আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – ষষ্ঠ খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

যায়নাব বিনত রাসূলিল্লাহ (সা)


মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেয়ে সায়্যিদা যায়নাব (রা)- যিনি আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাত বরণ করেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত ‘আয়িশা (রা্) তাঁর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সা) এ বাণী বর্ণনা করেছেন : [হায়াতুস সাহাবা-১/৩৭২] (আরবী*******)

‘সে ছিল আমার সবচেয়ে ভালো মেয়ে। আমাকে ভালোবাসার কারণেই তাকে কষ্ট পেতে হয়েছে।’

হযরত যায়নাবের (রা) সম্মানিতা জননী উম্মুল মু‘মিনীন হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রা)। যিনি মুহাম্মাদ (সা) এর রিসালাতের প্রতি সর্বপ্রথম ঈমান আনার অনন্য গৌরবের অধিকারিণী। তাঁর মহত্ব ও মর‌্যাদা এক বিশাল যে বিগত উম্মাত সমূহের মধ্যে কেবল মারইয়ামের (আ)-এর রিসালাতের প্রতি সর্বপ্রথম ঈমান আনার অনন্য গৌরবের অধিকারিণী। তাঁর মহত্ত্ব ও মর্যাদা এত বিশাল যে বিগত উম্মাত সমীহের মধ্যে কেবল হযরত মারইয়ামের (আ) সাথে যা তুলনীয়।

ইমাম আজ-জাহাবী বলেন :[ সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৪৬](আরবী*******)

‘যায়নাব হলেন রাসূলুল্লাহর (সা) মেয়ে এবং তাঁর হিযরাতকারিণী সায়্যিদাত বোনদের মধ্যে সবার বড়।’

আবু ‘আমর বলেন, যায়নাব (রা) তাঁর পিতার মেয়েদের মধ্যে সবার বড়্ এ ব্যাপারে কোন মতপার্থক্য নেই। আর যাঁরা ভিন্নমত পোষণ করেন তাঁরা ভুলের মধ্যে আছেন। তাদের দাবীর প্রতি গুরুত্ব প্রদানের কোন হেতু নেই। তবে মতপার্থক্য যে বিষয়ে আছে তা হলো, রাসূলুল্লাহর (সা) ছেলে-মেয়েদের মধ্যে যায়নাব প্রথমন সন্তান, না কাসিম? বংশবিদ্যা বিশারদদের একটি দলের মতে আল-কাসিম প্রথম ও যায়নাব দ্বিতীয় সন্তান। ইবনুল কালবী যায়নাবকে (রা) প্রথম সন্তান বলেছেন। ইবনে সা‘দের মতে, যায়নাব (রা) মেয়েদের মধ্যে সবার বড়।[তাবাকাত-৮/৩০] ইবন হিশাম রাসূলুল্লাহর (সা) সন্তনদের ক্রমধারা এভাবে সাজিয়েছেন :[ আস্-সীরাতুন নাবাবিয়্যা-১/১৯০] (আরবী*********)

রাসূলুল্লাহর (সা) বড় ছেলে আল কাসিম, তারপর যথাক্রমে আত-তায়্যিব ও আত-তাহির। আর বড় মেয়ে রুকাইয়্যা, তারপর যথাক্রমে যায়নাব, উম্মু কুলছূম ও ফাতিমা।’

পিতা মুহাম্মাদ (সা)-এর নুবুওয়াত প্র্রাপ্তির দশ বছর পূর্বে হযরত যায়নাবের (রা) জন্ম হয়। তখন হযরত রাসূলে কারীমের (সা) বয়স তিরিশ এবং মাতা হযরত খাদীজার (রা) পঁয়তাল্লিশ বছর্ হযরত যায়নাবের (রা) শৈশব জীবনের তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তাঁর এ জীবনটি সম্পূর্ণ অন্ধকারেই রয়ে গেছে। তাঁর জীবন সম্পর্কে যতটুকু যা জানা যায় তা তাঁর বিয়ের সময় থেকে।

রাসূলুল্লাহর (সা) মেয়েদের মধ্যে সর্বপ্রথম হযরত যায়নাবের (রা) বিয়ে অল্প বয়সে অনুষ্ঠিত হয়। তখনও পিতা মুহাম্মাদ (সা) নবী হননি।৫ ইমা, আজ- জাহাবীড এ মত গ্রহণ করতে পানেনি। তিনি বলেন: [তাবাকাত-৮/৩০-৩১] (আরবী======)

‘ইবন সা‘দ উল্লেখ করেছেন যে, আবুল আ‘স যায়নাবকে বিয়ে করেন নবুওয়াতের পূর্বে। এ এক অবাস্তব কথা।’

যাই হোক স্বামী আবুল ‘আস ইবন আর রাবী’ ইবন আবদুল ‘উয্যা ছিলেন যায়নাবের খালাতো ভাই। মা হযরত খাদীজার (রা) আপন ছোট বোন হালা বিনত খুওয়াইলিদের ছেলে। [সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৪৬]

বিয়ের সময় বাবা-মা মেয়েকে যে সকর উপহার সামগ্রী দিয়েছিলেন তার মধ্যে িইয়ামনী আকীকের একটি হারও ছিল। হারটি দিয়েছিলেন মা খাদীজা (রা)।[তাবাকাত-৮/৩১]

পিতা মুহাম্মাদ (সা) ওহী লাভ করে নবী হলেন। মেয়ে যায়নাব (রা) তাঁর মার সাঞেথ মুসলমান হলেন। স্বামী আবুল ‘আস তখন ইসলাম গ্রহণ করেননি। রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় হিজরাত করলেন। পরে হযরত যায়নাব (রা) স্বামীকে মুশরিক অবস্থায় মক্কায় রেখে মদীনায় হিজরাত করেন।[প্রাগুক্ত-৮/৩২]

রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত যায়নাব (রা) ও আবুল ‘আসের মধ্যের গভীর সম্পর্ক এবং ভদ্রোচিত কর্মপদ্ধতির প্রায়ই প্রশংসা করতেন।[সুনানু আবী দাউদ-১/২২২]

আবুল ‘আস যেহেতু শিরকের উপর অটল ছিলেন, এ করণে ইসলামের হুকুম অনুযায়ী উচিত ছিল, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেওয়া। কিন্তু রাসূল (সা) মক্কায় সে সময় শক্তিহীন ছিলেন। ইসলামী শক্তি তেমন মজবুত ছিল না। তাছাড়া কাফিরদের জুলুম-অত্যাচারের প্লাবন সবেগে প্রবাহমান ছিল। এদিকে ইসলামের প্রচার প্রসারের গতি ছিল মন্থর ও প্রাথমিক প্রর্যায়ের। এসকল কারণে তাঁদের স্বামিী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ না ঘটানোই রাসূল (সা) সমীচীন মনে করেন।

আবুল ‘আস স্ত্রী যায়নাবকে (রা) অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং সম্মানও করতেন। কিন্তু তিনি পূর্বপুরুষের ধর্ম ত্যাগ করে প্রিয়তমা স্ত্রীর নতুন দ্বীন কবুল করতে কোনভাবেই রাজী হলেন না। এ অবস্থা চলতে লাগলো। এদিকে রাসূলুল্লাহ (সা) ও কুরাইশদের মধ্যে মারাত্মক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত শুরু হয়ে গেল। কুরাইশরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করলো :

‘তোমাদের সর্বনাশ হোক! তোমরা মুহাম্মাদের মেয়েদের বিয়ে করে তার দুশ্চিন্তা নিজেদের ঘাড়ে তুলে নিয়েছো। তোমরা যদি এ সকল মেয়েকে তার কাছে ফেরত পাঠাতে তাহলে সে তোমাদের ছেড়ে তাদেরকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়তো।’ তাদের মধ্যে অনেকে এ কথা সমর্থন করে বললো- ‘এ তো অতি চমৎকার যুক্তি।’ তারা দল বেধে আবুল ‘আসের কাছে যেয়ে বললো, ‘আবুল ‘আস, তুমি তোমার স্ত্রীকে তারাক দিয়ে তার পিতার কাছে পাঠিয়ে দাও। তার পরিবর্তে তুমি যে কুরাইশ সুন্দরীকে চাও, আমরা তাকে তোমার সাথে বিয়ে দেব।’ আবুল ‘আস বললেন, ‘আল্লাহর কসম! না তা হয়না। আমার স্ত্রীকে আমি ত্যাগ করতে পারিনে। তার পরিবর্তে সকল নারী আমাকে দিলেও আমার তা পসন্দ নয়।’ একারণে রাসূল (সা) তাঁর আত্মীয়তাকে খুব ভালো মনে করতেন। এবং প্রশংসা করতেন। [তাবারী-৩/১৩৬; ইবন হিশাম, আস্-সীরাহ-১/৬৫২]

হযরত যায়নাব (রা) স্বামী আবুল ‘আসকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। স্বামীর প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও ত্যাগের অবস্থা নিম্নের ঘটনা দ্বারা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে:

নবুওয়াতের ১৩তম বছরে রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাত করেন। হযরত যায়নাব (রা) স্বামীর সাথে মক্কায় থেকে যান।[আনসাবুল আশরাফ-১/২৬৯] কুরাইশদের সাথে মদীনার মুসলমানদের সামরিক সংঘাত শুরু হলো। কুরাইশরা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বদরে সমবেত হলো। নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও আবুল ‘আস কুরাইশদের সাথে বদলে গেলেন। কারণ, কুরাইশদের মধ্যে তাঁর যে স্থান তাতে না যেয়ে উপায় ছিলনা। বদরে কুরাইশরা শোচনীয় পরাজয় বরণ করে। তাদের বেশ কিছু নেতা নিহত হয় এবং বহু সংখ্যক যোদ্ধা বন্দী হয়। আর অবশিষ্টরা পালিয়ে প্রাণ বাঁচায়। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! এই বন্দীদের মধ্যে রাসূলুল্লাহর (সা) জামাই হযরত যায়নাবের (রা) স্বামী আবুল ‘আসও ছিলেন। ইবন ইসহাক বলেন, হযর ত ‘আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর এবন নু‘মান (রা) তাঁকে বন্দী করেন। তবে আল-ওয়াকিদীর মতে হযরত খিরাশ িইবন আস-সাম্মাহর (রা) হতে তিনি বন্দী হন।[আল-ইসাবা ফী তাময়ীযিস সাহাবা-৪/১২২]

বন্দীদের সামাজিক মর্যাদা এবং ধনী-দরিদ্র প্রভেদ অনুযায়ী একহাজার থেকে চার হাজার দিরহাম মুক্তিপণ নির্ধারিত হলো। বন্দীদের প্রতিনিধিরা ধার্যকৃত মুক্তিপণ নিয়ে মক্কা-মদীনা ছুটাছুটি শুরু করে দিল। নবী দুহিতা হযরত যায়নাব (রা) স্বামী আবুল ‘আসের মুক্তিপণসহ মদীনায় লোক পাঠালেন। আল-ওয়াকিদীর মতে আবুল ‘আসের মুক্তিপণ নিয়ে মদীনায় এসেছিল তাঁর ভাই ‘আমর ইবন রাবী’। হযরত যায়নাব মুক্তিপণ দিরহামের পরিবর্তে একটি হার পাঠিয়েছিলেন। এই হারটি তাঁর জননী হযরত খাদীজা (রা) বিয়ের সময় তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন্ হযরত রাসূলে কারীম (সা) হারটি দেখেই বিমর্ষ হয়ে পড়লেন এবং নিজের বিষণ্ণ মুখটি একখানি পাতলা কাপড় দিয়ে ঢেকে ফেললেন। জানানাতবাসিনী প্রিয়তমা স্ত্রী ও অতি আদরের মেয়ের স্মৃতি তাঁর মানসপটে ভেসে উঠেছিল।

