আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – ষষ্ঠ খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

শিফা বিনত আবদিল্লাহ (রা)


হযরত শিফা (রা) মক্কার কুরায়শ খান্দানের আদী শাখার কন্যা। ডাকনাম উম্মু সুলায়মান। পিতা আবদুল্লাহ ইবন আবদি শামস‘, মাতা একই খান্দানের আমর ইবন মাখযূম শাখার সন্তান ফাতিমা বিনত আবী ওয়াহাব। [উসুদুল গাবা-৫/৪৮৬; আল-ইসাবা ফী তাময়ীয আস-সাহাবা-৪/৩৩৩] আবূ হুছমা ইবন হুযায়ফা আল-আদাবীর সঙ্গে শিফার বিয়ে হয়।[তাবাকাত-৮/২৬৮; আল-ইসতী‘আব-৪/৩৩২] অনেকে বলেছেন, তাঁর আসল নাম লায়লা এবং পরবর্তীতে তাঁর প্রতি আরোপিত উপাধি আশ-শিফা নামে পরিচিতি লাভ করেন।[নিসা‘মিন আসর আন-নুবুওয়াহ, টীকা নং-১, পৃ. ১৫৯]

হিজরাতের পূর্বে মক্কাতেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং প্রথম পর্বে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাতকারী মহিলাদের মধ্যে তিনিও একজন।[আল-ইসাবা-৪/৩৩৩] যে সকল মহিলা সাহাবী রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট বাই‘আত করেন তিনি তাঁদের অন্যতম। [নিসা‘মিন আসর আন-নুবুওয়াহ, পৃ.১৫৯] হযরত রাসূলে কারীমের (সা) প্রতি ছির তাঁর গভীর ভক্তি ও ভালোবাসা। রাসূল (সা) ও তাঁর এ ভক্তি-ভালোবাসাকে অত্যাধিক গুরুত্ব দিতেন। তিনি মাঝে মাঝে শিফার গৃহে যেতেন এবং বিশ্রাম নিতেন। হযরত শিফা (রা) তাঁর গৃহে রাসূলের (সা) জন্য একটি বিছানা এবং এক প্রস্থ পরিধেয় বস্ত্র বিশেষভাবে রেখে দেন। রাসূল (সা) তা ব্যবহার করতেন। হযরত শিফার ইনতিকালের পর তাঁর সন্তানরা এসব জিনিস অতি যত্নের সাথে সংরক্ষণ করতে থাকেন। কিন্তু উমাইয় খলীফা মারওয়ান ইবন হাকাম (মৃ.৬৫হি.) তাদের নিকট থেকে সেগুলো ছিনিয়ে নেন। ফলে তা শিফার পরিবারের বেহাত হয়ে যায়। [তাহযীবুল আসমা ওয়াল লুগাত-২/৮৭; আল-ইসতি‘আব-৪/৩৫৮]

হযরত উমার (রা) শিফাকে বিশেষ মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতেন। তাঁর মতামতের অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন এবং তাঁর প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধার ভাব পোষণ করতেন। তিনি শিফার বাজার পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার কিছু দায়িত্ব প্রদান করেন। [জামহারাতুল আনসাব আল-আরাব-১/১৫০; আল-ইসাবা-৪/৩৩৩]

হযরত রাসূলে কারীম (সা) তাঁকে একটি বাড়ী দান করেন। সেই বাড়ীতে তিনি ছেলে সুলায়মানকে নিয়ে বাস করতেন। [নিসা‘মিন আসর আন-নুবুওয়াহ-পৃ.১৬১]

