আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – ষষ্ঠ খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

যায়নাব বিন্‌ত আবী মু‘আবিয়া (রা)


সেকালে আরবে যায়নাব নামটি বেশ প্রচলিত ছিল। সীরাতের গ্রন্থাবলীতে এ নামের অনেক মহিলাকে পাওয়া যায়। বিশ্বাস ও কর্ম গুণে যে সকল যায়নাব ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছেন, আমাদের যায়নাবও তাঁদের একজন। তিনি বিখ্যাত ছাকীফ গোত্রের কন্যা। পিতা ‘আবদুল্লাহ আবূ মু‘আবিয়া ইবন ‘উত্তাব। স্বামী প্রখ্যাত সাহাবী হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন মাস‘উদ (রা)।[তাবাকাত-৮/২৯০; আল-ইসতী‘আব-৪/৩১০; উসুদুল গাবা-৫/৪৭০; তাহযীব আত-তাহযী-১২/৪২২]

তিনি একজন হস্তশিল্পী ছিলেন। নিজ হাতে তৈরী জিনিস বিক্রী করে নিজের ছেলে-মেয়ে ও পরিবারের জন্য ব্যয় করতেন। তিনি অন্যদের সংগে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং অন্য মহিলাদের সংগে রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাই‘আত করেন। খায়বার অভিযানে অংশগ্রহণ করেন।[মাজমা‘ আয-যাওয়ায়িদ -৬/১০]

যে সকল মহিলা সাহাবী (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীছ স্মৃতিতে ধারণ করে বর্ণনা করেছেন যায়নাব (রা) তাঁদের অন্যতম। তাঁর থেকে বর্ণিত হাদীছ সংখ্যা আটটি। তিনি সরাসরি রাসূল (সা) থেকে এবং স্বামী ‘আবদুল্লাহ ইবন মাস‘ঊদ ও ‘উমার ইবন আল-খাত্তাবের (রা) সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন।[নিসা’ মিন ‘আসর আন-নুবুওয়াহ্‌-৭২] আর তাঁর সূত্রে এ সকল হাদীছ বর্ণনা করেছেন :

আবূ ‘উবায়দা, ‘উমার ইবন আল-হারিছ , বিসর ইবন সা‘ঈদ, ‘উবায়দ ইবন সাব্বাক, তাঁর এক ভাতিজা যার নাম জানা যায় না ও আরো অনেকে।[আল-ইসাবা-৪/৩১৩]

হযরত রাসূলে কারীম (সা) মহিলাদেরকে ঘর থেকে বাইরে যাওয়ার সময় কোন রকম সুগন্ধি ব্যবহার করতে যে বারণ করেছেন তা হযরত যায়নাব (রা) বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা) একদিন তাঁকে বলেন : যখন তুমি ‘ইশার নামাযের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হবে তখন সুগন্ধি স্পর্শ করবে না।[তাবাকাত-৮/২৯০; আল-ইসতী‘আব-৪/৩১০; আল-ইসাবা-৪/৩১৩;]

হযরত যায়নাবের (রা) স্বামী হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন মাস‘উদ (রা) ছিলেন একজন উঁচু স্তরের সাহাবী। হযরত রাসূলে কারীমের (সা) কথা ও কাজ অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করতেন। বিন্দুমাত্র হেরফের হওয়া কল্পনাও করতে পারতেন না। নিজের পরিবারের লোকদেরকেও তেমন ভাবে গড়ে তোলার সাধ্যমত চেষ্টা করতেন। স্ত্রী হিসেবে হযরত যায়নাব (রা) তাঁর নিকট থেকে ইসলামী বিধি-বিধান, জীবন-যাপন প্রণালীর বহু কিছু শিক্ষা লাভ করেন।

