আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – ষষ্ঠ খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

রুকায়্যা বিনত রাসীলিল্লাহ (সা)


রাসূলুল্লাহ (সা) ও হযরত খাদীজার (রা) মেঝো মেয়ে হযরত রুকায়্যা (রা)। পিতা মুহাম্মাদের (সা) নবুওয়াত লাভের সাত বঝর পূর্বে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। যুবাইর ও তাঁর চাচা মুসআব যিনি একজন কুষ্টিবিদ্যা বিশারদ, ধারণা করেছেন, রুক্য়্যা (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) ছোট মেয়ে। জুরজানী এ মত সমর্থন করেছেন। তবে অধিকাংশের মতে যায়নাব (রা) হলেন বড়, আর রুকায়্যা মেঝো। ইবন হিশামের মতে, রুকায়্যা মেয়েদের মধ্যে বড়।[সীরাত ইবন হিশাম-১/১৯০]

মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক সংকলিত একটি বর্ণনামতে, রাসূলুল্লাহর (সা) বয়স যখন তিরিশ তখন হযরত যায়নাবের (রা) জন্ম হয় এবং তেত্রিশ বছর বয়সে জন্ম হয় হযরত রুক্য়্যার (রা)।[আল ইসতী‘আব (আল-ইসাবার পার্শ্ব টীকা)-৪/২৯৯] যাই হোক, সীরাত বিষেজ্ঞরা হযরত রুকায়্যাকে রাসূলুল্লাহর (সা) মেঝো মেয়ে বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।

রাসূলুল্লাহর (সা) নবুওয়াত লাভের পূর্বে মক্কার আবু লাহাবের পুত্র ‘উতবার সাথে হযরত রুকায়্যার (রা) প্রথম বিয়ে হয়। [তাবাকাতে ইবন সা‘দ-৮/৩৬] রাসূলুল্লাহ (সা) বনুওয়াত লাভ করলেন। কুরায়শদের সাথে তাঁর বিরোধ যখন চরম আকার ধারণ করে তখন তারাপ আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেওয়ার সকল পথ ও পন্থা বেছে নেয়। তারা সকল নীতি-নৈতিকতার মাথা খেয়ে সিদ্ধান্ত নেয় যে মুহাম্মাদের বিবাহিত মেয়েদের স্বামীর উপর চাপ প্রয়োগ অথবা প্রলোভন দেখিয়ে প্রত্যেকের স্ত্রীকে তালাক দেওয়াবে এবং পরে তাদের পিত্রগৃহে পাঠিয়ে দেবে। তাতে অন্তত মুহাম্মাদের মনোকষ্ট ও দুশ্চিন্তা বৃদ্ধি পাবে এবং নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে।

যেমন চিন্তা তেমন কাজ। তারা প্রথমে গেল রাসূলুল্লাহর (সা) বড় মেয়ের স্বামী আবুল ‘আম ইকন রাবী‘র নিকট। আবদার জানালো তাঁর স্ত্রী যায়নাব বিনত মুহাম্মাদকে তালাক দিয়ে পিতৃগৃহে পাঠিয়ে দেওয়ার। কিন্তু তিনি তাদের মুখের উপর সাফ ‘না’ বলে দিলেন। নির্লজ্জ কুরায়শ নেতৃবৃন্দ এমন জবাব মুনেও থামলো না। তারা গেল রুকায়্যার (রা) স্বামী ‘উতবা ইবন আবী লাহাবের নিকট এবং তার স্ত্রীকে তালাক দানের জন্যে চাপ প্রয়োগ করলো। সাথে সাথে এ প্রলোভনও দিল যে, সে কুরায়শ গোত্রের যে সুন্দরীকেই চাইবে তাকে তার বউ বানিয়ে দেওয়া হবে। বিবেকহীন ‘উতবা তাদের প্রস্তাব মেনে নিল। সে রুকায়্যার বিনিময়ে স‘ঈদ ইবনুল ‘আস, [আনসাবুল আশরাফ-১/৪০১] মতান্তরে আবান ইব স‘ঈদ ইবনুল ‘আসের একটি মেয়েকে পাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। কুরায়শ নেতারা সানন্দে তার এ দাবী মেনে নিল। তাদের না মানার কোন কারণ ছিল না। তাদের তো প্রধান উদ্দেশ্য ছিল যে কোনভাবে এবং যতটুকু পরিমণেই হোক মুহাম্মাদকে (সা) দৈহিক ও মনসিকভাবে নির্যাতন করা। মুহাম্মাদের (সা) একটু কষ্টতেই তাদের মানসিক প্রশান্তি। নরাধম ‘উতবা তার স্ত্রী সয়্যিদা রুকায়্যাকে (রা) তালাক দিল।[সীরাতু ইবন হিশাম-১/৬৫২]

