আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – ষষ্ঠ খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

উম্মুল ফাদল বিনত আল-হারিছ (রা)


উম্মুল ফাদল লুবাবা আল-কুবরা, যিনি শুধু উম্মুল ফাদল নামেই পরিচিত। আরবের রীতি অনুযায়ী বড় ছেলে আল-ফাদল ইবন ‘আব্বাসের নামে উপনাম ধারণ করেন। তাঁর পিতা আল-হারিছ ইবন হুযন আল-হিলালী এবং মাতা হিন্দ বিত ‘আওফ আল-কিনানিয়্যা। এই হিন্দ খাওলা নামেও পরিচিত।[তাবাকাত-৮/২৭৭; আল-ইসী‘আব-৪/৩৯৮] রাসূলুল্লাহর (সা) মুহতারাম চাচা হযরত ‘আব্বাস ইবন ‘আবদিল মুত্তালিব (রা) তাঁকে বিয়ে করেন। সুতরাং উম্মুল ফাদল রাসূলুল্লাহর (সা)  একজন গর্বিত চাচী। হযরত ‘আব্বাসের ছেলে-মেয়ে : আল-ফাদল, ‘আবদুল্লাহ, উবাইদুল্লাহ, মা‘বাদ, কুসাম, ‘আবদুর রহমান ও উম্মু হাবীবের গর্ভধারিনী মা। ইমাম জা জাহাবী বলেছেন : ‘তিনি হযরত আব্বাসের (রা) ছয়জন মহান পুত্রের জননী’।[সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/৩১৪; আনসাব আল-আশরাফ-১/৪৪৭] ‘আরব কবি ‘আবদুল্লাহ ইবন ইয়াযীদ আল-হিলালী বলেছেন : ‘উম্মুল ফাদলের গর্ভের ছয় সন্তানের মত কোন সন্তান আরবের কোন মহিয়ষী নারী জন্মদান করেননি।’[তাবাকাত-৮/২৭৭; আল-ইসতী‘আব, আল ইসাবার পার্শ্বটীকা-৪/৩৯৯]

তাঁর অনেকগুলো সহোদর, বৈপিত্রেয় ও বৈমাত্রেয় ভাই-বোন ছিলেন, যাঁদের অনেকে বিভিন্ন দিক দিয়ে ইতিহাসে খ্যাতহ হয়ে আছেন। যেমন মায়মূনা বিনত আল-হারিছ- যিনি লুবাবা আ-সুগরা নামে পরিচিত, প্রখ্যাত সাহাবী ও সেনানায়ক খালিদ ইবন আল ওয়ালিদের (রা) গর্বিত মা। ‘আযযা বিনত আল-হারিছ ও হুযাইলা-বিনত আল-হারিছ। শেষোক্ত তিনজন তাঁর বৈমাত্রের বোন। আর মাহমিয়্যা ইবন জাযাআ আয-যুবাইদী, সুলমা, আসমা’ ও সালামা- সবাই তাঁর বৈপিত্রেয় ভাই-বোন।[উসুদুল গাবা-৫/৫৩৯] সুতরাং দেখা গেল, তিনি উম্মুল মু‘মিনীন মায়মূনার আপন বোন ও সেনাপতি খালিদ ইবন আল-ওয়ালীদের খালা। বোন সালমা ছিলেন হযরত হামযার (রা) স্ত্রী, এবং আসমা ছিলেন হযরত ‘আলীর (রা) ভাই প্রখ্যাত সেনানায়ক ও শহীদ সাহাবী হযরত জা‘ফর ইবন আবী তালিবের (রা) স্ত্রী। জা‘ফারের শাহাদাতের পর প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) হন তাঁর দ্বিতীয় স্বামী। হযরত আবু বকরের (রা) ইনতিকালের পর হযরত ‘আলী (রা) হন তাঁর তৃতীয় স্বামী। উম্মুল ফাদলের মা এদিক দিয়ে সৌভাগ্যবতী যে, তৎকালীন আরবের শ্রেষ্ঠ ঘরের সর্বোত্তম সন্তানদেরকে কন্যাদের বর হিসেবে লাভ করেন। আর এ সৌভাগ্যের ব্যাপারে অন্য কোন নারী তাঁর সমকক্ষ নেই।[তাবাকাত-৮/২৭৮; আল-ইসী‘আব-৪/৩৯৯]

