আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – ষষ্ঠ খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

ফাতিমা বিন্‌ত আলআসাদ (রা)


তিনি ছিলেন একজন মহিয়সী সাহাবীয়া যিনি রাসূলুল্লাহকে (সা) এমনভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করেন যেমন একজন মানুষের বুক তার অন্তরকে এবং চোখের পাঁপড়ি চোখ দুটিকে রক্ষা করে। তিনি রাসূলুল্লাহকে (সা) এমন ভালোবাসতেন যেমন ভালোবাসে একজন মমতাময়ী মা তার একমাত্র সন্তানকে। ইসলামের প্রথম পর্বের ইতিহাসের যে সকল মহিয়সী মহিলার অবদান স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়েছে তাদের মধ্যে এই মহিলার নামটিও বিদ্যমান। তিনি অনেক মহত্ব ও মর্যাদার অধিকারিণী। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা) এর দাদা আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যুর তিনি তার লালন-পালনের সুযোগ লাভে ধন্য হন। তিনি ছিলেন ইসলামের চতুর্থ খলীফা ও রাসূলুল্লাহর (সা) একজন অন্যতম শ্রেষ্ট অশ্বারোহী বীর সৈনিক সাহাবী আলী ইবন আবী তালিবের (রা) গর্বিত মা। তিনি ছিলেন জান্নাতের অধিকারী যুবকদের দু‘নেতা হযরত হাসান ও হুসায়নর (রা) দাদী। মহান ম‘তার যুদ্ধের শহীদত্রয়ীর অন্যতম জ‘ফার আত-তায়্যারের (রা) মা। সর্বোপরি তিনি ছিলেন রাসূলুল্লহর (সা) প্রিয়তমা কন্যা, হাসান-হুসায়নের (রা) জননী হযরত ফাতিমা আয-যাহরার (রা) শ্বাশুড়ী। ইমাম শমসুদ্দিন আয-যাহবী (রহ) তার পরিচয় দিয়েছেন এভাবে : (আরবী*************) [সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/১১৮]

ফাতিমার পিতার নাম আসাদ। পিতামহ হাশিম, প্রপিতামহ আবদি মান্নাফ ইবন কুসায়। তিনি কুরায়শ গোত্রের হাশিমী শাখার কন্যা এবং আলী ইবন আবী তালিবের মা। পিতামহ হাশিমে গিয়ে তার বংশধারা রাসূলুল্লাহর (সা) বংশধারার সাথে মিলিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহর (সা) দাদা আবদুল মুত্তালিব ছিলেন একদিকে তার শ্বশুর এবং অন্য দিকে চাচা। প্রথম পর্বে মক্কা থেকে যে সকল মহিলা মদীনায় হিজরাত করেন তিনি তাদের একজন।

রাসূলুল্লাহর (সা) দাদা আবদুল মুত্তালিব যখন বুঝতে পারলেন যে, তার জীবন সন্ধা ঘনিয়ে এসেছে তখন তিনি ছেলে আবূ তালিবকে ডেকে তার ইয়াতিম ভাতিজা মুহাম্মদ ইবন আবদিল্লাহর লালন-পালানের ভার তার উপর অর্পণ করেন। তিনি চান যেন তার ইয়াতিম পৌত্রটি আবূ তালিব ও তার স্ত্রী ফাতিমা বিনত আসাদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠে। তিনি তাদেরকে মুহাম্মদের প্রতি বিশেষ যত্নবান হতে তাগিদ দেন। আর সেই থেকে বালক মুহাম্মদ তার চাচা-চাচী আবূ তালিব ও ফাতিমার (রা) সংসারের সাথে যুক্ত হন। ফাতিমা তার স্বামীর সাথে একযোগে মুহাম্মদের তত্ত্বাবধান ও প্রতিপালনে মনোযোগী হন। বালক তার মুহাম্মদ তার পরিবারে যুক্ত হওয়ার পর তিনি দেখতে পান, তার ছেলে-মেয়েরা যখন মুহাম্মদের সাথে আহার করে তখন তাদের খাবারে দারুণ বরকত হয়। আবূ তালিবের ছিলো অনেক গুলো ছেলে-মেয়ে। নিতান্ত অভাবী মানুষ। প্রতিবেলা তার পরিবারের জন্য যে খাদ্য-খাবারের ব্যবস্থা করা হতো তা সবাই এক সাথে অথবা পৃথকভাবে খেলে সবার পেট ভরতো না। কিন্তু যখন তাদের সাথে মুহাম্মদ খেতেন তখন সবারই পেট ভরে যেত। এ কারণে ছেলে-মেয়েরা যখন খেতে বসতো তখন আবূ তালিব বলতেন : “তোমরা একটু অপেক্ষা করো, আমার ছেলে মুহাম্মদ আসুক।“ তিনি আসতেন, এক সাথে খেতেন এবং তাদের খাবার বেঁচে যেত। এক পেয়েলা দুধ থেকে তিনি প্রথমে পান করলে তারা সবাই তৃপ্ত হয়ে যেত- যদিও তাদের একজনই সেই পূর্ণ পেয়ালাটি শেষ করে ফেলতে পারতো। তাই আবূ তালিব তাকে বলতেন : তুমি বড় বরকতময় ছেলে।

