সুন্নাত ও বিদয়াত

প্রাথমিক কথা

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) যে আদর্শ দুনিয়ার মানুষের সামনে উপস্থাপিত করেছেন, এক কথায় তা-ই  সুন্নাত এবং তার বিপরীত যা কিছু তা বিদয়াত এর পর্যায়ে গণ্য। নবী করীম (সাঃ) ‍এর তেইশ বছরের অবিশ্রান্ত সাধনা ও সংগ্রামের মাধ্যমে যে সমাজ গড়ে তুলেছিলেন, তাকে তিনি মুক্ত করেছিলেন সকলপ্রকার বিদয়াত ও জাহিলিয়াতের অক্টোপাশ থেকে এবং প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন সুন্নাতের আলোকোদ্ভাসিত মহান আদর্শের উপর। বিশ্ব মানবতার পক্ষে এ ছিল মহা সৌভাগ্যের ব্যাপার।

উত্তরকালে নানা কারণে মুসলিম সমাজ সুন্নাতের আদর্শ হতে বিচ্যূত হয়ে পড়ে, তাদের আকীদা ও আমলে প্রবেশ করে অসংখ্য বিদয়াত। এমন দিনও দেখা যায়, যখন মুসলমানরা সুন্নাত ও বিদয়াতের সংমিশ্রণে এক জগাখিচুড়ী বিধানকেই ইসলামী আদর্শ বলে মনে করতে ও অনুসরণ করতে শুরু করে। ফলে তাদের জীবনে আসে সার্বিক ভাঙন ও বিপর্যয়। বর্তমান সময় সে বিপর্যস্ত পরিবেশ ও পরিস্থিতিই গ্রাস করেছে সমগ্র বিশ্বমুসলিমকে।

কিন্তু এ অবস্থা বাঞ্চনীয় নয় মুসলমানদের জন্য। কারো পক্ষেই কাম্য হতে পারেনা এ আদর্শের বিচ্যূতি। এজন্য আজ নতুন করে লোকদের সামনে ইসলামী আদর্শবাদের ব্যাপক ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ অপরিহার্য্য, যেন মুসলমানদের মনে চেতনা জেগে উঠে, উদ্দীপ্ত হয়ে উঠে তাদের অবস্থার পরিবর্তনের পুনর্জাগরণের এবং নতুন করে আদর্শবাদী হয়ে উঠার এক উদগ্র বাসনা। এ পর্যায়ে আমার ক্ষুদ্র লেখনী-শক্তি যতোটুকু কাজ করেছে, তার মধ্যে বর্তমান গ্রন্থ একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। সুন্নাত ও বিদয়াতের মৌলিক ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ এবং আকীদা বিশ্বাসে, জীবনে ও সমাজে কোথায় কোথায় সুন্নাত থেকে বিচ্যূতি আর বিদয়াতের অনুপ্রবেশ ঘটেছে তা স্পষ্ট করে তুলে ধরাই আমার এ গ্রন্থ রচনার মূলে একমাত্র উদ্দেশ্য। এ উদ্দেশ্য কতখানি সফল হয়েছে কিংবা আদৌ তা সাফল্যের দাবি করতে পারি কিনা পাঠকবর্গ-ই তা বিবেচনা করবেন। আমার বক্তব্য শুধু এতটুকু যে, যা কিছু লিখেছি গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করে বুঝে শুনে লিখেছি, সঠিক কথা সুস্পষ্টভাবে পেশ করার জন্যই লিখেছি, লিখেছি কুরআন-হাদীস, ফিকাহ ও সর্বজনমান্য মনীষীদের মতামতের ভিত্তিতে। এ বইয়ে আলোচিত মতামতের জন্য ব্যক্তিগতভাবে আমি-ই দায়ী এবং যদি কাউকে দায়ী করতে হয় সেজন্য কেবল আমাকেই দায়ী করা যেতে পারে, অন্য কাউকে নয়। এ আলোচনায় আমি কোন ভুল করে থাকলে, কারো দোহাই দিয়ে নয়, কুরআন-হাদীসের ভিত্তিতেই আমার ভুল ধরিয়ে দেয়া যেতে পারে। এ ধরণের যে কোনো ভুলের সংশোধন করে নিতে আমি সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত।

এতদসত্ত্বেও আমার এ প্রচেষ্টা যদি আদর্শকে সমুজ্জল করে তোলবার এবং বিদয়াতের অন্ধকার বিদূরণে সামান্য কাজও করতে সক্ষম হয় তাহলে আমার শ্রম সার্থক মনে করবো এবং তাকে পরকালে আল্লাহর নিকট মুক্তিলাভের অসীলারূপে মনে করে তাঁর শোকরিয়া আদায় করবো।

মুহাম্মাদ আবদুর রহীম

 

দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা

আমার লিখিত ‘সুন্নাত ও বিদয়াত’ গ্রন্থখানি ১৯৬৭ সনের সেপ্টেম্বর মাসে সর্ব প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। অতঃপর অল্প দিনের মধ্যেই তাঁর সমস্ত কপি নিঃশেষ হয়ে যায়। গ্রন্থখানি যে বিদগ্ধ সমাজের নিকট সমাদৃত হয়েছে এবং চিন্তার জগতে তা যে বিশেষ আলোড়নের সৃষ্টি করেছে, তা তখনই স্পষ্ট বুঝতে পারা গিয়েছিল। বস্তুত আমাদের সমাজে যুগ যুগ ধরে সিঞ্চিত ও পুঞ্জীভূত বিদয়াতের উপর এ গ্রন্থখানি এক প্রচন্ড আঘাত হেনেছিল এবং বিদয়াতের পূজীরী ও বিদয়াত আশ্রিত গোষ্ঠী এ আঘাতে হতচকিত ও ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পড়েছিল। চারদিকে ‘গেল গেল’ রব ধ্বনিত হয়ে উঠেছিল। চলমান বিদয়াতের এটা ছিল আমার একটা চ্যালেঞ্জ।স্বভাবতই আমি আশা করেছিলাম, বিদয়াত পন্থীদের পক্ষ হতে এর প্রতিবাদ হয়তো আসবে।

কিন্তু কার্যত দেখা গেল, এ গ্রন্থের অকাট্য শাণিত ও অমোঘ আঘাতের জবাবে বিদয়াত পন্থীদের নিকট বলার মতো কোন কথা নেই। যদিও তারা আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করতে ত্রুটি করেনি। অতঃপর সংশ্লিষ্ট মহলসমূহ নীরবতা অবলম্বন ছাড়া আর কোন পথ খুঁজে পায়নি। আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়েছি এ দেখে যে, আমি পর্বত সমান বিদয়াতের বিরুদ্ধে যে কথা বলেছি, কোন অকাট্য দলীল দ্বারা তা রদ করার সাধ্য কোন মহলেরই নেই। আমি মহান আল্লাহর শোকর আদায় করছি এ জন্য যে, এ কালের পুঞ্জীভূত বিদয়াতের বিরুদ্ধে হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর সুন্নাত আদায় করা এবং ইমাম ইবনে তাইমিয়া ও মুজাদ্দিদে আলফেসানী (র)-র আদর্শ অনুসরণের কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভবপর হয়েছে তা যত সামান্য ও যত ক্ষুদ্রই হোকনা কেন।

 এই প্রসঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, আমি পীর-মুরীদী ব্যবস্থাকে ‘সুন্নাত’ বিরোধী ও বিদয়াত প্রমাণ করেছি, কিন্তু এদেশে আলিম ও পীরসাহেবান আবহমানকাল ধরে ইসলামের যে বিরাট খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন, এ দেশে এখনো যে দ্বীন ইসলামের নাম নিশানা রয়েছে তার পেছনে তাঁদের যে অপরিসীম অবদান রয়েছে, আমি তা অবশ্যই স্বীকার করেছি।

বিগত প্রায় দশটি বছর যাবত গ্রন্থটি পূর্ণমুদ্রণ সম্ভবপর হয়নি কোনো দুঃসাহসী প্রকাশক পাওয়া যায়নি বলে। বর্তমানে জনাব মোঃ আতাউর রহমান কর্তৃক তা নতুনভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এতে অনেক কয়টি নতুন বিষয় সংযোজিত হয়েছে  এবং প্রথম সংস্করণের অনেক কথা অধিকতর বলিষ্ঠ ও যুক্তিসহ পুনর্লিখিত হয়েছে। তত্ত্ব ও তথ্যের তুলনায় পূর্বের তুলনায় যথেষ্ট সমৃদ্ধ হয়েছে এ সংস্করণটি।

তাই সহজেই আশা করতে পারি, প্রথম সংস্করণের তুলনায় এই সংস্করণ বিদগ্ধ পাঠক সমাজের নিকট অনেক বেশি সমাদৃত হবে। নতুন করে গ্রন্থখানি পাঠক সমাজের নিকট উপস্থাপিত করতে পারলাম দেখে মহান আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া আদায় করছি।

মুহাম্মদ আবদুর রহীম

 

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

‘সুন্নাত’ ও ‘বিদয়াত’ দুটোই আরবী শব্দ। তা সত্ত্বেও মুসলিম সমাজে এ দুটো শব্দ ব্যাপকভাবে পরিচিত এবং ইসলামের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এ শব্দ দুটো বহুল ব্যবহৃত। কিন্তু যতদূর বোঝা যাচ্ছে, এ দুটো পরিভাষার সঠিক তাৎপর্য অনেকেই অনুধাবন করতে সক্ষম নয়। অথচ ইসলামী সংস্কৃতির যতোগুলো মৌলিক পরিভাষা রয়েছে, যে-সব পরিভাষার উপর ইসলামী জীবন-ব্যবস্থার সম্যক অনুধাবন নির্ভরশীল, এ দুটো শব্দ তার মধ্যেই গণ্য। অতএব এ দুটো শব্দের সঠিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ এবং এ দুটোর দৃষ্টিতে বর্তমান বিশ্ব-মুসলিম এর আকীদা, আমল ও আখলাক যাচাই ও পরখ করা একান্তই জরুরী, যদিও বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা সাপেক্ষ।

এ বিষয় আলোচনার প্রয়োজনীয়তা আরো অধিক তীব্র হয়ে দেখা দেয়, যখন আমরা দেখতে পাই যে, বর্তমান মুসলিম সমাজে কার্যত সুন্নাত ও বিদয়াতের মাঝে কোন পার্থক্য করা হয়না। শুধু তাই নয়, বহু রকমের সুন্নাত সমর্থিত ও সুন্নাতের দৃষ্টিতে অপরিহার্য-অবশ্য করণীয় কাজ আজ্ও মুসলিম সমাজেই সাধারণভাবে পরিত্যক্ত হয়ে রয়েছে এবং বহু প্রকারের বিদয়াত সুন্নাতের মতই গুরু্ত্ব লাভ করে শক্তভাবে শিকড় গেড়ে এবং শাখা প্রশাখায়, পত্র ও ফুলে ফলে সুশোভিত হয়ে বসে আছে। এখন অবস্থা এই যে, বর্তমান মুসলিম সমাজের চেহারা দেখে, তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক সামগ্রিক কার্যক্রম দেখে এবং জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের বাস্তব ভূমিকা লক্ষ্য করে বুঝবার কোন উপায় নেই যে, কোনটি সুন্নাত আর কোনটি বিদয়াত।আজকের মুসলিম জীবনে সুন্নাতের দিকপ্লাবী নির্মল আলোকচ্ছটা ম্লান হয়ে এসেছে এবং তদস্থলে বিদয়াতের কালো আঁধার সর্বত্র ছেয়ে আছে, গ্রাস করে ফেলেছে সমগ্র মুসলিম জীবনকে। বিদয়াতের এ রাহুগ্রাস হতে মুক্তি পাওয়া না পর্যন্ত সুন্নাতের স্বচ্ছ আলোকধারায় মুসলিম জীবনকে উদ্ভাসিত করে তোলা কিছুতেই সম্ভবপর হবেনা, হতে পারেনা। ঠিক এ উদ্দেশ্যে অনুপ্রাণিত হয়ে-ই আমরা এ আলোচনায় প্রবৃত হয়েছি।

সুন্নাত বিদয়াতের ব্যাখ্যা তাৎপর্য

প্রথমে আমরা মৌলিকভাবে এ শব্দ দুটোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা পেশ করতে চাই, বুঝতে চাই ইসলামী পরিভাষা হিসেবে ‘সুন্নাত’ বলতে কি বুঝায় এবং আহলে সুন্নাতই বা কারা? এবং বিদয়াত কি এবং সে বিদয়াত কতো দিক দিয়ে সচেতন বা অবচেতনভাবে মুসলিম সমাজকে গ্রাস করে ফেলেছে।

সুন্নাতশব্দের ব্যাখ্যা

‘সুন্নাত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘পথ’।

কুরআন মজীদে এ ‘সুন্নাত’ শব্দটি বহু ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে।

একটি আয়াত হলোঃ

 سُنَّةَ اللَّهِ الَّتِي قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلُ ۖ وَلَن تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَبْدِيلًا [٤٨:٢٣]

আল্লাহর সুন্নাত, যা পূর্ব থেকেই কার্যকর হয়ে রয়েছে। আর আল্লাহর এ সুন্নাতে কোনরূপ পরিবর্তন দেখবেনা কখনো।(আল ফাতহঃ48)

অপর আয়াতে বলা হয়েছেঃ فَلَن تَجِدَ لِسُنَّتِ اللَّهِ تَبْدِيلًا ۖ وَلَن تَجِدَ لِسُنَّتِ اللَّهِ تَحْوِيلًا

-তুমি আল্লাহর সুন্নাতে কোনরূপ পরিবর্তন হতে- কোনো প্রকারের ব্যতিক্রম হতে দেখবেনা।(আল ফাতীরঃ42)

সূরা বনি ইসরাঈলেও ‘সুন্নাত’ শব্দটি একই আয়াতে দুবার ব্যবহৃত হয়েছে।

আয়াতটি- سُنَّةَ مَن قَدْ أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ مِن رُّسُلِنَا ۖ وَلَا تَجِدُ لِسُنَّتِنَا تَحْوِيلًا [١٧:٧٧]

-তোমার পূর্বে যেসব রাসূল পাঠিয়েছি এ হচ্ছে তাদের ব্যাপারে সুন্নাত এবং তুমি আল্লাহর সুন্নাতে কোনোরূপ পরিবর্তন পাবেনা।

এসব আয়াতে ব্যবহৃত ‘সুন্নাত’ শব্দের শাব্দিক ও আভিধানিক অর্থ পথ, পন্থা ও পদ্ধতি। কিন্তু ‘সুন্নাতুল্লাহ’-আল্লাহর সুন্নাতের মানে কি?

ইমাম রাগেব ইসফাহানী লিখেছেনঃ আল্লাহ তা’আলার সুন্নাত বলা হয় তাঁর কর্মকুশলতার বাস্তব পন্থাকে, তাঁর আনুগত্য করার নিয়ম ও পদ্ধতিকে।

এভাবে দেখা যায় যে, ‘সুন্নাত’ শব্দটি একটি মৌলিক বিষয় সম্পর্কিত এবং তা যেমন আল্লাহর ব্যাপারে প্রয়োগ করা হয়েছে, তেমনি করা হয়েছে নবী ও রাসূলদের ক্ষেত্রেও। সাধারণ মানুষের বাস্তব অবস্থান বুঝবার জন্যেও এ শব্দের ব্যবহার দেখা যায় কুরআন মজীদে।

এ হলো ‘সুন্নাত’ শব্দটির শাব্দিক ব্যবহার ও আভিধানিক অর্থ। আমরা এখানে ‘সুন্নাত’ শব্দটির যে বিশ্লেষণ শুরু করেছি, তা এ দৃষ্টিতেই। আমাদের সামনে রয়েছে ‍এর মূল ও নির্গলিত অর্থ ।

ইমাম রাগেবের ভাষায়ঃ নবীর সুন্নাত হচ্ছে সে নিয়ম, পন্থা ও পদ্ধতি, যা তিনি বাস্তব কাজে ও কর্মে অনুসরণ করে চলতেন।

আর আল্লামা মুহাম্মাদ বশীর সাহসোয়ানীর ভাষায় ‘সুন্নাত’ হলোঃ সেই বিশেষ পথ, পন্থা ও পদ্ধতি যা নবী করীম (সাঃ) এর সময় থেকেই দ্বীন ইসলামের ব্যাপারে কোনো কাজ করার বা না করার দিক দিয়ে বাস্তবভাবে অনুসরণ করা হয়-যার উপর দিয়ে চলাচল করা হয়। ‘কিতাবুল মকসূদ’ এর ‘কিতাবুল কাজী’ অধ্যায়ে ‘সুন্নাত’ শব্দের ব্যাখ্যা করা হয়েছে এভাবেঃ ‘সুন্নাত’ দ্বীন ইসলামের এমন এক অনুসৃত কর্মপদ্ধতি, যার অনুসরণ সকল অবস্থায়ই ওয়াজিব বা কর্তব্য।

আল্লামা আবদুল আযীয আল হানাফী লিখেছেনঃ ‘সুন্নাত’ শব্দ বোঝায় রাসূল(সাঃ) এর কথা ও কাজ। আর তা রাসূলে করীম(সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের বাস্তব কর্মনীতি বুঝবার জন্যও ব্যবহৃত হয়।

আল্লামা সফীউদ্দীন আল-হাম্বলী লিখেছেনঃ কুরআন ছাড়া রাসূলের যে কথা, যে কাজ বা অনুমোদন বর্ণনার সূত্রে পাওয়া যায় তা-ই সুন্নাত।

মনে রাখতে হবে, এখানে সুন্নাতের সে অর্থ আলোচ্য নয়, যা হাদীস বিজ্ঞানীরা পরিভাষা হিসেবে ব্যবহার করেছেন; সে অর্থও নয় যা ফিকহ শাস্ত্রে গ্রহণ করা হয়েছে। হাদীস বিজ্ঞানীদের পরিভাষায় ‘সুন্নাত’ হচ্ছে রাসূলে করীম(সাঃ) এর মুখের কথা, কাজ ও সমর্থন অনুমোদনের বর্ণনা- যাকে প্রচলিত কথায় বলা হয় ‘হাদীস’। আর ফিকাহশাস্ত্রে ‘সুন্নাত’ বলা হয় এমন কাজকে, যা ফরজ ও ওয়াজিব নয় বটে; কিন্তু নবী করীম(সাঃ) তা প্রায়ই করেছেন। এ গ্রন্থে এ দুটো সুন্নাতের কোনটি-ই আলোচ্য নয়। এখানে আলোচ্য হচ্ছে ‘সুন্নাত’ তার মূলগত অর্থের দিক দিয়ে যা মৌলিক আদর্শ রীতি-নীতি, পথ, পন্থা ও পদ্ধতি বোঝায়। বস্তুত এ হিসেবে ‘সুন্নাত’ হলো সেই মূল আদর্শ, যা আল্লাহ তা’আলা বিশ্ব মানবের জন্য নাজিল করেছেন, যা রাসূলে করীম(সাঃ) নিজে তাঁর বাস্তব জীবনে দ্বীনি দায়িত্ব পালনের বিশাল ক্ষেত্রে অনুসরণ করেছেন; অনুসরণ করার জন্য পেশ করেছেন দুনিয়ার মানুষের সামনে। মূল ইসলামেরই বিকল্প শব্দ হচ্ছে ‘সুন্নাত’ যা আমরা এখানে আলোচনা করেছি। কেননা নবী করীম(সাঃ) যা বাস্তবভাবে অনুসরণ করেছেন, তার উৎস হচ্ছে ওহী- যা আল্লাহর নিকট হতে তিনি লাভ করেছেন। এ ‘ওহী’ দু’ভাগে বিভক্ত। একটি হচ্ছে আল্লাহর জানিয়ে দেয়া বিধান ও নির্দেশ। রাসূলে করীম (স) এর বাস্তব কর্মজীবন এ দুটোরই সমন্বয়, যেখানে এসবকিছুরই প্রতিফলন ঘটেছে পরিপূর্ণভাবে। রাসূলের বাস্তব জীবন বিশ্লেষণ করলে এ সব কটিরই প্রকটভাবে সন্ধান লাভ করা যাবে। আর তাই হচ্ছে ‘সুন্নাত’, তাই হচ্ছে পরিপূর্ণ দ্বীন ইসলাম। কুরআন মজীদে রাসূলের এ বাস্তব জীবনের সত্যিকার রূপ সুস্পষ্ট করে তুলবার জন্যেই তাঁর জবানীতে বলা হয়েছেঃ আমি কোন আদর্শই অনুসরণ করিনা; করি শুধু তাই যা আমার নিকট ওহীর সূত্রে নাযিল হয়।

ওহীর সূত্রে নাযিল হওয়া আদর্শই রাসূল করীম(স) বাস্তব কাজে ও কর্মে অনুসরণ করেছেন, তা-ই হচ্ছে আমাদের আলোচ্য ‘সুন্নাত’। এই সুন্নাতেরই অপর নাম ইসলাম।

কুরআন মজীদে এ সুন্নাতকেই ‘সিরাতুল মুস্তাকীম’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। রাসূলের জবানীতে কুরআন মজীদে ঘোষণা করা হয়েছেঃ

নিশ্চয়ই এ হচ্চে আমার সঠিক সরল দৃঢ় পথ। অতএব তোমরা এ পথই অনসরণ করে চলবে,  এ ছাড়া অন্যান্য পথের অনুসরণ তোমরা করবেনা। তা করলে তা তোমাদের এ পথ হতে বিচ্ছিন্ন করে দূরে নিয়ে যাবে। আল্লাহ তোমাদের এরূপ-ই নির্দেশ দিয়েছেন যেন তোমরা ভয় করে চলো।

এ আয়াতে ‘সিরাতুল মুস্তাকীম’ বলতে সে জিনিসকেই বুঝানো হয়েছে, যা বোঝায় ‘সুন্নাত’ শব্দ হতে। ইমাম শাতেবী ‘সিরাতুল মুস্তাকীম’ এর পরিচয় সম্পর্কে লিখেছেনঃ ‘সিরাতুল মুস্তাকীম’ হচে্ছ আল্লাহর সেই পথ, যা অনুসরণের জন্য তিনি দাওয়াত দিয়েছেন। আর তা-ই সুন্নাত; আর অন্যান্য পথ বলতে বোঝানো হয়েছে বিরোধ ও বিভেদপন্থীদের পথ, যা মানুষকে ‘সিরাতুল মুস্তাকীম’ হতে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। আর তারাই হচ্ছে বিদয়াতপন্থী লোক। আরও মনে রাখতে হবে, সুন্নাত হচ্ছে তা-ই , যা বিদয়াতের বিপরীত অর্থে ব্যবহৃত হয়। কেননা এ সুন্নাতের বিপরীতই হচ্ছে বিদয়াত।

বিদয়াতশব্দের ব্যাখ্যা

ইমাম রাগেব ‘বিদয়াত’ শব্দের অর্থ লিখেছেনঃ

কোনরূপ পূর্ব নমুনা না দেখে এবং অন্য কোন কিছুর অনুকরণ অনুসরণ না করেই কোনো কাজ নতুনভাবে সৃষ্টি করা।

আর দ্বীনের ক্ষেত্রে যে বিদয়াত তার সংজ্ঞা হিসেবে লিখেছেনঃ আরবী(*********)

দ্বীনের ক্ষেত্রে বিদয়াত হচ্ছে এমন কোনো কথা উপস্থাপন করা, যার প্রতি বিশ্বাসী ও যার অনুসারী লোক কোন শরীয়ত প্রবর্তক বা প্রচারকের আদর্শে আদর্শবান নয়, শরীয়তের মৌলনীতি ও সুষ্ঠু পরিচ্ছন্ন আদর্শের সাথেও যার কোন মিল নেই।

অর্থাৎ শরীয়ত প্রবর্তক যে কথা বলেননি সে কথা বলা এবং তিনি যা করেননি এমন কাজকে আদর্শরূপে গ্রহণ করা তা-ই হচ্ছে বিদয়াত।

ইমাম নবয়ী বিদয়াত শব্দের অর্থ লিখেছেনঃ আরবী(*********)

-এমন সব কাজ করা বিদয়াত, যার কোন পূর্ব দৃষ্টান্ত নেই।

আর আল্লামা মুল্লা-আলী আল কারী লিখেছেনঃ আরবী(*********)

-রাসূলের যুগে ছিলনা এমন নীতি ও পথকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে প্রবর্তন করা।

ইমাম শাতেবী লিখেছেনঃ আরবী(*********)

-আরবী ভাষায় বলা হয় অমুক লোক বিদয়াত করেছেন। আর এর মানে বোঝা হয়ঃ অমুক লোক নতুন পন্থার উদ্ভাবন করেছে, যা ইতিপূর্বে কারো দ্বারাই অনুসৃত হয়নি।

তিনি আরো লিখেছেনঃ আরবী(*********)

-বিদয়াত তখনই বলা হবে যখন বিদয়াতী কোনো কাজকে শরীয়ত মোতাবিক কাজ বলে মনে করবে অথচ তা মূলত শরীয়ত মোতাবিক নয়। এছাড়া আর অন্য কোনো অর্থ নেই।

তার মানে, শরীয়ত মোতাবিক নয়- এমন কাজকে শরীয়ত মোতাবিক বলে আকীদা হিসেবে বিশ্বাস করে নেয়াই হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে বিদয়াত। অন্যত্র লিখেছেনঃ আরবী(*********)

-এজন্যই এমন কাজকেও ‘বিদয়াত’ নাম দেয়া হয়েছে, যে কাজের সমর্থনে শরীয়তের কোনো দলীল নেই।

মোটকথা দাঁড়াল এই যে, বিদয়াত বলা হয় দ্বীন-ইসলামের এমন কর্মনীতি বা কর্মপন্থা চালু করাকে, যা শরীয়তের বিপরীত এবং যা করে আল্লাহর বন্দেগীর ব্যাপারে আতিশয্য ও বাড়াবাড়ি করাই হয় লক্ষ্য।

আবার প্রকৃত বিদয়াত ও আপেক্ষিক বিদয়াত এর পার্থক্য প্রদর্শন প্রসঙ্গে ইমাম শাতেবী লিখেছেনঃ আরবী(*********)

-প্রকৃত ও সত্যিকারের বিদয়াত তাই, যার স্বপক্ষে ও সমর্থনে শরীয়তের কোনো দলীলই নেই। না আল্লাহর কিতাব, না রাসূলের হাদীস, না ইজমার কোনো দলীল, না এমন কোনো দলীল পেশ করা যায় যা বিজ্ঞজনের নিকট গ্রহণযোগ্য। না মোটামোটিভাবে, না বিস্তারিত ও খুঁটিনাটিভাবে। এজন্য এর নাম দেয়া হয়েছে বিদয়াত। কেননা তা মনগড়া, স্ব-কল্পিত, শরীয়তে যার কোনো পূর্ব দৃষ্টান্ত নেই।

প্রখ্যাত হাদীসবিদ ইমাম খা্ত্তাবী বিদয়াতের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবেঃআরবী(*********)

-যে মত বা নীতি দ্বীনের মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়, নয় কোনো দৃষ্টান্ত কিংবা কিয়াস সমর্থিত- এমন যা নবোদ্ভাবিত করা হবে, তাই বিদয়াত। কিন্তু যা দ্বীনের মূলনীতি মোতাবিক, তারই ভিত্তিতে গঠিত, তা বিদয়াতও নয়, গোমরাহীও নয়।

হাফেজ ইবনে রজবও এ কথাই লিখেছেনঃ আরবী(*********)

‘বিদয়াত’ বলতে বোঝায় তা, যা নবোদ্ভাবিত, বোঝার মতো কোনো দলীল বা প্রমাণ শরীয়তে যার নেই।

 

কুরআন হাদীসেবিদয়াতশব্দের উল্লেখ

কুরআন মজীদে ‘বিদয়াত’ শব্দটি তিনটি ক্ষেত্রে তিনভাবে উল্লেখিত হয়েছে।

একঃ আল্লাহ সম্পর্কে এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে দুটি আয়াতে। একটি আয়াতঃ

بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ وَإِذَا قَضَىٰ أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُن فَيَكُونُ [٢:١١٧]

- আসমান জমিনের সম্পূর্ণ নবোদ্ভাবনকারী, নতুন সৃষ্টিকারী। তিনি যখন কোনো কাজের ফায়সালা করেন, তখন তাকে শুধু বলেনঃ হও। অমনি তা হয়ে যায়।(আল বাকারাহঃ117)

অপর আয়াতটি

بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ أَنَّىٰ يَكُونُ لَهُ وَلَدٌ وَلَمْ تَكُن لَّهُ صَاحِبَةٌ ۖ وَخَلَقَ كُلَّ شَيْءٍ ۖ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ [٦:١٠١

- তিনি তো আসমান জমিনের নব ‍সৃষ্টিকারী। তাঁর সন্তান হবে কোথ্থেকে, কেমন করে হবে তাঁর স্ত্রী? তিনি-ই তো সব জিনিস সৃষ্টি করেছেন। আর তিনি সর্ব বিষয়েই অবহিত।(আল আনআমঃ101)

এ দুটো আয়াতেই আল্লাহ তা’আলাকে ‘আসমান জমিনের বদীউন’- ‘পূর্ব দৃষ্টান্ত, পূর্ব উপাদান ও পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই সৃষ্টিকার’ বলা হয়েছে।

দ্বিতীয়, রাসূলে করীম(স) এর জবানীতে তাঁর নিজের সম্পর্কে বলা একটি আয়াতে এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে এভাবেঃ

          قُلْ مَا كُنتُ بِدْعًا مِّنَ الرُّسُلِ وَمَا أَدْرِي مَا يُفْعَلُ بِي وَلَا بِكُمْ ۖ

-বলো হে নবী! আমি কোনো অভিনব প্রেৃরিত ও নতুন কথার প্রচারক রাসূল হয়ে আসিনি। আমি নিজেই জানিনে আমার সাথে কিরূপ ব্যবহার করা হবে, তোমাদের সাথে কি করা হবে, তাও আমার অজ্ঞাত। (আল আহকাফঃ9)

আর তৃতীয়, এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে বনী ইসরাঈলের এক অংশের লোকদের বিশেষ ধরণের আমলের কথা বলতে গিয়ে।

আয়াতটি এইঃ وَرَهْبَانِيَّةً ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ إِلَّا ابْتِغَاءَ رِضْوَانِ اللَّهِ

-এবং অত্যধিক ভয়ের কারণে গৃহীত কৃচ্ছসাধনা ও বৈরাগ্যনীতি তারা নিজেরাই রচনা করে নিয়েছে। আমরা তাদের উপর এই নীতি লিখে ফরজ করে দিইনি। বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি সন্ধানকেই তাদের জন্য লিপিবদ্ধ করে দিয়েছিলাম।(আল হাদীদঃ 27)

এখানে ‘রাহবানিয়াত’ কে বিদয়াত বলা হয়েছে, যা আল্লাহ তা’আলা ব্যবস্থা করে দেননি, লোকেরা নিজেদের তরফ থেকে রচনা করে নিয়েছে। এখানে যে ‘বিদয়াত’ এর কথা বলা হয়েছে, সুন্নাত এর বিপরীত শব্দ হিসেবে, এ গ্রন্থে তা-ই আমাদের আলোচ্য বিষয়। এ আয়াত হতে যে কথাটি স্পষ্ট হয়ে উঠে তা হলোঃ আল্লাহ বান্দাদের জন্য যে বিধি ও বিধান দেননি-বান্দারা নিজেদের ইচ্চেমতো যা রচনা করে নিয়েছে, তা-ই ‘বিদয়াত’। পক্ষান্তরে আল্লাহ যা কিছু লিখে দিয়েছেন, বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন, যা করতে আদেশ করেছেন, তা করা ‘বিদয়াত’ নয়। এখান হতেই ‘বিদয়াত’ সংক্রান্ত মূল সংজ্ঞা ও ভাবধারার স্পষ্ট আভাস পাওয়া গেল।

সূরা ‘আল কাহাফ’ এর এক আয়াতে ‘বিদয়াত’ শব্দের এই অর্থের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষায়।

আয়াতটি এইঃ    قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُم بِالْأَخْسَرِينَ أَعْمَالًا [١٨:١٠٣]

الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا [١٨:١٠٤]

-বলো হে নবী! আমলের দিক দিয়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের কথা কি তোমাদের বলবো? তারা হচ্চে এমন লোক যাদের যাবতীয় চেষ্টা সাধনাই দুনিয়ার জীবনে বিভ্রান্ত হয়ে গেছে। আর তারাই মনে মনে ধারণা করে যে তারা খুবই ভালো কাজ করেছে। (আল কাহাফঃ102-103)।

অর্থাৎ যাবতীয় কাজ কর্ম ভুলের ভিত্তিতে সম্পাদিত হওয়া সত্ত্বেও যারা নিজেদের কাজকে খুবই ভালো, খুবই ন্যায়সঙ্গত, খুবই সওয়াবের কাজ বলে মনে করে, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত লোক। বিদয়াতপন্থীরাও ঠিক এমনি। তারা যেসব কাজ করে, আসলে তা আল্লাহর দেয়া নীতির ভিত্তিতে নয়। তা সত্ত্বেও এই হচ্ছে বিদয়াতের সঠিক পরিচয়। সূরা আল-কাহাফের উপরোক্ত আয়াতের তাফসীরে আল্লামা ইবনে কাসীর লিখেছেনঃ এ আয়াত সাধারণভাবে এমন সব লোকের বেলায়ই প্রযোজ্য , যারা আল্লাহর ইবাদত করে আল্লাহর পছন্দনীয় পন্থার বিপরীত পন্থা ও পদ্ধতিতে। তারা যদিও মনে করছে যে, তারা ঠিক কাজই করেছে এবং আশা করছে যে, তাদের আমল আল্লাহর নিকট স্বীকৃত ও গৃহীত হবে। অথচ প্রকৃতপক্ষে তারা ভুল নীতির অনুসারী এবং এ পর্যায়ে তাদের আমল আল্লাহর নিকট প্রত্যাখ্যাত।

অর্থাৎ ইবাদত-বন্দেগীর কাজ-যা করলে সওয়াব হবে এবং যা না করলে গুনাহ হবে বলে মনে করা হবে-এমন সব কাজই হতে হবে আল্লাহর সন্তোষমূলক পন্থা ও পদ্ধতিতে। এই হচ্ছে সুন্নাত। আর তার বিপরীত রীতি ও নিয়মে হলে তা হবে সুস্পষ্ট বিদয়াত। কেননা তা সুন্নাত বিরোধী। ইমাম কুরতবী তাই বিদয়াত বলেছেন এমন সব জিনিসকে যাঃ যা আল্লাহর কিতাব বা রাসূলের সুন্নাত অথবা সাহাবাদের আমলের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও তার অনুরূপ নয়।

এ সম্পর্কে অধিক সুস্পষ্ট কথা বিবৃত হয়েছে নিম্নোক্ত আয়াতটিতেঃ আয়াতটি এইঃ

وَمَن يُشَاقِقِ

 الرَّسُولَ مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَىٰ وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّىٰ وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ ۖ وَسَاءَتْ مَصِيرًا [٤:١١٥

-যে ব্যক্তি সঠিক হেদায়াতের পথ স্পষ্ট উজ্জ্বল হয়ে উঠার পরও রাসূলে করীমের বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং মুমিন সমাজের সুন্নতী আদর্শকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো পথ ও আদর্শের অনুসরণ করবে, আমরা তাদের সে পথেই চলতে দিবো। আর কিয়ামতের দিন তাদের পৌছে দিবো জাহান্নামে। বস্তুত জাহান্নাম অত্যন্ত খারাপ জায়গা। (আন নিসাঃ115)

এ আয়াতটি সুন্নাতের কুরআনী দলীল সমূহের অন্যতম। যে হেদায়াতের সুস্পষ্ট প্রতিভাত হয়ে উঠার কথা এখানে বলা হয়েছে মূলত তা-ই ‘সুন্নাত’। এ সুন্নাতই হেদায়াতের একমাত্র রাজপথ। কেননা আল্লাহর কালাম ও আল্লাহর অস্পষ্ট ওহী (ওহীয়ে খফী) অনুযায়ীই তাঁর কথা ও কাজের মাধ্যমে সুন্নাতের এ আদর্শকেই তিনি উদ্ভাসিত করে তুলেছিলেন। রাসূলের তৈরি সমাজের মুমিনগণ এই পথ অনুসরণ করেই চলতেন। এখন যদি কউ রাসূলের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করে, রাসূলের আদর্শ অনুসরণ করে চলতে প্রস্তুত না হয়, আর এ জন্যে মুমিন সমাজের অনুসৃত আদর্শকে বাদ দিয়ে অপর কোনো আদর্শকে অনুসরণ করে চলে, তবে তার পরিণাম জাহান্নাম ছাড়া আর কিছু নয়। অতএব রাসূলের ‘সুন্নাত’কে অনুসরণ করে চলাই কল্যাণ ও মুক্তিলাভের একমাত্র উপায়।

হাদীসে নবী করীমের ভাষায় ‘সুন্নাত’ কেই বলা হয়েছে ‘আল-আমর’। হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর বর্ণিত একটি হাদীসে বলা হয়েছে, নবী-করীম (স) ঘোষণা করেছেনঃ

আরবী(*********)

যে লোক আমার এই জিনিসে এমন কোনো জিনিস নতুন শামিল বা উদ্ভাবন করবে, যা মূলত এই জিনিসের অন্তর্ভূক্ত নয়, তা-ই প্রত্যাহৃত হবে।

এই হাদীসে ‘আমর’(অমর) বলে বুঝিয়েছেন মূল দ্বীন ইসলামকে, যা নবী করীম (স) দুনিয়ায় উপস্থাপিত করেছেন। কেননাঃ এই দ্বীন-ইসলামই তাঁর কর্মনীতি এবং তাঁর মান-মর্যাদা ও অবস্থার সাথে পূর্ণ সম্পৃক্ত।

