আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – ষষ্ঠ খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

উম্মু হাকীম বিনত আলহারিছ (রা)


হযরত রাসূলে কারীম (সা) নবুওয়াত লাভের পর মক্কা এবং পরে মদীনায় বিশ বছরের অধিক সময় আরবের লোকদেরকে, বিশেষকরে মক্কাবাসীদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে গেছেন। তাদেরকে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের দিকে আহবান জানিয়েছেন, কিন্তু মক্কাবাসীরা অন্ধ ও বধিরের তম আচরণ করেছে। তাদের সে আচরণ ছিল এমন : (আরবী***********) [সূরা হা-মীম আস-সাজদাহ-৫]

“তারা বলে, তুমি যার প্রতি আমাদেরকে আহবান করছো সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণ আচ্ছাদিত, আমাদের কানে আছে বধিরতা এবং তোমার ও আমাদের মধ্যে আছে অন্তরাল। সুতরাং তুমি তোমার কাজ কর এবং আমরা আমাদের কাজ করি।“

তারা প্রেম প্রীতির বদলা দিল শত্রুতা দ্বারা এবং কল্যাণ ও ‍উপকারের বদলা দিল অকল্যাণ ও ক্ষতির দ্বারা, তাদের সে আচরণ ছিল এমন : (আরবী ***************) [সূরা আল-কামার-৩]

“তারা সত্য প্রত্যাখ্যান করে এবং নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে, আর প্রত্যেক ব্যাপারই লক্ষ্যে পৌছবে।“

তারা হযরত রাসূলে করীমের (সা) সঙ্গে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে মক্কা থেকে তাড়িয়ে দেয়। তাতেও তারা তুষ্ট হতে পারেনি। বার বার যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তার উপর ঝাপিয়ে পড়ে। ইসলামের আলোকে নিভিয়ে দিতে সব রকমের সুযোগকে কাজে লাগায়।

অতপর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদের উপর বিজয় দান করলেন। মক্কা বিজয় হলো। অতবড় বিশ্ব যখন তাদের নিকট সংকীর্ণ হয়ে পড়লো, তারা যখন চতুর্দিকে কেবল অন্ধকার দেখতে লাগলো তখন আল্লাহর রাসূল (সা) তাদের প্রতি মহানুভবতার পরিচয় দিলেন। তাদের বিগত দিনের সকল আচরণ ক্ষমা করে দিলেন। মক্কাবাসীরা স্বেচ্ছায় দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করলো। উম্মু হাকিম, তাঁর পিতা, মাতা ও স্বামী সকলে মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য যে, এ চার জনই ছিলেন ইসলাম ও রাসূলুল্লাহর (সা) চরম দুশমন। ইসলামের সূচনা থেকে ঈমান আনার পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত বিশ বছর তাঁদের শত্রুতা ছিল মাত্রা ছাড়া।

উম্মু হাকীম মক্কার কুরাইশ গোত্রের আল-মাখযূমী শাখার সন্তান। উম্মু হাকীম ডাক নাম। এর অন্তরালে তাঁর আসল নামটি হারিয়ে গেছে। তা আর জানা যায় না। ‍উম্মু হাকীমের পরিবারটি ছিল কুরাইশ বংশের মধ্যে সম্মান, মর্যাদা ও নেতৃত্বের অন্যতম কেন্দ্র। পিতা আল-হারিছ ইবন হিশাম ইবন আল-মগীরা আল-মাখযূমী, নরাধম আবূ-জাহলের ভাই। মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন। একজন ভদ্র ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন। ইসলামের উপর অটল রাখার উদ্দেশ্যে রাসূল (সা) হুনাইন যুদ্ধের গণীমত (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) থেকে একশো (১০০) উট তাঁকে দান করেন। তিনি একজন ভালো মুসলমান হন। পরবর্তীকালে একজন মুজাহিদ হিসেবে শামে যান এবং সেখানে ‘আঊন‘ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।[আয-যাহবী, তারীখ আল-ইসলাম-২/১৮৩-১৮৪]

মা ফাতেমা বিনত আল-ওয়ালীদ ইবন আল-মুগীরা আল-মাখযূমিয়্যা প্রখ্যাত সেনানায়ক খালিদ ইবন আল-ওয়ালীদের (রা) বোন। মক্কা বিজয়ের ‍দিন ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লহর (সা) একটি হাদীস তিনি বর্ণনা করেছেন। স্বামী আল-হারিছের শাম অভিযানে তিনিও সফর সঙ্গী হন। আল-হারিছের ঔরসে তিনি ছেলে আবদুর রহমান ও মেয়ে উম্মু হাকীমের জন্ম দেন।[তারীখু ‍দিমাশক-তারাজিম আন-নিসা-৩০৫-৩০৭]

