আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – ষষ্ঠ খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

উম্মু উমার (রা)


মদীনার একজন আনসারী মহিলা। ‍উম্মু উমার উপনামে তিনি ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। ভালো নাম নুসাইবা। পিতার নাম কা‘আব ইবন আমর। মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের নাজ্জার শাখার কন্যা। [ সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৭৮] রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় হিজরতের প্রায় চল্লিশ বছর পূর্বে মদীনায় জন্ম গ্রহণ করেন। [সাহাবিয়াত-২০৪] বিখ্যাত বদরী সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবন কা‘ব আল মাযিনীর বোন। [সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৭৮]

উম্মু উমারার প্রথম বিয়ে হয় যায়দ ইবন আসিম ইবন আমরের সাথে। এই যায়দ ছিলেন তার চাচাতো ভাই। তার মৃত্যুর পর গাযিয়্যা ইবন আমরের সাথে ‍দ্বিতীয় বিয়ে হয়। প্রথম পক্ষে আবদুল্লাহ ও হাবীব এবং দ্বিতীয় পক্ষে তামীম ও খাওলা নামক মোট চার সন্তানের মা হন। [তাবাকাত-৮/৪১২; আল-ইসাবা-৪/৪৭৯]

ইসলামের একেবারে সূচনাপর্বে হযরত রাসূলে করীম (সা) মক্কায় ও তার আশে-পাশের জনপদে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চলেছেন এবং দিন দিন কঠোর থেকে কঠোরতর প্রতিরোধের মুখোমুখি হচ্ছেন। মাঝে মাঝে অন্তর মাঝে নৈরাশ্য ও হাতশা বোধ জন্ম নিলেও আল্লাহর রহমত এবং সাহায্য-সহায়তার উপর পূর্ণ বিশ্বাস রেখে তাবলীগী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। রাসূলুল্লাহর (সা) মক্কী জীবনের এমন এক প্রক্ষাপটে ইয়াছরিবের ছয় ব্যক্তি মক্কায় আসেন এবং রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে সাক্ষাৎ করেন, কথা শোনেন এবং ইসলাম গ্রহণ করে ইয়াছরিবে ফিরে যান। পরের বছর হজ্জ মওসুমে তারা আরো ছয় জনকে সংগে করে মক্কায় যান এবং গোপনে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে সাক্ষাৎ করে বাই‘আত করেন। যাকে আকাবার প্রথম বাই‘আত বলা হয়। ইয়াছরিব তথা মদীনায় ইসলাম প্রচার ও প্রসারের লক্ষে এবং তাদের অনুরোধে রাসূল (সা) দা‘ঈ হিসেবে মুস‘আব ইবন উমাইরকে (রা) তাদের সাথে মদীনায় পাঠান। এই ছোট্ট দলটি পরবর্তী একবছর মদীনায় ব্যাপকভাবে ইসলামের প্রচারের কাজ নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখেন। তারা এত আন্তরিকভাবে কাজ করেন যে, মাত্র এক বছরের মধ্যে মদীনার প্রতিটি ঘরে ইসলামের দাওয়াত পৌছে যায়। এ সময়ের মধ্যে মদীনার অনেক বড় বড় নেতা ও অভিজাত ঘরের নারী-পুরুষ ইসলামের দা‘ওয়াত কবুল করেন। যার ফল এই দাঁড়ায় যে, পরবর্তী হজ্জ মওসুমে তিয়াত্তর মাতন্তরে পঁচাত্তর জনের বিশাল একটি দল নিয়ে মুস‘আব মক্কায় যান এবং আকাবায় রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে গোপনে সাক্ষাৎ করেন। আর সেখানে অনুষ্ঠিত হয় আকাবার দ্বিতীয় বাই‘আত। রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় হিজরাতের পূর্বে হযরত মুস‘আবের তাবলীগে মদীনার যে সকল নারী-পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করেন উম্মু উমারা (রা) তাদের একজন। কেবল তিনি নন, এ সময়কালে তার গোটা খানদান মুসলমা হন। এভাবে তিনি হলেন প্রথম পর্বের একজন মুসলমান আনসারী মহিলা। [সাহাবিয়াত-২০৪]