আল্লামা কাজী ইয়াজ এ হাদীসের অর্থ বলেছেন এ ভাষায়ঃ

যে লোক ইসলামে এমন কোনো মত বা রায় প্রবেশ করাবে-ইসলামী বলে চালিয়ে দেবে, যার অনুকুলে কুরআন ও হাদীসে কোনো স্পষ্ট প্রকাশ্য বা প্রচ্ছন্ন কিংবা প্রকাশযোগ্য কোনো সনদ বর্তমান নেই, তাই প্রত্যাহারযোগ্য। আর এ জিনিসেরই অপর নাম ‘ বিদয়াত’। উপরোক্ত হাদীসে রাসূলে করীম (স) ‘আমার এই ব্যাপারে’ বলে ইসলামকেই বুঝিয়েছেন। এতে প্রমাণিত হলো যে, রাসূলের দৃষ্টিতে এ দ্বীন এক পরিপূর্ণ পূর্ণাঙ্গ ও পূর্ণ পরিমত দ্বীন এবং তা সর্বজন পরিচিত, ব্যাপক প্রচারিত ও অনুভবযোগ্য মাত্রায় সর্বদিকে প্রকাশিত। এ দ্বীন বা দ্বীনের কোনো মৌলিক খুঁটিনাটি দিকও কোনো দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তির নিকট অজ্ঞাত, অপরিচিত বা লুকায়িত নেই। এখন কেউ যদি এতে দ্বীন বহির্ভূত কোনো বিষয় বৃদ্ধি করতে চায়, কোনো অ-দ্বীনি ব্যাপার বা কাজকে ‘দ্বীনি’ বলে চালিয়ে দিতে চায়, তাহলে সেতো গোটা দ্বীনকেই বিনষ্ট করে দিবে। কেননা সে তো মূল দ্বীনকেই আদৌ চিনতে বা বুঝতে পারেনি। এ জন্য বিদয়াতের পরিচয় দান করতে গিয়ে আল্লামা কান্দেলভী লিখেছেনঃ বিদয়াত বলতে বোঝায় এমন জিনিস, যা দ্বীনের ক্ষেত্রে অভিনব, শরীয়তে যার কোনো ভিত্তি নেই, মৌলিক সমর্থন নেই। শরীয়তের পরিভাষায় তারই নাম হচ্ছে বিদয়াত।

‘বিদয়াত’ এর এ সংজ্ঞা হতে স্পষ্ট জানা গেল যে, ব্যবহারিক জীবনের কাজে কর্মে ও বৈষয়িক জীবন যাপনের নিত্য নতুন উপায় উদ্ভাবন এবং নবাবিষ্কৃত যন্ত্রপাতি নির্মাণের সঙ্গে শরীয়তী বিদয়াতের কোনো সম্পর্ক নেই। কেননা তার কোনোটিই ইবাদত হিসেবে ও আল্লাহর কাছে সওয়াব পাওয়ার আশায় করা হয়না। অবশ্য এ পর্যায়েও শর্ত এই যে, তার কোনোটিই শরীয়তের মূল আদর্শের বিপরীত হতে পারবেনা। অনুরূপভাবে যেসব ইবাদত নবী করীম(স) কিংবা সাহাবায়ে কিরাম(রা) হতে কথার কিংবা কাজের বিবরণ এর মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে ও ইশারা ইঙ্গিতে প্রমাণিত, তাও বিদয়াত নয়। এই সঙ্গে এ কথাও জানা গেল যে, নবী করীম(স) এর জমানায় যে কাজ করার প্রয়োজন হয়নি; কিন্তু পরবর্তীকালে কোনো দ্বীনি কাজের জন্য দ্বীনি লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যেই তা করার প্রয়োজন দেখা দিবে, তা করাও বিদয়াত পর্যায়ে গণ্য হতে পারেনা। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, প্রচলিত নিয়মে মাদ্রাসা শিক্ষা ও প্রচারমূলক সংস্থা ও দ্বীনি  প্রচার বিভাগ কায়েম করা, কুরআন হাদীস বুঝাবার জন্যে আরবী ব্যাকরণ রচনা বা ইসলাম বিরোধীদের জবাব দেবার জন্য যুক্তিবিজ্ঞান ও দর্শন রচনা, জিহাদের জন্য আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, যন্ত্রপাতি ও আধুনিক যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষাদান, দ্রুতগামী ও সুবিধাজনক যানবাহন ব্যবহার এসব জিনিস এক হিসেবে ইবাদতও বটে যদিও এগুলো রাসূলে করীম(স) এবং সাহাবায়ে কিরামের যুগে বর্তমান রূপে প্রচলিত হয়নি। তা সত্ত্বেও এগুলোকে বিদয়াত বলা যাবেনা। কেননা এসবের এভাবে ব্যবস্থা করার কোনো প্রয়োজন সেকালে দেখা দেয়নি। কিন্তু পরবর্তীকালে এর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে বলেই তা করা হয়েছে এবং তা দ্বীনের জন্যই জরুরী। আর সত্য কথা এই যে, এসবই সেকালে ছিল সেকালের উপযোগী ও প্রয়োজনীয় রূপে ও ধরনে। তাই আজ এর কোনোটিই ‘বিদয়াত’ নয়।

এসব সম্পর্কে এ কথাও বলা চলে যে, এগুলো মূলত কোনো ইবাদত নয়। এগুলো করলে সওয়াব হয়, সে নিয়তেও তা কউ করেনা। এগুলো হলো ইবাদতের উপায়, মাধ্যম বা ইবাদতের পূর্বশর্ত। তার মানে এগুলো এমন নয়, যাকে বলা যায় ‘দ্বীনের মধ্যে নতুন জিনিসের উদ্ভাবন।’ এবং এগুলো হচ্ছে –‘দ্বীনি পালন ও কার্যকরকরণের উদ্দেশ্যে নবোদ্ভাবিত জিনিস।’ আল কুরআন ও হাদীসের নিষিদ্ধ হলো দ্বীনের ভিতর দ্বীনরূপে নতুন জিনিস উদ্ভাবন করা। দ্বীনের বাস্তবায়নের জন্য নতুন জিনিস উদ্ভাবনতো নিষিদ্ধ নয় আদৌ। কাজেই এ জিনিসকে না বিদয়াত বলা যাবে, না তা অবশ্যই অপরিহার্য বলে বিবেচিত হবে।

কুরআনের আয়াত- আরবী(*********)

-যারা নিজেদের দ্বীনের মূলকে নানাভাগে ভাগ করে নানা দিকে যাওয়ার পথ বের করেছে এবং নানা দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, তাদের সাথে আপনার-হে নবী –কোনোই সম্পর্ক নেই।

এ আয়াতের তাফসীরে আল্লামা খাজেন লিখেছেন, হযরত আবু হুরায়রার বর্ণনা অনুযায়ী এখানে বলা হয়েছে, এ উম্মতে মুসলিমার গোমরাহ লোকদের কথা। আর অপর এক হাদীস অনুযায়ী নবী করীম(স) বলেছেন, এ আয়াতে মুসলিম উম্মতের বিদয়াতপন্থী, সংশয়বাদী ও পথভ্রষ্ট লোকদের কথাই বলা হয়েছে।

এ আলোচনার ফলে প্রমাণিত হয় যে, নবী করীম(স) যে দ্বীন আল্লাহর নিকট হতে লাভ করেছেন, যা তিনি নিজে বাস্তব জীবনে অনুসরণ করে চলেছেন এবং যা তিনি জনগণের সামনে উপস্থাপিত করেছেন ও অনুসরণ করে চলতে বলেছেন, এক কথায় একটি পরিভাষা হিসেবে তা-ই হচ্ছে সুন্নাত। আর তার বিপরীত যা কিছু-আকীদা, বিশ্বাস, আমল ও চরিত্র তা যে কোনো ক্ষেত্রেই হোক তা-ই হলো ‘বিদয়াত’। এ দৃষ্টিতে ‘সুন্নাত’ ও ‘বিদয়াত’ দুটি পরস্পর বিপরীত, পরস্পর বিরোধী মতাদর্শ, সম্পূর্ণ বিপরীতমূখী চিন্তা-বিশ্বাস, জীবনধারা ও জীবন ব্যবস্থা। এ দুটো সরলরেখার মতো পরস্পর বিপরীতদিকে ধাবিত। যা সুন্নাত তা বিদয়াত নয়; যা বিদয়াত তা সুন্নাত নয়। অনুরূপভাবে সুন্নাত কখনো বিদয়াত হতে পারেনা এবং বিদয়াত কোনোরূপেই এবং কারো কথাতেই সুন্নাতরূপে গৃহীত হতে পারেনা।

 

কুরআনে সুন্নাতের প্রমাণ

কুরআন মজীদে রাসূলে করীম(স) সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছেঃ

 يَأْمُرُهُم بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنكَرِ

-তিনি ‘মারুফ’ কাজের আদেশ করেন এবং ‘মুনকার’ কাজের নিষেধ করেন।

(আল আরাফঃ157)

এই ‘মারুফ’ ও ‘মুনকার’ বলতে কি বোঝায়, সে বিষয়ে তাফসীরকারকগণ বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এক ব্যাখ্যা অনুযায়ী ‘মারুফ’ বলতে ‘সুন্নাত’ ও ‘মুনকার’ বলতে ‘বিদয়াত’কে বোঝানো হয়েছে। আল্লামা হাদ্দাদী তাঁর তাফসীরে লিখেছেনঃ ‘মারুফ’ হচ্ছে ‘সুন্নাত’ আর ‘মুনকার’ হচ্ছে ‘বিদয়াত’।

হাদীসের সুন্নাতের প্রমাণ

হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন(রা) বলেন, কুরআন নাযীল হলো এবং রাসূল(স) সুন্নাত প্রতিষ্ঠিত করলেন। অতঃপর বললেন, তোমরা আমার অনুসরণ করো। আল্লাহর কসম, যদি তা না করো, তবে তোমরা গোমরাহ হয়ে যাবে।

অর্থাৎ কুরআন অনুযায়ী জীবন যাপনের যে নিয়ম, পথ ও আদর্শ তা-ই সুন্নাত। রাসূলে করীম(স) এই সুন্নাতকেই উপস্থাপিত ও প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং তা-ই অনুসরণ করে চলার নির্দেশ দিয়েছেন সব মানুষকে। আর শেষ ভাগে বলেছেন, এ সুন্নাতের অনুসরণ করা না হলে স্পষ্ট ভ্রষ্টতা ও গোমরাহী ছাড়া আর কিছুই থাকেনা। বস্তুত এ ভ্রষ্টতাই হচ্ছে বিদয়াত-যা সুন্নাতের বিপরীত।

হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ(রা) বলেনঃ আমরা একদা রাসূলে করীম(স) এর নিকট বসা ছিলাম। তিনি তাঁর সামনে একটি রেখা আঁকলেন এবং বললেনঃ এই হচ্ছে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর পথ। অতঃপর তার ডান দিকে ও বাম দিকে দুটো রেখা আঁকলেন এবং বললেন এ হচ্ছে শয়তানের পথ। তারপর তিনি মাঝখানে রেখার উপর হাত রাখলেন এবং কুরআনের এ আয়াতটি পড়লেনঃ(যার মানে হলো)“এই হচ্ছে আমার পথ সুদৃঢ়, সোজা ও সরল, অতএব তোমরা তা-ই অনুসরণ করে চল। আর এছাড়া যত অন্যান্য যত পথ-রেখা দেখতে পাচ্ছ, এর কোনোটাই অনুসরণ করোনা। অন্যথায় তোমরা আল্লাহর পথ হতে দূরে সরে যাবে, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। আল্লাহ তোমাদের এরই নির্দেশ দিয়েছেন, সম্ভবত তোমরা আল্লাহকে ভয় করে এই নির্দেশ অবশ্যই পালন করবে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রা) হতেও এই হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। তবে উভয়ের ভাষায় কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। (দারেমী, মুসনাদে আহমদ)

হযরত ইবরাজ ইবনে সারিয়াতা বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদীসে রাসূলে করীম(স) বলেছেনঃ তোমাদের অবশ্যই অনুসরণ করে চলতে হবে আমার সুন্নাত এবং হেদায়াতপ্রাপ্ত সত্যপন্থী খলীফাদের সুন্নাত। তোমরা তা শক্ত করে ধরবে, দাঁত দিয়ে কামড়িয়ে ধরে স্থির হয়ে থাকবে(যেন কোন অবস্থায়ই তা হাতছাড়া হয়ে না যায়, তোমরা তা হতে বিচ্যূত ও বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়)।

[ব্যাখ্যাঃ উপরোক্ত হাদীসে নবী করীম(স) নিজের সুন্নাতের সঙ্গে সঙ্গে খুলাফায়ে রাশেদীন এর সুন্নাতকেও অনুসরণ করার তাগিদ দিয়েছেন। কেননা তারা পুরোপুরিভাবেই রাসূলের সুন্নাতকে অনুসরণ করেছেন, সে অনুযায়ীই তাঁরা কাজ করেছেন এবং কোনো ক্ষেত্রেই রাসূলের সুন্নাতের বিপরীত কোনো কাজ তাঁরা করেননি। তা হলে সে সুন্নাতকে ‘খুলাফায়ে রাশেদূন এর সুন্নাত’ বলা হলো কেন? বলা হয়েছে এজন্য যে, তাঁরা রাসূলের সুন্নাত অনুযায়ীই আমল করেছেন, তাঁরা রাসূলের কথা ও কাজ থেকে তা-ই বুঝতে পেরেছেন এবং তা-ই তাঁরা গ্রহণ করেছেন। তাঁরা প্রত্যেকটি ব্যাপারে রাসূলের সুন্নাত অনুযায়ী আমল করার জন্য অতিশয় উদগ্রীব থাকতেন এবং তাঁর বিরুদ্ধতা হতে তাঁরা সবাই দূরে থাকতেন। কেবল বড় বড় ব্যাপারেই নয়, ছোট ছোট ব্যাপারেও তাঁরা তাই করতেন। কুরআন ও রাসূলের সুন্নাত থেকে কোনো বিষয়ে কোনো দলীল পেলে তাঁরা তা-ই আঁকড়ে ধরেছেন, কিছুতেই তা ত্যাগ করতেননা। অবশ্য যে ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো নির্দেশ পেতেননা, সেক্ষেত্রে তাঁরা গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা, পর্যালোচনা ও পারস্পরিক পরামর্শ করে একটা মত ঠিক করতেন এবং তদনুযায়ী আমল করতেন। এখানে প্রশ্ন হতে পারে, খোলাফায়ে রাশেদূন যদি নিজেদের মতো কাজই করে থাকেন তাহলে ‘খুলাফায়ে রাশেদূন এর সুন্নাত’ বলার কি তাৎপর্য থাকতে পারে। এর জবাব হলো এই যে, এমন অনেক লোকই ছিল যারা রাসূলের সময় ছিলনা, খলীফাদের সময় ছিল কিংবা এ উভয় কালেই জীবিত ছিল; কিন্তু উত্তরকালে অনেক নতুন অবস্থার উদ্ভব হওয়ার কারণে খুলাফায়ে রাশেদূনকে এ ব্যাপারে একটা নীতি নির্ধারণ করতে হয়েছে। তা দেখে এ পর্যায়ে লোকদের মনে নানা সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে। সে কারণে এ কথাটি বলে রাসূলে করীম(স) এ সন্দেহ দূর করার ব্যবস্থা করে দিলেন। বলে দিলেন, তাঁরা যে কাজ করবে তাতে আমারই সুন্নাত অনুসৃত হয়েছে বলে তোমরাও তা মেনে নেবে।]

সুন্নাতকে শক্ত করে ধারণ করার এবং অচল অটলভাবে তার অনুসরণ করার এবং তাগিদ অত্যন্ত তীব্র ও মজবুত। কেননা এ সুন্নাত হচ্ছে নবী করীম(স) এর বাস্তব কর্মনীতি। তার অনুসরণই হলো কার্যত ইসলাম পালন আর তা ত্যাগ করা হলে সুস্পষ্ট গোমরাহী ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকেনা। বলা হয়েছেঃ মূল সত্য বাদ দিলে গোমরাহী ছাড়া আর কি-ই বা অবশিষ্ট থাকে?

এজন্য রাসূলে করীম(স) এর ঘোষণাটি অত্যন্ত তাৎপয্যপূর্ণ। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রা) বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদীসের শেষ বাক্যটি হলোঃ তোমরা যদি তোমাদের নবীর সুন্নাত পরিত্যাগ করো, তাহলে তোমরা নিঃসন্দেহে গোমরা হয়ে যাবে। তিনি অপর এক হাদীসে বলেছেনঃ যে লোক আমার সুন্নাত থেকে বিমুখ হয়ে যাবে-তা অনুসরণ করে চলবেনা, সে আমার উম্মতের মধ্যে গণ্য নয়, নয় সে আমার পথের পথিক।

এক ব্যক্তি বসানো অবস্থায় উট জবাই করতে শুরু করেছিল। তখন আবদুল্লাই ইবনে উমর(রা) তাকে বলেনঃ উটটিকে বেঁধে দাঁড় করাও, তারপর নহর করো- এ-ই হচ্ছে হযরত আবুল কাসেম মুহাম্মদ(স) এর সুন্নাত।

মুসলিম সমাজে শরীয়ত মুতাবিক যে কর্মনীতি চালু রয়েছে, হাদীসে তাকেও সুন্নাত বলে অভিহিত করা হয়েছে। রাসূলে করীম(স) ইরশাদ করেছেনঃ যে লোক ঈদুল আযহার নামাজ পড়ে জন্তু জবাই করলো, সে তার কুরবানী পূর্ণ করে দিলো এবং মুসলমানদের রীতিনীতি ঠিক রাখল। ‘রাসূলের সুন্নাত’ মানে রাসূলের আদর্শ, রাসূলের কর্ম-বিধান। আর তা অনুসরণ না করার মানে হলো তার বিপরীত কর্মাদর্শ মেনে চলা। তাহলে যে লোক রাসূলে করীম(স) এর বিপরীত কর্মাদর্শ পালন ও অনুসরণ করে চলবে, সে কিছুতেই ইসলাম পালনকারী হতে পারেনা, হতে পারেনা সে মুসলিম। বস্তুত এ হাদীস হতে আরো বলিষ্ঠভাবে প্রমাণিত হলো যে, এ ‘সুন্নাত’ ফিকাহশাস্ত্রের পারিভাষিক নয়, নয় হাদীস শাস্ত্রবিদদের পারিভাষিক সুন্নাত। এসব হাদীসে ‘সুন্নাত’ বলে বোঝানো হয়েছে রাসূলে করীমের উপস্থাপিত ও বাস্তবে অনুসৃত জীবনাদর্শ। আর এ সুন্নাতই আমাদের আলোচ্য।

 

বিদয়াতের তাৎপর্য্

এই সুন্নাতের বিপরীত যা তা-ই হচ্ছে বিদয়াত। বিদয়াত কাকে বলে? সাইয়েদ জামালউদ্দীন আল কাসেমী লিখেছেনঃ বিদয়াত বলতে বোঝায় দ্বীন পূর্ণ পরিণত হওয়ার পর দ্বীনের মধ্যে কোনো নতুন জিনিসের উদ্ভব হওয়া। আর তা হচ্ছে এমন সব জিনিস যার অস্তিত্ব নবী করীম(স) এর যুগে বাস্তব কাজ, কথা বা সমর্থন অনুমোদনের আকারেও বর্তমান ছিলনা এবং শরীয়তের নিয়ম বিধানের দৃষ্টিতেও যে বিষয়ে কোনো অনুমতি পাওয়া যায়না। আর অস্বীকৃতিও পাওয়া যায়না।

এ সংজ্ঞার দৃষ্টিতে যার অস্তিত্ব সাহাবায়ে কিরামের যুগের কথা, কাজ বা অনুমতি পর্য়ায়ে কোনো ইজমা হওয়ারও সন্ধান পাওয়া যায়না, তাও বিদয়াত।

কেননা দ্বীনে কোনো নতুন জিনিস উদ্ভব করার অধিকারই কারো থাকতে পারেনা। বস্তুত দ্বীন পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর তাতে কোনো জিনিসের বৃদ্ধি করা বা কোনো নতুন জিনিসকে দ্বীন মনে করে তদনুযায়ী আমল করা-আমল করলে সওয়াব হবে বলে মনে করা এবং আমল না করলে আল্লাহর আজাব হবে বলে ভয় করাই হচ্ছে বিদয়াতের মূল কথা। যে বিষয়েই এরূপ অবস্থা হবে, তা-ই হচ্ছে বিদয়াত। কেননা, এরূপ করা হলে স্পষ্ট মনে হয় যে, তা পূর্ণ নয়, অপূর্ণ এবং তাতে অনেক কিছুরই অভাব ও অপূর্ণতা রয়েছে। আর এই ভাবধারাটা কুরআনের নিম্নোক্ত ঘোষণার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

কুরআন মজীদে দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে আল্লাহপাক ঘোষণা করেছেনঃ

আরবী(*********)

আজকের দিনে তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ পরিণত করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমাদের নিয়ামতকে সম্যকভাবে সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম-মনোনীত করলাম।

এ আয়াত থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, দ্বীন ইসলাম পরিপূর্ণ। এতে নেই কোনো অসম্পূর্ণতা, কোনো কিছুর অভাব। অতএব তা মানুষের জন্য চিরকালের যাবতীয় দ্বীনি প্রয়োজন পূরণে পূর্ণমাত্রায় সক্ষম এবং এ দ্বীনে বিশ্বাসী ও এর অনুসরণকারীদের কোন প্রয়োজন হবেনা এ দ্বীন ছাড়া অন্য কোনো দিকে তাকাবার, বাইরের কোনো কিছু এতে শামিল করার এবং এর ভিতর থেকে কোনো কিছু গ্রহণ করার। কেননা এতে যেমন মানুষের সব মৌলিক প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, তেমনি নেই এতে কোনো বাজে-অপ্রয়োজনীয় বা বাহুল্য জিনিস। অতএব না তাতে কোনো জিনিস বৃদ্ধি করা যেতে পারে, না পারা যায় তা থেকে কোনো কিছু বাদ দিতে। এ দুটোই দ্বীনের পরিপূর্ণতার বিপরীত এবং আল্লাহর উপরোক্ত ঘোষণার স্পষ্ট বিরোধী। ইসলামী ইবাদতের ক্ষেত্রে সওয়াবের কাজ বলে এমন সব অনুষ্ঠানের উদ্ভাবন করা, যা নবী করীম(স) ও সাহাবায়ে কিরামের জামানায় চালু হয়নি এবং তা দেখতে যতই চাকচিক্যময় হোকনা কেন তা স্পষ্টত বিদয়াত তা দ্বীন-ইসলামের পরিপূর্ণতার-কুরআনী ঘোষণার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মনোপুত ছিলনা, পছন্দসই ছিলনা বলেই তা সেকালে চালু করা হয়নি। এ কারণেই ইমাম মালিক বলেছিলেনঃ সেকালে যে কাজ দ্বীনী কাজ বলে ঘোষিত ও নির্দিষ্ট হয়নি, আজও তাকে দ্বীনী কাজ বলে মনে করা যেতে পারেনা।

দ্বীনের ক্ষেত্রে বিদয়াতের প্রচলনে মূল দ্বীনেরই বিকৃত ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার কারণ নিহিত রয়েছে। ইবাদতের কাজ কর্মে যদি আজ মনগড়া নিয়ম, শর্ত ও অনুষ্ঠানাদিকে বরদাশত করে নেয়া হয়, তাহলে তাতে নতুন নতুন জিনিস এত বেশি শামিল হয়ে যাবে যে, পরে কোনটি আসল এবং নবী করীম(স) প্রবর্তিত আর কোনটি নকল-পরবর্তীকালের লোকদের শামিল করা জিনিস, তা নির্দিষ্ট করাই সম্ভব হবেনা। অতীতকালের নবীর উম্মতদের দ্বারা নবীর উপস্থাপিত দ্বীন বিকৃত ও বিলীন হয়ে যাওয়ারও একমাত্র কারণও এই। তারা নবীর প্রবর্তিত ইবাদতে মনগড়া নতুন জিনিস শামিল করে নিয়েছিল। কিছুকাল পরে আসল দ্বীন কি, তা বুঝবার আর কোনো উপায়ই রইলোনা।

দ্বীনতো আল্লাহর দেয়া আর রাসূলের উপস্থাপিত জিনিস। তাতে যখন কেউ নতুন কিছু শামিল করে, তখন তার অর্থ এই হয় যে, আল্লাহ বা রাসূলে করীম(স) যেন বুঝতেই পারছিলেননা দ্বীন কিরূপ হওয়া উচিত আর এরা এখন বুঝতে পারছে (নাউজুবিল্লাহ)। তাই নিজেদের বুঝমত সব নতুন জিনিস এতে শামিল করে এর ত্রুটি দূর করতে চাইছে এবং অসম্পূর্ণতাকে সম্পূর্ণ করে তুলছে। আর এর ভেতর থেকে কিছু বাদ সাদ দিয়ে একে যুগোপযোগী করে তুলতে চাইছে। এরূপ কিছু করার অধিকার তাকে কে দিলো? আল্লাহ দিয়েছেন? তাঁর রাসূল দিয়েছেন? না কেউ দেয়নি, নিজ ইচ্ছেমতো ই সে তা করছে। ঠিক এ দিকে লক্ষ্য রেখেই হযরত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রা) বলেছেনঃ যে ইবাদাত সাহাবায়ে কিরাম করেননি, সে ইবাদাত তোমরা করোনা। (তাকে ইবাদত বলে মনে করোনা, তাতে সওয়াব হয় বলেও বিশ্বাস করোনা।) কেননা অতীতের লোকেরা পিছনের লোকদের জন্য কিছু বাকী রেখে যাননি যা লোকদের পূরণ করতে হবে। অতএব হে মুসলিম সমাজ, তোমরা আল্লাহর ভয় করো এবং পূর্ববর্তী লোকদের রীতিনীতি গ্রহণ ও অনুসরণ করে চলো।

এমতাবস্থায় ও দ্বীনের মাঝে কিছু বৃদ্ধি করা বা তা থেকে কিছু কমানোর অর্থ শরীয়তের বিধানের অনধিকার চর্চা, অবৈধ হস্তক্ষেপ এবং আল্লাহর ঘোষণার বিরুদ্ধতা আর তাঁর অপমান। এরূপ অনধিকার চর্চা করার ধৃষ্টতা ক্ষমার অযোগ্য।

‘বিদয়াত’ করে এবং তা বরদাশত করে তারা, যারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করতে পারেনি, যারা নিজেদের অনুগত বানাতে পারেনি রাসূলের। বস্তুত বিদয়াতের উৎস হচ্ছে নফসের খাহেশ, স্বেচ্ছাচারিতা, লালসা ও অবাধ্যতা। যারা আল্লাহর ফয়সালা ও রাসূলের পথ প্রদর্শনকে নফশের খাহেশ পূরণের পথে বাধাস্বরূপ মনে করে, তারাই দ্বীনের ভিতর নিজেদের ইচ্ছেমতো হ্রাস-বৃদ্ধি করে। এই হ্রাস-বৃদ্ধির পর যা হয় তাকেই দ্বীনের মর্যাদা দিয়ে বসে। আর যেহেতু এ কাজকেও দ্বীনী কাজই মনে করা হয়, সেজন্য এ কাজের ভুল ও মারাত্মকতা তাদের চোখে ধরা পড়েনা। এ কারণেই বিদয়াতীরা কখনো বিদয়াত হতে তাওবা করার সুযোগ পায়না। এ বিদয়াত এমনই এক মারাত্মক জিনিস, যা শরীয়তের ফরজ ওয়াজিবকে পর্যন্ত বিকৃত করে দেয়। শরীয়তের ফরয ওয়াজিবের প্রতি অন্তরে থাকেনা কোনো মান্যতা গণ্যতার ভাবধারা। শরীয়তের সীমালঙ্ঘন করার অভ্যাস হতে হতে লোকদের স্বাভাবিক প্রকৃতিই বিগড়ে যায় আর মন মগজ এতই বাঁকা হয়ে যায় যে, অতঃপর শরীয়তের সমস্ত সীমা-সরহদ চূর্ণ করে ফেলতেও কোনো দ্বিধা-কোনো কুন্ঠা জাগেনা তাঁদের মনে। শরীয়ত বিরোধী কাজগুলোকে তখন মনে হতে থাকে খুবই উত্তম।

প্রসঙ্গত মনে রাখতে হবে, দ্বীন ইসলামের পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ বিধান হওয়ার সঠিক তাৎপর্য্য কি? বস্তুত নবী করীম(স)দ্বীন সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়কে বিস্তারিতভাবে পৌছে দিয়েছেন। আর দুনিয়া সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে দিয়েছেন মোটামুটি বিধান ও ব্যবস্থা। দিয়েছেন কতগুলো মূলনীতি।

বাস্তব ব্যবস্থাপনা দিক দিয়ে ইসলামের শূরা ব্যবস্থা মুসলমানদের রাষ্ট্র নেতাকে শরীয়তের সীমার মধ্যে আনুগত্য দেয়া এবং তারা ইজতিহাদ করে যেসব হুকুম আহকাম বের করবে তা মানা, সহজতা বিধান, কষ্ট বিদূরণ ও প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা। এগুলো এমন যে, কালের পরিবর্তিত যে কোনো স্তরে এর নিয়ম বিধান সম্পূর্ণ নতুনভাবে মানুষের জীবন ও সমাজ গড়তে পারে। এ পর্যায়ে কয়েকটি হাদীসের ভাষা এখানে উল্লেখযোগ্য। একটি হচ্ছে ইবরাজ ইবনে সারিয়ারা বর্ণিত হাদীসঃ আরবী(********)

-রাসূলে করীম(স) একদা আমাদের নিকট গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজ করলেন, উপদেশ দিলেন। তার প্রতিক্রিয়া ও প্রভাবে উপস্থিত মানুষের চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হতে লাগল। লোকদের দিল নরম হয়ে গেল, কেঁপে উঠল। আমরা বললামঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনিতো বিদায় গ্রহণকারীর মতো ওয়াজ করলেন। তাহলে আমাদের প্রতি আপনি কি নির্দেশ দিচ্ছেন? রাসূল(স) বললেনঃ তোমাদেরতো আমি এমন এক আলোকোজ্জ্বল আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত রেখে যাচ্ছি যার দৃষ্টিতে রাতও দিনের মতোই উদ্ভাসিত। আমার চলে যাওয়ার পর যে-ই এর বিরুদ্ধতা করবে সে-ই ধ্বংস হবে।

এ হাদীসে আলোকোজ্জ্বল আদর্শ বলতে রাসূলের কর্মময় বাস্তব জীবনের আদর্শ, দৃষ্টান্ত ও নির্দেশসমূহকে বোঝানো হয়েছে। আর বস্তুতই তা এমন উজ্জ্বল প্রকট জিনিস যে, তার দৃষ্টিতে মানব জীবনের ঘোরতর সমস্যা সংকুল অন্ধকারেও দিনের আলোকের মতোই পথের দিশা লাভ করা যেতে পারে। অন্ধকার কোথাও এসে পথ রোধ করে দাঁড়াতে পারেনা, জীবনকে অচল ও সমস্যা ভারাক্রান্ত করে তুলতে পারেনা। কেননা নবী করীম(স) বিশ্ব মানবতাকে এমনই এক আলোকোজ্জ্বল পথের দিশা দিয়ে যাবার জন্যই এসেছিলেন দুনিয়ায়। আর তিনি তাঁর এ দায়িত্ব পালন করে গেছেন পূর্ণ মাত্রায়। তাতে থেকে যায়নি কোনোরূপ অসম্পূর্ণতার কালো ছায়া। ইমাম মালিকের এই কথাটিও এ প্রেক্ষিতে পঠিতব্যঃ

যে লোক ইসলামে কোনো বিদয়াত উদ্ভাবন করবে এবং তাকে ভালো ও উত্তম মনে করবে, সে যেন ধারণা করে নিয়েছে যে, নবী(স) রিসালাত ও নবুয়্যতের দায়িত্ব পালন করেননি, খেয়ানত করেছেন। কেননা তিনি যদি তা করেই থাকেন, তাহলে ইসলাম ও সুন্নাত ছাড়া আর তো কোনো কিছুর প্রয়োজন করেনা। সব ভালোই তো তাতে রয়েছে।

ইবরাহীম নখয়ী(রহ)বলেছেনঃ “আল্লাহ তা’আলা তোমাদের এমন কোনো কল্যানই দেননি যা সাহাবায়ে কিরামের নিকট গোপন বা অজ্ঞাত থেকে গেছে। অথচ সাহাবারা তাঁর রাসূলেরই সঙ্গি-সাথী ছিলেন এবং তার মাখলুকাতের মধ্যে সর্বোত্তম লোক ছিলেন।”

ইবরাহীম নখয়ী(রহ)-এর এ কথার তাৎপর্য্ এই যে, দ্বীনের ব্যাপারে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। সত্যিকারভাবে যে দ্বীন রাসূলের নিকট হতে পাওয়া গেছে, ঠিক তা-ই পালন করে চলা উচিত সকল মুসলমানের। না তাতে কিছু কম করা উচিত, না তাতে কিছু বেশি করা সঙ্গত হতে পারে।

কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতে এই কথাই বলা হয়েলে আহলী কিতাবকে লক্ষ্য করেঃ

يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ وَلَا تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ إِلَّا الْحَقَّ ۚ

-হে আহলী কিতাব! তোমরা তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করোনা। আর আল্লাহ সম্পর্কে প্রকৃত হক ছাড়া কোনো কথা বলোনা।

এই ‘আহলী কিতাব’ সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ

وَرَهْبَانِيَّةً ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ إِلَّا ابْتِغَاءَ رِضْوَانِ اللَّهِ فَمَا رَعَوْهَا حَقَّ رِعَايَتِهَا  [٥٧:٢٧]

-এবং বৈরাগ্যবাদ তারা নিজেরা রচনা করে নিয়েছে, আমরা তাদের জন্য এ নীতি লিখে দিইনি। আমরা তো তাদের জন্য লিখে দিয়েছিলাম আল্লাহর সন্তোষ লাভের জন্য চেষ্টা করাকে কিন্তু তারা এ নিষেধের মর্যাদা পূর্ণ মাত্রায় রক্ষা করেনি।(সূরা হাদীদঃ 27)।

এ আয়াতদ্বয়ের দৃষ্টিতে দ্বীনকে যথাযথভাবে গ্রহণ করাই মুমিনের কর্তব্য। তাতে নিজ থেকে কিছু বাড়িয়ে দেয়া বা কিছু বাদ সাদ দিয়ে কমানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ কাজ। এমনকি আল্লাহর দ্বীনে যেসব জিনিস বা যে কাজের যতটুকু গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সে জিনিস ও কাজকে ঠিক ততটুকু গুরুত্ব না দেয়া, কম গুরুত্বকে বেশি গুরুত্ব দেয়া আর বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কম গুরুত্ব দেয়া এ সবই নিতান্ত বাড়াবাড়ি। এমন কোনো জিনিসকে দ্বীনের জিনিস বলে চালিয়ে দেয়া, যা আদৌ দ্বীনের জিনিস নয়-সুস্পষ্টভাবে দুষণীয় কাজ, অপরাধজনক কাজ।

অতএব, কেউ যদি এমন কাজ করে শরীয়তের বা শরীয়তসম্মত কাজ মনে করে, যা আদপেই শরীয়তের কাজ নয়, সে তো দ্বীনের ভিতরে নতুন জিনিসের আমদানী করলো এবং এটাই হচ্ছে বিদয়াত। সে নিজের মুখে সম্পূর্ণ না-হকভাবে আল্লাহ সম্পর্কে কথা বলছে। আল্লাহ যা বলেননি তাকেই আল্লাহর নামে চালিয়ে দিচ্ছে।

হযরত আনাস ইবনে মালিক(র) এর নিকট এক লোক জিজ্ঞেস করলোঃ

আমি ইহরাম বাঁধব কোন জায়গা থেকে? তিনি বললেনঃ যেখান হতে নবী করীম(স) বেঁধেছেন সেখান হতেই বাঁধবে। লোকটি বললো “ আমি যদি সে জায়গার এ দিকে বসে ইহরাম বাঁধি তা হলে কি দোষ হবে? হযরত আনাস (রা) বললেনঃ না তা করবেনা। আমি ভয় করছি তুমি ফিতনায় নিমজ্জিত হয়ে যেতে পার। সেলোক বললোঃ ভালো কাজে কিছুটা বাড়াবাড়ি করাটাও কি ফিতনা হয়ে যাবে?”

তখন আনাস (রা) এ আয়াতটি পাঠ করলেনঃ

فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَن تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ[ ٢٤:٦]

-যারা রাসূলের আদেশ ও নিয়ম-বিধানের বিরোধিতা করে, তাদের ভয় করা উচিত। ফিতনা তাদেরকে গ্রাস করতে পারে কিংবা পৌছাতে পারে কোনো প্রাণান্তকর আযাব।

বললেনঃ“তুমি এমন একটা কাজকে ‘নেক কাজ’ বলে মনে করছো যাকে রাসূলে করীম(স) নেক কাজ বলে নির্দিষ্ট করে দেননি,-এর চেয়ে বড় ফিতনা আর কি হতে পারে?

এ কথোপকথোন থেকে বিদয়াত হতে একটা স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেল এবং জানা গেল যে ‘নেক কাজ’, ‘সওয়াবের কাজ’ মনে করেও এমন কোনো অতিরিক্ত কাজ করা যেতে পারেনা, যে কাজের কোনো বিধান মূল শরীয়তে নেই।

বিদয়াত কিভাবে চালু হয়?

