আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – ষষ্ঠ খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

উম্মু হানী বিনত আবী তালিব (রা)


ইতিহাসে তিনি উম্মু হানী- এ ডাকনামে প্রসিদ্ধ। আসল নাম ফাখতা, মতান্তরে হিন্দ। হযরত রাসূলে কারীমের মহতারাম চাচা আবূ তালিব এবং মুহতারামা চাচী ফাতিমা বিনত আসাদের কন্যা। ‘আকীল, জা‘ফার, তালিব ও ‘আলীর (রা) সহোদরা।[সীরাতু ইবন হিশাম, ২/৪২০; আ‘লাম আন-নিসা‘, ৪/১৪ আল-ইসী‘আব, ২/৭৭২, ] তাঁর শৈশব-কৈশোর জীবনের কথা তেমন কিছু জানা যায় না। তবে বিয়ে সম্পর্কে দু‘একটি বর্ণনা দেখা যায়। যেমন রাসূল (সা) নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে চাচা আবূ তালিবের নিকট উম্মে হানীর বিয়ের পয়গাম পাঠান। একই সংগ্রে হুবায়রা ইবন ‘আমর ইবন ‘আয়িয আল-মাখযূমীও পাঠান। চাচা হুবায়রার প্রস্তাব গ্রহণ করে উম্মু হানীকে তার সাথে বিয়ে দেন। নবী (সা) বললেন : ভাতিজা! আমরা তার সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক করেছি। সম্মানীয়দের সমকক্ষ সম্মানীয়রাই হয়ে থাকে।[আ‘লাম আন-নিসা- ৪/১৪,] এতটুকু বর্ণনা। এর অতিরিক্ত কোন কথা কোন বর্ণনায় পাওয়া যায় না। তবে হুবায়রা ইবন ‘আমরের সাথে তাঁর বিয়ে হয়েছিল সে কথা বিভিন্নভাবে জানা যায়।[উসুদুল গাবা-৫/৬২৪,]

উম্মু হানী কখন ইসলাম গ্রহণ করেন সে ব্যাপারে বিভিন্ন বর্ণনার মধ্যে একটু ভিন্নতা দেখা যায়। ইমাম আয-যাহাবি বলেন :[ সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/৩১২।] (আরবী*******)

‘তাঁর ইসলাম গ্রহণ বিলম্বে হয়। তিনি মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন।’

তবে রাসূলুল্লাহর (সা) সম্পর্কিত যে সকল বর্ণনা পাওয়া যায় তার মধ্যে উম্মু হানীর (রা) একটি বর্ণনাও বিভিন্ন গ্রন্থে দেখা যা। তাতে বুঝা যায় রাসূলুল্লাহর (সা) মি‘রাজ উম্মু হানীর ঘর থেকে হয়েছিল এবং তিনি তখন একজন মুসলমান। আর এটা হিজরাতের পূর্বের ঘটনা। তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহর (সা) ইসরা’ (মক্কা থেকে বাইতুল মাকদাসে রাত্রকালীন ভ্রমণ) আমার ঘর থেকেই হয়। সে রাতে তিনি ‘ঈশার নামায আদায় করে আমার ঘরে ঘুমান। আমরাও ঘুমিয়ে পড়ি। পজরের অব্যবহিত পূর্বে তিনি আমাদের ঘুম থেকে জাগান। তারপ তিনি বলেন : উম্মু হানী! তুমি দেখেছিলে, গতরাতে আমি এই উপত্যকায় ‘ঈশার নামায আদায় করেছিলাম। তারপর আমি বাইতুল মাকদাসে যাই এবং সেখানে নামায আদায় করি। আর এখন আমি ফজরের নামায তোমাদের সাথে আদায় করলাম, যা তোমরা দেখতে পেলে। তারপর তিনি বাইরে যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। আমি তহাঁর চাদরের এক কোনে টেনে ধরলাম। ফলে তাঁর পেটের অংশ বেরিয়ে যায়। তখন তা মিসরীয় কিবতী ভাঁজ করা কাতান বস্ত্রের মত দেখাচ্ছিল। আমি বললাম : হে আল্লাহর নবী! একথা আর কাউকে বলবেন না। এমন কথা তারা বিশ্বাস করবে না এবং তারা আপনাকে কষ্ট দিবে। বললেন : আল্লাহর কসম! একথা আমি তাদেরকে বলবই।

