আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – ষষ্ঠ খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

দুররা (রা) বিবিন্‌ত আবী লাহাব


হযরত রাসূলে কারীম (সা) নবুওয়াত লাভের পর তিন বছর যাবত মক্কায় গোপনে ইসলামের বাণী প্রচার করতে থাকেন। অনেকে তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনেন। অনেকের ঈমান আনার কথা প্রকাশ পেলেও অধিকাংশের কথা কুরাশদের নির্যাতনের ভয়ে গোপন থাকে। প্রথম দিকে কুরাইশরা রাসূলের (সা) প্রচারকে তেমন একটা গুরুত্ব দেয়নি। তিন বছর পর হযরত জিবরীল (আ) এসে রাসূলকে (সা) প্রকাশ্যে ইসলামের আহ্বান জানাতে বলেন এবং তাঁকে একথাও জানিয়ে দেন যে, তিনি হলেন একজন প্রকাশ্য সতর্ককারী। ইবন আব্বাস (রা) বলেন : যখন এ আয়াত- (আরবী*********)

‘আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করুন’[সূরা আশ-শু‘আরা-২১৪ ]- নাযিল হলো, রাসূল (সা) সাফা পাহাড়ের চূড়ায় উঠলেন এবং উচ্চকণ্ঠে আহ্বান জানাতে লাগলেন : ওহে ফিহ্‌র গোত্রের লোকেরা, ওহে ‘আদী গোত্রের লোকেরা!

এই আওয়াজ শুনে কুরাইশদের নেতৃস্থানীয় সকল লোক একত্রিত হলো। যিনি যেতে পারলেন না তিনি একজন প্রতিতিনধি পাঠালেন কি ব্যাপার তা জানার জন্য। কুরাইশরা হাজির হলো, আবূ লাহাবও তাদের সঙ্গে ছিল। এরপর তিনি বললেন : তোমরা বলো, যদি আমি বলি যে, পাহাড়ের ওদিকের প্রান্তরে একদল ঘোড়সওয়ার আত্মগোপন করে আছে, তারা তোমাদের উপর হামলা করতে চায়, তোমরা কি সে কথা বিশ্বাস করবে? সবাই বললো, হাঁ বিশ্বাস করবো। কারণ আপনাকে আমরা কখনো মিথ্যা বলতে শুনিনি। নবী (সা) বললেন তবে শোন, আমি তোমাদেরকে এক ভয়াবহ আযাবের ব্যাপারে সাবধান করতে প্রেরিত হয়েছ্ আবূ লাহাব বললো, তুমি ধ্বংস হও। আমাদেরকে কি একথা বলার জন্য এখানে ডেকেছো/

আবূ লাহাব একথা বচলার পর আল্লাহ তা‘আলা সূরা লাহাব নাযিল করেন। তাতে বলা হয় (আরবী*******)

‘আবূ লাহবের দু‘টি হাত ধ্বংস হোক এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক।’[সহীহ মুসলিম-১/১১৪; সহীহ বুখারী-২/৭০৬; তাফসীর আল-খাযিন-৭/৩১১; তাফসীর ইবন কাছীর : সূরা আল-মাসাদ]

দুর্‌রা (রা) ছিলেন এই আবূ লাহাবের কন্যা এবং ‘আব্দুল মুত্তালিব ছিলেন তাঁর দাদা। তিনি মক্কার কুরাইশ খান্দানের হাশিমী শাখার সন্তান এবং হযরত রাসূলে কারীমের (সা) চাচাতো বোন।[উসুদুল গাবা-৫/৪৪৯; আল-ইসতী‘আব-৪/২৯০; সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৭৫] দুর্‌রার (রা) জীবন আলোচনার পূর্বেচ তাঁর পিতা-মাতা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