সাধারণত শিশু-কিশোররা উসকো-খুশকো ও ধুলি-মলিন থকে, কিন্তু মুহাম্মদ (সা) সবসময় তেল-সুরমা লাগিয়ে পরিপাটি অবস্থায় থাকতেন। [সীরাতু ইবন হিশাম-১/১২০] ফাতিমা বিনত আসাদ এ সবকিছু ‍দেখতেন। আর এতে মুহাম্মদের (সা) প্রতি স্নেহ-মমতা আরো বেড়ে যেত। তার প্রতি আরো যত্নবান হতেন। এভাবে তাকে শৈশব থেকে যৌবন পর্যন্ত, তথা হযরত খাদীজার (রা) সাথে বিয়ের আগ পর্যন্ত নিজের সন্তানের থেকেও অধিক স্নেহ-মমতা দিয়ে লালন-পালন করেন। সব রকমের অশুভ ও অকল্যাণ থেকে আঁচলে লুকিয়ে রাখার মত তাকে আগলে রাখেন। এ কারণে নবী (সা) সারা জীবন চাচী ফাতিমা বিনত আসাদের মধ্যে নিজের মা আমিনা বিনত ওহাবের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেতেন। তাকে গর্ভধারিণী মায়ের পরে দ্বিতীয় মা বলে মনে করতেন।

হযরত ফাতিমা বিনত আসাদ (রা) মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে লোকেরা যা কিছু বলাবলি করতো, বিশেষত স্বামী আবূ তালিব যে প্রায়ই বলতেন- [আস-সীরাতুল হালাবিয়্যাহ্-১/১৮৯; নিসাউন মুবাশশারাত বিল-জন্নাহ্-৪১] আমার এ ভাতিজা একজন বড় সম্মানের অধিকারী ব্যক্তি হবে- কান লাগিয়ে শুনতেন। তিনি স্বামীর মুখে আরো শোনেন সিরিয়া সফরের সময় কিশোর মুহাম্মদকে (সা) কেন্দ্র করে যেসব অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল তার বর্ণনা। তাছাড়া তিনি আরো শোনেন হযরত খাদীজার দাস মায়সাবার বর্ণনা যা তিনি যুবক মুহাম্মদের (সা) সাথে সিরিয়া ভ্রমণের সময় প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি নিজে মুহাম্মদের (সা) মধ্যে যা কিছু দেখেছিলেন এবং অন্যদের মুখে তার সম্পর্কে যেসব কথা শুনেছিলেন তাতে এত প্রভাবিত ও মুগ্ধ হন যে, কলিজার টুকরো আলীকে তার তত্ত্বাবধানে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা-সংকোচ করেননি।