উম্মু হাকীমের স্বামী ইকরিমা ইবন আবী জাহল আল-মাখযূমী জাহিলী মক্কার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতা। মক্কা বিজয়ের পরে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে ইসলামের ঘোষণা দেন এবং পরবর্তীতে একজন অতি ভালো মুসলমান হন। শাম অভিযানে বের হন এবং হিজরী ১৩ সনে আজনাদাইন, মতান্তরে ইয়ারমুক যুদ্ধে শহীদ হন। উম্মু হাকীমের মামা সাইফুল্লাহ খালিদ ইবন আল-ওয়ালীদ (রা)।

এমনই এক পরিবার ও পরিবেশে উম্মু হাকীম বেড়ে উঠেন। চাচাতো ভাই ইকরিমাকে বিয়ে করেন। মহানবী (সা) মক্কায় রাসূল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন। যে দিন তিনি ইসলামের দিকে মক্কাবাসীদেরকে আহবান জানালেন সেই দিন থেকে এই পরিবারটি মহানবী (সা) ও ইসলামের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড়িয়ে গেল। মক্কা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত ইসলামকে ঠেকিয়ে রাখার জন্য যত রকম ষড়যন্ত্র করা হয়েছ, ইসলামকে সমূলে উত্খাত করার জন্য যত যুদ্ধ হয়েছে, তার সবকিছুতে উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। উহুদ যুদ্ধে আল-হারিছ, তাঁর স্ত্রী ফাতিমা, ইকরিমা, তাঁর স্ত্রী উম্মু হাকীম ও খালিদ ইবন আল-ওয়ালীদ- কুরাইশ বাহিনীর সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন।

ইসলামের বিরোধিতা ও মুসলমানদের ক্ষতি সাধনে কোন সুযোগকে তাঁরা হাতছাড়া করেননি। এমনকি হযরত রাসূলে কারীম (সা) যাদেরকে মহা অপরাধী বলে ঘোষণা দেন এবং কা‘বার গিলাফের নীচে পাওয়া গেলেও হত্যার নির্দশ দেন, উম্মু হাকীমের স্বামী ইকরিমা তাদের অন্যতম।

হযরত রাসূলে কারীম (সা) মক্কা বিজয়ের পর যে অবস্থান গ্রহণ করেন মানব জাতির ইতিহাসে তা এক অনন্য আদর্শ হিসেবে চিহ্ণিত হয়ে আছে। সে দিন তাঁর দয়া ও করুণা শত্রু-মিত্র, বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী সকলকে বেষ্টন করে। দীর্ঘদিন যাবত যারা তার প্রতি অন্ধ বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ করেছে, সেদিন তাঁর এই ব্যাপক ক্ষমা ও দয়া তাদের পাষাণ হ্রদয় পরম প্রশান্তি বয়ে আনে। মুহুর্তে তাদের অন্তর জেগে ওঠে এবং ভ্রান্তির বেড়াজাল ছিন্ন করে পতঙ্গের ন্যায় আলোর নিকট নিজেদেরকে সমর্পন করে। উম্মু হাকীম নিজে তাঁর স্বামীর জন্য এই ক্ষমার সুযোগ গ্রহণ করেন। তিনি কুরাইশ গোত্রের অন্যসব মহিলা, যেমন : ফাতিমা বিনত আল-ওয়ালীদ, হিন্দ বিনত উতবা, ফাখতা বিনত আল-ওয়ালীদ প্রমুখের সাথে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট যান এবং ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিয়ে বাই‘আত করেন। ইসলাম গ্রহণের পর থেকে রাসূল (সা) তাঁকে যথেষ্ট সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতেন। এ কারণে মহিলা সমাজে তিনি এক বিশেষ মর্যাদার আসন লাভ করেন।