ইমাম আহমাদ (রহ) হযরত যায়নাবের (রা) একটি বর্ণনা সংকলন করেছেন। তিনি বলেন : ‘আবদুল্লাহ (স্বামী) যখন বাইরের কাজ সেরে ঘরে ফিরতেন তখন দরজায় এসে থেমে গলা খাকারি ও কাশি দিতেন, যাতে আমাদের এমন অবস্থায় দেখতে না পান যা তাঁর পছন্ত নয়। একদিন তিনি ফিরে এসে গলাখাকারি দিলেন। তখন আমার নিকট এক বৃদ্ধা বসে ‘হুমরা () রোগ থেকে নিরাময়ের উদ্দেশ্যে আমাকে ঝাড়-ফুঁক করছিল। তাড়াতাড়ি আমি তাকে খাটের তলায় ঢুকিয়ে দিলা। তিনি ঘরে ঢুকে আমার পাশে বসার পর দেখলেন আমার গলায় সুতা ঝুলছে। প্রশ্ন করলেন : এটা কি?

বললাম : এটা আমার জন্য মন্ত্র পড়ে ফুঁক দেওয়া হয়েছে। তিনি সেটা ধরে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেন। তারপর বলেন : ‘আবদুল্লাহর পরিবার-পরিজন শিরকের প্রতি মুখাপেক্ষীহীন। আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) বলতে শুনেছি : তন্ত্র-মন্ত্র, তাবিজ-কবজ ও জাদিু-টোনা হলো শিরক।

আমি তাঁকে বললাম : আপনি এমন কথা বলছেন কেন? এক সময় আমার চোখ থেকে  ময়লা বের হতো এবং অমুক ইহুদীল নিকট যেতাম। সে আমর চোখে মন্ত্র পড়ে ফুঁক দিলে ভালো হয়ে যায়।

তিনি বললেন : এটা শয়তানের কাজ। সে তোমার চোখে হাত দিয়ে খোঁচাতো। সে মন্ত্র পড়ে যখন ফুঁক দিত, শয়তান খোঁচানো বন্ধ করে দিত। তোমার জন্য একথা বলাই যথেষ্ট যা নবী (সা) বলেছেন। : (আরবী****************)

‘হে মানুষের প্রতিপালক! আপনি এ বিপদ দূর করে দিন। আপনি নিরাময় দানকারী, আমাকে নিরাময় দিন। আপনার নিরাময় ছাড়া আর কোন নিরাময় নেই। এমন নিরাময় দিন যেন আর কোন রোগ না থাকে।[বুখারী ; আত-তিব্ব, বাবু রাকয়াতুন নাবিয়্যি; মুসলিম : বাবু রাকয়াতিল মারীদ; আবূ দাউদ (৩৮৮৩); ইবন মাজাহ (৩৫৩০); তাফসীর ইবন কাছীর -৪/৪৯৪]

ইসলামী ফিকাহ্‌বিদগণ বলেন, স্ত্রীর যদি যাকাত ওয়াজিব হয়, তাহলে স্বামীকে যাকাত দেওয়া উচিত। কারণ, পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব স্ত্রীর নয়, স্বামীর। সুতরাং অন্যকে যাকাতের অর্থ দেওয়ার চেয়ে স্বামীকে দিলে স্ত্রী অধিক ছোয়াবের অধিকারী হবে।

এ রকম ঘটনা হযরত যায়নাবের (রা) ক্ষেত্রেও ঘটেছিল। একদিন তিনি রাসূলকে (সা) মহিলাদের সাদাকা করতে ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য উৎসাহ দিয়ে বক্তৃতা করতে শুনলেন। ঘরে ফিরে দান করার উদ্দেশ্যে নিজের সকল গহনা একত্র করলেন। স্বামী ‘আবদুল্লাহ ইবন মাস‘ঊদ (রা) জিজ্ঞেস করলেন : এই গহনা নিয়ে কোথায় যাচ্ছো?

বললেন : এগুলো দ্বারা আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ করতে চাই।

বললেন : দাও, আমাকে ও  আমার ছেলে-মেয়েদেরকে দাও, আমি এগুলো লাভের যোগ্য।[হিলায়াতুল আওলিয়া ওয়া তাবাকাত আসফিয়া-২/৬৯]

এরপরের ঘটনা ইমাম বুখারী হযরত আবূ সা‘ঈদ আল-খুদরীর (রা) সূত্রে বর্ণনা করেছেন এভাবে :