তবে এ ব্যাপারে আরেকটি বর্ণনা এই যে, যখন ‘উতবার পিতা-মাতার নিন্দায় সূরা ‘লাহাম’- (আরবী====) নাযিল হয় তখন আবু লাহাব ও তার স্ত্রী উম্মু জামীল-হাম্মালাতাল হাতাব- ক্ষুব্ধ হয়ে ছেলে ‘উতবাকে বললো, তুমি যদি মুহাম্মাদের মেয়ে রুকায়্যাকে তালাক দিয়ে বিদায় না কর তাহলে তোমার সাথে আমাদের আর কোন সম্পর্ক নেই। মাতা-পিতার অনুগত সন্তান মা-বাবাকে ‍খুশী করার জন্যে স্ত্রী রুকায়্যাকে তালাক দেয়।[আল-ফাতহুর রাব্বানী মা‘আ বুলগিল আমানী-২২/৯৯ (হাদীস নং ৮৯৩)] উল্লেখ্য যে, ‘উতবার সাথে রুকায়্যার কেবল আক্দ হয়েছিল। স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বসবাসের পূর্বেই তালাকের এ ঘটনা ঘটে।[তাবাকাত -/৩৬]

হযরত রুকায়্যার (রা) দ্বিতীয় বিয়ে

হযরত ‘উছমান (রা) তাঁর ইসলাম গ্রহণ ও বিয়ের ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, আমি পবিত্র কা‘বার আঙ্গিনায় কয়েকজন বন্ধুর সাথে বসে ছিলাম। এমন সময় কোন এক ব্যক্তি এসে আমাকে জানালো যে, রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর মেয়ে রুকয়্যাকে ‘উতবা ইবন আবী লাহাবের সাথে বিয়ে দিয়েছেন। যেহেতু হযরত রুকাইয়্রা রূপ-লাবণ্য এবং ঈর্ষণীয় গুণ-বৈশিষ্ট্যের জন্যে স্বাতন্ত্রের অধিকারিণী ছিলেন, এ কারণে তাঁর প্রতি আমার খানিকটা মানসিক দুর্বলতা ছিল। আমি তাঁর বিয়ের সংবাদ শুনে কিছুটা অস্থির হয়ে পড়লাম। তাই উঠে সোজা বাড়ী চলে গেলাম। তখন আমাদের বাড়ীতে থাকতেন আমার খালা সা‘দা। তিনি ছিলেন আবার একজন ‘কাহিনা’ (ভাবিষ্যদ্বক্তা)।[ইসলামপূর্ব আরবের ইতিহাসে বহু কাহিন ও কাহিনার নাম পাওয়া ‍যায়। তারা সাধারণত হেঁয়ালিপূর্ণ ও ধাঁধামূলক কথায় সত্য ও অর্ধসত্য ভবিষ্যদ্বাণী উচ্চারণ করতো।] আমাকে দেখেই তিনি অকস্মাৎ নিম্নের কথাগুলো বলতে আরম্ভ করলেন : (আরবী========)