উম্মু হাকীমের স্বামী ইকরিমা ছিলেন ইসলামের চরম দুশমন। মহানবীর দৃষ্টিতে মহা অপরাধী। তাই রাসূল (সা) তার মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেন। মক্কা বিজয়ের পর প্রাণভয়ে তিনি ইয়ামনে পালিয়ে যান। স্ত্রী উম্মু হাকীমের চেষ্টায় তিনি মক্কায় ফিরে আসেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর উম্মু হাকীম (রা) উঠে দাঁড়িয়ে বললেন : ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি ইকরিমাকে হত্যা করতে পারেন, এ ভয়ে সে ইয়ামনের দিকে পালিয়ে গেছে। আপনি তাঁকে নিরাপত্তা দিন, আল্লাহ আপনাকে নিরাপত্তা ‍দিবেন। রাসূল (সা) বললেন : সে নিরাপদ।

সেই মুহুর্তে উম্মু হাকীম স্বামী ইকরিমার সন্ধানে বের হলেন। সংগে নিলেন তাঁর এক রোমান ক্রীতদাসকে। তাঁরা দু‘জন চলছেন। পথিমধ্যে দাসের মনে তার মনিবের প্রতি অসৎ কামনা দেখা দিল। সে চাইলো তাঁকে ভোগ করতে, আর তিনি নানা রকম টালবাহানা করে সময় কাটাতে লাগলেন। এভাবে তাঁরা একটি আরব গোত্রে পৌছলেন। উম্মু হাকীম তাদের সাহায্য কামনা করলেন। তারা সাহায্যের আশ্বাস দিল। তিনি দাসটিকে তাদের জিম্মায় রেখে একাকী পথে বের হলেন। অবশেষে তিহামা অঞ্চলে সাগর তীরে ইকরিমার দেখা পেলেন। সেখানে তিনি এক মাঝির সাথে কথা বলছেন তাকে পার করে দেওয়ার জন্য, আর মাঝি তাকে বলছেন :

-সত্যবাদী হও।

ইকরিমা বললেন : কিভাবে আমি সত্যবাদী হবো?

মাঝি বললেন : তুমি বলো, (আরবি ************)

“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি এক আল্লাহ ছড়া আর কোন ইলাহ আ মা‘বূদ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।“

ইকরিমা বললেন : আমি তো শুধু এ কারণে পালিয়েছি।

তাদের দু‘জনের এ কথোপকথনের মাঝখানেই উম্মু হাকীম উপস্থিত হলেন। তিনি তাঁর স্বামী কে লক্ষ্য করে বললেন : হে আমার চাচাতো ভাই! আমি সর্বোত্তম, সর্বশ্রেষ্ঠ ও পবিত্রতম ব্যক্তির নিকট থেকে আসছি। আমি তাঁর কাছ থেকে আমান (নিরাপত্তা) চেয়েছি। তিনি আপনার আমান মঞ্জুর করেছেন। সুতরাং এরপরও আপনি নিজেকে ধ্বংস করবেন না।

ইকরিমা জানতে চাইলেন : তুমি নিজেই তাঁর সাথে কথা বলেছো? বললেন : হাঁ, আমিই তাঁর সাথে কথা বলেছি এবং তিনি আপনাকে আমান দিয়েছেন। বার বার তিনি তাঁকে আমানের কথা শোনাতে লাগলেন। অবশেষে আশ্বস্ত হয়ে স্ত্রীর সাথে ফিরে চললেন।[আ‘লাম আন-নিসা-১/২৮১]

পথে চলতে চলতে উম্মু হাকীম তাঁর দাসটির অসৎ অভিপ্রায়ের কথা স্বামীকে বললেন। ফেরার পথে ইসলাম গ্রহণের পূর্বেই ইকরিমা দাসটিকে হত্যা হরেন। পথিমধ্যে তাঁরা এক বাড়ীতে রাত্রি যাপন করেন। ইকরিমা চাইলেন স্ত্রীর সাথে একান্তে মিলিত হতে। স্ত্রী কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলেন : আমি একজন মুসলিম নারী এবং আপনি এখনো একজন মুশরিক। স্ত্রীর কথা শুনে ইকরিমা অবাক হয়ে গেলেন। বললেন : তোমার ও আমার মিলনের মাঝখানে যে ব্যাপারটি অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে তাতো খুব বিরাট ব্যাপার।

এভাবে ইকরিমা যখন মক্কার নিকটবর্তী হলেন, তখন রাসূল (সা) তাঁর সাহাবীদের বললেন : খুব শিগগির ইকরিমা কুফর ত্যাগ করে মু‘মিন হিসেবে তোমাদের কাছে আসছে। তোমরা তার পিতাকে গালি দেবেনা। মৃত ব্যক্তিকে গালি দিলে তা জীবিতদের মনে কষ্টের কারণ হয় এবং তা মৃতের কাছেও পৌছে না।

