আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – ষষ্ঠ খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

আর-রুবায়্যি‘উ বিন্‌ত মু‘আওবিয (রা)


মদীনার ‘আদী ইবন আন-নাজ্জার খান্দানের মেয়ে আর-নুবায়্যি‘উ। যে সকল আনসার পরিবার ইসলামরে সেবায় মহান ভূমিকা পালন করেছে তাঁর পরিবারটি এর অন্তর্গত। প্রথম পর্বে আল্লাহর রাসূল (সা), ইসলঅম ও মক্কা থেকে আগত মুসলমানদের সেবায় এই পরিবারটির রয়েছে গৌরবময় অবদান। তাঁর মহান পিতা মৃ‘আওবিয, ইয়াস, ‘আকিল, খালিদ, ও আমির। তাঁদের মা ‘আফরা’ বিন্‌ত ‘উবাইদ আল-আনসারিয়্যা আন-নাজ্জারিয়্যা (রা)। তাঁর প্রথম তিন সন্তানের পিতা আল-হারিছ ইবন রিফ‘আ আন-নাজ্জারী। কিন্তু তাঁরা তাঁদের পিতার নামের চেয়ে মা ‘আফরার (রা) নামের সাথে অধিক পরিচিত। ইতিহাসে তাঁরা (আরবী***********)(‘আফরার ছেলেরা) নামে প্রসিদ্ধ। বাকী চারজনের পিতা আল-বুকাইর ইবন ‘আবদি ইয়ালীল আল-লায়ছী। ‘আফরার (রা) এই সাত ছেলের সকলে ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদরে রাসূলে কারীমের (সা) সাথে অংশগ্রহণ করেন। মদীনার যে ছয় ব্যক্তি মক্কায় গিয়ে সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহর (সা) সংগে গোপনে দেখা করে ইসলাম গ্রহণ করেন রুবায়্যি‘উ-এর চাচা ‘আওফ তাঁদের একজন। তিনি একজন ‘আকাবীও অর্থাৎ ‘আকাবার দুইটি বাই‘আতের অংশীদার। তাঁর পিতা মু‘আওবিয ও অপর চাচা মু‘আয (রা) ‘আকাবার প্রথম বাই‘আতে অংশগ্রহণ করেন।

তাঁর দাদী ‘আফরাৎ’ বিন্‌ত ‘উবাইদ মদীনায় ইসলামের বাণী পৌঁছার সূচনাপর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় আগমনের পর অন্য আনসারী মহিলাদের সাথে তিনিও বাই‘আত করেন। বদর যুদ্ধে রাসূলুল্লাহর (সা) পতাকাতলে শামিল হয়ে তাঁর সাতটি ছেলে অংশগ্রহণ করেন এবং দু‘চন শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর মত সৌভাগ্যের অধিকারী মুসলিম নারী জাতির মধ্যে দ্বিতীয় আর কেউ আছেন কি? আর-রুবায়্যি‘উ-এর মা উম্মু হয়াযীদ বিন্‌ত কায়সও মদীনার ‘আদী ইবন আন-নাজ্জআ গোত্রের মেয়ে।

আবূ জাহল যে কিনা এই  উম্মএতর ফির‘আউন অভিধায় ভূষিত, বদরে তাকে ‘আফরা’র দুই ছেলে হত্যা করেন এবং রাসূলুল্লঅহর (সা) নেক দু‘আর অধিকারী হন। তিনি দু‘আ করেন :[ আনসাব আল-আশরাফ-১/২৯৯; আহমাদ যীনী দাহলান, আস-সীরাহ্ আন-নাবাবিয়্যা-১/৩৮৯] (আরবী******)

‘আল্লাহ ‘আফরা’র দুই ছেলের প্রতি দয়া ও করুণা বর্ষণ করুন যারা এই উম্মাতের ফির‘আউন আবূ জাহলকে হত্যায় অংশগ্রহণ করেছে।’

আর-রুবায়্যিউ-এর মা উম্মু ইয়াযীদ বিন্‌ত কায়স মদীনার আন-নাজ্জার গোত্রের মেয়ে। তাঁর বোন ফুরাই‘আ বিন্‌ত মু‘আওবিয। তিনিও একজন উঁচু স্তরের সাহাবিয়া ছিলেন। আল্লাহর দরবারে তাঁর দু‘আ অতিমাত্রায় কবুল হওয়ার কারণে (আরবী******) (মুজাবাতুদ দুা‘ওয়াহ্‌) বলা হতো।[আল-ইসতী‘আব-৪/৩৭৫]