হযরত উম্মু উমারার জীবনের বড় ঘটনা আকাবার বাই‘আতে অংশগ্রহণ। আকাবার দ্বিতীয় বাই‘আতে পঁচাত্তর জন মুসলমান অংশগ্রহণ করেন। তার মধ্যে দুই জন মহিলা ছিলেন। উম্মু উমারা (রা) তার একজন। দ্বিতীয় মহিলা ছিলেন উম্মু মানী (রা)। [সীরাত ইবন হিশাম-১/৪৪১] পুরুষদের বাই‘আতের শেষে উম্মু উমারার স্বামী হযরত গাযিয়্যা ইবন আমর মহিলা দইজনকে ডেকে রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে হাজির করে আরজ করেন : ইয়া রাসূলুল্লহ! এই দুই মহিলাও বাই‘আতের উদ্দেশ্যে আমাদের সাথে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি বললেন : যে অঙ্গীকারের উপর তোমাদের বাই‘আত গ্রহণ করেছি ঐ একই অঙ্গীকারের উপর তাদেরও বাই‘আত গ্রহণ করছি। হাত মিলনোর প্রয়োজন নেই। আমি মহিলাদের সাথে হাত মিলাইনা। [আনসাব আল-আশরাফ-১/২৫০; আল-ইসাবা-৪/৪৭৯; সীরাতু ইবন হিশাম-১/৪৬৬]

হিজরী দ্বিতীয় সনে উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে উম্মু উমারা (রা) যোগ দেন। এ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহর (সা) মুহতারাম চাচা হযরত হামযা (রা) সহ বহু মুসলমান শহীদ হন। আল-ওয়াকিদী বলেন : [সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৭৮] উম্মু উমারা তার স্বামী গাযিয়্যা ইবন আমর ও প্রথম পক্ষের দুই ছেলে আবদুল্লাহ ও হাবীবের [কোন কোন বর্ণনায় হাবীব-এর স্থলে ‘খুবায়ব‘ এসেছে] সাথে উহুদে যোগদান করেন। মূলত তিনি গিয়েছিলেন একটি পুরানো মশক সংগে নিয়ে যোদ্ধাদের পানি পান করানোর উদ্দেশ্যে। কিন্তু এক পর্যায়ে সরাসরি সংঘর্ষে জরিয়ে পড়েন। চমত্কার রণকৌশলের পরিচয় দেন। শত্রুর বারোটি মতান্তরে তেরোটি আঘাতে তার দেহ জর্জরিত হয়। [তাবাকাত-৮/৪১২; সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৭৯] কোন কোন বর্ণনায় এসেছে এ যোদ্ধে তিনি তীর-বর্শা দ্বারা বারোজন পৌত্তলিক সৈন্যকে আহত করেন। [আনসাব আল-আশরাফ-১/৩২৫]

উহুদ যোদ্ধের এক পর্যায়ে শত্রু বাহিনীর পাল্টা আক্রমনে মুসলিম বাহিনীর বনোবল ভেঙ্গে যায়। মুষ্টিমেয় কয়েকজন জানবাজ মুজাহিদ ছাড়া আর সকলে রাসূলুল্লাহকে (সা) ছেড়ে ময়দান থেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। যে কয়েকজন মুজাহিদ নিজেদের জীবন বাজি রেখে রাসূলুল্লাহর (সা) নিরাপত্তা বিধান করেন তাদের মধ্যে উম্মু উমারা, আর স্বামী গাযিয়্যা ও ‍দুই ছেলে আবদুল্লাহ ও হাবীবও ছিলেন।