‘(হে উছমান) তোমার জন্য সুসংবাদ। তোমার প্রতি তিনবার সালাম। আবার তিনবার। তারপর আবার তিন বার। শেষে একবার সালাম। তাহলে মোট দশটি সালাম পূর্ণ হয়ে যায়। আল্লাহর ইচ্ছায় তুমি মুভ ও কল্যাণের সাথে মিলিত হবে এবং অমঙ্গল থেকে দূরে থাকব। আল্লাহর কসম, তুমি একজন ফুলের কুঁড়ির মত সতী-সাধ্বী সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করেছো। তুমি একজন কুমার, এক কুমারী পাত্রীই লাভ করেছো।’

তাঁর এমন কথাতে আমি ভীষণ তাজ্জব বনে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, খালা! আপনি এসব কী বলছেন তিনি বললেন : (আরবী=====)

‘উছমান, উছমান, হে ‘উছমান! তুমি সুন্দরের অধিকারী, তোমার জন্যে আছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইনি নবী, তাঁর সাথে আছে দলিল-প্রমাণ। তিনি সত্য-সঠিক রাসূল। তাঁর উপর কুরআন নাযিল হয়েছে। তাঁকে অনুসরণ কর, মূর্তির ধোঁকায় পড়ো না।’

আমি এবারও কিছু বুললাম না। আমি তাকে একটু ব্যাখ্যা করে বলার জন্যে অনুরোধ করলাম। এবার তিনি বললেন : (আরবী======)

‘মুহাম্মাদ ইবন ‘আবদিল্লাহ যিনি আল্লাহর রাসূল, কুরআন নিয়ে এসেছেন। আল্লাহর দিকে আহ্বান জানাচ্ছেন। তাঁর প্রদীপই প্রকৃত প্রদীপ, তাঁর দীনই সফলতার মাধ্যম। যখন মারামারি কাটাকাটি শুরু হয়ে যাবে এবং অসি উন্মুক্ত হবে এবং বর্শা নিক্ষেপ করা হবে তখন শোরগোল হৈচৈ কোন কল্যাণ বয়ে আনবে না।’

তাঁর একথা আমাকে দারুণভাবে প্রবাবিত করলো। আমি ভবিষ্যতের করণীয় বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে লাগলাম। আমি প্রায়ই আবু বকরের কাছে গিয়ে বসতাম। দুইদিন পর আমি যখন তাঁর কাছে গেলাম তখন সেখানে কেউ ছিলনা। আমাকে চিন্তিত অবস্থায় বসে থাকতে দেখে তিনি প্রশ্ন করলেন, আজ তোমাকে এত চিন্তিত মনে হচ্ছে কেন? তিনি আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন, তাই আমি আমার খালার বক্তব্যের সারকথা তাঁকে বললাম। আমার কথা শুনে তিনি বললেন : ‘উছমান, তুমি একজন বুদ্ধিমান মানুষ। সত্য-মিথ্যার পার্থক্য যদি তুমি বরতে না পার তাহলে সেটা হবে একটা বিস্ময়ের ব্যাপার। তোমার স্বজাতির লোকেরা যে মূর্তিগুলির উপাসনা করে, সেগুলি কি পাথরের তৈরী নয়- যারা কোন কিছু শুনতে পায় না, দেখতে পারে না এবং কোন উপকার ও অপকারও করার ক্ষমতা তারা রাখেনা? উছমান বললেন, আপিনি যা বলেছেন, তা সবটুকু সত্য।

আবু বকর বললেন, তোমার খালা যে কথা বলেছেন তা সত্য। মুহাম্মাদ ইবন ‘আবদিল্লাহ আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ তাঁর বাণী মানুষের পৌঁছানোর কন্যে তাঁকে পাঠিয়েছেন। যদি তুমি তাঁর কাছে যাও এবং মনোযোগ সহকারে তাঁর কথা শোন, তাতে ক্ষতির কী আছে? তাঁর একথার পর আমি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট গেলাম। আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, তাদের এ আলোচনার কথা শুনে রাসূল (সা) নিজেই ‘উছমানের (রা) নিকট যান। রাসূল (সা) বলেন, শোন উছমান, আল্লাহ তোমাকে জান্নাতের দিকে ডাকছেন, তুমি সে ডাকে সাড়া দাও। আমি আল্লাহর রাসূল- তোমাদের তথা সমগ্র সৃষ্টি জগতের প্রতি আমাকে পাঠানো হয়েছে।