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, আর-রুবায়্যি‘উ- এর বাবা-চাচারা বদর যুদ্ধের বীর যোদ্ধা ছিলেন। সে দিন তাঁরা জীবন দিয়ে পরবর্তীকালের ইসলামের বিজয়ধারার সূচনা করেন। এদিন কুরায়শ পক্ষের বীর সৈনিক আবুল ওয়ালীদ-‘উতবা ইবন রাবী‘আ, তার ভাই শায়বা ও ছেলে আল-ওয়ালীদ ইবন ‘উতবাকে সংগে নিয়ে পৌত্তলিক বাহিনী থেকে বেরিয়েং মুসলিম বাহিনীর দিকে এগিয়ে এসে তাদেরকে দ্বন্দ্ব যুদ্ধের আহবান জানায়। সাথে সাথে ‘আফরার তিন ছেলে মু‘আওবিয, মু‘আয ও ‘আওফ অস্ত্রসজ্জিত অবস্থায় তাদের দিকে এগিয়ে যয়। তারা প্রশ্ন করে : তোমরা কারা? তাঁরা বলেন : আমরা আনসারদের দলভুক্ত। তারা বললো : তোমাদের সাথে আমরা লড়তে চাই না। রাসূল (সা) তাদের ফিরে আসার নির্দেশ দিলেন এবং তাদেরই স্বগোত্রীয় হামযা, ‘আলী ও ‘উবাইদাকে (রা) সামনে এগিয়ে যাওয়ার আদেশ করলেন। তাঁরা এগিয়ে গেলেন এবং একযোগে আক্রমণ করে এই শয়তানের মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন।

আর-রুবায়্যি‘উর-এর পরিবারের লোকেরা জানতো এই উম্মাতের ফির‘আউন আবূ জাহল ইসলামের প্রচার-প্রতিষ্ঠার প্রধান প্রতিবন্ধক। সে এমন ইতর প্রকৃতির যে আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেয়, তাঁকে গালি দেয়। দুর্বল মুসলামানদের উপর নির্যাতন চালায় এবং তাদেরকে হত্যঅ করে। তাই আর-রুবায়্যি‘উ এর বাবা মু‘উওবিয ও চাচা মু‘আয (রা) বাগে পেলে এ্‌ নরাধমকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁরা অঙ্গীকার করেন হয় তাকে হত্যা করবেন, নয়তো নিজেরা শহীদ হবেন। তাঁদের আরাধ্য সুযোগটি এসে গেল। তাঁরা সাত ভাই বদর যুদ্ধে গেলেন। এর পরের ঘটনা বিখ্যাত মুহাজির সাহাবী হযরত ‘আবদুর রহমান ইকন ‘উওফ (রা) চমৎকার ভঙ্গিতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন :৩[সাহীহ আল-বুখারী : ফী ফারদিল খুমুস (৩১৪১), ফী আল-মাগাযী (৩৯৬৪ম ৩৯৮৮) : মুসলিম : ফী আল-জিহাদ (১৭৫২); সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-১/২৫০; বানাত আস-সাহাবা-৬৬] (আরবী*******)

‘বদরের দিন আমি সারিতে দাঁড়িয়ে ডানে-বাঁয়ে তাকিয়ে দেখি আমার দুই পাশে অল্প বয়সী দুই তরুণ। তাদের অবস্থানকে আমার নিজের জন্য যেন নিরাপদ মনে করালাম না। এমন সময় তাদের একজন অন্য সঙ্গী যেন শুনতে না পায় এমসভা ফিস ফিস করে আমাকে বললো : চাচা! আমাকে একটু আবূ জাহলকে দেখিয়ে দিন। বললাম : ভাতিজা! তাকে দিয়ে তুমি কি করবে? বললো : আমি আল্লাহর সংগে অঙ্গীকার করেছি, যদি আমি তাকে দেখি, হয় তাকে হত্যা করবো, নয়তো নিজে নিহত হবো। অন্যজনও একইভাবে একই কথা আমাকে বললো।

‘আবদুর রহমান ইবন ‘আওফ বলেন : তখন তাদের দুইজনের মাঝখানে আমি অবস্থান করতে পেরে কী যে খুশী অনুভব করতে লাগলাম! আমি হাত দিয়ে ইশারা করে তাদের আবূ জাহলকে দেখিয়ে দিলাম। সাথে সাথে দু্ইটি বাজ পাখীর মত তারা আবূ জাহলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে হত্যা করলো। তারা ছিল ‘আফরার দুই ছেলে।’