রণক্ষেত্রের এই নাজুক অবস্থার আগে যখন মুসলিম বাহিনী খুব শক্তভাবে শত্রুবাহিনীর মুকাবিলা করছিল এবং বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌছে গিয়েছিল তখনো উম্মু উমারা (রা) হাত পা গুটিয়ে বসে ছিলেন না। মশকে পানি ভরে নিয়ে মুজাহিদদের পান করাচ্ছিলেন। এমন সময় দেখলেন যে সবাই ময়দান ছেড়ে পালাচ্ছে। রাসূলুল্লাহর (সা) পাশে মাত্র গুটিকয়েকজন মুজাহিদ। তিনিও এগিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) পাশে জীবন বাজি রেখে অটল হয়ে দাঁড়ালেন। আর তার পাশে এসে অবস্থান নিলেন স্বামী ও দুই ছেলে। তিনি একদিকে রাসূলুল্লাহর (সা) উপর কাফিরদের আক্রমণ প্রতিহত করছিলেন, অপর দিকে তাদের উপর প্রচণ্ড আক্রমন চালিয়ে অনেককে ধরাশায়ী করে ফেরেছিলেন।

উহুদ যুদ্ধের সেই মারাত্মক পর্যায়ের বর্ণনা উম্মু উমারা দিয়েছেন এভাবে : “আমি দেখলাম, লোকেরা রাসূলুল্লাহকে (সা) ছেড়ে পালাচ্ছে। মাত্র মুষ্টিমেয় কয়েকজন যাদের সংখ্যা দশও হবেনা, রাসূলুল্লাহর (সা) পাশে আছি। আমি, আমার দুই ছেলে ও স্বামী রাসূলুল্লাহর (সা) পাশে দাঁড়িয়ে তাকে রক্ষা করেছি। তখন অন্য মুজাহিদরা পরাজিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহর (সা) পাশ ‍দিয়ে চলে যাচ্ছিল। রাসূল (সা) দেখলেন আমার হাতে কোন ঢাল নেই। তিনি এক ব্যক্তিকে দেখলেন, সে পালাচ্ছে এবং তার হতে একটি ঢাল। তিনি তাকে বললেন, ওহে, তুমি তোমার ঢালটি যে লড়ছে এমন কারো দিকে ছুড়ে মার। সে ঢালটি ছুড়ে মারে এবং আমি তা হতে তুলে নেই। সেই ঢাল দিয়েই আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) আড়াল করতে থাকি। সেদিন অশ্বারোহী যোদ্ধারা আমাদের সাথে খুব বাজে কাজ করেছিল। যদি তারা আমাদের মত পদাতিক হতো তাহলে আমরা শত্রুদের ক্ষতি করতে সক্ষম হতাম।“

তিনি আরো বলেছেন : কোন অশ্বারোহী আমাদের দিকে এগিয়ে এসে আমাকে তরবারির আঘাত করছিল, আর আমি সে আঘাত ঢাল দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। আমার কিছুই করতে সক্ষম হয়নি। তারপর যেই না সে পিছন ফিরে যেতে উদ্যত হিচ্ছল অমনি আমি তার ঘোড়ার পিছন পায়ে তরবারির কোপ বসিয়ে দিচ্ছিলাম। ঘোড়াটি আরোহীসহ মাটিতে পরে যাচ্ছিল। তখনই রাসূল (সা) আমার ছেলেকে ডেকে বলছিলেন : ওহে উম্মু উমারার ছেলে! তোমার মাকে সাহায্য কর।‘ সে ছুটে এসে আমাকে সাহায্য করছিল। এভাবে আমি তাকে মৃত্যুর ঠিকানায় পাঠিয়ে দিচ্ছিলাম। [তাবাকাত-৮/৪১৩; সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৭৯]

