আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – ষষ্ঠ খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

হিন্দ বিন্‌ত ‘উতবা


‘উতবা ইবন রাবী‘আ ইবন ‘আবদু মান্নাফ ইবন ‘আবদু শামস-এর কন্যা হিন্দ। তাঁর মা সাফিয়্যা বিন্‌ত উমাইয়্যা ইবন হারিছা আস-সুলামিয়্যা। মক্কার অভিজাত ‍কুরাইশ খান্দানের সন্তান।[তাবাকাত-৮/২৩৫; তাযহীব আল-আসমা’ ওয়াল লুগাত-২/৩৫; আল-ইাবা ফী তাময়ীয আস-সাহাবা-৪/৪০৯] ইসলাম-পূর্ব ও ইসলাম-পরবর্তী আরবে যে সকল মহিলা খ্যাতির অধিকারিণী তিনি তাঁদের একজন। তাঁর বড় পরিচয় তিনি উমাইয়্যা খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা হযরত মু‘আবিয়া ইবন আবী সুফইয়ানের (রা) গৌরবান্বিত মা।

কুরাইশ বংশের যুবক আল-ফাকিহ্‌ ইবন আল-মুগীরা আল-মাখযূমীর সাথে হিন্দ –এর প্রথম বিয়ে হয়, কিন্তু সে বিয়ে টেকেনি। ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। এই ছাড়াছাড়ি হওয়ার পশ্চতে একাট চমকপ্রদ কাহিনী আছে, আরবী সাহিত্যের প্রাচীন সূত্রসমীহে যা বর্ণিত হয়েছে। ঘটনাকি এই রকম :

মক্কার কুরাইশ গোত্রের আল-মাখযূমী শাখার যুবক আল-ফাকিহ্‌ ইবন আল-মুগীরার সাথে হিন্দ-এর বিয়ে হয়। সে ছিল অতিথিপরায়ন। অতিথিদের থাকার জন্য তার ছিল একটি অতিথিখারা। বাইরের লোক বিনা অনুমতিতে সব সময় সেখানে আসা-যাওয়া করতো। একদিন আল-ফাকিহ্‌ স্ত্রী হিন্দকে নিয়ে সেই ঘর দুপুরে বিশ্রাম নিচ্ছিলো। এক সময় হিন্দকে নিদ্রাবস্থায় রেখে সে ঘর থেকে বের হয়ে যায়।এ সময় একজন আগন্তুক আসে এবং একজন মহিলাকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে দরজা থেকেই ফিরে যায়। ফেরার পথে লোকটি আল-ফাকিহ্‌‘এর সামনে পড়ে এবং তার সন্দেহ হয়। সে ঘরে ঢুকে হিন্দকে জিজ্ঞেস করে : এইমাত্র যে লোকটি তোমার নিকট থেকে বেরিয়ে গেল সে কে? হিন্দ বললেন : আমি কিছুই জানি না। কাউকে আমি দেখেনি। আল-ফাকিহ্‌ তার কথা বিশ্বাস করলো না। সে হিন্দকে তার পিতৃগৃহে চলে যাওয়ার জন্য বললো। ব্যাপারটি মানুষের মধ্যে জানাজানি হয়ে গেল।  হিন্দ-এর পিতা ‘উতবা মেয়েকে বললো : তোমার ব্যাপারটি আমাকে খুলে বল। যদি আল-ফাকিহ্‌‘র কথা সত্য হয় হাতলে কোন গুপ্ত ঘাতক দিয়ে আমি তাকে হত্যা করে ফেলবো। তাতে চিরদিনের জন্য তোমার দুর্নাম দূর হয়ে যাবে। আর সে মিথ্যাবাদী হলে আমি ইয়ামনের একজন বিখ্যাত কাহিন (ভবিষ্যদ্বক্তা)-এর নিকট বিচার দিব। হিন্দ বললেন : আব্বা, সে মিথ্যাবাদী।

‘উতবা আল-ফাকিহ্‌র নিকট গেল এবং তাকে বললো : তুমি আমার মেয়ের প্রতি একটি বড় ধরনের অপবাদ দিয়েছো। হয় তুমি আসল সত্য প্রকাশ করবে, আর না হয় ইয়ামনের কাহিনের নিজক বিচারের জন্য তোমাকে যেতে হবে। সে বললো : ঠিক আছে, তাই হোক। আল-ফাকিহ্‌ বাণূ মাখযূমের নারী-পুরুষের একটি দল নিয়ে যেমন মক্কা থেকে ইয়ামনের দিকে বের হলো তেমনি ‘ইতবাও বের হলো বানূ আবদি মান্নাফেল নারী-পুরুষের একটি দল নিয়ে।

যখন তারা কাহিনের বাড়ীর কাছাকাছি পৌঁছলো তখন হিন্দ-এর চেহারা বিরূপ হয়ে গেল। তিনি বিমর্ষ হয়ে পড়লেন।এ অবস্থা দেখে তার পিতা তাকে বললো : মক্কা থেকে বের হওয়ার সময় তোমার চেহারা তো এমন ছিল না? তিনি বললেন : আব্বা! আমি কোন খারাপ কাজ করেছি, এজন্য আমার চেহারার এ অবস্থা হয়নি, বরং আমি চিন্তা করছি, তোমরা যার নিকট যাচ্ছো সে তো একজন মানুষ। সে ভুল ও শুদ্ধ দুটোই করতে পারে। হতে পারে আমার প্রতি দোষারোপ করে বসলো, আর তা চিরকাল আরবের মানুষের মুখে মুখে প্রচার হতে থাকলো। পিতা বললো: তুমি ঠিকই বলেছো।

এক সময় তারা কাহিনের নিকট পৌঁছলো। মেয়েরা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ালো। কাহিন একেকজনের নিকট গিয়ে তার মাথায় হাত রেখে বলছিল: যাও! তুমি তোমার কাজ কর। এক সময় সে হিন্দ-এর নিকট গেল এবং তার মাথায় হাত রেখে বললো : (আরবী****)

‘যাও, তুমি কোন অশ্লীল কাজ করোনি এবং তুমি ব্যভিচারিণীও নও। ভবিষ্যতে তুমি এক বাদশার জন্ম দেবে যার নাম হবে মু‘আবিয়া।’

হিন্দ কাহিনের নিকট বাইরে বেরিয়ে এলে আল-ফাকিহ্‌ তার হাত ধরে; কিন্তু হিন্দ সজোরে হাতটি ছাড়য়ে নেন এবং আল-ফাকিহ্‌কে লক্ষ্য করে বলেন : আল্লাহর কসম! আমি চাই অন্য কারো ঔরসে আমার গর্ভে সেই সন্তানের জন্ম হোক। অতঃপর আবূ সুফইয়ান তাঁকে বিয়ে করেন এবং মু‘আবিয়ার পিতা হন।

বর্ণিত হয়েছে, আল-ফাকিহ্‌ থেকে পৃথক হওয়ার পর হিন্দ পিতাকে বললেন : আব্বা! আমার কোন মতামত ছাড়াই এই লোকটির সাথে তুমি আমার বিয়ে দিয়েছিলে। তারপর যা হওয়ার তাই হলো। এবার কোন ব্যক্তির স্বভাব বৈশিষ্ট্য আমার নিকট বিস্তারিতভাবে বর্ণনা না করে কারো সাথে আমার বিয়ে দেবে না। অতঃপর সাহাইল ইবন ‘আমর ও আবূ সুফইয়ান ইবন হরব বিয়ের পয়গাম এভাবে উপস্থাপন করলো : (আরবী*****)

‘ওহে নারী জাতির হিন্দ! সুহাইল ও হারবের পুত্র আবূ সুফইয়ান তোমার নিকট এসেছে। তোমার প্রতি তাদের আগ্রহ ও সন্তুষ্টি আছে।

তাদের অনুগ্রহ ও কল্যাণে জীবন যাপন করা যায়। তারা ক্ষতি ও উপকার দুটোই করতে পারে।

তারা দু‘জন মহানুভব ও দানশীল। তারা দু‘জন উজ্জ্বলমুখমণ্ডল বিশিষ্ট সাহসী বীর।

তোমার নিকট উপস্থাপন করলাম। তুমিই নির্বাচন কর, কারণ তুমি দূরদৃষ্টিসম্পন্না বুদ্ধিমতী মহিলা। ধোঁকা ও প্রতারণার আশ্রয় নিও না। কারণ যে প্রতারণা করে সে প্রতারিত হয়।’

