আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – ষষ্ঠ খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

 আসমা’ বিন্‌ত ‘উমাইস (রা)


আরবের খাস‘আম গোত্রের কন্যা আসমা’ । পিতা ‘উমাইস ইবন মা‘আদ এবং মাতা কাওলা বিন্‌ত ‘আওফ। মা খাওলা, যিনি হিন্দা নামেও পরিচিত, কিন্না গোত্রের মেয়ে। আসমার ডাক নাম উম্মু ‘আবদিল্লাহ।[সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৮২] উম্মুল মু‘মিনীন হযরত মায়মুনার (রা) সৎ বোন ছিলেন।[সীরাতু ইবন হিশাম-১/২৫৭; টীকা-৭; সিয়ারু সাহাবিয়অত-১৪১] হযরতহ ‘আলী ইবন আবী তালিবের বড় ভাই জা‘ফর ইবন আবী তালিবের (রা) সাথে বিয়ে হয়।[তাবাকাতে ইবন সা‘দ-৮/২৮০;ইবন কুতায়বা; আল-মা‘-আরিফ-১৭১, ১৭৩] তিনি ছিলেন একদল বিখ্যাত মহিলা সাহাবীর সহোদরা অথবা সৎ বোন। তাদের সংখ্যা নয় অথবা দশজন।[আল-ইসাবা-৪/২৩১]

রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কায় দারুল আরকামে অবস্থান গ্রহণের পূর্বে তিনি মুসলমান হন।[তাবাকাত-৮/২৮০]

এরই কাছাকাছি সময়ে তাঁর স্বামী হযরত জা‘ফরও (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন।[সীরাতু ইবন হিশাম-১/১৩৬] ইসলাম গ্রহণের পর তিনি স্বামীর সাথে হাবশায় হিজরাত করেন। সেখানে তাঁদের তিন ছেলে- ‘আবদুল্লাহ, মুহাম্মাদ ও  ‘আওনের জন্ম হয়।[প্রাগুক্ত-১/৩২৩, ২/৩৫৯; আনসাবুল আশরাফ-১/১৯৮; সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৮৩; জামহারাত আনসার আল-‘আরাব-৩৯০]

কয়েক বছর হাবশায় অবস্থানের পর হিজরী সপ্তম সনে খাইবার বিজয়ের সময় হাবশা থেকে সরাসরি মদীনায় পৌঁছেন।[আনসাবুল আশরাফ-১/১৯৮; সীরাতু ইবন হিশাম-২/৩৫৯, ২৬৯] মদীনায় পৌঁছে তিনি উম্মুল মু‘মিনীন হযরত হাফসার (রা) ঘরে যান। তখন সেখানে হযরত ‘উমার (রা) উপস্থিত হন। তিনি প্রশ্ন করেন মহিলাটি কে? বলা হলো : আসমা বিন্‌ত উমাইস। ‘উমার (রা) বললেন : হ্যাঁ, সেই হাবশী মহিলা, সেই সাগরের মহিলা!  আসমা বললেন : হ্যাঁ সেই।  ‘উমার (রা) বললেন : হিজরাতের দ্বারা আমরা মর্যাদার দিক দিয়ে তোমাদেরকে অতিক্রম করে গিয়েছি। আসমা’ বললেন : হ্যাঁ, তা আপনি ঠিক বলেছেন। আপনারা রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে ছিলেন। তিনি আপনাদের ক্ষুধার্তদের আহার করাতেন এবং মূর্খদের শিক্ষা দিতেন। আর আমরা দেশ থেকে বহু দূরে অসহায় অবস্থায় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলেল সন্তুষ্টির জন্য পড়ে ছিলাম। ধৈর্য ও দৃঢ়তার সাথে কঠিন থেকে কঠিনতর বিপদ-মুসিীবতের মুকাবিলা করছিলাম। দেখি রাসূল (সা) ফিরে আসুন, বিষয়টি তাঁকে অবহিত করবো। অনেকটা ক্ষোভের সাথে আসমা‘ এ কথাগুলো বলেন। এরই মধ্যে রাসূল (সা) এসে উপস্থিত হন। আসমা‘ (রা) তাঁকে সবকথা খুলে বলেন। রাসূল (সা) বলেন : তারা তো এক হিজরাত করেছে, আর তোমরা করেছো দুই হিজরাত। এদিক দিয়ে তোমাদের মর্যাদা বেশি।[ফাতহুল বারী-৭/৩১৭; আল-মাগাযী-বাবু গাযওয়াতি খায়বার; মুসলিম, হাদীছ নং-২৫০৩; ফী ফাদায়িলি আস-সাহাবা; কানযুল ‘উম্মাল-৮/৩৩৩]