‘বিদয়াত’ উদ্ভূত ও চালু হওয়ার মূলে চারটি কার্য্কারণ লক্ষ্য করা যায়। একটি হলো এই যে, বিদয়াতী- নিজের থেকে তা উদ্ভাবন করে সমাজে চালু করে দেয়। পরে তা সাধারণভাবে সমাজে প্রচলিত হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় হলো, কোনো আলিম ব্যক্তি হয়তো শরীয়তের বিরোধী একটা কাজ করেছেন, করেছেন তা শরীয়তের বিরোধী জানা সত্ত্বেও; তা দেখে জাহিল লোকেরা মনে করতে শুরু করে যে, এ কাজ শরীয়তসম্মত না হয়ে যায়না। এভাবে এক ব্যক্তির কারণে গোটা সমাজেই বিদয়াতের প্রচলণ হয়ে পড়ে। তৃতীয় এই যে, জাহিল লোকেরা শরীয়তবিরোধী কোনো কাজ করতে শুরু করে। তখন সমাজের আলিমগণ সে ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরব থাকেন, তার প্রতিবাদও করেননা, সে কাজ করতে নিষেধও করেননা-বলেন না যে, এ কাজ শরীয়ত বিরোধী, তোমরা এ কাজ কিছুতেই করতে পারবেনা। এরূপ অবস্থায় আলিমদের দায়িত্ব, সুযোগ ও ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিদয়াত বা শরীয়ত বিরোধী কাজের প্রতিবাদ বা বিরুদ্বাচরণ না করার ফলে সাধারণ লোকদের মনে ধারণা জন্মে যে, এ কাজ নিশ্চয়ই নাজায়েজ হবেনা, বিদয়াত হবেনা। হলে কি আর আলিম সাহেবরা এর প্রতিবাদ করতেননা। অথবা অমুক সভায় এ কাজটি হয়েছে, এ কথাটি বলা হয়েছে, সেখানে অমুক অমুক বড় আলিম উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা যখন এর প্রতিবাদ করেননি, তখন বুঝতেই হবে যে, এ কাজ বা কথা শরীয়তসম্মত হবেই, না হলে তো তাঁরা প্রতিবাদ করতেনই। এভাবে সমাজে সম্পূর্ণ বিদয়াত বা নাজায়িজ কাজ ‘শরীয়তসম্মত’ কাজরূপে পরিচিত ও প্রচলিত হয়ে পড়ে। আর চতূর্থ এই যে, কোনো কাজ হয়তো মূলতই ভালো, শরীয়তসম্মত কিংবা সুন্নাত অনুরূপ। কিন্তু বহুকাল পর্যেন্ত তা সমাজের লোকদের সামনে বলা হয়নি, প্রচার করা হয়নি। তখন সে সম্পর্কে সাধারণের ধারণা হয় যে, এ কাজ নিশ্চয়ই ভালো নয়, ভালো হলে কি আলিম সাহেবরা এতদিন তা বলতেননা! এভাবে একটি শরীয়তসম্মত কাজকে শেষ পর্যন্ত শরীয়তবিরোধী কাজ বলে লোকেরা মনে করতে থাকে আর এ-ও একটি বড় বিদয়াত।

বিদয়াত প্রচলিত হওয়ার আর একটি মনস্তাত্ত্বিক কারণও রয়েছে। আর তা হলো এই যে, মানুষ স্বভাবতই চিরন্তন শান্তি ও সুখ- বেহেশত লাভ করার আকাঙ্খী। আর এ কারণে সে বেশি বেশি নেক কাজ করতে চেষ্টিত হয়ে থাকে। দ্বীনের হুকুম আহকাম যথাযথভাবে পালন করা কঠিন বোধ হলেও সহজসাধ্য সওয়াবের কাজ করার জন্য লালায়িত হয় খুব বেশি। আর তখনি সে শয়তানের ষড়যন্ত্রে পড়ে যায়। এই লোভ ও শয়তানী ষড়যন্ত্রের কারণে সে খুব তাড়াহুড়ো করে কতক সহজ সওয়াবের কাজ করার সিদ্ধান্ত করে ফেলে। নিজ থেকেই মনে করে নেয় যে, এগুলো খুব নেক কাজ, সওয়াবের কাজ। তা করলে এত বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে যে, বেহেশতের চিরস্থায়ী শান্তি সুখ লাভ করা কিছুমাত্র কঠিন হবেনা। কিন্তু এ সময়ে যে কাজগুলোকে সওয়াবের কাজ বলে মনে করে নেয়া হয়, সেগুলো শরীয়তের ভিত্তিতে কিংবা বাস্তবিকই সওয়াবের কাজ কিনা, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবার জন্য ইসলামী যোগ্যতাও যেমন থাকেনা, তেমনি সে দিকে বিশেষ উৎসাহও দেখানো হয়না। কেননা তাতে করে চিরন্তন সুখ লাভের সুখ স্বপ্ন ভেঙ্গে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। আর তাতেই তাদের ভয়।

প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে যে, একটি দ্বীনি সমাজে দ্বীনের নামে বিদয়াত চালু হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয় এবং তা মানব ইতিহাসে অভিনব কিছু নয়। দ্বীন যখন প্রথম প্রচারিত হয়, তখন তার ভিত্তি রচিত হয় ইলমের উপর। উত্তরকালে সেই ইলম যখন সমাজের অধিকাংশ বা প্রভাবশালী লোকেরা হারিয়ে ফেলে, তখন দ্বীনের প্রতি জনমনে যে ভক্তি, শ্রদ্ধা ও আকর্ষণ থাকে, তার মাধ্যম দ্বীনের নামে অদ্বীন ও বেদ্বীন ঢুকে পড়ে। মানুষ অবলীলাক্রমে সে কাজগুলো দ্বীনি মনে করেই করতে থাকে। ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, আরবরা ইবরাহীম-ইসমাঈল(আ) এর বংশধর ছিল। তাদের মধ্যে তওহীদ বিশ্বাস ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়েছিল। পরবর্তী কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত তথায় তওহীদী দ্বীন প্রবল হয়েছিল কিন্তু তার পরে সুদীর্ঘকাল অতিবাহিত হওয়ার কারণে তাদের আকীদা ও আমালে ‘হক’ এর সাথে ‘বাতিল’ সংমিশ্রিত হয়ে পড়ে। ভালো কাজ হিসেবে একসময় মূর্তিপূজা, পাথর-পাহাড় পূজাও ব্যাপকভাবে চালু হয়ে পড়ে। রাসূলে করীম(স) এর আগমনকালে তাদের দ্বীনি ও নৈতিক অবস্থা চরমভাবে অধঃপতিত হয়েছিল।

আকায়েদ ফিকাহর দৃষ্টিতে বিদয়াত

আকায়েদ ও ফিকাহর কিতাবাদিতেও `বিদয়াত’ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। কেননা বিদয়াত ইসলামে এক বড় গর্হিত কাজ এবং সর্বপর্যায়ে তা বর্জন করে চলাই মুমিনের কর্তব্য। সাধারণভাবে মুসলমানদের এ মহা অন্যায় থেকে বাঁচবার জন্যেই এসব কিতাবে বিদয়াত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। আমরা এখানে কয়েকটি কিতাবের ভাষ্য উল্লেখ করছি।

‘কাশফ বজদূভী’ কিতাবে বলা হয়েছেঃ “বিদয়াত হচ্চে দ্বীন এ নতুন উদ্ভাবিত জিনিস, যা সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেয়ীন আমলে আসেন”।

‘শরহে মাক্কাসিদ’ গ্রন্থে বলা হয়েছেঃ ঘৃণিত বিদয়াত বলতে বোঝায় এমন জিনিস, যা দ্বীনের মধ্যে নতুন উদ্ভাবন করা হয়েছে, অথচ তা সাহাবায়ে ও তাবেয়ীন এর জমানায় ছিলনা। আর না শরীয়তের কোন দলীলই তার সমর্থনে রয়েছে।

আল্লামা শিহাবউদ্দীন আফেন্দী লিখিত ‘মাজালিসুল আবরার’ গ্রন্থে বলা হয়েছেঃ জেনে রেখো, বিদয়াত শব্দের দুটো অর্থ। একটি আভিধানিক আর তা হচ্ছে, যে কোনো নতুন জিনিস, তা ইবাদতের জিনিস হোক, কি অভ্যাসগত কোনো ব্যাপার। দ্বিতীয় হচ্ছে শরীয়তী পারিভাষিক অর্থ। এ দৃষ্টিতে বিদয়াত হচ্ছে সাহাবাদের পরে দ্বীন ইসলামের কোনো জিনিস বাড়িয়ে দেয়া কিংবা হ্রাস করা যে সম্পর্কে নবী করীম(স)এর তরফ থেকে কথা কিংবা কাজের দিক দিয়ে স্পষ্ট কিংবা অস্পষ্ট কোনো অনুমতিই পাওয়া যায়না।

বিদয়াত সম্পর্কে হাদীসের ভাষ্য

একটি দীর্ঘ হাদীসের শেষাংশে ‘সুন্নাত’ পালনের তাগিদ করার পর বিদয়াত সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে রাসূলে করীম(স) ইরশাদ করেছেনঃ

 আরবী(********)

তোমরা নিজেদের দ্বীনে নিত্য নব-উদ্ভূত বিষয়াদি থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে। কেননা দ্বীনে প্রত্যেক নব উদ্ভাবিত জিনিসই বিদয়াত এবং সব বিদয়াতই চরম গোমরাহীর মূল। (আহমাদ)

এ হাদীসের শব্দ ‘মুহদাসাতুল উমুর’ এর ব্যাখ্যায় আল্লামা আহমাদুল বান্না লিখেছেনঃ মুহদাসাতুল উমুর বোঝায় এমন জিনিস ও বিষয়াদি যা কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা-কোনো দিক দিয়েই শরীয়তের বিধিবদ্ধ নয়। আর এ-ই হচ্ছে বিদয়াত।

হযরত আয়েশা(রা) বর্ণিত পূর্বোক্ত হাদীসটি মুসলিম শরীফ গ্রন্থে উদ্বৃত হয়েছে এ ভাষায়ঃ যে লোক এমন আমল করলো, যার অনুকূল ও সমর্থনে আমার ‍উপস্থাপিত শরীয়ত নয়(অর্থাৎ যা শরীয়ত মোতাবিক নয়)সে আমল অবশ্য প্রত্যাহারযোগ্য।

ইমাম শাতেবী এ হাদীসটি সম্পর্কে বলেছেনঃ বিশেষজ্ঞদের মতে এ হাদীসটি ইসলামের এক-তৃতীয়াংশ মর্যাদার অধিকারী। কেননা এ হাদীসে নবী করীম(স) এর উপস্থাপিত বিধানের বিরোধিতার সব কয়টি দিকই একত্রিতভাবে উদ্ধৃত হয়েছে, আর এর মোকাবিলায় সমায় হয়ে দাঁড়ায় সে জিনিস, যা বিদয়াত বা নাফরমানীর বিষয়।

হযরত উমর ফারুক ও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেছেনঃ তোমরা. হে মুসলিম জনতা! অনেক কিছুই নতুন উদ্ভাবন করবে। আর তোমাদের জন্যও উদ্ভাবন করা হবে দ্বীন ইসলামের অনেক নতুন জিনিস। জেনে রাখো, সব নব উদ্ভাবিত জিনিসই সুস্পষ্ট গোমরাহী। আর সব গোমরাহীরই চূড়ান্ত পরিণতি জাহান্নাম।

নবী করীম(স) ইরশাদ করেছেনঃ

আরবী(*******)

-তোমরা শুধু রাসূলের দেয়া আদর্শকে অনুসরণ করে চলো এবং কোনোক্রমেই বিদয়াত করোনা।

এক ভাষণে তিনি বলেছিলেনঃ

আরবী(******)

-জেনে রাখো, সর্বোত্তম বাণী হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। আর সর্বোত্তম কর্মবিধান হচ্ছে মুহাম্মদ(স) এর উপস্থাপিত জীবন-পন্থা। পক্ষান্তরে নিকৃষ্টতম জিনিস হচ্ছে নবোদ্ভাবিত মতাদর্শ আর প্রত্যেক নবোদ্ভাবিত মতাদর্শ-ই সুস্পষ্ট গোমরাহী।

 এ হাদীসের ‘মুহদাসাত’ শব্দের ব্যাখ্যায় আল্লামা মোল্লা আল কারী লিখেছেনঃ ‘মুহদাসাত’ বলতে বোঝায় সে সব বিদয়াত যা আকীদা, কথাবার্তা এবং আমলের ক্ষেত্রে নতুন উদ্ভাবিত হয়।

ইমাম মালিক(র) বলেছেনঃ রাসূলে করীম(স) এবং তারপরে মুসলমানদের দায়িত্বসম্পন্ন ব্যক্তিগণ সুন্নাতকে নির্ধারণ করে গেছেন। এখন তাকে আঁকড়ে ধরে এবং অনুসরণ করে চললেই আল্লাহরই কিতাবের সত্যতা বিধান করা হবে, আল্লাহর আনুগত্য করে চলার দায়িত্ব পূর্ণতাপ্রাপ্ত হবে। এ সুন্নাতই হলো আল্লাহর দ্বীনের স্বপক্ষে এক অতি বড় শক্তি বিশেষ। এ সুন্নাতকে পরিবর্তন করে বা বদলে দিয়ে তার স্থানে অন্য কিছু চালু করারা অধিকার কারোই নেই এবং তার বিপরীত কোনো জিনিসের প্রতি দৃষ্টি দেয়াও যেতে পারেনা। বরং যে লোক এ সুন্নাত অনুযায়ী আমল করবে সেই হবে হেদায়াতপ্রাপ্ত। যে এর সাহায্যে শক্তি অর্জন করতে চাইবে সেই হবে সাহায্যপ্রাপ্ত, কিন্তু যে লোক এর বিরুদ্ধতা করবে, সে মুসলমানদের অনুসৃত আদর্শকেই হারিয়ে ফেলবে। এসব লোক নিজেরা যেদিকে ফিরবে আল্লাহও তাদের সে দিকেই ফিরিয়ে দিবেন। আর তাদের জাহান্নামে পৌছে দিবেন। কিন্তু জাহান্নাম বড়ই নিকৃষ্ট জায়গা।

নবী করীম(স) এর অনুসৃত কর্মনীতিই সুন্নাত। তাও সুন্নাত, যা তাঁর পরবর্তীকালের ইসলামী সমাজের পরিচালকগণ খুলাফায়ে রাশেদীন প্রবর্তন করেছেন। তাঁরা তো তাই প্রবর্তন করেছেন, যা রাসূলে করীম(স)করতে বলেছেন-পথ দেখিয়েছেন। রাসূলের দেখানো আদর্শের তাঁরা বিরোধিতা করেননি, তাঁরা কোনো নতুন জিনিসের উদ্ভাবনও করেননি দ্বীন ইসলামে। এরাই হচ্ছেন খোলাফায়ে রাশেদীন।

এ পর্যায়ে ইমাম শাতেবী লিখেছেনঃ রাসূলে করীম(স) এর পরে মুসলিম সমাজের দায়িত্বশীল লোকেরা(খুলাফায়ে রাশেদীন) যে সুন্নাত-বাস্তব কর্মপন্থা নির্ধারণ করেছেন, তা-ও অবশ্যই অনুসরণীয় সুন্নাতরূপে গ্রহণীয়। তা কোনো বিদয়াত হতে পারেনা, নেই তাতে তাতে কোনো বিদয়াত, যদিও কুরআন ও হাদীস হতে তা স্পষ্টভাবে জানা যায়না। কেননা নবী করীম(স) বিশেষভাবে এ সুন্নাতেরও উল্লেখ করেছেন।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রা) কুরআন ও সুন্নাতের যথার্থ দক্ষতার অধিকারী ছিলেন। খোদ নবী করীম(স-ই ও তার সাক্ষ্য দিয়েছেন।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রা) বিশ্বাস করতেন যে, শিরক তাওহীদের পরিপন্থী(Negation)আর বিদয়াত সুন্নাতের বিপরীত। শিরক লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু- কালেমার এই প্রথম অংশের অস্বীকৃতি। আর বিদয়াত হচ্ছে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ কালেমার এই শেষাংশের বিপরীত আর অন্তর থেকে তার অস্বীকৃতি। মুজাদ্দেদী আলফেসানী(রহ)এই তত্ত্বের খুবই সুন্দর করে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর কথা হলো শিরক ও বিদয়াত সুন্নাতের নির্মূলকারী। এ কারণে উভয়েরই পরিণতি জাহান্নামের আগুন ছাড়া আর কিছু হতে পারেনা।

এ কথা মুজাদ্দিদ সাহেব নিজ থেকে বলেননি। মুসনাদে আহমাদ এ গজীব ইবনুল হারিস শিমালির বর্ণনায় উদ্বৃত হয়েছেঃ জনগণ যে বিদয়াতের উদ্ভাবন করে, তারই মতো একটা সুন্নাত সেখান হতে বিলুপ্ত হয়ে যায়। অতএব বিদয়াত উদ্ভাবন না করে সুন্নাত আঁকড়ে ধরাই উত্তম।

মুসনাদে দারেমী হাদীস গ্রন্থে হযরত হিসনের উক্তি উদ্বৃত হয়েছেঃ

জনগণ তাদের দ্বীনের মধ্যে যে বিদয়াতই চালু করে আল্লাহ তা’আলা তাদের নিকট হতে অনুরূপ একটি সুন্নাত তুলে নিয়ে যান। পরে কিয়ামত পর্যন্ত তা আর ফিরিয়ে আনেননা।

যে কাজটি সম্পর্কে আমাদের মনে ধারণা জন্মিবে যে, তা করলে আল্লাহ তা’আলা খুশি হবেন, আল্লাহ কিংবা রাসূলের নিকট প্রিয় বান্দা বলে গণ্য হবো অথবা আমাদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়ে যাবে কিংবা এই কাজটির দ্বারা আমাদের সন্তান সন্তনির রিজিকের পরিমাণ অতিপ্রাকিৃতিক উপায়ে বৃদ্ধি পেয়ে যাবে অথবা তাতে বরকত হবে বা সে কাজের বরকতে আমাদের বিপদ-আপদ অতিপ্রাকৃতিকভাবে দূর হয়ে যাবে। এই ধরণের সব কথাই ‘দ্বীনি’ বলে পরিচিত; কিন্তু এর সমর্থনে যদি শরীয়তের প্রমাণ না থাকে বা বড় বড় সাহাবীগণ নিজেদের জীবদ্দশায় তা না করে থাকেন, তাহলে তা বিদয়াত হবে। অনুরূপভাবে কোনো জায়েজ কাজ যদি শরীয়তের দিক হতে একাধিক পন্থায় পালন করার অনুমতি থাকে; কিন্তু তন্মধ্যে একটিমাত্র পন্থাকে সে জন্যে আমরা যদি সুনির্দিষ্ট করে নিই এবং বিশ্বাস করি যে, কেবল সেই পন্থায়ই তা করলে সওয়াব হবে, তাহলে তা-ও বিদয়াত হবে।

কিয়াস ইজতিহাস কি বিদয়াত?

ইসলামী শরীয়তের মূল উৎস হচ্ছে কুরআন ও হাদীস। এ দুটোকে ভিত্তি করেই ইসলামী জিন্দেগীর নিত্য নতুন প্রয়োজনীয় বিষয়ে শরীয়তের রায় জানতে হবে, দিতে হবে নিত্য নতুন উদ্ভূত সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান। তাই ইসলামী শরীয়তে কিয়াস ও ইজতিহাদ শরীয়তের অন্যতম উৎসরূপে পরিগণিত, এ দুয়ের সাহায্যেই ইসলাম সকল কালের, সকল মানুষের জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হওয়ার সামর্থ্য ও যোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম হয়ে থাকে, দিতে পারে মুসলিম জীবন বিধানের সকল পর্যায়ে ও সকল প্রকার অবস্থায় নির্ভূল পথ-নির্দেশ। তা-ই এ দুটো বিদয়াত নয়। বিদয়াত নয় এ জন্য যে, এ দুটো ইসলামী ব্যবস্থায় কিছুমাত্র নতুন জিনিস নয়। স্বয়ং রাসূলে করীম(স) ও খুলাফায়ে রাশেদীন কর্তৃক এ দুটো পূর্ণমাত্রায় ব্যবহৃত হয়েছে ইসলামী আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে।

আল্লামা আলুসী লিখেছেনঃ কিয়াস ও ইজতিহাস দ্বীন পূর্ণ হওয়ার কিছুমাত্র বিপরীত নয়। কেননা দ্বীন পূর্ণ হওয়ার অর্থ হচ্ছেঃ দ্বীন নিজস্ব দিক দিয়ে এবং তার আনুষঙ্গিক জরুরী বিষয়ে পূর্ণ পরিণত ও চূড়ান্ত। এখন তা হতেই প্রয়োজনীয় আইন কানুন ও নিয়মনীতি বের করা হবে। আকায়েদের মূলনীতি নির্ধারণ করা হবে, শরীয়তের মূলনীতি ও ইজতিহাদের কায়দা কানুন উদ্ভাবিত হবে। তার কোনোটাই কুরআন তথা দ্বীনের পূর্ণ হওয়ার বিপরীত হবেনা।

মুজাদ্দেদী আলফেসানী শায়খ আহমদ সরহিন্দী বলেছেনঃ কিয়াস ও ইজতিহাদকে কোনো দিক দিয়েই বিদয়াত মনে করা যেতে পারেনা। কেননা এ দুটো মূল কুরআন হাদীসের দলীলই প্রকাশ করে, কোনো নতুন অতিরিক্ত জিনিস দ্বীনের ভিতরে প্রমাণ করেনা।

বস্তুত কিয়াস ও ইজতিহাদ রূপায়িত হয় ইজমার মাধ্যমে। ইজমাও দ্বীন ইসলামের নবোদ্ভাবিত কোনো জিনিস নয় এবং তদ্দারা কোনো নতুন ইসলামের মূল বিধানের সাথে সামঞ্জস্যহীন কোনো মতও প্রমাণিত হয়না। তাই ইজমাও বিদয়াত নয়-ইজমা দ্বারা প্রমাণিত কোনো ফায়সালাও বিদয়াত বলে গণ্য হতে পারেনা। ইজমার ভিত্তি স্পষ্টভাবে হাদীসেই স্বীকৃত।

হযরত ইবনে মাসউদ(রা) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম(স) ইরশাদ করেছেনঃ

- আরবী (*******)

- মুসলিম সমাজ সামগ্রিকভাবে শরীয়তের দৃষ্টিতে যে সিদ্ধান্ত করবে তা আল্লাহর নিকটও ভালোও উত্তমরূপে গৃহীত হবে এবং সে মুসলিমরাই যাকে খারাপ ও জঘন্য মনে করবে, তাই খারাপ ও জঘন্য বলে গণ্য হবে আল্লাহর নিকট। (ইবনে নযীম এ হাদীসটিকে ইবনে মাসউদের কথা বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তবুও ইজমার সমর্থনে এ একটি দলীলরূপে গণ্য। কেননা সাহাবীর কথাও শরীয়তের দলীল)।

 

আহলে সুন্নাত আহলে বিদয়াত

সুন্নাত ও বিদয়াত সম্পর্কে এ আলোচনার পর বিবেচ্য বিষয় হলো, কে আহলে সুন্নাত আর কে আহলে বিদয়াত?

আহলে সুন্নাত কে- মানে, সুন্নাতের অনুসারী কারা? কারা সুন্নাতকে অবলম্বন করে চলছে এবং জীবনধারাকে সুন্নাতের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখছে। আর আহলে বিদয়াত কে-মানে কারা সুন্নাতের অনুসারী নয়, কারা বিদয়াতপন্থী? কারা বিদয়াতী?

এ প্রশ্নেরও আলোচনা আবশ্যক। কেননা লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, বেশ কিছু লোক চরম বিদয়াতী কাজ করেও জীবনের বিভিন্ন দিকে সুন্নাতের বরখেলাপ কাজ করেও একমাত্র নিজেদেরকেই ‘আহলে সুন্নাত’ বলে দাবি করছে। আর তাদের বিদয়াতসমূহকে যারা সমর্থন করেনা, যারা শক্তভাবে সুন্নাতের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে চাচ্ছে, সুন্নাতকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছে জীবনে ও সমাজে তাদেরকে তারা বিদয়াতী (ফিতরাতপন্থী) বলে ফতোয়া দিচ্ছে। কাজেই দলীল ভিত্তিক বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে এ কথা স্পষ্ট হয়ে উঠা দরকার যে, সত্যিকারভাবে কুরআন হাদীসের দৃষ্টিতে কে আহলে সুন্নাত আর কে আহলে বিদয়াত এবং সেই সঙ্গে আহলে সুন্নাতেরই বা স্থান কোথায় এবং কোথায় স্থান আহলে বিদয়াতের।

আহলে সুন্নাত কারা, এ কথার জবাবে আল্লামা আবদুর রহমান ইবনুল জাওজীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেছেনঃ এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, নবী করীম(স) ও তাঁর সাহাবায়ে কিরামের আদর্শে অনুসারীরাই হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে আহলে সুন্নাত। কেননা তাঁরাই সুন্নাতের আদর্শকে বাস্তবভাবে অনুসরণ করে চলেছে, যে সুন্নাতে কোনরূপ নতুন জিনিস উদ্ভাবিত হয়নি। এ জন্যে যে, নতুন জিনিস উদ্ভাবিত হয়েছে-বিদয়াত সৃষ্টি হয়েছেতো রাসূলে করীম(স) ও সাহাবায়ে কিরামের পরবর্তীযুগে।

তিনি আরো বলেছেনঃ পূর্বোক্ত আলোচনা হতে এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, আহলে সুন্নাত হলো সুন্নাতের অনুসারী লোকেরা। আর আহলে বিদয়াত হলো তারা, যারা এমন কিছু জিনিস বের করেছে, যা পূর্বে ছিলনা এবং যার কোন সনদও নেই।

অর্থাৎ সুন্নাত যারা কার্যত পালন করে, তাতে কোনোরূপ হ্রাস করেনা, বৃদ্ধিও করেনা, যেমন রাসূল ও সাহাবায়ে কিরাম করেছেন, বলেছেন ও চলেছেন হুবহু তেমন-ই পালন করে, তারাইতো অভিহিত হতে পারে আহলে সুন্নাত বলে। আর যারা তাতে কোনোরূপ হ্রাস-বৃদ্ধি করে, মনগড়া অনেক কিছু ধর্মের মধ্যে শামিল করে নেয়, ধর্মীয় কাজ বলে চালিয়ে দেয়, তারা ‘আহলে সুন্নাত’ হতে পারেনা। তারাতো সম্পূর্ণরূপে ‘আহলে বিদয়াত’-বিদয়াতপন্থী।

বস্তুত সাহাবায়ে কিরামের যুগে কোনো বিদয়াত ছিলনা। তাঁরাতো খালেস সুন্নাতের উপর আমল করেছেন; আমল করেছেন ব্যক্তি জীবনে, অনুসরণ করে চলেছেন সমষ্টিগত জীবনের সকল ক্ষেত্রে। শুধু তা-ই নয়, কোথাও কোনো বিদয়াত দেখা দিলে তাঁরা পূর্ণ শক্তিতে সে বিদয়াতের প্রতিরোধ করেছেন। তাঁরা নবী করীম(স) এর ঘোষণার উপর খাঁটি বলে উত্তীর্ণ হয়েছেন। নবী করীম(স) বলেছেনঃ

আরবী (************)

-আমার সাহাবীগণ আমার উম্মতের উপর আমানতদার। আর আমার সাহাবীরা যখন চলে যাবে, তখন আমার উম্মতের উপর সেই অবস্থা ফিরে আসবে, যার ওয়াদা তাদের জন্য করা হয়েছে।

সুন্নাত প্রতিষ্ঠা বিদয়াত প্রতিরোধের দায়িত্ব

এ ছিল রাসূলে করীম(স) এর আগাম সাবধান বাণী। তাঁর উম্মতের উপর যেসব আদর্শিক বিপদ ও সংঘাত আসতে পারে বলে রাসূলে করীম(স)মনে করেছেন, সেগুলোর উল্লেখ করে তিনি আগেই সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন যেন উম্মতের জনগণ সে বিষয়ে হুঁশিয়ার হয়ে থাকে এবং নিজেদের ঈমান-আকীদায় এবং আমলে ও আখলাকে সে ধরনের কোনো জিনিস-ই প্রবেশ করতে না পারে। এ পর্যায়ের আর একটি হাদীস হচ্ছে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রা) কর্তৃক বর্ণিত।

রাসূলে করীম(স) বলেছেনঃ আরবী (*********)

- আমার পূর্বে প্রেরিত প্রত্যেক নবীর-ই তাঁর উম্মতের মধ্য থেকে হাওয়ারীগণ হয়েছে এবং এমন সব সঙ্গী সাথী ও হয়েছে, যারা সে নবীর সুন্নাত গ্রহণ ও ধারণ করেছেন। আর তাঁর আদেশ ও নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করেছেন। পরে সে উম্মতের অধিকারী হয়েছে এমন সব লোক, যারা বলতো এমন সব কথা যা তারা করতোনা এবং করতো এমন সব কাজ, যা করতে তাদের আদৌ আদেশ করা হয়নি। এরূপ অবস্থায় এ লোকদের বিরুদ্ধে যারা জিহাদ করবে নিজেদের শক্তি দ্বারা, তারা মুমিন আর যারা জিহাদ করবে নিজেদের মুখের ভাষা ও সাহিত্য দ্বারা তারাও মুমিন; আর যারা জিহাদ করবে দিল দ্বারা তারাও মুমিন। কিন্তু অতঃপর একবিন্দু ঈমাণের অস্তিত্ব আছে বলে মনে করা যেতে পারেনা।   

এ দীর্ঘ হাদীসে পরবর্তীকালে যেসব উত্তরাধিকারী সম্পর্কে সাবধান করা হয়েছে, তারাই হচ্ছে আহলে বিদয়াত। কেননা তাদের কাজ ও কথায় মিলন নেই এবং করে এমন কাজ, যা করতে তাদের বলা হয়নি। অথচ ইসলামী শরীয়তে এমন কাজকে দ্বীন কাজ হিসেবে করার কাউকে-ই অনুমতি দেয়া যেতে পারেনা। তাহলে রাসূলের সুন্নাতের কোনো মূল্যই থাকবেনা কারো কাছে, থাকবেনা কোনো গুরুত্ব। এ জন্যে এদের বিরুদ্ধেই জিহাদ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অতএব বিদয়াতীদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তিরই কর্তব্য। যে তা করবেনা, এ হাদীস অনুযায়ী তার মধ্যে ঈমানের লেশমাত্র নেই।

ইসলামের জিহাদ ঘোষণার নির্দেশ মূলত কূফর ‍ও শিরকের বিরুদ্ধে। কিন্তু এখানে যে বিদয়াতের বিরুদ্ধে জিহাদ করার গুরুত্ব এত জোরালো ভাষায় বলা হলো, তার কারণ এই যে, বিদয়াত সুস্পষ্ট কুফর ও প্রকাশ্য শিরক না হলেও তা যে কুফর ও শিরক এ সূচনা, কুফর ও শিরক এর উৎসে বীজ, তাতে সন্দেহ নেই।

ইসলামী সমাজে একবার বিদয়াত দেখা দিলে ও ক্ষেত্র তৈরি করে নিতে পারলে অনতিবিলম্বে তা-ই যে আসল শিরক ও কুফর-এর দিকে টেনে নিয়ে যাবে তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। এ কারণেই ইসলামী সমাজে কুফর ও শির্ক এর এই বীজকে অংকুরেই বিনষ্ট করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং এ জন্যেই বিদয়াত ও বিদয়াতপন্থীদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করার ওপর ঈমানের নির্ভরশীর হওয়ার কথা বলা হয়েছে। বস্তুত দ্বীন ইসলামে যে কাজ করতে বলা হয়নি সে কাজকে দ্বীনি কাজ মনে করে করাই হচ্ছে এক প্রকার কুফরী এবং এতেই নিহীত রয়েছে শিরক এর ভাবধারা। এ পর্যায়ে নিম্নোক্ত হাদীস কয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

নবী করীম(স) ইরশাদ করেছেনঃ

আরবী (********)

- যে লোক আমার পরে মরে যাওয়া কোনো সুন্নাতকে পুনরুজ্জীবিত করবে, তার জন্যে সে পরিমাণ সওয়াব রয়েছে যে পরিমাণ সওয়াব সে সুন্নাত অনুযায়ী আমল করে পাও্য়া যাবে; কিন্তু আমলকারীর সওয়াবে বিন্দুমাত্র কম করা হবেনা। পক্ষান্তরে যে লোক কোনো গোমরাহীর বিদয়াতকে চালু করবে-যে বিদয়াতে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল মোটেই রাজি নহেন-তার গুনাহ হবে সে পরিমাণ, যে পরিমাণ গুনাহ তদনুযায়ী আমল করলে হবে; কিন্তু আমলকারীর গুনাহ হতে এক বিন্দু কম করা হবেনা।

এখানে মরে যাওয়া সুন্নাতকে পুণরায় চালু করার সওয়াব ও গোমরাহীর বিদয়াত প্রবর্তন করার গুনাহ সম্বন্ধে যা কিছু বলা হয়েছে, তা থেকে মুসলিম সমাজকে সুরক্ষিত রাখা এবং সমাজে সুন্নাতকে চালু ও প্রতিষ্ঠিত করা- তাকে মরে যেতে না দেয়া ও বিদয়াতকে কোনোক্রমেই চালু হতে না দেয়ার জন্যে উদ্বুদ্ধ করাই এ হাদীসের মূল লক্ষ্য।

নবী করীম(স) বলেছেনঃ

আরবী (**********)

- দ্বীন ইসলাম শুরুতে যেমন অপরিচিত ও প্রভাবহীন ছিল, তেমনি অবস্থা পরেও দেখা যাবে। এই সময়কার এই অপরিচিত লোকদের জন্য সুসংবাদ। আর এই অপরিচিত লোক হচ্ছে তারা, যারা আমার পরে আমার সুন্নাতকে বিপর্যস্ত করার যাবতীয় কাজকে নির্মূল করে সুন্নাতকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টিত হবে। (তিরমিযী)।

মুসলিম সমাজে যদি সাধারণভাবে সুন্নাত প্রতিষ্ঠিত না থাকে, বিদয়াত যদি মুসলিম সমাজকে গ্রাস করে ফেলে তাহলে প্রকৃত দ্বীন ইসলাম সেখানে এক অপরিচিত জিনিসে পরিণত হবে এবং প্রকৃত ইসলাম পালনকারী লোকগণ-যাও বা অবশিষ্ট থাকে- তারা সমাজে সম্পূর্ণ অপরিচিত ও প্রভাবহীন হয়ে পড়ে। সমাজের উপর মাতব্বরী ও কর্তৃত্ব হয় বিদয়াতী ও বিদয়াতপন্থী লোকদের। এরূপ অবস্থায় যারাই সুন্নাতকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে দ্বীনের দৃষ্টিতে সমাজকে সুস্থ করে গড়ে তুলতে চেষ্টিত হয়, তাদের জন্য আল্লাহ ও আল্লাহ্র রাসূলের তরফ হতে সুসংবাদ শুনান হয়েছে। কেননা তারা বাস্তবিক মজবুত ঈমানের ধারক।

বস্তুত সুন্নাত যখন সমাজে ম্লান ও স্তিমিত হয়ে আসে এবং বিদয়াতের জুলমাত পুঞ্জীভূত হয়ে গ্রাস করে ফেলে সমস্ত সমাজকে, তখন ঈমানদার লোকদের একমাত্র কাজ হলো বিদয়াতকে মিটিয়ে সুন্নাতকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সংগ্রাম করা। কিন্তু তখনও যারা বিদয়াত ও বিদয়াতপন্থীদের সম্মান দেখায়, তারা ইসলামের সাথে করে চরম দুশমনি।

রাসূলে করীম(স) ইরশাদ করেছেনঃ

আরবী (********)

- যে লোক কোনো বিদয়াতী বা বিদয়াতপন্থীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলো, সে তো ইসলামকে ধ্বংস করায় সাহায্য করলো।

কেননা বিদয়াত পন্থী ব্যক্তির ভূমিকা ইসলামের বিপরীত। সে তো ইসলামকে নির্মূল করার ব্রতেই লেগে আছে নিরন্তর। আর এরূপ অবস্থায় তার প্রতি সম্মান দেখানো বা শ্রদ্ধা প্রকাশ করার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, সে লোক বিদয়াতীর কাজকে সমর্থন করে এবং বিদয়াতকে পছন্দ করে। এতে করে বিদয়াতী ও বিদয়াতপন্থী ব্যক্তির মনে ইসলামকে ধ্বংস করার ব্যাপারে অধিক সাহস ও হিম্মত হবে, সে হবে নির্ভীক, দুঃসাহসী। আর এ জন্যেই এ কাজ ইসলামকে ধ্বংস করার ব্যাপারে সাহায্য করে বলে রাসূলে করীম(স)ঘোষণা করেছেন।

হযরত ইবনে আব্বাস(রা) বলেন, নবী করীম(স) ইরশাদ করেছেনঃ

আরবী (********)

- আল্লাহর নিকট তিন শ্রেণীর লোক অত্যধিক ঘৃণ্য। এক. যারা হারাম শরীফে শরীয়তবিরোধী কাজ করে, দুই. ইসলামী আদর্শে যারা জাহিলিয়াতের নিয়ম-নীতি প্রথাকে চালু করতে ইচ্ছুক এবং তিন. যারা কোনো কারণ ব্যতীত-ই মুসলমানের রক্তপাত করতে উদ্ধত হয়। (বুখারী)।

হাদীসে বলা হয়েছে জাহিলিয়াতের সুন্নাত, নিয়ম-নীতি ও প্রথা। অর্থাৎ জাহিলিয়াতের সুন্নাত। আর তা সম্যকভাবেই ‘সুন্নাতে রাসূল’ এর বিপরীত জিনিস। এখন যে লোক ইসলামের সুন্নাতের মাঝে জাহিলিয়াতের সুন্নাত বা নিয়ম-নীতি প্রথাকে চালু করতে চায় ইসলামের অন্তর্ভূক্ত সুন্নাত হিসেবে, সে যে আল্লাহ্র নিকট অত্যন্ত ঘৃণ্য হবে, হবে আল্লাহ্র নিকট অত্যন্ত অভিশপ্ত তাতে আর কি সন্দেহ থাকতে পারে।

এ পর্যায়ে হযরত হাসান বসরী(র) বলেছেনঃ যে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই তাঁর নামে শপথ করে বলছি, অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি ও মাত্রা হ্রাস করার দুই সীমাতিরিক্ত প্রান্তিক নীতির মধ্যবর্তী নীতিই হচ্ছে তোমাদের সুন্নাতের নীতি, অতএব তোমরা তারই উপর ধৈর্য্ সহকারে অবিচল হয়ে থাক, আল্লাহ তোমাদের প্রতি রহম করবেন। কেননা আহলে সুন্নাত-সুন্নাত অনুসারী লোকদের সংখ্যা চিরকালই কম ছিল অতীতে, পরবর্তীকালেও তাই থাকবে। এরা হচ্ছে তারা যারা কখনো বাড়াবাড়িকারীদের সঙ্গে যোগদান করেনি। বিদয়াতপন্থীদেরও সঙ্গী হয়নি তারা তাদের বিদয়াতের ব্যাপারে। বরং তারা সুন্নাতের উপর অটল হয়েই দাঁড়িয়ে রয়েছে, যদ্দিন না আল্লাহ্র সাক্ষাতের জন্য তারা মৃত্যুবরণ করেছে। আল্লাহ চাইলে তোমরাও এমনিই হবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেছেনঃ

লোকেরা যখনই কোনো বিদয়াতকে উদ্ভাবন করেছে, তখনই তারা এক একটি সুন্নাতকে মেরেছে। এভাবেই বিদয়াত জাগ্রত ও প্রচন্ড হয়ে পড়েছে, আর সুন্নাত মিটে গেছে।

এসব কয়টি হাদীসই মুসলমানদের সামনে একটা সুস্পষ্ট কর্মসূচী পেশ করেছে এবং তা হচ্ছে এই যে, মুসলমানরা যে দেশ ও যে অবস্থাতেই থাকুকনা কেন, তারা বিদয়াত ও বিদয়াতপন্থীদের বিরুদ্ধে দূর্ভেদ্য প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এবং সুন্নাতকে তার আসল রূপে ও ভাবধারায় প্রতিষ্ঠিত করতে এবং রাখতে চেষ্টিত হবে। ‘সুন্নাত’ যদি বিলীন হয়ে যায় আর বিদয়াত যদি প্রবল হয়ে দাঁড়াতে পারে, তাহলে মুমিন ও মুসলিমের অস্তিত্বই অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়।