আবূ লাহাব রাসূলুল্লাহর (সা) এক চাচা। তার আসল নাম ‘আবদুল ‘উয্‌যা ইবন ‘আবদুল মুত্তালিম ইবন হাশি। ভাতিজা মুহাম্মাদের (সা) প্রতি তার ছিল দারুণ ঘৃণা ও বিদ্বেষ। তাঁকে কষ্ট দিতে, তাঁর ধর্ম ও সত্তাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য তার চিন্তা ও চেষ্টার অন্ত ছিল না। দৈহিক সৌন্দর্য ও মুখমণ্ডলের দীপ্তির জন্য তাকে “আবূ লাহাব” (অগ্নিশিখা) বলে ডাকা হতো। অথচ দীপ্তিমান মুখমণ্ডলের অধিকারীর জন্য (আবুন নুর) (আরবী****) অথবা (আরবী****) (আবুদ দিয়া)হওয়া উচিত ছিল; কিন্তু ভবিষ্যতে তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম তাই আল্লাহ প্রথম থেকেই মানুষের দ্বারা তার নাম রেখে দেন আবূ লাহাব।[তাফসীর ইবন কাছীরন; সূরা লাহাব]

আবূ লাহাব হযরত রাসূলে কারীমের (সা) চাচা হওয়া সত্ত্বেও ভাতিজার প্রতি তার বিন্দুমাত্র দয়া-মমতা ছিল না। ভাতিজা নবুওয়অত লাভের দাবী ও প্রকাশ্যে ইসলামের দা‘ওয়অতী কার্যক্রম শুরু করার সাথে সাথে তাদের সম্পর্কে দারুণ অবনতি ঘটে। বাতিজাকে হেয় ও লাঞ্ছিত করার জন্য সে তার পিছে লেগে যায়। তাঁকে কষ্ট দেওয়ার কোন সুযোগ সে হাতছাড়া করতো না। মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করতে বাজার এবং বিভিন্ন জনসমাবেশে তাঁর পিছনে লেগে থাকতো। ইমাম আহমাদ (রা) আবুয যানাদের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। আবুয যানাদ বলেছেন, আমাকে রাবী‘আ ইবন ‘আব্বাদ নামের এক ব্যক্তি, যিনি পর্বর্তীতে ইসলমান গ্রহণ করেন, বলেছেন : আমি একবার যাল-মাজাযের বাজারে নবীকে (সা) দেখলাম, জনতাকে সম্বোধন করে বলেছেন : (আরবী******)

‘ওহে জনমণ্ডলী! তোমরা বল, আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। তোমরা সফলকাম হবে।’ তাঁর চারপাশে জনতার সমাবেশ ছিল। আর তাঁকে অনুসরণ করতো দীপ্তিমান চেহারার এক ব্যক্তি। সে মানুষকে বলতো ‘এ ধর্মত্যাগী মিথ্যাবাদী’। আমি লোকদের নিকট এই লোকটির পরিচয় জানতে চাইলে বললো : সে তাঁর চাচা আবূ লাহব।[প্রাগুক্ত; নিসা মিন ‘আসার আন-নুবাওয়াহ্‌-১৯১]

তারিক ইবন ‘আবদিল্লাহ আল-মুহারিবীর বর্ণনা থেকে জানা যায়, আবূ লাহাব নবীর (সা) কথা মিথ্যা প্রমাণ করতেই শুধু ব্যস্ত থাকতো না বরং তাঁকে পাথরও নিক্ষেপ করতো। এতে নবীর (সা) পায়ের গোড়ালি রক্তাক্ত হয়ে যেত।[তাফহীমুল কুরআন-৬/৫২২; ফী জিলাল আল-কুরআন-৩/২৮২]

শুধু কি তাই? সে মনে করতো তহার অর্থ-সম্পদ তাকে  দুনিয়া ও আখিরাতের সকল অপমান, লাঞ্ছনা ও শাস্তি থেকে রক্ষা করবে। বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (সা) যখন তাঁর সম্প্রদায়কে আল্লহর প্রতি ঈমানের দিকে আহ্বান জানালেন তখন আবূ লাহাব বললো : আমার ভাতিজা যা বলছে তা যদি সত্য হয় তাহলে আমি কিয়ামতের দিন আমার অর্থ-বিত্ত ও সন্তন-সন্ততিদের বিনিময়ে নিজেকে মুক্ত করতে পারবো। সে উপেক্ষা করে আল্লাহ তা‘আলার এ ঘোষণা :[ সূরা আশ-শুআরা-৮৮-৮৯] (আরবী*******)

‘যেদনি ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন কাজে আসবে না। সেদিন উপকৃত হবে কেবল সে, যে আল্লাহর নিকট আসবে বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে।

