আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – ষষ্ঠ খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

উম্মু কুলছূম বিনত রাসূলিল্লাহ (সা)


হযরত উম্মু কুলছূম (রা) হযরত রাসূলে কারীমের (সা) তৃতীয় মেয়ে। তবে এ ব্যাপারে সীরাত বিশেষজ্ঞদের কিছুটা মতপার্থক্য আছে। ইমাম আয-যাহাবী তাঁকে রাসূলুল্লাহর (সা) সন্তানদের মধ্যে চতুর্থ বলেছেন।[সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা, ২/২৫২] যুবাইর ইবন বাককার বলেছেন, উম্ম কুলছূম ছিলেন রুকাইয়্যা ও ফাতিমা (রা) থেকে বড়। কিন্তু অধিকাংশ সীরাত লেখক এ মতের বিরোধিতা করেছেন। সঠিক ও বিশ্বাসযোগ্য মত এটাই যে, হযরত উম্মু কুলছূম (রা) ছিলেন হযরত রুকায়্যার (রা) ছোট।[সীরাতু ইবন হিশাম, ১/১৯০] তাবারী রাসূলুল্লাহর (সা) মেয়েদের জন্মের ক্রমধারা উল্লেখ করেছেন এভাবে।[তারীখ আত-তাবাবী (লেইডেন) ৩/১১২৮] (আরবী=======)

‘যায়নাব, রুকায়্যা, উম্মু কুলছূম ও ফাতিমা জন্মগ্রহণ করেন।’

হযরত রুকায়্যা (রা) ছিলেন হযরত ‘উছমানের (রা) স্ত্রী। হিজরী ২য় সনে তাঁর ইনতিকাল হলে রাসূল (সা) উম্মু কুলছূমকে (রা) ‘উছমানের (রা) সাথে বিয়ে দেন।[তাবাকাত, ৮/৩৫] যদি উম্মু কুলছূম বয়সে রুকায়্যার বড় হতেন তাহলে ‘উছমানের (রা) সাথে তাঁরই বিয়ে হতো আগে, রুকায়্যা নয়। কারণ, সকল সমাজ ও সভ্যতায় বড় মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থাটা আগেই করা হয়। আর এটাই বুদ্ধি ও প্রকৃতির দাবী।

সীরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থাবলীতে হযরত উম্মু কুলছূমের (রা) জন্ম সনের কোন উল্লেখ দেখা যায় না। তবে রাসূলুল্লাহর (সা) নবুওয়াত লাভের ছয় বছর পূর্বে তাঁর জন্ম হয়েছিল বলে ধারণা করা যায়। কারণ, একথা প্রায় সর্বজন স্বীকৃত যে, নবুওয়াতের সাত বঝর পূর্বে রুকায়্যার এবং পাঁচ বছর পূর্বে হযরত ফাতিমার (রা) জন্ম হয়। আর একতাও মেনে নেয়া হয়েছে যে, উম্মু কুলছূম (রা) ছিলেন রুকায়্যার ছোট এবং ফাতিমার বঙ। তাহলে তাঁদের দুইজনের মধ্যবর্তী সময় তাঁর জন্মসন বলে মেনে নিতেই হবে। আর এই হিসেবেই তিনি নবুওয়াতের ছয় বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন।[সাহাবিয়াত-১২৯]