সাহাবীদের জামাআতই আদর্শ

দুনিয়া ইসলামের এ সুন্নাতের আদর্শ লাভ করেছে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ(স) এর কাছ থেকে। মুহাম্মদ(স)-ই এ সুন্নাতকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এবং তাঁর সাহাবীরাও এ সুন্নাতেরই উপর অটল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। সাহাবীদের পরে তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীনের যুগেও সুন্নাতই সমাজের ওপর জয়ী ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে মুসলিম মিল্লাতের নানাবিধ দূর্বলতা দেখা দেয়, দেখা দেয় নব নব বিদয়াত। সমাজের সাধারণ অবস্থা প্রচন্ডভাবে বদলে যায়। বিদয়াত জয়ী ও প্রকট হয়ে পড়ে এবং সুন্নাত হয় দূর্বল ও পরাজিত বরং লোকেরা বিদয়াতকেই সুন্নাত হিসেবে গ্রহণ করে এবং সুন্নাতকে বিদয়াতের ন্যায় পরিহার করে। সে আজ প্রায় বার তেরশ’ বছর আগের কথা। তারপর মুসলিম জীবন সুন্নাতের আদর্শ থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে পড়তে থাকে এবং সুন্নাতের আদর্শের পরিবর্তে শিকড় গাড়তে থাকে বিদয়াত। আজকের মুসলমান তো এ দৃষ্টিতে বিদয়াত-অজগরের একেবারে উদর গহবরে আটকে গেছে। কিন্তু আজও তাদের সামনে আদর্শ ও অনুকরণীয় ও অনুসরণযোগ্য হচ্ছে রাসূলে করীম(স) ও তাঁর সাহাবায়ে কিরাম। তাঁদেরই অনুসরণ করে চলা উচিত সকল মুসলমানের। রাসূল ও সাহাবদের যুগে সুন্নাত বিশ্ব মুসলিমের নিকট চিরকালের তরে আঁধার সমুদ্রের আলোকস্তম্ভ। আজো সেখান থেকেই আলো গ্রহণ করতে হবে, পেতে হবে পথ-নির্দেশ। রাসূলে করীম(স) এমনি এক ভবিষ্যদ্বাণী করে বিভ্রান্ত মুসলিমের জন্য পথ-নির্দেশ করে গেছেন।

রাসূলের একটি হাদীসের শেষাংশ হচ্ছে এইঃ

আরবী (************)

-বনী-ইসরাঈলীরা বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল আর আমার উম্মত তিহাত্তর ফির্কায় বিভক্ত হবে। তাদের মধ্যে একটি ফির্কা ছাড়া আর সব ফির্কা-ই জাহান্নামী হবে। সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেনঃ সে একটি ফির্কা কারা হে রাসূল (স)? তিনি বললেন, “তারা হচ্ছে সেই লোক যারা অনুসরণ করবে আমার ও আমার আসহাবদের আদর্শ”।

এ হাদীসকে ভিত্তি ধরে ইমাম তিরমিযী এবং ইমাম ইবনুল জাওজী যে কথাটি বলেছেন, তার মর্ম হলো এইঃ এ হাদীসে প্রমাণ রয়েছে যে, ‘এক জামা‘আত’ বলতে সাহাবাদের জামা‘আতকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ বিশেষ কোনো একজন সাহাবী নন, নবী করীম(স) এবং সামগ্রিকভাবে সাহাবীদের জামা‘আত যে সুন্নাতকে পালন করে গেছেন, পরিবর্তিত অবস্থায় এবং পতন যুগেও যারা সেই সুন্নাতকে অনুসরণ করবে, তারাই জান্নাতে যাওয়ার অধিকারী হবে। তারা হবে সেই লোক যারা আকীদা, কথা ও বাহ্যিক আমলের রীতি-নীতি সব-ই সাহাবীদের ইজমা থেকে গ্রহণ করবে।

আবুল আলীয় তাবেয়ী বলেছেনঃ মুসলিম সমাজ ফির্কায় ফির্কায় বিভক্ত হওয়ার পূর্বে যে অবস্থায় ছিল, তোমরা সেই অবস্থাকে শক্ত করে বজায় রাখতে ও বহাল করতে চেষ্টা করবে।

এ কথাটিতেও ঠিক সাহাবাদের যুগের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। কেননা সাহাবীদের যুগই ছিল এমন যুগ-যখন মুসলিম সমাজ ছিল ঐক্যবদ্ধ, অবিভক্ত।

আসেম বলেন, আবুল আলীয়ার এ নসীহতের কথা হাসানুল বসরীকে বলায় তিনি বলেনঃ আল্লাহ্র কসম, তোমাকে ঠিকই উপদেশ দিয়েছে এবং তোমাকে একান্তই সত্য কথা বলেছে।

ইমাম আওয়াজী বলেছেনঃ তোমরা নিজেকে সুন্নাতের ওপর অবিচল রাখো সুন্নাতে ধারক লোকেরা যেখানে দাঁড়িয়েছেন অর্থাৎ যে নীতি গ্রহণ করেছেন, তুমিও সে নীতিই গ্রহণ করো, তাঁরা যা বলেছেন, তুমি তাই বলবে, যা থেকে তাঁরা বিরত রয়েছেন, তুমিও তা থেকে বিরত থাকবে। আর তোমার পূর্ববর্তী নেককার লোক যে পথ ধরে চলে গেছেন, তুমিও সেই পথেই চলবেন। তাহলে তাঁরা যা করেছেন, তা-ই করার তওফীক তুমিও পাবে।

মনে রাখতে হবে, ইমাম আওজায়ী একজন তাবেয়ী এবং তিনি সলফে সালেহ বলতে বুঝিয়েছেন সাহাবীদের জামা‘আতকে। অতএব রাসূলের পরে সুন্নাতের আদর্শ সমাজ যেমন ছিলেন সাহাবায়ে কিরাম, তেমনি রাসূলের পরে সাহাবায়ে কিরামই হতে পারেন সকল কালের, সকল মুসলিমের আদর্শ ও অনুসরণীয়। সলফে সালেহীন বলতে দুনিয়ার মুসলমানের নিকট তাঁরাই বরণীয়। কেননা তাঁদের আদর্শবাদিতা ও রাসূলের অনুসরণ গুণের কথা স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা সাক্ষ্য দিয়েছেন কুরআন হাদীসে সাক্ষ্য দিয়েছেন স্বয়ং নবী করীম(স)। রাসূলের সত্য মাপকাঠিতে পুরোপুরিভাবে তাঁরাই উত্তীর্ণ হয়েছেন।

বস্তুত রাসূল(স) এর পরে সাহাবায়ে কিরাম ছাড়া মুসলমানদের নিকট আর কোনো ব্যক্তি কোনো কালের, কোনো দেশের কোনো বুযুর্গ ও(?) আদর্শ ও অনুসরণীয়রূপে গণ্য হতে পারে না। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রা) কোনো ব্যক্তিকে আদর্শরূপে গ্রহণ করা সম্পর্কে বলেছেনঃ কারো যদি সুন্নাতকে ধারণ করতেই হয়, তাহলে তার উচিত এমন ব্যক্তির সুন্নাত ধারণ করা, যে মরে গেছে। কেননা যে লোক এখনো জীবিত সে যে ভবিষ্যতে ফিতনায় পড়বেনা, তার কোনো নিশ্চয়তাই নেই। আর মরে যাওয়া লোক হচ্ছেন মুহাম্মদ(স) এর সাহাবীগণ, যারা ছিলেন এ উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম লোক, যাঁদের দিল ছিল সর্বাধিক পূণ্যময়, গভীরতম জ্ঞানসম্পন্ন। কৃত্রিমতা ছিলনা তাঁদের মধ্যে। আল্লাহ তা‘আলা তাঁদের বাছাই করে নিয়েছিলেন তাঁর নবীর সাহাবী হওয়ার জন্যে এবং তাঁর দ্বীন কায়েম করবার জন্যে। অতএব তোমরা তাদের সঠিক মর্যাদা অনুধাবন করো-স্বীকার করো। তাঁদের পদাংক অনুসরণ করো। আর তাঁদের চরিত্র ও স্বভাবের যতদূর সম্ভব তোমরা ধারণ ও গ্রহণ করো। কেননা তাঁরা ছিলেন সঠিক ও সুদৃঢ় হেদায়াতের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রা) এর মতো একজন সাহাবীরও এ এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ। এর তাৎপর্য্ এই যে, সাহাবায়ে কিরামই সর্বকালের লোকদের জন্য পরিপূর্ণ ও নিখুঁত নির্ভরযোগ্য আদর্শ। আকীদা-বিশ্বাস, আমল-আখলাকের দৃষ্টিতে তাঁরা সর্বোন্নত পর্যায়ে উন্নীত ও সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। কিন্তু এখানে বিশেষ কোনো ব্যক্তি সাহাবীর কথা বলা হয়নি, বলা হয়েছে সমষ্ঠিগতভাবে সাহাবীদের জামা‘আতের কথা। এই সাহাবীদের জামা‘আতই মুসলিমের নিকট অনুসরণীয়।

এ থেকে বোঝা গেল যে, রাসূলে করীম(স) ছাড়া মানব সমাজের কোনো এক ব্যক্তিকে-ই একান্তভাবে অনুসরণীয়রূপে গ্রহণ করা কিছুতেই কল্যাণকর হতে পারেনা, ইসলাম সে নির্দেশ দেয়নি কাউকেই-সে যে যুগের এবং যত বড় বুযুর্গ ও অলী-আল্লাহ্ই হোকনা কেন। শুধু তাই নয়, ইসলামে সে বিষয়ে স্পষ্ট নিষেধ বাণীও উচ্চারিত হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রা) হতে বর্ণিত হয়েছেঃ কেউ যেন নিজের দ্বীনকে কোনো ব্যক্তির সাথে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে না দেয় যে, সে ঈমান আনলে সেও ঈমান আনবে আর সে কুফরী করলে সেও কুফরী করবে। যদি তোমরা কারো অনুসরণ করতে বাধ্য হও-ই, তাহলে তোমরা অনুসরণ করবে মরে যাওয়া লোকদের। কেননা জীবিত মানুষ জীবিত থাকা অবস্থায় ফিতনা হতে মুক্ত হতে পারেনা।

এখানেও মরে যাওয়া লোক বলতে বোঝায়, সাহাবীদের জামা‘আত, কোনো বিশেষ ব্যক্তি-সাহাবী নয়। একমাত্র রাসূলে করীম(স) ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তির অন্ধ অনুসরণ ইসলামে আদৌ সমর্থিত নয়। এ হচ্ছে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের মতো একজন জলীলুল কদর সাহাবার কথা। তিনি যেমন ছিলেন প্রথম যুগের সাহাবী, তেমনি রাসূলের বিশেষ খাদেম। কাজেই সাধারণভাবে মুসলমানদের জন্য সঠিক নির্ভরযোগ্য কর্মনীতি এ-ই হতে পারে যে, তারা মেনে চলবে শুধু আল্লা্হকে, আল্লাহ্র রাসূলকে-কুরআন এবং হাদীসকে; আর এক কথায় সুন্নাতকে। এ ছাড়া কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত মতকে ব্যক্তিগত চাল-চলন, স্বভাব চরিত্র ও আচার ব্যবহারকে কখনোই একমাত্র আদর্শরূপে আঁকড়ে ধরবেনা। কোনো জীবিত বা মৃত মানুষের বিনা শর্তে আনুগত্য স্বীকার করবেনা। বিনা শর্তে আনুগত্য মানব সমাজে কেবলমাত্র রাসূলে করীম(স) কে করা যেতে পারে, করতে হবে, অন্য কারো নয়।

এ পর্যায়ে একটি বড় বিভ্রান্তির অপনোদন করা একান্তই আবশ্যক। বিভ্রান্তিটি হচ্ছে একটি প্রখ্যাত হাদীসকে কেন্দ্র করে।

হাদীসটি হলো এইঃ আরবী(**********)

-আমার সাহাবীগণ নক্ষত্রপুঞ্জের মতোই উজ্জ্বল। এদের মধ্যে যার-ই তোমরা অনুসরণ করবে, হেদায়াতপ্রাপ্ত হবে।

এই হাদীসের ভিত্তিতে কেউ কেউ বলতে চান যে, নিজেদের ইচ্ছেমতো  যে কোনো একজন সাহাবীর অনুসরণ করলেই হেদায়াতের পথে চলা সম্ভব হবে। কিন্তু কয়েকটি কারণে এই হাদীসকে দলীল হিসেবে পেশ করা যুক্তিযুক্ত হতে পারেনা। প্রথম কারণটি এই যে, এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন সূত্রে। একটি সূত্র হলোঃ আ‘মাশ থেকে আবু সুফিয়ান হতে, জাবির(রা) হতে। আর একটি হলো সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব হতে, ইবনে আমর থেকে। আর তৃতীয় হলো হামযা আল-জজী থেকে, নাফে থেকে, ইবনে উমর থেকে। কিন্তু মুহাদ্দিসদের বিচারে এ সব সূত্রে কোনো হাদীস প্রমাণিত নয়। ইবনে আবদুল বার্র এর উদ্বৃতি দিয়ে আল্লামা ইবনুল কায়্যিম লিখেছেনঃ আমাদের নিকট সাঈদের পুত্র ইবরাহীম, তাঁর পুত্র মুহাম্মদ হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, তাদের নিকট হামদ ইবনে আইয়ূব আস সামূত বর্ণনা করেছেন যে, আমাদের নিকট বাজ্জার বলেছেন যে, “আমার সাহাবীরা নক্ষত্রপুঞ্জের মতো, তাদের মধ্যে যার-ই তোমরা অনুসরণ করবে, হেদায়াত পাবে”। এই অর্থের যে হাদীসটি বর্ণনা করা হয় তা এমন একটি কথা, যা নবী করীম(স) হতেই সহীহ বলে প্রমাণিত হয়নি। (খতীব আল বাগদাদীর উদ্ধৃত হযরত ইবনুল খাত্তাব (রা) এর বর্ণনা থেকে এর বিপরীত কথা জানা যায়।)

হাদীস বিচারে সনদের গুরুত্ব হলো মৌলিক। আর সনদের বিচারে যে হাদীস সহীহ বলে প্রমাণিত নয়, তাকে শরীয়তের দলীল হিসেবে পেশ করার কোনো অধিকার কারোই থাকতে পারেনা।

সুন্নাত- কঠিন ও সহজ

আমরা যারা আহলি সুন্নাত হওয়ার দাবি করছি এবং মনে বেশ অহমিকা বোধ করছি এই ভেবে যে, আমরা কোনো গোমরাহ ফির্কার লোক নই; বরং নবী করীম(স)-এর প্রতিষ্ঠিত ও সুন্নাত অনুসরণকারী সমাজের লোক। কিন্তু আমাদের এই ধারণা কতখানি যথার্থ, তা আমাদের অবশ্যই গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার।

আমরা আহলি সুন্নাত অর্থাৎ সুন্নাতের অনুসরণকারী। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা রাসূলে করীম(স) এর কোন সুন্নাতের অনুসরণকারী? কঠিন ও কষ্টের সুন্নাতের, নাকি সহজ, নরম ও মিষ্টি মিষ্টি সুন্নাতের।

অস্বীকার করার উপায় নেই যে, রাসূলে করীম(স) এর জীবনে ও চরিত্রে এ উভয় ধরনের সুন্নাতেরই সমাবেশ ঘটেছে। তিনি একজন মানুষ ছিলেন। তাই মানুষ হিসেবেই তাঁকে এমন অনেক কাজই করতে হয়েছে, যা এই দুনিয়ায় বেঁচে থাকার জন্য দরকার। যেমন খাওয়া, পরা, দাম্পত্য ও সাংসারিক জীবন যাপন। এ ক্ষেত্রে তিনি যে যে কাজ করেছেন শরীয়তের বিধান অনুযায়ী তা-ও সুন্নাত বটে। তবে তা খুবই সহজ, নরম ও মিষ্টি সুন্নাত। তা করতে কষ্টতো হয়-ই না; বরং অনেক আরাম ও সুখ পাওয়া যায়। যেমন, কদুর তরকারী খাওয়া, মিষ্টি খাওয়া, পরিচ্ছন্ন পোষাক পরিধান করা, মিস্ওয়াক করা, আতর-সুগন্ধী ব্যবহার করা, বিয়ে করা, একাধিক স্ত্রী গ্রহণ, লম্বা জামা-পাগড়ী বাঁধা, দাঁড়ি রাখা ইত্যাদি।

কিন্তু রাসূলে করীম(স) এর জীবনে আসল সুন্নাত সেইসব কঠিন ও কষ্টসাধ্য কাজ, যা তাঁকে সেই মুশরিক আল্লাহদ্রোহী সমাজে তওহীদি দাওয়াত প্রচার ও দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা-প্রচেষ্টার সাথে করতে হয়েছে। এই পর্যায়ে তাঁকে ক্ষুধায় কাতর হতে, পেটে পাথর বাঁধতে ও দিন-রাত অবিশ্রান্তভাবে শারীরিক খাটুনী খাটতে হয়েছে। শত্রুদের জালা-যন্ত্রণা ভোগ করতে, পায়ে কাঁটা লাগাতে এবং তায়েফে গিয়ে গুন্ডাদের নিক্ষিপ্ত পাথরে দেহ মুবারককে ক্ষত-বিক্ষত করে রক্তের ধারা প্রবাহে পরনের কাপড় সিক্ত করতে ও ক্লান্ত শ্রান্ত অবসন্ন হয়ে রাস্তার ধারে বেহুঁশ হয়ে পড়ে যেতে হয়েছে। এক সময় বনু হাশিম গোত্রের সাথে মক্কাবাসীদের নিঃসম্পর্ক ও বয়কট হয়ে আবু তালিব গুহায় ক্রমাগত তিনটি বছর অবস্থান করতে হয়েছে। সর্বশেষে পৈতৃক ঘর-বাড়ি ত্যাগ করে মদীনায় হিজরত করতে হয়েছে। কাফির শত্রু বাহিনীর মোকাবিলায় মোজাহিদদের সঙ্গে নিয়ে পূর্ণ পরাক্রম সহকারে যুদ্ধ করতে, দন্ত মুবারক শহীদ করতে ও খন্দক খুদতে হয়েছে।

রাসূলে করীম(স) এর এসব কাজও সুন্নাত এবং সে সুন্নাত অনুসরণ করাও উম্মতের জন্য একান্ত কর্তব্য। তবে এ সুন্নাত অত্যন্ত কঠিন, দুঃসাধ্য ও প্রাণান্তকর চেষ্টার সুন্নাত।

সহজেই প্রশ্ন জাগে, আমরা কি এই সুন্নাত পালন করছি? যদি না করে থাকি-করছি না যে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়- তাহলে রাসূলের সুন্নাত অনুসরণের যে দাবি আমরা করছি, তা কি সত্য বলে মনে করা যায়? বড়জোর এতটুকুই বলা চলে যে, হ্যাঁ, আমরা রাসূলের সুন্নাত অনুসরণ করছি বটে, তবে তা মিষ্টি, সহজ ও নরম নরম সুন্নাত। কিন্তু কঠিন, কষ্ট, প্রাণে ও ধন-সম্পদে আঘাত লাগে এমন কোনো সুন্নাত পালনের দিকে আমাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই, তাও যে আমাদেরকে অবশ্য পালন করতে হবে, না করলে কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট কঠিন জবাবদিহি করতে হবে, সেকথা স্মরণ করতেও যেন আমরা ভয় পাই।

 

বিদয়াতের পুঞ্জীভূত স্তূপ

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ(রা)এর পূর্বোক্ত কথাটি যে অক্ষরে অক্ষরে সত্য, তা মুসলমানদের সাহাবী পরবর্তী যুগের ইতিহাস অকাট্য ও নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে। উত্তরকালে মুসলিম সমাজে নানাবিধ বিদয়াত প্রচলিত হয়ে পড়ে, সুন্নাত ধীরে পরিত্যক্ত হয়-মন ও জীবন থেকে নিঃশেষে বিলুপ্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু যখনি সুন্নাতকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা শুরু হয়েছে, তখনই এই ব্যক্তিগত অন্ধ অনুসরণের প্রবল বিদ্বেষ তার পথে প্রচন্ড বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষ ব্যক্তির নাম করে  যে তার জীবদ্দশায় হয়তো বড় আলীম বা পীর, অলী আল্লাহ হওয়ার সূখ্যাতি পেয়ে গেছেন জনগণের মাঝে-তাঁর দোহাই দিয়ে বলা হয়েছেঃ অমুক বুজুর্গ বা অমুক পীর একথা বলে গেছেন, কাজেই এতে কোনো দোষ নেই। এভাবে ব্যক্তি ভিত্তিক সত্যাসত্য ও ন্যায়ান্যায়ের বিচার ইসলামে এক সম্পূর্ণ নতুন জিনিস-সুস্পষ্ট বিদয়াত। অথচ ইসলামে নবী করীম(স) ছাড়া আর কোনো ব্যক্তির কথা অথবা কাজের দোহাই আদৌ সমর্থনীয় নয়। এভাবে মুসলিম সমাজে ধীরে ধীরে সুন্নাত-রাসূলে করীম(স) এর আদর্শ –তলিয়ে গিয়ে সেখানে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে বিদয়াত-আবর্জনার স্তূপ। এ বিদয়াত যেমন দেখা দিয়েছে আকীদা বিশ্বাসে, চিন্তায়-মনে, তেমনি আমলে ও আখলাকে, বাস্তব জীবনের সর্বদিকে ও সর্বক্ষেত্রে। এ স্তুপ প্রায় আকাশছোঁয়া। এর একটা একটা করে গণনা করাও সাধ্যাতীত। অথচ এ বিদয়াতগুলো চিহ্নিত ও নির্ধারিত না হলে মুসলমানকে তা থেকে রক্ষা করার-বিদয়াতের স্তুপের তলা থেকে তাদের উদ্ধার করার আরে কোনোই উপায় নেই। তাই আমরা কতকগুলো বড় বড় বিদয়াত সম্পর্কে যথাসম্ভব সংক্ষেপে আলোচনা পেশ করবো। আমরা দেখাবঃ এক-একটি বিদয়াত কিভাবে মুসলমানদের মধ্যে প্রবেশ করেছে ও শিকড় গেড়ে বসেছে এবং মূল ইসলামের দৃষ্টিতে তাদের কোথায়-কোন গোমরাহীর সুদূর প্রান্তে নিয়ে পৌছিয়েছে।

এ পর্যায়ের আলোচনার শেষভাগে আমরা ‘খলিফায়ে রাশিদ’ হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীযের সে বিখ্যাত ভাষণটির কথা উল্লেখ করবো, যা তিনি খলীফা নিযুক্ত হওয়ার পরই সমবেত লোকদের সামনে পেশ করেছিলেন।

ভাষণটি এইঃ জেনে রাখো, তোমাদের নবীর পর আর কোনো নবী-ই নেই, তোমাদের কিতাব(কুরআন মজীদ) এর পর আর কোনো কিতাব-ই নেই, তোমাদের জন্য নির্দিষ্ট সুন্নাতের পর আর কোনো সুন্নাত নেই এবং তোমাদের এই উম্মতের পর আর কোনো (নবীর) উম্মত হবেনা। তোমরা জেনে রাখো, হালাল তা-ই, যা আল্লাহ তাঁর কিতাবে তাঁর রাসূলের জবানীতে হালাল করে দিয়েছেন এবং তা হালাল কিয়ামত পর্য্ন্ত। জেনে রাখো, হারাম কেবল তা-ই, যা আল্লাহ হারাম করেছেন তাঁর কিতাবে তাঁর রাসূলের জবানীতে, তা হারাম কিয়ামত পর্য্ন্ত। জেনে রাখবে, আমি বিদয়াতপন্থী বা নতুন কিছুর প্রবর্ত্ক নই। আমি শুধু দ্বীনের অনুসরণকারী মাত্র। জেনে রাখো, আমি চূড়ান্ত ফয়সালাকারী কেউ নই, আমি তো শুধু নির্বাহকারী। জেনে রাখবে, আমি ধন-ভান্ডার সঞ্চয়কারী নই বরং আমি সেখানেই তাই রাখব, যা যেখানে রাখার জন্য আদিষ্ট হয়েছি। এ-ও জেনে রাখবে, আমি তোমাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি নই; আমাকে তো তোমাদের উপর বোঝাস্বরূপ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, আর শেষ কথা জেনে রাখবে, স্রষ্টার নাফরমানী করে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবেনা।

বস্তুত এ ভাষণটি ইসলামী আদর্শানুসারী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তিরই উপযুক্ত ভাষণ। এ ভাষণের মূল বক্তব্য আমাদের এ আলোচনারও বক্তব্য।

বিদয়াত কত প্রকার?

বিদয়াত সম্পর্কে এ মৌলিক আলোচনার শেষ পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা একান্ত আবশ্যক, তা হলো বিদয়াতের প্রকারভেদ সম্পর্কে। প্রশ্ন হলো, বিদয়াত কি সত্যিই কয়েকভাগে বিভক্ত?

সাধারণভাবে মুসলিম সমাজের প্রচলিত ধারণা হলো বিদয়াত দু’প্রকার। একটি হলো ‘বিদয়াতে হাসানা’ বা ‘ভালো বিদয়াত’ আর দ্বিতীয়টি হলো ‘বিদয়াতে সাইয়্যেয়া’ বা মন্দ বিদয়াত। কেউ কেউ দ্বিতীয়টির নাম দিয়েছেন ‘বিদয়াতে মুস্তাকবিহা’ বা ‘ঘৃণ্য ও জঘন্য বিদয়াত’। কিন্তু বিদয়াতের এ বিভাগও বোধ হয় একটি অভিনব বিদয়াত। কেননা বিদয়াতকে ‘ভালো’ ও ‘মন্দ’ এ দু’ভাগে ভাগ করার ফলে বহু সংখ্যক ‘বিদয়াত’-ই ভালো বিদয়াত হওয়ার পারমিট নিয়ে ইসলামী আকীদা ও আমলের বিশাল ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করেছে অগোচরে। ফলে তওহীদবাদীরাই আজ এমন সব কাজ অবলীলাক্রমে করে যাচ্ছে, যা প্রকৃতপক্ষেই তওহীদবিরোধী-যা সুস্পষ্টরূপে বিদয়াত এবং কোনো তওহীদবাদীর পক্ষেই তা এক মুহুর্তের তরেও বরদাশত করার যোগ্য নয়।

এ পর্যায়ে আল্লামা বদরুদ্দীন আইনীর মতো মনীষী ও বিদয়াতকে দু’প্রকারে বলে একটি সংজ্ঞা পেশ করেছেন। তিনি বলেছেনঃ বিদয়াত দু’প্রকার। বিদয়াত যদি কোনো শরীয়তসম্মত ভালো কাজের মধ্যে গণ্য হয়, তবে তা ‘বিদয়াতে হাসানা’-ভালো বিদয়াত। আর তা যদি শরীয়তের দৃষ্টিতে খারাপ ও জঘন্য কাজ হয়, তবে তা ‘বিদয়াতে মুস্তাকবিহা’ বা ‘ঘৃণ্য ও জঘন্য বিদয়াত’।

প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও গ্রন্থ প্রণেতা ইমাম শাওকানী লিখেছেনঃ ‘বিদয়াত’ আসলে বলা হয় এমন নতুন উদ্ভাবিত কাজ ও কথাকে, পূর্ববর্তী সমাজে যার কোনো দৃষ্টান্তই পাওয়া যায়না। আর শরীয়তের পরিভাষায় সুন্নাতের বিপরীত জিনিসকে বলা হয় বিদয়াত। অতএব তা অবশ্যই নিন্দনীয় হবে।

অর্থাৎ যা-ই সুন্নাতের বিপরীত তা-ই বিদয়াত। অতএব বিদয়াতের সব কিছুই নিন্দনীয়, পরিত্যাজ্য, তার মধ্যে কোনো দিকই প্রশংসনীয় বা ভালো হতে পারেনা। অন্য দিকে বিদয়াতকে দু’ভাগে ভাগ করে এক ভাগকে ভালো বিদয়াত বলে আখ্যায়িত করা এবং এক ভাগকে মন্দ বিদয়াত বলা একেবারেই অমূলক।

এ কথার যৌক্তিকতা অনস্বীকার্য্। শরীয়তে যার কোনো না কোনো ভিত্তি বা দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে, তা তো কোনোক্রমেই সুন্নাতের বিপরীত হতে পারেনা। যা-ই সুন্নাতের বিপরীত নয়, তা-ই বিদয়াত নয়। আর যার কোনো দৃষ্টান্তই ইসলামের সোনালী যুগে পাওয়া যায়না, শরীয়তে পাওয়া যায়না যার কোনো ভিত্তি তা কোনোক্রমেই শরীয়তসম্মত নয় বরং তা-ই সুন্নাতের বিপরীত; অতএব তা-ই বিদয়াত। এর কোনো দিকই ভালো প্রশংসনীয় বা গ্রহণযোগ্য নয়। এক কথায় বিদয়াতকে হাসানাহ্ ও সাইয়্যেয়া-ভালো ও মন্দ ভাগ করা অযৌক্তিক।

রাসূলের যুগে বিদয়াতের মধ্যে কোনো ভালো দিক পাওয়া যায়নি। সাহাবী ও তাবেয়ীনের যুগেও নয়, রাসূলের বাণীতেও বিদয়াতকে এভাবে ভাগ করা হয়নি।

তাহলে মুসলিম সমাজে বিদয়াতের এ বিভাগ কেমন করে প্রচলিত হলো? এর জবাব পাওয়া যাবে হযরত উমর ফারূকের(রা) একটি কথার বিস্তারিত ব্যাখ্যার মাধ্যমে। এ সম্পর্কে হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে। আবদুর রহমান ইবনে আবদুল কারী বলেনঃ আমি হযরত উমর(রা) এর সাথে রমজান মাসে মসজিদে গেলাম। সেখানে দেখলাম লোকেরা বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে নিজ নিজ নামায পড়ছে। আবার কোথাও একজন লোক নামায পড়ছে, আর তার সঙ্গে পড়ছে কিছু লোক। তখন হযরত উমর(রা) বলেনঃ আমি মনে করছি, এসব লোককে একজন ভালো ক্বারীর পিছনে একত্রে নামায পড়তে দিলে খুবই ভালো হতো। পরে তিনি তাই করার ব্যবস্থা করেন এবং হযরত উবাই ইবনে কায়াবের ইমামতিতে জামায়াতে নামায পড়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। এই সময় এক রাত্রে আবার উমর ফারূকের সাথে আমিও বের হলাম। তখন দেখলাম লোকেরা একজন ইমামের পেছনে জামা‘আতবদ্ধ হয়ে তারাবীহর নামায পড়ছেন। এ থেকে হযরত উমর(রা) বললেনঃ এতো খুব ভালো বিদয়াত।(এই হাদীসটি ঈমাম বুখারী প্রমূখ মুহাদ্দিস জামা‘আতের সাথে তারাবীহ নামায পড়ার পর্যায়েই তা উল্লেখ করেছেন। রমযান মাসে জামা‘আতের সাথে তারাবীহ পড়া যে জায়েজ এ হাদীসই তার দলীল।)

হাদীসের শেষভাগে উল্লেখিত হযরত উমর ফারূক(রা) এর কথাটিই হলো বিদয়াতকে দু’ভাগে ভাগ করার পক্ষে অনেকের যুক্তি। বাক্যটির শাব্দিক তরজমা হলো ‘এটা একটা উত্তম বিদয়াত’। আর একটি বিদয়াত যদি উত্তম হয়, তাহলে আপনা আপনি বোঝা যায় যে, আর একটি বিদয়াত অবশ্যই খারাপ হবে। তাহলে মনে করা যেতে পারে যে, কোনো কোনো বিদয়াত ভালো, আর কোনো কোনো বিদয়াত মন্দ। এই হলো এ ব্যাপারে মূল ইতিহাস। মনে হচ্ছে উত্তরকালে হাদীসের ব্যাখ্যা লিখতে গিয়েই লোকেরা বিদয়াতের এ দুটো ভাগকে তুলে ধরেছেন। এবং বুখারী থেকেই সাধারণ সমাজে এ কথাটি ছড়িয়ে পড়েছে ও লোকদের মনে বদ্ধমূল হয়ে বসেছে। এখন অবস্থা হচ্ছে এই যে, যে কোনো বিদয়াতকে সমালোচনা করলে বা সে সম্পর্কে আপত্তি তোলা হলে, তাকে বিদয়াত বলে ত্যাগ করার দাবি জানানো হলে অমনি জবাব দেয়া হয়, ‘হ্যাঁ, বিদয়াততো বটে, তবে বিদয়াতে সাইয়্যেয়া নয়, বিদয়াতে হাসানাহ, অতএব ত্যাগ করার প্রয়োজন নেই।’ হয়তোবা এ বিদয়াতের হাসানাহ এর আবরণে সুন্নাতের সম্পূর্ণ খেলাপ এক মারাত্মক বিদয়াত-ই সুন্নাতের মধ্যে, সওয়াবের কাজের মধ্যে গণ্য হয়ে মুসলিম সমাজে দ্বীনি মর্যাদা পেয়ে গেল। বস্তুত বিদয়াতের মারাত্মক দিক-ই হচ্ছে এই। এ কারণে বাস্তবতার দৃষ্টিতে রাসূলের বাণী ‘সব বিদয়াত-ই গোমরাহী’- এ কথাটি অর্থহীন হয়ে যায়। কেনন সব বিদয়াত-ই যদি গোমরাহী হয়ে থাকে তাহলে কোনো বিদয়াতই হেদায়াত হতে পারেনা। কিন্তু বিদয়াতের ভাগ-বন্টনে তার বিপরীত কথাই প্রমাণিত হয়। তার অর্থ দাঁড়ায় এই যে, কোনো কোনো বিদয়াত ভালোও আছে।রাসূলের কথা ‘সব বিদয়াতই গোমরাহী’ এ কথাটি ঠিক নয় (নাউজুবিল্লাহে মিন জালিক)। রাসূলের কথার বিপরীত ব্যাখ্যা দানের মারাত্মক দৃষ্টতা এর চেয়ে আর কিছু হতে পারেনা।

আমার বক্তব্য এই যে, মূলত বিদয়াতকে হাসানাহ ও সাইয়্যেয়া এ দু’ভাগে ভাগ করাই ভুল। আর হযরত উমর ফারূক(রা) এর কথা দ্বারাও এ বিভাগ প্রমাণিত হয়না। কেননা উমর ফারূক(রা) এর কথার অর্থ মোটেই তা নয়, যা মনে করা হয়েছে। এ জন্যে যে, উমর ফারূক(রা) জামা‘আতের সাথে তারাবীহর নামাযকে সে অর্থে বিদয়াত বলেননি, যে অর্থে বিদয়াত সুন্নাতের বিপরীত। তা বলতেও পারেননা তিনি। হযরত উমরের চাইতে অধিক ভালো আর কে জানবেন যে, জামা‘আতের সাথে তারাবীহ এর নামায পড়া মোটেই বিদয়াত নয়। রাসূলের জামানায় তা পড়া হয়েছে। রাসূলে করীম(সা) তারাবীহ এর নামায দু’তিন রাত নিজেই ইমাম হয়ে পড়িয়েছেন- এ কথা সহীহ হাদীস হতেই প্রমাণিত।

হযরত আয়েশা(রা) বলেনঃ আরবী(*******)

-নবী করীম(স) মসজিদে নিজের নামায পড়ছিলেন। বহু লোক তাঁর সঙ্গে নামায পড়লো, দ্বিতীয় রাত্রেও সে রকম হলো। এতে করে এ নামাযে খুব বেশি সংখ্যক লোক শরীক হতে শুরু করলো। তৃতীয় বা চতূর্থ রাত্রে যখন জনগণ পূর্বানুরূপ একত্রিত হলো, তখন নবী করীম(স) ঘর হতে বের হলেননা। পরের দিন সকাল বেলা রাসূলে করীম(স) লোকদের বললেনঃ তোমরা যা করেছ তা আমি লক্ষ্য করেছি। আমি নামাযের জন্য মসজিদে আসিনি শুধু একটি কারণে, তাহল এভাবে জামা‘আতবদ্ধ হয়ে (তারাবীহ) নামায পড়লে আমি ভয় পাচ্ছি, হয়ত তা তোমাদের ওপর ফরযই করে দেয়া হবে।

হযরত আয়েশা (রা) বলেনঃ ‘এ ছিল রমযান মাসের ব্যাপার।’

এ হাদীসে অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, জামা‘আতের সাথে তারাবীহ নামায পড়াবার কাজ প্রথম করেন নবী করীম(স) নিজে। করেন পর পর তিন রাত্রি পর্য্ন্ত। তাঁর পিছনে লোকেরা নামাযে শরীক হয়; কিন্তু তিনি নিষেধ করেননা। পরে তিনি তা পড়ান বন্ধ করেন শুধু এ ভয়ে যে, এভাবে এক অফরয নামায রাসূলের ইমামতিতে পড়া হলে এ কাজটি আল্লাহ্র তরফ হতে ফরয করে দেয়া হতে পারে। কেননা তখনো ওহী নাযিল হচ্ছিল, শরীয়ত তৈরি হচ্ছিল। আর নবীর কাজতো সুন্নাত। তা বিদয়াত হবে কি করে? [নবী করীম(স) নিজে তারাবীহ নামাযে ইমামতি বন্ধ করলেও তা জামা‘আতের সাথে পড়া কিন্তু বন্ধ হলোনা। তারপরও তা চলছে, কিন্তু তিনি নিষেধ করেননি জানা সত্ত্বেও। হযরত আয়েশা(রা) বর্ণিত হাদীসই তার প্রমাণ। তিনি বলেনঃ তৃতীয় বা চতূর্থ রাত্রে তিনি যখন তারাবীহ নামাযের ইমামতি করতে এলেননা, তখন পরেরদিন সকাল বেলা তিনি সাহাবীদের লক্ষ্য করে বললেনঃ রাত্রি বেলা তোমরা যা করেছিলে(তারাবীহ নামায পড়ছিলে) তা আমি দেখেছি। কিন্তু কেবল মাত্র একটি ভয়ই তোমাদের সাথে যোগ দিতে আমাকে বিরত রেখেছে। তা হচ্ছে, জামা‘আতের সাথে তারাবীহ পড়া তোমাদের জন্য ফরয হয়ে যাওয়া।]

[নবী করীম(স) কোনো কাজ করতে ইচ্ছে করেও তা করেননি শুধু এ ভয়ে যে, তিনি নিয়মিত তা করলে লোকেরাও তা নিয়মিত করতে শুরু করবে। আর তা দেখে আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের জন্য তা ফরয করে দিতে পারেন, এ কথা হযরত আয়েশা(রা) এর কথা থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। তিনি বলেনঃ নবী করীম(স) কোনো কোনো কাজ করতে ভালবাসতেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও তা করতেননা শুধু এ ভয়ে যে, তিনি তা নিয়মিত করতে থাকলে লোকদের উপর তা ফরয হয়ে যেতে পারে।]

