আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – ষষ্ঠ খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

কবি হিসেবে হযরত খানসার (রা) স্থান


আরবী কবিতায় প্রায় সকল অঙ্গনে খানসার (রা) বিচরণ দেখা যায়। তবে মরসিয় রচনায় তার জুড়ি মেলা ভার। আল্লামা ইবনুল আসীর লিখেছেন : আরবী **************) [উসুদুল গাবা-৫/৪৪১]

“আরবী কাব্যশাস্ত্রের পণ্ডিতরা এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে, খানসার পূর্বে ও পরে তাঁর চেয়ে বড় কোন মহিলা কবির জন্ম হয়নি।“

উমাইয়্যা যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আরব কবি জারীর (মৃত্যু-১১০ হি.)। একবার তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল : আরবের শ্রেষ্ঠ কবি কে? জবাবে তিনি বলেছিলেন : আরবী**********)[দুররুল মানছুর-১১০]

“যদি খানসা থাকতেন তাহলে আমিই।“

বাশশার বিন বুরদ ছিলেন আব্বাসী যুগের একজন শ্রেষ্ঠ আরব কবি। তিনি বলেন : আমি যখন মহিলা কবিদের কবিতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি তখন তাদের প্রত্যেকের কবিতায় একটা না একটা ত্রুটি ও দুর্বলতা প্রত্যক্ষ করি। লোকেরা প্রশ্ন করলো: খাসার কবিতারও কি একই অবস্থা? বললেন : তিনি তো পুরুষ কবিদেরও উপরে। [তাবাকাত আশ-শু‘আরাউ-২৭১]

সকল আরব কবি উমাইয়্যা যুগের লায়লা উখাইলিয়্যাকে একমাত্র খানসা (রা) ছাড়া আরব মহিলা কবিদের মাথার মুকুট জ্ঞান করেছেন। আধুনিক যুগের মিসরীয় পণ্ডিত ড: উমার ফাররূখ হযরত খানসার কাব্য প্রতিভা ও তাঁর কবিতার মূল্যায়ন করেছেন এভাবে : [তারীখ আল-আদাব আল-আরাবী-১/৩১৮]

(আরবী ******************)

“খানসা সার্বিকভাবে শ্রেষ্ট আরব কবি। তাঁর কবিতা সবই খণ্ড খণ্ড। অত্যন্ত, বিশুদ্ধ, প্রাঞ্জল, সূক্ষ্ম, শক্ত গঠন ও চমত্কার ভূমিকা সম্বলিত। তার কবিতায় গৌরব‘ গাথার প্রাধান্য অতি সামান্য। যতটুকু আমরা দেখেছি, বিশেষত তার দুই ভাইয়ের মৃত্যুতে তিনি যে দুখসহ ব্যথা পান সেজন্য মরসিয়ার প্রাধান্য অনেক বেশী। তার মরসিয়ার অর্থ স্পষ্ট, সূক্ষ্ম ও কোমল এবং আবেগ-অনুভূতির সঠিক মুখপত্র। তাতে অত্যাধিক দুখ্য ও পরিতাপ এবং দুই ভাইয়ের প্রশংসায় অতিরঞ্জন থাকা সত্ত্বেও তা বেদুঈন পদ্ধতি ও স্টইলের।“