উম্মু উমারার ছেলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। যখন মুসলিম মুজাহিদরা রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল তখন আমি ও আমার মা তার নিকট গিয়ে কাফিরদের আক্রমন থেকে রক্ষা করতে শুরু করলাম। এসময় রাসূল (সা) আমাকে বললেন, তুমি উম্মু উমারার ছেলে? বললাম হ্যাঁ। তিনি বললেন, শত্রুদের দিকে কিছু ছুড়ে মার। আমি আমার সামনের একটি লোকের দিকে একটি পাথর ছুড়ে মারলাম। লোকটি ছিলো ঘোড়ার পিঠে। নিক্ষিপ্ত পাথরটি গিয়ে লাগলো ঘোড়ার একটি চোখে। ঘোড়াটি ছটফট করতে করতে তার আরোহীসহ মাটিতে পড়ে গেল। আর আমি লোকটির উপর পাথর ছুড়ে মারতে লাগলাম। আমার একাজ দেখে রাসূল (সা) মৃদ্যু হাসতে থাকেন। [সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৮০]

উহুদের দিন উম্মু উমারা (রা) ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছিলেন। দামরা ইবন সা‘ঈদের দাদা উহুদের একজন যোদ্ধা, তিনি বলেছেন উম্মু উমারা সেদিন কোমরে কাপড় পেঁচিয়ে শত্রুদের উপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালান। এ যুদ্ধে তার দেহের তেরোটি স্থান মারাত্মকভাবে আহত হয়। [ তাবাকাত-৮/৪১৩]

এ সময় এক কাফিরের নিক্ষিপ্ত একটি আঘাতে হযরত রাসূলে পাকের একটি দাঁত ভেঙ্গে যায়। পাষণ্ড ইবন কামিআ রাসূলুল্লাহকে (সা) তাক করে তরবারির একটি কোপ মারে, কিন্তু তা ফসকে যায়। মুহূর্তে উমারা (রা) ফিরে দাঁড়ান। তিনি নরপশু ইবন কামিআর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিন্তু তার সারা দেহ বর্ম আচ্ছাদিত থাকায় বিশেষ কার্যকর হলোনা। তবে সে উম্মু উমারাকে তাক করে এবার একটি কোপ মারে এবং তা উম্মু উমারার কাধে লাগে। এতে তিনি মারত্মক আহত হন। [প্রাগুক্ত-৮,৪২৪; ইবন হিশাম-২/৮১-৮২]

ইবন কামিআ তো ভেগে প্রাণ বাঁচালো। কিন্তু উম্মু উমারার আঘাতটি ছিল অতি মারাত্মক। তার সারা দেহ রক্তে ভিজে গেল। তার ছেলে আবদুল্লাহ বর্ণনা করেছেন : আমার মা সেদিন মারাত্মক ভাবে আহত হন। রক্ত বন্ধই হচ্ছিল না। রাসূল (সা) তাকে বলেন : তোমার ক্ষত স্থানে ব্যান্ডেজ কর। অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (সা) তাকে আহত হতে দেখে তার ছেলে আবদুল্লাহকে ডেকে বলেন : তোমার মাকে দেখ, তোমার মাকে দেখ। তার ক্ষত স্থানে ব্যান্ডেজ কর। হে আল্লাহ! তাদের সবাইকে জান্নাতে আমার বন্ধু করে দাও। [সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৮১] উম্মু উমারা বলেন ‘দুনিয়ায় আমার যে কষ্ট ও বিপদ আপদ এসেছে, তাতে আমার কোন পরোয়া নাই। [তাবাকাত-৮/৪১৪-৪১৫] সেদিন রাসূল (সা) নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তার ক্ষত স্থানে ব্যান্ডেজ বাঁধান। এ সময় রাসূল (সা) কয়েকজন সাহসী সাহাবীদের নাম উচ্চারণ করে বলেন : উম্মু উমারার আজকের কর্মকাণ্ড তাদের কর্মকাণ্ড থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। এরপর প্রায় একবছর যাবত তার ক্ষত স্থানের চিকিত্সা করা হয়। [প্রাগুক্ত-৮/৪১২; সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৭৯]

