আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – ষষ্ঠ খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

আসমা’ বিন্‌ত ইয়াযীদ আল-আনসারিয়্যা (রা)


হযরত আসমা’ (রা) একজন মহিলা আনসারী সাহাবী। তাঁর পিতা ইয়াযীদ ইবন আস-সাকান এবং মাতা উম্মু সা‘দ ইবন যায়স ইবন মাস‘ঊদ। তাঁর স্বামী সা‘ইদ ইবন ‘আম্মারা-যিনি আবূ সা‘ঈদ আল-আনসারী নামে প্রসিদ্ধ।[সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা‘-২/২৯৬; আল-ইসাবা-৪/৮৯] হযরত আসমার’র ডাকনাম ছিল উম্মু সালামা, মতান্তরে উম্মু ‘আমির। তিনি মদীনায় বিখ্যাত আওস গোত্রের বানূ ‘আবদিল আশহাল শাখার সন্তান। প্রখ্যাত সাহাবী মুআয ইবন জাবালের (রা) ফুফুর কন্যা।[নিসা’ মিন ‘আসর আন-নুবুওয়াহ্‌-৭৮] ইবন হাজার তাঁকে মু‘আয ইবন জাবালের চাচাতো বোন বলেছেন।[আল-ইসাবা-৪/২২৫]

হযরত আসমা‘র (রা) জন্ম ও বল্যকাল সম্পর্কে বেশী কিছু তথ্য পাওয়া যায় না। তাঁর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে এতটুকু জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় হিজরাতের পর তিনি মুসলমান হন। তিনি বহুবিধ বৈশিষ্টের অধিকারিণী ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন বিশুদ্ধভাষী দারুণ বাকপটু মহিলা। বুদ্ধিমত্তা, ধর্মভীরুতা, ইবাদাত,-বন্দেগী, হাদীছ বর্ণনা ইত্যাদির জন্যও তিনি প্রসিদ্ধ। তাঁর আরো একটি বড় পরিচয় তিনি একজন বীর যোদ্ধা। মহিলাদের পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট কথা বলার জন্য তাঁকে বলা হতো – মহিলাদে মুখপাত্রী। একটি বর্ণনা মতে, তিনি আকাবর শেষ বাই‘আতে অংশগ্রহণ করেন।[হায়াতুস সাহাবা-১/৫৯৭; টীকা-৪।]

 হযরত রাসূলে কারীম (সা) মদীনায় এসেছেন। একদিন সাহাবায়ে কিরাম পরিবেষ্টিত অবস্থায় বসে আছেন। এমন সময় আসমা’ এলেন এবং রাসূলুল্লাহকে (সা) সম্বোধন করে ছোট-খাট এ ভাষণটি দিলেন :

“হে আল্লাহর রাসূল! আমি একদল মুসলিম মহিলর পক্ষ থেকে তাদের কিছু কথা বলার জন্য এসেছি। আল্লাহ তা‘আলা আপনাকে নারী-পুরুষ উভয় জাতির জন্য পথপ্রদর্শক করে পাঠিয়েছেন। আমরা মহিলারা আপনার উপর ঈমান এনে আপনার অনুসরী হয়েছি। কিন্তু নারী ও পুরুষের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান আমরা লক্ষ্য করি। আমরা গৃহের চৌহদ্দির মধ্যে আবদ্ধ। পুরুষের যৌন তৃপ্তি পূরণ করি এবং তাদের সন্তান ধারণ  করি। আর আপনারা পুরুষরা জুম‘আ. নামাযের জামা‘আত ও জানাযায় শরী হতে পারেন। হজ্জে যান। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আপনারা আল্লাহর পথে জিহাদে চলে যান। আর আমরা তখন আপনাদের সন্তানদেরকে লালন-পালন করি, ধন-সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ করি।, কাপড় তৈরীর জন্য চরকায় সূতা কাটি। আমাদের প্রশ্ন হলো, আমরা কি আপনাদে সাওয়াবের অংশীদা হবো না? আমার পিছনে যে সকল মহিলা আছেন, তাদেরও আমার মত একই বক্তব্য ও একই মত।”

