সীরাতে ইবনে হিশাম

ভূমিকা

ইতিহাস ও সীরাত

জাহিলিয়াত যুগে আরবরা ইতিহাস কি জিনিস, তা জানতো না। ইতিহাস বলতে তাদের কাছে ছিল উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জনশ্রুতি। আরব জীবনের স্বভাব +প্রকৃতির বর্ণনাই ছিল সেকালের প্রচলিত ইতিহাসের একমাত্র উপাদান। বাপদাদার বীরত্বগাথা এবং তাদের বদান্যতা, স্বগোত্রের প্রতি আনুগত্য ও প্রতিশ্রুতি পরায়ণতার গৌরবময় কাহিনীতে তা ছিল ভরপুর। বংশ পরম্পরা ও শত্রু মিত্রের পরিচয়মূলক বিবরণে সমৃদ্ধ ছিল সে ইতিহাস। পবিত্র কা’বাঘর ও তার রক্ষকদের, ইতিবৃত্ত, যমযম কূপের উদ্ভব-বৃত্তান্ত, জুরহুম ও কুরাইশ নেতৃবৃন্দের জীবন কথা, মাআরিবের বাঁধভাঙা প্লাবন ও তার পরিণতিতে সেখানকার অধিবাসীদের শতধাবিচ্ছিন্ন হযে দিকবিদিক  ছড়িয়ে পড়ার কাহিনী, গণক ও যাজকদের ভবিষ্যদ্বানী ও তাদের ছন্দবদ্ধ গদ্য-কবিতা ইত্যাদি-যার দ্বারা তৎকালীন আরবদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় জীবনের স্বরূপ জানা যায়- এসবই ছিল আরব জাতির ইতিকথার প্রধান উপজীব্য। যখন হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে ইসলামের পুনরাবির্ভাব ঘটলো, তখনো ঐসব জনশ্রুতিমুলক ইতিকাহিনী মানুষের মুখে মুখে বিবৃত হওয়া অব্যাহত থাকলো। অধিকন্তু ইসলামের প্রতি আহ্বান ও তার পূর্বে পরিলক্ষিত নবুওয়াতে পূর্বাভাস, তাঁর ক্রমবিকাশ ও বয়োপ্রাপ্তি, নবুওয়াতোত্তর জীবন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের জীবনের ঘটনাবলী এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার  আদর্শ জীবনের প্রতি বৈরীভাবাপন্ন নামধারী মুসলিম, খৃস্টান, ইহুদী ও মুশরিকদের কাহিনী- এসবের মধ্যে আরব কথক ও কহিনীকাররা এক ব্যাপক ও সুদূর প্রসারী উপকরণ পেয়ে গেল। ফলে এসব নতুন কহিনীও একইভাবে মৌখিক বর্ননার মাধ্যমে তাদের মধ্যে প্রচলিত ছিল।পবিত্র কুরআন, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস ও সাহাবাদের কথাবার্তা ঐ নতুন জীবনের এক সুপরিসর দলীল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো।

পবিত্র কুরআন তো প্রথম থেকেই লিখিত ছিল। কিন্তু মহানবীর (সা) হাদীস দীর্ঘকাল ব্যাপী অলিখিত থাকে তবে লোকেরা এগুলোকে বিশ্বস্ত ও প্রামাণ্য বর্ণনা বলে জানতো। হাদীসকে ব্যাপকভাবে লিখে রাখতে কেউ সাহসই করেনি। হযরত আবু সাঈদ (রা) বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের “কুরআন ছাড়া আমার কোন কথা লিখো না, যদি লিখে থাক হবে তা নিশ্চিহ্ন করে দাও ”- এই উক্তির কারণেই কেউ লিপিবদ্ধ করতে সাহস পায়নি।

এই নিষেধাজ্ঞার তাৎপর্য খুবই স্পষ্ট। কুরআন নাযিল হবার কালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উক্তি লিখে রাখলে কুরআনের সাথে তা মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতে পারে-এরূপ আশংকা ছিল। শুধুমাত্র এই মিশ্রণ এড়ানোর মহান লক্ষ্য সামনে রেখেই যে এই নিষেধাজ্ঞা উচ্চারিত হয়েছিল এবং তা যে কুরআন নাযিলকালের জন্যই সীমাবদ্ধ ছিল, সে কথা না বললেও চলে।

তথাপি উমার ইবনে আবদুল আযীযের শাসনকালের প্রারম্ভ পর্যন্ত ব্যপকভাবে হাদীস প্রনয়নের কাজে হাত দেয়া হয়নি। ৯৯ হিজরী সন থেকে ১০১ হিজরী সন পর্যন্ত তিনি খিলাফতের আসনে অধিষ্ঠিত থাকেন। কথিত আছে যে, তিনি হাদীস প্রণয়নের কাজে হাত দেবেন কিনা তা নিয়ে চল্লিশ দিন পর্যন্ত ইস্তিখারা করেন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহর তরফ থেকে হাত দেয়া কর্তব্য বলে আভাস পান। ফলে তিনি আবু বাকর ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে উমার ইবনে হাযামকে হাদীস  সংকলনের কাজে নিয়োজিত করেন। আবু বাকর ছিলেন মদীনার গভর্নর ও বিচারক। তিনি ১২০ হি: সন পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। যেসব হাদীস তাঁর মুখস্থ ছিল, তা তিনি একটি পুস্তকের আকারে লিপিবদ্ধ করে পর্যালোচনার জন্য বিভিন্ন শহরে পাঠান। উমার ইবনে আবদুল আযীয মুহাম্মদ ইবনে মুসলিম ইবনে শিহাব আযযুহরীকেও হাদীস সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত করেন। তিনি একখানা হাদীস গ্রন্থ প্রণয়ন করেন।

এরপর থেকে মুসলমানগণ হাদীস সংগ্রহের কাজ অব্যাহত রাখেন। তবে সে কাজ কোন বিশেষ বিন্যাস পদ্ধতির অনুস্ারী ছিল না যিনি যেভাবে পরতেন সংগ্রহ করতেন। কেউ বা শরীয়াতের বিধানের কোন বিশেষ পরিচ্ছেদের অধীন একখানা পুস্তকের আকারে লিপিদ্ধ করতেন। এরপর এই পুস্তক প্রণয়নের ধারা এগিয়ে চলে। এই পর্যায়ে আমরা দেখতে পাই, অনেকে হাদীস গ্রস্থের পরিচ্ছেদ বিন্যাস করেছেন এবং সেইসব গ্রন্থ থেকে হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন বৃত্তান্তকে আলাদা করেছেন। এই পর্যায়ে তাঁর জন্মবৃত্তান্ত, ধাত্রীগৃহে তাঁর লালন পালন এবং নবুওয়াতপূর্ব অন্যান্য ঘটনাবলী লিপিবদ্ধ করেছেন। অত:পর কৃরাইশদেরকে আল্লাহর দীনের দিকে আহ্বান জানানো এবং কুরাইশদের পক্ষ থেকে তাঁর ও তাঁর সহচরবৃন্দের ওপর পরিচালিত যুলুম নির্যাতনে ধৈর্য ধারণের ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। সেইসাথে যুদ্ধ বিগ্রহের ঘটনাবলী সংক্রান্ত হাদীসগুলোরও সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন।

ঐতিহাসিকগণ অনুসরণ করেছেন ভিন্নতর পন্থা। তাঁরা ইতিহাস বিষয় নিয়ে ব্যাপক গ্রন্থরাজি রচনা করেছন। এর মাধ্যমে তাঁদের ইসলামী ভাবাবেগই প্রতিফলিত হয়েছে- যার কারণে তাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যক্তিত্বে মুসলমানদের জন্য সন্দেহাতীতভাবে অনুকরণীয় আদর্শ ও হিদায়াত প্রাপ্তির উৎসের সন্ধান পেয়েছেন।

 

সীরাত গ্রন্থ রচনায় অগ্রণী মুসলিম ঐতিহাসকগণ

সীরাত গ্রন্থের প্রথম রচয়িতা ছিলেন উরওয়াহ ইবনুয্ যুবাইর ইবনুল ‘আওয়াম (৯২হি:), আব্বান ইবনে উস্মান (১০৫হি:), ওয়াহ্াব ইবনে মুনাববিহ (১১০ হি:), শুরাহবীল ইবনে সা’দ (১২৩হি:),ইবনে শিহাব আয্যুহরী (১২৪ হি:) এবং আবদুল্লাহ ইবনে আবু বাক্র ইবনে হাযাম (১৩৫ হি:)। এদের রচিত গ্রন্থাবলীর প্রায় সবই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তবে কিছু কিছু অংশ বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থে স্থান লাভ করেছে। তাবাবীর ইতিহাসের কথা এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। আর ওয়াহব ইবনে মুনাব্বিহর গ্রন্থের একটি অংশ বর্তমানে জার্মানীর হাইডেলবার্গ নগরীতে সংরক্ষিত আছে।

এঁদের পরে ইতিহাস ও সীরাত গ্রস্থের রচয়িতাদের আর একটি দল আবির্ভূত হন।তাঁদের মধ্যে প্রসিদ্ধ ব্যক্তিগণ হলেন মূসা ইবনে উকবাহ (১৪১ হি:), মুয়াম্মার ইবনে রাশেদ (১৫০ হি:) ও মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (১৫২ হি:)। এদের পরবর্তী দলের প্রধানতম ব্যক্তিবর্গ হলেন, যিয়াদ আল বুকায়ী (১৮৩ হি:), ওয়াকেদী যিনি মাগাযী (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধের ইতিহাস) গ্রন্থের রচয়িতা (২০৭ হি:), ইবনে হিশাম (২১৮ হি:) এবং বিখ্যাত তাবাকাত প্রণেতা ইবনে সা’দ (২৩০ হি:)।

সীরাতে ইবনে ইসহাক

উল্লিখিত সীরাত গ্রন্থাবলীর মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ, সর্বাধিক প্রামাণ্য ও নির্ভরযোগ্য এবং সবচেয়ে উন্নতমানের গ্রন্থ হলো সীরাতে মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক। [১. “মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক ইবনে ইয়াসার ইবনে আবদুল মুত্তালিব ইবনে আবদে মানাফের আযাদকৃত দাস। তাঁর দাদা ইয়াসার কুফার পশ্চিমে বারিয়ার দিকে অবস্থিত শহর আইনুত তামারের অন্যতম যুদ্ধবন্দী ছিলেন। হযরত আবু বাক্রের খিলাফতকালে ১২ হিজরী সনে এই শহর মুসলমানদের অধিকারভুক্ত হলে ইয়াসারকে মদীনায় নিয়ে আসা হয়। সেখানে ৮৫ হজিরী সনে তাঁর পৌত্র মুহাম্মাদ জন্মগ্রহণ করেন। মদীনাতেই তিনি যৌবন কাটান। অত:পর মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলো ভ্রমণে বের হন। ১১৫ হিজরী সনে তিনি ইস্কান্দারিয়া গমন করেন এবং মিসরীয় একদল হাদীসবেত্তার নিকট থেকে হাদীস সংগ্রহ ও বর্ণনা করেন। এরপর তিনি আলজাজিরা, কুফা, রাই, বুহায়রা ও সর্বশেষে বাগদাদ সফর করেন। এখানেই ১৫২ হিজরী সনে তাঁর ইনতিকাল হয়। প্রখ্যাত মনীষী ইবনে আদী তাঁর সম্পর্কে এই বলে মন্তব্য করেন যে,“সমসাময়িক বাদশাহদেরকে আজেবাজে পুস্তকাদি প্রণয়নের কাজ থেকে নিবৃত্ত করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সশস্ত্র সংগ্রাম, তাঁর নবুওয়াত প্রাপ্তি ও বিশ্ব সৃষ্টির ইতিহাস রচনার কাজে আত্ননিয়োগ করতে উদ্বুদ্দ করা যদি ইবনে ইসহাকের একমাত্র কৃতিত্বও হতো, তথাপি এ কৃতিত্বে তিনিই অগ্রণী এবং সর্বশ্রেষ্ঠ বলে পরিগণিত হতেন।”] এ গ্রন্থ তিনি রচনা করেন আব্বাসী শাসনামলের গোড়ার দিকে। বর্ণিত আছে যে, তিনি একবার বাগদাদে আব্বাসী শাসক মানসূরের দরবারে প্রবেশ করেন। মানসূরের সামনেই তাঁর পুত্র মাহদী উপবিষ্ট ছিলেন। মানসূর বললেন, “ইবনে ইসহাক, তুমি জানো ইনি কে?” ইবনে ইসহাক বললেন, “হাঁ, আমীরুল মুমিনীনের (মানসূর) ছেলে”। তখন মানসূর বললেন, “যাও, ওর জন্য এমন একখানা গ্রন্থ রচনা কর, যাতে আদমের (আ) সৃষ্টি থেকে শুরু কের আজকের দিন পর্যন্ত যবাতীয় ঘটনাবলীর বর্ণনা থাকবে”। তখন ইবনে ইসহাক চলে গেলেন এবং কিছুকালের মধ্যে উক্ত গ্রন্থ রচনা করে মানসূরের নিকট উপস্থপন করলেন। মানসূর বললেন, “ইবনে ইসহাক, তুমি গ্রন্থকে অতি মাত্রায় দীর্ঘ করে ফেলেছো। এখন গ্রন্থখানি সংক্ষিপ্ত করে লিখ”। এরপর ঐ বিশাল গ্রন্থখানি খলীফার কোষাগারে রেখে দেয়া হলো।

সীরাতে ইবনে হিশাম

ইবনে ইসহাকের পর আসেন ইবনে হিশাম। [২.আবু মুহাম্মাদ আবদুল মালেক ইবনে হিশাম ইবনে আইয়ুব আল হিমইয়ারী। জন্মস্থান বসরা। পরে তিনি মিশরে গমন করেন এবং ইমাম শাফেয়ীর সাথে মিলিত হন। এরপর উভয়ে প্রচুর আরব কাব্যচর্চা করেন। সীরাতে ইবনে ইসহাকের সংক্ষিপ্ত সংকলন ছাড়াও ইবনে হিশাম হিমইয়ার গোত্রের রাজন্যবর্গ ও বংশাবলী সম্পর্কেও একখানি গ্রন্থরচনা করেন। তাছাড়া সীরাত সম্পর্কিত দুর্লভ কবিতাসমূহের ব্যাখ্যা করে আরো একটি গ্রন্থও তিনি রচনা করেন। ২১৮ হিজরীসনে ফুসতাত নগরীতে তিনি ইনতিকাল করেন।]তিনি আমাদের জন্য এই সীরাত গ্রন্থকে সংক্ষিপ্ত করে পেশ করেন। এ কাজ তিনি সম্পন্ন করেন ইবনে ইসহাক কর্তৃক মূল গ্রন্থ রচনার প্রায় অর্থ শতাব্দী পরে। ইবনে ইসহাকের গ্রন্থের এই সংক্ষিপ্ত সার রচনায় তিনি যিয়াদ আল বুকায়ী নামক মাত্র এক ব্যক্তির মধ্যস্থতা গ্রহণ করেন।[৩.হাফেজ আবু মুহাম্মাদ যিয়াদ ইবনে আবদুল মালেক ইবনে আত্তুফাইল আল বুকায়ী আল আমেরী আল কুফী। বনী আমের ইবনে ছা’ছায়ার শাখা বনীল  বুকা থেকে উদ্ভূত বলে তিনি বুকায়ী নামে পরিচিত। তিনি বাগদাদ আগমন করেন এবং সেখানে ইবনে ইসহাক থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামরিক অভিযানসমূহের ইতিবৃত্ত এবং মুহাম্মাদ ইবনে সালেম থেকে শরীয়াতের বিধান শিক্ষা ও প্রচার করেন। অত:পর কুফায় প্রত্যাবর্তন করেন। সেখাসে খলিফা হারুনুর রশীদের শাসনামলে ১৮৩ হিজরী সনে ইনতিকাল করেন। ইবনে হিশাম যে তাঁর এই উস্তাদের যথাযথ কদর করতেন, গ্রন্থের শুরুতে উল্লিখিত এই কথা কয়টি তারই প্রমাণ বহন করছে, “আমি সেইসব বিষয় বাদ দিযেছি যার বর্ণনা অনেকের কাছে অপ্রীতিকর লাগবে অথবা যা বুকায়ী নিজের বর্ণনা দ্বারা আমাদের কাছে প্রামাণ্য বলে সাব্যস্ত করেননি।”] ইবনে হিশাম কর্তৃক বর্ণিত ইবনে ইসহাকের মূল গ্রন্থখানি আজকের এই গ্রন্থে’র বিষয়বস্তুকে অত্যধিক সংক্ষিপ্ত ও সম্পাদিত আকারে পেশ করেন। কোন কোন জায়গায় কিছু সংযোজন ও সমালোচনা ও এর অঙ্গীভূত করেন। আবার কখনো অন্যান্য মনীষীর বর্ণনার সাথে ইবনে ইসহাকের বর্ণনার তুলনা বা যাচাই বাছাইও করেছেন। ঐ গ্রন্থের সংকলনে তাঁর অনুসৃত পদ্ধতির কিছু বর্ণনা তিনি গ্রন্থের শুরুতেই দিয়েছেন। এতদসত্তেও আমরা এব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করি না যে, ইবনে হিশাম জূর্ণ সততা, বিশ্বস্ততা ও নিষ্ঠার সাথে ইবনে ইসহাকের গ্রন্থ সংকলন করেছেন। তাথেকে তিনি একটি শব্দও পরিবর্তন করেননি। আর যেখানেই ইবনে ইসহাকের বর্ণনার ত্রুটি তুলে ধরা, কিংবা কোন দুর্বোধ্য বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেয়া অথবা কোন বর্ণনার বিরেধী অন্য কোন বর্ণনা পেশ করার প্রয়োজন অনুভব করেছেন, সেখানে ‘ইবনে হিশাম বলেন’ উক্তি দ্বারা তা  শুরু করেছেন।

সংক্ষেপকরণই মূলত: তাঁর সীরাত গ্রন্থ সংকলনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। এ জন্য তিনি সৃষ্টির আদিকাল থেকে শুরু করে হযরত ইসমাঈলের বংশধরদের ইতিহাস এবং অন্যান্য যেসব কাহিনীর সাথে সীরাতের কোন সম্পর্কই তিনি দেখতে পাননি, তাও বাদ দিয়েছেনে। আর সেইসব কবিতাও তিনি এর অন্তর্ভুক্ত করেননি, যার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে তিনি সন্দেহ পোষণ করতেন।

যিনি ইবনে হিশামের সংকলন থেকে মূল সীরাত গ্রন্থে’র বিষয়বস্তুর সন্ধান লাভ করতে চেষ্টা করবেন, তিনি তাতে চরম নিষ্ঠ ও পরম বিশ্বস্ততার পরিচয়ই লাভ করবেন- যা সেই প্রচীন যুগের মুসলিম মনীষীদের বৈশিষ্ট্য ছিল।

সীরাতে ইবনে হিশামের মর্যাদা

মূলত: ইবনে ইসহাকের সীরাত গ্রন্থই সীরাত পাঠকদের জন্য প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত প্রধান প্রামাণ্য গ্রন্থরূপে বিবেচিত হয়ে আসছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনেতিহাসে বুৎপত্তিসম্পন্ন খুব কম লোকই এমন ছিলেন যাঁরা ইবনে ইসহাকের সীরাত গ্রন্থ’কে ঐ বিয়য়ের প্রধান পথ-প্রদর্শকরূপে গ্রহণ করেননি। এ সীরাতে ইবনে ইসহাকই প্রাচীনকাল থেকে “সীরাতে ইবনে হিশাম” নামে জ্ঞানীজনের কাছে পরিচিত। কেননা ইবনে হিশাম এই গ্রন্থের সংকলক ও সংক্ষেপক ছিলেন। ইবনে খাল্লিকান বলেন,“ইবনে হিশামই ইবনে ইসহাকের সংগৃহীত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামরিক ও সাধারণ জীবনেতিহাসসহ গোটা জীবনেতিহাসকে একত্রিত, সংকলিত ও সংক্ষিপ্ত করেছেন।এটাই বর্তমানে সীরাতে ইবনে হিশাম নামে পাঠক সমাজের হাতে শোভা পাচ্ছ।”

বেশ কিছুসংখ্যক টীকাকার ও ব্যাখ্যাকার সীরাতে ইবনে হিশামের টীকা লিখতে এগিয়ে এসেছিলেন। তন্মধ্যে আবুল কাসেম আবদুর রহমান  আস্ সুহাইলীর (৫৮১ হি:) “আর রাউদুল আনফ” নামক টীকাটি খুবই বিস্তারিত ও দীর্ঘ পরিসর।[৪.আবুল কাশেম আবদুর রহমান ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আহমাদ ইবনে আলখুসায়মী আস-সুহাইলী আল আন্দালুসী আল মালকী। সুহাইল স্পেনের কোরা এলাকার অস্তর্গত একটি উপত্যকার সাম। তিনি ৫০৮ হিজরী সনে জন্মগ্রহণ কর্নে এবং সেখানেই বসবাস করেত থাকেন। পরে মরক্কোতেও তিন বছর অতিবাহিত করেন এবং সেখানে ৫৮১ হিজরী সনে ইনতিকাল করেন।] এরপরে যিনি এই গ্রন্থের পর্যলোচনায় মনোযোগী হন, তিনি হলেন আবু যার আল খুশানী।[৫. আবু যার মুসআব ্ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে মাসউদ আল জিয়ানী আল খুশানী। স্পেনের খুশাইন নামক গ্রামে এবং কাদায়ার খুশাইন গোত্রের নামানুসারে তিনি খুশানী বলে পরিচিত ছিলেন। তিনি হিজরী ৫৩৩ সনে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৬০৪ সনে ইনতিকাল করেন।] তিনি এই দুর্বোধ্য অংশগুলোর ব্যাখ্যা করেন এবং তার গ্রন্থ ‘র্শাহ সীরাতুন্ নববীয়া’য় কিছু কিছু সমালোচনাও করেন। আর ডক্টর ব্রুনলাহ গ্রন্থখানি প্রকাশ করেন। বদরুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ আল আইনী“কাশফুল লিসান ফী শারহে সীরাতে ইবনে হিশাম” নামে এর ব্যাখ্যা প্রণয়ন সম্পন্ন করেন ৮০৫ হিজরী সনে।

অন্যদিকে আমরা দেখতে পাই কিছু কিছু গ্রন্থাকার এই গ্রস্থের সংক্ষেপকরণের দিকেও মনোযোগী হয়েছেন। তাদের একজন হলেন বুরহানুদ্দীন ইবরাহীম ইবনে মুহাম্মাদ আল মুরহাল আশ্শাফেয়ী। ‘আযযাখীরা ফী মুখ্তাছারিস্ সীরাহ্” নামে আঠারটি অধ্যায়ে গ্রথিত এই গ্রস্থে তিনি সীরাতে ইবনে হিশামকে শুধু সংক্ষিপ্তই করেননি, বরং কিছু বিষয়ের সংযোজনও করেছেন।৬৬১ হিজরী সনে তিনি এই গ্রন্থ রচনার কাজ সমাপ্ত করেন। অত:পর ৭১১ হিজরী সনে আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনে ইবরাহীম  ইবনে আবদুর রহমান আলওয়াসেতী “মুখতাছার সীরাতে ইবনে হিশাম” নামে আর একটি সংক্ষেপিত গ্রন্থ রচনা সম্পন্ন করেন।এমনকি কতিপয় গ্রন্থাকার সীরাতে ইবনে হিশামকে কাব্যাকারেও সংকলন করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন (১) আবু মুহাম্মাদ আবদুল আযীয ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সাইদ আদ দুমাইরী আদ দাইরিনী, ওফাত ৬০৭ হিজরী, (২)আবু নছর আল ফাতাহ বিন মূসা বিন মুহাম্মাদ আল মাগরিবী, ওফাত ৭৯৩ হিজরী। শেষোক্ত গ্রন্থাকারের রচিত গ্রস্থের নাম “আল ফাতহুল কারীব ফী সীরাতিল হাবীব।” গ্রন্থখানি দশ হাজার পংক্তিতে সংকলিত হয়।

সীরাতে ইবনে হিশামের বক্ষ্যমাণ সংক্ষিপ্ত রূপ

যৌবনের প্রারম্ভে আমি এই গ্রন্থখানা আগাগোড়া পড়বার জন্য বার বার চেষ্টা করতাম কিন্তু এর রচনা পদ্ধতির বিশৃঙ্খলা ও সমন্বয়হীনতা ঘোর মানসিক পীড়া ও একঘেঁয়েমী সৃষ্টি করতে। ফলে খানিকটা এখান থেকে খানিকটা ওখান থেকে পড়তাম। ভাষার মাধুর্য ও লালিত্য এবং বিষয়বস্তুর মাহাত্ন্যই আমাকে এইসব বিচ্ছিন্ন অংশগুলো পড়তে আকৃষ্ট করতো। ঐ অংশগুলো আমার কাছে ঊষর মরুভূমিতে পুষ্পকাননের মত উপভোগ্য মনে হতো।

আসলে কুরআন-হাদীস পড়লে মনে যে নিখাদ বন্দেগীর ভাব জাগে ও ঐকান্তিক আনুগত্যবোধ অনুভূত হয় সীরাত বিষয়ক বই-পুস্তক পড়লে আমি ঠিক তেমনি ধরনের অসুভূতি লাভ করতাম। মনে হয়, কি এক অজানা রহস্যের দুর্বার আকর্ষণে আমি বার বার ওটা পড়তে চাইতাম। আমার মরহুম পিতাও সীরাত বিষয়ের একজন গ্রন্থাকার ছিলেন। “তালখিছুদ দুরুসিল আওয়ালিয়াহ ফিস সীরাতিল মুহাম্মাদিয়া” নামে তিনি ত্রিশটি অধ্যায়ে সমাপ্ত একখানা সংক্ষিপ্ত রচনা করেন। দীর্ঘদিন ব্যাপী ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ওটাই ছিাল একমাত্র পাঠ্যপুস্তক। বলা বাহুল্য,তৎকালে সীরাত ছিল বিদ্যালয়গুলোর অন্যতম পাঠ্য বিষয়।

এতদসত্বেও সীরাতে ইবনে হিশাম গ্রন্থখানি আমি আগাগোড়া পড়তে সক্ষম হইনি। আগেই বলেছি যে, রচনা পদ্ধতির বিন্যস্ততার অভাব এবং অসংলগ্ন ও খাপছাড়া বর্ণনা রীতিই এর কারণ। সেখানে একজন সীরাত পাঠকের সমনে হঠাৎ করে  এসে গতিরোধ করে দাঁড়ায় বদরের সকল যুদ্ধবন্দীর নাম, বদরের মুসলিম বাহিনীর ব্যবহৃত সমস্ত ঘোড়ার নাম, আনসার ও কুরাইশদের মধ্য থেকে যেসব মুসলিম সৈনিক বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন, যারা শহীদ হন এবং  মুশরিকদের মধ্যে যাঁরা নিহত হয় তাদের সকলের নামের সুদীর্ঘ ফিরিস্তি। অনুরূপভাবে বদর যুদ্ধে যেসব কবিতা আবৃত্তি করা হয়েছে, পূর্ব-পুরুষের মহিমা কীর্তনমূলক যেসব সংলাপ উচ্চারিত হয়েছে, বংশ পরম্পরা উল্লেখ করে যেসব ভাষণ দেয়া হয়েছে, নিছক শব্দের মায়াজাল বুনে যে লম্বা বুলি আওড়ানো হয়েছে এবং সীরাতের মূল বিষয়ের সাথে সংগতিহীনÑ যদিও তার কাছাকাছি কুরআনের যেসব ব্যাখ্যার অবতারণা করা হয়েছে এর অধিকাংশ সীরাত গ্রন্থে’র প্রচলিত রীতি মুতাবিক বর্ণনা পরম্পরা তথা সনদের উল্লেখ যার গুরুত্ব একমাত্র সমালোচক পন্ডিতদের কাছেই স্বীকৃত, এসব জিনিস পাঠকের সীরাত অধ্যায়নে অন্তরায় হয়ে দেখা দেয়।

এজন্য আমি বক্ষ্যমাণ সংক্ষেপিত গ্রন্থের মাধ্যমে পাঠকের কাছে সুখপাঠ্য, অধ্যয়নের দারাবাহিকতা বিনষ্ট না করার ব্যবস্থা সম্বলিত ও নবতর আঙ্গিকে শোভিত করে সীরাতের এই নির্যাসটুকু ইপস্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছি। অবশ্য মূল গ্রন্থের আসল বক্তব্য যাতে অবিকৃত থাকে, সে ব্যাপারে আমি পূর্ণ সচেষ্ট থেকেছি, যাতে করে পাঠক তা থেকে উদ্ধৃতি দিতে পারেন ও আসল গ্রন্থ থেকে প্রামাণ্য তথ্য সংগ্রহের ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতে পারেন। মূল গ্রন্থের একটি বর্ণও আমি পরিবর্তন করিনি। কেননা গ্রন্থকারের বক্তব্য অবিকলভাবে উপস্থাপন করা যে আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য, তা আমি সব সময় মনে রেখেছি। ইবনে হিশামের কথা যথাযথভাবে উদ্ধৃত করা ও সেজন্য কথার শুরুতেই ‘ইবনে হিশাম বলেছেন’ বলে উল্লেখ করার রীতি আমি গ্রহণ করেছি ও তা অব্যাহতভাবে অনুসরণ করেছি। সংকলনের প্রয়োজন ও চাহিদা অনুসারেই যেখানে যেমন করা দরকার করেছি। বাদ বাকী সমস্ত ইবনে ইসহাকের বক্তব্য, যা ইবনে হিশাম কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে। বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যোখানে প্রয়োজন হয়েছে, কেবলমাত্র সেখানে ব্যতীত আর কোথাও আমি বর্ণনাদাতাদের নাম উল্লেখ করিনি, যদিও মূল গ্রন্থে ইবনে ইসহাক অথবা ইবনে হিশাম প্রায় ক্ষেত্রেই তাদের নাম উল্লেখ করেছেন। ইবনে হিশামের সমস্ত উদ্ধৃতিতে আমি শৃঙ্খলার সাথে বিন্যস্ত করার প্রতি যত্নবান থেকেছি, প্রয়োজনবোধে তার কোন কোনটার ব্যাখ্য-বিশ্লেষন করেছি। এ ক্ষেত্রে সীরাত বিশ্লেষকদের বর্ণনা এর্ব বিশ্বস্ত হাদীস গ্রন্থ ও অভিধানের উপর আমাকে নির্ভর করতে হয়েছে।

যার মূল গ্রন্থ অধ্যয়নের সুযোগ থেকে বঞ্জিত, বক্ষ্যমাণ সংক্ষেপিত সংকলন তাদের পক্ষে ঐ গ্রন্থ পাঠের একটা সহজ পন্থাবিশেষ। এতে করে বর্তমান তরুণ সমাজের সাথে তাদের প্রাচীন ও সুমহান উতরাধিকারের সুষ্ঠু সংযোগসূত্র স্থাপিত হতে পারে।

পাঠকগণ এই গ্রন্থ মাত্র কয়েকদিনেই পড়ে শেষ করতে পারেন এবং তা থেকে দ্রুততার সাথে মূল্যবান ও কল্যাণকর জ্ঞানার্জনে সক্ষম হতে পারেন। কিন্তু এর স্থলে তাকে যদি মূল গ্রন্থ পাঠ করতে হতো যা বর্তমানে পাঠক মাত্রেরই নাগালের বাইরে তাহলে তাতে তার বহু মাস লেগে যেতো।

আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন এই গ্রন্থ দ্বারা সমাজকে উপকৃত করেন। জ্ঞানের রাজ্যে আমার এই ক্ষুদ্র ও নগণ্য প্রচেষ্টা সার্থক হলেই নিজেকে কৃতার্থ মনে করবো। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টিই আমার এ প্রচেষ্টার একমাত্র লক্ষ্য।

আব্দুস সালাম হারূন

মিসরুল জাদীদাহ্

মধ্য রমজান

১৩৭৪ হিজরী

 

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আদম আলাইহিস্ সালাম পর্যন্ত ঊর্ধতন বংশপরম্পরা

আবু মুহাম্মাদ আবদুল মালেক ইবনে হিশাম বলেন:

এই গ্রন্থখানিতে আল্লাহর রাসূল হয়রত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনী আলোচিত হয়েছে। তাঁর উর্ধতন বংশপরম্পরা নিম্নরূপ:

পিতা আবদুল্লাহ, তদীয় পিতা আবদুল মুত্তালিব (আবদুল মুত্তালিবের প্রকৃত নাম শায়বা), তদীয় পিতা হাশিম (হাশিমের প্রকৃত নাম আমর), তদীয় পিতা আবদে মানাফ (আবদে মানাফের প্রকৃত নাম আল মুগীরা) তদীয় পিতা কুসাই (কুসাই-এর প্রকৃত নাম যায়েদ), তদীয় পিতা কিলাব, তদীয় পিতা মুররাহ, তদীয় পিতা কা’ব, তদীয় পিতা লুয়াই, তদীয় পিতা গালেব,  তদীয় পিতা ফিহির, তদীয় পিতা মালেক, তদীয় পিতা নাদার, তদীয় পিতা কিনান, তদীয় পিতা খুযাইমা, তদীয় পিতা মুদরিকা (মুদরিকার প্রকৃত নাম আমের), তদীয় পিতা ইলিয়াস, তদীয় পিতা মুদার, তদীয় পিতা নিযার, তদীয় পিতা মা’আদ, তদীয় পিতা আদনান, তদীয় পিতা  উদ্, তদীয় পিতা  মুকাওয়াম, তদীয় পিতা নাহুর, তদীয় হিতা তাইরাহ্, তদীয় পিতা ইয়’রুব, তদীয় পিতা ইয়াশজুব, তদীয় পিতা নাবেত, তদীয় পিতা ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম), তদীয় পিতা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম), তদীয় পিতা তারেহ (তারেহের অপর নাম আযর), তদীয় পিতা নাহুর, তদীয় পিতা সারীগ, তদীয় পিতা রাউ, তদীয় পিতা ফালেখ, তদীয় পিতা উবায়ের, তদীয় পিতা শালেখ, তদীয় পিতা আরফাখশাদ, তদীয় পিতা সাম, তদীয় পিতা নূহ (আলাইহিস সালাম), তদীয় পিতা লামক, তদীয় পিতা মুত্তাওশালাখ, তদীয় পিতা আখ্নুখ (ঐতিহাসিকদের ধারণা, তিনি হযরত ইদ্রিস আলাইহিস্ সালাম), তদীয় পিতা ইয়ারদ, তদীয় পিতা মাহলীল, তদীয় পিতা কাইনান, তদীয় পিতা  ইয়নিশ, তদীয় পিতা শীস, তদীয় পিতা আদম আলাইহিস্ সালাম।

ইবনে হিশাম বলেন,

“ইনশাআল্লাহ এই গ্রন্থ আমি হযরত ইবরাহীমের পুত্র ইসমাঈলের বিবরণ দিয়েই শুরু করবো। অত:পর ইসমাঈলের (আ) ঔরসে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যেসব পিতৃপুরুষ জন্মগ্রহণ করেছেন এবং যাঁরা সেই সব পিতৃপুরুষের ঔরষজাত সন্তান ছিলেন, পর্যয়ক্রমে তাঁদের বর্ণনা দেব। এভাবে ইসমাঈল আলাইহিস সালাম থেকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পর্যন্ত সমস্ত পিতৃপুরুষ ও তাঁদের সম্পর্কে প্রচলিত কাহিনীসমূহ আলোচনা করবো। কিন্তু ইসমাঈলের (আ) যেসব সন্তান হযরত মুহাম্মাদের (সা) পিতৃপুরুষ নন, গ্রন্থের কলেবর সংক্ষিপ্ত ও শুধুমাত্র সীরাত বিয়য়ক বক্তব্যের মধ্যে সীমিত রাখার তাকিদে আমি তাঁদের বিবরণ লিপিবদ্ধ করবো না। একই ভাবে, গ্রন্থের কলেবর সংক্ষিপ্ত রাখার উদ্দেশ্যে ইবনে ইসহাকের কিছু কিছু বর্ণনা বাদ দেবো যা তিনি এই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। ইবনে ইসহাকের ঐসব বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোন উল্লেখ নেই, সে সম্পর্কে কুরআনেও কোন কথা নাযিল হয়নি, কিংবা তা এই গ্রন্থের কোন বক্তব্যের উপলক্ষ, ব্যাখ্যা বা দলীল প্রমাণেরও পর্যায়ে পড়ে না। ইবনে ইসহাকের উল্লেখ করা এমন কিছু কবিতাও আমি বর্জন করেছি, যা কবিতায় পারদর্শীদের কাছে অজ্ঞাত বলে লক্ষ করেছি। এ ছাড়া ইবনে ইসহাকের কিছু কিছু অরুচিকর ও গণমনে অসন্তোষ উৎপাদনকারী উক্তি এবং বুকায়ী কর্তৃক সমর্থিত নয়, এমন কিছু বিষয়ও আমাকে বাদ দিতে হয়েছে। এ কয়টি জিনিস ছাড়া ইবনে ইসহাকের বাদবাকী সমস্ত তথ্য যতটা বর্ণিত ও স্বীকৃত, ততটা ইনশাআল্লাহ পুরোপুরিভাবে উল্লেখ করবো।”

ইসমাঈল আলাইহিস্ সালামের অধস্তন পুরুষদের বংশক্রম

ইসমাঈল আলাইহিস সালামের ঔরসে ১২ জন পুরুষ সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তাঁরা হলেন: নাবেত, কাইযার, আযরাল, মীশ, মাসমা’, মাশী, দাম, আযর, তীম, ইয়াতুর, নাবাশ ও কাইয়ুম।

নাবেতের ঔরসে ইয়াসজুব, ইয়াসজুবের ঐরসে ইয়া’রুব, ইয়া’রুবের ঔরসে উদ এবং উদের ঔরসে আদনান জন্মগ্রহণ করেন।

আনদানের পর থেকে ইসমাঈলের বংশধরগণ গোত্রে গোত্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে। আদনানের দু’টি পুত্রসন্তান ছিল : মাআদ ও আক।

আক ইবনে আদনান চলে যান ইয়ামানে এবং সেখানেই তাঁর বংশধররা স্থায়ী বসতি স্থাপন করেন। আক সেখানকার বনু আশয়ার গোত্রে বিয়ে করেন এবং তাদের সাথেই বসবাস করতে থাকেন, ফলে তাদের দেশ ও ভাষা উভয়ই এক হয়ে যায়। বনু আশয়ার গোত্রের ঊর্ধতন পুরুষরা হলো : আশয়ার, তদীয় পিতা নাবাত, তদীয় পিতা উদ, তদীয় পিতা হামাইসা, তদীয় পিতা আমর, তদীয় পিতা উরাইব, তদীয় পিতা ইয়াশজুব, তদীয় পিতা যায়েদ, তদীয় পিতা কাহলান, তদীয় পিতা ইয়াশযুব, তদীয় পিতা ইয়ারুব ও তদীয় পিতা কাহতান।

আদনানের অপর পুত্র মাআদ ইবনে আদনানের চারটি সন্তান জন্মে : নিযার, কুদাআ, কানাস ও ইয়াদ। কুদাইর বংশধর হিমইয়ার ইবনে সাবা পর্যন্ত বেঁচে থাকার সৌভাগ্য অর্জন করে। কিন্তু মাআদ সংক্রান্ত বংশধর বিশেষজ্ঞের মতে, কানাস বিন মাআদের বাদবাকী বংশধর নিশ্চিহ্ন হযে যায়। তবে হিরার বাদশাহ নুমান ইবনে মুনযির তাদেরই বংশধর।

রাবিয়া ইবনে নসরের স্বপ্ন

রাজাদের মধ্যে ইয়ামানের রাবিয়া ইবনে নসর একজন দুর্বল পরাধীন রাজা ছিলেন।একবার তিনি একটা ভয়ংকর সপ্ন দেভে ভীষণভাবে ঘাবড়ে যান। তাঁর রাজ্যে যত গণক, যাদুকর, আয়েফ [৬. তৎকালে এক ধরনের গণক ছিল যারা পখির ডাক, গতিবিধি ইত্যাদি দ্বারা ভবিষ্যদ্বাণী করতো। তাদেরকে বলা হতো আয়েফ।]

বা জ্যোতিষী ছিল তাদের সবাইকে তিনি সমবেত করে বলেন, “আমি এমন একটা স্বপ্ন দেখেছি যা আমাকে ভীত সন্ত্রস্ত করে তুলেছে। তোমরা আমাকে বলবে আমি কি স্বপ্ন দেখেছি এবং তার ত’বীরই বা কি?” সমবেত জ্যোতিষীরা বললো, “সপ্নটা আমাদের কাছে বর্ণনা করুন। আমরা তার তাবীর বলবো।” রাজা বললেন, “স্বপ্নটা যদি আমি বলে দিই তাহলে তোমাদের তাবীরে আমি স্বস্তি বা প্রশান্তি লাভ করতে পারবো না। কেননা এই স্বপ্নের তা’বীর বা ব্যাখ্যা একমাত্র সে-ই করতে সক্ষম যে আমার বলার আগেই স্বপ্ন সম্পর্কেও বলতে সক্ষম।” জ্যোতিষীদের একজন বললো, ‘জাঁহাপনা, যদি এইভাবে স্বপ্নের তা’বীর জানতে চান তাহলে সাতীহ ও শেক্কে ডেকে পাঠান। কারণ তাদের চেয়ে পারদর্শী আর কেউ রনই। আপনি যা জানতে চান তা তারাই বলতে পারবে।”

রাজা ঐ দ’জন ভবিষ্যদ্বক্তাকে ডেকে পাঠালেন। প্রথমে রাজার দরবারে হাজির হলো সাতীহ। রাজা তাকে বললেন, “আমি এমন একটা স্বপ্ন দেখেছি যা আমাকে ভীত সন্ত্রস্ত করে তুলেছে। তুমি বল আমি কি স্বপ্ন দেখেছি? তুমি যদি স্বপ্নটা সঠিকভাবে বলতে পার তাহলে তার ব্যাখ্যাও সঠিকভাবে করতে পারবে।”

সাতীহ বললো, “বেশ, আমি তাই করবো। আপনি স্বপ্নে দেখেছেন, অন্ধকারের ভেতর থেকে এক টুকরো আগুন বেরিয়ে এসে নিম্নভূমিতে নামলো এবং সেখানে যত প্রাণী ছিল, সবাইকে গ্রাস করলো।”

রাজা বললেন, ‘বাহ্! স্বপ্নটা তো তুমি সঠিকভাবেই বলে দিয়েছ। এখন বলতো এর তাৎপর্য কি?”

সে বললো, “দুই প্রস্তরময় দেশে বিরাজমান সমস্ত সাপের শপথ করে বলছি, আবিসিনিয়াবাসী আপনার ভূখন্ডে প্রবেশ করবে এবং সমগ্র ইয়ামান দখল করে নেবে।”রাজা বললেন, “হে সাতীহ, এটাতো ভীষণ বেদনাদায়ক ও ক্রোধোদ্দীপক ব্যাপার।

এটা কবে ঘটবে? আমার আমলেই, না আমার পরে।?”

সে বললো, “আপনার আমলের কিছু পরে, ষাট বা সত্তর বছরের বেশী অতিক্রান্ত হয়ে যাবে।” রাজা জিজ্ঞেস করলেন, “এই ভূখন্ঠ কি চিরকালই তাদের অধিকারে থাকবে, না তাদের জবরদখলের অবসান ঘটবে?” সে বললো, “৭০ বছরের কিছু বেশীকাল উত্তীর্ণ হবার পর তাদের দখলের অবসান ঘটবে? তারপর তারা হয় নিহত হবে নয়তে পালিয়ে যাবে। রাজা পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, “তাদেরকে কে হত্যা বা বহিষ্কার করবে?” সাতীহ বললো, “তারা নিহত বা বহিষ্কৃত হবে ইরাম ইবনে যীইয়াযানের হাতে। তিনি এডেন থেকে আবির্ভূত হবেন এবং ইয়ামানে তাদের একজনকেও অবশিষ্ট রাখবেন না।”

রাজা বললেন,“ইরামের আধিপত্য কি চিরস্থায়ী হবে না অস্থায়ী?”

সাতীহ বললো, “তাদের আধিপত্য অস্থায়ী হবে।”

রাজা বললেন, ’‘কার হাতে ক্ষমতার অবসান ঘটবে।?”

সাতীহ বললো,“এক পূত:পবিত্র নবীর হাতে। তিনি ঊর্ধজগত থেকে ওহী লাভ করবেন।”

রাজা বললেন, “এ নী কোন বংশোদ্ভূত?”

সাতীহ বললো,“তিনি নাদারের পুত্র মালেকের পুত্র ফিহির, ফিহিরের পুত্র গালেবের বংশ থেকে উদ্ভূত হবেন। তাঁর জাতির তাতে ক্ষমতা থাকবে বিশ্বজগতের বিলুপ্তি ঘটার মুহূর্ত পর্যন্ত।”

রাজা  বললেন, “বিশ্বজগতের আবার শেষ আছে নাকি?”

সে বললো,“হ্যাঁ, যেদিন পৃথিবীর প্রথম মানবগন ও শেষ মানবগণ একত্রিত হবে। যারা সৎকর্মশীল তারা সুখী হবে, আর যারা অসৎকর্মশীল তারা দুঃখ ভোগ করবে।”

রাজা বললেন,“তোমার ভবিষ্যদ্বাণী কি সত্য?”

সে বললো, “হ্যাঁ, রাতের অন্ধকার ও ঊষার আলোর শপথ, সুবিন্যস্ত প্রভাতের শপথ, আমি যা বলেছি তা পুরোপুরি সত্য।”

এরপর শেক এসে পৌঁছলো রাজার দরবারে। সাহীহকে রাজা যা যা বলেছিলেন শেককেও তাই বললেন। কিন্তু সাতীহ যা বলেছে তা তাকে জানতে দিলেন না- তারা উভয়ে একই ধরনের ভবিস্যদ্বাণী করে, না ভিন্ন রকমের, তা দেখবার জন্য তিনি ব্যাপারটা গোপন করলেন।

শেক বললো, “আপনি স্বপ্নে দেখেছেনে, অন্ধকার থেকে এবটি অগ্নিশিখা বেরিয়ে এলো। সেটা একটা পর্বত ও একটা বাগানের মাঝখানে পতিত হলো। অতঃপর সেখানকার সকল প্রণীকে গ্রাস করলো।”

রাজা বুঝতে পারলেন যে, উভয়ের বক্তব্য অভিন্ন। শুধু এতটুকু পার্থক্য যে সাতীহ বলেছিল, টুকরোটা নিম্নভূমিতে নামলো। আর শেক বলেছে, একটি পর্বত ও একটি বাগানের মাঝখানে নামলো। অতঃপর তিনি শেককে বললেন, “তুমি ঠিকই বলেছ। এবার বল এর তাবীর কি?”

সে বললো,“ দুই পর্বতাকীর্ণ দেশের সমস্ত মানুষের শপথ করে বলছি, আপনার দেশে সুদানীরা আক্রমণ চালাবে এবং সব দুর্বল লোক তাদের অঙ্গুলী হেলনে চলতে বাধ্য হবে। তারা আবইয়ান থেকে নাজরান পর্বত সমগ্র ভূখ-ের ওপর আধিপত্য বিস্তার করবে।”

রাজা বললেন, “এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও ক্রোধোদ্দীপক ব্যাপার। এ ঘটনা কবে ঘটবে? আমার জীবদ্দশাতেই, না আরো পরে?”

সে বললো, “আপনার পরে বেশ কিছুকাল অতিক্রান্ত হবার পর। এরপর একজন পরাক্রমশালী ব্যক্তি আপনাদেরকে উদ্ধার করবে এবং হানাদারদেরকে ভীষণভাবে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করে বিতাড়িত করবে।”

রাজা বললেন, “এই পরাক্রমশালী ব্যক্তি কে?”

সে বললো, “একজন যুবক, যিনি নগণ্য বা নীচাশয় নয়। যী-ইয়াযানের বাড়ী থেকে তার অভ্যুদয় ঘটবে। তিনে হানাদারদের একজনকেও ইয়ামানে টিকতে দেবেন না।”

রাজা বললেন, “এই ব্যক্তির শাসন কি চিরস্থায়ী হবে না ক্ষণস্থায়ী?”

শেক বললো একজন প্রেরিত রাসূলের আগমনে তার শাসনের অবসান ঘটবে-যিনি সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন, ধার্মিক ও সজ্জনদের সমভিব্যাহারে আসবেন, তাঁর জাতির শাসন চলবে কিয়ামত পর্যন্ত।”

রাজা বললেন, “কিয়ামত কি?”

সে বললো,“যেদিন শাসকদের বিচার হবে, আকাশ থেকে আহ্বান আসবে, সে আহ্বান জীবিত ও মৃত সকলেই শুনতে পাবে। আর নির্দিষ্ট সময়ে সকল মানুষকে সমবেত করা হবে। সেদিন মিতাচারী লোকদের জন্য হবে সাফল্য ও কল্যাণ।”

রাজা বললেন, “তুমি যা বলেছো তা বি সত্য?”

সে বললো,“হ্যাঁ, আকাশ ও পৃথিবী এবং তার মধ্যকার সকল সমতল ও অসমতল সব কিছুর রবের শপথ করে বলছি, আমি আপনার কাছে যে ভবিষ্যদ্বাণী করলাম তা সঠিক ও সন্দেহাতীত।”

রাবিয়া এই দুই ভবিষ্যদ্বক্তার কথায় বিশ্বাস স্থাপন করলেন এবং স্বীয় পরিবার পরিজনকে প্রয়োজনীয় পাথেয় দিয়ে ইরাক পাঠিয়ে দিলেন। তারপর পারস্যের তৎকালীন সম্রাট শাপুর ইবনে খুরযাদকে চিঠি লিখে পাঠালেন। শাপুর তাদেরকে হিরাতে বসবাস করার ব্যবস্থা করে দিলেন।

আবু কারব হাস্্সান ইবনে তুব্বান আস’আদ কর্তৃক ইয়ামান রাজ্য অধিকার এবং ইয়াসরিব আক্রমণ

রাবিয়ার মৃত্যুর পর সমস্ত ইয়ামানের রাজত্ব বলে যায় আবু কারব হাস্সান ইবনে তুব্বান আস’আদের হাতে। তাঁর পিতা তুব্বান আস’আদ আগে থেকেই পূর্ব দিক দিয়ে মদীনায় (ইয়াসরিব) আসতেন এবং এভাবে মদীনাবাসীদেরকে বিব্রত না করেই সুকৌশলে আপন আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেন। সেখানে তিনি নিজের এক পুত্রকে প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন। কিন্তু উক্ত পুত্র সহসা গুপ্তঘাতক কর্তৃক নিহত হয়। এরপর তুব্বান মদীনা ধ্বংস ও তার অধিবাসীদেরকে নির্মূল করার পরিকল্পনা নিয়ে আবার সেখানে আসেন। অতঃপর আমর বিন তাল্লার নেতৃত্বে লোকদের একটি দল সংঘবদ্ধ হয়। তারা শেষ পর্যন্ত তাঁর  সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই দলটি এমন ভাব দেখায় যে, তারা যেন দিনের বেলায় তাঁর সাথে যুদ্ধ করে ও রাত্রে আতিথেয়তা করে। তুব্বান তাদের এ আচরণে বিষ্মিত হয়ে বলেন, আশ্চর্য! এ জাতি বাস্তবিক পক্ষেই ভদ্র ও সম্ভ্রান্ত। এভাবে যুদ্ধ অব্যাহত থাকলো। এমতাবস্থায় একদিন দু’জন ইহুদী পন্ডিত মদীনা ও তার অধিবাসীদেরকে ধ্বংস করার ব্যাপারে তাঁর ইচ্ছ্রা কথা জানতে পেরে তাঁর কাছে আসেন। তারা তাঁকে বললেন,“হে রাজা, এ কাজটি করবেন না আপনি যদি জিদ ধরেন, তাহলেও আপনার সমনে অপ্রতিরোধ্য বাধা আসবে। ফলে আপনি যা চান তা করতে পারবেন না। অথচ আপনি অচিরেই শাস্তি ভোগ করবেন।” রাজা বললেন, “কি আরণে আমি শাস্তি ভোগ করবো?” তারা বললেন, “মদীনা শেষ যামানার নবীর আশ্রয় স্থল। কুরাইশদের দ্বারা তিনি পবিত্র স্থান থেকে বহিস্কৃত হবেন এবং এখানে এসে বসবাস করবেন।”

এ কথা শুনে রাজা নিবৃত্ত হলেন। তাঁর মনে হলো নোক দুটো যথার্থই জ্ঞানী লোক। তাদের কথঅয় রাজা মুগ্ধ হলেন। তিনি মদীনা ত্যাগ করে ঐ পন্ডিতদ্বয়ের ধর্ম গ্রহন করলেন।

তুব্বা তথা তুব্বান আস’আদ ও তাঁর গোত্রর লোকেরা পৌত্তলিক ছিলেন।তিনি ইয়ামানের পথে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হলেন। উসমান ও আমাজ নামক স্থানদ্বয়ের মধ্যস্থলে পৌঁছলে হাযাইল ইবনে মুদারাকা গোত্রের কতিপয় লোক তাঁর কাছে বললো,“হে রাজা, আপনি কি এমন এবটি অজানা ঘরের সন্ধান পেতে ইচ্ছুক, যা হীরক, মণিমুক্তা, চুন্নিপান্না প্রভৃতি মূল্যবান সম্পদে পরিপূর্ণ, অথচ আপনার পূর্ববর্তী রাজারা সে ব্যাপারে অজ্ঞ ছিল।” রাজা বললেন, “হ্যাঁ, এরকম ঘরের সন্ধান অবশ্যই পেতে চাই।” তারা বললো, ‘মক্কাতে একটি ঘর আছে। মক্কাবাসীরা সেখানে ইবাদাত করে ও তার পাশে নামায পড়ে।”

আসলে বনী হুযাইলের লোকেরা তুব্বানকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে েেদয়ার উদ্দেশ্যেই এ পরামর্শ দিয়েছিল। কেননা তারা জানতো, কাবাঘরকে করতলগত করার ইচ্ছে যে রাজাই করেছ এবং তার ওপর আক্রমণ যে-ই চালিয়েছে, সে-ই ধ্বংস হয়েছে।

তুব্বানের ইচ্ছাহলো, বনী হুযাইলের পরামর্শ অনুসারে কাজ করবে। কিন্তু তা করার আগে সেই ইহুদী পন্ডিতদ্বয়ের কাছে দূত পাঠিয়ে তাদের মতামত জানতে চাইলেন। পন্ডিতদ্বয় বললেন, “আপনাকে ও আপনার সৈন্য সামন্তকে ধ্বংস করাই বনী হুযাইলের ইচ্ছা। পৃথিবীতে আল্লাহর কোন ঘরকে আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ নিজের মালিকানায় নিতে পেরেছে বলে আমাদের জানা নেই। তারা যে পরামর্শ দিয়েছে সে অনুসারে আপনি যদি কাজ করেন তাহলে আপনার ও আপনার সহচরদের সমূলে বিনাশপ্রাপ্ত হতে হবে। এটা অনিবার্য ও অবধারিত।” রাজা বললেন, “তাহলে আমি যখন ঐ ঘরের কাছে যাব তখন আমার কি করা উচিত বলে আপনারা মনে করেন?” তারা বললেন “মক্কাবাসীরা যা করে আপনিও তাই করবেন। ঘরের চারপাশে তাওয়াফ করবেন এবং তার সম্মান ও তাজীম করবেন। তার কাছে থাকাকালে মাথায় চুল কামিয়ে ফেলবেন। যতক্ষণ ঐ ঘরের কাছ থেকে বিদায় না হন ততক্ষণ অত্যন্ত বিনয়াবনত থাকবেন।” রাজা বললেন, “আপনারা এসব করেন না কেন?”তারা বললেন, “খোদার কসম, ওটা আমাদের পিতা ইব্রাহীমের বানানো ঘর। এ ঘর সম্পর্কে আপনাকে আমরা যা যা বলেছি সবই সত্য। তবে ঘরের চারপাশে বহুসংখ্যক মূর্তি স্থাপন করে মক্কাবাসী আমাদের ঐ ঘরের কাছে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। ঐ ঘরের কাছে রক্তপাত(নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও) চালু রেখেও তারা আমাদের যাওয়া বন্ধ করেছে। তারা অংশীবাদী ও অপবিত্র।”

তুব্বান ইহুদী আলেমদ্বয়ের উপদেশ মেনে নিলেন এবং তা বাস্তবায়িত করলেন। এরপর হুযাইল গোত্রের সেই লোকদের কাছে গেলেন এবং তাদের হাত পা কেটে দিলেন। অতঃপর মক্কায় গেয়ে পবিত্র কা’বাঘর তাওয়াফ করলেন, তার পাশে পশু জবাই করে কুরবানী আদায় করলেন এবং মাথার চুল কামালেন। এভাবে তিনি ছয়দিন মক্কায় কাটালেন। এ ছয়দিন পশু কুরবানী করে মক্কাবাসীকে খাওয়ানো এবং মধু পান করানোই ছিল তাঁর প্রধান কাজ। তিনি স্বপ্নে দেখলেন কা’বা শরীফকে তিনি যেন গিলাফ দিয়ে আচ্ছাদিত করছেন। অতঃপর তিনি খাসফ নামক মোটা কাপড় দিয়ে কা’বায় গিলাফ চড়ালেন।

তিনি আবার স্বপ্ন দেখলেন যে, আরো ভালো কাপড় দিয়ে কা’বাকে গিলাফ পরাচ্ছেন। সুতরাং পরে তিনি মূল্যবান ইয়ামানী কাপড়ে কা’বাকে আবৃত করলেন। ঐতিহাসিকদের ধারণা, এই তুব্বা তথা তুব্বানই প্রথম ব্যক্তি যিনি কা’বা শরীফকে গিলাফ পরিয়েছিলেন এবং কা’বার মুতাওয়াল্লী জুরহুম গোত্রের লোকদেরকে গিলাফ পরানোর অসীয়াত করে গিয়েছিলেন। তিনিই প্রথম কা’বা ঘরকে পবিত্র করার (মূর্তি থেকে মুক্ত করা এর অন্তর্ভুক্ত ছিল) নির্দেশ দেন, কা’বার ধারেকাছে যেন তারা রক্তপাত না ঘটায়, মৃতদেহ এবং ঋতুবর্তী মহিলাদের ব্যবহৃত ময়লা বস্ত্রখ- ফেলে না রাখে-এসব ব্যাপারে তিনি সবাইকে সাবধান করে দেন। তিনি কা’বা ঘরের জন্য দরজা তৈরী ও তালাচাবির ব্যবস্থা করেন।

এরপর তুব্বা মক্কা থেকে বেরিয়ে তাঁর সৈন্য সামন্ত ও ইহুদী প-িতদ্বয়কে নিয়ে ইয়ামান অভিমুখে যাত্রা করেন। ইয়ামানে পৌঁছে তিনে সেখানকার জনগণকে মূর্তিপূজা ত্যাগ করে তাঁর গৃহীত ধর্মমত গ্রহণের দাওয়াত দেন। ইয়ামান বাসী সুস্পষ্টভাবে জানায় তারা তাদের প্রথামত আগুনের কাছে ফায়সালা চাওয়া ছাড়া ধর্ম ত্যাগ করবে না।

ইয়ামনবাসীরা আগুনের মাধ্যমে ঝগড়া বিবাদের মীমাংসা করতো। ঐ আগুন অত্যাচারীকে গ্রাস করতো কিন্তু মযলুমের ক্ষতি করতো না। একদিন ইয়ামনবাসী তাদের প্রতিমাসমূহ ও তাদের ধর্ম পালনের অন্যান্য সরঞ্জামাদি সহকারে এবং ইহুদী প-িতদ্বয় তাদের আসমানী কিতাব কাঁধে ঝুলিয়ে যে স্থান দিয়ে আগুন বেরোয় সেখানে গিয়ে বসলো। আগুন বেরিয়ে প্রথমেই ইয়ামানবাসীদের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। ইয়ামান বাসী তা দেখে ভীত হয়ে পড়লো এবং আগুন থেকে দূরে সরে গেল। উপস্থিত লোকেরা তাদেরকে তিরষ্কার করে ধৈর্যের সাথে যথাস্থানে বসে থাকতে বললো। তারা ধৈর্য ধারণ করে বসতেই আাগুন তাদেরকে ঘেরাও করে ফেললো এবং প্রতিমা ও অন্যান্য ধর্মীয় সাজ সরঞ্জাম পুড়িয়ে ভষ্ম করে দিল। হিমইয়ার গোত্রের যে ক’জন পুরোহিত ধর্মীয় সাজ সরঞ্জাম বহন করছিল তারাও ভষ্মীভ’ত হলো। ফলে হিমইয়ার গোত্র তুব্বানের ধর্মে দীক্ষা নিল। তখন থেকে ইয়ামানে ইহুদী ধর্মের পত্তন হলো।

তুব্বানের পর ইয়ামানের রাজ সিংহাসনে আরোহণ করেন তাঁর ছেলে হাস্সান। তিনি সমগ্র ইয়ামনবাসীকে সাথে নিয়ে সমগ্র আরব ও অনারাব জগত দখল করার অভিপ্রায়ে এক বিজয় অভিযান শুরু করেন। এভাবে বাহরাইন ভূখ-ে পৌঁছলে হিমইয়ার ও অন্যান্য ইয়ামানী গোত্রগুলো তাঁর সাথে আর সামনে এগুতে চাইল না। তারা তাদের স্বদেশ ও পরিবার পরিজনের কাছে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধাস্ত নিল। তারা ঐ বাহিনীতে অংশগ্রহণকারী হাস্সানের এক ভাই আমরের কাছে এ অভিপ্রায় ব্যক্ত করে বললো,“তুমি তোমার ভাই হাস্সানকে হত্যা কর এবং আমাদের সাথে স্বদেশে ফিরে চল। আমরা তোমাকেই রাজা হিসেবে বরণ করে নেব।” আমর তার বহিনীর লোকজনের সাথে আলোচনা করলে সবাই একমত হলো। কেবল যূ-রুআইন আল হিমইয়ারী এর বিরোধিতা করলো ও হত্যাকা- ঘটাতে নিষেধ করলো। কিন্তু আমর তার নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করলো। তখন যূ-রুআইন নিম্নলিখিত কবিতা আবৃতি করলো,

“হুঁশিয়ার! কে আছে নিজের নিদ্রার বিনিময়ে নিদ্রাহীনতাকে বরণ করে নেবে।

যে ব্যক্তি তার সুখময় জীবনকে অব্যাহত রাখে

সে-ই প্রকৃত ভাগ্যবান। কিন্তু

হিমাইয়ার বিশ্বাসঘাতকতা করলো। আর যূ-রুআইনের জন্য খোদার স্বীকৃত ওজর রইল।”

এই কবিতাটুকু সে ইক টুকরো কাগজে লিখে তাতে সীল মারলো। অতঃপর আমরের কাছে নিয়ে গিয়ে বললো, “আমার লেখা এই চিরকুট আপনার কাছে রেখে দিন।” আমর সেটা রেখে দিল। অতঃপর সে তার ভাই হাস্সানকে হত্যা করলো এবং দলবল সাথে নিয়ে ইয়ামানে প্রত্যাবর্তন করলো।

আমর ইবনে তুব্বান ফিরে আসার পর ঘোর অনিদ্রায় আক্রান্ত হলো। রোগ যখন মারাত্নক আকার ধারণ করলো তখন সে চিকিৎসক পাখীর সাহায্যে ভাগ্য গণনাকারী জ্যোতিষী ও ভবিষ্যদ্বক্তাদের ডাকলো এবং তার রোগের রহস্য উদ্ঘাটনে তাদের মতামত চাইলো। একজন বললো, “দেখুন, আপনি যেভাবে নিজের ভাইকে হত্যা করেছেন, এভাবে আপন ভাই বা রক্ত সম্পর্কীয় আপনজনকে যখনই কেউ হত্যা করেছে তাকে এ ধরনের নিদ্রাহীনতহায় ভুগতে হয়েছে।”

একথা শোনা মাত্রই আমর তার ভাই হাস্সানকে হত্যার পরামর্শ দানকারী ইয়ামানের সকল প্রভাবশালী ব্যক্তিকে হত্যা করতে লাগলো। একে একে তাদের সবাইকে হত্যা করার পর যখন যূ-রুআইনের কাছে এলো তখন সে বললো, “আমার নির্দোষিতার প্রমাণ আপনার কাছেই রয়েছে।” আমর বললো, “সেটা কি?” যূ-রুআইন বললো, “আমার লিখিত এক টুকরো কাগজ যা আমি আপনাকে দিয়েছিলাম।” তখন আমর সেটা বের করে দেখলো তাতে দু’টি পংক্তি লেখা আছে। সে বুঝতে পারলো যে, যূ-রুআইন তাকে সদুপদেশই দিয়েছিল। তাই সে তাকে হত্যা করলো না।

এরপর আমর মারা গেল। তার মৃত্যুর পর হিমইয়ারী শাসনের ক্ষেত্রে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিল এবং তারা ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়লো। এই সুযোগে ঘাড়ের উপর শাসক হয়ে চেপে বমলো লাখনিয়া ইয়াসূফ যূ-শানাতির নামক রাজ পরিবার বহির্ভূত এক ভয়ঙ্কর পাপিষ্ঠ ব্যক্তি। সে তাদের সম্ভ্রান্ত লোকজনদেরকে হত্যা করলো এবং রাজ পরিবারের লোকজনদের সাথে আমোদ প্রমোদে লিপ্ত হলো।

লাখনিয়ার সবচেয়ে বড় পাপাবার ছিল সমকাম। হাস্সানের ভাই এবং তুব্বানের ছেলে যূর’আ যু-নাওয়অসকে একদিন সে এই অভিপ্রায়ে ডেকে পাঠালো। হাস্সান নিহত হওয়ার সময় যূর’আ ছিল ছোট বালক। কিছু দিনের মধ্যে সে এক সুঠামদেহী ও বুদ্ধিমান তরুণ যুবকে পরিণত হলো। যূর’আর কাছে লাখনিয়ার বার্তাবাহক এলে সে তার কমতলব বুঝতে পারলো। সে একখানা তীক্ষèধার হালকা ছুরি নিজের পায়ের তলায় জুতার ভেতর লুকিয়ে নিয়ে লাখনিয়ার কাছে গেল। লাখনিয়া নিভৃতে ডেকে নিয়ে যূর’আর ওপর  চড়াও হলো। সে সুযোগ বুঝে তৎক্ষণাৎ ছুরি দিয়ে তাকে প্রচ-ভাবে আঘাত করলো। যূর’আ লাখনিয়অকে হত্যা করে জনসাধারণের সামনে এসে সগর্বে নিজের কীর্তি প্রচার করতে লাগলো। এবার জনগণ বললো,“তুমি আমদেরকে এই নরাধমের হাত থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছ। সুতরাং আমাদের শাসক হিসেবে তুমিই যোগ্যতম ব্যক্তি।”

হিমইয়ার গোত্র ও সমগ্র ইয়ামানবাসীর সহযোগিতায় যূর’আ যূনাওয়াস তাদের ওপর দীর্ঘস্থায়ী পরাক্রমশালী রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত  করলো। যূর’আ ছিলেন হিমইয়ার বংশের সর্বশেষ সম্রাট এবং সে (কুরআনের সূরা বুরূজের) পরিখায় পুরে আগুনে পুড়িয়ে মারার গটনার নায়ক।

ইয়ামানের নাজরান প্রদেশে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের প্রকৃত অনুসারীদের অবশিষ্ট একটি গোষ্ঠী তখনও বেঁচে ছিল। তাঁরা ছিলেন জ্ঞানী-গুণী ও সুদৃঢ় মনেবলের অধিকারী। তাঁদের নেতা ছিলেন আবুদল্লাহ ইবনে সামের। যূ-নাওয়াস তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে ইহুদীবাদ গ্রহণের দাওয়াত দিলো এবং পরিষ্কার বলে দিলো, “হয় ইহুদী হও, নচেৎ মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও।” সুতরাং তাদের জন্য পরিখা খনন করা হলো। শেষ পর্যন্ত তাদেরকে নির্মমভাবে আগুনে পুড়িয়ে মারা হলো এবং অনেককে তরবারি দিয়ে হত্যা করে তাদের লাশ বিকৃত করা হলো। এভাবে যূ-নাওয়াস প্রায়২০ হাজার লোককে হত্যা করলো।

এই যূ-নাওয়াস ও তার সৈন্য-সামন্তের প্রসঙ্গেই আল্লাহ তায়ালা হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ওহী নাযিল করেন, “পরিখার জ্বলন্ত অগ্নি কুন্ডলীর নায়কদের ওপর অভিসমাপ্ত। স্মরণ কর যখন তারা পরিখার পাশে বসেছিল, মুমিনদের ওপর তারা যে হত্যালীলা অনুষ্ঠানে ব্যাপৃত ছিল, সে দৃশ্য উপভোগ করছিল। মুমিনদের বিরুদ্ধে তাদের শুধু এই কারণে আক্রোশ ছিল যে, মহাপরাক্রান্ত, চিরনন্দিত আল্লাহ তায়ালার প্রতি তারা ঈমান এনেছিল।”

কথিত আছে যে, যূ-নাওয়াসের হাতে নিহত এই মুমিনদলের ইমাম ও অধিনায়ক ছিলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সামের।

 

হাবশীদের দখলে ইয়ামান

যূ-নাওয়াসের অগ্নিকুন্ডে নিহত মুমিনদের একজন কোন রকমে আত্নরক্ষা করে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। সাবা গোত্রোদ্ভূত দাওস যূ-সুলুবান নামক এই ব্যক্তি আগুনের পরিখা থেকে সুকৌশলে উদ্ধার পেয়ে নিজের ঘোড়ায় চড়ে ঊর্ধশ্বাসে মরুভূমির ভেতর দিয়ে ছুটতে থাকেন। যূ-নাওয়াসের পশ্চাদ্ধাবনকারী লোকজনের চোখে ধূলো দিয়ে। ছুটতে ছুটতে তিনি রোম সম্রাটের দরবারে উপনীত হন। তিনি উহুদীবাদী যূ-নাওয়াস ও তার সৈন্য সমন্তের হাতে নাজরানবাসী মুমিনদের যে লেমহর্ষক গণহত্যা ও নির্যাতন সংঘটিত হয়েছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিররণ দিয়ে যূ-নাওয়াসের শক্তির বিরুদ্ধে রোম সম্রাটের সামরিক সাহায্য প্রার্থনা করেন। সম্রাট বলেন, “তোমার দেশ আমার এখান থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। তাই আমি আবসিনিয়ার রাজাকে চিঠি লিখবো। তিনিও আমার ধর্মাবলম্বী। আর তাঁর দেশ তোমার দেশের কাছাকাছি।” সম্রাট আবিসিনিয়ার রাজাকে শুধু সাহায্য করার নির্দেশই নয়, সেই সাথে প্রতিশোধ গ্রহণেরও নির্দেশ দিয়ে চিঠি দিলেন। হাবশার রাজা নাজাশীর কাছে রোমান সম্রাটের ঐ চিঠি নিয়ে হাজির হলেন দাওস। নাজাশী হাবশা থেকে ৭০ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী দাওসের সাথে পাঠিয়ে দিলেন। বাহিনীর সেনাপতি করা হলো আরিয়াত নামক এক ব্যক্তিকে। তার সহযোগী হিসেবে ঐ বাহিনীতে রইলো আবরাহা আল আশরাম নামক অপর এক ব্যক্তি।

আরিয়াত তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে সমুদ্রপথে ইয়ামানের উপকূলে গিয়ে নামলেন। তার সাথে দাওস যূ-সুলুবানও ছিলেন। খবর পেয়ে যূ-নাওয়াস, হিমইয়ার ও তার অনুগামী অন্যান্য ইয়ামানী গোত্র সমভিব্যাহারে আরিয়াতের সৈন্যদের বাধা দিতে এগিয়ে গেলেন। উভয় পক্ষে তুমুল লড়াই হলো। অবশেষে যূ-নাওয়াস ও তার দলবল পাজয় বরণ করলো। এ অবস্থা দেথে যূ-নাওয়াস তার ঘোড়াকে সমুদ্রের দিকে হাঁকালো। ঘোড়া সমুদ্রের বুকে ঝাপিয়ে পড়লো এবং যূ-নাওয়াসের সলিল সমাধি ঘটলো। এখানেই যূ-নাওয়াস ও তার ইহুদীবাদী শাসনের অবসান ঘটলো। আরিয়াত ইয়ামানে প্রবেশ করে সিংহাসনে আরোহণ করলেন।

আরিয়াত ও আবরাহা দন্দ্ব

আরিয়াত দীর্ঘকাল ইয়ামানের শাসন পরিচালনা করতে থাকেন। এক সময় আবরাহা তাঁর সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন। তাঁর দাবী ছিল, নাজাশীর প্রতনিধি হিসেবে ইয়ামান শাসনের অধিকার তাঁরই বেশী। হাবশী সৈন্যরা এ প্রশ্নে দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়লো। দুই দলে যুদ্ধ হবার উপক্রম হলে আবরাহা আরিয়াতকে এই মর্মে বার্তা পাঠালেন, “হাবশীরা পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হলে নিজেরাই ধবংস হযে যাবে,পরিণামে কোন লাভ হবে না। সুতরাং এসো আমরা দু’জনে সম্মুখ সমরে লিপ্ত হই। আমাদের দু’জনের মধ্যে যে জয়যুক্ত হবে, সমস্ত সৈন্যবাহিনী তার আনুগত্য করবে।”আরিয়াত এই প্রস্তাবে রাজী হয়ে বললো,“হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ।” আরিয়াত ও আবরাহার মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হলো আবারাহা অপেক্ষাকৃত ধার্মিক, মোটা ও বেঁটে এবং আরিয়াত লম্বা, সুদর্শন ও বিশালদেহী ছিলেন। তাঁর হাতে ছিল একটি অস্ত্র। আবরাহা তাঁর পৃষ্ঠদেশকে রক্ষা করার জন্য তাঁর আতুদাহ নামক ক্রীতদাসকে পিছনের দিকে রাখলেন। আরিয়াত তাঁর তরবারি দ্বারা আবরাহার মাথায় আঘাত করলেন,কিন্তু তা তাঁর মুখম-লের ওপর লাগলো। এতে আবরাহার নাক ও কপালের ভ্রু কেটে গেল এবং ঠোঁট ও চোখ আঘাতপ্রাপ্ত হলো। একারণেই তাকে আবরাহা আল-আশরাম বা নাক কাটা বলা হয়। এইবার আতুদাহ আবরাহার পিছন থেকে বেরিয়ে এসে আরিয়াতকে আক্রমণ করে হতৃা করলো। এরপর আরিয়াতের অনুগত হাবশীসৈন্যরা আবরাহার দলে ভিড়ে যায় এবং আবরাহা আবিসিনিয়ার সর্বসম্মত প্রতিনিধিরূপে ইয়ামান শাসন করতে থাকেন।

আসহাবুল ফীলের ঘটনা

অতঃপর আবরাহা সানাতে কুল্লাইস নামে এমন একটি গীর্জা তৈরী করে, তৎকালীন বিশ্বে যার সমতুল ও সদৃশ কোন ঘর ছিল না।[৭.এটাই হলো সেই ঐতিহাসিক গীর্জা, যাকে আবরাহা পবিত্র কা’বার বিকল্প হিসেবে তৈরী করেছিলো। আরবরা কা’বার পরিবর্তে ঐ গীর্জাকে হজ্জের কেন্দ্র হিসেবে গ্রহণ করুক, ঐ গীর্জার  এলাকার হজ্জকে স্থনান্তরিত করুক এটাই ছিল তার অভিলাষ।]

অতঃপর সে নাজাশীকে পত্র লিখলো, “হে রাজা, আমি আপনার জন্য এমন একটি গীর্জা গড়েছি, যার তুলনা ইতহাসে পাওয়া যায় না। আরবদের হজ্জকে আমি এই গীর্জার এলাকায় স্থনাস্তরিত না করা পর্যন্ত ক্ষান্ত হবো না।”নাজাশীর কাছে লেখা আবরাহার এই চিঠির কথা অচিরেই আরবদের জানাজানি হয়ে লেল। তারা ভীষণ ক্ষুদ্ধ হলো।বনী কিনানা গোত্রে রক্তপাত নিষিদ্ধ হওয়ার মাসকে হালাল করণের প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী একটা গোষ্ঠী। [৮.এই গোষ্ঠীকে বলা হতো নাসায়াহ। জিলকদ, জিলহজ্জ ও মুহাররম এই তিন মাসকে এক নাগাড়ে রক্তপাতহীন মাস হিসেবে  পালন করা আরবদের পক্ষে কষ্টকর ছিল। নরহত্যার মাধ্যমে ডাকাতি লুটতরাজ ইদ্যাদি করেই তাদের জীবিকা নির্বাহ চলতো। এজন্য এক নাগাড়ে তিন মাস নিষিদ্ধ মাস যাপন তদের কাছে বিরক্তিকর হয়ে উঠেছিল। তাই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হজ্জ সমাপন করে মিনা থেকে ৮এর বাকী অংশ .... বেরিয়ে লোকজনের সামনে নিম্নরূপ ঘোষণা উচ্চারণ করতো, “আমি সেই ব্যক্তি যার কোন কলংক নেই, যার হুমকির কোন জবাব আসে না এবং যার সিদ্ধান্ত কেউ পাল্টাতে পারে না।” সবাই সমস্বরে বলতো, “আলবৎ! আলবৎ!!” অতঃপর পুনরায় সবাই বলতো, “আমাদের একটা নিষিদ্ধ মাস পিছিয়ে দাও। মুহাররম মাসটা হালাল করে দাও এবং তার বদলে সফর মাস নিষিদ্ধ বলে গণ্য কর।” এটাই নাসা বা হারাম মাসকে মনগড়[ভাবে পিছিয়ে নেয়াপর প্রক্রিয়া। এটা একটা জাহেলী রেওয়াজ এবং সম্পূর্ণ অনৈসলামিক রীতি।-অনুবাদক]

তাদের একজন রগচটা লোক গোপনে গিয়ে আবরাহার ঐ গীর্জায় পয়াখানা করে রেখে আবার নিজের বসতিতে ফিরে এলো।

যথাসময়ে ব্যাপারট আবরাহার কানে গেল। সে লোকজনের কাছে জিজ্ঞাসা করতে লাগলো,

“এই কা-টা কে করলো?” লোকেরা জানালো, “জনৈক আরব এ কাজ করেছে। সে মক্কার কা’বাঘরে হজ্জ আদায়কারীদের দলভুক্ত। আপনি মক্কা থেকে এখানে হজ্জ স্থানান্তর করতে ইচ্ছুকÑ একথা শুনে সে রেগে গিয়ে এ কাজ করেছে। এ দ্বারা সে প্রমাণ করতে চায় যে, এই গীর্জা কা’বার বিকল্প হতে পারে না এবং এটা হজের কেন্দ্র হবার যোগ্য নয়।”

আবরাহা তো রেগেই আগুন। সে শপথ করলো যে, যেমন করেই হোক সে কা’বাকে ধ্বংস করবেই। হাবশীদেরকে সে তার অভিপ্রায় জানালো। হাবশীরা সব রকমের উপকরণ ও সরঞ্জাম দিয়ে তাকে প্রস্তুত হতে সাহায্য করলো। যথাসময়ে সে একদল হস্তীনিয়ে কা’বা অভিযানে বেরিয়ে পড়লো। আরবরা ব্যাপারটা জানতে পেরে ভীষণ প্রমাদ গুনলে এবং ভীত সন্ত্রন্ত হয়ে পড়লো। আল্লাহর পবিত্র ঘর কা’বাকে আবরাহা ধ্বংস করতে চায় শুনে আরবরা উপলব্ধি করলো যে, হানাদরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা তাদের একান্ত কর্তব্য