হিন্দ বললেন : আব্বা! আমি এসব কিছুই শুনতে চাই না। আপনি তাদের দু‘জনের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য আমার কাছে একটু ব্যাখ্যা করুন। তাহলে আমার জন্য অধিকত উপযোগী কে তা আমি নির্ধারণ করতে পারবো। ‘উতবা এবার সুহাইলের বর্ণনা দিতে গিয়ে বললো : একজন তো গোত্রের উঁচু স্থানীয় ও বিত্তবান। তুমি তাঁর আনুগত্য করলে সে তোমার অনুগত থাকবে। তুমি তার প্রতি বিরূপ হলে সে তোমার কাছে নত হবে। তারপর পরিবার ও সম্পদের ব্যাপরে তুমি তার উপর কর্তৃত্ব করবে। আর অন্যজন উঁচু বংশ ও সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য সকলের নিকট পরিচিত। সে তার গোত্রের সম্মান ও মর্যাদা। প্রচণ্ড আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন, অত্যন্ত সতর্ক, সম্পদের পাহারায় উদাসীন হয়ে ঘুমায় না এবং তার পরিবারের উপর থেকে তার লাঠি কখনো নামায় না। হিন্দ বললেন : আব্বা! প্রথম ব্যক্তি হবে একজন স্বাধীন নারীকে বিনষ্টকারী। সেই নারী বিদ্রোহী হলে আর আত্মসমর্পণ করবে না। স্বামীর ছায়াতলে মূলত সেই সবকিছু করবে। স্বামী তার আনুগত্য করলে স্ত্রীল ইশারা-ইঙ্গিতে চলবে। পরিবারের লোকেরা তাকে ভয় করে চলবে। তখন তাদের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যাবে। এমতাবস্থায় সে যদি কোন সন্তানের জন্ম দেয়, সে সন্তান হবে নির্বোধ। এই লোকটির আলোচনা আমার নিকট করবেন না। তার নামও আমর আমর নিকট উচ্চারণ করবেন না। আর অন্যজন পূতঃপবিত্র স্বাধীন ও কুমারী  নারীল স্বামী হওয়ার যোগ্য। এ ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ যে, তার গোত্র তার সিদ্ধান্ত পাল্টাতে পারবে না এবং কোন ভয়-ভীতি তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে সক্ষম হবে না। এমন স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তিই আমার স্বামী হওয়ার যোগ্য। তার সাথেই আমাকে বিয়ে দিন। ‘উতবা আবূ সুফইয়ানের সাথে হিন্দ-এর বিয়ে দেয়। তার ঔরসে হিন্দ মু‘আবিয়অ নামের পুত্রের জন্ম দেয়। সুহাইল ইবন ‘আমর হিন্দকে না পেয়ে দারুণ আহত হয় এবং তার মনোবেদনা একটি কবিতায় প্রকাশ করে। আবূ সুফইয়ানকে একটু হেয় করারও চেষ্টা করে। আবূ সুফইয়ান একটি কবিতায় তার জবাব দেন।

এর পরের ঘটনা। সুহাইল অন্য মহিলাকে বিয়ে করে এবং তার গর্ভে সুহাইলের এক ছেলের জন্ম হয়। ছেলেটি বড় হলে একদিন সুহাইল তাকে নিয়ে বেড়াতে বের হয়েছে। পথে সে দেখতে পায় এক ব্যক্তি একটি মাদী উটের উপর সওয়া হয়ে ছাগল চরাচ্ছে। ছেলেটি পিতাকে বলে : আব্বা! এই ছোটগুলো কি বড়টির বাচ্চা? তার প্রশ্ন শুনে পিতা সুহাইলের মুখ থেকে স্বগতোক্তির মত বের হয় : ‘আল্লাহ হিন্দ-এর প্রতি দয়া ও করুণা করুন। এ মন্তব্য দ্বারা সে হিন্দ-এর দূরদৃষ্টির কথা স্মরণ করে।[তারীখু দিমাশ্‌ক-তারাজিম আন-নিসা’-৪৪০-৪৪১; আল-‘ইকদ আল-ফারীদ-৬/৮৯; আস-সাবীহ আল-হালাবিয়্যা-৬/৮৬-৭৮; মাজমা‘ আয-যাওয়অহিদ-৯/২৬৭-২৬৮;]

ইবন সা‘দ অবশ্য বলেছেন, হিন্দ-এর প্রথম স্বামী হাফ্স ইবন আল-মুগীরা ইবন ‘আবদুল্লাহ ইবং তার ঔরসে হিন্দ-এর পুত্র আবান-এর জন্ম হয়।[তাবাকাত-৮/২৩৫]

হিন্দ ভালোবাসতেন মুসাফির ইবন আবী ‘আমরকে। মুসাফিরও তাঁকে গভীরভাবে ভালোবাসতো। এই মুসাফির ছিল রূপ-সৌন্দর্যে, কাব্য প্রতিভা ও দানশীলতায় কুরাইশ যুবকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। একদিন হিন্দ তাকে বললেন : যেহেতু তুমি দরিদ্র, তাই আমার পরিবার তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে দিতে রাজি হবে না। তুমি পার্শ্ববর্তী কোন রাজান নিকট যাও এবং সেখন থেকে কিছু সম্পদের মালিক হয়ে ফিরে এসে আমাকে বিয়ে করবে। মুসাফির হিন্দ-এর মাহরের অর্থ লাভের আশায় হীরার রাজা আন-নু‘সান ইবন আল-মুনযিরের নিকট গেল। কিছুদিন পর আবূ সুফইয়ান ইবন হরব, মতান্তরে জনৈক ব্যক্তি মক্কা থেকে হীরায় গেল। মুসাফির তার নিকট মক্কার হল-হাকীকত জিজ্ঞেস করলো এবং জানতে চাইলো সেখানকার নতুন কোন খবর আছে কিনা। আবূ সুফইয়ান বললো : নতুন তেমন কোন খবর নেই। তবে আমি হিন্দ বিন্‌ত ‘উতবাকে বিয়ে করেছি। মুসাফির নিম্নের চরণ দু‘টি আবৃত্তি বরতে শুরু করলো :[ আ’লাম আন-নিসা’ -৫/২৪২] (আরবী****)

‘ওহে, হিন্দ তোমার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে গেছে এবং নিকৃষ্টতম নিষিদ্ধ বস্তুতে পরিণত হয়েছে। সে এমন খারাপ মানুষের মত হয়ে গেছে যে তার অস্ত্র কোষমুক্ত করে, তীর-ধনুক দু‘হাত দিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখে।’

এক সময় মক্কায় ইসলামের অভ্যুদয় হলেঅ।

পরবর্তী বিশ বছর পর্যন্ত হিন্দ ইসলামের আহবানের প্রতি কর্ণপাত করেননি। বরং তার এ দীর্ঘ সময় আল্লাহর রাসূল, ইসলাম ও মুসলমানদের মাত্রাছাড়া বিরুদ্ধচরণ ও শত্রুতায় অতিবাহিত হয়েছে। এ সময় শত্রুতা প্রকাশের কোন সুযোগই তিনি হাতছাড়া করেননি। স্বর্ণ ও অলঙ্কারের প্রতি মহিলাদের আবেগ স্বভাবগত। কোন অবস্থাতেই তার এ দু‘টো জিনিস হাতছাড়া করতে চায় না। কিন্তু হিন্দ দুটোর বিনিময়েও ইসলামের প্রচার-প্রসার ঠেকাতে মোটেই কার্পণ্য করেননি। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূল (সা) আবূ সুফইয়ানের গৃহকে নিরাপদ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আবূ সুফইয়ানের ঘর আশ্রয় নিবে সে নিরাপদ থাকবে। এ ঘোষণার পর আবূ সুফইয়ান ঘরে প্রবেশ করতে চাইলে হিন্দ তাকে তিরস্কার করে বলেন : আল্লাহ তোমার অনিষ্ট করুন। ‍তুমি একজন নিকৃষ্ট প্রবেশকারী।[আয-যাহাবী, তারখী আল-ইসলাম ওয়া তাবাকাত আল-মাশাহীর ওয়া আল-আ‘লাম-৩/২৯৮] তার এমন মাত্রাছাড়া শত্রুতার কারণে রাসূল (সা) তাকে হত্যার ঘোষণা দেন। ইসরামের এহেন শত্রু মক্কা বিজয়েল সময় ইসলামের ঘোষণা দেন।

হিন্দ ছিলেন কুরাইশদের অন্যতাম সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী মহিলা।[প্রাগুক্ত] চমৎকার কাব্য প্রতিভাও ছিল তাঁর। বদরে নিহতদের স্মরণে, বিশেষত তাঁর পিতা ‘উতবা, ভাই আল-ওয়ালীদ ইবন ‘উতবা এবং চাচা শায়বা ইবন রাবী‘আ ও অন্যদের স্মরণে তিনি অনেক মরসিয়া রচনা করেছেন।

‘উমার রিদা কাহ্‌হালা হিন্দ-এর পরিচয় দিয়েছেন এভাবে :[ আ‘লাম আন-নিসা’-৫/২৪২] (আরবী*******)

রূপ. সৌন্দর্য, মতামত, সিদ্ধান্তক, বুদ্ধি-প্রজ্ঞা, ভাষার শুদ্ধতা ও অলঙ্কার, সাহিত্য, কবিতা, বীরত্ব-সাহসিকতা ও আত্মসম্মানবোধের অধিকারিণী ছিলেন হিন্দগ বিন্‌ত ‘উতবা।’

বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (সা) ইসলাম প্রচারে আদিষ্ট হয়ে যখন কুরাইশ গোত্রের লোকদের সমবেত করে তাদের সামনে ইলামের দা‘ওয়াত উপস্থাপন করেন তখন আবূ লাহাব তার প্রতিবাদ করে এবং তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বেরিয়ে আসে। তারপর সে হিন্দ বিন্‌ত ‘উতবার নিকট এসে বলে  : ‘উতবা মেয়ে! আমি মুহাম্মাদের থেকে পৃথক হয়ে এসেছি এবং সে যা কিছু নিয়ে এসেছে বলে দাবী করছে তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছি। আমি লাত ও ‘উয্‌যাকে সাহায্য করেছি এবং তাদের দু‘জনকে প্রত্যাখ্যান করায় আমি মুহাম্মাদের প্রতি ক্ষব্ধ হয়েছি। হিন্দ মন্তব্য করলেন : ‘উতবার বাবা!  আল্লাহ আপনাকে ভালো প্রতিদান দিন।[সীরাতু ইবন হিশাম-১/৬৫৪]

