আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – ষষ্ঠ খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

উম্মু ‘আতিয়্যা বিন্‌ত আল-হারিছ (রা)


উম্মু ‘আতিয়্যা (রা) একজন আনসারী মহিলা। পিতার নাম আল-হারিছ।[তাহযীব আল-আসমা’ ওয়াল লুগাত-২/৩৬৪; তাহযীব আত-তাহযীব-১২/৪৫৫; উসুদুল গাবা-৫/৬০৩] তিনি একজন উঁচু পর্যায়ের মহিলা সাহাবী। উম্মু ‘আতিয়্যা তাঁর ডাকনাম। এ নামেই তিনি ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। আসল নাম নুসাইবা বিন্‌ত আল-হারিছ।[আল-কামূস আল-মুহীত, মাদ্দা (নাসব)] উল্লেখ্য যে, একই সাথে নুসাইবা নাম ও উম্মু ‘আতিয়্যা ডাকনামের দ্বিতীয় কোন মহিলা সাহাবীর সন্ধান পাওয়া যায় না।

সম্ভবতঃ তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় হিজরাতের আগে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এ কারণে রাসূল (সা) মদীনায় আসার পর পুরুষদের পাশাপাশি মহিলাদের যে বাই‘আত করেন। উম্মু ‘আতিয়্যা সেই বাই‘আতের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে :

রাসূলুল্লাহ (সা) যখন মদীনায় আসলেন তখন আনসার মহিলাদের একটি গৃহে একত্র করলেন। তারপর সেখানে ‘উমার ইবন আল খাত্তাবকে (রা) পাঠালেন। তিনি এস দরজার অপর পাশে দাঁড়িয়ে সালাম দিলেন, মহিলারাও সালামের জবাব দিলেন। তারপর বললেন : আমি রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতিনিধি হিসেবে আপনাদে নিকট এসেছি। আমরা বললাম : রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর প্রতিনিধিকে স্বাগতম। তিনি বললেন : আপনারা একথার উপর বাই‘আত করুন যে, আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করবেন না, চুরি করবেন না, ব্যভিচার করবেন না, আপনাদের সন্তানদের হত্যা করবেন না, কারো প্রতি মিথ্যা দোষারোপ করবেন না এবং কোন ভালো কাজে অবাধ্য হবেন না।

আমরা বললাম : হাঁ, আমরা মেনে নিলাম। তারপর ‘উমার (রা) দরজার বাহির থেকে তাঁর হাত বাড়িয়ে দেন এবং ঘরের ভিতরে মহিলারাও নিজ নিজ হাত সম্প্রসারিত করেন। (মূলতঃ এ হাত বাড়ানো ছিল বাই‘আতের প্রতীকস্বরূপ। কোন মহিলা ‘উমারের (রা) হাত স্পর্শ করেননি।) তারপর ‘উমার (রা) বলেন : হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন! উম্মু ‘আতিয়্যা (রা) আরো বলেন : আমাদে ঋতুবতী মহিলা ও কিশোরীদের দুই ‘ঈদের সময় ‘ঈদগাহে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, লাশের পিছে পিছে যেতে বারণ করা হয় এবং আমাদের জুম‘আ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এদিন উম্মু ‘আতিয়্যা “দোষারোপ” ও “ভালো কাজে অবাধ্য হওয়াঃ কথা দুইটির ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করেন।[হায়াত আস-সাহাব-১/২৫১-২৫২]

হযরত রাসূলে কারীম (সা) মহিলাদের জিহাদে গমনের অনুমতি দান করেছিলেন। বাস্তবে মুহাজির আনসারদের বহু মহিলা, এমনকি রাসূলুল্লাহর (সা) বেগমদের কেই কেউ জিহাদে যোগদান করেছেন। যেমন উম্মুল মু‘মিনীন ‘আয়িশা (রা) উহদ ও বানু আল-মুসতালিক যুদ্ধে এবং উম্মুল মু‘মিনীন উম্মু সালাম (রা) খায়বার অভিযান ও মক্কা বিজয়ে অংশগ্রহণ করেন।

যুদ্ধের ময়দানে মহিলারা সাধারণতঃ সেবামূলক কর্মে, যেমন আহতদের সেবা ঔষধ খাওয়ানো খাদ্য প্রস্তুত করা পানি পান করানো ইত্যাদিতে নিয়োজিত থাকতেন। উম্মু ‘আতিয়্যাও রাসূলুল্লাহর (সা) সংগে যুদ্ধে গেছেন। তিনি নিজেই বলেছেন: [আত-তাজহ আল-জামি’ লিল উসূল-৪/৩৪৪; তাবাকাত-৮/৪৫৫; আল-ইসাবা-৪/৪৫৫; আল-ইসাবা-৪/৪৫৫; আল-মাগাযী-২/৬৮৫; সীরাতু ইবন হিশাম-২/৩৪২ ](আরবী*********)