কিছুক্ষণ পর হযরত রাসূলে কারীম (সা) সাহাবীদের লক্ষ্য করে বললেন : ‘যায়নাব তার স্বামীর মুক্তিপণ হিসেবে এই হারটি পাঠিয়েছে। তোমরা ইচ্ছে করলে তার বন্দীকে ছেড়ে দিতে পার এবং হারটিও তাকে ফেরত দিতে পার।’ সাহাবীরা রাজী হয়ে গেলেন। তাঁরা আবুল ‘আসকে মুক্তি দিলেন, আর সেই সাথে ফেরত দিলেন তাঁর মুক্তিপণের হারটি। তবে রাসূলুল্লাহ (সা) আবুল ‘আসের নিকট থেকে এ অঙ্গিকার নিলেন যে মক্কায় ফিরে অনতিবিলম্বে সে যায়নাবকে মদীনায় পাঠিয়ে দেকে।

রাসূলুল্লাহ (সা) যায়নাবকে (রা) নেওয়ার জন্য আবুল ‘আসের সংগে হযরত যায়দ ইবন হারেছাকে (রা) পাঠন। তাঁকে ‘বাতান’ অথব ‘জাজৎ নামক স্থানে অপেক্ষা করতে বলেন! যায়নাব  (রা) মক্কা থেকে সেকানে পৌছলে তাঁকে নিয়ে মদীনায় চলে আসতে বলেন। আবুল ‘আস মক্কায় পৌছে যায়নাবকে (রা) সফরের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত আছেন, এমন সময় হিন্দ বিনত ‘উতবা এসে হাজির হলো। প্রস্তুতি দেখে বললো : মুহাম্মাদের মেয়ে, তুমি কি তোমার বাপের কাছে যাচ্ছো? যায়নাব (রা) বললেন, এই মুহূর্তে তো তেমন উদ্দেশ্য নেই, তবে ভবিষ্যতে আল্লাহর যা ইচ্ছ হয়। হিন্দ ব্যাপারটি বুঝতে পেরে বললো : বোন, এটা গোপন করার কি আছে। সত্যিই যদি তুমি যাও তাহলে পথে দরকার পড়ে এমন কোন কিছু প্রয়োজন হলে রাখঢাক না করে বলে ফেলতে পার, আমি তোমার খিদমতের জন্য প্রস্তুত আছি।

মহিলাদের মধ্যে শত্রুতার সেই বিষাক্ত প্রভাব তখনও বিস্তার লাভ করেনি যা পুরুষদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। এ কারণে হযরত যায়নাব (রা) বলেন : হিন্দ যা বলেছিল, অন্তরের কথাই বলেছিল। অর্থাৎ আমার যদি কোন জিনিসের প্রয়োজন হতো, তাহলে অবশ্যই সে তা পূরণ করতো। কিন্তু সে সময়ের অবস্থা চিন্তা করে আমি অস্বীকার করি।[তাবারী-১/১২৪৭; ইবন হিশাম-১/৬৫৩-৫৪]

হযরত যায়নাব (রা) কিভাবে মক্কা থেকে মদীনায় পৌছেন সে সম্পর্কে সীরাতের গ্রন্থসমীহে নানা রকম বর্ণনা পাওয়া যায়। কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হলো:

ইবন ইসহাক বলেন, সফরের প্রস্তুতি শেষ হলে যায়নাবের (রা) দেবর কিনানা ইবন রাবী‘ একটি  উট এনে দাঁড় করালো। যায়নাব উটের ফিঠের হাওদায় উঠে বসলেন। আর কিনানা স্বীয় ধনুকটি কাঁধে ঝুলিয়ে তীরের বাণ্ডিলটি হাতে নিয়ে দিনে দুপুরে উট হাঁকিয়ে মক্কা থেকে বের হলো। কুরাইশদের মধ্যে হৈ চৈ পড়ে গেল। তারা ধাওয়া করে মক্কার অদূরে ‘জী-তুওয়া’ উপত্যকায় তাঁদের দুই জনকে ধরে ফেললো। কিনানা কুরাইশদের আচরণে ক্ষিপ্ত হয়ে কাঁধের ধনুকটি হাতে নিয়ে তীরের বাণ্ডিলটি সামনে ছড়িয়ে দিয়ে বললো : তোমাদের কেউ যায়নাবের নিকটে যাওয়ার চেষ্টা করলে তার সিনা হবে আমার তীরের লক্ষ্যস্থল। কিনানা ছিল একজন দক্ষ তীরন্দাজ। তার নিক্ষিপ্ত কোন তীর সচরাচর লক্ষ্যভ্রষ্ট হতো না। তার এ হুমকী শুনে আবু সুফইয়ান ইবন হারব তার দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে বললো :

‘ভাতিজা, তুমি যে তীরটি আমাদের দিকে তাক করে রেখেছো তা একটি ফিরাও। আমরা তোমার সাথে একটু কথা বলতে চাই।’ কিনানা তীরটি নামিয়ে নিয়ে বললো, কি বলতে চান, বলে ফেলুন। আবু সুফইয়ান বললো :

‘তোমার কাজটি ঠিক হয়নি। তুমি প্রকাশ্যে দিনে দুপুরে মানুষের সামনে দিয়ে যায়নাবকে নিয়ে বের হয়েছো, আর আমরা বসে বসে তা দেখছ্ িগোটা আরববাসী জানে বদরে আমাদের কী দুর্দশা ঘটেছে এবং যায়নাবের বাপ আমাদের কী সর্বনাশটাই না করেছে। তুমি যদি এভাবে প্রকাশ্যে তার মেয়েকে আমাদের নাকের উপর দিয়ে নিয়ে যাও তাহলে সবাই আমাদের কাপুরাষ ভাববে এবং এ কজটি আমাদের জন্য অপমান বলে বিবেচনা করবে। তুমি আজ যায়নাবকে বাড়ী ফিরিয়ে নিয়ে যাও। কিছুদিন সে স্বামীর ঘরে থাকুক। এদিকে লোকেরা যখন বলতে মুরু করবে যে, আমরা যায়নাবকে মক্কা থেকে যেতে বাধা দিয়েছি, তখন একদিন গোপনে তাঁকে তার বাপের কাছে পৌছে দিও।’ [আল-বিদায়-৩/৩৩০; ইবন হিশাম-১/৬৫৪-৫৫]