উহুদের এই মারাত্মক আক্রমণে উম্মু উমারার ছেলে আবদুল্লাহও মারাত্মকভাবে আহত হলোভ আবদুল্লাহ বর্ণনা করেছেন : সেদিন আমি মারাত্মক ভাবে আহত হলাম। রক্ত পড়া বন্ধ হচ্ছিল না। তা দেখে রাসূল (সা) বলেন : তোমার আহত স্থানে ব্যান্ডেজ বাঁধ। কিছুক্ষণ পর আমার মা অনেকগুলো ব্যান্ডেজ হাতে নিয়ে আমার দিকে ছুটে আসেন এবং আমার আহত স্থানে ব্যান্ডেজ বেঁধে দেন। রাসূল (সা) তখন পাশেই দাঁড়িয়ে। ব্যান্ডেজ বাঁধা শেষ করে মা আমাকে বলেন : বেটা ওঠো। শত্রু সৈন্যদের গর্দান মার। রাসূল (সা) তখন বলেন : ওহে উম্মু উমারা, তমি যতখানি শক্তি ও সামর্থ্য রাখ, অন্যের মধ্যে তা কোথায়?

আবদুল্লাহ আরো বর্ণনা করেন, এ সময় যে শত্রু সৈন্যটি আমাকে আহত করেছিল, অদূরে তাকে দেখা গেল। রাসূল (সা) আমার মাকে বললেন : এ সেই ব্যক্তি যে তোমার ছেলেকে যখম করেছে। আমার মা বললেন : আমি তার মুখোমুখি হবো এবং তার ঠ্যাংয়ের নলা ভেঙ্গে দিবো। একথা বলে তিনি তকে আঘাত করে ফেলে দেন। তা দেখে রাসূল (সা) হেসে দেন এবং আমি তার সামনের দাঁত দেখতে পাই। তার পর তিনি বলেন : উম্মু উমারা তুমি বদলা নিয়েছো। তার পর আমরা দুজনে মিলে আঘাতের পর আঘাত করে তাকে জাহান্নামের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিই। তখর রাসূল (সা) বলেন, উম্মু উমারা, সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি তোমাকে সফরকাম করেছেন। [প্রাগুক্ত]

উহুদ যুদ্ধ শেষ হলো। মুজাহিদরা ঘরে ফিরতে লাগলেন। রাসূল (সা) আবদুল্লাহ ইবন কা‘ব মাযিনীকে পাঠিয়ে উম্মু উমারার অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল না হয়ে ঘরে ফিরলেন না।

উহুদ যুদ্ধ শেষ হওয়ার কিছুদিন পর রাসূলুল্লাহর (সা) ঘোষণা ‍মদীনার মুজাহিদদেরকে ‘হামরা আল আসাদ‘ [মদীনা থেকে জুল হুলাইফার দিকে যেতে রাস্তার বাম দিকে আট মাইলের মাথায় একটি স্থান] এর দিকে বেরিয়ে পড়ার ঘোষণা দেন। উম্মু উমারা সেখানে যাওয়ার জন্য মাজার কাপড় পেঁচিয়ে প্রস্তুত হয়ে যান। কিন্তু ক্ষত থেকে রক্ত ক্ষরণের কারণে সক্ষম হনন। [ তাবাকাত-৮/৪১৩]

উহুদ যুদ্ধ ছাড়াও তিনি আরো অনেক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ইবন সা‘দের বর্ণনা মতে, তিনি উহুদ, হুদাইবিয়া, খায়বার, কাজা ‘উমরা আদায়, হুনাইন ও ইয়ামামার যুদ্ধ ও অভিযানে যোগ দেন। হাকেম ও ইবন মুন্দার মতে, তিনি বদরেও যোগ ‍দিয়েছিলন। তবে ইমাম জাহাবী বলেন, তার বদরে অংশগ্রহণ কথাটি সঠিক নয়। [সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা২/২৭৮.২৮২] তবে একমাত্র ইয়ামামার যুদ্ধ ছাড়া অন্য কোন যুদ্ধে ও অভিযানে তার অংশগ্রহণের কোন বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। উম্মু উমারার বোনও তার সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। [ইবন হিশাম-১/৪৬৬]