কিছুক্ষণের মধ্যে ইকরিমা তাঁর স্ত্রী উম্মু হাকীমসহ রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট উপস্থিত হলেন। রাসূল (সা) তাঁকে দেখেই আনন্দে উঠে দাঁড়ালেন এবং চাদর গায়ে না জড়িয়েই তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন। তারপর রাসূল (সা) বসলেন। ইকরিমা তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বলেন :

ইয়া মুহাম্মাদ! উম্মু হাকীম আমাকে বলেছে আপনি আমাকে আমান দিয়েছেন। নবী বললেন : সে ঠিক বলেছে। তুমি নিরাপদ। ইকরিমা বললেন : মুহাম্মাদ আপনি কিসের দা‘ওয়াত দিয়ে থাকেন?

রাসূল (সা) বললেন : আমি তোমাকে দা‘ওয়াত দিচ্ছি তুমি সাক্ষ্য দেবে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং আমি (মুহাম্মাদ) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। তারপর তুমি নামায কায়েমকরবে, যাকাত আদায় করবে। এভাবে তিনি ইসলামের সবগুলি আরকান বর্ণনা করলেন।

ইকরিমা বললেন : আল্লাহর কসম! আপনি কেবল সত্যের দিকেই দা‘ওয়াত ‍দিচ্ছেন এবং কল্যাণের কথা বলছেন। তারপর তিনি বলতে লাগলেন :

এ দা‘ওয়াতের পূ্র্বেই আপনি ছিলেন আমাদের মধ্যে সর্বাধিক সত্যবাদী ও সত্কর্মশীল। তারপর “আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লহু ওয়া আশহাদু আন্নাকা আবদুহু ওরাসূলুহু“- বলতে বলতে রাসূলুল্লহর (সা) ‍দিকে হাত বাড়িয়ে দেন।

রাসূল (সা) বললেন : তুমি বলো, “উশহিদুল্লাহ ওয়া উশহিদু মান হাদারা আন্নি মুসলিমুন মুজাহিদুন মুহাজিরুন“-আল্লাহ ও উপস্থিত সকলকে সাক্ষি রেখে বলছি আমি একজন মুসলিম, মুজাহিদ ও মুহাজির।

ইকরিমা তাই উচ্চারণ করলেন। তারপর রাসূল (সা) তাঁকে বললেন : অন্য কাউকে আমি দিচ্ছি, এমন কিছু আজ যদি আমার কাছে চাও, আমি তোমাকে দেব।

ইকরিমা বললেন : আমি চাচ্ছি যত শত্রুতা আমি আপনার সাথে করেছি, যত যুদ্ধে আমি আপনার মুখোমুখি হয়েছি এবং আপনার সামনে অথবা পিছনে যত কথাই আমি আপনার বিরুদ্ধে কলেছি- সবকিছুর জন্য আপনি আল্লাহর কাছে আমার মাগফিরাত কামনা কিরুন।

রাসূল (সা) তাঁর জন্য দু‘আ করলেন : হে আল্লাহ! যত শত্রুতা সে আমার সাথে করেছে, তোমার নূরকে বিভিয়ে দেওয়ার দেওয়ার উদ্দেশ্যে যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত হতে যত পথই সে ভ্রমণ করেছে- সবকিছুই তাকে ক্ষমা করে দাও। আমার সামনে বা অগোচরে আমার মানহানিকর যত কথাই সে বলেছে, তা-ও তুমি ক্ষমা করে দাও।

আনন্দে ইকরিমার মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, তিনি বললেন : ইয়া রাসূলুল্লাহ, আল্লাহর কসম! আল্লাহর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে যতকিছু আমি ব্যয় করেছি তার ‍দ্বিগুণ আল্লাহর পথে ব্যয় করবো এবং আল্লাহর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে যুদ্ধ আমি করেছি, তার ‍দ্বিগুণ যুদ্ধ আমি আল্লাহর পথে করবো।[ আত-তাবারী, তারীখ-২/১৬০; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৪/২৯৭; আল-আ‘লাম-২/২৬৯; উসুদুল গাবা-৫/৫৭৭; আসহাবে রাসূলের জীবন কথা-১/২০৫-২০৮]

এদিন থেকেই তিনি আল্লাহর যমীনে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামী কাফেলায় শরীক হলেন এবং ইয়ারমূক যুদ্ধে শাহাদাত বরণের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে কৃত অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে পূর্ণ করেন।