আল্লাহই জানেন তাঁর এ বাক্যটির মধ্যে কী এমন শক্তি ছিল! আমি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললাম। অবলীলাক্রমে আমার মুখ থেকে উচ্চারিত হলো কালেমায়ে শাহাদাত- আশহাদু আন লাইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ।[আল ইসাবা-৪/৩২৭-২৮]

এ ঘটনার পর মক্কাতেই হযরত উছমানের (রা) সাথে হযরত রুকায়্যার (রা) বিয়ের ‘আকদ সম্পন্ন হয়।

হযরত রুকায়্যা (রা) তাঁর মা উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা (রা) ও বড় বোন হযরত যায়নাবের সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন।[সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা’ -২/২৫১] অন্য মহিলারা যখন রাসূলুল্লাহর (সা) বাই‘আত করেন তখন তিনিও বাই‘আত করেন।[তাবাকাত-৮/৩৬]

নবুওয়াতের পঞ্চম বছরে তিনি স্বামী হযরত ‘উছমানের (রা) সাথে হাবশায় হিজরাত করেন। হযরত আসমা বিনত আবী বকর (রা) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল (সা) ও আবু বকর হিরাগুহায় অবস্থান করতেন আর আমি তাঁদের দুইজনের খাবার নিয়ে যেতাম। একদিন হযরত ‘উছমান (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট হিজরাতের অনুমতি চাইলে তাঁকে হাবশায় যাওয়ার অনুমতি দান করেন। অতঃপর তাঁরা স্বামী-স্ত্রী মক্কা ছেড়ে হাবশার দিকে চলে যান। তারপর আমি আবার যখন তাঁদের খাবার নিয়ে গেলাম তখন রাসূল (সা) জানতে চান : উছমান ও রুক্য়্যা কি চলে গেছে? বললাম : জী হাঁ, তাঁরা চলে গেছেন। তখন আমার পিতা আবু বকরকে (রা) শুনিয়ে বললেন : (আরবী=======)

‘নিশ্চয় তারা দুইজন ইবরাহীম ও লূত-এর পর প্রতম হিজরাতকারী।’[আনসাবুল ‘আশরাফ০১/১৯৯। হযরত কাতাদা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (সা) বলেন : ‘উছমান ইবন ‘আফফান সপরিবারে মহান আল্লাহর দিকে প্রথম হিজরাতকারী।’ (হায়াতুস সাহাবা-১/৩৪৬)।]

কিছুকাল হাবশায় অবস্থানের পরতাঁরা আবার মক্কায় ফিরে আসেন। মক্কার কাফিরদের অপতৎপরতার মাত্রা তখন আরো বেড়ে গিয়ে বসবানের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল। তাই সেখানে অবস্থান করা সমীচীন মনে করলেন না। আবার হাবশায় ফিরে গেলেন।

হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। ‘উছমান িইব ‘আফ্ফান (রা) তাঁর স্ত্রী রুকায়্যাকে (রা) নিয়ে হাবশার দিকে বেরিয়ে গেলেন। তাঁদের খবর রাসূলুল্লাহর নিকট আসতে দেরী হলো। এরমধ্যে এক কুরায়শ মহিলা হাবশা থেকে মক্কায় এলো। সে বললো : মুহাম্মাদ, আমি আপনার জামাইকে তার স্ত্রসহ যেতে দেখেছি। রাসূল (সা) জানতে চাইলেন : তুমি তাদের কি অবস্থায় দেখেছো? সে বললো : দেখলাম সে তার স্ত্রীকে একটি দুর্বল গাধার উপর বসিয়ে হাঁকয়ে নিয়ে যাচ্ছে। রাসূল (সা) তখন মন্তব্য করলেন : (আরবী==========)