ইসলামের প্রতি হিন্দ-এর প্রচণ্ড বিদ্বেষ ও শত্রুতা ছিল। তা  সত্ত্বেও তাঁর মধ্যে অনেক গুণ বিদ্যমান ছিল। ইতিহাসে এমন একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যাতে তাঁর প্রখর আত্মমর্যাদাবোধ এবং নারী জাতির প্রতি তীব্র সহানুভূতি ও সহমর্মিতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাসূলুল্লাহর (সা) কন্যা হযরত যায়নাবের (রা) স্বামী আবুল ‘আস ইবন রাবী’ (রা) কুরায়শ বাহিনীর সঙ্গে বদরে যান মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য। দুর্ভাগ্য তাঁর, মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হলেন। মক্কায় অবস্থানরাত স্ত্রী যায়নাবের (রা) চেষ্টায় এবং মুসলমানদের উদারতায় মুক্তি লাভ করে মক্কায় ফিরে যান। তবে মদীনা থেকে আসার সময় রাসূলুল্লাহকে (সা) কথা দিয়ে আসেন যে, মক্কায় পৌঁছে যায়নাবকে সসম্মানে মদীনায় পৌঁছে দেবেন। মক্কায় ফিরে তিনি স্ত্রী যায়নাবকে (রা) সফরের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বললেন। যায়নাব চুপে চুপে প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। এ খবর হিন্দ-এর কানে গেল। তিনি গোপনে রাতের অন্ধকারে যায়নাবের নিকট গেলেন এবং বললেন : ‘ওহে মুহাম্মাদের মেয়ে! শুনতে পেলাম তুমি নাকি তোমার পিতার নিকট চলে যাচ্ছ? যায়নাব (রা) বলেন : এখনো সিদ্ধান্ত নিইনি। হিন্দ মনে করলেন, হয়তো যায়নাব তাঁর কাছে বিষয়টি গোপন করছে, তাই তিনি বললেন : আমার চাচাতো বোন! গোপন করো না। ভ্রমণ পথে তোমার কাজে লাগে এমন জিনিসের প্রয়োজন থাকলে, অথবা অর্থের সংকট থাকলে আমাকে বল, আমি তোমাকে সাহয্য করবো। আমার কাছে লজ্জা করো না। পুরুষদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব-ফাসাদ তা নারীদের সম্পর্কে কোন রকম প্রভাব ফেলে না। পরবর্তীকালে যায়নাব (রা) বলেছেন, আমার বিশ্বাস ছিল তিনি যা বলছেন তা করবেন। তা সত্ত্বেও আমি তাঁকে ভয় করেছিলাম। তাই আমি আমার উদ্দেশ্যের কথা অস্বীকার করেছিলাম।[প্রাগুক্ত]

একদিন যায়নাব (রা) মক্কা থেকে মদীনার দিকে বের হলেন। কুরাইশরা তাঁকে বাধা দিয়ে আবার মক্কায় ফিরিয়ে দিল। একথা হিন্দ জানতে পেরে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে ঘর থেকে বের হলেন এবং সেই সব দুরাচারীদের সামনে গিয়ে তাদের এহেন দুষ্কর্মের জন্য কঠোর সমালোচনা করলেন। তাদের উদ্দেশ্যে নিম্নের চরণটিও আওড়ালেন :[ প্রাগুক্ত-১/৬৫৬; নিসা’ মিন ‘আসর আন-নুবুওয়অহ্‌-৪৭২] (আরবী*****)

‘সন্ধি ও শান্তির সময় কঠিন ও কঠোর গাধার মত আচরণ করতে পার, আর রণক্ষেত্রে ঋতুবতী নারীর রূপ ধারণ কর।’

কুরাইশ পাষণ্ডরা যায়নাবকে (রা) মক্কায় আবূ সুফইয়ানের নিকট নিয়ে আসে। উল্লেখ্য যে, যায়নাব (রা) সন্তানসম্ভবা ছিলেন। পাষণ্ডরা উটের পিঠ থেকে ফেলে দেওয়ায় তিনি বেশ আঘাতও পেয়েছেলেন। তাঁর সেবা ও আদর-আপ্যায়ন করার জন্য তাঁকে নিয়ে বানূ হাশিম ও বানূ উমাইয়্যার মেয়েরা বিবাদ শুরু করে দেয়। অবশেষে হিন্দ তাঁকে নিজের কাছে রেখে দেন এবং সেবা শুশ্রূষা করে সুস্থ করে তোলেন। এ সময় হিন্দ প্রায়ই তাঁকে বলতেন, তোমার এ বিপদ তোমার বাবার জন্যই।

হিজরী ২য় সনে সিরিয়া থেকে মক্কা অভিমুখী আবূ সফইয়অনের একটি বাণিজ্য কাফেলা নির্বিঘ্নে পার করা এবং মুসলমানদেরকে চিরতরে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে মক্কার পৌত্তলিকদের বিশাল একটি বাহিণী বের হয়। এই বাহিনীর পুরোভাগে ছিল কুরাইশদের বাছা বাছা মানুষ ও নেতৃবৃন্দ। তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে, বদরে পৌঁছে উট জবাই করে ভুরিভোজ এবং মদ পান করে আনন্দ ফূর্তি করবে। তারপর মুসলমানদের শিকড়সহ উৎখাত করবে। যাতে আরবের আর কেউ কোন দিন তাদের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে দুঃসাহস না করে।

মক্কার এই পৌত্তলিক বাহিনীতে ছিল হিন্দ-এর পিতা, ভাই, চাচা ও তাঁর স্বামী। তবে তাৎপর্যপূর্ণ ইবন ‘উতবা (রা) ও তাঁর আযাদকৃত দাস সালিম (রা) । বদর যুদ্ধে এই আবূ হুযাইফা ইবন ‘উতবা (রা) ও তাঁর আযাদকৃত দাস সালিম (রা)। বদর যুদ্ধে এই আবূ হুযাইফার (রা) ছিল এক গৌরবজনক ভূমিকা।

এ যুদ্ধে তিনি পিতা ‘উতবাকে তাঁর সঙ্গে দ্বন্দ্ব যুদ্ধের আহ্বান জানান। হিন্দ তাঁর ভাইয়ের এহেন আচরণের নিন্দায় নিম্নের চরণ দু‘টি বলেন : [সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা’ -১/১৬৬; নিসা’ মিন ‘আসর আন-নুবাওয়াহ্‌-৪৭২] (আরবী******)

‘ত্যাড়া চোখ, বাঁকা দাঁত ও নিন্দিত ভাগ্যের অধিকারী আবূ হুযাইফা দীনের ব্যাপারে নিকৃষ্ট মানুষ।

তোমার পিতা যিনি তোমাকে ছোটবেলা থেকে প্রতিপালন করেছেন এবং কোন রকম বক্রতা ছাড়াই তুমি পূর্ণ যুবক হয়েছো, তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে না।?’

যুদ্ধের সূচনা হিন্দা‘র পিতা, ভাই ও চাচা নিহত হয়। শুধু তাই নয়, পৌত্তলিক বাহিনীর সত্তরজন বাছা বাছা সৈনিকও নিহত হয়। তাদের মৃত দেহ বদরে ফেলে রেখে অন্যরা মক্কার পথ ধরে পালিয়ে যায়। এই পলায়নকারীদের পুরোভাগে ছিল হিন্দ-এর স্বামী আবূ সুফইয়ান। এ বিজয়ে মুসলমানরা যেমন দারুণ উৎফুল্ল হন তেমনি কুরাইশ বাহিনীর খবর মক্কায় পৌঁঝলে সেখানের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে হতবাক হয়ে যায়। প্রথমে অনেকে সে খবর বিশ্বাস করতে পারেনি। পরাজিতরা যখন মক্কায় ফিরতে লাগলো তখন খবরের যথার্থতা সম্পর্কে আর কোন সন্দেহ থাকলো না। ঘটনার ভয়াবহতায় মক্কাবাসীদের মথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। আবূ লাহাব তো শোকে দুঃখে শয্যা নিল এবং সে অবস্থায় সাতদিন পরে জাহান্নামের পথে যাত্রা করে। তার জীবনের অবসান হয়। কুরাশি নারীরা তাদের নিহতদের স্মরণে এক মাস ব্যাপী শোক পালন করে। বুক চাপড়িয়ে, মাথায় চুল ছিঁড়ে তারা মাতম করতে থাকে। নিহত কোন সৈনিকের বাহন অথবা ঘোড়ার পাশে সমবেত হয়ে তারা রোনাজারি করতে থাকে। একমাত্র হিন্দ ছাড়া এই শোক প্রকাশ ও মাতম করা থেকে মক্কার কোন নারী বাদ যায়নি। হাঁ, হিন্দ কোন রকম শোক প্রকাশ করেননি। একদিন কিছু কুরাইশ মহিলা হিন্দ-এর নিকট গিয়ে প্রশ্ন করে : তুমি তোমার পিতা, ভাই, চাচা ও পরিবারের সদস্যদের জন্য একটু কাঁদলে না? বললেন : আমি যদি তাদের জন্য কাঁদি তাহলে সে কথা মুহাম্মাদের নিকট পৌঁছে যাবে।