‘আমি নবীর (সা) সাথে সাতটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। তাঁদের পিছনে তাঁবুতে থেকে তাদের জন্য খাবার তৈরী করতাম, আহতদের ঔষধ পান করাতাম এবং রোগীদের সেবায় নিয়োজিত থাকতাম।’ খায়বার যুদ্ধে উম্মু ‘আতিয়্যা (রা) বিশজন মহিলার একটি দলের সাথে জিহাদের ছোয়াব লাভের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হন।

নবী পরিবারের সাথে হযরত উম্মু ‘আতিয়্যার (রা) গভীর সম্পর্ক ছিল। বিশেষদঃ উম্মুল ‍মু‘মিনীন হযরত ‘আয়িশার (রা) সাথে সম্পর্ক ছিল খবই আন্তরিক। মাঝে মধ্যে হযরত ‘আয়িশাকে (রা) হাদিয়া-তোহফা দিতেন। একদিন রাসূল (সা) ‘আয়িশা (রা) ঘর এসে জিজ্ঞেস করেন : তোমার কাছে আহার করার মতহ কোন কিছু আছে কি? ‘আয়িশা (রা) বললেন : নেই। তবে উম্মু ‘আতিয়্যা নুসাইবাকে সাদাকার ছাগলের কিছু গোশত পাঠানো হয়েছিল, তিনি আবার তা থেকে কিছু পাঠিয়েছেন। রাসূল (সা) বললেন : তা তার জায়গা মত পৌঁছে গেছে। [আল-ইসাবা-৪/৪৫৫]

হযরত রাসূলে কারীমরে (সা) কন্যাদের সাথেও হযরত উম্মু ‘আতিয়্যার (রা) সম্পর্ক ছিল। তার প্রমাণ এই যে, হিজরী অষ্টম সনের প্রথম দিকে হযরত যায়নাবের (রা) ইনতিকাল হলে উম্মু ‘আতিয়্যা (রা) তাঁকে গোসল দেন। তিনি সে বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে : [মুওয়াত্তা আল-ইমাম মালিক : আল-জানায়িয; তাবাকাত-৮/৩৪, ৩৫; উসুদুল গাবা-৫/৬০৩; আয-যাহাবী : তারীক-২/৫২০ ](আরবী********)

‘যায়নাব বিন্‌ত রাসূলিল্লাহ (সা) মারা গেলে রাসূল (সা) বললেন : তোমরা তাকে বেজোড়ভাবে তিন অথবা পাঁচবার করে গোসল দিবে। শেষবার কর্পুর বা কর্পুর জাতীয় কিছু দিবে। তোমরা গোসল শেষ করে আমাকে জানাবে। আমরা তার গোসল শেষ করলে রাসূল (সা) নিজের একটি লুঙ্গি আমারদের দিয়ে বলেন : এটি তার গায়ে পেঁচিয়ে দেবে।’

রাসূলুল্লাহর (সা) আরেক কন্যা উম্মু কুলছূম (রা) ইনতিকাল করলে উম্মু ‘আতিয়্যা (রা) তঁঅকেও গোসল দেন।[আত-তাবারী : তারীখ-২/১৯২; ইবন মাজাহ, হাদীছ নং-১৪৫৮; তাবাকাত-৮/৩৮; আল-ইসাবা-৪/৪৬৬] এমনিভাবে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সময়কালে কেবল দায়িত্ব পালন করেছেন।

খিলাফতে রাশিদার সময় হযরত উম্মু ‘আতিয়্যার (রা) এক ছেলে কোন এক যুদ্ধে যান এবং মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় তাকে বসরায় আনা হয়। এ খবর পেয়ে মা উম্মু ‘আতিয়্যা (রা) খুব দ্রুত সেখানে ছুটে যান। কিন্তু তাঁর পৌঁছার একদিন পূর্বে ছেলের ইনতিকাল হয়। বসরায় বানূ খালাফ-এর প্রাসাদে ওঠেন এবং সেখান থেকে আর কোথাও যাননি। ছেলের মৃত্যুর তৃতীয় দিন সুগন্ধি আনিয়ে গায়ে মাখেন এবং বলেন :

 (আরবী*******)[ সাহীহান : আত-তালাক; তাফসীর আল-খাযিন-১/২৩৯]

‘একজন নারীর তার স্বামী ছাড়া অন্য কোন মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের বেশী শোক পালন করা উচিত নয়। স্বামীর জন্য চার মাস দশ দিন শোক পালন করবে।’

তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) আদেশ-নিষেধ যথাযথভাবে মেনে চলার চেষ্টা করতেন। সবসময় মৃত্যু মাতম করতে নিষেধ করা হয় তখন তিনি বলেন, অমুক খান্দানের লোক আমার নিকট এসে কান্নাকাটি করে গেছে, আমাকেও তার বদলা হিসেবে তাদের কোন মৃতের জন্য কেঁদে আসা উচিত। তাঁর এমন কথায় রাসূল (সা) নিষেধাজ্ঞার আওতা থেকে সেই খান্দানটি ব্যতিক্রম ঘোষণা করেন।[সাহীহ মুসলিম-১/৪০১; মুসনাদ -/৪০৭]