রাসূলুল্লাহ (সা) নবুওয়াত প্রাপ্তির আগে আবূ লাহাব তুর দুই পুত্র ‘উতবা এবং ‘উতাইবাকে রাসূলেল (সা) দুই কন্য রুকায়্যাকে এবং উম্মু কুলসুমের সাথে বিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু রাসূলের (সা) নবুওয়অত পাওয়ার পর এবং দ্বীনের দাওয়াত প্রচারে শুরুতে আবূ লাহাব নবীর দুই কন্যাকে তালাক দিতে তার দুই পুত্রকে বাধ্য করেছিল।[তাফহীমুল কুরআন-৬/৫২২; ফী জিলাল আল-কুরআন-৩/২৮২]

হযরত রাসূলে কারীমের (সা) দ্বিতীয় পুত্র ‘আবদুল্লাহর ইনতিকালের পর আবূ লাহাব এতো খুশী হয়েছিল যে, তার বন্ধুদের কাছে দৌড়ে গিয়ে গদগদ কণ্ঠে বলেছিল, মুহাম্মাদ অপুত্রক হয়ে গেছে।[তাফহীমুল কুরআন-৬/৪৯০]

আবূ লাহবের স্ত্রী তথা দুর্‌রার (রা) মা উম্মু জামীলের প্রকৃত নাম আরওয়। সে ছিল হারব ইবন উমাই্য়্যার কন্যা এবং আবূ সুফইয়ানের (রা) বোন। হযরত রাসূলে কারীমের (সা) প্রতি শত্রুতার ক্ষেত্রে সে স্বামীল চেয়ে কোন অংশে কম ছিল না। রাসূল (সা) যে পথে চলাফেরা করতেন সেই পথে এবং তাঁর দরজায় কাঁটা বিছিয়েু রাখতো। সে অত্যন্ত অশ্লীল ভাষী এবং প্রচণ্ড ঝেগড়াটে ছিল। নবীকে (সা) গালাগাল দেওয়া এবং কুটনামি, নানা ছুতোয় ঝগড়া, ফেতনা-ফাসাদ এবং সংঘাতময় পরিস্থির সৃষ্টি করা ছিল তার কাজ। এক কথায় সে ছিল নোংরা স্বভাবের এব মহিলা। এ কারণে আল-কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা তার নিন্দায় বলেছেন,

(আরবী*******) –এবং তার স্ত্রীও সে ইন্ধন বহন করে।[সীরাতু ইবন হিশাম-১/৩৫৫]

এই উম্মু জামীল যখন জানতে পালো যে, তাঁর নিজের এবং স্বামীর নিন্দায় আয়াত নাযিল হয়েছে তখন সে রাসূলুল্লাহকে (সা) খুঁজে খুঁজে কা‘বার কাছে এলো, রাসূল (সা) তখন সেখানে ছিলেন। সংগে হযরত আবূ বকর সিদ্দীকও ছিলেন। আবূ লাহাবের স্ত্রীর হাতে ছিল এক মুঠ পাথর। রাসূলের (সা) কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছলে আল্লাহ তার দৃষ্টি কেড়ে নেন। ফলে সে রাসূলকে (সা) দেখতে পায়নি, আবূ বকরকে (রা) দেখছিল। সে আবূ বকরের (রা) সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো, তোমার সাথী কোথায়? আমি শুনেছি তিনি আমার নিন্দা করেছেন। আল্লাহর কসম! যদি তাঁকে পেয়ে যাই তবে তাঁর মুখে এ পাথর ছুড়ে মারবো। দেখ, আল্লাহর কসম! আমিও একজন কবি। এরপর সে নিম্নের দু‘টি আবৃত্তি করে (আরবী****)

‘মুযাম্মামের অবাধ্যতা করেছি, তাঁর কাজকে অস্বীকার করেছি এবং তাঁর দীনকে ঘৃণা ও অবজ্ঞাভরে প্রত্যাখ্যান করেছি।’

উল্লেখ্য যে, তৎকালীন মক্কার পৌত্তলিকরা নবী কারীমকে (সা) মুহাম্মাদ না বলে ‘মুযাম্মাম’ বলতো। মুহাম্মাদ অর্থ প্রশংসিত। আম ‘মুযাযাম্মম’ অর্থ নিন্দিত। এরপর উম্মু জামীল চলে গেল। আবূ বকর সিদ্দিীক (রা) নবী (সা) বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! সে কি আপনাকে দেখতে পায়নি? বললেন : না, দেখতে পায়নি। আল্লাহ তা‘আলা আমার ব্যাপারে তার দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছিলেন।[প্রাগুক্ত-১/৩৫৬]