তারা এবং খাযরাজ গোত্রের নারীরা উৎফুল্ল হবে। আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ ও তাঁর সহচরদের নিকট থেকে প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত তেল-সুগন্ধি আমার জন্য হারাম। আমি যদি জানতাম কান্নাকাটি ও মাতম আমার দুঃখ-বেদনা দূর করে দেবে তাহলে আমি কাঁদতাম। কিন্ত আমি জানি আমার প্রিয়জনদের বদলা না নেওয়া পর্যন্ত আমার অন্তরের ব্যথা দূর হবে না।

হিন্দ তেল-সুগন্ধির ধারে কাছেও গেলেন না এবং আবূ সুফইয়ানের শয্যা থেকেও দূরে থাকলেন। পরবর্তী উহুদ যুদ্ধ পর্যন্ত মক্কাবাসীদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে লাগলেন। আর বদরে নিহতদের স্মরণে প্রচুর মরসিয়া রচনা করলেন। সেই সকল মরসিয়ার কয়েকটি চরণ নিম্নরূপ :[ শা‘ইরাত আল-‘আরাব-৪৬৮; আ’লাম আন-নিসা’-৫/২৪৩] (আরবী*******)

‘আমি আল আবতাহ উপত্যকাদ্বয়ের নেতা এবং প্রতিটি বিদ্রোহীর অসৎ উদ্দেশ্য থেকে তাকে রক্ষাকারীর মৃত্যুতে কাঁদছি।

তোমার ধ্বংস হোক! জেনে রাখ, আমি কাঁদছি সৎকর্মশীল উতবা, শায়বা এবং গোত্রের নিরাপত্তা বিধানকারী তার সন্তানের জন্য। তারা সবাই গালিবের বংশধরের মধ্যে উঁচু মর্যাদার অধিকারী। তাদের সম্মান ও মর্যাদা অনেক।’

বদর যুদ্ধে হিন্দ-এর পিতা ‘উতবা, চাচা শায়বা এবং ভাই নিহত হলো। হিন্দ তাদের স্মরণে মরসিয়া গাইতে থাকেন। তৎকালীন ‘আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহিলা কবি আল-খানসা’। জাহিলী আমলের কোন এক যুদ্ধে তাঁর দু‘ভাই সাখর ও মু‘আবিয়া নিহত হয়। আল-খানসা’ সারা জীবন তাদের জন্য কেঁদেছেন, মাতম করেছেন এবং বহু মর্মস্পর্শী মরসিয়া রচনা করে সমগ্র আরববাসীকে তাঁর নিজের শোকের অংশীদার করে তুলেছেন। এ কারণে ‘উকাজ মেলায় আল-খানসা‘র হাওদা ও তাঁবুর সামনে পতাকা উড়িয়ে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হতো। তিনি বলতেন : আমি আরবের সবচেয়ে বড় মুসীবতগ্রস্ত মানুষ। হিন্দ এসব কথা অবগত হয়ে বলতেন : আমি আল-খানসা’র চেয়েও বড় মুসীবতগ্রস্ত। তারপর তিনিও আল-খানসা’র মত হাওদা বিশেষভাবে চিহ্নিত করার নির্দেশ দেন এবং উকাজে উপস্থিত হন। তিনি বলেন : আমার উট আল-খানসা’র উটের কাছাকাছি নাও। তাই করা হলো। আল-খানসা’র কাছাকাছি গেলে তিনি বললেন : বোন! আপনার পরিচয় কি? বললেন : আমি হিন্দ বিন্‌ত ‘উতবা-আরবের সবচেয়ে বড় মুসীবতগ্রস্ত মানুষ। আমি জানতে পেরেছি, আরববাসীর নিকট নিজেকে আপনি সবচেয়ে বড় বিপদগ্রস্ত মানুষ হিসেবে তুলি ধরেছেন। আপনার সেই বিপদটি কি? বললেন :  আমার পিতা ‘আমর, ভাই সাখর ও মু‘আবিয়ার মৃত্যু।

তিনি পাল্টা হিন্দকে প্রশ্ন করলেন : তা আপনার বিপদটা কি? বললেন : আমার পিতা ‘উতবা ও ভাই আল-ওয়ালীদের মৃত্যু। আল-খানসা’ বললেন : এছাড়া আর কেউ আছে? তারপর তিনি আবূ ‘আমর, মু‘আবিয়া ও সাখরের স্মরণে একটি মরসিয়া কবিতা আবৃত্তি করেন।[আ‘লাম আন-নিসা’ -৫/২৩৪]

উহুদের প্রস্তুতি

বদরের পর থেকে কুরাইশদের অন্তরে শান্তি নেই। তাদের নারীরা নিহত পুত্র, পিতা, স্বামী অথবা প্রিয়জনদের স্মরণে শোক প্রকাশ করে চলেছে। তাদের অন্তরে বড় ব্যথা। অতঃপর মক্কার পৌত্তলিকরা বদরের উপযুক্ত বদলা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। মহিলারাও এবার জিদ ধরলো পুরুষদের সঙ্গে যুদ্ধে যাবার। তবে সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যা এবং আরো কিছু অশ্বারোহী ও পদাতিক যোদ্ধা মহিলাদের সঙ্গে নিতে রাজি হচ্ছিল না। হিন্দ ঘর থেকে বেরিয়ে তাদের সামনে দাঁড়ালেন এবং সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যাকে লক্ষ্য করে বললেণ : তুমি তো বদলে প্রাণে বেঁচে গিয়ে নিরাপদে স্ত্রীর নিকট ফিরে এসেছিলে। হাঁ, এবার আমরা যাব এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবো। বদরে যাত্রাকালে আল-জুহফা থেকে তোমরা মহিলাদেরকে ফিরিয়ে দিয়েছিলে, এবার কেউ আর তাদেরকে ফেরাতে পারবে না। সেবার তারা তাদের প্রিয়জনদের হারিয়েছে।

কুরাইশ বাহিনী মক্কা থেকে বের হয়ে মদীনার দিকে চললো। হিন্দ- এর নেতৃত্বে পনেরো জন মহিলাও তাদের সহযাত্রী হলো।[আনসাবুল আশরাফ-১/৩১২-৩১৩; মক্কা থেকে আর যে সকল নারী উহুদে গিয়েছিল তাদের অন্যতম হলো : সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যার স্ত্রী বরযায্‌ বিন্‌ত উমউদ আছ-ছাকাফী, তালহা ইবন আবী তালাহার স্ত্রী সালামা বিন্ত সা‘দ. আল-হারিছ ইবন হিশামের স্ত্রী ফাতিমা বিন্‌ত আল-ওয়ালীদ ইবন আল-মুগীরা ও আমর ইবন আল-আরেস স্ত্রী হিন্দ বিন্‌ত মুনাব্‌বিহ। (আল-ওয়াকিদী, আল-মাগাযী-১/২০২-২০৩] তাদের অন্তরে প্রতিশোধেল আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। বদরে মাহাম্মাদের (সা) চাচা হামযা ইবন আবদিল মুত্তালিব হিন্দ- এর প্রিয়তম ব্যক্তিকে হত্যা করেছে। তাই হিন্দ হাবশী ক্রীতদাস ওয়াহশীকে নানা রকম অঙ্গীকার করে উত্তেজিত ও উৎসাহিত করেছেন। সে যদি হামযাকে হত্যা করতে পারে তাহলে তিনি তাকে প্রচুর স্বার্ণ, অলঙ্কার ও অর্থ দিবেন। উল্লেখ্য যে, এই ওয়াহশী ছিলেন জুবায়র ইবন মুতইমের ক্রীতাদাস।

উহুদের ময়দানে উভয় বাহিনী পরস্পর মুখোমুখি হলো। উভয় পক্ষ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে। কুরাশিরা বদর ও সেখানে নিহতদের স্মৃতিচারণ করছে। হিন্দ- এর নেতৃত্বে কুরাইশ নারীরা দফ তবলা বাজিয়ে নিম্নের এ গানটি গাইতে গাইতে তাদের সারিবদ্ধ সৈনিকদের সামনে দিয়ে চক্কর দিতে লাগলো।[আ‘লাম আন-নিসা’- ৫/২৪৪; বিভিন্ন বর্ণনায় গানটির কিছু পার্থক্য দেখা যায়। ](আরবী***********)

‘তারকার কন্য মোরা, নিপুপ চলার ভঙ্গি। সামনে যদি এগিয়ে যাও জড়িয়ে নেবো বুকে। আর যদি হটে  যাও পিছে, পৃথক হয়ে যাব চিরদিনের তরে।’ অপরদিকে মুসলমানরা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ও তাঁর সাহায্যকে স্মরণ করছে। হযরত রাসূলে কারীম (সা) কিছু দক্ষ তীরন্দাযকে পাহাড়ের উপর একটি নির্দিষ্ট স্থানে নিয়োগ করলেন  এবং গোটা বাহিনীকে এমনভাবে সাজালেন যে, কেউ ভুল না করলে আল্লাহর ইচ্ছায় বিজয় অবধারিত।

