আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – ষষ্ঠ খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

উম্মু আয়মান বারাকা (রা)


রাসূলুল্লাহর (সা) আযাদকৃত দাসী উম্মু আয়মান। তাঁর ভালো নাম ‘বারাকা’। হাবশী কন্যা। পিতার নাম সা‘লাবা ইবন ‘আমর। রাসূলুল্লাহর (সা) সম্মানিত পিতা ‘আবদুল্লাহর মতান্তরে মাতা আমিনার দাসী ছিলেন।[আনসাবুল আশরাফ-১/৯৬,] উত্তরাধিকার সূত্রে রাসূল (সা) তাঁকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন।[সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২২৩,] তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) ধাত্রী ছিলেন। রাসূলুল্লা্হকে (সা) কোলে-কাঁখে করে যাঁরা বড় করেন, তিনি তাঁদের একজন।[আনসাবুল আশরাফ-১/৯৬, ৪৭৬,] রাসূলুল্লাহর (সা) সাতটি ছাগী ছিল, উম্মু আয়মান সেগুলো চরাতেন।[প্রাগুক্ত১/৫১৩,]

রাসূলুল্লাহর (সা) বয়স যখন ছয় বছর তখন মা আমিনা তাঁকে সংগে করে মদীনায় যান স্বামীর কবর যিয়ারতের জন্য। এ সফরে সাথে ছিলেন ‘আবদুল মুত্তালিব ও উম্মু আয়মান।[প্রাগুক্ত-১/৯৪]

‘উবাইদ ইবন ‘আমর আল-খাজরাজী ইয়াছরিব থেকে মক্কায় এসে বসবাস করতে থাকেন। এখানে তিনি ‍উম্মু আয়মানের (সা) পরিবারে ফিরে আসেন। বালাজুরী বলেন, ‘উবাইদের সাথে উম্মু আয়মানের এ বিয়ে হয় জাহিলী যুগে। রাসূলুল্লাহর (সা) সংসারে তিনি বিধবা অবস্থায় জীবনের অনেকগুলো দিন কাটিয়ে দেন। অতঃপর রাসূল (সা) একদিন মক্কায় তাঁর সাহাবীদের বললেন : ‘তোমাদের কেউ যদি জান্নাতের অধিকারিণী কোন মহিলাকে বিয়ে করতে চায় সে যেন উম্মু আয়মানকে বিয়ে করেন।’ অতঃপর রাসূলুল্লাহর (সা) পালিত পুত্র এবং অতি প্রীতিভাজন যায়দ ইবন হারিছ তাঁকে বিয়ে করার আগ্রহ প্রকাশ করলে রাসূল (সা) নিজেই উদ্যোগী হয়ে তাঁর সাথে আয়মানের বিয়ে দেন। যায়দের ঘরে পরবর্তীকালের বিখ্যাত সেনানায়ক উসামার জন্ম হয়। প্রথম স্বামীর ঘরের সন্তান আয়মানের নাম অনুসারে আরবের রীতি অনুযায়ী তিনি উম্ম আয়মান উপনাম গ্রহণ করেন এবং এ নামেই ইতিহাসে প্রসিদ্ধি অর্জন করেন। তাঁর আসল নাম ‘বারাকাৎ। এই আয়মান মুসলমান হন এবং হুনাইন যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন।[প্রাগুক্ত-১/৪৭২-৪৭৩; তাবাকাত-৮/২২৪; সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২২৪]

উম্মু আয়মান (রা) ইসলামের প্রথম পর্বেই মুসলমান হন। যেসব ব্যক্তি হাবশা ও মদীনা উভয় স্থানে হিজরতের গৌরব অর্জন করেন, তিনি তাঁদের একজন। প্রথমে হাবশায় হিজরাত করেন। তারপর মক্কায় ফিরে এসে আবার স্বামী যায়দ ইবন হারিছার সাথে মদীনায় হিজরাত করেন।[সিয়ারুস সাহবিয়াত-১১১, আনসাবুল আশরাফ-১/৩২০] তিনি উহুদ ও খায়বার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। উহুদে সৈনিকদের পানি পান করানো ও আহতদের সেবার দায়িত্বে নিয়েঅজিত থাকেন।