ইয়ামানের জনৈক সম্ভ্রান্ত ও প্রভাবশালী নাগরিক ‘যূ-নফর’ সমগ্র ইয়মানবাসী ও অন্যান্য আরবদেরকে আহ্বান জানালেন কা’বা শরীফকে রক্ষা করার জন্য আরাহার বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে। যারা তার আহ্বানে সাড়া দিল। তদের নিয়ে যূ-নফর আবারাহার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেন। কিন্তু তিনি ও তাঁর বাহিনী পরাজিত হলেন এবং যূ-নফর বন্দী হলেন। এরপর আবরাহা তার ইস্পিত লক্ষ্যে এগিয়ে গেলো। খাস’য়াম উপজাতীয়দের এলাকায় পৌঁছলে নুফাইল ইবনে হাবীব আল্ খাসয়ামী দু’টি খাসয়ামী গোত্র শাহরান ও নাহিস  এবং আরো কয়েকটি সমমনা আরব গোত্রকে সাথে নিয়ে আবরাহার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন। যুদ্ধে নুফাইলও সদলবলে পরাজিত ও বন্দী হলেন। আবরাহা নুফাইলকে মুক্তি দিলে সুফাইল তার পথ প্রদর্শক হিসেবে সহযাত্রী হলেন। আবরাহা যখন তায়েফের উপর দিয়ে এগিয়ে চলছিল, তখন সাকীফ গোত্রের কিছু লোকজন সাথে নিয়ে মাসউদ ইবনে মু’আততিব তার সাথে সাক্ষাৎ করলো এবং তাকে বললো, “হে রাজা, আমরা একান্ত অনুগত গোলাম তুল্য। আপনার বিরোধী নই আমরা। আপনি যে ঘর লক্ষ্য করে চলেছেন, ওটা আমাদের উপাসনার ঘর নয়। আপনি তো চাইছেন মক্কার ঘরে হামলা চালাতে। বেশ আমরা আপনার পথপ্রদর্শক হিসেবে একজন লোক সঙ্গে দিচ্ছি। সে আপনাকে দেখিয়ে দেবে কা’বা ঘর।” আবরাহা তাদের প্রতি প্রীত ও সদয় হলো। তায়েফবাসী তার সাথে আবু রিগাল নামক এক ব্যক্তি কে মক্কার পথ দেখিয়ে দেয়ার জন্য পাঠালো। আবরাহা ও তার দলবলকে সাথে নেয়ে মুগাম্মাস[৯.তায়েফগামী পথে মক্কার নিকটবর্তী একটি স্থানের নাম।]নামক স্থানে উপনীত হলে আবু রিগাল মারা গেল। পরবর্তীকালে আরববাসী আবু রিগালের কবরে পাথর নিক্ষেপ করতো এবং আজও মুগাম্মাসে তার কবরে লোকেরা পাথর নিক্ষেপ করে থাকে।

আবরাহা মুগাম্মাসে যাত্রাবিরতি করার সময় আসওয়াদ বিন মাকসূদ নামক জনৈক হাবশী নাগরিককে ঘোড়ায় চড়িয়ে মক্কা পরিদর্শনে পাঠায়। আসওয়াদ মক্কা পর্যন্ত যায় এবং ফিরে আসার সময় উপত্যকায় চারনভূমিতে বিচরণশীল কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্রের লোকদের গবাদি; পশু ধরে নিয়ে আসে। এইসব গবাদি পশুর মধ্যে আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিমের দুশো উটও ছিল। তিনি ঐ সময় কুরাইশদের মধ্যে সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ও বড় নেতা ছিলেন। গবাদি পশু ধরে নিয়ে আসার ঘটনায় বিক্ষুব্ধ ঐ এলাকার কুরাইশ, কিনানা ও হুযাইল গোত্র আবরাহার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হতে চেয়েছিল। কিন্তু নিজেদের অক্ষমতা বুঝতে পেরে তারা সে ইচ্ছা পরিহার করে।

আবরাহা হুনাতাহ আল্ হিমইয়ারীকে মক্কায় পাঠাবার সময় বলে দিল, “প্রথমে মক্কার সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি ও নেতা যিনি, তাঁকে চিনে নিও। অতঃপর তাঁকে বলো, রাজা তাদের সাথে যুদ্ধ করতে আসেননি। এসেছেন শুধু কা’বা ঘরকে ধ্বংস করতে। তোমরা যদি আমাদেরকে একাজে বাধা দিতে  কোন যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত না হও তাহেল তোমাদের রক্তপাতের কোন ইচ্ছা আমাদের নেই। তিনি যদি আমার সাথে যুদ্ধ করতে ইচ্ছুক না হয়ে থাকেন তাহলে তাঁকে আমার কাছে নিয়ে আসবে।”

হুনাতাহ মক্কায় প্রবেশ করে খোজ নিয়ে জানতে পারলো, মক্কায় সমচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি ও নেতা হলেন আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম। সে আবদুল মুত্তালিবের কাছে উপস্থিত হলে এবং রাজা তকে যা বলতে বলেছিলো তা বললো। আবদল মুত্তালিব বললেন, “আল্লাহর কসম, আমরা তার সাথে যুদ্ধ করতে চাইনে এবং সে ক্ষমতাও আমাদের নেই। এটা আল্লাহর পবিত্র ঘর। এটা তাঁর নিজস্ব ঘর ও নিজস্ব সম্ভ্রমের ব্যাপার। আর যদি তিনি বাধা না দেন তবে আমাদের কিছু করার থাকবে না।”

তখন হুনাতাহ বললো, “আপনি আমার সাথে রাজার কাছে চলুন। কারণ তিনি আমাকে আদেশ করেছেন আপনাকে সঙ্গে করে তার কছে নিয়ে যেতে।” আবদুল মুত্তালিব তাঁর এক পুত্রকে সাথে নিয়ে আবরাহার নিকট চললেন। আবরাহার সৈন্যদের কাছে পৌঁছেই তিনি যূ-নফর নম্পর্কে খোঁজ নিলেন, যিনি তাঁর বন্ধু ছিলেন। বন্দী যূ-নফরের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হলো। তিনি কললেন, “হে যূ-নফর, আমাদের উপর যে বিপদ নেমে এসেছে, তার প্রতিকারে তোমার দ্বারা কি কোন সাহায্য হতে পারে?” যূ-নফর বললো, “এমন একজন রাজবন্দীর কি-ইবা সাহায্য করার ক্ষমতা থাকতে পারে, যে প্রতি মুহূর্তে প্রহর গুনছে, এই বুঝি তাকে হত্যা করা হয়? আমার বাস্তবিকই তোমাদের এই মুসিবতে তেমন কিছু করার নেই। তবে আনীস নামক একজন মাহুত আছে। সে আমার বন্ধু। তাকে আমি বার্তা পাঠাচ্ছি। তোমার উচ্চ মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে তাকে অবহিত করবো ও রাজার কাছে তুমি যাতে নিজের বক্তব্য পেশ করতে পার সেজন্য তাকে অনুমতি চেয়ে দিতে বলবো। এমনকি সম্ভব হলে সে যাতে তোমার ব্যাপারে সুপারিশও করে, সেজন্য তাকে অনুরোধ করবো।” আবদুল মুত্তালিব বললেন, “এটুকুই যথেষ্ট হবে।” এরপর যূনফর আনীসের নিকট এই বলে বার্তা পাঠালো, “শোনো! আবদুল মুত্তালিব হলেন কুরাইশদের একচ্ছত্র অধিপতি। মক্কার বণিক সমাজের নেতা। উপত্যকাভূমিতে মানুষের এবং পাহাড় পর্বতের বন্য পশুর খাদ্য সরবরাহকারী হিসেবে তিনি পরিচিত। যেসব পশু রাজার হস্তগত হয়েছে, তন্মধ্যে দু’শত উট এই আবদুল মুত্তালিবের। সুতরাং তুমি রাজার সাথে সাক্ষাতের বন্দোবস্ত করে দাও এবং যতটা পার তাঁর উপকার কর।” আনীস বললো, “ঠিক আছে। আমি সাধ্যমত চেষ্টা করব।” আনীস আবরাহাকে বললো, “হে রাজা, কুরাইশদের নেতা আপনার দরবারে উপস্থিত। তিনি আপনার সাথে দেখা করতে চান। তিনি মক্কায় বণিকদের দলপতি। তিনি উপত্যকা ভূমিতে যেমন মানুষের আহার করান, তেমনি পর্বত শীর্ষের বন্য পশুর খাদ্য সরবরাহকারী বলেও সুখ্যাত। অনুগ্রহপূর্বক তাঁকে সাক্ষাতের অনুমতি দিয়ে তাঁর দাবী-দাওয়া পেশ করতে দিন।” আবরাহা তাঁকে অনুমতি দিলো।

আবদুল মুত্তালিব ছিলেন সেই সময়কার শ্রেষ্ঠতম সুদর্শন  এবং অতি গণ্যমান্য ও মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। আবরাহা তাঁকে দেখেই মুগ্ধ ও অভিভূত হলো। সে আবদুল মুত্তালিবকে এতখানি সম্মানিত মনে করলো যে, নিজে উচ্চ আসনে বসে তাঁক নীচে বসতে দিতে পারলো না। পক্ষান্তরে হাবশীরা তাঁকে রাজার সাথে একই রাজকীয় আসনে উপবিষ্ট দেখুক, তাও পছন্দ করলো না। অগত্যা আবরাহা স্বীয় রাজকীয় আসন থেকে নেমে নীচের বিছানায় বসলো এবং আবদুল মুত্তালিবকে সেখানে নিজের পাশে বসালো অতপর দোভাষীকে বললো, “তাঁকে বক্তব্য পেশ করতে বলো।” দোভাষী আদেশ পালন করলো। আবদুল মুত্তালিব বললেন, “আমার অনুরোধ, আমার যে দুশো উট রাজার হাতে এসেছে, তা ফেরত দেয়া হোক।” দোভাষী যখন একথা আবরাহাকে জানালো তখন আবরাহা দোভাষীর মাধ্যমে বললো,“তোমাকে প্রথম দৃষ্টিতে যখন দেখেছিলাম তখন অবিভূত হয়েছিলাম কিস্তু এখন তোমার কথা শুনে তোমার প্রতি আমার ভীষণ বীতশ্রদ্ধা জন্মে গেছে। এচা খুবই আশ্চর্যজনক যে, তুমি আমার সাথে আমার হস্তগত দুশো উটের দাবী নিয়ে কথা বলছো। অথচ তোমার ও তোমার বাপদাদার ধর্মের কেন্দ্র যে কা’বাগৃহ, আমরা সেটাকে ধ্বংস করতে এসছি এ কথা জেনেও তুমি সে সম্বন্ধে কিছুই বলছো না।” আবদুল মুত্তালিব বললেন, “আমি শুধু উটেরই মলিক। কা’বা গৃহের মালিক আর একজন আছন, তিনিই তাঁর ঘর রক্ষা করবেন।” আবরাহা বললো,“আমার আক্রমণ থেকে তিনি এ ঘরকে ঠেকাতে পারবেন না।” আবদুল মুত্তালিব বললেন,“ সেটা আপনার আর কা’বা ঘরের মলিকের ব্যাপার।”

আবরাহা  আবদুল মুত্তালিবের উট ফিরিয়ে দিলো। আবদুল মুত্তালিব কারাইশদের কাছে গেলেন এবং তাদেরকে সমস্ত ব্যাপারটা জানালেন। তিনি তাদেরকে মক্কা থেকে বেরিয়ে পার্শ্ববর্তী পাহাড় পর্বতের গোপন গুহাগুলোতে আশ্রয় নিয়ে আবরাহার সৈন্যদের সম্ভাব্য নির্যাতন থেকে আত্নরক্ষা করার নির্দেশ দিলেন। এরপর আবদুল মুত্তালিব নিজে কুরাইশদের একদল লোককে সাথে নিয়ে কা’বার দরজার চৌকাঠ আঁকড়ে ধরে দাঁড়ালেন এবং আল্লাহর কাছে আবরাহা ও তার সৈন্য সামন্তের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে তাঁর সাহায্য কামনা করে দোয়া করতে লাগলেন। আবদুল মুত্তালিব কা’বার চৌকাঠ ধরে বলতে লাগলেন,

“হে আল্লাহ, একজন বান্দাও তার দলবলকে রক্ষা করে থাকে। অতএব তুমি তোমার অনুগত লোকদেরকে রক্ষা কর। ওদের ক্রুশ বলবিক্রম যেন তোমার শক্তির উপর জয়যুক্ত না হয়। আমাদের কিবলাকে তুমি যদি ওদের  করুণার ওপর ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকো তাহলে যা খুশি কর!”

এপর আবদুল মুত্তালিব কা’বার দরজার চৌকাঠ ছেড়ে দিলেন এবং তিনি ও তাঁর কুরাইশ সঙ্গীরা পর্বত গুহায় আশ্রয় নিলেন। সেখানে বসে তারা পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন আবরাহা মক্কায় ঢুকে কি করে।

পরদিন প্রত্যুষে আবরাহা মক্কায় প্রবেশ করার প্রস্তুতি নেতে লাগলো। তার হস্তী বাহিনী ও সৈন্য বাহিনীকে সুসংহত করলো। তার হাতীর নাম ছিল মাহমুদ। আবরাহার সংকল্প ছিল, প্রথমে কা’বাকে ধ্বংস করবে, অতঃপর ইয়ামান ফিরে যাবে। হস্তী বাহিনীকে মমক্কা অভিমুখে পরিচালিত করলে নুফাইল ইবনে হাবীব এগিয়ে এলো এবং আবরাহার হাতীর পাশে দাঁড়ালো। অতঃপর সে হাতীর কান ধরে বললো, “হাঁটু গেড়ে বসে পড়ো। নচেত যেখান থেকে এসেছো ভালোয় ভালোয় সেখানে ফিরে যাও। জেনে রেখো তুমি আল্লাহর পবিত্র নগরীতে রয়েছো।” অতঃপর কান ছেড়ে দিতেই হাতী হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। নুফাইল হাতীকে নিষ্ঠুরভাবে পিটিয়ে কোন রকমে পাহাঢ়ের ওপর চড়ালো। এরপর অনেক মারধোর করেও হাতীকে ওঠানে সম্ভব হলোনা। অতঃপর তার শুঁড়ের ভেতর  আঁকাবাঁকা লাঠি ঢুকিয়ে রক্তাক্ত করে দেয়া হলো যাতে হাতী উঠে দাঁড়ায়। তবুও উঠলোনা। অতঃপর তাকে পেছনের দিকে ইয়ামান অভিমুখে  ফিরতি যাত্রা করার জন্য চালিত করা মাত্রই ছুটতে আরম্ভ করলো। সিরিয়ার দিকে চালিত করলেও জোর কদমে চলতে লাগলো। অতঃপর যেই মক্কার দিকে চালিত করা হলো অমনি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। ঠিক এই সময়ে আল্লাহ তায়ালা সমুদ্রের দিক থেকে এক ধরনের কালো পাখী পাঠালেন। প্রতিটি পাখিীর সাথে তিনটি করে পাথরের নুড়ি ছিল। একটা তার ঠোঁটে আর দুটো দুইপায়ে। পাথরগুলো কলাই ও বুটের মত। যার গায়েই সেগুলো পড়তে লাগলো, সে-ই তৎক্ষণাৎ মরতে লগলো। কিন্তু সবার গায়ে পড়তে পারলোনা। অনেকেই পালিয়ে যেখান থেকে এসেছে সেদিকে ফিরে যেতে লাগলো। লোকেরা রাস্তার যেখানে সেখানে পড়ে মরতে লাগলো। আবরাহার গায়ে একটা গুড়ি পড়তেই সে তৎক্ষনাৎ মারা গেল। ইবনে ইসহাক বলেন,

আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবী হিসেবে পাঠানোর পর এই ঘটনাকে কুরাইশদের প্রতি তাঁর বিশেষ করুণা ও অনুগ্রহ হিসেবে উল্লেখ করেন। কেননা এর মাধ্যমেই তিনি হাবশীদের পরাধীনতার বিপদ থেকে তাদেরকে উদ্ধার করেছিলেন। যাতে তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য বহাল থাকে। আল্লাহ সূরা ফীলে বলেন,

[আরবী ***********]

“তুমি কি দেখনি, তোমার প্রতিপালক হাতীওয়ালাদের সাথে কি রকম আচরণ করেছিলেন? তিনি কি তাদের চক্রান্তকে ব্যর্থ করে দেননি? তিনি তাদের বিরুদ্ধে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখী পাঠিয়েছিলেন, যারা তাদের প্রতি কঠিন কংকর নিক্ষেপ করছিলো আর এভাবে তাদেরকে চর্বিত ভূষি বা ঘাসের মত বানিয়ে দিয়েছিলেন।”

নিযার ইবনে মা’আদের বংশধর

নিযার ইবনে মা’আদের ঔরসে তিনটি পুত্র জন্মগ্রহণকরে : মুদার, রাবিয়া ও আনমার।[১০. ইবনে হিশাম চতুর্থ সন্তান হিসেবে উল্লেখ করেছেন ‘ইয়াদ’কে।]

মুদারের দুই পুত্র : ইলিয়াস ও আইলান

ইলিয়াসের তিন পুত্র : মুদরাকা, তাবেখা, কামা’আ

মুদরাকার দুই পুত্র : খুযাইমা, হুযাইল

খুইযামার চার পুত্র : কিনানা, আসাদ, ইসদাহ ও আল হাউন

কিনানার চার পুত্র : নাদার১১, মালেক, আবদমানাহ, মিলকান

নাদারের দুই পুত্র : মালেক ও ইয়খলুদ

মেিলকের এক পুত্র : ফিহির

ফিহিরের চার পুত্র : গালেব, মুহারিব, হারেস, আসাদ

গালেবের দুই পুত্র : লুয়াই, তাইম

লুয়অইয়ের চার পুত্র : কা’ব, আমের উসামা, ই্ফ

কা’বের তিন পুত্র : র্মুরা, আদী, হুছাইছ

র্মুরার তিন পুত্র : কিলাব, তাইম, ইযাকযাহ

কিলাবের দুই পুত্র : কুসই, যুহরাহ

কুসাই-এর চার পুত্র : আবদ মানাফ, আবদুদ-দার, আবদুল উযযা, আবদ কুসাই

আবদ মানাফের চার পুত্র : হাশিম, আবদ শামস, মুত্তালিব, নাওফেল

 

আবদুল মুত্তালিব বিন হশিমের সন্তান সন্তুতি

ইবনে হিশাম বলেন,

“আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিমের ঔরসে দশ পুত্র ও ছয় কন্যা জন্মগ্রহণ করেন। পুত্ররা হলেনঃ আল-’আব্বাস, হামযা, ’আবদুল্লাহ, আবুতালিব, যুবায়ের, হারেস,

১১.ইবনে হিশামের মতে নাদারের অপর নাম কুরাইশ। তার বংশধরই কুরাইশী বলে খ্যাত। তার বংশোদ্ভূত না হলে কাউকে কুরাইশী বলা চলে না। অন্যেরা বলেন ফিহির ইবনে মালিকের নাম কুরাইশ।

হাজলা, মুকাওয়েম, দিরা, আবু লাহাব (প্রকৃত নাম আবদুল উয্যা)। কন্যাগণ হলেনঃ সাফিয়া, উম্মে হাকিম আল বায়দা, আতিকা, উমায়মা, আরওয়া, বাররাহ।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিতামাতা

আবদুল মুত্তালিবের পুত্র আবদুল্লাহর ঔরসে এবং ওয়াহাবের কন্যা আমিনার গর্ভে জন্ম গ্রহণ করেন আদমের (আ) শ্রেষ্ঠতম সন্তান মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ বিন আবদুল মুত্তালিব। আল্লাহ তাঁর পরিবার পরিজনদের প্রতি অশেষ শান্তি, রহমত ও বরকত নাযিল করুন।

মাতার দিক থেকে তাঁর বংশ পরম্পরা নিম্নরূপ:

আমিনা বিনতে ওয়াহাব ইবনে আবদ মানাফ ইবনে যুহরাহ ইবনে কিলাব ইবনে মুররা ইবনে কা’ব ইবনে লুয়াই ইবনে গালেব ইবনে ফিহির ইবনে নাদার। আমিনার মাতা বারা বিনতে আবদুল উয্যা ইবনে উসমান ইবনে ‘আবদুদ-দার ইবনে কুসাই ইবনে কিলাব ইবনে মুররা ইবনে লুয়াই ইবনে গালেব ইবনে ফিহির ইবনে মালেক ইবনে নাদার।

সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আদমের (আ) সন্তানদের মধ্যে পিতৃ মাতৃ উভয় কূলের দিক থেকে সম্ভ্রান্ততম, শ্রেষ্ঠতম, উচ্চতম ও মহত্তম।

যমযম কূপ খনন ও তদবিষয়ে সৃষ্ঠ মতবিরোধ

একদিন আবদুল মুত্তালিব পবিত্র কা’বার হাতীমের [১২. অর্থাৎ কা’বার ভিত্তির যে অংশ হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম কর্তৃক স্থাপিত হয়েছিলো। কিন্তু কুরাইশরা তার ওপর আর কোন কিছু নির্মাণ করেনি।]মধ্যে ঘুমিয়ে আছেন এমন সময়ে স্বপ্নে যমযম কূপ খননের আদেশ পেলেন। এ সম্পর্কে স্বয়ং আবদুল মুত্তালিবের বর্নলা নিম্নরূপঃ আমি হাতীমের মধ্যে ঘুমিয়ে আছি। এমতাবস্থায় এক অচেনা আগন্তুক এলেন এবং আমাকে বললেন, পবিত্র কূপ খনন কর। আমি জিজ্ঞেস করলাম : কোন্ পবিত্র কূপ? আগন্তুক এর কোন জবাব না দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন পরদিন আমি নিজের শোয়ার ঘরে গিয়ে ঘুমালাম, এ রাতেও সেই আগন্তুক এসে বললেনঃ সংরক্ষিত কূপ খনন কর। আমি জিজ্ঞেস করলাম : কোন্ সংরক্ষিত কূপ? আগন্তুক কোন জবাব না দিয়ে অর্দশ্য হয়ে গেলেন। পরদিন আম উক্ত স্থানে ঘুমাতে গেলাম, সেই আগন্তুক আবার এলেন এবং বললেন : যমযম খনন কর। আমি বললাম : যমযম কি? তিনি বললেন : “যে কূপের পানি কখনো কমে না বা শুকায় না, যা সর্বোচ্চ সংখ্যক হাজীকে খাবার পানি সরবরাহ করতে পারবে, যা অবস্থিত গোবর ও রক্তের মাঝখানে সাদা ডানাবিশিষ্ট কাকের বাসার নিকটে।” [১৩.কথিত আছে যে,  আবদুল মুত্তালিব যখন কূপ খনন করতে উদ্যোগী হলেন তখন তাঁকে খননের যে স্থান নির্দেশ করা হয়েছিল, সেখানে পিঁপড়ের ঢিবি ও কাকের গুহা দেখতে পেলেন। কিস্তু গোবর ও রক্ত দেখতে পেলেন না। ফলে তিনি দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। এমতাবস্থায় সহসা সেখানে একটি গাভীকে ছুটে আসতে দেখলেন। এক ব্যক্তি গাভীটি জবাই করতে উদ্যত হয়েছিল। কিন্তু গাভীটি ছুটে পালিয়ে আসে। লোকটি পিছু পিছু ছুটে এসেও তাকে ধরতে পারলো না। গাভী শেষ পর্যন্ত মসজিদেহারামের চৌহদ্দির ভেতরে এসে ঢুকে পড়লো। চিহ্নিত স্থানটিতে এসে গাভী দাঁড়ালে লোকটি সেখানেই সেটিকে জবাই করলো। ফলে গাভীর রক্ত ও গোবর বেরিয়ে এল। আবদুল মুত্তালিবের কাছে সমগ্র ব্যাপারটা পরিস্কার হযে গেল এবং তিনি সেখানেই খনন কাজ শুরু করে দিলেন।]

আগন্তুক তাঁর কাছে যখন যমযম কূপের বৈশিষ্ঠ স্পষ্ট করে দিল ও স্থান নির্দিষ্ঠ হলো এবং স্বপ্নের সত্যতা সম্পর্কে আর কোন সন্দেহ রইলো না, তখন পরদিন সকালে পুত্র হারেসকে সাথে করে কোদাল নিয়ে সেখানে গেলেন। হারেস ছাড়া তখন তাঁর আর কোন পুত্র জন্মগ্রহণ করেনি। যমযম কূপ [প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আবদুল মুত্তালিব প্রকৃতপক্ষে যমযম কূপ পুনঃখনন করেন। এই কূপের আবির্ভাব ঘটে সর্বপ্রথম খৃস্টপূর্বে ১৯১০ সালে, হযরত ইসমাঈলের জন্মের বছরে। হিজরী সাল অনুযায়ী রাসূল (সা) এর জন্মের ২৫৭২ বছর আগে এটির আবির্ভাব ঘটে। পরে এক পর্যায়ে যমযম কূপ শুকিয়ে যায় ও মাটির নীচে চাপা পড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এর কোন চিহ্নই আর অবশিষ্ট থাকেনি। আবদুল মুত্তালিবের হাওত পুনঃখনন না হওয়া পর্যন্ত এর সন্ধান কেউ পায়নি। (মক্কা শরীফের ইতিকথা, পৃঃ২২,২৩ ও ২৪) ] খননের কাজ এগিয়ে চললো।যখন আবদুল মুত্তালিব সেই প্রস্তরটি দেখতে পেলেন যা থেকে কূপ উৎসারিত হয়েছে তখন আনন্দের আতিশয্যে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে চিৎকার করে উঠলেন। কুরাইশরা ঐ ধ্বনি শুনে বুঝতে পারলো যে, আবদুল মুত্তালিব যা খুঁজছেন তা পেয়ে গেছেন। সবাই তাঁর কাছে এসে বললো, “হে আদুল মুত্তালিব, ওটা তো আমাদের পিতা ইসমাঈলের কূপ। এতে আমাদেরও হক আছে। আপনি আমাদের কে এই কূপের অংশীদার করুন!” আবদুল মুত্তালিব বললেন, “আমি তা পারবো না। এ জিনিসটা শুধু আমাকে দেয়া হয়েছে, তোমাদেরকে নয়।” তারা বললো, “আমাদের সাথে ন্যায় সঙ্গতভাবে ফায়সালা করুন। তা না হলে আমরা চূড়ান্ত বুঝাপড়া না করে আপনাকে ছাড়বো না।” আবদুল মুত্তালিব বললেন, “বেশ, তাহলে তোমাদের ও আমার মধ্যে এই বিরোধ মীমাংসার জন্য যাকে খুশী সালিশ মানো। আমি তার ফায়সালা মেনে নিতে প্রস্তুত।” তারা বললো, “বনু সা’দ গোত্রে হুযাইম নামে এক জ্যোতিষিণী আছে। সে-ই আমাদের সালিশ।” আবদুল মুত্তালিব বনু আবদ মানাফ গোত্রের কিছু লোককে সাথে নিয়ে সেখানে রওনা দিলেন। প্রতিটি কুরাইশ গোত্রের একজন করে লোক গেল তাঁর সাথে। সমগ্র যাত্রাপথটা ছিল মরু অঞ্চণের ভেতর দিয়ে। হিজাজ ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী এক মরুভুমিতে পৌঁছেতেই আবদুল মুত্তালব ও তাঁর দলের লোকদের পানি ফুরিয়ে গেল। পিপাসায় তাদের এমন শোচনীয় দশা হলো যে, বাঁচার আর কোন আশাই রইলো না। সহগামী কুরাইশ গোত্রগুলোর কাছে তাঁরা খাবার পানি চাইলে তারা দিতে রাজী হলোনা। তারা বললো, “আমরাও মরুভূমিতে আছি। আশংকা হয় আমাদের অবস্থাও তোমাদের মত হতে পারে।”

আবদুল মুত্তালিব কুরাইশদের নিষ্ঠুর আচরনে মর্মাহত হয়ে এবং নিজেদের সম্ভাব্য শোচনীয় পরিনতির কথা চিন্তা করে সহযাত্রীদের কাছে জিজ্ঞাসা করলেন, “এখন আমাদের কি করা উচিত বলে তোমরা মনে কর?” সহযাত্রীরা এক বাক্যে বললো, “আমরা শুধু আপনার মতানুসারে কাজ করবো। আপনি যা ভালো মনে করেন নির্দেশ দিন।” তিনি বললেন, “আমি মনে করি, আমাদের গায়ে এখনো যেটুকু শক্তি আছে তা দিয়ে প্রত্যেকে নিজের কবর খুঁড়ে রাখি। অতঃপর যখন একজন মারা যাবে, তখন আমরা যারা জীবিত থাকবো তারা তাকে ঐ কবরে নিক্ষেপ করবো এবং মাটি ঢেকে দেবো। সবার শেষে মাত্র একব্যক্তি অবশিষ্ট থাকবে। গোটা কাফিলার লাশ নষ্ট হওয়ার চেয়ে একটিমাত্র লোকের লাশ নষ্ট হোক, তাও ভালো সবাই একবাক্যে আবদুল মুত্তালিবের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করলো এবং সবাই নিজ নিজ কবর খুঁড়লো। অতঃপর পিপাসার দরুন অবধারিত মৃত্যুর অপেক্ষঅয় সবাই বসে প্রহর গুনতে লাগলো। কিছুক্ষন পর আবদুল মুত্তালিব তাঁর সঙ্গীদেরকে বললেন, “আল্লাহর কসম, একবারেই নিশ্চেষ্ট বসে বসে কোথাও না গিয়ে এবং জীবন বাঁচানোর কোন অবলম্বন না খুঁজে অসহায়ভাবে মৃত্যুর কবলে নিজেদেরকে এভাবে সঁপে দেয় ভীষণ কাপুরুষতা। এমনও তো হতে পারে যে, আল্লাহ কোন স্থানে আমাদের জন্য পানির ব্যবস্থা করে দেবেন। অতএব, চল, যাত্র শুরু করা যাক।” যাত্রার প্রস্তুতি সম্পন্ন হলো। সফরের সহযাত্রী অন্যান্য কুরাইশরা (যারা পানি দিতে অস্বীকার করেছিল) এতক্ষণ তাদের সমস্ত তৎপরতা নিরীক্ষণ করছিল। আবদুল মুত্তালিব সওয়ারীতে আরোহণ করলেন। যেই সওয়ারী চলতে আরম্ভ করেছ, অমনি তার পায়ের খুরের নীচ থেকে সুপেয় পানির একটি ঝর্ণা নির্গত হলো। তা দেখে আবদুল মুত্তালিব ও তাঁর সঙ্গীরা ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে উঠলেন অতঃপর আবদুল মুত্তালিব ও তাঁর সঙ্গীরা সওয়ারী থেকে নেমে পানি পান করলেন এবং মশকগুলো পূর্ণ করে পানি ভরে নিলেন। এরপর আবদুল মুত্তালিব কুরাইশদেরকে ডেকে বললেন, “এসো, আল্লাহ আমাদের পানি পান করিয়েছেন।তোমরাও পানি পান করে যাও ও মশক ভরে নিয়ে যাও।” তারা এলো এবং পানি পান করে ও মশক ভরে নিয়ে গেল। অতঃপর তারা বললো, “হে আবদুল মুত্তালিব, আল্লাহর কসম, আমাদের ওপর তোমার প্রাধান্য চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়ে গেছে। আমরা যমযমের ব্যাপারে আর কখনো তোমার সাথে কলহ করবো না। আমরা বুঝতে পেরেছি, যিনি আজ তোমাকে এই মরুভূমিতে পানি পান করিয়েছেন, তিনিই তোমাকে যমযমের পানি পান করিয়েছেন। অতএব তুমি পুনরায় তোমার পানি পান করানোর মহান কাজে দ্বিধাহীনভাবে নিয়োজিত হও।”

আবদুল মুত্তালিব ফিরে চললেন এবং সেই কাফিলার অন্য সবাই ফিরে চললো। জ্যোতিষিণীর নিকট কেউ গেল না এবং আবদুল মুত্তালিবকেও তার কাছে যাওয়া থেকে সবাই অব্যহতি দিল।

আবদুল মুত্তালিব কর্তৃক তাঁর পুত্রকে কুরবানীর মানত

আবদুল মুত্তালিব যমযম কূপ খননের সময় কুরাইশদের পক্ষ থেকে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে মানত করেছিলেন যে, যদি তাঁর দশটি সন্তান জন্মে এবং তারা তাঁর জীবদ্দশায় বয়োপ্রাপ্ত হয়ে তাঁর রক্ষণাবেক্ষণ করতে সক্ষম হয় তাহলে তিনি একটি সন্তানকে আল্লাহর নামে কা’বার পাশে কুরবানী করবেন। সুতরাং তাঁর পুত্রের সংখ্যা যখন দশটি পূর্ণ হলো এবং তিনি বুঝতে পারলেন যে, তারা তাঁকে রক্ষা করতে পারবে তখন তিনি তাদের সবাইকে ডেকে একত্র করলেন এবং তাদেরকে নিজের মানতের কথা জানালেন। অত:পর তাদেরকে ঐ মানত পূরণের আহ্বান জানালেন। পুত্ররা সবাই সম্মতি প্রকাশ করলো। জিজ্ঞেস করলো।, “আমাদের কিভাবে কি করতে হবে?” তিনি বললেন, “তোমরা প্রত্যেকে একটা করে তীর নেবে। অতঃপর তাতে নিজের নাম লিখে আমার কাছে আসবে।” সকলে তাই করলো এবং তার কাছে এলো। আবদুল মুত্তালিব তাদেরকে সাথে নিয়ে ‘হুবাল’ নাম মূর্তির নিকট গেলেন। তখন হুবাল থাকতো কা’বার মধ্যবর্তী একটি গহ্বরের কাছে। এই গহ্বরেই জমা হতো কা’বার নামে উৎসর্গীকৃত যাবতীয় জিনিস।

হুবালের কাছে ৭টি তীর থাকতো। প্রত্যেক তীরেই এক একটা কথা উৎকীর্ণ ছিল। একটা তীরে উৎকীর্ণ ছিল “রক্তপণ।” যখন তাদের ভেতরে “রক্তপণ” কার ওপর বর্তায় (অর্থাৎ আমার হত্যাকারী কে) তা নিয়ে মতবিরোধ ঘটতো, তখন ৭টা তীর টানা হতো। যদি “রক্তপন” উৎকীর্ণ তীর বেরিয়ে আসতো তাহলে যার নাম বেরুতো,তাকেই “রক্তপণ” দিতে হতো। একটা তীরে লেখা ছিল “হাঁ”। যখন কোন কাজের ইচ্ছা পোষণ করা হতো, তখন একই নিয়মে তীরগুলো টানা হতো। যদি ঐ “হা” লেখা তীর বেরুতো তাহলে ইস্পিত কাজ করা হতো। আর একটা তীরে লেখা ছিল “না”। যে কোন কাজের ইচ্ছা নিয়ে তীরগুলো টানা হতো। যদি“না” লেখা  তীর বেরিযে আসতো, তাহলে আর সে কাজ তারা করতো না। আর একটা তীরে লেখা ছিল “তোমাদের অন্তর্ভুক্ত বা তোমাদের মধ্য থেকে ” আর একটা তীরে লেখা ছিল “সংযুক্ত” আর একটাতে “তোমাদের বহির্ভূত” আর একটাতে “পানি”। কূপ খনন করতে হলে তারা এই তীর গুলোর মধ্য থেকে একটি টানতো যার মধ্যে এই তীরটিও থাকতো যা ফলাফল বেরুতো সেই অনুসারে কাজ করতো।

তৎকালে আরববাসী যখনই কোন বালকের খাত্না করাতে কিংবা কোন কন্যার বিয়ে দিতে ব্ াকোন মৃতকে দাফন করতে চাইতো অথবা কোন শিশুর জন্ম বৈধ কিনা তা নিয়ে সন্দেহে পড়তো, তখন তাকে ‘হুবাল’ নামক দেবমূর্তির নিকট হাজির করতো এবং সেইসাথে একশো দিরহাম ও একটা বলির উটও নিয়ে যেতো। টাকা ও উট তীর টানার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিকে দিত। অতঃপর যার ব্যাপারে নিষ্পত্তি কাম্য, তাকে মূর্তির সামনে হাজির করে বলতো, “হে আমাদের দেবতা, সে অমুকের পুত্র অমুক, তার ব্যাপারে আমরা তোমার নিকট থেকে অমুক বিযযে ফায়সালা কামনা করছি। অতএব তার ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত কী, তা আমাদের জানিয়ে দাও।” অতঃপর তীর টানার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিকে তারা তীর টানতে বলতো। যদি ‘তোমাদের অন্তর্ভুক্ত’ লেখা তীর বেরুতো, তাহলে তারা বুঝতো যে, সংশ্লিষ্ট শিশু বৈধ সন্তান, আর যদি ‘তোমাদের বহির্ভূত’ লেখা তীর বেরুতো, তাহলে ঐ সন্তান তাদের মিত্র বলে গণ্য হতো। আর যদি ‘সংযুক্ত’ লেখা তীর বেরুতো, তাহলে সে তাদের মধ্যে ঐ অবস্থাতেই থাকতো; তার বংশমর্যাদা বা মৈত্রী  অনির্ধারিতই থেকে যেতো। আর যদি তাদের ইস্পিত অন্য কোন কাজের প্রশ্নে ‘হাঁ’ লেখা তীর বেরুতো, তাহলে ঐ কাজ অবিলম্বেই সম্পন্ন করতো। কিন্তু ‘না’ লেখা তীর বেরুলে ঐ বছরের জন্য কাজটি স্থগিত রাখতো। পরবর্তী বছর ঐ কাজ সম্পর্কে একই পন্থায় সমাধান চাইতো। এভাবে তীরের ফায়সালাই ছিল তাদের সকল ব্যাপারে চূড়ান্ত ফায়সালা।

আবদুল মুত্তালিব তীর টানায় নিয়োচিত ব্যক্তিকে বললেন, “আমার এই পুত্রদের ব্যাপারে তীর টেনে দেখুন তো।” তিনি তাকে নিজের মানত সম্পর্কেও অবহিত করলো। আবদুল্লাহ ছিলেন ঐ সময় আবদুল মুত্তালিবের কনিষ্ঠতম পুত্র। [পরবর্তী সময়ে জন্মগ্রহণকারী হামযা ও আব্বাস (রা) আবদুল্লাহ্রও ছোট ছিলেন।] তিনি ছিলেন আবদুল মুত্তালিবের সর্বাধিক প্রিয় সন্তান। তাই তিনি ব্যগ্রভাবে লক্ষ্য করছিলের যে, তীর আবদুল্লাহকে পাশ কাটিয়ে যায় কি না। পাশ কাটিয়ে গেলেই তো আবদুল্লাহ বেঁচে যান। তীর টানা লোকটি যখন তীর টানতে উদ্যত হলো, তখন আবদুল মুত্তালিব হুবাল দেবতার কাছে দাঁড়িয়ে  আল্লাহকে ডাকতে লাগলেন। অতঃপর তীর টানা হলে দেখা গেল, তীর আবদুল্লাহর নামেই বেরিয়েছে। অলে আবদুল মুত্তালিব এক হাতে আবদল্লাহকে ও অন্য হাতে বড় একটা ছোরা নিযে তাকে জবাই করার উদ্দেশ্যে ইসাফ ও নায়েলার  (দেব-দেবী) পাশে গেলেন। আসর জমিয়ে বসা কুরাইশ নেতারা তখন উঠে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “ওহে আবদুল মুত্তালিব, ব্যাপার কি?” তিনি তখন উঠে গিয়ে বললেন, “আমার এই ছেলেকে জবাই করবো।” তখন কুরাইশগণ ও তার পুত্ররা একযোগে বলে উঠলো, “উপযুক্ত কারণ ছাড়া কিছেুতেই ওকে জবাই করো না। আর যদি তুমি এভাবে ছেলেকে জবাই করো, তবে অনাগত কাল পর্যন্ত তা চলতে থাকবে। লোকরো নিজ নিজ সন্তানকে এনে বলি দিতে থাকবে এবং মানব বংশ একে একে নিঃশেষ হয়ে যাবে।” আবদুল্লাহর মামাদের গোত্রীয় জনৈক মুগীরা ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উমার ইবনে মাখযুম বললেন, “একেবারে অনন্যোপায় হওয়া ছাড়া এমন কাজে প্রবৃত্ত হয়ো না। যদি আমরা মুক্তিপণ দিয়ে অব্যাহতি দিতে পারি তাহলে আমরা মুক্তিপণ দিতে প্রস্তুত।” পক্ষান্তরে, কুরাইশগণ ও আবদুল মুত্তালিবের পুত্ররা কললো, “তাকে জবাই করো না। বরং ওকে নিয়ে হিজাযে চলে যাও। সেখানে এক মহিলা জ্যোতিষী রয়েছে, তার অধীনে জ্বিন আছে। তাকে জিজ্ঞেস করে জেনে নাও, কাজটা ঠিক হবে কিনা। এরপর আমরা বাধা দেব না। তুমি স্বাধীনভাবে যা খুশী ক’রো। মহিলা যদি জবাই করতে বলে জবাই করো, আর যদি অন্য কোন উপায় বাৎলে দেয় তাহলে সেটাই গ্রহণ করে নিও।” কুরাইশদের উপদেশটাই মেনে নিয়ে আবদুল মুত্তালিব ও তাঁর সহযোগীরা হিজায অভিমুখে রওয়ানা দিলেন। তাঁরা মদীনায় পৌঁছলেন ও খাইবারে সেই মহিলার সাক্ষাৎ পেলেন। আবদুল মুত্তালিব মহিলাকে তাঁর ও তাঁর পুত্রের সকল বৃত্তান্ত খুলে বললেন। মহিলা বললেন, “তোমরা আজ চলে যাও। আমার অনুগত জিন আসুক, তার কাছ থেকে আমি জেনে নিই”। সবাই মহিলার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফিরে আসলেন। বিদায় নিয়ে বেরিয়েই আবদুল মুত্তালিব আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করনৈ। পরদিন সকালে আবার সবাই মহিলার কাছে সমবেত হলেন। মহিলা বললেন, “আমি প্রয়োজনীয় তথ্য জেনেছি। তোমাদের সমাজে মুক্তিপণ কি হারে ধার্য আছে?” তারা জানেিলন, “দশটা উট।” মহিলা বললেন, যাও তোমাদের দেশে ফিরে যাও, অতঃপর তোমাদের সংশ্লিষ্ট মানুষটিকে মূর্তির নিকট হাজির কর ও ১০টা উট উৎসর্গ কর। অতঃপর উট ও তোমাদের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভাগ্য বিধানের জন্য তীর টানো। যদি তোমাদের লোকের নামের বিপক্ষে তীর বেরোয় তাহলে উট আরো দাও, যতক্ষন তোমাদের মনিব খুশী না হন। আর যদি উটের নাতে বেরোয় তাহলে বুঝবে তোমাদের মনিব সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তোমাদের ব্যক্তিটি অব্যহতি পেয়েছে।”

এরপর সবাই মক্কায় চলে গেল। অতঃপর যখন তারা মহিলার কথা অনুযাী মূর্তির নিকট গিয়ে কর্তব্য সমাধায় প্রস্তুত হলো, তখন আবদুল মুত্তালিব দাঁড়িয়ে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতে লাগলেন। অতঃপর তারা আবদুল্লাহকে ও সেই সাথে দশটা উটকে যথারীতি হাজির করলো। আবদুল মুত্তালিব হুবালের নিকট দাঁড়িযে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে লাগলেন। অতঃপর তীর টানা হলো। তীর আবদুল্লাহর নমেই বেরুলে তারা আরো দশটা বৃদ্ধি করলো। ফলো উটের সংখ্যা দাঁড়ালো বিশ। আবদুল মুত্তালিব আবার আল্লাহর কাছে দোয়া করতে ’লাগলেন। পুনরায় তীর টানা হলো এবং এবারও আবদুল্লাহর নামে তীর বেরুলো। ফলে আরো দশটি উট বৃদ্ধি করে ত্রিশ করা হলো এবং আবদুল মুত্তালিব আল্লাহর কাছে দোয়া করতে লাগলেন। এবারও তীর টানা হলে আবদুল্লাহর নামে তীর বেরুলো। পুনরায় আরো দশটা উট বাড়িয়ে চল্লিশ করে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে লাগলেন আবদুল মুত্তালিব। এবার ও তীর টানা হলে আবদুল্লাহর নামে বেরুলো। পুনরায় আরো দশটা উট বাড়িয়ে পঞ্চাশ করা হলা এবং আবদুল মুত্তালিব আল্লাহর কাছে দোয়া করতে লাগলেন। এবারও তীর টানা হলো এবং তা আবদুল্লাহর নামে বেরুলো অতঃপর আরো দশটা উট বাড়িয়ে উটের সংখ্যা ষাট করার পর একই পন্থায় তীর টানা হলে তখনো আবদুল্লাহর নাম বেরুলো।আবার দশটা উট বাড়িয়ে উটের সংখ্যা সত্তর করার পর একই নিয়মে তীর টানা হলে আবারো  হলো। এবারও আবদুল্লাহর নাম বেরুলো। এরপর আরো দশটা উট বাড়িয়ে উটের সংখ্যা আশি করা হলো এবারও আবদুল্লাহর নাম বেরুলো।অতঃপর আবার দশটা উট বাড়িয়ে নব্বই করা হলে আবার আবদুল্লাহর নামে তীর বেরুলো। অতঃপর আরো দশটা উট বাড়িয়ে একশো করার পর আবদুল মুত্তালিব একই নিয়মে আল্লাহর নিকট দোয়া করে তীর টানতে বললে এবার উটের নামে তীর বেরুলো। সমবেত কুরাইশগণ ও অন্য সবাই বলে উঠলো, “হে আবদলু মুত্তালিব, তোমার প্রভু এবার পুরোপুরি সন্তুষ্ট হয়েছেন।”

অনেকের মতে আবদুল মুত্তালিব এরপর বললেন, “আমি আরো তিনবার তীর না টেনে ক্ষান্ত হব না।” ফলে আবদূল্লাহ ও উটের নামে তীর টানা হলো এবং আবদুল মুত্তালিব দাঁড়িয়ে দোয়া করতে লাগলেন। তীর উটের নামে বেরুলো। এভাবে দ্বিতীয়বার এবং তৃতীয়বারেও তীর উটের নামে বেরুলো। অবশেণে ঐ একশো উট কুরবানী করা হলো এবং কুরবানীর পর পশুগুলোকে এমনভাবে ফেলে রাখা হলো যেন কোন মানুষকে তার কাছে যেতে বাধা দেয়া বা ফিরিয়ে দেয়া না হয়।

মহানবীর (স্) আমিনার গর্ভে থাকাকালের ঘটনাবলী

প্রচলিত জনশ্রুতি থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মা আমিনা বিনতে ওয়াহাব বলতেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গর্ভে আসার পর তাঁর কাছে কোন এক অপরিচিত আগন্তুক আসেন এব্ং তাঁকে বলেন, “তুমি যাকে গর্ভে ধারণ করেছ, তিনি এ যুগের মানব জাতির মহানায়ক। তিনি যখন ভূমিষ্ঠ হবেন তখন  তুমি বলবেঃ সকল হিংসুকের অনিষ্ট থেকে এই শিশুকে এক ও অদ্বিতীয় প্রভুর আশ্রয়ে সমর্পণ করছি। অতঃপর তার নাম রাখবে মুহাম্মাদ। [১৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্বে মাত্র তিনজনের এনাম রাখা হযেছে। যথা: (১) কবি ফরাজদাকের দাদার দাদা মুহাম্মাদ ইবনে সুফিয়ান বিন মুজাশি। (২) মুহাম্মাদ ইবনে উহাইহা ইবনে আল জাল্লাহ (৩) মুহাম্মাদ ইবনে হিমরান ইবনে রাবিয়াহ। এ তিনজনের প্রত্যেকের পিতা জানতে পারেন যে, আল্লাহর এক রাসূলের আবির্ভাবের সময় ঘরিয়ে এসেছে এবং তিনি হিজাযে জন্মগ্রহণ করবেন। লোকমুখে একথা শুনে তাদের প্রত্যকে আকাক্সক্ষা জাগে যে, তিনি যেন তারই সন্তান হন। একবার তারা আসমানী কিতাবের  জ্ঞান রাখে এমন এক বাদশাহর কাছে গমন করেন। তিনি তাদেরকে যানান যে, মাহাম্মাদ নামে একজন নবঢর আবির্ভাব ঘটতে যাচ্ছে। এই সময় তাঁরা বাড়ীতে নিজ নিজ স্ত্রীকে গর্ভবতী দেখে এসেছিলেন। ফলে প্রত্যেকেই তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নেন যে, তাঁদের পুত্র সন্তান ভূমিষ্ট হলে তার নাম রাখবেন মুহাম্মাদ। এই সিধান্ত অনুসারেই তাঁরা তাঁদের তিন ছেলের নাম রেখেছিলেন।

তিনি গর্ভে থাকাকালে আমিনা স্বপ্নে দেখেন যে, তাঁর ভেতর থেকে এমন একটা আলোকরশ্মি বেরুলো যা দিয়ে তিনি সিরীয় ভূখ-ের বুসরার প্রাসাদসমূহ দেখতে পেলেন।

এরপর তিনি মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থাতেই অল্পদিনের মধ্যে তাঁর পিতা আবদুল্লাহ ইনতিকাল করেন।

রাসূলুল্লাহর (স) জন্ম

‘আমুল ফীল অর্থাৎ হস্তীবাহিনী নিয়ে আবরাহার কা’বা অভিযানের ঘটনা যে বছর ঘটে, সেই বছরের রবিউল আউয়াল মানের দ্বাদশ রজনী অতিক্রান্ত হবার শুভ মুহূর্তে সোমবারে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্মগ্রহণ করেন।

কায়েস ইবনে মাখরামা থেকে বণিৃত, তিনি কলেছেন, “আমি ও রাসূলুল্লাহ (সা) আবরাহার হামলার বছর জন্মগ্রহণ করি। তাই আমরা সমবয়সী”

হাসসান ইবনে সাবিত বলেন,

“আমি তখন সাত আট বছরের বালক হলেও বেশ শক্তিশালী ও লম্বা হয়ে উঠেছি। যা শুনতাম তা বুঝতে পারার ক্ষমতা তখন হয়েছে। হঠাৎ শুনতে পেলাম জনৈক ইহুদী ইয়াসরিবের (মদীনার) একটা দুর্গের ওপর উঠে উচ্চস্বরে ওহে ইহুদী সমাজ!’ বলে চিৎকার করে উঠলো। লোকেরা তার চারপাশে জমায়েত হয়ে বললো, “তেমার কি  হয়েছে?”আজ রাতে আমাদের জন্মে সেই নক্ষত্র উদিত হয়েছে।”

অতঃপর হয়রত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভূমিষ্ঠ হলে তাঁর মা আমিনা তাঁর দাদা আবুদল মুত্তালিবের নিকট এই বলে খবর পাঠালেন যে, “আপনার এক পৌত্র জন্মেছে। আসুন, তাঁকে দেখুন।” আবদুল মুত্তালিব এলেন, এসে তাঁকে দেখলেন। এই সময় আমিনা তাঁর গর্ভকালীন সময়ে দেখা স্বপ্নের কথা, নবজাতক সম্পর্কে যা তাঁকে বলা হয়েছে এবং তাঁর যে নাম রাখতে বলা হয়েছে তা সব জানালেন। অতঃপর আবদুল মুত্তলিব তাঁকে নিয়ে কা’বাঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন এবং শিশুকে মায়ের কাছে দিয়ে ধাত্রীর সন্ধান করতে লাগলেন। অবশেষে বনু সা’দ ইবনে বাক্রের আবু যুয়াইবের কন্যা হালিমাকে ধাত্রী হিসেবে পাওয়া গেল।

 

হালীমার কথা

হালীমা বর্ননা করেছেন যে, তিনি তাঁর স্বামী ও একটি দুগ্ধপোষ্য পুত্রকে সাথে নিয়ে বনু সা’দের একদল মহিলার সাথে দুধ-শিশুর সন্ধানে বের হন। ঐ মহিলারা সকলেই দুধ-শিশুর সন্ধানে ব্যাপৃত ছিল। বছরটি ছিল ঘোর অজন্মার। আমরা একেবারেই সকলেই দুধ-শিশুর সন্ধানে ব্যাপৃত ছিল। বছরটি ছিল ঘোর অজন্মার। আমরা একোরেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলাম। আমি একটি সাদা গাধার পিঠে সওয়ার হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের সাথে ছিল আমাদের বয়স্ক উটটি। সেটি এক ফোটা দুধও দিচ্ছিল না। আমাদের যে শিশু-সন্তানটি সাথে ছিল ক্ষুধার জ্বালায় সে এত কাঁদছিল যে, তার দরুন আমরা সবাই বিনিদ্র রজনী কাটাচ্ছিলাম। তার ক্ষুধা নিবৃত্ত করার মত দুধ আমার বুকেও ছিল না, উষ্ট্রীর পালানেও ছিল না। বৃষ্টি ও স্বাচ্ছন্দ্য লাভের আশায় আমর উন্মুখ হযে ছিলাম। এ অবস্থায় আমি নিজের গাধাটার পিঠে চড়ে বেড়িয়ে পড়লাম। পথ ছিল দীর্ঘ এবং এক নাগাড়ে চলতে চলতে আমাদের গোটা কফিলা ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়লো। অবশেষে আমরা দুধ-শিশুর খোঁজে মক্কায় উপনীত হলাম। আমাদের প্রত্যেককেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গ্রহণ করতে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু যখনই বলা হয় যে, তিনি পিতৃহীন, তখন প্রত্যেক্ েঅস্বীকার করে বসে। কারণ আমরা প্রত্যেকেই শিশুর পিতার কাছ থেকে উত্তম পারিতোষিক প্রত্রাশা করতাম। কারণ আমরা প্রত্যেকেই শিশুর পিতার কাছ থেকে উত্তম পারিতোষিক প্রত্যাশা করতাম। আমরা প্রত্যেকেই বলাবলি করতাম, “পিতৃতীন শিশু! শিশুর মা আর দাদা কিইবা পারিতোষিক দিতে পারবে?” এ কারণে আমরা সবাই তাঁকে গ্রহণ করতে অপছন্দ করছিলাম। ইতিমধ্যে আমার সাথে আগত সকল মহিলাই একটা না একটা দুধ-শিশু পেয়ে গেল। পেলাম না শুধু আমি। খালি হাতেই ফিরে যাবো বলে যখন মনন্থির করেছি, তখন আমি আমার স্বামীকে বললাম, “খোদার কসম, এতগুলো সহযাত্রীর সাথে শূন্য হাতে ফিরে যেতে আমার মোটেই ভাল লাগছে না। খোদার কসম, ঐ ইয়াতীম শিশুটার আছে আমি যাবোই এবং ওকেই নেব।” আমার স্বামী বকললেন, “নিতে পার। হয়তো আল্লাহ ওর ভেতরই আমাদের জন্য কল্যাণ রেখেছেন। ”

হালীমা বলেন, অতঃপর আমি গেলাম ও ইয়াতীম শিশুকে নিয়ে এলাম। আমি শুধু অন্য শিশু না পাওয়ার কারণেই তাকে নিতে বাধ্য হয়েছিলাম তাকে নিয়ে কাফিলার কাছে চলে গেলাম। তাকে যখন কোলে নিলাম তখন আমার স্তন দু’টি দুধে অর্তি হয়ে গেল এবং তা থেকে শিশু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেট ভরে দুধ খেলেন। তার দুধভাইও পেট ভরে দুধ খেলো। অতঃপর দু’জনেই ঘুমিয়ে পড়লো। অথচ ইতিপূর্বে তার জ্বালায় আমরা ঘুমাতে পারতাম না। আমার স্বামী আমাদের সেই উষ্ট্রীটার কাছে যেতেই দেখতে পেলেন, সেটির পালানও দাধে ভত্যি। অতঃপর তিনি প্রচুর পরিমানে দুধ দোহন করলেন এবং আমরা দু’জনে তৃপ্ত হয়ে দুধ পান করলাম। এরপর বেশ ভালোভাবেই আমাদের রাতটা কাটলো।

সকাল বেলা আমার স্বামী বললেন, “হালীমা, জেনে রেখো, তুমি এক মহাবল্যাণময় শিশু এনেছ।” আমি বললাম, “বাস্তবিকই আমারও তাই মনে হয়।”

এরপর আমরা রওয়ানা দিলাম। আমি গাধার পিঠে সওয়ার হলাম। আমার গাধা গোটা কাফিলাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চললো। কাফিলার কারো গাধাই তার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে সক্ষম হলোনা। আমার সহযাত্রী মহিলারা বরতে লাগলো, “হে আবু যুয়াইবের কল্যা, একটু দাঁড়াও আবং আমাদের জন্য অপেক্ষা কর। এটা কি তোমার সেই গাধা নয় যেটার পিঠে চড়ে তুমি এনছিলে?” আমি তাদেরকে বললাম, “হা্রাঁ, সেইটাই তো।” তারা বললো, “আল্লাহর কসম, এখন এর অবস্থাই পাল্টে গেছে।”

শেষ পর্যন্ত আমরা বনি সা’দ গোত্রে আমাদের নিজ নিজ গৃহে এসে হাজির হলাম। আমাদের ঐ এলাকাটার মত খরাপীড়িত এলাকা দুনিয়ার আর কোথাও ছিল বলে আমার জানা ছিল না। শিশু মাহাম্মাদকে নিয়ে বাড়ী পৌঁছার পরে প্রতিদিন আমাদের ছাগল ভেড়াগুলো খেয়ে পরিতৃপ্ত এবং পালান ভর্তি দুধ নিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে আসতো। আমরা তা যথামত দোহন করে পান করতে লাগলাম, অথচ অন্যান্য লোকেরা এক কাতরা দুধ দোহাতে পাতো না। তাদের ছাগল-ভেড়ার পালানে এক ফোঁটা দুধও পেতো না। এমনকি আমাদের গোত্রের লোকেরা রাখাদের বলতে লাগলো, “আবু যুরাইবের কন্যার (হালীমা) রাখল যেখানে মেষ চরায় সেখানে নিয়ে চড়াবে।” রাখালরা আমার (হালীমার) মেষ চড়ানো সত্বেও মেষপাল ক্ষুধার্ত আবস্থায় ফিরে আসতো। এভাবে ক্রমেই আমার সংসার প্রাচুর্য ও সুখ-সমৃদ্ধিমে ভরে উঠতে লাগলো। এ অবস্থার ভেতর দিয়েই দু’বছর অতি বাহিত হলো এবং আমি শিশু মুহাম্মাদের (সা) দুধ ছাড়িয়ে দলাম। অন্যান্য ছেলেদের চেয়ে দ্রুত গতিতে তিনি বড় হতে লাগলেন। দু’বছর  বয়স হতেই তিনি বেশ চটপটে ও নাদুসনুদুস বালকে পরিনত হলেন। আমরা তাঁকে তাঁর মার কাছে নিয়ে গেলাম। তবে আমরা তাঁকে আমাদের কাছে রাখতেই বেশী আগ্রহী ছিলাম। আরণ তাঁর আসার পর থেকে আমর াবিপুল কল্যাণের অধিকারী হয়েছিলাম। তাঁর মাকে আমি বললাম, “আপনি যদি এই ছেলেকে আমার কাছে আরো হৃষ্টপুষ্ট হওয়া পর্যন্ত থাকতে দিতেন তাহলেই ভালো হতো। আমার আশংকা হয়, মক্কার রেগ-ব্যাধিতে বা মহামারিতে তিনি আক্রান্ত হতে পারেন।” শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁকে আমাদের সাথে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন।

আমরা তাঁকে নিয়ে ফিরে এলাম। এর মাত্র কয়েক মাস পরে একদিন তিনি তাঁর দুধভাই-এর সাথে আমাদের বাড়ীর পেছনের মাঠে মেষ শাবক চরাচ্ছিলেন। এমন সময়  তাঁর ভাই দৌড়ে এলো এবং আমাকে ও তাঁর পিতাকে বললো,“আমার ঐ কুরাইশী ভাইকে সাদা কাপড় পরিহিত দুটো লোক এসে ধরে শুইেেয় দিয়ে পেট চিরে ফেলেছে এবং পেটের সবকিছু বের করে নাড়াচড়া করছে।”

আমি ও তার পিতা-দুজনেই তাঁকে পড়িয়ে ধরলাম  এবং বললাম, “বাবা তোমার কী হয়েছে?” তিনি বললেন, “আমার কাছে সাদা কাপড় পরা দু’জন লোক এসেছিলো। তারা আমাকে শুইয়ে দিয়ে আমার পেট চিরেছে। তারপর কি যেন একটা জিনিস খুঁজেছে, আমি জানি না তা কী?”

এরপর আমরা মুহাম্মদকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিয়ে নেজেদের বাড়ীতে ফিরলাম। আমার স্বামী বললেন, “হালীমা, আমার আশংকা, এই ছেলের ওপর কোন কিছুর আছর হয়েছে। কাজেই কোন ক্ষতি হওয়ার আগেই তাঁকে তাঁর পরিবারের কাছে পৌঁছে দাও।”

যথার্থই আমরা তাঁকে কাঁর মার কাছে নিয়ে গেলাম। তাঁর মা বললেন, “ধাত্রী বোন, তুমি তো ওকে কাছে রাখতে খুব উদগ্রীব ছিলে। কি হয়েছে যে, একে নিয়ে এলে?” আমি বললাম, “আল্লাহ আমাকে দু’টি ছেলের দায়িত্ব দিয়েছেন। আমার যা করণীয় ছিল তা আমি করেছি। কোন অঘটন ঘটবে বলে আমার আশংকা হয়। এ নিয়ে আমার চিন্তার অবধি নেই। তাই আপনার ছেলেকে ভালোয় ভালোয় আপনার হাতে তুলে দিলাম।” আমিনা বললেন, “তুমি যা বলছো তা প্রকৃত ঘটনা নয়। আসল ব্যাপারটা কি আমাকে সত্য করে বলো।” এভাকে পুরো ঘটনা খুলে না বলা পর্যন্ত  তিনি আমাকে ছাড়লেন না। ঘটনা শুনে আমিনা বললেন, “তুমি কি তাহলে মনে করছো ওকে ভূতে ধরেছ্ ে”আমি বললাম, “হ্যাঁ।’ তিনি বললেন, “ওকে যখন গর্ভে ধারণ করেছি তখন স্বপ্নে দেখি, আমার দেহ থেকে একটা জ্যোতি বেরিয়ে এলো এবং তার প্রভায় সিরীয় ভুখ-ের বুসরার প্রসাদগুলে আলোকিত হয়ে গেল। অতঃপর সে গর্ভে বড় হতে লাগলো। আল্লাহর কসম, এত হালকা ও বহজ গর্ভধারণ আমি আর কখনো দেখিনি। যখন ওকে প্রসব করলাম তখন মটিতে হাত রাখা ও আকাশের দিকে মাথা উঁচু করা অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হলো। তুমি ওকে রেখে নির্দ্বিধায় চলে যেতে পার।”

বক্ষ বিদারনের ঘটনা

ইবনে ইসহাক বলেন,

সাওর ইবনে ইয়াযীদ কতিপয় বিদ্বান ব্যক্তির নিকট থেকে (আমার ধারণা, একমাত্র খালিদ বিন মা’দান আল কালয়ীর নিকট থেকেই) বর্ণনা করেছেন যে, কতিপয় সাহাবী একরার হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওযাসাল্লামকে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আপনার নিজের সম্পর্কে আমাদেরকে কিছু বলুন।” তিনি বললেন, “হ্যাঁ, শোনো। আমি পিতা ইবরাহীমের দোয়ার ফল এবং ভাই ঈসার সুসংবাদের পরিণতি। আমি গর্ভে আসার পর আমার মা স্বপ্নে দেখেন যে, তাঁর মধ্য এথকে একটা জ্যোতি বেরুলো যা দ্বারা সিরিয়ার প্রসাদসমূহ আলোকিত হয়ে গেলো। আর বনু স’দ ইবনে বাক্র গোত্রে আমি ধাত্রীয় ােলে লালিত-পালিত হই। এই সময় একদিন আমার এক দুধভাই-এর সাথে আমেিদর (ধাত্রী মাতা হালীমার) বাড়ীর পেছনে মেষ চরাতে যাই। তখন সাদা কাপড় পরা দু’জন লোক আমার কাছে আসে। তাদের কাছে একটা সোনার তশতরী ভর্তি বরফ ছিল। তারা আমাকে ধরে আমার পেট চিড়লো। অতঃপর আমার হৃদপি- বের করে তাও চিরলো এবং তা থেকে এক ফোটা কালো জমাট রক্ত বের করে তা ফেলে দিল। তারপর ঐ বরফ দিয়ে আমার পেট ও হৃদপি- ধুয়ে পরিষ্কার করে দিল। অতঃপর তাদের একজন অপরজনকে বললো : মুহাম্মাদকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওযাসাল্লাম) তাঁর উম্মাতের দশজনের সাথে ওজন কর। সে আমাকে পরিমাপ করলো এবং আমি দশজনের চাইতে বেশী হলাম অতঃপর সে আবার বললো : তাঁকে তাঁর উম্মাতের একশে জনের সাথে ওজন কর। আমি একশো জনের চাইতেও বেশী হলাম। অতঃপর সে আবার বললো :তাঁকে তাঁর উম্মাতের এক হাজার জনের সাথে ওজন কর। আমাকে এক হাজার জনের সাথে ওজন করলে আমি এবারও ওজনে তাদের চাইতে বেশী হলাম। অতঃপর সে বললো : রেখে দাও, আল্লাহর কসম, তাঁকে যদি তাঁর সমগ্র উম্মাতের সাথেও ওজন করা হয় তাহলেও তিনিই তাঁদের সবার চাইতে ওজনে বেশী হবেন।”

দাদার অভিভাবকত্বে

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওযাসাল্লাম তাঁর মা আমিন বিনতে ওযাহাব ও দাদা আবদুর মুত্তালিব ইবনে হাশিমের জীবদ্দশায়ও আল্লাহর তদারক ও তত্ত্বাবধানে ছিলেন। এই সময় আল্লাহ পতি দ্রুত তাঁর শারীরিক প্রবৃদ্ধি দান করেন, যাতে আল্লাহর ইস্পিত অলৌকিকত্ব তাঁর মাধ্যমে প্রকাশ পায়। যখন তাঁর বয়স হয় ছয় বছর, তখন মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী ‘আবওয়া’ নামক স্থানে তাঁর মাতা ইনতিকাল করেন। সেখানে শিশু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওযাসাল্লামকে সাথে নিয়ে তিনি বনী আদ ইবনে নাজ্জার গোত্রে মুহাম্মাদের (সা) মামাদের বাড়ীতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। মক্কা অভিমুখে প্রত্যাবর্তনের সময় তিনি ইনতিকাল করেন। মায়ের ইনতিকালের পর হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওযাসাল্লাম দাদা আবদুল মুত্তালিবের একক তত্ত্বাবধানে লালিত পালিত হতে থাকেন। আবদুল মুত্তালিবের জন্য কা’বা শরীফের ছায়ায় চাদর বিছানো হতো। আবদুল মুত্তালিব সেখানে উপস্থিত না হওযা পর্যন্ত ঐ চাদরের আশে পাশে বসে থাকতো তাঁর পুত্র পৌত্ররা আবদুল মুত্তালিবের সম্মানার্থে কেই তাঁর ওপর বসতো না। কিন্তু দৃঢ়চেতা কিশোর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওযাসাল্লাম এসেই বিছানার ওপর গিয়ে বসে পড়তেন। তাঁর চাচা তাঁকে ধরে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করতেন। তা দেখে আবদুল মুত্তালিব বলতেন, “তোমরা আমার পৌত্রকে বাধা দিও না। আল্লাহর কসম, সে এক অসাধারন ছেলে।” অতঃপর তাঁকে সাথে নিয়ে চাদরের ওপর বসতেন এবং তাঁর পিঠে হাত বুলিয়ে আদার করতেন। তাঁর সব কাজই তাঁর ভাল লাগতো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বযস আট  বছর পূর্ণ হলে আবদুল মুত্তালিব মারা যান। আবরাহার হস্তী বাহিনী নিয়ে কা’বা শরীফ  আক্রমণ করার আট বছর পর তিনি মারা যান।

চাচা আবু তালিবের অভিভাবকত্বে

আবদুল মুত্তালিবের তিরোধানের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওযাসাল্লাম তাঁর চাচা আবু তালিবের কাছে লালিত-পালিত হতে লাগলেন। তৎকালে বনু লেহাব গোত্রের এক ব্যক্তি মানুষের দৈহিক লক্ষণসমূহ দেখে ভাগ্য বিচার করতো। সে যখন মক্কায় আসতো, কুরাইশরা তাদের ছেলেদের নিয়ে তার কাছে ভীড় জমাতো। সে ছেলেদের শরীরের ওপরে নজর বুলিয়ে তাদের ভাগ্য বলতো। অন্যদের সাথে আবু তালিবও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে উক্ত গণকের কাছে গেলেন। গণক তাঁর দিকে তাকালো এবং পরক্ষণেই যেন এবটু ভাবতে আরম্ভ করলো। ক্ষণিকের জন্য সে বালক মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওযাসাল্লামের কথা এড়িয়ে গেলো। কিছুক্ষণ পর বললো, “এই বালককে নিয়ে একটু বিশেষভাবে মনোযোগ দিতে হবে।” আবু তালিব বালক মুহাম্মাদের প্রতি গণকের অধিক মনোযোগ লক্ষ্য করে তাঁকে কৌশলে সরিয়ে দিলেন। এতে গণক বললো, “তোমাদের এ কি কা-! বালকটাকে আমার কাছে আবার  নিয়ে এসো। আল্লাহর কসম, এ এক অসাধারণ বালক।”

পাদ্রী বাহীরার ঘটনা

কিছুদিন পরের ঘটনা। আবু তালিব এক কাফিলার সাথে সিরিয়ায় রওয়ানা হলেন বাণিজ্যোপক্ষে। যাত্রার প্রক্কালে বালক মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওযাসাল্লাম) তাঁর সাথে যাওয়ার আবদার করলেন। স্নেবিগলিত চাচা তাঁর আবদার উপেক্ষা করতে পারলেন না। তিনি বললেন, “আমি তাঁকে সাথে নিয়ে যাবো, তাঁকে রেখে আমি কক্ষণও কোথাও যাবো না।”

আবু তালিব তাঁকে সাথে নিয়ে সফরে বেরুলেন। কাফিলা বুসরা এলাকায় পৌঁছলে যাত্রবিরতি করলো। সেখানে ছিলেন বাহীরা নামে এক খৃস্টান পাদ্রী। এক গীর্জায় তিনি থাকতেন। ঈসায়ী ধর্ম সম্পর্কে তিনি ছিলেন খুবই পারদর্শী। দীর্ঘকাল ব্যাপী ঐ গীর্জায় একখানা আসমানী কিতাব রক্ষিত ছিলো। পুরুষানুক্রমে ঐ জ্ঞানের উরাধিকার চলে আসছিলো। বাহীরর কাছ দিয়ে ইতিপূর্বে তারা প্রায়ই আসা-যাওয়া করতেন। কিন্তু তিনি কারো সামনে বেরুতেন না বা কারো সাথে কথা বলতেন না। কিন্তু এই বছর যখন কুরাইশদের কাফিলা আবু তালিব ও বালক মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামসহ ঐ স্থানে বাহীরার গীর্জার পাশে যাত্রাবিরতি করলো তখন বাহীরা তাদের জন্য প্রচুর খাদ্যের ব্যবস্থা করলেন।

কথিত আছে বাহীরা তাঁর গীর্জায় বসেই একটা আশ্চর্য ব্যাপার দেখতে পান। তিনি কাফিলার এগিয়ে আসার সময় দেখেন যে, সমগ্র কাফিলার মধ্যে একমাত্র বালক মৃহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেই আকাশ থেকে একখ- মেঘ ছায়া দিয়ে চলেছে। অতঃপর তারা একটা গাছের ছায়ায় যাত্রাবিরতি করলে মেঘ এবং সেই গাছের ডালপালা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ঝুঁকে ছায়া দিতে লাগলো। এ দৃশ্য দেখে বাহীরা গীর্জা থেকে বেরিয়ে আসলেন এবং লোক পাঠিয়ে কাফিলার লোকদেরকে বলে পাঠালেন, “হে কুরাইশ বনিকগণ, আমি আপনাদের জন্য খাওয়ার বন্দোবন্ত করেছি। আপনাদের মধ্যে ছোটবড় দাস বা মনিব সবাইকে এসে খাদ্য গ্রহণ করতে অনুরোধ করছি।” কুরাইশদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি বললো, হে বাহীরা, আজকে আপনি নতুন মহিমায় ম-িত হয়েছেন। ইতপূর্বে আমরা বহুবার আপনার নিকট দিয়ে যাতায়াত কেরছি। কিন্তু কখনো আপনি এরূপ আতিথেয়তা দেখাননি। আজকে আপনার এরূপ করার কারণ কি?” বাহীরা বললেন, “সে কথা ঠিকই। আগে আমি কখনো এরূপ করিনি। তবে আজ আপনারা আমার অতিথি। তাই মনের ইচ্ছা আপনাদের যত্ন করি,আপনাদের জন্য খাবার তৈরী করি এবং আপনার সকলেই খাবার গ্রহণ করুন।”

অতঃপর সকলেই খেতে গেলেন। কিন্তু অল্পবয়স্ক হবার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফিলার বহরের সাথে গাছের ছায়ায় বনে রইলেন। খাওয়ার জন্য সমবেত কুরাইশী বণিকদের সবাইকে ভালভাবে পরখ করে বাহীরা সেই পরিচিত হাব-ভাব ও চালচনের কোন লক্ষণ দেখতে পেলে না, যা বালক মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে তিনি দেখেছিলেন। তাই তিনি বললেন, হে কুরাইশী অতিথিবৃন্দদ, আপনাদের কেউই যেন আমার খাবার গ্রহণ থেকে বঞ্চিত না থকেন।” তারা বললেন, “হে বাহীরা, যারা এখনে আসার মত তারা সবাই এসেছেন। শুধুমাত্র একটি বালক কাফিলার বহরে রয়েছে। সে কাফিলার মধে কনিষ্ঠতম।” বাহীরা বললেন, “না, তাঁকে বাদ রাখবেন না। তাঁকেও ডাকুন। সেও আপনাদের সাথে খাবার গ্রহণ করুক।” জনৈক কুরাইশী বললো, “লাত-উয্যার শপথ, আবদুল্লাহ ইবনে আবুদল মুত্তালিবের ছেলে আমাদের সাথে থাকবে অথচ আমাদের সাথে খাবার গ্রহণ করবে না। এটা হতে পারে না। এটা আমাদের জন্য নিন্দনীয় ব্যাপার।” একথা বলেই সে উঠে গিয়ে বালক মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাকে কোলে করে নিয়ে এলো এবং সবার সাথে খাবারের বৈঠকে বসিয়ে দিলো। এই সময় বাহীরা তাঁর সমগ্র অবয়ব গভীরভাবে দেখতে লাগলেন এবং দেহের বিশিষ্ট নিদর্শনগুলো পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। তাঁর বিবরণ তিনি পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবে পেয়েছেন। সমাগত অতিথিদের সকলের খাওয়া শেষ হলে এবং তারা এক এক করে সবাই বেরিয়ে গেলে বাহীরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললেন, “হে বৎস, আমি তোমাক লাত ও উয্যার দোহাই দিয়ে অনুরোধ করছি, আমি যা জিজ্ঞেস করবো তুমি তার জবাব দেবে।” বাহীরা লাত ও উয্যার দোহাই দিলেন এই জন্য যে, তিনি কুরাইশদেরকে পরস্পর কথাবার্তা বলার সময় ঐ দুই মূর্তির শপথ করতে শুনেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আমাকে লাত-উয্যার দোহাই দিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না। আল্লাহর শপথ, আমি ঐ দুই দেবতাকে সর্বাধিক ঘৃণা করি।” বাহীরা বললেন, “আচ্ছা তবে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, যা জিজ্ঞেস করবো তার জবাব দেবে।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “বেশ, কি কি জানতে চান বলুন।” অতঃপর বাহীরা তাঁকে নানা কথা জিজ্ঞেস করতে লাগলেন। তাঁর ঘুমন্ত অবস্থার কথা, তাঁর দেহের গঠন-প্রকৃতি ও অন্যান্য অবস্থার কথা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সব প্রশ্নের যা জবাব দিলেন, তা বাহীরার জানা তথ্যের সাথে হুবহু মিলে গেল। তারপর তিনি তাঁর পিঠ দেখলেন। পিঠে দুই স্কন্ধের মধ্যবর্তী স্থানে নবুওয়াতের মোহর অংকিত দেখতে পেলেন। মোহর অবিকল সেই জায়গায় দেখতে পেলেন যেখানে বাহীরার পড়া আসমানী কিতাবের বর্ণনা অনুসারে থাকার কথা ছিল।

এসব করার পরে বাহীরা আবু তালিবকে জিজ্ঞেস করলেন, “বালকটি আপনার কে?” তিনি বললেন, “আমার ছেলে।” বাহীরা বললেন, “সে আপনার ছেলে নয়। এই ছেলের পিতা জীবিত থাকতে পারে না।” আবু তালিব বললেন,“বালকটি আমার ভ্রাতুষ্পুত্র।” বাহীরা বললেন, “ওর পিতার কি হয়েছিল?” আবু তালিব বললেন, “এই ছেলে মায়ের পেটে থাকতেই তার পিতা মারা গেছে।” বাহীরা বললেন, “এই ছেলে মায়ের পেটে থাকতেই তার পিতা মারা গেছে।” বাহরিা বললেন, “ঠিক, এ রকম হওয়ার কথা। আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রকে নিয়ে গৃহে ফিরে যান। খবরদার, ইয়াহুদীদের থেকে ওকে সাবধানে রাখবেন। আল্লাহর কসম, তারা যদি এই বালককে দেখতে পায় এবং আমি তার যে নিদর্শন দেখে চিনেছি তা যদি চিনতে পারে তাহলে তারা ওর ক্ষতি সাধনের চেষ্টা করবে। কেননা আপনার এ ভ্রাতৃষ্পুত্র অচিরেই এক মহা মহামানব হিসাবে আবির্ভূত হবেন।”অতঃপর তাঁকে নিয়ে তিনি তাড়াতাড়ি স্বদেশে ফিরে গেলেন।

ফিজারের যুদ্ধ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বিশ বছরের তরুন, তখন ফিজার যুদ্ধ সংঘঠিত হয়। ফিজার যুদ্ধ নামকরনের কারণ এই যে, এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কিনানা ও কাইস ঈলান গোত্রদ্বয়ের উভয়েই তাদের পরস্পরের নিষিদ্ধ জিনিসসমূহ লংঘন করেছিল। কুরাইশ ও কিনানার যৌথ বাহিনীর নেতা ছিলেন হারব ইবনে উমাইয়া। দিনের প্রথমাংশে যুদ্ধে কাইস কিনানাকে পরাজিত করে। কিন্তু দিনের মধ্যাহ্ন ভাগে কিনানা জয়ী হয়।[১৫.ইবনে হিশাম উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিজার যুদ্ধে কয়েকদিন অংশগ্রহণ করেন। তাঁর চাচারা তাঁকে সঙ্গে করে রণাঙ্গনে নিয়ে গিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “আমি শত্রুদের নিক্ষিপ্ত তীর ও বর্শাগুলো প্রতিহত করতাম এবয় তা কুড়িয়ে এনে চাচাদের হাতে তুলে দিতাম।” এটা ছিল সর্বশেষ ফিজার যুদ্ধ। এটি ফিজার আল-বারাদ নামে খ্যাত। ইতপূর্বে আরো তিনটি ফিজার যুদ্ধ সংগটিত হয়েছিল। প্রথমটি কিনানা ও হাওয়াযিন গোত্রের মধ্যে, দ্বিতীয়টি কুরাইশ ও হাওয়াযিন গোত্রের মধ্যে এবং তৃতীয়টি কিনানা ও হাওয়াযিন গোত্রের মধ্যে।]

