আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – ষষ্ঠ খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

হামনা বিনত জাহাশ (রা)


হযরত হামনা (রা) হযরত রাসূলে কারীমের (সা) নিকটাত্মীয়া। রাসূলুল্লাহর (সা) মুহতারামা ফুফু উমাইমা বিনত আবদিল মুত্তালিবের কন্যা। তিনি একদিকে যেমন রাসূলুল্লাহর (সা) ফুফাতো বোন, অন্যদিকে শালীও। উম্মুল মু‘মিনীন হযরত যায়নাব বিনত জাহাশের সহোদরা।[আনসাবুল আশরাফ-১/২৩১; নিসাউন মবাশশারাত বিল জান্নাহ-১/২৪৩] মদীনায় প্রেরিত রাসূলুল্লাহর (সা) প্রথম দূত ও দা‘ঈ (ইসলাম প্রচারক) প্রখ্যাত সাহাবী মুস‘আব ইবন উমাইর (রা) তাঁর প্রথম স্বামী। [জামহারাতুল আনসাব আল-আরাব-১/১৯১; তাবাকাত-৮/২৪১; আল-ইসতী‘আব-৪/২৬২]

হযরত হামনার (রা) স্বামী মুস‘আব ইবন উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার বিত্তবান পরিবারের এক সুদর্শন যুবক। তাঁর মা খুনাস বিনত মালিকের ছিল প্রচুর সম্পদ। শৈশব থেকে তিনি প্রাচুর্যের মধ্যে বেড়ে ওঠেন। মা তাঁকে সবসময় দামী দামী পোশাক-পরিচ্ছদে সাজিয়ে রাখতো। মক্কায় তাঁর চেয়ে দামী সগন্ধি আর কেউ ব্যবহার করতো না। পায়ে পরতেন হাদরামাউতের জুতো। পরবর্তীকালে রাসূল (সা) মুস‘আবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলতেন : (আরবী*************)

“আমি মুস‘আবের চেয়ে চমত্কার জুলফী, অধিকতর কোমল চাদরের অধিকারী এবং বেশী বিলাসী মক্কায় আর কাউকে দেখিনি।“

এই যুবক যখন শুনলেন রাসূল (সা) আল-আরকাম ইবন আবিল আরকামের গৃহে অবস্থান করে গোপনে মানুষকে ইসলামের দা‘ওয়াত দিচ্ছেন তখন একদিন সেখানে হাজির হলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করলেন। সেখান থেকে তিনি হলেন মাদরাসায়ে নববীর ছাত্র। নবীর (সা) প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে লাভ করেন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। খুব অল্প সময়ের মধ্যে স্বীয় শিক্ষকের এমন আস্থা অর্জন করেন যে, তিনি তাঁকে দূত ও দা‘ঈ হিসেবে মদীনায় পাঠান। এভাবে তিনি হলেন ইসলামের ইতিহাসের প্রথম দূত ও দা‘ঈ। [নিসা‘মিন আসর আন-নুবুওয়াহ পৃ.৫০]

মক্কায় ইসলামের প্রথম পর্বে যে সকল মহিলা ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহর (সা) সুহবত বা সাহচার্য লাভের গৌরব অর্জন করেন হামনা তাঁদের একজন। হামনার গোটা পরিবারই ছিলো মুসলমান। মক্কায় তাঁদের উপর কুরায়শদের অত্যাচার মাত্রাছাড়া রূপ ধারণ করলে তাঁরা নারী-পুরুষ সকলে মদীনায় হিজরাত করেন। হিজরাতকারী পুরুষরা হলেন : আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ, তাঁর ভাই আবূ আহমাদ, উকাশা ইবন মিহসান, শুজা’, উকবা, ওয়াহাবের দুই পুত্র, আরবাদ এবং নারীরা হলেন : যয়নাব বিনত জাহাশ, উম্মু হাবীবা বিনত জাহাশ, জুযামা বিন জানদাল, উম্মু কায়স বিনত মিহসান, উম্মু হাবীব বিনত ছুমামা, উমাইয়া বিনত রুকাইস, সাখবার বিনত তা‘মীম ও হামনা বিনত জাহাশ (রা)।[সীরাতু ইবন হিশাম-১/৪৭২; দাররুস সাহাবা-৫৫৬]

মদীনায় আসার পর হযরত হামনা (রা) অন্য ঈমানদার মহিলাদের তম আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আত্মনিয়োগ করেন। নবী (সা) ও স্বামীর নিকট থেকে ইসলামী জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে আরো শিক্ষিত করে তোলেন। নিজের নৈতিক মান আরো উন্নত করেন। ফলে মদীনার সমাজে তাঁরা একটি সম্মানজনক মর্যাদার আসন লাভ করেন। এখানে তাঁদের কন্যা সন্তান যয়নাব বিনত মুস‘আব জন্মগ্রহণ করে। [তাবাকাত-৩/১১৬; আনসাবুল আশরাফ-১/৪৩৭]

