আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – ষষ্ঠ খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

উমামা বিনত আবিল আস (রা)


হযরত উমামার বড় পরিচয় তিনি হযরত রাসূলে কারীমের (সা) দৌহিত্রী। তাঁর পিতা আবুল আস (রা) ইবন বারী এবং মাতা যায়নাব (রা) বিনত রাসূলিল্লাহ (সা)। উমামা তাঁর নানার জীবদ্দশায় মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের অনেক আগেই নানী উম্মুল মু‘মিনীন হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রা) ইনতিকাল করেন। উমামার দাদী ছিলেন হযরত খাদীজার ছোট বোন হালা বিনত খুওয়ায়লিদ। হিজরী ৮ম সনে উমামার মা এবং দ্বাদশ সনে পিতা ইনতিকাল করেন।[তারাজিমু সায়্যিদাত বায়াতিন নুবুওয়াহ-৫৩৬-৫৩৭]

নানা হযরত রাসূলে কারীম (সা) শিশু উমামাকে অত্যধিক স্নেহ করতেন। সব সময় তাকে সংগে সংগে রাখতেন। এমনকি নামাযর সময়ও কাছে রাখতেন। মাঝে মাঝে এমনও হতো যে, রাসূল (সা) তাকে কাঁধের উপর বসিয়ে নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন। রুকূ‘তে যাওয়ার সময় কাঁধ থেকে নামিয়ে দিতেন। তারপর সিজদায় গিয়ে তাকে মাথার উপর বসাতেন এবং সিজদা থেকে উঠার সময় কাঁধের উপর নিয়ে আসতেন। এভাবে তিনি নামায শেষ করতেন। এ আচরণ দ্বারা উমামার প্রতি তাঁর স্নেহের আধিক্য কিছুটা অনুমান করা যায়।

রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবী হযরত আবূ কাতাদা (রা) বলেন, একদিন বেলাল আযান দেওয়ার পর আমরা জুহর, মতান্তরে আসরের নামাযের জন্য অপেক্ষায় আছি, এমন সময় রাসূল (সা) উমামা বিনত আবিল আসকে কাঁধে বসিয়ে আমাদের মাঝে উপস্থিত হলেন। রাসূল (সা) নামাযে দাঁড়ালেন এবং আমরাও তাঁর পিছনে নামাযে দাঁড়িয়ে গেলাম। উমামা তখনও তার নানার কাঁধে একইভাবে বসা।

রাসূল (সা) রুকূতে যাবার সময় তাকে কাঁধ থেকে নামিয়ে মাটিতে রাখেন। রুকূ-সিজদা শেষ করে যখন উঠে দাঁড়ালেন তখন আবার তাঁকে ধরে কাঁধের উপর উঠিয়ে নেন। প্রত্যেক রাক‘আতে এমনটি করে তিনি নামায শেষ করেন।[সুনানু নাসাঈ-২/৪৫,৩/১০; তাবাকাত-৮/২৩২; আল ইসাবা-৪/২৩৬; হায়াতুস সাহাবা-২/৪৮২]

উম্মুল মু‘মিনীন হযরত আইশা (রা) বর্ণনা করেছেন। হাবশার সম্রাট নাজ্জাশী রাসূলুল্লাহকে (সা) কিছু স্বর্ণের অলঙ্কার উপহার হিসেবে পাঠান, যার মধ্যে একটি স্বর্ণের আংটিও ছিলো। রাসূল (সা) সেটি উমামাকে দেন।[নিসা‘মিন আসর আন-নুবুওয়াহ-২৮৯]

উমামার প্রতি রাসূলুল্লাহর (সা) স্নেহের প্রবলতা আরেকটি ঘটনার দ্বারাও অনুমান করা যায়। একবার রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট মুক্তা বসানো স্বর্ণের একটি হার আসে। হারটি হাতে করে ঘরে এসে বেগমদের দেখিয়ে বলেন : দেখ তো, এটি কেমন? তাঁরা সবাই বলেন : অতি চমত্কার! এর চেয়ে সুন্দর হার আমরা এর আগে আর দেখিনি। রাসূল (সা) বললেন : এটি আমি আমার পরিবারের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশী প্রিয় তার গলায় পরিয়ে দেব। আইশা (রা) মনে মনে ভাবলেন, না জানি তিনি এটা আমাকে না দিয়ে অন্য কোন বেগমের গলায় পরিয়ে দেন কিনা। অন্য বেগমগণও ধারণা করলেন, এটা হয়তো আইশা (রা) ভাগ্যেই জুটবে। এদিকে বালিকা উমামা তাঁর নানা ও নানীদের অদূরেই মাটিতে খেলছিল। রাসূল (সা) এগিয়ে গিয়ে তার গলায় হারটি পরিয়ে দেন।[আল-ইসতী‘আব-৪/২৩৮; উসুদুল গাবা-৫/৪০০; আস-সীরাহ আল-হালাবিয়্যাহ-২/৪৫২; দুররুস সাহাবা ফী মানাকিব আল-কারাবাহ ওয়াস সাহাবা-৫৩৫; আ‘লাম আন-নিসা-১/৭৭]