কিনানা আবু সুফইয়ানের কথা মেনে নিযে যায়নাবসহ মক্কায় ফিরে এল। যখন ঘটনাটি মানুষের মধ্যে জানাজানি হয়ে গেল, তখন একদিট রাতের অন্ধকারে সে আবার যায়নাবকে নিয়ে মক্কা থেকে বের হলো এবং ভাইয়ের নির্দেশ মত নির্দিষ্ট স্থানে তাঁকে তাঁর পিতার প্রতিনিধির হাতে তুলে দিল। যায়নাব (রা) হযরত যায়দ ইবন হারিছার (রা) সাথে মদীনায় পৌছলেন। [তাবারী-১/১২৪৯; যুরকানী : শারহুল মাওয়াহিব-৩/২২৩’]

তাবারানী ‘উরওয় ইবন যুবাইর হতে বর্ণনা করেছেন। এক ব্যক্তি যায়নাব বিনত রাসূলুল্লাহকে (সা) সাথে নিয়ে মক্কা থেকে বের হলে কুরায়শদের দুই ব্যক্তি [সেই দুই ব্যক্তির একজন হাব্বার ইবন আল-আসওয়াদ। সে ছিল হযরত খাদীজার (রা) চাচাতো ভাইয়ের ছেলে। তাই সম্পর্কে সে যায়নাবের মামাতো ভাই। আর দ্বিতীয়জন ছিল নাফে’ ইবন ‘আবদি কায়স অথবা খালিদ ইবন ‘আবদি কায়স্ তাদের এমন অহেতুক বাড়াবাড়িমূলক আচরণের জন্য রাসূল (সা) ভীষণ বিরক্ত হন। তাই তিনি নির্দেশ দেন : (আরবী========)

‘যদি তোমরা হাব্বার ইবন আল-আসওয়াদ ও সেই ব্যক্তিটি যে তার সাথে যায়নাবের দিকে এগিযে যায়, হাতের মুঠোয় পাও, তাহলে আগুনে পুড়িয়ে মারব্ ’ কিন্তু পরদিন তিনি আবার বলেন : (আরবী=========)

‘আমি তোমাদেরকে বলেছিলাম, যদি তোমরা এ দুই ব্যক্তিকে ধরতে পার, আগুনে পুড়িয়ে মারবে। কিন্তু পরে আমি ভেবে দেখলাম এক আল্লাহ ছাড়া আর কারো জন্য কাউকে আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়া উচিত নয়্ তাই তোমরা যদি তাদেরকে ধরতে পার, হত্যা করবে।’ কিন্তু পরে তারা মুসলমান হয় এবং রাসূল (সা) তাদেরকে ক্ষমা করে দেন। (বুখারী, কিতাবুল জিহাদ : বাবু লা ইউ‘য়াজ্জাবুয বিআজাবিল্লাহ; আল-ইসাবা : হাব্বার ইবন আল-আসওয়াদ, ৩য় খণ্ড; আনসাবুল আশরাফ-১/৩৫৭, ৩৯৮, সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৪৭; ইবন হিশাম-১/৬৫৭)] পিছু ধাওয়া করে তাদের ধরে ফেলে। তারা যায়নাবের (রা) সংগী রোকটিকে কাবু করে যায়নাবকে (রা) উটের পিঠ থেকে ফেলে দেয়। তিনি একটি পাথরের উপর ছিটকে পড়লে শরীর

ফেটে রক্ত বের হয়ে যায়্ এ অবস্থা তারা যায়নাবকে(রা) মক্কায় আবু সুফইয়ানের নিকট নিয়ে যায়। আবু সুফইয়ান তাঁকে বনী হাশিমের মেয়েদের কাছে সোপর্দ করে। পরে তিনি মদীনায় হিজরাত করেন। উঠের পিঠ থেকে ফেলে দেওয়ায় তিনি যে আঘাত পান, আমরণ সেখানে ব্যথা অনুভব করতেন এবং সেই ব্যথায় শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেন। এজন্য তাঁকে শহীদ মনে করা হতো।[হায়াতু সাহাবা-১/৩৭১]

হযরত ‘আয়িমা (রা) বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহর (সা) মেয়ে যায়নাব কিনানার সাথে মক্কা থেকে মদীনার উদ্দেশ্যে বের হলো। মক্কাবাসীরা তাদের পিছু ধাওয়া করলো। হাব্বার ইবনুল আসওয়াদ সর্বপ্রথম যায়নাবকে ধরে ফেললো। সে যায়নাবের উটটি তীরবিদ্ধ করলে সে পড়ে গিয়ে আঘাত পেল। সে সন্তান সম্ভাবা ছিল। এই আঘাতে তার গর্ভের কসন্তানটি নষ্ট হয়ে যায়। অতঃপর বানু হাশিম ও বানু উমাইয়্যা তাঁকে নিয়ে বিবাদ শুরু করে দিল। অবশেষে সে হিন্দ বিনত ‘উতবার নিকট থাকতে লাগলো। হিন্দ প্রায়ই তাকে বলতো, তোমার এ বিপদ তোমার বাবার জন্যেই হয়েছে। [ইবন হিশাম ১/৬৫৪]