বালাজুরী বলেন : রাসূলুল্লাহর (সা) ধাত্রী উম্মু আয়মান (রা) উহুদ যুদ্ধে আনসার মহিলাদের সাথে মুসলিম মুজাহিদদের পানি পান করাচ্ছিলেন। তাঁকে লক্ষ্য করে হিব্বান ইবন ‘আরাকা একটি তীর নিক্ষেপ করে। তীরটি তাঁর ঝালরে লাগে এবং তাঁর দেহের কিছু অংশ বেরিয়ে পড়ে। তা দেখে তীর নিক্ষেপকারী অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। অতঃপর রাসূল (সা) সা‘দ েইবন আবী ওয়াক্কাসের হাতে তীর ধরিয়ে দিয়ে বলেন : এটি মার। সা‘দ তীরটি ছুড়ে মারলেন এবং তা হিব্বানের গায়ে আদে। সাথে সাথে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং মারা যায়। তা দেখে রাসূল (সা) এমনভাবে হেসে দেন যে তাঁর দাঁত দেখা যায়।[প্রাগুক্ত-১/৩২০,]

আল-হারিছ ইবন হাতিব, ছা‘লাবা  ইবন হাতিব, সাওয়াদ ইবন গাযিয়্যা, সা‘দ ইবন ‘উছমান ও আরো কয়েক ব্যক্তি উহুদের সয়দান থেকে পালিয়ে আসেন। উম্মু আয়মান তাঁদেরকে ভীষণ তিরস্কার করেন। তাঁদের মুখে ধুলো ছুড়ে মারতে লাগেন এবং তাঁদেরকে লক্ষ্য করে বলতে থাকেন : যাও, চরকা আছে, সুতা কাট।[প্রাগুক্ত-১/৩২৬,]

হযরত উম্মু আয়মান (রা) আজীবন রাসূলুল্লাহর (সা) পরিবারের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। রাসূলুল্লাহর (সা) পরিবারের লোকদের সাথেই তিনি মদীনায় হিজরাত করেন।[আল-ইসাবা-৪/৪৫০; আল-ইসতী‘আব-৪/৪৫০; হায়াতুস সাহাবা-১/৩৬৯,] ‘আলী ও ফাতিমার বিয়ের সময়ও আমরা উম্মু আয়মানকে (রা) সবার আগ্রভাগে দেখি। রাসূল (সা) আদরের কন্যা ফাতিমাকে স্বামীগৃহে পাঠালেন, পরদিন সকালেই মেয়ে-জামাইকে দেখার জন্য ছুটে গেলেন জামাই বাড়ি। দরজায় টোকা দিলেন। বিয়ে বাড়িতে মহিলাদের বেশ ভির। রাসূলুল্লাহর (সা) উপস্থিতি টের পেয়ে সবাই বেশ সতর্ক হয়ে পড়েছে। উম্মু আয়মান দরাজা খুলে দিলে রাসূল (সা) তাঁকে বললেন : আমার ভাইকে ডেকে দাও। উল্লেখ্য যে, জামাই ‘আল (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সা) চাচাতো ভাই। উম্মু আয়মান (রা) রাতে ‘আলীর বাড়িতেই ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহকে (সা) বললেন : ইয়া রাসূলুল্লাহ! ‘আলীকে ভাই বলছেন কেন। সে কি আপনার মেয়ের স্বামী নয়?[ হায়াতুস সাহাবা-২/৬৬৮]

হিজরী ৮ম সনে যায়নাব বিনতু রাসূলিল্লাহর (সা) ইনতিকাল হলে অন্য মহিলাদের সাথে তাঁর গোসলে অংশগ্রহণ করেন। তার পূর্বে বদর যুদ্ধের সময় রুকাইয়্যা বিনত রাসূলিল্লাহর (সা) ইনতিকাল হলে তাঁকেও গোসল দেন উম্মু আয়মান। আল-কালবী বলেন : উম্মুল মু‘মিনীন খাদীজা (রা) মৃত্যুবরণ করলে তাঁকে গোসল দেন উম্মু আয়মান ও উম্মুল ফাদ।[আনসাবুল আশরাফ -১/৪০০, ৪০১, ৪০৬]