যুদ্ধ শুরু হলো। প্রথম দিকে পৌত্তলিক বাহিনীর পরাজয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠলো। মুসলিম বাহিনী বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেল। কুরাইশ বাহিনী বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়লো। কুরাইশ রমণীরা হেয়, লাঞ্ছিত অবস্থায় যুদ্ধবন্দিনী হতে চলছিল। যুদ্ধেল এমন এক পর্যায়ে কিছু মুসলিম সৈনিক শত্রুপক্ষের পরিত্যক্ত জিনিসপত্র সংগ্রহে মনোযোগী হয়ে পড়লো, আর পাহাড়ের উপর নিয়োগকৃত তীরন্দায বাহিনীল কিছু সদস্য রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশের কথা ভুলে গিয়ে স্থান ত্যাগ করলো। মুহূর্তের মধ্যে যুদ্ধের রূপ পাল্টে গেল। পলায়নপর পৌত্তলিক বাহিনী মুসলমানদের এই দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ করলো। তারা ফিরে দাঁড়িয়ে পাল্টা আক্রমণ করে বসলো। মুসলিম বাহিনী হতচকিত হয়ে পড়লো। আবার যুদ্ধ শুরু হলো। বহু হতাহতকসহ সত্তর (৭০) জন মুসলিম সৈনিক শাহাদাত বরণের মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটলো। ওয়াহশীর হাতে হযরত হামযা (রা) শহীদ হলেন।

কুরাইশরা আনন্দ-উল্লাসে ফেটে পড়লো। বদরের কঠিন বদলা নিতে পেরেছে মনে করে আত্মতৃপ্তি অনুভব করলো। সবচেয়ে বেশী খুশী হলেন হিন্দ। হামযার (রা) হত্যায় তিনি তুষ্ট হতে পারলেন না। তিনি কুরাইশ নারীদের সঙ্গে নিয়ে নিহত মুসলিম সৈনিকদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং তাঁদের এবং তাঁদের নাক, কান, হাত, পা ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে চরমভাবে বিকৃতি সাধন করলেন।

আল-বালাযুরী হিন্দ- এর নৃশংসতার বিবরণ দিতে গিয়ে বলেছেন : ‘ওয়াহশী হযরত হামযাকে হতৎ্যা করে তাঁর বুক চিরে কলিজা বের করে এনে হিন্দ এর হাতে দেয়। হিন্দ সেই কলিজা দাঁত দিয়ে চিবিয়ে থুথু করে ফেলে দেন। তারপর নিজে গিয়ে কেটে-কুটে হামযার (রা) দেহ বিকৃত করে ফেলেন। হিন্দ তাঁর দেহ থেকে দু‘হাতের কব্জী, পাকস্থলী ও দু‘ পা কেটে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। তরপর ফিরে এসে নিজের অঙ্গ থেকে মূল্যবান রত্নখচিত স্বর্ণের অলঙ্কার, যথা পায়ের খাড়ু, গলার হার ও কানের ‍দুল খুলে ওয়াহশীর হাতে তুলে দেন। পায়ের আঙ্গুলে পরিহিত স্বর্ণের আংটিগুলিও খুলে তাকে দিয়ে দেন। কারণ, এই হামযা বদর যুদ্ধে তার বাবা ‘উতবাকে হত্যা করেছিলেন। [আনসাব আল-আশরাফ-১/৩২২]

হযরত হামযার (রা) কলিজা চিবানোর কথা শুনে হযরত রাসূলে কারীম (সা) বলেন : যদি হিন্দ হামজার কলিজা চিবিয়ে গিলে ফেলতো তাহলে জাহান্নারেম আগুন তাকে স্পর্শ করতো না। আল্লঅহ রাব্বুল ‘আলামীন জাহান্নামের আগুনের জন্য হামযার  গোশ্‌ত স্পর্শ করা নিষিদ্ধ করেছেন।[আ‘লাসি আন-নিসা’-৫/২৪৫]

সে এমনই এক নিষ্ঠুর ও অমানবিক কাজ ছিল যার দায়ভার কুরাইশ দলপতি আবূ সফইয়ানও নিতে অস্বীকার করেন। তিনি একজন মুসলমানকে লক্ষ্য করে বলেন, আল্লাহর কসম! তোমাদের যে বিকৃত সাধন করা হয়েছে তাতে যেমন আমি খুশী নই, তেমনি অখুশীও নই। আমি কাউকে বারণও করিনি, আবার করতেও বলিনি। সবকিছু শেষ করে হিন্দ একটি উঁচু পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে নিম্নের চরণগুলি উচ্চারণ করেন :[ আয-যাহাবী, তারীখ-২/২০৫] (আরবী**********)

‘আমরা তোমাদেরকে বদরের বদলা দিয়েছি। একটি যুদ্ধের পর আরেকটি যুদ্ধ হয় আগুনওয়ালা। আমার পিতা ‘ইতবা, ভাই, চাচা ও দলের জন্য আমি ধৈর্যহারা হয়ে পড়েছিলাম। আমি আমার অন্তরকে সুস্থ করেছি, অঙ্গীকার পূর্ণ করেছি। হে ওয়াহশী! তুমি আমার অন্তরকে রোগমুক্ত করেছো।’

বদরের ক্ষতি, অপমান ও লজ্জা অনেকটা পুষিয়ে নিয়ে অন্তরভরা আনন্দ-খুশী সহকারে কুরাইশরা ফিরে চললো। হিন্দ তখন গাইতে লাগলেন : [সীরাতু ইবন হিশাম-২/১৬৮] (আরব**********)

‘আমি ফিরে চলেছি, অথচ আমার অন্তরে রয়েঠে বহু পুঞ্জিভীত ব্যথা। আমার উদ্দেশ্য যা ছিল তার কিছু অর্জনে ব্যর্থ হয়েছি। তবে আমি কিছু অর্জন করেছি। আমার উদ্দেশ্য এবং আমার চলার  পথে যেমনটি আমি আশা করেছিলাম তেমনটি হয়নি।’

মদীনাবাসীদের সঙ্গে সংঘাত-সংঘর্ষের মধ্য কুরাইশদের বেশ কয়েকটি বছর কেটে গেল।

খন্দকের যুদ্ধ, হুদাইবয়অর সন্ধি এবং সবশেষে মক্কা বিজয়। কোন উপায় না দেখে রাসূলুল্লাহর (সা) মক্কায় প্রবেশের আগের দিন কুরাইশ নেতা হিন্দ-এর স্বামী আবূ সুফইয়ান গেলেন রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট মক্কাবাসীদের নিরাপত্তার বিষয়ে আলোচনার জন্য। সেখানেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করে মক্কায় ফিরে এসে ঘোষণা দেন : ওহে কুরাইশ সম্প্রদায়! তোমরা শুনে রাখ, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি। তোমরাও ইসলাম গ্রহণ কর। কারণ, মুহাম্মাদ তোমাদের নিকট এসে গেছেন এমন শক্তি-সামর্থ্য নিয়ে যার ধারণাও তোমাদের নেই। সঙ্গে সঙ্গে হিন্দ তার মাথাটি সজোরে চেপে ধরে বলেন : তুমি সম্প্রদায়ের একজন নিকৃষ্ট নেতা। তারপর হিন্দ মক্কাবাসীরেদ প্রতি শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এবং মাহাম্মাদকে (সা) হত্যা করতে আহ্বান জানান।[আ‘লাম আন-নিসা’ -৫/২৪৫]

ইসলাম গ্রহণ ও বায়‘আত

এ ব্যাপারে সকল বর্ণনা একমত যে, মক্কা বিজয়ের দিন হিন্দ-এর স্বামী আবূ সুফইয়ানের ইসলাম গ্রহণের পর হিন্দ ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি খুব ভালো মুসলমান হয়েছিলেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে বিভিন্ন সূত্রে যে সকল তথ্য বর্ণিত হয়েছে তা একত্রিত করলে নিম্নের রূপ ধারণ করে :

হিন্দ আবূ সুফইয়ানকে বললেন ; আমি ইচ্ছা করেছি, মুহাম্মাদের অনুসারী হবো।

আবূ সুফইয়ান : গতকালও তো দেখলাম তুমি এ কাজকে ভীষণ অপছন্দ করছো।

হিন্দ : আল্লাহর কসম! আমার মনে হয়েছে, গত রারে পূর্বে এই মসজিদে আর কোন দিন আল্লাহর সত্যিকার ইবাদাত হয়নি। তারা কিয়াম, রুকূ‘ ও সিজদার মাধ্যমে নামায আদায়েল উদ্দেশ্যেই সেখানে এসেছে ।

আবূ সুফইয়ান : ‍তুমি যা করার তাতো করেছো। তুমি তাঁর নিকট যাওয়ার সময় তোমার গোত্রের কাউকে সঙ্গে নিয়ে যাবে।[মক্কা বিজয়ের দিন রাসূল (সা) ছয়জন পুরুষ ও চরজন মহিলাকে ক্ষমার আওতার বাইরে রাখেন এবং তাদেরকে নাগালের মধ্যে পাওয়া মাত্র হত্যার নির্দেশ দেন। পুরুষরা হলো :‘ইকরামা ইবন আবী জাহ্‌ল, হাব্বাব ইবন আল-আসওয়অদ, ‘আবদুল্লাহ ইবন সা‘দ ইবন আবী সারাহ, ‍মুকায়্যিস ইবন সুবাবা, আল-হুয়ায়রিছ ইবন নুকায়য। মহিলারা হলো : হিন্দ বিন্‌ত ‘উতবা, আমর ইবন হাশিম ইবন ‘আবদুল মুত্তালিবের দাসী সাবা,ম হিলাল ইবন ‘আবদিল্লাহর দু‘জন গায়িকা- ফারতানা ও আরনা। এ দু‘ গায়িকা রাসূলুল্লাহর (সা) নিন্দামূলক গান গেয়ে বেড়াতো। (আনসাব আল-আশরাফ-১/২৫৭; নিসাৎ মিন ‘আসর আন-নুবাওয়াহ্‌-৪৮৬) ইবন হাজার এর বাইরে আরো কিছু নারী-পুরষের নাম উল্লেখ করেছেন। (ফাতহুল বারী-৮/১১-১২)]