একদিন রাসূলুল্লাহ (সা) যায়দ ইবন হারিছাকে বললেন, তুমি কি যায়নাবকে আনতে পারবে? যায়দ রাজি হলো। হযরত রাসূলে কারীম (সা) যায়দকে একটি আংটি দিয়ে বললেন, ‘এটা নিয়ে যাও, যায়নাবের কাছে পৌছাবে।’ আংটি নিয়ে যায়দ মক্কার দিকে চললো। মক্কার উপকণ্ঠে সে এক রাকালকে ছাগল চরাতে দেখলো। সে তাকে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কার রাখাল? বললো, ‘আবুল ‘আসের’। আবার জিজ্ঞেস করলো, ‘ছাগলগুলি কার?’ বললো, ‘যায়নাব বিনত মুহাম্মাদের।’ যায়দ কিছুদূর রাখালের সাথে চললো। তারপর তাকে বললো, ‘আমি যদি একটি জিনিস তোমাকে দিই, তুমি কি তা যায়নাবের কাছে পৌঁছে দিতে পারবে?’ রাখাল রাজি হলো। যায়দ তাকে আংটিটি দিল, আর রাখাল সেটি যায়নাবের হাতে পৌঁছে দি।।

যায়নাব রাখালকে জিজ্ঞেস করলো, ‘এটি তোমাকে কে দিয়েছে?‘ বললো, ‘একটি লোক’। আবার জিজ্ঞেস করলো, ‘তাকে কোথায় ছেড়ে এসেছো?’ বললো, অমুক স্থানে।/ যায়নাব চুপ থাকলো। রাতের আঁধারে যায়নাব চুপে চুপে সেখানে গেল। যায়দ তাকে বললো, ‘তুমি আমার উটের পিছে উঠে আমার সামনে বস।’ যায়নাব বললো, ‘না, আপনিই আমার সামনে বসুন।’ এভাবে যায়নাব যায়দের (রা) পিছনে বসে মদীনায় পৌঁছলেন। হযরত রাসূলে কারীম (সা) প্রায়ই বলতেন, ‘আমার সবচেয়ে ভালো মেয়েটি আমার জন্য কষ্ট ভোগ করেছে।’[হায়াতু সাহাবা -১/৩৭১-৭২] সীরাতের গ্রন্থসমীহে হযরত যায়নাবের (রা) মক্কা থেকে মদীনা পৌঁছার ঘটনাটি একাধিক সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে বর্ণিত হতে দেখা যায়।

যেজেকু তাঁদের দুইজনের মধ্যের সম্পর্ক অতি চমৎকার ছিল, এ কারণে হযরত যায়নাবের (রা) মদীনায় চলে যাওয়ার পর আবুল ‘আস বেশীর বাগ সময় খবই বিমর্ষ থাকতেন। একবার তিনি যখন সিরিয়া সফরে ছিলেন তখন যায়নাবের (রা) কথা স্মরণ করে নিম্নের পংক্তি দুইটি আওড়াতে থাকেন :[ তাবাকাত-৮/৩২; আনসাবুল আশরাফ-১/৩৯৮] (আরবী==========)

“যখন আমি ‘আরিম’ নামক স্থানটি অতিক্রম করলাম তখন যায়নাবের কথা মনে হলো। বললাম, আল্লাহ ত‘আলা ঐ ব্যক্তিকে সজীব রাখুন যে হারামে বসবাস করছেন। আমী মুহাম্মাদের (সা) মেয়েকে আল্লাহ তা‘আলা ভালো প্রতিদান দিন। আর প্রত্যেক স্বামী সেই কথার প্রশংসা করে যা তার ভালো জানা আছে।”

মক্কার কুরায়দের যে বিশেষ গুণের কথা কুরআনে ঘোষিত হয়েছে—‘রিজলাকাষ ষিকায়ি ওয়াস সাঈফ’ – শীতকালে ইয়ামনের দিকে এবং গ্রষ্মকালে শামের দিকে তাদের বাণিজ্য কাফিলা চলাচল করে—আবুল ‘আসের মধ্যেও এ গুণটির পূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল। মক্কা ও শামের মধ্যে সবসময় তাঁর বাণিজ্য কাফিলা যাতায়াত করতো । তাতে কমপক্ষে একশো উটসহ দুইশো লোক থাকতো্ তাঁর ব্যবসায়িক বুদ্ধি, সততা ও আমানতদারীর জন্য মানুষ তাঁর কাছে নিজেদের পণ্যসম্ভার নিশ্চিন্কে সমর্পণ করতো। ইবন ইসহাক বলেন, ‘অর্থ-বিত্ত, আমানতদারী ও ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি মক্কার গণমান্য মুষ্টিমেয় লোকদের অন্যতম ছিলেন।’[আল-ইসাবা-৪/১২২]

স্ত্রী যায়নাব (রা) থেকে বিচ্ছেদের পর আবুল ‘আস মক্কায় কাটাতে লাগলেন। হিজরী ৬ষ্ঠ

সনের জামাদি-উল-আওয়াল মাসে তিনি কুরাইশদের ১৭০ উটের একটি বাণিজ্য কাফিলা নিয়ে সিরিয়া যান। বাণিজ্য শেষে মক্কায় ফেরার পথে কাফিলাটি যখন মদীনার কাছাকাছি স্থানে তখন রাসূলুল্লাহ (সা)খবর পেলেন। তিনি এক শো সত্তর সদস্যের একটি বাহিনীসহ যায়দ ইবন হারিছাকে (রা) পাঠালেন কাফিলাটিকে ধরার জন্য। ‘ঈস নামক স্থানে দুইটি দল মুলোমুখি হয়। মুসলিম বাহিনী কুরায়শ কাফিলাটিকে বাণিজ্য সম্ভারসহ সকল লোককে বন্দী করে মদীনায় নিয়ে যায়। তবে আবুল ‘আসকে ধরার জন্য তারা তেমন চেষ্টা চালালো না। তিনি পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেন। [আনসাবুল আশরাফ-১/৩৭৭, ৩৯৯-৪০০; তাবাকাত-৮/৩৩; সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা—২/২৫৯]