রাসূল (সা) আসমা’র বক্তব্য শোনার পর সাহাবীদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন : তোমরা কি এর চেয়ে আরো সুন্দর দীন সম্পর্কে জানতে চায় এমন কোন মহিলার কথা শুনেছো? তাঁর বললেন ; আমাদের তো ধারণাই ছিল না যে, একজন এমন মহিল এমন প্রশ্ন করতে পারেন। তারপর রাসূল (সা) আসমা’কে লক্ষ্য করে বলেন : “নাবী যদি তার স্বামীর সাথে সদাচরণ করে, তার মন যুগিয়ে চলে, তার ইচ্ছা-অনিচ্ছামত আনুগত্য করে এবং দাম্পত্য জীবনের দায়িত্ব-অধিকার পূরণ করে তাহলে সেও পুরুষের সমান  প্রতিদান লাভ করবে। যাও, তুমি একথা তোমার পিছনে রেখে আসা অন্য নারীদেরকে বলে দাও।”

রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ থেকে এ সুসংবাদ শুনে আসমা’ আনন্দের সাথে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ ও ‘আল্লাহু আকবার’ পাঠ করতে করতে ফিরে যান।[আল-ইসতী‘আব-৪/২৩৩; উসুদুল গাবা-৫/৩৯৮; আস-সীরাহ্‌ আল-হালাবিয়্যা-১/১৪৯। আস-তূসী এ ঘটনাটি আসমা’ বিন্‌ত ‘উবায়দ আল-আনসারিয়্যার প্রতি আরোপ করেছেন। ইবন মুন্দাহ্‌ ও আবূ নু‘আয়ম এ ঘটনাটি আসমা’ বিন্‌ত ইয়াযীদ ইবন আস-সাকান ভিন্ন দুই মহিলা। ইবন ‘আবদিল বার উপরোক্ত দুজনকে একই মহিলা বলেছেন এবং তাঁর মতে এ মহিলাই রাসূলুল্লাহর (সা) সঙ্গে কথা বলেছিলেন। ইমাম আহমাদও এ রকম মত পোষণ করেছেন। (আ‘লাম আন-নিসা’ -১/৬৭; টীকা-১)]

 হযরত আসমা’ যে মহিলা দলটির প্রতিনিধিত্ব করছিলেন সেই দলে তাঁর খালাও ছিলেন। তাঁর হতে সোনার চুরিড় ও আংটি ছিল। রাসূল (সা) জিজ্ঞেস করলেন : এই অলঙ্কারের যাকাত দেওয়া হয়? বললেন : না। রাসূল (সা) বললেন : তুমি কি এটা পছন্দ কর যে, আল্লাহ তোমাকে আগুনের চুড়ি ও আংটি পরান? আসমা’ তখন খালাকে বললেন : খালা, তুমি এগুলো খুলে ফেল। তিনি সঙ্গে ‍সঙ্গে সব অলঙ্কার খুলে ছুড়ে ফেলে দেন। তারপর আসমা’ বললেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা যদি অলঙ্কার না পরি তাহলে স্বামীদের নিকট তো গুরুত্বহীন হয়ে পড়বো। বললেন : রূপোর অলঙ্কার বানিয়ে তাতে জাফরানের রং লাগিয়ে না। সোনার চাকচিক্য দেখা যাবে। আলোচনার এ পর্যায়ে বাই‘আতের সময় হয়ে যায়। রাসূল (সা) তাঁদেরকে কয়েকটি অঙ্গীকার বাক্য পাঠ করান। এই সময় আসমা’ বলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনার একটি হাত বাড়িয়ে দিন, আমরা স্পর্শ করে আমাদের এ বাই‘আত সম্পন্ন করি। রাসূল (সা) বললেন : আমি মহিলাদের সাথে করমর্দন করি না।[মুসনাদে আহমাদ-৬/৪৫৩, ৪৫৪, ৪৫৮, ৪৬ ০, ৪৬১] কোন কোন সূত্রে অলঙ্কারের ঘটনাটি খেঅদ আসমা’র বলে বর্ণিত হয়েছে।[সাহাবিয়াত ৩০২]