আবূ জাহলকে হত্যার পর তাঁরা বীর বিক্রমে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েরন। এই বদরেই আর-রুবায়্যি‘উ –এর মহান পিতা মু‘আওবিয (রা) শাহাদাত বরণ করেন।[আল-ইসতিবসার-৬৬, ] আবূ জাহলকে হত্যার ব্যাপারে রাসূলকে (সা) প্রশ্ন করা হয়েছিল : তাকে হত্যার ক্ষে্রে তাদের দুইজনের সংগে আর কে ছিল? বললেন : ফেরেশতাগণ এবং ‘আবদুল্লাহ ইবন মাস‘উদ শেষ আঘাত হানে। আবূ জাহলের হত্যার পর রাসূল (সা) বললেন : আবূ জাহলের অবস্থা কি তা কেউ দেখে আসতে পারবে কি? ইবন মাস‘উদ (রা) বললেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি যাচ্ছি। তিনি গিয়ে দেখেন ‘আফরার দুই ছেলে তাকে এমন আঘাত হেনেছে যে সে একেবারে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।[‘উয়ূন আল-আছার-১/৩১৫; আস-সীরাহ্‌ আল-হালরিয়্যা-২/৪৩৩]

হযরত রাসূলে কারীমের (সা) মদীনায় হিজরাতের পূর্বে আর-রুবায়্যি‘উ (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন তিনি একজন কিশোরী। রাসূল (সা) মক্কা থেকে কুবায় এসে উঠলেন। সেখানে তিন দিন অবস্থানের পর মদীনার কেন্দ্রস্থরের দিকে যাত্রা করেন এবং মসজিদে নববীর পাশে হযরত আবূ আইউ আল-আনসারীর (রা) গৃহে ওঠেন। তাঁর এই শুভাগমনে গোটা মদীনা আনন্দে দাঁড়িয়ে নেচে-গেয়ে তাঁকে স্বাগতম জানায়। তাদের স্বাগত সঙ্গীতের একটি চরণ ছিল এরকম :

(আরবী*****)

‘আমরা বানূ নান-নাজ্জারের কিশোর-কিশোরী। কি মজা! মুহাম্মাদ আমাদের প্রতিবেশী।’

রাসূল (সা) তাদের লক্ষ্য করে বললেন : তোমরা কি আমাকে ভালোবাস? তারা বললো : হাঁর । তিনি বললেন : আল্লাহ জানেন, আমার অন্তর তেকামাদের ভালোবাসেন। অনেকে বলেছেন, এই কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আর-রুবায়্যি‘উও ছিলেন।[নিসা’ মিন ‘আসর আন-নুবুওয়াহ-১৫০,১৫১] বয়স বাড়ার সাথে রাসূলে কারীম (সা) ও ইসলামের প্রচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি নানাভাবে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। বিভিন্ন দৃশ্যপটে তাঁকে উপস্থিত দেখা যায়। ইসলামের সেবায় অতুলনীয় ত্যাগের জন্য রাসূল (সা) এই পরিবারের সদস্যদের বিশেষ মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতেন। সব সময় হযরত রাসূলে কারীমের (সা) ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও সুখ-সুবিধার খোঁজ-খবর রাখতেন। রাসূল (সা) তাজা খেজুরের সাথে কচি শশা খেতে পছন্দ করতেন। আর-রুআয়্যি‘উ বলেন : আমার পিতা মু‘আাওবিয ইবন ‘আফরা (রা) একটি পাত্রে এক সা‘ তাজা খেজুর ও তার উপর কিছু কচি শশা দিয়ে আমাকে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট পাঠান। তিনি শশা পছন্ত করতেন। সেই সময় বাহরাইন থেকে রাসূলেল (সা) নিকট কিছু গহনা এসেছিল। তিনি তার থেকে এক মুট গহনা নিয়ে আমাকে দেন। অপর একটি বর্ণনায় স্বর্ণের কথা এসেছে। তারপর বলেন : এ দিয়ে সাজবে। অথবা বলেন : এ দিয়ে গহনা বানিয়ে পরবে।[বুখারী, ফী আল-আত‘ইমা-৯/৪৯৫; মুসলিম ফী আল-আশরিয়া (২০৪৩); তিরমিযী (১৮৪৫) ও ইবন মাজাহ (৩৩২৫)ফী আল-আত‘ইমা; মাজমা‘উ যাওয়ায়িদ লিল হায়ছামী-৯/১৩]