খাদীজা রাদিয়ল্লাহ আনহার সাথে বিয়ে

খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ ছিলেন তৎকালীন আরবের একজন সম্ভ্রান্ত ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মহিলা। তিনি লোকজনকে নির্দিষ্ট বেতনে ও লভ্যাংশের ভিত্তিতে ব্যবসায়ে নিয়োগ করতেন। ব্যবসায়ী গোত্র হিসেবে কুরাইশদের নাম-ডাক ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা ও চারিত্রিক মহত্ত্বের কথা জানতে পেরে তিনি তাঁর কাছে লোক পাঠিয়ে তাঁর পণ্যসামগ্যী নিয়ে সিরিয়া যাওয়ার প্রস্তাব দিয়ে বললেন যে, এজন্য তিনি অন্যদেরকে যা গিয়ে থাকেন তার চেয়ে উত্তম সম্মানী তাঁকে দেবেন। মাইসারাহ নামক এক কিশোরকেও তাঁর সাহায্যের জন্য সঙ্গে দিতে চাইলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই প্রস্তাব গ্রহণ করলেন এবং খাদীজার পণ্য সামগ্রী ও দাস মাইসারাহকে সাথে নিয়ে সিরিয়ায় রওয়ানা হলেন। অনতিবিলম্বে তিনি সিরিয়ায় গিয়ে পৌঁছলেন।

সিরিয়ায় পৌঁছে তিনি জনৈক ধর্মযাজকের গীর্জার নিকটবর্তী এক গাছের নীচে বিশ্রাম করলেন। ধর্মযাজক মাইসারাহকে জিজ্ঞেস করলেন, “গাছটির নীচে যিনি বিশ্রাম নিচ্ছেন তিনি কে?” মাইসারাহ বললেন, “তিনি হারামের অধিবাসী জনৈক কুরাইশ বংশীয় ব্যক্তি।” ধর্মযাজক কললেন, “এই গাছের নীচে নবী ছাড়া আর কেউ কখনো বিশ্রাম নেয়নি!”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর আনীত পণ্য বিক্রি করে দিলেন এবং নতুন কিছু জিনিস ক্রয় করলেন। অতঃপর তিনি মক্কা অভিমুখে রওনা হলেন। পথে যেখানেই দুপুর হয় এবং প্রচ- রৌদ্র ওঠে, মাইসারাহ দেখতে পায় যে, দু’জন ফিরিশতা মুহাম্মাদকে ছায়া দিয়ে রৌদ্র থেকে রক্ষা করেছে এবং তিনি উটের পিঠে সওয়ার হয়ে এগিয়ে চলেছেন। মক্কায় পৌঁছে তিনি খাদীজাকে তাঁর ক্রয় করা পণ্যদ্রব্য বুঝিয়ে দিলেন। খাদীজা ঐ মাল বিক্রি করে প্রয় দ্বিগুণ মুনাফা লাভ করলেন। মাইসারাহ খাদীজাকের যাজকের বক্তব্য ও নবীকে (সাঃ) দুই ফিরিশতার ছায়াদানের বিষয় অবহিত কললেন। খাদীজা ছিলেন দৃঢ় ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন বুদ্ধিমতি ও সম্ভ্রান্ত মহিলা।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহত্ত্ব ও সততার সাথে পরিচিত হওয়া তার জন্য একটা অতিরিক্ত সৌভাগ্য রূপে বিবেচিত হলো, যা নিছক আল্লাহর ইচ্ছাক্রমেই তিনি লাভ করলেন। মাইসারাহ কাছে উক্ত অলৌকিক ঘটনার কথা শুনে খাদীজা লোক পাঠিয়ে তাঁকে বললেন, “ভাই, আপনাদের গোত্রের মধ্যে আপনার যে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান, যে আত্নীয়তার বন্ধন এবং সর্বোপরি আপনার বিশ্বস্ততা, চরিত্রমাধুর্য ও সত্যবাদিতার যে সুনাম রয়েছে, তাতে আমি মুগ্ধ এবং অভিভূত।” এই কথা বলে খাদীজা তাঁকে বিয়ে করার প্রন্তাব দেন। কুরাইশদের মধ্যে খাদীজা ছিলেন সর্বাপেক্ষা অভিজাত বংশীয়া, সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সম্ভ্রান্ত এবং অতিশয় ধনাঢ্য মহিলা। এ কারণে সম্ভব হলে তাঁর গোত্রের সকলেই তাঁকে বিয়ে করার অভিলাষ পোষণ করতো।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদীজার এ প্রস্তাব চাচাদেরকে জানালেন। চাচা হামযা খাদীজার পিতা খুয়াইলিদ ইবনে আসাদের (ইবনে আবদুল উযযা ইবনে কুসাই ইবনে কিলাব ইবনে মুররাহ ইবনে কা’ব ইবনে লুয়াই) সাথে দেখা করে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিলেন এবং বিয়ে সম্পন্ন হলো।[১৬. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মোহরানা হিসেবে খাদীজাকে ২০ টি উট দিয়েছিলেন। তিনিই প্রথম স্ত্রী এবং তাঁর জীবদ্দশায় তিনি আর কোন বিয়ে করেননি।]

খাদীজার গর্ভে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একমাত্র ইবরাহীম ছাড়া সব সন্তান জন্মে তাঁরা হলেন : কানিম, তাহির তাইয়েব, যয়নব, উম্মে কুলসুম ও ফাতিমা। কাসিমের নামানুসারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবুল কাসিম নামেও খ্যাত হন। কাসিম ও তাহির জাহেলিাতের যুগেই মারা যান। কিন্তু মেয়েরা সবাই ইসলামের আবির্ভাব প্রত্যক্ষ করেন এবং ইসলাম গ্রহণ করে পিতার সাথে হিজরাত করেন।[১৭. বর্ণনা থেকে বুঝা যায়, তাহির ও তাইয়েব দুই ব্যক্তি। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার হলো এ দুটোই আবদুল্লাহর উপনাম। তাঁকে এই দুই নেিমই ডাকা হতো।]

 

ওয়ারারা বিন নওফেলের ভাষ্য

খাদীজার চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নওফেল ইবনে আসাদ ইবনে আবদুল উযযা ছিলেন পূর্বতন আসমানী কিতাবে ব্যুৎপত্তি সম্পন্ন একজন খৃস্টান প-িত। পার্থিব জ্ঞানেও তিনি যথেষ্ট পারদর্শী ছিলেন। হযরত খাদিজা মাইসারাহর নিকট থেকে খৃস্টান ধর্মযাজকের যে মন্তব্য শুনেছিলেন এবং মাইসারাহ নিজে দুইজন ফেরেশতা কর্তৃক ভাবী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ছায়াদানের যে দৃশ্য অবলোকন করেছিল তা ওয়ারাকাকে জানালেন। ওয়ারাকা বললেন, “খাদীজা, এ ঘটনা যদি সত্যিই ঘটে থাকে তাহলে নিশ্চিতভাবে জেনে রাখো যে, মুহাম্মাদ এ যুগের নবী। আমি জানতাম, বর্তমান মানক বংশধরদের কাছে একজন নবীর আগমন আসন্ন হয়ে উঠেছে এবং তাঁর প্রতীক্ষা করা হচ্ছে। এটা সেই নবীরই যুগ।” একথা বলে ওয়ারাকা প্রতীক্ষিত নবীর আগমণ অনেক বিলম্বিত হওয়ায় আক্ষেপ করতেন। অধীর অপেক্ষায় অনেক সময় তিনি বলতেন, “আর কত দেরী হবে!” এবাবে তিনি আক্ষেপ করে নীচের কবিতাটি আবৃত্তি করতেন :

[আরবী ************]

“আমি অত্যন্ত নাছোড়বান্দা হয়ে এমন এবটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে স্মরণ রেখে চলেছি, যা দীর্ঘদিন যাবৎ অনেককে ফুঁপিয়ে কাঁদতে উদ্বুদ্ধ করেছে। (সে বিয়য়টির) অনেক বিবরণের পর নতুন করে খাদীজার কাছ থেকেও বিবরণ (পাওয়া গেল), বস্তুতঃ হে খাদীজা, আমার প্রতীক্ষা খুবই দীর্ঘায়িত হয়ে গেছে। আমার প্রত্যাশা, মক্কার উচ্চভূমি ও নিম্নভূমির মধ্য থেকে তোমার বাস্তব রূপ প্রতিভাত হওয়া দেখতে পাই, যে কথা তুমি ঈসায়ী ধর্মযাজকের বলে জানিয়েছ। বন্তুতঃ ধর্মযাজকদের কথা বিকৃত করা আমি পছন্দ করি না।”

[আরবী ************]

“মুহাম্মাদ অচিরেই আমাদের সরদার ও নেতা হবেন এবং তাঁর বিরুদ্ধবাদীকে তিনি পরাজিত করবেন, আর দেশের সর্বত্র আলো ছড়াবেন, যে আলো দ্বারা সমগ্র সৃষ্টি জগৎকে তিনি উদ্ভাসিত করে তুলবেন। যারা তাঁর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবে তাদেরকে তিনি পর্যুদস্ত করবেন আর যারা তাঁর সাথে আপোষকামী হবে তারা হবে বিজয়ী। হায় আফসোস! যখন এসব ঘটনা ঘটবে তখন যদি আমি উপস্থিত থাকতাম, তাহলে তোমাদের সবার আগে আমিই তাঁর দলভুক্ত হতাম।”

পবিত্র কা’বার পুনর্নিমাণ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স যখন পঁয়ত্রিশ বছর তখন কুরাইশগণ পবিত্র কা’বার ভবন সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেয়। এ সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল পবিত্র কা’বার ছাদ তৈরি করা। কেননা ছাদ নির্মাণ না করলে দেয়াল ধসে যাওয়ার আশংকা ছিল। ঐ সময় কা’বার দেয়াল সাড়ে তিন হাতের সামান্য বেশী উঁচু ছিল এবং তাও শুধুমাত্র পাথরের ওপর পাথর সজিয়ে নির্মিত ছিল। কোন গাঁথুনি ছিল না। ঘটনাক্রমে ঐ নময় জনৈক রোমান ব্যবসায়ীর এক ব্যবসায়ীর একখানি জাহাজ সমুদ্রের প্রবাহের সাথে ভেসে জিদ্দার উপকৗলে এন আছড়ে পড়ে এবং ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায। এই জাহাজের তক্তাগুলো কুরাইশরা নিয়ে যায় এবং পবিত্র কাবার ছাদ তৈরীর কাজে ব্যবহার করার জন্য তা ছেঁটেকেচে ঠিকঠাক করে। মক্কায় জনৈক মিসরীয় রাজমিন্ত্রীরও আবির্ভাব ঘটে এবই সময়। পবিত্র কা’বার সংস্কার সাধনে তার দ্বারা কিছু কাজ নেয়া যাবে বলে কুরাইশগণ মনে মনে স্থির করে ফেলে। পবিত্র কা’বা সংলগ্ন কূপ থেকে তখন একটা সাপ প্রতিদিন উঠে আসতো এবং কা’বার দেয়ালের ওপরে বসে রোদ পোহাতো। যে কূপ থেকে সাপটা উঠে আসতো তার মধ্যে কা’বার জন্যপ্রতিদিন উৎসর্গীকৃত জিনিসসমূহ নিক্ষেপ করা হতো। সাপের কারণে কুরাইশগণ আতংকিত ছিল। কেননা সাপটা এমন ভয়ংকর ছিল যে, কেউ তার ধারেও ঘেঁষতে পারতো না। কেউ তার কাছে গেলেই ফনা বিস্তার করে সশব্দে চামড়ায় চামড়া ঘষে মোচড় খেতো এবং মুখ ব্যাদান করতো। এভাবে একদিন সাপটি যথন পবিত্র কা’বার দেয়ালের ওপর রোদ পোহাচ্ছিলো তখন আল্লাহ সেখানে একটা পাখী পাঠালেন। পাখী সাপটাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল। তখন কুরাইশগণ আশ্বস্ত হয়ে বরলো : আশা করা যায় যে, আল্লাহ আমাদের ইচ্ছায় সম্মতি দিয়েছেন। আজ আমাদের কাছে একজন প্রীতিভাজন মিস্ত্রী রয়েছে, প্রয়োজনীয় কাঠের যোগাড় হয়ে গেছে। আর সাপের হাত থেকেও আল্লাহ নিষ্কৃতি দিয়েছেন।

অতঃপর তারা কা’বার দেয়াল ভেঙ্গে দিয়ে নতুন করে নির্মণের আয়েজন করলো। এই সময় আবু ওয়াহাব ইবনে আমর ইবনে আয়েয ইবনে ইমরান ইবনে মাখযূম উঠে কা’বার একটা পাথর বিচ্ছিন্ন করে হাতে তুলে নিল। কিন্তু পাথরটি তৎক্ষণাৎ তার হাত থেকে সটকে পড়লো এবং যেখানে তা ছিল সেখানে পুনঃস্থাপিত হলো। এ আশ্চর্য ব্যাপার দেখে সে বললো, “হে কুরাইশগণ, তোমরা এই কা’বার ভবন র্মিাণে শুধু তোমাদের বৈধভাবে উপার্জিত সম্পদ নিয়েজিত কর। এত ব্যভিচার, সুদ কিংবা উৎপীড়ন দ্বারা অর্জিত সম্পদ ব্যয় করো না।”

অতঃপর কুরাইশগণ কা’বার গৃহনির্মণের কাজ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেল। দরজার অংশ নির্মাণের ভার বনু আবদ মানাফ ও যুহরার ভাগে, রুকনে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানীর মধ্যবর্তী অংশ নির্মাণের ভার বনী মাখযূম গোত্রের ভাগে এবং তাদের সাথে আরো কয়টি কুরাইশ গোত্র যুক্ত হলো, কা’বার মেঝে নির্মাণের ভার বরী জুমাহ ও বনী সাহামের ভাগে, আর হাজরে আসওয়াদ সংলগ্ন অংশ বনী আবদুদদার, বরী কুসাই ও বনী আসাদ ইবনে আবদুল উয্যা ও বনী আদী ইবন কা’বের ভাগে পড়লো।

এবার ভাঙ্গার  কাজে হাত দেয়ার পালা কিন্তু এ কাজে হাত দিতে প্রত্যেকেই এক অজানা ভয়ে ভতি হয়ে পড়লো। তখন ওয়ালীদ ইবনুল মুগিিরা ঘোষণা করলো, “ আমিই ভাঙ্গার কাজ শুরু করছি। এই বলে সে কোদাল হাতে নিয়ে জীর্ণ ভবনের এক প্রান্তে গাঁড়িয়ে বরলো, “হে আল্লাহ, তোমার ধর্ম থেকে বিচ্যুত হইনি এবং আমরা যা করছি তা সদুদ্দেশ্যেই করছি।” অতঃপর রুকনে ইয়ামানী ও বুকনে আসওয়াদের কোণ থেকে খানিকটা ভেঙ্গে ফেললো। পরবর্তী রাত সবাই উৎকণ্ঠার সাথে কাটালো। সবাই কললো, “দেখা যাক, ওয়ালীদের ওপর কোন আপদ আসে কিনা। যদি তেমন কিছু হয় তাহলে ভাঙবো না। বরং যেটুকু ভাঙ্গা হয়েছে তা আবার জুড়ে সাবেক অবস্থায় বহাল করবো। অন্যথায় বুঝবো আল্লাহ আমাদের উদ্যোগে সন্তুষ্ট। অবশিষ্ট অংশও ভেঙ্গে ফেলবো।” ওয়ালীদ পরদিন সকালে স্বাভাবিকভাবে আরদ্ধ কাজে ফিরে এলো। এবং কা’বার দেয়াল ভাঙতে আরম্ভ করলো। তার সাথে অন্যান্য লোকেরাও ভাঙতে লাগলো। এ ভাবে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের নির্মিত ভিত পর্যন্ত গিয়ে থামলো। অতঃপর তারা সবাই উটের পিঠের কূজাকৃতির দুর্লভ সবুজ পাথর সংগ্রহ করতে গেল, যার একটা আর একটার সাথে লেগে থাকে।[১৮. কোন কোন বর্ণনায় বরা হয়েছে, পাথরগুলো বর্শার ফলকের ন্যায় সবুজ।]

অতঃপর কুরাইশ গোত্রগুলো কাবা পুনঃনির্মাণের উদ্দেশ্যে পাথর সংগ্রহ করলো। প্রত্যেক গোত্র আলাদা ভাবে সংগ্রহ করলো ও পুনঃনির্মাণের কাজ সমাধা করলো। হাজরে আসওয়াদের স্থান পর্যন্ত দেয়াল নির্মাণ সম্পন্ন হলে এবার তা যথাস্থানে কে স্থাপন করবে তা নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ শুরু হরো। হাজরে আসওয়াদ তুলে নিয়ে যথাস্থানে স্থাপন করার সম্মান লাভের বাসনা প্রত্যেকেরই প্রবল হয়ে উঠলো। এ নিয়ে গোত্রগুলো সংঘবদ্ধ হতে লাগলো এবং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল।

বর্ণিত আছে যে, ঐ সময় সমগ্র কুরাইশ সম্প্রদায়ের প্রবীণতম ব্যক্তি আবু উমাইয়া ইবনুল মুগীরা নিম্নরূপ আহ্বান জানালেন, “হে কুরাইশগণ, এই পবিত্র মসজিদের দরজা দিয়ে যে ব্যক্তি প্রথম প্রবেশ করবে, তাকেই তোমরা এই বিবাদের মীমাংসার দায়িত্ব দাও।” সবাই এ প্রস্তাবে সম্মত হলেন। অতঃপর দেখা গেল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই সর্বপ্রথম  প্রবেশ করলেন। তাঁকে দেখে সবাই একবাক্যে বলে উঠলো, “এতো আমাদের আল আমীন (পরম বিশ্বস্ত) মুহাম্মাদ তাঁর ফায়সালা আমরা মাথা পেতে নেব।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাদমান লোকদের কাছাকাছি গিয়ে উপনীত হলে সবাই তাঁকে তাদের বিবাদের বিয়য়টা জানালে তিনি করলেন, “আমাকে একখানা কাপড় দাও।” কাপড় দেয়া হলে তিনি তা বিছিয়ে হাজরে আসওয়াদ উক্ত কাপড়ের মধ্যস্থলে স্থাপন করে বললেন “প্রত্যেক গোত্রকে এই কাপড়ের চারপাশ ধরতে হবে।” সবাই তা ধরলো ও উঁচু করে যথাস্থানে নিয়ে রাখলো। অতঃপর তিনি নিজ হাতে হাজরে আসওয়াদ তুলে যথাস্থানে রাখলেন ও তার উপর গাঁথুনি দিলেন।

আরব গণক, ইহুদী পুরেহিত ও খৃস্টান ধর্মযাজকদের ভবিষ্যদ্বাণী

ইহুদী পুরেহিত, খৃস্টান ধর্মযাজক ও আরব গণকগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করে রেখেছিলেন যে, তাঁর আগমনের সময় ঘনিয়ে আসছে। ইয়াহুদ ও খৃস্টান যাজক সম্প্রদায় এ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তাদের স্ব স্ব আসমানী কিতাবে বর্ণিত শেষ নবী ও তাঁর আবির্ভাবের সময়ের লক্ষণসমূহ বিচার করে এবং তাদের নবীগণ তাঁর সম্পর্কে যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন তার নিরিখে আর আরব গণকের ভবিষ্যদ্বাণীর উৎস ছিল ফিরিশতাদের কথাবার্তা আড়ি পেতে শ্রবণকারী জিনদের কাছ থেকে পাওয়া খবর। তখনও উল্কাবাণ নিক্ষেপ করে শয়তানদেরকে বিতাড়িত করতেঃআড়িপাতা থেকে নিবৃত্ত করা হতো না। এই শয়তানরা গণক নারী-পুরুষদের কাছে আসতো। ফলে তারা মাঝে মাঝে শেষ নবীর আগমন সম্পর্কে কিছু কিছু পূর্বাভাস দিত। সাধারণ আরবরা এ সব পূর্বাভাসে তেমন কর্ণপাত করতো না। কিন্তু হযরতের আবির্ভাব ঘটার পর এবং আভাস দেয়া লক্ষণগুলো বাস্তবে সংঘঠিত হবার পর সকলেই তা জানতে ও উপলব্ধি করতে পালো।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত লাভের সময় যখন আসন্ন হয়ে উঠলো তখন শয়তানদের আড়িপাতা বন্ধ করা হলো এবং যেসব ঘাঁটিতে বসে তারা আড়িপাততো সেসব ঘাঁটিতে তাদের আনাগোনা উল্কাবাণ নিক্ষেপ করে বন্ধ করা হলো। এতে জিনরা বুঝতে পারলো যে, এ পদক্ষেপ সৃষ্টিজগতে আল্লাহর কোন বিশেষ  প্রক্রিয়া বা ব্যবস্থা বলবৎ করার লক্ষ্যেই গৃহীত হয়েছে।

রাসূলুল্লাহর (সা) দৈহিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য

ইবনে হিশাম বলেন,

হযরত আলী ইবনে আবু তালিবের পুত্র মাহাম্মাদের পুত্র ইবরাহীম থেকে গুফরার আযাদকৃত দাস উমার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৈহিক ও চারিত্র্রিক বৈশিষ্ট্যের নিম্নরূপ বর্ণনা দিয়েছেনঃ

আলী ইবনে আবু তালিব যখনই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশংসা করতেন তখনই বলতেন, “তিনি অধিক লম্বা ছিলেন না, আবার খুব বেঁটেও ছিলেন না বরং তিনি উচ্চতায় মধ্যম আকৃতির ছিলেন। তাঁর চুল অত্যধিক কুঞ্চিত ছিল না আবার একবারে অকুঞ্চিতও ছিল না। বরং তা কিঞ্চিত কোঁকড়ানো। তিনি খুব বেশী স্থুল বা মোটা  দেহের অধিকারী ছিলেন না। তাঁর মুখম-ল একেবারে গোলাকার ও ক্ষুদ্র ছিলনা। চোখ দুটো ছিল কালো। লম্বা  ভ্রƒ-যুগল, গ্রন্থি’র হাড়গুলো ও দুই স্কন্থের মধ্যবর্তী হাড়টি ছিল উঁচু ও সুস্পষ্ট। বক্ষ থেকে নাভি পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল ছিল হালকা লোমে আবৃত। হাত ও পায়েরপাতা ছিল পুষ্ট, চলার সময় পা দাবিয়ে দিতেন না, মনে হতো যেন কোন নিম্ন ভূমিতে নামছেন। কোনদিকে ফিরে তাকালে গোটা শরীর নিয়ে ফিরতেন। তাঁর দুই স্কন্ধের মাঝখানে নবুওয়াতের সীল বা মোহর লক্ষণীয় ছিল। বস্তুতঃ তিনি ছিলেন শেষ নবী, শ্রেষ্ঠ দানশীল, শ্রেষ্ঠতম সাহসী, অতুলনীয় সত্যবাদী, সবচেয়ে দায়িত্বজ্ঞান সম্পন্ন, সবচেয়ে অমায়িক ও মিশুক। প্রথম নজরে তাঁকে দেখে সবাই ঘাবড়ে যেতো।” তাঁর প্রশংসাকারী আলী (রা) বলেন, “তাঁর মত মানুষ তাঁর আগেও দেখিনি পরেও দেখিনি।”

ইনজীলে রাসূলুল্লাহর (সা) বিবরণ

ইবনে ইসহাক বলেন,

হযরহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে ঈসা আলাইহিস্ সালামের যে বিবরণ ও প্রতিশ্রুতি ঈসার সহচর ইউহান্না কর্তৃক সংকলিত ইনজীলে বর্ণিত হয়েছে যা স্বয়ং ঈসা আল্লাহর তরফ থেকে প্রাপ্ত ওহী অনুসারে লিপিবদ্ধ করিয়েছেন, আমার জানা মতে তা এইঃ

“যে ব্যক্তি আমাকে হিংসা ও ঘৃণা করে, সে স্বয়ং আল্লাহকে ঘৃণা করে। যেসব কাজ আর কেউ কখনো করেনি, তা যদি আমি তোমাদের সামনে করে না দেখাতাম, তাহলে তাদের (অর্থাৎ অবিশ্বাসীদের ) কোন দোষ হতো না। কিস্তু এখন তারা আল্লাহর নিদর্শনকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা ভেবেছে যে, এভাবে তারা আমাকে ও আল্লাহকে পরাজিত করতে পারবে। এসব ঘটেছে এজন্য যাতে খোদায়ী গ্রন্থের ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়। বস্তুতঃ তারা অন্যায়ভাবে আমাকে ঘৃণা করেছে। ‘মানহামান্না’Ñযাকে আল্লাহ পাঠাবেন- যদি তোমাদের কাছে আসেন, তবে তিনিই আমার পক্ষে স্ক্ষ্য দেবেন। তিনি আল্লাহর নিকট থেকে আগত পবিত্র আত্না। আর তোমরাও অবশ্যই আমার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। কারণ প্রথম থেকেই তোমরা আমার সঙ্গে আছ। আমি তোমাদের কে এ সমস্ত কথা এজন্য বললাম, যাতে তোমরা অভিযোগ না করতে পার। [১৯.বাইবেল যোহন ১৫:২৩-৩৬ দ্রষ্টব্য।] সুরিয়ানী ভাষায় ‘মুনহামান্না’ অর্থ মুহাম্মাদ। আর রোমান ভাষায় এর প্রতিশব্দ হরো ‘বারাকলিটাস।’

 

নবুওয়াত লাভ

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বযস যখন চল্লিশ বছর হলো, আল্লাহ তাঁকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য করুণাস্বরূপ এবং গেটা মানবজাতির জন্য সুসংবাদদাতা করে পাঠালেন। ইতিপূর্বে পৃথিবীতে যত নবী-রাসূল এসছেন তাঁদের প্রত্যেকের নিকট থেকে আল্লাহ তায়ালা এই মর্মে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তাঁরা নাকি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ঈমান আনবেন, তাঁকে সমর্থন করবেন এবং তাঁর বিরোধীদের মুকাবিলায় তাঁকে সাহায্য করবেন। আর তাদের প্রতি যারা ঈমান আনবে ও সমর্থন জানাবে তাদরেকেও এ দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেবেন। সেই অঙ্গীকার অনুসারে প্রত্যেক নবী নিজ নিজ অনুসারীদেরকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মেনে নেয়া ও তাঁর আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়ে যান।

আয়িশা (রা) বর্ণনা করেন, “আল্লাহ তায়ালা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্মানিত করতে ও মানব জাতিকে তাঁর দ্বারা অনুগৃহীত করতে মনস্থ করলেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়াতের অংশ হিসেবে নির্ভুল স্বপ্ন দেখতে থাকেন। তখন তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন তা ভোরের সূর্যোদয়ের সমই বাস্তব হয়ে দেখা দিত। এই সময় আল্লাহ তায়ালা তাকে নির্জনে অবস্থান করার প্রতি আগ্রহী করে দেন। একাকী নিভৃতে অবস্থান তাঁর কাছে সর্বাধিক পছন্দনীয় হয়ে ওঠে।”

আবদুল মালিক ইবনে উবাইদুল্লাহ বর্ণনা বলেনঃ

আল্লাহ তায়ালা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্মান ও মার্যাদায় ভূষিত করতে মনস্থ করলেন ও নবুওয়াতের সূচনা করলেন, তখন তিনি কোন প্রয়োজনে  বাইরে বেরুলে লোকালয় ছেড়ে অনেক দূরে মক্কার পার্বত্য উপত্যকায় ও সমভূমিতে চলে যেতেন। তখন যে কোন পাথর বা গাছের পাশ দিয়েই তিনি অতিক্রম করতেন ঐ পাথর বা গাছ বলে উঠতো, “আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ!” ( হে আল্লাহর রাসূল, আপনার প্রতি সালাম)। এ কথা শোনা মাত্রই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশে-পাশে ডানে-বামে ও পেছনে ফিরে তাকাতেন। কিছুদিন কেটে গেল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে শুন্তে ও দেখতে থাকলেন। অতঃপর রমযান মাসে তিনি যখন হেরা গুহায় [২০. মক্কা থেকে তিন মাইল দূরে অবস্থিত একটি পাহাড়ের গুহার নাম হেরা।] অবস্থান করছিলেন, তখন তাঁর কাছে আল্লাহর তরফ থেকে পরম সম্মান ও মর্যাদার বাণী বহন করে জিবরীল আলাইহিস্ সালাম এলেন।

উবাইদ ইবনে ‘উমাইর থেকে বর্ণিত আছে যে,

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি বছর এক মাস হেরা গুহায় কাটাতেন। জাহিলিয়াতের যুগে কুরাইশরাও এই একইভাবে মূর্তিপূজা বাদ দিয়ে নিভৃত তপস্যায় মগ্ন হতো। প্রতি বছর একটা মাস তিনি এভাবে নির্জনে ইবাদাত করে কাটাতেন। উক্ত মাসে তাঁর কাছে যত দরিদ্র লোকই থাকতো তাদেরকে তিনি খাবার দিতেন। এক মাসের এই নির্জনবাস সমাপ্ত করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের বাড়ীতে ফিরে যাবার আগে সর্বপ্রথম কা’বা শরীফে প্রবেশ করে সাতবার বা ততোধিক বার তাওয়াফ করতেন এবং একাজ করার পরই কেবল বাড়ীতে ফিরে আসতেন। অতঃপর আল্লাহ কর্তৃক তাঁকে পরম সম্মানে ভূষিত করার মাসটি অর্থাৎ নবুওয়াত প্রাপ্তির বছরের রমযান মাস সমাগত হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যথারীতি হেরায় অবস্থানের জন্য রওয়ানা হলেন। অবশেষে সেই মহান রাতটি এলো, যে রাতে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে রিসালাত দিয়ে গৌরবান্বিত করলেন। এই সময় আল্লাহর নির্দেশে জিবরীল আলাইহিস্ সালাম তাঁর কাছে আসলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। এই অবস্থায় জিবরীল একখ- রেশমী কাপড় নিয়ে আবির্ভূত হলেন। ঐ রেশমী বস্ত্রখ-ে কিছু লেখা ছিল। জিবরীল আমাকে বললেন, “পড়ুন”! আমি বললাম, “আমি পড়তে পারি না।”

তখন তিনি আমাকে এমন জোরে আলিঙ্গন করলেন যে, আমি ভাবলাম, মরে যাচ্ছি। কিছুক্ষণ পর আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, “পড়ুন!” আমি বললাম, “আমি পড়তে পারি না।” তিনি পুনরায় আমাকে সজোরে আলিঙ্গন করলেন। এবারও চাপের প্রচ-তায় আমার মৃত্যুর আশংকা হলো। আবার তিনি ছেড়ে দিলেন এবং বললেন, “পড়ৃন”! আমি বললাম, “কি পড়বো?” তিনি বললেন, “ইকরা বিসমি রাব্বিকা....। অর্থাৎ পড়ুন আপনার সেই প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পড়ুন, আর আপনার প্রভু সদাশয় অতি। তিনিই কলম দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে সেইসব জিনিস শিক্ষ দিয়েছেন যা সে জানতো না।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর আমি শোনানো আয়াত কয়টি পড়লাম। এই পর্যন্ত পড়িয়েই জিবরীল থামলে এবং তারপর চলে গেলেন। এরপর আমি ঘুম থেকে উঠলাম। মনে হলো যেন আমি আমার মানসপটে কিছু লিখে নিয়েছি এরপর আমি হেরা গুহা থেকে বেরিয়ে এলাম। পর্বতের মধ্যবর্তী এক স্থানে পৌঁছে হঠাৎ ওপর থেকে আওয়াজ শুনতে পেলাম “ হে মুহাম্মাদ, আপনি আল্লাহর রাসুর এবং আমি জিবরীল।” আমি ওপরে আসমানের দিকে তাকিয়ে দেখলাম. জিবরীল একজন মানুষের আকৃতিত আকাশের দূর দিগন্তে ডানা দু’খানা ছড়িয়ে দিয়ে আছেন এবং বলছেন, “হে মুহাম্মাদ আপনি আল্লাহর রাসূল এবং আমি জিবরীল।” আমি স্তব্ধ হযে দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম। আকাশের অন্যান্য প্রান্তে তাকিয়ে দেখি, সর্বত্রই তিনি একই আকৃতিতে বিরাজমান। এইরূপ নিশ্চলভাবে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে রইলাম। আমি পিছনে সরতে বা সামনে এগুতে সক্ষম হচ্ছিলাম না। এই সময় খাদীজা আমাকে খুঁজতে লোক পাঠালো। মক্কার উঁচু এলাকায় পৌঁছে তারা আবার খাদীজার কাছে ফিরে গেল। অথচ আমি তখনো ঐ একই স্থানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এরপর জিবরীল অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমি আমার পরিবারের কাছে ফিরে চললাম। খদীজার কাছে উপনীত হয়ে তার কাছে খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলাম। সে বললো, “হে আবুল কাসিম, আপনি কোথায় ছিলেন? আমি আপনার খোঁজে লোক পাঠিয়েছিলাম। তারা মক্কার উচ্চভূমিতে আপনাকে খুজে ফিরে এসছে।” আমি যা কিছু দেখেছিলাম সবকিছু খাদীজাকে খুলে বললাম। খাদীজা বললো, “এ ঘটনাকে আপনি পরম শুভ লক্ষণ হিসেবে গ্রহণ করুন এবং অবিচল থাকুন। যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ করে বলেছি, আপনি এ যুগের মানবজাতির জন্য নবী হিসেবে মনোনীত হয়েছেন বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।”

অতঃপর খাদীজা কাপড়-চোপড়ে আবৃত হয়ে ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের কাছে গেলেন। ওয়ারাকা ছিলেন খাদীজার চাচাতো ভাই। তিনি খ্রস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং আসমানী কিতাবের জ্ঞানে সুপ-িত ছিলেন। বিশেষতঃ তাওরাত ও ইনজীল বিশ্বাসীদের নিকট থেকে অনেক জ্ঞান লাভ করেছিলেন। খদীজা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেখা ও শোনা সমস্ত য়টনা তাঁর কাছে আদ্যোপান্ত বর্ণনা করলেন। সব শুনে ওয়ারাকা বলে উছলেন, “কুদ্দূসুন কদ্দূসুন! মহা পবিত্র ফেরেশতা! মহা পবিত্র ফেরেশতা!! আল্লাহর শপথ করে বলছি, হে খাদীজা, তুমি বিশ্বাস কর, মুহাম্মাদের নিকট সেই মহান দূতই এসেছেন যিনি মূসার নিকট আসতেন। বস্তুতঃ মুহাম্মাদ বর্তমান মানব জাতির জন্য নবী মনোনীত হয়েছেন। [২১.সুহাইলী বলেনঃ ঈসা (আ) সময়ের ব্যবধানের দিক দিয়ে নিকটতর নবী হওয়া সত্ত্বেও ওয়ারাকা তার পরিবর্তে মূসার নামোল্লেখ করলেন এই যে, ওয়ারাকা তখন খৃস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। আর খৃস্টানদের মতে হযরত ঈসা (আ) নবী নন। বরং তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী হয়রত ঈসা (আ) আল্লাহ তায়ালার তিনটি সত্তার একটি যা ঈসার সত্তায় একাকার হয়ে গিয়েছে। খৃস্টানদের মধ্যে অবশ্য এ ব্যাখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।]তাঁকে বলো, তিনি যেন অবিচল থাকেন।”

খাদীজা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ফিরে গিলেন এবং ওয়ারাকা যা বলেছেন তা তাঁকে জানালেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হেরা গুহায় মাসব্যাপী ইবাদাত শেষ হলে তিনি মক্কায় ফিরে যথারীতি কা’বার তাওয়াফ করতে শুরু করলেন। এই সময় ওয়ারাকা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “ভাতিজা, তুমি যা দেখেছো ও শুনেছো- বলতো।”রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে সমস্ত ঘটনা কললেন। সব শুনে ওয়ারাকা বললেন, “নিশ্চিত জেনো, তুমি এ যুগের মানব জাতির নবী। সেই মহাদূতই তোমার কাছে এসেছিলেন যিনি মূসার কাছেও আসতেন। তুমি এটাও নিশ্চিত জেনে রেখো যে, তোমার বাণীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হবে, নির্যাতন করা হবে। তোমাকে দেশান্তরিত করা হবে এবং তোমার বিরুদ্ধে লড়াই করা হবে। আমি যদি তখন জীবিত থাকি তাহলে অবশ্যই আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠায় প্রকাশ্যভাবে সাহায্য করবো।” অতঃপর ওয়ারাকা তাঁর  কাছে মাথা এগিয়ে নিয়ে এলেন  এবং তাঁর কপালে চুমু খেলেন। তাওয়াফ সমাপ্ত করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাড়ী ফিরে গেলেন।

কুরআন নাযিলের সূচনা

পবিত্র রমযান মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ওহী নাযিল শুরু হয়। মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ বলেন,

“রমযান মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানব জাতির জন্য পথনির্দেশক রূপে, হিদায়াতের সুস্পষ্ট দলিল-প্রমাণ সহকারে, হক ও বাতিলের পার্থক্যকারী হিসেবে।”

মহান আল্লাহ আরো বলেন.

“আমি এই কুরআন লাইলাতুল কদরে নাযিল করেছি। লাইলাতুল কদর কী তা কি তুমি জানো? লাইলাতুল কদর সহস্র মাসের চেয়ে উত্তম। এ রাতে ফিরিশতাগণ ও জিবরীল অবতীর্ণ হয় তাদের প্রতিপালকের ইচ্ছায় ওবং প্রভাত হওয়া পর্যন্ত এ রাত শান্তিময় হয়ে থাকে।”(সূরা কদর)

আল্লাহ তা’য়ালা আরো বলেন,

“হা-মীম! সুস্পষ্ট গ্রন্থের শপথ! নিশ্চয়ই এই কিতাবকে আমি একটি কল্যাণময় রজনীতে নাযিল করেছি। নিশ্চিতভাবে নিশ্চিভাবেই আমি সাবধান করতে চেয়েছি। এ ছিল এমন এক রাত, যে রাতে আমার হুকুমে সকল বিষয়ের যুক্তিপূর্ণ ও বিজ্ঞানভিত্তিক ফায়সালা করা হয়। আর আমি একজন রাসূল পাঠাতে চাচ্ছিলাম।”(সুরা দুখান)

আল্লাহ তা’য়ালা আরো বলেন,

“তোমরা যদি আল্লাহর ওপর এবং আমার বান্দার ওপর পৃথকীকরণ ও দুই দলের মুখোমুখী হওয়ার দিনে আমি যা নাযিল করেছি তার ওপর ঈমান এন থাক....” এখানে মুখোমুখী হওয়ার দিন অর্থ বদরের ময়দানে মুশরিকদের ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখোমুখী হওয়ার দিন।

খাদীজা বিনতে খুয়াইলিদের ইসরাম গ্রহণ

খাদীজা বিনতে খুয়াইলিদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ঈমান আনলেন। আল্লাহর কাছ থেকে যে প্রত্যাদেশ তিনি পেলেন তা সত্য বলে মেনে নিলেন। নবুওয়াতের দায়িত্ব পালনের  কাজে তাঁকে সমযোগিতা করলেন। বস্তুতঃ তিনিই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলেন প্রতি ঈমান আনয়নকারী ও তাঁকে সত্যরূপে গ্রহণকারী প্রথম ব্যক্তি।

এভাবে আল্লাহ তাঁর নবীর দুঃখ-কষ্টকে লাঘব করেন। যখনই অবাঞ্ছিত অবস্থার সৃষ্টি হতো, কেউ তাঁর দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করতো ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করতো, তখন তিনি মর্মাহত হতেন। কিন্তু খাদীজার কাছে গেলেই আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁর মনোকষ্ট দূর হয়ে যেতো। খাদীজা তাঁকে সান্ত¦না দিতেন, তাঁর মনের দুঃখ-বেদনা হালকা করে দিতেন, তাঁর দাওয়াতকে সম্পূর্ণ সত্য বলে স্বীকৃতি দিতেন এবং মানুষের আচরণকে যাতে তিনি হালকাভাবে গ্রহণ করেন, সেজন্য অন্রপ্রণিত করতেন। আল্লাহ তাঁর (খাদীজার) ওপর রহমত নাযিল  করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “এ কারণে আমি খাদীজাকে জান্নাতে এমন একটি গৃহের সুসংবাদ দিতে আদিষ্ট হয়েছি, যে গৃহ অনুপম কারুকার্যখচিত মুক্তার তৈরী এবং যেখানে কোন হৈ চৈ, দুঃখ-কষ্ট ও অসুস্থতা থাকবে না।”

ওহীর বিরতি

এরপর কিছুদিনের জন্য ওহী বন্ধ থাকে বিষয়টি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য খুবই কষ্টকর হয়ে উঠলো। এরপর জিবরীল (আ) তাঁর কাছে সূরা ‘আদ্ দুহা’ নিয়ে আবির্ভূত হলেন। যে মহান প্রতিপালক তাঁকে নবুওয়াত দ্বারা সম্মানিত করেছেন তিনি ঐ সূরাতে শপথ করে বলেছেন যে, তিনি তাঁকে ত্যাগ করেননি এবং তাঁর প্রতি বৈরীও হননি। মহান আল্লাহ বলেন, “মধ্যাহ্নের শপথ এবং তিমিরাচ্ছন্ন রজনীর শপথ!

তোমার প্রভু তোমাকে ত্যাগ করেননি এবং পরিত্যাগ করেননি এবং তোমার প্রতি বৈরিও হননি।” অর্থাৎ তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে তোমাকে পরিত্যাগ করেননি, আর তোমার প্রতি শত্রুতা পোষণ করার পর পুনরায় ভালোবেসেছেন এমনও হয়নি। “বস্তুতঃ তোমার জন্য পূর্বের অবস্থার চেয়ে পরবর্তী অবস্থাই ভালো।” অর্থাৎ আমার নিকট তোমার প্রত্যাবর্তনের পর তোমার জন্য যা প্রস্তুত করে রেখেছি তা দুনিয়াতে তোমাকে যা দিয়েছি তার চেয়ে উত্তম। অবশ্যই তিনি তোমাকে অচিরেই এতো পরিমাণে প্রদান করবেন যাতে তুমি খুশী হয়ে যাবে। অর্থাৎ দুনিয়ায় সাফল্য ও বিজয় এবং আখিরাতে প্রতিদান। “তিনি কি তোমাকে ইয়াতীম অবস্থায় পেয়ে আশ্রয় দেননি? আর তিনিই তোমাকে দিশেহারা দেখে পথের সন্ধান দিয়েছেন এবং তোমাকে দরিদ্র অবস্থায় পেয়ে সম্পদশালী করেছেন।” এ আয়াত ক’টিতে আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর প্রথম জীবনে প্রাপ্ত সম্মান এবং তাঁর মাতৃ-পিতৃহীন, সহায়-সম্বলহীন ও দিশেহারা অবস্থায় আল্লাহ তাঁর প্রতি যে করুণা-অনুকম্পা দেখিয়েছেন এবং নিজ অনুগ্রহে তাঁকে যে শোচনীয় দুরবস্থা থেকে উদ্ধার করেছেন, তার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। “অতএব তুমি ইয়াতীমের প্রতি ক্রোধ প্রদর্শন করো না এবং সাহায্য প্রার্থনাকারীকে ধমক দিও না।” অর্থাৎ আল্লাহর দুর্বল বান্দাদের ওপর ঐদ্ধত্য ও অহংকার প্রদর্শন করো না এবং নিষ্ঠুর ও স্বেচ্ছাচারী আচরণ করোনা। “আর তোমার প্রতিপালকের দেয়া নিয়ামতের কথা প্রচার কর।” অর্থাৎ আল্লাহর তরফ থেকে নবুওয়াত প্রপ্তির মাধ্যমে যে অতুলনীয় সম্পদ ও অনুপম মর্যাদা তুমি লাভ করেছ, তার কথা মানুষকে জানাও ও তাদেরকে সেদিকে দাওয়াত দাও।

এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতি সংগোপনে তাঁর নিকটতম লোকদের মধ্য হতে বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের কাছে দীন প্রচারে আত্ননিয়োগ করলেন। আল্লাহ তাঁকে নবুওয়াত দান করে স্বয়ং তাঁর ওপর ও সমগ্র মানব জাতির ওপর যে মহা অনুগ্রহ করেছেন তার কথা ব্যক্ত করতে লাগলেন।

প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী

পুরুষদের মধ্য হতে যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ঈমান আনেন, তাঁর সাথে নামায আদায় করেন, এবং তাঁর প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হওয়া ওহী মনে-প্রাণে গ্রহণ করেন, তিনি ছিলেন তাঁরই চাচা আবু তালিবের পুত্র আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু। তখন তাঁর বয়স মাত্র দশ বছর।

হযরত  আলীর (রা) ওপর আল্লাহর একটা বিশেষ অনুগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। আল্লাহ যে তাঁর কল্যাণ চেয়েছিলেন এবং সে জন্য তাঁর উপযোগী ব্যবস্থাও করে রেখেছিলেন, সেটা তাঁর ইসলাম গ্রহণের পূর্ববর্তী ঘটনাবলী থেকে বুঝা যায়। কুরাইশদের তখন ঘোর দুর্দিন। বহু সন্তানের পিতা হওয়ায় আবু তালিব নিদারুণ আর্থিক সংকটে ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরেক চাচা ছিলেন আব্বাস। তিনি ছিলেন বনু হাশিম গোত্রের মধ্যে সচ্ছলতম ব্যক্তি। তাঁকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “হে আব্বাস, আপনার ভাই আবু তালিব অধিক সন্তানের ভারে জর্জরিত। দেখতেই পাচ্ছেন মানুষ কি ভীষণ দুর্দশায় ভুগছে। আসুন, আমরা তাঁর সন্তান ভার লাঘব করি। তাঁর পুত্রদের মধ্য হ’তে একজনের দায়-দয়িত্ব আমি গ্রহণ করি আর অপর একজনের দায়িত্ব আপনি গ্রহণ করুন। এভাবে দু’টি সন্তানের দায়-দায়িত্ব থেকে তাঁকে রেহাই দেয়া যাবে।”

আব্বাস বললেন, “ঠিক আছে, চলো যাই।”

অতঃপর তাঁরা উভয়ে গিয়ে আবু তালিবকে বললেন, “যতদিন দেশবাসী বর্তমান আর্থিক সংকট থেকে মুক্ত হচ্ছে না ততদিনের জন্য আমর আপনার সন্তানদের ভার লাঘব করতে চাই।” আবু তালীব বললেন, “তোমরা আকীলকে আমার কাছে রেখে যাও। তারপর যাকে খুশী নিয়ে যাও।”

অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামে আলীকে নিলেন এবং তাঁকে নিজ পরিবারের অন্তর্ভুক্ত করলেন। আর আব্বস নিলেন জাফরকে এবং তাঁকে তিনি স্বীয় পরিবারের অন্তর্ভুক্ত করলেন। এরপর আলী (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত প্রাপ্তির সময় পর্যন্ত তাঁর কাছেই ছিলেন। তাই নবুওয়াত প্রাপ্তির পরে আলী তাঁর ওপর ঈমান আনলেন ও তাঁকে নবী হিসেবে মনে-প্রাণে মেনে নিয়ে তাঁর অনুসরন করতে লাগলেন।

কোন কোন ঐতিহাসিকদের মতে, নামাযের সময় উপস্থিত হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার দুর্গম গিরি গুহায় চলে যেতেন, আর তাঁর সাথে আলীও যেতেন। কিন্তু এ কাজটি তাঁর পিতা, চাচা ও গোত্রের সকলের অগোচরে সঙ্গোপনে করতে থাকলেন।সেখানে তাঁরা দু’জনে গিয়ে নিভৃতে নামায পড়তেন এবং সন্ধ্যা হলে বাড়ী ফিরতেন। এভাবেই তাঁরা আল্লাহর ইচ্ছায় বেশ কিছুদিন কাজ চালিয়ে যেতে লাগলেন। একদিন আবু তালিন তাঁদের দুজনকে নামাযরত অবস্থায় দেখতে পেয়ে নামায শেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, “ভাতিজা, এটা আবার কোন দীন (ধর্ম) যার অনুসরণ তুমি করছো?” তিনি বললেন, “চাচা, এটা আল্লাহর দীন, তাঁর ফেরেশতাদের দীন, তাঁর নবী-রাসূলদের দীন। আর বিশেষতঃ আমাদের পিতা ইবরাহীমের দীন। আল্লাহ আমাকে রাসূল বনিয়েছেন এবং এই দীনসহ মানব জাতির কাছে পাঠিয়েছেন। হে চাচা, আমি যত লোককে এই  দীনের শিক্ষা দিয়েছি  এবং যত লোককে এই জীবন  বিধান গ্রহনের আহ্বান জনিয়েছি তাদের সবলের চাইতে আপনি এই দাওয়াত পাওয়ার অধিক হকদার। আর যত লোক আমার এই দাওয়াত গ্রহণ করেছে এবং আমাকে কাজে সহযোগিতা করেছে তাদের তুলনায় আপনারই বেশী কর্তব্য এ আহ্বানে সাড়া দেয়া ও সহযোগিতা করা।”

আবু তলিব বললেন, “ভাতিজা, আমি আমার পূর্বপুরুযদের ধর্ম ও রীতিনীতি বর্জন করতে পারি না। তবে আল্লাহর কসম, আমি যতদিন বেঁচে আছি তোমার এ তৎপরতার দরুন তোমাকে কোন অপ্রীতিকর অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে না।”

এরপর ইসলাম গ্রহণ করেন যালিদ ইবনে হারিস্ ইবনে শুরাহবীল ইবনে কা’ব ইবনে আবদুল উযযা। ইতিপূর্বে খাদীজার ভ্রাতুষ্পুত্র হাকীম ইবনে হিযাম ইবনে খুয়াইলিদ সিরিয়া থেকে যায়িদ ইবনে হারিসাসহ বেশ কযেকজন ক্রীতদাষ নিয়ে আসেন। একদিন তার ফুফু খাদীজা তার কাছে এলেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে খাদীজার বিয়ে হয়ে গেছে। হাকীম বললেনম, “ফুফু, আপনি এই দাসগুলোর মধ্য থেকে যে কোন একজনকে পছন্দ করুন। যে ছেলেটিকেই আপনি পছন্দ করবেন তাকেই আমি আপনাকে দিয়ে দেব।” তিনি যায়িদকে পছন্দ করে নিয়ে নিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদীজার কাছে যায়িদকে দেখে তাকে পাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করতেই খাদীজা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লা কে উপহার হিসেবে তাকে দিয়ে দিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দাসত্ব শৃংখল থেকে মুক্ত করে পালক পুত্র হিসেবে গ্রহন করলেন। এটা ছিল নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বের ঘটনা।

এরপর ইসলাম গ্রহণ করেন আবু বাক্র ইবনে আবু কুহাফা। তাঁর আসল নাম আতীক। আর আবু কুহাফার প্রকৃত নাম ছিল উসমান। আবু বাক্র রাদিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণ করার পর তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন। তিনি ছিলেন তাঁর গোত্রের অত্যন্ত জনপ্রিয়, বন্ধুবৎসল ও অমায়িক ব্যক্তি। কুরাইশদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত ও তাদের বংশপরিচয় সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত। কুরাইশদের ও তাদের ভালো-মন্দ ও কল্যাণ-অকল্যাণ সম্পর্কে তাঁর মত বিচক্ষণ জ্ঞানী আর কেউ ছিল না। তিনি ছিলেন ব্যবসায়ী, দানশীল ও চরিত্রবান লোক। গোত্রের  লোকেরা তাঁর কাছে ভীড় জমাতো। তাঁর অমায়িক মেলামেশা, পা-িত্য ও ব্যবসায়িক দক্ষতার কারণে অনেকেই তাঁর সাথে বন্ধুত্ব ও সখ্যতা স্থাপন করতো। এ জন্য গোত্রের মধ্য থেকে যারা তাঁর সান্নিধ্যে আসতো ও তাঁর নিকট অত্যন্ত বিশ্বস্ত ছিল, তিনি তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিতে লাগলেন। তাঁর দাওয়াতে একে একে ইসলাম গ্রহণ করলেন উসমান এবনে আফফান, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, আবদুর রহমান ইবনে আউফ, সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস ও তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ। এই পাঁচজন এবং আবু বাক্র, আলূ ও যায়িদ-মোট আটজনই ছিলেন প্রথম মুসলিম। তাঁরাই প্রথম নামায কায়েম করেন ও ইসলামকে মনে-প্রাণে গ্রহণ করেন।

এরপর আবু উবইদা ইবনুল জাররাহ, আবু সালামা ইবনে আবদুল আসাদ, আরকাম ইবনে আবুল আরকাম, [২২.আরকামের বাড়ী ছিল সাফা পাহাড়ের ওপর। এই বাড়ীতেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। হযরত উমারের (রা) ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে মুসলমানদের সংখ্যা চল্লিশে পৌঁছার পূর্বে পর্যন্ত এভাবে গোপনে অবস্থান ও দাওয়াতের কাজ চলতে থাকে। চল্লিশজন পূর্ণ হবার পর তারা জনসমক্ষে আত্ন প্রকাশ করেন।]

উসমান ইবনে মাযউন এবং তাঁর দুই ভাই কুদামা ও আবুদল্লাহ, উবাইদা ইবনে হারেস, সাঈদ ইবনে যায়িদ ইবনে আমর ও তাঁর স্ত্রী উমার উবনুল খাত্তাবের বোন ফাতিমা, আসমা বিনতে আবু বাক্র ও আয়িশা বিনতে আবু বাকর (আয়িশা তখন অল্পবয়স্কা বালিকা), খাব্বাব ইবনে আরাত, উমাইর ইবনে আবু ওয়াক্কাস, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, মাসউদ ইবনে কারী, সালীত ইবনে আমর, আইয়াশ ইবনে আবু রাবীয়া ও তাঁর স্ত্রী আসমা বিনতে সুলামা, খুনাইস ইবনে হুযাফা, আমের ইবনে রাবীয়া, আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ ও তাঁর ভ্রাতা আবু আহমদ, জাফর ইবনে আবু তালিব ও তাঁর স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস, হাতেব ইবনে হারেস ও তাঁর স্ত্রী ফাতিমা বিনতে মুজাল্লাল, তাঁর ভ্রাতা হুতাব ও তাঁর স্ত্রী ফুকাইহা বিনতে ইয়াসার, মা’মার ইবনে হারেস, সায়েব ইবনে উসমান ইবনে মাযউন, মুত্তালিব ইবনে আযহার ও তাঁর স্ত্রী রামলা বিনতে আবু আউফ, নাহহাম তথা নাঈম ইবনে আবদুল্লাহ, আমের ইবনে ফুহাইরা, খালিদ ইবনে সাঈদ ইবনুল আস ও তাঁর স্ত্রী আমীনা বিনতে খালাফ, হাতেব ইবনে আমর, আবু হুযাইফা ইবনে উতবা ইবনে রাবীয়া, ওয়াকিদ ইবনে আবদুল্লাহ, বুকাইর ইবনে আবদে ইয়ালীলের পুত্র খালিদ, আমের, আকেল ও ইয়াস, আম্মার ইবনে ইয়াসার ও সুহাইব ইবনে সিনান রুমী [২৩.সুহাইব জন্মগতভাবে আরব। তিনি শৈশবে রোমকদের হাতে বন্দী হন এবং তাদের মাঝেই দাস হিসেবে বড় হন। পরে কালব গোত্রের এক ব্যক্তি তাঁকে ক্রয় করে এন মক্কায় বিক্রয় করে। আদুল্লাহ ইবনে জুদআন তাঁকে খরিদ করে মুক্ত করেছেন। হাদেিস সাহাইব উসলাম গ্রহণকারী প্রথম রুমবাসী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।]  ইসলাম গ্রহণ করেন।

প্রকাশ্য দাওয়াত

এরপর লোকেরা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে। ফলে মক্কার সর্বত্র ইসলামের কথা ছড়িয়ে পড়ে এবং এ বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা হতে থাকে। অতঃপর মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাঁর রাসূলকে তাঁর বাণী উচ্চকণ্ঠে প্রচার করার নির্দেশ দেন এবং আল্লাহর দীনের দাওয়াত নিয়ে জনগণের মধ্যে প্রকাশ্যে ঝাঁপিয়ে  পড়তে বলেন। নবুওয়াত লাভের পর ইসলামের প্রকাশ্য প্রচার শুরু হবার আগে গোপন প্রবার কাজ তিন বছর ধরে চলে। তখন আল্লাহ এই নির্দেশ দেন,“হে নবী,এখন আপনি উচ্চকণ্ঠে প্রচার শুরু করুন এবং মুশরিকদের কথার প্রতি ভ্রƒক্ষেপ করবে না।” তিনি আরো বলেন, “হে নবী, আপনি আপনার নিকট-আত্মীয়দেরকে সতর্ক করুন আর আপনার অনুসারী মু’মিনদের প্রতি অনুকম্পাশীল ও সদয় থাকুন। আর বলুন : আমি প্রকাশ্য সতর্ককারী।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাগণ নামায পড়ার সময় দুর্গম গিরিগুহায় চলে যেতেন এবং লোকজনের চোখের আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে নামায পড়তেন। একদিন সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস সহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাদের এবটি ক্ষুদ্র দল মক্কার কোন এক পর্বত গুহায় নামায পড়ছেন, এমন সময় মক্কার মুশরিকদের একটি দল সেখানে উপস্থিত হয়। তারা মুমিনদেরকে কঠোরভাবে নিন্দা ও গালিগালাজ করতে থাকে এবং এক পর্যায়ে তারা তাদের ওপর হামলা চালিয়ে তাদেরকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাসক এই সময় একটা মরা উটের চোয়ালের হাড় দিয়ে প্রচ- জোরে আঘাত হেনে মুশরিকদের একজনের মাথা ফাটিয়ে দেন। ইসলামের জন্য এটাই ছিল রক্তপাতের প্রথম ঘটনা।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর নির্দেশ মুতাবিক প্রকাশ্য দাওয়াত দিলেও যতক্ষণ তাদের দেব-দেবীর সমালোচনা করেননি ততক্ষণ তারা তাঁর থেকে দূরে যায়নি কিংবা তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখরও হননি। কিন্তু যখন তিনি তাদের দেব-দেবীর সমালোচনা করলেন তখনই তারা তাঁর আন্দোলনকে একটা ভয়ংকর ও মারাত্মক জিনিস বলে মনে করলো। তাঁর বিরুদ্ধে প্রচ-ভাবে ক্ষেপে উঠলো এবং তাঁর বিরুদ্ধতা ও শত্রুতায় কোমর বেঁধে নামলো। তবে স্বল্পসংখ্যক লোক যারা তখনো আত্মপ্রকাশ করেননি- ইসলামের খাতিরে এই শত্রুতা থেকে তাদেরকে রক্ষা করলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি তাঁর চাচা আবু তালিব পুর্ণ সহানুভূতি ও অনুকম্পা দেখাতে থাকেন। তিনি কুরাইশদের আক্রমণের মুখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রক্ষা করতে থাকলেন এবং তার পাশে এসে দাঁড়ালেন। ফলে তিনি আল্লাহর দ্বীন প্রচারের কাজ অপ্রতিহত গতিতে চালিয়ে যেতে সক্ষম হলেন। কিন্তু কুরাইশরা যখন দেখলো, সম্পর্কচ্ছেদ ও দেব-দেবীর সমলোচনার বিরুদ্ধে তাঁদের প্রবল আপত্তিকেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিন্দুমাত্র পরোয়া করছেন না, অধিকন্তু তাঁর চাচা তাঁকে আশ্রয় দিয়ে চলছেন, কোন মতেই তাঁকে কুরাইশদের হাতে সমর্পণ করছে না; তখন একদিন কুরাইশদের গণ্যমান্য নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ সদলবলে আবু তালিবের কাছে গিয়ে বললো, “হে আবু তালিব আপনার ভাতিজা আমাদের দেব-দেবীকে গালি-গালাজ করেছে, আমাদের ধর্মের নিন্দা করেছে, আমাদের বুদ্ধিমত্তাকে বোকামী ঠাউরিয়েছে এবং আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে পথভ্রষ্ঠ বলে আখ্যায়িত করেছে। এমতাবস্থায় হয় আপনি তকে এসব থেকে বিরত রাখুন নতুবা তাকে শায়েস্তা করার জন্য আমাদেরকে সুযোগ দিন।” আবু তালিব তাদেরকে হৃদয়গ্রাহী ভাষায় জবাব দিলেন এবং বুঝিয়ে-সুজিয়ে বিদায় করলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কাজ যথারীতি চালিয়ে যেতে লাগলেন। তিনি আল্লাহর দীনের দিকে মানুষকে দাওয়াত দিতে থাকলেন ও তাঁর প্রচার-প্রসারের কাজ অব্যাহত রাখলেন। ফলে কুরাইশদের বিদ্বেষ ও আক্রোশ দিন দিন বেড়ে যেতে লাগলো। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনায় মেতে উঠলো এবং পরস্পরকে তাঁর বিরুদ্ধে উস্কানী দিতে আরম্ভ করলো।

তাই পুনরায় তারা আবু তালিবের কাছে উপস্থি হয়ে বললো, হে আবু তালিব, আপনি আমাদের মধ্যে প্রবীণ ও মুরুব্বী। আমারা আপনাকে গণ্যমান্য ও শ্রদ্ধেয় মনে করি।

আমরা বলেছিলাম, আপনার ভাতিজাকে নিষেধ করুন কিন্তু আপনি তা করলেন না। আল্লাহর কসম, এভাবে আর চলতে দিতে পারি না। সে আমাদের সমলোচনা দেব-দেবীর নিন্দা ও আমাদের বুদ্ধিমত্তাকে বোকামী ঠাওরানোর যে ধৃষ্টতা দেখিয়ে যাচ্ছে তা আমরা আর সহ্য করতে পারি না। এখন হয় আপনি তাকে নিবৃত করবেন নচেৎ আমরা আপনাকে সহ তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবো এবং একপক্ষ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আগে আর থামবো না।”

আবু তালিব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ডেকে পাঠালেন। তিনি তাঁকে বললেন, “ভাতিজা তোমার সম্প্রদায়ের লোকজন আমার কাছে এসে এইসব কথা বলেছে।” এই বলে তিনি কুরাইশ নেতৃবৃন্দ যা বলেছিলো তা তাঁকে বললেন। তারপর বললেন, “অবস্থা যখন এই পর্যায়ে উপনীত হয়েছে তখন তুমি নিজেকে ও আমাকে সামলে চলো। আমার ওপর আমার সাধ্যের বেশী কোন কিছু চাপিয়ে দিও না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মনে করলেন, চাচা মত পাল্টে ফেলেছেন, কুরাইশদের মুকাবিলায় তাঁকে একাকী  ছেড়ে দিতে চাচ্ছেন এবং তাঁর সহায়তা করতে অক্ষম হয়ে পড়েছেন। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন “চাচা, আল্লাহর কসম করে বলছি, তারা যদি আমার ডান হাতে সূর্য ও বাম হাতে চাঁদ এন দেয় এবং তার বিনেময়ে আমাকে এই কাজ ত্যাগ করতে বলে, তবুও আমি এটা ত্যাগ করবো না। আমি ততদিন পর্যন্ত এ কাজ করতে থাকবো, যতদিন না আল্লাহ তাঁর দীনকে বিজয়ী করেন কিংবা এই কাজ করতে করতে আমি ধ্বংস হয়ে যাই।” এই কথা বলার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দু’চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো অতঃপর তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং চলে যেতে উদ্যত হলেন। কিছুদূর অগ্রসর হলে আবু তালিব তাঁকে ডেকে বললেন, “হে ভাতিজা, কাছে এসো।” তিনি কাছে গেলেন। আবু তালিব বললেন, “ভাতিজা, ঠিক আছে। তুমি যা বলতে চাও বলতে থাক। আমি কখনো কোন কারণে তোমাকে ওদের কাছে সর্পণ করবো না।”

কুরাইশরা যখন জানতে পারলো যে, আবু তালিব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবমাননাকর অবস্থার মুখে একা ছেড়ে দিতে রাজি নন এবং তাদের সম্পর্কচ্ছেদ ও শত্রুতা সত্ত্বেও তাঁকে তাহাদের হাতে তুলে না দিতেও অবিচল, তখন তারা উমারাহ ইবনে ওয়ালদি ইবনে মুগীরা নামক এক যুবককে আবু তালিবের কাছে নিয়ে গেয়ে বললো, “হে আবু তালিব, এই যুবককে দেখুন, এর নাম উমারাহ ইবনে ওয়ালীদ কুরাইশ গোত্রে এর মত সাহসী, শক্তিমান ও সুদর্শন যুবক আর নেই। একে আপনি পুত্র হিসেকে গ্রহণ করুন। এর বুদ্ধিমত্তা ও সাহায্য-সহোযোগিতা দ্বারা আপনি উপকৃত হতে পারবেন। আর আপনার ঐ ভাতিজাকে আমাদের হাতে তুলে দিন, যে আপনার পূর্বপুরুষের ধর্মের বিরোধিতা করছে, আপনার সম্প্রায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করছে এবং তাদের বুদ্ধিমত্তাকে বোকামি ঠাওরাচ্ছে। তাকে আমাদের হাতে তুলে দিন, আমরা তাকে হত্যা করি। একজন মানুষের বিনিময়ে একজন মানুষ আপনি পেয়ে যাচ্ছেন।”

আবু তালিব বললেন, “আল্লাহর কসম, তোমরা অত্যন্ত জঘন্য ব্যাপার আমার ওপর চপিয়ে দিচ্ছ। আমি কি এমন প্রস্তাব মেনে নিতে পারি যে, তোমরা তোমাদের সন্তান আমাকে দেবে, আমি তাকে খাইয়ে-দাইয়ে মানুষ করবো আর আমার সন্তান তোমাদের হেিত তুলে দেবো, তোমরা তাকে হত্যা করবে? খোদার কসম, জেনে রেখো, এটা কখনো হবে না।”

মুতয়িম ইবনে আদী বললো, “হে আবু তালিব, আপনার সম্প্রদায় আপনার কাছে ন্যয়সঙ্গত প্রস্তাবই দিয়েছে। আপনি নিজেও যা পছন্দ করেন না তা থেকে তারা আপনাকে অব্যাহতি দিতে চাচ্ছে। অথচ মনে হচ্ছে, আপনি তাদের কোন প্রস্তাবই গ্রহণ করতে প্রস্তুত নন।” আবু তালিব মুতয়িমকে বললেন, “আল্লাহর কসম, তারা আমার প্রতি সুবিচার করেনি। আসলে তুমি আমাকে অপমানিত করতে বদ্ধপরিকর। এজন্য গোটা সম্প্রদায়কে আমার বিরুদ্ধে লিলিয়ে দিতে চাচ্ছ। এখন তোমার যা ইচ্ছা করতে পার।”

এবার ব্যাপারটা সবার আয়ত্তের বাইরে চলে গেল এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি দেখা দিল। কুরাইশরা পরস্পরকে যুদ্ধের জন্য ক্ষেপিয়ে তুলতে লাগলো। প্রত্যেক গোত্র তার মধ্যে অবস্থানকারী মুষ্টিমেয় মুসলমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো, ভয়ংকর নির্যাতন শুরু করে দিল এবং ইসলাম ত্যাগ করার জন্য কঠোর চাপ দিতে লাগলো একমাত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই নির্যাতন থেকে নিরাপদ রইলেন। চাচা আবু তালিবের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁকে রক্ষা করলেন।

আবু তালিব যখন দেখলেন কুরাইশরা চরম হিংসাত্মক পথ বেছে নিয়েছে, তখন বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব গোত্রের লোকদের সাথে তিনি যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রক্ষা করা ও তাঁর প্রতি যে কোন অশোভন আচরণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর যে নীতি তিনি গ্রহণ করেছিলেন তার প্রতি সমর্থন ও সহযোগিতা দানের জন্য সকলকে আহ্বান জানালেন। এই দুই গোত্রের সকলেই তাঁর আহ্বানে সাড়া দিলো ও তাঁকে সমর্থনের আশ্বাস দিলেন। একমাত্র আল্লাহর দুশমন অভিশপ্ত আবু লাহাব সমর্থন দিল না।

কুরআন সম্পর্কে ওয়ালীদ ইবনে মুগীরার মন্তুব্য

প্রবীণ কুরাইশ নেতা ওয়ালীদ ইবনে মুগীরার কাছে কুরাইশদের একটি দল সমবেত হলো। তখন হজ্জের মওসুম সমাগত। ওয়ালীদ বললো, “হে কুরাইশগণ, হজ্জের মওসুম সমাগত। আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তোমাদের এখানে লোক আসবে। আর মুহাম্মাদের কথা তারা ইতিমধ্যেই শুনেছে। সুতরাং তোমরা তার সম্পর্কে একটি সর্বসম্মত মত স্থির কর। এ ব্যাপারে তোমাদের মধ্যে যেন কোন রকম মতানৈক্য না থাকে। একজন একটা বলবে, আরেকজন তার কথা খ-ন করবে এমন যেন না হয়। তাহনে একজনের কথা আরেকজনের কথা দ্বারা মিথ্যা প্রমাণিত হবে।”

 সবাই বললো, “তাহলে আপনিই একটা মত ঠিক করে দিন। আমরা সবাই সেই মতেরই প্রতিধ্বনি করবো।”ওয়ালীদ বললো, “বলো তোমারাই বলো, আমি শুনি।” সমবেত সবাই বললো, “আমরা বলবো, মাহাম্মাদ একজন গণক।” ওয়ালীদ বললো, “না, সে গণক নয়। আমরা অনেক গণককে দেখেছি। মাহাম্মাদের কথাবার্তা গণকের ছন্দবদ্ধ অস্পষ্ট কথার মত নয়।”

সবাই বললো, “তাহলে আমরা বলবো, মুহাম্মাদ পাগল।”

ওয়ালীদ বললো, “না, সে পাগলও নয়। আমরা অনেক পাগল দেখেছি, আর পাগলামী কাকে বলে তাও জানি। পাগলের কথাবার্তায় জড়তা ও অস্পষ্টতা থাকে, প্রবল ভাবাবেগের মূর্ছনা এবং সন্দেহ-সংশয়ে তা ভারাক্রান্ত থাকে। কিন্তু মুহাম্মাদের কথায় তা নেই।”

সবাই বললো, “তাহলে আমরা বলবো, সে একজন কবি।”

ওয়ালীদ বললো, “না সে কবিও নয়। আমরা সব ধরনের কবিতা সম্পর্কে অবহিত। কিন্তু মুহাম্মাদের কথা কোন ধরনের কবিতার আওতায় পড়ে না।”

সবাই এবার বললো, “তাহলে আমরা বলবো, সে যাদুকর।” ওয়ালীদ বললো, “সে যাদুকরও নয়। আমরা যাদুকর ও যাদু অনেক দেখেছি। কিন্তু তাদের মত গিরা দেয়া ও গিরায় ফুঁক দেয়ার অভ্যাস মুহাম্মাদের নেই।” সবাই বললো, “তাহলে আপনি কি বলতে চান?”

ওয়ালীদ বললো, “এতে কোন সন্দেহ নেই যে, মাহাম্মাদের কথা শুনতে বেশ মিষ্টি লাগে। তার গোড়া অত্যন্ত শক্ত এবং শাখা-প্রশাখা ফলপ্রসূ। তোমরা যে কথাই বলবে তা মথ্যিা বলে প্রতিপন্ন হবে। তবে সবচেয়ে উপযুক্ত কথা হবে তাকে যাদুকর বলা। কেনা সে এমনভাবে কথা বলে যা ভাইয়ে ভাইয়ে, স্বামী-স্ত্রীতে ও আত্মীয়-স্বজনের পরস্পরের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে যাদুর মতই কার্যকর। তাই তাকে যথার্থ যাদুই বলা চলে এর প্রভাবে জাতি বাস্তুবিকই বিভেদের শিকার হয়েছে।

এরপর হজ্জের মওসুমে লোকজনের আগমন শুরু হলে কুরাইশরা লোকজনের যাতায়াতের পথে জটলা করে বসে থাকতে লাগলো। আর যখনই কেউ তাদের পাশ দিয়ে যেতো তখনই তাকে বলতো মুহাম্মাদের সংস্পর্শ থেকে যেন সে সাবধান থাকে। আর তাকে তারা মুহাম্মাদের তৎপড়তা সম্পর্কেও অবহিত করতো। এই উপলক্ষে আল্লাহ ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা সম্পর্কে নাযিল করলেন,

“যাকে আমি একা সৃষ্টি করেছি তার সাথে বুঝাপড়ার দায়িত্ব আমার জন্য রেখে দাও। তাকে সৃষ্টি করার পর আমি অনেক সম্পদ দিয়ে সর্বক্ষণ পাশে থাকার মত অনেক পুত্র সন্তান দিয়েছি এবং তার নেতৃত্ব ও প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছি। এরপরও যাতে তাকে আরো অধিক দান করি সেজন্য সে লালায়িত। তা কক্ষণো হবে না। সে আমার আয়াতসমূহের প্রতি অত্যন্ত বৈরীভাবাপন্ন।”

এরপর যার সাথেই দেখা হয়, তার কাছেই তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে ঐসব কথা বলতে লাগলো। হজ্জের মওসুম শেষে আরবরা যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো তখন তাদের মুখে কেবল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রসঙ্গই আলোচিত হতে লাগলো। এভাবে আরবের প্রতিটি জনপদে তাঁর কথা ছড়িয়ে পড়লো।

রাসূলুল্লাহর (সা) ওপর উৎপীড়নের বিবরণ

ক্রমেই কুরাইশরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতে লাগলো। রাসূলুল্লাহ ও তাঁর সহচরদের শত্রুতায় তারা বেসামাল হয়ে উঠলো। তারা মূর্খ ও বখাটে ধরনের লোকদের উস্কিয়ে দিতে লাগলো। এইসব অর্বাচীন তাঁকে মিথ্যাবাদী বলে গালাগালি এবং নানাভাবে কষ্ট দিতে লাগলো। তাঁকে কনি, যাদুকর, জ্যোতিষী ও পাগল বলে অপবাদ দিলো। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর দীন প্রচার ও প্রসার করার কাজে অবিচল থাকরেন। ক্রমেই তিনি অধিকতর প্রকাশ্যভাবে দাওয়াত দিতে লাগলেন। আরবদের বাতিল রসম রেওয়াজের সমালোচনা, তাদের মূর্তিপূজা প্রত্যাখ্যান ও তাদের কুফরী মতবাদের সাথে তাঁর সম্পর্কচ্ছেদের কথা তাদের কাছে ঘোর আপত্তিকর হওয়া সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তা করতে লাগলেন। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস বলেন-

“একদিন যখন কুরাইশ সরদারগণ হাজরে আসওয়াদের নিকট সমবেত হয়েছে, তখন আমি সেখানে উপস্থিত হলাম। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বললো, “এই লোকটার ব্যাপারে আমরা যতটা সহিষ্ণুতা দেখিয়েছি তা নজিরবিহীন। সে আমাদেরকে বোকা বানিয়েছে এবং আমাদের দেবদেবীকে গালাগালি করেছে। অত্যন্ত নাজুক ও মারাত্মক ব্যাপারে আমরা তাকে সহ্য করেছি।” এভাবে তাদের মধ্যে আলোচনা চলতে থাকাকালে সহসা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে আবির্ভূত হলেন। শান্ত পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে তিনি হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করলেন। তাদের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় কেউ কেউ বিরূপ মন্তব্য করলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখম-লে আমি সে মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলাম। দ্বিতীয়বার যখন তাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন তখন তারা আবার শ্লেষপূর্ণ মন্তব্য করলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারায় আমি তার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলাম। তৃতীয় বারে তাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় আবার তারা অনুরূপ মন্তব্য করলে তিনি সেখানে থেমে বললেন, “হে কুরাইশগণ, শোন, যার হাতে আমার প্রাণ সেই সত্তার শপথ করে বলছি, আমি তোমাদের সর্বনাশ বয়ে এনেছি (যদি তোমরা ঈমান না আন)।”

তাঁর উক্তিতে জনতা বজ্রাহতের ন্যায় স্তব্ধ ও হতবাক হয়ে গেল। তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি ক্ষণকাল আগেও তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশী আক্রোশ ও উস্কানিমূলক কথা বলেছে, সেও যথাসম্ভব মিষ্ট কথা বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শান্ত করতে উদ্যত হলো। এমনকি সি বলতে বাধ্য হলো, “আবুল কাসিম, তুমি যাও। তুমি তো আর নির্বোধ নও।”

এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকে চলে গেলেন। পরদিন সবাই একই স্থানে সমবেত হলো। আমিও সেখানে ছিলাম। তখন তারা বলাবলি করতে রাগলো, “দেখলে তো! মহাম্মাদের কতদূর বাড় বেড়েছে এবং সে কতদূর ধৃষ্টতা দেখালো। তোমরা যে কথা একবারেই পছন্দ কর না তা সে তোমাদের মুখের ওপর স্পষ্ট বলে দিল। আর তোমরা তাকে ছেড়ে দিলে।”

ঠিক সেই মুহূর্তেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে আবির্ভূত হলেন। আর যায় কোথায়! সকলে একযোগে তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। সবাই তাঁকে ঘেরাও করে বলতে থাকলো, “তুমিই তো আমাদের ধর্ম ও দেব-দেবীর বিরুদ্ধে আপত্তিকর কথা বলে থাকো।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “হ্যাঁ আমিই ঐসব কথ বলে থাকি।” আমি দেখলাম তাদের মধ্যে এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহকে তাঁর গলার ওপরের চদরের দু’পাশ ধরে ফাঁস লাগিয়ে হত্যা কতে উদ্যত হয়েছে। সেই মুহূর্তে হযরত আবু বাক্র এগিয়ে গিয়ে বাধা দিলেন। তিনি কেঁদে ফিললেন এবং বললেন, “একটি লোক আল্লাহকে নিজের রব কলে ঘোষনা করেছ, এই কারণে কি তোমরা তাঁকে হত্যা করে ফেলবে।”

এরপর জনতা সেখান থেকে চলে গেল। সেদিন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর কুরাইশদের যেরূপ মারাত্মক আক্রমণ দেখেছি, তেমন আর কখনও দেখিনি।”

হামযার ইসলাম গ্রহণ

আসলাম গোত্রের একজন তুখোড় স্মৃতিধর ব্যক্তি আমাকে বললেন,

“একদিন সাফা পর্বতের পাশে আবু জাহল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাক্ষাত পায়। ঐ সময় সে তাঁর সাথে দুর্ব্যবহার করে তাঁকে গালি দেয়। সে তাঁকে অত্যন্ত অপ্রীতিকর কথা বলে। ইসলামের বিরুদ্ধে কটূক্তি এবং তাঁর দাওয়াত ও আন্দোলনের প্রতি শ্লেষাত্মক বাক্যবাণ নিক্ষেপ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাবে কোন একটি কথা বললেন না। আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের এক দাসী নিজের ঘরে বসে এসব কটূক্তি শুনতে পায়। অতঃপর আবু জাহল সে স্থান ত্যাগ করে কা’বার পাশে কুরাইশদের এক দরবারে গিয়ে বসে।

এর অল্পক্ষণ পওেরই আবদুল মুত্তালিবের পুত্র হামযা তীর-ধনুক সজ্জিত অবস্থায় শিকার থেকে ফিরছিলেন। তিনি একজন ভাল শিকারী ছিলেন। শিকারের প্রতি তীর নিক্ষেপে ও শিকারের সন্ধান করায় তিনি বেশ পটু ছিলেন। এরকম শিকার করে যখনই তিনি ফিরতেন তখন পথে কুরাইশদের কোন দরবার বা জটলা দেখলে সেখানে থামতেন, সালাম দিতেন এবং তাদের সাথে কথাবার্তা বলতেন। তিনি ছিলেন কুরাইশদের সম্ভ্রান্ত ও তাগড়া জোয়ান। তিনি যখন আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের দাসীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাড়ি ফিরে গিয়েছেন। দাসি হামযাক দেখেই বললো, একটু আগে হিশামের পুত্র আবুল হাকাম [২৪. আবুল হাকাম আবু জাহলের উপনাম বা উপাধি। তার নাম আমর ইবনে হিশাম ইবনে মুগীরা ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উমার ইবনে মাখযুম।] তোমার ভাতিজা মুহাম্মাদের সাথে কি আচরণ করেছে তা যদি দেখতে। এখানে মুহাম্মাদ বসা ছিল। তাকে দেখেই সে তার সাথে দুর্ব্যবহার ও গালাগালি করেছে। তার সাথে অত্যন্ত আপত্তিকর আচরণ করেছে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটা কথাও না বলে চলে গেল।”

হামযা এ কথা শুনে ক্রোধে অধীর হয়ে পড়লেন। কেননা আল্লাহ তাঁকে ইসলামের গৌরব মুকুট পরাতে চাচ্ছিলেন। তাই তিনি আবু জাহলেন সন্ধানে দ্রুত ছুটে গেলেন। পথে কারো কাছে দাঁড়ালেন না। তাঁর ইচ্ছা ছিল আবু জাহলকে পেলেই তাকে শিক্ষা দেবেন। মসজিদে হারামে ঢুকেই  দেখলেন, সে দরবার জমিয়ে বসে আছে। তিনি তার গিকে এগিয়ে গেলেন। কাছে গিয়েই ধনুক দিয়ে তাকে প্রচ- আঘাত করে গুরুতরভাবে জখম করে দিলেন। অতঃপর বললেন, “তুই মুহাম্মাদকে গালাগালি করিস? অথচ আমি তার ধর্ম গ্রহণ করেছি। সে যা কিছুই বলে আমি তা সমর্থনকারী। পারিস তো আমাকে পাল্টা আঘাত কর দেখি।”

তৎক্ষণাৎ বনী মাখযুম গোত্রের কিছু লোক ছুটে এল হামযার বিরুদ্ধে আবু জাহলকে সাহায্য করতে। কিন্তু আবু জাহল বললো, “তোমরা হামযাকে কিছু বলো না। কেনানা আমি সত্যিই তার ভতিজাকে অত্যন্ত জঘন্য ভাষায় গালাগালি করেছি।”

হামযা ইসলামের ওপর দৃঢ় ও অবিচল রইলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কার্যক্রমে সাহায্য ও সহায়তা অব্যাহত রাখলেন। হামযার (রা) ইসলাম গ্রহণের পর কুরাইশরা উপলব্ধি করলো যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এখন আর নিপীড়ন ও হেয় করা সহজ হবে না। কিছু করতে গেলেই হামযা এসে রুখে দাঁড়াবে। তাই আপাততঃ তারা উৎপীড়নের মাত্রা কিছুটা কমিয়ে দিল।

 

রাসূলুল্লাহর (সা) আন্দোলন প্রতিরোধে উতবার ফন্দি

একটি সুত্র আমাকে জানিয়েছে যে, বিশিষ্ট কুরাইশ সরদার উতবা ইবনে রাবীআ একদিন কুরাইশদের দরবারে বসে ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সমজিদে হারামে একাকী বসেছিলেন। উতবা বললো, “হে কুরাইশগণ, আমি মুহাম্মাদের কাছে যেয়ে কিছু কথা বলবো। তার কাছে কিছু প্রস্তাব রাখবো। হয়তো সে কিছু প্রস্তাব মেনে নেবে এবং তার প্রচার বন্ধ করবে। তোমরা এটা কেমন মনে কর?”