হযরত আসমা’ (রা) সব সময় হযরত রাসূলৈ কারীমের (সা) আশে পাশে অবস্থান করতেন। একদিন রাসূল (সা) তার সামনে দাজ্জাল প্রসঙ্গে আলোচনা করলেন। তিনি কান্না শুরু করে দিলেন। রাসূল (সা) এ অবস্থায় উঠে চলে গেলেন। ফিরে এসে দেখলেন, আসমা’ একই অবস্থায় কাঁদছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন : কাঁদছো কেন? আসমা’ বললেন : আমাদের অবস্থা এমন যে, দাসী আটা চটকাতে বসে, আর এদিকে আমাদের ক্ষিধেও পেয়ে যায়। তার খাবার তৈরী শেষ না হতেই আমরা খাবার জন্য অস্থির হয়ে পড়ি। দাজ্জালের সময় যখন অভা দেখা দেবে তখন আমরা ধৈর্য ধরবো কেমন করে? রাসূল (সা) বললেন : সেদিন তাসবীহ ও তাকবীর ক্ষুধা থেকে রক্ষা করবে। এত কান্নাকাটি ও হাহুতাশের প্রয়োজন নেই। তখন আমি যদি জীবিত থাকি, তোমাদের জন্য ঢাল হয়ে থাকবো। অন্যথায় আমার পরে আল্লাহ প্রত্যেকটি মুসলমানকে রক্ষা করবেন।[মুসনাদে আহমাদ-৬/৪৫৩]

হযরত ‘আয়িশা (রা) তাঁর পরিবারের অন্য লোকদের সাথে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাত করে আসার অল্প কিছদিন পর আনুষ্ঠানিকভাবে পিতৃগৃহ থেকে স্বামীগৃহে যান। এই অনুষ্ঠানে হযরত আসমা’ও ছিলেন। ‘আয়িশাকে (লা) যারা নববধূর বেশে সাজিয়েছিলেন আসমা’ তাঁদের অন্যতম। সাজগোজ শেষ হলে ‘আয়িশাকে (রা) একটি আসনে বসিয়ে স্বামী রাসূলকে (সা) সংবাদ পাঠানো হয়। তিনি এসে ‘আয়িশার (রা) পাশে বসে পড়েন। মহিলাদের সধ্য থেকে কেউ একজন এক পেয়ালা দুধ রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে দেন। তিনি সামান্য পান করে ‘আয়িশার (রা) হাতে দেন। তিনি লজ্জায় মাথা নত করে রাখেন। তখন আসমা’ ধমকের সুরে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) যা দিচ্ছেন তা গ্রহণ কর। হযরত ‘আয়িশা (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) হাত থেকে দুধেল পেয়ালা নিয়ে সামান্য পান করে আবার রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে ফিরিয়ে দেন। তিনি পেয়ালাটি আসমা’র হাতে তুলে দেন। পেয়ালাটির যে স্থানে রাসূল (সা) মুখ লাগিয়ে পান করেছিলেন ঠিক সেখানেই মুখ লাগিয়ে পান করার জন্য আসমা’ পেয়ালাটি ঘোরাতে থাকেন। রাসূল (সা) বলেন অন্য মহিলাদেরকেও দাও। কিন্তু উপস্থিত অন্য মহিলারা বললেন, আমাদের এখন পান করার ইচ্ছা নেই। জবাবে রাসূল (সা) বললেন : ক্ষুধার সাথে মিথ্যাও? অর্থাৎ ক্ষুধার সাথে মিথ্যাকে এক করে ফেলছো?[ প্রাগুক্ত-৬/৪৫৮, ৪৬১]

ইসলামের ইতিহাসে যে সকল বীরাঙ্গনা মুজাহিদের নাম পাওয়া যায় হযরতহ আসমা’র নামটি তাদের শীর্ষে শোভা পায়। এমনই হওয়া উচিত। কারণ, তিনি এমন এক পরিবারের সন্তান যাদের সকলে আল্লাহর রাসূলের নিরাপত্তার জন্য জীবন কুরবানী করেছিলেন। উহুদ যুদ্ধসহ রাসূলুল্লাহর (সা) মাদানী জীবনে প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে এই পরিবারের লোকেরা তাঁদের জীবনের বিনিময়ে আল্লাহর রাসূলের নিরাপত্তা বিধান করেছেন।

আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। উহুদ যুদ্ধের দিন সাতজন আনসার ও দুইজন কুরাইশ, মোট নয়জন মুজাহিদসহ রাসূল (সা) মূল বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। শত্রু পক্ষের আঘাতে এক পর্যায়ে রাসূল (সা) আহত হন। তখন রাসূল (সা) তাঁর সংগের এই ক’জন ‍মুজাহিদকে লক্ষ্য করে বলেন : যে এদেরকে আমাদের থেকে দূরে তাড়িয়ে দিতে পারবে তার জন্য রয়েছে জান্নাত। অথবা তিনি একথা বলেন যে, সে জান্নাতে আমার সঙ্গী হবে।

আনসারদের এক ব্যক্তিহ সামনে এগিয়ে গিয়ে যুদ্ধ করে শহীদ হলেন। রাসূল (সা) আবারো পূর্বের মত একই কথা বললেন। এবারো একজন আনসারী এগিয়ে গেলেন এবং যুদ্ধ করে শহীদ হলেন। এভাবে একে একে সাতজন আনসারীই শহীদ হলেন।[সহীহ মুসলিম : বাবু গাওওয়াতি উহুদ।] এর সপ্তম জন ছিলেন আসমা’র ভাই ‘আম্মারা ইবন ইয়াযীদ ইবন আস-সাকান। শত্রু পক্ষের আঘাতে মারাত্মক আহত হয়ে তিনি যখন পড়ে গেলেন ঠিক তখনই একদল মুজাহিদ এসে উপস্থিত হন। তারা পৌত্তলি বাহিনীকে তাড়িয়ে দিয়ে তাদের কবল থেকে আম্মারকে উদ্ধার করেন। রাসূল (সা) চেঁচিয়ে তাদেরকে বলেন : তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো। রাসূল (সা) নিজের পায়ের উপর তার মাথা রেখে শুইয়ে দেন। এ অবস্থায় তার যখন মৃত্যু হলো তখন দেখা গেল তার মুখ রাসূলুল্লাহর (সা) পদযুগলের উপর। এই উহুদ যুদ্ধে আসমা’র পিতা ইয়াযীদ, আসমা’র আরেক ভাই ‘আমির এবং চাচা যিয়াদ ইবন আস-সাকান (রা) শহীদ হন।[নিসা’ মিন ‘আসর আ-নুবুওয়াহ্‌-৮০]

 তাঁর পরিবারের সদস্যদের এভাবে শাহাদাত বরণে জিহাদের প্রতি আসমা’র আগ্রহ আকর্ষণ করেছেন। বাই‘আতে রিদওয়ান, মক্কা বিজয় ও খাইবর অভিযান তার মধ্যে অন্যতম। বর্ণনাকারীগণ এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন যে, আসমা‘ (রা) হিজরী ১৫ সনে সংঘটিত ইয়রমূক যুদ্ধে যোগদান করেন এবং তাঁবুর খুঁট দিয়ে পিটিয়ে একাই নয়জন রোমান সৈন্যকে হত্যা করেন।[সিয়ারু আ’লাম আন-নুবালা’ -২/২৯৭; আল-ইসাবা-৪/২২৯; আ‘লাম আন-নিসা; মাজমা’ আয-হাওয়ায়িদ-৯/২৬০; হায়াতুস সাহাবা-১/৫৯৭]