জাহিলী যুগে সমগ্র আরবের বিভিন্ন স্থানে মেলা প্রদর্শনী ও সভা-সমাবেশ করার রীতি ছিল। এর উদ্দেশ্য হতো পরস্পর মত বিনিময়, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতা। এতে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষ  অংশ গ্রহণ করতো। সমগ্র আরববাসী দূর দূরান্ত থেকে এসব মেলায় ছুটে আসতো। এর সূচনা হতো রাবীউল আউয়াল মাস থেকে। এ মাসের প্রথম দিন দুমাতুল জান্দালে বছরের প্রথম মেলা বসতো। এই মেলা শেষ করে তারা হিজরের বাজারে চলে যেত। তারপর উমানে, সেখান থেকে হাদারামাউতে। তারপর  ইয়ামেনের সান‘আর আশে-পাশে কোথাও দশ, আবার কোথাও বিশ অবস্থান কারতো। এভাবে গোটা আরব ঘোরার পর হজ্জের কাছাকছি সময়ে জুলকা‘দা মাসে মক্কার কয়েক মাইল দূরে উকাজের [উকাজ: নাখলা ও তায়িফের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। সেখানে সাধারণভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যের বাজার বসতো। ৫৪০ খ্রীষ্টাব্দে এ বাজারের পত্তন হয় এবং হিজরী ১২৯ সনে খারেজিদের দ্বারা লুণ্ঠিত হওয়ার সময় পর্যন্ত চালু ছিলো। (ড: আবদুল মুন‘ইম খাফাজী ও ড: সালাহ উদ্দিন আবদুত তাওয়াব : আল-হায়াত আল-আদাবিয়্যা ফী আসরায় আল-জাহেলিয়্যা ওয়া সাদরিল ইসলাম- পৃ. ২৮) তারপর খারেজীদের ভয়ে সেই যে উকাজের মেলা বন্ধ হয়ে যায়, আজ পর্যন্ত আর চালু হয় নি। উকাজের পর আরবের মাজান্না ও জুলমাযায়ের মত প্রাচীন বাজারও ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। মক্কার এ জাতীয় সর্বশেষ বাজারটি ধ্বংস করা হয় ১৯৭ হিজরীতে। (আল-আযরুকী : আখবারু মক্কাহ-১২১-২২)] ] বাজারে বছরের সর্বশেষ মেলা বসতো। এ মেলাটি ছিলো আরবের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ। আরবের সকল গোত্রের লোক, বিশেষত গোত্র নেতারা এ মেলায় অবশ্যই যোগদান করতো। কোন গোত্র নেতা কোন কারণে অংশ গ্রহণ করতে না পারলে প্রতিনিধি পাঠাতো। এ মেলার অঙ্গনে আরববাসী তাদের গোত্রীয় নেতা নির্বাচন, আন্ত-গোত্র কলহের মীমাংসা, পারস্পরিক হত্যা ও সংঘাতের অবসান ইত্যাদি বিষয়ের চূড়ান্ত করতো। এই মেলায় মক্কার কুরাইশ গোত্রের সম্মান ও মর্যাদা ছিল সবার উপরে। যখন যাবতীয় বিষয়ের নিষ্পত্তি হয়ে যেত তখন প্রত্যেক গোত্রের কবিরা তাদের স্বরচিত কবিতা পাঠ করে শোনাতো। সেসব কবিতার বিষয় হতো বীরত্ব, সাহসিকতা, দানশীলতা, অতিথি সেবা, পূর্ব-পুরুষের শৌর্য-বীর্য, গৌরব, শিকার, আনন্দ-উত্সব, খুন-খারাবি, যুদ্ধ-বিগ্রহ, শান্তি-সন্ধি, প্রেম-বিরহ, শোক ইত্যাদির বর্ণনা। এখানেই নির্ধারিত হতো আরব কবিদের স্থান ও মর্যাদা।

কবি খানসাও এ সকল মেলা ও সমাবেশে অংশগ্রহণ করতেন এবং উকাজ তার মরসিয়া অপ্রতিদ্বন্দী বলে স্বীকৃতি পায়। তিনি যখন উটের উপর সাওয়ার হয়ে আসতেন তখন অন্য কবিরা তার চার পাশে ভিড় জমাতো। সবাই তার কবিতা শোনার জন্য অধীর অপেক্ষায় থাকতো। এক সময় সকলকে মরসিয়া শুনিয়ে তৃপ্ত করতেন।