ইবন ইসহাক বলেন, যেসব লোক রাসূলকে (সা) ঘরের মধ্যে কষ্ট দিত তাদের নাম হলো আবূ লাহাব, হাকাম ইবন আবুল ‘আস ইবন উমাইয়্যা, ‘উকবা ইবন আবী মু‘ঈত, ‘আদী ইবন হামরা, ছাকাফী ইবনুল আসদা‘ প্রমুখ। তারা সবাই ছিল রাসূলের (সা) প্রতিবেশী।[আর রাহীক আল-মাখতূ,-১০৩]

হযরত রাসূলে কারীমের (সা) এহেন চরম চরম দুশমনের পরিণতি কি হয়েছিল তা একটু জানার বিষয়। বদর যুদ্ধের সময় সে মক্কায় ছিল। যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের খবর শোনার পর প্লেগ জাতীয় (আরবী***) (আল-আদাসা) নামক একপ্রকার মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তিন দিন পর্যন্ত মৃতদেহ ঘরে পড়ে থাকে। সংক্রমণের ভয়ে কেউ ধারে-কাছে যায়নি। যখন পচন ধরে গন্ধ ছড়িয়ে পড়তে থাকে তখন তার এক ছেলে দূর থেকে পানি চুড়ে মেরে মৃতদেহকে গোসল দেয়। কুরাইশ গোত্রের কেউ লাশের কাছে যায়নি। তারপর কাপড়ে জড়িয়ে উঠিায়ে মক্কার উঁটু ভূমিতে নিয়ে যায় এবং একটি প্রাচীরের সাথে ঠেস দিয়ে রেখে পাথর চাপা দেয়। এই ছিল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলৈর (সা) চরম দুশমনের পার্থিব নিকৃষ্ট পরিণতি।[নিসা মিন ‘আসর আন-নুবুওয়াহ্‌-১৯২]

এমন একটি নোংরা ও ভয়াবহ পরিবারে দুর্‌রা বিন্‌ত আবী লাহাব জন্মগ্রহণ করেন এবং বেড়ে ওঠেন। তিনি সেই শিশুকাল থেকেই পিতা-মাতার এহেন নোংরা ও কুরুচিপূর্ণ কাজ দেখতেন, কিন্তু তাদের এসব কাজ ও আচরণ মেনে নিতে পারতেন না। মনে মনে পিতা-মাতার এসম ঘৃণ্য কাজকে প্রত্যাখ্যান করতেন।

ধীর ধীরে ইসলামের বাণী তিনি হৃদয়ঙ্গম করেন। ইসলাম তাঁর অন্তরে আসন করে নেয়। একদিন তিনি পৌত্তলিকতার অন্ধকার ঝেড়ে ফেলে দিয়ে ঈমানের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন। (আরবী****) (তিনি জীবিতেকে বের করেন মৃত থেকে।) আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেমন মৃত থেকে জীবিতকে বের করেন দুর্‌রা (রা) ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে বলা চলে।

হযরত দুর্‌রা (রা) মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করেন।[আয-যিরিকলী :  আল-আ‘লাম-২/৩৩৮] তবে কখন তা সঠিকভাবে জানা যায় না। তিন মদীনায় হিরাত করেন।[সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৭৫] তাঁর প্রথম স্বামী আল-হারিছ ইবন নাওফাল ইবন আল-হারিছ ইবন আবদুল মুত্তালিব। কুরইশ পক্ষে বদর যুদ্ধে যেয়ে সে পৌত্তলিক অবস্থায় নিহত হয়। তার ঔরসে দুররা (রা) ‘উকবা, আল-ওয়ালীদ ও আবূ মুসলিম- এ তিন ছেলে জন্ম দেন। মদীনায় আসার পর প্রখ্যাত সাহাবী হযরত দিহইয়া আল-কালবীর (রা) সাথে তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে হয়।[তাবাকাত ইবন সা‘দ-৮/৫০; নিসা মিন ‘আসর আন-নুবুওয়াহ্‌-১৯৩] এই দিহইয়া আল-কালবী (রা) ছিলেন প্রথমপর্বে ইসলাম গ্রহণকারী একজন মহান সাহাবী। বদরের পরে সকল যুদ্ধে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে অংশগ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহর (সা) পত্র নিয়ে রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াসের দরবারে যান। অত্যন্ত সুপুরুষ ছিলেন। জিবরীল (আ) তাঁর আকৃতি ধারণ করে মাঝে মাঝে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট আসতেন। হযরত মু‘আবিয়ার (রা) খিলাফতকাল পর্যন্ত তিনি জীবিত ছিলেন।[তাহ্‌যীবুল আসমা’ ওয়াল লুগাত-১/১৮৫]