হযরত আসমা’ (রা) ইসলাম গ্রহণের পর থেকে রাসূলুল্লাহর (সা) ইনতিকাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় রাসূলুল্লাহর (সা) সাহচর্য ও সান্নিধ্যে কাটান। সব সময় তাঁর আশে পাশেই থাকতেন। রাসূলুল্লাহর (সা) সেবার সামান্য সুযোগকেও হাতছাড়া করতেন না। রাসূলের (সা) সকল কথা কান লাগিয়ে শুনতেন এবং স্মরণ রাখতেন। সময়ে-অসময়ে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করে জেনে নিতেন। এ কারণে আনসারী মহিলাদের মধ্যে তিনি সর্বাধিক হাদীছ বর্ণনাকারীর গৌরব অর্জন করেছেন। তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) ৮১ (একাশি) টি হাদীছ বর্ণনা করেছেন।[আ‘লাম আন-নিসা’-১/৬৭; নিসা’ মিন ‘আসর-আন-নুবুওয়াহ্‌-৮০]

হযরত আসমা’ (রা) থেকে যারা হাদীছ বর্ণনা করেছেন তারা হলেন : মাহমূদ ইবন ‘আমর (তাঁর ভাগ্নে) আল-আনসারী, আবূ সুফইয়ান মাওলা ইবন আহমাদ, ‘আবদুর রহমান ইবন ছাবিত আস-সামিত আল-আনসারী, মুজাহিদ ইবন জুবায়ের, মুহাজির ইবন আবী মুসলিম ও শাহর ইবন হাওশার।

আবূ দাঊদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবন মাহা প্রভৃতি গ্রন্থে তাঁর হাদীছ সংকলিত হয়েছে।[আ‘লাম আন-নিসা’-১/৬৭; সিয়ারুস সাহাবিয়াত-১৬৬] ইমাম আল-বুখারী তাঁর “আল-আদাব আল-মুফরাদ” গ্রন্থেও সংকলন করেছেন।[নিসা’ মিন ‘আসর আন-নুবুওয়াহ্‌-৮১]

হযরত আসমা’ (রা) বর্ণিত হাদীছের মাধ্যমে মোটামুটি আল কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের নাযিল হওয়অর প্রেক্ষাপট, উপলক্ষ, শরী‘আতের বিভিন্ন বিধান, রাসূলুল্লাহর (সা) গুণাবলী, যুদ্ধ-বিগ্রহ, জীবন বৃত্তান্ত ইত্যাদি বিষয়গুলো জানা যায়। যেমন সূরা আল-মায়িদা নাযিল হওয়ার সম্পর্কে তিনি বলেছেন : আমি রাসূলুল্লাহর (সা) উষ্ট্রী আল-‘আদবা’র লাগাম ধরা ছিলাম। রাসূল (সা) তখন তার পিঠে বস। এমতাবস্থায় উষ্ট্রীর বাহু ভেঙ্গে চুর হয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছিল।[তাফসীর ইবন কাছীর-২.২; আল-বিদয়িা ওয়ান নিহায়া-৩/২২]

জামা ছিল রাসূলের (সা) সবচেয়ে প্রিয় পোশাক। আসমা’ (রা) সেই জামার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে : রাসূল্লাহর (সা) জামার হাতা ছিল হাতের কবজী পর্যন্দ।[হায়াতুস সাহাবা-২/৭০৫]

এ হাদীছটিও আসমা‘ (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, এক ইহুদীর নিকট কিছু খাদ্যের বিনিময়ে রাসূলূল্লাহ (সা) তাঁর বর্মটি বন্ধক রাখা অবস্থায় ইনতিকাল করেন। হযরত রাসূলে কারীমের (সা)  ইনতিকালের পর আবূ যার আল-গিফারী (রা) যে শাসকদের কঠোর সমালোচনা করবেন এবং এর জন্য যে তাঁকে বিভিন্ন স্থানে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ানো হবে এ বিষয়ের একটি হাদীছ তিনি বর্ণনা করেছেন।[ইবন মাজাহ (২৮৩৮); আত-তিরমিযী-(১৭৬৫); হায়াতুস সাহাবা-২/৬৭]