অনেকের মত হযরত উম্মু কুলছূমেরও (রা) শৈশবকাল অজ্ঞতার অন্ধকারে ঢাকা পড়ে গেছে। আরবের সেই সময়কালটা এমন ছিল যে, কোন ব্যক্তিরই জীবনকথা পূর্ণভাবে পাওয়া যায় না। এ কারণে তাঁর বিয়ের সময থেকেই তাঁর জীবন ইতিহাস লেখা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ (সা) নবুওয়াত লাভের পূর্বে আবু লাহাবের পুত্র ‘উতবার সাথে রুকায়্যার এবং তার দ্বিতীয় পুত্র ‘উতাইবার সাথে উম্মু কুলছূমের বিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সা) নবুওয়াত লাভের পর যখন আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর নিন্দায় সূরা লাহাব নাযিল হয় তখন আবু লাহাব, মতান্তরে আবু লাহাবের স্ত্রী দুই ছেলেকে লক্ষ্য করে বলে, ‘তোমরা যদি তাঁর [মুহাম্মাদ (সা)] মেয়েকে তালাক দিয়ে বিদায় না কর তাহলে তোমাদের সাখে আমার বসবাস ও উঠাবসা হারাম।’[তাবাকাত-৮/৩৭] হযরত রুকায়্যার (রা) জীবনীতে আমরা উল্লেখ করেছি যে, পিতা-মাতার এরূপ কথায় এবং সামাজিক চাপে ‘উতবা তার স্ত্রী রুকায়্যাকে তালাক দেয়। তেমনিভাবে ‘উতাইবাও মা-বাবার হুকুম তামিল করতে গিয়ে স্ত্রী উম্মু কুলছূমকে তালাক দেয়। এ হিসেবে উভয়ের তালাকের সময়কাল ও কারণ একই।[উসুদুল গাবা-৫/১২] উভয় বোনের বিয়ে হয়েছিল ঠিকই কিন্তু স্বামীর ঘরে যাবার পূর্বেই এ ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।

হিজরী দ্বিতীয় সনে রুকায়্যা (রা) মৃত্যুবরণ করলে হযরত ‘উছমান (রা) স্ত্রী শোকে বেশ বিষন্ন ও বিমর্ষ হয়ে পড়েন। তছার এ অবস্থা দেখে রাসূল (সা) একদিন তাঁকে বললেন, ‘উছমান, তোমাকে এমন বিমর্ষ দেখছি, কারণ কি? ‘উছমান (রা) বললেন, আমি এমন বিমর্ষ না হয়ে কেমন করে পারি? আমার উপর এমন মুসীবত এসেছে যা সম্ভবত : কখনো কারো উপর আসেনি। রাসূলুল্লাহর (সা) কন্যার ইনতিকাল হয়েছে। এতে আমার মাজা ভেঙ্গে গেছে। রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল তা ছিন্ন হয়ে গেছে। এখন আমার উপায় কি? তাঁর কথা শেষ না হতেই রাসূল (সা) বলে উছলেন, জিবরীল (আ) আল্লাহর দরবার থেকে আমাকে হুকুম পৌঁছে দিয়েছেন, আমি যেন রুকায়্যার সমপরিমাণ মাহরের ভিত্তিতে উম্মু কুলছূমকেও তোমার সাথে বিয়ে দিই। প্রাগুক্ত-৫/৬১৩ [] অতঃপর রাসূল (সা) হিজরী ৩য় হিজরী সনের রবী‘উল আউয়াল মাসে হযরত ‘উছমান (রা) সাথে উম্মু কুলছূমের ‘আকদ সম্পন্ন করেন।[তাবাকাত-৮/৩৭] ‘আকদের দুই মাস পরে জামাদিউস ছানী মাসে তিনি স্বামী গৃহে গমন করেন। হযরত উম্মু কুলছূম কোন সন্তানের মা হননি।[প্রাগুক্ত]

একটি বর্ণনায় এসছে, রুকায়্যার (রা) ইনতিকালের পর ‘উমার ইবন আল খাত্তাব (রা) তাঁর মেয়ে হাফসাকে (রা) উছমানের (রা) সাথে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি কোন উত্তর না দিয়ে চুপ থাকেন। একথা রাসূল (সা) জানতে পেরে ‘উমারকে বলেন, আমি হাফসার জন্যে ‘উছমানের চেয়ে ভাল স্বামী এবং এবং ‘উছমানের জন্যে হাফসার চেয়ে ভালো স্ত্রী তালাশ করবো। তারপর তিনি হাফসাকে বিয়ে করেন এবং উম্মু কুলছূমকে ‘উছমানের সাথে বিয়ে দেন।[প্রাগুক্ত-৮/৩৮]

হযরত উম্মু কুলছূম (রা) তাঁর মা উম্মুল মু’মিনীন হযরত খাদীজার (রা) সাথেই ইসলাম গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে অন্য বোনদের সাথে রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাই’আত করেন।[প্রাগুক্ত-৮/৩৭] রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় হিজরাতের পর তিনি পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে মদীনায় হিজরাত করেন। [সিয়ারু আ’লাম আন-নুবালা-২/২৫২, হায়াতুস সাহাবা-১/৩৬৯]