হযরত রাসূলে কারীমের (সা) মাদানী জীবন যখন প্রতিপক্ষের সাথে যুদ্ধ-বিগ্রহ ও দ্বন্দ্ধ-সংঘাত আরম্ভ হয় তখন হামনার (রা) ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রশংসিত ও আদর্শমানের। উহুদ যুদ্ধে হামনা (রা) আরো কিছু মুসলিম মহিলাদের সঙ্গে মুজাহিদদের সাথে যোগ দেন। সেদিন তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ যুদ্ধের একজন সৈনিক, প্রত্যক্ষদর্শী হযরত কা‘ব ইবন মালিক (রা) বলেন : “আমি উহুদের যুদ্ধের দিন উম্মু সুলাইম বিনত মিলহান ও উম্মুল মু‘মিনীন আয়িশাকে (রা) নিজ নিজ পিঠে পানির মশক ঝুলিয়ে বহন করতে দেখেছি। হামনা বিনত জাহাশকে দেখেছি তৃষ্ণার্তদের পানি পান করাতে এবং আহতদের সেবা করতে। আর উম্মু আয়মানকে দেখেছি আহতদের পানি পান করাতে।“[আল-ওয়াকিদি, আল-মাগাযী-১/২৪৯, ২৫০; দাররুস সাহাবা-৫৫৬]

উহুদ যুদ্ধে মুস‘আব ইবন উমাইর (রা) সহ সত্তরজন মুসলিম মুজাহিদ শহীদ হন। যুদ্ধ শেষে হামনা (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট যান। রাসূল (সা) তাঁকে বলেন : হামনা! হিসাব কর। হামনা : কাকে? রাসূল (সা) : তোমার মামা হামযাকে। হামযা : (আরবী**********) আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করুন, তার প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ বর্ষণ করুন এবং তাঁকে জান্নাত দান করুন!

নবী (সা) আবার বললেন : আরেকজনকে গণনা কর।

হামনা : কাকে?

নবী (সা) : তোমার স্বামী মুস‘আব ইবন উমাইরকে।

হামনা জোরে একাট চিত্কার দিয়ে বলে উঠলেন : হায় আমার দুখ!

তাঁর এ অবস্থা দেখে রাসূল (সা) মন্তব্য করেন : “নারীর হ্রদয়ে স্বামীর অবস্থান এমন এক স্থানে যা অন্য কারো জন্য নেই।“ এ মন্তব্য তখন করেন যখন তিনি দেখেন, হামনা তাঁর মামা ও ভাইয়ের মৃত্যুতে অটল কয়েছেন, কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর কথা শুনে ভেঙ্গে পড়েছেন।

রাসূল (সা) হামনাকে জিজ্ঞাস করেন : তোমার স্বামীর মৃত্যুর কথা শুনে এমন আচরণ করলে কেন? হামনা বললেন : তাঁর সন্তানদের ইয়াতীম হওয়ার কথা মনে হল এবং আমি শঙ্কিত হয়ে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেললাম। [সীরাত ইবন হিশাম-২/৯৮; আনসাবুল আশরাফ-১/৪৩৮]

রাসূর (সা) হামনার জন্য দু‘আ করলেন, আল্লাহ যেন তাঁর সন্তানদের জন্য মুস‘আবের স্থলে ভালো কাউকে দান করেন। অতপর হামনা (রা) প্রখ্যাত সাহাবী হযরত তালহা ইবন উবাইদুল্লাহকে (রা) বিয়ে করেন। উল্লেখ্য যে, এই তালহা হলেন, জীবদ্দশায় যে দশজন জান্নাতের সুসংবাদ লাভ করেছেন তাদের অন্যতম। এই তালহার ঔরসে হামনা জন্ম দেন ছেলে মুহাম্মাদ ইবন তালহাকে। হামনার (রা) সন্তানদের প্রতি তিনি ছিলেন দারুণ স্নেহশীল। [আল-ইসাবা-২/২২১; আনসাবুল আশরাফ-১/৮৮; সুনান আবী দাউদ, হাদীস নং-১৫৯০]

উহুদ পরবর্তী যুদ্ধেসমূহে হামনা (রা) যোগদান করতে থাকেন। খায়বারেও তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সংগে যান এবং বিজয়ের  পর সেখানে উত্পাদিত ফসল থেকে তিরিশ ওয়াসাক রাসূল (সা) তার জন্য নির্ধারণ করে দেন।[তাবাকাত-৮/২৪১; সীরাত ইবন হিশাম-২/৩৫২]

হযরত হামনার (রা) ছেলে মুহাম্মাদ ইবন তালহার জন্মের পর তিনি তাকে কোলে করে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট নিয়ে যান এবং আবেদন করেন : ইয়া রাসূলুল্লাহ! এর একটা নাম রেখে দিন। রাসূল (সা) তার মাথায় হাত বুলিয়ে নাম মুহাম্মাদ এবং ডাকনাত আবুল কাসিম রাখেন। রাশিদ ইবন হাফস আয-যুহরী বলেন, আমি সাহাবীদের ছেলেদের কেবল চারজনকে পেয়েছি যাঁদের প্রত্যেকের নাম মুহাম্মাদ এবং ডাকনাম আবুল কাসিম। তাঁর হলেন : ১. মুহাম্মাদ ইবন আবী বকর (রা), ২.মুহাম্মাদ ইবন আলী ইবন আবী তালিব (রা), ৩. মুহাম্মাদ ইবন সা‘দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা), ৪. মুহাম্মাদ ইবন তালহা (রা)। [আল-ইসাবা-৩/৩৫৭]