অবশ্য মূসা ইবন ‘উকবার মতে, আবু বাসীর ও তাঁর বাহিনী আবুল ‘আসের কাফিলার উপর আক্রমণ চালায়। উল্লেখ্য যে, এই আবু বাসীর ও আরও কিছু লোক হুদায়বিয়ার সন্ধির পর ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে সন্ধির শর্তানুযায়ী মদীনাবাসীরা তাঁদের আশ্রয় দিতে অক্ষমতা প্রকাশ করে। ফলে মক্কা থেকে পালিয়ে তাঁরা লোহিত সাগরের তীরবর্তী এলাকায় বসবাস করতে থাকেন। তাঁরা সংঘবদ্ধভাবে মক্কার বাণিজ্য কাফিলার উপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে লুটপাট করতে থাকেন। তাঁরা কুরায়শদের জন্র কাল হয়ে দাঁড়ান্ তাঁদের ভয়ে কুরায়শদের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। অবশেষে মক্কার কুরায়শরা বাধ্য হয়ে তাদের মদীনায় ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহকে (সা) অনুরোধ করে।[আল-ইসাবা-৪/১২২]

যাই হোক, আবুল ‘আস তাঁর কাফিলার এ পরিণতি দেখে মক্কায় না গিয়ে ভীত সন্ত্রস্তভাবে রাতের অন্ধকারে চুপে চুপে মদীনায় প্রবেশ করলেন এবং সোজা যায়নাবের (রা) কাছে পৌঁছে আশ্রয় চাইলেন। যায়নাব তাঁকে নিরাপত্তার আশ্বাস দিলেন। কেউ কিছুই জানলো না।[আনসাবুল আশরাফ-১/৩৭৭, ৩৯৯]

রাত কেটে গেল। হযরত রাসূলে কারীম (সা) নামাযের জন্য মসজিদে গেলেন। তিনি মিহরাবে দাঁড়িয়ে ‘আল্লাহ আকবার’ বলে তাকবীর তাহরীমা বেঁধেছেন। পিছনের মুকতাদীরাও তাকবীর তাহমীমা শেষ করেছে। এমন সময় পিছনে মেয়েদের কাতার থেকে যায়নাবের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো- ‘ওহে জনমণ্ডলী, আমি মুহাম্মাদের (সা) কন্যা যায়নাব। আমি আবুল ‘আসকে নিরাপত্তা দিয়েছি, আপনারাও তাঁকে নিরাপত্তা দিন।’

রাসূলুল্লাহ (সা) নামাজ শেষ করে লোকদের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, “আমি যা শুনেছি তোমরাও কি তা শুনেছো?”

লোকেরা জবাব দিল, ‘হাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ!’ রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, ‘যার হতে আমার জীবন, সেই সত্তার শপথ, আমি এ ঘটনার কিছুই জানিনা। কী অবাক কাণ্ড! মুসলমানদের একজন দুর্বল সদস্যাও শত্রুকে নিরাপত্তা দেয়। সে সকল মুসলমানের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা দিয়েছে।’[প্রাগুক্ত-১/৩৯৯-৪০০; তাবাকাত-৮/৩৩]

অতঃপর রাসূল (সা) ঘরে গিয়ে মেয়েকে বললেন, ‘আবুল আসের তাকার সম্মানজনক ব্যবস্থা করবে। তবে জেনে রেখ তুমি আর তার জন্য হালাল নও। যতক্ষণ সে মুশরিক থাকবে। হযরত যায়নাব (রা) পিতার কাছে আবেদন জানালেন আবুল ‘আসের কাফিলার লোকদের অর্থসম্পদসহ মুক্তিদানের জন্য।

রাসূলুল্লাহ (সা) সেই বাহিনীর লোকদের ডাকলেন যারা আবুল ‘আসের কাফিলার উট ও লোকদের ধরে নিয়ে এসেছিল। তিনি তাদের বললেন, ‘আমার ও আবুল ‘আসের মধ্যে যে সম্পর্ক তা তোমরা জান। তোমরা তার বাণিজ্য সম্ভার আটক করেছো। তার প্রতি সদয় হয়ে তার মালামাল ফেরত দিলে আমি খুশী হবো। আর তোমরা রাজী না হলে আমার কোন আপত্তি নেই। আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে তোমরা তা ভোগ করতে পার। তোমরাই সেই মালের বেশী হকদার।’ তারা বললো, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা তার সবকিছু ফেরত দিচ্ছি।’[ইবন হিশাম – ১/৬৫৮; তাবাকাত- ৮/৩৩]

আবুল ‘আস চললেন তাদের সাথে মালামাল বুঝে নিতে। পথে তারা আবুল ‘আসকে বললো, শোন আবুল ‘আস, কুরায়শদের মধ্যে তুমি একজন মর্যাদাবান ব্যক্তি। তাছাড়া তুমি রাসূলুল্লাহর (সা) চাচাতো ভাই এবংতাঁর মেয়ের স্বামী। তুমি এক কাজ কর। ইসলাম গ্রহণ করে মক্কাবাসীদের এ মালামালসহ মদীনায় থেকে যাও। বেশ আরামে থাকবে। আমি আমার নতুন দ্বীনের জীবন শুরু করবো শঠতার মাধ্যমে?[ প্রাগুক্ত]

আবুল ‘আস তাঁর কাফিলা ছাড়িয়ে নিয়ে মক্কায় পৌছালেন। মক্কায় প্রত্যেকের মাল বুঝে দিয়ে বললেন, ‘হে কুরায়শ গোত্রের লোকেরা! আমার কাছে তোমাদের আর কোন কিছু পাওনা আছে কি?’ তারা বললো না। আল্লাহ তোমাকে উত্তম পুরস্কার দান করুন আমরা তোমাকে একজন চমৎকার প্রতিশ্রুতি পালনকারী রূপে পেয়েছি।