আমি আমার হাবশী দাসীকে বললাম : তুমি রাসূলুল্লাহর (সা) পিছে পিছে যাও এবং শোন তিনি মানুষকে কি বলেন এবং লোকেরা তাঁকে কি বলে। রাসূলুল্লাহ (সা) বেরিয়ে গেলেন এবং মানুষকে ইরার কথা বললেন। লোকেরা শুনে তো বিস্ময়ে হতবাক! তারা বললো : মুহাম্মাদ! তোমার এ দাবীর সপক্ষে প্রমাণ কি? আমরা তো এমন কথা আর কখনো শুনিনি। বললেন : আমি অমুক উপত্যাকায় অমুক গোত্রের একটি কাফেলার পাশ দিয়ে গিয়েছি। তাদের একটি উট হারিয়ে গিয়েছিল, আমি সে উটের সন্ধান দিয়েছি। আমি তখন শাম অভিমুখী ছিলাম। তারপর আমি “দাজনান” – এ অমুক গোত্রের কাফেলাকে পেয়েছি। আমি যখন তাদের অতিক্রম করি তখন তারা ঘুমিয়ে। তাদের একটি পানির পাত্র কিছু দিয়ে ঢাকা ছিল। আমি পাত্র থেকে পানি পান করে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রেখেছি। আমার এ দাবীর প্রমাণ হলো এখন সেই কাফেলা বায়দা থেকে তান‘ঈমের বাঁকের পথে আছে। যার অগ্রভাগে রয়েছে একটি ধূসর বর্ণের উট। লোকেরা সংগে সংগে তান‘ঈমের দিকে ছুটে গেল এবং তাদেরকে দেখতে পেল। তারা তাদেরকে পাত্রে ঢাকা দেওয়া পানির কথা বললো, তারা তার সত্যতা স্বীকার করলো। আর যে কাফেলার উট হারিয়ে গিয়েছিল তারা মক্কায় ফিরে এলে তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে তারাও কথাটি সত্য বলে স্বীকার করলো।[সীরাতু ইবন হিশাম-১/৪০২-৪০৩; ইবন কাছীর, আস-সীরাহ্ আন-নাবাবিয়্যাহ্-১/২৯৫]

মক্কা বিজয়ের দিন উম্মু হানীকে ইতিহাসের দৃশ্যপটে দেখা যায়। তাঁকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি ঘটনার কথা সীরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থাবলীতে বর্ণিত হয়েছে। যেমন এদিন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁর স্বামী মক্কা থেকে পালিয়ে নাজরানের দিকে চলে যান।[আনসাবুল আশরাফ-১/৩৬২] স্ত্রী উম্মু হানীর ইসলাম গ্রহণের খবর শুনে তাঁকে তিরস্কার করে একটি কবিতা তিনি রচরা করেন। কবিতাটির কিছু অংশ সীরাতের বিভিন্ন গ্রন্থে দেখা যায়।[সীরাতু ইবন হিশাম-২/৪২০; উসুদুল গাবা-৫/৬২৮; ইবন দুরাইদ, আল-ইতিকাক-১৫২] নিম্নের চরণগুলোতে মক্কা থেকে পালিয়ে যাবার কারণ স্ত্রীর নিকট ব্যাখ্যা করেছেন ।[আ‘লাম আন-নিসা-৪/১৪] (আরবী********)