তিনি অতি নিকট থেকে মুহাম্মদের (সা) মধ্যে স্নেহময় পিতার রূপ দেখেছিলেন। তিনি লক্ষ করেছিলেন আলীর জন্মের পর থেকে তার প্রতি মুহাম্মদের (সা) অত্যাধিক আগ্রহ ও উত্সাহকে। বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলতেন : আলীর জন্মের পর মুহাম্মাদ তার নিজের মুখ থেকে একটু থুথু নিয়ে তার মুখে দেয়। তারপর সে জিহ্বা চাটতে চাটতে ঘুমিয়ে যায়। পরদিন সকালে আমরা আলীর জন্য ধাত্রী ডেকে পাঠালাম। কিন্তু কারো স্তনই গ্রহন করলো না। আমি মুহাম্মাদ কে ডাকলাম। সে তার জিহ্বায় একটু দুধ ‍দিল। আর আলী তা চাটতে চাটতে ঘুমিয়ে গেল। আল্লাহ যতদিন ইচ্ছা করলেন এভাবে চলতে লাগলো। [আস-সীরাতুল হালাবিয়্যা-১/৪৩২; প্রাগুক্ত] এ সবকিছু দেখে-শুনে মুহম্মাদের প্রতি ফাতিমা বিনত আসাদের স্নেহ-মমতা ও ভক্তি-শ্রদ্ধা দিন দিন বেড়ে যেতে থাকে। তিনি ছেলে আলীকে মুহাম্মাদের (সা) সার্বাক্ষণিক সহচর হওয়ার তাকিদ দেন।

রাসূল (সা) প্রথম দিকে যখন কা‘বার চত্বরে নামায আদায় করতেন তখন কুরায়শরা তেমন গুরুত্ব ‍দিত না। পরে যখন নিয়মিত পড়তে লাগলেন, তখন আলী ও যায়দ তাকে পাহারা দিতেন। পরে এমন হলো যে, তারা দু‘জন রাসূল (সা) ঘর থেকে বের হলে সর্বক্ষণ তার সংগে থাকতেন। একদিন আলী (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছেন, তখন আবূ তালিব তাকে ডেকে পেলেন না। আলীর মা ফাতিমা বললেন : আমি তাকে মুহাম্মাদের সাথে যেতে দেখলাম। আবূ তালিব তাদেরকে তালাশ করতে করতে শি‘আবে আবী দাব-এ গিয়ে পেলেন। মুহাম্মাদ (সা) নামাযে দাঁড়িয়ে, আর আলী (রা) তাকে পাহারা ‍দিচ্ছেন। [আনসাবুল আশরাফ-১/১১১]

মুহাম্মাদ (সা) নবুওয়াত লাভ করলেন। নিজ গোত্র ও আত্মিয়-বন্ধুদেরকে ইসলামের দিকে আহবান জানানোর নির্দেশ লাভ করলেন। আল্লাহ নাযিল করলেন : (আরবি *******)[সূরা আশ-শু‘আরা-২১৪] “তুমি তোমার নিকট-আত্মিয়দের সতর্ক কর।

নবী (সা) তার প্রভুর নির্দেশ পালন করলেন। নিকট-আত্মিয়দের দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের দিকে আহবান জানালেন। তাদেরকে আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আনার তাগিদ ‍দিলেন। ইসলামের সেই একেবারে সূচনা পর্বে যে ক‘জন মুষ্টিমেয় মহিলা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আনে মুসলমান হন তাদের মধ্যে ফাতিমা বিনত আসাদ অন্যতম। সেদিন তার স্বামী আবূ তালিব ভাতিজা মুহাম্মাদের (সা) আবেদনে সারা দিতে অপারগ হলেও তাদের কিশোর ছেলে আলী (রা) আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আনেন।