রাসূলুল্লাহর (সা) ইনতেকালের পর ইয়ামামার অধিবাসী এবং তথাকার নেতা মুসায়লামা আল-কাজ্জাব মুরতাদ হয়ে যায়। সে ছিল একজন নিষ্ঠুর প্রকৃতির অত্যাচারী মানুষ। তার গোত্রে প্রায় চল্লিশ হাজার যুদ্ধ করার মত লোক ছিল। তারা সবাই তাকে সমর্থন করে। নিজের শক্তির অহমিকায় সে নিজেকে একজন নবী বলে দাবী করে এবং তার সমর্থকদের সবার নিকট থেকে জোর-জবরদস্তীভাবে স্বীকৃতি আদায় করতে থাকে। আর যারা তার নবুওয়াতের মিথ্যা দাবীকে মানতে অস্বীকৃতি জানায় তাদের উপর নানাভাবে নির্যাতন চালাতো। হযরত উম্মু উমারার (রা) ছেলে হযরত হাবীব ইবন যায়দ উমান থেকে মদীনায় আসার পথে মুসায়লামার হতে বন্দী হন। মুসায়লামা তাকে বলেন, তুমি তো সাক্ষ্য দিয়ে থাক যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। হাবীব বলেন, হ্যাঁ, আমি তাই সাক্ষ্য দিয়ে থাকি। মুসায়লামা তখন বলে : না, তোমাকে এ কথা বলতে হবে যে, মুসায়লামা আল্লাহর রাসূল।‘ হযরত হাবীব অত্যন্ত শক্তভাবে তার দাবী প্রত্যাখ্যান করেন। নবুওয়াতের মিথ্যা দাবীদার মুসায়লামা হযরত হাবীবের একটি হাত বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তারপর সে হাবীবের নিকট একই স্বীকৃতি দাবী করে। তিনি পূর্বের মতই অস্বীকৃতি জানান। পাষাণ মুসায়লামা তার দ্বিতীয় হাতটি কেটে দেয়। মোটকথা, নরাধম মুসায়লামা তার দবীর উপর অটল থাকে, আর হযরত হাবীবও অটল থাকেন নিজের শক্ত বিশ্বাসের উপর। পাষণ্ড মুসায়লামা একটি একটি করে হযরত হাবীবের দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। আল্লাহর এই বান্দা জীবন দেওয়া সহজ মনে করেছেন, কিন্তু বিশ্বাস থেকে চুল পরিমাণ বিচ্যুত হওয়া সমীচীন মনে করেননি। এ ঘটনার কথা উম্মু উমারার (রা) কানে পৌছলে তিনি মনকে শক্ত করেন এবং মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন যদি কখনো মুসলিম বাহিনী এই ভণ্ড নবীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে তখন তিনিও অংশগ্রহণ করবেন এবং আল্লাহ চাইলে নিজের হাতে এই জালিমকে জাহান্নামের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিবেন। [প্রাগুক্ত; সাহাবিয়াত-২০৭; সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৮১]

