আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – ষষ্ঠ খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

সুমায়্যা বিনত খুববাত (রা)


ইসালামের প্রথম শহীদ হযরত সুমায়্যা (রা) একজন মহিলা সাহাবী। তার বংশ পরিচয় তেমন একটা পাওয়া যায় না। ইবন সা‘দ তার পিতার নাম “খুববাত“ বলেছেন, [তাবাকাত-৮/২৬৭] কিন্তু বালাজুরী বলেছেন ‘খায়্যাত‘। [আনসাবুল আশরাফ-১/১৫৭] প্রখ্যাত শহীদ সাহাবী ‘আম্মার ইবন ইয়াসিরের (রা) মা এবং মক্কার আবু হুজাইফা ইবন আল-মগীরা আল-মাখযুমীর দাসী। [তাবাকাত-৮/২৬৮]

আল-ওয়াকিদীসহ একদল বংশবিদ্যা বিশারদ বলেছেন, হযরত ‘আম্মারের (রা) পিতা ইয়াসির ইয়ামনের মাজহাজ গোত্রের ‘আনসী শাখার সন্তান। তবে তার ছেলে ‘আম্মার মক্কার বানূ মাখযুমের আযাদকৃত দাস। ইয়াসির তার দু‘ভাই- আল হারিছ ও মালিককে সংগে নিয়ে তাদের নিখোঁজ চতুর্থ ভাইয়ের সন্ধানে মক্কায় আসেন। আল-হারিছ ও মালিক স্বদেশ ইয়ামনে ফিরে গেলেন, কিন্তু ইয়াসির মক্কায় থেকে যান। মক্কার রীতি অনুযায়ী তিনি আবূ হুযায়ফা ইবন আল-মুগীরা আল-মাখযুমীর সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে থাকেন। আবূ হুজাইফা তার দাসী সুমায়্যাকে ইয়াসিরের সাথে বিয়ে দেন এবং তাদের ছেলে ‘আম্মারের জন্ম হয়। আবূ হুজাইফা ‘আম্মারকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে নিজের সাথে রেখে দেন। যতদিন আবূ হুজাইফা জীবিত ছিলেন ‘আম্মার তার সাথেই ছিলেন। [সীরাত ইবন হিশাম-১/২৬১; টিকা-৪; আনসাবুল আশরাফ-১/১৫৭] উল্লেখ্য যে, এই আবূ হুজাইফা ছেলেন নরাধম আবূ জাহলের চাচা। [ আল-আ‘লাম-৩/১৪০] হযরত সুমায়্যা (রা) যখন বার্ধক্যে দুর্বল হয়ে পড়েছেন তখন মক্কায় ইসলামী দা‘ওয়াতের সূচনা হয়। তিনি প্রথম ভাগেই স্বামী ইয়াসির ও ছেলে আম্মার সহ গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেন। কিছুদিন পর প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন। মক্কায় তাদের এমন কোন আত্মিয়-বন্ধু ছিল না যারা তাদেরকে কুরাইশদের নিষ্ঠুরতার হাত থেকে বাঁচাতে পারতো। আর তাই তারা তাদের উপর মাত্রা ছাড়া নির্যাতন চালাতে কোন রকম ত্রুটি করেনি।

ইমাম আহমাদ ও ইবন মাজাহ বর্ণনা করেছেন, আবদুল্লাহ ইবন মাস‘উদ (রা) বলেন : সর্ব প্রথম যারা ইসলামের ঘোষণা দান করেন, তারা হলেন সাত জন। রাসূলুল্লাহ (সা), আবু বকর, আম্মার, আম্মারের মা সুমায়্যা, সুহাইব, বিলাল ও আল-মিকদাদ (রা)। আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহকে (সা) তার চাচার দ্বারা এবং আবু বকরকে তার গোত্রের দ্বারা নিরাপত্তা বিধান করেন। আর অন্যদেরকে পৌত্তলিকরা লোহার বর্ম পরিয়ে প্রচন্ড রোদে দাড় করিয়ে রাখতো। [ আল-বিদায়া-৩/২৮; কানয আল ‘উম্মাল-৭/১৪; আল-ইসাবা-৪/৩৩৫; হায়াতুস সাহাবা-১/২৮৮]