এখান থেকেই এই মহিয়সী সাহাবীয়া ফাতিমা বিনত আসাদের (রা) জীবনের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হলো। কুরায়শরা মুহাম্মাদ ও তার দীন ইসলামের বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে লেগে গেল। তারা বানূ হাশিমের সাথে বিবাদে লিপ্ত হলো। যখন তারা দেখলো আবূ তালিব ও তার স্ত্রী মুহাম্মাদের (সা) সমর্থন ও আশ্রয় দিচ্ছেন তখন তারা মুহাম্মাদকে (সা) তাদের হাতে সমর্পণের দাবী জানালো। কিন্তু চাচা-চাচী ভাতিজা মুহাম্মাদের (সা) পক্ষে অটল থাকলেন। কোন চাপের কাছেই নত হলেন না। মুহাম্মাদকে (সা) তাদের হতে অর্পণের আবদার শক্তভাবে প্রত্যাখ্যান করলেন। ফলে যারা ঈমান এনে মুহাম্মাদের (সা) অনুসারী হয়েছিল তাদের প্রতি তারা প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে উঠলো।

নবী (সা) যখন দেখলেন কুরায়শরা তার অনুসারীদের উপর অত্যাচার-উত্পীড়নের ক্ষেত্রে মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে তখন তিনি তাদেরকে আবিসিনিয়ায় হিজরাতের অনুমতি দান করেন। কুরায়শদের অত্যাচার থেকে বাচার জন্য মুসলামনদের যে দলটি প্রথম আবিসিনিয়া হিজরাত করেন তার মধ্যে ফাতিমা বিনত আসাদের কলিজার টুকরা জা‘ফার ইবন আবী তালিব (রা) ও তার স্ত্রী আসমা বিনত উমাইসও (রা) ছিলেন। যাত্রাকালে মা ফাতিমার (রা) এই ছেলেটি ছিল চেহারা-সুরতে ও আদবে-আখলাকে নবী করীমের (সা) অনুরূপ। কুরায়শদের যে পাঁচ ব্যক্তিকে লোকেরা রাসূলুল্লাহর (সা) অনুরূপ বলে মনে করতো তারা হলেন : জা‘ফার ইবন আবী তালিব, কুছাম ইবন আল-আব্বাস, আস-সায়িব ইবন উবায়দ ইবন আবদি ইয়াযীদ ইবন হাশিম ইবন আবদুল মুত্তালিব, আবূ সুফিয়ান ইবন আল-হারিছ ইবন আবদিল মুত্তালিব ও আল-হাসান ইবন আলী ইবন আবী তালিব (রা)। [নিসাউন মুবাশশারাত বিল জান্নাহ-৪২]

কুরায়শরা যখন দেখলো বিষয়টি আস্তে আস্তে তাদের ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে, তারা বানূ হাশিম ও বানূ আবদিল মুত্তালিবের নারী-পুরুষ ও শিশু-যুবক-বৃদ্ধ সকলকে “শি‘আবে আবী তালিব“ উপত্যকায় অবরুদ্ধ অবস্থায় রাখার সিদ্ধান্ত নিল। ফাতিমা বিনত আসাদ (রা) আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে অন্য নারীদের সাথে এ অবরোধ মেনে নেন। অন্যদের সাথে তিনিও এ অবরুদ্ধ জীবনের তিনটি বছর সীমাহীন ক্ষুধা ও অনাহারের মুখোমুখি হন এবং গাছের পাতা খেয়ে কোন রকম জীবন রক্ষা করেন। অবশেষে তিন বছর পর নবুওয়াতের দশম বছরে তারা অবরোধ তুলে নেয়। অন্য মুসলমানদের সাথে ফাতিমাও (রা) মুক্ত জীবনে ফিরে আসেন। এ তিনটি বছর মহিলারা চরম ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দান করেন।

“শি‘আবে আবী তালব“ থেকে মুক্ত হওয়ার পর নবুওয়াতের দশম বছরে রাসূলুল্লাহর (সা) অতি আপন দু‘ব্যক্তি মাত্র অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে ইনতিকাল করেন। প্রথমে তার প্রিয়তমা স্ত্রী উম্মুল মু‘মিনীন হযরত খাদীজা বিনত খুওয়ায়লিদ (রা) ও পরে চাচা আবূ তালিব এ দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। এতদিন এ দু‘জনই ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনে ঢালস্বরূপ। এখন এ দু‘জনের অবর্তমানে অত্যাচারী কুরায়শরা আরো জোরে-শোরে নবী (সা) ও তার অনুসারীদের উপর জুলুম-নির্যাতন করতে শুরু করে। অবশেষে আল্লাহ তায়ালা নবী করীম (সা) ও মুসলমানদেরকে মদীনায় হিজরাতের অনুমতি দান করেন।