বিয়ের বয়স হলে বিখ্যাত মুহাজির সাহাবী ইবন আল-বুকাইরন আল-লায়ছীর সাথে বিয়ে হয় এবং তাঁর ঔরসে জন্মগ্রহণ করে ছেলে মুহাম্মাদ ইবন ইয়অস। তাঁর এই বিয়ের বিশেষ মহত্ব ও মর্যাদা এই যে, বিয়ের দিন সকালে রাসূল (সা) তাঁদের বাড়ৎীতে যান এবং তাঁর বিছানায় বসেন। পরবর্তী জীবনে আর-রুবায়্যি‘উ (রা) অত্যন্ত গর্বের সাথে সেকথা বলেছেন এভাবে : [বুখারী ফী আন-নিকাহ (৫১৪৭); ফী আল-মাগাযী (৪০০১); তিরমিযী-১০৯০; তাবাকাত-৮/৩২৮; তাহযীব আল-আসমা’ ওয়াল লুগাত-২/৬০৯] (আরবী******)

‘আমার বিয়ের দিন সকালে রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের বাড়ীতে এসে আমার ঘরে প্রবেশ করেন এবং বিছানায় বসেন। আমাদের ছোট ছোট মেয়েরা দফ বাজিয়ে বদর যুদ্ধে নিহত আমার বাপ-চাচাদের প্রশংসামূলক গীত সুর করে গাচ্ছিল। এর মধ্যে একজন গাইলো : আমাদের নবী আছেন যিনি ভবিষ্যতের কথা জানেন। তখন রাসূল (সা) তাকে বললেন : এটা বাদ দাও। আগে তোমরা যা বলছিলে তাই বল। অপর একটি বর্ণনায় এসেছে :

একথা বলো না। বরং আগে যা বলছিলে তাই বল। মূলতঃ তার প্রতি যে ভবিষ্যতের জ্ঞান আরোপ করা হয়েছে, তা থেকে বিরত রাখার জন্য একথা বলেন।

ইমাম আয-যহাবী এ ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে :[ সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা’ -৩/১৯৮] (আরবী*******)

‘নবী (সা) তাঁর বিয়ের দিন সকালে তার সাথে আত্মীয়তার সূত্রে তাঁকে দেখতে যান।’

আর-রুবায়্যি‘উ-এর বিয়ের দিন রাসূলুল্লাহর (সা) উপস্থিতি সম্ভবতঃ তাঁর প্রতি তথা তাঁর পরিবারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য ছিল। কারণ, ইসলামের জন্য এ পরিবারটির যে ত্যাগ ও কুরবানী ছিল তা রাসূল (সা) উপেক্ষা করতে পারেননি। ইসলামের জন্য এ পরিবার তাদের অর্থ-সম্পদ ব্যয় করেছে, শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এবং জীবনও দিয়েছে। সুতরাং পিতৃহারা এই মেয়েটি যার পিতা আবূ জাহলেল ঘাতক এবয় যিনি বদরে শাহাদাত বরণ করেছেন, তার আনন্দের দিনে রাসূল (সা) কিভাবে দূরে থাকতে পারেন?

যুদ্ধের ময়দানে আর-রুবায়্যি‘উ-এর পিতা বদর যুদ্ধেঘ অংশগ্রহণের মাধ্যমে জিহাদের সূচনা করেন, তাঁর মেয়ে হিসেবে তিনি সে ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখেন। পিতার রক্ত তাঁর ধমনীতে প্রবাহিত ছিল। তাই তাঁর মধ্যে ছিল জিহাদে গমনের অদম্য স্পৃহা। জিহাদের সীমাহীন গুরুত্ব তিনি পূর্ণরূপে অনুধাবন করেন। তাই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য রাসূলুল্লাগর (সা) সংগে বেশ কিছু জিহাদে যোগ দেন। ইবন কাছীর (রহ) বলেন : তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সংগে জিহাদে যেতেন। আহতদের ঔষুধ সেবন এবং ক্ষত-বিক্ষতদের পানি পান করাতেন। তিনি নিজেই বলেছেন :[সিফাতুস সাফওয়া-২/৭১; আত-তাজ আল-জামি’ লিল উসূল-৪/৩৪৪](আরবী******)