তাহলে হযরত উমর (রা) জামা‘আতের সাথে নামায পড়াকে বিদয়াত বললেন কেন? বলছেন বিদয়াতের শাব্দিক ও আভিধানিক অর্থে, পরিভাষা হিসেবে নয়। বিদয়াতের শাব্দিক ও আভিধানিক অর্থ যে ‘নতুন’ তা পূর্বেই বলা হয়েছে। আর একে নতুনও এ হিসেবে বলা হয়নি যে, এরূপ নামায ইতিপূর্বে কখনোই পড়া হয়নি; বরং বলা হয়েছে এ জন্যে যে, নবী করীম(স)এর সময়ে জামা‘আতের সাথে তারাবীহ নামায পড়া দু চার দিন পর বন্ধ হয়ে যায়, তার পর বহু বছর অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে। হযরত আবু বকর(রা) এর খিলাফতের সময় এ নামায নতুন করে চালু করা যায়নি। এরপরা হযরত উমর ফারূক(রা) এর সময় এ নামায় পূণরায় চালু হয়। এ হিসেবে একে বিদয়াত বলা ভুল কিছু হয়নি এবং তাতে করে তা সে বিদয়াতও হয়ে যায়নি যা সুন্নাতে বিপরীত, যার কোনো দৃষ্টান্তই রাসূলের যুগে পাওয়া যায়না। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, তাহলে হযরত উমরের এ কথাটির সঠিক তাৎপর্য্ কি? মুহাদ্দিসদের মতে এর তাৎপর্য্ এইঃ জামা‘আতের সাথে নামায পড়া এক অতি উত্তম চমৎকার ব্যবস্থা যা রাসূলে করীম(স) হতে শুরু হয়েছিল এবং পরে হযরত আবু বকরের সময়ে লোকদের নানা জটিলতায় মশগুল হয়ে থাকার কারণে পরিত্যক্ত হয়ে গিয়েছিল।

মুল্লা আলী কারী হযরত উমর ফারূক(রা) এর এ কথাটুকুর ব্যাখ্যায় বলেছেনঃ

উমার ফারূক(রা) এ কাজকে বিদয়াত বলেছেন তার বাহ্যিক দিককে লক্ষ্য করে। কেননা নবী করীমের পর এ-ই প্রথমবার নতুনভাবে জামা‘আতের সাথে তারাবীহ্র নামায পড়া চালু হয়েছিল। নতুবা প্রকৃত ব্যাপারের দৃষ্টিতে জামা‘আতের সাথে এ নামায পড়া মোটেই বিদয়াত নয়।

এখানে ইমাম মালিক(রা) এর প্রখ্যাত কথাটি স্মরণীয়। তিনি বলেছেনঃ যে লোক ইসলামের কোনো বিদয়াতের সৃষ্টি করলো এবং তাকে খুবই ভালো মনে করলো, সে প্রকারান্তরে ঘোষণা করলো যে, হযরত মুহাম্মদ(স) রিসালাতের দায়িত্ব পালনে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন (নাউজুবিল্লাহ)। কেননা আল্লাহ তো বলেছেনঃ আমি আজ তোমাদের দ্বীনকে তোমাদের জন্য পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম। অতএব রাসূলের সময় যা দ্বীনভুক্ত ছিলনা, তা আজও দ্বীনভুক্ত নয়।

এ বিষয়ে আমার শেষ কথা হলো, বিদয়াতকে দু’ভাগে ভাগ করাও একটি বিদয়াত এবং বিদয়াতের এ বিভাগ এর দুয়ার-পথ দিয়ে অসংখ্যা মারত্মক বিদয়াত ইসলামের গৃহ-প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে দ্বীনি মর্যাদা লাভ করেছে। বড় সওয়াবের কাজ বলে সমাজের বুকে শিকড় মজবুত করে গেড়ে বসেছে। এ বিষবৃক্ষ যত তাড়াতাড়ি উৎপাটিত করা যায়, ইসলাম ও মুসলমানের পক্ষে ততোই মঙ্গল।

বিদয়াত সমর্থনের পীর অলির দোহাই

বিদয়াতপন্থীরা সাধারণত নিজেদের উদ্ভাবিত কাজে সমর্থনে সূফীয়ায়ে কিয়াম ও মাশায়েখে তরীকতের দোহাই দিয়ে থাকে। তারা বড় বড় ও সুস্পষ্ট বিদয়াতী কাজকেও ‘বিদয়াত’ নয়-বড় সওয়াবের কাজ বলে চালিয়ে দেয়। আর বলেঃ অমুক অলী-আল্লাহ, অমুক হযরত পীর কেবলা নিজে এ কাজ করেছেন এবং করতে বলেছেন। আর তাঁর মতো অলী-আল্লাহই যখন এ কাজ করেছেন, করতে বলে গেছেন, তাহলে তা বিদয়াত হতে পারেনা, তা অবশ্যই বড় সওয়াবের কাজ হবে। তা না হলে কি আর তিনি তা করতেন। অতএব তা সুন্নাত বলে ধরে নিতে হবে।

বিদয়াতের সমর্থনে এরূপ পীরের দোহাই দেয়ার ফলে সমাজে দু’ধরণের প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একটি প্রতিক্রিয়া এই যে, কোনটি সুন্নাত আর কোনটি বিদয়াত, কোনটি জায়েয আর কোনটি নাজায়েয তা সুনির্দিষ্টভাবে ও নিঃসন্দেহে জানবার জন্য না কুরআন দেখা হয়, না হাদীস, না সাহাবায়ে কিরামের আমল ও জীবন চরিত। কেবল দেখা হয়, অমুক হুজুর কিবলা এ কাজ করেছেন কিনা। তিনিই যদি করে থাকেন তাহলে তা করতে আর কোনো দ্বিধাবোধ করা হয়না। সেক্ষেত্রে এতটুকুও চিন্তা করা হয়না যে, যার বা যাদের দোহাই দেয়া হচ্ছে সে বা তারা কুরআন-হাদীস অনুযায়ী কাজ করছে কিনা; তারা শরীয়তের ভিত্তিতে এ কাজ করেছে নাকি নিজেদের ইচ্ছেমতো।

এরূপ কথাতো আরবের কাফির সমাজের লোকদের বলা কথার মতো। যখন তাদের নিকট প্রকৃত তওহীদী দ্বীনের দাওয়াত পেশ করা হয়েছিল, তখন তারা বলেছিলঃ আমরা আমাদের বাপদাদাকে একটি পন্থার সংঘবদ্ধ অনুসারীরূপে পেয়েছি। আমরা তাদের পদচিহ্ন অনুসরণ করে চলতে চলতে হেদায়াত পেয়ে যাব।

অর্থাৎ তাদের নিকট হক না হকের একমাত্র দলীল ছিল পূর্বপুরুষের দোহাই। তাদের তারা অনুসরণ করতো এ কারণে নয় যে, তারা কোনো ভাল আদর্শ অনুসরণ করে গেছে; বরং এ জন্যে যে, তারা ছিল তাদের পূর্বপুরুষ। এক্ষেত্রেও তাই দেখা যায়ঃ বিদয়াত কাজের সমর্থনে কেবল হুজুর কেবলার দোহাই। সে দোহাইর ভিত্তি শরীয়তের কোনো দলীল নয়, দলীল শুধু এই যে, সে তাদের ধারণা মতে একজন বড় অলী-আল্লাহ আর তার করা কাজ শরীয়তের প্রধান সনদ।

সেদিন আরবদের উপরোক্ত কথার জবাবে নবীগণের জবানীতে কুরআন মজীদে বলা হয়েছিলঃ

বলো! তোমরা তোমাদের বাপ দাদাকে যে নীতি অনুসারে পেয়েছ, তার অপেক্ষা অধিক উত্তম হেদায়াতের বিধান যদি আমি তোমাদের নিকট নিয়ে উপস্থিত হয়ে থাকি, তাহলেও কি তোমরা সে বাপ দাদাদেরই অনুসরণ করতে থাকবে?

অর্থাৎ এ এক আশ্চর্যের ব্যাপার যে, নীতি হিসেবে যেটা ভালো ও উত্তম বিবেচিত হবে, সেটা তারা অনুসরণ করতে রাজি নয়। এমন কি ভালো নীতি কোনটি তার বিচার বিবেচনা করতেও প্রস্তুত নয় তারা। সর্বোত্তম নীতি ও আদর্শ পেশ করা হলেও তারা যেমন পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করতেই বদ্ধপরিকর ছিল, তেমনি এরাও শরীয়তের দলীলের ভিত্তিতে যদি কোনো কাজের বিদয়াত হওয়ার প্রমাণিতও হয় তবু তারা হুজুর কেবলার দোহাই দিয়ে সে বিদয়াতী কাজ-ই করতে থাকবে।

এর পরিণাম এই যে, মানুষের দ্বীন ও ঈমানকে জনৈক অলী-আল্লাহ বা তথাকথিত পীরের আচার-আচরণের উপর নির্ভরশীল করে দেয়া হয়। সেখানে না আল্লাহ্র কথার কোনো দোহাই চলে, না রাসূলের কোনো কাজের বা কথার। আর কুরআন হাদীসের দৃষ্টিতে এ নীতি সুস্পষ্ট শিরক ও নিষিদ্ধ। এরূপ নীতিই গোমরাহীর মূল উৎস। এরূপ অবস্থায় মানুষ মানুষের অন্ধ অনুসারী হয়ে যায়; আর আল্লাহ্র বান্দা হওয়ার পরিবর্তে বান্দা হয়ে যায় সেই মানুষেরই। আল্লাহ্র বান্দা হওয়ার কোনো সুযোগই এদের জীবনে ঘটেনা।

অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে সত্যিকার মুমিন মুসলমানের ভূমিকা সম্পূর্ণরূপে বিবৃত হয়েছে কুরআনে, হাদীসে, ইতিহাসে। তাদের সমাজে দোহাই চলতো কেবল কুরআনের, হাদীসের। কোনো ব্যক্তির দোহাই দেয়া সে সমাজে শিরক রূপে গণ্য ছিল। সকল জটিল অবস্থাতেই শুধু এই কুরআন হাদীসেরই দোহাই দেয়া হতো এবং কুরআন হাদীসের কোনো দলীল তাদের সামনে পেশ করা হলে সব বিবাদ মুছে যেত, বিদ্রোহ দমন হতো, ঘুছে যেত সব মতপার্থক্য। তা-ই মেনে নিত তারা মাথা নত করে। তার বিপরীত আচরণ করতে তারা সাহস করতোনা, সে অধিকার কারো আছে বলেও মনে করতোনা তারা। রাসূলে করীমের ইন্তিকালের পরে খিলাফত পর্যায়ে মুসলমানদের মধ্যে মতভেদ হয়, হয় বাক-বিতন্ডা। কিন্তু যখনই তাঁদের সামনে রাসূলে করীম(স) এর একটি হাদীস পেশ করা হয় অমনি সবাই তা মেনে নিলেন। প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর(রা) যাকাত দিতে অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। সাহাবীদের মাঝে এ বিষয়ে মতভেদ হলো। এ পর্যায়ে কুরআনের দলীল পেশ করা হলে সবাই মেনে নিলেন যে, খলীফার গৃহীত এ নীতি যুক্তিসঙ্গত। ক্রীতদাস উসামা ইবনে যায়দের নেতৃত্বে বাহিনী প্রেরণ পর্যায়ে সাহাবীদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। হযরত আবু বকর(রা) বললেনঃ রাসূলে করীম(স) নিজে যে বাহিনী প্রেরণের সিদ্ধান্ত করে গেছেন, আমি তা প্রত্যাহার করতে পারবোনা।

এ সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা সবাই মেনে নিলেন। বস্তুত এ-ই হচ্ছে আদর্শ মুসলমানের ভূমিকা। আর মুসলমানদের জন্য চিরন্তন আদর্শ এ-ই হতে পারে, এ-ই হওয়া উচিত।

এর দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়া এই দেখা দিয়েছে যে, জনসাধারণ মনে করতে শুরু করেছে যে, শরীয়ত ও মারিফাত (বা তরীকত) দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বতন্ত্র জিনিস। শরীয়তে যা নাজায়েজ, মারিফাত বা তরীকতের দৃষ্টিতে তাই জায়েয। কেননা একদিকে শরীয়তের দলীল দিয়ে বলা হচ্ছেঃ এটা বিদয়াত কিন্তু পীরের দোহাই দিয়ে সেটিকেই জায়েয করে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। ফলে শরীয়ত আর মারিফাতের দুই পরস্পর বিধান হওয়ার ধারণা প্রকট হয়ে উঠে।

 এরূপ ধারণা দ্বীন ইসলামের পক্ষে যে কতখানি মারাত্মক, তা বলে শেষ করা কঠিন। অতঃপর দ্বীন ও ঈমানের যে কোনো কল্যাণ নেই, তা স্পষ্ট বলা যায়। কেননা মানুষকে সব রকমের গোমরাহী থেকে বাঁচাবার একমাত্র উপায় হচ্ছে শরীয়ত। এই শরীয়তের সুস্পষ্ট বিরোধিতাকেও যদি জায়েয মনে করা হয়, জায়েয বলে চালিয়ে দেয়া সম্ভব হয়, তাহলে গোমরাহীর সয়লাব যে সবকিছুকে রসাতলে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে, তা রোধ করতে পারবে কে?

তাই আমরা বলতে চাই, শরীয়তের ব্যাপারে রাসূল ও সাহাবাদের ছাড়া আর কারো দোহাই চলতে পারেনা। কুরআন, হাদীস ও ইজমায়ে সাহাবা ছাড়া স্বীকৃত হতে পারেনা অপর কোনো দলীল। কোনো মুসলমান-ই সে দোহাই মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। নিলে তা ইসলাম হবেনা, হবে অন্য কিছু।

কয়েকটি বড় বড় বিদয়াত

সুন্নাত ও বিদয়াত সম্পর্কে নীতিগত আলোচনা এখানে শেষ করে দ্বিতীয় পর্যায়ে আমরা কতকগুলো বড় বড় বিদয়াত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করবো। এখানে বিদয়াত হিসেবে যে কয়টি বিষয়কে পেশ করা হচ্ছে, তার মানে কখনো এ নয় যে, কেবল এ কয়টিই বিদয়াত, এর বাইরে বা এছাড়া আর কোনো বিদয়াত নেই এবং এ কয়টি বিদয়াত উৎখাত হলেই সমস্ত বিদয়াত বুঝি শেষ হয়ে যাবে, আর সুন্নাতের সোনালী যুগের সূচনা হবে। না, তা নয়। বরং এর অর্থ এই যে, আমাদের মুসলিম সমাজে বর্তমানে যত বিদয়াতই প্রবেশ করেছে, তন্মধ্যে এগুলো হচ্ছে মৌলিক ও বড় বড় বিদয়াত। তবে এ-ই শেষ নয়। এ রকম আরো বিদয়াত রয়েছে যা আমাদের জীবনে পুঞ্জীভূত হয়ে রয়েছে। বিদয়াতের এ নীতিগত আলোচনার পর এখানকার আলোচনাকে মনে করা যেতে পারে দৃষ্টান্ত। অর্থাৎ দৃষ্টান্তস্বরূপ এ কয়টি বিদয়াতের আলোচনা এখানে পেশ করা হলো, এ দৃষ্টিতে বিবেচনা করলে দেখা যাবে, এ ধরণের আরো অনেক বিদয়াত রয়েছে আমাদের জীবনে ও সমাজে। এর সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোরও মূলোৎপাটন আবশ্যক।

তওহীদি আকীদায় শিরক এর বিদয়াত

একথা কেবল মুসলমানেরই নয়, দুনিয়ায় কারো অজানা থাকার কথা নয় যে, ইসলামের বুনিয়াদী আকীদা হচ্ছে তওহীদ। ‘তওহীদ’ মানে আল্লাহ্র  একত্ব। আল্লাহ্র এর একত্ব সার্বিক, পূর্ণাঙ্গ ও সর্বাত্মক। এ দৃষ্টিতে আল্লাহ শুধু সৃষ্টিকর্তাই নন তিনি একমাত্র পালনকর্তা, মালিক, রিযিকদাতা, রক্ষাকর্তা ও আইন বিধানদাতাও। অতএব মানুষ ভয় করবে কেবল আল্লাহ কে, ইবাদত বন্দেগী ও দাসত্ব করবে একমাত্র আল্লাহ্র। সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা ও লালন পালনকারী হিসেবে মানবে একমাত্র আল্লাহকে। এসব দিক দিয়ে তিনিই একমাত্র ‘ইলাহ’। তিনি ছাড়া কেউ ইলাহ নেই, কেউ ইলাহ নয় এবং কেউ ইলাহ হতে পারেনা এবং তিনিই একমাত্র রব, তিনি ছাড়া লালনপালনকারী ও ক্রমবিকাশদাতা, রক্ষাকর্তা ও প্রয়োজন পূরণকারী আর কেউ নেই। মাবুদ ও একমাত্র তিনি-ই। তিনি ছাড়া আর কেউ ইবাদাত-বন্দেগী আনুগত্য পাবার অধিকারী নয়। অতএব মানুষের উপর আইন-বিধান কেবল আল্লাহরই চলবে। সংক্ষেপ কথায়ঃ রব্ব হওয়ার দিক দিয়েও তিনি এক, একক, অনন্য; আর ইলাহ হওয়ার দিক দিয়েও তিনি এক, লা-শরীক। রবুবিয়তের দিক দিয়েও আল্লাহ এক, উলুহিয়াতের দিক দিয়েও তিনি এক। এর কোনো একটি দিক দিয়েও তাঁর শরীক কেউ নেই, জুড়ি কেউ নেই, সমতুল্য কেউ নেই।

শুধু এখানেই শেষ নয়। তিনি তাঁর যাত- মূল সত্তায় এক, অনন্য। তাঁর গুণাবলীতেও তিনি একক-শরীকহীন। মাখলুকাতের ওপর-অতএব মানুষের ওপর-হক বা অধিকার তাঁরই অপ্রতিদ্বন্ধী। এ হক-হকুকের দিক দিয়েও তাঁর শরীক কেউ নেই। এবং ক্ষমতা ইখতিয়ারও একমাত্র তাঁরই রয়েছে, সৃষ্টির ওপর, এই মানুষের ওপর। আর এসব ক্ষেত্রেও তাঁর শরীক কেউ নেই, কিছু নেই। কাউকেই তাঁর শরীক হওয়ার মর্যাদা দেয়া যেতে পারেনা।

ইসলামের এই তওহীদী আকীদা কুরআন হতে প্রমাণিত; প্রমাণিত হাদীস থেকেও। রাসূলে করীম(স) সর্বশেষ নবী ও রাসূল হিসেবে এই আকীদা-ই পেশ করেছেন বিশ্ববাসীর সামনে। দাওয়াত দিয়েছেন মৌলিক আকীদা হিসেবে এ তওহীদকে গ্রহণ করার। যারাই সেদিন ইসলাম কবুল করেছিলেন, তাঁরা সকলে ইসলামের এ ধারণার প্রতি ঈমান এনেই হয়েছিলেন মুসলমান। অতএব রাসূলের সাহাবীরাও ছিলেন এই আকীদায় বিশ্বাসী। এই ব্যাপারে তাঁরা কখনো দূর্বলতা দেখাননি, এক্ষেত্রে কারো সাথে তাঁরা রাজি হননি কোনোরূপ আপোস বা সমঝোতা করতে। অতএব, এ-ই হচ্ছে সুন্নাতের তওহীদী আকীদা। আকীদার সুন্নাত এ-ই।

কিন্তু ইসলামের এই সুন্নাতী আকীদায় কিংবা বলা যায়-আকীদার এই সুন্নাতে বর্তমানে দেখা দিয়েছে নানা শির্ক এর বিদয়াত। মুসলিম সমাজে আল্লাহকে এক ও অনন্য বলে সাধারণভাবে স্বীকার করা হয় বটে। কিন্তু কার্যত দেখা যায়, আল্লাহ্র উলুহিয়াতী তওহীদের প্রতি যদিও বিশ্বাস রয়েছে; কিন্তু তাঁর রবুবিয়াতের তওহীদ স্বীকার করা হচ্ছেনা। মুখে স্বীকার করা হলেও কার্য্ত অস্বীকারই করা হচ্ছে। রব্ব হিসেবে মেনে নেয়া হচ্ছে আরো অনেক শক্তিকে; মুখে নয়-বাস্তব কাজের ক্ষেত্রে। আর এ-ই হচ্ছে শির্ক। শব্দগত আকীদা হিসেবে যদিও আল্লাহকে-ই রিযিকদাতা, জীবনদাতা, মৃত্যুদাতা, সৃষ্টিকর্তা, প্রভাবশালী, কর্তৃত্বসম্পন্ন, বিশ্ব ব্যবস্থাপক এবং রব্ব বলে স্বীকার করা হয়, কিন্তু এ শ্রেণীর লোকেরাই মৃত ‘বুযুর্গ’ লোকদের নিকট প্রার্থনা করে, আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদেরই ভয় করে চলে, তাদেরই নিকট হতে কোনো কিছু পেতে আশা পোষণ করে। বিপদে পড়লে তাদের নিকটই নিষ্কৃতি চায়, উন্নতি তাদের নিকট থেকেই চায় লাভ করতে। মনে করেঃ এর অলৌকিকভাবে মানুষের দোয়া শুনতে ও কবুল করতে পারে, সাহায্য করতে পারে, ফয়েজ করতে পারে। ভালো মন্দ করাতে ও ঘটাতে পারে। এই উদ্দেশ্যে তাদের সন্তোষ কামনা করে। আর তাদের সন্তোষ বিধানের জন্যেই তাদের উদ্দেশ্যে মানত করে, জন্তু জবাই করে, মরার পর তাঁদের কবরের উপর সিজদায় মাথা লুটিয়ে দেয়, নিজেদের ধন-সম্পদের একটা অংশ তাদের জন্য ব্যয় করা কর্তব্য মনে করে। আর এসব কারণেই দেখা যায়, এ শ্রেণীর লোকদের কবরকে নানাভাবে ইজ্জত ও তাজীম করা হচ্ছে, বহু অর্থ খরচ করে কবরের ওপর পাকা-পোখত কুব্বা নির্মাণ করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে দেশ-দেশান্তর সফর করা হয়। এক নির্দিষ্ট দিনে ও সময়ে চারিদিক হতে ভক্তরা এসে জমায়েত হয়। ঠিক যেমন মুশরিক জাতিগুলো গমন করে তাদের জাতীয় তীর্থভূমে।

ইসলামের তওহীদী আকীদার দৃষ্টিতে আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো নিকট-আর কাউকে সম্বোধন করে দো‘আ করা সুস্পষ্ট শিরক। ইসলামে তা স্পষ্ট ভাষায় নিষিদ্ধ। কুরআন মজীদে এ সংক্রান্ত অসংখ্য আয়াত তার অকাট্য প্রমাণ। কুরআনের কোনো কোনো আয়াতে মুশরিকদের লক্ষ্য করে, কোনো কোনো আয়াতে সাধারণভাবে এবং অনেক আয়াতে তওহীদবাদী মুসলিমদের লক্ষ্য করেই এই নিষেধ বাণী উচ্চারিত হয়েছে।

এ পর্যায়ে কুরআনের কয়েকটি আয়াত পেশ করা হচ্ছে। একটি আয়াতে বলা হয়েছেঃ

وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّن يَدْعُو مِن دُونِ اللَّهِ مَن لَّا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَىٰ يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَن دُعَائِهِمْ غَافِلُونَ [٤٦:٥] -আল্লাহকে বাদ দিয়ে(বা আল্লাহ ছাড়াও) যারা এমন সবকে ডাকে- দো‘আ করে, যারা তাদের জন্যে কিয়ামত পর্য্ন্তও জবাব দিতে পারবেনা আর তারা তাদের দো‘আ সম্পর্কে কিছুই জানেনা, এই শ্রেণীর লোকদের চেয়ে অধিক গোমরাহ আর কে হতে পারে। (আল আহক্বাফ)

অপর এক আয়াতের ভাষা হলো এইঃ

وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا [٧٢:١٨]

-সব মসজিদ-ই আল্লাহর। অতএব, আল্লাহ ছাড়া অপর কাউকেই ডাকবেনা। (জ্বীনঃ17)

এ আয়াতটিতে স্বয়ং রাসূলে করীম ও মুসলমানদের সম্বোধন করা হয়েছে। এ আয়াতের তফসীরে আল্লামা ইবনে কাসীর লিখেছেনঃ আল্লাহ তাঁর বান্দাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তারা যেন তাঁর ইবাদাতের জন্য নির্দিষ্ট জায়গাগুলোতে একমাত্র তাঁকেই ডাকে, তাঁরই একত্বকে প্রতিষ্ঠিত রাখে এবং তাঁর সাথে অপর কাউকেই যেন ডাকা না হয়, তাঁর সাথে যেন কোনোরূপ শিরক করা না হয়।

একটি আয়াতে খোদ নবী করীম(স) কে লক্ষ্য করে বলা হয়েছেঃ

তুমি আল্লাহর সাথে অপর কোনো ইলাহ্ কে একত্র করে ডেকোনা- একত্রিত করোনা। যদি তা করে, তাহলে তুমি আযাবপ্রাপ্ত লোকদের মধ্যে গণ্য হবে।

আয়াতে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে স্বয়ং নবী করীম(স) কে। ‘তফসীরে ফতহুল বয়ান’ এ লেখা হয়েছেঃ আল্লাহতা‘আলা যখন কুরআনের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত করলেন, প্রমাণ করে দিলেন যে, কুরআন তাঁর নিকট হতে অবতীর্ণ কিতাব, তখন তিনি তাঁর নবী মুহাম্মদ(স) কে নির্দেশ দিলেন এককভাবে কেবলমাত্র তাঁকেই ডাকবার, কেবল তাঁরই নিকট দো‘আ করার। আর আয়াতের শেষাংশের ব্যাখ্যা উক্ত তফসীরে লেখা হয়েছে এভাবেঃ

রাসূলে করীমকে বলা হয়েছে যে, যদি তুমি তাই করো, তাহলে তোমাকে আযাব দেয়া হবে। এখানে মুহাম্মদ(স) কে সম্বোধন করে একথা বলা হয়েছে। তিনি নিজে যদিও শিরকের গুনাহ হতে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ পবিত্র, তবুও তাঁকে লক্ষ্য করে একথা বলা হয়েছে তওহীদ সম্পর্কে মুমিন বান্দাগণকে উদ্বুদ্ধ করার ও সর্ব প্রকার শিরক-এর স্পর্শ হতে দূরে রাখার উদ্দেশ্যে। তাহলে কথাটি এই দাঁড়াল যে, আল্লাহ বললেনঃ তুমি তো সৃষ্টিলোকের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত, আমার নিকট সবচাইতে মর্যাদাবান, সবচেয়ে বেশি প্রিয়; কিন্তু এতদসত্ত্বেও তুমি যদি আমি ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ আছে বলে বিশ্বাস করো, তাহলে আমি তোমাকেও আযাব দেবো। অতএব ভেবে দেখো, অন্যান্য বান্দারা এরূপ করলে তাদের পরিণতি কি হবে?

আল্লাহকে ছাড়া অন্য কাউকেই ডাকা শির্ক, অন্য কারো নিকট দো‘আ করা শির্ক-অতএব সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, তা কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত কয়টি থেকেও প্রমাণিত হয়।

وَلَا تَدْعُ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ ۖ فَإِن فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِّنَ الظَّالِمِينَ [١٠:١٠٦]

-আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন কাউকে ডাকবেনা, যা তোমাকে কোনো উপকার দিতে পারেনা, তোমার কোনো ক্ষতি সাধনও করতে পারেনা। তুমিও যদি তা-ই করো, তাহলে তুমিও জালিমদের মধ্যে গণ্য হবে।

সুরা মুমিন এর এ আয়াতটি এ পর্যায়ে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দো‘আ সম্পর্কে ইতিবাচকভাবে পথনির্দেশ করেছে এ আয়াত।

আল্লাহতা‘আলাই ইরাশাদ করেছেনঃ

هُوَ الْحَيُّ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ فَادْعُوهُ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ ۗ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ [٤٠:٦٥]

-তিনি চিরঞ্জীব, তিনি ছাড়া মাবুদ নেই। অতএব তোমরা ডাকো কেবল তাঁকেই একনিষ্ঠভাবে তাঁরই আনুগত্য সহকারে। আর সমস্ত প্রশংসাই আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট, যিনি সারাজাহানের রব্ব।

আল্লাহকে জীবন্ত ও চিরঞ্জীব বলার মানে-ই হলো এই যে, তিনি ছাড়া আর যত মা‘বুদ-যাদের তোমরা মাবুদ বলে স্বীকার করো, বাস্তবভাবে যাদের তোমরা বন্দেগী ও দাসত্ব করো-তারা সবাই আসলে মৃত। জীবনের কোনো সন্ধানই সেখানে পাওয়া যাবেনা। আর যারা মৃত, জীবনহীন, তাদের ডাকার-তাদের নিকট কাতর স্বরে দো‘আর প্রার্থনা করার কি সার্থকতা থাকতে পারে। কেননা মৃতদের না দো‘আ শুনবার ক্ষমতা আছে, না শুনে তা কবুল করার ও দো‘আ অনুযায়ী কোনো কাজ করে দেবার আছে সামর্থ্য্। জীবন্ত ও চিরঞ্জীবতো একমাত্র আল্লাহ; তাঁর কোনো লয়, ক্ষয় বা কোনোরূপ অক্ষমতা নেই। অতএব কেবলমাত্র তাঁকেই ডাকা উচিত, তাঁরই নিকট দো‘আ ও প্রার্থনা করা বাঞ্চনীয়-সব সময়, সকল অবস্থায়। এর ব্যতিক্রম কিছু হতে পারেনা।

এ আয়াত থেকে আরো স্পষ্টভাবে জানা গেল যে, যিনি প্রকৃত ইলাহ, দো‘আ কেবল তাঁরই নিকট করা যেতে পারে এবং যাঁর নিকট দো‘আ করা হবে, ঐকান্তিক নিষ্ঠার সাথে বাস্তব আনুগত্য ও করতে হবে একমাত্র তাঁরই। আর দো‘আ কবুল হওয়ার জন্য প্রয়োজন আল্লাহর জন্য সব তায়ীফ ও প্রশংসা উৎসর্গ করা। আন্তরিকভাবে আল্লাহর আনুগত্য বাস্তব জীবনে না করলে এবং মুখে অকৃত্রিমভাবে তাঁর প্রশংসা না করলে তাঁর নিকট দো‘আর করার কোনো অর্থ হয়না। তুমি যাঁর আনুগত্য করে চলতে রাজি নও, যার প্রশংসা ও শোকর তোমার মুখে ধ্বনিত হয়না, তাঁর নিকট তোমার দো‘আ করারও কোনো অধিকার থাকতে পারেনা। আর তিনিই বা সে দো‘আ কবুল করবেন কেন?

তাই সুরা আল আরাফে সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহতা‘আলাঃ

المُعتَدينَ ا يُحِبُّ ل إِنَّهُ وَخُفيَةً  تَضَرُّعً رَبَّكُم ادعوا  ۗ  العٰلَمينَ رَبُّ اللَّهُ تَبارَكَ وَالأَمرُ الخَلقُ لَهُ أَلا

-সাবধান, মনে রেখ, সৃষ্টি তাঁরই, বিধানও তাঁরই চলবে। মহান বরকতওয়ালা আল্লাহতা‘আলা যিনি সারা জাহানের রব্ব। তোমরা ডাকো তোমাদের এই রব্বকে কাঁদ কাঁদ স্বরে, চুপে চুপে। নিশ্চয়ই তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।(আরাফঃ55)

এ আয়াত স্পষ্টভাবে আমাদের সামনে যে গভীর তত্ত্ব উদঘাটিত করে, তা হলো এই সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ, অতএব দুনিয়া জাহানে আইন ও বিধান চলবে একমাত্র তাঁরই। এই সৃষ্টিকর্তা ও বিধানদাতা আল্লাহ বড় মহান, অসীম বরকতের মালিক। তোমাদের এই রব্বকেই তোমরা ডাকবে। ডাকবে কাঁদ কাঁদ স্বরে-বিনীত অবনত মস্তকে কাতর কন্ঠে। এবং ডাকবে গোপনে, অনুচ্চ স্বরে। আর শেষ কথাটি বলা হচ্ছে যে, যে লোক আল্লাহকেই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা বিধানদাতা বলে মানেনা, মানেনা বরকতওয়ালা মহান আল্লাহরূপে এবং তাঁরই নিকট যে লোক দো‘আর করেনা, বিপদে আপদে একমাত্র তাঁকেই ডাকেনা, তারাই সীমালংঘনকারী। আর সীমালংঘনকারীরা আল্লাহর ভালোবাসা পায়না।

কোনো কোনো মহল মনে করে যে, কুরআনে এসব আয়াতে যে ‘দো‘আ’ শব্দ উল্লিখিত হয়েছে, তার মানে হচ্ছে ইবাদত আর এ আয়াত কয়টির মানে হলোঃ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করোনা, তা করা শিরক। অতএব আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নিকট দো‘আ করা নিষিদ্ধ নয়, শিরক-ও নয়। কিন্তু এ কথা যে কতখানি ভুল ও প্রকৃত সত্যের বিপরীত, তা বলাই বাহুল্য। আসল কথা হলো, কুরআন মজীদের এসব আয়াতে যে দো‘আ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে এর প্রকৃত অর্থঃ ধ্বনি দেয়া, আওয়াজ দেয়া এবং এমনভাবে কারো কাছে প্রার্থনা করা যার নিকট দো‘আ কবুল হতে বা প্রার্থিত জিনিস পাওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ বা সংশয় নেই। ইবাদত এ শব্দের প্রকৃত অর্থ নয়। তা হচ্ছে এর ‘মাজাজী’ বা পরোক্ষ অর্থ। আরবী অভিধানে বা শরীয়তে কোনো দিক দিয়েই এর অর্থ ‘ইবাদত’ নয়। আরবী ভাষার কোনো অভিধানেই এর অর্থ ইবাদত লেখা হয়নি। এমনকি জাহিলিয়াতের যুগের কোনো কবি-সাহিত্যিকের লেখায়ও এ শব্দের ব্যবহার এ অর্থে হতে দেখা যাবেনা। এখানে আমরা কয়েকটি আরবী প্রাচীণ ও প্রমাণিক অভিধান হতে কিছু উদ্বৃতি করছি।

আল জাওহীরি তাঁর অভিধানে লিখেছেনঃ

আরবী(*********)

আমি অমুক ব্যক্তিকে ডেকেছি, মানেঃ তার নাম করে আওয়াজ দিয়েছি, তাকে আহবান জানিয়েছি। তার জন্যে আল্লাহর নিকট দো‘আ করেছি। আর তার উপর বদদো‘আ করেছি। দাওয়াত মানে একবার ডাকা। আর দো‘আ হলো এক বচন শব্দ। এর বহুবচন দাওয়াত বা দো‘আসমূহ।

এখানে ‘দো‘আ’ শব্দের ভিন্ন রূপ ও প্রয়োগ দেখানো হয়েছে। সবক্ষেত্রেই অর্থ হলো প্রার্থনা, ডাকা, আহবান করা।

আর আলকেমিস এ বলা হয়েছে-

দো‘আ মানে আল্লাহর দিকে নিষ্ঠাপূর্ণ আহবান , ঝোঁক প্রবণতা। তাঁকে ডাকো যেমন ডাকা দরকার। অপরের ওপর তাদের জন্য দাওয়াত অর্থাৎ দো‘আ তাদের থেকেই শুরু করা হবে। তাদের ডাকো, মানেঃ তাদের একত্রিত করো। নবী করীম(স) আল্লাহর (দিকে)আহবানকারী। মুয়াযযিনকেও আহবানকারী বলা হয়।

মোটকথা আরবী অভিধানের কোনো কিতাবেই দো‘আ মানে ইবাদত লিখিত হয়নি।

অবশ্য আল্লামা ইবনুল হাজার বলেছেনঃ দো‘আ শব্দটি ইবাদত অর্থেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু তা নিশ্চয়ই এ শব্দের প্রত্যক্ষ ও প্রকৃত অর্থ নয়, পরোক্ষ অর্থ হবে।

শায়খ আবুল কাশেম আল কুশাইরী লিখেছেনঃ কুরআনে দো‘আ শব্দটি কয়েকটি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যথাঃ ইবাদত, কাতর ফরিয়াদ, প্রার্থনা, কথা, আওয়াজ, ধ্বনি, প্রশংসা ইত্যাদি।

আল্লামা তাকীউদ্দীন আসসুবকী লিখেছেনঃ তা সত্ত্বেও এ আয়াতে ‘দো‘আ’ শব্দের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করাই উত্তম।

কেননা দো‘আ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে যত আয়াতে তার কোথাও এমন কোনো কারণ দেখা যায়না, যার দরুণ শব্দটির আসল ও বাহ্যিক অর্থ গ্রহণের পরিবর্তে পরোক্ষ অর্থ গ্রহণ করা দরকারী হতে পারে। কুরআনের সব তাফসীরকারকই এই মত পোষণ করেছেন। কাজেই কুরআনের ব্যবহৃত ‘দো‘আ’ শব্দের ইবাদত অর্থ করা এবং এই সুযোগে আল্লাহ ছাড়া অন্য শক্তির নিকট দো‘আ করাকে জায়েয মনে করা চরম বাতুলতা এবং সুস্পষ্ট বিদয়াত ছাড়া আর কিছুই নয়।

কুরআনের আয়াতঃ

আরবী(********)

-ওয়ালা তাদয়ু মিন দুনিল্লাহী মালা ইয়ান ফায়ুকা ওয়ালা ইয়া দুররুকা ফায়ীন ফায়ালতা ফা ইন্নাকা ইজা লামিনাজ্জালিমীন।

এ আয়াতের তাফসীরে ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী লিখেছেনঃ

আয়াতের দো‘আ শব্দের অর্থ হলো উপকার পেতে চাওয়া, ক্ষতি থেকে বাঁচতে চাওয়া। আর আয়াতের অর্থ হলোঃ তুমি যদি আল্লাহ ছাড়া অপর কারো নিকট উপকার বা ক্ষতির জন্য প্রার্থনায় মনোনিবেশ করো, তাহলে তুমি জুলুমকারী হবে। কেননা জুলুম বলা হয় কোনো জিনিসকে তার আসল জায়গা ছাড়া অন্য জায়গায় স্থাপন করা। আর আল্লাহ ছাড়া যখন কারোই কোনো ক্ষমতা নেই, তখন কোনো প্রকার ক্ষমতা চালানাকে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো প্রতি অর্পণ করা অন্য কারো ক্ষমতা চালাবার শক্তি আছে বলে মনে করা নিঃসন্দেহে জুলুম।