এ কথার পর হিন্দ ‘উছমান, মতান্তরে ‘উমারের (রা) নিকট যান। তখন হিন্দ-এর সঙ্গে ইতিপূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছেন এমন কিছু মহিলাও ছিলেন। ‘উছমান (রা) গিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) সঙ্গে সাক্ষাতে অনুমতি নিয়ে এলেন। হিন্দ-এর ভয় ছিল, হামযার (রা) সাথে তাঁর আচরণের জন্য রাসূল (সা) তাঁকে পাকড়াও করতে পারেন, তাই মাথা-মুখ ঢেকে অপরিচিতের বেশে রাসূলের (সা) নিকট প্রবেশ করেন।

তাঁর সঙ্গে গেলেন আরো অনেক মহিলা। উদ্দেশ্য তাঁদের, রাসূলুল্লঅহর (সা) হাতেক বাই‘য়াত হওয়া। তঁরা যখন রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে পৌঁছলেন তখন তাঁর নিকট বসা তাঁর দুই বেগম, কন্যা ফাতিমা ও বানূ ‘আবদিল মুত্তালিবের আরো অনেক মহিলা। মাথা ও মুখ ঢাকা অবস্থায় হিন্দ কথা বললেণ : রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে। উহুদের যুদ্ধে হযরত হামযার (রা) কলিজা চিবিয়েছিলেন তাই আজ বড় লজ্জা ও অনুশোচনা। মাথা ও মুখ ঢাকা অবস্থায় বললেন :

‘ইয়অ রাসূলাল্লাহ! সেই আল্লাহর প্রশংসা, যিনি তাঁর মনোনীত দীনকে বিজয়ী করেছেন। আপনার ও আমার মাঝে যে আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে সে সূত্রে আমি আপনার নিকট ভালো ব্যবহার আশা করি। এখন আমি একজন ঈমানদার ও বিশ্বাসী নারী- একথা বলেই তিনি তাঁর অবগুণ্ঠন খুলে পরিচয় দেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি হিন্দ বিন্‌ত ‘উতবা। রাসূল (সা) বললেন : খোশ আমদেদ। হিন্দ বললেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর কসম! হেয় ও অপমান করার জন্য আপনার বাড়ীর চেয়ে আমার নিকট অধিক প্রিয় বাড়ী ধরাপৃষ্ঠে এর আগে আর ছিল না। আর এখন আপনার বাড়ীর চেয়ে অধিক সম্মানিত বাড়ী আমার নিকট দ্বিতীয়টি নেই।[আসহাবে রাসূলের জীবনকথা-১/২০৫]

রাসূল (সা) বললেন : আরো অনেক বেশী। তারপর তিনি তাদেরকে কুরআন পাঠ করে শোনান এবং বাই‘আত গ্রহণ করেন। রাসূল (সা) বললেন : তোমরা একথার উপর অঙ্গীকার কর যে, আল্লাহর সাথে আর কোন কিছুকে শরীক করবে না।

হিন্দ বললেন : আপনি আমাদের থেকে এমন অঙ্গীকার নিচ্ছেন যা পুরুষদের থেকে নেন না। তা সত্ত্বেও আমরা আপনাকে এ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।

রাসূল (সা) : তোমরা চুরি করবে না।

হিন্দ : আল্লাহর কসম! আমি আবূ সুফইয়ানের অর্থ-সম্পদ থেকে মাঝে মাঝে কিছু নিয়ে থাকি। আমি জানিনে, তাকি আমার জন্য হালাল হবেচ, নাকি হারাম হবে।

পাশে বসা আবূ সুফইয়ান বলে উঠলেন : অতীতে তুমি যা কিছু নিয়েছো তাতে তুমি হলালের মধ্যে আছ। রাসূল (সা) বললেন : তুমি তো হিন্দ বিন্‌ত ‘উতবা।

হিন্দ : হাঁ, আমি হিন্দ বিন্‌ত ‘উতবা। আপনি আমার অতীতের আচরণকে ক্ষমা করে দিন। আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন।

রাসূল (সা) বললেন : তোমরা ব্যভিচার করবে না।

হিন্দ : ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোন মুক্ত-স্বাধীন নারী কি ব্যভিচার করে?

রাসূল (সা) : তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না।

হিন্দ বললেন : আমরা তো তাদেরকে শিশুকালে লালন-পালন করেছি। আপনি তাদের বড়দেরকে বদরে হত্যা করেছেন। সুতরাং আপনি এবং তারা এ বিষয়টি ভালো জানেন।

তাঁর এবখা শুনে ‘উমার (রা) হেসে দেন।

রাসূল (সা) : কারো প্রতি বানোয়অট দোষারোপ করবে না।

হিন্দ : কারে প্রতি দোষারোপ কর দারুণ খারাপ কাজ।

রাসূল (সা): কোন ভালো কাজে আমার অবাধ্য হবে না।

হিন্দ : আমরা এই মজলিসে বসার পরও কোন ভালো কাজে আপনার অবাধ্য হবো?

রাসূল (সা) ‘উমারক বললেন : তুমি এই মহলাদের বাই‘আত গ্রহণ কর এবং তাদের মাগফিরাত কামনা করে আল্লাহর নিকট দু‘আ কর।

‘উমার (রা) তাঁদের বাই‘আত গ্রহণ করলেন। রাসূল (সা) মহিলাদের সাথে করমর্দন করতেন ন। তিনি তাঁর জন্য বৈধ অথবা মাহরিম নারী ছাড়া অন্য কোন নারীকে স্পর্শ করতেন না। তেমনি তাদেরকে স্পর্শ করার সুযোগও দিতেন ন। তাই হিন্দ যখন বললেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা আপনাকে স্পর্শ করতে চাই। বললেন : আমি মহিলাদের সঙ্গে করমর্দন করি না। একজন নারীর জন্য আমার যে বক্তব্য, এক শো’ নারীর জন্য আমার বক্তব্য একই।

অতঃপর রাসূল (সা) আবূ সুফইয়ান ও হিন্দ-এর পূর্বের বিয়েকে বহাল রাখেন।[তাবাকাত-৮/২৩৬, ২৩৭; আত-তাবারী, তারীখ-২/১৬১, ১৬২; আল-ইসতীআব-৪/৪১১; উসুদুল গাবা-৪/৪/৪০৯; আস-সীরাহ্‌ আল-হালবিয়্যাহ্‌-৩/৪৬, ৪৭; এছাড়া বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসাঈসহ বিভিন্ন গ্রন্থে ঘটনাটি কমবেশী বর্ণিত হয়েছে।]

নারী জাতির মধ্যে হিন্দ-এর ব্যক্তিত্বে ছিল এক বিশেষ বৈশিষ্ট্যের ছাপ। তাঁর মধ্যে ইসলাম প্রবেশ করার পর তাঁর অন্তরের সকল পঙ্কিলতা  দূর করে দেয়, সাহাবিয়া সমাজে তিনি এক অনন্য মহিলা রূপে আত্মপ্রকাশ করেন। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর মূর্খতার আবরণ এবং বিবেক ও চেতনাকে আচ্ছাদনকারী সকল অসত্য ও অসারতাকে দূর করে পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন করে দেন। ইসলাম গ্রহণের পর আর কখনো কোন ভ্রান্ত বিশ্বাসের কাছে নত হননি। ইসলামী বিশ্বাসকে তিনি বাস্তবে রূপদান কনে। ইসলাম পূর্ববর্তী জীবনে তাঁর গৃহে একটি মূল্যবান বিগ্রহ ছিল। ইসলাম গ্রহণ করে ফিরে গিয়ে- তোমার ব্যাপারে আমরা একটা ধোঁকার মধ্যে ছিলাম- একথা বলতে বলতে কুড়াল দিয়ে ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলেন।[তাহযীব আল-আসমা’ ওয়াল লুগাত-২/৩৫৭; তাবাকাত-৮/২৩৭; আনসাবুল আশরাফ-১/৩৬০]

একথা প্রতীয়মান হয় যে, হিন্দ ভদ্রতা ও শিষ্টচারিতার গুণে গুণান্বিত ছিলেন। ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহর (সা) রিসালাতহকে সত্য বলে মেনে নেওয়ার পর রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট উপহার পাঠান। রাসূল (সা) তাঁর দু‘আ করেন। এ প্রসঙ্গে ইবন আসাকির বলেন : ইসলাম গ্রহণের পর হিন্দ দু‘টি ভূনা বকরীর বাচ্চা এবং মশক পানি তাঁর দাসীর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট পাঠান। রাসূল (সা) তখন আল-আবতাহ উপত্যকায় অবস্থান করছিলেন। রাসূলের (সা) সঙ্গে তখন উম্মু সালাম, মায়নূনাসহ বানূ ‘আবদিল মুত্তালিবের আরো কিছু মাহিলা ছিলেন।  খাবারগুলি রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে উপস্থাপন করে দাসীটি বললো : এই উপহারটুকু আমার মনিবা পাঠিয়েছন এবং বিনয়ের সাথে এ অক্ষমতার কথাও বলেছেন : বর্তমান সময়ে আমাদের ছাগীগুলি কমই মা হচ্ছে। রাসূল (সা) বললেন : আল্লাহ তোমাদের ছাগলে বরকত দিন এবং মায়ের সংখ্যা বাড়িয়ে দিন।