‘তোমার জীবনের শপথ! আমি ভরুতার কারণে ও হত্যার ভয়ে মুহাম্মাদ ও তাঁর সঙ্গীদেরকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে পালিয়ে আসিনি। তবে আমি নিজের বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছি, তাতে বুঝেছি এ যুদ্ধে আমার তীর ও তরবারি যথেষ্ট নয়। আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল থেকেছি। কিন্তু যখন আমার অস্থান সংকীর্ণ হওয়ার ভয় করেছি তখন ফিরে এসেছি যেমন বাঘ তার শাবকের কাছে ফিরে আসে।’

অনেকে তাঁর এই ফিরে আসাকে ইসলামের দিকে ফিরে আসা বলেছেন, কিন্তু তা সঠিক নয়। কারণ, তিনি কুফরীর উপর অটল থেকে মৃত্যুবরণ করেন।

এই মক্কা বিজয়ের দিন তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) অবস্থান স্থলে যান এবং তাঁকে গোসল করে চাশতের আট রাক‘আত নামায আদায করতে দেখেন। এ দিন তিনি দু‘জন আত্মীয়কে নিজ গৃহে আশ্রয় দেন এবং সে কথা রাসূলুল্লাহকে (সা) জানালে তিনিও তাদের নিরাপত্তার ঘোষণা দেন। নিম্নে সেই বর্ণনাগুলো তুলে ধরা হলো।

মক্কা বিজয়ের দিন আল-হারিছ ইবন হিশাম উম্মু হানীর গৃহে আশ্রয় নেয়। এ সময় উম্মু হানীর ভাই ‘আলী (রা) সেখানে যান। তিনি আলীকে (রা) আল-হারিছের বিষয়টি অবহিত করেন। সঙ্গে সঙ্গে ‘আলী (রা) তাকে হত্যার উদ্যেশ্যে তরবারি হাতে তুলে নেন। উম্মু হানী তাঁকে বলেন, ভাই! আমি তাকে নিরাপত্তা দিয়েছি। কিন্তু ‘আলী (রা) তাঁর কথায় কান দিলেন না। তখন উম্মু হানী ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁর দু‘হাত শক্তভাবে মুঠ করে ধরে বলেন, আল্লাহর কসম! তুমি তাকে হত্যা করতে পার না। আমি তাকে আশ্রয় দিয়েছি। ‘আলী (রা) এক পাও এগোতে পারলেন না। তাঁর হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু সক্ষম হলেন না।

এ সময় নবী (সা) উপস্থিত হলেন। উম্মু হানী (রা) বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি অমুককে আশ্রয় দিয়েছি, আর ‘আলী তাঁকে হত্যা করতে চায়। রাসূল (সা) বললেন, তুমি যাকে আশ্রয় দিয়েছো, আমরাও তাকে আশ্রয় দিলাম। তুমি ‘আলীর উপর রাগ করো না। কারণ, ‘আলী রাগ করলে আল্লাহ রাগান্বিত হন। তাকে ছেড়ে দাও। উম্মু হানী আলীকে ছেড়ে দেন। রাসূল (সা) বললেন : একজন নারী তোমাকে পরাভূত করেছ। আলী বললেন : আল্লাহর কসম! ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি মাটি থেকে আমার পা উঠাতেই পারলাম না। রাসূল (সা) হেসে দিলেন।[প্রাগুক্ত-৪/১৫; মুসনাদে আহমাদ-৫/২৪২]