তিনি মক্কায় ইসলামী দা‘ওয়াতের প্রথম ভাগে মুসলমান হন। বর্ণিত হয়েছে, তিনি মক্কার প্রথম মহিলা যিনি হযরত খাদীজার (রা) পরে ইসলাম গ্রহণ করেন।[তাবাকাত-৮/২৭৭] তবে আল-ইসাবা গ্রন্থে একথাও বলা হয়েভে যে, তিনি হিজরাতের পূর্বে মুসলমান হন।[সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/৩১৫]তবে মুহাদ্দিঝগণ এ বর্ণনাটিকে দুর্বল এবং প্রথমোক্ত বর্ণনাটিকে সঠিক বলেছেন। [সাহাবিয়াত-১৭৪] ইমাম জাহাবী তাঁকে প্রথম পর্বের মুসলমান বলেছেন।[সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/৩১৫]

রাসূলুল্লাহর (সা) খাদেম আবু রাফে‘ বলেছেন, আমি ছিলাম ‘আব্বাসের দাস। আমাদের আহলি বায়তের মধ্যে ইসলাম প্রবেশ করে। ‘আব্বাস ও উম্মুল ফাদল ইসলাম গ্রহণ করেন। [হায়াহতুস সাহাবা-৩৪/৫৩০ ১১. তাবাকাত-৮/২৭৮] এটাই সঠিক ওয ‘আব্বাস প্রথম দিকেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তা গোপন রাখেন।

মক্কার আদি পর্বের মুসলমান হলেও স্বামী হযরত ‘আব্বাসের (রা) মদীনায় হিজরাতের পূর্ব পর্যন্ত শত প্রতিকূলতার মধ্যেও মক্কার মাটি আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকেন। হযরত ‘আব্বাস (রা) অনেক দেরীতে ইসলামের ঘোষণা দেন এবং একেবারে শেষের দিকে মদীনায় হিজরাত করেন। আর তখনেই উম্মুল ফাদল (রা) তাঁর সন্তানদের সহ মদীনায় হিজরাত করেন। তই তাঁর ছেলে হযরত ‘আবদুল্লাহর ইবন ‘আব্বাস (রা) পরবর্তীকালে সূরা আন-নিসার ৭৫ নং আয়াতটি তিলাওয়াত করে বলতেন, এ আয়াতে যে দুর্বল নারী ও শিশুদের পক্ষে যুদ্ধ করতে বলা হয়েছে, আমার মা ও আমি হলাম সেই নারী ও শিশু।[সহীহ আল-বুখারী, কিতাবুত তাফসীর, সূরা আন-নিসা’] আয়াতটির মর্ম এরূপ : ‘আর তোমাদের কি হলো যে, তোমরা আল্লাহর রাহে লড়াই করছো না দুর্বল সেই পুরুষ, নারী ও শিশুদের পক্ষে যারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে এই জনপদ থেকে নিষ্কৃতি দান কর; এখানকার অধিবাসীরা যে অত্যাচারী!’ হাদীছ দ্বারা বুঝা যায় তাঁরা হযরত ‘আব্বাসের (রা) আগে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং! হিজরাত করতে অক্ষম ছিলেন। একথা বলেছেন ইমাম আজ-জাহাবী।[সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/৩১৫]

রাসূলুল্লাহ (সা) উম্মুল ফাদল সহ তাঁর অন্য বোনদেরকে ঈমানদার বলে ঘোষণা দান করেছেন। একবার রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে মায়মূনা, উম্মুল ফাদল, লুবাবা সুগরা, হুযাইলা, ‘আযযা, আসমা ও সালমা- এই বোনদের নাম আলোছনা করা হলো। রাসূল (সা) বললেন : এই সকল বোন মু‘মিনা বা ঈমানদার।[তাবাকাত-৮/২৭৮; আল-ইসতী‘আব-৪/৪০১] রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনের কিছু কিছু ঘটনা দ্বারা জানা যায়, তিনি চাচী উম্মুল ফাদলকে যেমন ভালোবাসতেন, তেমনি গুরুত্বও দিতেন। চাচীও তাঁকে খুবই আদর করতেন। রাসূল (সা) প্রায়ই চাচীকে দেখার জন্যে তাঁর গৃহে যেতেন এবং দুপুরে কিছুক্ষণ সেখানে বিশ্রাম নিতেন।[তাবাকাত/৮/২৭৭; উসুদল গাবা-৫/৫৩৯]