হাদীছ, সীরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থাবলীতে মদীনার আনসারদের সহামুভবতা, উদারতা ও অন্যকে প্রাধান্য দানের গুণের অনেক কথা যেমন বর্ণিত হয়েছে, তেমনিভাবে দাতের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহর (সা) অনেক মু‘জিযা যে প্রকাশ পেয়েছিল সেকথাও এসেছে। ‘ইবন আসাকির তাঁর তারীখে আসমা’কে কেন্দ্র করে রাসূলুল্লাহর (সা) একটি মু‘জিযার কথা আসমা‘র যবানীতে বর্ণনা করেছেন। আসমা’ বলেন : আমি একদিন দেখলাম রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের মসজিদে মাগরিবের নামায আদায় করছেন। আমি ঘরে এলাম এবং কিছু হাঁড়ওয়ালা গোশ্‌ত ও রুটি নিয়ে তাঁর সামনে রেখে বললাম : আমার বাবা-মা আপনার প্রতি কুরবান হোক! এগুযলো আপনি রাতের খাবার হিসেবে খেয়ে নিন। তিনি সঙ্গীদের ডেকে বললেন : বিসমিল্লাহ বলে তোমরা খেতে শুরু কর। সেই সামান্য খাবার রাসূলুল্লাহ (সা) খেলেন, তাঁর সঙ্গীরা খেলেন এবং যারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন, সবাই খেলেন। যে সত্তার হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ! সর্বমোট চল্লিশজন লোক খাওয়ার পরও আমি দেখলাম বেশীর ভাগ গোশ্‌ত ও রুটি রয়ে গেছে। তারপর রাসূল (সা) আমাদের একটি মশকে মুখ লাগিয়ে পানি পান করে বিদায় নেন। আমরা সেই মশ্‌কটি সংরক্ষণ করেছিলাম। কারো অসুখ হলে তাকে সেই মশকে পানি পান করানো হতো এবং মাঝে মাছে বরকত লাভের উদ্দেশ্যেও তাতে পান করা হতো।[নিসা’ মিন ‘আসর আন-নুবুওয়াহ্-৮২]

তিনি অত্যন্ত অতিথিপরায়ণা ছিলেন। একবার শাহর ইবন হাওশাব তাঁর বাড়ীতে এলেন। তাঁর সামনে খাবার উপস্থিত করা হলো। তিনি খেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করলেন। তাখন আসমা’ (রা) তাঁকে রাসূলুল্লাহর (সা) একটি ঘটনা শুনিয়ে বলেন : এখন তো নিশ্চয় আর খেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করবে না। শাহর বললেন : আম্মা! এমন ভুল হবে না।[আল-ইসতী‘আব-৩/৭২৬; মুসনাদে আহমাদ-৬/৪৫৮]

হযরত আসমা’ (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) ইনতিকালের পর মদীনা ত্যাগ করে শামে চলে যান। এ সময় ইয়ারমূক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এরপর তিনি দিমাশ্‌কে অবস্থান করে সেখানে হাদীছ বর্ণনা করতে থাকেন। একথা ইবন ‘আসাকির আবূ যুর‘আর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

হযরত আসমা‘র (রা) মৃত্যুর সঠিক সন জানা যায় না। ‘আল্লামা আয-যাহবী (রহ) বলেছেন, তিনি ইয়াযীদ ইবন মু‘আবিয়ার (রা) শাসমকাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।[নিসা’ মিন ‘আসর আন-নুবুওয়াহ্-৮৩]

উল্লেখ্য যে, ইয়াযীদ ১৪ রাবী‘উল আউয়াল ৬৪হি. মৃত্যুবরণ করেন। আয-যাহাবী আরো বলেছেন, আসমা’ (রা) দিমাশ্‌কে বসবাস করেন এবং দিমাশ্‌ক বাবুস সাগীরে তাঁর কবর বিদ্যমান।[সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা’ -২/২২০, ২৯৬] একথারই সমর্থন পাওয়া যায় ইবন কাছীরের মন্তব্যে। হিজরী ৬৯ সনে যাঁরা মৃত্যুবরণ করেছেন, দিমাশ্‌কের বাবুস সাগীরে তাঁকে দাফন করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী আবদুল মালিক ইবন মারওয়ানের খিলাফতকালে হযরত আসমা’ ইনতিকাল করেছেন।[নিসা’ মিন ‘আসর আন-নুবুওয়াহ-৮৩] তার সন্তানাদির কোন তথ্য পাওয়া যায় না।

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