রাসূল (সা) ও তার সঙ্গী-সাথীরা মদীনায় হিজরাত করলেন। ফাতিমা বিনত আসাদও (রা) অন্যদের সাথে মক্কা ত্যাগ করে মদীনায় চলে গেলেন। যুবায়র ইবন বাক্কর তার ইসলাম ও হিজরাত সম্পর্কে বলেন : (আরবী*****************) [আল-ইসতিয়াব-৪/৩৭০] “তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের দিকে হিজরাত করেন।“

তার স্থান ও মর্যাদা

অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাবি‘ঈ ইমাম আশ-শা‘বী (রহ) তার ইসলাম ও হিজরাত সম্পর্কে বলেন : (আরবী*****************) [উসুদুল গাবা-(৭১৬৮); আল-ইসাবা-৪/৩৮০] “আলী ইবন আবী তালিবের (রা) মা ফাতিমা বিনত আসাদ ইবন হাশিম ইসলাম গ্রহন করেন এবং মদীনায় হিজরাত করেন।“

রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট ফাতিমা বিনত আসাদের (রা) মর্যাদা ও গুরুত্ব সম্পর্কে ইবন সা‘দ বলেন : (আরবী***********) [তাবাকাত-৮/২২২; সিফাতুল সাফওয়া-২/৫৪; আল-ইসাবা-৪/৩৮০] “ফাতিমা বিনত আসাদ ইসলাম গ্রহন করেন। তিনি একজন সত্কর্মশীল মহিলা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে দেখতে যেতেন এবং তার গৃহে দুপুরে বিশ্রাম নিতেন।“

তার সত্যনিষ্ঠা ও ধর্মপরায়ণতার কারণে রাসূল (সা) তাকে অতিমাত্রায় ভক্তি-শ্রদ্ধা করতেন। তাকে লালন-পালন, আদব-আখলাক শিক্ষাদান ও তার সাথে সুন্দর ব্যবহারের প্রতিদানে রাসূলও (সা) তার সাথে সবসময় সদ্ব্যবহার করতেন। তার ছেলে আলীর (রা) সাথে রাসূলুল্লাহর কন্যা ফাতিমার (রা) বিয়ে হলো। তখন তিনি একজন মমতাময়ী মা ও একজন আদর্শ শ্বাশুড়ী হসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাদের জীবন তো আর এমন বিত্ত-বৈভবের জীবন ছিলনা। সব কাজ নিজেদেরই করতে হতো। নবী দহিতা ফাতিমাকে (রা) ঘরে আনার পর আলী (রা) মাকে বললেন : আমি পানি আনা, প্রয়োজনে এদিক-ওদিক যাওয়ার ব্যাপারে ফাতিমা বিনত রাসূলুল্লাহকে সাহায্য করবো, আর আপনি তাকে ঘরের কাজে, গম পেষা ও আটা চটকানোর কাজে সাহায্য করবেন। [সিফাতস সাফওয়া-২/৫৪; আয-যাহাবী, আরীখুল ইসলাম-৩/৬২১; উসুদুল গাবা-৫/৫১৭]