হযরত রাসূলে কারীম (সা) আয়মানকে যথেষ্ট সমাদর ও সম্মান করতেন। মাঝে মধ্যে মা বলেও সম্বোধন করতেন। তিনি একথাও বলতেন : ‘এই পরিবারের অবশিষ্ট ব্যক্তি।’[তাবাকাত-৮/২২৩; আল-হাকিম-৪/৬৩,] উম্মু আয়মান (রা) একটু সরল বুদ্ধির মানুষ ছিলেন। রাসূল (সা) তাঁর সাথে মাঝে মধ্যে একটু হাসি-তামাশাও করতেন। একদিন উম্মু আয়মান (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে বললেন : ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে কোন বাহনের পিঠে চড়ার ব্যবস্থা করে দিন। রাসূল (সা) বললেন: আমি আপনাকে মাদী উটের বাচ্চার উপর চড়াবো। উম্মু আয়মান বললেন : বাচ্চা তো আমার ভার বহন করতে পারবে না। রাসূল (সা) বললেন আমি আপনাকে বাচ্চার উপরই চড়াবো। আসলে রাসূল (সা) তাঁর সাথে একটু তামাশা করছিলেন। হাদীছে এসেছে রাসূল (সা) অহেতুক কোন হাসি-তামাশা করতেন না। তার মধ্যেও সত্য নিহিত থাকতো। এক্ষেত্রে তাই। কারণ, সব উট- তা ছোট হোক বা বড়, কোন না কোন মাদী উটেরই বাচ্চা।[আল-বিদায়া-৬/৪৬; আল-আদাব আল মুফরাদ লিল বুখারী-৪১; সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২২৫ ,]

হযরত উম্মু আয়মান (রা) সবগুলো আরবী বর্ণধ্বনি উচ্চারণ করতে পারেন না।[তাবাকাত-৮/২২৫] আবু জা‘ফর আল-বাকির বলেছেন, একদিন উম্মু আয়মান (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট গেলেন এবং সালাম দিতে গিয়ে উচ্চারণ করলেন এভাবে : (আরবী*****) (সালামু লা ‘আলাইকুম)। সেদিন থেকে রাসূল (সা) তাঁকে শুধু (আরবী***) আস-সালামু বরার অনুমতি দান করেন।[প্রাগুক্ত; সিয়ারা আ‘লাম আন-নুবালা-২/২২৫]

রাসূলুল্লাহ (সা) মৃত্যুবরণ করলে উম্মু আয়মান ভীষণ দুঃখ পান এবং কাঁদতে শুরু করেন। লোকেরা বললো : আপনি কাঁদছেন? জবাবে তিনি বললেন : আল্লাহর কসম, আমি জানতাম তিনি মৃত্যুবরণ করবেন। কিন্তু আমি এ জন্য কাঁদছি যে, আজ থেকে আমাদের নিকট আসমান থেকে ওহী আসা বন্ধ হয়ে গেল। আনাস (রা) থেকে আরো বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা) উম্মু আয়মানের সাথে মাঝে মধ্যে যেমন দেখা করতেন, চলো যাই আমরাও তাঁর সাথে একটু দেখা করে আসি। তাঁরা দুইজন উম্মু আয়মানের নিকট পৌঁছলে তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। তাঁরা বললেন : আপনি কাঁদছেন কেন? আল্লাহর নিকট যা কিছু আছে তা তাঁর রাসূলের (সা) জন্য উত্তম। উম্মু আয়মান বললেন : আমি সে কথা না জেনে কাঁদছিনে। আমি কাঁদছি এ জন্য যে, আকাশ থেকে ওহী আসা বন্ধ হয়ে গেল। এ কথা মুনে আবু বকর ও ‘উমার (রা) উভয়ে কাঁদা শুরু করলেন।[সাহীহ মুসলিম; ফাদায়িলস সাহাবা (২৪৫৪); ইবন মাজা: আল-জানায়িয (১৬৩৫); কানয আল-‘উম্মাল-৪/৪৮; আল-বিদায়া-৫/২৭৪,] এমনিভাবে দ্বিতীয় খলীফা ‘উমার শাহাদাত বরণ করলে তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকেন, “আজ ইসলাম দুর্বল হয়ে গেল।”[ সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২২৭,]

রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় হিজরাত করে আসার পর আনসারগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁদের অনেক খেজুর বাগান রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে ছেড়ে দেন। । পরবর্তীতে যখন মদীনার ইহুদী গোত্র বানু কুরায়জা ও বানু নাদীর মদীনা থেকে বিতাড়িত হয় এবং তাদের সবকিছু মুসলমানদের হাতে আসে তখন তিনি আনসারদের সেই বাগ-বাগিচা ফেরত দিতে আরম্ভ করেন। তার মধ্যে হযরত আনাসেরও (রা) কিছু ছিল। রাসূল (সা) সেই বাগান উম্মু আয়মানকে দিয়েছিলেন। হযরত আনাস (রা) যখন সেই বাগান ফেরত নেওয়ার জন্য উম্মু আয়মানের নিকট গেলেন তখন তিনি তা ফেরত দিতে অস্বীকার করেন। পরে রাসূল (সা) সেই বাগানের পরিবর্তে তাঁকে দশগুণ বেশী দান করেন।[সহীহ আল-বুখারী; আল-মাগাযী-৭/৩১৬; মুসলিম; আল-জিহাদ ও সায়র-২/৩৪১,]

রাসূলুল্লাহ (সা) একদিন উম্মু আয়মানের বাড়িতে যান। উম্মু আয়মান পান করার জন্য শরবত পেশ করেন। রাসূল (সা) রোজা অবস্থায় ছিলেন। এ কারণে পান করতে ইতস্তত: করেন। এতে উম্মু আয়মান খুব অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।[মুসলিম-২/৩৪১,] সম্ভবত তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) রোযার কথা জানতেন না। আর সে কথা প্রকাশ করা রাসূলুল্লাহ (সা) জরুরী কোন বিষয় বলেও মনে করেননি।

হযরত উম্মু আয়মান (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীছও বর্ণনা করেছেন। তাঁর সূত্রে পাঁচটি হাদীছ বর্ণিত পাওয়া যায়। [সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২২৭,] তাঁর সূত্রে যাঁরা হাদীছ বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে আনাস ইবন মালিক, হানশ ইবন ‘আবদিল্লাহ সান‘আনী এবং আবু ইয়াযীদ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।[সাহাবিয়াত-২০০]

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাঁর প্রথম স্বামীর পক্ষে আয়মান এবং দ্বিতীয় স্বামীর পক্ষে উসামা- এই দুই ছেলে ছিল। তাঁরা দুইজনই সাহাবী ছিলেন। উসামা অতি মর্যাদাবান সাহাবী ছিলেন। রাসূলুল্লাহর (সা) অতি স্নেহের পাত্র ছিলেন। আয়মানের এক ছেলে ছিলেন হাজ্জাজ ইবন আয়মান। একদিন তিনি মসজিদে ঢুকে রুকু-সিজদা দায়সারাভাবে করে খুব তাড়াতাড়ি নামায শেষ করেন। পাশে হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘উমার (রা) বসা ছিলেন। তিনি ইবন আয়মানকে (রা) ডেকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি মনে করেছো যে, তোমার নামায হয়েছে? তোমার নামায হয়নি। যাও, আবার পড়। ইবন আয়মান চলে যাওয়ার পর ইবন ‘উমার (রা) লোকদের নিকট জিজ্ঞেস করেন এ লোকটি কে? লোকেরা বললো : হাজ্জাজ ইবন আয়মান- উম্মু আয়মানের পৌত্র। ইবন ‘উমার (রা) তখন মন্তব্য করেন : রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে দেখলে আদর করতেন।[তাবাকাত-৮/২২৫; সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২২৬,]

খলীফা হযরত ‘উছমানের (রা) খিলাফতকালে হযরত উম্মু আয়মান (রা) ইনতিকাল করেন। আর ইবনুল আছীর যে বলেছেন, তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) ওফাতের পাঁচ অথবা ছয় মাস পরে ইনতিকাল করেন, তা সঠিক নয়।[তাবাকাত-৮/২২৭; সাহাবিয়াত-২০০]

উম্মু আয়মানের (রা) সাথে সম্পর্কিত একটি অলৌকিক ঘটনার কথা বিভিন্ন সীরাত গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। যেমন, তিনি যখন হিজরাত করছিলেন তখন পথিমধ্যে এক স্থানে সন্ধ্যা হলো এবং তিনি পিপাসায় কাতর হয়ে পড়লেন। ধারে কাছে কোথাও পানি ছিল না্ এমন সময আকাশ থেকে সাদা রশিতে ঝোলানো এক বালতি পানি তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালো। তিনি পেট বরে সেই পানি পান করলেন। ফল এই দাঁড়ায যে, তিনি জীবনে আর কখনো পিপাসায কাতর হননি। তিনি বলতেন, প্রচণ্ড গরমের দুপুরে রোযা অবস্থায আমার পিপাসা হয়না।[তাবাকাত-৮/২২৪; হায়াতুস সাহাবা-৩/৬১৮]