এ সময়ে হামযা ইসলাম গ্রহণ করায় মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে আরম্ভ করেছে। তাই সকলে বললো, “খুব ভালো প্রস্তাব। আপনি যান এবং কথা বলুন।”

উতবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের  কাছে গেল এবং তাঁর পাশে গিয়ে বসলো। সে বললো, “ভতিজা, তুমি আমাদেরগোত্রের মধ্যে কতখানি সম্ভ্রান্ত ও বংশমর্যাদা সম্পন্ন তা তোমার অজানা নয়। তুমি একটা মারাত্মক ব্যাপার নিয়ে তোমার জাতির কাছে আবির্ভূত হয়েছ। তোমার এ দাওয়াত জাতির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে। তুমি তাদেরকে বেকুফ ঠাউরিয়েছ এবং তাদের পূর্বপুরুষদের হেয় প্রতিপন্ন করেছ। আমার কথা শোনো! তোমার কাছে কয়েকটা বিকল্প প্রস্তাব রাখছি। একটু ভেবে দেখো এর কিছু কিছু মেনে নিতে পার কিনা।”

রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “বেশ, বলুন। আমি শুন।”

উতবা বললো, “ভাতিজা, তুমি যে নতুন দাওয়াত দিতে শুরু করেছ, এর দ্বারা যদি বিপুল সম্পদ লাভ করা তোমার  ইচ্ছা হয়ে থাকে, তাহলে আমরা তোমার জন্য অর্থ সংগ্রহ করে তোমাকে আমাদের ভিতরে সবচেয়ে বিত্তশালী বানিয়ে দেবো। আর যদি তুমি পদমর্যাদা লাভ করতে চাও তাহলে আমরা তোমাকে এ দেশের রাজা  বানিয়ে দেবো। আর যদি এমন হয়ে থাকে যে, তোমার কাছে জ্বিন আসে, তাকে তুমি হটাতে পারছ না, তাহলে আমরা তোমার চিকিৎসা করাবো। যত টাকা লাগুক তোমাকে সুস্থ করে তুলবো। কেননা অনেক সময় জ্বিন মানুষের ওপর পরাক্রান্ত হয়ে থাকে এবং তাকে তাড়ানোর জন্য চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।”

এই পর্যন্ত বলে উতবা থামলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মনোযোগ সহকারে উতবার কথা শুনছিলেন। তার কথা শেষ হলে তিনি বললেন, “হে আবুল ওয়ালীদ, আপনার কথা কি শেষ  হয়েছে?”-“হাঁ।” তিনি বললেন, “তাহলে আমার কিছু কথা শুনুন।” উতবা বললো, বলো।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুরা হামীম আস সাজদা তিলাওয়াত করা শুরু করলেন। “বিসমিল্লাহির রাহমনির রাহীম। হা-মীম! এটা পরমত করুণাময় ও দয়ালু আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হওয়া কিতাব। আরবী ভাষায় নাযিলকৃত কিতাব কুরআন। এর আয়তগুলোকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, জ্ঞানী লোকদের জন্য। সুসংবাদবাহী ও সতর্ককারী হিসেবে তা এসেছে। কিস্তু তাদের অধিকাংশই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে; তারা শুনতে চায় না। তারা বলে, তুমি যে বিষয়ের দিকে আমাদের আহ্বান করছো, আমাদের মন তা থেকে পর্দার আড়ালে রয়েছে।”উতবা স্তব্ধ হয়ে শুনতে লাগলো। সে পেছনের দিকে হাতে ভর দিয়ে বসে খুবই মনোযোগের সাথে তাশুনছিলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিলাওয়াত করতে করতে ঐ সূরায় সিজদার আয়াতে গিয়ে থামলেন এবং সিজদা করলেন।[২৫.আয়াতটি হলো এই : দিন ও রাত,সূর্য ও চন্দ্র এ সবই আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন। তোমরা সূর্য ও চন্দ্রের উদ্দেশ্যে সিজদা করো না- একমাত্র আল্লাহকে সিজদা কর,যিনি এসব সৃষ্টি করেছেন- যদি একমাত্র তাঁর ইবাদাত করতে প্রস্তুত থেকে থাক।] এরপর বললেন, “যা শুনবার তা তো শুনলেন। এখন যা করনীয় মনে করেন করুন।”

অতঃপর উতবা উঠে তার সঙ্গীসাথীদের কাছে ফিরে গেলো। সঙ্গীরা তাকে দেখে পরস্পর বলাবলি করতে লাগলো, উতবা এক রকম চেহারা নিয়ে গিয়েছিল, এখন ভিন্ন রকম চেহারা নিয়ে ফিরে আসছে।” দলবলের মধ্যে গিয়ে বসতেই সবাই তাকে জিজ্ঞেস করলো, “হে আবুল ওয়ালীদ, আপনার কথা কী?”

উতবা বললো, “আমি এমন বাণী শুনেছি যা আর কখনো শুনিনি। হে কুরাইশগণ, সত্যিই তা কবিতাও নয়, কোন জ্যোতিষীর কথাও নয়। তোমরা আমার কথা শোনো এবং এই ব্যাপারটা আমার ওপর ছেড়ে দাও। এই লোকটা যা করতে চায় করতে দাও। তার সাথে কোন সংশ্রব রাখো না। আমি নিশ্চিত যে, মুহাম্মাদ যে কথা প্রচারে নিয়োজিত, তা ভবিষ্যতে বিরাট আলোড়ন তুলবে। আরবরা যদি তার বিপর্যয় ঘটায় তাহলে তোমরা অন্যের সাহায্যে তার হাত থেকে রক্ষা পেয়ে গেলে। আর যদি সে আরবদের ওপর জয়যুক্ত হয় তাহলে তার রাজত্ব তোমাদেরই রাজত্ব হবে। তার মর্যাদা তোমাদেরই মর্যাদার কারণ হবে। পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা সৌভাগ্যবান জনগোষ্ঠী।” এ কথায় সবাই একবাক্যে বলে উঠলো, “মুহাম্মাদ এবার তোমাকে যাদু করেছে।” উতবা বললো, “এটা আমার অভিমত। এখন তোমরা যা ভাল বুঝ কর।”

কুরাইশ নেতাদের সাথে রাসূলুল্লাহর (সা) কথোপকথন

মক্কার কুরাইশ গোত্রসমূহের নারী ও পুরুষদের মধ্যে ইসলাম ক্রমান্বয়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। আর কুরাইশরা মুসলমানদের যাকে পারতে আটক করে রাখতো এবং তার উপর কঠিন অত্যাচার চারাতো!

এই অবস্থায় পরিপেক্ষিতে একদিন সূর্যাস্তের পর প্রত্যেক গোত্র থেকে কুরাইশ সরদারগণ কা’বা শরীফের নিকট জমায়েত হলো। যারা জমায়েত হলো তারা হচ্ছে উতবা ইবনে রাবীয়া, শাইবা ইবনে রাবীয়া, আবু সুফিয়ান ইবনে হারব, নাদার ইবনে হারেস,আবুল বুখতারী ইবনে হিশাম, আসওয়াদ ইবনে মুত্তালিব, যামআ ইবনে আসওয়াদ, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা, আবু জাহল ইবনে হিশাম, আবদুল্লাহ ইবনে আবু উমাইয়া, আস ইবনে ওয়ায়েল, নুবাইহ্ ইবনে হাজ্জাজ, মুনাববিহ ইবনে হাজ্জাজ এবং উমাইয়া ইবনে খালাফ। তারা পরস্পরকে বলতে লাগলো, “মুহাম্মাদকে ডেকে পাঠাও, তার সাথে কথা বল, প্রয়োজনে ঝগড়াও কর। তাহলে জনতার কাছে তোমরা দোষ এড়িয়ে যেতে পারবে।” যথার্থই তাঁর কাছে দূত পাঠানো হলো। দূত গিয়ে বললো, “কুরাইশ নেতৃবৃন্দ তোমার সাথে কথা বলার জন্য জমায়েত হয়েছেন। তাদের কাছে একটু চলো।”

একথা শোনা মাত্রই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ত্রস্তপদে তাদের কাছে ছুটে এলেন। তিনি ভেবেছিলেন যে, তিনি তাদের কাছে যে দাওয়াত দিয়েছেন সে সম্পর্কেই বোধ হয় তারা নতুন কিছু চিন্তাভাবনা করেছে। বস্তুতঃ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আস্তরিকভাবে কামনা করতেন যে, তারা সঠিক পথে ফিরে আসুক। তাদের গোয়ার্তুমি ও অত্যাচারে তিনি ভীষণ দুঃখিত ছিলেন। তিনি গিয়ে কুরাইশ নেতৃবৃন্দের পাশে বসলেন। তারা বললো, “হে মুহাম্মাদ তোমার সাথে কিছু কথা বলার জন্য আমরা তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছি। খোদার কসম, তুমি তোমার সম্প্রদায়ের মধ্যে যে বিভেদ সৃষ্টি করেছ, তেমন আর কোন আরব কখনো করেছে কলে আমাদের জানা নেই। তুমি পূর্বপুরুষদের ভর্ৎসনা করেছ, প্রচলিত ধর্মের নিন্দা করেছ, দেব-দেবীকে গালিগালাজ করেছ, বুদ্ধিমান লোকদের বোকা ঠাউরিয়েছ এবং জাতির ঐক্যে ভাঙ্গন ধরিয়েছ। মোটকথা, আমাদের ও তোমার মধ্যে কোন খারাপ জিনিসই আনতে তুমি বাকী রাখনি। এখন কথা হলো এসব কথা বলে তুমি যদি সম্পদ অর্জন করতে মনস্থ করে থাক, তাহলে আমরা তোমাকে টাকা কড়ি সংগ্রহ করে দিই, যাতে তুমি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বিত্তশালী হতে পার। আর যদি এর দ্বারা তুমি পদমর্যাদার প্রত্যাশী হয়ে থাক, তাহলে আমরা তোমাকে সরদার বানিয়ে দিই। আর যদি তুমি রাজা বাদশাহ হতে চাও তাহলে এস তোমাকে আমাদের রাজা বানিয়ে নিই। আর তোমার কাছে যে দূত আসে সে যদি কোন জ্বিন-ভূত হয়ে থাকে এবং তোমার ওপর পরাক্রান্ত হয়ে থাকে তাহলে আমরা যত টাকা লাগুক, তোমার চিকিৎসা করাতে প্রস্তুত যাতে তুমি সুস্থ হয়ে ওঠ অথবা তোমার সম্পর্কে জনত্র কাছে আমাদের কোন জবাবদিহি করতে না হয়।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাবে বললেন, “তোমরা যা যা বলছ তার কোনটাই আমি চাই না। আমি যে দাওয়াত তোমাদের কাছে পেশ করেছি তার উদ্দেশ্য এ নয় যে, আমি তোমাদের সম্পদ চাই কিংবা তোমাদের সম্পদ চাই কিংবা তোমাদের মধ্যে পদমর্যাদায় শ্রেষ্ঠ হতে চাই কিংবা তোমাদের রাজা হতে চাই। আমাকে আল্লাহ তোমাদের কাছে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, তিনি আমার প্রতি এক কিতাব নাযিল করেছেন  এবং তোমাদের জন্য সাবধানকারী ও সুসংবাদ দানকারী হতে আমাকে আদেশ করেছেন। তাঁর আদেশ অনুসারে আমি তোমাদের কাছে আমার প্রতিপালকের বাণী পৌঁছে দিয়েছি এবং তোমাদেরকে কল্যাণের জন্য সদুপদেশ দিয়েছি। এখন তোমরা যদি আমার এই দাওয়াত গ্রহণ করে নাও, তাহলে সেটা তোমাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্য বয়ে আনবে। আর যদি তা প্রত্যাখ্যান কর তাহলে তোমাদের ও আমার ব্যাপারে আল্লাহর চূড়ান্ত ফায়সালা না আসা পর্যন্ত আমি ধৈর্য ধারণ করবো।”

তারা বললো, “হে মুহাম্মাদ, আমরা যে কয়টা প্রস্তাব তোমার কাছে পেশ করলাম তার কোনটাই যদি তোমার কাছে  গ্রহণযোগ্য না হয় তাহলে আর একটা কথা শোনো। তুমি তো জান, দুনিয়ায় আমাদের মত সংকীর্ণ আবাসভূমি আর কারো নেই, পানির অভাব ও অন্যান্য উপকরণের দৈন্যের  কারণে আমরা যেরূপ দুঃসহ জীবন যাপন করি, পৃথিবীতে আর কোন জাতি এমন জীবন যাপন  করে না। সুতরাং তোমার যে প্রভু তোমাকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, তার কাছে প্রর্থনা কর যেন তিনি এই পাহাড় পর্বতগুলোকে এখান থেকে দূরে সরিয়ে নেন যাতে আমাদের আবাসভূমি আরো প্রশস্ত হয় এবং তিনি যেন ইরাক ও সিরিয়ায় নদ-নদীর ন্যায় আমাদের এ দেশেও নদ-নদী প্রবাহিত করে দেন। তাঁর কাছে আরো প্রার্থনা কর তিনি যেন আমাদের পূর্বপুরুষদের পুনর্জীবিত করেন এবং পুনর্জবীত পূর্বপুরুষদের মধ্যেই কুসাই ইবনে কিলাবও যেন অন্তর্ভুক্ত থাকেন যিনি অন্যতম সত্যবাদী ন্যায়নিষ্ঠ নেতা ছিলেন। তাদেরকে আমরা তোমার কথা সত্য না মিথ্যা জিজ্ঞেস করবো। তারা যদি বলেন তুমি সত্যবাদী এবং আমাদের দাবী অনুসারে তুমি যদি কাজ কর তাহলে আমরা তোমার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করবো, তোমার খোদাপ্রদত্ত মর্যাদা আমরা স্বীকার করবো এবং তোমাকে যথার্থই আল্লাহর রাসূল বলে মেনে নেব।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন, “এসব ব্যাপার নিয়ে আমি তোমাদের  কাছে আসিনি। আমাকে আল্লাহ যে জিনিস দিয়ে পাঠিয়েছেন, তাছাড়া আর কোন কিছু আমার ইখতিয়ারে সেই। আর যা দিয়ে আমাকে পাঠানো হয়েছে তা আমি তোমাদের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়েছি। এটা যদি তোমরা গ্রহণ কর তাহলে এটা দুনিয়া ও আখিরাতে তোমাদের সৌভাগ্যের দুয়ার খুলে দেবে। আর যদি অগ্রাহ্য কর তাহলে আল্লাহ তোমাদের ও আমার মধ্যে একটা চূড়ান্ত ফায়সালা না করা পর্যন্ত আমি ধৈর্য ধারণ করবো।”

তারা বললো, “এ প্রস্তাবও যদি তোমার মনঃপূত না হয়, তাহলে তুমি নিজের জন্য একটা কাজ কর। তোমার প্রতিপালককে বল তোমার সাথে একজন ফেরেশ্তা পাঠাতে। তিনি আমাদের সামনে তোমার কথা সত্য বলে সাক্ষ্য দেবেন এবং তোমার পক্ষ হয়ে আমাদের সাথে কথা বলবেন। আর আল্লাহ তোমার জন্য আনেকগুলো বাগবাগিচা ও প্রাসাদ বানিয়ে দিক এবং অনেক সোনা রূপার ধনদৌলত দান করুক। এতে করে তোমার যে অর্থলিপ্সা দেখতে পাই তা মিটবে। কেননা তুমি তো আমাদেরই মত বাজারে ঘোরাফেরা কর এবং আমাদেরই মত জীবিকা অন্বেষণ কর। তোমার এসব ধনদৌলত হলে আমরা বুঝবো, তুমি যথার্থই আমাদের চাইতে শ্রেষ্ঠ এবং তোমার প্রভুর কাছে মর্যাদাবান। তুমি নিজের ধারণা মুতাবিক সত্যিই যদি রাসূল হয়ে থাক তাহলে এসব করে দেখাও তো দেখি।”

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, না এটাও আমি করবো না। আমি আল্লাহর কাছে এসব জিনিস চাইতে পারবো না। আমি তোমাদের কাছে এসব জিনিস নিয়ে আাসিনি। আল্লাহ আমাকে কেবল সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী করে পাঠিয়েছেন। তোমরা যদি আমার আহ্বানে সাড়া দাও, তবে সেটা হবে দুনিয়া ও আখিরাতে তোমাদের সৌভাগ্যের উৎস। আর যদি প্রত্যাখ্যান কর, তাহলে আল্লাহ যা করেন তাই হবে। তিনি যতক্ষণ আমার ও তোমাদের মধ্যে নিষ্পত্তি করে না দেন ততক্ষণ আমি ধৈর্য ধারন করবো।”

তারা বললো, “তাহলে কয়েক টুকরো মেঘ আমাদের মাথার ওপর ফেলে দাও, যেমন তুমি বিশ্বাস কর যে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে তা পারেন। এটা না করলে আমরা তোমার ওপর ঈমান আনবো না।”

রাসূলুল্লাহ বললেন, “এটা সম্পূর্ণ আল্লাহর ইখতিয়ারাধীন। তিনি ইচ্ছা করলে অবশ্যই তা করতে পারেন।”

তারা বললো, “হে মুহাম্মাদ, তোমার প্রতিপালক কি এটা জানতেন না যে, আমরা তোমার সাথে বৈঠকে বসবো এবং যা এখন তোমার কাছে চাইলাম তা তোমার কাছে চাইবো? তিনি কি তোমার কাছে এসে আমরা যেসব কথা উত্থাপন করলাম তার জবাব তোমাকে শিখিয়ে দিতে পারলেন না এবং তোমার দাওয়াত অগ্রাহ্য করলে আমাদের  তিনি কি করবেন তা জানাতে পারলেন না? আমরা জানতে পেরেছি যে, ইয়ামামায় বসবাসকারী ‘রাহমান’ নামক এক ব্যক্তি তোমাকে এসব কথা শিখিয়ে দেয়। [২৬.লোকটি হলো মুসাইলিমা ইবনে হাবিব হানফী। সে মুসাইলিমা কাযযাব (মিথ্যাবাদী) নামে প্রসিদ্ধ। সে বয়সে প্রবীণ ছিল এবং জাহিলী যুগে  তাকে ‘রাহমান’ বলে ডাকা হতো। (রাউদুল আনফ)]

আল্লাহর শপথ, আমরা কথনো রাহমানকে বিশ্বাস করবো না। মুহাম্মাদ, তোমার কাছে আমরা আমাদের অক্ষমতার কথা জানাচ্ছি। তোমার আচরণ আমাদের সাথে যতদূর গড়িয়েছে তাতে আমরা তোমাকে ছাড়বো না। হয় তুমি আমাদের ধ্বংস করবে নচেৎ আমরা তোমাকে ধ্বংস করবো- তার আগে আমরা ক্ষান্ত হবো না।” সমবেত লোকদের একজন বললো, “আমরা ফেরেশতাদের পূজা করি। ফেরেশতারা হলো আল্লাহর মেয়ে।’ আর একজন বললো, “আল্লাহ ও ফেরেশতাদেরকে আমাদের সামনে হাজির কর নচেৎ আমরা তোমরা ওপর ঈমান আনবো না।”

এসব কথা শোনার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকে চলে এলেন। তাঁর ফুফাতো ভাই আবদুল্লাহ ইবনে আবু উমাইয়া ইবনে মুগীরাও তাঁর সাথে এলো। সে বললো, “শোনো মুহাম্মাদ তোমার সম্প্রদায়ের লোকেরা তোমার কাছে কতকগুলো প্রস্তাব পেশ করলো। তার একটাও তুমি গ্রহণ করলে না। তারপর তারা এমন কতকগুলো জিনিস তোমার কাছে দাবী করলো যা দ্বারা আল্লাহ তোমাকে যে পদমর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন বলে তুমি নিজে বলে থাক তা জানতে ও বুঝতে পারে এবং তোমাকে স্বীকার করতে ও তোমার অনুসরণ করতে পারে। কিন্তু তুমি সে দাবগিুলোও পূরণ করলে না। তুমি যে তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং তুমি যে আল্লাহর রাসূল তা জানার জন্যও তারা কিছু দাবী জানালো তোমার কাছে। তুমি তাও রাখলে না। আল্লাহর কসম, তুমি একটা সিঁড়ি দিয়ে আকাশে চড়বে এবং তোমাকে আকাশে উঠে যেতে আম স্বচোখে দেখবো, অতঃপর তোমার সাথে চারজন ফেরেশতা আসবেন এবং তারা তোমার দাবীর সত্যতার সাক্ষ্য দেবে- তানা হলে আমি তোমার ওপর ঈমান আনবো না। এমনকি তুমি যদি এসব করে দেখিয়ে দাও তাহলেও আমার মনে হয় না যে, আমি তোমার ওপর ঈমান আনব।”২৭.এই ব্যক্তি মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে ইসলাম গ্রহণ করেন।

এরপর সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে চলে গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাকে ত্যাগ করে অত্যন্ত ব্যাথিত ও বিষণœ মনে বাড়ী চলে এলেন। কেননা তাঁকে যখন ডেকে নেয়া হয় তখন তিনি খুবই আশান্বিত হয়ে ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু কার্যতঃ যখন দেখলেন যে, তারা তাঁর থেকে আরো দূরে সরে গেল, তখন তাঁর দুঃখের সীমা থাকলো না।

আবু জাহলের আচরণ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চলে যাওয়ার পর আবু জাহল বললো, “হে কুরাইশ, শোন! মুহাম্মাদ বিছুতেই তার নীতি ত্যাগ করতে রাজী নয়। আমাদের ধর্মের সামালোচনা, আমাদের পূর্বপুরুষদের নিন্দা, আমাদের বুদ্ধিমত্তাকে নির্বুদ্ধতা বলে বিবেচনা করা এবং আমাদের দেব-দেবীকে গালমন্দ করার বদ্ধমূল স্বভাব সো কিছুতেই পরিহার করবে না। আমি আল্লাহর নামে অঙ্গীকার করছি, কাল যত বড় পাথর আমি উত্তোলন করতে পারি, হাতে নিয়ে তার অপেক্ষায় থাকবো। নামাযে যখনই সে সিজদায় যাবে, তখনই সেই পাথর দিয়ে আমি মাথা গুড়িয়ে দেবো। এরপর যা হয় হবে। তোমরা আমাকে বিচারে সোপর্দ কর কিংবা রক্ষা কর, সেটা তোমাদের বিবেচ্য। বনু আবদ মানাফ যা ভালো মনে করে তাই করবে।” সবাই কললো, “আল্লাহর শপথ আমরা কিছুতেই তোমাকে বিচারের জন্য সোপর্দ করবো না তুমি যা সংকল্প করেছো তা করে ফেলো।”

পরদির আবু জাহল সত্যি সত্যি প্রকা- একখানা পাথর নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অপেক্ষায় বসে রইলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও নিত্যকার অভ্যাস মত নামায পড়তে গেলেন। মক্কায় বাস করলেও তিনি সিরিয়ার দিকে মুখ করে নামায পড়তেন। রুকনে ইয়ামানী ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে এমনভাবে দাঁড়িয়ে নামায পড়তেন যে, কা’বা তাঁর ও সিরিয়ার মাঝখানে পড়তো। তিনি নামাযে দাঁড়ালেন। আর কুরাইশরা তাদের সম্মেলন স্থলে বসে আবু জাহল কি করে সেজন্য অধীর আগ্রহে প্রহন গুনতে লাগলো।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সিজদায় গেলেন তখন  আবু জাহল পাথর উত্তেলন করে তাঁর দিকে  এগিয়ে গেল। তার কাছে যেতেই পরাজিত, ভীত-বিহ্বল ও বিবণর্ষ চেহারা নিয়ে ফিরে এলা। তার হাত দুটো যেন পাথরের ওপর নিথর ও নিশ্চল হয়ে গিয়েছে। সে পাথরখানা দূরে ছুড়ে ফেলে দিল। এসময় কুরাইশদের কয়েকজন তার দিকে এগিয়ে গেল এবং বললো, “হে আবুল হাকাম, তোমার কী হলো?” সে বললো, “আমি মুহাম্মাদরে কাছে চলে গিয়েছিলাম এবং গতরাতে তোমাদের কাছে যে সংকল্প ব্যক্ত করেছিলাম, তাই কার্যকর করতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু যে মাত্র তার কাছে গিয়েছি অমনি একটা প্রকা- ও ভয়ংকর উট তার ও আমার মধ্যে আড়াল হয়ে দাঁড়ালো। আল্লাহর শপথ, আম কখনো এমন ভয়ংকর চুঁট, ঘাড় ও দাঁতওয়ালা উট দেখিনি। উটটা আমাকে খেয়ে ফেলতে উদ্যত হেয়ছিলো।”

নাদার ইবনে হারেসের বিবরণ

আবু জাহলের এসব কথা বলার পর নাদার ইবনে হারেস উঠে দাঁড়ালো। সে বললো, “হে কুরাইশ জনতা, আল্লাহর শপথ, তোমাদের ওপর এমন এক আপদ আপতিত হয়েছে যার প্রতিকারে তোমারা এখনো কোন কৌশল অবলম্বন করতে পারনি। মুহাম্মাদ ছিল তোমাদের মধ্যে একজন তরুণ কিশোর মাত্র। সে ছিল তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক প্রিয় ও সবচেয়ে সত্যবাদী। সে ছিল সবচেয়ে বিশ্বস্ত।ভ কিন্তু প্রৌঢ়ত্বে পদার্পণ করা মাত্রই সে নতুন জিনিস নিয়ে আবির্ভূত হলো। তখন তোমরা তাকে বললে যাদুকর। না, আল্লাহর শপথ, সে যাদুকর নয়। আমরা যাদুকরদের দেখেছি। তাদের তন্ত্রমন্ত্র ও ফুকও আমরা দেখেছি। তোমরা তাকে বললে জ্যোতিষী। আল্লাহর শপথ, সো জ্যোতিষী নয়। জ্যোতিষীদের মারপ্যাঁচ ও রংঢং আমরা অনেক শুনেছি ও দেখেছি। পাগলের কথাবার্তায় যে জড়তা, আবোল াতবোল ও ভাবেবেগ থাকে, তা তাঁর কথাবার্তায় অনুপস্থিত। হে কুরাইশগণ, তোমরা নিজেদের অবস্থাটা খতিয়ে দেখ। আল্লাহর শপথ, তোমাদের ওপর এক ভয়াবহ মুসীবত আপতিত হয়েছে।”

নাদার ইবনে হারেস ছিল কুরাইশদের সবচেয়ে কুটিল ও কুচক্রী সেনাদের অন্যতম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নানাভাবে কষ্ট দেয়া ও তাঁর বিরুদ্ধে শত্রুতা করাই ছিল তার কাজ। সে হীরায় কিছুকাল কাটিয়েছিল এবং সেখান থেকে  পারস্যের রাজ-রাজাদের কাহিনী শিখে এসেছিলো। রুস্তম ও ইসফিন্দিয়ারের উপাখ্যানও সে জানতো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই কোন বৈঠকে বসে আল্লাহর বাণী শোনাতেন  এবং তাঁর জাতিকে পূর্বতন জাতিগুলো কিভাবে আল্লাহর রোষের শিকার হয়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে সেসব কথা উল্লেখ করে হুঁশিয়ার করতেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথা শেষ করে উঠে যাওয়া মাত্রই সে বলতো, “হে কুরাইশগণ, আমি মুহাম্মাদের চেয়েও সুন্দর কাহিনী বলতে পারি এসো, আমি তোমাদেরকে তাঁর কথার চেয়ে চটকদার কথা শুনাই।” অতঃপর সে তাদেরকে পারস্যের রাজাদের এবং রুস্তম ও ইসফিন্দিয়ারের উপাখ্যান শোনাতো। তারপর বলতো, “মুহাম্মাদ আমার এসব কথার চেয়ে কি সুন্দর কথা বলতে পারে?”

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তায়ালা বলতেন, “নাদার ইবনে হারেস সম্পর্কে কুরআনে আটটি আয়াত নাযিল হয়েছে।”

যখনই তার সামনে আয়াতগুলো পাঠ করা হয় তখনই সে বলে : এগুলো তো প্রাচীনকালের উপাখ্যান!” এই আয়াতটি এবং ‘প্রাচীন কালের উপাখ্যান’- এর উল্লেখ অন্য যেসব আয়াতে হয়েছে, তা এই নাদার ইবনে হারেস সম্পর্কেই নাযিল হয়েছে

দুর্বল মুসলমানদের ওপর মুশরিকদের অত্যাচার

যারা ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করেছিলো সেসব সাহাবার ওপর মুশরিকরা ভীষণ অত্যাচার চালাতে লাগলো। প্রত্যেক গোত্র তার মধ্যকার মুসলমানদের ওপর সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে  পড়লো। কোথাও বা তাদেরকে অন্তরীণ রেখে মারপিট করে, ক্ষুৎপিপাসায় অবর্ণনীয় কষ্ট দিয়ে, কোথাও বা দ্বি-প্রহরে প্রচ- গরমের সময় মক্কার রৌদ্রতপ্ত মরুপ্রন্তরে শুইয়ে দিয়ে নির্যাতন চালাতে থাকলো। যারা দুর্বল এভাবে নির্যাতন চালিয়ে তাদেরকে ইসলাম ত্যাগ করতে বাধ্য করা হতো। কেউ কেউ অসহ্য নির্যতনের চাপে ইসলাম ত্যাগ করতো। আবার কেউ কেউ সাহায্য সমর্থন পেত এবং এভাবে আল্লাহ তাদেরকে রক্ষা করতেন। আবু বাকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর ক্রীতদাস বিলাল এক সময় বনু জুমাহ গোত্রের এক ব্যক্তির ক্রীতদাস ছিলেন। তাঁর নাম ছিল বিলাল ইবনে রাবাহ। তাঁর মার নাম ছিল হামামাহ। তিনি তাদের মধ্যেই আশৈশব লালিত পালিত হয়েছিলেন। তিনি একজন নিষ্ঠাবান ও পবিত্রাত্মা মুসলিম ছিলেন। উমাইয়া ইবনে খালাফ ইবনে ওয়াহাব ইবনে হুযাফা ইবনে জুমাহ রৌদ্রতপ্ত দুপুরে তাঁকে মক্কার সমভূমিতে নিয়ে চিৎ করে শুইয়ে দিতো। অতঃপর তাঁর বুকের ওপর একটা প্রকা- পাথর চাপা দিয়ে রাখার নির্দেশ দিত। তারপর তাকে বলতো, “মুহাম্মাদকে অস্বীকার করে লাত ও উয্যার পূজা করতে রাজী না হলে আমৃত্যু এভাবেই থাকতে হবে।” এহেন কঠিন যন্ত্রণা ভোগের মুহূর্তেও তিনি কলতেন, “আহাদ” অর্থৎ আল্লাহ এক, আল্লাহ এক। তিনি এভাবে নিযৃাতন ভোগের সময় যখন ‘আহাদ’, ‘আহাদ’ উচ্চারণ করতেন, তখন মাঝে মাঝে ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল তাঁর কাছ দিয়ে যেতেন। বিলালের ঐ কথা শুনে ওয়ারাকা ইবনে নাওফেলও সাথে সাথে বলতেন, “আল্লাহর শপথ, হে বিলাল, সত্যই আল্লাহ এক, আল্লাহ এক, আল্লাহ এক।“ এরপর ওয়ারাকা উমাইয়া ইবনে খালাফের কাছে এবং বিলালকে নির্যাতনকারী বরী জুমাহ গোত্রের অন্যান্যদের কাছে যেয়ে বলতেন, “আল্লাহর শপথ, এই কারণে তোমরা যদি তাকে মেরে ফেল, তাহলে আমি তাকে অবশ্যই মহাপুণ্যবান মনে করবো এবং তার পদধূলি নেবো।” একদিন সেখান দিয়ে আবু বাক্র রাদিয়াল্লাহু আনহু যাচ্ছিলেন। তিনি দেখলেন বিলালকে সেই একই পন্থায় নির্যাতন করা হচ্ছে। তিনি উমাইয়া ইবনে খালাফকে বললেন, “এই অসহায় মানুষটাকে নির্যাতন করতে তোমার কি একটুও আল্লাহর ভয় হয় না? আর কত দিন এটা চালাবে?”

সে বললো, “তুমিই তো ওকে খারাপ করেছো। এখন তুমিই ওকে এ অবস্থা থেকে রেহাই দাও।”

আবু বাকর বললেন, “আমি তাই করবো। আমার কাছে ওর চেয়েও তাগড়া ও শক্তিশালী একটা ছেলে আছে সে তোমার ধর্মের অনুসারী। এর বদলে আমি তাকে দিয়ে দেবো।” সে বললো, “আমি রাজী।” আবু বাক্র বললেন, “আমি রাজী। সেটা তোমাকে দিলাম।” অতঃপর তিনি সেটা দিলেন উমাইয়াকে  এবং উমাইয়ার কাছ থেকে বেলালকে নিয়ে মুক্ত করে দিলেন। হিজরাতের আগে আবু বাক্র বিলালসহ মোট সাতজন নওমুসলিম গোলামকে স্বাধীন করেন। এদের মধ্যে ছিলেন আমের ইবনে ফুহাইরা, উম্মে উবাইস ্এবং যিননীরা। যিননীরাকে মুক্ত করার সময় তাঁর চোখ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কুরাইশরা তা দেখে বললো, “ওর চোখ নষ্ট হয়েছে লাত ও উয্যার অভিশাপেই।” যিননীরা বললেন, “আল্লাহর শপথ, তোদের আমি কখনো মুক্ত করবো না”, তখন আবু বাক্র সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি কথাটা শোনামাত্রই বললেন, “হে অমুকের মা, তুমি শপথ ভঙ্গ কর।” সে বললো, “কী বলছো! শপথ ভঙ্গ করবো? তুমিই তো ওদেরকে খারাপ করেছো। এখন তুমিই মুক্ত কর।” আবু বাক্র বরলেন, “আমি ওদেরকে নিয়ে নিলাম! ওরা মুক্ত ও স্বাধীন। মেয়ে দুটিকে বললেন, “তোমরা মহিলার আটা ফিরিয়ে দাও।” মেয়েদ্বয় বললো, “হে আবু বাক্র, আগে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেব এবং পরে আটা ফিরিয়ে দেব কি?” আবু বাক্ র বললেন, “সে তোমাদের ইচ্ছা।”

আর একবার তিনি বনী মুয়াম্মালের একজন নও মুসলিম বাঁদীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। উমার ইবনুল খাত্তাব তাঁর উপর নির্যাতন চালিয়ে তাঁকে ইসলাম ত্যাগের জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। উমার তখনো মুশরিক। তিনি মারতে মারতে যথন ক্লান্ত হযে গেলেন তখন তাকে বললেন, “তোর কাছে আমি ওজর জানাচ্ছি যে, শুধু ক্লান্ত হয়ে যাওয়ার কারণেই তোকে আর মারতে পাররম না।” মেয়েটি বললো, “আল্লাহ তোমার সাথে যেন এরূপ আচরণই করেন।” এই দৃশ্য দেখে আবু বাক্র তৎক্ষণাৎ বাঁদীটি কিনে নিয়ে মুক্ত করে দিলেন।

আবু বাক্রের (রা) পিতা আবু কুহাফা একদিন তাঁকে বললেন, “বেটা, আমি দেখছি তুমি শুধু দুর্বল দাস দাসীদেরকে মুক্ত করছো। যদি তুমি শক্তিশালী জোয়ান পুরুষ দাসদের মুক্ত করতে তাহলে প্রয়োজনের সময় তারা তোমার পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারতো।” একথা শুনে আবু বাক্র বললেন, “হে পিতা, আমি যা করছি তা একমাত্র মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যেই করছি।”

বনু মাখযূম গোত্রের লোকেরা আম্মার ইবনে ইয়াসার ও তাঁর পিতামাতাকে তপ্ত দুপুরের সময় মক্কার উতপ্ত মরুভূডমিতে নিয়ে নির্যাতন করতো। তাঁদের গোটা পরিবার ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের ওপর নির্যাতন চলাকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের কাছে উপস্থিত হতেন এবং সান্তনা দিয়ে বলতেন, হে ইয়াসারের পরিবার, ধৈর্য ধারণ কর। তোমাদের জন্য জান্নাতের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।” আম্মারের মাতাকে (সুমাইয়া) তারা মারতে মারতে মেরেই ফেললো। তথাপি তিনি ইসলাম ত্যাগ করেননি।

আর পাপিষ্ঠ আবু জাহল যখনই শুনতো যে অমুক ইসলাম গ্রহণ করেছে, অমনি তার বিরুদ্ধে কুরাইশদেরকে উস্কিয়ে দিত। ইসলাম গ্রহণকারী যদি ভালো পদমর্যাদাধারী ব্যক্তি হতো তাহলেও তাঁকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করতো এবং বলতো, “তুমি তোমার বাপের ধর্ম ত্যাগ করেছ। অথচ তোমার বাপ তোমার চেয়েও উত্তম। কাজেই আমরা তোমাকে বেকুফ প্রতিপন্ন করবো, তোমার মতামত যে খারাপ ও ভুল, তা আমরা প্রমাণ করে ছাড়বো, তোমার মান-সম্মান ভূলুণ্ঠিত করে তবে ক্ষান্ত হবো।”  আর যদি তিনি ব্যবসায়ী হতেন তবে তাকে বলতো, “আমরা তোমার ব্যবসায়ের সর্বনাশ ঘটাবো এবং তোমার মালপত্র নষ্ট করে দেবো।” আর যদি দুর্বল কেউ হতো তাহলে মারপিট করতো ও তার বিরুদ্ধে লোকজনকে লেলিয়ে দিত।

সাঈদ ইবনে যুবাইর বলেন, “আমি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বসকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাদের ওপর কি এতদূর অত্যাচার চালাতো যার ফলে তারা ইসলাম ত্যাগ করলেও তাদের ওপর দোষারোপ করা চলতো না?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ। তারা তাঁদেরকে প্রহার করত এবং অনাহার ও পিপাসায় কষ্ট দিত। তাঁদের এক একজন এ ধরনের অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে এতদূর হীনবল হয়ে পড়তেন যে, সোজা হয়ে বসে থাকতেও পারতেন না।

এহেন নির্যাতন চালানোর পর তাঁদেরকে জিজ্ঞাসা করতো, ‘স্বীকার কর আল্লাহর ছাড়া লাত-উয্যাও তোমার মাবুদ?’ কেউ কেউ বলতো, হাঁ।’ এমনকি একটা তুচ্ছ পোকামকড়ও দেখিয়ে বলতো, ‘আল্লাহ্ ছাড়া একেও মাবুদ বলে মান তো?’ কেউ কেউ অসহ্য নির্যাতন থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য অনন্যোপায় হয়ে বলতো, ‘হাঁ’।”

আবিসিনিয়ার মুসলমানদের প্রথম হিজরাত

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন একদিকে তাঁর সাহাবীদের ওপর অসহনীয় নির্যাতন চলছে। অপরদিকে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বিশেষ মর্যাদা লাভ ও আবু তালিবের সহায়তা লাভের কারণে তিনি অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জীবন যাপন করছেন। অথচ তিনি তাঁদের ওপর আপতিত যুলুমকে কিছুমাত্র রোধ করতে পারছেন না। এ অবস্থায় তিনি সাহাবীদেরকে বললেন, “তোমরা যদি আবসিনিয়ায় চলে যাও মন্দ হয় না। সেখানে একজন রাজা আছেন যার রাজত্বে কারো ওপর যুুলুম হয় না। এ দেশটা সত্য ও ন্যায়ের আশ্রয়স্থল। যতদিন এই অসহনীয় পরিস্থতি থেকে আল্লাহ তোমাদের মুক্ত না করেরন ততদিন সেখানে অবস্থান কর।” এই উপদেশ অনুসারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাগণ কুফরীতে প্রত্যাবর্তনে বাধ্য হবার আশংকায় এবং নিজের দ্বীন ও ঈমানকে বাঁচানোর তাকিদে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণের জন্য আবিসিনিয়ায় চলে গেলেন। ইসলামের অভ্যুদয়ের পর এটাই প্রথম হিজরাত।

এই হিজরাতের জন্য যাঁরা প্রথম স্বদেশ ত্যাগ করেণ তাঁরা হলেন উসমান ইবনে আফফান ও তাঁর স্ত্রী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কন্যা রুকাইয়া, আবু হুযাইফা ইবনে উতবা ও তাঁর স্ত্রী সাহলা বিনতে সুহাইল, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, মুসআব ইবনে ‘উমাইর, আবদুর রহমান্ ইবনে আউফ, আবু সালামা ইবনে আবদুল আসাদ ও তাঁর স্ত্রী লায়লা বিনতে আবি হাসমা, আবু সাবরা ইবনে আবু বুহম ও সুহাইল ইবনে বাইদা। এই দশজন আবিসিনিয়ায় হিজরাতকারী প্রথম মুসলমান। (ইবনে হিশামের মতে উসমান ইবনে মাযউন ছিলেন দলনেতা।) এরপর দেশত্যাগ করেন জাফর ইবনে আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু। তারপর একের পর এক মুসলমানরা সেখানে গিয়ে সমবেত হতে থাকেন। কেউবা সপরিবারে কেউবা পরিবার পরিজন ছেড়ে একাকী। এভাবে যেসব মুসলমান হিজরাত করে আবিসিনিয়ায় গিয়ে বসবাস করা শুরু করেন, তাঁদের সংখ্যা সর্বমোট ৮৩ জনে দাঁড়ায়। অবশ্য যেসব অল্পবয়স্ক শিশু কিশোর তাঁদের সাথে গিয়েছিল কিংবা সেখানে যাওয়ার পর জন্মগ্রহণ করেছিল তারা এ সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত নয়।

মুহাজিরদের ফিরিয়ে আনার জন্য আবিসিনিয়ায় কুরাইশদের দূত প্রেরণ

কুরাইশগণ যখন দেখলো যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাগণ আবিনিনিয়ায় গিয়ে নিরাপদে ও শান্তিতে বসবাস করছেন, তখন তারা সিদ্ধান্ত নিল যে, নাজাশীর নিকট দু’জন যোগ্য দূত পাঠাবে। এতে নাজাশী তাদেরকে সেখান থেকে ফেরত পাঠাবে এবং তারা তাদেরকে ধর্মান্তরিত করার সুযোগ পাবে। তারা মুসলমানদেরকে তাঁদের নিরাপদ ও নিরুপদ্রব আশ্রয় থেকে যে করেই হোক বের করে আনতে বদ্ধপরিকর হলো। এ উদ্দেশ্যে যে দু’জন লোককে পাঠালো তারা হলো আবুদল্লাহ ইবনে আবু রাবী’আ ও আমর ইবনুল ’আস ইবনে ওয়ায়েল। কুরাইশরা দূতদ্বয়ের মাধ্যমে নাজাশীকে দেয়ার জন্য বিপুল উপঢৌকন সংগ্রহ করলো। অতঃপর তাদেরকে নাজাশীর কাছে পাঠালো।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহধর্মিনী উম্মে সালামা বিনতে আবু উমাইয়া ইবনে মুগীরা বলেন, আমরা আবিসিনিয়ায় গিয়ে উপস্থিত হবার পর একজন উত্তম প্রতিবেশী পেলাম। তিনি স্বয়ং নাজাশী। আমরা আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে পূর্ণ নিরাপত্তা লাভ করলাম। নির্বিঘেœ আল্লাহর ইবাদাত করতে লাগলাম। কোন কষ্টদায়ক ব্যবহারও কেউ করছিল না এবং কোন অপ্রীতিকর কথাও আমাদের শুনতে হচ্ছিল না। কুরাইশগণ একথ জানতে পেরে সিদ্ধান্ত নিল যে,  নাজাশীর কাছে আমাদের ব্যাপারে দু’জন পারদর্শী দূত পাঠাবে এবং নাজাশীর কাছে আমাদের মক্কার দুর্লভ ও নয়ানাভিরাম জিনিস উপঢৌকন পাঠাবে। নাজাশীর কাছে মক্কা থেকে যেসব  জিনিস আসতো তার মধ্যে সবচেয়ে উত্ম জিনিস বিবেচিত হতো সেখানকার চামড়া। তাই তাঁর জন্য কুরাইশরা প্রচুর চামড়া সংগ্রহ করে পাঠিয়েছিলেন। নাজাশীর রাজকর্মচারী ও দরবারীদের কাউকেই তারা উপহার দিতে বাদ রাখেনি। এসব উপহার উপঢৌকন সহকারে আবদুল্লাহ ইবনে আবু রাবী’আ ও আমর ইবনুল ‘আসকে পাঠালো এবং তাদের করণীয় কাজ তাদেরকে বুঝিয়ে দিল। তারা তাদেরকে বলে দিল, “মুহাজিরদের সম্পর্কে নাজাশীর সাথে কথা বলার আগে তোমরা প্রত্যেক দরবারী ও রাজকর্মচারীকে উপঢৌকন দিয়ে অনুরোধ করবে, তিনি যেন মুহাজিরদেরকে তোমাদের হাতে সমর্পণ করেন এবং সমর্পণ করার আগে তাদের সাথে যেন কোন কথা না বলেন।”

এরপর তারা রওনা হলো এবং নাজাশীর কাছে এসে উপনীত হলো। তখন আমরা উত্তম প্রতিবেশীর কাছে উত্তম বাসস্থানে বসবাস করছি। নাজাশীর সাথে কথাবার্তা বলার আগে তারা প্রতিটি দরবারী ও রাজকর্মচারীকে উপঢৌকন দিল। তাদের প্রত্যেককে তারা বললো, “আমাদের দেশ থেকে কতকগুলো বেকুব যুবক বাদশাহর রাজ্যে এসে আশ্রয় নিয়েছে। তারা নিজ জাতির ধর্ম ত্যাগ করেছে অথচ আপনাদের ধর্মও গ্রহণ করেনি। তারা এক নতুন উদ্ভট ধর্ম তৈরী করেছে। সে ধর্ম আপনাদের ও আমাদের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। জাতির সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত লোকেরা আমাদেরকে বাদশাহর কাছে পাঠিয়েছেন, যেন তিনি ওদেরকে ওদের স্বাজাতির কাছে ফেরত পাঠান। আমরা যখন বাদশারহর সাথে কথা বলবো তখন আপনারা বাদশাহকে ওদের ফেরত পাঠাতে ও ওদের সাথে কোন কথা না বলতে পরামর্শ দেবেন। কেননা তাদের দোষত্রুটি সম্পর্কে তাদরে জাতিই সবচেয়ে ছাল জানে।” দরবারীরা সবাই এতে সম্মতি জানালো। অতঃপর তারা নাজাশাকীকে উপঢৌকন দিল এবং তিনি তা গ্রহণ করলেন। অতঃপর তারা তাঁর সাথে কথা বলতে শুরু করলো। তারা বললো, “হে বাদশাহ, আমাদের দেশ থেকে কতিপয় নের্বোধ যুবক আপনার দেশে আশ্রয় নিয়েছে। তারা তাদের স্বাজাতির ধর্ম ত্যাগ করেছে এবং আপনার ধর্মও গ্রহণ করেনি তারা একটা উদ্ভট ধর্ম উদ্ভাবন করে নিয়ছে যা আপনার ও আমাদের কাছে অজ্ঞাত। তাদের ব্যাপারে আপনার কাছে তাদের কওমের সবচেয়ে সম্মানিত লোকেরা আমাদেরকে দূত হিসেবে পাঠিয়েছেন। তাঁরা তাদেরও মুরব্বী ও আম্মীয়-স্বজন। ওদেরকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ নিয়েই আমরা এসেছি। তাদের কি দোষত্রুটি আছে সে সম্পর্কে তাদের মুরব্বীরা ও আত্মীয়রাই সমধিক অবগত।”

উম্মে সালামা বলেন, নাজাশী মুহাজিরদের বক্তব্য শুনুক এটা আবুদল্লাহ ইবনে আবু রাবী’আ ও আমর ইবনুল ‘আসের কাছে সবচেয়ে অবাঞ্ছিত ব্যাপার ছিল। রাজার  দরবারীরা রাজাকে বললো, “হে বাদশাহ, ওরা দু’জন ঠিকই বলেছে। তাদের জাতির তাদের দোষত্রুটি ভালো জানে। কাজেই ওদেরকে এই দূতদ্বয়ের হাতে সমর্পণ করে দিন। ওরা ওদেরকে স্বদেশ ও স্বজাতির কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাক।”

নাজাশী ভীষণ রেগে গেলেন। তিনি বললেন, “না, এ পরিস্থিতিতে আমি তাদেরকে এই দূতদ্বয়ের হাতে সমর্পণ করবো না। একদল লোক আমার সান্নিধ্যে বাস করছে। তারা আমার দেশে অতিথি হয়েছে। তারা অন্যত্র না গিয়ে আমার কাছে আসাকে অগ্রগণ্য মনে করেছে। আমি তাদেরকে ডাকবো এবং এই আগন্তুকদ্বয়ের বক্তব্য সম্পর্কে তাদের বক্তব্যও শুনবো। যদি দেখি, এরা  দু’জন যেরূপ বলছেন, আশ্রিতরা সত্যিই তদ্রƒপ, তা হলে ওদেরকে সমর্পণ করবো এবং তাদের জাতির কাছে ফেরত পাঠাবো; অন্যথায় পাঠাবো না। যতদিন তারা আমার কাছে থাকতে চাইবে সাদরে রাখবো।”

উম্মে সালামা বলেন, অতঃপর নাজাশী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের ডেকে পাঠালেন। নাজাশীর বার্তাবাহক যখন মুহাজিরদের ডাকতে গেল, তখন সবাই পরামর্শে বসলেন। এক অপরকে  জিজ্ঞেস করলেন, বাদশাহর কাছে গিয়ে কি বলা যাবে। সবাই এক বাক্যে বললেন, “আমরা যা জানি এবং আমাদের নবী যা নির্দেশ দিয়েছেন ত-ই বলবো। তাতে পরিণতি যা হয় হবে।”

তাঁরা দরবারে এলেন। নাজাশী তার আগেই ধর্মযাজকদে ডেকে হাজির করে রেখেছেন। তাঁরা বাদশাহর সামনে ইনজীল খুলে বসেছেন। বাদশাহ তাদের জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের সেই ধর্মটা কি যা গ্রহণ করে তোমরা নিজ জাতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছো।এবং আমার ধর্ম বা অন্য কোন ধর্ম গ্রহণ করোনি?”

জাফর ইবনে আবু তালিব উত্তরে বললেন, “হে বাদশাহ, আমরা ছিলাম অজ্ঞ জাতি। আমরা মূর্তিপূজা করতাম, মৃত জন্তুর গোশত খেতাম এবং অশ্লীল ও খারাপ কাজে লিপ্ত থাকতাম, আমরা নিকট আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতাম, প্রতিবেশীকে অবজ্ঞা করতাম এবং আমাদের মধ্যে যে সবল সে দুর্বলের হক আত্মসাত করতো। এমতাবস্থায় আল্লাহ আমাদের কাছে আমাদের মধ্যে থেকেই এক ব্যক্তিকে নবী করে পাঠালেন। আমরা তাঁকে সম্ভ্রান্ত বংশীয় ও সত্যবাদী বলে জানি এবং বিশ্বস্ত ও সচ্চরিত্র রূপে তাঁকে দেখেছি। তিনি আমাদেরকে একমাত্র আল্লাহর ইাবাদাত  করার ও তাঁর একত্বে বিশ্বাস করার আহ্বান জানালেন। আমরা আল্লাহকে ছাড়া অন্য যেসব বস্তু তথা পাথর ও মূর্তি ইত্যাদির পূজা করতাম, তা তিনি ছাড়তে বললেন। তিনি সত্য কথা বলা, আমানত রক্ষা করা, আত্মীয়ের সাথে সদাচরণ করা, প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার করা এবং নিষিদ্ধ কাজ ও রক্তপাত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিলেন। তিনি আমাদের অশ্লীল কাজ করতে, মিথ্যা কথা বলতে, ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাত করতে ও নিরপরাধ নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করতে নিষেধ করলেন। আমাদেরকে এক আল্লাহর ইবাদাত করতে ও তাঁর সাথে শরীক না করতে বললেন। নামায পড়তে ও যাকাত দিতে বললেন।” এভাবে জাফর একে একে ইসলামের বিধানগুলো তুলে ধরলেন।

জাফর আরো বললেন, “আমরা তাঁর এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাঁর প্রতি ঈমান আনলাম। তিনি আল্লাহর তরফ থেকে যেসব বিধান দিলেন তার অনুসরণ করতে লাগলাম। এক আল্লাহর ইবাদাত করতে লাগলাম এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক  করলাম না। তিনি যেসব জিনিস হারাম ঘোষণা করলেন আমরা তা থেকে বিরত রইলাম, আর যেসব জিনিস হালাল ঘোষণা করলেন আমরা তা  হালাল বলে মেনে নিলাম। এতে আমাদের জাতি  আমাদের শত্রু হয়ে গেল, তারা আমাদের ওপর নির্যাতন চালাতে লাগলো এবং আমাদেরকে এক আল্লাহর ইবাদাত থেকে মূর্তিপূজায় ফিরিয়ে নেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। তারা আমাদের ওপর চাপ দিতে লাগলো যাতে আমরা ঘৃণ্য অপকর্মগুলোকে আবার হালাল মনে করে নিই। তারা যখন এভাবে আমাদের ওপর পরাক্রান্ত হয়ে উঠলো, যুলুম-নির্যতন দ্বারা আমাদের জীবন দুর্বিষহ করে তুললো এবং  আমাদের মনোনীত ধর্ম পালনে বাধা দিতে লাগলো, তখন আমরা আপনার দেশে এসে আশ্রয় নিলাম। অন্যদের চেয়ে আপনাকেই উত্তম মনে করলাম এবং আপনার প্রতিবেশী হয়ে থাকতে আগ্রহী হলাম। হে বাদশাহ, আমাদের আশা এই যে, আপনার কাছে অত্যাচারের শিকার হবো না।”

নাজাশী তাঁকে বললেন, “তোমাদের নবী আল্লাহর বাণী নিয়ে  সেছেন্ তার কোন অংশ কি তোমার কাছে আছে?” জাফর বললেন, “হ্যাঁ, আছে।” নাজাশী বললেন, “আমাকে পড়ে শোনাও।” জাফর সূরা মারিয়ামের প্রথম থেকে  কতিপয় আয়াত পড়ে শোনালেন। আয়াতগুলো শুনে নাজাশী কাঁদতে লাগলেন। তাঁর দাড়ি অশ্রুসিক্ত হয়ে গেল। তাঁর সাথে সাথে ধর্মযাজকরাও কাঁদতে কাঁদতে ইনজীল ভিজিয়ে ফেললেন। এরপর নাজাশী বললেন, “আমি নিশ্চিত যে, এই বাণী এবং ঈসার বাছে যে বাণী আসতো, উছয় একই উৎস থেকে নির্গত। হে কুরাইশ দূতদ্বয়, তোমরা বিদায় হও। আমি কিছুতেই ওদেরকে তোমাদের হাতে সমর্পণ করবো না। ওরা এখানেই থাকবে।”

উম্মে সালামা বলেন, দরবার থেকে বেরিয়ে আমর ইবনুল ‘আস বললেন, “আল্লাহর শপথ, আগামীকাল আমি আবার নাজাশীর কাছে আসবো। তখন তাঁকে এমন কথা বলবো যা আশ্রিত মুসলমানদের ব্যাপারে অপেক্ষাকৃত সংযত ছিলেন। তিনি বললেন, “এরূপ করো না। যদিও তারা আমাদের বিরোদী, তথাপি আমাদের এতদূর যাওয়া ঠিক হবে না। কারণ তাদের বহু রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়-স্বজন রয়েছে।” আমর ইবনুল ’আস বললেন, “আমি নাজাশীকে জানাবো যে, মুসলমানরা হযরত ঈসা ইবনে মারিয়ামকে স্রেফ আল্লাহর বান্দা বলে বিশ্বাস করে।”

পরদিন আমরা নাজাশীর দরবারে পুনরায় হাজির হয়ে তাঁকে বললেন, “হে বাদশাহ, আশ্রিতরা ঈসা ইবনে মারিয়াম সম্পর্কে একটা মারাত্মক কথা বলে থাকে। আপনি ওদের ডাকুন এবং ঈসা(আ) সম্পর্কে তাদের মতামত কি তা জিজ্ঞাসা করে দেখুন।”

বাদশাহ আবার মুসলমানদেরকে দরবারে ডাকলেন ঈসা (আ) সম্পর্কে মতামত জিজ্ঞাসা করার জন্য। উম্মে সালামা বলেন, এবারে আমরা সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হলাম। মুসলমান মুহাজিররা আবার পরামর্শের জন্য সমবেত হলেন। সবার সামনে এখন নতুন প্রশ্ন, বাদশাহ ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে কি বলবো। অবশেষে সবাই স্থির করনেল যে, আল্লাহ যা বলেছেন এবং আমাদের নবী যে সত্য ধারনা দিয়েছেন, আমরা ঠিক তাই বলবো। ফলাফল যা হওয়ার হবে।

মুহাজিররা দরবারে হজির হলে তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা মারিয়ামের পুত্র ঈসা সম্পর্কে কি ধারণা পোষণ কর?” জাফর ইবনে আবু তালিব বললেন, “আমাদের নবী তাঁর সম্পর্কে যে ধারণা দিয়েছেন, আমরা তাতেই বিশ্বাস করি। তিনি বলেছেন, ঈসা (আ) আল্লাহর বান্দা, তাঁর রাসূল, তাঁরই ফুঁকে দেয়া আত্মা এবং তাঁরই বাণী যা তিনি কুমারী ও পুরুষদের স্পর্শমুক্ত মারিয়ামের ওপর নিক্ষেপ করেছিলেন।”

এ কথা শুনে নাজাশী প্রবল উচ্ছ্বাসবশে মাটিতে হাত চাপড়িয়ে একখানা ক্ষুদ্র কাঠ হাতে নিলেন এবং বললেন, “আল্লাহর শপথ, তুমি যা বলেছো তার সাথে মারিয়ামের পুত্র ঈসার এই কাঠির পরিমাণ পার্থক্যও নেই।”

বাদশাহর এই কথা বলার সময় পার্শ্বস্থ দরবারীরা ক্রোধবশে ফিসফিস করে কি যেন বললো। বাদশাহ তা শুনে বললেন, “যতই ফিসফিস করোনা কেন, আমার মত অপরিবর্তিত থাকবে। হে মুহাজিরগণ, তোমরা এখন নিজ নিজ বাসস্থানে চলে যাও। আমার রাজ্যে তোমরা সম্পূর্ণ নিরাপদে ও নিশ্চিন্তে বাস করতে থাক। যে তোমাদের গালাগাল করবে তাকে জরিমানা করা হবে। তোমাদের কোন একজনকেও কষ্ট দিয়ে আমি যদি পাহাড় স্বর্ণ লাভ করি, তথাপি আমি তা করা পছন্দ করি না। হে রজকর্মচারীগণ, তোমরা এই দূতদ্বয়ের দেয়া উপঢৌকনগুলো ফিরিয়ে দাও। ওগুলোতে আমার কোন প্রয়োজন নেই।”

উম্মে সালামা বলেন, “এরপর তারা উভয়ে চরম লাঞ্ছনার গ্লানি মাথায় নিয়ে ফিরে গেলেন। তাদের আনা উপঢৌকনও ফেরত দেয়া হলো। আমরা তাঁর কাছে অত্যন্ত নিরুদ্বেগ আবাসিক পরিবেশ ও পরম সুজন প্রতিবেশীর সাহচর্যে বসবাস করতে লাগলাম।”

উম্মে সালামা বলেন, এইরূপ নিরুদ্বেগ পরিবেশে আমরা জীবন যাপন করছিলাম। সহসা আবিসিনিয়াা এক ব্যক্তি নাজাসীর সাথে তাঁর রাজত্বের অধিকার নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলো। সেই সময় আমরা যেরূপ দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়েছিলাম সেরূপ আর কখনো পড়িনি। আমাদের আশংকা ছিল ঐ ব্যক্তি যদি নাজাশীর বিরুদ্ধে জয়ী হয় তাহলে সে হয়তো নাজাশীর মত আমাদের আশ্রয় দিতে চাইবে না এবং আমাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকারও স্বীকার করবে না। নাজাশী তাঁর ঐ প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চলে গেলেন। দুই প্রতিপক্ষের মাঝখানে পড়লো নীলনদ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুহাজির সাহাবীগণ বললেন, “এমন কোন ব্যক্তি কি এখানে আছেন যিনি আবিসিনীয় জনগনের এই যুদ্ধের সময় রণাঙ্গণে উপস্থিত হবে  এবং যুদ্ধের ফলাফল কি হয় তা দেখে এসে আমাদের জানাবেন?” যুবাই ইবনুল আওয়াম বললেন, “আমি যাবো।” বয়সে কনিষ্ঠতম এই সাহাবীর ইচ্ছায় সবাই সম্মতি দিলেন।

একট চামড়ার মশকে হাওয়া ভরে যুবাইরের সঙ্গে দেয়া হলো। তিনি ওটা বুকের ওপর স্থাপন করলেন। অতঃপর তার ওপর ভর করে সাঁতরে নীলনদের কিনারে গিয়ে উঠলেন। তারপর হেঁটে রণ্ঙ্গনে হাজির হলেন।

উম্মে সালামা বলেন, এই সময় আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকি যেন নাজাশী তার শত্রুর ওপর জয়লাভ করেন এবং দেশের ওপর তাঁর কর্তৃত্ব বহাল থাকে। আমরা যখন যুদ্ধের ফলাফর জানার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষারত ছিলাম তখন সহসা যুবাইরকে দেখা গেল। তিনি কাপড় নাড়তে নাড়তে দৌড়ে আসছিলেন এবং বলেছিলেন, “তোমরা সুসংবাদ শোন, নাজাশী জয়লাভ করেছেন। আল্লাহ তাঁর শত্রুকে ধ্বংস করেছেন এবং আবিসিনিয়ায় তাঁর কর্তৃত্ব বহাল রেখেছেন।” এরপর আবিসিনিয়ায় তাঁর শাসন সুসংহত হয়। আমরা সেখানে সর্বোত্তম স্থানে অবস্থান করছিলাম। অবশেষে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ফিরে যাই। তিনি তখনো মক্কায় অবস্থান করছিলেন।

 

উমার ইবনুল খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণ

আমর ইবনুল ’আস ও আবদুল্লাহ ইবনে আবু রাবী’আ যখন মক্কায় কুরাইশদের কাছে ফিরে আসলো তখন কুরাইশরা জানতে পারলো যে, তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদেরকে ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছেই, অধিকন্তু নাজাশী তাদেরকে অপ্রীতিকর কথাবার্তা বলেও বিদায় দিয়েছেন। এই সময় হযরত উমারও ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একরোখা ও দুঃসাহসী। তাঁর অসাক্ষাতেও কেউ তাঁর বিরুদ্ধে কিছু বলতে বা করতে সাহস করতো না। হামযা ও উমারের মত দুই বীরকে কিছু বলতে বা করতে সাহস করতো না। হামযা ও উমারের মত দুই বীরকে সাথী হিসেবে পেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ কাফিরদের যুলুম থেকে অনেকটা নিরাপত্তা লাভ করেন। বলতে গেলে তাঁরা শক্তি মত্তায় কুরাইশদেরকেও ছাড়িয়ে গেলেন।

আবদুল্লাহ ইবনে মাস’উদ (রা) বলতেন, “খাত্তাবের পুত্র উমার ইসলাম গ্রহণ না করা পর্যন্ত আমরা কা’বা ঘরে গিযে নামায পড়তে পারতাম না। উমার ইসলাম গ্রহণ করার পর কুরাইশদেরকে চ্যালেঞ্জ করে কা’বার সামনে গিয়ে নামায আদায় করেন এবং আমরাও তাঁর সাথে নামায পড়ি। কিছুসংখ্যক সাহাবা হিজরাত করে হাবশায় [আবিসিনিয়া] যাওয়ার পর উমার (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন।”

উমারের ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটা এইরূপ : তাঁর বোন ফাতিমা বিনতে খাত্তাব ও তার স্বামী সাঈদ ইবনে যায়িদ তখন ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। ব্যাপারটা তাঁরা উভয়েই উমারের কাছ থেকে গোপন রেখেছিলেন। বনী আদী ইবনে কা’ব গোত্রের নাঈম ইবনে আবদুল্লাহ নাহহামও গোত্রের লোকদের ভয়ে নিজের ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন রাখেন। তিনি ছিলেন হযরত উমারেরই জাতিগোষ্ঠীভুক্ত। আরেকজন সাহাবী খাব্বাব ইবনুল আরাত ফাতিমা বিনতে খাত্তাবের কাছে মাঝে মাঝে তাঁকে কুরআন শরীফ পড়াতে আসতেন। একদিন উমার তলোয়ার হাতে নিয়ে বেরিয়েছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর গুটিকয়েক সাহাবীর সন্ধানে। তিনি পূর্বাহ্নে জানতে পেরেছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  তাঁর চল্লিশজন নারাী পুরুষ সহচরকে নিযে সাফা পর্বতের নিকট একটি বাড়ীতে সমবেত হয়েছেন। সেখানে তাঁর সাথে হামযো ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা), আবু বাক্র সিদ্দক (রা) ও আলী ইবনে আবু তালিব (রা) সহ সেইসব মুসলমান ছিলেন যারা আবিসিনিয়া না গিয়ে মক্কাতেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়েছিলেন। নাঈম উমারের (রা) মুখোমুখী দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় যাচ্ছ উমার?”

উমার বললো, “আমি ঐ বিধর্মী মুহাম্মাদের সন্ধানে যাচ্ছি, যে কুরাইশদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে, তাদেরকে বেকুফ সাব্যস্ত করেছে, তাদের ধর্মের নিন্দা করেছে এবং তাদের দেবদেবীকে গালি দিয়েছে। আমি তাকে হত্যা করবো।”

নাঈম তাঁকে বললেন, “উমার, তুমি নিশ্চয়ই আত্মপ্রবঞ্চিত হয়েছো। তুমি কি মনে কর যে, মুহাম্মাদকে হত্যা করার পর বনু আবদে মানাফ তোমাকে ছেড়ে দেবে এবং তুমি অবাধে বিচরণ করতে পারবে? তুমি বরং নিজের ঘর সামলাও।

উমার বললেন, “কেন, আমার গোষ্ঠীর কে কি করেছে?”

নাঈম বললেন, “তোমার ভগ্নিপতি ও চাচাতো ভাই সাঈদ ইবনে যায়িদ ইবনে আমর এবং তোমার বোন ফাতিমা। আল্লাহর শপথ, ওরা উভয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে। তারা মুহাম্মাদের ধর্মের অনুসরণ করে চলেছে। কাজেই পারলে আগে তাদেরকে সামলাও।”[২৮. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন বিপন্ন হবার আশংকা বোধ করে উমারের মনযোগ অন্যদিকে চালিত করাই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। এতে করে ফাতিমা ও তাঁর স্বামীর নির্যাতিত হবার সম্ভাবনা থাকলেও সেটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাশংকার তুলনায় অনেক হালকা ব্যাপার।]

এ কথা শোনামাত্রই উমার বোন ও ভগ্নিপতির গৃহ অভিমুখে ছুটলেন। তখন সেখানে খাব্বাব ইবনুল আরাতও উপস্থিত। তাঁর কাছে পবিত্র কুরআনের অংশবিশেষ ছিল যা তিনি সাঈদ দম্পতিকে পড়াচ্ছিলেন। ঐ অংশে সূরা ত্বাহা লেখা ছিল। তাঁরা উমারের আগমন টের পেলেন। খাব্বাব তৎক্ষন্ৎ একটি ক্ষুদ্র কক্ষে আত্মগোপন করলেন। ফাতিমা কুরআন শরীফের অংশটুকু লুকিয়ে ফেললেন। উমার গৃহে প্রবেশের প্রক্কালে শুনছিলেন যে, খাব্বাব কুরআন পড়ে তাঁদের দু’জনকে শোনাচ্ছেন। তিনি প্রবেশ করেই বললেন, “তোমরা কি যেন পড়ছিলে শুনলাম।” সাঈদ ও ফাতিমা উভয়ে বললেন, “তুমি কিছুই শোননি।” উমার বরলেন, “আল্লাহর শপথ, আমি শুনেছি, তোমরা মুহাম্মাদের ধর্ম গ্রহণ করেছো এবং সেটাই অনুসরণ করে চলছো।” এ কথা বলেই ভগ্নিপতি সাঈদকে একটা চড় দিলেন। ফাতিমা উঠে এসে স্বামীকে তার প্রহার থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করতে লাগলেন। উমার ফাতিমাকে এমন জোরে আঘাত করলেন যে, তিনি আহত হলেন।

উমারের এই বেপরোয়া আচরণ দেখে তারা উভয়ে বললেন,“হ্যাঁ, আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং আল্লাহ ও তাঁর প্রতি ঈমান এনেছি। এখন আপনি যা খুশী করতে পারেন।” উমার তাঁর বোনের দেহে রক্ত দেখে নিজের এহেন আচরণে অনুতপ্ত হলেন।

তারপর অনুশোচনার সুরে বোনকে বললেন, আচ্ছা, তোমরা যে বইটা পড়ছিলে, সেটা আমাকে দাও তো। আমি একটু পড়ে দেখি মুহাম্মাদ কি বাণী প্রচার করে?” এখানে উল্লেখ্য যে, উমার লেখাপড়া জানতেন।

তাঁর বোন বললেন, “আমাদের আশংকা হয়, বইটা দিলে তুমি নষ্ট করে ফেলবে।”

উমার দেবদেবীর শপথ করে বললেন, “তুমি ভয় পেও না। আমি ওটা পড়ে অবশ্যই ফিরিয়ে দেব।” একথা শুনে বোনের মনে এই মর্মে আশার সঞ্চার হলো যে, তিনি হয়তো ইসলাম গ্রহণ করবেন। তাই তিনি বললেন, “ভাইজান, আপনি মুশরিক হওয়ার কারনে অপবিত্র। অথচ এই বই স্পর্শ করতে হলে পবিত্রতা অর্জন করা প্রয়োজন।”[২৯.কুরআন শরীফ স্পর্শ করার জন্য পবিত্রতার শর্ত সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন, ফরয। আবার কারো কারো মতে ফরয নয়-মুস্তাহাব।]

উমার তৎক্ষনাৎ গিয়ে গোসল করে পবিত্র হয়ে আসলেন। ফাতিমা এবার কুরআন শরীফ  দিলেন। খুলেই যে অংশটি তিনি দেখলেন তাতে ছিল সূরা ত্বাহা। এথম থেকে কিছুটা পড়েই বললেন, “কি সুন্দর কথা! কি মহান বানী!” আড়াল থেকে এ কথা শুনে খাব্বাব বেরিয়ে এসে বললেন, “ উমার মনে হয়, ্আল্লাহ তার নবীর দোয়া কবুল করে তোমাকে ইসলামের জন্য মনোনীত করেছেন। গতকাল তিনি দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, আবুল হাকাম ইবনে হিশাম অথবা ইমার ইবনুল খাত্তাবের দ্বারা ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি কর।’ হে উমার, তুমি আল্লাহর ডাকে সাড়া দাও, তুমি আল্লাহর ডাকে সাড়া দাও!”