এ সকল মজলিসে খানসার বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানের প্রতীক হিসেবে তার তাঁবুর দরজায় একটি পতাকা উড়িয়ে দেওয়া হতো, আর তাতে লেখা থাকতো-(আরবী*****) কথাটি। যার অর্থ আরবের শ্রেষ্ট মরসিয়া রচয়িতা। ইবন কুতায়বা বলেন : (আরবী*******) [আশ-শিরু ওয়াশ শুয়ারাউ-১৬১; সিফাতু জাযীরাতুল আরাব-২৬৩]

তিনি এসব মৌসুমী মেলায় অবস্থান করতেন। তার হাওদাটি বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হতো। তার পিতা আমর এবং দুই ভাই- সাখর ও মুয়াবিয়ার মৃত্যুর বিপদটিকে আরববাসী খুব বড় করে দেখতো। তিনি কবিতা পাঠ করতেন, আর লোকেরা কাঁদতো।“ জাহিলী আরবে বহু বড় বড় কবি জন্মেছিলেন। আন-নাবিগা আজ-জুরইয়ানী (মৃত্যু ৬০৪ খ্রি) সেই সব বড় কবিদের একজন। তার কাব্যখ্যাতি আজও বিশ্বব্যাপী। তার আসল নাম যিয়াদ ইবন মু‘আবিয়া এবং ডাকনাম আবূ উমামা। আবূ উবায়দা তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন : (আরবী ***************) [সাহাবিয়াত-১৮৬]

“সকল কবির পুরোভগে অবস্থানকরী প্রথম স্তরের অন্যতম কবি তিনি।“ উন্নত মানের প্রচুর কবিতা রচনার কারণে তাঁকে আন-নাবিগা বলা হয়। উকাজ মেলায় কেবল তাঁরই জন্য লাল তাঁবু নির্মান করা হতো। এ ছিল একটি বিরল সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক, যা কেবল তিনি লাভ করার যোগ্য বলে ভাবা হতো। অন্য কারও জন্য এমন লাল তাঁবু নির্মান করা যেত না। এর কারণ, কাব্য ক্ষেত্রে যিনি সর্বজনমান্য, কেবল তিনিই এ মর্যাদা লাভের যোগ্য বলে বিবেচিত হতেন। ইবন কুতায়বা বলেন : (আরবী *****) [আস-শিরু ওয়াশ শু‘আরাউ-১৬০]

“আন-নাবিগার জন্য উকাজে লাল রঙ্গের চামড়ার তাঁবু টাঙ্গানো হতো। সেই তাঁবুতে কবিরা এসে তাকে কবিতা শোনাতো।“

উকাজের মেলা উপলক্ষে কবি আন-নাবিগার সভাপতিত্ব কবি সম্মেলন হতো। আরবের বড় বড় কবিগণ এ সম্মেলনে যোগ দিতেন এবং নিজ নিজ কবিতা পাঠ করে স্বীকৃতি লাভ করতেন। একবার এমনি এক সম্মেলনে তত্কালীন আরবের শ্রেষ্ঠ তিন কবি- আল-আ‘শা আবূ বাসীর, হাসসান ইবন ছাবিত ও খানসা যোগ দেন। প্রথমে আল-আ‘শা, তারপর হাসসান কবিতা পাঠ করেন। সবশেষে পাঠ করেন খানসা। তার পাঠ শেষ হলে সভাপতি আন-নাবিগা তাকে লক্ষ করে বলেন : (আরবী ***********)

“আল্লাহর কসম! এই একটু আগে যদি আবূ বাসীর আমাকে তার কবিতা না শোনাতেন তাহলে আমি বলতাম, জিন ও মানুষের মধ্যে তুমিই সর্বশ্রেষ্ঠ কবি।“

আন-নাবিগার এ মন্তব্য শুনে কবি হাসসান দারুণ ক্ষুব্দ হন। তিনি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এভাবে- আল্লাহর কসম! আমি আপনার চেয়ে এবং আপনার পিতা ও পিতামহের চেয়েও বড় কবি। আন-নাবিগা হাসসানের হাত চেপে ধরে বলেন: ভাতিজা তুমি আমার এ শ্লোকটির চেয়ে ভাল কোন শ্লোক বলতে পারবে কি? (আরবী***********)