তাবারানী বর্ণনা করেছেন। একবা আল-গিফার গোত্রের একদল লোক ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এলো। এ দলটির মধ্যে জাহজাহ আল গিফারীও ছিলেন। তারা মসজিদে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে নামায আদায করলেন। নামাযে সালাম ফেরানোর পর রাসূল (সা) ঘোষণা দিলেন : মুসল্লীদের প্রত্যেকেই তার পাশের অতিথিকে সাথে করে নিয়ে যাবে। জাহজাহ আল-গিফারী বলেন : সবাই চরে গেল। মসজিদে মসজিদে কেবল আমি ও রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে গেলাম। আমি ছিলাম একজন দীর্ঘদেহী মোটা মানুষ। রাসূল (সা) রাসূল (সা) আমাকে সংগে করে তাঁর ঘরে নিয়ে গেলেন্ তারপর আমার জন্যে একটি ছাগৎীর দুধ দুইয়ে আনলেন। আমি তা এক চুমুকে শেষ করে ফেললাম। তারপর হাঁড়িতে রান্না করা খাবার আনলেন, তাও সাবাড় করে ফেললাম। এ অবস্থা দেখে উম্মু আয়মান (রা) মন্তব্য করলেন : আজ রাতে যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহকে (সা) অভুক্ত রাখলো, আল্লাহ যেন তাকে অভুক্ত রাখেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : উম্মু আয়মান, চুপ করুন। সে তার রিযিক খেয়েছে। আর আমাদের রিযিক আল্লাহর দায়িত্বে।

রাত পোহালো। পরদিন দলটির সকলে একত্র হলো। প্রত্যেকেই তার খাবারের কথা বলতে লাগলো। জাহজাহও তার অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করলেন। দিন কেটে গেল। তারা রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে মাগরিবের নামায আদায় করলেন। আগের দিনের মত রাসূল (সা) একই ঘোষনা দিলেন। সবাই যার যার অতিথি সংগে করে চলে গেল। জাহজাহ বলেন, আজো আমি ও রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে গেলাম। আসলে আমার এ বিরাট বপু দেখে কেউ আমাকে নেওয়ার আগ্রহ দেখাতো না। রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে নিয়ে ঘরে গেলেন। তারপর একটি ছাগী দুইয়ে দুধ আনলেন। আমি পান করলাম এবং তাতেই পরিতৃপ্ত হলাম। আমার আজকের এ অবস্থা দেখে উম্মু আয়মান (রা) বিস্ময়ের সাথে বলে উঠলেন : ইয়া রাসূলুল্লাহ! এই কি আমাদের সেই মেহমান নয়? তিনি বললেন : হাঁ, সেই মেহমান। তবে আজ রাতে সে খেয়েছে ‍মু‘মিন খায় একটিতে।[কানয আল-‘উম্মাল-১/৯৩; আল-ইসাবা-১/২৫৩; হায়াতুস সাহাবা-২/১৯৭-১৯৮]

হযরত উম্মু আয়মান (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) জন্য খাবার তৈরী করতেন। একদিন তিনি আটা চাললেন এবং সেই চালা আটা দিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) জন্য রুটি তৈরি করলেন। রুটি দেখে রাসূল (সা) প্রশ্ন করলেন। এ কি? উম্মু আয়মান বলেন : আমাদের দেশে আমরা এরূপ রুটি তৈরি করে থাকি। তাই আপনাকে এরূপ রুটি খাওয়াতে চেয়েছি। উল্লেখ্য যে, উম্মু আয়মানের (রা) জন্মভূমি ছিল হাবশা। রাসূল (সা) বললেন : এই রুটিগুলো চেলে বের করা ভূষির সাথে মিশিয়ে দিন। তারপর চটকিয়ে আবার আটার দলা বানিয়ে ফেলুন।[আত-তারগীব ওয়াত তারহীব-৫/১৫৪; হায়াতুস সাহাবা-২/২৭৩]

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