ফাতিমা বিনত আসাদের প্রতি রাসূলুল্লাহর (সা) অতিরিক্ত ভক্তি-শ্রদ্ধা থাকার কারণে তিনি মাঝে মাঝে তাকে বিভিন্ন জিনিস উপহার-উপঢৌকন পাঠাতেন। জা‘দা ইবন হুবায়রা আলী থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন : একবার রাসূল (সা) আমাদের নিকট এক জোড়া অতি উন্নতমানের নতুন কাপড় পাঠালেন। সাথে সাথে এ কথাও বলে পাঠালেন যে, “এ দু‘টোকে নিকাবের কাপড় বানিয়ে ফাতিমাদের মধ্যে ভাগ করে দাও।“ আমি চার টুকরো করলাম। এক টুকরো ‍দিলাম ফাতিমা বিনত রাসূলুল্লাহকে, এক টুকরো ফাতিমা বিনত আসাদকে এবং আর এক টুকরো ফাতিমা বিনত হামযাকে (রা)। তবে তিনি চতুর্থ টুকরোটি যে কাকে দেন তা বলেননি। ইবন হাজার (রহ) বলেছেন, সম্ভবত চতুর্থটি দেন আকীল ইবন আবী তালিবের স্ত্রী ফাতিমা বিনত শায়বাকে। [উসুদুল গাবা-৫/৫১৭; আল-ইসাবা-৪/৩৮০] উল্লেখ্য যে, ফাতিমা নামে চব্বিশজন মহিলা সাহাবী ছিলেন। [নিসাউন মিন আসর আন-নুবুওয়াহ-২২; নিসাউন মুবাশশারাত বিল জান্নাহ-৪৪]

ইবনুল আছীর বলেছেন, ফাতিমা বিনত আসাদ প্রথম হাশিমী মহিলা যিনি একজন হাশিমী বংশের সন্তান জন্মদান করেন। [আল-ইসতীয়াব-২/৭৭৪; সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/১১৮] তিনি প্রথম হাশিমী যার গর্বে একজন খলীফার জন্ম হয়। তারপর ফাতিমা বিনত রাসূলিল্লাহর (সা) গর্ভে জন্ম হয় আল-হাসান ইবন আলীর (রা)। তারপর খলীফা হারূনুর রশীদের স্ত্রী যুবাইদার গর্ভে জন্মগ্রহন করেন খলীফা আল-আমিন। [নিসাউন মুবাশশারাত বিল-জান্নাহ-৪৫]

সাহাবায়ে কেরামের অন্তরেও ফাতিমা বিনত আসাদের (রা) একটা মর্যাদাপূর্ণ আসন ছিল। বিশেষ করে সাহাবী কবিদের নিকট। জা‘ফার ইবন আবী তালিব (রা) মু‘তায় শহীদ হওয়ার পর কবি আহসান ইবন ছাবিত (রা) তার স্বরণে যে কবিতাটি রচনা করেন তাতে তার মা ফাতিমারও ভূয়সী প্রশংসা করেন। [সীরাতু ইবন হিশাম-২/১৫১]

তেমনিভাবে কবি আল-হাজ্জাজ ইবন আলাত আস-সুলামীও উহুদ যুদ্ধে হযরত আলীর (রা) বীরত্ব ও সাহসিকতার প্রশংসা করতে গিয়ে তার মায়েরও প্রশংসা করেন। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৭/৩৩৬; নিসাউন মুবাশশারাত বিল-জান্নাহ-৪৫]

অনেকের ধারণা যে, তিনি হিজরাতের পূর্বে ইন্তেকাল করেন। তবে তা সঠিক নয়। ইমাম আস-সামহূদী (রহ) তার “আল-ওয়াফা বি আখবারি দারিল মুস্তাফা“ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি মদীনায় মারা যান এবং তাকে “আর-রাওহা“ গোরস্তানে দাফন করা হয়। [আল-ইসাবা-৪/৩৮০]

নবী করীমের (সা) অন্তরে হযরত ফাতিমা বিনত আসাদের (রা) ছিল বিশেষ মর্যাদার স্থান। তাই তার মৃত্যুর পরেও রাসূল (সা) তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কথা ভোলেননি। তিনি নিজের জামা দিয়ে ফাতিমাকে কাফন দিয়েছেন। তার কবরে নেমে তার পাশে শুয়েছেন এবং তার ভালো কাজের কথা উল্লেখ করে প্রশংসা করেছেন। [ উসুদুল গাবা-৫/৫১৭ ] আস-সামহুদী উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) মাত্র পাঁচটি কবর ছড়া আর কোন কবরে নামেননি। সেই পাঁচটির মধ্যে তিনটি নারীর এবং দুটি পুরুষের। তার মধ্যে আবার একটি মক্কায় এবং চারটি মদীনায়। মদীনার গুলো হলো : ১. খাদীজার (রা) ছেলের কবর। ছেলেটি রাসূলুল্লাহর (সা) গৃহে ও তত্ত্বাবধানে ছিল। ২. “যূ আল-বিজাদাইন“ (দুই চাদরের অধিকারী) বলে খ্যাত আবদুল্লাহ আল-মুযানীর (রা) কবর। ৩. উম্মুল ম‘মিনীন আয়িশার (রা) মা উম্মু রূমানের (রা) কবর। ৪. ফাতিমা বিনত আসাদের (রা) কবর। [ওয়াফা আল-ওয়াফা৩/৮৯৭; নিসাউন মিন আসর আন-নুবুওয়াহ-২৩]