দাসী ফিরে গিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) দু‘আর কথা হিন্দকে অবহিত করলে তিনি ভীষণ খুশী হন। পরবর্তীকালে দাসীটি বলতেন, আমরা আমাদে ছাগল ও তার মায়ের সংখ্যা এত বেশী হতে দেখেছি যা পূর্বে আর কখনো হয়নি। হিন্দ বলতেন : এটা রাসূলুল্লা্হর (সা) দু‘আ ও তাঁর বরকতে হয়েছে। সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাদেরকে ইসলামের হিদায়াত দান করেছেন। তারপর তিনি এই স্বপ্নের কথা বলতেন : আমি স্বপ্নের মধ্যে দেখেছিলাম, অনন্তকাল ধরে রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। ছায়া আমার নিকটেই, কিন্তু সেখানে যেতে সক্ষম হচ্ছি না। যখন রাসূল (সা) আমাদের কাছে আসলেন, দেখলাম, আমি যেন ছায়ায় প্রবেশ করলাম।[তারীখু দিমাশ্‌ক, তারাজিম আন-নিসা’-৪৫৬, ৪৫৭]

হিন্দ-এর জ্ঞানগর্ভ বাণী

হিন্দএর মুখ-নিঃসৃত অনেক জ্ঞানগর্ভ বাণী আছে যা প্রায় প্রবাদ-প্রবচনে পরিণত হয়েছে। শব্দ এত যাদুকারী ও ভাব এত উন্নতমানের যে, তা দ্বারা তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা ও চমৎকার চিন্তা ও অনুধ্যান ক্ষমতা প্রমাণিত হয়। এই জীবনের রঙ্গমঞ্চ সম্পর্কে তাঁর ব্যাপক অভিজ্ঞতা, সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা, দূরদর্শিতা, সত্যকে মেনে নেওয়ার ক্ষমতা ইত্যাদি গুণের কথাও তা দ্বারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ কারণে ইবনুল আছীর তাঁর পরিচয় দিয়েছেন এভাবে : [উসুদুল গাবা-৫/৫৬৩] (আরবী********)

‘তিনি ছিলেন একজন প্রাণসত্তার অধিকারিণী, আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্না, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা সম্পন্না এবং বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার অধিকারিণী মহিলা।’

যেমন তিনি বলেছেন : ‘নারী হলো  বেড়ি। তার জন্য অবশ্যই একটি কণ্ঠের প্রয়োজন। তোমার কণ্ঠে ধারণ করার পূর্বে ভালো করে দেখে নাও, কাকে ধারণ করছো।’ তিনি আরো বলেছেন : ‘নারীরা হলো বেড়ি। প্রত্যেক পুরুষ অবশ্যেই তার হাতের জন্য একটি বেড়ি ধারণ করবে।’[আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-৩/২৬৭; আল-আ‘লাম-৮/৯৮]

পরবর্তীকালের ঘটনা। খলীফা ‘উমারের খিলাফতকাল, মক্কায় আবূ সুফইয়ানের (রা) বাড়ীর দরজহার সামনে দিয়ে পানি গড়িয়ে যেত। হাজীদের চলাচলের সময় তাদের পা পিছলে যেত। ‘উমার (রা) তাঁকে এভাবে পানি গড়ানো বন্ধ করতে বলেন। আবূ সুফইয়ান (রা) ‘উমারের (রা) কথার গুরুত্ব দিলেন না। এরপর ‘উমার (রা) একদিন সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই দরজার ভিজে স্থনটিতে তাঁর পা পিছলে গেল। তিনি হাতের চাবুকটি আবূ সুফইয়ানের (রা) মাথার উপর উঁচু করে ধরে বলেন : আমি  কি আপনাকে এই পানি গড়ানো বন্ধ করতে বলিনি? আবূ সুফইয়ান সঙ্গে সঙ্গে নিজের শাহাদাত আঙ্গুলি দ্বারা নিজের মুখ চেপে ধরেন। তখন ‘উমার (রা) বলেন : ‘সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাকে এমনও দেখালেন যে, আমি মক্কার বাতহা’ উপত্যকায় আবূ সুফইয়ানকে পিটাচ্ছি, অথচ তাঁর সাহায্যকারী নেই, আমি তাঁকে আদেশ করছি, আর তিনি তা পালন করছেন।’ উমারের এ মন্তব্য শুনে হিন্দ বলে ওঠেন : ওহে ‘উমার! তাঁর প্রশংসা কর। তুমি তাঁর প্রশংসা করলে তোমাকে অনেক বড় কিছু দেওয়া হবে।

হযরত ‘উমার ইবন আল-খাত্তাব (রা) যখন ইয়াযীদ ইবন আবী সুফইয়ানকে (রা) শামের ওয়ালী নিয়োগ করেন তখন মু‘আবিয়া (রা) ইয়াযীদের সংগে শামে যান। এ সময় আসূ সুফইয়ান (রা) একদিন হিন্দকে (রা) বলেন : এখন যে তোমার ছেলে মু‘আবিয়া আমার ছেলে ইয়াযীদের অধীন থাকবে- এটা তোমার কেমন লাগবে? হিন্দ বললেন : যদি আরব ঐক্যে অস্থিরতা দেখা দেয় তখন দেখেবে আমার ছেলে এবং তোমার ছেলের অবস্থান কি হয়। উল্লেখ্য যে, ইয়াযীদ (রা) ছিলেরন আবূ সুফইয়ানের (রা) অন্য স্ত্রীর সন্তান। এর অল্পকাল পরে ইয়াযীদ (রা) শামে মারা যান। ‘উমার (রা) তাঁর স্থলে মু‘আবিয়াকে (রা) নিয়োগ করেন। এ নিয়োগ লাভের পর হিন্দ মু‘আমিয়াকে (রা) বলেন : আমার ছেলে! আল্লাহর কসম! আরবের স্বাধীন নারীরা তোমার মত সন্তান খুব কম জন্ম দিয়েছে। এ ব্যক্তি তোমাকে টেনে তুলেছে। সুতরাং তোমার পছন্দ হোক বা অপছন্দ হোক তুমি তাঁর মর্জি মত কাজ করবে। হযরত হিন্দ- বিভিন্ন সময়ের এ জাতীয় মন্তব্য ও আচরণ দ্বারা বুঝা যায় হযরত ‘উমারের (রা) প্রতি ছিল তাঁর দারুণ শ্রদ্ধাবোধ। সব সময় তাঁকে সম্মান ও মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতেন।

হিন্দ একবার খলীফা ‘উমারের (রা) নিকট গিয়ে বাইতুল মাল থেকে চার হাজার দিরহাম ঋণের আবেদন জানিয়ে বললেন, এদিয়ে আমি ব্যবসা করবো এবং ধীরে ধীরে পরিশোধ করবো।  খলীফা তাঁকে ঋণ দিলেন। তিনি সেই অর্থ নিয়ে কালবে গোত্রের এলাকায় চলে যান এবং সেখানে কেনাবেচা করতে থাকেন। এর মধ্যে তিনি খবর পেলেন আবূ সুফইয়ান ও তাঁর ছেলে ‘আমর ইবন আবী সুফইয়ান এসেছেন মু‘আবিয়ার (রা) নিকট। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মু‘আবিয়ার (রা) নিকট চলে যান।

উল্লেখ্য যে, আগেই আবূ সুফইয়ানের (রা) সাথে তাঁর দূরত্বের সৃষ্টি হয়।

মু‘আবিয়া (রা) মায়েল এভাবে আসার কারণ জানতে চান। হিন্দ বলেন : আমি তোমাকে নজরে রাখার জন্য এসেছি। ‘উমার তো কেবল আল্লাহর জন্য কাজ করেন। এদিকে তোমার বাবা এসেছেন তোমার নিকট। আমার ভয় হলো তমি সবকিছু তাঁর হাতে উঠিয়ে না দাও। মানুষ জানত পারবে না তুমি এসব জিনিস কোথা থেকে তাঁকে দিচ্ছো। পরে ‘উমার তোমাকে পাকড়াও করবেন। মু‘আবিয়া (রা) বাবা ও ভাইকে একশো দীনারসহ কাপড়-চোপড় ও বাহন দিলেন। ভাই আমর এ দানকে যথেষ্ট বলে মনে করলেন।

আবূ সুফইয়ান বললেন : একে বড় দান মনে করো না। হিন্দ-এর অগোচরে এ দান দেওয়া হয়নি। আর এই যে, সুন্দর পোশাক, এগুলো হিন্দ এনেছে। এরপর তাঁরা সবাই মদীনায় ফিরে আসেন। এক সময় আবূ সুফইয়ান হিন্দকে জিজ্ঞেস করেন : ব্যবসায়ে কি লাভ হয়েছে? হিন্দ বলেন : আল্লাহই ভালো জানের। মদীনায় আমার কিছু ব্যবসা আছে। মদীনায় এসে হিন্দ তাঁর পণ্য কিক্রি করলেন এবং ‘উমারের (রা) নিকট গিয়ে ব্যবসায়ে তাঁর লোকসানের কথা জানালেন। ‘উমার বললেন : তোমাকে দেওয়া অর্থ যদি আমার হতো আমি ছেড়ে দিতাম। কিন্তু এ অর্থ তো মুসলমানদের। আর এই যে, সুন্দর পোশাক তুমি আবূ সুফইয়ানকে দিয়েছিলে তাতে এখনো তার নিকট আছে। তারপর ‘উমার (রা) লোক পাঠিয়ে আবূ সুফইয়ানকে গ্রেফিতার করেন। হিন্দ-এর নিকট থেকে পাওনা উসূল করে তাঁকে ছেড়ে দেন। ‘উমার (রা) আবূ সুফইয়ানকে (রা) জিজ্ঞেস করেন : মু‘আবিয়া আপনাকে নগদ কত দিয়েছে? আবূ সুফইয়ান বলেন : এক শো দীনার।[আ‘লাম আন-নিসা‘-৫/২৪৯]