আল-আজলাহ যায়দ ইবন আলী ইবন হুসায়নের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা) নবুওয়াত লাভের পর একমাত্র উম্মুল ফাদল ছাড়া অন্য কোন মহিলার কোলে মাথা রাখেননি এবং তা রাখা তাঁর জন্যে বৈধও ছিল না। উম্মুল ফাদল রাসূলুল্লাহর (সা) মাথা নিজের কোলের উপর রেখে সাফ করে দিতেন এবং চোখে সুরমা লাগিয়ে দিতেন। একদিন তিনি যখন সুরমা লাগাচ্ছেন, তখন হঠাৎ তাঁর চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি রাসূলুল্লাহর (সা) গণ্ডে পড়ে। তিনি মাথা উঁচু করে জিজ্ঞেস সরেন : কি হয়েছে? উম্মুল ফাদল বলেন : আল্লাহ আপনাকে মৃত্যু দান করবেন। যদি এ নেতৃত্ব ও ক্ষমতা আমাদের মধ্যে থাকে অথবা অন্যদের হাতে চলে যায় তাহলে আমাদের মধ্যে কে আপনার স্থলাভিষিক্ত হবে তা যদি বলে যেতেন। রাসূল (সা) বললেন : আমার পরে তোমরা হবে ক্ষমতাহীন, দুর্বল।[তাবাকাত/৮/২৭৮] ইমাম আহমাদের বর্ণনায় জানা যায়, রাসূলুল্লাহর (সা) অন্তিম রোগ শয্যায় এ ঘটনাটি ঘটে।[হায়াতুস সাহাবা-২/৩৩৭  ]

বিদায় হজ্জে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে উম্মুল ফাদলও হজ্জ করেন। আরাফাতে অবস্থানের দিন রাসূলুল্লাহ (সা) রোযা অবস্থায় আছেন কিনা, সে ব্যাপারে সাহাবীরা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে ছিলেন্ এক পর্যায়ে তাঁরা তাঁদের সে দ্বিধার কথা উম্মুল ফাদলের নিকট প্রকাশ করেন। উম্মুল ফাদল বিষয়টি নিশ্চিত হবার জন্য এক পেয়ালা ‍দুধ রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে পেশ করেন এবং তিনি তা পান করেন। এভাবে তাঁদের সব দ্বিধা-সঙশয় দূর হয়ে যায়।[তাবাকাত/৮/২৭৯;]

হযরত উম্মুল ফাদল (রা) একদিন রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট বললেন, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আপনার দেহের একটি অঙ্গ আমার ঘরে আছে। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : স্বপ্নের তাবীর ইনশাআল্লাহ ভালো। ফাতিমার একটি পুত্র সন্তান হবে এবং আপনি তাকে দুধ পান করাবেন। এভাবে আপনি হবেন তার তত্ত্বাধায়িকা। ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়য় হযরত ফাতিমা হযরত হুসাইনকে (রা( জন্ম দেন এবং উম্মুল ফাদল (রা) তাঁকে দুধও পান করান। একদিন তিনি হুসাইনকে কোলে করে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকাট আনেন। শিশু হুসাইন নানার কোলে পেশাব করে দেন। উম্মূল ফাদল তাঁকে ধমক দিয়ে বলেন, তুমি রাসূলুল্লাহর (সা) কোলে পেশাব করে দিয়েছো? রাসূল (সা) বলেন : আপনি সন্তানকে ধমক দিয়ে আমাকে কষ্ট দিচ্ছেন। তারপর পানি দিয়ে পেশাব ধোয় হয়।[প্রাগুক্ত]

হযরত উম্মুল ফাদল (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) রাসূলুল্লাহর (সা) তিরিশটি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। একথা ইমাম জাহাবী মুসনাদে বাকী ইবন মুখাল্লাদের সূত্রে উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে একটি মাত্র হাদীছ মুত্তাফাক ‘আলাইহি, ইমাম বুখারী এবং তিনটি ইমাম মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন।[সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/৩১৫; দ্র. বুখারী-২/২০৪, ৪/২০৬; মুসলিম, হাদীস নং৪৬২, ১১২৩, ১৪৫১;]

উম্মুল ফাদল থেকে যাঁরা হাদীছ বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হলেন : ‘আবদুল্লাহ, তাম্মাম, আনস ইবন মালিক, ‘আবদুল্লাহ ইবন হারিছ, ‘উমাইর, কুরাইব ও ফাবূস।[উসুদুল গাবা-৫/৫৪০]

হযরত উম্মুল ফাদল একজন উঁচু স্তরের ‘আবিদ এবং দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ মহিলা ছিলেন। প্রতি সোম ও বুধবার রোযা রাখা তাঁর অভ্যাস ছিল। একথা তাঁর সুযোগ্য ছেলে মহান সাহাবী হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আব্বাস (রা) বলেছেন।[তাবাকাত -৮/২৭৮; সিয়ারু সাহাবিয়াত-১১৭] তৃতীয় খলীফা হযরত ‘উছমানের (রা) খিলাফতকালে তিনি ইনতিকাল করেন। তখন তাঁর স্বামী হযরত আব্বাস (রা) জীবিত ছিলেন। হযরত ‘উছমান (রা) জানাযার নামায পড়ান।[সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/৩১৫ সিয়ারুস সাহাবিয়াত-১১৭]

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