‘আমরা রাসূলুল্লাহর (সা) সংগে জিহাদে যেতাম। মুজাহিদদের পানি পান করাতাম, তাদের সেবা করতাম এবং আহত-নিহতদের মদীনায় পাঠাতাম।’

৬ষ্ঠ হিজরীর যুলকা‘দা মাসে হুদায়বিয়াতে মক্কার পৌত্তলিকদের সংগে রাসূলুল্লাহর (সা) যে সন্ধি-চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, সেই চৌদ্দ শো মুাজাহিদের মধ্যে তিনিও ছিলেন একজন। সেখানে রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জীবন বাজি রাখার যে বাই‘আত অনুষ্ঠিত হয়, তিনিও সে বাই‘আত করেন। এ বাই‘আতকে বাই‘আতে রিদওয়ান ও বাই‘আতে শাজারা বলা হয়। ইসলামের ইতিহাসে এ বাই‘আতের গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন ও তাঁর রাসূল (সা) যে এ বাই‘আতকে খুবই পছন্দ করেছেন তা কুরআন ও হাদীছের বাণীতে স্পষ্ট জানা যায়। যেমন : আল্লাহ বলেন:[ সূরা আল-ফাতহ-১০] (আরবী*******)

‘যারা তোমার হাতে বাই‘আত করে তারা তো আল্লাহরই হাতে বাই‘আত করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর। অতঃপর যে তা ভঙ্গ করে, তা ভঙ্গ করার পরিণাম তারই এবং যে আল্লাহর ষাথে অঙ্গীকার পূর্ণ করে তিনি অবশ্যই তাকে মহাপুরস্কার দেন।’

এ আয়াতে রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে হাত রেখে বাই‘আত করাকে আল্লাহর হাতে হাত রেখে বাই‘আত করা বলা হয়েছে। এতে এ বাই‘আতের বিরাট গুরুত্ব প্রমাণিত হয়।

হযরত রাসূলে কারীম (সা) এ বাই‘আতের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন :[ মুসলিম (২৪৯৬); তাবাকাত-২/১০০, ১০১] (আরবী******)

‘বৃক্ষের নীচে বাই‘আতকারীদের কেউই জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।’

সেদিন বাই‘আতকারীদেরে উদ্দেশ্যে রাসূল (সা) বলেন :[ বুখারী : বাবু গাযওয়াতিল ফাতহ] (আরবী*****)

‘আজ তোমরা প্রথিবীর অধিবাসীদের মধ্যে সর্বোত্তম মানুষ।’

স্পষ্টভাষিণী

আবূ জাহলের ঘাত তাঁর মহান পিতাকে নিয়ে আর-রুবায়্যি‘উর (রা) গর্বের অন্ত ছিল না। আবূ জাহলের মা আসমা‘ বিন্‌ত মাখরামার সাথে তাঁর একটি ঘটনা দ্বারা একথা প্রমাণিত হয়। আর-রুবায়্যি‘উ বলেন :

আমি ‘উমার ইবন আল-খাত্তাবের (রা) খিলাফতকালে একদিন কয়েকজন আনসারী মহিলার সাথে আবূ জাহলের মা আসমা‘ বিন্‌ত মাখরামামর নিকট গেলাম। আবদুল্লাহ ইবন আবী রাবী‘আ (আবূ জাহলের বৈপিত্রেয় ভাই) ছিল তাঁর আরেক ছেলে। তিনি ইয়ামন থেকে মদীনায় তাঁর মা আসমার নিকট আতর পাঠাতেন, আর তিনি তা বিক্রি করতেন। আমরাও তাঁর নিকট থেকে আতর কিনতাম। সেদিন আমার শিশিতে আতর ভরে ওযন দিলেন, যেমন আমার সাথীদের আতর ওযন দিয়েছিলেন। তারপর বললেন : আপনাদের কার নিকট কত পাওনা। থাকলো তা লিখিয়ে দিন। আমি বললাম : আর-রুবায়্যি‘উ বিন্‌ত মু‘আওবিযের পাওনা লিখুন।

আসমা‘ আমার নাম শুনেই বলে উঠলেন : (আরবী***) –হালকা। শব্দটি অভিশাপমূলক। অর্থাৎ গলায় যন্ত্রণা হয়ে তোমার মরণ হোক। তারপর বললেন : তুমি কি কুরায়শ নেতার হত্যাকারীর মেয়ে?

