আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – ষষ্ঠ খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

হাওয়া বিনত ইয়াযীদ (রা)


হাওয়ার পিতার নাম ইয়াযীদ ইবন সিনান। মদীনার আবদুল আশহাল গোত্রের মেয়ে। তিনি মদীনার কায়স ইবন খুতায়মের স্ত্রী ছিলেন। মদীনার মহান আনসারী সাহাবী সা‘দ ইবন মু‘আয (রা) ছিলেন হাওয়ার মা আকরাব বিনত মু‘আযের আপন ভাই। সুতরাং বিখ্যাত সাহাবী সা‘দ ছিলেন হাওয়ার মামা। মহান বদরী সাহাবী রাফি‘ ইবন ইয়াযীদ (রা) হাওয়ার সহোদর। রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনার হিজরাতের পূর্বে, মদীনায় ইসলাম প্রচারের সূচনা পর্বে হাওয়া ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূল (সা) যে সকল মহিলাকে সম্মান ও সম্ভমের দৃষ্টিতে দেখতেন তিনি তাঁদের একজন। হাওয়া আকাবার প্রথম ও দ্বিতীয় বাই‘আতের মধ্যবর্তী সময়ে ইসলাম গ্রহণ করে থাকবেন। [আল-ইসাবা-৪/২৭৭; নিসা‘মিন আসর আন-নুবুওয়াহ-৯১]

মদীনার যে ক‘জন মহিলা সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁর নিকট বাই‘আত করেন, এই হাওয়া তাঁদের অন্যতম। আবদুল আশহাল গোত্রের এক মহিলা উম্মু আমির বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি, লাইলা বিনত আল-হুতায়ম ও হাওয়া বিনত ইয়াযীদ- এই তিনজন একদিন মাগরিব ও ঈশার মাঝমাঝি সময়ে আমাদের চাদর ‍দিয়ে সারা দেহ ঢেকে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট উপস্থিত হলাম। আমরা সালাম দিলাম। তিনি আমাদের পরিচয় জানতে চাইলেন। আমরা পরিচয় দিলাম। তিনি আমাদেরকে স্বাগত জানিয়ে জানতে চাইলেন : তোমরা কি জন্য এসেছো?

আমরা বললাম : ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমরা আপনার নিকট ইসলামের বাই‘আত (আনুগত্যের অঙ্গীকার) করতে এসেছি। আমরা আপনার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং আপনি যা নিয়ে এসেছেন তা সত্য বলে সাক্ষ্য দিয়েছি।

রাসূল (সা) বললেন : সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি তোমাদের ইসলামের প্রতি হিদায়াত দান করেছেন। আমি তোমাদের বাই‘আত গ্রহণ করলাম। উম্মু আমির (রা) বলেন : অতপর আমি একটু রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে এগিয়ে গেলাম। তখন তিনি বললেন : আমি মহিলাদের সাথে করর্মদন কারি না। হাজার মহিলার উদ্দেশ্যে আমার যে কথা, একজন মহিলার জন্যও আমার সেই এক কথা।

উম্মু আমির বলেন : রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট আমরা প্রথম বাই‘আত গ্রহণকারী।[তাবাকাত-৮/১২; আল-ইসাবা-৪/২৭৬]

ইসলামের কারণে যাঁরা জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, হাওয়া তাঁদের অন্যতম। তাঁর স্বামী কায়স ইবন খুতায়ম ছিলেন মদীনার আওস গোত্রের খ্যাতনামা কবি। তিনি পৌত্তলিকতার উপর অটল থাকলেও তাঁর অজ্ঞাতে স্ত্রী হওয়া ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি তা জানতে পেরে তাঁকে ইসলাম থেকে বিরত রাখার জন্য তাঁর উপর নির্যাতন আরম্ভ করেন। তাঁকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতেন, নামাযরত অবস্থায় সিজদায় গেলে মাটিতে ফেলে দিতেন।[আল-ইসাবা-৪/২৭৬] হাওয়া নীরবে সকল অত্যাচার সহ্য করে যেতেন। রাসূল (সা) তখন মক্কায়। মদীন থেকে যে সকল মুসলমান মক্কায় যেতেন তাঁদের মুখে তিনি মদীনার হাল-হাকীকত অবগত হতেন। তাঁদের কাছেই তিনি হাওয়ার উপর নির্যাতনের কথা অবগত হন। মৃত্যুর পূর্বে একবার কায়াস মক্কার “যুল মাজায“-এর মেলায় যান। রাসূল (সা) খবর পেয়ে তাঁর অবস্থানস্থলে গিয়ে হাজির হন। রাসূলকে (সা) দেখে কায়স সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং খুবই সম্মান ও সমাদর করেন। রাসূল (সা) তাঁকে ইসলাম গহণের আহ্বান জানান। তিনি এই বলে সময় নেন যে, মদীনায় ফিরে গিয়ে আরো একটু চিন্তা করে দেখবেন। রাসূল (সা) তাতে রাজি হন। তারপর তিনি প্রসঙ্গ পাল্টে বলেন, তোমার স্ত্রী হাওয়া বিনত ইয়াযীদ তো ইসলাম গ্রহণ করেছে। তুমি তাকে নানাভাবে কষ্ট দিয়ে থাক। আমি চাই তুমি আর তাকে কোনভাবে কষ্ট দিবে না। আল্লাহকে ভয় কর। তার ব্যাপারে আমার কথা মনে রেখ।[তাবাকাত-৩/৩২৪;৮/২৩; আ‘লাম আন-নিসা-১/৩০৪]