উমার তখন বললেন, “হে খাব্বাব, আমাকে মুহাম্মাদের সন্ধান দাও। আমি তাঁর কছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করি।” খাব্বাব বললেন, “তিনি সাখা পর্বতের নিকট একটা বাড়ীতে কিছুসংখ্যক সাহাবার সাথে অবস্থান করছেন।”

উমার তাঁর তলোয়ার কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবাদের সন্ধানে চললেন। যথাস্থানে গিয়ে দরজায় করাঘাত করলেন। আওয়াজ শুনে একজন সাহাবা উঠে এসে জানালা দিয়ে তাঁকে দেখলেন। সেখলেন উমার তরবারী হাতে দাঁড়িয়ে। তিনি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ফিরে গেলেন এবং বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, উমার দরজায় তরবারী নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।” হামযা রাদিয়ল্লাহু তা’য়ালা আনহু বললেন, “তাঁকে আসতে দাও। যদি ভালো উদ্দেশ্যে এসে থাকে আমরা তাকে সহযোগিতা করবো আর যদি খারাপ উদ্দেশ্যে এসে থাকে তবে তাঁর তরবারী দিয়েই তাকে হত্যা করবো।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তাকে আসতে দাও।” তিনি উমারকে ভেতরে যেতে অনুমতি দিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠে উমারের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং কক্ষের ভেতরে তাকে সাক্ষাত দান করলেন। তিনি উমারের পাজামার বাঁধনের জায়গা অথবা গলায় চাদরের দুই প্রান্ত যেখানে একত্রিত হয় সেখানে শক্তভাবে মুষ্টিবদ্ধ করে ধরলেন। তারপর করলেন, “হে খাত্তাবের পুত্র, কি উদ্দেশ্যে এসছো? আল্লাহর শপথ, আল্লাহর তরফ থেকে তোমার উপর কোন কঠিন মুসিবত না আসা পর্যন্ত তুমি সংযত হবে বলে আমার হয় না।”

উমার বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমি  আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানের প্রতি ঈমান আনার জন্যই এসছি।”

একথা শোনামাত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন জোরে ‘আল্লাহু আকবার’ বললেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাদের সবাই বুঝতে পারলো যে, উমার ইসলাম গ্রহণ করেছে। হামযার পরে উমারের ইসলাম গ্রহণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাগণের মনোবল বিপুলভাবে বৃদ্ধি পেল। তাঁরা নিশ্চিত হলেন যে, এই দু’জন এখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি মুশরিকদের যুলুম-নির্যাতন প্রতিরোধ করতে পারবেন এবং তারা সবাই ওদের দু’জনের সহযোগিতায় মুসলমানদের শত্রুদের মোকাবিলা করতে সক্ষম হবেন। এরপর সাহাবাগণ সেই স্থান থেকে নিজ নিজ অবস্থানে চলে গেলেন।

উমার রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু বলেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করার পর সেই রাতেই চিন্তা করতে লাগলাম যে, মক্কাবাসীদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবচেয়ে কট্রর দুশমন কে আছে। আমি তার কাছে যাবো এবং আমার ইসলাম গ্রহণের কথা তাকে জানাবো। আমি স্থির করলাম যে, আবু জাহলই বড় দুশমন। অতঃপর সকল হতেই আমি তার বাড়ীতে গিয়ে দরজায় করাঘাত করলাম। আবু জাহল বেরিয়ে আমার সামনে আসলো। সে বললে, “ভাগ্নে, তোমাকে খোশ আমদেদ জানাচ্ছি। [৩০.উমারের (রা) মাতা হানতামা বিনতে হিশাম আবু জাহলের বোন ছিলেন।]

কি মনে করে এসছো?” আমি বললাম, “আপনাকে জানাতে এসেছি যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুল মুহাম্মাদের প্রতি ঈমান এনেছি এবং তাঁর আনীত বিধান ও বাণীকে মেনে নিয়েছি।” এ কথা শোনামাত্র সে আমার মুখের ওপর এই বলে দরজা বন্ধ করে দিল, “আল্লাহ তোকে কলংকিত করুক, যে খবর তুই এনছিস তাকেও কলংকিত  করুক।”

চুক্তিনামার বিবরণ

কুরাইশরা দেখলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ একটা নিরাপদ ও নিরুপদ্রব স্থানে আশ্রয় পেয়েছে এবং নাজাশী তাঁর কাছে আশ্রয়প্রার্থীদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছে। তারা দেখলো, উমার ইসলাম গ্রহণ করেছে।

ফলে উমার ও হামযার মত লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহচরদের দলভুক্ত হয়েছে এবং ইসলাম মক্কার পার্শ্ববর্তী গোত্রসমূহের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। এসব দেশে তারা পুনরায় মিলিত লো এবং এই মর্মে একটা চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করাার সিদ্ধান্ত নিলো যে, বনু হাশিম ও বনু আবদুল মুত্তালিব গোত্রের সাথে অবশিষ্ট কুরাইশগণ এখন থেকে আর কোন বিয়ে শাদী ও বেচাকেনা করবে না।

একটি সম্মেলন আহ্বান করে তারা এই চুক্তিনামা সম্পাদন ও স্বাক্ষর করলো। এরপর চুক্তিনামাটি কা’বা শরীফের ভেতরে ঝুলিয়ে রাখলো, যাতে তাদের মনে ওটার গুরুত্ব ও প্রভাব বেশী হয়।

মানসূর ইবনে ইকরামা এই চুক্তিনামা লিপিবদ্ধ করে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বদদোয়ায় তার কয়েকটি আঙ্গুল অসাড় হয়ে যায়।

এ চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর বনু আবদুল মুত্তালিব গোত্রের লোকগণ আবু তালিবের শরণাপন্ন হয়। তারা সবাই তার কাছে সমবেত হলো এবং সবাই আবু তালিবের সাথে তার গিরিবর্তে প্রবেশ করলো। অপরদিকে বনু হাশিম গোত্র থেকে আবু লাহাব বেরিয়ে গিয়ে বৈরী কুরাইশদের সাথে মিলিত হলো এবং তাদের পক্ষ সমর্থন করলো। সে বলতো. “মুহাম্মাদ আমাকে এমন সব বিষয় বলে যা আমি দেখতে পাইনে। সে বলে মৃত্যুর পরে আবার জীবন হবে। একথা বিশ্বাস করলে আমার হাতে আর কি থাকলো?” এরপর সে তার দ্ইু হাতে ফুঁক দেয় আর বলে, “তোমাদের উভয়ের ধ্বংস সাধিত হোক। (অর্থাৎ উভয় হাতের ) মুহাম্মাদ যা বলে তার কোনটাই আমি তোমাদের ক্ষেত্রে দেখি না।”(হাতে আমলনামা আসার ব্যাপারে নিয়ে উপহাস করাই সম্ভবতঃ তার উদ্দেশ্য।(অনুবাদক) এই  এসঙ্গে আল্লাহ এই আয়াত নযিল করেন :

[আরবী *************]

“আবু লাহাবের দুই হাত ধ্বংস হোক এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক”

বনু আবদুল মুত্তালিব ও বনু হাশিম গোত্রদ্বয়ের গিরিবর্তে অবরোধ জীবন যাপন চলে দুই বা তিন বছর। এই সময় তারা অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করেন। দুই একজন সহৃদয় কুরাইশ আত্মীয়ের গোপন সহযোগিতা ছাড়া কিছুই তাদের কাছে পৌঁছতো না।

[৩১. কারো কারো মতে সূরা লাহাবের শানে নুযুল এইরূপ: আল্লাহ যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘনিষ্ঠতম আত্মীয় স্বজনের নিকট ইসলামের দাওয়াত দেয়ার নির্দেশ দেন তখন একদিন তিনি সাফা পর্বতে আরেহণ করে সমগ্র মক্কাবাসীকে ডাক দেন। সবাই সমবেত হলে তিনি বললেন, “আমি যদি তোমাদের বলি যে, পর্বতের অপর পাশে সমভূমিতে একটি সেনাদল তোমাদের ওপর হামলা করার জন্য ওত পেতে আছে, তাহলে তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে?” তখন সবাই এক বাক্যে বললো, “তোমাকে তো কখনো মিথ্যা কথা বলতে  দেখিনি।” তখন তিনি বললেন, “আমি তোমাদের হুঁশিয়ার করছি এক কঠিন শাস্তি সম্পর্কে।” এই সময় আবু লাহাব বলে, “তুই মর! এই জন্য আমাদের ডেকেছিস?” এর জবাবে সূরা লাহাব নাযিল হয়।]

রাসূলুল্লাহর (সা) উপর কুরাইশদের নির্যাতন

আল্লাহর বিশেষ রক্ষা ব্যবস্থার কারণে আপন চাচা বনু আবদুল মুত্তালিব ও বনু হাশিম গোত্রের কার্যকর প্রতিরোধের মুখে শারীরিক কোন আক্রমন চালাতে পারেনি। তাই তারা অনন্যোপায় হয়ে তাঁকে নিন্দা, কটাক্ষ, উপহাস বিদ্রƒপ করা এবং তাঁর সএথ ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হওয়ার পথ বেছে নেয়। কুরআন কুরাইশদের এ জাতীয় ক্রিয়াকলাপ এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে তাদের শত্রুতামূলক আচরণ সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা ও বিশ্লেষণসহ নাযিল হতে থাকে। এ জাতীয় আচরণকারীদের কারো কারো নাম কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদের নাম উল্লেখ না করে কাফিরদের সম্পর্কিত সাধারণ বর্ণনার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

কুরাইশদের মধ্য থেকে এ জাতীয় যেসব লোকের নাম কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের মধ্যে আবু লাহাব ইবনে আবদুল মুত্তালিব অন্যতম। তার স্ত্রী উম্মে জামীল বিনতে হারব ইবনে ইমাইয়কে “হাম্মালাতার হাতাব” অর্থাৎ কাঠ বহনকারিণী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা সে কাঁটা সংগ্রহ করে এনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যাতায়াতের পথে ছড়িয়ে রাখতো। এজন্যই আল্লাহ তাদের উভয়ের সম্পর্কে এই সূরা নাযিল করেন :

[আরবী *************]

“ভেঙ্গে গিয়েছে আবু লাহাবের দুই হাত, আর সে ব্যর্থ হয়েছে। তার সম্পদ ও অর্জিত কোন কিছুই তার কাজে আসেনি। অবশ্যই সে শিখাবিশিষ্ট আগুনে নিক্ষিপ্ত এবং তার সাথে তার স্ত্রীও- যে কাষ্ঠ বহনকারিনী। তার গলায় থাকবে খেজুর ছালের রশি।”

ইবনে ইসহাক বলেন, আমি শুনেছি, উম্মে জামীল যখন তার ও তার স্বামীর ব্যাপারে নাযিল হওয়া কুরআনের এই সূরার কথা শনলো, তখন হাতে একটা পাথর মুষ্টিবদ্ধ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লমের নিকট উপস্থিত হলো। এই সময় তিনি আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়ারøাহ তা’য়ালা আনহুর সঙ্গে কা’বা শরীফের পাশে মসজিদে হারামে বসে ছিলেন। সে সেখানে তাঁদের দু’জনের কাছে এসে দাঁড়াতেই আল্লাহ তা’য়ালা তার চোখ থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অদৃশ্য করে দিলেন। ফলে সে আবু বাক্র ছাড়া আর কাউকে দেখতে পেলো না। সে বললো, “হে আবু বাক্র, তোমার সঙ্গী কোথায়? আমি শুনেছি, সে আমার নিন্দা করে। আল্লাহর শপথ, তাকে পেলে আমি এই পাথর তার মুখের উপর ছুড়ে মারতাম।” এ কথা বলে সে চলে গেল। আবু বাক্র (রা) বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কি মনে করেন যে, সে আপনাকে দেখতে পেয়েছে?” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “সে আমাকে দেখতে পায়নি। আল্লাহ আমাকে দেখবার শক্তি তার থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন।”

আর উমাইয়া ইবনে খালাফ ইবনে ওয়াহাব ইবনে হুযাফা ইবনে জুমাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখলেই উচ্চস্বরে গালাগালি ও অস্ফুট স্বরে নিন্দা করতো। আল্লাহ তার সম্পর্কে সুরা হুমাযা নাযিল করেন :

[আরবী *************]

‘সামনাসামনি কটু কথা বলতে, অসাক্ষাতে নিন্দা করতে এবং ধনসম্পদ উপার্জন করে তা গুনে গুনে রাখতে অভ্যস্ত এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য অনিবার্য ধ্বংস। সে মনে করে, তার সম্পদ তাকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে। কক্ষণো নয়, সে অবশ্যই চূর্ণবিচুর্ণকারী স্থানে নিক্ষিপ্ত হবে। আর সেই চুর্ণ বিচূর্ণকারী স্থানটা কি, তাকি তুমি জান? সেটা আল্লাহর আগুন, যাকে উত্তপ্ত করা হয়েছে, যা অন্তর পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। নিশ্চয় তা তাদের ওপর ঢেকে বন্ধ করে দেয়া হবে, তা উঁচু উঁচু স্তম্ভে পরিবেষ্টিত থাকবে।”

আর একজন ছিল ’আস ইবনে ওয়ায়েল সাহামী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্যতম সাহাবী খাব্বাব ইবনুল আরাত একজন কর্মকার ছিলেন। তিনি তরবারী বিক্রি করেছিলেন। এই সুবাদে ’আসের নিকট তার বেশ কিছু টাকা পাওনা ছিল। তিনি সেই টাকার তাগাদা দিতে গেলে ’আস বললো, “হে খাব্বাব, তোমাদের লোক মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশ্বাস করে যে, জান্নাতে যারা যাবে  তারা যত খুশী সোনা, রূপা, পোশাক ও চাকর নফর পাবে, তাই না?” খাব্বাব বললেন, ‘হ্যাঁ।’ ’আস বললো, “তাহলে হে খব্বাব, আমাকে কিয়ামাত পর্যস্ত সময় দাও। আমি জান্নাতে গিয়ে তোমার পাওনা পরিশোধ করে দেবো। হে খাব্বাব, আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, তুমি ও তোমার সাথী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কাছে আমার চেয়ে অগ্রগন্য হবে না এবং আমার চেয়ে এবং আমার চেয়ে বেশী সৌভাগ্যশালীও হবে না।” এ প্রেক্ষিতে ’আস সম্পের্কে আল্লাহ নাযিল করেন-

[আরবী *************]

“তুমি কি সেই ব্যক্তিকে দেখেছো যে আমার আয়াতগুলোকে অস্বীকার করে এবং বলে যে, আমাকে তো ধন সম্পদ ও সন্তান সন্ততি দিয়ে সমৃদ্ধ করা হতেই থাকবে। সে কি গায়েব জেনে ফেলেছে, কিংবা করুণাময় আল্লাহর কাছ থেকে কোন প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিয়েছে? কক্ষণো নয়! সে যা বলে আমি লিখে রাখবো এবং তাঁর  শাস্তি আরো বাড়িয়ে দেবো? যে  সন্তান ও ধন সম্পদের কথা সে বলে, তা শেষ পর্যন্ত আমারই অধিকারভুক্ত হবে এবং সে একাকীই আমার কাছে হাজির হবে।” (সূরা মারিয়াম)

অপর এক রেওয়ায়েত থেকে জানা যায় যে, আবু জাহল ইবন হিশাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে দেখা করে বলে, “হে মুহাম্মাদ, আমাদের দেবদেবীকে গালাগালি করা তোমাকে বন্ধ করতে হবে। নচেত তোমার খোদাকে গাল দেবো।” এ প্রসঙ্গে আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করেন :

[আরবী *************]

“ওদের দেবদেবীকে তোমরা গাল দিও না। তাহলে ওরা  শত্রুতা ও অজ্ঞতার কারণে আল্লাহকে গাল দেবে।” (আল আনয়াম)

নাদার ইবনে হারেস ইবনে কালাদা ইবনে আবদে মানাফ ইবনে আবদুদ্ দার ইবনে কুসাই ছিল এমনি আর একজন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই কোন বৈঠকে আল্লাহর দিকে মানুষকে দাওয়াত দিতেন, কুরাইন তিলাওয়াত করতেন এবং কুরাইশদেরকে অতীতের ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলোর ইতিহাস বর্ণনা করে তাদের অনুরূপ পরিণতির শিকার হওয়া সম্পর্কে সাবধান করে দিতেন এবং ঐ বৈঠকের শ্রোতদের কাছে পারস্যের বীর রুস্তম ও ইসফিন্দিয়ারের কাহিনী বলতো। তারপর সে বলতো, “মুহাম্মাদ আমার চেয়ে ভাল কাহিনী শোনাতে পারে না। মুহাম্মাদের কাহিনীগুলো তো প্রচীন যুগের কিচ্ছা কাহিনী ছাড়া আর কিছুই নয়। ওগুলো মুহাম্মাদ যেমন লিখে রেখেছে, তেমনি আমিও লিখে রেখেছি।” তার সম্পর্কে আল্লাহ নযিল করেন,

[আরবী *************]

“তারা বলেছে : এসব প্রচীন যুগের কিচ্ছা কাহিনী যা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লিখিয়ে নিয়েছে। এগুলো তাকে প্রতিদিন সকালে ও বিকালে শেখানো হয়। হে নবী, তুমি বল : এ বাণী  তিনিই নাযিল করেছেন যিনি আকাশ ও পৃথিবীর সকল গুপ্ত রহস্য জানেন। বস্তÍতঃ তিনি ক্ষমাশীল করুণাময়।” (আল কুরআন)

[আরবী *************]

“অবিশ্বাসীকে  যখনই আমার আয়াত পড়ে শোনানো হয় অমনি সে বলেঃ এসব তো প্রাচীন কালের কিচ্ছা কাহিনী মাত্র।” (আল কালাম)

আরো নাযিল হয়,

[আরবী *************]

“এমন  প্রত্যেক মিথ্যাবাদী পাপিষ্ঠের জন্যে ধ্বংস যার সামনে পঠিত আল্লাহর আয়াতগুলো শুনেও সে দাম্ভিকতার ওপর শক্ত হয়ে দাঁড়ায় এবং এমন ভান করে যেন শুনেনি। সুতরাং তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ জানিয়ে দাও।” (আল জাসিয়া)

আর এক ব্যক্তি হলো আখনাস ইবনে শুরাইক ইবনে আমর ইবনে ওয়াহাব সাকাফী। সে ছিল একজন গণ্যমান্য লোক। সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নানা উপায়ে লাঞ্ছনা দিত এবং অকথ্য কথা বলতো। আল্লাহ তার সম্পর্কে সূরা আলা কালামে বলেন,

[আরবী *************]

“এমন ব্যক্তির আনুগত্য করো না যে অত্যধিক কসম খায়, যার কোন গুরুত্ব নেই, যে অতিমাত্রায় গালাগাল করে ও চোগলখুরী করে বেড়ায়, যে ভাল কাজে বাধা দেয়, সীমালংঘন করে, পাপ কাজে লিপ্ত থাকে, যে অতিমাত্রায় দুষ্কৃতিকারী, অত্যাচারী এবং সর্বোপরি যে পরিচয়হীন।”

ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা বলেছিল, “কুরাইশ গোত্রে আমার মত সরদার এবং সাকীফ গোত্রে আবু মাস’উদ আমর ইবনে উমাইর সাকাফী থাকতে ওহী নাযিল হলো কিনা মুহাম্মাদের ওপর আমরা দুই শহরের দুই প্রধান ব্যক্তিত্ব কিনা বাদ পড়ে গেলাম।”

এর জবাবে আল্লাহ নাযিল করেন  সূরা যুখরুফের আয়াত,

[আরবী *************]

“তারা বলেছে : দুই শহরের[৩২. অর্থাৎ মক্কা ও তায়েফ] কোন একজন প্রধান ব্যক্তির ওপর কুরআন নাযিল হলেই ভাল হতো। তোমার প্রভুর অনুগ্রহ ওরাই বণ্টন করে থাকে? পার্থিব জীবনে তাদের জীবিকা আমিই তাদের মধ্যে বণ্টন করেছি এবং তাদের কিছু সংখ্যক লোককে অপর কিছুসংখ্যক লোকের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি, যার ফলে একে অপরকে কাজে লাগাতে পারে। আসলে তারা যা সংগ্রহ করছে তার চেয়ে তোমার প্রভুর অনুগ্রহই উৎকৃষ্ট।”

উকবা ইবনে আবু মুয়াইত ও উবাই খালফ উভয়ে পরস্পরের অন্তরঙ্গ সহচর ছিল। একবার উকবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মজলিসে বসেছিল এবং তাঁর কথা শুনেছিল। উবাই এখবর জানতে পেরে উকবার কাছে এসে বললো, “তুমি মুহাম্মাদের মজলিসে বসেছো এবং তার কথা শুনেছো তা কি আমি শুনিনি মনে করেছো?” অতঃপর সে কঠিন শপথ বাক্য উচ্চারণ করে বললো, “তুমি যদি মুহাম্মাদের মজলিসে বসে থাক এবং তার কথা শুনে থাক আর তার মুুখে থু থু নিক্ষেপ না করো তবে তোমার মুখ দেখা আমার জন্য হারাম হয়ে যাবে।” আল্লাহর অভিসম্পাত উকবার  উপর! হতভাগা সত্যি সত্যি আল্লাহর দুশমন উবাইয়ের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করলো।

এ সম্পর্কে আল্লাহ নাযিল করলেন,

[আরবী *************]

“যেদিন যালিম নিজের আঙ্গুল কামড়ে অনুশোনা করবে এবং ভাববে, হায়! আমি যদি রাসূলের সহযোগিতা করতাম। হায়! আমি যদি অমুককে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম। সে তো আমাকে বিপথগামী করে দিয়েছে আমার কাছে পথনির্দেশ আসার পর। বস্তুতঃ শয়তান মানুষকে হেয় করতে খুবই সিদ্ধহস্ত।”

একদিন উবাই ইবনে খাল্ফ একখানা জীর্ণপ্রায় পুরনো হাড় নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গেল এবং সে বললো, “হে মুহাম্মাদ, তুমি কি বিশ্বাস কর যে, আল্লাহ এই ধ্বংসপ্রায় হাড়কে পুনর্জীবিত করবেন? অতঃপর সে ওটা নিজের হাতের ওপর গুড়ো করে বাতাসে ফুঁক দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে উড়িয়ে দিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “ হ্যাঁ, আমি বলি আল্লাহ এ হাড়কে এবং তোমাকে জীর্ণ হয়ে যাওয়ার পর পুনর্জীবিত করবেন। অতঃপর তোমাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।” এ প্রসঙ্গে আল্লাহ আয়াত নযিল করেন করলেন,

[আরবী *************]

“সে আমাকে দিয়ে দৃষ্টান্ত দেয় আর নিজের সৃষ্টির ব্যাপারটা ভুলে যায়। সে বলে, ‘এই অস্থিগুলো যখন জরাজীর্ণ হয়ে গেছে, তখন কে এগুলোকে আবার জীবিত করবে?’ তুমি তাকে বল, ‘এগুলিকে তিনি পুনর্জীবিত কবেন যিনি প্রথমবার এগুলিকে সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি সৃষ্টির সব কাজই জানেন। তিনিই সেই আল্লাহ যিনি তোমাদের জন্য শ্যামল সবুজ গাছ হতে আগুন উৎপন্ন করেছেন আর তা দিয়ে তোমরা নিজেদের চুলো জ্বালাও।” (ইয়াসীন)

আর একদিন যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কা’বার তাওয়াফ করছিলেন, তখন আসওয়াদ ইবনুল মুত্তালিব ইবনে খালফ ও ’আস ইবনে ওয়ায়েল সাহামী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘিরে ধরলো। তারা সবাই ছিল নিজ নিজ গোত্রের প্রবীণ ব্যক্তি। তারা বললো, “হে মুহাম্মাদ. এসো আমরা তোমার আল্লাহর পূজা করি আর  তুমি আমাদের দেব-দেবীর পূজা কর। এভাবে আমরা পরস্পরের কাজে শরীক হয়ে যাই। যদি তোমার মাবুদ আমাদের দেব-দেবীর চেয়ে ভাল হয়ে থাকে তা হলে আমরা তার পুজার অংশ হয়ে গেলাম। আর যদি আমাদের দেবতা তোমার খোদার চেয়ে ভাল হয়ে থাকে তাহলে তুমিও তার অংশ পেয়ে গেলে।”এর জবাবে আল্লাহ নযিল করলেন,

[আরবী *************]

“হে নবী, তুমি বল : হে কাফিরগণ, তোমরা যার ইবাদাত কর আমি তার ইবাদাত করি না। আর আমি যাঁর ইবাদাত করি তোমরা তাঁর ইবাদাত কর না। আমি তার ইবাদাত করবো না যার ইবাদাত তোমারা করছো, আর আমি যাঁর ইবাদাত করি তোমরাও তার ইবাদাত করবে না। তোমাদের জন্য তোমাদের দীন আর আমার জন্য আমার দীন।” (আল কাফিরুন)

আল্লাহ্ কাফিরদেকে ভীতি প্রদর্শনের জন্য যাক্কুম বৃক্ষের উল্লেখ করলে আবু জাহল ইবনে হিশাম বললো, “হে কুরাইশগণ, মুহাম্মাদ যে যাক্কুম বৃক্ষের ভয় দেখাচ্ছে, সেটা কি জান?” তারা বললো, ‘না’ তখন সে বললো, “মদীনার খেজুর যা মাখন সহকারে রাখা হয়। আল্লাহর শপথ করে বলছি, মদীনায় যদি বসবাস করার সুযোগ পাই তাহলে তৃপ্তি সহকারে ওটা খাবো।” এই প্রসঙ্গে আল্লাহ নাযিল করলেন,

[আরবী *************]

“যাক্কুম গাছ গুনাহগারের খাদ্য হবে, তেলের গাদের মত পেটের ভেতরে এমনভাবে উথলে উঠবে যেমন ফুটন্ত পানি টগবগ করে উথলে ওঠে।” (আদদুখান)

অর্থাৎ যাক্কুম সম্পর্কে আবু জাহল যা বলে আসলে তা নয়।

একবার ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মিলিত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথে কথা বলতে আরম্ভ করেন। তিনি ওয়ালীদের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে উঠছিলেন। এই সময় অন্ধ সাহাবী ইবনে উম্মে মাকতুম সেখানে গিয়ে হাজির হলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আলাপ শুরু করে দিলেন এবং তাঁকে এ কুরআন পড়ে শোনাতে বললেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তাঁর এ আগমন ও কথাবার্তা বিরক্তিকর বলে মনে হলো। কারণ তিনি ওয়ালীদের সাথে কথাবার্তায় তেমন মনোযোগ দিতে পারছিলেন না। ফলে তার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে তিনি যে আশা পোষণ করছিলেন  সেটা প- হয়ে যাবার উপক্রম হলো। আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমের কথাবার্তা অতিমাত্রায় বেড়ে যেতে আরম্ভ করেছে দেখে তিনি বিরক্তিভরে মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং তাঁকে কোন গুরুত্ব দিলেন না। তাই আল্লাহ তা’আলা তাঁর সম্পর্কে নাযিল করলেন,

[আরবী *************]

“সে (রাসূল) ভ্রূ কুঁচকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল এ কারণে যে, তার কাছে অন্ধ লোকটি এসছিল। তুমি জান, সে হয়তো শুধরে যেত কিংবা উপদেশ গ্রহণ করতো এবং উপদেশ তার জন্য কল্যানকর হতো। পক্ষান্তরে যে লোক অনাগ্রহী তার প্রতি তুমি বেশ মনোযোগ দিচ্ছ। অথচ সে শুধরে না গেলেই বা তোমার কি আসে যায় আসে? আর যে লোক তোমার নিকট দৌড়ে এলো এবং যে পরিণাম সম্পর্কে ভয় করছিলো তুমি যে লোক তোমার নিকট দৌড়ে এলো এবং যে পরিণাম সম্পর্কে ভয় করছিলো তুমি তার প্রতি অনীহা দেখাচ্ছ। কক্ষণো নয়, এটা একটা উপদেশ-যার ইচ্ছা গ্রহণ করবে। সম্মানিত গ্রন্থসমূহে লিপিবদ্ধ, যা উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ও পবিত্র।” (সুরা ’আবাসা)

অর্থাৎ আল্লাহ বলেন : আমি তোমাকে সকলের জন্য সুসংবাদ দানকারী ও সতর্ককারী করে পঠিয়েছি এবং তোমাকে নির্দিষ্ট কারো জন্য পাঠাইনি। অতএব যে যা চেয়েছে তা থেকে তাকে বঞ্চিত করো না। আর যে ব্যক্তি ইচ্ছুক নয় তাঁর জন্য লালায়িত হয়ো না।

যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর বাড়ীর চৌহদ্দিতেই কষ্ট দিত তারা হলো আবু লাহাব, হাকাম ইবনে আবুল ’আস, উকবা ইবনে আবু মুয়াইত, আদী ইবনে হামরা আস্ সাকাফী ও ইবসুল আসদা আল-হাযালী। এরা সবাই ছিল তাঁর প্রতিবেশী। হাকাম ইবনে  আবুল ’আস ছাড়া এদের মধ্যে কেউ ইসলাম গ্রহণ করেনি। বর্ণিত আছে, এসব লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নামায পড়তেন তখন তাঁর ওপর ছাগলের নাড়ীভুড়ি ছুড়ে মারতো। কেউ কেউ তাঁর বাড়ীতে রান্নার জন্য চড়ানো হাড়িতেও ঐ নাড়ীভুড়ি নিক্ষেপ করতো। শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাধ্য হয়ে একটা দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে নামায পড়তে লাগলেন। তারা তাঁর শরীরে নাড়িভুড়ি নিক্ষেপ করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটা তা একটা লাঠির মাথায় উঠিয়ে বাড়ীর বাইরে যেতেন এবং সংশ্লিষ্ঠ লোকের ঘরের দরজায় গিয়ে বলতেন, “হে আবদে মানাফের জাতিগোষ্ঠি, এটা তোমাদের কোন ধরনের প্রতিবেশীসুলভ আচরণ? তারপর তিনি সেই নাড়ীভুড়ি রাস্তায় ফেলে দিতেন।”

আবিসিনিয় থেকে মক্কার লোকদের ইসলাম গ্রহণের খবর শুনে মুহাজিরদের প্রত্যাবর্তন

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যেসব সাহাবী আবিসিনিয়ায় হিজরাত করেছিলেন, তাঁরা শুনলেন যে, মক্কাবাসীরা ইসলাম গ্রহণ করেছে। একথা শুনে তাঁরা মক্কা অভিমুখে রওনা দিলেন। মক্কা নগরীর কাছাকাছি পৌঁছলে তাঁরা জানতে পারলেন যে, মক্কাবাসীরা ইসলাম গ্রহণ করেছে বলে যে কথা তাঁরা শুনেছেন তা ঠিক নয়। ফলে মক্কাবাসীদের কারো সহযোগিতা নিয়ে অথবা গোপনে ছাড়া কেউই নগরীতে প্রবেশ করলেন না। সর্বমোট ৩৩জন সাহাবী আবিসিনিয়া থেকে প্রত্যাবর্তন করলেন। উসমান ইবনে মাযউন ওয়ালীদ ইবনে মুগীরার আশ্রয়ে এবং আবু সালামা ইবনে আবদুল আসাদ ইবু তালিব ও তার মাতা রাবাহ বিনতে আবদুল মুত্তালিবের আশ্রয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন।

চুক্তি বাতিল হওয়ার কাহিনী

বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবকে গিরিবর্তে অবরোধ করে রাখার লক্ষ্যে কুরাইশগণ যে চুক্তিনমায় সই করে, কুরাইশদের একটি দল অবশেষে তা  বাতিল করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী কৃতিত্ব হিশাম ইবনে আমরের। কারণ, তিনি ছিলেন নাদলা ইবনে হিশাম ইবনে আবদে মানাফের মা-শরীক সৎভাই। হিশাম অবরুদ্ধ বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের কাছে আসতেন ও তাঁদেরকে উটের পিঠে করে এনে খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ করতেন। গিরিবর্তের প্রবেশ মুখে এস নিজের মাথা থেকে শিরস্ত্রাণ খুলে তা দিয়ে এক পাশে সজোরে আঘাত করতেন। তারপর গিরিবর্তের ভেতরে প্রবেশ করতেন। পুনরায় আসতেন এবং পোশাক দিয়ে যেতেন। এভাবে বিভিন্ন সময় দরকারী জিনিসপত্র সরবরাহ করতেন।

একদিন যুহাইর ইবনে আবু উমাইয়া ইবনে মুগীরার কাছে গেলেন। তিনি ছিলেন আবদুল মুত্তালিবের কন্যা আতিকার ছেলে। গিয়ে বললেন, “হে যুহাইর, তুমি নিজে তো খেয়ে পরে ও স্ত্রী পরিজন নিয়ে দিব্যি সুখে আছ, অথচ তোমার মামারা কোথায় কিভাবে আছেন তাও তোমার জানা আছে। তারা বয়কট অবস্থায় রয়েছেন। কেউ তাদের সাথে বেচাকেনা করে না, বিয়েশাদী করে না। তুমি কি করে এ অবস্থ মেনে নিয়েছো? আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, ওরা যদি আবুল হাকাম ইবনে হিশামের (আবু জাহল) মামা হতো, আর তুমি যদি তাদেরকে এভাবে বয়কটকরতে তাকে অনুরোধ করতে, তাহলে সে কখ্খনো তোমার অনুরোধ রক্ষা করতো না।” যুহাইর বললো. “ব্যস,হয়েছে। আর বলতে হবে না। শোনো হিশাম, আমি একা কি করতে পারি? আমার সাথে যদি আর একজন লোক হতো তা হলে এই চুক্তি বাতিল করার উদ্যেগ নিতাম।” হিশাম কললেন, “লোক তো একজন পেয়েছি।” যুহাইর বললো, “কে তিনি? ” হিশাম বললো, “আমি নিজে।” যুহাইর বললো, “আর একজন লোক খুঁজে বের কর।”

হিশাম মুতয়িম ইবনে ’আদীর কাছে গিয়ে তাকে বললো, “হে মুতয়িম, বনু আবদ মানাফের দুইজন লোক যদি অনাহারে ধুঁকে ধুঁকে মারা যায়, তাহলে তুমি কি কুরাইশদের মন রক্ষা করার জন্য সে দৃশ্য নীরবে দেখবে? কুরাইশদেরকে যদি এভাবে সুযোগ দিতে থাক তাহলে তারা তোমাদের দিকেও দ্রুত ধেয়ে আসবে।” মুতয়িম বললো, “বেশ তো বুঝলাম। আমি একা কি করতে পারি?” হিশাম বললো, “তুমি তো আর একজন লোক পেয়ে গেছো।” মুতয়িম বললো, “সে কে?” হিশাম বললো, “আমি নিজেই সে ব্যক্তি।” মুতয়িম বললো, “তৃতীয়ি একজন লোক আমাদের খুঁজে বের করা দরকার।” হিশাম বললো, “তৃতীয় একজন লোকও পেয়ে গেছি।” মুতয়িম বললো, “কে সে?” হিশাম বললো, “যুহাইর ইবনে আবু উমাইয়া।” মুতয়িম বললো, “চতুর্থ আরেকজন খুঁজে বের কর।”

তখন সে বুখতারী ইবনে হিশামের কাছে গেল। তার কাছে গিয়ে সে মুতয়িমকে যা বলেছিল তারই পুনরাবৃত্তি করলো। আবুল বুখতারী বললো, “আমরা যদি এটা করতে যাই তাহলে আমাদের সাহায্যকারী  কেউ হবে  কি?। ” সে বললো, “হ্যাঁ।” সে বললো, “কে?” হিশাম বললো, “যুহাইর, মুতয়িম এবং আমি নিজে।” আবু বুখতারী বললো, “পঞ্চম আরেকজন লোক খুঁজে বের কর।”

তখন সে যাম’আ ইবনে আসওয়াদ ইবনে মুত্তালিবের কাছে গেল। সে অবরুদ্ধদের সাথে তার আত্মীয়তা ও অধিকারের উল্লেখ করে তার সাথে বিষয়টা আলোচনা করলো। যাম’আ বললো, “তুমি যে কাজে আমাকে আহ্বান করছো আর কেউ কি তার পক্ষে আছে?” সে বললো, “হ্যাঁ।”  অতঃপর সে তাকে সবার সাম বললো।

এরপর মক্কার উচ্চভূমিত হাজ্জন নামক পর্বতের পাদদেশে তারা সমবেত হবার একটা তারিখ নির্ধারণ করলো। যথাসময়ে তারা সেখানে জমায়েত হলো এবং চুক্তিনামাটা বাতিল করানোর জন্য তোড়জোড় শুরু করার সিদ্ধান্ত নিল। যুহাইর বললো, “আমি নিজে এ ব্যাপারে অগ্রণী হয়ে সবার সাথে আলাপ আলোচনা করার দায়িত্ব নিলাম।”

পরদিন সকালে তারা সবাই কুরাইশদের সভাস্থলগুলোতে গিয়ে জড়ো হলো। যুহাইর জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক  পরে উপস্থিত হলো এবং সাতবার কা’বার তাওয়াফ করে সমবেত জনতার কাছে এসে বললো, “হে মক্কাবাসী, আমরা খাবো পরবো, আর বনু হাশিম অবরুদ্ধ অবস্থায় ধুঁকে ধুঁকে মরে যাবে, কেউ তাদের সাথে কেনাবেচা করতে পারবে না-এটা কি করে চলতে পারে? আল্লাহর শপথ, এই সম্পর্ক-বিনাশী ও যুলুমের প্ররোচনা দানকারী চুক্তিনামা ছিঁড়ে ফেলার আগে আমি ক্ষান্ত হবো না।”

মসজিদে হারামের এক কোণায় উপবিষ্ট  আবু জাহল বলে উঠলো, “তুমি মিথ্যা বলছো। আল্লাহর শপথ, ওটা ছেঁড়া হবে না।” তখন যাম’আ ইবনে আসওয়াদ বললো “আল্লাহর শপথ, তুমি নিজে সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী। এই চুক্তিনামা যখন লেখা হয়, তখন আমরা ঐ জিনিসটির ব্যাপারে সম্মত ছিলাম না।” আবুল বুখতারী বললো, “যাম’আ ঠিক বলেছে। এই চুক্তিতে যা লেখা হয়েছে আমরা তা মানি না কিংবা স্বীকারও করি না।”মুতয়িম ইবনে আদী বললো.“তোমরা দু’জন ঠিক বলেছো। এর বিপরীত কথা যে বলে সে মিথ্যুক। আল্লাহর কাছে আমরা এই চুক্তির সাথে আমাদের সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করছি এবং এতে  যা লেখা হয়েছে  তা অগ্রাহ্য করছি।” হিশাম ইবনে আমরও অনুরূপ কথা বললো। সব শুনে আবু জাহল বললো, “ব্যাপারটা রাতের অন্ধকারে স্থিরীকৃত হয়েছে এবং এ সম্পর্কে অন্য কোথাও পরামর্শ করা হয়েছে। ” আবু জাহল যখন একথা বলছিল তখন আবু তালিব মসজিদের এক কোণে কসে ছিলেন। মুতয়িম চুক্তি নামাটা ছিঁড়ে ফেলার জন্য এগিয়ে গেলো। কিন্তু ওটা হাতে নিয়ে দেখলো একমাত্র “বিসমিকা আল্লাহুম্মা” ( হে আল্লাহ তোমার নামে) এই শব্দটি ছাড়া সমগ্র চুক্তিনামাটা উই পোকায় খেয়ে ফেলেছে।

চুক্তিনামার লেখক মানসূর ইবসে ইকরামের হাত অবশ হয়ে গিয়েছিল বলে কথিত আছে।

ইরাশ গোত্রের এক ব্যক্তির আবু জাহলের নিকট উট বিক্রির ঘটনা

ইবনে ইসহাক বলেন, আবদুল মালিক ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবু সুফিয়ান সাকাফী যিনি প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন, আমাকে জানিয়েছেন :

ইরাশ গোত্রের এক ব্যক্তি তার একটা উট নিয়ে একবার মক্কায়  আসে। আবু জাহল তার কাছ থেকে উটটা খরিদ করে নেয়। কিন্তু তার দাম নিয়ে টালবাহানা করতে থাকে।

ইরাশী লোকটা অনন্যোপায় হয়ে কুরাইশদের একটি সভায় গিয়ে হাজির হয়। সেখানে উপস্থিত সবাইকে সম্বোধন করে সে বলে, “হে কুরাইশগণ, আবুল হাকাম ইবনে হিশামের কাছ থেকে আমর পাওনা আপনারা কেউ কি আদায় করে দিতে পারেন?

দেখুন, আমি একজন বহিরাগত পথিক। আমাকে দুর্বল পেয়ে সে আমার পাওনা দিতে গড়িমসি করছে।” এই সময় মসজিদের একপাশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে ছিলেন। উপস্থিত কুরইশগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখিয়ে বললো, “ঐ যে লোকটা বসে আছে দেখছো, তার কাছে গিয়ে বল। সে তোমার পাওনা আদায় করে দেবে।” আসলে তারা বিদ্রƒপাচ্ছলেই কথাটা বলেছিল। আবু জাহল ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যকার বৈরী সম্পর্কের কথা তাদের অজানা ছিল না।

উট বিক্রেতা ইরাশী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে হাজির হলো। তাঁকে বললো, “হে আল্লাহর  বান্দা, আবুল হাকাম ইবনে হিশাম তার দাপট দেখিয়ে আমার পাওনা নিয়ে টালবাহানা করছে। আমি একজন বহিরাগত পথিক। আমি এই লোকগুলির কাছে জিজ্ঞেস করলাম আমার হক কে আদায় করে দিতে পারে? তারা সবাই আপনাকে দেখিয়ে দিল। আপনি তার কাছ থেকে আমার পাওনা আদায় করে দিন। আল্লাহ আপনাকে রহমত করবেন।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আমার সাথে এসো।” এই বলে তিনি তাকে সাথে নিয়ে চললেন। কুরাইশরা তাঁকে ঐ লোকটা সাথে যেতে দেখে এক ব্যক্তিকে পেছনে পেছনে পাঠিয়ে দিয়ে বললো, “যাও, দেখে এসো. মুহাম্মাদ (সা) কি করে।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু জাহলের বাড়ী চলে গেলেন। সেখানে পৌঁছে তিনি দরজায় করাঘাত করলেন। সে ভেতরে থেকে বললো, “কে?” তিনি বললেন, “আমি মুহাম্মাদ, একটু বেরিয়ে এসো!” সে তখনই বেরিয়ে এলো। ভয়ে তার প্রাণ বেরিয়ে যাবার উপক্রম এবং চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বরলেন, “এই ব্যক্তিকে তার পাওনা দিয়ে দাও।” সে তৎক্ষনাৎ বললো, “আচ্ছা একটু অপেক্ষা কর, তার পাওনা দিয়ে দিচ্ছি।” এই বলে সে বাড়ীর ভেতরে প্রবেশ করলো। কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এসে উট বিক্রেতাকে তার পাওনা দিয়ে দিল।

অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরে এলেন। উট বিক্রেতাকে বললেন, “এবার তুমি তোমার কাজে ফিরে যাও।” সে কুরাইশদের সেই সভায় গিয়ে হাজির হলো এবং উপস্থিত লোকদেরকে বললো, “আল্লাহ তাঁকে উত্তম পুরষ্কার দিন। তিনি আমাকে আমার পাওনা আদায় করে দিয়েছেন।” আর যে ব্যক্তিকে তারা পেছনে পেছনে পাঠিয়েছিল তাকে বললে,“এই, তুমি কি দেখলে?” সে বললো, “সে এক আশ্চর্য কান্ড! তাকে কিছুই করতে হয়নি। যেয়ে শুধু দরজায় করাঘাত করেছে, আর অমনি সে যেন আতংকিত হয়ে বেরিয়ে আসলো। সে তাকে বললো, এই ব্যক্তির পাওনা দিয়ে দাও। সে বললো, আচ্ছা, একটু অপেক্ষা কর। এক্ষুণি দিয়ে দিচ্ছি। এই বলে ভেতরে গিয়ে তৎক্ষনাৎ পাওনা এনে দিয়ে দিল।” কিছুক্ষণের মধ্যে আবু জাহল সেখানে উপস্থিত হলে সবাই তাকে বললো, “কি ব্যাপার, তোমার কি হয়েছে? আজ তুমি যে কা- করেছো, এমন তো আর কখনো করতে দেখিনি? ” আবু জাহল বললো, “এটা সত্য যে, মুহাম্মাদ আমার দরজায় কড়ানাড়া ছাড়া আর কিছু করেনি। আমি শুধু তার শব্দটা শুনেই ভয় পেয়ে যাই এবং পরক্ষণেই তার সামনে আসি। আমি দেখতে পেলাম. তার মাথার ওপর একটা ভয়ংকর আকারের উট। তার মত চুঁট, ঘাড় ও দাঁতবিশিষ্ট কোন উট আমি আর কখনো দেখিনি। আল্লাহর শপথ, অস্বীকার করলে সে নিশ্চিত আমাকে খেয়ে ফেলতো।”

ইসরা বা রাত্রিকালীন সফর

একদিন রাত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় অর্থাৎ বাইতুল মাকদিসে নিয়ে যাওয়া হয়। [৩৩.সুহাইলী বলেন : ঘটনাটা মদীনায় হিজরাতের এক বছর পূর্বে সংঘটিত হয়েছিল বলে কেউ কেউ উল্লেক করেছেন।] এই সময় কুরাইশ গোত্রের মধ্যে এবং অন্যান্য গোত্রের লোকজনের মধ্যে ইসলাম বেশ প্রসার লাভ করেছে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলতেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বোরাক আনা হয়। এটি একটি চতুষ্পদ জন্তু। পুর্বতন নবীদেরকেও এই জন্তুর পিঠে সওয়ার করানো হতো। এটি এত দ্রুতগামী যে, সে দৃষ্টির শেষ সীমায় পা ফেলতো। তিনি সেই জানোয়ারে সওয়ার হলেন। তাঁর সঙ্গী (জিবরীল) তাঁকে সাথে নিয়ে রওনা হলেন। আকাশ ও পৃথিবীর অসংখ্য নিদর্শন দেখতে দেখতে তিনি  এগিয়ে যেতে লাগলেন। এভাবে চলতে চলতে বাইতুল মাকদিস গিয়ে থামলেন। সেখানে নবীদের এক বিরাট সমাবেশ দেখতে পেলেন। তার মধ্যে ইবরাহীম (আ). মূসা (আ) ও ঈসাকেও (আ) দেখলেন। তাঁদের সবাইকে নিয়ে এক জামায়াতে নামায পড়লেন। তারপর তাঁর কাছে তিনটা পাত্র আনা  হলো। একটিতে পানি, একটিতে মদ এবং একটিতে দুধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “ঐ তিনটি পাত্র আমার সামনে রাখার পর শুনতে পেলাম কে যেন বলছেঃ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি পানি ভরা পাত্র গ্রহণ করেন তা হলে তিনি বিপথগামমী হবেন এবং তাঁর উম্মতও ডুববে। আর যদি মদের পাত্র গ্রহণ করেন তা হলে তিনি বিপথগামী হবেন এবং তাঁর উম্মতও বিপথগামী হবে। আর যদি তিনি দুধের পাত্র গ্রহণ করেন তা হলে তিনিও হিদায়াত লাভ করবেন এবং তাঁর উম্মাতও  হিদায়ত লাভ করবে।” এ কথা শুনে আমি দুধের পাত্রটা নিলাম এবং তা থেকে দুধ পান করলাম। তখন জিবরীল (আ) আমাকে বললেন : “হে মুহাম্মাদ! আপনিও সুপথগামী হয়েছেন আর আপনার উম্মাতও।”

হাসান (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আমি হাজরে আসওয়াদের কাছে ঘুমিয়ে ছিলাম। সহসা জিবরীল এলেন। তিনি আমাকে চিমটি কাটলেন। আমি উঠে বসলাম কিন্তু কোন কিছু না দেখে আবার শুয়ে পড়লাম। তিনি আবার এসে আমাকে চিমটি কাটলেন। আমি আবার উঠে বসলাম এবং কিছু না দেখে আবার শুয়ে পড়লাম। তিনি তৃতীয়বার এলেন এবং পুনরায় চিমটি কাটলেন। এবারে আমি উঠে বসতেই তিনি আমার বাহু ধরে টান দিলেন। সেখানে আমি একটা সাদা বর্ণের জন্তু দেখতে পেলাম। তা ছিল খচ্চর ও গাধার মাঝামাঝি আকৃতির। তার দুই উরুতে দুটি পাখা। পাখার সাহায্যে সে পা সঞ্চালন করে। আর হাত দুটিকে সে দৃষ্টির শেষ সীমায় দিয়ে রাখে। তিনি আমাকে ঐ জন্তুটির ওপর সওয়ার করালেন। অতঃপর আমাকে নিয়ে রওনা দিলেন। দুজনের কেউ কাউকে হারিয়ে না ফেলি, এতটা পাশাপাশি আমরা চলতে লাগলাম।” হাসান (রা) তার বর্ণনায় বলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চলতে লাগলেন।আর তাঁর সাথে জিবরীলও চলতে লাগলেন। বাইতুল মাকদিস গিয়ে তাঁরা যাত্রাবিরতি করলেন। সেখানে দেখলেন নবীদের একটি দল সমবেত হয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে ইবরাহীম, মূসা ও ঈসা আলাইহিমুস্ সালামও উপস্থিত আছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইমাম হয়ে তাঁদের নিয়ে নমায পড়লেন। অতঃপর তাঁর কাছে দুটো পাত্র হাজির করা হলো। একটাতে মদ, অপরটায় দুধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুধ ভর্তি পাত্রচা নিলেন, তা থেকে কিছুটা দুধ পান করলেন এবং মদভর্তি পাত্রটা বর্জন করলেন। তা দেখে জিবরীল বরলেন, “হে মুহাম্মাদ! আপনি নিজেও ইসলামের পথে চালিত হয়েছেন আর আপনার উম্মাতও ইসলামের পথে চালিত হয়েছে। মদ আপনাদের ওপর হারাম হয়েছে।” এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে মক্কায় ফিরে গেলেন। পরদিন সকালে তিনি কুরাইশদের কাছে গেলেন এবং রাত্রের ঘটনা ব্যক্ত করলেন। অধিকাংশ লোক তা শুনে বললো, “আল্লাহর শপথ, এ এক আজব ও অবিশ্বাস্য ব্যাপার। মক্কা থেকে সিরিয়া কত কাফিলা যায়। তাদের যেতে একমাস এবং আসতে এক মাস সময় লাগে। আর এত লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে মুহাম্মাদ কিনা একরাতেই সেখানে গেল আবার মক্কায় ফিরেও এলো!”

হাসান (রা) বলেন, “এই ঘটনা শুনে বহু সংখ্যক মুসলমান ইসলাম ত্যাগ করলো। লোকেরা আবু বাক্রের (রা) কাছে গিয়ে তাঁকে বললো, “হে আবু বাক্র, তোমার বন্ধুকে কি তুমি বিশ্বাস কর? সে বলছে, সে  নাকি গতরাতে বাইতুল মাকদাস গিয়েছিলো, সেখানে সে নামায পড়েছে, অতঃপর মক্কায় ফিরে এসেছে!”

আবু বাকর বললেন, “তোমরা কি তাকে অবিশ্বাস কর?” সবাই বললো, “হ্যাঁ, ঐতো মসজিদে বসে লোকজন এই কথাই বলছে।” আবু বাক্র (রা) বললেন, “আল্লাহর শপথ, তিনি যদি একথা বলে থাকেন তা হলে সত্য কথাই বলেছেন। এতে তোমরা আশ্চর্য হওয়ার কি দেখলে? তিনি তো আমাকে বলে থাকেন যে, তাঁর কাছে আল্লাহর কাছ থেকে ওহী আসে। আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত ওহী আসে মাত্র এক মুহূর্তের মধ্যে। তাঁর সে কথাও আমি বিশ্বাস  করে থাকি। তোমরা যে ঘটনা নিয়ে চোখ কপালে তুলছো তার চেয়েও এটা বিস্ময়কর।” অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে হাজির হলেন। তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর নবী, আপনি কি জনগণকে বলেছেন যে, আপনি গত রাতে বাইতুল মাকদাস ভ্রমণ করেছেন?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ।” আবু বাকর (রা) বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, বাইতুল মাকদাসের আকৃতি কেমন আমাকে বলুন। কেননা বাইতুল মাকদাস আমি গিয়েছি।” রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, “এই সময় আমার সামনে বাইতুল মাকদাস তুলে ধরা হলো এবং আমি তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।” তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বাকরকে (রা) তার আকৃতির বর্ণনা দিতে লাগলেন। আর তা শুনে আবু বাক্র (রা) বলতে লাগলেন, “আপনি ঠিক বলেছেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি নিঃসন্দেহে আল্লাহর রাসূল।” বর্ণনা দেয়া শেষ হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু ব্ক্রাকে বললেন, “হে আবু বাক্র, তুমি সিদ্দীক।” সেদিনই তিনি আবু বকরকে (রা) সিদ্দীক তথা ‘পরম সত্যনিষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াভ (রহ) বলেন, “ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর  সাহাবীদের কাছে হযরত ইবরাহীম, মূসা ও ঈসা আলাইহিমুস সালামের দৈহিক গঠনের বর্ণনা দিয়েছিলেন। তিনি ঐ রাতে তাঁদেরকে দেখেছিলেন। তিনি বলেছেন, “দৈহিক গঠনের দিক দিয়ে  হযরত ইবরাহীম (আ) তোমাদের সঙ্গীর (অর্থাৎ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) সাথেই সর্বাধিক সাদৃশপূর্ণ। আর মূসা আলাইহিস সালাম বাদামী রঙের দীর্ঘাকায় একহারা গড়নের ও উন্নত নাসা সুপুরুষ ছিলেন। মনে হয় যেন শানুয়া গোত্রের কোন লোক। ঈসা (আ) মাঝারী গড়নের, লাল বর্ণের, নরম ও সোজা চুল এবং মুখে বহুসংখ্যক তিলবিশিষ্ট। দেখে মনে হয়, তাঁর চুল থেকে পানির বিন্দু গড়িয়ে পড়ছে। সবে মাত্র হাম্মাম থেকে গোসল করে বের হয়েছেন। তোমাদের মধ্যে উরওয়াহ ইবনে মাসউদ সাকাফীর সাথে তাঁর দৈহিক সাদৃশ্য সর্বাধিক।”

 

মি’রাজের ঘটনা

ইবনে ইসহাক বলেন, আমি বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছি যে, আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখ থেকে শুনেছি, তিনি বলেছেন, “বাইতুল মাকদাসের অনুষ্ঠানাবলী সমাপ্ত হলে আমার সামনে ঊর্ধাকাশে আরোহণের সিঁড়ি হাজির করা হলো। এমন সুন্দর কোন জিনিস আমি আর কখনো দেখিনি। মৃত্যুর সময় হলে মানুষ এই সিঁড়িই দেখতে পায় এবং এর দিকে চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে। আমার সঙ্গী (জিবরাইল) আমাকে ঐ সিঁড়িতে আরোহণ করালেন এবং আমাকে সাথে নিয়ে আকাশের একটি দরজায় গিয়ে থামলেন। এ দরজাকে ‘বাবুল হাফাযাহ’ বা রক্ষকদের দরজা বলা হয়। এখানে ইসমাঈল নামক একজন ফিরিশতা কর্তব্যরত রয়েছেন। তাঁর অধীনে রয়েছে বার হাজার ফেরেশতা এবং এইসব ফেরেশতার প্রত্যেকের অধীনেও আবার বার হাজার করে ফেরেশতা রয়েছে।” এই হাদীস বর্ণনা করার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাআনের এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন,

[আরবী *************]

“তোমার প্রভুর সৈন্য সামন্তের সংখ্যা তিনি ছাড়া আর কেউ জানে না।” (সূরা আলা মুদ্দাস্সির)

“অতঃপর যখন আমাকে নিয়ে তিনি ভেতরে প্রবেশ করলেন তখন ঐ ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে জিবরীল, ইনি কে?’ তিনি বললেন, ‘ইনি মুহাম্মাদ।’ ফেরেশতা আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইনি কি নবী?’ জিবরীল বললেন, ‘হ্যাঁ।’ অতঃপর তিনি আমার কল্যাণ কামনা করে দোয়া করলেন।”

প্রথম আকাশে প্রবেশের পর আমি দেখতে পেলাম এক ব্যক্তি বসে আছেন। তাঁর কাছে সকল মৃত মানুষের আত্মা হাজির হচ্ছে। কোন কোনটা হাজির হলে তিনি খুব খুশী হচ্ছেন এবং প্রশংসা করে বলছেন, ‘এটি একটি পবিত্র আত্মা যা একটি পবিত্র দেহ থেকে নির্গত হয়েছে।’ আবার কোন কোনটা হাজির হলে তিনি চেহারায় বিরক্তি প্রকাশ করে বলছেন, ‘আহ! এটি একটি অপবিত্র আত্মা যা একটি পাপপংকিল দেহ থেকে নির্গত হয়েছে।’ আমি জিবরাইলকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘হে জিবরাইল, ইনি কে?’ জিবরাইল বললেন, ইনি আপনার পিতা আদম (আ)। তাঁর কাছে তাঁর সন্তানদের আত্মা হাজির করা হয়। কোন মুমিনের আত্মা দেখলে তিনি আনন্দিত হয়ে বলেন, ‘এটি একটি পবিত্র আত্মা যা একটি পবিত্র দেহ থেকে বেরিয়েছে।’ ্আর কোনা কাফিরের আত্মা দেখলে তিনি আর্তনাদ করে ওঠেন, তাকে অপছন্দ করেন এবং তার প্রতি বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘এটি একটি পাপাত্মা যা কোন পাপিষ্ঠ দেহ থেকে নির্গত হয়েছে।’

অতঃপর কতগুলো লোক দেখলাম। তাদের ঠোঁট উটের মত এবং তাদের হাতের মুঠোয়  দগদগে জ্বলন্ত  ছোট ছোট পাথর টুকরো রয়েছে। সেগুলো তারা মুখে পুরছে। আর পরক্ষণেই তা মলদ্বার দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে জিবরীল, এরা কারা?’ তিনি বললেন, ‘এরা ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাতকারী।’

এরপর আরো কিছু সংখ্যক লোক দেখলাম। তাদের পেটের মত বীভৎস আকৃতির পেট আর কখনো দেখিনি। দেখলাম, ফেরাউনের সহযোগীদের যে পথ গিয়ে দোযখে নেয়া হচ্ছে, সেই পথের ওপর তারা [৩৪.ফিরাউনের সহযোগীদের জাহান্নামের কঠিনতম শাস্তি ভোগ করতে হবে বলে কুরআনে উল্লেখ রয়েছে।] অবস্থান করছে। তারা পিপাসা-কাতর উটের মত ছটফট করছে। আর ফিরাউনের দোযখগামী অনুসারীরা তাদেরকে পায়ের তলায় পিষ্ট করে যাচ্ছে তথাপি সেখান থেকে একটু সরে বসবার ক্ষমতাও তাদের নেই। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে জিবরীল, এরা কারা?’ তিনি বললেন, ‘এরা সুদখোর।’

অতঃপর আরো একদল লোক দেখলাম। তাদের সামনে উৎকৃষ্টমানের পুষ্ট গোশত রয়েছে। আর তার পাশেই রয়েছে উৎকট দুর্গন্ধ যুক্ত খারাপ গোশত। অথচ তারা ভালো গোশত বাদ দিয়ে খারাপ গোশত খাচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে জিবরীল, এরা কারা?’ তিনি বললেন, ‘এরা সেই সব লোক যারা বৈধ স্ত্রী থাকতে নিষিদ্ধ স্ত্রী  লোকের কাছো যায়।’

অতঃপর কিছু সংখ্যক নারীকে দেখলাম তাদের স্তনে রশি বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম ‘হে জিবরীল এরা কারা?’ তিনি বললেন, ‘এরা সেই সব নারী যারা ব্যভিচারের মাধ্যমে অন্যের ঔরসজাত সন্তান স্বামীর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করে দেয়।’

এরপর তিনি দ্বিতীয় আকাশে আরোহণ করালেন। সেখানে দুই খালাতো ভাই ঈসা (আ) ও ইয়াহইয়া ইবনে যাকারীয়ার (আ) সাক্ষাত পেলাম।

অতঃপর জিবরীল (আ) আমাকে তৃতীয় আকাশে আরোহণ করালেন। সেখানে এক ব্যক্তিকে দেখলাম। তাঁর চোহারা পূর্নিমার চাঁদের মত উজ্জ্বল। আমি বললাম, ‘হে জিবরীল, ‘ইনি কে?’ তিনি বললেন, ‘ইনি ইয়াকুবের (আ) পুত্র ইউসুফ (আ)।’

অতঃপর চতুর্থ আকাশে আরোহণ করে সেখানে আর এক ব্যক্তিকে দেখলাম। জিবরাইল জানালেন ইনি ইদ্রিস (আ)। অতঃপর পঞ্চম আকাশে আরোহণ করলাম। সেখানে দেখলাম, সাদা চুল ও দীর্ঘ শ্মশ্রুধারী এক বৃদ্ধ। অত সুন্দর বৃদ্ধলোক, আমি আর কখনো দেখিনি। জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে জিবরীল, ইনি কে?’ তিনি বললেন, ‘তিনি স্বজাতির কাছে প্রিয় হারুন ইবনে ইমরান (আ)’! অতঃপর ষষ্ঠ আকাশে পৌঁছলাম। সেখানে দেখলাম বাদামী রংয়ের লম্বা নাক বিশিষ্ট এক দীর্ঘায়ী পুরুষ, যেন শানুয়া গোত্রের লোক। আমি বললাম জিবরাইল ইনি কে?’ জিবরাইল বললেন, ‘তিনি আপনার ভাই মূসা ইবনে ইমরান (আ)।’

অতঃপর আমাকে সপ্তম আকাশে আরোহণ করালেন। সেখানে দেখলাম, বাইতুল মামুরের দরজার কাছে একটি চেয়ারে এক বৃদ্ধ বসে আছেন। তোমাদের সঙ্গী (অর্থাৎ মুহাম্মাদ (সা) স্বয়ং তাঁর সাথে সবচেয়ে বেশী সাদৃশ্যপূর্ণ। বাইতুল মামুরে প্রতিদিন সত্তর হাজার ফিরিশতা প্রবেশ করে এবং তারা আর ফিরে আসে না। এভাবে কিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ইনি কে?” তিনি বললেন, ‘তিনি আপনার পিতা ইবরাহীম (আ)।’

অতপর তিনি আমাকে নিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করলেন। সেখানে ঈষৎ কালো ঠোঁট বিশিষ্ট একটি পরমা সুন্দরী যুবতীকে দেখলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কার জন্য?’ সে বললো, ‘যায়িদ ইবনে হারেসার জন্য।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়িদ ইবনে হারেসাকে এই সুসংবাদটি জানিয়ে দিয়েছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “এরপর আমি ফিরে এলাম। আসার পথে মূসা ইবনে ইমরানের (আ) সাথে দেখা হলো। বস্তুত: তিনি তোমাদের একজন উত্তম বন্ধু। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার ওপর কয় ওয়াক্ত নামায ফরয করা হয়েছে?” আমি বললাম, ‘প্রতিদিন পঞ্চাশ ওয়াক্ত।’ মুসা বললেন, ‘দেখ, নামায বড় কঠিন কাজ। তোমার উম্মাত খুবই দুর্বল। তুমি আল্লাহর কাছে ফিরে যাও এবং তোমার উম্মাতের জন্য দায়িত্ব আরো হালকা করে দিতে বল।’ আমি আল্লাহর কাছে ফিরে গেলাম এবং আমার ও আমার উম্মাতের দায়িত্ব হালকা করে দিতে অনুরোধ করলাম আল্লাহ দশ ওয়াক্ত নামায কমিয়ে দিলেন।অতঃপর ফিরে আসলাম। মূসার সাথে আবার দেখা হলো। তিনি আবার আগের মত বললেন। আমি আবার গিয়ে আল্লাহকে নামায কমিয়ে দেয়ার আবেদন জানালাম। আল্লাহ আরে দশ ওয়াক্ত নামায কমিয়ে দিলেন। এভাবে তিনি ক্রমাগত আমাকে পরামর্শ দিতে লাগলেন।

যখনই তাঁর কাছে ফিরে যাই, তিনি বলেন, ‘যাও, আরো কমিয়ে দিতে বলো। এভাবে কমাতে কমাতে দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামায বাকি রইল। এবারও মূসার (আ) কাছে ফিরে এলে তিনি আরো কমিয়ে আনার পরামর্শ দিলেন। আমি বললাম, ‘বহুবার আল্লাহর কাছে ফিরে গিয়েছি এবং কমিয়ে দিতে বলেছি। আমি লজ্জাবোধ করছি। তাই আর ফিরে যেতে পারবো না।’

অতএব যে ব্যক্তি এই পাঁচ ওয়াক্ত নামায ঈমান ও সতর্কতার সাথে পড়বে, সে পঞ্চাশ ওয়াক্ত ফরয নামাযের সওয়াব পাবে।”

আবু তালিব ও খাদীজার ইনতিকাল

অতঃপর একই বছর আবু তালিব ও খাদীজা (রা) ইনতিকাল করেন। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর একের পর এক বিপদ-মুসিবত আসতে থাকে। খাদীজা (রা) ছিলেন তাঁর এক পরম সত্যনিষ্ঠ উপদেষ্টা। তিনি নিজের যাবতীয় দুঃখ কষ্টের কথা তাঁর কাছে বলতেন। আর চাচা আবু তালিব ছিলেন তাঁর সহায় ও ঢালস্বরূপ। তিনি কুরাইশদের অত্যাচার প্রতিরোধ করতেন এবং তাঁকে সর্বাত্মক সহায়তা দিতেন। মদিনায় হিজরাতের তিন বছর পূর্বে খাদীজা ও আবু তালিবের মৃত্যু ঘটে।

আবু তালিব মারা যাওয়ার পর কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর এমন নির্যাতন শুরু করলো, আবু তালিবের জীবদ্দশায় যা তারা করার সাহস করেনি। এমনকি একদিন কুরাইশদের একজন অত্যন্ত নীচাশয় অর্বাচীন তার চলার পথে গতিরোধ করে তাঁর মাথায় ধুলো নিক্ষেপ করলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধুলো নিয়ে বাড়ী গেলেন। এ অবস্থা দেখে তাঁর এক মেয়ে ছুটে এসে কাঁদতে কাঁদতে তাঁর মাথার ধুলো মুছে পরিষ্কার করে দিল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলছিলেন, “মা, কাঁদিস না! তোর আব্বাকে আল্লাহ রক্ষা করবেন।” এ পর্যায়ে তিনি বললেন, “আবু তালিব মারা যাওয়ার আগে কুরাইশরা আমার সাথে কোন রকম খারাপ আচরণ করতে পারেনি।”

আবু তালিব রোগাক্রান্ত হলে রোগের চরম পর্যায়ে কুরাইশরা একদিন এই বলে সলাপরামর্শ করলো যে, তার রোগ মারাত্মক অবস্থায় উপনীত, হামযা ও উমার ইসলাম গ্রহণ করেছে, কুরাইশদের সকল গোত্রে ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছে, এমতবস্তায় আবু তালিবের কাছে আমাদের যাওয়া উচিত। তাঁর কাছে গিয়ে তাঁর মধ্যস্থতায় মুহাম্মাদের সাথে আমাদের একটা চুক্তি করা উচিত। নতুবা তাঁর দলবল আমাদের ধনসম্পদ পর্যন্ত কেড়ে নিতে পারে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেছেন, “উতবা ও শাইবা ইবনে রাবীয়া, আবু জাহল, উমাইয়া ইবনে খালাফ, আবু সুফিয়ান ইবনে হারব প্রমুখ বড় বড় কুরাইশ নেতা আবু তালিবের কাছে গিয়ে হাজির হলো। তারা তাঁকে বললো, “হে আবু তালিব, আপনি আমাদের কাছে কতখানি শ্রদ্ধার পাত্র তা আপনার অজানা নয় আজ আপনি মারাত্মক রোগে আক্রান্ত। আপনার জীবন নিয়ে আমরা শংকিত। আপনার ভাতিজার সাথে আমাদের সম্পর্কের ধরনও আপনার জানা। কাজেই তাকে ডাকুন, মৃত্যুর আগে  তার সাথে আমাদের একটা আপোষরফা করে দিয়ে যান। তার সম্পর্কে আমাদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিন এবং আমাদের সম্পর্কে তার কাছ থেকেও প্রতিশ্রুতি আদায় করে দিন, যাতে আমরা তার ওপর কোন বাড়াবাড়ি না করি এবং সে ও আমাদের ওপর কোন বাড়াবাড়ি না করে। আমরাও তার ও তার ধর্মের ওপর হস্তক্ষেপ না করে আর সেও আমাদের  ওপর কোন বাড়াবাড়ি না করে। আমরাও তার ও তার ধর্মের ওপর হস্তক্ষেপ না করি আর সেও আমাদের ও আমাদের ধর্মের ব্যাপারে কোন প্রকার হস্তক্ষেপ না করে।”

আবু তালিব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ডেকে পাঠালেন। তিনি এসে তাঁকে বললেন, “ভাতিজা, এরা তোমার সম্প্রদায়ের  নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। তারা এসেছে তোমার নিকট থেকে একটা কথা নিতে এবং তার বিনিময়ে তোমাকে একটা প্রতিশ্রুতি দিতে। ” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “হ্যাঁ, তোমরা আমার নিকট থেকে একটা মাত্র কথা গ্রহণ করে তাহলে সহগ্র আরবের মালিক হয়ে যাবে এবং  অনারব লোকেরা সবাই তোমাদের বশ্যতা স্বীকার করবে। ” আবু জাহল বললো, “বেশ! তা হলে একটা কেন, দশটা কথা গ্রহণ করতেও রাজী আছি।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তোমরা ঘোষণা কর যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই এবং অন্য যে সব দেব-দেবীর পূজা করো তা আর করবে না।” এ কথা শুনে তারা সবাই হাততালি দিল। অতঃপর বললো, “আচ্ছা মুহাম্মাদ, তুমি কি চাও যে, আমরা অন্য সব দেব-দেবীর বদলে শুধুমাত্র একজনের পূজা করি? এটা তোমার একটা আজগুবি কথা।” এরপর তারা পরস্পর বলাবলি করতে লাগলো, “দেখ, এই লোকটির কাছে তোমার যা প্রত্যাশা করছো তা সে কখনো দেবে না। অতএব তোমরা চলে যাও। তার ও তোমাদের ব্যাপারে আল্লাহর ফায়সালা না আসা পর্যন্ত বাপদাদার ধর্ম পালন করতে থাক।”

সবাই সেখান থেকে চলে গেলে আবু তালিব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, “ভাতিজা,আমার মনে হয, তুমি তাদেরকে অন্যায় কিছু অনুরোধ করনি।”

আবু তালিবের মুখে এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মনে তাঁর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে আশার সঞ্চার হলো। তাই তিনি আবু তালিবকে এই বলে পীড়াপীড়ি করতে থাকলেন, “চাচা, আপনি একবার বলুন। তাহলে কিয়ামতের দিন আপনার জন্য সুপারিশ করা আমার জন্য বৈধ হয়ে যাবে।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এরূপ আগ্রহী হতে দেখে আবু তালিব বললেন, “ভাতিজা, আমার মুত্যুর পরে তোমার ও তোমার ভাই বোনদের অপমানিত হতে হবে এবং কুরাইশরা ভাববে যে আমি  শুধু মৃত্যুর ভয়ে ঈমান এনেছি। এই আশংকা যদি না থাকতো তা হলে আমি কালেমা পড়তাম ও ঈমান আনতাম। আমি শুধু তোমাকে খুশী করার জন্যই এ কথা বলছি।”

এরপর আবু তালিবের অন্তিম মুহূর্ত ঘনিয়ে এলে আব্বাস দেখলেন, আবু তালিব ঠোঁট নাড়ছেন। তিনি তাঁর মুখের দিকে কান এগিয়ে দিলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, “ভাতিজা তুমি যে কালেমা পড়তে বলেছো, আমার ভাই তা পড়েছে।” রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “আমি শুনতে পাইনি।”

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, কুরাইশদের যে লোকজন আবু তালিবের কাছে এসেছিল তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা’য়ালা এই আয়াত নাযিল করেছেনঃ

[আরবী *************]

“সা-দ। উপদেশ পরিপূর্ণ কুরআনের শপথ। অবিশ্বাসীরাই বরং অহংকার ও হঠকারিতায় লিপ্ত। তাদের পূর্বে আমি কত জাতিকেই না ধ্বংস করে দিয়েছি। তখন তারা আর্তনাদ করে উঠেছে। কিন্তু তখন আর রক্ষা পাওয়ার অবকাশ ছিল না। এই লোকেরা তাদের মধ্যে থেকেই একজন সতর্ককারী আবির্ভূত হওয়ায় বিষ্মিত হয়েছে আর অবিশ্বাসীরা বলতে লাগলো, ‘এই ব্যক্তি তো যাদুকর, মিথ্যাবাদী। সে কি সমস্ত খোদার স্থানে একজন মাত্র খোদাকে বসিয়েদিল! এটা নিতান্তই অদ্ভুত ব্যাপার!’ তাদের নোতারা এই বলতে বলতে চলে গেল, ‘চল, নিজেদের দেব-দেবীর প্রতি অবিচল থাকো। এটা অর্থাৎ যে কথা বলা হচ্ছে তা অবশ্যই উদ্দেশ্যমূলক। এ রকম কথা তো আমরা সাম্প্রতিক কালের কোন ধর্মের নিকট থেকেই শুনতে পাইনি। নিশ্চয়ই এটা মনগড়া কথা ছাড়া আর কিছুই নয়।” (সূরা সা-দ)

‘সাম্প্রতিক কালের ধর্ম’ অর্থ খৃস্টধর্ম- যার অনুসারীরা বলতো যে, আল্লাহ তিনজনের তৃতীয়জন। অতঃপর আবু তালিব মারা গেলেন।

সাহায্য লাভের আশায় বনু সাকীফ গোত্রের শরণাপন্ন হওয়া

আবু তালিব মারা যাওয়ার পর কুরাইশগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ভীষণ অত্যাচার শুরু করলো যা তাঁর চাচা আবু তালিব বেঁচে থাকলে তারা করতে পারেনি। তাই তিনি কুরাইশদের অত্যাচার প্রতিরোধে সাহায্য ও সহযোগিতা লাভের আশায় তায়েফে বনু সাকীফ গোত্রের কাছে গেলেন।তিনি আশা করেছিলেন যে, তারা হয়তো ইসলাম গ্রহণ করবে, তাই একাকীই তিনি সেখানে গেলেন।

তায়েফে পৌঁছে তিনি বনু সাকীফ গোত্রের সবচেয়ে গণ্যমান্য তিন ব্যক্তির কাছে উপস্থিত হলেন। তারা তিন ভাই আবদ ইয়ালীল, মাসউদ ও হাবীব। তাদের পিতার নাম আমর ইবনে উমাইর। তাদের একজন কুরাইশ গোত্রের বনু জুমাহ উপগোত্রের বংশের মেয়ে বিয়ে করেছিলো। তাদের কাছে বসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিলেন এবং ইসলাম প্রচারে সহায়তা করার অনুরোধ জানালেন। তিনি তাদেরকে কুরাইশদের বিরোধিতার মুখে তাঁকে সমর্থন করার অনুরোধ জানালেন। তাদের একজন বললো, “আল্লাহ যদি তোমাকে রাসূল করে পাঠিয়ে থাকেন  তা হলে তিনি কা’বা শরীরফর গেলাফ খুলে ফেলুন।” [এর অর্থ সম্ভবতঃ এই যে, তাঁকে রাসূল করে পাঠানোর কারণে কা’বার মর্যাদা বিনষ্ট হয়েছে। কেননা তাঁর মত একজন অসহায় লোককে রাসূল বানানো তাদের কাছে অযৌক্তিক। -অনুবাদক] আর একজন বললো, “আল্লাহ কি রাসূল বানানোর জন্য তোমাকে ছাড়া আর কাউকে পেলেন না?” তৃতীয় জন বললো, “তোমার সাথে আমি কোন কথাই বলবো না। তুমি যদি তোমার দাবী অনুসারে সত্যিই রাসূল হয়ে থাকো তা হলে তো তোমার কথার প্রতিবাদ করতে যাওয়া বিপজ্জনক। আর তুমি যদি মিথ্যাবাদী হয়ে থাকো তা হলে তোমার সাথে আমার কথা বলাই অনুচিত।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর কথা না বলে সেখান থেকে উঠে আসলেন। বিদায় হবার আগে তাদেরকে অনুরোধ করলেন যে, তোমরা যখন আমার দাওয়াত গ্রহণ করলে না তখন আমার কথা আর কারো কাছে প্রকাশ করো না। ওরা অন্যদের কাছে তাঁর  কথা প্রচার করে তাঁর বিরুদ্ধে লোকজনকে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারে এই আশংকায় তিনি এরূপ করলেন। কিন্তু তারা সে অনুরোধ রক্ষা করলো না। তারা বরং গোত্রের মূর্খ, নির্বোধ ও দাস শ্রেণীর লোকদেরকে তাঁর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিল। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালাগালি দিতে ও হৈ হল্লা করতে করতে চারদিক থেকে ছুটে এলো। বিপুল সংখ্যক লোক তাঁকে ঘিরে ধরলো। তিনি বাধ্য হয়ে উতবা ও শাইবা ইবনে রাবীয়া নামক দুই ভাইয়ের দেয়াল ঘেরা ফলের বাগানে আশ্রয় নিলেন। তারা দুই ভাই সে সময় বাগানেই ছিলো। সাকীফ গোত্রের যেসব লোক তাঁর পিছু নিয়েছিলো তারা তখন ফিরে চলে গেল।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি আঙ্গুর ঝোপের ছায়ায় গিয়ে বসলেন। উতবা ও শাইবা তাঁর উপর তায়েফবাসীর অবর্ণনীয় অত্যাচার এতক্ষন নীরবে প্রত্যক্ষ করছিলো। ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কুরাইশ উপ-গোত্রের সেই মহিলাটির সাক্ষাত ঘটে। তিনি তাকে বললেন, “তোমার দেবররা আমার সাথে কি আচরণ করলো দেখলে তো?”

অতঃপর একটু শান্ত হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কাছে নিম্পরূপ দোয়া করলেন,

[আরবী *************]

“হে আল্লাহ, আমার দুর্বলতা, অক্ষমতা, সহায় সম্বল ও বিচক্ষণতার অভাব এবং  মানুষের কাছে আমার নগণ্যতা ও অবজ্ঞা-উপেক্ষার জন্য আপনারই কাছে আমি ফরিয়াদ করছি। হে শ্রেষ্ঠ দয়াবান, আপনি দুর্বল ও উপেক্ষিতদের প্রতিপালক। আপনি আমারও প্রতিপালক। কার রহম ও করুণার ওপর আমাকে ছেড়ে দিচ্ছেন? আমার সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করে সেই অনাত্মীয়ের ওপর, না কি সেই শত্রুর যে আমার সাথে যে নিষ্ঠুর আচরণ করে সেই অনাত্মীয়ের ওপর, না কি সেই শত্রুর যে আমার ওপর প্রভাবশালী ও পরাক্রান্ত হয়ে উঠেছে? আমার উপর আপনি যদি স্বস্তি ও নিরাপত্তা দান করেন তবে সেটা আমার জন্য নিঃসন্দেহে স্বস্তির কারণ। আমি আপনার সেই জ্যোতির আশ্রয় চাই যার আবির্ভাবে সকল অন্ধকার আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে এবং যার সাহায্যে দুনিয়া ও আখিরাতের সকল সমস্যার সুরাহা হয়। আপনার সকল ভর্ৎসনা মাথা পেতে নিতে আমি প্রস্তুত। আপনার সাহায্য ছাড়া আর কোন উপায়ে শক্তি সামর্থ্য লাভ করা সম্ভব নয়।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এহেন শোচনীয় অবস্থা এবং এতক্ষণ যাবত তাঁর ওপর যে অত্যাচার চলছিল প্রত্যক্ষ করে উতবা ও শাইবা ভ্রাতৃদ্বয় তাঁর সাথে তাদের বংশীয় বন্ধনের কথা মনে করে বিচলিত হয়ে উঠলো। আদ্দাস নির্দেশ পালন করলো। সে আঙ্গুর ভর্তি পাত্রটি নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে নিয়ে রাখলো এবং তাঁকে  বললো, ‘খান।’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিসমিল্লাহ বলে খাওয়া শুরু করলেন।

আদ্দাস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, “একথা তো (অর্থাৎ বিসমিল্লাহ ) এ দেশের লোকদের বলতে শুনি না।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “হে আদ্দাস, তুমি কোন্ দেশের মানুষ? তোমার ধর্মই বা কি? ” সে বললো, “আমি একজন খৃষ্টান। আমি নিনুয়া বা নিনেভার অধিবাসী।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তিনি আমার ভাই। তিনি নবী ছিলেন, আমিও নবী।” এ কথা শোনামাত্রই আদ্দাস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ঝুঁকে পড়লো এবং তাঁর মাথায়, হাতে ও পায়ে চুমু খেতে লাগলো।

এ দৃশ্য দেখে রাবীয়ার পুত্রদ্বয় পরস্পরকে বলতে লাগলো, “আরে! ছেলেটাকে তো নষ্ট করে দিল দেখছি।” আদ্দাস উতবা ও শাইবার কাছে ফিলে এল। তারা তাকে বললো, “কিহে আদ্দাস! তোমার কি হলো যে ঐ লোকটির মাথায় ও হাতে -পায়ে চুমু খেলে?” সে বললো, “হে আমার মনিব, পৃথিবীতে তাঁর চেয়ে ভালো লোক নেই। সে আমাকে এমন একটা বিষয় জানিয়েছে যা নবী ছাড়া আর কেউ জানতে পারে না।” তারা বললো, “হে আদ্দাস, কি বাজে বক্ছো। তার প্ররোচনায় পড়ে তুমি নিজের ধর্ম পরিত্যাগ করো না কারণ তার ধর্মের চেয়ে তোমার ধর্ম উত্তম।”

নাসীবীনের জ্বিনদের ঘটনা

বনু সাকীফের কাছ থেকে হতাশ হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামে তায়েফ থেকে মক্কায় ফিরে চললেন। পথে নাখলা [মক্কা থেকে দুই দিন দুই রাতের দূরত্বে অবস্থিত দুটো উপত্যকার নাম। একটার নাম নাখলাতুল ইয়ামানিয়া, অপরটির নাম নাখলাতুল শামিয়া।] উপত্যকায় পৌঁছে মধ্যরাতে তিনি নামায পড়ছিলেন। এই সময়ে নাসীবীনের সাতজন জ্বিন ঐ স্থান দিয়ে যাচ্ছিলো। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কুরআন তিলাওয়াত শুনলো। নামায শেষ হ’লে তারা নাসীবীনে [মুসেল থেকে সিরিয়া যাওয়ার পথে আববের একটি শহর বা জনপদ।]ফিরে গিয়ে নিজেদের সম্প্রদায়ের কাছে কুরআনের বানী পৌঁছিয়ে দিল- যার প্রতি তারা পথিমধ্যে শোনা মাত্রই ঈমান এনেছিলো। পবিত্র কুরআনের সূরা জ্বিন ও সূরা আহকাফে আল্লাহ এই জিনদের কাহিনী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বর্ণনা করেছেন। সূরা আহকাফের আয়াত কয়টি হলো, “সেই সময়ের কথা স্মরণ কর যখন আমি তোমার দিকে জ্বিনদের একটি দলকে পরিচালিত করলাম যেন তারা কুরআন শুনতে পারে। তারা সেখানে পৌঁছে পরস্পরকে বললো: ‘তোমরা চুপ করে শোনো’। তাদের কুরআন শোনা শেষ হলে তারা স্বজাতির কাছে ফিরে গিয়ে তাদেরকে সাবধান করতে লাগলো। বললো, ‘হে আমাদের জাতি, আমরা এমন এক গ্রন্থের তিলাওয়াত শুনে এসেছি যা মূসার পরবর্তী সময়ে তাঁর কিতাবের ( তাওরাতের ) সত্যায়নকারী  এবং সত্য ও নির্ভুল পথের দিশারী হয়ে নাযিল হয়েছে। হে আমাদের জাতি, আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দাও এবং তাঁর প্রতি ঈমান আন তা হলে তিনি তোমাদের গুনাহ মাফ করবেন এবং তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে রেহাই দেবেন।”

সূরা জ্বিনে আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেন, “হে নবী, তুমি বল যে, আমাকে ওহীর মাধ্যমে জানানো হয়েছে যে একদল জ্বিন কুরআনের বাণী শুনেছে”.... এরূপ সমগ্র সূরাটিই জ্বিনদের সংক্রান্ত আলোচনায় পরিপূর্ণ।

ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে রাসূল্লাহ (সা) সব গোত্রের কাছে হাজির হলেন

অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় উপস্থিত হলেন। দুর্বল শ্রেণীর মুষ্টিমেয় লোক-যারা তাঁর প্রতি আগেই ঈমান এনছিল তারা ছাড়া গোটা কুরাইশ সম্প্রদায়ই তাঁর নিকৃষ্টতম দুশমনে পরিণত হয়েছে। এমতবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ্জের সময় মক্কায় আগত নানা গোত্রের লোকদের কাছে উপস্থিত হলেন। তাদেরকে আল্লাহর দিকে আহব্বান জানালেন এবং বললেন, “আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর প্রেরিত নবী। তোমরা আমাকে সমর্থন করো এবং যুলুম থেকে রক্ষা করো তা হলে আল্লাহ আমার কাছে যে বাণী পাঠিয়েছেন তা তোমাদের কাছে পেশ করবো এবং বিশ্লেষণ করবো।”

রাবিয়া ইবনে আব্বাদ বর্ণনা করেন:

আমি তখন সবেমাত্র যুবক। পিতার সাথে মিনায় গিয়েছিলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন  মক্কার বাইরে থেকে আগত বিভিন্ন আরব গোত্রের শিবিরসমূহে গিয়ে নিম্নরূপ ভাষণ দিচ্ছিলেন, “হে অমুক অমুকের বংশধর, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, একমাত্র তাঁরই ইবাদাত করো এবং তাঁর সাথে আর কাউকে শরীক করো না। তোমাদেরকে এসব প্রতিমার পূজা করতে নিষেধ করেছেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যাতে তোমরা আমাকে সমর্থন কর, আমার প্রতি ঈমান আন এবং আমাকে যুলুম থেকে রক্ষা কর আর আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়ে দিতে পারি।” এই সময় তাঁর পেছনে তাঁকে অনুসরণ করছিল একজন টেরাচোখা, মাথায় দুটো জটাধারী এবং আদন অঞ্চলের পোশাক পরিহিত একটি লোক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই তাঁর দাওয়াতী বক্তৃতা শেষ করেন,অমনি সে বলে, “হে অমুক অমুকের বংশধর, এই ব্যক্তিটি (মুহাম্মাদ) তোমাদেরকে লাত ও উযযার পূজা ত্যাগ করতে বলছে এবং বনু মালিক ইবনে উকাইশের সাথে মৈত্রী সম্পর্ক বর্জন করতে বলছে। [৩৫.উকাইশ অর্থ অপ্রাপ্ত উট যা যে কোন জিনিস দেখে  ভয়ে পালায়। বনু মালিক ইবনে উকাইশ জ্বিনদের একটি গোত্রের নাম।] এক নতুন ও বিভ্রান্তিকর দাবী তুলে মানুষকে বিপথগামী করার চেষ্টা করছে। তার আহ্বান সে দিকেই। তোমরা তার কথায় কান দিও না এবং তার অনুসরণ করোনা।” আমি আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করলাম, “মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিছু ধাওয়া করে যে লোকটি তাঁর  দাওয়াতকে খ-ন করার চেষ্টা চালাচ্ছে, সে কে?” তিনি বললেন, “সে মুহাম্মাদের চাচা আবু লাহাব আবদুল উযযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব।”

 ইবনে ইসহাক হলেন, ইবনে শিহাব যুহরী আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যক্তিগতভাকে কিন্দা গোত্রের লোকদের প্রতিটি শিবিরে গিয়ে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত দেন। কিন্তু তাদের সরদার মুলাইহ সহ সকলে তাকে প্রত্যাখ্যান করে।

তিনি বনু আমের ইবসে সা’সা’য়া গোত্রের লোকদের কাছেও যান, তাদেরকে আল্লাহর দিকে ডাকেন এবং নিজেকে তাদের সামনে পেশ করেন। জবাবে বাইহারা ইবনে ফিরাস নামক এক ব্যক্তি বললো, “আমি যদি এই কুরাইশ যুবককে নিই তা হলে তার সাহায্যে গোটা আরব ভূমি দখল করতে পারবো।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে তাঁর নিম্নরূপ সংলাপ হয়,

বাইহারা: “আচ্ছা, যদি আমরা তোমার আনুগত্য করি ও তোমর কাজে সহায়তা করে অতঃপর আল্লাহ তোমাকে জয়যুক্ত করেন, তখন কি আমাদের হাতে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব দেবে?”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম: “ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব আল্লাহর ইখতিয়ারাধীন। তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করেন।”

বাইহারা: “তাহলে শুধু তোমার খাতিরে সমগ্র আরব জাতির সামনে আমাদের বুক পেতে দেয়ার কি অর্থ থাকতে পারে? তুমি বিজয়ী হলে তো ক্ষমতা চলে যাবে অন্যদের হাতে তোমার এ কাজে আমাদের শরীক হওয়ার কোন দরকার নেই।”

এভাবে বনু আমের গোত্রও তাঁকে প্রত্যাখ্যান করলো। হজ্জ শেষে লোকদের মক্কা ত্যাগ করে নিজ নিজ এলাকার দিকে যাত্র করলো। বনু আমের গোত্রের লোকজনও নিজ গোত্রের কাছে ফিরে দিয়ে তাদের এক অতিশয় বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তির কাছে উস্থিত হলো। বার্ধক্যের কারণে তিনি হজ্জে যেতে পারতেন না। প্রতি বছরই তারা হজ্জ থেকে ফিরে এসে ঐ বৃদ্ধের কাছে যেতো এবং সেখানকার ঘটনাবলী তাকে  জানাতো। এ বছরও তারা ফিরে গেলে বৃদ্ধ তাদেরকে  তাদের উৎসবের ঘটনাবলী জিজ্ঞেস করলো তারা বললো, “এবার কুরাইশদের এক যুবক আমাদের কাছে এসেছিলো। বনু আবদুল মুত্তালিব গোত্রের আরো একজন লোক তার পিছু পিছু এসেছিলো। সেই যুবকের দাবী হলো, সে নবী। সে আমাদের কে অনুরোধ জানিয়েছিলো যে, আমরা যেন তাকে অত্যাচার থেকে রক্ষা করি, তার সমর্থন করি এবং তাকে আমাদের এলাকায় নিয়ে আসি।” একথা শুনে বৃদ্ধ তার নিজের মাথার ওপর হাত দু’খানা রাখলেন এবং বললেন, “হে বনী আমের, তোমরা যা হারিয়ে এসছো, তা আবার ফিরে পাওয় যায় কিনা ভেবে দেখো। কারণ ইসমাঈলের বংশধর কখনো নবী হবার মিথ্যা দাবী করেনি। আল্লাহর শপথ, ঐ যুবক যা বলেছে তা সম্পূর্ণ সত্য। তোমরা কোন সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলে না?”