বললাম : নেতার নয়, তাদে দাসের হত্যাকারীর মেয়ে।

বললেন : আল্লাহর কসম! তোমার নিকট আমি কিছুই বেচবো না।

আমিও বললাম : আল্লাহর কসম! আমিও আপনার নিকট থেকে আর কখনো কিচু কিনবো না। তোমার এ আতরে কোন সুগন্ধি নেই।। মতান্তরে একথাও বলেন যে, আপনার আতর চাড়া আর কারো আতরে আমি পঁচা গন্ধ পাইন। একথাগুলো বলে আমি উঠে আসি। আসলে উত্তেজনাবশতঃ আমি একথা বলি। মূলতঃ তাঁর আতরের চেয়ে সুগন্ধ আতর আমি কখনো শুকিনি।[আল-মাগাযী লিল ওয়াকিদী-১/৮৯; তাবাকাত-৮/৩০০.৩০১; আনসাব আল-আশরাফ-১/২৯৮; সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-৩/১৯৯]

হাদীছ বর্ণনা

কেবল জিহাদে গমনের ক্ষেত্রেই তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল তা নয়, শরী‘আতের বিভিন্ন বিষয় জানা এবং রাসূলুল্লাহর (সা) বাণী শোনা ও আচরণ পর্যবেক্ষণেও তাঁর ছিল সমান আগ্রহ। আর এ উদ্দেশ্যে তিনি প্রায়ই উম্মুল মু‘মিনীন হযরত ‘আয়িশার (রা) নিকট যেতেন। তাই তাঁর থেকে রাসূলুল্লাহর (সা) বেশ কিছু গুণ-বৈশিষ্ট্য। ইমাম আয-যাবাহী বলেছেন : তিনি রাসুলুল্লাহর (সা) সাহচর্য যেমন পেয়েছেন তেমনি তাঁর হাদীছও বর্ণনা করেছেন। তাঁর থেকে রাসূলুল্লাহর (সা) ২১ (একুশ) টি হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। সাহীহ ও সুনানের গ্রন্থাবলীতে এ হাদীছগুলো সংকলিত হয়েছে। তার মধ্যে একটি হাদীছ মুত্তাফাক ‘আলাইহি।[জাওয়ামি‘উ আস-সীরাহ্‌ আন-নাবাবিয়্যা-২৮২; বানাত আস-সাহাবা-১৬৭, ১৬৮]

উঁচু স্তরের অনেক ‘আলিম তাবি‘ঈ তাঁর নিকট হাদীছ শুনেছেন এবং তাঁর সূত্রে বর্ণনাও করেছেন। সেই সকল বিখ্যাত তাবি‘ঈদের কয়েকজন হলেন :

সুলায়মান ইবন ইয়াসার ও আবূ সালামা ইবন ‘আবদির রহমান। এ দুইজন হলেন সাতজন প্রথম সরির আলিম তাবি‘ঈর অন্তর্গত। তাছাড়া আবূ ‘উবায়দা মুহাম্মাদ ইবন ‘আম্মার ইবন ইয়াসির, ইবন ‘উমারের (রা) আযাদকৃত দাস নাফি’, ‘উবাদা ইবন আল-ওয়ালীদ ইবন ‘উবাদা ইবন আস-সামিত (রা) খালিদ ইবন যাকওয়ান ‘আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন ‘আকীল, আয়িশা বিন্‌ত আনাস ইবন মালিক প্রমুখ।[আল-ইসতী‘আব -৪/৩০২; তাহযীব আত-তাহযীব-১২/৪১৮; সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা’-৩/১৯৮]

সাহাবায়ে কিরাম (রা) হযরত রাসূলে কারীমের (সা) চেহারার দীপ্তি ও সৌন্দর্যের চমৎকার সব বর্ণনা দিয়েছন। তার মধ্যে কারো কারো বর্ণনার কিছু বাক্যের অনুপম শিল্পরূপ পাঠক ও শ্রোতাতে দারুণ মুগ্ধ করে। যেমন হযরত আবূ হুরায়রার (রা) একটি বাক্য :[ মুসনাদে আহমাদ-২/৩৫০, ৩৮০; বানত আস-সাহাবা-১৬৬;](আরবী*****)