হযরত ফাতিমা বিনত আসাদের মৃত্যু রাসূল (সা) এবং সাহাবীদের মনে দারুণ বেদনার ছাপ ফেলে। রাসূল (সা) তার জন্য দুয়া করেন, তার প্রশংসা করেন এবং নিজের জামা দিয়ে তার কাফন দেন। হযরত জাবির ইবন আবদিল্লাহ (রা) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে বসে ছিলাম। এমন একজন এসে বললো : ইয়া রাসূলুল্লাহ! আলী, জা‘ফার ও আকীলের মা মারা গেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : তোমরা সবাই আমার মার কাছে চলো। আমরা উঠলাম এবং এমন নিশব্দে পথ চললাম যেন আমাদের প্রত্যেকের মাথার উপর পাখী বসে আছে। বাড়ির দরজায় পৌছার পর রাসূল (সা) গায়ের জামাটি খুলে পরিবারেরে লোকদের হাতে দিয়ে বলেন : তার গোসল দেওয়া শেষ হলে এটি তার কাফনের নীচে দিয়ে দেবে।

যখন লোকেরা দাফনের জন্য লাশ নিয়ে বের হলো তখন রাসূল (সা) একবার খাটিয়ায় কাঁধ দেন, একবার খাটিয়ার সামনে যান, আরেকবার পিছনে আসেন। এভাবে তিনি কবর পর্যন্ত পৌছেন। তারপর কবরে নেমে গড়াগড়ি ‍দিয়ে আবার উপরে উঠে আসেন। তারপর বলেন : আল্লাহর নামের সাথে এবং আল্লাহর নামের উপরে তোমরা তাকে কবরে নামও। দাফন কাজ শেষ হওয়ার পর তিনি সোজা হয়ে দাড়িয়ে বলেন : আমার মা ও প্রতিপালনকারিণী! আল্লাহ আপনাকে ভালো প্রতিদান দিন। আপনি ছিলেন আমার একজন চমত্কার মা ও চমত্কার প্রতিপালনকারিণী। জাবির বলেন : আমরা বললাম : ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি এখানে এমন দুটি কাজ করেছেন, আমরা কখনো আপনাকে এ ধরণের কাজ করতে দেখিনা। বললেন : সে দুটি কাজ কি? বললাম : আপনার জামা খুলে দেওয়া এবং কবরে গড়াগড়ি দেওয়া। বললেন : জামাটির ব্যাপার হলো, আমি চেয়েছি তাকে যেন কখনো জাহান্নামের আগুন স্পর্শ না করে। যদি আল্লাহ চান। আর কবরে আমার গড়াগড়ি দেওয়া – আমি চেয়েছি আল্লাহ যেন তার কবরটি প্রশস্ত করে দেন। [ কানয আল-উম্মাল-১৩/৬৩৬; সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/১১৮]

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে নবী (সা) ফাতিমা বিনত আসাদের কবরে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়েন। তারপর এই দু‘আটি পাঠ করেন : (আরবী****************) “ আল্লাহ যিনি জীবন ও মৃত্যু দান করেন। তিনি চিরঞ্জীব যার মৃত্যু নেই। আমার মা ফাতিমা বিনত আসাদকে আপনি ক্ষমা করুন এবং তাকে তার যুক্তি-প্রমাণকে শিখিয়ে দিন। আপনার নবী এবং আমার পূর্ববর্তী নবীদের দাবির ভিত্তিতে আপনি তার কবরকে প্রশস্ত করে দিন। আপনি হলেন সকল দয়ালুদের মধ্যে সবচেয়ে বড় দয়ালু।“