ইবন হিশান তাঁর সীরাতে ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন এভাবে : উম্মু হানী বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) যখন মক্কার উঁচু ভূমিতে অবতরণ করলেন তখন আমার শ্বশুরের গোত্র বনূ মাখযূমের দুই ব্যক্তি আল-হারিছ ইবন হিশাম ও ‘আবদুল্লাহ ইবন আবী রাবী‘আ পালিয়ে আমার গৃহে আশ্রয় নেয়। এ সময় আমার ভাই ‘আলী এসে উপস্থিত হয় এবং তাদেরকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। আমি দরজা বন্ধ করে মক্কার উঁচু ভূমিতে রাসূলুল্লাহর নিকট (সা) ছুটে গেলাম। তিনি আমাকে স্বাগত জানিয়ে বললেন : উম্মু হানী! কি উদ্দেশ্যে এসেছো? আমি তখন ঐ দুই ব্যক্তি ও ‘আলীর বিষয়টি তাঁকে অবহিত করলাম। তিনি বললেন : তুমি যাদেরকে নিরাপত্তা দিয়েছো আমরাও তাদেরকে নিরাপত্তা দিলাম। অতএব সে তাদেরকে হত্যা করবে না।[সীরাতু ইবন হিশাম-২/৪১১; হায়াতুস সাহাবা-১/১৮২; ৩/১৪৫, ১৪৬,]

উম্মু হানী বলেছেন, আমি মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট যাই। দেখলাম তিনি গোসল করছেন এবং ফাতিমা কাপড় দিয়ে তাঁকে আড়াল করে আছেন। আমি সালাম দিলাম। তিনি প্রশ্ন করলেন। কে তুমি? বললাম : আবূ তালিবের মেয়ে উম্মু হানী। বললেন : উম্মু হানী! তোমাকে শুভেচ্ছা ও স্বাগতম! গোসল সেরে তিনি নামাযে দাঁড়ালেন। এককানা মাত্র কাপড় পরে ও গায়ে জড়িয়ে আট রাকা‘আত নামায আদায় করেন। তারপর আমি বললাম : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার সহোদর ‘আলী এক ব্যক্তিকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছে যাকে আমি আশ্রয় দিয়েছি। বললেন : উম্মু হানী! তুমি যাকে আশ্রয় দিয়েছো আমরাও তাকে আশ্রয় দিলাম। সেটা ছিল চাশতের নামায।[মহীহ বুখারী-৩.৪৩; বাবু সালাতিল ফাজরি ফিস সাফর-৬/১৯৫, ১৯৬; কিতাবুল মাগাযী; বাবু মানযিলিন নাবিয়্যি ইউমাল ফাতহি; সহীহ মুসলিম (৩৩৬) বাবু সালাতিল মাসাফিরীন ওয়া কাসরিহা; বাবু ইসতিহবাবি সালাতিদ দুহা; আল-মুওয়াত্তা-১/১৫২; বাবু সালাতিদ দুহা।]

হযরত রাসূলে কারীমের (সা) প্রতি ছিল উম্মু হানীর (রা) দারুণ সম্মান ও শ্রদ্ধবোধ। মক্কা বিজয়ের সময়কালে একদিন রাসূল (সা) তাঁর গৃহে যান। উম্মু হানী (রা) তাঁকে শরবত পান করতে দিলে তিনি কিছু পান করে উম্মু হানীর দিকে এগিয়ে দেন। উম্মু হানী সেদিন নফল রোযা রেখেছিল। তিনি রোযা ভেঙ্গে রাসূলুল্লাহর (সা) পানকৃত অবশিষ্ট শরবত পান করেন। রাসূল (সা) তাঁর এভাবে রোযা ভাঙ্গার কারণ জানতে চাইলে জবাব দেন : আমি আপনার মুখ লাগানো শরবত পানের সুযোগ ছেড়ে দিতে পারি না। রাসূল (সা) তাঁকে খুব ভালোবাসতেন। একবার তিনি বলেন : উম্মু হানী, বকরী গ্রহণ কর। এ অত্যন্ত বরকতের জিনিস।[মুসনাদে আহমাদ-৬/৩৪৩]