আবদুল্লাহ ইবনে কা’ব কলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু হানীফা গোত্রের লোকদের সাথেও তাদের আস্তানায় গিয়ে দেখা করেন, তাদের কাছে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছান এবং  তাঁকে সমর্থন দেয়ার অনুরোধ জানান। কিন্তু তারা সবচেয়ে জঘন্যভাবে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে কাজ চালিয়ে যেতে লাগরেন। হজ্জ কিংবা অন্য কোন উপলক্ষে মক্কায় কিছু লোক সমবেত হলেই তিনি তাদের কাছে যেতেন। এভাবে প্রত্যেক গোত্রের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতেন। তাঁর কাছে আগত খোদায়ী রাহমাত ও হিদায়াত গ্রহণ করার জন্য তিনি অনুরোধ জানাতেন। যে কোন নামকরা ও গণ্যমান্য আরব মক্কায় এসেছে জানতে পারলেই তিনি তার কাছে যেতেন এবং আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত দিতেন।

বনু আমর ইবনে আওফ গোত্রের সুয়াইদ ইবনে ছামিত হজ্জ কিংবা উমরাহ উপলক্ষে মক্কা এসে সে খবর শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথে দেখা করলেন এবং তাকে আল্লাহ ও তাঁর দ্বীন ইসলামের দিকে দাওয়াত দিলেন সুহাইল বললো, “তুমি যে বাণী শোনাচ্ছ, তার অনুরূপ কিছু আমার কাছেও আছে।” রাসূলুল্লাহ বললেন,“ তোমার কাছে কি বাণী আছে? ” সে বললো, “লোকমানের বাণী সম্বলিত একখানি পুস্তিকা।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “এই বাণী খুব সুন্দর। তবে আমার কাছে যে  বাণী, তা এর চেয়েও ভাল। তা হলো কুরআন, আল্লাহ আমার উপর নাযিল করেছেন,এটা হচ্ছে হিদায়াত এবং আলোর উৎস।”অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুয়াইদকে কুরআন পড়ে শোনালেন। তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। সুয়াইদ এ দাওয়াত উপেক্ষা করলো না। সে বললো,“তুমি যে কুরআনের বাণী শোনালে, তা সত্যিই অপূর্ব। ” অতঃপর সুয়াইদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে বিদায় হয়ে মদীনায় নিজ গোত্রে ফিরে গেল। এর কিছুকাল পরেই খাজরাজ গোত্রের লোকেরা তাকে হত্যা করে। বনু ‘আমর গোত্রের লোকেরা বলতো, “আমাদের বিশ্বাস, সুয়াইদ মুসলমান হিসেবে মারা গেছে। ” মদীনার পার্শ্ববর্তী বুয়াস নামক স্থানে আওস ও খজরাজ গোত্রের মধ্যে যে যুদ্ধ হয়, তার আগেই সুয়াইদ নিহত হয়েছিল।

মদীনায় ইসলাম বিস্তারের সূচনা

অবশেষে সেই সময়টি এসে উপস্থিত হলো যখন আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে বিজয়মাল্যে ভূষিত করা, তাঁর নবীকে অধিকতর মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করা এবং তাঁকে দেয়া প্রতিশ্রুতি করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এবারও নবী  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যথরীতি হজ্জ উৎসবে আগত লোকদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিতে ও তাঁকে আপন করে গ্রহণ করার জন্য আরব গোত্রগুলিকে অনুরোধ করতে লাগলেন। এবার তিনি কিছুসংখ্যক মদীনাবাসীর সাক্ষাত পেলেন। এরা ছিলেন মদীনার খাজরাজ গোত্রের একটি দল। আকাবার [ ৩৬. মক্কা থেকে দুই মাইল দূরে অবস্থিত একটি জায়গার নাম। এটি মক্কা ও মিনার মধ্যবর্তী একটি জায়গা। এখান থেকে পাথর নিক্ষেপ হজ্জের অন্যতম বিধি।] কাছাকাছি এক স্থানে তাদের সাথে তাঁর সাক্ষাত ঘটে। আল্লাহ এই দলটির কল্যান সাধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলেই এই ঘটনা ঘটেছিলো। [৩৭. এ ঘটনা ঘটে নবুওয়াতের একাদশ বছরে।] তাদের সাথে দেখা হওয়া মাত্রই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস  করলেন, “আপনারা কারা? ” তারা বললো,“আমরা খাজরাজ গোত্রের লোক।” তিনি পুনরায় বললেন, “যা ইহুদিদের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ আপনারা কি তাদের অন্তর্ভুক্ত?” তাঁরা বললো, “হ্যাঁ।” তিনি বললেন, “আপনারা একটু বসবেন কি? আমি আপনাদের সাথে কিছু কথা বলতে চাই।” তারা বললো, বেশ,বলুন।” এরপর তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্যে বসলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে দাওয়াত দিলেন, তাদের সামনে ইসলাম পেশ করলেন এবং কুরআন তিলাওয়াত করে শোনালেন।

আগে থেকেই মহান আল্লাহ তাদের ইসলাম গ্রহণের সহায়ক একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রেখেছিলেন। মদীনায় তাদের আশেপাশে ইহুদীরা বাস করতো। তারা আসমানী কিতাকের অধিকারী ছিলো এবং সেই সুবাদে তাদের কাছে ঐশী জ্ঞান ছিল। খাজরাজ ও অন্যান্য আরব গোত্র ছিল মুশরিক তথা প্রতিমাপূজারী। ইতিপূর্বে এইসব পৌত্তলিক আরবকে আগ্রাসী যুদ্ধের মাধ্যমে পরাজিত করে ইহুদীরা তাদের এলাকা দখল করে বসতি স্থপন করে পৌত্তলিক ও ইহুদেিদর মধ্যে যখনই কোন অপ্রীতিকর অবস্থার উদ্ভত হতো, তখনই ইহুদীরা পৌত্তলিকদেরকে এই বলো শাসাতো, “এ যুগের নবীর আগমনের সময় আসন্ন হয়ে উঠেছে। ঐ নবী এলে আমরা তাঁর সেতৃত্বে ‘আদ ও ইরাম জাতিকে যেভাবে পাইকারী হত্যা করা হয়েছিল, তোমদেরকে সেইভাবে কচুকাটা করবো।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খাজরাজ গোত্রের দলটির সাথে আলাপ-আলোচনা করলেন এবং তাদেরকে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত দিলেন তখন তারা এক অপরকে বলতে লাগলো, “আল্লাহর শপথ, ইনিই তো সেই নবী যার কথা বলে ইহুদরিা আমাদেরকে হুমকি দেয় ও শাসায়। এখন ইহুদীদেরকে কিছুতেই আমাদের আগে ইসলাম গ্রহণের সুযোগ দেয় উচিত হবে না।” এইরূপ চিন্তার বশবর্তী হয়ে তারা তৎক্ষনাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করলো। তারা বললো, “আমরা আমাদের সম্প্রদায়কে এক ভয়ংকর শত্রুর শত্রুতার মুখে অসহায় অবস্থায় রেখে এসেছি। আমরা আশা করি আল্লাহ আমাদের গোটা সম্প্রদায়কেই আপনার সমর্থক করে দেবেন। আমরা তাদের কাছে ফিরে গিয়ে আপনার দাওয়াত তাদের কাছেও তুলে ধরবো। আল্লাহ যদি তাদেরকে আপনার সমর্থক বানিয়ে দেন তা হলে আপনার চেয়ে স্মমানিত ও পরাক্রান্ত আর কেউ থাকবে না।”

এভাবে তারা ঈমান আনা ও ইসলামকে সত্য বলে মেনে নেয়ার পর নিজ এলাকায় ফিরে গেলেন। যতদূর জানা যায়, খাজরাজ গোত্রীয় এই দলটির সদস্য ছিল ছয়জন। মদীনায় পৌঁছে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্য গোত্রের কাছে পেশ করলেন এবং তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানালেন। এভাবে ক্রমে মদীনার প্রতিটি ঘরে ইসলমের দাওয়াত পৌঁছে গেল। এমন একটি বাড়ীও অবশিষ্ট রইলো না, যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা আলোচিত হতো না।

আকাবার প্রথম বাইয়াত

পরবর্তী বছর আরো বারো জন হজ্জ উপলক্ষে মক্কায় আসলো। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আকাবায় সাক্ষাত করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ইসলাম গ্রহণ পূর্বক অনৈসলামিক কার্যকলাপ পরিত্যাগ করার অঙ্গীকার করলেন। এই অঙ্গীকার গ্রহণ অনুষ্ঠানকে আকাবার প্রথম বাইয়াত বলা হয়। এটি অনুষ্ঠিত হয়েছিলো মুসলিম নারীদের বাইয়াত গ্রহণের পদ্ধতিতে যা মক্কা বিজয়ের পরের দিন পুরুষদের বাইয়াত গ্রহণের অব্যবহিত পর সাফা পর্বতের ওপর অনুষ্ঠিত হয়। আকাবার প্রথম বাইয়াত  অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয় কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পচিালনার নির্দেশ আসার পূর্বে। এ বাইয়াতে অংশ গ্রহণকারেিদর মধ্যে ছিলেন আসআদ ইবনে যুরারা, রাফে ইবনে মালিক, ‘উবাদা ইবনুস্ ছামিত এবং আবুল হাইসাম ইবনে তাইহান।

‘উবাদা ইবনুস্ ছামিত বলেন, “আমি আকাবার প্রথম বাইয়াতে উপস্থিত ছিলাম। আমরা ছিলাম বারোজন পুরুষ। নারীদের বাইয়াতের পদ্ধতিতেই আমাদের বাইয়াত সম্পন্ন হয এবং তাছিল যুদ্ধের নির্দেশ আসার পূর্বেকার ঘটনা। আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে অঙ্গীকার করেছিলাম যে, আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবো না, চুরি-ডাকাতি করবো না, ব্যভিচার করবো না, সন্তান হত্যা করবো না, কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটাবো না এবং ন্যায়সঙ্গত ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবাধ্যতা করবো না।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “এসব অঙ্গীকার পূরণ করলে তোমাদের জন্য জান্নাতও রয়েছে। আর এর কোন একটি ভঙ্গ করলে তোমাদের পরিণতি আল্লাহর হাতে ন্যস্ত থাকবে। ইচ্ছে করলে তিনি শাস্তি দেবেন, ইচ্ছে করলে মাফ করে দেবেন।”

ইবনে ইসাহাক কলেন: মদীনার এই দলটি যখন নিজ সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গেল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে মুস’য়াব ইবনে উমাইরকে পাঠিয়ে দিলেন তাদেরকে কুরআন পড়ানো, ইসলাম শিক্ষা দেয়া ও ইসলামী বিধানের তত্ত্ব বুঝিয়ে দেয়ার জন্য। তিনি মদীনার শিক্ষাগুরুরূপে অভিহিত হতেন। তিনি মদীনার মুসলমানদেরকে নামাযও পড়াতেন। কেননা এক গোত্রের লোক অন্য গোত্রের লোকের ইমামতি করুক এটা আওস ও খাজরাজ গোত্রদ্বয় পছন্দ করতো না।

 

আকাবার দ্বিতীয় বাইয়াত

কিছুদিন পর মুস’য়াব ইবনে উমাইর মক্কা ফিরলেন। মদীনার কিছু কিছু নওমুসলিম তাঁদের স্বগোত্রীয় পৌত্তলিকদের সাথে হজ্জ উপলক্ষে মক্কা গেলেন। আইয়ামে তাশরীকের মাঝামাঝি সময়ে তাঁরা সবাই আকাবায় সমবেত হওয়ার জন্য [৩৮. দশই জিলহজ্জের পরবর্তী তিন দিনকে আইয়ামে তাশরিক বলা হয়। তাশরিক অর্থ চামড়া রৌদ্রে শুকানো। আরবরা এই সময় কুরবানীর পশুর চামড়া শুকাতো।] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কথা দিলেন। বলাবাহুল্য আল্লাহর রাসূলের মর্যাদা বৃদ্ধি ও বিজয় দান, ইসলাম মুসলমানদের শক্তিম ব্রদ্ধি এবং অংশীবাদ ও অংশীবাদীদের পতন ঘটাতে আল্লাহর ইপ্সিত মুহূর্তটি সমাগত হলে এই দ্বিতীয় বাইয়াত সম্পন্ন হ।েপ।া।

কা’ব ইবনে মালিক বলেন: আমরা আমাদের গোত্রের মুশরিক হাজীদের সাথে মক্ক অভিমুখে রওনা হলাম। আমরা ততক্ষণে নামায পঢ়তে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি এবং ইসলামের বিধি –বিধান শিখে নিয়েছি। আমাদের প্রবীণ মুরুব্বী ও গোত্রপতি বারা ইবনে মা’রূরও আমাদের সহযাত্রী। আমরা সফরে রওনা হয়ে মদীনা থেকে বেরুতেই রারা বললো, “শোনো, আমি একটা মত স্থির করেছি, জানি না তোমরা তাতে একমত হবে কিনা।

আমরা বললোম, “সেটা কি?” তিনি বললেন, “আমি ঠিক করেছি, কা’বাকে পেছনে রেখে নামায পড়বো না বরং কা’বার দিকে মুখ করেই নামায পড়বো। ” আমরা তাকে বললাম, “আমরা তো জানি, আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিরিয়া অর্থাৎ বাইতুল মাকদাসের দিকে ফিরেই সামায পড়ে থাকেন। আমরা তাঁর বিরোধিতা করতে পারি না।” তিনি বললেন, “তা হলে আমি কা’বা ও বাইতুল

মাকদাস-উভয়ের দিকে মুখ করে নামায পড়বো।” আমরা বললাম, “আমরা কিন্তু তা করবো না।” তাই নামাযের সময় হলে আমরা বাইতুল মাকসাদের দিকে মুখ করে নামায পড়তাম আর তিনি পড়তেন কা’বার দিকে মুখ করে। এভাবে আমরা মক্কায় এসে পৌঁছলাম। তিনি জিদ ধরে এসেছেন তার জন্য আমরা তাকে তিরস্কার করতে করতে এসেছি। কিন্তু তিনি কোনক্রমেই তার জিদ বর্জন করেননি। মক্কায় পৌঁছার পর তিনি আমাকে বললেন, “ভাতিজা, আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিয়ে চলো। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করবো, সারাপথ আমি যেভাবে নামায পড়েছি, তা ঠিক হলো কিনা” তোমাদের কে যেভাবে আমার বিরুদ্ধে কাজ করতে দেখলাম, তাতে আমার মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছে।”

কা’ব ইবনে মালিক বলেন, “অতঃপর আমরা  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্ধানে বেরুলাম। আমরা তাঁকে চিনতাম না এবং ইতিপূর্বে কথনো তাঁকে দেখিনি। একজন মক্কাবাসীর সাথে দেখা হলে আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোথায় আছেন?” সে জিজ্ঞেস করলো, “তোমরা কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিন?” আমরা বললাম, ‘না।’ সে বললো, “তাঁর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবকে কি চেন?” আমরা বললাম, ‘হ্যাঁ।’ আমরা আব্বাসকে  আগে থেকেই চিনতাম। তিনি আমাদের এলাকা দিয়ে ব্যবসা উপলক্ষ্যে যাতায়াত করতেন। মক্কাবাসী লোকটি বললো, “মসজিদে হারামে প্রবেশ করে যাঁকে আব্বাসের সাথে বসা দেখবে তিনিই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।” আমরা মসজিদে হারামে প্রবেশ করে দেখলাম, আব্বাস বসে আছেন আর তার সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও বসে আছেন। আমরা সালাম দিয়ে তাঁর কাছে গিয়ে বসলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্বাসকে জিজ্ঞেস করলেন,    তুমি কি এই দুই ব্যক্তিকে চেন?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ, আমি তাদেরকে চিনি। ইনি গোত্রপতি বারা ইবনে মা’রূর। আর ইনি কা’ব ইবনে মালিক।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার সম্পর্কে যা বললেন তা আমি ভুলতে পারব না। তিনি বললেন,তিনি বললেন, “কবি কা’ব ইবনে মালিক না কি?” আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন বারা বললেন, “হে আল্লাহর নবী, আমি এই সফরে বের হওার পূর্বেই আল্লাহ আমাকে ইসলাম গ্রহনের তাওফীক দান করেছেন। এরপর আমি কা’বার দিকে মুখ  করে নামায পড়তে লাগলাম। কিন্তু আমার সঙ্গীরা আমার মত অগ্রাহ্য করেছে। এজন্য আমি সংশয়াপন্ন হয়ে পড়েছি। হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কোনটা সঠিক মনে করেন?” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তুমি একটা কিবলার দিকে নামায পড়তে। ধৈর্য ধরে সেই কিবলার অনুসরণ করলে ভালো হতো।”

এরপর তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কিবলাকে মেনে নিলেন এবং আমাদের সাথে বাইতুল মাকদাসের দিকে মুখ করে নামায পড়তে লাগলেন। পরে আমরা হজ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। আইয়ামে তাশরিকের মাঝামাঝি সময়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আকাবায় সাক্ষাতের ওয়াদা করলাম। যেদিন হজ্জের অনুষ্ঠানাদি শেষ হলো তার পরবর্তী রাতটাই ছিল আমাদের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মিলিত হবার প্রতিশ্রুত রাত। তখন আমাদের সাথে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম আবু জাবির। তিনি ছিলেন অন্যতম সম্মানিত সমাজপতি। তাঁকেও আমরা সাথে নিলাম। কিন্তু আমাদের সাথে কারা আছে আর আমরা কি করতে যাচ্ছি তা আমাদের সহযাত্রী গোত্রীয় মুশরিকদেরকে ঘুণাক্ষরেও জানতে দেইনি। আমরা আবু জাবিরকে বললাম, “হে আবু জাবির, আপনি আমাদের একজন সম্মানিত সরদার। আপনি যে জীবন-পদ্ধতি অনুসরণ করছেন, তা আমাদের  দৃষ্টিতে অত্যন্ত গর্বিত ব্যাপার। আপনি পরকালে দোযখের আগুনে নিক্ষিপ্ত হন তা আমরা চাই না।” অতঃপর তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিলাম এবং তাঁকে জানালাম যে, আজ আকাবাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আমাদের মিলিত হবার কথা রয়েছে। আবু জাবির তৎক্ষণাৎ ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং আমাদের সাথে আকাবার বাইয়াতে অংশ গ্রহণ করলেন। এরপর তিনি একজন আহ্বায়কে পরিণত হন।

সেই রাতে আমরা আমাদের কওমের লোকদের সাথে কাফিলার মধ্যেই ঘুমালাম। রাত এক-তৃতীয়াংশ অতিক্রান্ত  হওয়ার পর আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেয় ওয়াদা মুতাবিক আকাবার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। নিশাচর পাখীর মত অতি সন্তর্পণে ও অতি গোপনে বেরিয়ে পড়লাম। পথ চলতে চলতে আমরা  আকাবার নিকটবর্তী গিরিবর্তে গিয়ে সমবেত হলাম। আমরা সর্বমোট তিহাত্তর জন লোক জমায়েত হলাম। আমাদের সাথে দুইজন মহিলাও ছিলেন। তাঁরা হলেন মুসাইব বিনতে কা’ব ও আসমা বিনতে আমর ইবনে আদী। [৩৯. ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন সময় মহিলাদের হাত স্পর্শ করতেন না। তিনি শুধু মৌখিক অঙ্গীকার নিতেন। তাঁরা অঙ্গীকার করলে তিনি বলতেন, ‘তোমরা যেতে পার। তোমাদের বাইয়াত সম্পন্ন হয়েছে।’ ]

কা’ব ইবনে মালিক বলেন, আমরা গিরিবর্তে সমবেত হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতীক্ষায় রইলাম। অবশেষে তিনি তাঁর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবকে  সাথে নিয়ে সেখানে পৌঁছেলন। তখনও আব্বাস ইবলাম গ্রহণ করেননি। তিনি কেবল ভ্রাতস্পুত্রের ঐ গুরুত্বপূর কাজটি প্রত্যক্স করা ও তাঁর নিরপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত হবার জন্যই এসেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বৈঠকে বসলেন, তখন সর্বপ্রথম আব্বাস আমাদের সাথে কথা বললেন। তিনি বললেন, “হে খাজরাজ গোত্রের জনম-ণী মুহাম্মাদ আমাদের মধ্যে কিরূপ মর্যাদার অধিকারী,তা আপনাদের নিশ্চয়ই জানা আছে। তাঁকে তাঁর সম্প্রদায়ের লোকদের জুলুম নির্যাতন থেকে আমরা এ যাবত রক্ষ করেছি। তাঁর সম্প্রদাযের মধ্যে তিনি একটা বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ফলে তাঁর সম্প্রদায় ও জন্মভূমিতে  তিনি সম্মান ও নিরাপত্তার অধিকারী। তা সত্ত্বেও আপনাদের প্রতি তাঁর অদম্য আগ্রহ এবং আপনাদের মধ্যেই তিনি থাকতে কৃতসংকল্প। এখন আপনারা ভেবে দেখুন, তাঁকে আপনারা যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন তা রক্ষা করতে পারবেন কিনা এবং তাঁর শত্রুদের হাত থেকে তাঁকে নিরাপদে রাখতে পারবেন কিনা। তা যদি পারেন তা হলে আপনাদের দায়দায়িত্ব ভালো করে বুঝে নিন। আর যি মনে করেন যে, ভবিষ্যতে আপনারা তাঁকে তাঁর শত্রুদের হাতে সমর্পণ করবেন এবং সাথে করে নিয়ে যাওয়ার পরও তাঁকে লাঞ্ছনার মুখে ঠেলে দেবেন, তা হলে এখনই সেই দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন। কেননা বর্তমানে তিনি তাঁর স্বজাতির কাছে ও আপর মাতৃভূমিতে সম্মানে ও নিরাপদে আছেন।” আব্বাসের এ কথাগুলো শোনার পর আমরা বললাম, “আপনার কথা আমরা শুনলাম। হে আল্লাহর রাসূল, এখন আপনি বলুন এবং যেমন খুশী অঙ্গীকার নিন!”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামে এবার তাঁর কথা বললেন। প্রথমে তিনি কুরআন তিলাওয়াত করলেন, তারপর সবাইকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং ইসলামের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করলেন। অতঃপর বললেন, “আমি তোমাদের কাছ থেকে এই অঙ্গীকার চাই যে, তোমরা তোমাদের স্ত্রী ও সন্তানদেরকে যেভাকে বিপদ থেকে রক্ষা করে থাকো, আমাকেও সেভাবে রক্ষা করবে।”

তৎক্ষণাৎ বারা ইবনে মা’রূর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাত ধরে বললেন, “হ্যাঁ। যে মহান সত্তা আপনাকে নবী করে সত্যদীনসহ পাঠিয়েছে তাঁর শপথ করে বলছে, আমরা স্বজন ও স্ত্রী-সন্তানদের যেভাবে বিপদ থেকে রক্ষা করে থাকি, আপনাকেও সেভাবে রক্ষা করবো। হে আল্লাহর রাসূল, আমরা আপনার আনুগত্য করার শপথ গ্রহণ করলাম। আল্লাহর শপথ, আমরা য্দ্ধু ও অস্ত্রের মধ্যেই লালিত পালিত। আমরা পুরুষানুক্রমে যোদ্ধা জাতি।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বারার কথা শেষ না হতেই আবুল হাইসাম ইবনে তাইহান বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের সাথে ইহুদীদের মৈত্রী সম্পর্কে রয়েছে এবং আমরা তা ছিন্ন করতে যাচ্ছি। এসব করার পর আল্লাহ আপনাকে বিজয় দান করলে আপনি কি আমভদের ত্যাগ করে নিজ গোত্রে ফিরে যাবেন?” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হেসে বললেন, “আমি বরং তোমাদের জীবন মরণ ও সুখ দুঃখের চিরসঙ্গী হবো, তোমাদের রক্তপাতকে আমি নিজের রক্তপাত বলে গণ্য করবো। আমি চিরকাল তোমাদের থাকবো এবং তোমরা চিরকাল আমার থাকবে। তোমরা যার সাথে যুদ্ধ করবে, আমিও তার সাথে যুদ্ধ করবো।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছিলেন, “তোমাদের মধ্য থেকে বারো জন নকীব বা আহ্বায়ক নির্বাচন করে আমার কাছে পাঠাও যাতে তারা নিজ নিজ গোত্রের লোকদের এই অঙ্গীকারে শামিল করে নিতে পারে।” তারা তখন বারো জন আহ্বায়ক নির্বাচন করে। তন্মধ্যে নয় জন ছিল খাজরাজ গোত্রের এবং তিন জন আওস গোত্রের।[৪০. খাজরাজের নয় জন আহ্বায়ক হলেন: আসাদ ইবনে যুরারা, সা’দ ইবনে রাওয়াহা, রাফে’ ইবনে মালিক, বারা ইবনে মা’রূর, আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম, উবাদা বনে ছামিত, সা’দ ইবনে উবাদা ও মুনযির ইবনে আমর ইবনে খুরাইস। আর আওস গোত্রের তিন জন ছিলেন: উসাইদ ইবনে হুদাইর, সা’দা ইবনে খাইসামা ও রিফায়া ইবনে মুনযির। ইবনে হিশাম বলেন, বিজ্ঞ ঐতিহাসিকগণ রিফায়ার স্থলে আবুল হাইসাম ইবনে তাইহানকে আহ্বায়ক বলে উল্লেখ করেন।]

যিনি সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে হাত রেখে বাইয়াত করেন তিনি বারা ইবনে মা’রূর। পরে তিনি নিজ গোত্রকে ঐ বাইয়াতে শামিল করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আমাদের এই বাইয়াত অনুষ্ঠান সমাপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শয়তান আকাবার পর্বত শীর্ষ থেকে এমন জোরে চিৎকার করে উঠলো যে, ও রকম বিকট চিৎকার আমি আর কখনো শুনিনি। সে চিৎকার করে বলছিলো, “হে মিনাবাসী, মুজাম্মাম অর্থাৎ নিন্দিত ব্যক্তির সাথে  ধর্মদ্রোহীরা যে যোগসাজশ করলো তা কি তোমরা লক্ষ্য করলে না? [৪১.মুজাম্মাম অর্থ ধিকৃত বা নিন্দিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম মুহাম্মাদের (প্রশংসিত) বিপরীত শব্দ। মুশরিকরা তাঁকে এই নামে ডাকতো। আর যারা ইসলাম গ্রহণ করতো তাদেরকে বলতো সাবি অর্থাৎ সাবি অর্থাৎ ধর্মত্যাগী বা বে-দীন।]  ওরা তোমাদের সাথে যুদ্ধের পাঁয়তারা করছে। ” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “এ হলো আকাবার শয়তান আযেব ইবনে উযাইবের চিৎকার।”

অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তোমরা নিজ নিজ কাফিলায় বলে যাও।”

‘আব্বাস এবন উবাদা ইবনে নাদালা বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, যে আল্লাহ আপনাকে সত্য বিধানসহ পাঠিয়েছেন তাঁর শপথ করে বলছি, আপনি চাইলে আমরা আগামীকালই মিনায় অবস্থানকারীদের ওপর তরবারী নিয়ে হামলা চালাবো।”

এরপর আমরা গিয়ে শয্যাগ্রহণ করলাম এবং সকাল পর্যন্ত ঘুমালাম। সকাল হতেই কুরাইশদের বিরাট একটি দল আমাদের ঘিরে ধরলো।। তারা বললো, “হে খাজরাজ গোত্রের লোকগণ, আমরা জানতে পেরেছি যে, তোমরা মুহাম্মাদকে আমাদের মধ্য থেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছো এবং আমাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য তার সাথে ষড়যন্ত্র¿ করছো। সত্যি বলতে কি, আরবের আর কোন গোত্রের সাথে যুদ্ধের চেয়ে তোমদের সাথে যুদ্ধ আমাদের কছে সবচেয়ে অপছন্দীয়।” এ কথা শুনে আমাদের যেসব মুশরিক সেখানে ছিল, তারা আল্লাহর শপথ করে করতে লাগলো, “এ ধরনের কোন ষড়যন্ত্রই এখানে হয়নি এবং আমরা তেমন কিছু ঘটেছে বলে জানি না।”

বস্তুত:তারা সত্য কথাই বলছিল। তাঁরা প্রকৃতপক্ষে কিছুই জানতো না। তারা যখন আল্লাহর শপথ করে কুরাইশদের এসব বলে আশ্বস্ত করছিল তখন আমরা একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছিলাম। এরপর মিনা থেকে লোকজন চলে গেলে কুরাইশরা ব্যাপারটা আরো গভীরভাবে অনুসন্ধান চালালো। শেষ পর্যন্ত তারা জানতে পারলো যে, ঘটনাটা সত্য। অতঃপর আওস ও খাজরাজ গোত্রের লোকদের সন্ধানে তারা চারদিকে ছুটাছুটি শুরু করলো। মক্কার নিকটবর্তী আযাখের নামক স্থাকে তারা সা’দ ইবনে উবাদা, মুনযির ইবনে আমররে সাক্ষাত পেলো। মুনযিরকে তারা ধরতে পারলো না, কেবল সা’দ ধরা পড়লেন। সা’দের চুল ছিল বেশ লম্বা। তারা তাঁকে ধরে উটের রশি দিয়ে দুই হাত ঘাড়ের সাথে এঁটে বাঁধলো। তারপর তাঁকে পিটাতে পিটাতে চুল ধরে টানতে টানতে মক্কায় নিয়ে গেল।

এ সম্পর্কে সা’দ নিজে যে বর্ণনা দিয়েছেন তা নিম্নরূপ, আমি তাদের হাতে ধৃত ও বন্দী অবস্থায় ছিলাম। এমতাবস্থায কুরাইশদের একটি দল আমার কাছে আসলো। তাদের ভেতরে খুবই উজ্জ্বল ফর্সা, সুন্দর ছিপছিপে লম্বা ও মিষ্টি চেহারার অধিকারী এক সুদর্শন পুরুষকে দেখলাম। আমি মনে মনে বললাম: এই বিপুল জনতার মধ্যে কারো কাছে যদি ভালো  ব্যবহার প্রত্যাশা করা যেতে পারে তা হলে এই ব্যক্তির কাছেই। কিন্তু এ লোকটা আমার কাছে এসে প্রথমেই আমাকে প্রচ- এক থাপ্পড় কষে দিলো। তখন আমি মনে মনে বললাম, এই লোকটার কাছ থেকেই যখন এমন ব্যবহার পেলাম, তখন আর কারো কাছ থেকেই ভালো ব্যবহার  আশা করা যায় না। এভাবে তারা আমাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিল। আমি তখন সম্পূর্ণ অসহায়। সহসা জনতার মধ্য হতে এক ব্যক্তি আমার প্রতি দয়াপরবশ হয়ে বললো, “আহ্! কি দুঃখজনক দশা তোমার। আচ্ছা কুরাইশদের ভেতরে কি তোমার জানাশোনা বা লেনদেন আছে এমন একটা লোকও নেই?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, আছে। আমি এক সময় যুবাইর ইবনে মুতয়িম ইবনে আদীর বাণিজ্য প্রতিনিধিদের আশ্রয় দিতাম এবং আমাদের অঞ্চলে কেউ তাদের ওপর যুলুম করতে  চাইলে তাদেরকে রক্ষা করতাম। তা ছাড়া হারেস ইবনে হারব ইবনে উমাইয়ার বাণিজ্য প্রতিনিধিদেরকেও সাহায্য করতাম। ”লোকটি বললো, ‘তা হলে ঐ দু’জনের সাম উল্লেখ করে খুব উচ্চস্বরে ধ্বনি দাও। তাদের সাথে তোমার যে সম্পর্ক রয়েছে তার উল্লেখ কর।” আমি সঙ্গে সঙ্গে ঐ দু’জরের নামে ধ্বনি দিলাম। আর ঐ লোকটি তৎক্ষণাৎ যুাবাইর ও হারেসের সন্ধানে ছুটে গেলো এবং কা’বার সন্নিকটে মসজিদুল হারামের মধ্যে তাদেরকে পেলো।

অতঃপর সে তাদেরকে বললে, “মক্কার অদূরের সমভূমিতে খাজরারের একটা লোককে এই মুহূর্ত ভীষণভাবে পিটানো হচ্ছে। সো মার খাচ্ছে আর তোমরদের দু’জনের নামোল্লেখ করে বলছে যে, তার সাথে নাকি তোমাদের জানাশোনা আছে।”যুবাইর ও হারেস বললো, “লোকটি কে?” সে বললো, ‘সা’দ ইবনে উবাদা।” তারা বললো, “ঠিকই বলেছে। সে আমাদের ব্যবসায়ীদেরকে তাদের এলাকায় গেলে আশ্রয় দিতো এবং যুলুম থেকে রক্ষা করতো।” অতঃপর উভয়ে এসে সা’দকে জনতার হাত থেকে উদ্ধার করলো। তারপর সা’দ চলে গেলেন।

আকাবার শেষ বাইয়াত ও তার শর্তাবলী

আকাবার শেষ বাইয়াতটি সম্পন্ন হয় আল্লাহর তরফ থেকে সশস্ত্র যুদ্ধের অনুমতি লাভের পর। তাই যুদ্ধের অঙ্গীকার ছাড়া এই বাইয়াতের শর্তাবলী ছিলো প্রথম বাইয়াতের শর্তাবলীর অনুরূপ। প্রথম বাইয়াত ছিল মক্কা বিজয়ের মহিলাদের বাইয়াতের অনুরূপ। কারণ প্রথম বাইয়াতের সময় আল্লাহ তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যুদ্ধের অনুমতি দেননি। তাই অনুমতি লাভের পর আকাবার শেষ বাইয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু’মিনদের নিকট থেকে যুদ্ধের ব্যাপারে এই মর্মে অঙ্গীকার গ্রহণ করেন যে, তারা দুনিয়ার সকল কাফিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করবেন। তিনি তাদের ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে অঙ্গীকারের শর্তাবলী আরোপ করেন এবং সেই শর্তাবলী সহ অঙ্গীকার পালন করলে তাদের জন্য জান্নাত রয়েছে বলে ঘোষণা করেন।

‘উবাদা ইবনে ছামিত (রা) বর্ণনা করেন, “আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে যুদ্ধের অঙ্গীকারে আবদ্ধ হলাম। সেই অঙ্গীকারের শর্তবলী ছিলো এই: অবস্থা কঠিন কিংবা স্বাভাবিক যা হোক না কেন আমরা সর্বদা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কথা বলবো এবং আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারের পরোয়া করবো না।”

সশস্ত্র যুদ্ধের নির্দেশ লাভ

আকাবার বাইয়াতের পূর্বে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যুদ্ধের বা প্রয়োজনে রক্তপাত ঘটানোর অনুমতি দেয়া হয়নি। তখন পর্যন্ত তাঁকে শুধু আল্লাহর দ্বীনের দিকে দাওয়াত দেয়া, যুলুম নির্যাতনে ধৈর্যধারণ করা এবং অজ্ঞ লোকদের ক্ষমা করার নির্দেশ দেয়া হচ্ছিলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুসরণকারী যেসব লোককে ঘরবাড়ী ত্যাগ করতে হয়েছিলো, তাদের উপরে কুরাইশরা চরম ও নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়েছিলো। অসহ্য নির্যাতনের শিকার হয়ে কেউ কেউ ইসলাম ত্যাগ করতেও বাধ্য হয়েছিলো। কুরাইশরা বেশ কিছু সংখ্যাক ঈমানদারকে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছিলো। এভাবে মুসলমানেদের কেউবা অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলো, কেউবা ইসলাম পরিত্যাগ করেছিল, কেউবা দেশত্যাগ করেছিলো। তাদের তধ্যে অনেকে হাবশায় এবং অনেকে মদীনায় হিজরাত করেছিলো এভাবে সবদিক দিয়েই মুসলমানরা যখন লাঞ্ছিত ও সর্বস্বান্ত, কুরাইশরা খোদাদ্রোহিতার শেষ সীমায় উপনীত এবং তাঁর নবী প্রত্যাখ্যাত, তখনই আল্লাহ তাঁর রাসূলকে সশস্ত্র যুদ্ধ পরিচালনা এবং যালিম খোদাদ্রোহীদেরকে পর্যুদস্ত করার অনুমতি দিলেন। উরওয়া ইবনে যুবাইর ও অন্যান্য বর্ণনাকারীদের নিকট থেকে আমি যা জানতে পেরেছি। তদনুসারে আল্লাহর বিধানকে প্রতিষ্ঠা ও ঈমানদারদের প্রতিরক্ষার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধ ও রক্তপাত বৈধ ঘোষণা করে সর্বপ্রথম যে আয়াতগুলো নাযিল হয়, তা হলো-

[আরবী *************]

“যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা হচ্ছে তাদেরকে (যুদ্ধের) অনুমতি দেয়া গেল। কারণ তারা মাযলুম। বস্তুত: আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করার মত ক্ষমতাশালী। তারা সেই সব লোক, যাদেরকে শুধু ‘আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ’ এই কথাটুকু বলার কারণে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে ঘরবাড়ী থেকে তাড়িয়ে দেয় হয়েছে। আল্লাহ যদি একদল মানুষকে আরেক দল দিয়ে দমন করার ব্যবস্থ না রাখতেন তাহলে মন্দির, গীর্জা, সব ইবাদাতখানা ও মসজিদসমূহ, যেখানে বেশী করে আল্লাহর নাম স্মরণ করা হয়ে থাকে ধ্বংস করে দেয়া হতো। আল্লাহকে যে সাহায্য করবে আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন। বস্তুত: আল্লাহ শক্তিশালী মহা প্রতাপান্বিত। তারা সেই সব লোক যাদের আমি পৃথিবীতে ক্ষমতা ও সুযোগ দিলেই নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে, ন্যায় ও সত্যকে প্রতিষ্ঠা করবে এবং অন্যায় ও অসত্যকে প্রতিরোধ করবে। আল্লাহর হাতেই সব কিছুর চূড়ান্ত পরিণতি। (সূরা হজ্জ ৩৯-৪১)

অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কিরামের ওপর যুলুম নির্যাতন হওয়ার কারণেই আমি তাদের জন্য সশস্ত্র যুদ্ধ বৈধ করেছি। তারা মানুষের প্রতি কোন অপরাধ বা পাপ করেনি। তারা যখনই বিজয়ী হবে তখনই নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে, ভালো কাজের আদেশ করবে ও মন্দ কাজ প্রতিহত করবে। এরপর আল্লাহ আবার নাযিল করেনÑ

[আরবী *************]

“তাদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাও যাতে কোন মু’মিনকে আর তার দীন পরিত্যাগ করতে বাধ্য করা না হয় এবং একমাত্র আল্লাহর আনুগত্য অবশিষ্ট থাকে।” (সূরা বাকারাহ্) অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহর ইবাাত বা দাসত্ব করা হয়, অন্য কারো নয়।

মুসলমানদেরকে মদীনায় হিজরাত করার অনুমতি দান

আল্লাহর তরফ থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন যুদ্ধের অনুমতি দেয় হলো আর মদীনাবাসীদের উপরোক্ত দলটি ইসলামী বিধানের অনুসরণ এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর অনুরসারীদের সর্বত্মক সাহায্য সহযোগিতা দানের ব্যাপারে অঙ্গীকারাবদ্ধ হলো, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই সব মুসলমানকে মদীনায় হিজরাত করে তাদের আনসার ভাইদের কাছে-চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। তিনি তাদেরকে বললেন, “আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য একটি নিরাপদ আবাসভূমি ও কিছুসংখ্যক ভাই সংগ্রহ করে দিয়েছেন।” ফলে মুসলমানগণ দলে দলে হিজরাত করতে শুরু করলেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে মক্কা ত্যাগ করে মদীনায় হিজরাতের জন্য আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায় মক্কায় অবস্থান করতে লাগলেন।

মদীনায় হিজরাতকারী মুসলমানদের বিবরণ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের কুরাইশ বংশীয় প্রথম মুহাজির ছিলেন বনী মাখযুম গোত্রের আবু সালামা ইবনে আবুদুল আসাদ। আকাবার বাইয়াতের এক বছর আগে তিনি মদীনায় হিজরাত করেন। ইতিপূর্বে তিনি আবিসিনিয়া থেকে মক্কায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে আসেন। এই সময় কুরাইশরা তাঁকে উৎপীড়ন করতে লাগলো। তিনি মদীনাবাসীদের ইসলাম গ্রহনের খবর শুনতে পেলেন। এবং তাঁর সাথে হিজরাত করে চলে গেলেন। আবু সালামার পর আমের ইবনে রাবীয়া এবং মদীনায় তার স্ত্রী লায়লা বিনতে আবু হাসমা মদীনায় হিজরাত করেন। তারপর আবুল্লাহ ইবনে জাহাশ তাঁর পরিবার পরিজন ও ভাই আবদ ইবনে জাহাশকে সাথে নিয়ে হিজরাত করেন। তাঁর ভাইয়ের আর এক নাম ছিলো আবু আহমাদ। তাঁর দৃষ্টিশক্তি ছিলো ক্ষীণ। তা সত্ত্বেও তিনি কারো সাহায্য ছাড়াই মক্কার উচ্চ ও সমতল এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন। তিনি ছেলেন একজন কবি।

এপর উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) ও আইয়াশ ইবনে আবু রাবিয়া মাখযুমী হিজরাত করে মদীনায় চলে যান। অতঃপর ব্যাপকহারে মুসলমানগণ মদীনায় হিজরাত করতে থাকেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরাত

সাহাবীগণ হিজরাত করে মদীনায় চলে যাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরাতের ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায় থেকে গেলেন। এ সময়ে আলী ইবনে আবু তালিব, আবু বাক্র সিদ্দীক ও মুষ্টিমেয় ক’জন সাহাবা ছাড়া আর কেউ মক্কায় ছিলেন না। অন্য যারা ছিলো তারা হয় কাফিরদের হাতে বন্দী ছিল নতুবা ইসলাম ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলো। আবু বাকর (রা) প্রায়ই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট হিজরাত করার অনুমতি চাইতেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বলতেন, “তুমি তাড়াহুড়ো করো না। হয়তো আল্লাহ তোমাকে একজন সাথী জুটিয়ে দেবেন।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই তাঁর হিজরাতের সঙ্গী হন। হযরত আবু বাক্র সিদ্দীক (রা) এরপর থেকে তাই কামনা করতেন। কুরাইশরা যখন দেখলো যে, অন্যত্র তাদের গোত্রের বাইরের বহু লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারী হয়েছে এবং তাঁর সঙ্গীরা তাদের কাছে হিজরাত করে চলে যাচ্ছে, তখন তারা বুঝতে পারলো যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সহচরগন একটা নিরাপদ আবাসভূমি পেয়ে গেছেন। তাই তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেশত্যাগের ব্যাপারে সতর্ক হয়ে গেলো। তারা ভাবলো যে, তিনি তাদের সাথে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করেছেন।

এ ব্যাপারে পরামর্শ করার জন্য তারা পরমর্শগৃহ ‘দারুন্ নাদওয়ায়’ সমবেত হলো। এই গৃহটি ছিলো কুসাই ইবনে কিলাবের বাড়ী। কুরাইশরা যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে এখানেই সমবেত হতো। এবার তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভয়ে ভীত হয়ে তাঁর ব্যাপারে কি করা যায়, তাই নিয়ে আলোচনা করতে বসলো। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য তারা নির্ধারিত দিনে সেখানে সমবেত হলো। এই দিনকে ‘গণসমাবেশ দিবস’ নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। তাদের পরামর্শ গৃহে ঢুকবার পথে ইবলিস কম্বল আচ্ছদিত এক বৃদ্ধের বেশে তাদের সামনে এসে দাঁড়ালো। সে ঠিক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। তাকে দেখে সবাই বললো, “বৃদ্ধ এই  লোকটি কে?” সে বললো, “আমি নাজদের অধিবাসী। [৪২.সুহাইলী মতে, শয়তান নিজেকে নাজদবাসী বলে পরিচয় দেয়ার কারণ হলো, কুরাইশরা আগেই জানিয়ে দিয়েছিলো যে, তিহামা অঞ্চলের কোন লোককে এই পরামর্শ সভায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। কেননা তারা মনে করতো, তিহামাবাসী মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমর্থক। এজন্য ইবলিস নাজদবাসী বৃদ্ধের রূপ ধরে আত্মপ্রকাশ করেছিলো।]

তোমরা যে উপলক্ষে আজ সমবেত হচ্ছো, তা আমি শুনেছি। তাই তোমাদের কথাবার্তা শোনার জন্য এসেছি। আশা করি আমার উপদেশ ও পরামর্শ থেকেও তোমরা বঞ্চিত হবে না।”একথা শুনে সবাই তাকে পরম সমাদরে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দিলো। সে সবার সাথে প্রবেশ করলো। ততক্ষণে কুরাইশদের বড় বড় নেতা ও সরদার ভেতরে আসন গ্রহণ করেছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে তারা পরস্পর বলাবলি করতে লাগলো, “এই লোকটির তৎপড়তা বর্তমানে কোন্ পর্যায়ে পৌঁছেছে, তোমরা সবাই তা জান। সে তার বাইরের অনুসারীদের নিয়ে কখন যে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তার কোন ঠিক নেই। তার আক্রমণ থেকে আমরা এখন নিরাপদ নই। অতএব, সবাই মিলে তার ব্যাপারে একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ কর।”

সলাপরামর্শ চলতে থাকলো। এক সময় একজন বললো, “তাকে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে কোন অর্গলবদ্ধ  কুঠরীতে বন্দী করে রাখ। তারপর ইতিপূর্বে তার মত  কবিদের যে পরিণতি হয়েছে তারও সেই পরিণতি অর্থাৎ শোচনীয় মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে থাক। যুহাইব, নাবেগা ও তাদের মত অন্যান্য কবির এই পরিণতি হযেছিল। ” তখন বুড়ো বললো, “না, তোমাদের এই সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। তোমরা যদি তাকে বন্দী কর, তা হলে বদ্ধ কুঠরীতে  তার বন্দী হওয়ার খবর তার বাইরের অনুসারীদের কানে চলে যাবে। সে অবস্থায় তারা তোমাদের ওপর হামলা  চালিয়ে তাকে তোমাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে পারে। অতঃপর তাদের সংখ্যা বেড়ে যাবে এবং একদিন  তারা তোমাদের ওপর বিজয়ী হবে। কাজেই তোমাদের এ সদ্ধিান্ত সঠিক নয়। অন্য কোন সিদ্ধান্ত নিতে পার কিনা, ভেবে দেখ।”

এরপর আবার আলাপ-আলোচনা চলতে লাগলো। একজন বললো, “আমরা তাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করবো। এরপর তাকে নিয়ে আমাদের আর কোন দুশ্চিন্তা থাকবে না। সে একাবার আমাদের কাছ থেকে চলে গেলে কোথায় গেলো বা কোথায় থাকলো আমরা তার কোন পরোয়া করবো না। সে চলে গেলে আমরা তার ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে যাবো। এরপর আমাদের পারস্পরিক মৈত্রী ও বন্ধুত্ব এবং অন্যান্য ব্যাপারে আমরা নিজেরাই শুধরে স্বাভাবিক করে নিতে পারবো।”

নাজদের বৃদ্ধ বললো, “না, এটাও সঠিক সিদ্ধান্ত হলো না। তোমরা কি তার অনুপম বাচনভঙ্গি, মিষ্ট ভাযা, যুক্তিগ্রাহ্য কথা এবং তথাকথিত ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত মন মগজ আছন্নকারী ব্যাপারগুলো দেখনি? তোমরা যদি এই পদক্ষেপ নাও, তাহলে এমনও হতে পারে যে, সে অন্য কোন আরব গোত্রে গিয়ে হাজির হবে, আর তার মিষ্ট ও হৃদয়গ্রাহী কথা দিয়ে তাদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করবে এবং তারা তার অনুসারী হয়ে যাবে। অতঃপর তাদের নিয়ে তোমাদের ওপর হামলা চালিয়ে তোমাদের দেশ দখল করে তোমাদের হাত থেকে কর্তৃত্ব ছিনিয়ে নেবে। তোমরা এটা বাদ দিয়ে অন্য কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ কর।”

এবার আবু জাহল বললো, “আমার একটা মত আছে য এতক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের কারো মাথায় আসেনি।” সবাই বললো, “বলো দেখি, আবুল হাকাম তোমার মত কি।”

সে বললো, “আমাদের প্রত্যেক গোত্র থেকে এক একজন শক্তিশালী সম্ভ্রান্ত যুবক বাছাই করতে হবে। তারপর তাদের প্রত্যেককে আমরা একটা করে ধারালো তরবারী দেবো। ওই যুবকেরা এক যোগে হামলা চালিয়ে মুহাম্মাদকে হত্যা করবে। এভাবে আমরা তার থেকে নিস্তার পেতে পারি। আর তারা সবাই মিলে যখন এ কাজটা করবে, তখন মুহাম্মাদের খুনের দায় দায়িত্ব সকল গোত্রের ঘাড়েই কিছু না কিছু পড়বে। ফলে আবদ মানাফ গোষ্ঠী সমগ্র জাতির বিরুদ্ধে লড়াই করে খুনের প্রতিশোধ নিতে পারবে না। রক্তপণ নিয়ে সন্তুষ্ট হতে বাধ্য হবে। আমরা সকল গোত্র মিলে তাদেরকে রক্তপণ দিয়ে দেবো।”

নাজদের বৃদ্ধ বললো, “এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত। আমি মনে করি এর চেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত আর হতে পারে না।”

এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে পরামর্শ সভার সমাপ্তি ঘোষনা করা হলো এবং সবাই যার যার বাড়ীতে চলে গেলো।

তৎক্ষণাৎ জিবরীল (আ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এস তাঁকে বললেন, “আপনি প্রতিদিন যে বিছানায় ঘুমান আজ রাতে সে বিছানায় ঘুমাবেন না।”রাতের এক তৃতীয়াংশ অতিক্রান্ত হলে নির্ধারিত ঘাতকের দল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরের দরজায় এসে সমবেত হয়ে ওত পেতে থাকলো। তিনি কখন ঘুমান তার প্রতীক্ষা করতে লাগলো। ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁর ওপর হামলা চালাবে এই তাদের বাসনা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের উপস্থিতি বুঝতে পেরে আলী ইবনে আবু তালিবকে (রা) বললেন, “তুমি আমার বিছানায় ঘুমাও এবং আমার এই সবুজ হাদরামাউতী চাদর দিয়ে আপাদমস্তক আবৃত করে রাখ। তোমার ওপর তাদের দিক থেকে কোন আঘাত আসবে না, এ ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত থাক।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুমাবার সময় ঐ চাদরটি গায়ে জড়িয়ে নিতেন।

মুহাম্মাদ ইবনে কা’ব আল কারযী বলেন, ঘাতক দলে আবু জাহলও ছিলো। ঘাতকরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাড়ীর দরজার জাময়েত হলে আবু জাহল তাদেরকে বললো, “ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে যে, তোমরা যদি তার অনুসরণ কর তাহলে তোমাদের আরব ও অনারব সবার জন্য জর্ডানের বাগ বাগিচার মত অসংখ্য বাগ বাগিচা তৈরী করে দেয়া হবে। কিন্তু যদি তার অনুসরণ না কর তা হলে তোমরা ধ্বংস ও নির্মূল হয়ে যাবে। মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করে তোমাদেরকে আগুনে পোড়ানো হবে।”

ঠিক সেই মুহূর্তেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেরিয়ে তাদের সামনে আসলেন। তিনি এক মুষ্ঠি ধূলি হাতে নিলেন। অতঃপর আবু জাহলকে লক্ষ্য করে বলতে লগলেন, “হ্যাঁ, আমি এ কথা বলি এবং যাদেরকে আগুনে পোড়ানো হবে তুমিও তাদেরই একজন।” এই সময় আল্লাহ তাদের দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নিলেন। ফলে তারা তাঁকে দেখতে পেলো না। তিনি ঐ ধূলি তাদের মাথার ওপর ছড়িয়ে দিতে লাগলেন। তিনি তখন সূরা ইয়াসীনের নিন্মোক্ত আয়াতসমূহ পড়ছিলেন-

“ইয়াসীন! জ্ঞানের ভা-ার কুরআনের কসম, নিশ্চয়ই তুমি রাসূল। তুমি সঠিক পথের ওপর আছ। এ কুরআন মহাপরাক্রান্ত করুনাময়ের নাযিল করা, যাতে তুমি এমন একটি জাতিকে সাবধান করে দিতে পার যাদের পূর্বপুরুষদের সাবধান করা হয়নি। পলে তারা অজ্ঞতার মধ্যে নিমজ্জিত রয়েছে। তাদের অধিকাংশ লোকই আল্লাহর আযাবের যোগ্য তাই তারা ঈমান আনছে না। আমি তাদের গলায় বেড়ি লাগিয়ে দিয়েছি। সেই বেড়িতে তাদের থুতনি পর্যন্ত শ্রংখলিত হয়ে গেছে। এ জন্য তারা মাথা উঁচু করে রয়েছে। আমি তাদের সামনে একটি প্রাচীর এবং পেছনে আরেকটি প্রাচীর দাঁড় করিয়ে তাদেরকে ঢেকে দিয়েছি। তাই তারা দেখতে পায় না।” এই আয়াত কয়টি পড়তে পড়তে তিনি তাদের প্রত্যেকের মাথায় ধূলি নিক্ষেপ করলেন। অতঃপর নিজের ইচ্ছামত একদিক চলে গেলেন।

কিছুক্ষণ পর বাইরের এক ব্যক্তি তাদের কাছে এসে  জিজ্ঞেস করলো, “তোমরা এখানে কি জন্য অপেক্ষা করছো?” তারা বললো, “আমরা মুহম্মাদের অপেক্ষায় আছি।” সে বললো, “আল্লাহ তোমাদেরকে ব্যর্থ করে দিয়েছেন। মুহাম্মাদ তো তোমাদের সামনে দিয়েই বেরিয়ে গেছে। তোমাদের মাথায় কি রয়েছে, তা কি দেখতে পাচ্ছো না?” তখন প্রত্যেকে মাথায় হাত দিয়ে দেখলো, ধূলিতে মাথা আচ্ছন্ন হয়ে আছে।

অতঃপর তারা গৃহতল্লাশী শরু করলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাদর গায়ে দিয়ে আলীকে (রা) বিছানায় শয়িত দেখে বললো, “এই তো মুহাম্মাদ, চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে।” তাই তারা ভোর পর্যন্ত অপেক্ষায় রইলো। সকালে আলী (রা) বিছানা থেকে উঠলে তাকে দেখে সবাই বলে উঠলো, “লোকটা তাহলে তো ঠিকই বলেছে যে, মুহাম্মাদ চলে গেছে।”

ইবনে ইসহাক বলেন, আবু বাক্র ছিলেন খুব ধনবান ব্যক্তি। তিনি রাসূলুল্লাহর কাছে হিজরাতের অনুমতি চাইলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বলতেন, “তুমি তাড়াহুড়া করোনা। আল্লাহ হয়তো তোমাকে নিজের কথাই বলেছেন। তাই তিনি তখন থেকেই দুটো উট কিনে নিজের বাড়ীতে রেখেছিলেন। হিজরাতের প্রস্তুতিস্বরূপ তিনি এই কাজ করেছিলেন।

আয়েশা (রা) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বাক্রের বাড়ীতে সকালে হোক বা বিকেলে দিনে অন্ততঃ একবার যেতে ভুলতেন না। সেই দিনটা এসে উপনীত হলো যেদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মক্কার স্বগোত্রীয়দেরকে ছেড়ে হিজরাত করে চলে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হলো। সেদিন তিনি দুপুরে আমাদের বাড়ীতে আসলেন। ঐ সময় কখনো তিনি আসতেন না। তাঁকে দেখে আবু বাক্র বললেন, “নিশ্চয়ই কিছু ঘটেছে তা না হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সময় আসতেন না।” তিনি বাড়ীতে প্রবেশ করলে আবু বাক্রের বাড়ীতে তখন আমি আর আমার বোন আসমা বিনতে আবু বকর ছাড়া আর কেউ ছিলো না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তোমরা এখানে অন্য যারা রয়েছে, তাদেরকে আমার কাছ থেকে সরিয়ে দাও।” আবু বাক্র (রা) বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমার দুই মেয়ে ছাড়া আর কেউ নেই। আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হোক। আপনার কি হয়েছে? আমাকে বলুন।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আল্লাহ আমাকে মক্কা থেকে চলে যাওয়ার ও হিজরাত করার অনুমতি দিয়েছেন।” আবু বাক্র বললেন, “আমিও কি সঙ্গে যেতে পারবো?” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “হ্যাঁ, তুমিও সঙ্গে যেতে পারবে?।” আয়িশা (রা) সবলেন, সেদিনের আগে আমি জানতাম না যে, মানুষ আনন্দের আতিশয্যেও কাঁদতে পারে। আমি আবু বাক্র (রা) কে সেদিন কাঁদতে দেখেছি। অত:পর আবু কাক্র (রা) বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, এই দেখুন, আমি এই উট দুটো এই কাজের জন্যই প্রস্তুত করে রেখেছি।” অতঃপর তারা আবদুল্লাহ ইবনে আরকাতকে পথ দেখিয়ে নেবার জন্য ভাড়া করে সাথে নিলেন। সে ছিলো মুশরিক। উট দুটো তার কাছেই রেখে গেলেন। সে নির্ধারিত সময়ের জন্য উট দুটির দেখাশুনা ও তত্ত্বাবধান করতে থাকলো।

ইবনে ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মক্কা ত্যাগের সময় তাঁর মক্কা ত্যাগের কথা শধুমাত্র আলী ইবনে আবু তালিব (রা), আবু বাকর সিদ্দীক (রা) এবং আবু বাকরের পরিবার পরিজন ছাড়া আর কেউ জানতো না। আলীকে ব্যাপারটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই জানিয়েছিলেন। তিনি তাঁকে মক্কায় কিছুদিন থাকতে বলেছিলেন। মক্কার লোকেরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নানা রকমের জিনিস গচ্ছিত রাখতো। যারা কোন জিনিস নিজের কাছে রাখা নিরাপদ মনে করতো না তারা  তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আমানত রাখতো। কারণ তাঁর সততা ও আমানতদারীর কথা সবার জানা ছিলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরাতের পর ঐ আমানত ফেরত দেয়ার জন্যই তিনি আলীকে (রা) দায়িত্ব অর্পণ করেন এবং তাকে মক্কায় আরো কিছুদিন থাকার নির্দেশ দেন।

এবার আবু বাক্র রাদিয়াল্লাহু আনহুর বাড়ী থেকে বের হবার পালা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আবু বাক্রের (রা) কাছে আসলেন। তারপর আবু বাক্রের ঘরের পেছনের জানালা দিয়ে উভয়ে বের হলেন। অতঃপর তাঁরা মক্কার নিম্নভূমিতে অবস্থিত ‘সাওর’ পর্বতের একটি গুহার পাশে গিয়ে তার ভেতরে প্রবেশ করলেন। আবু বাকর তাঁর ছেলে ‘আবদুল্লাহকে বলে গেলেন, দিনের বেলায় লোকেরা তাঁদের সম্পর্কে কিছু বলাবলি করে কিনা, তা যেন সে মনোযোগ দিয়ে শোনে এবং সন্ধ্যার সময় তাঁদের কাছে গিয়ে সব কথা জানায়। (মুক্তিপ্রাপ্ত গোলাম ও পরে স্বেচ্ছায় মজুরীর ভিত্তিতে কর্মরত) ভৃত্য আমের ইবনে ফুহাইরাকে নির্দেশ দিয়ে গেলেন, সে যেন দিনের বেলায় তাঁর মেষপাল চরায়, অতঃপর সেগুলোকে সাওরের ঐ পর্বত গুহার কাছে ছেড়ে দেয় এবং সন্ধ্যার সময় পর্বত গুহায় তাঁদের সাথে দেখা করে। আসমা বিনতে আবু বাক্র প্রতিদিন সন্ধ্যার সময় তাঁদের জন্য খাবার নিয়ে যেতেন। [৪৩. হাসান বসরী (রহঃ) থেকে ইবনে হিশাম বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ও আবু বাক্র (রা) সাওর পর্বত গুহায় পৌঁছেন রাতে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রবেশের আগে আবু বাক্র (রা) গুহায় প্রবেশ করলেন। সেখানে কোন হিং¯্র প্রাণী বা সাপ আছে কিনা তা ভালো করে দেখে নিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিপদমুক্ত রাখার উদ্দেশ্যেই তিনি এরূপ ঝুঁকি নিয়েছিলেন। ]আবু বাক্রকে (রা) সাথে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাওর পর্বত গুহায় তিনদিন  অবস্থান করেন। এদিকে কুরাইশরা হাতছাড়া হয়ে যাওয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য একশো উট পুরস্কার ঘোষণা করলো। আবদুল্লাহ ইবনে আবু বাক্র সারা দিন কুরাইশদের সাথেই মিলেমিশে থাকতেন এবং তাদের সলাপরামর্শ শুনতেন। তারা তাঁদের উভয়ের সম্পর্কে যা যা মন্তব্য করতো তাও শুনতেন। অতঃপর সন্ধ্যার সময় তাঁদের কাছে গিয়ে সারা দিনের যাবতীয় খবর জানাতেন। আর ভৃত্য আমের ইবনে ফুহাইরা মক্কাবাসীদের পশুপালের সাথেই আবু বাকরের (রা) মেষপাল চরিয়ে বেড়াতো। কিন্তু সন্ধ্যা হলেই সেগুলোকে ‘সাওর’ পর্বতগুহার কাছে নিয়ে ছেড়ে দিতো, তখন তাঁরা উভয়ে মেষের দুধ দোহন করতেন অথবা জবাই করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে আবু বাক্র সকালে ‘সাওর’ পর্বত গুহা থেকে বেরিয়ে মক্কায় যেতেন তখন আমের ইবনে ফুহাইরা তার মেষপাল নিয়ে পিছু পিছু যেতেন যাতে তার পদচিহ্ন মুছে যায়। এভাবে তিনদিন অতিবাহিত হলে তাদের সম্পর্কে মক্কাবাসীদের হৈ চৈ ধীরে ধীরে থিতিয়ে আসলো। তখন আবদুল্লাহ ইবনে আরাকাত নিজে একটি উটে চড়ে রাসূলুল্লাহ ও আবু বাক্রের (রা) উট দুটিকে সাথে নিয়ে সাওর পর্বত গুহায় হাজির হলো। আসমা বিনতে আবু বাকর পথের খাবার নিয়ে তাদের কাছে আসলো। কিন্তু খাবার ঝুলিয়ে বেঁধে দেয়ার মত কোন রশি আনতে সে ভুলে গিয়েছিলো। উভয়ে রওনা হলেন। আসমা খাবার ঝুলানো চেষ্টা করলো, কিন্তু দেখলো কোন রশি নেই। অগত্যা সে নিজের কোমর বন্ধনী খুলে তা ফেড়ে রশি বনিয়ে খাবার বেঁধে ঝুলিয়ে দিলো। এই জন্য আসমা বিনতে আবু বাক্রকে ‘যাতুননিতাকাইন’ দুটি কোমর বন্ধনীর  অধিকারিণীর বলে অভিহিত করা হতো। [৪৪.ইবনে হিশাম বলেন, আমি একাধিক বিজ্ঞজনের কাছে শুনেছি যে, আমাকে যাতুননিতাকাইন অর্থাৎ ‘দুই কোমর বন্ধনীর অধিকারিণী বলা হতো। এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে, আসমা যখন খাবারের পাত্র বেঁধে ঝুলিয়ে দিতে চাইলো, তখন নিজের বেল্টটি দ্বিখ-িত করলো, একটি দিয়ে তা ঘুরিয়ে বাঁধলো, অপরটি দিয়ে ঝুলালো।]

আবু বাক্র উট দুটোকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এনে সবচেয়ে ভালো উটটি তাঁকে দিয়ে বললেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার পিতা মাতা আপনার জন্য কুরবার হোক। এতে আরোহণ করুন।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “যে উট আমার নয় তাতে আমি আরোহণ করবো না।” তিনি বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, এটি আপনার। আপনার উপর আমার পিতামাতা কুরবান হোক।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “না তবে কত দাম দিয়ে এটি কিনেছো বল।” আবু বাক্র উটের দাম বললেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আমি এই দামের বিনিময়ে উটটি নিলাম।” আবু বাক্র বললেন, “উট ও তার দাম উভয়ই আপনাকে দিয়ে দিলাম।”

অতঃপর উভয়ে উটের পিঠে সওয়ার হয়ে যাত্রা শুরু করলেন। আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর ভৃত্য আমের ইবনে ফুহাইরাকে পথিমধ্যে প্রয়োজনীয় সেবার জন্য পেছনে চড়িয়ে নিলেন।”

আসমা বিনতে আবু বাকর বলেন, আবু বাক্র (রা) ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রওনা হয়ে যাওয়ার পর আবু জাহল সহ কুরাইশদের একটি দল আসলো। তারা আবু বাক্রের (রা) দরজার সামনে দাঁড়ালো। আমি তাদের কাছে গেলাম। তারা বললো, “তোমার আব্বা কোথায়? ” আমি বললাম, ‘আব্বা কোথায় জানি না।” সঙ্গে সঙ্গে পাষ- নরাধম আবু জাহল আমার মুখে এমন জোরে থাপ্পর মারলো যে, আমার কানবালাটি ছিটকে পড়ে গেলো।

অতঃপর তারা চলে গেলো। ইতিমধ্যে তিনদিন কেটে গেলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন দিকে রওয়ানা হয়েছেন তার কোন হদিস পাওয়া গেলো না। হঠাৎ মক্কার নিম্নভূমি থেকে এক জিন গান গাইতে গাইতে আসলো। লোকেরা তাকে দেখতে পাচ্ছিলো না। কিন্তু তার আওয়াজ শুনে  তাকে অনুসরণ করতে  লাগলো। দেখতে দেখতে সে মক্কার উচ্চভূমি অতিক্রম করে চলে গেল। সে যে গানটি গাচ্ছিলো তা হলো:

[আরবী *************]

“মানুষের প্রভু আল্লাহ সেই দুই বন্ধুকে সর্বোত্তম পুরস্কার দিক-যারা উম্মে মা’বাদের বাড়ীতে [৪৫. উম্মে মা’বাদের প্রকৃত নাম আতিকা বিনতে খালিদ। সে বনু কা’ব গোত্রের এক মহিলা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ‘আবু বাক্র, আমের ইবনে ফুইহারা ও আবদুল্লাহ ইবনে আরকাত এই মহিলার বাড়ীতে যাত্রাবিরতি করেন। তাঁরা এই মহিলার কাছ থেকে কিছু গোশত ও খোরমা ক্রয়ের ইচ্ছা ব্যাক্ত করেন। কিন্তু সেখানে কোনটাই ছিলো না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে মা’বাদের ঘরের এক কোণে একটা ছাগল দেখতে পেলেন। ছাগলটি দুধ দিতো না। তিনি ঐ মহিলার নিকট ছাগলটির দোহন করার অনুমতি চাইলেন। অতঃপর তিনি হাত দেয়ে তার পালান ধরতেই তা দুধে ভরে উঠলো। এ দৃশ্য দেখে মহিলা তৎক্ষণাৎ ইসলাম গ্রহণ করলেন]

আশ্রয় গ্রহণ করেছে। তারা বদান্যতা সহকারে যাত্রাবিরতি করেছে, অতঃপর পুনরায় যাত্রা করেছে। যে ব্যক্তি মুহাম্মাদের বন্ধু হয়েছে, সে সফলকাম হয়েছে। বনু কা’বের যুবতীটির মুসলিমদের ব্যবস্থা তদারক করার জায়গায় উপস্থিত থাকা ও উপবিষ্ট থাকার জন্য সমগ্র বনু কা’বই অভিনন্দিত হোক।”

তার এ কথা শুনে আমরা বুঝতে পারলাম যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনা অভিমুখে যাত্রা করেছেন।”

সুরাকা ইবনে মালিক ইবনে জু’সাম বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার পথে মক্কা ত্যাগ করেন। কুরাইশরা তাঁকে পাকড়াও করে আনার বিনিময়ে একশো উষ্ট্রী পুরস্কার ঘোষণা করেন। একদিন আমি নিজ গোত্রের পরামর্শ সভায় বসে আছি আমাদেরই এক ব্যক্তি আমাদের কাছে এসে দাঁড়ালো। সে বললো, “আল্লাহর শপথ, আমি এই মাত্র তিনজনের  একটা দলকে যেতে দেখে আসলাম। আমার মনে হয়, তারা মুহাম্মাদ ও তার সঙ্গী সাথীরাই হবে।” আম তাকে চোখ টিপে চুপ করতে ইশারা করলাম। অতঃপর বললাম, “ওরা অমুক গোত্রের লোকজন। তাদের একটা পশু হারিয়ে গেছে, সেটাই খুঁজে বেড়াচ্ছে।” সে বললো, “হয়তো তাই।”

সে আর কোন কথা বললো না। সেখানে অল্প কিছুক্ষণ কাটিয়ে আমি বাড়ীতে গেলাম এবং ঘোড়া ও অস্ত্রশস্ত্র গুছিয়ে নিয়ে রওয়ানা হওয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগলাম। আমার ভাগ্য গণনার তীরটিও সাথে নিলাম। তারপর যুদ্ধের পোশাক পরে রওয়ানা হলাম। পথে বেরিয়ে এক জায়গায় গিয়ে তীর দিয়ে ভাগ্য গণনা করলাম। যা আমার একেবারেই অপছন্দ, তীর ঠিক সেই ভবিষ্যদ্বণীই করলো। অর্থাৎ ‘মুহাম্মাদের কোন ক্ষতি হবে না।’ আসলে আমার ইচ্ছা ছিলো তাকে পাকড়াও করে কুরাইশদের হাতে তুলে দিয়ে পুরস্কারের একশো উষ্ট্রী লাভ করা। তাদের পদচিহ্ন ধরে আমি দ্রুত ঘোড়া হাঁকিয়ে  এগিয়ে চললাম ঘোড়টি আমাকে নিয়ে যেইমাত্র প্রবল বেগে ছুটতে আরম্ভ করেছে, অমনি সেটি হোঁচট খেলো। আমি ঘোড়ার পিঠের ওপর থেকে ছিটকে রাস্তার ওপর এসে পড়লাম। আমি তখন মনে মনে বললাম,‘ব্যাপার কি!’ আবার ভাগ্য গননার তীর বের করে তা দিয়ে গণনা করলাম। এবারও একই ফল পাওয়া গেলো: ‘তার কোন ক্ষতি হবে না।’ অথচ এরূপ সিদ্ধান্ত আমার কাম্য ছিলো না। আমি তবুও নাছোড়বান্দা।

কিছুতেই থামতে রাজী নই। আবার পায়ের ছাপ অনুসরণ করে জোরে ঘোড়া হাঁকালাম। মুহাম্মাদ ও তাঁর সঙ্গীরা আমার দৃষ্টিসীমার মধ্যে এসে গেলো এবং তাদেরকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম। হঠাৎ সেই মুহূর্তে ঘোড়াটি আবার হোঁচট খেলো। আমি ছিটকে পড়লাম। মনে মনে বললাম ব্যাপার কি! আবার তীর বের করে গণনা করলাম। এবারও অবাঞ্ছিত সিদ্ধান্ত বেরুলো: ‘তাঁর কোন ক্ষতি হবে না।’ এবারও আমি দমলাম না। তাদেরকে অনুসরণ করে এগিয়ে চললাম। আবার তাদেরকে স্পষ্ট দেখতে পেলাম। দেখতে পাওয়া মাত্রই ঘোড়া আবার হোঁচট খেলে এবার ঘোড়ার সামনের পা দুটি মাটিতে দেবে গেলো এবং আমি ছিটকে পড়ে গেলাম। পা দু’খানা টেনে বের করার সঙ্গে সঙ্গে সেই জায়গা থেকে কু-লি পাকিয়ে ধোঁয়া বের হতে থাকলো। এবার আমি বুঝতে পারলাম যে, মুহাম্মাদকে আমার হাত থেকে রক্ষা করা হয়েছে এবং সে অজেয়। অতঃপর আমি তাদেরকে ডাক দিয়ে বললাম, “আমি জুসামের পুত্র সুরকা। তোমরা একটু থামো, তোমাদের সাথে আমার কথা আছে। আল্লাহর শপথ, তোমাদের ব্যাপারে আমার সংশয় দূর হয়ে গিয়েছে। আমার দিক থেকে কোন অবাঞ্ছিত ব্যাবহার তোমরা পাবে না।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বাকরকে বললেন, “তাকে জিজ্ঞেস করো সে আমাদের কাছে কি চায়?” আমি বললাম, “আমাকে একটা বাণী লিখে দাও। সেই লেখা তোমাদের ও আমার মধ্যে একটা প্রমাণস্বরূপ থাকবে।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকরকে কিছু লিখে দিতে বললেন।

আবু বাক্র (রা) একটা হাড়ের ওপর (অথবা কাপড়ের টুকরায়  অথবা ভাঙ্গা মৃৎ পাত্রের টুকরায়) একটা বাণী লিখে আমার দিকে ছুড়ে মারলেন। আমি সেই টুকরাটা কুড়িয়ে নিলাম এবং আমার তীরের খাপের মধ্যে পুরে নিয়ে ফিরে আসলাম। এই ঘটনার কথা অতঃপর আর কারো কাছে ব্যক্ত করলাম না। যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা জয় করলেন এবং হুনাইন ও তায়েফ অভিযান সম্পন্ন করলেন, তখন আমি ঐ লেখাটা নিয়ে তাঁর সাথে দেখা করতে গেলাম। মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী জো’রানায় তাঁর সাথে দেখা করতে গেলাম। আমি আনসারদের একটি সেনাদলের কাছে উপস্থিত হলাম। তারা বর্শা দিয়ে আমাকে মৃদু খোঁচা দিতে দিতে বললো, “ভাগো, ভাগো। কি চাও এখানে?” আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এগিয়ে গেলাম। তিনি তখন উটের ওপর সওয়ার ছিলেন। আমি যেন এই মুর্হূতেও দেখতে পাচ্ছি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চর্বির মত সচ্ছ ও শুভ্র পাদু খানি জিনের পাদানিতে রেখে বসে আছেন। আমি সেই লিখিত টুকরাটি উঁচু করে দেখিয়ে বললাম, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! এটি সেই বস্তু যাতে আপনি একটি বাণী লিখে দিয়েছিলেন। আমি জুসামের পুত্র সুরাকা। ” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আজ ওয়াদা পালন ও সৌজন্য প্রদর্শনের দিন। কাছে আস।” আমি তাঁর কাছে গেলাম এবং ইসলাম গ্রহণ করলাম। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করার মত একটি বিষয় মনে হলে তা জিজ্ঞেস করলাম। কিন্তু এখন তা মনে সেই। আমি বললাম, “হে আল্লাহর  রাসূল, আমি নিজের উটের জন্য পানি দিয়ে চৌবাচ্চা ভরে রাখি। কিন্তু অন্যদের পথহারা উটগুলো এসে তার ওপর চড়াও হয় এবং পানি পান করে ফেলে। এভাবে ঐ সব উটকে পানি পান করাই তা হলে আমার সওয়াব হবে কি? তিনি বললেন, “ যে কোন প্রাণীর চাহিদা পূরণ করলেই সওয়াব হয়।” এরপর আমি নিজ গোত্রের কাছে ফিরে গেলাম এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আমার সদকার প্রাণী পৌঁছিয়ে দিলাম।