‘আল্লাহ তাদের সাথী হোন। লুত আলাইহিস সালামের পরে উছমান প্রথম ব্যক্তি যে সস্ত্রীক হিজরাত করেছে। [আল-বিদায়া-৩/৬৬; সিয়ারু আ’লাম আন-নুবালা-২/২৫১]

তাঁরা দ্বিতীয়বার বেশ কিছুদিন হাবশায় অবস্থান করার পর মক্কায় ফিরে আসেন এবং কিছুদিন মক্কায় থেকে পরিবার-পরিজনসহ আবার চিরদিনের জন্য মদীনায় হিজরাত করেন।[তাবাকাত-৮/৩৬]

দ্বিতীয়বার হাবশায় অবস্থানকালে হযরত রুকায়্যার (রা) পুত্র ‘আবদুল্লাহর জন্ম হয়। এ ‘আবদুল্লাহর নামেই হযরত ‘উছমানের উপনাম হয় আবু ‘আবদিল্লাহ। এর পূর্বে হাবশায় প্রথম হিজরাতের সময় তার গর্ভের একটি সন্তান নষ্ট হয়ে যায়। [প্রাগুক্ ‘ উসুদুল গাবা-৫/৩৫৬] কাতাদা বলেন, ‘উছমানের (রা) ঔরসে রুকায়্যার (রা) কোন সন্তান হয়নি। ইবন হাজার বলেন এটা কাতাদার একটি ধারণা মাত্র। এমন কতা তিনি ছাড়া আর কেউ বলেননি।[আলইসতী‘আব-৪/৩০০] তবে ‘আব্দুল্লাহর পরে হযরত রুকায়্যার (রা) আর কোন সন্তান হয়নি।[তাবাকাত – ৮/৩৬]

‘আবদুল্লাহর বয়স যখন মাত্র ছয় বছর তখন হঠাৎ একদিন একটি মোরগ তার একটি চোখে ঠোকর দেয় এবং তাতে তার মুখমণ্ডল ফুলে গোটা শরীরে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এই দুর্ঘটনায হিজরী চতুর্থ সনের জামাদিউল আওয়াল মাসে সে মারা যায়।[সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৫১] রাসূল (সা) তাঁর জানাযার নামাজ পড়ান এবং হযরত ‘উছমান (রা) কবরে নেমে তার দাফন কাজ সম্পন্ন করেন।

মদীনা পৌঁছার পর হযরত রুকায়্যা (রা) হিজরী দ্বিতীয় সনে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হন। তখন ছিল বদর যু্দ্ধের সময়কাল। হযরত রাসূলে কারীম (সা) যু্দ্ধের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি ‘উছমানকে (রা) তাঁর রুগ্ন স্ত্রীর সেবা-শুশ্রুষার জন্য মদীনায় রেখে নিজে বদরে চলে যান। হিজরাতের এক বছর সাত মাস পরে পবিত্র রমজান মাসে হযরত রুকায়্যা ইনতিকাল করেন। উসামা ইবন যায়দ (রা) বলেন, আমরা যখন রাসূলুল্লাহর (সা) মেয়ে রুকায়্যাকে কবর দিয়ে মাটি সমান করছিলাম ঠিক তখন আমার পিতা যায়দ ইবন হারিছা বদরের বিজয়ের সুসংবাদ নিয়ে উপস্থিত হন। রাসূল (সা) আমাকে ‘উছমানের সাথে মদীনায় রেখে গিয়েছিলেন।[সীরাতু ইবন হিশান-১/৬৪২-৪৩; আনসাবুল আশরাফ-১/২৯৪, ৪৭৫]

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, তারা যখন রুকায়্যার (রা) দাফন কাজে ব্যস্ত ঠিক সে সময় ‘উছমান (রা) দূর থেকে আসা একটি তাকবীর ধ্বনী শুনতে পেয়ে উসামার (রা) নিকট জানতে চান এটা কী্য তাঁরা তাকিয়ে দেখতে পেলেন যায়দ ইবন হারিছা (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) উটনীর উপর সওয়অর হয়ে আছেন এবং বদরে মক্কার কুরায়শ নেতাদের হত্যার খবব ঘোষণা করছেন। [আল-ইসাবা-৪/৩০৫]