কায়স বললেন : আবুল কাসিম! আপনার সম্মানে আমি তাকে আর কোন কষ্ট দিবো না। রাসূলকে (সা) কথা দিয়ে মদীনায় ফিরে এলেন। স্ত্রীকে বললেন : তোমার সেই বন্ধু আমার সাথে দেখা করেছেন এবং তোমাকে কোন রকম কষ্ট না দেওয়ার জন্য আমাকে অনুরোধ করেছেন। সুতরাং এখন থেকে আমি আর তোমাকে কিছু বলবো না। তুমি স্বাধীনভাবে তোমার দীন চর্চা করতে পার।[ইবন সাল্লাম, তাবাকাত আশ-শু‘আরা-১৯২,১৯৩]

অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি স্ত্রীকে বলেন : তুমি তোমার দীন যেভাবে ইচ্ছা পালান করতে পর। আমি আর কোন রকম বাধা দিব না। আল্লাহর কসম! আমি তাঁর চেয়ে সুন্দর চেহেরা ও সুন্দর আকৃতির কোন মানুষ আর দেখিনি। [আল-বায়হাকী, দালায়িল আন-নুবুওয়াহ-২/৪৫৬; আ‘লাম আন-নিসা-১/৩০৪]

এরপর হাওয়া (রা) স্বামীর নিকট ইসলামের যা কিছু গোপন রেখেছিলেন সবই প্রকাশ করে দেন। প্রকাশ্যেই ইসলাম চর্চা করতে থাকেন। কায়স আর মোটেও বাধা দেননি। প্রতিবেশী ও বন্ধু-বান্ধবরা যখন তাঁকে বলতো, তুমিতো পৌত্তলিক ধর্মের উপর অটল আছ, কিন্তু তোমার স্ত্রী তো মুহাম্মাদের (সা) অনুসারী হয়ে গেছেন। তিনি বলতেন : আমি মুহাম্মাদকে কথা দিয়েছি যে, আমি আর তাকে কোন কষ্ট দেব না এবং তাকে দেওয়া কথা আমি রক্ষা করবো। কায়সের এ অঙ্গীকার পালন এবং স্ত্রীকে নির্যাতন না করার কথা রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে পৌছলে তিনি মন্তব্য করেন : (আরবী*********) অর্থাৎ কাঁচা-পাকা জোড়া ভ্রূ বিশিষ্ঠ লোকটি কথা রেখেছে। [উসুদুল গাবা-৫/৪৩১; নিসা‘মিন আসর আন-নুবুওয়াহ-৯৪]

এভাবে নির্বিঘ্নে হাওয়া ইসলামী জীবন যাপন করতে লাগলেন। এর মধ্যে রাসূল (সা) হিজরাত করে মদীনায় চলে আসলেন। হাওয়া আরো কিছু আনসারী মহিলাদের সাথে প্রথম পর্বেই রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট উপস্থিত হয়ে বাই‘আত সম্পন্ন করেন।

কায়স ইসলাম গ্রহণ করেননি। তবে হাওয়ার (রা) গর্ভে জন্ম নেওয়া তাঁর দুই ছেলে ইয়াযীদ ও ছাবিত- উভয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। উহুদ যুদ্ধে ইয়াযীদ রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে অংশগ্রহণ করেন এবং দেহের বারোটি স্থানে আঘাত পান। এদিন তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে তরবারি হাতে নিয়ে প্রচণ্ড যুদ্ধে লিপ্ত হন। তখন রাসূল (সা) তাঁকে ‘জাসির‘ নামে সম্বোধন করে নির্দেশ দিচ্ছিলেন এভাবে : (আরবী ************)- হে জাসির! সামনে এগিয়ে যাও। জাসির! পিছনে সরে এসো।

আবূ উবায়দার (রা) নেতৃত্বে পরিচালিত “জাসর“-এর যুদ্ধে এই ইয়াযীদ শাহাদাত বরণ করেন। [প্রাগুক্ত] আর ছাবিত, ইবন আবদিল বার “আল ইসতী‘আব“ গ্রন্থে বলেছেন, তাকে সাহাবীদের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি মু‘আবিয়ার (রা) খিলাফাতকালে ইনতিকাল করেন।[নিসা‘মিন আসর আন-নুবুওয়াহ-৯২]

উল্লেখ্য যে, কায়স ইবন খুতাইমের দুই বোন- লাইলা ও লুবনা ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট বাই‘আত করেন। হযরত হাওয়ার শেষ জীবন সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তিনি কখন, কোথায় এবং কিভাবে মারা গেছেন সে সম্পর্কে ইতিহাস নীরব। তাবে তিনি যে একজন ভালো মুসলমান হতে পেরেছিলেন, ইতিহাসের সকল সূত্র সে কথা বলেছে।[আল-ইসাবা-৪২৭৬]

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