মুসায়লামার এহেন ঔদ্ধ্যত ও বাড়াবাড়ির কথা খলীফা হযরত আবু বকরের (রা) কানে এলো। তিনি এই ধর্মদ্রোহিতার মূল উপরে ফেলার লক্ষে চারহাজার সৈন্যসহ হযরত খালিদ ইবন ওয়ালীদকে (রা) পাঠান। উম্মু উমারা (রা) তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য এটাকে সুবর্ণ সুযোগ হসেবে গ্রহণ করলেন। তিনি খলীফার নিকট এই অভিযানে অংশগ্রহণের অনুমতি চাইলেন। খলীফা অনুমতি দিলেন। উম্মু উমারা (রা) খালিদ ইবন ওয়ালিদরে (রা) বাহিনীর সাথে ইয়ামামায় গেলেন। প্রচণ্ড যুদ্ধ হলো। বারো শো মুজাহিদ শহিদ হলেন। অন্যদিকে ঐতিহাসিকদের বর্ণনা মতে, মুসায়লামার আট/নয় হাজার সৈন্য মারা যায়। অবশেষে মুসায়রামার হত্যার মাধ্য দিয়ে মুসলিম বহিনীর বিজয় হয়।

প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছে। উম্মু উমারা (রা) সুযোগের অপেক্ষায় আছেন। তার একমাত্র লক্ষ্য তার ছেলের ঘাতক পাষণ্ড মুসায়লামা আল-কাজ্জাব। এক সময় তিনি এক হাতে বর্শা ও অন্য হতে তারবারি চালাতে চালাতে শত্রু বাহিনীর ব্যূহ ভেদ করে মুসায়লামার কছে পৌছে যান। এ পর্যন্ত পৌছতে তার দেহের এগারটি স্থান নিযা ও তরবারির আঘাতে আহত হয়। শুধু তাই নয়, একটি হাত বাহু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতেও তার সিদ্ধান্ত টলেনি। মোটেও ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটেনি। তিনি আরো একটি এগিয়ে গেলেন। মুসায়লামাকে তাক করে তরবারির কোপ মারবেন, ঠিক এমন সময় হঠাৎ এক সাথে দুইখানি তরবারির কোপ মুসায়লামার উপর এসে পড়ে। আর সে কেটে ঘোড়ার পিঠ থেকে ছিটেকে পড়ে। তিনি বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখেন, ছেলে আবদুল্লাহ পাশে দড়িয়ে। জিজ্ঞেস করলেন, তুমিই কি তাকে হত্যা করেছো? আবদুল্লাহ জবাব দিলেন, একটি কোপ আমার অন্যটি ওয়াহশীর। আমি বোঝতে পারছিনে কার কোপে সে নিহত হয়েছে। উম্মু উমারা (রা) দারুণ উত্ফুল্ল হলেন এবং তখনই সিজদায়ে শুকর আদায় করলেন। [ইবন হিশাম-১/৪৬৬; সাহাবিয়াত-২০৮]

উম্মু উমারার (রা) যখম ছিল খুবই মারাত্মক। একটি হাতও কাটা গিয়েছিল।এ কারণে খুবই দুর্বল হয়ে পরেছেলেন। বাহিনী প্রধান হযরত খালিদ ইবন ওয়ালীদ ছিলেন তার বীরত্ব ও সাহসিকতার একজন গুণমুগ্ধ ব্যক্তি। তিনি তাকে খুব তা‘জীমও করতেন। তিনি আপন তত্ত্বাবধানে তার সেবা ও চিকিত্সার ব্যবস্থা করেন। তার চিকিত্সায় যাতে কোন ত্রুটি না হয় সে ব্যাপারে সর্বক্ষণ সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। তাই তিনি সুস্থ হয়ে সারাজীবন খালিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। তার প্রশংসায় তিনি বলতেন, তিনি একজন সহমর্মী, উচুমনা ও বিনয়ী নেতা। তিনি খুব আন্তরিকতার সাথে আমার সেবা ও চিকিত্সা করেন। মদীনায় ফেরার পর খলীফা আবু বকর (রা) তাকে প্রায়ই দেখতে যেতেন। [তাবাকাত-৮/৪১৬]