আর এই ‘দো‘আ’ শব্দের প্রকৃত অর্থ ‘ইবাদত’ না হলেও দো‘আ ও এক প্রকারের ইবাদত। অতএব তা আল্লাহ ছাড়া আর কারোরই নিকট করা যেতে পারেনা।

তাহলে আল্লাহ ছাড়া নানাভাবে নানা শক্তি ব্যক্তির নিকট যে দো‘আ করা হয়, বিপদ মুক্তি ও দুনিয়ার উন্নতির জন্য প্রার্থনা করা হয়, নিরাময়তা চাওয়া হয়, সেগুলো কি হবে? সেগুলো যে সুস্পষ্ট শিরক হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এবং এ শিরক হচ্ছে ইসলামের তওহীদী সুন্নাতের এক মহা বিদয়াত। কেননা একজন যে অপরজনকে ডাকে, অপর একজনের নিকট দো‘আ করে এমন এক কাজের জন্যে, যা করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারোই নেই-থাকতে পারেনা। এভাবে ডাকার মানেই এই যে, সে তাকে অলৌকিক ক্ষমতার মালিক মনে করে, বিশ্বাস করে তার কিছু একটা করার ক্ষমতা আছে। তা মনে না করলে সে কিছুতেই তাকে ডাকত না, তার নিকট দো‘আর করতো না। ফলে তার মনে তার নিকট কেবল দো‘আ করেই ক্ষান্ত হয়না; শান্ত হয়না, বরং তার ইবাদত করতেও আগ্রহাণ্বিত হয়ে পড়ে। আর এরূপ হচ্ছে সুস্পষ্ট শিরক।

কুরআনের স্পষ্ট ঘোষণা হলোঃ

وَإِن يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ ۖ وَإِن يَمْسَسْكَ بِخَيْرٍ فَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ [٦:١٧]

-কোনো দুঃখ বা বিপদ যদি তোমাকে গ্রাস করে থাকে তা(আল্লাহর মর্জিতেই হয়েছে বলে মনে করতে হবে এবং তা)দূর করার কেউ নেই একমাত্র আল্লাহ ছাড়া। এমনিভাবে তুমি যদি কল্যাণ লাভ করে থাকো তবে তিনিই তো সর্বশক্তিমান। (আল আনআমঃ ১৫)

অর্থাৎ এ কল্যাণ দান করার ক্ষমতাও তাঁরই রয়েছে এবং তাঁরই অনুগ্রহে তুমি এ কল্যাণ লাভ করেছো। তিনি ছাড়া এ কল্যাণ তোমাকে আর কেউই দিতে পারেনি। কেননা অন্য কারোই কিছু করার ক্ষমতা নেই, সামর্থ্য নেই।

অপর আয়াতে বলা হয়েছেঃ

وَإِن يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ ۖ وَإِن يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ ۚ يُصِيبُ بِهِ مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ ۚ وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ [١٠:١٠٧]

-আল্লাহ যদি তোমাকে কোনো ক্ষতি বা বিপদ দেন, তবে তা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ-ই দূর করতে পারবেনা। আর তিনিই যদি তোমার প্রতি কোনো কল্যাণ দান করতে ইচ্ছে করেন, তাহলে তাঁর এই কল্যাণ দানকে প্রত্যাহার করতে পারে এমন কেউ নেই। তবে তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে চান কল্যাণ দেন, তিনিই ক্ষমা দানকারী, করুণাময়। (ইউনূসঃ107)

এ আয়াত দুটো-এমনিভাবে কুরআনের আরো ভুরি ভুরি আয়াত এবং রাসূলে করীম(স) এর হাদীস স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছে যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ বিপদ দিতে পারেনা, কেউ সে বিপদ দূরও করতে সক্ষম নয় আল্লাহ ছাড়া। অনুরূপভাবে আল্লাহ ছাড়া কেউ কল্যাণ করতে পারেনা কারো। তিনি কারো কল্যাণ করতে চাইলে তা ফেরাতেও এবং সেই কল্যাণ হতে তাকে বঞ্চিত রাখতেও পারেনা কেউই। সব শক্তির একচ্ছত্র মালিকতো তিনিই। অতএব দো‘আ একমাত্র আল্লাহর নিকটই করা কর্তব্য। কর্তব্য সব রকমের বিপদ হতে উদ্ধার পাওয়ার জন্য দো‘আ করা, কর্তব্য সব ধরণের কল্যাণ লাভের জন্য দো‘আ করা। এবং সেই দো‘আ হবে সরাসরি আল্লাহর নিকট, অন্য কারো অসীলা দিয়ে বা দোহাই দিয়ে নয়, অন্য কারো মাধ্যমেও নয়। তওহীদ বিশ্বাসের ঐকান্তিক দাবিও হলো এই। কেননা আল্লাহ ছাড়া অপর কারো নিকট দো‘আ করার কোনো ফল নেই, নেই কোনো সার্থকতা।

আল্লাহতা‘আলা এই পর্যায়ে আরো স্পষ্ট ও বলিষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেনঃ

وَالَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِهِ مَا يَمْلِكُونَ مِن قِطْمِيرٍ [٣٥:١٣]

إِن تَدْعُوهُمْ لَا يَسْمَعُوا دُعَاءَكُمْ وَلَوْ سَمِعُوا مَا اسْتَجَابُوا لَكُمْ[٣٥:١٤]

-আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা আর যার নিকটই দো‘আ করো, তাদের কেউ একবিন্দু জিনিসের মালিক নয়। তা সত্ত্বেও যদি তোমরা তাদেরই ডাকো- তাদের নিকটই দো‘আ করো, তবে তারা তো তোমাদের ডাকও শুনতে পারেনা। (আল ফাতীরঃ13-14)

তোমাদের দো‘আ আর যদি শুনতে পায়ও, তবু এ কথা চূড়ান্ত যে, তারা না দিবে তোমাদের ডাকের জবাব, না পারবে কবুল করতে তোমাদের দো‘আ।

বস্তুত দো‘আ যে কেবলমাত্র আল্লাহর নিকটই করতে হবে খালেসভাবে অপর কারো দোহাই দিয়ে নয়, কাউকে তাঁর নিকট অসীলা বানিয়ে নয়, একথা কুরআন মজীদে উদ্বৃত অসংখ্য দো‘আ থেকেও আমাদের শেখানো হয়েছে। কুরআনে উল্লেখীত যে কোনো দো‘আ-ই তার দলীল হিসেবে পেশ করা যেতে পারে। এখানে দৃষ্টান্তস্বরূপ কুরআনের বিশেষ কয়েকটি দো‘আ উদ্বৃত করা হচ্ছে।

কুরআনের প্রথম সূরা আল ফাতিহায় উদ্বৃত হয়েছে এই দো‘আঃ

اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ [١:٦]

-হে আল্লাহ তুমিই আমাদের সরল সঠিক দৃঢ় পথ দেখাও-পরিচালিত করো সে পথে।

এরূপ দো‘আ করতে শেখানো হয়নিঃ হে আল্লাহ! অমুক পীরের অসীলায় আমাদের সরল সঠিক সুদৃঢ় পথ দেখাও।

সূরা আল বাকারা’র শেষ আয়াত কয়টিও আল্লাহর শিখিয়ে দেয়া দো‘আ। তাতে কোনো একটি কথা সরাসরিভাবে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নিকট কিংবা কারো অসীলা ধরে আল্লাহর নিকট দো‘আ করার শিক্ষা দেয়া হয়নি। এই পর্যায়ে হযরত ইবরাহীম(আ) এর দো‘আ ও উল্লেখযোগ্য। কাবা ঘর নির্মাণের সময় তিনি এবং হযরত ঈসমাইল(আ) দো‘আ করেছিলেনঃ

رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ [٢:١٢٧

رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِن ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُّسْلِمَةً لَّكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ [٢:١٢٨]

-হে আল্লাহ! তুমি আমাদের দো‘আ কবুল করো। তুমি সব-ই শোনো, সব-ই জানো। হে আমাদের আল্লাহ তুমি আমাদের দুজনকে মুসলিম-তোমার অনুগত বানাও। আর আমাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন এক উম্মত জাগ্রত করো, যা হবে তোমার অনুগত। হে আল্লাহ, তুমি আমাদের যাবতীয় ইবাদত বন্দেগীর-হজ্জ ও কুরবানীর ‍নিয়ম-নীতি জানিয়ে দাও, আমাদের তওবা কবুল করো। কেননা তুমি তওবা কবুলকারী।

বস্তুত বান্দার মনে দুঃখ ও ব্যথা বেদনার কথা কেবল আল্লাহর নিকটই বলা যেতে পারে, বলতে হবে কেবলমাত্র তাঁরই সমীপে। কেননা সে দুঃখ বেদনার সৃষ্টিও যেমন হয়েছে আল্লাহর মঞ্জুরীতে, তা দূর করার ক্ষমতাও একমাত্র তাঁরই রয়েছে। হযরত ইয়াকুব(আ) পুত্রহারা হয়ে তাঁর মর্মবেদনা পেশ করেছিলেন দুনিয়ার অপর কারো নিকট নয়, নয় কোনো পীর বা গদ্দীনশীনের নিকট; বলেছিলেন কেবলমাত্র আল্লাহর নিকট।

তাঁর তখনকার কথা উদ্বৃত হয়েছে কুরআন মজীদে এ ভাষায়ঃ

আরবী(****)

-আমি আমার দুঃখ-বেদনা এবং চিন্তা-ভাবনার কথা কেবল আল্লাহর নিকটই প্রকাশ করছি, পেশ করছি।

হযরত মূসা(আ) এর দো‘আ ছিল নিম্নোক্ত ভাষায়ঃ

-আরবী (******)

-হে আল্লাহ! তোমার জন্যেই সব প্রশংসা, সব অভিযোগ তোমারই নিকট, কেবল তোমার নিকটই সাহায্য প্রার্থনা, কেবল তোমার নিকটই ফরিয়াদ। কেবল তোমার উপরই ভরসা। কেননা কোনো কিছু করার সামর্থ্য্ এবং ক্ষমতা ও শক্তি তুমি ছাড়া আর কারো নিকটই নাই।

আল্লাহ নিজেই হযরত জাকারিয়া এবং তাঁর স্ত্রীর প্রশংসা করে ইরশাদ করেছেনঃ

-আরবী (******)

-তারা ছিল সব কল্যাণময় কাজে উৎসাহী, প্রতিযোগী ও তৎপর। তারা কেবল আমাকে ডাকত-আমারই নিকট দো‘আ করতো আগ্রহ উৎসাহ এবং ভয় আতংক সহকারে। আসলে তারা সব সময় আমার জন্যেই ভীত হয়ে থাকত।

স্বয়ং আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ(স)-এর নীতিও ছিল তাই। কোনো ব্যতিক্রম ছিলনা এ থেকে। বদরের যুদ্ধে তাঁর সঙ্গী সাথীদের সংখ্যাল্পতা দেখে তিনি আল্লাহর দিকে মুখ করে দু’হাত তুলে দো‘আ করেছিলেনঃ

-আরবী (******)

-হে আল্লাহ! তুমি আমার কাছে যে ওয়াদা করেছ তা আজ পূর্ণ করো। হে আল্লাহ! ইসলামের ধারক এ মুষ্টিমেয় বাহিনীকে যদি তুমি ধ্বংস করে দাও তাহলে যে দুনিয়ায় তোমার বন্দেগী করা হবেনা।

এর-ই পর আল্লাহর আয়াত নাযিল হলোঃ

إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ أَنِّي مُمِدُّكُم بِأَلْفٍ مِّنَ الْمَلَائِكَةِ مُرْدِفِينَ [٨:٩]

-তোমরা যখন তোমাদের আল্লাহর নিকট-ই ফরিয়াদ করলে, তখন তিনি তোমাদের জবাব দিলেন, তোমাদের দো‘আ ও ফরিয়াদ কবুল করে নিলেন। এবং বলেছিলেন, হ্যাঁ, আমি তোমাদের পর পর এক হাজার ফেরেশতা পাঠিয়ে সাহায্য করবো। (আনফালঃ 9)

এ আয়াত থেকে এ কথাও প্রমাণিত হয় যে, ফরিয়াদ যদি একান্তভাবে আল্লাহর নিকট করা হয়, কোনো মাধ্যম, অসীলা আর ওয়াস্তা ছাড়াই, তাহলেই তিনি দো‘আ কবুল করেন, অন্যথায় তাঁর কোনো ঠেকা নেই কারো দো‘আ কবুল করার। কেউ তাঁকে সেজন্য বাধ্যও করতে পারেনা। দো‘আ কার কাছে করতে হবে সে কথা অধিক স্পষ্ট করে তোলবার জন্য নবী করীম(স) ঘোষণা করেছেনঃ তোমাদের প্রত্যেকেই যেন নিজের যাবতীয় প্রয়োজন কেবল আল্লাহর নিকট চায়। এমনকি কারো জুতার ফিতাও যদি ছিঁড়ে যায়, তবুও তাঁর নিকটই চাইবে। তিনি যদি না-ই দেন, তবে তা কেউ-ই দিতে পারবেনা।

আল্লাহর শিক্ষা ও রাসূলের শিক্ষাও এই যে, ব্যক্তিগত এবং সমষ্টিগত বিপদের কালে ফরিয়াদ করতে হবে একমাত্র আল্লাহর নিকট এবং তাতে অন্য কাউকে অসীলা ধরা কিংবা কারো দোহাই দেয়ার এই শিক্ষা-ইসলামের এই সুন্নাতের সম্পূর্ণ বিপরীত। নবী-রাসূলগণই যদি নিজেদের সব ব্যাপারে কেবলমাত্র আল্লাহরই নিকট ফরিয়াদ করে থাকেন এবং এ ব্যাপারে আর কারো নিকট কোনো ইন্তেমদাদ(সাহায্য প্রার্থনা)না করে থাকেন, তাহলে আমরা সাধারণ মুসলমানরাই বা কেনো অন্য কারো প্রতি মুখাপেক্ষী হবো, নির্ভরশীল হবো, কেন অন্য কাউকে অসীলা ধরবো? অথচ এই নবী-রাসূলগণই তো আমাদের চিরন্তন আদর্শ। তাঁদের কাজও যেমন আমাদের কাছে অনুসরণীয় তেমনি অনুসরণীয় তাঁদের কর্মনীতি ও কর্মপদ্ধতিও। বিশেষত আল্লাহ এসব দো‘আ শিক্ষা দিয়ে আমাদেরকেও অনুরূপ  আল্লাহ মুখী হতে, কেবলমাত্র আল্লাহর নিকটই দো‘আ করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

অবশ্য এ কথা অস্বীকার করা যাচ্ছেনা যে, নবী করীমের(স) জীবদ্দশায় তাঁকে অসীলা বানিয়ে বিপদ থেকে উদ্ধার পাবার জন্যে আল্লাহর কাছে দো‘আ করেছেন তদানীন্তন মুসলমানেরা। হাদীসে তার সুস্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু তা হলো রাসূলের জীবদ্দশায়, রাসূল নিজে একজন প্রার্থনাকারী হিসেবে লোকদের মাঝে উপস্থিত থাকা অবস্থায়। আর তা থেকে অতটুকুই প্রমাণিত হয়, রাসূলের জীবদ্দশায় তাঁকে অসীলা বানিয়ে দো‘আ করা জায়েয ছিল। কিন্তু রাসূলে করীমের ইন্তিকালের পর আর কোনো দিন সাহাবায়ে কিরাম তাঁকে দো‘আ প্রার্থনায় অসীলা বানাননি। ‘অসীলা’ বানানো হয়নি এমন কোনো ব্যক্তিকে যে মরে গেছে এবং যে নিজে দো‘আর অনুষ্ঠানে শরীক নেই। এ পর্যায়ে কুরআন মজীদের আরো দু’টি আয়াত বিবেচ্য। সূরা সেজদায় আল্লাহ নেক বান্দাদের পরিচয় দান প্রসঙ্গে বলেছেনঃ

تَتَجَافَىٰ جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ [٣٢:١٦]

-তাদের পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশ সুখশয্যা হতে বিচ্ছিন্ন হয়েই থাকে, তারা (তাদের আল্লাহর প্রতি) ভয় ও আশা পোষণ করেই ডাকতে থাকে তাদের আল্লাহকে। তদুপরি আমি তাদের যা দান করেছি তা থেকে (আমার পথে) ব্যয় করে।

এ আয়াতে ‘ইয়াদয়ুদা রাব্বাহুম খাওফান ওয়া তামআন’ বাক্যাংশ বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। এখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, আল্লাহর আয়াতের প্রতি প্রকৃত যারা ঈমানদার তারা ভয় পায় কেবলমাত্র আল্লাহকে, আশা পোষণ করে একমাত্র আল্লাহর প্রতিই, যিনি তাদের রব্ব। বিপরীত অর্থে তারা আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয়ও করেনা, কারো প্রতি কিছু আশাও পোষণ করেনা। আর ভয়ের কারণ হলেও তাঁরা ডাকে কেবল আল্লাহকে, আল্লাহর-ই নিকট দো‘আ প্রার্থনা করে, আল্লাহ ছাড়া আর কারো নিকটই প্রার্থনা করেনা। অনুরূপভাবে কোনো কিছু পাওয়ার আশাও করে কেবলমাত্র আল্লাহর নিকট থেকে, সে জন্যেও দো‘আ করে তাঁরই নিকট। আল্লাহর নিকট ছাড়া আর কারো নিকট হতে কিছুই পাওয়ার আশা করেনা তারা এবং কোনো কিছু পাওয়ার প্রয়োজন হলে একমাত্র আল্লাহর নিকটই সেজন্য দো‘আ করে, প্রার্থনা করে।

তাছাড়া প্রথমাংশে বলা হয়েছে নামায পড়ার কথা, শেষাংশে বলা হয়েছে দো‘আ করার কথা। ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী লিখেছেনঃ দো‘আ ও নামায প্রকৃত অর্থের দিক দিয়ে একই জিনিস।

অর্থাৎ নামায যেমন আল্লাহ ছাড়া আর কারো জন্যে, কারো উদ্দেশ্যে পড়া হয়না, দো‘আ ও  তেমনি আল্লাহ ছাড়া আর কারো নিকট করা যায়না।

আর একটি আয়াত হলোঃ

আরবী(*******)

-যে লোক আল্লাহর অনুগত-আল্লাহর-ই হুকুম পালনকারী, রাতের বেলা আল্লাহকে সেজদা করে, পরকালকে ভয় করে এবং কেবলমাত্র আল্লাহর রহমতেরই আশা করে, তার পরিণতি কি মুশরিক ব্যক্তিদের মতো হতে পারে?

তার মানে এসব গুণ যার আছে সে মুশরিক নয়, সে তওহীদবাদী। আর যার এসব গুণ নেই, নেই এর কোনো একটি ‍গুণও, সে-ই মুশরিক হয়ে যাবে প্রকৃত ব্যাপারের দিক দিয়ে। যেমন কেউ যদি আল্লাহর অনুগত না হয়ে অনুগত হয় আল্লাহর সৃষ্ট কোনো শক্তির- যে লোক পরকালকে ভয় করেনা কিংবা যে লোক তার আল্লাহর রহমতের আশা করেনা বা আল্লাহর পরিবর্তে অন্য কারো রহমত ও অনুগ্রহ দৃষ্টি লাভের আশা পোঁষণ করে-কুরআনের এ আয়াতের ঘোষণা অনুযায়ী সে-ই মুশরিক হবে। অতএব আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা কুরআনের দৃষ্টিতে কিছুতেই জায়েয হতে পারেনা।

এ আলোচনার শেষ পর্যায়ে শায়খ আবদুল কাদের জিলানী(রহ) এর দু-তিনটি কথা এখানে প্রমাণ হিসেবে উদ্বৃত করা জরুরী মনে করছি। তিনি তাঁর গ্রন্থ…..এর শুরুতেই লিখেছেনঃ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর-ই জন্য, যাঁর প্রশংসা সহকারে সব কিতাবই শুরু করা হয় এবং যাঁর জিকির করে সব কথা শুরু করতে হয়। তাঁরই প্রশংসার দৌলতে জান্নাতী লোকেরা জান্নাত পাবে, তিনিই এমন সত্তা যে তাঁর নাম উচ্চারণ করলে সব রোগ নিরাময় হয়, তাঁরই নামে সব চিন্তা দুঃখ ও বিপদ দূর হয়ে যায়। সুখ-দুঃখ, আনন্দ-নিরানন্দকালে তাঁরই দরবারে কাতর কন্ঠে কাঁদ কাঁদ স্বরে দো‘আ করা হয়। তাঁর জাত-ই এমন যে, নানা বুলি ও নানা ভাষা হওয়া সত্ত্বেও সমস্ত দো‘আ প্রার্থনাকারীর ডাক তিনি শুনেন, বিপদগ্রস্ত কাতর মানুষের দো‘আ তিনিই কবুল করেন।

তিনি তাঁর গ্রন্থ ‘ফাতাউল গায়েব’ এ লিখেছেনঃ আমাদের কান্না-কাটা, আমাদের দো‘আ এবং সব অবস্থায় আমাদের রুজু হতে হবে একমাত্র আল্লাহর-ই নিকট, যিনি আমাদের পরোয়ারদিগার, আমাদের সৃষ্টিকর্তা, আমাদের রিযিকদাতা। তিনি খাওয়ান, তিনিই পান করান, তিনিই উপকার দেন, তিনিই মুহাফিজ, তিনিই নিগাহবান। আমাদের জীবন তাঁরই হাতে।

“অতএব তোমার প্রার্থনা হবে এবং নিজের প্রয়োজন পূরণের জন্য ডাকবে একমাত্র আল্লাহকেই, আল্লাহরই নিকটে, তিনি একাই তোমার দাতা, তিনি-ই তোমার লক্ষ্য হবেন।”

“যে লোক নিজেরই মতো কোনো মাখলুকের ওপর ভরসা করে, সে অভিশপ্ত।”

শায়খ জিলানী মৃত্যুশয্যায় শায়িত অবস্থায় তাঁর পুত্র আবদুল ওহাব তাঁকে বললেনঃ “আমাকে এমন কিছু অসীয়ত করুন, আপনার পরে যা অনুসরণ করে আমি চলবো, আমল করবো”।

তখন তিনি বললেনঃ আল্লাহকে ভয় করে চলাই তোমাদের কর্তব্য; আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করবেনা, আল্লাহ ছাড়া আর কারো নিকট কিছু চাইবেনা-কারো কাছ থেকে কিছু পাওয়ার আশা করবেনা। সব প্রয়োজনকেই এক আল্লাহর ওপরই সোপর্দ করে দেবে। সেই এক আল্লাহ ছাড়া আর কারো নিকট কিছুমাত্র ভরসা করবেনা, নির্ভরতা গ্রহণ করবেনা। সব কিছু কেবল তাঁরই নিকট হতে পেতে চাইবে। আল্লাহ ছাড়া কারো প্রতি আস্থা স্থাপন করবেনা। তওহীদকেই ধারণ করবে, তওহীদকেই ধারণ করবে, তওহীদকেই ধারণ করবে। সকলেই এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ একমত।

এ পর্যায়ে শেষ কথা এই যে, দো‘আ কবুলকারী যদি কেবলমাত্র আল্লাহতা‘আলা ই হয়ে থাকেন, আর তিনি-ই যদি সরাসরি তাঁরই নিকট দো‘আ করতে বলে থাকেন, তাহলে অন্য কারো নিকট দো‘আ করা, দো‘আয় অন্য কাউকে অসীলা বানানো আল্লাহর ওপর খোদকারী ছাড়া আর কিছু নয়। যারা তা করতে বলে তারা শুধু বিদয়াতী-ই নয়, তারা সুস্পষ্টরূপে শিরক- এ লিপ্ত-শিরক প্রচারকারী তারা। ইসলামের তওহীদি আকীদায় শিরক-এর আমদানি করে।

বস্তুত ইসলামের ঐকান্তিক দাবি হলো, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে মা‘বুদ ও (অলৌকিকভাবে) প্রয়োজন পূরণকারী বলে মেনে নিতে সুস্পষ্ট ভাষায় অস্বীকার করবে এবং কোনোরূপ শরীকদারী ছাড়াই একমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই অনন্য মা‘বুদ হওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণ করবে। এই হচ্ছে প্রকৃত তওহীদী আকীদা এবং কালেমায়ে তাইয়্যেবার প্রথম অংশ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ এর তাৎপর্য্। অতঃপর হযরত মুহাম্মদ(স) কে আল্লাহতা‘আলার রাসূল মানবে। অর্থাৎ জীবন যাপনে আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি, তা জানবার সর্বশেষ একমাত্র ব্যক্তি হচ্ছে হযরত মুহাম্মদ(স)। তাই জীবন যাপনের অপরাপর নিয়ম ও পদ্ধতিকে-যা হযরত মুহাম্মদ(স) কর্তৃক প্রচারিত নয় তা-ও মেনে নিতে অস্বীকার করতে হবে। কলেমার দ্বিতীয় অংশের এই হচ্ছে তাৎপর্য্।

পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণও তাঁদের উম্মতদের এই শিক্ষাই দিয়েছেন। কিন্তু এ কথা নিঃসন্দেহ যে উত্তরকালে তারা গোমরাহ হয়ে শিরকে নিমজ্জিত হয়েছে। এই পর্যায়ে হযরত মুহাম্মদ(স) কালেমার এই উভয় পর্যায়ে বৈপরীত্য শিরক ও বিদয়াতের গোমরাহীতে নিমজ্জিত হওয়ার ব্যাপারে খুব বেশি সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। কেননা তার কোনো একটি দিক দিয়েও শিরকে নিমজ্জিত হলে নিঃসন্দেহে জাহান্নামে যেতে হবে।

 

আইন পালনের শিরক-এর বিদয়াত

ইসলামের তওহীদী আকীদায় আল্লাহর একত্ব ও অনন্যতা স্বীকৃত যেমন বিশ্বসৃষ্টি, লালন-পালন, রিযিকদান এবং দো‘আ ও ইবাদত পাওয়ার অধিকার প্রভৃতির ক্ষেত্রে। অনুরূপভাবে মানুষের বাস্তব জীবনের সর্বস্তরে ও সর্বক্ষেত্রে নিরংকুশভাবে আনুগত্য করে চলতে হবে এক আল্লাহকেই। মানুষের নিকট এই আনুগত্য পাওয়ার একমাত্র অধিকার হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার, আল্লাহ ছাড়া আর কারোরই এই অধিকার নেই, যেমন সমগ্র বিশ্বলোক-বিশ্বলোকের অনু-পরমাণু পর্য্ন্ত আনুগত্য করে চলছে একমাত্র আল্লাহর। পরন্তু নিখিল জগতের সবকিছুর ওপর যেমন আইন বিধান চলে একমাত্র আল্লাহর, তেমনি মানুষের জীবনেও সর্বদিকে ও বিভাগে আইন জারি করার নিরংকুশ অধিকারও একমাত্র আল্লাহর। আল্লাহর সৃষ্ট এই মানুষের ওপর আল্লাহ ছাড়া আর কারোরই আইন জারি করার নেই। মানুষও পারেনা আল্লাহ ছাড়া আর কারো আইন মেনে নিতে ও পালন করতে। করলে তা হবে সম্পূর্ণরূপে অনধিকারচর্চা, অন্যায় এবং অত্যাচার; তা হবে সুস্পষ্টরূপে শিরক।

বস্তুত মানুষের জন্য আইন বিধান তিনিই রচনা করবেন, মানুষ তার জীবনের সকল দিক ও বিভাগে কেবল তাঁরই দেয়া আইন পালন করে চলবে। তাঁর দেয়া আইন বিধানের বিপরীত কোনো কাজ কিছুতেই করবেনা। কেননা মানুষের ওপর হুকুম করার, অন্য কথায়-আইন দেয়ার ও জারি করার অধিকারতো আল্লাহ ছাড়া আর কারোরই নেই, থাকতে পারেনা। এ বিষয়ে মূল কথা হলো; আপনি কাকে এই অধিকার দিচ্ছেন যে, সে আপনার জন্যে আইন তৈয়ার করবে, আর আপনি তা পালন করবেন, করতে প্রস্তুত হবেন আর কাকে এই অধিকার আপনি দিচ্ছেননা।

যদি আপনি একমাত্র আল্লাহকে এই অধিকার দেন, তাহলে আল্লাহর তওহীদ বিশ্বাস পূর্ণ হলো, আর যদি ওপর কাউকে, কোনো ব্যক্তিকে, কোনো প্রতিষ্ঠানকে –এই অধিকার দেন বা অধিকার আছে বলে মনে করেন, তা হলে প্রকৃতপক্ষে সে-ই হলো আপনার আল্লাহ, আর আপনি তার বান্দা-দাস। কিন্তু এই শেষোক্ত অবস্থা নিঃসন্দেহে শিরক এর অবস্থা। একথাই ঘোষিত হয়েছে কুরআন মজীদে নিম্নোক্ত আয়াতসমূহে।

সূরা আল-আনআমের আয়াতে রাসূলে করীমের জবানীতে বলা হয়েছেঃ

مَا عِندِي مَا تَسْتَعْجِلُونَ بِهِ ۚ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ ۖ يَقُصُّ الْحَقَّ ۖ وَهُوَ خَيْرُ الْفَاصِلِينَ [٦:٥٧]

-তোমরা যে জন্যে খুব তাড়াহুড়া করছো তা তো  আমার কাছে নেই। সব ব্যাপারে ফয়সালা ও হুকুম করার অধিকার কারোই নেই-একমাত্র আল্লাহ ছাড়া। তিনিই সত্য বর্ণনা করেন এবং তিনিই সর্বোত্তম ফয়সালা দানকারী।

সূরা ইউসূফের আয়াত হলোঃ

আরবী(*********)

-হুকুমদানের-আইন বিধান রচনার চূড়ান্ত অধিকার কারোরই নেই এক আল্লাহ ছাড়া। সেই আল্লাহ-ই ফরমান দিয়েছেন যে, হে মানুষ তোমরা কারোরই দাসত্ব করবেনা, করবে কেবলমাত্র সেই আল্লাহর।

এ আয়াতের তাফসীরে আল্লামা ইবনে কাসীর লিখেছেনঃ নির্দেশদান, হস্তক্ষেপকরণ, ইচ্ছা করা ও মালিকানা বা নিরংকুশ কর্তৃত্ব এই সব কিছুই একমাত্র আল্লাহর জন্য। তিনি তাঁর বান্দাদের চূড়ান্তভাবে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা এক আল্লাহ ছাড়া আর কারোরই ইবাদাত-বন্দেগী বা দাসত্ব করবেনা।

উপরোক্ত এ আয়াতে একদিকে বলা হয়েছে হুকুম দানের কথা, অপরদিকে দাসত্বের কথা। যার হুকুম পালন করা হয়, কার্য্ত দাসত্ব তাঁরই করা হয়। আর কারো হুকুম আইন, আদেশ নিষেধ, হালাল হারাম পালন করা, মেনে নেয়া ও অনুসরণ করাই হচ্ছে শরীয়তের পরিভাষায় ইবাদত। কাজেই এ ব্যাপারে আল্লাহকেই একমাত্র আইনদাতা বলে মেনে নেয়া তওহীদেরই আকীদা ও আমল। আর এই দিক দিয়ে অপর কাউকে এ অধিকার দিলে তা হবে সুস্পষ্ট শিরক।

নিম্নোক্ত আয়াত ও ঠিক এ কথাই ঘোষণা করেছে।

مَا لَهُم مِّن دُونِهِ مِن وَلِيٍّ وَلَا يُشْرِكُ فِي حُكْمِهِ أَحَدًا [١٨:٢٦]

-লোকদের জন্য এক আল্লাহ ছাড়া কোনো ‘অলী’ নেই এবং তিনি তাঁর হুকুম রচনা ও জারি করার ক্ষেত্রে কাউকেই শরীক করেননা।

এখানে ‘অলী’ শব্দটি ঠিক ‘আদেশদাতা’ ‘আইন-বিধানদাতা’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে এবং আল্লাহ ছাড়া কোনো ‘অলী’ নেই-এর মানে আল্লাহ ছাড়া আদেশদাতা, আইন বিধানদাতা ও প্রভুত্ব কর্তৃত্বসম্পন্ন আর কেউ নেই, কেউ হতে পারেনা। এ কথাই এ আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে। আর এ কথাকে অধিক চূড়ান্ত করে বলা হয়েছে আয়াতের শেষাংশে এই বলে যে, তাঁর হুকুমের ক্ষেত্রে তিনি কাউকেই শরীক করেননা। অর্থাৎ আইন-বিধানদাতা হিসেবে আল্লাহ এক, একক ও অনন্য। তিনি আর কাউকেই নিজস্বভাবে মানুষের ওপর হুকুম দানের ও আইন জারী করার অধিকার দেননি। সেই সঙ্গে মানুষকেও অধিকার দেয়া হয়নি আর কাউকে হুকুমদাতা বলে মেনে নেয়ার এবং আর কারো দেয়া আইন পালন করার। মানুষ যদি কাউকে এরূপ অধিকার দেয়, তবে আল্লাহর সাথে শিরক করা হয়। তা হবে অনধিকার চর্চা। কেননা আল্লাহর সৃষ্টির ওপর আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেই এই অধিকার তিনি নিজে দেননি; এখন আল্লাহর সৃষ্টির ওপর অপর কারো হুকুমদানের এবং হুকুমদাতা বলে মেনে নেয়ার কার অধিকার থাকতে পারে? আল্লাহ তো শিরক এর গুনাহ কখনো মাফ করেননা। অন্যান্য গুনাহ্র কথা স্বতন্ত্র।

ইরশাদ হয়েছেঃ

إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ ۚ

-আল্লাহর সাথে শিরক হলে তিনি তা মাফ করেননা। এছাড়া অন্যান্য গুনাহ যাকে ইচ্ছা মাফ করে দেন। (আন-নিসাঃ116)

বস্তুত ইসলামের তওহীদী আকীদায় এ-ই হচ্ছে সুন্নাত। কুরআন মজীদের ত্রিশ পারা কালাম এই আকীদারই বিশ্লেষণে পরিপূর্ণ। নবী করীম(স) এই আকীদাই প্রচার করেছেন, এই আকীদার ভিত্তিতেই তিনি চালিয়েছেন তাঁর সমগ্র দাওয়াতী ও ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। তখনকার সময়ের লোকেরা এই কথাই বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর প্রচারিত আকীদা থেকে এবং আকীদা গ্রহণ করেই তাঁরা মুসলমান হয়েছিলেন। এক কথায় এই হচ্ছে ইসলামের বুনিয়াদী আকীদা এবং এরই ভিত্তিতে নবী করীম(স) গড়ে তুলেছিলেন পূর্ণাঙ্গ সমাজ ও রাষ্ট্র।

এক আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছেঃ

আরবী(********)

-হুকুম আইন-বিধান রচনা ও জারী করার অধিকার কেবলমাত্র মহান আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট।

আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীকে লক্ষ্য করে হুকুম দিয়েছেন-

إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْقُرْآنَ تَنزِيلًا [٧٦:٢٣]

فَاصْبِرْ لِحُكْمِ رَبِّكَ وَلَا تُطِعْ مِنْهُمْ آثِمًا أَوْ كَفُورًا [٧٦:٢٤]

-নিশ্চয়ই আমরা কুরআন নাযিল করেছি। অতএব আল্লাহর হুকুম পালনের মধ্যেই সবর করে থাকো, তা বাদ দিয়ে কোনো গুনাহগার কিংবা কাফির ব্যক্তির আনুগত্য করোনা, তার দেয়া হুকুম মেনো না।

কুরআন নাযিল করার কথা বলার পরই আল্লাহর হুকুম পালনে সবর করতে বলার তাৎপর্য্ এই যে, কুরআনই হলো আল্লাহর হুকুমপূর্ণ কিতাব। এ কিতাব মেনে চললেই আল্লাহর হুকুম মান্য করা হবে। আর তা পালনে সবর করার অর্থ আল্লাহর হুকুম পালন করেই ক্ষান্ত থাকা, তাছাড়া আর কারো হুকুম পালন না করা।

নবী করীম(স) নিজের ভাষায় বলেছেন-

আরবী(*******)

-সৃষ্টির আনুগত্য করতে গিয়ে আল্লাহর নাফরমানী করার অধিকার নেই কারো।

তার মানে, আনুগত্য মৌলিকভাবে কেবল আল্লাহরই প্রাপ্য মানুষের কাছে। মানুষ কেবল তাঁরই আনুগত্য করতে আদিষ্ট। কিন্তু যদি কোনো ক্ষেত্রে অন্য কারো আনুগত্য করতে হয়, অন্য কারো আইন বিধান পালন করার প্রয়োজন দেখা দেয়, তাহলে কি করা যাবে? রাসূলের এই কথাটুকুতে তারই জবাব রয়েছে। এখন এর তাৎপর্য্ হলো এই যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো আনুগত্য করা যেতে পারে কেবলমাত্র একটি শর্তে আর সেই শর্ত হলো এই যে, অন্য কারো আনুগত্য করা হলে তাতে যেন আনুগত হওয়ার আসল ও মৌল অধিকার আল্লাহর নাফরমানী হয়ে না যায়। যদি তা হয় তাহলে কিছুতেই অন্য কারো আনুগত্য করা যেতে পারেনা।

ইলমে ফিকাহ্ও এই কথাই আমাদের সামনে পেশ করে নানা কথায়, নানা ভাষায়। উসুলুল ফিকহর কিতাব ‘নুরুল আনোয়ার’ এ লিখিত হয়েছেঃ

তওজীহ কিতাবের বিশ্লেষণ থেকে যা জানা যায়, তা হলো এই যে, প্রত্যেকটি হুকুমের জন্য (১) হুকুমদাতা, (২)যার প্রতি হুকুম দেয়া হয় এবং (৩) যে বিষয়ে হুকুম দেয়া হলো এই তিনটি জিনিস জরুরী। অতএব হুকুমদাতা হচ্ছে এক আল্লাহ, হুকুম দেয়া হয়েছে শরীয়ত পালনে বাধ্য মানুষকে এবং হুকুম দেয়া হয়েছে শরীয়ত পালনের।

‘তাওজীহ’ কিতাবে আরো স্পষ্ট করে কথাটি বলা হয়েছে এভাবেঃ

কিতাবের দ্বিতীয় পর্যায়ে আলোচনা হবে হুকুম সম্পর্কে। হুকুম এর জন্য হুকুমদাতা আবশ্যক, আর হুকুমদাতা হচ্ছে আল্লাহতা‘আলা, মানুষের জ্ঞান বুদ্ধি বিবেক নয়।