উম্মু হাকীম (রা) স্বামী ইকরিমার (রা) সাথে রোমানদের সাথে যু্দ্ধের জন্য শামে যান। ইয়ারমূক রাণাঙ্গনে রোমান ও মুসলিম বাহিনী মুখোমুখি হয় এবং প্রচণ্ড যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে কুরাইশ রমণীরা অসি চালনায় পুরুষ যোদ্ধাদেরকেও হার মানায়। এই রমণীদের মধ্যে উম্মু হাকীমও একজন। এই ইয়ারমূক যুদ্ধে উম্মু হাকীম (রা) স্বামীকে হারান। ইকরিমা (রা) এ যুদ্ধে শহীদ হন।[সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-১/৩২৪; আল-ইসাবা-৪/৪২৬] চার মাস দশ ‍দিন ইদ্দত পালনের পর বহু লোক তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। ইয়াযীদ ইবন আবী সুফইয়ানও (রা) তাঁদের একজন। তিনি সকলকে হতাশ করে খালিদ ইবন সা‘ঈদ ইবন আল-আসের (রা) প্রস্তাবে সাড়া দেন। চার শো দীনার মাহরের বিনিময়ে তাঁর সাথে বিয়ে সম্পন্ন হয়। আকদ সম্পন্ন হলেও বাসর শয্যার পূর্বেই ‍দিমাশকের দক্ষিণে সংঘটিত “মারজ আস-সাফার“ যুদ্ধের তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। মুসলিম সৈনিকরা সেখানে চলে যায়। হযরত খালিদ (রা) যুদ্ধে যাওয়ার আগেই স্ত্রীর সাথে বাসর সম্পন্ন করতে চাইলেন। স্ত্রী উম্মু হাকীম বললেন : শত্রু বাহিনীর এই সমাবেশ পর্যুদস্ত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত।

খালিদ (রা) বললেন : আমার অন্তর বলছে এই যুদ্ধে আমি শাহাদাত বরণ করবো। উম্মু হাকীম (রা) আর আপত্তি করলেন না। মারজ আস-সাফারে একটি পুলের ধারে একটি তাঁবুর মধ্যে তাঁদের বাসর শয্যা রচিত হয় এবং সেখানে তাঁরা রাত্রি যাপন করেন।

পরবর্তীকালে এ পুলটির নাম হয় “কানতারাতু উম্মি হাকীম“-উম্মু হাকীমের পুল। সকালে ওলীমা ভোজও হয়। ভোজ শেষ হতে না হতেই রোমানদের সাথে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। খালিদ (রা) শত্রু বাহিনীর উপর ঝাঁপিয় পড়েন এবং বীরের মত যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেন। উম্মু হাকীম (রা) তখনো নববধূর সাজে। হাতে মেহেদীর রং, দেহে সুগন্ধি। যে তাঁবুতে রাত বাসর করেছেন, তার একটি খুঁটি তুলে হাতে নিলেন। সেই তাঁবুর পাশেই তিনি রোমান সৈনিকদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলেন এবং সেই খুঁটি দিয়ে পিটিয়ে সেদিন তিনি সাতজন রোমান সৈন্যকে হত্যা করেন।[আল-ইসতী‘আব-৪/৪২৫; তারীখু দিমাশক-৫০৬; উসুদুল গাবা-৫/৫৭৭; আ‘লাম আন-নিসা-১/২৮১; আল-ইসাবা-৪/৪২৬]

উম্মু হাকীম (রা) আবার বিধবা হয়ে মদীনায় ফিরে আসেন। খলীফা হযরত উমারের (রা) তাঁকে বিয় করেন এবং এখানে তাঁর গর্ভে কন্যা ফাতিমা বিনত উমারের জন্ম হয়। ফাতিমার চাচা যায়দ ইবন আল-খাত্তাবের ছেলের সাথে এই ফাতিমার বিয়ে হয়।[আত-তাবারী, তারীখ-২/৫৬৪; আয-যাহাবী, তারীখ-৩/২৭৪; নাসাবু ‍তুরায়শা-৩০৩]

বিভিন্ন ঘটনার আলোকে ‍বুঝা যায় উম্মু হাকীম (রা) স্বামী হযরত উমারের (রা) জীবদ্দশায় তাঁরই খিলাফতকালে ইনতিকাল করেন। আল্লামা যিরিকলী সুনির্দিষ্টভাবে হিজরী ১৪ সনের কথা বলেছেন।[নিসা‘মিন আসর আন-নুবুওয়াহ-৪৮৯]

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