হযরত উম্মু উমারা (রা) ছিলেন একজন মহিলা বীর যোদ্ধা। তার বীরত্ব ও সাহসিকতার বিস্ময়কর বাস্তবতা আমরা বিভিন্ন রণাঙ্গনে প্রত্যক্ষ করেছি। তার যে রণমূর্তি আমরা উহুদ ও ইয়ামামার যুদ্ধে দেখি, তার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কমই দেখা যায়। হযরত রাসূলে করীম (সা) ছিলেন তার সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তি। তার ভালবাসার প্রমাণ তিনি দিয়েছেন উহুদের ময়দানে। রাসূল (সা) তার বাড়ীতে মাঝে মাঝে যেতেন। একদিন রাসূল (সা) আসলেন। তিনি তাকে খাবার দিলেন। রাসূল (সা) তাকেও তার সাথে খেতে বললেন। উম্মু উমারা বললেন, আমি রোযা আছি। রাসূল (সা) বললেন, যখন রোযাদারের নিকট কিছু খাওয়া হয় তখন ফেরেশতারা তার জন্য দোয়া করে। [প্রাগুক্ত; মুসনাদে আহমাদ-৬/৪৩৯; তিরমিজী-৭৮৫; ইবন মাজাহ-১৭৪৮]

খলীফা হযরত উমারও (রা) উম্মু  উমারার (রা) সম্মান ও মর্যাদার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। তার খেলাফত কালে একবার গনীমতের মালের মধ্যে কিছু চাদর আসে। তার মধ্যে একটি চাদর ছিল খুবই সুন্দর ও দামী। অনেকে বললেন, এটি খলীফা তনয় আবদুল্লাহর (রা) স্ত্রীকে দেওয়া হোক। অনেকে খলীফার স্ত্রী কুলছুম বিনত আলীকে (রা) দেওয়ার কথা বললেন। খলীফা কারো কথায় কান দিলেন না। তিনি বললেন, আমি এ চাদরের সবচেয়ে বেশী হকদার উম্মু উমারাকে মনে করি। এটি তাকেই দেব। কারণ, আমি উহুদের দিন তার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সা) বলতে শুনেছি : “আমি যে দিকেই দৃষ্টিপাত করছিলাম, শুধু উম্মু উমারাকেই লড়তে দেখছিলাম।“ অতপর তিনি চাদরটি তার কাছে পাঠিয়ে দেন। [তাবাকাত-৮/৪১৫; সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৮১; আনসাব আল-আশরাফ-১/৩২৬]

রাসূলুল্লাহর (সা) বেশ কিছু হাদীস তার সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তার থেকে এ হাদীসগুলি উব্বাদ ইবন তামীম ইবন যায়দ, হারিছ ইবন আবদিল্লাহ ইবন কা‘ব আকরামা ও লায়লা বর্ণনা করেছেন। [আল-ইসাবা-৪/৪৮০]

হযরত উম্মু উমারার (রা) মৃত্যসন সঠিকভাবে জানা যায় না। মুসায়লামার সাথে যুদ্ধ পর্যন্ত যে জীবিত ছিলেন সেটা নিশ্চিত। তবে তার পরে কতদিন জীবিত ছিলেন তা নিশ্চিতভাবে কেউ বলতে পারেননি।

হযরত উম্মু উমারা (রা) সব সময় রাসূলের (সা) মজলিসে উপস্থিত থাকতেন এবং মনোযোগ সহকারে তার কথা শুনতেন। এভাবে তার বিশ্বাস প্রতিদিনই  দৃঢ় হতো এবং জ্ঞান ‍বৃদ্ধি পেত। একদিন তিনি রাসূলুল্লাহকে বলেন : আমি দেখতে পাচ্ছি সব জিনিসই পুরুষদের জন্য, মহিলাদের জন্য কোন কিছুর উল্লেখ করা হয় না। অর্থাৎ তার দাবী ছিল কুরআনে পুরুষদের কথা যেমন এসেছে নারীদের কথাও তেমন আসুক। তার এমন দাবীর প্রেক্ষাপটে নাযিল হলো সূরা আল-আহযাবের ৩৫ তম আয়াতটি। [তিরমিজী-৪/১১৬; প্রাগুক্ত-৪/৪৭৯]

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