‘আমির থেকে বর্ণিত হয়েছে। আসমা’ অভিযোগ করেন এ ভাষায় : ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই লোকেরা মনে করে যে, আমরা মুহাজির নই। জবাবে রাসূল (সা) বলেন : যারা এমন কথা বলে তারা অসত্য বলে। তোমাদের হিজরাত দুইবার হয়েছে। একবার তোমরা নাজ্জাশীর নিকট হিজরাত করেছো। আরেকবার আমার নিকট।[তাবাকাত-৮/২৮১; আল-ইসাবা-৪/২৩১]

রাসূলুল্লাহর (সা) এ মুখ নিঃসৃত সুসংবাদ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়লে হাবশায় হিজরাতকারী ব্যক্তিরা দারুণ উৎফুল্ল হন। তাঁরা আসমার নিকট এসে এ সুসংবাদের সত্যতা যাচাই করে যেতেন।[‍বুখারী -২/৬০৭-৬০৮; তাবাকাত-৮/২৮১]

ঐতিহাসিক মূতার  যুদ্ধ হয় হিজরী অষ্টম সনে। হযরত আসমা’র (রা) স্বামী জা‘ফার (রা) ছিলেণ এ ‍যুদ্ধের একজন সেনা অধিনায়ক। যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। খবরটি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট পৌঁছর পর তিনি আসমার (রা) বাড়ীতে ছুটে যান এবং বলেন, জা‘ফারের ছেলেদেরকে আমার সামনে নিয়ে এসো। আসমা’ ছেলেদেরকে গোসল করিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে হাজির করেন। রাসূলুল্লাহর (সা) চোখ ‍দুইটি পানিতে  ভিজে গেল। তিনি ছেলেদের জাড়িয়ে চুমু দেন। আসমা‘ জিজ্ঞেস করলেন, জা‘ফারের কি কোন খবর পেয়েছেন? রাসূল (সা) জবাজ দিলেন, “হ্যাঁ, সে শহীদ হয়েছে।” এতটুকু শুনতেই আসমা’ চিৎকার দিয়ে ওঠেন এবং বাড়ীতে একটা মাতমের রূপ ধারণ করে। প্রতিবেশী মহিলারা তাঁর পাশে সমবেত হয় এবং তাঁকে বলে, রাসূল (সা) বুকে হাত মারতে নিষেধ করছেন। সেখান থেকে উঠে রাসূল (সা) নিজের ঘর ফিরে এলেন এবং বললেন : তোমরা জা‘ফরের ছেলেদের জন্য খাবার তৈরি  কর। কারণ তাদের মা আসমা’ শোক ও দুঃখ্যে কাতর হয়ে পড়েছে।[মুসনাদ-৬/৩৭০; আনসাবুল আশরাফ-১/৩৮০]

অতঃপর রাসূল (সা) ব্যথিত চিত্তে বিমর্ষ মুখে মসজিদে গিয়ে বসেন এবং হযরত জা‘ফারের (রা) শাহাদাতের খবর ঘোষণা করেন। ঠিক এ সময় এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে বলে, জা‘ফারের স্ত্রী মাতম শুরু করেছেন এবং কান্নাকাটি করছেন। তিনি লোকটিকে বলেন, তুমি যাও এবং তাদেরকে এমন করতে বারণ কর। কিচুক্ষণ পর লোকটি আবার ফিরে এসে বলে, ইয়া রাসূলাল্লাহ, তারা তো বিরত হচ্ছে না। তিনি লোকটিকে আবার একই কথা বলে পাঠালেন। কিন্তু তাতেও কোন কাজ হলো না। তখন রাসূল (সা) বললেন, তার মুখে মাটি ভরে দাও। সহীহ বুখারীতে একথাও এসেছে যে, হযরত ‘আয়িশা (রা) ঐ লোকটিকে বলেন, আল্লাহর কসম! তোমরা যদি এ কাজ (মুখে মাটি  ভরা) না কর তাহলে রাসূল (সা) কষ্ট থেকে মুক্তি পাবেন না। তৃতীয় দিন রাসূল (সা) আসমার বাড়ী যান এবং তাঁকে শোক পালন করতে বারণ করেন।[মুসনাদ-৬/৩৬৯]