তারপর তিনি চারবার তাকবীর উচ্চারণ করেন। লাশ কবরে নামান রাসূল (সা), আব্বাস ও আবূ বকর সিদ্দিক (রা)। [নিসাউন মবাশশারাত বিল-জান্নাহ-৪৭]

হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) বলেন, যখন আলীর (রা) মা ফাতিমা (রা) গেলেন তখন নবী (সা) নিজের একটি জামা তাকে পরান এবং তার সাথে শুয়ে পড়েন। লোকেরা বললো : ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা)! আমরা তো আপনাকে আর কখনো এমনটি করতে দেখিনি। বললেন : আবূ তালিবের পরে তার চেয়ে বেশী সদাচরণ আর কেউ আমার সাথে করেনি। আমি আমার জামা তার গয়ে এ জন্য পরিয়েছি যেন তাকে জান্নাতের পোশাক পড়ানো হয়, আর তার সাথে এজন্য শুয়েছি যেন তার সাথে সহজ আচরণ করা হয়। [ আ‘লাম আন-নিসা-৪/৩৩; সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/১১৮]

এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায় ফাতিমা বিনত আসাদ (রা) অবশ্যই জান্নাতে যাবেন। ইমাম আল-কুরতুবী বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা তার নবী মুহাম্মাদের (সা) এ বৈশিষ্ট্য দান করেছেন যে, কবরে তার উপর দলন-পেষণ চালানো হবে না। যেহেতু তিনি ফাতিমা বিনত আসাদের কবরে শুয়েছেন, এজন্য তার বরকতে ফাতিমা (রা) কবরের পেষণ থেকে মুক্তি পেয়ে গিছেন। [ আস-সীরাতুল আলাবিয়্যা-২/৬৭৩]

হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বলেছেন, যখন আলীর (রা) মা ফাতিমা বিনত আসাদ (রা) মারা গেলেন তখন রাসূল (সা) তার বাড়ীতে গেলেন এবং তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন : হে আমার মা, আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করুন। আমার মার পরে, আপনি অভুক্ত থেকে আমার পেট ভরাতেন, আপনি না পরে আমাকে পরাতেন এবং ভালো কিছু নিজে না খেয়ে আমাকে খাওয়াতেন। এর দ্বারা আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকাল লাভের আশা করতেন। [ মাজমা আয-যাওযায়িদ-৯/২৫৬; নিসাউন মবাশশারাত বিল-জান্নাহ-৪৮]

হযরত রাসূলে কারীম (সা) এত বড় মহানুভব ব্যক্তি ছিলেন যে, কেউ তার প্রতি সামান্য দয়া ও অনুগ্রহ দেখালে তা কোনদিন ভোলেননি। কথায় ও কর্মের দ্বারা সবসময় তার প্রতি কৃতিজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তাহলে ফাতিমা বিনত আসাদ (রা), যিনি নবীর (সা) জীবনে মায়ের ভূমিকা পালন করেছেন, আল্লাহ ও তার রাসূলের জন্য হিজরাত করেছেন এবং সারাটি জীবন রাসূলেস কল্যাণ চিন্তা করেছেন, তাকে তিনি ভুলবেন কেমন করে? তার সাথে যেমন আচরণ করা দরকার তা তিনি করেছেন।

হযরত ফাতিমা বিনত আসাদ (রা) থেকে রাসূলুল্লাহর (সা) ছেচল্লিশটি (৪৬) হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তার মধ্যে একটি মুত্তাফাক আলাইহি (বুখারী ও মুসলিমে একই সনদে বর্ণিত হয়েছে)। [ আ‘লাম আন-নিসা-৪/৩৩]

তার ছেলেরা হলেন : তালিব, আকীল, জা‘ফার ও আলী (রা) এবং মেয়েরা হলেন : হাম্মাদ ও রীতা। [তাবাকাত-৮/১৬১]

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