আবুল ‘আস বললেন, ‘আমি তোমাদের হক পূর্ণরূপে আদায় করেছি। এখন আমি ঘোষনা করছি- আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ও রাসূলুহু- আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সা) তাঁর একজন বান্দা ও রাসূল। মদীনায় অবস্থানকালে আমি ঘোষণা  দিতে পারতাম। কিন্তু তা দিইনি এ জন্যে যে, তোমরা ধারণা করতে আমি তোমাদের মাল আত্মসাৎ করা উদ্দেশ্যেই এমন করেছি। আল্লাহ যখন তোমাদের যার যার মাল ফেরত দানের তাওফীক আমাকে দিয়েছেন এবং আমি আমার দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছি, তখনই আমি ইসলামের ঘোষণা দিচ্ছি।’

ই হিজরী সপ্তম সনের মুহাররম মাসের ঘটনা। এরপর আবুল ‘আস (রা) জন্মভূমি মক্কা থেকে হিজরাত করে মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সা) খিদমতে হাজির হন।[প্রাগুক্ত]

হযরত রাসূলে কারীম (সা) সম্মানের সাথে আবুল ‘আসকে (রা) গ্রহণ করেন এবং তাঁদের বিয়ের প্রথম ‘আকদের ভিত্তিতে স্ত্রী যায়নাবকেও (রা) তাঁর হাতে সোপর্দ করেন। [সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৪৯; আল ইসাবা-৪/৩১২,]

হযরত যায়নাব (রা) স্বামী আবুল ‘আসকে তাঁর পৌত্তলিক অবস্থায মক্কায় ছেড়ে এসেছিলেন। এ কারণে স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটেছিল বলে ধরে নেওয়া যায়। পরে আবুল ‘আস যখন ইসলাম গ্রহণ করে মদীনায় আসলেন তখন রাসূল (সা) যায়নাবকে তাঁর কাছে ফিরিয়ে দিলেন। এখন প্রশ্ন হলো, প্রথম ‘আকদের ভিত্তিতে যায়নাবকে প্রত্যর্পণ করেছিলেন, না আবার নতুন ‘আকদ হয়েছিল? এ ব্যাপারে দুই রকম বর্ণনা পাওয়া যায়। হযরত ইব ‘আব্বাস (রা) বলেন : [ইবন হিশাম-১/৬৫৮-৫৯; রিমিজী (১১৪৩); ইবন মাজাহ (২০০৯); সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৪৯] (আরবী====)

‘রাসুলুল্লাহ (সা) তাঁর মেয়েকে অনেক বছর পর প্রথম বিয়ের ভিত্তিতে আবুল ‘আসের নিকট ফিরিয়ে দেন এবং কোন রকম নতুন মাহর ধার্য করেননি।’

ইমাম শা‘বী বলেন :[ তাবাকাত-৮/৩২] (আরবী============)

‘যায়নাব ইসলাম গ্রহণ করেন এবং হিজরাতও করেন। তারপর আবুল ‘আস ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূল (সা) তাদের বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটাননি।’

এর কারণ হিসেবে বলাহয়েছে যে, তখনও পর্যন্ত সূরা আল-মুমতাহিনার নিম্নের আয়াতটি নাযিল হয়নি : [সূরা আল-মুমতাহিনা-১০] (আরবী======)

একই ধরনের কথা হযরত কাতাদও বলেছেন। তিনি বলেন : (আরবী========)

‘এ ঘটনার পরে নাযিল হয় সূরা ‘আল-বারায়াতৎ। অতঃপর কোন স্ত্রী তার স্বমীর পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করলে নতুন করে ‘আকদ ছাড়া স্ত্রীর উপর স্বামীর কোন প্রকার অধিকার থাকতো না।’

কিন্তু তার পূর্বে মুসলিম নারবীরা স্বামীর ইসলাম গ্রহণের পর নতুন ‘আকদ ছাড়াই স্বামীর কাছে ফিরে যেতেন।

তবে অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে : (আরবী=====)

‘নবী (সা) নতুন বিয়ে ও নতুন মাহরের ভিত্তিতে যয়নাবকে আবুযল ‘আসের নিকট প্রত্যর্পণ করেন।’ ইমাম আহমাদ বলেন : এটি একটিচ দুর্বল হাদীছ।

সনদের দিক দিয়ে ইবন ‘আব্বাসের (রা) বর্ণনাটি যদিও অপর বর্ণানটির উর প্রাধান্যযোগ্য, তবুও ফকীহরা দ্বিতীয়বার ‘আকদের বর্ণনাটির উপর আমল করেছেন। তাঁরা ইবন ‘আব্বাসের (রা) বর্ণনাটি যদিও অপর বর্ণনাটির উপর প্রাধান্যযোগ্য, তবুও ফকীহরা দ্বিতীয়বার ‘আকদের বর্ণাটির উপর আমল করেছেন। তাঁরা ইবন ‘আব্বাসের (রা) বর্ণনাটির এরূপ ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, যেহেতু দ্বিতীয় ‘আকদের সময় মাহর ও অন্যান্য বিষয় অপরিবর্তিত ছিল, তাই তিনি প্রথম ‘আকদ বলে বর্ণনা করেছেন। অন্যথায় এ ধরনের বিচ্ছেদে দ্বিতীয়বার ‘আকদ অপরিহার্য। ইমাম সুহায়লীও এরূপ কথা বলেছেন।

হযরত যায়নাব (রা) পিতা রাসূলুল্লাহ (সা) ও স্বামী আবুল ‘আস (রা)- উভয়কে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। ভালো দামী কাপড় পড়তে আগ্রহী ছিলেন। হযরত আনাস (রা) একবার তাঁকে একটি রেশমী চাদর গায়ে দেওয়া অবস্থায় দেখতে পান। চাদরটির পাড় ছিল হলুদ বর্ণের।