দ্বিতীয় বিয়ে

স্বামী হযরত জা‘ফারের (রা) শাহাদাতের ছয় মাস পরে অষ্টম পরে অষ্টম হিজরীর শাওয়অল মাসে হুনাইন যুদ্ধের সময়কালে হযরত আবু বাকরের সাথে আসমার দ্বিতীয় বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) স্বয়ং বিয়েটি পড়ান।[আল-ইসাবা-৪/২৩১] এই বিয়ের দুই বছর পর দশম হিজরীর জুলকা‘দা মাসে আবূ বাকরের (রা) ঔরসে ছেলে মুহাম্মাদ ইবন আবী বাকরের জন্ম হয়। আসমাৎ তখন রাসূলুল্লাহর (সা) বিদায় হজ্জের কাফেলার সাথে শরীক হয়ে মক্কার পথে ছিলেন। জুল হুলায়ফা পৌঁছার পর মুহাম্মাদ ভূমিষ্ঠ হয়। এখন তিনি হজ্জ আদায়ের ব্যাপারে সংশয়িত হয়ে পড়েন। স্বামী আবু বাকরও (রা) তাঁকে মদীনায় ফেরত পাঠাতে চাইলেন। অবশেষে রাসূলুল্লাহর (সা) মতামত জানতে চাওয়া হলো। রাসূল (সা) বললেন, তাকে বলো সে যেন গোসল করে হজ্জের ইহরাম বেঁধে নেয়।[তাবাকাত-৮/২৮২; মুসনাদ-৬/৩৬৯; মুসলিম-৩/১৮৫-১৮৬]

হিজরী অষ্টম সনে প্রথম স্বামী জা‘ফারের ইনতিকালে হযরত আসমা‘ (রা) ভীষণ ব্যথা পান। কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টি লাভের আশায় এই শোক ও দুঃখকে তিনি সবর ও শোকরে রূপান্তরিত করেন। কিন্তু হিজরী ১৩ সনে দ্বিতীয় স্বামী হযরত আবু বাকরের (রা) মৃত্যুতে তিনি আবার শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন। ধৈর্য ও সহনশীলতার মাধ্যমে তিনি এ শোকও কাটিয়ে ওঠেন। মৃত্যুকালে আবু বাকর (রা) ওসীয়ত করে যান, স্ত্রী আসমা’ তাঁকে অন্তিম গোসল দিবেন। আসমা’ তাঁকে গোসল দেন।[মুওয়াত্তা-১/ ২২৩; তাবাকাত-৮/২৮৩] গোসল দেয়া শেষ হলে তিনি উপস্থিত মুহাজিরদের লক্ষ্য করে বলেন : আমি রোযা আছি। আর দিনটিও ভীষণ ঠাণ্ডার। আমাকেও গোসল করতে হবে? লোকেরা বললো : না।[মুওয়াত্তা-১/২২২-২২৩; সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৮৬]

হযরত আবু বাকরের (রা) ইনতিকালের সময় তাঁর ঔরসে আসমার গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তান মুহাম্মাদের বয়স প্রায় তিন বছর ছিল।[তাবাকাত-৮/২৮৪] পরবর্তীকালে এই মুহাম্মাদ তৃতীয় খলীফা হযরত উছমানের (রা) হত্যার  মত মারাত্মক ট্রাজেডীর এক অন্যতম সাক্ষী অথবা নায়কে পরিণত হন।

দ্বিতীয় স্বামী আবু বাকরের (রা) মৃত্যুর পর হযরত আসমা’ হযরত আলীকে (রা) তৃতীয় স্বামী হিসেবে গ্রহণ কনে। শিমু  মুহাম্মাদ ইবন আবী বাকর মায়ের সাথে সৎ পিতা ‘আলীর (রা) সংসারে চলে আসেন এবং তাঁর স্নেহচায়ায় ও তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন। উল্লেখ্য যে, পরবর্তীকালে হযরত উছমান (রা) হত্যার দায়-দায়িত্ব যে অনেকে হযরত ‘আলীর (রা) উপর চাপাতে চেয়েছিলেন, তার মূল কারণ এই সৎ পুত্র মুহাম্মাদের আচরণ।