বলা হয়েছেঃ হুকুম কেবল আল্লাহর ই হতে পারে। এ ব্যাপারে সব ইমামই সম্পূর্ণ একমত।

কুরআন, হাদীস ও ইজমা-ইসলামী শরীয়তের এই তিনটি বুনিয়াদী দলীল থেকে এ কথাই প্রমাণিত হয়। তা হচ্ছে এই যে, হুকুম দেয়ার অধিকার আল্লাহ ছাড়া আর কারোই নেই। আল্লাহর তওহীদে বিশ্বাসী লো্ক এক আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেই হুকুমদাতা, বিধান-দাতা ও জায়েয-নাজায়েয নির্ধারণকারী হিসেবে মানতে পারেনা। মানলে তা হবে শিরক। রাসূলে করীমের পরে খোলাফায়ে রাশেদীন এর আমলেও মুসলমানদের এই ছিল আকীদা এবং এই ছিল তাঁদের আমল।

হযরত উমর ফারূক(রা) হযরত আবু মূসা আশ‘আরীর নিকট ইসলামী শাসন কার্য্ পরিচালনা সম্পর্কিত পলিসি নির্ধারণকারী এক চিঠিতে লিখেছিলেনঃ

শরীয়ত ভিত্তিক বিচার ব্যবস্থা কায়েম করা এক অকাট্য দ্বীনি ফরয এবং অনুসরণযোগ্য এক সুন্নাত।

কিন্তু উত্তরকালে মুসলিম সমাজে তওহীদের এই মৌলিক ভাবধারা-যাকে আমাদের ভাষায় বলতে পারি তওহীদ আকীকার রাজনৈতিক তাৎপর্য্-স্তিমিত হয়ে আসে। শেষ পর্য্ন্ত এমন একদিনও আসে, যখন মুসলমানরা দ্বীন ইসলামে ধর্ম ও রাজনীতিকে দুই বিচ্ছিন্ন ও পরস্পর সম্পর্কহীন জিনিস বলে মনে করতে শুরু করে এবং এই মনোভাবের ফলে ধর্মের ক্ষেত্রে ধর্মীয় নেতাদের কর্তৃত্ব মেনে নেয়। কেবল আল্লাহর হুকুমই নয়, সেই সঙ্গে ধর্ম নেতা তথা পীর সাহেবের হুকুম পালন করাও দরকারী বলে মনে করে। জীবনের বৃহত্তম দিক-রাজনীতি, সমাজনীতি ও অর্থনৈতিক কাজকর্মকে ইসলামের আওতার বাইরে বলে মনে করে। সেখানে মেনে নেয়া হয় রাজনীতিকও শাসকদের বিধান। নামাযের ইমামতি ধার্মিক লোকই করবে বলে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু সমাজ, রাষ্ট্র ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ফাসিক-ফাজির তথা ইসলামের দুশমনদের নেতৃত্ব স্বীকার করে নিতেও এতটুকু দ্বিধাবোধ করা হয়না-একে ইসলামের বিপরীত কাজ বলে মনে করা হয়না। শুধু তাই নয়, ব্যক্তি জীবনে যারা ধর্মকে খুব গুরুত্ব সহকারে পালন করে –পালন করা দরকার বলে মনে করে, তারাই যখন রাজনীতি করতে নামে, তখন সেখানে করে চরম গায়র ইসলামী রাজনীতি, চরম শরীয়ত বিরোধী সামাজিকতা এবং সুস্পষ্ট হারাম উপায়ে ব্যবসা বাণিজ্য ও লেনদেন। কেননা এসব ক্ষেত্রে তারা আল্লাহকে হুকুম দেয়ার অধিকার দিতে রাজি হয়না, আল্লাহর হুকুম মেনে চলতে হবে এক্ষেত্রে তা মনে করতে পারেনা। ধর্ম ও রাজনীতি কিংবা ধর্ম ও অর্থনীতি ইত্যাদিকে বিচ্ছিন্ন পরস্পর সম্পর্কহীন মনে করাই হলো আধুনিক সেকিউলারিজম এর মূল কথা এবং ইসলামের তওহীদী আকীদার সামাজিক-রাজনৈতিক দিকে এই হলো এক মারাত্মক বিদয়াত। এই পর্যায়ে এসে সমাজের ধার্মিক লোকেরা আল্লাহকে পাওয়ার জন্য পীর ধরা ফরয বলে প্রচার করে। আর অপর শ্রেণীর লোকেরা রাজতন্ত্র, বাদশাহী ও ডিকটেটরী শাসন ব্যবস্থা পর্য্ন্ত ইসলাম সম্মত মনে করতে শুরু করে। ফাসিক-ফাজির নেতা, রাজা-বাদশাহ ও ডিকটেটরকে বাস্তব জীবনে আইন শাসনের ক্ষেত্রে ঠিক আল্লাহর স্থানে বসিয়ে দেয়। তারা এজন্যে রাসূলের হাদীস ‘সুলতানরা আল্লাহর ছায়া সদৃশ’ প্রচার করে। রাজা-বাদশাহ ও ফাসিক ফাজির নেতৃবৃন্দকে মানব সমাজের ওপর আল্লাহর সমান মাননীয় করে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মুসলমানদের বাস্তব আনুগত্যের ক্ষেত্রে ধর্মীয় দিক দিয়ে আলিম ও পীরকে এবং জাগতিক ব্যাপারে রাজা-বাদশাহ, রাজনৈতিক নেতা ও ডিকটেটরকে আল্লাহর সমতুল্য করে ফেলেছে। আল্লাহ যেমন জনগণের ওপর নিজস্ব আইন বিধান জারী করেন, তেমনি ধর্মনেতা বা পীর-বুযুর্গ এবং রাজা-বাদশাহ ও রাষ্ট্রকর্তাদেরও নিজেদের মর্জিমত আইন বিধান জারী করার অধিকার আছে বলে মনে করেছে। ইসলামী ধর্ম ব্যবস্থায় এবং বৈষয়িক রাজনীতির ক্ষেত্রে এমনিভাবে এক মহা বিদয়াতের অনুপ্রবেশ সম্ভব হয়েছে। আর তারই ফলে আল্লাহর তওহীদী ধর্মে ধর্মনেতার তথা পীর-বুজুর্গ লোকদের এবং রাজনীতি ও সমাজ সংস্থায় রাজনীতিবিদদের নিরংকুশ কর্তৃত্ব স্বীকার করে শিরক এর এক অতি বড় বিদয়াত দাঁড় করিয়ে নিয়েছে। পরবর্তীকালে ক্রমশ এমন একদিন এসে পড়ে, যখন রাজা-বাদশাহ ও রাষ্ট্রকর্তাদের রচিত আইন বিধান পালন করাকে আল্লাহর আইন পালনের মতোই কর্তব্য এবং পীরের হুকুম মানা আল্লাহর হুকুম পালনের সমান কর্তব্য বলে মনে করতে থাকে। আর তাদের নাফরমানীকে আল্লাহর নাফরমানীর মতোই গুনাহের কাজ বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে।(ঠিক এ কারণে এক সঙ্গে দু’জন ইমাম-রাষ্ট্রপ্রধান মেনে নেয়াও জায়েয নয়। একজন ধর্মীয় ইমাম-পীর ও একজন রাষ্ট্রীয় ইমাম-বাদশাহ বা ডিকটেটর মেনে নেয়া শরীয়তবিরোধী।)

অথচ শরীয়তের নির্দেশ মুতাবিক তাদের কর্তব্য ছিল এক ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করা এবং সেজন্য ইসলামী আদর্শবাদী ইমাম তথা রাষ্ট্রচালক নিয়োগ করা। কুরআনের আয়াত ‘আমি পৃথিবীতে খলীফা বানাব’-এর ভিত্তিতে ইমাম কুরতবী লিখেছেনঃ

ইমাম ও খলীফা নিয়োগ কর্তব্য – যার কথা শোনা হবে ও আনুগত্য করা হবে, যেন জাতির ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয় ও খলীফার আইন আদেশ পুরোপুরি জারী হয়-এ পর্যায়ে উপরোক্ত আয়াতই মূল দলীল। ইমাম ও মুজতাহিদ ইমামদের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই। অতএব এ কাজ যে ওয়াজিব তা প্রমাণিত হলো। প্রমাণিত হলো যে, এরূপ একজন ইমাম বা খলীফা নিয়োগ করা সেই দ্বীন ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ, যে দ্বীন হলো মুসলমানদের সামাজিক ও সামগ্রিক জীবনের ভিত্তি।

আল্লাহর হুকুম ও আইন ছাড়া অন্য কারো আইন পালন করা যে শিরক, পূর্বের আলোচনায় শরীয়তের অকাট্য দলীলের ভিত্তিতে তা প্রমাণিত হয়েছে।

কিন্তু আলিম নামধারী এমন কিছু লোক রয়েছে, যারা জাহিল পীরদের ফেরেবে পড়ে কেবল আল্লাহকেই একমাত্র আইন বিধানদাতা বলে মানতে রাজি নয়। কেননা হুকুম আইনদাতা রূপে কেবল আল্লাহকেই যদি মানতে হয়, তাহলে ‘হুযুর কিবলা’র স্থান হবে কোথায়? অতএব আল্লাহর সঙ্গে ‘হুযুর কিবলাকে’ও হুকুম দেয়ার অধিকারী মেনে নেয়া ছাড়া উপায় নেই। এ জন্যে এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো হুকুম মানা শিরক-‘ইসলামের তওহীদী’ আকীদাসম্মত এই কথার জবাবে নেহায়েত মূর্খের মতই বলতে শুরু করেঃ

“পাঠকগণ! একটু চিন্তা করুন-স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মক্তব প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে, রাজনৈতিক, সামাজিক, বিভিন্ন সমিতি, কমিটি ও সংস্থায়, নৌকা, স্টীমার, বাস, ট্রেন ইত্যাদি পরিচালনায় ও যাতায়াত প্রভৃতি অসংখ্য পার্থিব ও বৈষয়িক ব্যাপারে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষকে কি মানুষের গড়া কোনো আইন মেনে চলতে হয়না? জ্বি হ্যা, তাতো নিশ্চয়ই হয়; তাতে আর সন্দেহ কি? তাহলে কি আল্লাহকে একমাত্র হুকুমদাতা বলে মানতে হবে? আমাদের পূর্বোক্ত দীর্ঘ আলোচনার আলোকে চিন্তা করলে আলিম নামধারী ব্যক্তির উপরোক্ত কথা যে কতখানি হাস্যকর তা যে কোনো লোকই বুঝতে পারেন। একেতো তিনি নিজেই বলছেনঃ ‘পার্থিব ও বৈষয়িক ব্যাপারে মানুষের গড়া আইন পালন করতে হয়।’ নিতান্ত বৈষয়িক ব্যাপারেও আল্লাহ ও রাসূলের কোনো বিধান বা আদর্শ নেই, সেসব ক্ষেত্রে আর কারো হুকুম মানা যাবেনা- একথা আপনাকে কে বলেছে? এখানে মূল কথা হচ্ছে মানুষের জীবনকে বৈষয়িক ও ধর্মীয়-এ দু’ভাগে ভাগ করাই আপনার মারাত্মক ভুল। ইসলামে এ বিভাগকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেয়া হয়েছে। অতএব কেবল জাগতিক ব্যাপারেই নয়, নিছক ধর্মীয় ব্যাপার বলে আপনি যাকে মনে করছেন, তাতেও আল্লাহ ছাড়া অন্যের হুকুম পালন করা যেতে পারে; কিন্তু বিনাশর্তে নয়, একটি বিশেষ শর্তের ভিত্তিতে। তাহলো প্রথমতো সে হুকুম আল্লাহর হুকুম মুতাবিক হবে। আর দ্বিতীয়ত আল্লাহর হুকুমের বিপরীত কিছু হবেনা-এ শর্তের ভিত্তিতে যে কোন ক্ষেত্রে যে কারোরই হুকুম পালন করা যেতে পারে। কেননা তা মূলত আল্লাহরই হুকুম। কিন্তু জনাব, হুযুর কিবলার হুকুমকে যে আল্লাহর হুকুমের মতোই বিনাশর্তে নির্বিচারে মানবেন, তা চলবেনা, তাহলে সুস্পষ্ট শিরক হবে এবং আপনি সেই শিরকের অতল সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে থাকবেন।

রাজনীতি না করার বিদয়াত

রাজনীতিকে পরিত্যাগ করে, তার সাথে কোনোরূপ সম্পর্ক না রেখে চলা আর এক প্রকারের বড় বিদয়াত, যা বর্তমান মুসলিম সমাজের এক বিশেষ শ্রেণীর লোকদের গ্রাস করে আছে। এ লোকদের দৃষ্টিতে রাজনীতি সম্পূর্ণ ও মূলগতভাবেই দুনিয়াদারীর ব্যাপার। দুনিয়াদার লোকেরাই রাজনীতি করে। আর যারাই রাজনীতি করে তাদের দুনিয়াদার হওয়ার একমাত্র প্রমাণই এই যে, তারা রাজনীতি করে। এই শ্রেণীর লোকদের মধ্যে প্রায়ই শুনতে পাওয়া যায়, তারা বলে বেড়ায়ঃ ‘আমি রাজনীতি করিনা’ কিংবা ‘রাজনীতি অনেকদিন করেছি, এখন আর করিনা’ আবার কেউ কেউ বলেঃ ‘আমরা ধার্মিক লোক, রাজনীতির সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক্ নেই।’

এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি যে বিদয়াত, তার কারণ এই যে, তা স্বয়ং রাসূলে করীম(স) এর আদর্শ, কর্মনীতি ও আকীদার সম্পূ্র্ণ বিপরীত। রাসূলে করীম(স) এর নব্যুয়তের জিন্দেগীটি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, তিনি রাজনীতি করেছেন, রাষ্ট্রের সাথে তাঁর কাজের সংঘর্ষ হয়েছে এবং শেষ পর্য্ন্ত তিনি সকল বাতিল রাষ্ট্র ও গায়র ইসলামী রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে পুরোপুরি ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করেছেন, সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ইসলামী আদর্শের রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা। রাসূলের জীবদ্দশায় ও তাঁর পরে এ রাজনীতি সাহাবায়ে কিরাম করেছেন, রাষ্ট্র চালিয়েছেন এবং রাষ্ট্র সংক্রান্ত যাবতীয় কর্তব্য সম্পাদন করেছেন। তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীনরাও রাজনীতি করেছেন।

রাজনীতির কথা কুরআন মজীদে রয়েছে, রয়েছে হাদীসে, আছে এ দুয়ের ভিত্তিতে তৈরী ফিকাহ শাস্ত্রের মাসলা-মাসায়েলে। কাজেই রাজনীতি করা সুন্নাত। ইসলামী আদর্শের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

রাজনীতি সুন্নাত, ইসলামী আদর্শ মোতাবিক-শুধু তাই নয়, তা হচ্ছে ইসলামের মূল কথা। দুনিয়ায় নবী প্রেরণের মূলেও রয়েছে জমিনের বুকে আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করা। নবীগণ দুনিয়ায় এ কাজ করেছেন পূর্ণ শক্তি দিয়ে, জীবন ও প্রাণ দিয়ে আর আধুনিক ভাষায় এ-ই হচ্ছে রাজনীতি।

আল্লাহর নিকট মানুষের জন্য মনোনীত জীবন ব্যবস্থা হচ্ছে একমাত্র ইসলাম, অন্য কিছু নয়। এই হচ্ছে আল্লাহর ঘোষণাঃ

ইন্নাল্লাজিনা ইনদাল্লাহিল ইসলাম।

এর অর্থও তাই। আর এ দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করে মানব সমাজে আল্লাহর বিধান মোতাবিক ইনসাফ কায়েম করার উদ্দেশ্যেই আল্লাহ পাঠিয়েছেন আম্বিয়ায়ে কিরামকে।

আল্লাহ্ নিজেই ইরশাদ করেছেনঃ

لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ ۖ وَأَنزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ

-নিশ্চয়ই আমরা নবী রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন অকাট্য যুক্তি ও প্রমাণ সহকারে। তাদের সঙ্গে নাযিল করেছি কিতাব ও ইনসাফের মানদন্ড যেন লোকেরা হক ও ইনসাফ সহকারে বসবাস করতে পারে। আর দিয়েছি ‘লৌহ’। এর মধ্যে রয়েছে বিপুল ও প্রচন্ড শক্তি এবং জনগণের জন্য অপূর্ব কল্যাণ।

এ আয়াত থেকে যে মূল কথাটি জানা যাচ্ছে তা হলো, দুনিয়ার মানুষ সুষ্ঠু ও নির্ভূল ইনসাফের ভিত্তিতে জীবন যাপন করা সুযোগ লাভ করুক-এ উদ্দেশ্যে আল্লাহতা‘আলা নবী রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন। নবী-রাসূলগণ যাতে করে দুনিয়ায় সঠিক ইনসাফ ও সুবিচার কায়েম করতে সক্ষম হন, তার জন্যে রাসূলগণকে আল্লাহর নিকট হতে প্রধানত দুটি জিনিস দেয়া হয়েছে বৈশিষ্ট্য ও আল্লাহর সরাসরি প্রেরণের নিদর্শন হিসেবে। তার একটি হলো-মোজেযা-অকাট্য যুক্তি ও প্রমাণ, যা লোকদের সামনে নবী-রাসূলগণের নব্যুয়ত ও রিসালাতকে সত্য বলে প্রমাণ করে দেয়। আর দ্বিতীয় হচ্ছে আল্লাহর কালাম-আসমানী কিতাব, যা নাযিল করা হয়েছে মানুষের জীবন যাপনের বাস্তব বিধান হিসেবে।

এছাড়া আরো দু’টি জিনিস দেয়া হয়েছে। একটি হলো ‘মীযান’ মানে মানদন্ড, মাপকাঠি; যার সাহায্যে ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ ও সত্য-মিথ্যা প্রমাণ করা যায়। আল্লামা ইবনে কাসীর এ আয়াতের তাফসীরে ‘মীযান’ শব্দের ব্যাখ্যা হিসেবে লিখেছেনঃ ‘মীযান’ মানে মুজাহিদ এবং কাতাদার মতে ‘সুবিচার ও নিরপেক্ষ ইনসাফ’। আর তা হচ্ছে এমন এক সত্য যা সুস্থ, অনাবিল ও দৃঢ় জ্ঞান ‍বুদ্ধি বিবেক হতে প্রমাণিত। আর দ্বিতীয় জিনিস হচ্ছে আল হাদীদ। ‘হাদীদ’ মানে চলতি কথায় ‘লৌহ’। আর এর শাব্দিক অর্থ ইমাম রাগেবের ভাষায় ধারালো, তীক্ষ্ম, শক্তভাবে প্রভাব বিস্তারকারী জিনিস। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে এসব বিভিন্ন অর্থেই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।

অতএব এর অর্থ আমরা বুঝতে পারি, প্রথমত লৌহ ধাত, দ্বিতীয়ত এক শক্ত শাণিত ও অমোঘ প্রভাব বিস্তারকারী ও ক্ষমতা প্রয়োগকারী জিনিস। আর নবী রাসূলের প্রসঙ্গে এর অর্থ অনায়াসেই বুঝতে পারিঃ ‘জবরদস্ত শক্তি’। ইংরেজীতে যাকে বলা হয় Coercive Power বা অন্য কথায় ‘রাষ্ট্রশক্তি’।

নবী-রাসূলগণ আল্লাহর বিধানের ভিত্তিতে তীব্র তীক্ষ্ম শক্তিসম্পন্ন ও অমোঘ কার্য্কর রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করতেন, তারই সাহায্যে লৌহ নির্মিত অস্ত্র ব্যবহার করে সমস্ত অন্যায় ও জুলুমের পথ বন্ধ করতেন, আর নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের ওপর নিরপেক্ষ ইনসাফ কায়েম করতেন। কাজেই নবী-রাসূলগণকে যে ইনসাফ কায়েমের উদ্দেশ্যে দুনিয়ায় প্রেরণ করা হয়েছিল, খতমে নব্যুয়তের পর সে ইনসাফ কায়েম করা এবং তারই জন্য তীব্র শক্তি প্রভাবশালী রাষ্ট্রশক্তি প্রতিষ্টিত করা নবীর উম্মতের দায়িত্ব ও কর্তব্য। আর এ শক্তি অর্জন করতে চেষ্টা করা, এ শক্তি অর্জন করে তার সাহায্যে ইনসাফ কায়েম করাকেই আধুনিক ভাষায় বলা হয় রাজনীতি। এ কথাই প্রতিধ্বনিত হয়েছে রাসূলে করীম(স) এ বাণীতেঃ

নিশ্চয়ই আল্লাহতা‘আলা রাষ্ট্রশক্তির সাহায্যে এমন অনেক কাজই সম্পন্ন করেন, যা কুরআন দ্বারা তিনি করাননা।(কোনো কোনো মনীষীর মতে এ কথাটি হযরত উসমান(রা) এর, হযরত মুহাম্মদ(স) এর নয়। সেটা হতেও পারে, তিনি কথাটি রাসূলের নিকটই শুনেছিলেন হয়তো। আর তা না হলেও সাহাবীদের কথারও গুরুত্ব অনস্বীকার্য্। তাও হাদীস হিসেবে গণ্য। সাহাবীগণ রাসূলে করীম(স) এর নিকট হতেই দ্বীন সম্পর্কিত যাবতীয় জ্ঞান লাভ করেছিলেন।)

তার মানে আল্লাহর চরম লক্ষ্য হাসিলের জন্য কুরআনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র শক্তি অপরিহার্য্। কুরআনকে কার্য্কর করার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রশক্তিকে প্রয়োগ না করলে কুরআন আপন শক্তির বলে মানব সমাজে কার্য্কর হতে পারবেনা।

এছাড়া কুরআন মজীদে নির্দেশ রয়েছেঃ

شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّىٰ بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَىٰ ۖ أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ ۚ كَبُرَ عَلَى الْمُشْرِكِينَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَيْهِ ۚ اللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَن يَشَاءُ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَن يُنِيبُ [٤٢:١٣]

-আল্লাহতা‘আলা তোমাদের দ্বীনের জন্য সে পন্থাই নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন যার হুকুম তিনি দিয়েছিলেন নূহকে, আর অহীর সাহায্যে – হে মোহাম্মদ-এখন তোমার দিকে পাঠিয়েছি, আর যার হেদায়াত আমরা ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে দিয়েছি এই তাগিদ করে যে, কায়েম করো এই দ্বীনকে এবং এ ব্যাপারে তোমরা বিচ্ছিন্ন ও বিভিন্নপন্থী হয়ে যেওনা। হে নবী, তুমি যে জিনিসের দাওয়াত দিচ্ছ তা মুশরিকদের নিকট বড়ই দুঃসহ ও অসহ্য হয়ে উঠেছে। আল্লাহ যাকে চান যাচাই করে আপনার বানিয়ে নেন এবং তাঁর নিজের দিকে যাওয়ার ও পৌছার পথ তাকেই দেখান, যে তাঁর দিকে রুজু হবে। (আশ শুরাঃ13)।

এ আয়াত স্পষ্ট বলছে যে, হযরত নূহ(আ) হতে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ(স) কেও নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, আল্লাহর দেয়া এ দ্বীনকে পুরোপুরি কায়েম করো। হযরত মুহাম্মদ(স) সব বাতিল আদর্শে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা চূর্ণ করে এ দ্বীনকে কায়েম করার এবং দ্বীনের ভিত্তিতে সমাজ, জীবন ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে গড়ে তোলারই দাওয়াত দিচ্ছিলেন তখনকার সময়ের লোকদের মধ্যে। আর এ জিনিসই ছিল মুশরিকদের জন্য বড় দুৎসহ। দ্বীন কায়েমের দাওয়াত ও চেষ্টা মুশরিকদের পক্ষে সহ্য করা এ জন্য দুঃসহ ছিল যে, তার ফলে মানুষের জীবন থেকে শিরকের নাম নিশানা পর্য্নত মুছে যাবে। আর শিরকই যদি না থাকলো, তাহলে তো মুশরিকদের অস্তিত্বই নিঃশেষ হয়ে গেল। তার আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবেনা। এখানে দ্বীনকে কায়েম করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, দেয়া হয়েছে রাসূলে করীমের নবুয়্যতী জিন্দেগীর প্রথম দিকেই। দ্বীনকে শুধু প্রচার করার নির্দেশ কোরআন মজীদে কোথাও নেই। আর দ্বীন কায়েমের মানে হলো মানুষের মন, জীবন, আকীদা, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পলিসি ও ব্যবস্থাকে দ্বীনের ভিত্তিতে গড়ে তোলা এবং আল্লাহর দেয়া আইন বিধানকে বাস্তবভাবে জারী ও কার্য্কর করা, তারই ভিত্তিতে শাসন, বিচার, শিক্ষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে পূর্ণমাত্রায় রূপায়িত করা।

(কুরআন মজীদে আল্লাহ নির্ধারিত ফৌজদারী আইনকে বলা হয়েছে ‘আল্লাহর দ্বীন’। সূরা আন-নূর এ যিনাকারী পুরুষ ও নারীকে শরীয়তী দন্ড হিসেবে কোড়া মারার নির্দেশ দেয়ার পর বলা হয়েছেঃ আল্লাহর দ্বীন জারী ও কার্য্কর করার ব্যাপারে সে দুজনের প্রতি দয়া ও মায়া যেন তোমাদেরকে পেয়ে না বসে, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমানদার হয়ে থাকো। এ আয়াতে কোড়া মারা ফৌজদারী আইনকে ‘আল্লাহর দ্বীন’ বলা হয়েছে।)

অতএব দ্বীন কায়েম করা, কায়েম করার চেষ্টা করা হযরত মুহাম্মদ(স) এর প্রতি ঈমানদার মুসলমানের মাত্রেরই দ্বীনি ফরয, যেমন ফরয নামায কায়েম করা, যাকাত দেয়া ইত্যাদি। হাদীসেও দ্বীন কায়েম করার স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়।

একটি হাদীসে নবী করীম(স) ইরশাদ করেছেনঃ কেউ যদি তার যিনার অপরাধ আমাদের সামনে প্রকাশ করে দেয় তাহলে আমরা তার ওপর আল্লাহর কিতাব কায়েম করে দেবো।

‘আল্লাহর কিতাব কায়েম করে দেব’ কথার অর্থ আল্লাহর কিতাবে লিখিত যিনার শাস্তি তার ওপর কার্য্কর করে দেবো, তাকে সেই শাস্তি দেবো, যা আল্লাহর কিতাবে লিখিত রয়েছে। এখানে আল্লাহর কিতাব কায়েম করার মানে হলো আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী আইন জারী করা। অনুরূপভাবে দ্বীন কায়েম করার মানে হলো দ্বীন অনুযায়ী পূর্ণ জীবন পূণর্গঠিত করা। রাসূলে করীম(স) এ নির্দেশ পেয়েছিলেন তাঁর নব্যুয়তের প্রাথমিক পর্যায়েই। পূর্বোক্ত আয়াতটি হলো সূরা আশ শুরার। আর তা মক্কা শরীফেই অবতীর্ণ হয়েছিলো। উক্ত সূরায় পূর্বোদ্ধুত আয়াতের একটু পূর্বেই রয়েছে এ আয়াতটিঃ

وَكَذَٰلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لِّتُنذِرَ أُمَّ الْقُرَىٰ وَمَنْ حَوْلَهَا وَتُنذِرَ يَوْمَ الْجَمْعِ لَا رَيْبَ فِيهِ ۚ [٤٢:٧]

-এমনিভাবে হে মুহাম্মদ! তোমার প্রতি আরবী ভাষার কিতাব এ কুরআনকে ওহী করে পাঠিয়েছি এ উদ্দেশ্যে যে, তুমি এ কিতাবের মাধ্যমে মক্কাবাসী ও তার আশেপাশের লোকদের ভয় দেখাবে, ভয় দেখাবে একত্রিত হওয়ার সেই দিনটি সম্পর্কে, যে দিনের উপস্থিতির ব্যাপারে কোনোই সন্দেহ নেই।

এ আয়াতে নবী করীম(স) কে ভয় দেখাবার কাজ করতে বলা হয়েছে আর তারই ভিত্তিতে পরবর্তীতে দেয়া হয়েছে দ্বীন কায়েমের নির্দেশ। তার মানে দ্বীন কায়েম করা বা সেজন্য চেষ্টা করা পরকালের প্রতি ঈমানের অপরিহার্য্ দাবি। তা করা না হলে সে দিন আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে। আর এ-ই ছিল নবী করীম(স) এর নব্যুয়তের প্রাথমিক পর্যায়ের দাওয়াত ও সাধনা। এ ছিলে সে জিহাদ, যার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল নবী করীম(স) কে মক্কার জীবনেই এ আয়াতেঃ

فَلَا تُطِعِ الْكَافِرِينَ وَجَاهِدْهُم بِهِ جِهَادًا كَبِيرًا [٢٥:٥٢]

- হে নবী কাফির লোকদের আনুগত্য স্বীকার করবেনা কখনো এবং কিছুতেই। বরং কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী কাফিরদের সাথে পূর্ণ শক্তি প্রয়োগে ও সর্বাত্মকভাবে জিহাদ করবে।

কাফিরদের আনুগত্য স্বীকার না করার-তা অস্বীকার ও অমান্য করার এবং এ বাতিলপন্থীদের পূর্ণ শক্তি নিয়োগ করে তাদের ক্ষমতাচ্যূত করার সাধনাই ছিল প্রথম দিন থেকে বিশ্বনবীর সাধনা।(এ পর্যায়ে আল্লামা ইবনূল কাইয়্যেম লিখেছেনঃ যেদিন প্রথম তাঁকে নবী রূপে নিয়োগ করলেন, সেদিনই আল্লাহ তাঁকে জিহাদ করার নির্দেশ দিলেন।

আর কোরআনের পূর্বোক্ত আয়াত সম্পর্কে তিনি লিখেছেনঃ এ সূরাটি মক্কায়ই অবতীর্ণ। এতে আল্লাহতা‘আলা রাসূলকে কাফির (এবং মুনাফিকদের) সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন।)

আর আজকের ভাষায় এই হচ্ছে দ্বীন কায়েমের রাজনীতি। নবীর এ সাধনারই বাস্তব ফল পাওয়া গেছে হিজরতের পরে মদীনা কেন্দ্রিক ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থারূপে।

এ দৃষ্টিতে তাঁদের কথা ভুল প্রমাণিত হয় যারা বলে বেড়ান যে, ‘নবী করীম(স) দ্বীন কায়েম করার-ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করার- কোনো দাওয়াত দেননি বা সেজন্য কোনো চেষ্টা করেননি।’ মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রতো ছিল আল্লাহর দান মাত্র। অথচ প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আল্লাহর দ্বীনকে কায়েম করার দাওয়াত সব নবীরই মৌলিক দাওয়াত ছিলো, সর্বশেষ নবীর সাধনাও ছিল তারই জন্য।

একথা আজকের দিনে কেবল কোরআন হাদীসের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণেই জানা যাচ্ছে তা নয়; খোদ সাহাবীগণ একান্তভাবে বিশ্বাস করতেন যে, রাসূলে করীম(স) কে দ্বীন কায়েমের এ মহান উদ্দেশ্যেই দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছে এবং সাহাবায়ে কিরাম (রা) ছিলেন এ কাজের জন্যেই তাঁর সঙ্গী ও সাথী। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের কথা পূর্বেই উদ্বৃত হয়েছে।

তিনি সাহাবীদের সম্পর্কে বলেছেনঃ আল্লাহতা‘আলা তাঁদের বাছাই করে মনোনীত করে মনোনীত করে নিয়েছেন তাঁর নবীর সঙ্গী সাথী হওয়ার জন্য এবং তাঁর দ্বীনকে কায়েম করার উদ্দেশ্যে।

এখানে দুটো কথা বলা হয়েছে। প্রথম কথাটি থেকে প্রমাণিত হয় যে, সাহাবায়ে কিরামের ফযীলত ও মর্যাদা-শ্রেষ্টত্বের একমাত্র ভিত্তি হলো রাসূলে করীমের সোহবত লাভ করা, তাঁর সঙ্গী ও সাথী হওয়া। তাঁরা কি কাজে রাসূল(স) এর সঙ্গী ও সাথী ছিলেন? সকলেই জানেন, রাসূলে করীমের(স) রিসালাতের মূল দায়িত্ব পালনের ব্যাপারেই তাঁরা ছিলেন রাসূলের সঙ্গী ও সাথী। আর এ এত বড় মর্যাদা ও শ্রেষ্টত্বের ব্যাপার যে-ঈমান, আমল ও তাকওয়া-তাহরাতের উচ্চতম মর্যাদাও এর সমতুল্য হতে পারেনা।

আর দ্বিতীয় কথা বলা হয়েছে, আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে কায়েম করার উদ্দেশ্যেই রাসূলের সাহাবীদেরকে মনোনীত করেছেন। সাহাবীদের ব্যাপারে এ হলো আল্লাহর দ্বিতীয় উদ্দেশ্য। আর এ উদ্দেশ্য প্রথম উদ্দেশ্যেরই পরিপূরক। বরং বলা যায়, তাঁদের নবীর সঙ্গী ও সাথী বানিয়ে দেবার মূল লক্ষ্যই ছিলো আল্লাহর দ্বীন কায়েম করা। একথা থেকে স্বয়ং নবী করীম(স) এর আগমনের উদ্দেশ্যও স্পষ্টভাবে বোঝা গেল। জানা গেল যে, নবীর জীবন লক্ষ্য ও ছিল আল্লাহর দ্বীন কায়েম করা এবং সাহাবীদের উদ্দেশ্যও ছিল তা-ই। নবীর আগমন, লক্ষ্য ও সাহাবীদের জীবন উদ্দেশ্য দু’রকমের ছিল কিংবা পরস্পর বিপরীত ছিলো-তার ধারণাও করা যায়না। যে মহান উদ্দেশ্যে আল্লাহতা‘আলা সাহাবায়ে কিরাম(রা)-কে নবী করীম(স) এর সঙ্গী ও সাথী বানিয়ে দিয়েছেন, তা হলো আল্লাহর দ্বীনকে কায়েম করা আর এ কারণেই নবী করীম(স) এর ইন্তিকালের সঙ্গে সঙ্গে সাহাবীদের এ দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়নি। বরং তা ছিল তাঁদের জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্য্ন্ত শাশ্বত কর্তব্য। এ থেকে এ কথাও বোঝা গেল যে, আল্লাহ যে উদ্দেশ্যে সাহাবীদের বাছাই ও মনোনীত করেছিলেন, তা কেবল মদীনাতেই মনোনীত ছিলনা, করণীয় ছিল মক্কায়ও। বরং মক্কী জীবন থেকেই যারা রাসূলে করীম(স) এর সাহাবী হয়েছিলেন, সাহাবীদের মধ্যে তাঁদের সম্মান ও মর্যাদা ছিল সর্বাধিক। এ থেকে একথাও অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো যে, নবী করীম(স) ও সাহাবীদের জীবন উদ্দেশ্য মক্কী জীবনেও তাই ছিলো, যা ছিল মাদানী পর্যায়ে। মদীনায় গিয়ে যেমন কোনো নতুন লক্ষ্য গ্রহণ করা হয়নি, তেমনি মদীনায় যাওয়ার পর মক্কী পর্যায়ের লক্ষ্য ও বদলে যায়নি। এমন হয়নি যে, নবী করীম(স) সাহাবায়ে কিরাম মক্কায় এক ধরনের উদ্দেশ্যে কাজ করেছিলেন আর মদীনায় গিয়ে ভিন্ন ধরনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য গ্রহণ করেছিলেন। অতএব গোটা মুসলিম উম্মতের উদ্দেশ্য ও দায়িত্ব তা-ই ছিলো যা ছিলো স্বয়ং রাসূলে করীম(স) ও সাহাবায়ে কিরামের। তাঁদের পদাংক অনুসরণ করা, শুধু ‘দলীয় রাজনীতির উর্ধ্বে থেকে কওম ও হুকুমাতকে রাহমুনায়ী’ করে এ কর্তব্য পালন হতে পারেনা। বরং সেজন্য প্রত্যক্ষভাবে দ্বীন কায়েমের রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়া ইসলামে বিশ্বাসী মানুষ মাত্রেরই কর্তব্য।(এখানে মনে করতে হবে যে, যারা শুধু কলেমার তাবলীগ করেন এবং বলেন, আমরা নবীর মক্কী পর্যায়ের কাজ করছি, তারা কিন্তু মোটেই সত্যি কথা বলছেননা। বরং নবীর মক্কী পর্যাযের কাজকে এরূপ বিকৃতরূপে পেশ করে তারা বড় অপরাধ করছেন। মক্কী পর্যায়ে রাসূল(স)ইসলামী রাজনীতি ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার যে আদর্শ পেশ করেছেন, মাদানী পর্যায়ে তা-ই কায়েম করেছেন। কাজেই তাঁর কাজ এক অখন্ড ও অবিভাজ্য আদর্শ, তাকে দু’ভাগে বিভক্ত করা যায়না। বিভক্ত করা হলে তা নিঃসন্দেহে বিদয়াত হবে।)

এ যদি রাজনীতি হয়ে থাকে, তবে এ রাজনীতি তো দ্বীন-ইসলামের হাড়মজ্জার সাথে মিশ্রিত, ইসলামের মূলের সাথে সম্পৃক্ত। সব নবী এ দ্বীনই নিয়ে এসেছিলেন এবং সব নবীর প্রতি এ রাজনীতি করারই নির্দেশ ছিল আল্লাহর তরফ থেকে। আজ যাঁরা এ রাজনীতিকে ক্ষমতার লোভ বলে দোষারোপ ও ঘৃণা প্রকাশ করছেন, তাঁরা বুঝতে পারেননা যে, এ দোষারোপ কার্য্ত রাসূলে করীম(স) এর ওপরই বর্তায়। বর্তায় মহান আদর্শ স্থানীয় সাহাবায়ে কিরামের ওপর, বর্তে দুনিয়ার মুজাদ্দিদীন ও ইসলামের মুজাহিদীনের ওপর। এ রাজনীতি ছাড়া দ্বীন, কোনোভাবেই দ্বীন ইসলাম নয়, সে দ্বীন নয়, যা নিয়ে এসেছিলেন আখেরী নবী। এ রাজনীতি পরিহার করে চলা এবং একে ‘ক্ষমতার লোভ’ বলে ঘৃণা করা ও গালাগালি করাই হলো এক অতি বড় বিদয়াত। এ বিদয়াত খতম করা না হলে ইসলাম রক্ষা পেতে পারেনা। এহেন রাজনীতিকে অস্বীকার করা, তাকে পাশ কাটিয়ে চলা এবং ‘‘দলীয় রাজনীতির উর্ধ্বে থেকে জনগণ ও সরকারকে শুধু রাহমুনায়ী করা কিংবা রাজনীতির ব্যাপারে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত থেকে ধর্মের কিছু অংশ প্রচার করাকে যে নিঃসন্দেহে কুরআন হাদীসের মূল ঘোষণা তথা ইসলামের প্রাণ শক্তিকেই অস্বীকার করার শামিল, তা কে অস্বীকার করতে পারে?”