হযরত আবুল ‘আসের (রা) ঔরসে হযরত যায়নাবের (রা) দুইটি সন্তান জন্মলাভ করে। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। ছেলে ‘আলী হিজরতের পূর্বে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে নিজের দায়িত্বে নিয়ে প্রতিপালন করতে থাকেন। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (সা) যখন মক্কায় প্রবেশ করেন তখন ‘আলী নানার উটের টিছে সওয়ার ছিলেন। বালেগ হওয়ার পূর্বে পিতা আবুল ‘আসের (রা) জীবদ্দশায় ইন্তেকাল করেন। [আল-আ‘লাম-৩/৩৬]

কিন্তু ইবন ‘আসাকিরের একটি বর্ণনা দ্বারা জানা যায়, ‘আলী ইয়ারমূক যুদ্ধ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন এবং এই  যু্দ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। [আল-ইসাবা-৪/৩১২] মেয়ে উমামা (রা) দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিলেন।

হযরত যায়নাব (রা) স্বামী আবুল ‘আসের (রা) সাথে পুনর্মিলনের পর বেশীদিন বাঁচেননি। এক বছর বা তার চেয়ে কিছু বেশীদিন মদীনায় স্বামীর সাথে কাটানোর পর হিজরী অষ্টম সনের প্রথম দিকে মদীনায় ইনতিকাল করেন।[তাবাকাত-৮/৩৪; আল-আ‘লাম-৩/৬৭] তাঁর মৃত্যুর কারণ ও অবস্থা সম্পর্কে ইবন ‘আবদিল বার লিখেছেন :[ আল ইসতী ‘আব (আল-ইসাবার পার্শ্বটীকা) ৪/৩১২]

‘হযরত যায়নাবের (রা) মৃত্যুর কারণ হলো, যখন তিনি তাঁর পিতা রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে যাওয়ার জন্য মক্কা থেকে বের হন তখন হাব্বার ইবন আল-আসওয়াদ ও অন্য এক ব্যক্তি তাঁর উপর আক্রমণ করে। তাদের কেউ একজন তাঁকে পাথরের উপর ফেলে দেয়। এতে তাঁর গর্ভপাত ঘটে রক্ত ঝরে এবং তিনি দীর্ঘদিন পর্যন্ত রোগে ভুগতে থাকেন। অবশেষে হিজরী অষ্টম সনে ইনতিকাল করেন।

হযরত উম্মু আয়মান (রা), হযরত সাওদা (রা), উযরত উম্মু সালামা (রা) ও হযরত উম্মু ‘আতিয়্যা (রা), হযরত যায়নাবকে (রা) গোসল দেন।[আনসাবুল আশরাফ-১/৪০০ ] রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর জানাযার নামায পড়ান এবং নিজে কবরে নেমে নিজ হাতে অতি আদরের মেয়েটিকে কবরের মধ্যে রেখে দেন। তখন রাসূলুল্লাহর (সা) চেহারা মুবারক খুবই বিমর্ষ ও মলিন দেখাচ্ছিল। তিনি তাঁর জন্য দু‘আ করেন এই বলে: হে আল্লাহ! যায়নাবের (রা) সমস্যাসমূহের সমাধান করে দিনেএবং তার কবরের সংকীর্ণতাকে প্রশস্ততায় পরিবর্তন করে দিন।[উসুদুল গাবা-৫/৪৬৮; তাবাকাত-৮/৩৪]

হযরত উম্মু ‘আতিয়া (রা) বলেন, আমি যায়নাব বিনত রাসূলিল্লাহর (সা) গোসলে শরীক ছিলাম। গোসলের নিয়ম-পদ্ধতি রাসূলুল্লাহ (সা) নিজেই বলে দিচ্ছিলেন। তিনি বললেন, প্রথমে প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তিন অথবা পাঁচবার গোসল দিবে। তারপর কর্পূর লাগাবে।[তাবাকাত-৮/৩৪; সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৫০ ] একটি বর্ণনায় সাতবার গোসল দেওয়ার কথাও এসেছে। মূলত উদ্দেশ্য ছিল তাহারাত বা পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা যদি তিন বারে অর্জিত হয়ে যায় তাহলে বেশী ধোয়ার প্রয়োজন নেই। তা না হলে পাঁচ/সাত বারও ধুতে হবে। উম্মু ‘আতিয়্যা আরও বলেন:[ প্রাগুক্ত]

আমরা যখন যায়নাবকে গোসল দিচ্ছিলাম তখন রাসূল (সা) আমাদেরকে বললেন : ‘তোমরা তার ডান দিক ও ওজুর স্থানগুলি হতে গোসল আরম্ভ করবে।’

হযরত রাসূলে কারীম (সা) উম্মু ‘আতিয়্যাকে (রা) একথাও বলেন যে, গোসল শেষ হলে তোমরা আমাকে জানাবে। সুতরাং গোসল শেষ হলে তাঁকে জানানো হয়। তিনি নিজের একখানি তবন (লুঙ্গি) দিয়ে বলেন, এটি কাফনের কাপড়ের মধ্যে প্রতীক হিসেবে দিয়ে দাও।[বুখারী: বাবু গুসলিল মায়্যিত; সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৫২] রাসূল (সা) তাঁর পূর্বে মৃত্যুবরণকারী ‘উছমান ইবন মাজ‘উনের (রা) পাশে দাফন করার নির্দেশ দেন।[আনসাবুল আশরাফ-১/২১২]

হযরত যায়নাবের (রা) ইনতিকালের অল্প কিচুদিন পর তাঁর স্বামী আবুল ‘আসও (রা) ইনতিকাল করেন।[উসুদুল গাবা-৫/৪৬৮] বালাজুরী বলেন, ইসলাম গ্রহণের পর তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে কোন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি এবং হিজরী ১২ সনে ইনতিকাল করেন। হযরত যুবায়র ইবনুল ‘আওয়াম (রা) ছিলেন তাঁর মামাতো ভাই। মৃত্যুর পূর্বে তাঁকেই অসী বানিয়ে যান। [আনসাবুল আশরাফ-১/৪০০]

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