“আল-‘ইকদ আল-ফারীদ” গ্রন্থে এসেছে। আবূ সুফইয়ান মু‘আবিয়ার নিকট থেকে মদীনায় এসে ‘উমারের (রা) নিকট গিয়ে বলেন : আমাকে কিছু দান করুন। ‘উমার (রা) বললেন : আপনাকে দেওয়ার মত আমার নিকট তেমন কিছু নেই। ‘উমার (রা) সীল মোহর একজনের হাতে দিয়ে হিন্দ-এর নিকট পাঠালেন। তাঁকে বলে দিলেন : ‍তুমি তাকে বলবে, যে দু‘টি পাত্র তুমি নিয়ে এসেছো, তা আবূ সুফইয়ান পাঠিয়ে দিতে বলেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে পাত্র দু‘টি উমারের (রা) নিকট নিয়ে আসা হলো। তার মধ্যে দশ হাজার দিরহাম ছিল। ‘উমার (রা) পাত্রসহ দিরহামগুলো বাইতুল মালে পাঠিয়ে দিলেন। ‘উমারের (রা) পর ‘উছমান (রা) খলীফা হলেন। তিনি সেই অর্থ আবূ সুফইয়ানকে (রা) ফেরত দিতে চাইলেন। কিন্তু আবূ সুফইয়ান তা নিতে অস্বীকৃতি জানান এই বলে : যে, অর্থের জন্য ‘উমার আমাকে তিরস্কার করেছেন তা আমি অবশ্যই নেব না।[প্রাগুক্ত; আল-‘ইকদ আল-ফারীদ-১/৪৯]

হিন্দগ ও মু‘আবিয়া

হিন্দ-এর ছেলে মু‘আবিয়অ (রা) দুধ পান করানো অবস্থায়ই তিনি ছেলেকে আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন, উদার, ভদ্র তথা বিভিন্ন গুণে গুণনান্বিত করে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তিনি ছেলেকে শিশুকারে কোলে করে নাচাতে নাচাতে নিম্নের চরণগুলি সুর করে আবৃত্তি করতেন। [নিসা‘ মিন ‘আসর আন-নুবুওয়াহ্‌-৪৮০]

(আরবী***********)

‘আমার ছেলে সম্ভ্রান্ত মূল বা খান্দানের। তার পরিবারের মধ্যে অতি প্রিয় ও বিচক্ষণ। সে অশ্লীল কর্ম সম্পাদনকারী নয় এবং নীচ প্রকৃতিরও নয়। ভীরু ও তাপুরুশ নয় একং অশুভ ও অকল্যাণের প্রতীকও নয়। বানূ ফিহরের শীলা, তাদের নেতা। মানুষের ধারণা ও অনমানকে সে মিথ্যা হতে দেয় না এবং ভীত হয়ে পালিয়েও যায় না।’

মু‘আবিয়া (রা) যখন ছোট্ট শিশুটি তখন একদিন একটি লোক তাঁকে দেখে মন্তব্য করে : আমার বিশ্বাস এই ছেলেটি তার জাতির নেতৃত্ব দিবেই।[আল-‘ইকদ আল-ফারীদ-২/২৮৭; ‘উয়ূন আল-আখবার-১/২২৪]

ইয়াযীদ ইবন আবী সুফইয়ানের মৃত্যুর পর অনেকে বলাবলি করতে লাগলো, আমরা আশা করি মু‘আবিয়া হবে ইয়াযীদের যোগ্য উত্তরসূরী। একথা শুনে হিন্দ মন্তব্য করেন : মু‘আবিয়ার মত মানুষ কারো উত্তরসূরী হয় না। আল্লাহর কসম! গোটা আরব ভূমিকে যদি এক সঙ্গে মিলিত করা হয় এবং তার মাঝখানে তাকে ছুড়ে ফেলা হয় তাহলে যেদিক দিয়ে ইচ্ছো সে বেরিয়ে আসতে পারবে।[আল-‘ইকদ আল-ফারীদ -৩/১৪] একবার তাঁকে বলা হলো : মু‘আবিয়া যদি বেঁচে থাকে তাহলে তার জাতিকে শাসন করবে। হিন্দ বললেন : তার সর্বনাশ হোক! যদি সে তার জাতিকে ছাড়া অন্যদের শাসন না করে। একবার তিনি শিশু মু‘আবিয়াকে নিয়ে তায়িফ যাচ্ছেন। উটের পিঠে হাওদার সামনের দিকে মু‘আবিয় বসা। এক আরব বেদুঈন তাকে দেখে হিন্দকে বলে : আপনি শিশুটিকে দু‘হাত দিয়ে ভালো করে ধরে রাখুন এবং তাকে যত্নের সাথে প্রতিপালন করুন। কারণ ভবিষ্যতে এ শিশু একজন বড় নেতা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী ব্যক্তি হবে। হিন্দ তার কথার প্রতিবাদ করে বলেন : না, বরং সে একজন উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন বাদশাহ এবং দানশীল ব্যক্তি হবে।[আ‘লাম আল-নিসা’-৫/২৫০]

হযরত মু‘আবিয়অ (রা) তাঁর ময়ের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন : হিন্দ ছিলেন জাহিলী যুগে কুরাইশদের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং ইসলামী যুগে একজন সম্মানিত অভিজ্ঞ মহিলা। হযরত মু‘আবিয়অ (রা) ছিলেন আরবের অন্যতাম শ্যেষ্ঠ বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান, মেধাবী ও দক্ষ মানুষ। তিনি তাঁর যাবতীয় গুণ পিতার চেয়ে মায়েল নিকট থেকেই বেশী অর্জন করেন। হযরত মু‘আবিয় (রা) পরবর্তী জীবনে কোথাও নিজের গুণ বৈশিষ্ট্যের প্রসঙ্গ অকপটে মায়েল প্রতিই আরোপ করতেন। প্রতিপক্ষের সমালোচনার জবাবে তিনি গর্বের সাথে প্রায়ই বলতেন : আমি হিন্দ-এর ছেলে।[আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/৯২

হযরত হিন্দ (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) অঙ্গীকারের উপর আমরণ অটল ছিলেন। অক্ষরে অক্ষরে তা পালন করেন। ইয়ারমুক যদ্ধে যোগদান করেন এবং যুদ্ধের ময়দানে সৈনিকদের রোমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তোলেন। ‘উমারের (রা) খিলাফতকালে তিনি ছেলে মু‘আবিয়ার (রা) নিকট যান।[তারীখু দিমাশ্‌ক, তারাজিম আন-নিসা’ -৪৩৭; আল-আ‘লাম-৮/৯৮]

হযরত হিন্দ (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) কয়েকটি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তাঁর সূত্রে মু‘আবিয়া ও উম্মুল মু‘মিনীন ‘আয়িশা (রা) বর্ণনা করেছেন। তাঁর থেকে বর্ণিত হাদীছের একটি এই :[ একমাত্র তিরমিযী ছাড়া সিহাহ সিত্তার অন্য পাঁচটি গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। মুসনাদে আহমাদ-৬/৩৯; তাবাকাত-৮/২৩৭;] (আরবী********)

‘আমি নবীকে (রা) বললাম : আবূ সুফইয়ান একজন কৃপণ ব্যক্তি। তাঁর সম্পদ থেকে তাঁর অগোচরে আমি যা কিছু নিই তাছাড়া তিনি আমার তিনি আমার ছেলে ও আমাকে কিছুই দেন না। এতে কি আমার কোন অপরাধ হবে? তিনি বললেন : তোমার ছেলে ও তোমার প্রয়োজন পূরণ হয় ততটুকু যুক্তিসম্মত ভাবে গ্রহণ কর।’

তবে ইবনুল জাওযী ‘আল-মুজতানা’ গ্রন্থে বলেছেন, হিন্দ রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে সরাসরি কিছু বর্ণনা করেছেন বলে আমাদের জানা নেই।[আ‘লাম আন-নিসা-৫/২৫০]

বিভিন্ন বর্ণনা দ্বারা জানা যায় হিন্দ (রা) খলীফা হযরত ‘উমারের (রা) খিলাফতকালে হিজরী ১৪, খ্রীঃ ৬৩৫ সনে ইনতিকাল করেন। তিনি যে দিন ইনতিকাল করেন সে দিনই হযরত আবূ বকর সিদ্দীকের (রা) পিতা হযরত আবূ কুহাফা (রা) ইনতিকাল করেন।[উসুদুল গাবা-৫৬৩; তাহযীব আল-আসমা’ ওয়াল লুগাত-২/৩৫৭] তবে একথাও বর্ণিত হয়েছে যে, আবূ সুফইয়ান (রা) হযরত ‘উছমানের (রা) খিলাফতকালে ইনতিকাল করলে জনৈক ব্যক্তি হযরত মু‘আবিয়অর (রা) নিকট হিন্দকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালে তিনি ভদ্রভাবে একথা বলে প্রথ্যাখ্যান করেন যে, তিনি এখন বন্ধ্যা হয়ে গেছেন, তাঁর বিয়েল আর প্রয়োজন নেই।[আস-ইসাবা-৪/৪২৬; সাহাবিয়াত -২৭১]

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