পাঠকবর্গ লক্ষ্য করে থাকবেন, হযরত আসমার দুই ছেলের নাম মুহাম্মাদ- মুহাম্মাদ ইবন জা‘ফার ও মুহাম্মাদ ইবন আবী বাকর। একদিন এই দুই ছেলে একজন আরেকজনের উপর কৌলিন্য ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করে বলতে থাকে, আমি তোমার চেয়ে বেশী মর্যাদাবান। আমার পিতা তোমার পিতার চেয়ে বেশী সম্মানীয়। অনেকক্ষণ পর্যন্ত তাদের এ বিতর্ক চলতে থাকে। হযরত আলী (রা) তাদের মা আসমাকে বললেন, তুমিই তাদের এ বিাবদের ফয়সালা করে দাও। আসমা’ বললেন, আমি আরব যাবকদের মধ্যে জা‘ফারের চেয়ে ভালো কাউকে পাইনি, আর বৃদ্ধদের মধ্যে আবু বাকরের চেয়ে বেশী ভালো কাউকে দেখিনি। ‘আলী (রা) বললেন, তুমি তো আমার বলার কিছু রাখলে না। তুমি যা বলেছো, তাছাড়া অন্য কিছু বললে আমি বেজার হতাম। আসমা’ তখন বলেন, আর ভালো মানুষ হিসেবে আপনি তিনজনের মধ্যে তৃতীয়।[প্রাগুক্ত-৮/২৮৫; সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৮৭]

হযরত আলীর (রা) ঔরসে হযরত আসমা’ ছেলে ইয়াহইয়াকে জন্মদান করেন। তবে ইবন সা‘দ তাঁর তাবাকাতে মুহাম্মাদ ইবন ‘উমারের সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, ‘আলীর (রা) ঔরসে আসমা গর্ভে দুই ছেলে- ইয়াহইয়অ ও ‘আওনের জন্ম হয়। প্রথমোক্ত বর্ণনাটি সঠিক বলে মনে হয়। কারণ, বেশীল ভাগ সীরাত বিশেষজ্ঞ উক্ত মতটিই গ্রহণ করেছেন। শেষোক্ত মতটিকে ‘আল্লামা ইবনুল আছীর ভুল বলেছেন। তিনি লিখেছেন, এটা ইবনুল কালবীল একটা কল্পনা। আর তিনি ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ মিথ্যাবাদী।[উসুদুল গাবা-৫/৩৯৫; সিয়ারুস সাহাবিয়াত-১৪৪; আল-ইসতী‘আব-২/৭৪৫] তাহলে হযরত আসমার (রা) তিন স্বামীর ঘরে মোট সন্তান সংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচজন। হযরত জা‘ফারের ঘরে মাহাম্মাদ, ‘আবদুল্লাহ, ‘আওন, আবু বাকরের (রা) ঘরে মুহাম্মাদ এবং ‘আলীর (রা) ঘর ইয়াহইয়অ।[আনসাবুল আশরাফ-১/৪৪৭] পাঁচজনই পুত্র সন্তান।

পূর্বেই ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, মুহাম্মাদ ইবন আবী বাকর খলীফা ‘উছমানের খিলাফতকালের বিদ্রোহ বিশৃখলায় জড়িয়ে পড়েন। আর এরই প্রেক্ষিতে হিজরী ৩৮ সনে তিনি মিসরে নিহত হন। গাধার চামড়ার মধ্যে ভরে তাঁর মৃতদেহ জ্বালিয়ে ফেলে অতি নিষ্ঠুরভাবে প্রশোধ নেওয়া হয়। ছেলের এমন মর্মান্তিক পরিণতিতে স্বভাবতঃই মা আসমা’ ভীষণ দুঃখ পান। কিন্তু ভেঙ্গে না পড়ে ধৈর্য ধারণ করেন। এই মর্মন্তুদ খবর শোনার পর জায়নামায বিছিয়ে নামাযে দাঁড়িয়ে যান।[আল-ইসাবা-৪/২৩১; সাহাবিয়াত-১৭৩]