উম্মু হানীর (রা) স্বামী হুবায়রা কুফরীর উপর অটল থাকে এবং সেই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। উম্মু হানী ইসলাম গ্রহণের পর ইসলামের কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে। অতঃপর রাসূল (সা) তাঁকে বিয়ের পয়গাম দেন। জবাবে উম্মু হানী বলেন : আল্লাহর কসম! আমি তো জাহেলী যুগেই আপনাকে ভালোবাসতাম। এখন ইসলামী যুগে তো সে ভালোবাসা আরো গভীর হয়েছে। তবে আমি এখন একজন বিপদগ্রস্ত নারী। আমার অনেকগুলো ছোট ছেলে-মেয়ে আছে। আমার ভয় হয় তারা আপনাকে কষ্ট দেবে। রাসূল (সা) বলেন :বাহনের পিঠে আরোহণকারিনীদের মধ্যে কুরাইশ রমণীরা উত্তম। তারা তাদের শিশুদের প্রতি সর্বাধিক মমতাময়ী এবং স্বামীদের অধিকারের ব্যাপারে অধিক যত্নশীলা।[সীরাতু ইবন হিশাম-২/৪২০; আনসাবুল আশরাফ-১/৪৫৯,]

অপর একটি বর্ণনায় একথাও এসেছে, তিনি বলেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার কান এবং চোখ থেকেও আপনি আমার অধিক প্রিয়। স্বামীর অধিকার অনেক বড় জিনিস। স্বামীর দিকে মনোযোগী হলে আমার নিজের এবং আমার সন্তানদের অনেক কিছু ত্যাগ করতে হবে। আর সন্তানদের দিকে মনোযোগ দিলে স্বামীর অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে। তাঁর একথা শুনে রাসূল (সা) বলেন : উটের পিঠে আরোহণকারিণীদের মধ্যে সুরাইশ রমণীরা সর্বোত্তম। তারা তাদের শিশু সন্তানদের প্রতি যেমন অধিক মমতাময়ী তেমনি স্বামীর অধিকারের প্রতিও বেশী যত্নশীলা। এরপর রাসূল (সা) বিষয়টি নিয়ে আর উচ্চ-বাচ্চ করেননি।[আল- ‘ইকদ আল-ফারীদ-৬/৮৯; সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/৩১৪; আনসাব-১/৪৫৯; আ‘লাম আন-নিসা-৪/১৬]

একবার উম্মু হানী বর্ণনা করেছেন, ‘আম্মার ইবন ইয়াসির, তাঁর পিতা ইয়াসির, ভাই ‘আবদুল্লাহ দেন। [মুসনাদে আহমাদ-৬/৩৪৩]

উম্মু হানী বর্ণনা করেছেন, ‘আম্মার ইবন ইয়াসির, তাঁর পিতা ইয়াছির, ভাই আবদুল্লাহ ইবন ইয়াসির এবং মা সুমাইয়্যাকে আল্লাহর রাস্তায় থাকার কারণে শাস্তি দেওয়া হতো। একদিন তাঁদের পাশ দিয়ে রাসূল (সা) যাওয়ার সময় বলেন : ওহে ইয়াসরের পরিবার! তোমরা ধৈর্যধারণ কর। তোমাদের ঠিকানা হল জান্নাত। অতঃপর নির্যাতনে ইয়াসির মৃত্যুবরণ করেন। সুমাইয়্যা আবূ জাহলকে কঠোর ভাষায় গালমন্দ করেন। আবূ জাহল তাঁর যৌনাঙ্গে বর্শাঘাত করলে তিনিও মৃত্যুবরণ করেন। আর ‘আবদুল্লাহকে তীর নিক্ষেপ করলে তিনিও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।[আনসাবুল আশরাফ-১/১৬০]

এমনিভাবে উম্মু হানী (রা) রাসূলুল্লাহকে (সা) যেমন দেখেছিলেন তার একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহর (সা) দাঁতের চেয়ে সুন্দর তাঁদ আর কারো দেখিনি। রাসূলুল্লাহর (সা) পেট দেখে ভাজ করা কাগজের কথা মনে হতো। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহর (সা) মাথার কেশ চারটি গুচ্ছে ভাগ করা দেখেছি।[প্রাগুক্ত-১/৩৯৩] হযরত রাসূলে কারীমের (সা) ইনতিকালের পর প্রথম খলীফা আবূ বকরের (রা) নিকট নবী দুহিতা হযরত ফাতিমার পিতার উত্তরাধিকার দাবীর বিষয়টিও উম্মু হানী (রা) বর্ণনা করেছেন।[প্রাগুক্ত-১/৩৯৩]