একবার খলীফা হযরত উমার (রা) তাঁকে ডেকে এনে একটি চাদর দান করেন। ঠিক সে সময় উপস্থিত আতিকা বিনত উসাইদকেও অপেক্ষাকৃত একটি ভালো চাদর দান করেন। অভিযোগের সুরে শিফা খলীফাকে বলেন : আপনার হাত ধুলিমলিন হোক! আপনি তাকে আমার চাদরের চেয়ে ভালো চাদর দান করেছেন। অথচ আমি তার আগে মুসলমান হয়েছি এবং আমি আপনার চাচাতো বোন। তাছড়া আমি এসছি, আপনি ডেকে পাঠিয়েছেন, তাই। আর সে নিজেই চলে এসেছে। জবাবে উমার (রা) বললেন : আমি তোমাকে ভালো চাদরটি দিতাম; কিন্তু সে এসে পড়ায় তাঁকে প্রাধান্য দিতে হয়েছে। কারণ বংশগত দিক থেকে সে রাসূলুল্লাহর (সা) অধিকতর নিকটবর্তী। [আল-ইসতী‘আব-৪/৩৫৮; উসুদুল গাবা-৫/৪৯৭; সাহাবিয়াত, পৃ.২৪০]

হযরত শিফাও ছিলেন হযরত উমারের (রা) গুণমুগ্ধা। সময় ও সুযোগ পেলেই উমারের (রা) আদর্শ মানুষের সামনে তুলে ধরতেন। যেমন, একদিন তিনি কয়েকজন যুবককে তাঁর সামনে দিয়ে অত্যন্ত ধীরগতিতে চাপাস্বরে কথা বলতে বলতে যেতে দেখে প্রশ্ন করলেন এদের অবস্থা এমন হয়েছে কেন? লোকেরা বললো : এরা আবিদ- আল্লাহর ইবাদতে মশগুল ব্যক্তিবর্গ। হযরত শিফা (রা) একটু রাগত স্বরে বললেন : (আরবী***********) [তারীখ আত-তাবায়ী-২/৫৭১; তাবাকাত-৩/২৯০]

“আল্লাহর কসম! উমার যখন কথা বলতেন, উচ্চস্বরে বলতেন, যখন হাঁটতেন, দ্রুতগতিতে হাঁটতেন, যখন কাউকে মারতেন, অত্যন্ত ব্যথা দিতেন। আল্লাহর কসম! তিনিই সত্যিকারের আবিদ।“

হযরত উমার (রা) হযরত শিফার (রা) সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য মাঝে মাঝে তাঁর বাড়ীতে যেতেন, তাঁর খোঁজ-খবর নিতেন। স্বামী-সন্তানদের কুশল জিজ্ঞাসা করতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদেরকে পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিতেন। শিফা (রা) বলেন : একদিন উমার (রা) আমার গৃহে এসে দু‘জন পুরুষ লোককে ঘুমিয়ে থাকতে দেখেন। উল্লেখ্য যে, লোক দু‘জন হলেন তাঁর স্বামী ও ছেলে সুলায়মান। উমার প্রশ্ন করলেন : এদের ব্যাপারটি কি? এরা কি সকালে আমাদের সাথে জামা‘আতে নামায পড়েনি? বললাম : হে আমীরুল মু‘মিনীন! তারা জামা‘আতে নামায পড়েছে। সারা রাত নামায পড়ে সকালে ফজরের নামায জামা‘আতে আদায় করে ঘুমিয়েছে। উল্লেখ্য যে, তখন ছিল রমাদান মাস। উমার বললেন : সারা রাত নামায পড়ে ফজরের জামা‘আত ত্যাগ করার চেয়ে ফজরের নামায জামা‘আত আদায় করা আমার অধিক প্রিয়। [কানয আল-উম্মাল-৪/২৪৩; হায়াতুস সাহাবা-৩/১২৩]

তিনি কিছু ঝাড়ফুঁক ও লিখতে জানতেন। জাহিলী যুগে এ দুটি বিষয় অত্যন্ত সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা হতো। একবার তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট আসেন এবং বিনয়ের সাথে বলেন, জাহিলী জীবন আমি কিছু ঝাড়ফুঁক জানতাম। আপনি অনুমতি দিলে শোনাতে পারি। রাসূল (সা) অনুমতি দেন এবং তিনি সেই মন্ত্র শোনেন। রাসূল (সা) বলেন, তুমি এই মন্ত্র দিয়ে ঝাড়ফুঁক চালিয়ে যেতে পার। হাফসাকেও (উম্মুল মু‘মিনীন) শিখিয়ে দাও।

অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (সা) তাঁকে বলেন : (আরবী**************)