ইবনে ইসহাক বলেন, পথপ্রদর্শক আবদুল্লাহ ইবনে আরকাত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বাক্র রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সাথে নিয়ে মক্কার নিম্নভূমি দিয়ে এগিয়ে চললো। অতঃপর উপকূলবর্তী এলাকায় গিয়ে উপনীত হলো। সেখান থেকে উসফান অঞ্চলের নিম্নভূমি দিয়ে অগ্রসর হয়ে কুদাইদ অতিক্রম করার পর খাররার নামক স্থানে গিয়ে উপনীত হলো। অতঃপর লেকফ্ ও মাদলাজা লেকফ্ অতিক্রম করে মাদলাজ মাহাজ নামক জায়গায় পৌঁছলো। সেখান থেকে মারজাহ মাহাজ, মারজাহ যিল গাদাওয়াইন তারপর বাতন যি কাশর ও জাদাজিদ হয়ে আজরাদ পৌঁছলো। তারপর মাদলাজা তিহিনের শত্রু এলাকা যা-সালাম অতিক্রম করে আবাবিদ ও তারপরে আল-ফাজ্জাহ অতিক্রম করলো।

ইবনে হিশাম বলেন, অতঃপর সে তাদেরকে নিয়ে আরজ নামক স্থাকে উপনীত হলো। তাখন সেখানকার অধিবাসীদের বেশ কিছু লোক সেখানে তাদের জন্য প্রতীক্ষায় ছিলো। আসলাম গোত্রের আওস ইবনে হাজার নামক স্থানে উপনীত হলো। তখন সেখানকার অধিবাসীদের বেশ কিছু লোক সেখানে তাদের জন্য প্রতীক্ষায় ছিলো। আসলাম গোত্রের আওস হাজার নামক এক ব্যক্তি ইবনুর রিদা নামক তার একটা উটে আরোহণ করিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদীনায় যাওয়ার ব্যবস্থা করলো। মাসউদ ইবনে হুনাইদা নামক তার এক ভৃত্যকেও সে তাঁর সাথে পাঠালো। এরপর পথপ্রদর্শক তাদের উভয়কে  নিয়ে আরজ ত্যাগ করলো। রুকুবার ডান দিক দিয়ে সানিয়াতুল আয়ের হয়ে বাতনু রীমে গিয়ে উপনীত হলো। সেখান থেকে সরাসরি কুবায় বনু আমর ইবনে আউফ গোত্রের বসতিতে গিয়ে হাজির হলো। তখন ছিলো রবিউল আউয়াল মাসের বার তারিখের প্রখর রৌদ্র ঝলসানো দুপুর। সূর্য তখন প্রায় মাথার ওপরে এসে গিয়েছে।

 

কুবায় উপস্থিতি

আবদুর রহমান ইবনে উয়াইমি ইবনে সায়েদা স্বগোত্রীয় বিপুল সংখ্যাক সাহাবীর এই বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন: আমরা যখন শুনতে পেলাম যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে রওয়ানা হয়েছেন এবং যে কোন দিন মদীনায় পৌঁছতে পারেন বলে আমরা মনে করছিলাম, তখন থেকে প্রতিদিন ফজরের নামাযের পর আমাদের এলাকার উন্মুক্ত প্রন্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতীক্ষা করতাম। সূর্যের উত্তাপ অসহনীয় না হওয়া পর্যন্ত আমরা সরতাম না। যখন আর কোন ছায়া থাকতো না তখন ফিরে যেতাম। তখন ছিলো প্রচ- গরমের মৌসুম। যে দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্যি সত্যি এসে পৌঁছলেন, প্রতিদিনের মত সেদিনও আমরা প্রান্তরে বসে অপেক্ষা করছিলাম। সূর্য মাথার ওপর আসার  কারণে যখন কোন ছায়া অবশিষ্ট থাকলো না তখন আমরা বাড়ীর ভেতরে প্রবেশ করলাম। আমরা বাড়ীর ভেতরে প্রবেশ করা মাত্রই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৌঁছলেন। একজন ইহুদী সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছিলো। আমরা কিভাবে তাঁর অপেক্ষায় থাকতাম তা সে দেখেছিলো। তাই সে উচ্চস্বরে চিৎকার করে বললো, “হে কায়লার বংশধরগণ, [৪৬. এ কথা দ্বারা সমগ্র আনসারদেরকে বুঝায়। কায়লা তাদের এক খ্যাতনামা পিতামহী ছিলেন।]

তোমাদের সৌভাগ্যের ধন এসে গিয়েছে।”

আমরা একটা খেজুর গাছের ছায়ায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাত করলাম। তাঁর প্রায় সমবয়সী আবু বাক্র (রা) তাঁর সঙ্গে ছিলেন। আমাদের অধিকাংশ লোকই তখন পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেনি। তাঁকে দেখার জন্য বিরাট জনতার ভিড় জমলো অথচ কে আবু বাক্র আর কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা কেউ বুঝতে পারছিলো না। যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীরের ওপর থেকে ছায়া সরে গেলো, তখন আবু বাক্র (রা) নিজের চাদর দিয়ে তাঁকে ছায়া দিতে লাগলেন। তখন আমরা সবাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিনতে পারলাম।

ইবনে ইসহাক বলেন, অনেকের মতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথম কুলসূম ইবনে হিদামের, আবার কারো মতে সা’দ ইবনে খাইসামার মেহমান হন। যারা বলেন, তিনি কুলসূম ইবনে হিদামের মেহমান হয়েছিলেন, তাঁরা বলেন যে, তিনি কুলসূমের বাড়ীতে  থাকলেও লোকজনকে সাক্ষাত দানের জন্য অকৃতদার সা’দ ইবনে খাইসামার বাড়ীতে গিয়ে বসতেন। মুহাজিরদের ভেতরে যারা অবিবাহিত তাঁরাও ঐ বাড়ীতেই থাকতেন। আবু বাক্র সিদ্দীক (রা) মেহমান হন হাবিব ইবনে ইসাফের, মতান্তরে খাবেজা ইবনে যায়িদের।

আলী ইবনে আবু তালিব (রা) মক্কায় তিন দিন অবস্থান করেন। এই সময়ের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গচ্ছিত আমানতসমূহ মালিকদের কাছে ফেরত দেয়ার কাজ সম্পন্ন করেন এবং তারপর হিজরাত করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে চলে যান। তিনিও কুলসূম ইবনে হিদামের মেহমান হন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুবাতে ইবনে আওফ গোত্রে সোম, মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার এই চার দিন অবস্থান করেন। এই সময় তিনি সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন।

মদীনায় উপস্থিতি

অতঃপর আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি শুক্রবার কুবা ত্যাগ করেন। বনু সালেম ইবনে আওফের বস্তিতে গিয়ে তিনি জুমার নামায পড়েন। বাতনুল ওয়াদীর মসজিদে তিনি জুমার নামায আদায় করেন। বাতনুল ওয়াদীর আর এক নাম ওয়াদীয়ে রানুনা। এখানেই তিনি মদীনায় প্রথম জুমার নামায আদায় করলেন।

ইতবান ইবনে মালিক ও আব্বাস ইবনে উবাদা ইবনে নাদলা সহ বনু সালেম ইবনে আওফের একদল লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললো, “হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের যা কিছু জনবল, সহায় সম্বল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে, তাতে খুশী হয়ে আমাদের এখানেই আপনি স্থায়ীভাবে বসবাস করুন।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের উষ্ট্রীকে দেখিয়ে বললেন, “একে তোমরা পথ ছেড়ে দাও। আল্লাহর তরফ থেকে এটির ওপর নির্দেশ রয়েছে আমাকে যথাস্থানে নিয়ে যাওয়ার।” সবাই তাই করলো। উষ্ট্রী নিজের ইচ্ছামত চলতে লাগলো। বনু বায়াদা গোত্রের বস্তির নিকট যখন  হাজির হলো, তখন যিয়াদ ইবনে লাবীদ ও ফারওয়া ইবনে আমরের নেতৃত্বে বনু বায়াদা গোত্রের একদল লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট হাজির হয়ে বললো, “হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের এখানে আসুন, আমাদের যে জনবল, সহায় সম্বল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে তাঁর মধ্যে এসে বসবাস করুন।” তিনি বললেন, “এই উষ্ট্রীকে তার ইচ্ছামত যেতে দাও। কেননা ওকে যথাস্থানে আমাকে পৌঁছে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ” উষ্ট্রীটি চলতে লাগলো। বনু সায়েদার বস্তিতে পৌঁছলে সা’দ ইবনে উবাদা ও মুনযির ইবনে আমরের নেতৃত্বে বনু সায়েদার একদল লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পথ আগলে দাঁড়ালো। তারাও বনু বায়াদা ও বনু সালেমের মত একই অনুরোধের পুনরাবৃত্তি করলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু বায়াদা ও বনু সালেমকে যে কথা বলেছিলেন বনু সায়েদাকেও তাই বললেন। উষ্ট্রী অগ্রসর হতে লাগলো। যখন সেটি খাযরাজ গোত্রের বনু হারেস পরিবারের বাড়ীর পাশ দিয়ে চলতে লাগলো, তখন সা’দ ইবনে রাবী, খবেজা ইবনে যায়িদ ও আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা বনু হারেস পরিবারের আরো কিছু লোককে সাথে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পথ আগলে দাঁড়ালো। তারা তাদের পরিবারে অবস্থান করা ও তাদের জনবল, সহায় সম্বল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ওপর আস্থা রাখার আমন্ত্রণ জানালো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তোমরা উষ্ট্রীকে যেতে দাও। কেননা এটি আমাকে উপযুক্ত  স্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য আদিষ্ট।”  সকলে পথ ছেড়ে দিলো এবং উষ্ট্রীটা সামনের দিকে এগিয়ে চললো। চলতে চলতে উষ্ট্রী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মামাদের পরিবার বনী আদী ইবনে নাজ্জারের বাড়ী অতিক্রম করলো। তখন বনী আদী ইবনে নাজ্জারের কতিপয় লোককে সাথে নিয়ে সালীত ইবনে কায়েস ও আবু সালীত উসাইরা ইবনে আবি খাবিজা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে এসে দাঁড়ালো। তারা বললো, “ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনারা আমাদের কাছে আসুন এবং আমাদের যা কিছু জনবল, সহায় সম্বল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে, তার ওপর আস্থা রাখুন।” তিনি বললেন, “উষ্ট্রীকে তার খেয়াল খুশীমত যেতে দাও। কারণ ওকে উপযুক্ত স্থানে আমাকে পৌঁছিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” এখানে উল্লেখ থাকে যে, বনী আদী ইবনে নাজ্জারেরই মেয়ে ছিলেন আবদুল মুত্তালিবের মা সালামা বিনতে আমর।

বনু মালিক ইবনে নাজ্জারের বাসস্থানের কাছে এসে উষ্ট্রী হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। সে যেখানে বসলো সেখানেই পরবর্তীকালে সমজিদে নববীর প্রবেশদ্বার তৈরী হয়। তৎকালে ঐ জায়গাটা ছিলো বনু নাজ্জারের দুটো ইয়াতীম শিশুর খেজুর শুকাবার জায়গা। শিশু দুটো হলো আমরের ছেলে সাহল ও সুহাইল। তাদের লালন পালন করতো মায়য ইবনে আকরা। উষ্ট্রী হাঁটু গেড়ে বসলেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পিঠ থেকে নামলেন না। স্থির হয়ে বসে রইলেন। কিছুক্ষন পর উষ্ট্রীটি সামান্য কিছুদূর এগিয়ে গেলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখনও তার লাগাম শক্ত করে ধরে রাখলেন। অতঃপর উষ্ট্রী পিছনের দিকে ফিরে তাকালো এবং পুনরায় তাঁর প্রথম বিরতি স্থানে ফিরে এলা। সেখানে এসে হাঁটু গেড়ে বসলো। এবারে সে নড়াচড়া ও শব্দ করলো। তার বুক ও গলার নিম্নাংশ মাটিতে ঠেকিয়ে  দিলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উষ্ট্রীর পিঠ থেকে নামলেন। আবু আইয়ুব খালিদ ইবনে যায়িদ তাঁর  আসবাবপত্র নামিয়ে নিলো এবং নিজের ঘরে নিয়ে রাখলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু আইয়ুবের মেহমান হলেন। তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “খেজুর শুকাবার জায়গাটা কার?” মায়ায ইবনে আকরা বললো, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, ওটা আমরের ছেলে সাহল ও সুহাইলের। ওরা আমার পালিত ইয়াতীম। আমি তাদেরকে সম্মত করিয়ে নেবো। আপনি এখানে মসজিদ তৈরী করুন। ” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ স্থানে  মসজিদ নির্মাণে আদিষ্ট হলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মসজিদ ও ঘরবাড়ী তৈরী হওয়া পর্যন্ত আবু আইয়ুবের বাড়ী অবস্থান করলেন। এই মসজিদ নির্মাণের কাজে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই যোগদান করেন, যাতে মুসলমানরাও অংশগ্রহণ করার প্রেরণা পায়। ফলে মুহাজির ও আনসারগণ সকলেই ঐ কাজে পূর্ণ আগ্রহের সাথে অংশ নেন। এ সম্পর্কে জনৈক মুসলমান স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেন,

“আমরা যদি বসে থাকি আর নবী কাজ করেন, তা হবে আমাদের চরম ভ্রষ্টতার পরিচায়ক। ” মসজিদ নির্মানের সময় মাঝে মাঝেই মুসলমানরা উদ্দীপনার সাথে কবিতা বলতেন। যেমন: “আখিরাতের জীবন ছাড়া আর কোন জীবনের গুরুত্ব নেই। হে আল্লাহ, আপনি আনসার ও মুহাজিরদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন। ” আর তাদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন,“আখিরাতের জীবন ছাড়া আর কোন জীবনের গুরুত্ব নেই। হে আল্লাহ, আপনি আনসার ও মুহাজিরদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন।”

মসজিদ ও থাকার ঘর নির্মিত হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু আইয়ুবের বাড়ী থেকে নিজের ঘরে গিয়ে বাস করতে লাগলেন।

আবু আইয়ুব বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আমার বাড়ীতে মেহমান হলেন, তখন তিনি নিচের তলায় থাকতে লাগলেন আর আমি ও আমার স্ত্রী উপরে। আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল, আমি উপরের তলায় থাকি আর আপনি নীচের তলায় থাকেন তা আমার কাছে নিতান্ত অপছন্দনীয় ও গর্হিত কাজ। অতএব আপনি ওপরে থাকুন। আর আমরা নেমে এসে নীচে থাকি।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন, “আমাদের নীচে থাকাটা আমাদের জন্য এবং যারা আমাদের সাথে দেখা সাক্ষাত করতে আসে তাদের জন্য অধিকতর সুবিদাজনক।”

এ জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নীচের তলায় এবং আমরা ওপরের তলায় বাস করতে লাগলাম। একবার আমাদের একটা পানি ভর্তি কলসী ভেঙ্গে গেলো। আমাদের একটি মাত্র কম্বল ছিলো আর কোন লেপ বা শীতবস্ত্র ছিলোনা। অগত্যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গায়ে তা থেকে পানি পড়বে এবং তাতে তিনি কষ্ট পাবেন এই আশংকায় আমি ও আমার স্ত্রী ঐ কম্বলটা দিয়েই পানি মুছে ফেললাম।

আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রাতের জন্য খাবার তৈরী করে পাঠাতাম। তিনি ঐ খাবারের উদ্বৃত্তটুকু ফেরত পাঠালে আমি ও আমর স্ত্রী বরকতের আশায় তাঁর হাত লাগানো জায়গা থেকেই খেয়ে নিতাম। একদিন রাত্রে এইভাবে তাঁর জন্য খাবার পাঠালাম। সেই খাবারে আমরা কিছু পিঁয়াজ বা রসুনও দিলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা ফেরত পাঠালেন। আমরা ঐ খাবারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাত স্পর্শ করার কোন চিহ্ন দেখতে পেলাম না। ফলে আমি ঘাবড়ে গিয়ে তাঁর কাছে গেলাম। বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল, আপনার জন্য আমার বাপ-মা কুরবান হোক। আপনি খাবার ফেরত পাঠালেন অথচ তাতে আপনার হাতের স্পর্শের কোন চিহ্নই দেখলাম না। আপনি যখনই খাবার ফেরত  দিতেন, আমি ও আমার স্ত্রী বরকত লাভের জন্য সেই খাবার আপনার হাত লাগানোর জায়গা থেকে খেতাম।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আমি খাবারের মধ্যে অমুক গাছের গন্ধ পেয়েছি। যেহেতু আমাকে অনেকের মুখের কাছে মুখ নিয়ে আলাপ করতে হয়, তাই আমি খাইনি। অবশ্য তোমরা ওটা খেতে পার।” এরপর আমরা ঐ খাবার খেয়ে নিলাম। অতঃপর আর কখনো আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য পিঁয়াজ বা রসুন পাঠাইনি ইবনে ইসহাক বলেন এরপর মুহাজিররা হিজরাত করে একের পর এক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট চলে আসতে লাগলেন। একমাত্র যারা বন্দী ছিলেন অথবা কঠোর নির্যাতনে ইসলাম ত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন, তাঁরাই মক্কায় থেকে  গেলেন। মুষ্টিমেয় কয়েকটি পরিবার ছাড়া আর সব কয়টি পরিবারেরই অবস্থা এরূপ ছিলো যে, তারা তাদের পরিবারের সব লোক এবং ধন সম্পদ মদীনায় নিয়ে আসতে পারেনি। যে কয়টি পরিবার তাদের সকল সদস্যসহ হিজরাত করতে সক্ষম হয়েছিলো তারা হলো,বনু জুমাহ গোত্রের বনু মাযউন পরিবার, বনু উমাইয়ার মিত্র বনু জাহাশ ইবনে রিয়াব এবং বনু সা’দ ইবনে লাইসের বনু বুকাইর পরিবার যারা বনু কা’বের মিত্র ছিলো। হিজরাতের পর এদের ঘরবাড়ী একেবারেই জনশূন্য ও অর্গলবদ্ধ ছিল।

মদীনাতে ভাষণ দান ও চুক্তি সম্পাদন

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রবিউল আউয়াল মাসে মদীনায় পৌঁছেন এবং পরবর্তী বছর সফর মাস পর্যন্ত মদীনাতেই অবস্থান করেন। এই সময়ের মধ্যে তাঁর জন্য মসজিদ ও ঘর তৈরী করা হয়। উপরন্তু মদীনার আনসারদের এই গোত্রটির (বনু মালিক ইবনে নাজ্জার) ইসলাম গ্রহণের ফলে ইসলাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। একমাত্র খতমা, ওয়াকেদ, ওয়ায়েক ও উমাইয়া এই চারটি পরিবার ছাড়াও আওস গোত্রের একটি গোষ্ঠী পৌত্তলিকতা আঁকড়ে থাকে।

আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমান আমর কাছে বর্ণনা করেছেন যে, মদীনায় রাসূলুল্লাহ (সা) প্রথম যে ভাষণ দেন তাতে প্রথমে জনতার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি আল্লাহর যথাযোগ্য প্রশংসা করেন। তারপর নিম্নবর্ণিত কথাগুলো বলেন:

“হে জনম-লী, তোমরা আখিরাতের জন্য পুণ্য সঞ্চয় কর। জেনে রেখো, তোমাদের মধ্য থেকে কেউ হয়তো সহসাই মারা যাবে, তার মেষপাল দেখার লোকও থাকবে না। অতঃপর তার রব জিজ্ঞেস করবেন। কোন দোভাষীও সেখানে থাকবে না। তিনি বললেন,‘তোমার কাছে কি আমার রাসূল আসেনি? আমি কি তোমাকে ধন সম্পদ অনুগ্রহ বিতরণ করিনি? তা থেকে তুমি কতটুকু আখিরাতের জন্য পাঠিয়েছো?’ তখন সে ডানে বামে তাকাবে। কিন্তু কিছুই দেখতে পাবে না। সামনের দিকে তাকাবে। সেখানে জাহান্নাম ছাড়া কিছুই দেখতে পাবে না। যে ব্যক্তি নিজেকে  দোযখ থেকে রক্ষা করতে পারে, তার নিজেকে রক্ষা করতে যত্নবান হওয়া উচিত তা যদি একটা খোরমার অংশ দিয়েও হয়। যার এটুকু ক্ষমতা সেই তারও উচিত অন্তত ভালো কথা বলে নিজেকে  দোযখ থেকে রক্ষা করা। কেননা প্রতিটি ভালো কাজের পুরস্কার দশগুণ থেকে সাতশো গুণ পর্যন্ত দেয়া হয়। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।”

আরেকবার তিনি নিম্নরূপ ভাষণ দেন,

“সকল প্রশংসা। আমি তাঁর প্রশংসা করি ও তাঁর কাছেই সাহায্য চাই। আমরা তাঁর কাছে প্রবৃত্তির কুপ্ররোচনা ও খারাপ কাজ থেকে আশ্রয় চাই। আল্লাহ যাকে হিদায়াত দান করেন তাকে কেউ বিপথগামী করতে পারে না। আর আল্লাহ যার জন্য গুমরাহীর অনুমোদন দান করেন তাকে কেউ সুপথগামী করতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তিনি একক ও লা শরীক। বস্তুত: আল্লাহর কিতাব হলো সর্বোত্তম কথা। যে ব্যক্তির অন্তরে তিনি কুরআনকে আকর্ষণীয় করেছেন এবং যাকে কুফরীতে নিমজ্জিত থাকার পর ইসলাম গ্রহণের সুযোগ দিয়েছেন এবং যে মানুষের কথা বাদ দিয়ে কুরআনকে গ্রহণ করেছে সে সফলকাম। কেননা কুরআনের চেয়ে সুন্দর ও অলংকারম-িত কথা আর নেই। আল্লাহ যা পছন্দ করেন তোমরা তাই পছন্দ কর। আল্লাহকে সমগ্র মন দিয়ে ভালবাস। আল্লাহর বাণী চর্চা ও তাঁর স্মরণে গাফিল হয়ো না এবং মনকে কঠিন হতে দিও না। কেননা আল্লাহ তাঁর প্রত্যেক সৃষ্টি থেকেই কিছু সংখ্যককে বাছাই করেন। তার আমল থেকেও কিছু আমলকে মনোনীত বলে স্থির করেছেন। তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকেও কিছু সংখ্যাক বান্দাকে মনোনীত করেছেন। তিনি উত্তম কথা পছন্দ করেন। মানুষকে কিছু দেয়া হয়েছে তার মধ্যে হালাল ও হারাম দুই-ই আছে। অতএব আল্লাহর ইবাদাত কর এবং তাঁর সাথে কোন কিছু শরীক করো না। তাঁকে যথার্থভাবে ভয় কর। তোমরা যে সব কথা মুখে বলে থাক তার ভেতরে যে কথা উত্তম তাকে কার্যে পরিণত করার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সম্যবাদী হও, আল্লাহর অনুগ্রহ দ্বারা পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা  গড়ে তোল। আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার লংঘিত হলে তিনি ক্রুদ্ধ হন। তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।”

অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে একটি ঘোঘনাপত্র সম্পাদন করেন। এই দলীলের মাধ্যমে তিনি ইহুদীদের সাথে শাস্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রতিশ্রুতি প্রদান ও গ্রহণ করেন, তাদের ধর্মপালনের স্বাধীনতা ও ধন সম্পদে তাদের মালিকানার স্বীকৃতি দেন এবং তদের সাথে কিছু শর্ত প্রদান ও গ্রহণ করেন। সে ঘোষণাপত্র নিম্নরূপ:

“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, কুরাইশ ও ইয়াসরিবের মু’মিন মুসলমানগণ এবং পরবর্তীকালে যারা তাদের অনুসারী হয়ে তাদের সাথে শরীক হবে ও একসাথে জিহাদে অংশগ্রহণ করবে, তাদের পক্ষ থেকে এ একটি ঘোষণাপত্র। সমগ্র মানব জাতির মধ্যে তারা একটি স্বতস্ত্র উম্মাহ। কুরাইশদের মধ্য থেকে আগত মুহাজিররা তাদের ইসাম গ্রহণকালীন অবস্থার ওপর বহাল থকবে, তাদের পরস্পরের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দানের নীতি অক্ষুণœ থাকবে, তাদের পরস্পরের মধ্যে সাবেকী ক্ষতিপূরণ দানের নীতি অটুট থাকবে, প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মু’মিনদের মধ্যে মুক্তিপণ নিয়ে বন্দীকে মুক্তি দেয়ার বিধান চালু থাকবে। বনু সায়েদাও তাদের ইসলাম গ্রহণকালীন অবস্থার ওপর বহাল থাকবে। তাদের প্রত্যেক গোষ্ঠীর মুমিনদের মধ্যে বন্দীকে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেয়া চলবে। বনু হারেস তাদের ইসলাম গ্রহণকালীন অবস্থার ওপর বহাল থাকবে। তাদের পরস্পরের মধ্যে সবেকী ক্ষতিপূরণ দানের নীতি অক্ষুণœ থাকবে। তাদের প্রত্যেক গোষ্ঠীর মু’মিনদের মধ্যে বন্দীকে মুক্তপণের ভিত্তিতে মুক্তি দেয়ার রীতি অব্যাহত থাকবে। আর বনু জুশামও ইসলাম গ্রহণকালীন অবস্থার ওপর বহাল থাকবে। তাদের সাবেকী ক্ষতিপূরণ দানের রীতি চালু থাকবে। তাদের প্রত্যেক গোষ্ঠীর মু’মিনদের মধ্যে ন্যায়সঙ্গতভাবে মুক্তিপণের ভিত্তিতে বন্দী মুক্তির নীতি অক্ষুণœ থাকবে। বনু নাজ্জারও ইসলাম গ্রহণকালীন অবস্থার ওপর বহাল থাকবে। তাদের প্রত্যেক গোষ্ঠীর মু’মিনদের  মধ্যে ন্যায়সঙ্গতভাবে মুক্তিপণ নিয়ে বন্দী মুক্তির নীতি অব্যাহত থাকবে। বনু আমর ইবনে আওফ ইসলাম গ্রহণকালীন অবস্থার ওপর বহাল থাকবে। তাদের সাবেকী ক্ষতিপূরণ দানের রীতি অব্যাহত থাকবে। তাদের প্রত্যেক গোষ্ঠীর মু’মিনদের মধ্যে ন্যায়সঙ্গতভাবে মুক্তিপণের ভিত্তিতে বন্দীকে মুক্তি দেয়া চলবে। বনু নাবীত ইসলাম গ্রহণকালীন অবস্থার ওপর বহাল থাকবে। তাদের সাবেকী ক্ষতিপূরণ দানের রীতি চালু থাকবে। তাদের প্রত্যেক গোষ্ঠীর মু’মিনদের  মধ্যে ন্যায়সঙ্গতভাবে মুক্তিপণ নিয়ে বন্দী মুক্তির নীতি অব্যাহত থাকবে। বনু আওস ইসলাম গ্রহনকালীন অবস্থার ওপর বহাল থাকবে। তাদের প্রত্যেক গোষ্ঠীর মু’মিনদের মধ্যে ন্যায়সঙ্গতভাবে মুক্তিপণের ভিত্তিতে বন্দীকে মুক্তি দেয়া চলবে। মু’মিনগণ তাদের মধ্যকার ঋণগ্রন্ত ও অধিক সন্তানধারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ ও মুক্তিপণদানে সঙ্গতভাবে আর্থিক সাহায্য করবে। কোন মু’মিন অন্য মু’মিনের মিত্রের বিরোধিতা করবে না। খোদাভীরু মু’মিনগণ তাদের মধ্যকার বিদ্রোহী, ঘোরতর নির্যাতক, অপরাধী, মুসলিম সমাজের স্বার্থের ক্ষতিকারক ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারকের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যাবস্থা নেবে এবং এ ধরনের অপরাধীর বিরুদ্ধে সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে পদক্ষেপ নেবে, চাই সে তাদের কারো ছেলেই হোক না কেন। কোন কাফিরের স্বার্থে এক মু’মিন অন্য মু’মিনকে হত্যা করবে না এবং কোন কাফিরকে কোন মুমিনের বিরুদ্ধে সাহায্য করবে না। মুসলিম রাষ্ট্রে অনুগত অমুসলিমের অধিকার সমানভাবে নিরাপদ। একজন নগণ্যতাম অমুসলিমকেও মুসলমানরা পূর্ণ নিরাপত্তাসহ আশ্রয় দেবে। মু’মিনরা পরস্পরের মিত্র হয়ে থাকবে, তবে অন্যদের বেলায় এ কথা প্রযোজ্য নয়। আর ইহুদীদের  মধ্য হতে যে ব্যক্তি আমাদের আনুগত্য ও অনুসরণ করবে, সে আমদের সমান অধিকার ও সাহায্য লাভ করবে। এ ধরনের লোকদের ওপর কোন যুলুম চলতে  দেয়া হবে না এবং তাদের ওপর কাউকে হামলা চালাতে সাহায্য করা হবে না। মু’মিনদের রক্ষাকবচ সবার ক্ষেত্রে এক ও অভিন্ন। ইসলামের স্বার্থে কোন যুদ্ধ সংঘটিত হলে সেই যুদ্ধে মুসলমান কোন অমুসলমানের সাথে সমতা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে ছাড়া আপোষরফা করবে না। আমাদের মধ্য হতে প্রতিটা যোদ্ধাদল অন্য যোদ্ধাদলকে অনুসরণ করবে। মুমিনদের একজন অন্যজনকে হত্যা করতে পারবে শুধুমাত্র হত্যার বিনিময়ে এবং আল্লাহর বিধান অনুসারে। খোদাভীরু মু’মিনগণ সর্বশ্রেষ্ঠ ও দৃঢ়তম আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত। মদীনার কোন মুশরিক কুরাইশ সম্প্রদায়ের কারো জানমালেরর্ কষক বা জিম্মাদার হতে পারবে না, আর কোন মু’মিনের ক্ষতি সাধনে তাকে প্রশ্রয় দেবে না। যে ব্যক্তি কোন মু’মিনকে মৃত্যুদ- অপরাধ না করা সত্ত্বেও হত্যা করবে এবং তা যথাযথভাবে প্রমাণিত হবে, তাকে প্রাণদন্ডে দন্ডিত করা হবে। অবশ্য নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীকে অন্য কোন উপায়ে খুশী করে থাকলে প্রাণদ- হবে না। তবে সর্বাবস্থায় মুমিনরা সকলে ঐ মুসলিম হন্তার বিরুদ্ধে থাকবে এবং তার পক্ষপাতিত্ব করা কোন মুমিনের জন্য হালাল হবে না। এই ঘোষণাপত্রকে মেনে নিয়েছে এবং আল্লাহ ও আখিরাতে অটুট বিশ্বাস রাখে এমন কোন মু’মিনের জন্য ইসলামী বিধানে উদ্ভট জিনিস সংযোজনকারীর সাহায্য করা বা আশ্রয় দেয়া বৈধ নয়। যে ব্যক্তি এ ধরনের লোককে সাহায্য করবে কিংবা আশ্রয় দেবে তার ওপর আল্লাহর লা’নত এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহর গজব নামবে। তার পক্ষে কোন সুপারিশ বা পণ গ্রহণ করা হবে না। আর তোমরা যখনই কোন বিষয়ে মতবিরেধে লিপ্ত হবে, তখন সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শরণাপন্ন হবে।

মু’মিনরা যতদিন যুদ্ধরত থাকবে ততদিন ইহুদীরা তাদের যুদ্ধের রসদ যোগানোতে অংশ নেবে। বনু আওফের ইহুদিরা মু’মিনদের সাথে একই উম্মাতভুক্ত বলে গণ্য হবে, তারা নিজে এবং তাদের মিত্ররাও। কিন্তু মুসলমানরা ও ইহুদীরা সে অবস্থায় নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে। তবে যে ব্যক্তি যুলুম অত্যাচার ও অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত হবে সে কেবল নিজের পরিবার পরিজনের ধ্বংসই ডেকে আনবে। বনু নাজ্জারভ্কুত ইহুদীদের  অধিকার বনু আওফের ইহুদীদের সমান। অনুরূপভাবে বনু হারেস, বনু সায়েদা, বনু জুশাম, বনু আওস, বনু সা’লাবা ও বনু শতাইবার ইহুদীদের অধিকার বনু আওফের ইহুদীদের সমান। তবে যুলুম অত্যাচার ও পাপাচারে লিপ্ত ব্যাক্তি নিজের ও নিজের পরিবার পরিজনের কেবল ধ্বংসই সাধন করবে। সা’লাবার যাবতীয় বাহ্যিক ব্যাপার তাদের ভেতরকার ব্যাপারের সমপর্যায়ে তাদের প্রাণের মতই সম্মানার্হ। আনুগত্য ও প্রতিশ্রুতিপরায়ণতা যেন সাবাইকে পাপাচার থেকে রক্ষা করে। সা’লাবার মিত্রদের অধিকার তাদের নিজেদেরই সমান। ইহুদেিদর আভ্যন্তরীণ ব্যাপার তাদের প্রাণের মতই সম্মানার্হ। তাদের ভেতর থেকে কেউ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুমতি ছাড়া মদীনার বাইনে যেতে পারবে না। প্রত্যেকের জেনে রাখা উচিত যে, কোন প্রকারের তর্ক বা জেরা দ্বারা আগুন থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না। যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করলো সে নিজের ও নিজের পরিবার পরিজনের ধ্বংসের বিনিময়েই হত্যা করলো। অবশ্য নিহত ব্যক্তি অপরাধী হলে আলাদা কথা। আল্লাহ তায়ালা এ ক্ষেত্রে অধিকতর মহানুভবতা পছন্দ করেন। ইহুদীদের ব্যয়ভার তারা নিজেরাই বহন করবে এবং মুসলামানদের ব্যয়ভারও তারা নিজেরাই বহন করবে। এই ঘোষণাপত্রকে যারা মেনে নিয়েছে তদের কর্তব্য, কোন শরীক যুদ্ধরত থাকলে তাকে সর্বতোভাবে সাহায্য করা এবং পরস্পরের মধ্যে হিতকামনা, সদুপদেশ ও মহানুভবতার সম্পর্ক থাকবে, কোন পাপা কাজে একজন আর একজনের সাথে শরীক  হবে না। নিজের মিত্রের ক্ষতি সাধন এক ভয়ংকর নজিরহীন অপরাধ। মাযলুমকে সাহায্য করা সকলের কর্তব্য। মু’মিনরা যতদিন যুদ্ধরত থাকবে ততদিন ইহুদীরা তাদেরকে আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে যাবে। [৪৭. অর্থাৎ আল্লাহ ও মুমিনগণের তাদের সহযোগিতা নিতে আপত্তি নেই।] এই ঘোষণাপত্রের শরীকদের জন্য ইয়াসরিবের অভ্যন্তরে ভাগ সম্পূর্ণ নিরাপদ। প্রতিবেশী যদি অপরাধী না হয় এবং ক্ষতিকর কাজে লিপ্ত না থেকে থাকে তা হলে তার জান, মাল ও ইজ্জত নিজের জান, মাল ও ইজ্জতের মতই পূর্ণ নিরাপত্তার অধিকারী। কারো বাড়ীর ভেতরে বাড়ীর মালিকের অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করা যাবে না। এই ঘোষণাপত্র গ্রহণকারীদের মধ্যে যে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা কিংবা ঝগড়া কলহ ঘটুক না কেন, তার ফায়সালার জন্য আল্লাহ ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরণাপন্ন হতে হবে। আল্লাহ সর্বাধিক সতর্কতা ও সততার সাথে এই ঘোষণাপত্রের বাস্তবায়ন দেখতে আগ্রহী।[৪৮. উল্লেখযোগ্য যে, এই ঘোষণাপত্র যখন গ্রহণ করা হয় তখন জিজিয়া আরোপ করা হয়নি এবং মুসলমানগণ দুর্বল ছিল। সে সময় ইহুদীরা মুসলমানদের পক্ষে যুদ্ধ করলে যুদ্ধলব্ধ সম্পদে ইহুদীদের অংশ থাকতো। এই ঘোষণাপত্রে তাদের জন্য যুদ্ধের ব্যয়ভার বহনে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক ছিল।] জেনে রাখা দরকার যে, কুরাইশ ও তাদের সহযোগীদের আশ্রয় দেয়া চলবে না। ঘেষনাপত্র গ্রহণকারীগণ মদীন আক্রমণকারীকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করবে। আর যখন সন্ধি ও মৈত্রী স্থাপনের আহ্বান জানানো হবে তখন তারা আহ্বানকারীর সাথে সন্ধি ও মৈত্রী স্থাপন করবে। এ ধরনের কোন সন্ধি ও মৈত্রীর দিকে তাদেরকে যখন আহ্বান জানানো হবে তখন তা মেনে চলা মু’মিনদের জন্যও বাধ্যতামূলক হবে। তবে যে বা যারা ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণকরবে তখন তারা তাদের প্রাপ্য অংশ সেই পক্ষের নিকট থেকে নেবে যে পক্ষ তাদেরকে বাহিনীতে ভর্তি করেছিল। আওসে ইহুদীদের ও তাদের  মিত্রদের অধিকার ও দায়দায়িত্ব এই ঘোষণাপত্র গ্রহণকারীদের অধিকার ও দায়দায়িত্বের মতই এবং ঘোষণাপত্র সম্পাদনকারীদের কাছ থেকে তারা পূর্ণ ন্যায়সঙ্গতভাবে তা লাভ করতে পাবে। কেউ সততার পথ অবলম্বন করলে তার পূর্বতন পাপাচার ক্ষমার চোখে দেখতে হবে। কেউ খারাপ কাজ করলে তা তার নিজেরই ক্ষতি সাধন করবে। আল্লাহ এই ঘোষণাপত্রের আনুগত্রের ব্যাপারে সর্বধিক সততা ও সত্যবাদিতা দেখতে চান। এই ঘোষণাপত্র কোন অত্যাচারী বা অপরাধীর জন্য রক্ষকবচ নয়। যুলুম কিংবা অপরাধে লিপ্ত না হলে য্দ্ধু থেকে বেরিয়ে যাওয়া কিংবা নিস্ক্রিয় বসে থাকা লোকও মদীনার চৌহদ্দির ভেতরে নিরাপত্তা লাভ করবে। যে ব্যক্তি সততা ও খোদাভীতির পথে অবিচল থাকবে, আল্লাহ ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার আশ্রয়দাতা ও সহায়ক থাকবেন।”

আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে ভ্রাতৃ সম্পর্ক স্থাপন

ইবনে ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাজির ও আসসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন করেন। তিনি যা বলেননি, তা তার ওপর আরোপ করা থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। আমি জানতে পেরেছি যে, তিনি প্রতি দুইজনের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন করেছিলেন। এরপর তিনি আলী ইবনে আবু তালিবের হাত ধরে বললেন, “এ হলো আমার ভাই।” এভাবে নবীদের সরদার, মুত্তাকীদের নেতা, বিশ্বজাহানের প্রতিপালকের রাসূল, বিশ্বজাহানে যাঁর কোন জুড়ি নেই- তিনি আর আবু তালিব তনয় আলী (রা) নতুন করে ভ্রাত্র বন্ধনে আব্দধ হলেন। আর আল্লাহ ও রাসূলের সিংহ এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব ও  যায়িদ ইবনে হারেসার ভ্রাতৃ সম্পর্ক স্থাপিত হলো। উহুদ যুদ্ধে যাওয়ার প্রক্কালে হামযা অছিয়ত করে গিয়েছিলেন যে, তাঁর মৃত্যু হলে যায়িদ ইবনে হারেসা তাঁর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবেন। আবু তালিবের পুত্র জাফর তাইয়ার ও বনু সালামা বংশোদ্ভূত মুয়ায ইবনে জাবাল পরস্পর ভ্রাতৃ বন্ধনে আবদ্ধ হন। উমার ইবনুল খাত্তাব ও ইতবান ইবনে মালিক পরস্পর ভাই হন। আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ ও সা’দ ইবনে মুয়ায, আবদুর রহমান ইবনে আওফ ও সা’দ ইবনে রাবী, যুবাইর ইবনুল আওয়াম ও সালামা ইবনে সুলামা, উসমান ইবনে আফফান ও আওস ইবনে সাবিত, তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ ও কা’ব ইবনে মালিক, সাঈদ ইবনে যায়িদ ও উবাই ইবনে কা’ব, মুসআব ইবনে উমাইর ও আবু আউয়ূব ভালিদ, আবু হুযাফা ইবনে উতবা ইবনে কা’ব, মাসআব ইবনে উমাইর ও আবু আইয়ূব খালিদ, আবু হুযাইফা ইবনে উতবা ও ‘উব্বাদ ইবনে বিশর, আম্মার ইবনে ইয়াসার ও হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান এবং আবু যার গিফারী ও মুনযির ইবনে আমর পরস্পর ভ্রাতৃ সম্পর্ক স্থাপন করেন। এছাড়াও হাতিব ইবনে আবু বালতাআ ও উয়াইম ইবনে সায়েদা, সালমান ফারসী ও আবুদ্ দারদা এবং আবু বাক্রের (রা) আযাদকৃত দাস বিরার ও আবু রুয়াইহার মধ্যে ভ্রাতৃ বন্ধন স্থাপিত হয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর যে সব সাহাবীদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন করেন তাদের মধ্যে উল্লিখিত সাহাবীদের নামই আমি জানতে পেরেছি।

আযানের সূচনা

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় তাঁর  মুহাজির ভাইদের সবাইকে কাছে পেয়ে এবং আনসারদের ঐক্যবদ্ধ সমর্থন ও সহযোগিতা লাভ করে যখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন তখন ইসলাম একটি সুসংহত শক্তিতে  পরিণত হলো। সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত নামায কায়েমের ব্যবস্থা হলো, যাকাত ও রোযা ফরয হলো এবং অপরাধ দমনের আইন চালু হলো। হালাল হারামের বিধানও কার্যকর হলো। এভাবে ইসলাম তাদের মধ্যে পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করলো। আনসারদের এই গোত্রটিই ঈমান গ্রহণের পর এখানে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আসার পর মুসলমানগণ নামাযের সময় হলেই তাঁর কাছে আপনা থেকেই জমায়েত হতো, ডাকতে হতো না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মনস্থ করলেন, ইহুদীরা যেমন শিঙ্গা বাজিয়ে নামাযের জন্য লোক জমায়েত করে থাকে তিনিও তেমনি শিঙ্গা বাজানোর ব্যাবস্থা করবেন। কিন্তু পরক্ষণেই ব্যাপারটা তাঁর মনঃপূত না হওয়ায় বাদ দিলেন। এরপর ঘণ্টা বাজিয়ে মুসলমানদেরকে নামাযে ডাকায় বিষয়টি চিন্তা করলেন।

এইসব চিন্তাভাবনা চলাকালেই আবদুল্লাহ ইবনে যায়িদ কিভাবে মানুষকে ডেকে জমায়েত করতে হয় তা স্বপ্নে দেখলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আজ রাতে আমি স্বপ্নে দেখলাম, অচেনা একজন লোক সবুজ কাপড় পড়ে এবং একটা ঘণ্টা হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। লোকটা আমার কাছ দিয়ে চলে যাওয়ার সময় আমি তাকে বললাম, ‘ওহে আল্লাহর বান্দা, তুমি কি এই ঘন্টাটা বিক্রি করবে?’ সে বললো, ‘ঘণ্টা দিয়ে তুমি কি করবে?’ আমি বললাম, ‘নামাযের জন্য লোকজনকে ডাকবো।’ সে বললো, ‘তোমাকে এর চেয়ে ভালো জিনিস শিখিয়ে দেবো?’ আমি বললাম, ‘কি জিনিস, বলতো।’ সে বললো, ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ, আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ, হাইয়া আলাস সালাহ, হাইয়া আলাস সালাহ, হাইয়া আলাল ফালাহ, হাইয়া আলাল ফালাহ, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু।” রাসূলুল্লাহকে স্বপ্নের বৃত্তান্ত জানানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি বললেন, “ইনশাআল্লাহ এই স্বপ্ন সত্য। তুমি বিলালকে নিয়ে এক জায়গায় দাঁড়াও। তাকে কথাগুলো শিখিয়ে দাও। সে আযান দিক। কেননা ওর আওয়াজ তোমার আওয়াজের চেয়ে বড়।” বিলাল আযান দিলেন। উমার ঘরে বসে তা শুনলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি চাদর টানতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ, আল্লাহর কসম, আবদুল্লাহ ইবনে যায়িদ যে স্বপ্ন দেখেছে, আমিও সেই রকম দেখেছি। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আলহামদু লিল্লাহ’ বলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন।”

কতিপয় সাহাবীর রোগাক্রান্ত হওয়ার বিবরণ

আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন,

মদীনায় জ্বরের প্রাদুর্ভাব ছিল সর্বাদিক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের অনেকেই রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে এ থেকে ম্ক্তু রেখেছিলেন। আবু বাক্র ও তাঁর দুই ভৃত্য বিলাল ও ‘আমের ইবনে ফুহাইরা একই ঘরে বাস করতেন। তাঁরা সবাই জ্বরে আক্রান্ত হলেন। আমি তাঁদেরকে দেখতে গেলাম। তখনো পর্দার বিধান নাযিল হয়নি। আক্রান্তদের রোগযন্ত্রণা ছিল অবর্ণনীয়। আমি প্রথমে আবু বাকরের (রা) কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আব্বা, আপনার কেমন লাগছে?” তিনি একটা কবিতা আবৃত্তি করে জবাব দিলেন,

“প্রত্যেক মানুষ তার আপনজনের কাছে অবস্থান করে। অথচ মৃত্যু তার অতি নিকটেই।”

আমি বুঝতে পারলাম এবং মনে মনে বললাম, “আব্বা নিশ্চয়ই প্রলাপ বকছেন। ’

অতঃপর আমের ইবনে ফুহাইরার কছে গিয়ে বললাম, “আমের, আপনার শরীর কেমন?”

তিনিও কবিতা আবৃত্তি করে জবাব দিলেন, “মৃত্যুর সাদ উপভোগ করার আগেই মৃত্যু লাভ করেছি,

কাপুরুষের মৃত্যু তার মাথার ওপরেই থাকে,

প্রত্যেকটি লোক তার সর্বশক্তি দিয়ে জিহাদ করে, ষাঁড় যেমন শিং দিয়ে নিজের চামড়া বাঁচায়।”

আমি বুঝতে পারলাম, ‘আমের সংজ্ঞা হারিয়ে প্রলাপ বকছেন।

বিলালের জ্বরের প্রকোপ যখন বৃদ্ধি পেতো তিনি বাড়ীর উঠানে গিয়ে শুয়ে পড়তেন।

তারপর উচ্চস্বরে কবিতা আবৃত্তি করে বলতেন,

“আহা! আমি কি একটি রাত ইযখের ও গোলাপের সাহচর্যে ফাখখে কাটাতে পারবো?

আর একটি দিনও কি আমি মাজান্নার [৪৯. ফাখ্খ: মক্কায় বাইরের একটি জায়গার নাম। উযখের : এক ধরনের সুগন্ধী উদ্ভিদের নাম। মাজান্না: মক্কার নিম্নাঞ্চলে অবস্থিত একটি বাজার।] জলাশয়ে নামবার সুযোগ পাবো? আর শামা ও তাফীল পর্বত দুটোকে কি আর একবারও দেখতে পাবো?[৫০. শামা ও তাফীর মক্কার দুটো পাহাড়ের নাম।]

তাঁদের কাছে যা শুনলাম তা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গিয়ে জানালাম। আমি বললাম, “জ্বরের প্রচ-তায় তাঁরা সবাই প্রলাপ বকছেন। যা বলছেন তা তাঁরা নিজেরাই বুঝেন না।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “হে আল্লাহ, আপনি মদীনাকে আমাদের কাছে মক্কার মত বা তার চেয়েও বেশী প্রিয় করে দিন। এখানে যেসব ফসল ফলে তাতে আমাদের জন্য বরকত দিন। এখান থেকে যাবতীয় রোগব্যাধি দূর করে মাহইয়ায়াতে [৫১. মাহইয়ায়া সিরিয়ার হাজীদের ইহরাম বাঁধার জায়াগা জুহফার অপর নাম।] নিয়ে যান।”

 

হিজরাতের তারিখ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় পৌঁছেন তখন সময় ছিল রৌদ্রতপ্ত দুপুরের প্রাক্কাল। তারিখ ছিল ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স হয়েছিল ৫৩ বছর। এটা নবুওয়াতের ১৩ বছর পরের ঘটনা। অতঃপর রবিউল আউয়াল মাসের বাকী দিনগুলো এবং রবিউস সানী, জামাদিউল আউয়াল, জামাদিউস সানী, রযন, শা’বান, রমাদান, শাওয়াল, যিলকাদ, যিলহাজ্ব ও মুহররমার মাস মদীনাতেই অবস্থান করেন। [অর্থাৎ হিজরত করে মদীনায় যাওয়ার পরে এই সময়ে মদীনার বাইরে কোথাও যাননি: - সম্পাদক]

প্রথম যুদ্ধাভিযান

মদীনা আগমনের ঠিক ১২ মাস পর সফর মাসে তিনি ওয়াদ্দান তথা আবওরা অভিযানে বের হন। কুরাইশ ও বনু দামরা ইবনে বাক্রের সন্ধানে তিনি ওয়াদ্দান পৌঁছেন। সেখানে বনু দামরা তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে। অতঃপর তিনি কোন রকম ষড়যন্ত্রের সম্মুখীন না হয়েই নিরাপদে মদীনায় ফিরে আসেন। সফর মাসের অবশিষ্ট দিনগুলো ও রবিউল আউয়াল মাসের প্রথমাংশ সেখাইেন অতিবাহিত করেন।

উবাইদা ইবনে হারিসের নেতৃত্বে অভিযান

রাসূলুল্লাহ (সা) নিজে এই যুদ্ধের ঝান্ডা বেঁধেছিলেন

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনা অবস্থানের এই সময়েই তিনি উবাইদা ইবনে হারিসকে ৬০ অথবা  ৮০ জন লোকের একটি অশ্বারোহী বাহিনীসহ পাঠালেন। তাঁরা সবাই ছিলেন মুহাজির। আসারদের কেউই তাঁদের সাথে ছিলেন না। দলটি সানিয়াতুল মুররায় নিম্নভূমিতে একটি জলাশয়ের কাছে পৌঁছিলে কুরাইশদের বিরাট একটি  দলের সম্মুখীন হলো। কিন্তু কোন য্দ্ধু হলো না। কেবল সা’দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস  একটি তীর নিক্ষেপ করেন। এটাই ছিল ইসলামী বাহিনীর প্রথম তীর নিক্ষেপ। অতঃপর দলটি ফিরে এলো। মুসলমানরা ছিলো তখন বেশ উদ্দীপ্ত।

সমুদ্র উপকূলের দিকে হামযার নেতৃত্বে অভিযান

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই সময় হামযার (রা) নেতৃত্বে ৩০ জন ঘোরসওয়ার মুহাজিরের একটি দলকে ঈসের দিক দিয়ে সমুদ্রোপকূলের দিকে পাঠিয়ে দিলেন। এ অভিযানেও কোন আনসারকে পাঠালেন না। এবার মুসলিম বাহিনী আবু জাহলেন নেতৃত্বাধীন মক্কার ৩০০ অশ্বারোহীর একটি বাহিনীর মুখোমুখি হলো। মাজদী আবনে আমর জুহানীর প্রচেষ্টায় তখনও কোন সংঘর্ষ ঘটলো না। তিনি উভয় পক্ষকে দূরে সরিয়ে দিলেন। ফলে উভয় বাহিনী পরস্পর থেকে বিচ্ছন্ন হয়ে ফিরে গেল। এবারও কোন যুদ্ধ সংঘটিত হলো ন।

বুয়াত অভিযান

রবিউল আউয়াল মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে বেরিয়ে বুয়াত নামক স্থানে পৌঁছলেন। এখানে গেলেন রিদ্ওয়ার দিক দিয়ে। কোন যুদ্ধ ছাড়াই তিনি মদীনায় ফিরে এলেন। সেখানে  তিনি রবিউস সানীর অবশিষ্ট দিনগুলো এবং জমাদিউল উলার প্রথম ভাগ অতিবাহিত করলেন। [৫২. এই অভিযানে যাওয়ার সময় সায়েব ইবনে উসমান ইবনে মাযউনকে (রা) মদীনায় দেখাশুনার দায়িত্ব দেয়া হয়। বুয়াত : ইয়াম্বুর নিকটবর্তী জুহাইনা গোত্রের এলাকার একটি পর্বতের নাম। ]

উশাইরা অভিযান

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুনরায় কুরইশদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করলেন।[ ৫৩. এই সময় আবু সালামা ইবনে আবুদর আসাদকে (রা) মদীনা রক্ষার দায়িত্ব দেয়া হয়।]বনু দীনারের গিরিবর্ত দিয়ে অতঃপর হাবারের মরুভূমির মধ্য দিয়ে বাহিনী নিয়ে ইবনে আযহার উপত্যাকায় পৌঁছে একটি গাছের ছায়ায় যাত্রাবিরতি করলেন। সেখানে নামায পড়লেন। এজন্য সেখানে একটি মসজিদ রয়েছে। সেখানে তাঁর জন্য খাবার তৈরী করা হলে তিনি সবাইকে সাথে নিয়ে খাওয়া দাওয়া করলেন। ঐ স্থানে ডেকচি রাখার রাখার জায়াগা এখনো সুস্পষ্ট। তাঁকে সেখানকার ‘মুশতারাব’ নামক ঝর্ণা থেকে পানি পান করানো হলো। অতঃপর তিনি খালায়েক নামক স্থানকে বাম দিকে রেখে যাত্রা শুরু করলেন এবং আবদুল্লাহ গিরিপথ অতিক্রম করলেন। অতঃপর বাম দিকে ঘুরে ইয়ালইয়াল নামক সমভূমিতে পৌঁছে ইয়ালইয়াল ও দাবুয়ার সংযোগস্থলে যাত্রাবিরতি করলেন এবং সেখানকার একটি কুয়া থেকে পানি পান করলেন। অতঃপর ফারশ মিলালের সমভূমির মধ্য দিয়ে চললেন। অবশেষে ইয়ামামের ছোট ছোট পার্বত্য অঞ্চলের পথ পেলেন। অতঃপর সেই পথ ধরে ইয়াম্বুর সমভূমি দিয়ে উশাইরাতে গিয়ে যাত্রাবিরতি করলেন। এখনে জামাদিউল উলা এবং জামাদিউস সানীর কয়েকটা দিন অবস্থান করলেন। এখানে বনু মাদলাজ এবং তার বনু দামরা গোত্রীয় মিত্রদেরকে বশ্যতা স্বীকারে উদ্বুদ্ধ করলেন। অতঃপর নিরাপদে মদীনায় ফিরে এলেন।

সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের নেতৃত্বে সামরিক অভিযান

অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সা’দ ইবনে আবী ওয়াক্কাসের নেতৃত্বে একটি বাহিনী পাঠান। ৮ জন মুহাজিরের এই বাহিনী হিজাযের খাযযার নামক স্থানে গিয়ে উপনীত হলো। অতঃপর নিরাপদে মদীনায় ফিরলো।

সাফওয়ান অভিযান: প্রথম বদর অভিযান

উশাইরা অভিযান থেকে ফেরার দশ দিনের কম সময়ের মধ্যে একদিন কুরয ইবনে জাবের ফেহরী মদীনার আশপাশে ছেড়ে দেয়া উট ও অন্যান্য গৃহপালিত পশু লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যে হামলা চালিয়ে বসলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৎক্ষনাৎ তার পিছু ধাওয়া করলেন। [৫৪. এই যুদ্ধে যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়িদ ইবনে হারিসাকে মদীনার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিযুক্ত করেন।] তিনি বদর প্রন্তরের একপাশে সাফওয়ান সামক একটি উপত্যকায় পৌঁছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরয ইবনে জাবেরের নাগার পেলেন না। এ ঘটনাকে প্রথম বদর অভিযান বলা হয়। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় ফিরে এলেন এবং জামাদিউস সানী মাসের বাকী দিনগুলো এবং রযব ও শা’বান মাস মদীনাতেই কাটালেন।

আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের নেতৃত্বে সামরিক অভিযান

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রযব মাসে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের নেতৃত্বে প্রথম বদর অভিযান থেকে প্রত্যাগত মুহাজিরদের ৮ জনের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনী পাঠালেন। তাদের মধ্যে কোন আনসারকে অন্তর্ভুক্ত করলেন না। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশকে একটি পত্র দিয়ে বললেন যে, দুইদিন পথ চলার পর এই পত্রখানা খুলে পড়বে, তার আগে নয়। চিঠি পড়ার পর তাতে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, সে অনুসারে কাজ করবে এবং সঙ্গীদের কারো উপর কোন কিছু জোর করে চাপিয়ে দেবে না।

দুইদিন ধরে পথ চলার পর আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ চিঠি খুলে পড়লেন। তাতে লেখা ছিল, “আমার এই চিঠি যখন তুমি পড়বে, তখুনি রওনা হয়ে মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী নাখলা নামক স্থানে গিয়ে যাত্রাবিরতি করবে। সেখানে কুরাইশদের জন্য ওত পেতে থাকবে এবং কোন তথ্য পেলে আমাকে জানাবে।”

আবুদল্লাহ ইবনে জাহাশ চিঠিখানা পড়েই বললেন,“আমি মেনে নিলাম ও অনুগত রইলাম। ” অতঃপর সঙ্গীদেরকে বললেন, “ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে নাখলায় গিয়ে কুরাইশদের জন্য ওৎ পেতে থাকতে বলেছেন এবং কোন খবর জানলে তা তাঁকে জানতে বলেছেন। আর এ ব্যাপারে তোমাদের কারো ওপর বাধ্যতামূলক কোন দায়িত্ব চাপাতে নিষেধ করেছেন। তোমাদের মধ্যে কেউ যদি শাহাদাত লাভে ইচ্ছুক থাকে তবে সে যেন যায়। আর যে তা চায় না, সে যেন ফিরে যায়। তবে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ পালন করবো।” একথা বলার পর আবদুল্লাহ ইবন জাহাশের সঙ্গে সবাই রওয়ানা হয়ে গেল। কেউই ফিরে গেল না। তিনি হিজাযে প্রবেশ করলেন। বাহরান নামক স্থানে সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস ও উতবা ইবনে গায ওয়ান তাদের উট হারিয়ে ফেললেন। তাঁরা দু’জন ঐ উটকে অনুসরন করে চলছিলেন। ফলে ঐ উট খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে তাঁরা আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ থেকে পিছিয়ে পড়লেন। আর আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ ও তাঁর সঙ্গীগণ যাত্রা অব্যাহত রাখলেন। চলতে চলতে তাঁরা নাখলাতে পৌঁছে যাত্রাবিরতি করলেন। এই সময় তাঁদের নিকট দিয়ে কুরাইশদের একটি কাফিলা কিসমিস চামড়া বহন করে নিয়ে যাচ্ছিল। আর সেই সাথে কুরাইশদের অন্যান্য পণ্যদ্রব্যও ছিল। এই দলের মধ্যে আমর ইবনে হাদরামী, উসমান ইবনে আবদুল্লাহ ও তার ভাই নওফেল ইবনে আবদুল্লাহ এবং হাকাম ইবনে কাইসান ছিল। আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের দল তাদেরকে দেখে ঘাবড়ে গেলো কেননা তারা তাদের খুব নিকটে পৌঁছে গিয়েছিলো। উক্কাশা ইবনে মুহসান ওদের কাছে চলে গেলেন। তাঁর মাথা মু-ানো ছিল। তাঁকে দেখে কুরাইশরা আশ্বস্ত হলো। বললো, “এরা স্থানীয় বাসিন্দা। এদের দিক থেকে কোন ভয় নেই।” ওদিকে মুসলমানগণ কুরাইশদের ব্যাপারে পরামর্শে বসলেন। ঐদিন ছির রযব মাসের শেষ দিন। সকলে মত প্রকাশ করলেন যে, আজকে কুরাইশদের এই কাফিলাকে ছেড়ে দিরে এরপরই তারা হারাম শরীফের এলাকায় প্রবেশ করবে এবং আমাদের হাত থেকে নিরাপত্তা লাভ করবে। পক্ষান্তরে আজ যদি তাদেরকে হত্যা করা হয় তাহলে নিষিদ্ধ মাসের মধ্যে রক্তপাত ঘটানোর দোষে দোষী হতে হবে। তাই তারা দ্বিাধাদ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে গেলেন এবং কুরাইশ কাফিলার বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে  সংকোচ বোধ করতে লাগলেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেললেন এবং দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়ে একমত হলেন যে, যাকে যাবে পারা যায় হত্যা করতে হবে এবং তাদের যার কাছে যা আছে তা নিয়ে নিতে হবে। ওয়াকিদ ইবনে আবদুল্লাহ তামিমী আমর ইবনে হাদরামীকে বর্শার আঘাতে হত্যা করলেন। আর উসমান ইবনে আবদুল্লাহ ও হাকাম ইবনে কাইসানকে বন্দী করলেন। নওফেল ইবনে আবদুল্লাহ পালিয়ে আত্মরক্ষা করলো। তাকে কিছুতেই ধরা সম্ভব হলো না। অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ কাফিলার অবশিষ্ট লোক ও বন্দী দুজনকে নিয়ে মদীনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপস্থিত হলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আমি তো তোমাদেরকে নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ করতে বলিনি। ” অতঃপর তিনি কাফিলা ও বন্দীদেরকে আটকে রাখলেন এবং তাদের সম্পদ গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ উক্তিতে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ সবার সামনে খাটো ও লা জওয়াব হয়ে গেলেন। তাঁর দলের লোকেরা ভাবলেন তদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। মুসলমানরা এ কাজের জন্য তাদেরকে তিরস্কার করলেন। ওদিকে কুরাইশরা বলতে লাগলো, “মুহাম্মাদ ও তার সহচররা নিষিদ্ধ মাসের পবিত্রতা লংঘন করেছে। তারা নিষিদ্ধ মাসে রক্তপাত ঘটিয়েছে, অন্যের সম্পদ হস্তগত করেছে এবং লোকজনকে বন্দী করেছে।” মক্কাতে যে কয়জন মুসলমান তখনো ছিলেন তাদের একজন জবাব দিলেন, “মুসলমানরা যা করেছে, শা’বান মাসে করেছে। [একথা বলার পেছনে যুক্তি ছিলো যে, রজব মাসের শেষ তারিখের সূর্যাস্তের পর শা’বান মাস শুরু হয়েছিলো।-সম্পাদক]

এই প্রচারনা অভিযান যখন ব্যাপক আকার ধারণ করলো তখন আল্লাহ তা’য়ালা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি এই আয়াত নাযিল করলেন:

[আরবী *************]

“তারা তোমাকে নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। তুমি বল: এ মাসে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া অন্যায়। তবে আল্লাহর কাছে তার চেয়েও বড় অন্যায় হলো

আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে রাখা,কুফরী করা, মসজিদে হারামে যেতে বাধা দেয় এবং মসজিদে হারামের অধিবাসীদেরকে সেখান থেকে বহিষ্কার করা। বস্তুতঃনির্যাতনের মাধ্যমে মানুষকে বিপথগামী করা হত্যার চেয়েও বড় অপরাধ। তারা অবিরতভাবে তোমাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত, যাতে করে সাধ্যে কুলালে তোমাদেরকে ধর্মান্তরিত করতে পারে।” (আল বাকারাহ)

অর্থাৎ তোমরা যদি হারাম মাসে হর্তাকা- করেও থাক, তবে তারা তো আল্লাহর পথে চলতে তোমাদেরকে বাধা দিয়েছে, সেইসাথে কুফরীও করেছে এবং মসজিদে হারামে তোমাদেরকে যেতে দেয়নি। আর তোমরা মসজিদুল হারামের অধিবাসী হওয়া সত্ত্বেও তোমাদেরকে সেখান থেকে বিতাড়িত করা আল্লাহর কাছে তোমাদের একজন কাফিরকে হত্যা করার চাইতে মারাত্মক অপরাধ। আর তারা যে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে তাদেরকে ধর্মত্যাগে বাধ্য করতো এবং কুফরী ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনতো, সেটা হত্যার চেয়েও জঘন্য কাজ। আর এই জঘন্যতম অন্যায় কাজ তারা তোমাদের সাথে অবিরতভাবেই করে চলেছে এবং তা থেকে ফিরছে না বা তাওবাহ করছে না।

কুরআনে যখন এই পথনির্দেশ এলো এবং আল্লাহ মুসলমানদের ভীতি ও দুশ্চিন্তা দূর করে দিলেন তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আটক কাফিলা ও বন্দীদেরকে সরকারীভাবে গ্রহণ করলেন। কুরাইশরা তাঁর কাছে উসমান ও হাকামকে পণ্যের বিনিময়ে মুক্তি দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে বার্তা পাঠালো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জবাবে  এদেরকে জানালেন, “আমাদের দুইজন লোক সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস ও উতবা ইবনে গাযওয়ান ফিরে না আসা পর্যন্ত বন্দীদের মুক্তি দেবো না। কেননা তোমাদের দ্বারা ওদের জীবন বিপন্ন হবার আশংকা রয়েছে।”অচিরেই সা’দ ও উতবা ফিরে এলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে পণ্যের বিনিময়ে মুক্তি দিলেন। তবে বন্দীদ্বয়ের মধ্যে হাকাম ইবনে কাইসান ইসলাম গ্রহণ করেন ও সাচ্চা মুসলিমে পরিণত হন। অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছেই থেকে যান। পরে বীরে মাউনার ঘটনায় তিনি শহীদ হন। উসমান ইবনে আবদুল্লাহ মক্কা চলে যায় এবং কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে।

কিবলা পরিবর্তন

বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদীনা আগমনের আঠার মাস পর শাবান মাসে কিবলা পরিবর্তন হয়।

বদরের যুদ্ধ

এরপর একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে পারলেন যে, আবু সুফিয়ান ইবনে হারবের নেতৃত্বে কুরাইশদের একটি বিরাট কাফিলা সিরিয়ার দিক থেকে এগিয়ে আসছে। সে কাফিলায় কুরাইশদের বহু সম্পদ এবং বাণিজ্যিক সম্ভার রয়েছে। কাফিলায় মাখরামা ইবনে নওফেল ও আমর ইবনুল ‘আসসহ কুরাইশ বংশোদ্ভূত ৩০ অথবা ৪০ জন লোক রয়েছে। তিনি মুসলমানদেরকে তাদের দিকে পাঠিয়ে দিলেন। বললেন, “এটা কুরাইশদের কাফিলা। এতে প্রচুর ধন-সম্পদ রয়েছে। তোমরা ওদিকে যাও। হয়তো আল্লাহ ঐসব সম্পদ তোমাদের হস্তগত করে দেবেন।” মুসলমানরা কাফিলাকে ধরার জন্য যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কেউবা ত্বরিৎ প্রস্তুত হয়ে গেলেন। কেউবা একটু শৈথিল্য দেখালেন এবং দেরী করলেন। কারণ তারা ধারণা করতে পারেননি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধের সম্মুখীন হয়েছেন।

হিজাযের কাছাকাছি এসে আবু সুফিয়ান ব্যাপারটা আঁচ করতে পারলো। পথচারী যার সাথেই দেখা হলো, তাকে সে জিজ্ঞাসা করতে লাগলো। কেননা সে মুসলমানদের প্রস্তুতি সম্পর্কে ভীতসন্ত্রন্ত ছিল। শেষ পর্যন্ত কোন কোন পথচারী তাকে স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিল যে, মুহাম্মাদ তাঁর সহচরদেরকে তোমার ও তোমার কাফিলার ওপর আক্রমণ চালাতে চলেছে। সুতরাং আবু সুফিয়ান সাবধান হয়ে সম্মুখে অগ্রসর হতে লাগলো। সে দামদাম ইবনে আমর গিফারীকে তৎক্ষণাৎ মজুরীর বিনিময়ে মক্কা পাঠিয়ে দিল। তাকে বলে দিল, সে যেন কুরাইশদের কাছে গিয়ে তাদের ধন সম্পদ নিরাপদে নিয়ে আসার জন্য কিছু অস্ত্রসজ্জিত লোক পাঠাতে অনুরোধ করে এবং মুহাম্মাদ যে তার দলবলসহ তাদেরকে আক্রমণ করতে উদ্যত তা তাদেরকে জানায়। দামদাম খুব দ্রুত মক্কার দিকে রওয়ানা হয়ে গেল।

দামদাম মক্কা পৌঁছার তিন দিন আগে আবদুল মুত্তালিব তনয়া আতিকা ভয়ংকর স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি তাঁর ভাই আব্বাসকে ব্যাপারটা জানালেন। বললেন, “ভাই, আজ খারাপ স্বপ্ন দেখেছি। আমার ভয় হচ্ছে যে, তোমার সম্প্রদায়ের ওপর কোন বিপদ মুসিবত এসে পড়বে। কাজেই আমি তোমাকে যা বলছি কাউকে বলো না।”

আব্বাস বললেন, “তুমি স্বপ্নে কী দেখেছো?”

আতিকা বললেন, “দেখলাম, একজন সওয়ার মক্কার পার্শ্ববর্তী সমতল ভুমিতে এসে নামলো। অতঃপর উচ্চস্বরে চিৎকার করে বললো, ‘হে কুরাইশগণ, তিন দিনের মধ্যে মৃত্যুর জন্য তৈরী হয়ে যাও, হুঁশিয়ার!” অতঃপর তার উট তাকে নিয়ে আবু কুবাইস পর্বত শিখরে আরোহণ করলো। অতঃপর আবার চিৎকার করে একই কথা ঘোষণা করলো। তারপর সেখান থেকে বড় একটা পাথর গড়িয়ে দিল। পাথরটা গড়িয়ে গড়িয়ে পাহাড়ের পাদদেশে পড়তেই টুকরো টুকরো হয়ে গেল এবং তার কোন না কোন টুকরো মক্কার প্রত্যেক বাড়ীতে গিয়ে পড়লো।”

আব্বাস বললেন, “এটা গুরুতর স্বপ্ন। তুমি কাউকে এটা বলো না। সম্পূর্ণ গোপন রেখো।”

এরপর আব্বাস বাইরে বেরুতেই তার বন্ধু ওয়ালীদ ইবনে রারিয়ার সাথে তার দেখা হলো। তিনি তাকে স্বপ্ন বৃত্তান্ত জানালেন এবং তাকে সাবধান করে দিলেন যেন কাউকে না বলে। ওয়ালীদ ব্যাপারটা তার পিতা উতবাকে জানালো। এভাবে কথাটা সমগ্র মক্কায় রটে গেল। কুরাইশরা সকল মহফিল ও বৈঠকে এ নিয়ে আলাপ করতে লাগলো।

আব্বাস বলেন, আমি পরদিন কা’বা শরীফ তাওয়াফ করতে গেলাম। আবু জাহ্ল সেখানে কুরাইশ একদল লোকের সাথে আতিকার স্বপ্ন নিয়ে আলাপ করছিলো। আবু জাহ্ল আমাকে দেখেই বললো, “আব্বাস, তাওয়াফ শেষ করে এ দিকে এসো।” তাওয়াফ শেষে আমি তাদের কাছে  গিয়ে বসলাম। আবু জাহ্ল আমাকে বললো, “হে আবদুল মুত্তালিবের পুত্র, এই মহিলা- নবী কবে তোমাদেরকে এসব কথা বলেছে?”

আমি বললাম, “কিসের কথা?”

আবু জাহ্ল, “আতিকার দেখা সেই স্বপ্নের কথা।”

আমি বললাম, “সে কী স্বপ্ন দেখেছে?”