নিশ্চয় তুমি সেই রাত্রির মত, যে রাত্রি আমাকে ধারণ করে। ‍যদিও আমি ধারণা করেছি, তোমার থেকে আমার দূরত্ব অনেক ব্যাপক।“ অর্থৎ রাত্রির মত তুমি আমাকে বেষ্টন করে আছ – তা আমি যত দূরেই থাকি না কেন। তারপর তিনি খানসাকে বলেন : তাকে আবৃত্তি করে শোনাও।“খানসা তার আরো কিছু শ্লোক আবৃত্তি করেন। তারপর আন-নাবিগা মন্তব্য করেন : (আরবী ****)

“আল্লাহর কসম! আমি দুই স্তনবিশিষ্ট কাউকে তোমার চেয়ে বড় কবি দেখিনি। অর্থাৎ তোমার চেয়ে বড় কোন মহিলা কবিকে দেখিনি।“ সাথে সাথে খানসা আন-নাবিগার কথার সংশোধনী দেন এভাবে- (আরবী************)

“না, আল্লাহর কসম! দুই অণ্ডকোষধারীদের মধ্যেও না।“ অর্থাৎ কেবল নারীদের মধ্যে নয়, বরং পুরুষদের মধ্যেও আপনি আমার চেয়ে বড় কবি দেখেননি। [আবুল ফারাজ আল-ইসফাহানী : কিতাবুল আগানী-১১/৬; আশ-শিরু ওয়াশ শুয়ারাউ-১৬০]

কোন কোন বর্ণনায় এসেছে আন-নাবিগার প্রশ্নের জবাবে হাসসান তাঁর নিম্নের শ্লোকটি পাঠ করে শোনান : আরবী ********)

“আমাদের কাছে বড় বড় স্বচ্ছ ও ঝকঝকে বরতন, পূর্বাহ্ন বেলায় যা চকচক করতে থাকে। আর আমাদের তরবারিসমূহ এমন যে তার হতল থেকে ফোটা ফোটা রক্ত ঝরতে থাকে।“কবি হাসসান তাঁর শ্লোকে নিজের অতিথি সেবা এবং বীরত্ব ও সাহসিকতার কথা বলতে চেয়েছেন। কিন্তু কবি আন-নাবিগা মতান্তরে খানসা হাসসানের শ্লোকটির কঠোর সমালোচনা করে তার ত্রুটিগুলি তুলে ধরেন এবং তাঁর দাবী প্রত্যাখ্যান করেন। [কাদুমা ইবন জা‘ফার : নাকদুশ শি‘র-পৃ. ৬২; আল-আগানী-৯/৩৪০]

মোটকথা, কাব্য শক্তি ও প্রতিভার দিক দিয়ে হযরত খারসার (রা) স্থান দ্বিতীয় স্তরের তত্কালীন আরব কবিদের মধ্যে অনেক উঁচুতে। তার কবিতার একটি ‍দিওয়ান ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দে বৈরুতের একটি প্রকাশনা সংস্থা সর্বপ্রথম ছাপার অক্ষরে প্রকাশ করে। ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে দিওয়ানটি ফরাসী ভাষায় অনুবাদ হয়। [সাহাবিয়াত-১৮৮]

হযরত খানসার (রা) মৃত্যু সন নিয়ে মতপার্থক্য আছে। একটি মতে, হযরত উসমানের (রা) খিলাফতকালের সূচনা পর্বে ‍হি : ২৪/খ্রি: ৬৪৪-৪৫ সনে তিনি মারা যান। প্রক্ষান্তরে অপর একটি মতে, হি: ৪২/খ্রি: ৬৬৩ সনের কথা এসেছে। [ড: উমার ফাররূখ-১/৩১৮]

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