হযরত উম্মু হানী (রা) রাসূলুল্লহর (সা) ৪৬ (ছেচল্লিশটি ) হাদীছ বর্ণনা করেছেন যা হাদীছের বিভিন্ন গ্রন্থে সংকলিত রয়েছে।[বুখারী-৬/১৯৫, ১৯৬ : বুবু আমান আন-নিসা ওয়া জাওযারিহিন্না; মুসলিম (৩৩৬) বাবু ইসতিহবাব সালাতিদ দুহা] তাঁর সূত্রে যে সকল রাবী হাদীছ বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে বিশেষ কয়েকজন হলেন : জা‘দা, ইয়াহইয়া, হারূর, আবূ মূররা, আবূ সালিহ, আবদুল্লাহ ইবন ‘আয়্যাশ, আবদুল্লাহ ইবন আল হারিছ ইবন নাওফাল, ‘আবদুর রহমান ইবন আবী লায়লা, শা‘বী, ‘আতা, কুরাইব, মুজাহিদ, ‘উরওয়া ইবন আয-যবায়র, মুহাম্মাদ ইবন ‘উকবা প্রমুখ।[সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/৩১২; আ’লাম আন-নিসা-৪/১৬]

হযরত উম্মু হানীর (রা) মৃত্যুসন সঠিকভাবে জানা যায় না। তবে “আল-ইসাবা ফী তাময়ীয আস-সাহাবা” গ্রন্থের বর্ণনায় জানা যায়, তিনি ‘আলীর (রা) মৃত্যুর পরও জীবিত ছিলেন।[সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/৩১৩] তাঁর কয়েকজন সন্তানের নাম হলো: ‘আমর, হানী, ইউসুফ ও জা‘দা। তাঁরা সকলে হযরত ‘আলীর (রা) ভাগ্নে। জা‘দাকে হযরত ‘আলী (রা) খুরাসানের ওয়ালী নিয়োগ করেছিলেন। [প্রাগুক্ত-২/৩১২,৩১৩; সাহাবিয়াত-২২৯]

হযরত উম্মু হানীর (রা) জন্য বিশেষ মর্যাদার বিষয় এই যে, হযরত রাসূলে কারীম (সা) তাঁর নিকট খাবার চেয়ে খেয়েছেন এবং প্রশংসা করেছেন। একদিন রাসূল (সা) উম্মু হানীকে বললেন : তোমার নিকট খাবার কোন কিছু আছে কি?

উম্মু হানী : কিছু শুকনো রুটির টুকরো ছাড়া আর কিছু নেই। আমি তা আপনার সামনে দিতে লজ্জা পাচ্ছি।

রাসূল (সা) বললেন : সেগুলোই নিয়ে এসো।

উম্মু হানী হাজির বরলেন। রাসূল (সা) সেগুলো টুকরো টুকরো করে লবন-পানি মিশালেন। তারপর বললেন : কিছু তরকারি আছে? উম্মু হানী বললেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! কিছু সিরকা ছাড়া আমার কাছে আর কিছু নেই। রাসূল (সা) সিরকা আনতে বললেন। তিনি রুটির টুকরোগুলোতে সিরকা মিশিয়ে আহার করলেন। তারপর আল্লাহর হামদ জ্ঞাপন করে বললেন :সিরকা অতি উত্তম তরকারি। উম্মু হানী! যে গৃহে সিরকা থাকে সে গৃহ অভাবী হয় না।[আস-সীরাতুল হালাবিয়্যাহ-৩/৪২; নিসা’ মিন ‘আসর আন-নুবুওয়াহ্-৩৯৮]

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