হযরত হামনার (রা) ছেলে এই মুহাম্মাদ ইবন তালহা উত্তরকালে একজন দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ত ও সত্যনিষ্ঠ আবেদ ব্যক্তিতে পরিণত হন। অতিরিক্ত সিজদাবনত থাকার কারণে তাঁর উপাধি হয় ‘সাজ্জাদ‘। হিজরী ৩৬ সনের জামাদি-উল-আওয়াল মাসে উটের যুদ্ধে পিতা তালহার সাথে শাহাদাত বরণ করেন। তালহার (রা) ঔরসে হামনা (রা) আরেকটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। তার নাম ‘ইমরান ইবন তালহা (রা)। [তাবাকাত-৫/১৬৬; জামহারাতু আনসাব আল-আরাব-১/১৩৮; আনসাবুল আশরাফ-১/৪৩৭]

হযরত হামনার (রা) মহত্ব ও মর্যাদা অনেক। তিনি হযরত নবী কারীম (সা) থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর থেকে তাঁর পুত্র ইমরান ইবন তালহা বর্ণনা করেছেন। তিনি ছিলেন উম্মুল মু‘মিনীন হযরত যয়নাবের বোন। বর্ণিত হয়েছে, যয়নাবের (রা) জীবন সন্ধা ঘনিয়ে এলে বোন হামনাকে (রা) বলেন : আমি আমার কাফন প্রস্তুত করে রেখেছি। আমার মৃত্যুর পর খলীফা উমার (রা) আমার কাফন পাঠাতে পারেন। যদি পাঠান, তুমি যে কোন একটি সাদাকা করে দিও। যয়নাব (রা) মারা গেলেন। উমার (রা) পাঁচ প্রস্থ কাপড় পাঠালেন। সেই কাপড় দ্বারা তাঁকে কাফন দেওয়া হয়। আর যয়নাবের (রা) প্রস্তুতকৃত কাপড় হামনা সাদাকা করে দেন।[আনসাবুল আশরাফ-১/৪৩৫; আল-ইসাবা-৪/৩০৮] এ ঘটনা ইঙ্গিত করে যে, হযরত হামনা (রা) হিজরী ২০ (বিশ) সনের পরেও জীবিত ছিলেন। কারণ উম্মুল মু‘মিনীন হযরত যয়নাবের (রা) ইনতিকাল হয় হিজরী বিশ সনে। [নিসা‘মিন আসর আন-নুবুওয়াহ-৫৪] আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) আনুগত্যসহকারে ইবাদাত-বন্দেগীর মাধ্যমে এক প্রশংসিত জীবন-যাপন করে তিনি পরলোকে যাত্রা করেন।

উম্মুল মু‘মিনীন হযরত আয়িশার (রা) পূতপবিত্র চরিত্রে কলঙ্ক আরোপের ঘটনায় যারা বিভিন্নভাবে জড়িত পড়েছিলেন তারা হলেন আবদুল্লাহ ইবন উবায়, যায়দ ইবন রিফা‘আ, মিসতাহ ইবন উছাছা, হাসসান ইবন ছাবিত ও হামনা বিনতে জাহাশ। এদের মধ্যে প্রথম দুইজন মুনাফিক এবং অপর তিনজন মু‘মিন। মু‘মিন তিনজন নিজেদের কিছু মানবিক দুর্বলাতা ও ভ্রান্তিবশত এই ফিতনায় জড়িয়ে পড়েছিলেন।[তাফহীমুল কুরআন, খণ্ড ৩, সূরা আন-নূর, পৃ.১৩৮; হায়াতুস সাহাবা-১/৫৮৮]

হযরত আয়িশার (রা) পবিত্রাতা ঘোষণা করে আল কুরআনের আয়াত নাযিল হওয়ার পর রাসূল (সা) এদের সকলকে মিথ্যা কলঙ্ক আরোপের নির্ধারিত শাস্তি প্রদান করেন। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৪/১৬০; আনসাবুল আশরাফ-১/৩৪৩; হায়াতুস সাহাবা-১/৫৯০] হযরত হামনার (রা) এমন কর্মে জড়িত হওয়ার কারণ সম্পর্কে হযরত আয়িশা (রা) বলেন, যেহেতু আমার সতীনদের মধ্যে একমাত্র তাঁর বোন যয়নাব ছাড়া আর কেউ আমার সমকক্ষতার দাবীদার ছিলেন না, তাই তিনি তাঁর বোনের কল্যাণের উদ্দেশ্যে আমার প্রতিপক্ষের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন এবং ফিতনায় জড়িয়ে পড়েন। [সীরাতু ইবন হিশাম-২/৩০০]

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