হযরত দুররা (রা) হিজরাত করে মদীনায় আসার পর যথেষ্ট সমাদর, সম্মান ও মর্যাদা লাভ করলেও কোন কোন মুসলিম মহিলা তাঁকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি তাঁর পিতা-মাতার আচরণের কথা মনে করে তাঁরা তাঁকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখতে থাকে। দুররা (রা) বড় বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন। এ অবস্থা থেকে রাসুল (সা) তাঁকে উদ্ধার করেন। এ সম্পর্কে বিভিন্ন সূত্রে যা বর্ণিত হয়েছে তা একত্র করলে নিম্নরূপ দাঁড়ায়। “দুররা বিন্‌ত আবী লাহাব হিজরাত করে মদীনায় আসলেন এবং রাফি’ ইবন আল-মু‘আল্লা আয-যুরকীর (রা) গৃহে অবতরণ করেন। বানূ যুরাইক গোত্রে মহিলারা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে এসে বললো, আপনি তো সেই আবূ লাহাবের কন্যা যার সম্পর্কে নাযিল হয়েছে : (আরবী*********)

তাহলে তোমার এ হিজরাতে ফায়দা কোথায়?

অত্যন্ত ব্যথিত চিত্তে দুররা (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে ‍যুরাইক গোত্রের নারীদের মন্তব্যের কথা জানালেন। রাসূল (সা) তাঁকে শান্ত করে বললেন : বস। তারপর জুহরের নামায আদায় করে মিম্বরের উপর বসে কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকলেন। তাপর বললেন : (আরবী*******)

‘ওহে জনমণ্ডলী! আমার পরিবারের ব্যাপারে আমকে কষ্ট দেওয়া হয় কেন? আল্লাহর কসম! আমার নিকটাত্মীয়রা কিয়অমতের দিন আমার সুপারিশ লাভ করবে। এমন কি (ইয়ামানের) সুদা, হাকাম ও সাহ্‌লাব গোত্রসমূহও তা অবশ্য লাভ করবে।[আ‘লাম আন-নিসা-১/৪০৯; উসুদুল গাবা-৫/৪৫০; আল-ইসাবা-৪/৪৯০; হায়াতুস সাহাবা-১/৩৭২]

অপর একটি বর্ণনায় এসেছে; রাসূল (রা) দুররার (রা) মর্যাদার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন : (আরবী********)

‘যে তোমাকে রাগান্বিত করবে সে আল্লাহকে রাগান্বিত করবে।’[আশ-শাওকানী, দুররুস সাহাবা-৫৪২;]

নবী পরিবারের সাথে হযরত দুররার (রা) সম্পর্ক দূরের ছিল না। এ কারণে প্রায়ই উম্মুল মু‘মিনীন ‘আয়িশার (রা) নিকট যেতেন এবং তাঁর থেকে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করতেন। অনেক সময় এমনও হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহর (সা) সেবার ক্ষেত্রে দুইজন পাল্লা দিচ্ছেন। যেমন একদিনের ঘটনা তিনি বর্ণনা করেছেন এভাবে: আমি ‘আয়িশার (রা) নিকট বসে আছি এমন সময় রাসূল (সা) ঘরে ঢুকে বলেন, আমাকে ওজুর পানি দাও। আমি ও ‘আয়িশা দু‘জনই পানির পাত্রের দিকে দৌড় দিলাম। ‘আয়িশার আগেই আমি সেটা ধরে ফেললাম, রাসূলুল্লাহ (সা) সেই পানি দিয়ে ওজু করার পর আমার দিকে চোখ তুলে তাকালেন এবং বললেন :

(আরবী*****) তুমি আমার (পরিবারের একজন এবং আমিও তোমার (পরিবারের) একজন।[ইমাম আশ-শাওকানী বলেছেন, ইমাম আহমাদ হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। দুররা থেকে এর বর্ণনাকারীদের সূত্রের সকলে ‘ছিকা’ বা বিশ্বস্ত। (দুরুসুস সাহাবা-৫৪৩)]