হযরত জাবির (রা) বলেন, একদিন মুশরিকরা যখন ‘আম্মার ও তার পরিবারবর্গকে শাস্তি দিচ্ছিল তখন সেই পথ দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) কোথাও যাচ্ছিলেন। তিনি তাদের অবস্থা দেখে বলেন : “হে ইয়াসিরের পরিবার-পরিজন! তোমাদের জন্য সুসংবাদ। তোমাদের জন্য রয়েছে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি।“ [ হায়াতস সাহাবা-১/২৯১]

আবদুল্লাহ ইবন জা‘ফার (রা) বলেন, রাসূল (সা) তাদের সেই অসহায় অবস্থায় দেখে বলেন : “হে ইয়াসিরের পরিবারবর্গ ধৈর্য ধর। তোমাদের জন্য জান্নাত নির্ধারিত রয়েছে। [সীরাতু ইবন হিশাম-১/৩২০; আনসাবুল আশরাফ-১/১৬০, হায়াতস সাহাবা-১/২৯১] ইবন আব্বাসের (রা) বর্ণনায় একথাও এসেছে যে, সুমায়্যাকে (রা) আবু জাহল বল্লম মেরে হত্যা করে। ‍অত্যাচার, উত্পীড়নে ইয়াসিরের মৃত্যু হয় এবং আবদুল্লাহ ইবন ইয়াসিরকে তীরবিদ্ধ করা হয়, তাতেই তিনি মারা যান।

উসমান (রা) বলেন, একদিন আমি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে ‘আল-বাতহা‘ উপত্যকায় হাটছিলাম। তখন দেখতে পেলাম, আম্মারের পিতা রাসূলকে (সা) দেখে বরে ওঠেন : ইয়া রাসূলুল্লাহ! কালচক্র এ রকম? রাসূল (সা) বললেন : হে ইয়াসিরের পরিবার-পরিজন! ধৈর্য ধর। হে আল্লাহ! ইয়াসিরের পরিবারবর্গকে ক্ষমা করুন। [ তাবাকাত-৩/১৭৭; কানয আল-উম্মাল-৭/৭২]

সারাদিন এভাবে শাস্তি ভোগ করার পর সন্ধ্যায় তারা মুক্তি পেতেন। শাস্তি ভোগ করে হযরত সুমায়্যা প্রতিদিনের মত একদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলেন। পাষণ্ড আবু জাহল তাকে অশালীন ভাষায় গালি দিতে থাকে। এক পর্যায়ে তার পশুত্বের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যায়। সে সুমায়্যার দিকে বর্শা ছুড়ে মারে এবং সেটি তার যৌনাঙ্গে গিয়ে বিদ্ধ হয় এবং তাতেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। [ তাবাকাত-৮/২৬৫; আল-বিদায়া-৩/৫৯; সিফাতুস সাফওয়া-২/৩২] ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি‘উন।

মায়ের এমন অসহায় মৃত্যুবরণে ছেলে আম্মারের দুখের অন্ত ছিলনা। তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে বললেন : ইয়া রাসূলুল্লাহ! এখন তো জুলুম-অত্যাচার মাত্রা ছাড়া রূপ নিয়েছে। রাসূল (সা) তাকে ধৈর্য ধরার উপদেশ দিলেন। তারপর বললেন : “হে আল্লাহ, তুমি ইয়াসিরের পরিবারের কাউকে জাহান্নামের আগুনের শাস্তি দিওনা।“[সীরাতু ইবন হিশাম-১/৩১৯; টিকা-৫]

হযরত সুমায়্যার (রা) শাহাদাতের ঘটনাটি হিজরতের পূর্বের। এ কারণে তিনিই হলেন ইসলামের প্রথম শহীদ। হযরত মুজাহিদ (রহ) বলেন : ইসলামের প্রথম শহীদ হলেন আম্মারের মা সুমায়্যা। [তাবাকাত-৮/২৬৫; আল-বিদায়া-৩/৫৯; সিফাতুস সাফওয়া-২/৩২]

বদর যুদ্ধে নরাধম আবু জাহল নিহত হলে রাসূল (সা) আম্মারকে বলেন : “আল্লাহ তোমার মায়ের ঘাতককে হত্যা করেছেন। [আল-আসাবা-৪/৩৩৫] হযরত সুমায়্যা (রা) শাহাদাতের ঘটনাটি ঘটে ৬১৫ খ্রীস্টাব্দে। [আল-আ‘লাম-৩/১৪০]

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