আবু জাহ্ল, “হে আবদুল মুত্তালিবের পুত্র, তোমাদের পুরুষরা নবুওয়াতী করতে করতে অবশেষে তোমাদের মহিলারাও দেখছি নবুওয়াতী শুরু করে দিল। আতিকা নাকি স্বপ্নে দেখেছে, কে বলেছে, ‘তিন দিনের মধ্যে তৈরী হয়ে যাও।’ আমরা তোমাদের জন্য তিন দিন অপেক্ষা করবো। যদি কথা সত্য হয় তাহলে তো যা হবার হবে। আর যদি তিন দিন অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পরও কিছু না ঘটে তাহলে আমরা  তোমাদের সম্পর্কে লিখিত ঘোষণা জারী করে দেব যে, আরবে তোমাদের মত মিথ্যাবাদী পরিবার আর নেই।”

আব্বাস বলেন, আবু জাহলের উক্তিতে আমি তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখালাম না। শুধু অস্বীকার করেই ক্ষান্ত হলাম। বললাম: আতিকা কোন স্বপ্ন দেখেনি। অতঃপর যার যার কাজে চলে গেলাম। বিকালে আবদুল মুত্তালিব পরিবারের প্রত্যেক মহিলা এক এক করে আমার কাছে এসে বললো, “এই পাটিষ্ঠ খবিসটাকে তোমরা কেন এত সহ্য করছো? সে এতদিন আমাদের পুরুষদের যা ইচ্ছে  বলেছে। এখন সে আমাদের নারীদেরকেও যা ইচ্ছে বলতে শুরু করেছে। তুমি এসব শুনছো, অথচ তোমার কোন সম্ভ্রমবোধ জাগছে না।” আমি বললাম, “আল্লাহর কসম আমি ভীষণ বিব্রতবোধ করছি। আমি বিশেষ কোন প্রতিক্রিয়া দেখাইনি। তবে ওকে আমি দেখে নেব। আর একবার বলুক, তখন তোমাদের হয়ে যা করা দরকার, তা আমি করবোই।”

আতিকার স্বপ্নের তৃতীয় দিন পর আমি সেখানে গেলাম। আমি তখন রাগে ও ক্ষোভে ফুঁসছি। ভাবছিলাম, বেটার সাথে যে আচরণ করা দরকার ছিল, ত করতে পারিনি। আবার যদি সুযোগ পাই, তবে যা করতে পারিনি তা এবার করে দেখাবো। আমি মসজিদে প্রবেশ করে সেখানে তাকে দেখতে পেলাম। আমি তার দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম আর অপেক্ষা করতে লাগলাম যে, সেদিন যেসব কথা বলেছে, তার কিছু অংশের পুনরাবৃত্তি করলেই ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বো। আবু জাহল ছিল হালকা পাতলা গড়নের, কিন্তু তার চাহনি ছির তীক্ষè, ভাষা ছিল তীব্র ধারালো। সহসা সে দ্রুত মসজিদের দরজায় দিকে এগিয়ে এলো। আমি মনে মনে বললাম, আল্লাহর অভিশাপ হোক ওর ওপর! ওর কী হয়েছে? ওর সমগ্র সত্তা এমন ভীতসন্ত্রস্ত কেন? তবে কি আমার ভর্ৎসনার ভয়ে? সহসা বুঝতে পারলাম, সে দামদাম ইবনে আমর গিফারীর হাঁকডাক শুনেছে যা আমি তখনো শুনিনি। দামদাম মক্কার মরুভূমিতে এসে তার উটের ওপর বসেই চিৎকার করে বলছে, “হে কুরাইশগণ, মহাবিপদ! মহাবিপদ! তোমাদের ধন সম্পদ আবু সুফিয়ানের কাছে। মুহাম্মাদ তার সহচরদেরকে ঔ সম্পদের পেছনে লেলিয়ে দিয়েছে। মনে হয় তোমরা তো আর রক্ষা করতে পারবে না। সাহায্য করতে অগ্রসর হও! সাহায্য করতে অগ্রসর হও!” গিফারী চিৎকার করে এ কথা বলার আগেই উটের নাক কেটে, হাওদা উল্টিয়ে দিয়ে এবং নিজের জামা ছিঁড়ে একটা তেলেসমাতি কা- করে ফেলেছে।

এই ভয়াবহ ঘটনার কারণে আমরা কেউ কারো প্রতি মনোযোগী হতে পারলাম না। লোকজন অতি দ্রুত প্রস্তুত হয়ে গেলো। তারা বলতে লাগলো, “মুহাম্মাদ ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা কি মনে করেছে যে, আমরা ইবনুল হাদরামীর কাফিলার মত অসহায়? [৫৫. অর্থাৎ আমর ইবনুল হাদরামী, যাকে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের বাহিনী হত্যা করে। ]কক্ষনো না, এবার তারা অবশ্যই অন্য রকম অভিজ্ঞতা লাভ করবে। সেদিন তারা মাত্র দুইজনের মুকাবিলায় এমন ধৃষ্টতা দেখাতে পেরেছে। তাও এমন ধরনের লোক যে, হয় যুদ্ধের ময়দান থেকে বেরিয়ে যেতে চায়, নতুবা নিজের জায়গায় অন্যকে পাঠাতে চায়। আর আজ গোটা কুরাইশ গোত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছে। কুরাইশদের কোন গণ্য মান্য লোক আজ বাদ পড়েনি। কেবলমাত্র আবু লাহাব বাদ পড়েছে এবং তার জায়গায় আসী ইবনে হিশাম ইবনে মুগীরাকে পাঠিয়েছে।” এই ব্যক্তির নিকট আবু লাহাম চার হাজার দিরহামের পাওনাদর ছিল। সে দারিদ্রের জন্য ঐ ঋণ শোধ করতে পারেনি। সেজন্য এ পাওনা টাকার বিনিময়ে সে তাকে যুদ্ধে পাঠিয়ে দেয় তার স্থলাভিষিক্ত করে।

 উমাইয়া ইবনে খালাফও যুদ্ধে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সে ছিল স্থূলদেহী রাশভারী এক বৃদ্ধ। উকবা ইবনে আবু মুয়াইত তার কাছে এলো। উমাইয়া তখন মসজিদুল হারামে লোকজনের সাথে বসে ছিল। সে তাকে চন্দন কাঠের তৈরী একটা সুগন্ধি দিয়ে বললো, “নাও, তুমি এটি দিয়ে সুবাসিত হও। কারণ তুমি তো মেয়ে মানুষ।” উমাইয়া বললো, “দূর হ’ এখান থেকে! আল্লাহ তোকে কুৎসিত করে দিক।” লজ্জা পেয়ে বুড়ো উমাইয়া অতঃপর যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিল।

প্রস্তুতি নেয়া সম্পন্ন হলো এবং রণাঙ্গনে যাওয়ার জন্য সবাই বদ্ধ পরিকর হলো। তখন তাদের সাতে বনু বাক্র ইবনে আবদ্ মানাতে যে যুদ্ধ হয়েছিল তার কথা মনে করে তাঁরা বললো, “আমাদের আশংকা হয় যে, ওরা পেছন দিক থেকে আমাদের ওপর হামলা করতে পারে।” এ আশংকা তাদেরকে যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারে দ্বিধান্বিত করে তুলছিল। তখন ইবলিস সুরাকা ইবনে মালিক ইবনে জাশআম আল মুদলাজীর আকৃতি ধারণ করে তাদে কাছে হাজির হলো। সে বললো, “আমি তোমাদের তত্ত্বাবধায়ক থাকছি যেন কিনানা গোত্র তোমাদের ওপর পেছন দিক থেকে আক্রমণ করতে না পারে।” এ আশ্বাস লাভ করার পর তারা দ্রুতবেগে মক্কা ত্যাগ করলো।

ওদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদেরকে সঙ্গে নিয়ে অভিযানে বেরিয়ে পড়লেন। তখন রমযান মাসের কয়েকটা দিন অতিবাহিত হয়েছে। তিনি আমর ইবনে উম্মে মাকতুমকে নামায পড়ানোর দায়িত্বে নিয়োজিত করলেন। মুসআব ইবনে উমাইরের হাতে সাদা পতাকা তুলে দিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে ছিল দুটো কালো পতাকা। তার একটি ছিল আবু তালিব তনয় আলীর নিকট এবং এটির নাম ছিল ঈগল। অপরটি ছিল জনৈক আনসারের নিকট। ঐদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাদের কাছে সর্বমোট ৭০ টি উট ছিল। তারা পালাক্রমে ঐগুলোতে আরোহণ করতে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আলী ইবনে আবু তালিব ও মুরসাদ ইবনে আবু মুরসাদ একটি উটের পিঠে পালাক্রমে আরোহণ করতে লাগলেন। আর হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুই ভৃত্য যায়িদ ইবনে হারিসা ও আবু কাবশা আরোহণ করতে লাগলেন আরেকটিতে। আরেকটিতে চড়তে লাগলেন আবু বাক্র, উমার ও আবদুর রহমান ইবনে আউফ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনা থেকে মক্কার পথ ধরে চলতে লাগলেন এবং মদীনার বাইরের গিরি প্রবেশপথে পৌঁছিলেন। অতঃপর সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে আকীক, যুল হুলায়ফা, আওলাতুল জায়েশ, তুরবাম, মালাল, মারইনের গামীছূর হাম্মাম, ইয়ামামের কংকরময় ভূমিতে সাইয়ালা, ফাজ্জুর রাওহা এবং সেখান থেকে শানুকায় পৌঁছলেন। সেখান থেকে আরকাজ যারিয়াহ নামক স্থানে পৌঁছলে এক বেদুইনের সাথে দেখা হলো। বেদুইনকে জিজ্ঞেস করলেন সে কোন লোকজন দেখেছে কিনা। কিন্তু তার কাছে কোন খবর পাওয়া গেলো না। সাহাবারা ঐ লোকটাকে বললো, ‘আল্লাহর রাসূলকে সালাম দাও।’ সে বললো, ‘তোমাদের মধ্যে আল্লাহর রাসুল আছে নাকি?’ সবাই বললো, হ্যাঁ।’ অতঃপর সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললো, “তুমি যদি আল্লাহর রাসূল হয়ে থাকে তাহলে বলতো আমার এই উষ্ট্রীর পেটে কি আছে?” সালামা ইবেন সুলামা ইবনে ওয়াকশ তাকে বললো, “তুমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করো না। আমার কাছে এসো, আমি বলছি ওর পেটে কি আছে। তুমি ঐ উষ্ট্রীটার সাথে সঙ্গম করেছিলে। তাই ওর পেটে তোমার ঔরসের একটা ছাগলের বাচ্চা রয়েছে।”রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সঙ্গে সঙ্গে সালামাকে ধমক দিয়ে বললেন, “চুপ কর। লোকটার সাথে তুমি অশ্লীল কথা বলছো?” অতঃপর অন্যদিকে মনোযোগ দিলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাওহার ‘সাজসাজ্’ নামক কূপের নিকট গিয়ে যাত্রাবিরতি করলেন। সেখান থেকে আবার রওয়ানা হলেন। কিছুদূর গিয়ে মক্কার পথ ত্যাগ করে ডান দিকের পথ ধরে নাজিয়া অভিমুখে যাত্রা করলেন। তাঁর গন্তব্যন্থল ছিল বদর। বদরের নিকটবর্তী একটি জায়গায় পৌঁছে তিনি রুহকান নামক একটি উপত্যাকা পাড়ি দিলেন। এই উপত্যকাটি নাজিরা ও সাফরা গিরিপথের মধ্যস্থলে অবস্থিত। সেখান থেকে তিনি গিরিপথে গিয়ে উপনীত হলেন। অতঃপর সেখান থেকে নেমে সাফরার নিকট পৌঁছলেন। এখানে পৌঁছে তিনি বাসবাস ইবনে আমর জুহানী ও আদী ইবনে আবু জাগবা জাহানীকে বদর এলাকায় পাঠালেন আবু সুফিয়ান ইবনে হারব ও অন্যদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়ার জন্য। ঐ দু’জনকে আগে পাঠিয়ে দেয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদর অভিমুখে রওয়ানা হলেন।

পথিমধ্যেই তিনি জানতে পারলেন ও, কুরাইশরা তাদের বাণিজ্য কাফিলাকে রক্ষা করার জন্য সদলবলে মক্কা থেকে যাত্রা করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ খবর সাহাবাদের জানালেন এবং এ মুহূর্তে তাদের কি করা উচিত সে সম্পর্কে সকলের সাথে পরামর্শ করলেন। সর্বপ্রথম আবু বাক্র সিদ্দীক (রা) উঠে দাঁড়ালেন ও তাঁর মতামাত অতি চমৎকারভাকে ব্যক্ত করলেন। এরপর মিকদাদ ইবনে আমর দাঁড়িয়ে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ আপনাকে যেদিকে বলতে বলেছেন সেদিকে এগিয়ে চলুন। আল্লাহর কসম, বনী ইসরাঈল যেমন মুসাকে (আ) বলেছে, ‘তুমি আর তোমার রব গিয়ে যুদ্ধ কর, আমরা এখানে বসে রইলাম’Ñ আমরা সে রকম কথা আপনাকে বলবো না। আমরা বলছি, আপনি ও আপনার রব গিয়ে লড়াই করুন, আমরাও আপনার ও আপনার রবের সহযোগী হয়ে লড়াইতে শরীক আছি। সেই মহান সত্তার শপথ যিনি আপনাকে সত্য বিধান দিয়ে পাঠিয়েছেন, আপনি যদি আমাদের নিয়ে সুদূর ইয়ামানের বারকুল গিমাদেও যান, তাহলেও আমরা আপনার সঙ্গী হয়ে সেখানে যাবো।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিকদাদকে ধন্যবাদ দিলেন এবং তাঁর জন্য দোয়া করলেন।

অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদের সম্বোধন করলেন, “তোমরা আমাকে পরামর্শ দাও।” আনসারদের এত গুরুত্বদানের কারণ ছিল এই যে, তারা ছিল মুসলমানদের সহায়। তারা যখন আকাবাতে বাইয়াত করেছিলো তখন বলেছিলো, “হে আল্লাহর রাসূল, আপনি যত দিন আমাদের আবাসভূমিতে না যাবেন ততদিন আমরা আপনার দায়িত্ব নিতে অপরাগ। যখন আপনি আমাদের কাছে যাবেন তখন আমাদের দায়িত্বে থাকবেন। আমরা আমাদের ছেলেমেয়ে ও স্ত্রীদেরকে যেভাবে সব রকমের বিপদ থেকে রক্ষা করি ঠিক সেইভাবে আপনাকে রক্ষা করবো।” এজন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশংকা করেছিলেন যে, আনসাররা হয়তো মনে করতে পারে যে, মদীনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলেই কেবল তাদের ওপর তাঁর সাহায্য করার ও তাঁকে রক্ষা করার দায়িত্ব বর্তায়। আনসাররা এরূপ ভেবে থাকতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে তাদের আবাসভূমির বাইরে কোন শত্রুর বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে যেতে চাইলে তাঁর সাথে যাওয়া তাদের দায়িত্ব নয়। তাই তিনি যখন আনসারদেরকে সম্বোধান করলেন তখন সা’দ ইবনে মুয়ায বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আপনি বোধ হয় আমাদের মতামত জানতে চাচ্ছেন।”রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “হ্যাঁ।” সা’দ বললেন, “আমরা আপনার প্রতি ঈমান এনেছি যে বিধান নিয়ে এসেছেন তা পরম সত্য। আর এই প্রত্যয়ের ভিতরেই আমরা আপনার কাছে অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি দিয়েছি যে, আমরা আপনার নির্দেশ মানবো ও আনুগত্য করবো। হে আল্লাহর রাসূল, তাই আপনি যা ভাল মনে করেন, করুন। আমরা আপনার সাথে আছি। সেই আল্লাহর শপথ যিনি আপনাকে মহাসত্য দিয়ে পাঠিয়েছেন, সামনের এই সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আপনি যদি তার অথৈ পানিতে নামেন, আমরাও আপনার সাথে নামবো। আমাদের একটি লোকও আপনাকে ছেড়ে পেছনে থাকবে না। আগামীকাল যদি আপনি আমাদের সাতে নিয়ে শত্রুর মুখোমুখি হতে চান, ততেও আমাদের কোন আপত্তি নেই। আমরা যুদ্ধে ধৈর্যশীল এবং শত্রুর মুকাবিলায় সংকল্পে অবিচল। আশা করি, আল্লাহ আপনাকে আমাদের এমন তৎপরতা দেখবার সুযোগ দেবেন, যাতে আপনার চোখ জুড়িয়ে যাবে। আল্লাহর রহমতের ওপর নির্ভর করে আমাদের নিয়ে আপনি এগিয়ে চলুন।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সা’দের বক্তব্য শুনে খুশী হলেন এবং খুবই উৎসাহিত বোধ করলেন। অতঃপর বরলেন, “তোমরা বেরিয়ে পড়। আল্লাহ আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, দুই কাফিলার যে কোন একটি আমাদের হাতে পরাভূত হবো।[ ৫৬.একটি হলো আবু সুফিয়ান ও আমর ইবনুর আ’স সহ বাণিজ্যিক কাফিলা, অপরটি আবু জাহলের নেতৃত্বে আগত সমর সজ্জায় সজ্জিত সুবিশাল বাহিনী।] আল্লাহর কসম, আমি যেন এখনই কুরাইশদের শোচনীয় মৃত্যু ঘটতে দেখছি।”

অতপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদর প্রান্তরের কাছাকাছি গিয়ে তাঁবু স্থাপন করলেন। তারপর তিনি নিজে আর একজন সাহাবাকে [৫৭. ইনি আবু বাক্র সিদ্দীক রাদিয়ল্লাহু আনহু।]নিয়ে টহল দিতে বেরুলেন। কিছুদূর গিয়ে জনৈক বৃদ্দ আরবের সাক্ষাত পেলেন। তিনি কুরাইশদের কথা কিছু জানেন কিনা এবং মাহাম্মাদ ও তাঁর সহচরদের সম্পর্কে কোন খবর শুনেছেন কিনা জিজ্ঞেস করলেন। বৃদ্ধ বললেন, “তোমরা কারা বল, তা না হলে বলবো না।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আমরা যা জানতে চেয়েছি, সেটা আগে বল। তারপর আমরা আমাদের পরিচয় দেবো।” বৃদ্ধ বললেন, “শুনেছি, মুহাম্মাদ ও তাঁর সহচরগণ অমুক দিন যাত্র শুরু করেছেন। এটা যদি সত্য হয় তাহলে তার এখন অমুক জায়গায় থাকার কথা। আর কুরাইশদের সম্পর্কে শুনেছি, তারা অমুক দিন রওয়ানা দিয়েছে। এটা যদি সত্য হয় তাহলে তার আজ অমুক জায়গায় এসে পৌঁছার কথা।” উভয় দল সত্যি যেখানে উপস্থিত হয়েছে, বৃদ্ধ সেই স্থানের  কথাই বললেন। অতঃপর জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কোথা থেকে এসেছো?” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “পানি থেকে। ”বৃদ্ধ বললেন, “পানি থেকে’ অর্থ কি?” ইরাকের পানি থেকে নাকি?

অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের কছে এলেন রাত্রে তিনি আলী ইবনে আবু তালিব, যুবাইর ইবনুল আওয়াম ও সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস সহ একদল সাহাবীকে কুরাইশদের খোঁজ খবর নিতে বদর প্রান্তরের পার্শ্ববর্তী জলাশয়ে পাঠালেন। সেখানে তাঁরা কুরাইশদের এক পাল পানি পানরত উট দেখতে পেলেন এবং তার মধ্যে বনু হাজ্জাজ গোত্রের ভৃত্য আসলাম ও বনু আস ইবনে সাঈদের ভৃত্য আরীদ আবু ইয়াসারের সাক্ষাত পেলেন। তাঁরা ঐ ভৃত্যদ্বয়কে সাথে নিয়ে এলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায পড়ছিলেন। তাদেরকে জিজ্ঞস করা হলো, “তোমরা কারা?” তারা বললো, “আমরা কুরাইশদের পানি বহনকারী। তাদের জন্য খাবার পানি নিতে আমাদেররকে পাঠিয়েছে।” মুসলমানগণ তাদের কথা বিশ্বাস করলেন না। তাদের ধারণা ছিল, ওরা আবু সুফিয়ানের লোক। অতঃপর তাদেরকে প্রহার করা হলো পিটুনীর চোটে তারা স্বীকার করতে বাধ্য হলো যে, তারা আবু সুফিয়ানের লোক। অতঃপর মুসলমানগণ তাদেরকে ছেড়ে দিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায শেষ করে বললেন, “ওরা যখন  সত্য বললো তখন তখন ওদের তোমরা প্রহার করলে। আর যখন মিথ্যা বললো তখন ছেড়ে দিলে। এটা তোমাদের কেমন কাজ? ওরা ঠিকই বরেছে। ওরা কুরাইশদের লোক। তোমরা আমাকে কুরাইশদের খবর বল।” তারা বললো,“আল্লাহর কসম, ঐ দূর প্রন্তরে বালুর টিলাটা দেখছেন, ওর অপর পার্শ্বেই তারা রয়েছে।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  জিজ্ঞেস করলেন, “ওরা সংখ্যায় কত?” আসলাম ও আরীদ বললো, “জানি না।” তিনি বললেন, “প্রতিদিন কয়টা জন্তু জবাই করে?” তারা বললো, “কোন দিন দশটা, কোন দিন নয়টা।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তাহলে ওদের সংখ্যা নয়শো থেকে হাজারের মধ্যে হবে।”অতঃপর জিজ্ঞেস করলেন, “কুরাইশ নেতাদের মধ্যে কে কে এসেছে?” তারা বললো, ‘উতবা ইবনে রাবীআ, শাইবা ইবনে রাবীআ, আবুল বুখতারী ইবনে হিশাম, হাকিম ইবনে হিযাম, নওফেল ইবনে খুয়াইলিদ, হারেস ইবনে আমের ইবনে নওফেল, তুয়াইমা ইবনে আদী ইবনে নওফেল, নাদার ইবনে হারেস যাম’আ ইবনে আসওয়াদ, আবু জাহেল ইবনে হিশাম, উমাইয়া ইবনে খালাফ, হুজাজের দুই পুত্র নাবীহ ও মুনাব্বিহ, সুহাইল ইবনে আমর এবং আমর ইবনে আব্দ উদ্।” এ বিবরণ নেয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের সামনে গিয়ে বললেন, “মক্কা তোমাদের নিকট তার কলিজার টুকরাগুলোকে পাঠিয়ে দিয়েছে।”

ইতি পূর্বে বাসকাস ইবনে আমর ও আদী ইবনে আবু যাগবা টহল দিতে দিতে বদর প্রান্তরে এসে থামে। তারা জলাশয়ের নিকটবর্তী একটা পাহাড়ের কাছে গিয়ে উট থেকে নামলো এবং একটা মশকে পানি ভরে নিল। মুজদী ইবনে আমর জুহানী তখন জলাশয়োর কিনারে ছিল। জলাশয়ের কাছে আগত লোকদের মধ্যে দুটি বাঁদী ছিল। তাদের একজন অপরজনের কাছে তার প্রাপ্য পরিশোধ করার দাবী জানাতে লাগলো ঋনগ্রস্ত বাঁদীটি বললো,“কাফিলা কাল অথবা পরশুদিনই আসছে। তখন আমি কাফিলার কাজ করে তোমার পাওনা পরিশোধ করে দেবো।” মুজদী বরলো, “তুমি ঠিকই বলেছো।” অতঃপর সে উভয়ের মধ্যে আপোষ করিয়ে দিল। আদী ও বাসবাস একই কথোপকথন  শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ফিরে গেল এবং যা শুনেছে তা তাঁকে জানালো। আবু সুফিয়ান ইবনে হারব সাবধানতা অবলম্বনের জন্য কাফিলাকে পেছনে রেখে আগে আগে এলো। সে জলাশয়ের কাছে গিয়ে মুজদী ইবনে আমরকে জিজ্ঞেস করলো, “কারো আনাগোনা টের পেয়েছো নাকি?” সে বললো, “সন্দেহজনক কাউকে দেখিনে। কেবল দুজন উট সওয়ারকে দেখলাম এই পাহাড়টার কাছে এসে উট থেকে নামলো। তারপর মশকে পানি ভরে চলে গেল।” আবু সুফিয়ান সেই জায়গায় উপস্থিত হলো যেখানে বাসবাস ও আদী উট থেকে নেমেছিলো। সেখানে তাদের উটদ্বয়ের খানিকটা গোবর পেয়ে তা তুলে নিল এবং সেটা ভেঙে ছিন্ন ভিন্ন করলো। তার ভেতর সে কতকগুলো আঁটি পেল। এ আঁটি দেখে সে বললো, “আল্লাহর কসম, এটা ইয়সরিবের পশুখাদ্য।” সে দ্রুত বেগে তার কাফিলার কাছে ছুটে গেল। কাফিলাকে সে ভিন্ন পথে চালিত করে বদর প্রান্তর বামেরেখে সমুদ্র কিনারে পথ ধরে দ্রুত চলে গেল।

আবু সুফিয়ান যখন নিশ্চিন্ত হলো যে, তার কাফিলাকে সে বাঁচিয়ে নিয়ে এসেছে, তখন সে কুরাইশবাহিনীর কাছে এই মর্মে বার্তা পাঠালো, “তোমরা তোমাদের বাণিজ্যিক কাফিলা, তোমাদের লোকজন ও ধন সম্পদকে রক্ষা করার জন্য এসেছো। আল্লাহ ওগুলোকে রক্ষা করেছেন। অতএব তোমরা মক্কায় ফিরে যাও।” জবাবে আবু জাহর বললো, “বদরের মেলা পর্যন্ত না গিয়ে আমরা কিছুতেই ফিরবো না। এখানে তিন দিন থাকবো, পশু জবাই করে ধুমধাম করে খাবারের আয়োজন করবো, মদ খাবো, গায়িাকারা বাদ্য বাজিয়ে গান গাইবে, আরবদেরকে আমাদের অভিযানের কথা ও বাহিনী গড়ে তোলার কাহিনী শোনাবো।  এভাবে তাদের মনে আমাদের  ভীতি চিরকালের জন্য বদ্দমূল হয়ে যাবে। অতএব মেলায় চলো।” উল্লেখ্য যে, বদরের প্রান্তরে প্রতি বছর একটি মেলা বসতো এবং তা ছিল আরবের নামকরা মেলা।

আতঃপর কুরাইশরা তাদের আয়োজন ও প্রস্তুতি অব্যাহত রাখলো। তারা বদর প্রান্তুরের অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী মরুময় টিলার অপর পার্শ্বে গিয়ে তাঁবু ফেললো। আল্লাহ প্রবল বৃষ্টি লামালেন। প্রান্তরের মাটি তেমন উষর ছিল না, খানিকটা রসালো ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ এতটা বৃষ্টি পেলেন যে,তাঁদের অবস্থানস্তলের মাটি ভিজে গেল। কিন্তু চলাচলে কোন অসুবিধার সৃষ্টি করলোনা। পক্ষান্তুরে কুরাইশদের অবস্থানস্থলের মাটি এত বেশী স্যাঁত সেতে হয়ে গেল যে, তাদের চলাচল অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম বাহিনীকে আরো বেশী পানি জমা হয়েছে এমন জায়গায় সরিয়ে নিলেন।

হুবাব ইবনে মুনযির বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, এই জায়গাটা কি আপনি আল্রাহর নির্দেশক্রমেই বাছাই করেছেন যার থেকে আমরা একটুও এদিক ওদিক করতে পারি না? অথবা এটা কি আপানার নিজের রণকৌশলগত অভিমত?” তিনি বললেন, “এটা নেহায়েত একটা রণকৌশল এবং আমার নিজস্ব অভিমত।” হুবাব বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, এ জায়গাটা বাছাই করা ঠিক হয়নি। অতএব সবাইকে নিয়ে এখান থেকে সরে পড়ুন। যেখানে অপেক্ষঅকৃত কম পানি আছে সেখানে তাঁবু ফেলুন। অতঃপর আমরা সেই জায়গার আশে পাশে যে কূপ আছে তা বন্ধ করে দেবো। তার ওপর চৌবাচ্চা তৈরী করে সেটা পানি দিয়ে ভরে রাখবো। অতঃপর শত্রু পক্ষের সাথে লড়াই করবো। ফলে আমরা পর্যাপ্ত খাবার পানি পাবো। কিন্তু ওরা পাবে না। ” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তুমি ঠিক বলেছো।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবাইকে নিয়ে উঠলেন। সামান্য পানি জমা স্থানে এসে তাবু ফেললেন। অতঃপর পানির কূপ বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ দিলেন এবং তাই করা হলো। অতঃপর কূপের ওপর একটা চৌবাচ্চা তৈরী করে তাতে পানি ভরে রাখা হলো।এবং তাতে পানির পাত্র ফেলে রাখা হলো।

সা’দ ইবনে মু’আয বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমাদেরকে অনুমতি দিন, আমরা আপনার জন্য একটা সুরক্ষিত মঞ্চ তৈরী করি, আপনি তার ভেতরে থাকবেন এবং আমরা হবো আপনার বহনকারী। অতঃপর শত্রুর মুকাবিলায় যাবো। আল্লাহ যদি আমাদেরকে বিজয়ী করেন তাহলে আমাদের আশা পূর্ণ হবে। আর যদি তা না হয় তাহলে আপনাকে আমরা বহন করে নিয়ে যাবো। আপনি অন্যান্য মুসলমানের সাথে মিলিত হবেন। হে আল্লাহর নবী, বিপুল সংখ্যক মুসলমান আপনার সাথে শুধু এই জন্য আসতে পারেনি যে, আপনি যুদ্ধে যাবেন তা তারা জানে না। তারা আপনাকে আমাদের চেয়ে কম ভালবাসে না। তারা যদি জানতো যে, আপনি যুদ্ধে যাচ্ছেন তাহলে তারা যুদ্ধে না এসে ক্ষান্ত হতো না। তাদের দিয়ে আল্লাহ আপনাকে রক্ষা করতেন এবং তারা আপনার হিতাকাক্সক্ষী হতো এবং আপনার সহযোগী হয়ে লড়াই করতো।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সা’দের কথা শুনে খুশী হলেন, তাঁর প্রশংসা করলেন এবং তাঁর কল্যাণের জন্য দোয়া করলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য একটা সুরক্ষিত মঞ্চ তৈরী করা হলো এবং তিনি তার মধ্যে অবস্থান করতে লাগলেন।

সকাল বেলা কুরাইশরা বালুর টিলা দিয়ে বেরিয়ে এলো। তাদেরকে নামতে দেখেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ, এই সেই কুরাইশ যারা গর্ব ও অহংকারের সাথে আপনার সাথে বিদ্রোহ ও আপনার রাসূলকে অস্বীকার করে আজ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। হে আল্লাহ, আপনি যে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি আমাকে দিয়েছেন তাঁর সময় সমুপস্থিত। হে আল্লাহ, ওদেরকে আজ সকালেই ধ্বংস করে দিন। ”

সবাই যখন ময়দানে নামলো তখন কুরাইশদের একটি দল সামনে অগ্রসর হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তৈরী করা চৌবাচ্চায় এসে উপনীত হলো। এই দলের মধ্যে হাকীম ইবনে হিযামও ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদেরকে বললেন, “ওদেরকে বাধা দিও না।” বস্তুতঃ ঐ চৌবাচ্চা থেকে যে যে পানি খেয়েছে, সে ঐ দিন নিহত হয়েছে। একমাত্র হাকীম ইবনে হিযাম এর ব্যতিক্রম সে নিহত হয়নি। পরে সে ইসলাম গ্রহণ করে এবং ভালো মুসলমানে পরিণত হয়। এই ঘটনাকে সে আজীবন স্মরণ রেখেছিল। এমনকি কখনো দৃঢ়ভাবে কসম করতে হলে বলতো, “সেই মহান সত্তার কসম যিনি আমাকে বদর যুদ্ধের দিন রক্ষা করেছেন।”

মুসলমানগণ শান্ত ও স্থির হলে কুরাইশরা ইমাইর ইবনে ওয়াহাব জুমাহীকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের সংখ্যা নির্ণয়ের জন্য পাঠালো। সে যোড়ায় চড়ে বাহিনীর চারপাশ দিয়ে একট চক্কর দিয়ে ফিরে গিয়ে বললো, “তিনশোর সামান্য কিছু বোশী বা কম হতে পারে। তবে আমাকে আর একটু সময় দাও দেখে আসি ওদের কোন গুপ্ত ঘাঁটি বা সাহায্যকারী আছে কিনা।” অতঃপর সে সমস্ত প্রান্তর ঘুরলো, কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না। অতঃপর ফিরে গিয়ে বললো, “কোন কিছুই সন্ধান পেলাম না। তবে তাদের হাবভাব দেখে মনে হয়, তারা মরণপণ করে এসেছে। ইয়াসরিবের উষ্ট্রীগুলো সুনিশ্চিত মৃত্যু বহন করে এনেছে। ওরা এমন একটা দল তরবারীই যাদের একমাত্র সহায় ও রক্ষক। আল্লাহর কসম, আমি নিশ্চিত যে, ওদের একজন নিহত হলে তার বদলায় তোমাদের একজন নিহত হবে। তারা কুরাইশদের মধ্য থেকে যখন তাদের সমসংখ্যক মানুষ হত্যা করবে, তখন আর তা আমাদের জন্য সুখবর হবে না। অতএব তোমরা এখনো ভেবে দেখো।”

হাকীমইবনে হিযাম এ কথা শুনে কুরাইশ বাহিনীর লোকদের কাছে গেল। প্রথমে সে উতবা ইবনে রাবীআকে গিয়ে বললো, “হে ওয়ালীদের পিতা, আপনি কুরাইশদের একজন প্রবীণ নেতা। আপনার কথা সবাই মানে। আপনি কি এমন একটা কাজ করতে প্রস্তুত যা করলে অনন্তকাল ধরে আপনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন?” সে বললো, “হাকীম, তুমি কি বরতে চাচ্ছো?” হাকীম বললো, “আপনি কুরাইশবাহিনীকে ফিরিয়ে নিয়ে যান এবং আপনার মিত্র ‘আমর ইবনে হাদরামীর হত্যাকা-ের ব্যাপারটা মিটিয়ে দেবার দায়িত্ব নিন।” উতবা বললো, “তা আমি করতে রাজী। সে ব্যাপারে আমি তোমার কথা রাখবো। হাদরামী আমার মিত্র এবঙ তার রক্তপণ ও আর্থিক ক্ষতি পূরণ করে দিতে আমি প্রস্তুত। তুমি আবু জাহলের কাছে যাও। আমি মনে করি, কুরাইশদেরকে ফিরিয়ে নেয়ার প্রশ্নে সে ছাড়া আর কেউ বিরোধিতা করবে না।” অতঃপর উতবা ইবনে রাবীআ দাঁড়িয়ে কুরাইশদের উদ্দেশ্যে বললো, “হে কুরাইশগণ, মুহাম্মাদ ও তার সহযোগীদের সাথে লড়াই করে আমাদের কোন লাভ হবে না। বস্তুতঃ আজ যদি আমরা তাকে হত্যা করতে সক্ষম হইম তা হলেও আমাদের ভেতের কখনো সদ্ভাব জন্মাবে না। একজন আর একজনের মুখ দেখা পছন্দ করবে না। কেননা সে তার চাচাতো ভাই, খালাতো ভাই কিংবা কোন আত্মীয়ের হত্যাকারী বল চিহ্নিত হবে অতএব, বলো আমরা ফিরে যাই এবং মুহাম্মাদ ও তার অনুচরদের পথ থেকে সরে দাঁড়াই। তাদের ব্যাপারটা আরববাসীর উপর অর্পণ করি। সমগ্র আরববাসী মিলে যদি তাকে হত্যা করে তাহলে তো আমাদের উদ্দেশ্যই সিদ্ধ হবে। আর যদি তা না করে তাহলে মুহাম্মাদের কাছে আমরা অন্ততঃ নির্দোষ থাকবো।”

হাকীম বলেন, অতঃপর আমি আবু জাহলের কাছে গেলাম, দেখলাম, সে তার যুদ্ধের সাজ সরঞ্জামে শাণ দিচ্ছে। আমি তাকে বললাম, “হে আবুল হিকাম, উতবা আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছে।” অতঃপর উতবা যা বলেছে তা তাকে জানালাম। সে সঙ্গে বললো, “উতবার মাথা বিগড়ে গেছে। নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ তাকে যাদু করেছে। এটা কখ্খনো সম্ভব নয়। আল্লাহ আমাদের ও মাহাম্মাদের মধ্যে চূড়ান্ত ফায়সালা না করা পর্যন্ত আমরা ফিরবো না। উতবা যা বলেছে তা তার মনের কথা নয়। যেহেতু মাহাম্মাদ ও তার অনুচররা সংখ্যায় খুবই নগন্য এবং তাদের ভেতরে তার ছেলেও রয়েছে, যুদ্ধ হলে তার ছেলের জীবন বিপন্ন হবে তা ভেবে সে একথা বলেছে।” অতঃপর সে নিহত আমর ইবনে হাদরামীর ভাই আমের ইবনে হাদরামীর কাছে এই মর্মে খবর পাঠালো যে, “তোমার মিত্র ইতবা কুরাইশদেরকে ফেরত নিয়ে যেতে চায়। অথচ তুমি তোমার প্রতিশোধের সুযোগ নিজের চোখে নাগালের মধ্যে দেখতে পাচ্ছো। সুতরায় তুমি কুরাইশদের তোমার ভাই- এর হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে তাদের প্রতিশ্রুতি পালনের কথা স্মরণ করিয়ে দাও। ” ‘আমের ইবনে হাদরামী উঠে দাঁড়ালো এবং বুকের কাপড় খুলে ‘হায় আমর! হায় আমর!!’ বলে চিৎকার করে মাতম করতে থাকলো। সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলো। কুরাইশরা রণোন্মাদ হয়ে উঠলো। উতবা যে শুভ উদ্যোগ নিয়েছিল, আমের তা এক নিমিষে নস্যাৎ করে দিল।

আসওয়াদ ইবনে আবদুল আসাদ মাখযুমী ছিল কুরাইশদের মধ্যে চরম অসৎ ওগুা স্বভাবের লোক। সে তার ঘৃণ্য তৎপরতা শুরু করে দিল। সে ঘোষণা করল। “মুসলমানদের জলাধার থেকে আমি পানি পান করবো। কিংবা তা ভেঙ্গে ফেলবো। এম যদি আমার মৃত্যুও ঘটে, পরোয়া করি না। ” এই বলে সে ময়দানে নামলে হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব তার মুখোমুখি হলেন। দুইজনের আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণ চলাকালে হামযা আসওয়াদের পায়ে তরবারীর আঘাত করলেন। তার পা কেটে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। এ সময় সে চৌবাচ্চার কাছেই ছিল। সে চিৎ হয়ে পড়ে গেল এবং তার পা থেকে ফিনকি দিযে রক্ত ছুটতে লাগলো।সে পুনরায় হামাগুড়ি দিয়ে চৌবাচ্চার দিকে এগুলো এবং নিজের প্রতিজ্ঞা রক্ষা করার উদ্দেশ্যে চৌবাচ্চার সীমানার ভেতরে ঢুকে পড়লো। হামযা তার পিছু ধেয়ে গেলেন এবং চৌবাচ্চার সীমানার ভেতরেই তাকে হত্যা করলেন।

এরপর ময়দানে অবতীর্ণ হলো উতবা ইবন রাবীআ। তার ভাই শাইবা ও ছেলে ওয়ালীদ তার সঙ্গে এলো। কুরাইশদের ব্যুহ ছেড়ে সামনে গিয়ে সে হুংকার দিয়ে দ্বন্দ্ব যুদ্ধের আহ্বান জানালে আনসারদের মধ্য হতে তিন যুবক আউফ ও মুয়াওয়েব ইবন হারেস (দুই ভাই) এবং আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা তার মুকাবিলায় এগিয়ে গেলেন। কুরাইশরা বললো “তোমরা কারা?” তাঁরা বললেন, “আমরা আনসার।” তারা বললো, “তোমাদের দিয়ে আমাদের কোন প্রয়োজন নেই।” অতঃপর একজন চিৎকার করে বললো, “হে মুহাম্মাদ, আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে যারা আমাদে সমকক্ষ, তাদেরকে পাঠাও।” তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উবাইদা ইবনে হারেস হামযা ও আলীকে পাঠালেন। তাঁরা গিয়ে নিজ নিজ পরিচয় দিলে প্রতিপক্ষ খুশী হয়ে বললো, “ঠিক আছে। এবার মর্যদাসম্পন্ন প্রতিপক্ষ পাওয়া গেছে।” মুসলিম বাহিনীর সবকনিষ্ঠ মুজাহিদ উতবা ইবনে রাবীআর বিরুদ্ধে, হামযা শাইবার বিরুদ্ধে এবং আলী ওয়ালীদ ইবনে উতবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে দিলেন। হামযা শাইবাকে এবং আলী ওয়লীদকে পাল্টা আঘাত হানার সুযোগও দিলেন না। প্রথম আঘাতেই সাবাড় করে দিলেন। আর উবাইদা ও উতবা উভয়ে একটি করে আঘাত বিনিময় করলো এবং উভয়ে গুরুতরভাবে আহত হলো। হামযা ও আলী (রা) দ্রুত ছুটে দিয়ে নিজ নিজ তরবারী দিয়ে উতবাকে খতম করে দিলেন। অতঃপর তারা উবাইদাকে ঘাড়ে তুলে নিয়ে মুসলিম বাহিনীর মধ্যে পৌঁছিয়ে দিলেন।

এরপর উভয় পক্ষ একযোগে পরস্পরের দিকে এগিয়ে গেল এবং পরস্পরের কাছাকাছি হলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহবাদেরকে বলে দিলেন, তিনি নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত তারা যেন হামলা না করে। তিনি বললেন, “কুরাইশরা তোমাদের ঘেরাও করে ফেললে তীর নিক্ষেপ করে তাদেরকে হটিয়ে দিও।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সময় মুসলিম বাহিনীকে সারিবদ্ধ করে আবু বাক্র সিদ্দীকসহ তাঁর মঞ্চসদৃশ স্থানে অবস্থান করতে লাগলেন। সেখানে আর কেউ ছিল না। তিনি আল্লাহর কাছে তাঁর প্রতিশ্রুতি সাহায্য প্রেরণের জন্য দোয়া করতে লাগলেন। তিনি বলতে লাগলেন, “হে আল্লাহ, এই মুষ্টিমেয় মুসলমান যদি আজ ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে আপনার ইবাদত করার জন্য কেউ থাকবে না।” আবু বাক্র(রা) বরতে লাগলেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। আল্লাহ আপনাকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা অবশ্যই পালন করবেন।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সময় নিজ মঞ্চের ভেতরে কিছুক্ষণের জন্য তন্দ্রাভিভূত হয়ে পড়রেন। অতঃপর সাহায্য এসে গেছে। এই দেখোনা জিবরীল একটি ঘোড়ার লাগাম ধরে হাঁকিয়ে আসছেন। তাঁর পোশাকের ভাঁজে ভাঁজে ধূলোর আস্তরণ জমে গেছে।” পরক্ষণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেরিয়ে রণাঙ্গনে গেলেন এবং মুজাহিদগণকে এই বলে যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করলেন, “সেই মহান সত্তার শপথ যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, আজ যে ব্যক্তি কাফিরদের সাতে ধৈর্য ও নিষ্ঠা সহকারে যুদ্ধ করবে এবং শুধু সামনের দিকে এগুতে থাকবে, কোন অবস্থায় পিছু হটবে না, আল্লাহ তাকে জান্নাত দান করবেন।” বনু সালামা গোত্রের উমাইর ইবন হুমাম (রা) হাতে কয়েকটি খোরমা নিয়ে খাচ্ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা শুনেই বললেন, “বাহ! আমার তাহলে জান্নাতে যাওয়ার পথে শাহাদাত লাভ করা ছাড়া তো আর কোন বাধাই নেই দেখছি।” একথা বলেই তিনি হাতের খোরমাগুলো ছুড়ে ফেলে দিলেন এবং তরবারী নিয়ে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। কিছুক্ষণ পরেই তিনি শাহাদাত বরণ করলেন।

অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মুষ্টি ধুলি হাতে নিয়ে কুরাইশদের দিকে এগিয়ে গেলেন। অতঃপর এই বলে ফুঁ দিয়ে দিয়ে উড়িয়ে দিলেন, “ওদের মুখ বিকৃত হয়ে যাক।” অতঃপর সাহাবীদেরকে নির্দেশ দিলেন, “জোর হামলা চালাও।” অল্পক্ষণের মধ্যেই কুরাইশদের চরম পরাজয় ঘটলো। কুরাইশদের বড় বড় নেতাদের অনেকেই নিহত ও বন্দী হলো।

ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিন সাহাবীদেরকে বলেছিলেন, “আমি জানতে পেরেছি যে,বনু হাশিমের কিছু সংখ্যক লোককে জোর জবরদস্তি করে যুদ্ধে নিয়ে আসা হয়েছে। আমাদের সাথে যুদ্ধ করার কোন প্রয়োজন তারা অনুভব করে না। কাজেই বনু হাশিমের কেউ তোমাদের সামনে পড়লে তাকে হত্যা করো না। আবুল বুখতারী ইবনে হিশাম কারো সামনে পড়লে তাকে হত্যা করো না। কেননা তাকেও জবরদস্তিমূলকভাবে টেনে আনা হয়েছে।” মুসলিম বাহিনীর জনৈক আবু হুযাইফা বললেন, “আমরা আমাদের বাপ-ভাই-পুত্র ও আত্মীয়স্বজনকে হত্যা করবো, আর আব্বাসকে কেন ছাড়বো? আমার সামনে পড়লে আমি তাকে তরবারী দিয়ে আঘাত করবোই।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এ কথা শুনলেন তখন উমার ইবনুল খাত্তাবকে (রা) ডেকে বললেন, “হে উমার, আল্লাহর রাসূলের চাচার মুখে কি তরবারী দিয়ে আঘাত করা যায়।” উমার বললেন “ইয়া রাসূলুল্লাহ, অনুমতি দিন আমি তরবারী দিয়ে ওর ঘাড়টা কেটে ফেলি। আমি নিশ্চিত যে, আবু হুযাইফা মুনাফিক হয়ে গেছে।” পরবর্তীকালে আব হুযাইফা বলতেন, “বদর যুদ্ধের দিন আমার ঐ কথাটা বলা আমাকে শংকিত করে তুলেছে। শাহাদাত লাভের দ্বারা এর কাফফারা না হওয়া পর্যন্ত আমার এ শংকা দূর হবে না।” পরে ইয়ামামার যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

মুসলমানদের অনেক দুর্যোগের দিনে ফেরেশতারা সাহায্য করেছেন। কিন্তু নিহতদের ভেতরে আবু জাহলের লাশ আছে কিনা খুঁজে দেখার নির্দেশ দিলেন। ইবনে মাসউদ বলেন, আমি তার মস্তক ছিন্ন করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিয়ে গেলাম। বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল, এটা আল্লাহর দুশমন আবু জাহলেন মাথা।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “সত্যি কি তাই?” আমি বললাম, “আল্লাহর কসম, সত্যি।” ইবনে মাসউদ বলেন, আবু জাহলকে হত্যা করা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিজ্ঞা  ছিল। আমি অতঃপর তার মাথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে রাখলাম। তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন।

পরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশ নেতৃবৃন্দের লাশ কুয়ার মধ্যে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দিলেন। উমাইয়া ইবনে খালাফ ছাড়া আর সবার লাশ নিক্ষেপ করা হলো। উমাইয়ার লাশ  তার সামরিক পোশাকের মধ্যে ফুলে সেঁটে গিয়েছিল। সাহাবীগণ তাকে পেশাক থেকে ছাড়াবার চেষ্টা করলে তার গোশত ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে লাগলো। এ অবস্থা দেখে তাঁরা তাকে যেমন ছিল তেমনভাবেই রেখে মাটি ও পাথর চাপা দিলেন। কুয়ার ভিতর নিক্ষেপ করার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে দাঁড়ালেন। তখন মধ্যরাত। সাহাবীগণ শুনতে পেলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একে একে কুয়ায় নিক্ষিপ্ত সকলের নাম নিয়ে সম্বোধন করে বললেন, “হে কুয়ার অধিবাসী, হে উতবা, শাইবা, উমাইয়া ও আবু জাহল! আল্লাহ তোমাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা যথাযথভাবে পেয়েছো? আমি তো আমার রবের প্রতিশ্রুতি বাস্তবরূপে পেয়েছি।” মুসলমানগণ বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল, যারা মরে পচে গিয়েছে তাদেরকে আপনি সম্বোধন করছেন।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আমার কথা তোমরা যেমন শুনতে পাও তারাও তেমনি শুনতে পাচ্ছে। সাড়া দিতে পারছে না।”

এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম বাহিনীর কাছে যে গণিমতের মার (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) রয়েছে, তা একত্রিত করার নির্দেশ দিলেন। মুসলমানগণ তা নিয়ে মতবিরোধে লিপ্ত হলেন। যারা ঐ সম্পদ সংগ্রহ করেছেন তারা বললেন, “এ সম্পদ আমাদের পাওনা।” যারা শত্রুর সাথে যুদ্ধ করেছিরেন তাঁরা বললেন, “এ সম্পদ আমাদের পাওনা, কেননা আমরা যদি যুদ্ধ না করতাম তাহলে তোমরা এগুলো সংগ্রহ করার সুযোগ পেতে না, কুরাইশদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত থাকায় আমরা তোমাদের সাথে গণিমত সংগ্রহের কাজে যোগ দিতে পারিনি, ফলে তোমরা এগুলো সংগ্রহ করতে পেরেছো।” শত্রুরা ভিন্ন পথ দিযে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর আক্রমন চালাতে পারে এই আশংকায় যারা তাঁর পাহারায় নিয়োজিত ছিলেন তাঁরা বললেন, “আল্লাহর কসম, তোমরা আমাদের চেয়ে বেশি হকদার নও, শত্রুকে আমরাও বাগে পেয়েছিলাম এবং আমরা তাদেরকে হত্যা করার ইচ্ছা করেছিলাম। আর এইসব মালপত্র সংগ্রহ করতেও আমাদের কোন বাধা ছিল না এবং আমরা সংগ্রহ করতেও চেয়েছিলাম। কিন্তু শত্রুরা নতুন করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর আক্রমণ চালাতে পারে এই আশংকায় আমরা তাঁর পাহারায় নিয়োজিত হই। সুতরাং এই সম্পদে তোমাদের অধিকার আমাদের চেয়ে বেশী নয়।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহাকে মদীনার উঁচু এলাকায় এবং যায়িদ ইবনে হারিসাকে নিম্ন এলাকায় মুসলমানদের বিজয় সয়বাদ দিয়ে পাঠালেন। অতঃপর তিনি সদলবলে মুশরিক যুদ্ধবন্দীদের সাথে নিয়ে মদীনা অভিমুখে যাত্রা করলেন। যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে উতবা ইবনে আবু মুরাইত ও নাদার ইবনে হারেসও ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুশরিকদের কাছ থেকে পাওয়া গণিমতের সম্পদও সাথে নিয়ে চললেন। আবদুল্লাহ ইবনে কা’ব ইবনে আমর ইবনে আউফকে গণিমতের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব অর্পণ করলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফরা গিরিপথ থেকে বেরিয়ে যখন গিরিপথ ও নাজিয়ার মধ্যবর্তী বালুর পাহাড়ে উপনীত হলেন তখন সেখানে বসে তিনি মুসলমানদের মধ্যে গণিমতের মাল সমভাবে বণ্টন করলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুনরায় যাত্রা শুরু করলেন। রাওহাতে পৌঁছলে সাখানকার মুসলমানগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবাদের আল্লাহ যে মহাবিজয় দান করেছেন সেজন্য অভিনন্দন জানাতে লাগলেন। তখন সালামা ইবনে সুলামা (রা) বললেন, “তোমরা কিসের জন্য আমাদেরকে মুবারকবাদ জানাচ্ছ? কতকগুলো ঝানু বৃদ্ধ লোকের সাথেই তো আমরা লড়াই করে এলাম। বন্দী উটের মত তারা হীনবল হয়ে গিয়েছিল। তাই আমরা তাদের জবাই করে দিলাম।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হাসলেন এবং বললেন, “ভাতিজা ওরাই তো হর্তাকর্তা।”

সাফরা গিরিপথে পৌঁছে যুদ্ধবন্দী নাদার বিন হারেসকে হত্যা করা হলো। আবু তালিব তনয় আলী তাকে হত্যা করলেন। অতঃপরে তাঁরা পুনরায় অগ্রসর হলেন। আরকুয যারীয়াতে পৌঁছে উকবা ইবনে আবু মুয়াইতকেও হত্যা করা হলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হত্যার নির্দেশ দিলে উকবা বললো, “শিশুদের দেখাশুনার জন্য কে থাকলো, হে মুহাম্মাদ!” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংক্ষেপে শুধু বললেন, “আগুন!” অতঃপর আসেম ইবনে সাবিত ইবনে আবুল আফলাহ্ আনসারী উকবা ইবনে মুয়াইতাকে হত্যা করলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাত্রা করলেন। তিনি যুদ্ধবন্দীদের পৌঁছার একদিন আগেই মদীনায় পৌঁছলেন। যুদ্ধবন্দীরা পৌঁছলে সাহাবাদের মধ্যে তাদেরকে বণ্টন করে রাখা হলো। তারপর তিনি বললেন, “যুদ্ধবন্দীদের প্রতি তোমরা সহানুভূতির মনোভাব রাখবে।”

ওদিকে হাইসমান ইবনে আবদুল্লাহ কুরাইশদের শোচনীয় পরাজয়ের গ্লানিময় সংবাদ নিয়ে সর্বপ্রথম মক্কায় পৌঁছলো। কুরাইশগণ তাদো নিহতদের জন্য বিলাপ করতে লাগলো। তারপর সংযত হয়ে পরস্পরকে বলতে লাগলো, “এমন বিলাপ করো না। মুহাম্মাদ ও তার অনুচররা জানতে পাররে খুশীতে বগল বাজাবে। আর বন্দীদের খালাস করিয়ে আনতে তাড়াহুড়ো করো না যাতে মুহাম্মাদ ও তার অনুচররা মুক্তিপণ আদায়ের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কড়াকড়ি করার সুযোগ পায়।” আবদুল মুত্তালিব তনয় আসওয়াদ তার তিন ছেলেকে হারিয়েছিল। ছেলে তিনটি হলো: যামআ, আকীল ও হারেস। তার ইচ্ছা হচ্ছিল ছেলেদের জন্য বিলাপ করতে। এই সময় গভীর রাতে সে এক শোকাহত নারী কণ্ঠের কান্না শুনতে পেল। দৃষ্টিশক্তিহীন আসওয়াদ তার এক গোলামকে বললো, “যাও তো খোঁজ নিয়ে এসো, উচ্চস্বরে বিলাপ করা বৈধ করা হয়েছে কিনা। দেখ, কুরাইশগণ তাদের নিহতদের জন্য কাঁদছে কিনা। তাহলে আমি যামআর জন্য কাঁদবো। কেননা আমার কলিজা পুড়ে গেছে।” গোলাম ফিরে এসে জানালো, “এক মহিলা তার উট হারিয়ে বিলাপ করছে। এ কথা শুনে আসওয়াদ নিম্নলিখিত কবিতা আবৃত্তি করলো, “ঐ মহিলা একটা উটের জন্য এমন করে রাত জেগে কাঁদছে, এ কেমন কথা? আসলে কিন্তু সে জওয়ান উটের জন্য নয় বরং এমন এক পূর্ণিমার চাঁদের জন্য কাঁদছে, যার সৌভাগ্য খুবই সীমিত। সেই পূর্ণিমার চাঁদ যার জন্য বনু হুসাইস, মাখযুম ও আবুল ওয়ালীদের গোত্র ক্রন্দনরত। যদি আমি কাঁদি তাহলে আকীরের জন্য ও বীর কেশরী হারেসের জন্য কাঁদার মানুষ অনেক রয়েছে। সেই অসংখ্য কান্নারত লোকের উল্লেখ করা সম্ভব নয়। বস্তুত: যামআর কোন জুড়ি নেই।”

অতঃপর কুরাইশগণ যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিপণ দিযে খালাস করে আনার আয়োজন করলো। প্রথমে তারা সুহাইল ইবনে আমরকে মুক্ত করার জন্য তাদের সম্মতি নেয়ার পর মুসলমানগণ বললেন, “এবার পণের অর্থ দাও।” মিকরায বললো, “তোমরা সুহাইলের পরিবত্যে আমাকে আটক করে রেখে তাকে ছেড়ে দাও যাতে সে গিয়ে তার পণের অর্থ পাঠিয়ে দিতে পারে।” এ কথায় সম্মত হয়ে তাঁরা সুহাইলকে ছেড়ে দিলেন এবং তার বদলে মিকরাযকে বন্দী করে রাখলেন। তার আগে উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাকে অনুমতি দিন সুহাইলের সামনের দাঁত উপড়ে ফেলি যাতে কথা বলতে তার জিহ্বা বেরিয়ে আসে এবং আপনার বিরুদ্ধে আর কখনো বক্তৃতা দিয়ে বেড়াতে না পারে।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আমি তার চেহারা বিকৃত করবো না। তাহলে নবী হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ আমার চেহারা বিকৃত করে দেবেন।”

যুদ্ধবন্দীদের একজন ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামাতা, তাঁর কন্যা যয়নাবের স্বামী আবুল ‘আস ইবনে রাবী ইবনে আবদুল উয্যা। যয়নাবের ইসলাম গ্রহনের ফলে আবুল আসের সাথে তার বিচ্ছেদ ঘটে, কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কার্যতঃ তাদের বিচ্ছেদ ঘটাতে সক্ষম ছিলেন না। তাই যয়নাব মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও মুশরিক স্বামীর ঘর করতে থাকেন। এই অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরাত করেন। পরে কুরাইশরা বদরের যুদ্ধে গেলে আবুল আসও তাদের সাথে যোগ দেয়। এভাবে সে যুদ্ধবন্দীদের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং মদীনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নীত হয়।

অতঃপর মক্কাবাসীরা যুদ্ধবন্দীদেরকে মুক্ত করার জন্য মুক্তিপণ পাঠাতে লাগলো। যয়নাবও আবুর আ’স ইবনে রাবী’র মুক্তিপণ বাবদ কিছু টাকা ও বিয়ের সময় খাদীজার দেয়া হার পাঠিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হারখানি দেখে আবেগে উদ্বেলিত হয়ে উঠলেন। সাহাবীদেরকে তিনি বললেন, “তোমরা যদি ভাল মনে কর তবে যয়নাবের পাঠানো মুক্তিপণ ফেরত দিয়ে তার বন্দীকে মুক্ত করে দিতে পার।” সাহাবীগণ তাকে মুক্তি দিলেন এবং মুক্তিপণ বাবদ পাঠানো টাকা ও হার ফেরত দিলেন।

আবুল ‘আস মক্কায় গিয়ে এবং যয়নাব মদীনায় এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বাস করতে লাগলেন। ইসলাম তাদের বিচ্ছেদ ঘটালো। মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে আবুল ‘আস ব্যবস্ায় উপলক্ষে সিরিয়া গেল। তার কাছে নিজের ও কুরাইশদের ব্যবসার টাকা আমানত হিসেবে ছিল যা তাকে মূলধন হিসেবে দেয়া হয়েছিল। সে কেনাবেচা সম্পন্ন করার পর যখন প্রত্যাবর্তন করছিল তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেরিত একটি বাহিনী তার পণ্যদ্রব্য কেড়ে নেয় এবং আবুল ’আস পালিয়ে আত্মরক্ষা করে। সেনাদল যখন রাসূলের কন্যা যয়নাবের নিকট উপস্থিত হয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করলো। যয়নাব তাকে আশ্রয় দিলেন। সে তার জিনিসপত্র ফেরত চাইতে এসেছিল। সকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায পড়তে গেলেন এবং সাহাবীদের সাথে সামাযে দাঁড়ালেন। তখন যয়নাব নারীদের কক্ষ থেকে চিৎকার করে বললো, “হে জনগণ, শুনে রাখ, আমি আবুল ’আস ইবনে রাবী’কে আশ্রয় দিয়েছি।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাম ফেরানোর পর সবার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, “হে মুসলমানগণ, আমি যে কথা শুনতে পেরেছি, তোমরাও কি তা শুনেছো?” সবাই বললো, “হ্যাঁ শুনেছি।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আল্লাহর কসম, এই ঘোষণা শুনবার আগে আমি এ ঘটনার কিছুই জানতাম না। চুক্তি অনুসারে যে কোন ব্যক্তি মুসলমানদের নিকট আশ্রয় নিতে পারে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কন্যার কাছে গিয়ে তাঁকে বললেন, “যয়নাব, আবুল আসকে সযতেœ রাখ। কিন্তু সে যে নির্জনে তোমার কাছে না আসে। কেননা তুমি এখন তার জন্য হালাল নও।”

আবদুল্লাহ ইবনে আবু বাক্র বলেন, যে সেনাদলটি আবুল আসের জিনিসপত্র ছিনিয়ে এনেছিল তাদের কাছে তিনি বার্তা পাঠালেন, “তার সাথে আমাদের সম্পর্ক কি তা তোমরা জান। তোমরা তার কিছু জিনিস হন্তগত করেছো। তোমরা যদি সদয় হয়ে তার জিনিস ফিরিয়ে দাও, তবে তা হবে আমাদের পছন্দনীয়। আর যদি না দিতে চাও ওটা গণিমতের মাল যা আল্লাহ তোমাদের দিয়েছেন। এসব সম্পদের আইনগত অধিকারী তোমরাই।” তাঁরা বললো, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা বরং তার জিনিস তাকে ফিরিয়েই দেব।” এরপর কেউ বালতি নিয়ে এলো। কেউ তার পুরনো মশক, কেউ তার চামড়ার পাত্র এবং কেউবা তার ছোট একটা কাঠের হাতল পর্যন্ত ফিরিয়ে দিল। এভাবে তার সব জিনিস সে হুবহু ফেরত পেলো। একটা জিনিসও বাকি রইলো না। পরে সে ঐসব জিনিস মক্কায় নিয়ে গেল এবং কুরাইশদের যার যে জিনিস তা তাকে ফিরিয়ে দিয়ে বললো, “হে কুরাইশগণ, তোমাদের আর কারো কোন জিনিস কি ফেরত পেতে বাকী আছে?” তারা বললো, “আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিন। আমাদের আর কোন প্রাপ্য ইেন। তুমি আমাদের সাথে একজন সত্যিকার আমানতদর ও মহৎ লোকের ন্যায় আচরণ করেছো।” তখন সে বললো, “তাহলে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আমি শুধু এ আশংকায় ইসলাম গ্রহণ করিনি যে, তোমরা হযতো ভাবতে আমি তোমাদের সম্পদ আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যেই এরূপ করেছি। আল্লাহ যখন এগুলো তোমাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার ব্যাবস্থা করেছেন এবং আমি দায়মুক্ত হয়েছি, তখনই আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম।” অতঃপর আবুল আস (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট চলে আসেন।

বদরের যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে যাদের অনুকম্পা প্রদর্শন করে মুক্তিপণ ছাড়াই মুক্তি দেয়া হয়েছির তারা হলেন: আবুল আস ইবনে রাবী, মুত্তালিব ইবনে হানতাব, সাইফী ইবনে আবু রিফায়া এবং আবু আযযা আমর ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উসমান। আবু আযযা ছিল দরিদ্র এবং বহু কন্যাদায়গ্রস্ত। সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গিয়ে বললো, “হে আল্লাহর রাসূল, আমার কি অর্থ সম্পদ আছে তা আপনার জানা। আমি অত্যন্ত অভাবী এবং বহু সন্তানভারে ক্লিষ্ট। অতএব আমাকে অনুকম্পা প্রদর্শন করুন।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মুক্তিপণ মাফ করে দিলেন এবং অঙ্গীকার নিলেন যে, সে আর কখনো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করবে না। আবু আযযা তার গোত্রের কাছে ফিরে গিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশংসায় নিন্মোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করে

“রাসূল মুহাম্মাদের নিকট আমার এ বার্তাটি কে পৌঁছিয়ে দেবে?

আপনি সত্য এবং বিশ্ব সম্রাট সকল প্রশংসার অধিকারী।

আপনি সেই ব্যক্তি যিনি সত্য ও ন্যায়ের দিকে আহব্বান জানান,

মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পরম সম্মানিত ও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি,

আপনি আমাদের পক্ষ থেকে পরম সম্মানিত ও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি,

আপনি যার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হন, সে চরম হতভাগা,

আর যার সাথে আপোষ করেন সে পরম ভাগ্যবান।”

মুশরিকদের থেকে যে মুক্তিপণ আদায় করা হয় তার পরিমাণ ছিল বন্দিপ্রতি এক হাজার দিরহাম থেকে চার হাজার দিরহাম। তবে বিত্তহীন ব্যক্তিকে অনুকম্পা দেখানো হয় এবং বিনা পণে মুক্তি দেয়া হয়। মোট ৮৩ জন মুহাজির, ১৬১ জন আওস গোত্রীয় আনসার এবং ১৭০ জন খাজরাজ গোত্রীয় আনসার বদর যুদ্ধে অংগ্রহণ করেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদেরকে গণিমতের অংশ দেন। বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুসলিম সংখ্যা আনাসার ও মুহাজির মিলে তিনশো চৌদ্দ জন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সবাইকে গণিমতের অংশ ও পারিশ্রমিক প্রদান করেন। বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয় ১৭ই রমযান, শুক্রবার সকাল বেলা।

 

বনু সুলাইম অভিযান

বদর যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় সাত দিন অবস্থান করেন। অতঃপর বনু সুলইম গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি নিজেই এতে নেতৃত্ব দেন এবং তাদের কাদর নামক একটি জলাশয় দখল করেন। এখানে কোন প্রতিরোধের সম্মুখীন হননি। মদীনায় শাওয়ালের বাকী দিনগুলো ও পুরো যিলকা’দ মাস কাটান। এই সময়ে তিনি কুরাইশ যুদ্ধবন্দীদের অধিকাংশকে মুক্তিপণের বিনিময়ে মুক্তি দেন।[৫৮. এই অভিযানে যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিবা ইবনে আরকাতা গিফারীকে মদীনার তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করে যান। কেউ কেউ বলেন, ইবনে উম্মে মাকতুমকে মদীনার দায়িত্ব দিয়ে যান ]

সাওয়ীক অভিযান

জিলহাজ্ব মাসেই আবু সুফিয়ান ইবনে হারব সাওয়ীক অভিযান চালায়। এই বছর মুশরিকরা হজ্ব বাদ দিয়েই যুদ্ধে এসেছিল। কেননা আবু সুফিয়ান এবং কুরাইশদের অন্যান্য লোকেরা বদর থেকে পরাজয়ের গ্লানি মাথায় নিয়ে মক্কায় ফিরেই প্রতিজ্ঞা করলো যে, মাহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর আর একটি হামলা চালিয়ে উপযুক্ত প্রতিশোধ না নেয়া পর্যন্ত স্ত্রী সঙ্গমজনিত অপবিত্রতা দূর করার জন্য গোসলের পানি মাথায় লাগাবো না [৫৯. হজ্ব ও বিয়ে শাদীর মত এই গোসলেরও রেওয়াজ জাহিলিয়াত যুগে ছিল।] এই প্রতিজ্ঞা পূরণের জন্য আবু সুফিয়ান দুশো ঘোড় সওয়ার নিয়ে রওনা হলো। নাজদিয়া অতিক্রম করে সে মদীনার অনতিদূরে অবস্থিত ‘সায়েব’ নামক পাহাড়ের পার্শ্ববর্তী একটি ঝর্ণার কাছে এসে তাঁবু স্থাপন করলো। অতঃপর রাতের আঁধারে সে বনু নাযীরের হুয়াই ইবনে আখতাবের বাড়ীতে পৌঁছে দরজায় করাঘাত করলো। হুয়াই শংকিত হয়ে দরজা খুলতে অস্বীকার করলো। অগত্যা আবু সাফিয়ান সালাম ইবনে মিশকামের কাছে গেল। এই ব্যক্তি ছিল তৎকালে বনু নাযীরের সরদার এবং তাদের আপৎকালীন সংকট মুকাবিলার জন্য সঞ্চিত তহবিলের সংরক্ষক। আবু সুফিয়ান তার বাড়িতে ঢোকার অনুমতি প্রার্থনা করলে সে অনুমতি দিল। সে তাকে আপ্যায়নও করলো। সালাম তাকে মদীনার আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অবহিত করলো। অতঃপর আবু সুফিয়ান রাত থাকতেই তার সহচরদের কাছে চলে গেল। সে কুরাইশ বাহিনীর কিছু লোককে মদীনার পাঠিয়ে দিল। তারা মদীনার পার্শ্ববর্তী উরাইব নামক স্থানে উপনীত হলো। সেখানকার খেজুর বাগানে তারা আগুন জ্বালালো। সেখানে তারা আনসার  ও তার জনৈক মিত্রকে তাদের একটি যৌথ কৃষি খামারে পেয়ে হত্যা করলো। তারপর যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকে অদৃশ্য হয়ে গেল। মদীনাবাসী তাদের এই কর্মকা- টের পেয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন। বাশীর ইবনে আবদুল মুনযিরকে মদীনার দায়িত্বে রেখে গেলেন। ‘কারকারাতুল কাদর’ নামক স্থানে পৌঁছে আবু সুফিয়ান ও তার দলবলের কোন হদিস না পেয়ে ফিরে এলেন। খামারের ভেতরে তাদের ফেলে যাওয়া কিছু জিনিসপত্র দেখতে পেলেন। হালকা হয়ে দ্রুত পালানোর উদ্দেশ্যে তারা ওগুলো ছুড়ে ফেলে দেয়।[৬০.ক্রুাইশদের ফেলে যাওয়া এই সব জিনিসের মধ্যে বেশীরভাগ ছিল গম বা জবের ছাতুÑ যা দুধ, মধু ও ঘি দিয়ে অথবা পানি দিয়ে খাওয়া যায়। এই ছাতুকে আরবীতে সাওয়ীক বলা হয়। আর এই কারনেই এই অভিযানের নাম হয়েছে ‘সাওয়ীক অভিযান।’] বিনাযুদ্ধে ফিরে আসা হলো বলে মুসলমানরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল, এটা কি আমাদের জিহাদ বলে গণ্য হবে?” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, “হ্যাঁ।”

যূ-আমার অভিযান

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাওয়ীক অভিযান থেকে ফিরে এসে যিলহাজ্ব মাসের অবশিষ্ট পুরো অথবা প্রায় পুরো সময় মদীনাতে অতিবাহিত করেন। তারপর নাজদের গাতফান গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। এই অভিযানকেই যূ-আার অভিযান বলা হয়। পুরো অথাবা প্রায় সমগ্র সফর মাস তিনি নাজদে অবস্থান করেন। পুরো রবিউল আউয়াল কিংবা অল্প কয়েকদিন বাদে রবিউল আউয়াল মাস মদীনাতেই কাটান।

বাহরানের ফুরু অভিযান

এবার কুরাইশদের বিরুদ্ধে তিনি আর একটি অভিযান পরিচালনা করলেন। তিনি হিজায অতিক্রম করে ফুরু অঞ্চল হয়ে বাহরান পৌঁছেন। সেখানে রবিউস সানী ও জামাদিউল উলা অতিবাহিত করেন। অতঃপর নিরাপদে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন।

বুন কাইনুকার যুদ্ধ

বনু কাইনুকার মূল ঘটনা ছিল এই যে, জনৈক আরব মহিলা কিছু পণ্যদ্রব্য নিয়ে বনু কাইনুকা গোত্রের বাজারে বিক্রি করে। সেখানে সে এক স্বর্ণকারের দোকানের কাছে বসে। দোকানের লোকেরা মহিলার মুখ খুলতে বলে। কিন্তু মহিলা তা করতে অস্বীকার করে। অতঃপর স্বর্ণকার এই মহিলার পরিধানের কাপড়ের একটা কোণা ধরে তার পিঠের সাথে বেঁধে দেয়। মহিলা এটা টের পায়নি। ফলে সে উঠে দাঁড়ালে অমনি উলঙ্গ হয়ে যায়। বাজারের লোকেরা তা দেখে হো হো করে হেসে ওঠে। মহিলা সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে ওঠে। জনৈক মুসলমান স্বর্ণকারের ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাকে হত্যা করে ফেলে। স্বর্ণকার ছিল ইহুদী। তাই ইহুদীরাও সংঘবদ্ধ হযে ঐ মুসলমানকে হত্যা করে। তখন নিহত মুসলমানের পরিবার-পরিজন মুসলমানদের কাছে ফরিয়াদ জানায় তারা ক্রুদ্ধ হয়ে আক্রমণ চালালে বনু কাইনুকার সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ বেঁধে যায়।

মদীনার ইহুদীদের মধ্যে বনু কাইনুকাই সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাদের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি ভঙ্গ করে। ফলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে অবরোধ করে অনুকূল শর্তে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেন। এভাবে আল্লাহর সাহায্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে নতজানু করলে, আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবসে সুলুল তাঁর কাছে এসে বললো, “হে মুহাম্মাদ, আমার মিত্রদের প্রতি সহৃদয় আচরণ করুন।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এ কথায় কোন উত্তর দিলেন না। সে আবার বললো, “হে মুহাম্মাদ, আমার মিত্রদের সাথে সদয় আচরণ করুণ।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এবার সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্মের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিলে তিনি বললেন, “আমাকে ছাড়।” এই সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত ক্রুদ্ধ হন যে, তাঁর মুখম-ল রক্তিম হয়ে যায়। অতঃপর তিনি তাকে বললেন, “আরে। আমাকে ছাড় তো।” সে বললো, “না, আমার মিত্রদের সাথে সদয় আচরণের নিশ্চয়তা আগে দিন, তারপর ছাড়বো। বিশ্বাস করুন, চারশো নাঙ্গামাথা যোদ্ধা এবং তিনশো বর্মধারী যোদ্ধা আমাকে সারা দুনিয়ার মানুষ থেকে নিরাপদ করে দিয়েছে। আর আপনি কিনা একদিনেই তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাচ্ছেন। আমি তাদের ছাড়া এক মুহূর্তও নিরাপদ নই”। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আচ্ছা, বেশ। ওদেরকে তোমার মর্জির ওপর ছেড়ে দিলাম।”

এরপর উবাদা ইবনে ছামিত (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে হাজির হলেন। বনু কাইনুকার সাথে তাঁরও মৈত্রী সম্পর্ক ছিল। কিন্তু তাঁর কোন পরোয়া না করে তিনি তাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিলেন এবং তাদের সাথে তার কৃত চুক্তির দায়দায়িত্ব থেকে তিনি আল্লাহ ও রাসূলের সামনে নিজেকে মুক্ত বলে ঘোষণা করলেন।তিনি বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার মিত্র ও বন্ধু শুধুমাত্র আল্লাহ, রসূল ও মু’মিনগণ। এসব কাফিরের মৈত্রী থেকে আমি সম্পূর্ণ মুক্ত।”

উবাদা ইবনে ছামিত ও আবদুল্লাহ ইবনে উবাই সম্পর্কেই সূরা মায়িদার নিম্নলিখিত আয়াতগুলো নাযিল হয়,

“হে মুমিনগণ, তোমরা ইহুদী ও খৃস্টানদের কখনো বন্ধু ও মিত্র হিসেবে গ্রহণ করো না। ওরা পরস্পরের মিত্র। তোমাদের মধ্য হতো যে ব্যক্তি তাদেরকে মিত্র হিসেবে গ্রহণ করবে সে তাদেরই দলভুক্ত গণ্য হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ যালিমদেরকে সুপথ দেখান না। যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে তাদেরকে তুমি দেখতে পাবে ইহুদী ও খৃস্টানদের ব্যাপার নিয়ে ছুটোছুটি করে আর বলে: আমাদের আশংকা হয়, আমাদের ওপর বিপদ-মুসিবত এসে পড়ে কিনা। আল্লাহ তো বিজয় দিতে পারেন কিংবা নিজের পক্ষ থেকে অন্য কোন ঘটনা ঘটিয়ে দিতে পারেন। তখন তারা মনের ভেতরে লুকানো ব্যাপার নিয়ে অনুতপ্ত হবে। মুমিনরা বলেঃ এই নাকি কসম খেয়ে লম্বা লম্বা বুলি আওড়ানো সেই লোকদের অবস্থা যারা বলে যে, তারা তোমাদের সাথেই রয়েছে। তাদের সমস্থ নেক আমল বরবাদ হয়ে গেছে। ফলে তারা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে। হে মু’মিনগণ, তোমাদের মধ্য হতে যদি কেউ তার দীন ত্যাগ করে, তাহলে সেদিন বেশী দূরে নয় যখন আল্লাহ এমন একটি দলের আবির্ভাব ঘটাবেন, যাদেরকে আল্লাহ ভালোবাসেন এবং যারা আল্লাহকে ভালোবাসে, যারা মু’মিনদের প্রতি বিনয়ী এবং কাফিরদের প্রতি কঠোর, যারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কারো নিন্দা বা তিরস্কারের পরোয়া করবো না। এরূপ দৃঢ় হতে পারাটা আল্লাহ অনুগ্রহ বিশেষ। যাকে তিনি দিতে চান, এ অনুগ্রহ দিয়ে থাকেন। বস্তুত: আল্লাহর সর্বত্র অনুগ্রহ বিশেষ। যাকে তিনি দিতে চান, এ অনুগ্রহ দিয়ে থাকেন। বস্তুত: আল্লাহর সর্বত্র বিরাজিত সর্বজ্ঞ। তোমাদের বন্ধু ও মিত্র তো একমাত্র আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং সেই সব মু’মিন যারা নামাযী, যাকাত দাতা ও আল্লাহর অনুগত। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মু’মিনদের মিত্র হিসেবে গ্রহণ করবে সে আল্লাহর দলভুক্ত হবে এবং তার জেনে রাখা উচিত যে, আল্লাহর দলই চূড়ান্ত বিজয় লাভ করে থাকে।”

যায়িদ ইবনে হারিসার কারাদা অভিযান

কারাদা নাজদের একটি জলাশয়। এখানে অভিযান পরিচালনার কারণ ছিল এই যে, বদরের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কুরাইশরা তাদের সিরিয়া যাতায়াতের চিরাচরিত পথে চলাচল বিপদজ্জনক মনে করে ইরাকের পথ ধরে যাতায়াত করা শুরু করলো। আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে একটি ব্যবসায়ী দল এই পথ দিয়ে সিরিয়া অভিমুখে যাত্রা করে। তাদের সাথে তাদের প্রধান পণ্যদ্রব্য ছিল বিপুল পরিমাণ রৌপ্য। বনু বাক্র ইবনে ওয়ায়িলের ফুরাত ইবনে হাইয়ান ছিল তাদের ভাড়াটে পথপ্রদশক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই কাফিলাকে আক্রমণ করার জন্য যায়িদ ইবনে হারিসাকে পাঠালেন। তিনি কারাদার গিয়ে কাফিলাকে ধরলেন। কাফিলার লোকজন প্রাণভয়ে পালিয়ে গেলে তিনি পণ্যসম্ভারসহ সমগ্র কাফিলাটিকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট হাজির হলেন।

উহুদ যুদ্ধ

বদর যুদ্ধ থেকে পরাজয়ের কলংক মাথায় নিয়ে কুরাইশ কাফিররা যখন মক্কায় পৌঁছলো এবং আবু সুফিয়ান তার কাফিলা নিয়ে মক্কায় ফিরে গেল তখন আবদুল্লাহ ইবনে আবু রাবীআ, ইবরিমা ইবনে  আবু জাহল ও সাফওয়ান ইবনে উমাইয়াসহ কুরাইশদের একটি দলÑ যাদের পিতা, পুত্র কিংবা ভাই যুদ্ধে নিহত হয়েছিল, আবু সুফিয়ানের কাছে গেল। আবু সুফিয়ানের ঐ কাফিলায় সেবার যে মুনাফা অর্জিত হয় তা তখনো তর কাছেই ছিল। তারা বললো, “হে কুরাইশগণ, মুহাম্মাদ তোমাদের বিরাট ক্ষতি সাধন করেছে এবং তোমাদের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের হত্যা করেছে। এবার এই কাফিলার যাবতীয় সম্পদ দিয়ে আমাদেরকে সাহায্য কর, তাহলে আশা করি আমরা আমাদের হারানো লোকদের উপয্ক্তু প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারবো।” সবাই সম্মতি দিল।

অতঃপর আবু সুফিয়ান, তার কাফিলার অন্তর্ভুক্ত অকুরাইশীগণ, বিশেষত: কিনানা গোত্র ও তিহামাবাসীদের মধ্যে যারা কুরাইশদের প্রতি অনুগত ছিল, যুদ্ধে যেতে সম্মাতি দিল, তখন কুরাইশগণও মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। প্রতিহিংসা বৃত্তিকে  উস্কিয়ে দেয়ার জন্য এবং যোদ্ধাদের পালানো রোধ করার জন্য কুরাইশরা তাদের কিছু সংখ্যাক মহিলাকেও সঙ্গে নিল। সেনাপতি আবু সুফিয়ান স্বীয় স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবাকে, উকরিমা বিন আবু জাহল উম্মে হাকিম  বিনতে হারেসকে, হারেস বিন হিশাম ফাতিমা বিনতে ওয়ালীদকে, সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া বারযা বিনতে মাস’উদকে এবং আমর ইবনুল আস বারিতা বিনতে মুনাব্বিহকে সঙ্গে নিল। অতঃপর তারা মদীনা অভিমুখে  অগ্রসর হলো।মদীনার সম্মাুখস্থ উপত্যাকার মুখে অবস্থিত খাল থেকে নির্গত দুইটি ঝর্নার কিনারে বাতনুস সুবখার পাহাড়ের কাছে গিয়ে তাঁবু স্থাপন করলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলমানগণ তাদের ঐ স্থানে অবস্থান গ্রহণের কথা শুনতে পেলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদেরকে সম্বোধন করে বললেন, “আমি একটি ভাল স্বপ্ন দেখেছি। দেখলাম, আমার একটি গরু জবাই করা হয়েছে। আর আমার তরবারীর ধারালো প্রান্তে যেন ফাটল ধরেছে। আরো দেখলাম, আমি একটা সুরক্ষিত বর্মের ভেতরে হাত ঢুকিয়েছি।[ ৬১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “গরু জবাই এর তাৎপর্য এই যে, আমার কিছু সংখ্যক সাহাবী নিহত হবে। আর আমার তরবারীর ধারালো প্রান্তে যে ফাটল দেখলাম সেটা আমার পরিবারভুক্ত এক ব্যক্তি নিহত হওয়ার আলামত।”]এই বর্ম দ্বারা আমি মদীনাকে বুঝেছি। তোমরা যদি মনে কর, মদীনায় অবস্থান করবে এবং কুরাইশরা যেখানে অবস্থান নিয়েছে, সেখানে থাকাকালেই তাদেরকে যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ দেবে, তাহলে সেটা করতে পার। তারপরও যদিওরা ওখানেই অবস্থান করে তাহলে সেটা তাদের জন্য খুবই খারাপ অবস্থান বলে প্রমাণিত হবে। আর যদি তারা মদীনায় প্রবেশ করে তাহলে মদীনায় বসেই আমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করবো।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসলে মদীনার বাইরে যেতে চাচ্ছিলেন না। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সুলুলেরও মত ছিল অনুরূপ মদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার বিপক্ষে। কিন্তু মুসলমানদের মধ্যে যারা বদর যুদ্ধে অংশ নিতে পারেননি এবং যাদের জন্য আল্লাহ উহাদ ও অন্যান্য যুদ্ধে যোগদানের সৌভাগ্য নির্ধারণ করে রেখেছিলেন তাঁরা বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, শত্রুর মুকাবিলার জন্য আমাদেরকে মদীনার বাইরে নিয়ে চলুন। ওরা যেন মন করতে না পারে যে, আমরা দুর্বল কিংবা কাপুরুষ হয়ে গেছি।”

আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সুলুল বললো, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, মদীনাতেই অবস্থান নিন, বাইরে যাবেন না। আল্লাহর কসম,আমরা মদীনার বাইরে গেলেই শত্রুরা আমাদের ক্ষতি বেশী করতে পারবে। আর শত্রুরা যদি মদীনায় প্রবেশ করে আক্রমণ চালায় তাহলে আমরা শত্রুদের অধিকতর বিপর্যয় ঘটাতে পারবো। অতএব হে আল্লাহর রাসূল, কাফিররা যেমন আছে ওদেরকে তেমনি থাকতে দিন। তারা যদি ওখানেই থেকে যায় তাহলে এ জায়গাটা তাদের জন্য জঘন্যতম অবরোধস্থল বলে সাব্যস্ত হবে। আর যদি তারা মদীনায় প্রবেশ করে তাহলে আমাদের পুরুষরা তাদের  সাথে মুখোমুখি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবে এবং স্ত্রী ও শিশুরা ওপর থেকে তাদের প্রতি পাথর নিক্ষেপ করবে। আর যদি ফিরে যায় তাহলে যেমন এসেছিল তেমনি ফিরে যাবে।” পক্ষান্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যেসব মুসলমান মদীনার বাইরে কুরাইশদের সাথে লড়াই করতে আগ্রহী ছিলেন, তারা তাঁদের ইচ্ছা প্রকাশ করতে লাগলেন। ইতোমধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ ঘরে প্রবেশ করলেন এবং যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হলেন। সে দিনটি ছিল জুম’আর দিন। একই দিন মালিক ইবনে আমর নামক জনৈক আনসার ইন্তিকাল করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জানাযা পড়লেন। অতঃপর মুসলিম জনতার সামনে আসলেন। তিনি মদীনায় বসেই কুরাইশদের মুকাবিলা করতে চেয়েছিলেন ভেবে মুসলমানগণ অনুতপ্ত হলো। তারা বললো, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা আপনার মত পছন্দ করিনি,এটা আমাদের উচিৎ হয়নি। আপনি যদি মদীনাতেই অবস্থান করতে চান তবে তাই করুন।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “না, তা হয় না, যুদ্ধের পোশাক পরার পর যুদ্ধ না করে তা খুলে ফেলা কোন নবীর পক্ষে শোভা পায় না।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাজার সাহাবীকে সঙ্গে নিয়ে রওয়ানা হলেন। মদীনা ও উহুদের মধ্যবর্তী শাওত নামক স্থানে পৌঁছার পর প্রায় এক তৃতীয়াংশ লোক নিয়ে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সুলুল আলাদা হয়ে গেল। সে বললো, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওদের কথা শুনলেন, আমার কথা শুনলেন না। হে জনতা, আমি বুঝি না আমরা কিসের জন্য এতগুলো লোক প্রাণ দেবো?”

সে তার গোত্রের মুনাফিক ও সংশয়মান অনুসারীদের সাথে নিয়ে মুসলিম বাহিনী থেকে বিচ্ছন্ন হয়ে গেলো। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম তদের পিছু পিছু গেলেন এবং বললেন, “আমি তোমাদেরকে দোহাই দিচ্ছি। তোমাদের মুসলমান ভাইদেরকে এবং আল্লাহর নবীকে উপস্থিত শত্