যে সকল আনসারী মহিলা তীক্ষ্ণ স্মৃতিশক্তির অধিকারিণী ছিলেন উম্মু ‘আতিয়্যা (রা) তাদের অন্যতম।তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) বেশ কিছু হাদীছ স্মৃতিতে ধারণ ও বর্ণনা করেছেন। ইমাম আন-নাওবী (রহ) উল্লেখ করেছেন, রাসূলুল্লাহর (সা) চল্লিশটি হাদীছ উম্মু ‘আতিয়্যার (রা) সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তার মধ্যে ছয়টি বুখারী ও মুসলিম উভয়ে বর্ণনা করেছেন। তকাছাড়া একটি করে হাদীছ উভয়ের গ্রন্থে এককভাবে বর্ণনা করেছেন।[তাহযী আল-আসমা’ ওয়াল লুগাত-২/৩৬৪] সুনানে আরবা‘আতেও তাঁর হাদীছ সংকলিত হয়েছে।

সাহাবীদের মধ্যে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা) সহ বহু বিশিষ্ট তাবি‘ঈ তাঁর থেকে সেই হাদীছগুলো শুনেছেন ও বর্ণনা করেছেন। যেমন : হাফসা বিন্‌ত সীরীন (মৃ. ১০১ হি.), তাঁর ভাই মুহাম্মাদ ইবন সীরীন, ‘আবদুল মালিক ইবন ‘উমাইর, ‘আলী ইবন আল-আকমার, উম্মু শুরাহী (রহ) ও অন্যরা।[সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/৩১৮; তাহযীব আত-তাহযীব-১২/৪৫৫]

ইমাম আয-যাহাবী উম্মু ‘আতিয়্যাকে (রা) ফকীহ সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর নিম্নের এ বর্ণনাটির প্রতি লক্ষ্য করলেই এর সত্যতা প্রমাণিত হয়। তিনি বলেছেন : (আরবী(********)

‘আমাদেরকে জানাযার অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে কঠোরভাবে করা হযনি।’ তিনি বলতে চেয়েছেন, মহিলাদেরকে শবাধারের পিছে পিছে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে এ নিষেধাজ্ঞা অন্যান্য নিষেধাজ্ঞার মতহ তেমন কঠোর নয়। সুতরাং তা হারামের পর্যায়ে নয়, বরং মাকরূহ পর্যায়ের।[নিসা’ মিন ‘আসর আন-নুবাওয়াহ্‌-১২১, টীকা-১]

ইবন ‘আবদিল বার (রহ) উম্মু ‘আতিয়্যাকে (রা) বসরার অধিবাসী গণ্য করেছেন। বিখ্যাত মহিলা তাবি‘ঈ হাফসা বিন্‌ত সীরীন (রহ)ও এ,ন তদা কলেছেন।[প্রাগুক্ত] বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য দ্বারা প্রতীয়মান হয়, তিনি মদীনা ত্যাগের পর আর সেখানে ফিরে আসেননি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বসরায় থেকে যান। বসরাবাসী সাহাবায়ে কিরাম (রা), তাবি‘ঈন ও সাধারণ মানুষের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা লাভ করেন। আহ্‌লি বায়ত তথা নবী-পরিবারের সাথে তাঁর সুসম্পর্ক আজীবন বহাল থাকে। হযরত আলী (রা) তাঁর গৃহে আহার করে বিশ্রাম নিতেন।[তাবাকাত-৮/৪৫৬; আল-ইসাবা-৪/৪৫৫]

বসরায় তিনি একজন ফকীহ মহিলা সাহাবী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর হাদীছের সমঝ-বুঝ, শরী‘আতের বিধান সম্পর্কে সূক্ষ্ম জ্ঞান এবং রাসূলুল্লাহর (সা) নৈকট্যের কথা জানাজানি হওয়ার পর সকল শ্রেণীর মানুষের শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিতে পরিণত হন। যেহেতু তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) দুই কন্যাকে গোসল দিয়েছিলেন এবং সে কথা বর্ণনা করতেন তাই বসরায় বসবাসকারী সাহাবায়ে কিরাম এবং মুহাম্মাদ ইবন সীরীনের (রহ) মত উঁচু স্তরের ফকীহ তাবি‘ঈ তাঁর নিকট এসে মৃতের গোসল দানের নিয়ম-পদ্ধতি ও অন্যান্য বিষয়েল জ্ঞান লাভ করতেন।[আল-ইসতী‘আব-৪/৪৫২; আল-ইসাবা-৪/৪৫৫]

ধারণা করা হয় তিনি হিজরী ৭০ (সত্তর) সনের ষেশ দিকে বসরায় ইনতিকাল করেন।[সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা’ ২/৩১৮]

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