অসুস্থ স্ত্রীর পাশে তাকার জন্য হযরত ‘উছমান (রা) বদরের মত এত গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তবে রাসূল (সা) তাঁকে বদরের অংশীদার গণ্য করে গণীমতের অংশ দান করেন। ‘উছমান (রা) জানতে চান, জিহাদের সাওয়াবের কি হবে রাসূল (সা) বলেন : তুমি সাওয়াবও লাভ করবে।[আনসাবুল আশরাফ-১/২৮৯; সীরাতু ইবন হিশাম-১/৬৭৮]

ইবন ‘আব্বাস বলেন, রুকায়্যার (রা) মৃত্যুর পর রাসূল (সা) বলেন :[ আল ইসাবা-৪/৩০৪] (আরবী=======)

‘তুমি আমাদের পূর্বসূরী ‘উছমান ইবন মাজ‘উনের সাথে মিলিত হও।’ [‘উছমান ইবন মাজ‘উন (রা) উম্মুল মু‘মিনীন হযরত হাফসার (রা) মামা। তিনি দুইবার হাবশায় হিজরাত করেন। সর্বশেষ মদীনায় হিজরাত করেন। এ বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায়, তিনি হযরত রুকায়্যার (রা) পূর্বে মারা যান। বালাজুরীর বর্ণনা মতে, তিনি হিজরী ২য় সনের জিলহাজ্জ মাসে মদীনায় ফিরে এসে হিজরাতের তিমিশ মাস পরে মারা যান। (আসহাবে রাসূলোর জীবন কথা-২/২৭) আর হযরত রুকায়্যার (রা) বদর যুদ্ধের সময় মারা যান, এ ব্যাপারে সকলে একমত। সুতরাং বিষয়টি বোধগম্য নয়।] মহিলারা কাঁদতে থাকে। এসময় ‘উমার (রা) এসে তাঁর হাতের চাবুক উঁচিয়ে পেটাতে উদ্যত হন। রাসূল (সা) হাত দিয়ে তাঁর চাবুকটি ধরে বলেন, ছেড়ে দাও। তারা তো কাঁদছে। অন্তর ও চোখ থেকে যা বের হয়, তা হয় আল্লাহ ও তাঁর অনুগ্রহ থেকে। আর হাত ও মুখ থেকে যে ক্রিয়া প্রকাশ পায় তা হয় শয়তান থেকে। ফাতিমা (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) পাশে কবরের ধারে বসেছিলেন। রাসূল (সা) নিজের কাপরের কোনা দিয়ে তাঁর চোখের পানি মুছে দিচ্ছিলেন। [সিয়ারু আ‘লাম-নুবালা-২/২৬২; তাবাকাত-৮/৩৭।] ইবন সা‘দ উপরোক্ত বর্ণনা সম্পর্কে বলেন, সকল বর্ণনাকারীর নিকট এটাই সর্বাধিক সঠিক বলে বিবেটিত যে, রুকায়্যার (রা) মৃত্যু ও দাফনের সময় রাসূল (সা) বদরে ছিলেন। সম্ভবত এটা রাসূলুল্লাহর (সা) অন্য মেয়ের মৃত্যুর সময়ের ঘটনা। আর যদি রুকায়্যার মৃত্যু সময়ের হয় তাহলে সম্ভবত রাসূল (সা) বদর খেকে ফিরে আসার পরে কবরের পাশে গিয়েছিলেন, আর মহিলারাও তখন ভীড় করেছিলেন। [মুসনাদে ইমাম আহমাদের একটি বর্ণনায় এসেছে যে, রাসূলের (সা) বদর থেকে ফিরে আসার পরে কবরের পাশে গিয়েছিলেন, আর মহিলারাও তখন ভীড় করেছিলেন।[তাবাকাত-৮/৩৭] মুসনাদে ইমাম আহমাদের একটি বর্ণনায় এসেছে যে, রাসূলের (সা) অনিচ্ছার কারণে উছমানের (রা) পরিবর্তে আবু তালহা (রা) কবরে নেমে রুকায়্যাকে শায়িত করেন। এ ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন উছেছে যে, তা কেমন করে সম্ভপ? রাসূল (সা) তো তখন বদরে। তাই মুহাদ্দিছগণ বলেছেন, এটা উম্মু কুলছূমের (রা) দাফনের সময়ের ঘটনা। তাছাড়া অপর একটি বর্ণনায় উম্মু কুলছূমের (রা) নাম এসেছে।[আল-ফাতহুর রাব্বানী মা‘আ বুলুগিল আমানী-২২/১৯৯]