হযরত দুররা (রা) ছিলেন অন্যতম কুরাইশ মহিলা কবি। তিনি হাদীছও বর্ণনা করেছেন। নবী (রা) থেকে সরাসরি ও ‘আয়িশার (রা) সূত্রে মোট তিনটি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তাঁর বর্ণিত একটি হাদীছ নিম্নে উদ্ধৃত হলো : (আরবী******)

‘দুররা (রা) বলেন :  রাসূল (সা) মিম্বরের উপর আছেন, তখন এক ব্যক্তি উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে : ইয়া রাসূলুল্লাহ! কোন ব্যক্তি সবচেয়ে ভালো? রাসূল (সা) বললেন : যে বেশী কুরআন পাঠ করে, বেশী তাকওয়া-পরহেগারী অবলম্বন করে, বেশী বেশী ভালো কাজের আদেশ দেয়, বেশী বেশী খারাপ কাজ করতে বারণ করে এবং বেশী বেশী আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখে, সেই ব্যক্তি সবচেয়ে ভালো।’

তাঁর থেকে বর্ণিত দ্বিতীয় হাদীছটি হলো : (আরবী********)

‘কোন মৃত ব্যক্তির করণে কোন জীবিত ব্যক্তিকে কষ্ট দেওয়া যাবে না।’[আল-ইসতী‘আব-৪/২৯১; আল-ইসাবা-৪/২৯১; আল-আ‘লাম -২/৩৩৮]

তাঁর মধ্যে এক শক্তিশালী কাব্য প্রতিভা ছিল। কাব্যচর্চা করেছেন। চমৎকার ভাবসমৃদ্ধ কিছু কবিতা তাঁর নামে বিভিন্ন গ্রন্থে দেখা যায়। ফিজার যুদ্ধ সম্পর্কে তাঁর একটি কবিতার কিছু অংশ নিম্নরূপ : [আ‘লাম আন-নিসা-১/৪০৯; শা‘য়িরাত আল-আরাব-১২০; নিসা মিন ‘আসর আন-নুবুয়াহ্‌-১৯৬] (আরবী*********)

‘ভীতি ও আতঙ্কের দিন প্রত্যুষে তারা পাহাড়ের মত অটল বাহিনীর সাক্ষাৎ লাভ করে যার মধ্যে বনী ফিহ্‌রের যুদ্ধের পোশাক পরিহিত নেতৃবৃন্দও আছে।

পাগলের মত উত্তেজিত ও বোবা বিশাল বাহিনী যখন দৃশ্যমান হয় তখন তোমার মনে হবে তা যেন সমুদ্রের বিক্ষুব্ধ তরঙ্গ।

অশ্বারোহী বাহিনী শিকারী বাজপাখীর মত উন্মুক্ত তরবারি হাতে ছোঁ মেরে ধূসর বর্ণের বাহিনীর সামনে নেমে আসে।

সেই তরবারির মরণরূপী মারাত্মক বিষ তাদের শীতলতম ব্যক্তিকেও উত্তেজিত করে এবং উষ্ণতমকে প্রবাহিত করে দেয়।

তারা এমন সম্প্রদায় যদি পাথর সামনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়, তারাও শক্ত হয়ে যায় এবং কঠিন পাথরকেও নরম করে ফেলে।’

হযরত দুররা (রা) রাসূলে কারীমের (সা) নিকট থেকে যে সম্মান ও মর্যাদা লাভ করেন তা আজীবন বজায় রাখেন। রাসূল (রা) তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা অবস্থায় দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। আর দুররা (রা) খলীফা হযরত ‘উমারের (রা) খিলাফতকালে হিজরী ২০ (বিশ) সনে  ইনতিকাল করেন।[নিসা মিন ‘আসর আন-নুবুওয়াহ্‌-১৯৬]

উল্লেখ্য যে, ইতিহাসে দুররা নামের তিনজন মহিলা সাহাবীর পরিচয় পাওয়া যায়। তারা হলেন : দুররা বিন্‌ত আবী সুফইয়ান, দুররা বিন্‌ত আবী সালামা ও দুর্‌রা বিন্‌ত আবী লাহাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুন্ন।

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