ইবন মাস‘ঊদের স্ত্রী যায়নাব বলেন : হে আল্লাহর নবী! আপনি আজ সাদাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আমার কিছু গহনা আছে এবং তা সাদাকা করতে চাই। কিন্তু ইবন মাস‘ঊদ (স্বামী) মনে করে, অন্যদের চেয়ে তিনি ও তাঁর ছেলে তা লাভের ক্ষেতে অগ্রাধিকা পাওয়ার যোগ্য। নবী (সা) বললেন : ইবন মাসঊদ ঠিক বলেছে। তোমার সাদাকা লাভের ক্ষেত্রে তোমার স্বামী ও ছেলে অন্যদের থেকে অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য।

ঘটনাটি ‘আমর ইবন আল-হারীছ থেকে এবাবে বর্ণিত হয়েছে :

যায়না, ‘আবদুল্লাহ ইবন মাস‘ঊদের (রা) স্ত্রী বলেন : রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : (আরবী************)

‘হে নারী সমাজ! তোমরা সাদাকা কর- তা তোমাদের গহনাই হোক না কেন।’

যায়নাব বলেন : একথা শুনে আমি ‘আবদুল্লাহর নিকট ফিরে এলাম। তাঁকে বললাম, আপনি একজন স্বল্প বিত্তের মানুষ। রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের সাদাকা করার নির্দেশ দিয়েছেন। আপনি তাঁর নিকট যান ও জিজ্ঞেস করুন, আপনাকে সাদাকা করা জায়েয হবে কিনা। জায়েয না হলে আমি অন্যদের দিব।

আমি গেলাম। দেখলাম রাসূলুল্লাহর (সা) দরজায় আরেকজন আনসারী মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। উল্লেখ্য যেড, এই মহিলার নামও যয়নাব এবং তিনি আবূ মাস‘ঊদ আল-আনসারীর স্ত্রী। তার ও আমার উদ্দেশ্য একই। বিলাল (রা) ভিতর থেকে বেরিয়ে আসলেন। আমরা তাঁকে বললাম : আপনি একটু রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট যান এবং তাঁকে বলুলন, দরজায় দাঁড়ানো দুইজন মহিলা জানতে চাচ্ছে যে, স্বামী এবং তার ছোট ছেলে-মেয়েদের সাদাকা করা জায়েয হবে কিনা। আমরা কে তা তাঁকে বলবেন না।

বিলাল (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট গিয়ে বিষয়টি জানতে চাইলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা) জিজ্ঞেস করলেন : তারা কে? বিলাল (রা) বললেন : একজন আনসারী মহিলা ও যায়না।

রাসূল (সা) আবার প্রশ্ন করলেন : কোন যায়না? বিলাল বললেন : ‘আবদুল্লাহ ইবন মাস‘ঊদের স্ত্রী। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : তারা দুইটি ছোয়াব পাবে : আত্মীয়তার এবং সাদাকার।[বুখারী : আয-যাকাত, বাবুয যাকাত ‘আলাল আকারিব; মুসলিম : আয-যাকাত, বাবু ফাদল আন-নাফাকাতি ‘আলাল আকরাবীন ওয়া আয-যাওযি ওয়া আল-আওলাদ; উসুদুল গাবা-৫/৪৭০, ৪৭১; আল-ইসাবা-৪/৩১৩]

হযরত যায়নাবের (রা) স্বামী হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন মাস‘ঊদ (রা) হিজরী ৩২ সনে ইনতিকাল করেন। অন্তিম অবস্থায় তিনি স্ত্রী ও কন্যাদের দেখাশুনা ও বিয়ে-শাদীর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কিছু ক্ষমতা দিয়ে যুবায়র ইবন আল-‘আওয়াম ও ‘আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (র) পক্ষে একটি অসীয়ত করে যান।[তাবাকাত-৩/১৫৯] হযরত যায়নাব (রা) কখন কোথায় ইনতিকাল করেন সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ধারণ করা হয় যে, তিনি স্বামীর মৃত্যুর পর বেশ কিছুদিন জীবিত ছিলেন এবং খিলাফতে রাশিদার শেষের দিকে ইনতিকাল করেন।[নিসা’ মিন ‘আসর আন-নুবুওয়াহ্‌-৭৬]

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