হযরত উম্মু কুলছূমের (সা) ইনতিকালের পর রাসূল (সা) বলেন, আমার যদি দশটি মেয়ে থাকতো তাহলে একের পর এক তাদের সকলকে ‘উছমানের (রা) সাথে বিয়ে দিতাম।[আল-ইসতী’আব-৭৯৩] একটি বর্ণনায় দশটি মেয়ের স্থলে একশোটি মেয়ে এসেছে। স্বামী ‘উছমানের (রা) সাথে ছয় বছর কাটানোর পর হিজরী ৯ম সনের শা’বান মাসে হযরত উম্মু কুলছূম (রা) ইনতিকাল করেন।[সিয়ারু আ’লাম আন-নুবালা-২/২৫৩] আনসারী মহিলারা তাঁকে গোসল দেন। তাঁদের মধ্যে উম্মু ‘আতিয়্যাও ছিলেন। রাসূল (সা) জানাযার নামায পড়ান। হযরত আবু তালহা, ‘আলী ইবন আবী তালিব, ফাদল ইবন ‘আব্বাস ও উসামা ইবন যায়দ (রা) লাশ কবরে নামান।[তাবাকাত-৮/৩৮-৩৯]

একটি বর্ণনায় এসেছে, আনাস (রা) উম্মু কুলছূমকে (রা) রেখা অঙ্কিত রেশমের কাজ করা একটি চাদর গায়ে দেওয়া অবস্থায় দেখেছেন।[বুখারী : বাবুল হারীর লিন-নিসা; আবু দাউদ (২০৫৮); নাসাঈ-৮/১৯৭; ইবন মাজাহ্-(৩৫৯৮); তাবাকাত-৮/৩৮]

নরাধম ‘উতায়বা তার জাহান্নামের অগ্নিশিখা পিতা আবু লাহাব এবং কাঠকুড়ানি মা উম্মু জামীল হাম্মালাতাল হাতাব- এর চাপে স্ত্রী উম্মু কুলছূমকে তালাক দানের পর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট এসে চরম অমার্জিত আচরণ করে। সে রাসূলকে (সা) লক্ষ্য করে বলে : ‘আমি আপনার দীনকে অস্বীকার করি, মতান্তরে আপনার মেয়েকে তালাক দিয়েছি। আপনি আর আমার কাছে যাবেন না, আমিও আর আপনার কাছে আসবো না।’ একথা বলে সে গোঁয়ারের মত রাসূলুল্লাহর (সা) উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাতে রাসূলুল্লাহর (সা) জামা ছিঁড়ে যায়। এরপর সে শামের দিকে সফরে বেরিয়ে যায়। তার এমন পশুসুলভ আচরণে রাসূল (সা) ক্ষুব্ধ হয়ে বদ-দু’আ করেন এই বলে : আমি আল্লাহর কাছে কামনা করি, তিনি যেন তাঁর কোন কুকুরকে তার উপর বিজয়ী দেন।’

‘উতাইবা কুরাইশদের একটি বাণিজ্য কাফেলার সাথে শামের দিকে বেরিয়ে পড়লো। যখন তারা ‘আয-যারকা’ নামক স্থানে রাত্রি যাপন করছিল, তখন একটি কেড়ে তাদের অবস্থান স্থলের পাশে ঘুর ‍ঘুর করতে থাকে। তা দেখে ‘উতাইবার মনে পড়ে রাসূলুল্লাহর (সা) বদ-দু‘আর কথা। সে তার জীবন নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। সে বলতে থাকে, ‘আমার মা নিপাত যাক, মুহাম্মাদের কথা মত এ নেকড়ে তো আমাকে খেয়ে ফেলবে।’ যাহোক, কাফেলার লোকেরা তাকে সকলের মাঝখানে ঘুমানোর ব্যবস্থা করে ঘুমিয়ে পড়ে। নেকড়ে সকলকে ডিঙ্গিয়ে মাঝখান থেকে ‘উতাইবাকে উঠিয়ে নিয়ে যায় এবং কামড়ে, খামছে রক্তাক্ত করে হত্যা করে।

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