‘আমি রাসূলুল্লাহর (সা) চেয়ে অধিকতর সুন্দর কোন কিছু কখনো দেখিনি। যেন সূর্য ছুটছে।’ রাসূলুল্লাহর (সা) মুখমণ্ডলের সৌন্দর্যের একটি বর্ণনা দিতে। তিনি বললেন :[ দালায়িল আন-নুবুওয়া্‌ লিল বায়হাকী-১/২০০; উসুদুল গাবা-৫/৪৫৫;] (আরবী****)

‘বেটা, তুমি যদি তাঁকে দেখতে তাহলে বলতে, সূর্যের উদয় হচ্ছে।’ সত্যি এ এক অপূর্ব বর্ণনা।

একবার রাসূলুল্লাহ (সা) রুবায়্যি‘উ-এর বাড়ীতে ওযু করেন। কিভাবে তিনি ওযু করেছিলেন, রুবায়্যি‘উ (রা) তা প্রত্যক্ষ করেন। পরবর্তীতে তিনি তা বরাণনা করতেন। সে বর্ণনা শোনার জন্য বহু মানুষ তাঁর নিকট আসতেন। একবার আবদুল্লাহ ইবন ‘আব্বাস (রা) আসেন এবং রাসূলুল্লাহর (সা) ওযুর অবস্থা বর্ণনা করার অনুরোধ জানান।[তাফসীর আল-কুরতুবী-৬/৮৯] তাঁর সেই বর্ণনাটি হাদীছের বিভিন্ন গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে।[আবূ দাঊদ : ফী আত-তাহারা-বাবু সিফাতি ওয়াদুয়িন নাবীয়ি্য (সা); আত-তিরমিযী: আত-তাহারা। (৩৩); ইবন মাজাহ (৪১৮)]

এ পৃথিবীতে এক জোড়া নর-নারীর দাম্পত্য জীবন যাপন যেমন স্বাভাবিক তেমনি সে জীবনে মনোমালিন্য, কলহ এবং বিচ্ছেদও স্বাভাবিক। আর-রুবায়্যি‘উ (রা)-এর জীবনেও এমনটি ঘটেছিল। দীর্ঘদিন স্বামী ইয়াস ইবন আল-বুকাইরের সাথে থাকার পর পরস্পরের মধ্যে এমন বিরোধ সৃষ্টি হয় যে কোনভাবেই এক  সাথে থাকা সম্ভব হলো না। বিষয়টির বর্ণনা তিনি এভাবে দিয়েছেন : ‘আমার ও আমার চাচাতো ভাই অর্থাৎ স্বামীর মধ্যে একদিন ঝগড়া হলো। আমি তাকে বললাম : আমার যা কিছু আছে সব নিয়ে তুমি আমাকে প্রথক করে দাও। সে বললো : ঠিক আছে, আমি তাই করলাম। রুবায়্যি‘উ (রা) বলেন : আল্লাহর কসম! সে আমার সবকিছু নিয়ে নিল, এমনকি বিছানাটিও। আমি ‘উছমানের (রা) নিকট গিয়ে সব কথা তাঁকে খুলে বললাম। তিনি তখন অবরুদ্ধ অবস্থায়। বললেন : শর্ত পূর্ণ করাই উচিত। ইয়াসকে লক্ষ্য করে বললেন: তুমি ইচ্ছা করতে তার যা কিছু আছে সব নিতে পার, এমনকি চুলের ফিতাটি পর্যন্ত। [আল-ইসাবা-৪/২৯৪; ‍সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-৩/৩০০] তাঁদের এই বিচ্ছেদের ঘটনাটি ঘটে হিজরী ৩৫ সনে।

হযরত রুবায়্যি‘উ (রা) দীর্য় জীবন পেয়েছিলেন বলে জানা যায়। তবে সু্নির্দিষ্টভাবে ওয়াতের সনটি জানা যায় না। ইমাম আ-যাহবিী (রহ) বলেছেন, তিনি হিজরী ৭০ (সত্তর) সনের পরে ‘আবদুল মালিক ইবন মারওয়ানের খিলাফতকালে ইনতিকাল করেন।[সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা’-৩/৩০০] অবশ্য কোন সূত্র হিজরী ৪৫ (পঁতাল্লিশ) সনে তাঁর মৃত্যুর কথা উল্লেখ করেছে। ‘আল্লামা আযযিরিক্‌লী বলেছেন, তিনি হযরত মু‘আবিয়ার (রা) খিলাফতকাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।[আল-আ‘লাম-৩/৩৯]

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