“তুমি নামলার মন্ত্র হাফসাকে শিখিয়ে দাও, যেমন তাকে লেখা শিখিয়েছো।“ এ বর্ণনা দ্বারা জানা যায়, তিনি হযরত হাফসাকে (রা) লেখা শিখিয়েছিলেন।[আল-ইসাবা-৪/৩৩৩] উল্লেখ্য যে, আধুনিককালের চিকিত্সাবিদদের মতে “নামলা“ একজিমা ধরণের এক প্রকার চর্মরোগ।[আ‘লাম আন-নিসা -২/২০১] রাসূলুল্লাহর (সা) অনুমতি পেয়ে তিনি সেই মন্তর মহিলাদেরকে শেখাতেন।[নিসা‘মিন আসর আন-নুবুওয়াহ, পৃ.১৬০]

হযরত শিফা (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে সরাসরি এবং উমার (রা) থেকে কয়েকটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁর থেকে যাঁরা বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে তাঁর পুত্র সুলায়মান, পৌত্র আবূ সালামা আবূ বকর ও উছমান এবং আবূ ইসহাক ও উম্মুল মু‘মিনীন হযরত হাফসা (রা) বিশেষ উল্লেখযোগ্য।[তাহযীবুত তাহযীব-১২/৪২৮; আল-ইসতী‘আব-৪/৩৩৩] তার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা-১২ (বারো)।[আল-ইসাবা-৪/৩৩৩]

তাঁর দুই সন্তানের কথা জানা যায়- পুত্র সুলায়মান এবং এক কন্যা-যিনি শুরাহবীল ইবন হাসানার (রা) স্ত্রী ছিলেন। সুলায়মান ছিলেন একজন জ্ঞানী ধর্মপরায়ণ সজ্জন ব্যক্তি। মুসলিম মনীষীদের মধ্যে তিনি এক বিশেষ মর্যাদার অধিকারী।[তাবাকাত-৮/২৬৮]

হযরত শিফার (রা) মৃত্যসন জানা যায় না। তবে অনেকে হযরত উমারের (রা) খলাফতেকালে হিজরী ২০ সনের কাছাকাছি কোন এক সময়ের কথা বলেছেন। [আ‘লাম আন-নিসা-২/১৬৩]

হযরত শিফার বর্ণিত একটি অন্যতম হাদীস হলো : (আরবী************) [উসুদুল গাবা-৫/৪৮৭; আল-ইসাবা-৪/৩৩৩]

“রাসূলুল্লাহকে (সা) সর্বোত্তম আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাস করা হলো। তিনি বললেন : আল্লাহর উপর ঈমান, আল্লাহর হথে জিহাদ এবং হজ্জে মাবরূর বা আল্লাহর নিকট গৃহীত হজ্জ।“

তাবারানী ও বায়হাকী হযরত শিফার (রা) একটি চমকপ্রদ হাদীস বর্ণনা করেছেন। শিফা (রা) বলেন : আমি একদিন রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট গেলাম এবং কিছু সাদাকার আবেদন জানালাম। তিনি অক্ষমতা প্রকাশ করে চললেন, আর আমিও চাপাচাপি করতে লাগলাম। এর মধ্যে নামাযের সময় হয়ে গেল। আমি বেরিয়ে আমার মেয়ের ঘরে গেলাম। মেয়ের স্বামী ছিল শুরাহবীল ইবন হাসানা। আমি এ সময় শুরাহবীলকে ঘরে দেখে বললাম : নাময শুরু হতে চলেছে, আর তুমি এখন ঘরে? আমি তাকে তিরস্কার করতে লাগলাম। সে বললো : খালা! আমাকে তিরস্কার করবেন না। আমার একখানা মাত্র কাপড়, তাও রাসূল (সা) ধার নিয়েছেন। আমি বললাম : আমি যাকে তিরস্কার করছি তার এই অবস্থা, অথচ আমি তার কিছুই জানিনা। শুরাহবীল বললো : আমার একখানা মাত্র তালি দেয়া কাপড় আছে।[কানয আল-উম্মাল-৪/৪১; হায়াতুস সাহাবা-১/৩২৬]

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