হযরত উমামার (রা) পিতা আবুল আস ইবন রাবী (রা) হিজরী ১২ সনে ইনতিকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর মামাতো ভাই যুবাইর ইবন আল-আওয়ামের সাথে উমামার বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছার কথা বলে যান। এদিকে উমামার খালা হযরত ফাতিমাও (রা) ইনতিকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি স্বামী আলীকে বলে যান, তাঁর পরে তিনি যেন উমামাকে বিয়ে করেন। অতপর উমামার বিয়ের বয়স হলো। যুবাইর ইবন আল-আওয়াম (রা) হযরত ফাতিমার (রা) অন্তিম ইচ্ছা পূরণের জন্য উদ্যেমী হলেন। তাঁরই মধ্যস্থতায় আলীর (রা) সাথে উমামার (রা) বিয়ে সম্পন্ন হলো। তখন আমীরুল মু‘মিনীন উমারের (রা) খিলাফতকাল।

হিজরী ৪০ সন পর্যন্ত তিনি আলীর (রা) সাথে বৈবাহিক জীবন যাপন করেন। এর মধ্যে আলীর (রা) জীবনের উপর দিয়ে নানা রকম ঝড়-জঞ্ঝা বয়ে যায়। অবশেষে হিজরী ৪০ সনে তিনি আততায়ীর হাতে মারত্মক ভাবে আহত হন। এই আঘাতে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি স্ত্রী উমামাকে বলেন, আমার পরে যদি তুমি কোন পুরুষের প্রয়োজন বোধ কর, তাহলে আল-মুগীরা ইবন নাওফালকে বিয়ে করতে পার। তিনি আল-মুগীরাকেও বলে যান, তাঁর মৃত্যুর পর তিনি যেন উমামাকে বিয়ে করেন। তিনি আশংকা করেন, তাঁর মৃত্যুর পরে মু‘আবিয়া (রা) উমামাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবেন। তাঁর এ আশংকা সত্যে পরিণত হয়। তিনি ইনতিকাল করেন। উমামা উদ্দত তথা অপেক্ষার নির্ধারিত সময়সীমা অতিবাহিত করলেন। হযরত মু‘আবিয়া (রা) মোটেই দেরী করলেন না। তিনি মারওয়ানকে লিখলেন, তুমি আমার পক্ষ থেকে উমামার নিকট বিয়ের পয়গাম পাঠাও এবং এ উপলক্ষে এক হাজার দীনার ব্যয় কর। এ খবর উমামার (রা) কানে গেল। তিনি সাথে সাথে আল-মুগীরাকে লোক মারফত বললেন, যদি আপনি আমাকে পেতে চান, দ্রুত চলে আসুন। তিনি উপস্থিত হলেন এবং হযরত হাসান ইবন আলীর (রা) মধ্যস্থতায় বিয়ের কাজ সম্পন্ন হয়।[আল-ইসাবা-৪/২৩৭] এই আল-মুগীরার স্ত্রী থাকা অবস্থায় মু‘আবিয়ার (রা) খিলাফতকালে তিনি ইনতিকাল করেন। আলীর (রা) ঘরে উমামার (রা) কোন সন্তান হয়নি। তবে আল-মুগীরার ঘরে তিনি এক ছেলের মা হন এবং তার নাম রাখেন ইয়াহইয়া। এ জন্য আল-মুগীরার ডাকনাম হয় আবূ ইয়াহইয়া।[প্রাগুক্ত; উসুদুল গাবা-৫/৪০০; আ‘লাম আন-নিসা-১/৭৭] তবে অনেকে বলেছেন, আল-মুগীরার ঘরেও তিনি কোন সন্তানের মা হননি। তাঁরা বলেন, রাসূলুল্লাহর (সা) কন্যাদের মধ্যে একমাত্র ফাতিমা (রা) ছাড়া আর কারো বংশধারা অব্যাহত নেই। হতে পারে আল-মুগীরার ঔরসে ইয়াহইয়া নামের এক সন্তানের জন্ম দেন, কিন্তু শিশু কালেই তার মৃত্যু হয়। উমামার মৃত্যুর মাধ্যমে নবী দুহিতা যায়নাবের (রা) বংশধারার সমাপ্তি ঘটে। কারণ তাঁর পূর্বেই যয়নাবের পুত্রসন্তান আলীর মৃত্যু হয়।[তারাজিমু সায়্যিদাতি বাতিন নুবুওয়াহ-৫৩৮; নিসা মিন আসর আন-নুবুওয়াহ-২৮০]

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