হযরত আসমা’ (রা) হাবশা অবস্থানকালে সেখানকার সাদামাটা ধরনের টোটকা চিকিৎসার জ্ঞান অর্জন করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) যখন অন্তিম রোগশয্যায় এবং পার্থিব জীবনের প্রান্ত সীমায় তখন উম্মু সালামা ও আসমা’ (রা) মিলিতভাবে রাসূলুল্লাহর (সা) রোগ ‘জাতিুল জান্‌ব’ বলে নির্ণয় করেন এবং তাঁকে ঔষধ পান করাতে উদ্যোগী হন। রাসূল (সা) কোন প্রকার ঔষধ পান করতে অস্বীকৃতি জানান। ঠিক সে সময় তিনি একটু অচেতন হয়ে পড়েন। এটাকে তাঁর দুইজন একটি সুযোগ বলে মনে করেন। তাঁরা রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ একটু ফাঁক করে ঔষধ ঢেলে দেন। কিছুক্ষণ পরে তাঁর অচেতন অবস্থা দূর হয়ে গেলে তিনি কিছুটা স্বস্তি অনুভব করেন এবং বলেন : এ ব্যবস্থাপত্র সম্ভবতঃ আসমা’ দিয়ে থাকবে।[বুখারী-২/৮৫১; আনসাবুল আশরাফ-১/৫৪৫]

হযরত আসমা’ (রা) থেকে ষাটটি হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। তাঁর নিকট যাঁরা হাদীছ শুনেছেন ও বর্ণনা করেছেন তাঁদে মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হলেন- ‘আবদুল্লাহ ইবন জা‘ফার, ইবন ‘আব্বাস, কাসিম ইবন মুহাম্মাদ, ‘আবদুল্লাহ ইবন শাদ্দাদ ইবন আল-হাদ, ‘উরওয়অ, সা‘ঈদ ইবন মুসায়্যিব, উম্মু ‘আওন বিন্‌ত মুহাম্মাদ ইবন জা‘ফার, ফাতিমা বিনত ‘আলী, আবূ ইয়াযীদ আল মাদানী।[আদ-দুররুল মানছুর -৩৫; সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৭৮] তিনি সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতেন। রাসূল (সা) বিপদ-আপদের সময় পড়ার জন্য তাঁকে একটি দু‘আ শিখিয়ে দেন। আসমা’ সেটি পাঠ করতেন।[মুসনাদ-৬/৩৬৯; কান্‌য আল-‘উম্মাল-১/২৯৯]

তিনি স্বপ্নের তা‘বীর ভালো জানতেন। এ কারণে উমার (রা) সচরাচর তাঁর কাছ থেকেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিতেন।[কান্‌য আল-উম্মাল-৩/১৫৩; আল-ইসাবা-৪/২৩১; হায়াতুস সাহাবা-৩/৪৫০]

হযরত আসমার (রা) তৃতীয় স্বামী ‘আলী (রা) হিজরী ৪০ সনে শাহাদাত বরণ করেন। হযরত আসমাও এর কিছু দিন পরে ইনতিকাল করেন।[তাহজীবুত তাহজীব-১২/৩৯৯; শাজারাতুজ জাহাজ-১/১৫, ৪৮]

একদিন রাসূল (সা) আসমার প্রথম স্বামী জা‘ফারের তিন ছেলেকে খুবই ক্ষীণ ও দুর্বল দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করেন, এদের এমন অবস্থা কেন? আসমা’ বলেন, তাদের অতিমাত্রায় নজর লাগে। রাসূল (সা) তা তুমি ঝাড়-ফুঁক কর না কেন। হযরত আসমার একটি মন্ত্র জানা ছিল। তিনি সেটি রাসূলকে (সা) শোনান। রাসূল (সা) শুনে বলেন, হ্যাঁ এটি ঠিক আছে।[মুসলিম-২/২২৩]

হযরত আসমা’ (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় তাঁর পরিবারের সাথে গভীরভাবে জড়িত ছিলেন। কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায়, হযরত ফাতিমার (রা) বিয়ের সময় তিনি বেশ কর্মতৎপরতা দেখান।পাত্রী পক্ষ থেকে তিনি জামাই ‘আলীল (রা) বাড়ীতে যান।[হায়াতুস সাহাবা-২/৬৬৭-৬৬৮]

 

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