উল্লেখ্য যে, উম্মু কুলছূম (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) তৃতীয় মেয়ে- রুকায়্যার (রা) মৃত্যুর পর ‘উছমান (রা) তাঁকে বিয়ে করেন। কিছুদিন পর তিনি মারা যান।

যযরত রুকায়্যা (রা) খুবই রূপ-লাবণ্যের অধিকারিণী ছিলেন। ‘দুররুল মানছূর’ গ্রন্থে এসেছে : ‘তিনি ছিলেন দারণ রূপবতী। হাবশায় অবস্থানকালে সেখানকার একদল বখাটে লোক তাঁর রূপ-লাবণ্য দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। এই দলটি তাঁকে ভীষণ বিরক্ত করে। তিনি তাদের জন্য বদ-দু‘আ করেন এবং তারা ধ্বংস হয়ে যায়। [দুররুল মানছুর-২০৭; সাহাবিয়াত-১২৮]

প্রিয়তমা স্ত্রী ও সুখ-দুঃখের সাথীর অকাল মৃত্যূতে হযরত ‘উছমান (রা) দারুণ কষ্ট পান। তাঁদের দুইজনের মধ্যে দারুণ মিল-মুহাব্বত ছিল। লোকেরা বলাবলি করতো এবং কথাটি যেন উপমায় পরিণত হয়েছিল যে, (আরবী======)

‘মানুষের দেখা দম্পতিদের মধ্যে ও তাঁর স্বামী ‘উছমান হলো সর্বোত্তম। [আল-ইসাবা-৪/৩০৫] বিভিন্ন বর্ণনায় জানা যায়, রুকায়্যা ছিলেন একজন স্বামী-সোহাগিনী এবং পতি-পরায়ণা স্ত্রী। তাঁদের স্বল্পকালের দাম্পত্য জীবনে তাঁরা কখনো বিচ্ছিন্ন হননি। সকল বিপদ-আপদ ও প্রতিকূল অবস্থা তাঁরা একসাথে মুকাবিলা করেছেন। তিনি নিজে যেমন স্বামীর সেবা করে সকল যন্ত্রণা লাঘব করার চেষ্টা করতেন, তেমনি স্বামী ‘উছমানও স্ত্রীর জীবনকে সহজ করার চেষ্টা সব সময় করতেন। একদিন রাসূল (সা) ‘উছমানের (রা) ঘরে গিয়ে দেখেন রুকায়্যা স্বামীর মাথা ধুইয়ে দিচ্ছেন। তিনি বলেন : [প্রাগুক্ত](আরবী=========)

‘আমার মেয়ে! তুমি আবু ‘আবদিল্লাহর (‘উছমান) সাথে ভালো আচরণ করবে। কারণ আমার সাহাবীদের মধ্যে স্বভা-চরিত্রে আমার সাথে তাঁর বেশী মিল’

আবু হুরাইরা (রা) বলেন, আমি একদিন রাসূলুল্লাহর (সা) মেয়ে ও ‘উছমানের স্ত্রী রুকায়্যার ঘরে গিয়েঢ দেখি তাঁর হাতে চিরুনী। তিনি বললেন : রাসূলূল্লাহ (সা) এই মাত্র আমার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। তিনি দেখে গেলেন আমি ‘উছমানের মাথায় চিরুনী করছি। [হায়াতুস সাহাবা-২/৫৪২]

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