নবী করীম(স) এর প্রতি ঈমান এনেই আমরা মুসলিম হতে পেরেছি। তিনিই আমাদের একমাত্র আদর্শ। আর তাঁর সাহাবী সে আদর্শানুসারী লোকদের প্রথম কাফেলা, আমাদেরও অগ্রপথিক? তাঁরা কি রাজনীতি চর্চা করেছেন? না তাঁরা দলীয় রাজনীতির উর্ধ্বে থেকে শুধু রাহনুমায়ী-ই(?) করে গেছেন, না নিজেরাই রাজনীতির মাঝদরিয়ায় ঝাঁপ দিয়ে মানুষকে গায়রুল্লাহর গোলামী থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর বন্দেগীর পথে নিয়ে গেছেন? যে কেউ রাসূলের জীবন কাহিনী ও সাহাবীদের দিন রাতের ব্যস্ততার কথা জানেন, তাঁদের মনে এ ব্যাপারে কোনো অস্পষ্টতা থাকতে পারেনা। তাঁরা নিঃসন্দেহে জানেন, রাসূল করীম(স) ও সাহাবায়ে কিরাম রাষ্ট্রশক্তি অর্জন করেছেন, তাঁর সাহায্যে ইসলামী জীবন বিধানকে বাস্তবায়িত করেছেন, অন্যায় ও জুলুমের প্রতিরোধ করেছেন এবং ন্যায় এর প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাই আল্লাহর দ্বীনকে কায়েম করার উদ্দেশ্যে আল্লাহর বিধান মোতাবিক ও রাসূলের দেখানো পথে ও নিয়মে যে রাজনীতি, সে রাজনীতি করা প্রকৃতই সুন্নাহ এবং তা বাদ দিয়ে চলা, আর এ রাজনীতিকে বাদ দিয়ে চলার রাজনীতেকে সুন্নাত বা ‘ইসলামের রীতি’ বলে বিশ্বাস করা সুস্পষ্টভাবে বিদয়াত। এ বিদয়াত ইসলামকে এক বৈরাগ্যবাদী ধর্মে পরিণত করেছে। শুধু তা-ই নয়, মুসলিমদের উপর ফাসিক ফাজিরদের কর্তৃত্ব, জুলুম ও শোষণ চলার স্থায়ী ব্যবস্থা করে দিয়েছে। বস্তুত নবী করীম(স) যদি এদের মতো নীতি অনুসরণ করতেন, যদি তদানীন্তন আরব সমাজের প্রধান আবু জেহেল ও আবু লাহাব এর প্রতি তাদের শুধু ‘রাহনুমায়ী’ করার নীতিই গ্রহণ করতেন, তাহলে মুশরিক কাফিরদের তরফ হতে এত বিরুদ্ধতা হতোনা, রাসূলকে হিজরত করতে, জিহাদে দাঁত ভাঙতে ও সাহাবীদের শহীদ হতে হতোনা কখনো। বরং তাঁরা এ ধরনের নীতি গ্রহণ করে লাখ লাখ টাকা পেতে পারতেন, যেমন একালের এক শ্রেণীর আলিম ও পীরেরা পাচ্ছে এ যুগের আবু জেহেল ও আবু লাহাব এর কাছ থেকে। আর তা-ই যদি তাঁরা করতেন, তাহলে এ যুগে ইসলামের কোনো অস্তিত্বই থাকতোনা, হতো না ইসলামের কোনো ইতিহাস- কোনো গৌরবোজ্জ্বল জীবন্ত কাহিনী।

প্রত্যক্ষভাবে আল্লাহর দ্বীন কায়েমের রাজনীতি করা ইমাম মুজতাহিদগণের মতে এবং ফিকাহ ও আকাঈদের দৃষ্টিতেও ঈমানেরই তাগিদ-একান্তই কর্তব্য।

আল্লামা মুল্লা আলী আল কারী ইমাম আবু হানীফা(রহ) এর ইসলামী আকায়েদ এর বড় ব্যাখ্যাতা। তিনি লিখেছেনঃ ইমাম-ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালক-নিয়োগ করা যে ওয়াজিব, এ বিষয়ে সব বিশেষজ্ঞই সম্পূর্ণ একমত।

ইমাম নিয়োগের কাজ যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝাতে গিয়ে তিনি আরো লিখেছেনঃ সাহাবায়ে কিরামও ইমাম নিয়োগকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। এমন কি নবী করীম(স) কে দাফনের পূর্বেই ইমাম নিয়োগের কাজ সুসম্পন্ন করেছেন। কিন্তু কেন? তার কারণ এই যে, মুসলমানদের জন্য একজন ইমাম-রাষ্ট্রচালক-একান্তই আবশ্যক, যে তাদের আইনসমূহ কার্যকর করবে, হদ্দসমূহ কায়েম করবে, তাঁদের ফাঁক ও ফাটলসমূহ বন্ধ করবে, তাদের সৈন্যদের সদা প্রস্তুত ও সজ্জিত করে রাখবে, তাদের সম্মান ও সময় সংরক্ষণ করবে, তাদের বিদ্রোহী আক্রমণকারীদের শক্তিবলে দমন করবে, ডাকাত ও ছিনতাইকারীদের শাসন করবে, জুম’আ, হজ্জ ও ঈদ কায়েম রাখবে, অভিভাবকহীন ছেলেমেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করবে, গনীমতের মাল ও জাতীয় সম্পদ বন্টন করবে এবং এ ধরনের আরও শরীয়ত মোতাবিক যে সব কাজ করা জরুরী তা সুসম্পন্ন করবে। (শরহে ফিকাহ আকবর)

এই পর্যায়ে সর্বশেষ ও অত্যন্ত জরুরী কথা হলো, ‘রাজনীতি না করা বিদয়াত’ পর্যায়ে এখানে  যা কিছু বলা হয়েছে, তা শুধু দ্বীন কায়েমের রাজনীতি না করা সম্পর্কে কিন্তু রাজনীতির নামের দ্বীন ইসলাম পরিপন্থী মতাদর্শ কায়েমের রাজনীতি, তা না করা নয়, তা করাই একালের একটি অতি বড় বিদয়াত। বড়ই দুঃখ ও লজ্জার বিষয়, মুসলমানরা এ ইসলামী পরিচিত ধারণকারী বিভিন্ন গোষ্ঠী, দল জামা‘আত বর্তমানে সাধারণভাবে যে রাজনীতি করছে, তা দ্বীন কায়েমের রাজনীতি নয়; এবং দ্বীন ইসলাম বিরোধী ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, সমাজতন্ত্র বা পুঁজিবাদ কায়েম করার রাজনীতি করছে-তা সম্পূর্ণ বিদয়াত, হারাম। মুসলমান বা ইসলাম পরিচিতি দিয়ে কুফর কায়েম করার রাজনীতি করা কুরআনের ভাষায় চরম মুনাফিকী, তা আল্লাহর এই প্রশ্নের সম্মুখীনঃ আরবী(****)

-হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা মুখে কেন বলো সেই কথা যা কাজে তোমরা করছোনা?

যা করছো না তাই বলছো, অতএব যা বলছো তা করছো না-নিজেদের নাম ও পরিচিতির আলোকে যা তোমাদের করা উচিত, তা করছো না, যা করা উচিত নয় তা করছো। তোমাদের নাম ও পরিচিতি দেখে লোকেরা তোমাদের নিকট যে রাজনীতি আশা করে স্বাভাবিকভাবে তোমরা সে রাজনীতি করছো না, করছো যা তা হলো ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী, সমাজতন্ত্রী বা পুঁজিবাদ রাজনীতি। ফলে তোমাদের গোটা অস্তিত্বই একটা প্রচন্ড মুনাফিকী হয়ে দাঁড়িয়েছে। তোমরা হচ্ছো মিথ্যাবাদী ও ধোঁকাবাজ।

তোমাদের এই রাজনীতি স্পষ্ট বিদয়াত, তা অবিলম্বে পরিহার করে সরাসরি আল্লাহর দ্বীন কায়েমের রাজনীতি করা তোমাদের কর্তব্য। তোমাদের নাম ও পরিচিত ঐকান্তিক দাবিও তাই। গণতন্ত্রের মাধ্যমে ইসলাম কায়েম করার কথা বলা সুস্পষ্ট বিদয়াত। কেননা গণতন্ত্র কুফরি মতবাদ। কুফর দ্বারা ইসলাম কায়েম হতে পারেনা। ইসলাম সরাসরি আল্লাহর বন্দেগী কবুলের দাওয়াতের মাধ্যমেই কায়েম হতে পারে, এছাড়া মধ্যমপন্থা ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়, অতএব তা ত্যাগ করতে হবে।

আল্লাহর নৈকট্য লাভে অসীলা বিদয়াত

কুরআন ও হাদীসে যে সর্বাত্মক তওহীদী আকীদা পেশ করেছে, তদানুযায়ী একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই হলেন সমগ্র বিশ্বলোকের নিরংকুশ অধিকারী কর্তা ও পরিচালক। মানুষ কেবল এক আল্লাহরই বন্দেগী দাসত্ব ও আনুগত্য করবে, জীবনের সমগ্র ক্ষেত্রে এক আল্লাহরই দেয়া আইন বিধান পালন করে চলবে এবং এই সব ব্যাপারেই একমাত্র অনুসরণ করবে আল্লাহর রাসূলের। হেদায়াত লাভ করবে রাসূলের নিকট থেকে। তিনি যে পথ, পন্থা ও উপায় এবং কর্মনীতি উপস্থাপিত করেছেন, মানুষ তাদের সমগ্র কাজ সেই অনুযায়ীই সম্পন্ন করবে। কোনো কিছু চাইতে হলে কেবল তাঁরই নিকট চাইবে এবং কোনো কিছু পাওয়ার আশা করলেও কেবল তাঁরই নিকট হতে আশা করবে।

কুরআন মজীদে উদাত্ত ভাষায় বলা হয়েছেঃ

قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ [٣:٣١]

- তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস, তবে তোমরা আমার(নবীর) অনুসরণ করে চলো। তা হলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গোনাহ খাতা মাফ করে দেবেন।

এই আয়াত অনুসারে আল্লাহকে ভালোবাসার, আল্লাহর বন্দেগী করার ইচ্ছা বান্দার মনে জাগাবার অনিবার্য্ ফলশ্রুতি যেমন রাসূলের অনুসরণ করা; তেমনি বাস্তব ক্ষেত্রে রাসূলের অনুসরণ করা ছাড়া আল্লাহকে ভালোবাসার কোনো দাবিই অর্থবহ হতে পারেনা। উপরন্তু আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার একমাত্র উপায়ই হচ্ছে রাসূলের অনুসরণ।

আল্লামা আলুসী এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেনঃ যে লোক আল্লাহর আনুগত্য করে তাঁর প্রতি ভালোবাসা দেখাল এবং তাঁর নবীর অনুসরণ করে তাঁর নৈকট্য অর্জন করলো, আল্লাহ তার জন্য ক্ষমাশীল ও দয়াবান।

রাসূলে করীম(স) কে মুসলমানদের জন্য একমাত্র অনুসরণীয় আদর্শ ব্যক্তি হিসেবে পেশ করা হয়েছে কোরআন মজীদে।

ইরশাদ হয়েছেঃ

لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا [٣٣:٢١]

-নিশ্চিতই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের চরিত্রে উত্তম অনুসরণীয় নমুনা ও আদর্শ রয়েছে। তাদের জন্য তা ফলপ্রসূ হবে যারা আল্লাহকে পেতে চায়, পরকালে মুক্তি চায় এবং আল্লাহকে খুব বেশি স্মরণ করে।

এ আয়াত অনুযায়ীও যে লোক আল্লাহকে পেতে চায়, পরকালের মুক্তি চায় এবং আল্লাহর জিকির করে বেশি বেশি করে, তার জন্য বাস্তব অনুসরণযোগ্য আদর্শ চরিত্র হচ্ছে রাসূলে করীম(স)। যে লোক তাঁকে অনুসরণ করবে সর্বোতভাবে, সে যেমন আল্লাহকে পাবে, পাবে পরকালীন মুক্তি, তেমনি তাঁর আল্লাহ জিকির বাস্তবরূপ লাভ করবে নবীর অনুসরণের মাধ্যমে, তারই মাঝে তা রূপায়িত ও প্রতিফলিত হয়ে উঠবে।

কুরআনের এসব উদাত্ত ঘোষণা অনুযায়ী মানুষ মানতে বাধ্য একমাত্র আল্লাহকে এবং অনুসরণ করতে বাধ্য একমাত্র রাসূলে করীম(স) কে। বস্তুত ইসলামের তওহীদী আকীকা অনুযায়ী আল্লাহকে পাওয়ার উপায় রাসূলের বাস্তব অনুসরণ ছাড়া আর কিছু নেই। রাসূলের জামানায়, সাহাবীদের সময়ে এবং তাবেই ও তাবে তাবেয়ীনের সময়েও এই ছিল ইসলামী সমাজের বাস্তবরূপ। আল্লাহকে পাওয়ার এছাড়া অন্য কোনো পথই তাঁদের জানা ছিলনা, তাঁরা অন্য কোনো উপায়ই গ্রহণ করতেননা। কিন্তু পরবর্তীকালে মানুষের ওপর চেপে বসে পীরত্বের বিদয়াত। সমাজে এক শ্রেণীর লোক পীর হয়ে বসে এবং দাবি করে যে, তারা আল্লাহর নিকট বান্দাদের পৌছার অসীলা বা মাধ্যম। তাদের গ্রহণ করলে আল্লাহকে পাওয়া যাবে আর তাদেরকে গ্রহণ না করলে আল্লাহকে পাওয়া যাবেনা (নাউজুবিল্লাহ)।

অথচ কুরআন থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহকে পাওয়ার জন্য রাসূলের অনুসরণে শরীয়ত পালন ছাড়া দ্বিতীয় কোনো মাধ্যমের কোনো অবকাশই নেই, তার কোনো প্রয়োজনই নেই। বান্দার দো‘আ আল্লাহর নিকট সরাসরি পৌছে যায়, আল্লাহ সরাসরিভাবে বান্দার দো‘আ কবুল করে থাকেন, সে জন্য তিনি কোনো মাধ্যম গ্রহণ করতে বলেননি, দো‘আ কবুল হওয়ার জন্য তিনি কোনো মাধ্যম গ্রহণের শর্তও আরোপ করেননি। বরং এ পর্যায়ের যাবতীয় বিভ্রান্তি ও ভুল আকীদা দূর করে দিয়ে তিনি স্পষ্টভাষায় ঘোষণা করেছেনঃ

وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ ۖ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ ۖ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ [٢:١٨٦]

-হে নবী! আমার বান্দা যদি তোমার নিকট আমার বিষয়ে জিজ্ঞেস করে, তবে বলে দাও আমি অতি নিকটে, কোনো দো‘আকারী যখন আমাকে ডাকে তখন আমি তার দো‘আ র জবাব দিই-দো‘আ কবুল করি। অতএব আমারই নিকট জবাব পেতে চাওয়া তাদের কর্তব্য এবং আমার প্রতিই তাদের ঈমান রাখা উচিত। তাহলে সম্ভবত তারা সঠিক পথে চলতে পারবে।

আল্লাহ-ই সব দো‘আ প্রার্থনাকারীর দো‘আ কবুল করেন, কেবল তাঁরই নিকট দো‘আ করে তাঁরই নিকট থেকে তাঁর জবাব পেতে চেষ্টা করা উচিত, এ কথাই বলা হয়েছে উক্ত আয়াতে। আল্লাহর নিকট কোনো মাধ্যম ছাড়া পৌছা যায়না বলে বিদয়াতীরা যে ধারণা সৃষ্টি করেছে তার মূলোৎপাটন করা হয়েছে এ আয়াতে। “দো‘আ কারীর দো‘আ আমিই কবুল করি” বলে আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিলেন যে, আল্লাহর নিকট দো‘আ করতে এবং দো‘আ কবুল করাতে কোনো অসীলার প্রয়োজন নেই। সঠিকভাবে আল্লাহর নিকট দো‘আ করতে পারলে আল্লাহ সরাসরিভাবেই তা কবুল করে থাকেন। “আমারই জবাব পেতে চাওয়া কর্তব্য” বলে আল্লাহ বুঝিয়ে দিলেন যে, যে লোক দো‘আ করবে তার মনে এ দো‘আ কবুলের জন্য বিশেষ আগ্রহ, উৎসাহ ও আবেগ থাকা বাঞ্চনীয়। এ জিনিস অপরের দ্বারা হয়না, অসীলা কিছুই করতে পারেনা। আর ‘‘আমার প্রতিই ঈমান রাখা উচিত” বাক্য দ্বারা বলে দিলেন যে, আমার এই ঘোষণাকে মনে রেখে আল্লাহকে আপনার অতি নিকটে বলে বিশ্বাস করা কর্তব্য। কোনো মাধ্যমের ধোঁকায় পড়ে গিয়ে সরাসরি আল্লাহর নিকট দো‘আ করার পরিবর্তে কোনো মাধ্যমের আশ্রয় গ্রহণের বিভ্রান্তিতে পড়া উচিত নয়। আয়াতের শেষ শব্দেও এ পথকেই সত্যিকার বিদয়াতের পথ বলে ঘোষণা করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, আল্লাহর নৈকট্য লাভের একমাত্র উপায় হলো, আল্লাহর নিকট কাতরভাবে দো‘আ করা ও এই বিশ্বাস মনে রাখা যে, আল্লাহ-ই আমার দো‘আ কবুল করবেন।

অপর এক আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা আরো জোরালোভাবে ঘোষণা করেছেনঃ

وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ ۚ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ [٤٠:٦٠]

- তোমাদের আল্লাহ বলেছেনঃ তোমরা আমাকেই ডাকো, আমারই নিকট দো‘আ করো, আমিই তোমাদের জবাব দেবো-দো‘আ কবুল করবো। যে সব লোক আমার ইবাদত করার ব্যাপারে অহংকার করবে, তাদের সকলকে জাহান্নামে একত্রিত করা হবে। (আল মোমেনঃ60)

এখানেও আল্লাহকে সরাসরি ডাকার-সরাসরিভাবে আল্লাহর নিকট দো‘আ করার নির্দেশ। আর আয়াতের দ্বিতীয় অংশে এই দো‘আ কেই আল্লাহর ইবাদত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ যারা সরাসরিভাবে আল্লাহর নিকট দো‘আ করেনা, অসীলা ধরে অগ্রসর হতে চায়, তারা একান্তভাবে আল্লাহর ইবাদত করতে প্রস্তুত নয়, তারা  যে জাহান্নামে যাবে  তাতে আর কোনোই সন্দেহ থাকতে পারেনা। মক্কার কাফিরদের তো এই অপরাধই ছিলো যে, যার জন্য তারা জাহান্নামী হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

কোরআন মজীদের এসব আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য, নিজেদের দো‘আ কবুল করবার জন্যে এবং ইসলামী শরীয়ত মোতাবিক আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী করবার জন্য কোনো ‘অসীলার’ আদৌ কোনো প্রয়োজন নেই এবং আল্লাহর নিকট তা পছন্দনীয়ও নয়। বরং আল্লাহতো চান বান্দা সরাসরিভাবে তাঁরই দিকে রুজু হোক, তাঁরই নিকট আত্মসমর্পণ করুক; তাঁর পরিবর্তে অন্য কারো নিকট দরবারে কপাল লুটানো ত্যাগ করুক। কিন্তু পরবর্তীকালে মুসলিম সমাজে ইসলামেরই দোহাই দিয়ে প্রবর্তন করা হয়েছে ‘অসীলা’। অসীলা ছাড়া আল্লাহকে পাওয়ার নাকি আর কোনো উপায়-ই নেই-এমন প্রচারণা চালানো হয়েছে। ইসলামের তওহীদী ব্যবস্থায় এই ‘অসীলা’র প্রচলন এক অতি বড় বিদয়াত এবং এ বিদয়াত তওহীদবাদিদের কঠিন শিরক-এ নিমজ্জিত করে ছেড়েছে। বিদয়াতীদের দরবার থেকে ফতোয়া জারি করা হয়েছেঃ আল্লাহ প্রাপ্তির জন্য অথবা আল্লাহপাকের অনুগ্রহ লাভের উদ্দেশ্যে অসীলা অবলম্বন করা কেবলমাত্র জায়েজই নয়; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফরয ও ওয়াজিবও বটে।

বস্তুত যা কুরআন থেকে প্রমাণিত নয়, যা রাসূলের কথা, কাজ ও অনুমোদন দ্বারা প্রমাণিত নয়-তাকে ফরয, ওয়াজিব বলাই হলো বিদয়াত। উপরোল্লিখিত অংশ এই বিদয়াতেরই সপক্ষে এক বিশেষ ফতোয়া। এই বিদয়াত এখন জনগণের একাংশকে গ্রাস করে রয়েছে। তাদের মধ্যে কারো ধারণাঃ “আমরা নামায রোজা করিনা; কেননা আমরা পীরকে ধান দিয়ে থাকি”। (নাউজুবিল্লাহ)

তার মানে পীরকে ধান দিলে পীর তো খুশি হবে। আর পীর খুশি হলে আল্লাহও খুশি হবেন। তাহলে আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী করার আর প্রয়োজন কি? আল্লাহকে পাওয়ার জন্য পীরকে ধান দেয়া-ভেট দেয়াই –নাকি যথেষ্ট।

আবার অন্য কিছু লোকের ধারণা যে, পীর সাহেব যে বেহেশতে যাবেনই একথা তো নিশ্চিত-যেন তারা আল্লাহর কাছ থেকে জানতে পেরেছে যে, পীর সাহেব একজন বেহেশতী হয়েই আছেন। অথচ এ ধারণা চরম বাতুলতা ছাড়া আর কিছুই নয়। কেননা যাকে এরূপ মর্যাদা দিয়ে তার হাত হাত রাখা হচ্ছে, তার পক্ষে অন্যদের বেহেশতে নিয়ে যাওয়া তো দূরের কথা, সে নিজেই যে বেহেশতে যাবে তারও কোনোই ঠিক ঠিকানা নেই।

অসীলাবাদীরা তাদের মতের সমর্থনে কোরআনের একটি আয়াতের অংশও পেশ করে থাকেঃ সে আয়াতাংশ হচ্ছে-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الْوَسِيلَةَ

-হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা ভয় করো আল্লাহকে এবং তাঁর নিকট অসীলার সন্ধান করো।

 আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহকে ভয় করে তাঁর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করতে। কিন্তু কুরআনের আয়াতের মূল প্রতিপাদ্য কথার সম্পূর্ণ বিপরীত কথা প্রমাণ করতে চেষ্টা করা হয়েছে এভাবে এ আয়াতকে ব্যবহার করে। প্রথম কথা, অসীলাবাদীরা এ আয়াতকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করেনি, আয়াতটির শুধু একটি অংশকে নিজেদের কথা প্রমাণের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ পূর্ণ আয়াতের অর্থ হয় এক, আর আয়াতের একটি অংশ পেশ করে নিজেদের মতলব মতো সম্পূর্ণ ভিন্ন কথাও বলতে চেষ্টা করা যেতে পারে। এখানে ঠিক তাই হয়েছে।

সম্পূর্ণ আয়াতটি এইঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الْوَسِيلَةَ وَجَاهِدُوا فِي سَبِيلِهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ [٥:٣٥]

-হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তাঁর নিকট অসীলার সন্ধান করো এবং জিহাদ করো তাঁর পথে। সম্ভবত তোমরা কল্যাণ লাভ করতে পারবে। (আল মায়েদাঃ35)

প্রখসে প্রমাণ করতে হবে-‘অসীলা’ শব্দের অর্থ কি, কুরআনের এ আয়াতে কোন্ অর্থে ‘অসীলা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। তারপরই এ আয়াতের যথার্থ বক্তব্য বুঝতে পারা যাবে। আমরা তাই দেখছি, কুরআন মজীদে এই ‘অসীলা’ শব্দটি এ আয়াত ছাড়া আরো একটি আয়াতে-মোট দুই জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছে।

অপর আয়াতটি হলো এইঃ

قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُم مِّن دُونِهِ فَلَا يَمْلِكُونَ كَشْفَ الضُّرِّ عَنكُمْ وَلَا تَحْوِيلًا [١٧:٥٦]

أُولَٰئِكَ الَّذِينَ يَدْعُونَ يَبْتَغُونَ إِلَىٰ رَبِّهِمُ الْوَسِيلَةَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ وَيَرْجُونَ رَحْمَتَهُ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ ۚ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحْذُورًا [١٧:٥٧]

-বলো! তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের মা’বুদ বলে মনে করো, তাদের একবার ডাকো, তারা তোমাদের থেকে বিপদ ও কষ্ট দূর করতে কিংবা তা বদলে দেবার কোনো ক্ষমতা রাখেনা। এই লোকেরা যাদের ডাকে, তারাই তাদের পরোয়ারদিগারের নিকট নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধান করে যে, তাদের মধ্যে কে আল্লাহর অধিক নিকটবর্তী, তাঁর রহমতের তারা আশা করে, তাঁর আযাবকে তারা ভয় করে। নিশ্চয়ই আল্লাহর আযাব ভয় করার যোগ্য।

(বনী ঈসরাইলঃ 56-57)

এ দু জায়গায় যে ‘অসীলা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে তার অর্থ কি? কুরআন মজীদের শব্দ ব্যাখ্যাকারী লেখক সর্বজনমান্য মনীষী আল্লামা রাগেব ইসফাহানী এ শব্দের অর্থ লিখেছেন এভাবেঃ অসীলা মানে কোনো জিনিসের নিকট আগ্রহ সহকারে পৌছা। এর মধ্যে আগ্রহের ভাব বলে তা অসীলা বা পৌছা অপেক্ষা একটু বিশেষ অর্থজ্ঞাপক।

তিনি তাঁর খতীব নামক গ্রন্থে লিখেছেনঃ ‘অসীলা’ বিশেষ্য অর্থাৎ নৈকট্য, নিকটবর্তী হওয়া, নৈকট্য লাভের উপায় অর্থাৎ আনুগত্য।

আল্লামা কুরতবী তাফসীরে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেনঃ ‘অসীলা’ শব্দের অর্থ হলো নৈকট্য। আর এ অর্থই বর্ণিত হয়েছে আবু অয়েল, হাসান, মুজাহিদ, কাতাদাহ, আতা, সুদ্দী, ইবনে যায়দ ও আবদুল্লাহ ইবনে কাসীর প্রমূখ তাবেয়ী ও কুরআনবিদ মনীষীদের কাছ হতে।

তিনি আরো লিখেছেনঃ অসীলা হলো এমন নৈকট্য যার দরুণ কারো কাছে কোনো কিছু চাওয়া বাঞ্চনীয় নয়। চাওয়া যেতে পারে আল্লাহর নিকট, কাজেই এ নৈকট্যও আল্লাহরই হতে হবে।

ইমাম সুয়ূতী প্রথমোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেনঃ অসীলা হচ্ছে সেই আনুগত্য-ইবাদাত, যা তোমাদেরকে তাঁর নিকটবর্তী করে দেয়।

মওলানা আবদূর রশীদ নোমানী ‘লাগাতুল কুরআন’ এ লিখেছেনঃ শব্দটি সম্পর্কে দু’ধরনের মত রয়েছে। খতীব ও ইমাম রাযীর মতে এর অর্থ নৈকট্য লাভের উপায়। আর ইমাম সুয়ূতী এর দু’প্রকারের অর্থ করেছেন। একটি হলো-নৈকট্যের উপায় মানে ইবাদাত আর অপরটি হলো খোদ নৈকট্য যা ইবাদাত এর সাহায্যে লাভ করা যায়।

ইমাম শাওকানী লিখেছেনঃ ‘অসীলা’ মানে নৈকট্য, যা সন্ধান করা উচিত।

আবু ওয়ায়েল, হাসান, মুজাহিদ, কাতাদাহ, সুদ্দী, ইবনে যায়দ প্রমুখ মনীষী এই মতই প্রকাশ করেছেন এবং হযরত ইবনে আব্বাস, আতা ও আবদুল্লাহ ইবনে কাসীর হতেও একই মত বর্ণিত হয়েছে।

তাফসীরে ফতহুল বয়ানেও এই কথাই বলা হয়েছে। তাতে লেখা হয়েছেঃ অসীলা জান্নাতের একটি বিশেষ মর্যাদা, যা রাসূলের জন্য বিশেষভাবে নির্দিষ্ট।

বুখারী শরীফে হযরত জাবির হতে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম(স) বলেছেনঃ আযান শুনে যে লোক বলবে-হে আল্লাহ! এই পূর্ণ দাওয়াতের ও কায়েম করা নামাযের রব্ব তুমি মুহাম্মাদ কে ‘অসীলা’ দান করো, মর্যাদা দান করো এবং তাঁকে সেই মাকামে মাহমুদে পাঠাও, যার ওয়াদা তুমি তাঁকে করেছ, কিয়ামাতের দিন এই লোকের শাফায়াত অনিবার্য্ হবে।

মুসলিম শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি নবী করীম(স) কে বলতে শুনেছেনঃ তোমরা মুয়াযযিনের আযান শুনতে পেলে সে যা যা বলে তোমরাও তাই বলতে থাকে। পরে আমার প্রতি দুরুদ পাঠ করো। বস্তুত যে লোক আমার প্রতি এক দুরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার প্রতি দশ দুরুদ পাঠাবেন।

অতঃপর তোমরা আমার জন্য অসীলার সওয়াল করো। কেননা এ হচ্ছে জান্নাতের একটি বিশেষ মঞ্জিল।

‘ফতহুল বয়ান’ গ্রন্থে অসীলা শব্দের প্রথম অর্থের ব্যাখ্যায় লেখা হয়েছেঃ এ কথা সুস্পষ্ট যে-অসীলা-যার মানে নৈকট্য-তাকওয়ার অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে, তাকওয়া ছাড়াও এমন সব গুনাবলী যার সাহায্যে বান্দাগণ তাদের আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা বোঝায়। কেউ কেউ বলেছেন-অসীলা অর্থ প্রেম-ভালোবাসা অর্থাৎ তোমরা আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা পোষণ করো। কিন্তু প্রথম অর্থই উত্তম।

আল্লামা ইবনে কাসীর তাঁর তাফসীরে প্রথম আয়াতের ব্যাখ্যায় যা লিখেছেন তার তরজমা এইঃ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে তাঁর প্রতি তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। আর তাঁকওয়াকে যদি তাঁর আনুগত্যের সংগে মিলিয়ে দেয়া যায় তাহলে তার অর্থ হবে হারাম কাজ হতে বিরত থাকা এবং যাবতীয় নিষিদ্ধ কাজ ত্যাগ করা। আর তারপরই বলেছেন-তাঁর নিকট অসীলা সন্ধান করো।

অতঃপর লিখেছেনঃ সুফিয়ান সওরী তালহা থেকে, তালহা আতা থেকে এবং আতা ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে, এই ‘অসীলা’ মানে নৈকট্য।

আবু ওয়ায়েল, হাসান, মুজাহিদ, কাতাদাহ, সুদ্দী, ইবনে যায়দ, আবদুল্লাহ ইবনে কাসীর প্রমুখ প্রখ্যাত প্রাচীন মনীষীগণও এই মতই প্রকাশ করেছেন এবং কাতাদাহ্ এ আয়াতের তরজমা করেছেন এভাবেঃ

অর্থাৎ তাঁর দিকে তোমরা নৈকট্য লাভ করো, তাঁর আনুগত্য করো এবং যে কাজে তিনি সন্তুষ্ট হন তা করো।

তারপরই আল্লামা ইবনে কাসীর লিখেছেনঃ ইলমে কুরআনের এই ইমামগণ ‘অসীলা’ শব্দের অর্থ যা কিছু বলেছেন, সে বিষয়ে মুফাসসিরদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই।

তিনি ‘অসীলা’ শব্দের আরো ‍দুটো অর্থ লিখেছেন।

একটি হলোঃ অসীলাতা, যার সাহায্যে মূল লক্ষ্যে পৌছা যায়।

আর দ্বিতীয়ঃ অসীলা জান্নাতের এক উচ্চতর মঞ্জিলের নামও। আর তা হচ্ছে রাসূলে করীম(স) এর মরতবা।

অসীলার এই অর্থের সমর্থনে ইমাম ইবনে কাসীর বহু সংখ্যক হাদীস উদ্বৃত করেছেন। হযরত আলী(রা) বর্ণিত এই পর্যায়ের একটি হাদীসের ভাষা হলোঃ জান্নাতে একটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ স্থান আছে যাকে বলা হয় ‘অসীলা’। তোমরা যখন আল্লাহর নিকট কিছু চাইবে তখন তোমরা আমার জন্য অসীলার প্রার্থনা করবে।

আর এ আয়াতের শেষাংশের তাফসীরে লিখেছেনঃ

আল্লাহ যখন হারাম কাজ ত্যাগ করার ও ইবাদাত আনুগত্যের কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দিলেন, তখন সীরাতাল মুস্তাকিম-বহির্ভূত কাফির মুশরিক শত্রু বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিলেন।

ইমাম বায়জাবী এ আয়াতের তাফসীরে লিখেছেনঃ

অর্থাৎ সন্ধান করো সেই জিনিস যার সাহায্যে তোমরা তাঁর সওয়াব এবং তাঁর নৈকট্য লাভ করতে পারো। আর তা হচ্ছে আল্লাহর আনুগত্যমূলক কাজ করা এবং নাফরমানীমূলক কাজ ত্যাগ করা।

আল্লামা যামাখশারী লিখেছেনঃ অসীলা হচ্ছে এমন জিনিস, যার দ্বারা কোনোরূপ নৈকট্য লাভ করা যায় বা এমন কোনো কাজ কিংবা অন্য কিছু। পরে তা ব্যবহার করা হয়েছে সে জিনিস বোঝাবার জন্য, যা দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা পর্য্ন্ত পৌছানো যায়। তা হচ্ছে ইবাদাত ও আনুগত্যের কাজ করা এবং নাফরমানী ত্যাগ করা। আল্লামা আবুস সয়ুদও এ আয়াতের তাফসীরে একই কথা বলেছেন নিজস্ব ভাষায়।

তাতে অসীলা সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ ‘অসীলা’ তা, যা দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়-আল্লাহ পর্যন্ত পৌছা যায়। আর তা হচ্ছে ইবাদাত আনুগত্যের কাজ করা এবং নাফরমানী ত্যাগ করা।

তিনি আরো লিখেছেনঃ আয়াতের এরূপ অর্থও করা হয়েছে-প্রথম বাক্যে আল্লাহকে ভয় করো বলে গুনাহ ও নাফরমানী ত্যাগ করতে বলা হয়েছে। আর দ্বিতীয় বাক্যে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধান করো বলে আল্লাহর ইবাদাত ও আনুগত্য অবলম্বন করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর যে লোকই নাফরমানীর কাজ ত্যাগ করবে এবং মনের পক্ষে দুঃসহজনক কাজ সম্পন্ন করবে তার কিছু না কিছু কষ্ট ও শ্রম অবশ্যই হবে। তাই এ দু’টি আদেশের পরপর আল্লাহর আদেশ হলো-আল্লাহর পথে জিহাদ করো আল্লাহর প্রকাশ্য ও শক্ত দুশমনদের সাথে যুদ্ধ করে।

আল্লামা সাইয়েদ মাহমুদ আলুসীও এ আয়াতের ব্যাখ্যায় অনেক কথা বিস্তারিতরূপে আলোচনা করেছেন। তিনি সূরা আল মায়েদার উপরোল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেনঃ এবং তালাশ করো-সন্ধান করো তোমাদের নিজেদের জন্য তাঁর সওয়াব এবং তাঁর নৈকট্য।

আর ‘অসীলা’র অর্থ লিখেছেনঃ অসীলা তা, যার সাহায্যে পৌছা যায় এবং আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া যায়, তা হলো ইবাদত বন্দেগীর কাজ করা ও নাফরমানীর কাজ ত্যাগ করা।

আল্লামা ইবনে জরীর তারাবী লিখেছেনঃ আল্লাহর নিকট আমল সহকারে নৈকট্য পেতে চাও, যা তাঁর সন্তোষের কারণ হবে, ‘অসীলা’, ‘ফাযীলা’ ওজনের শব্দে। যেমন কেউ বলে, ‘আমি তার নিকটবর্তী হলাম’ এতে তাওয়াসসূল ‘তাকাররূব’ অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। ‘তাওয়াসালতু ইলাইহি’ মানে আমি তার নিকটবর্তী হলাম।

তিনি আরো লিখেছেনঃ আমরা যেমন বলেছি, শব্দের ব্যাখ্যাকার ও তাৎপর্য্ বিদগণ এ অর্থই গ্রহণ করেছেন। বাশশার ও সুফিয়ান আবু ওয়েল থেকে বর্ণনা করেছেন, ‘ওয়াবতাগু ইলাইহিল অসীলাতা’ বলে আমলের নৈকট্য লাভের হুকুম করা হয়েছে। সুফিয়ান, আবু তালহা, আতা প্রমুখও এ ব্যাপারে অর্থ করেছেন নৈকট্য। কাতাদাহ থেকে বর্ণিতঃ তিনি এ আয়াতের তরজমা করেছেন এভাবেঃ ‘আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁর পছন্দমতো কাজ করে আল্লাহর নিকটবর্তী হও।’ হুযায়ফা থেকে বর্ণিত, মাশীদ আবু নজীহ বলেছেন যে, মুজাহিদ ‘ওয়াবতাগু ইলাইহিল অসীলাতা’র অর্থ করেছেন নৈকট্য।

আল্লামা ফখরুদ্দীন রাযী লিখেছেনঃ আল্লাহর নিকট ‘অসীলা’ তালাশ করো অর্থ-আমলের সাহায্যে আল্লাহর নৈকট্য তালাশ করো।

আল্লামা আলুসী বলেছেনঃ ইবনুল আনবারী ইবনে আব্বাসের কথা উদ্বৃত করে বলেছেন-অসীলা মানে প্রয়োজন, আবশ্যকতা।

এ অর্থের দিক দিয়ে আয়াতের অর্থ হবেঃ তোমরা আল্লামুখী হয়ে তোমাদের প্রয়োজন পূরণ করতে চাও। কেননা আসমান জমিনের সব চাবিই তাঁর হস্তে এবং আর কারো প্রতি মুখাপেক্ষী হয়ে তোমরা প্রয়োজন পূরণ করতে চেওনা।

‘অসীলা’ শব্দের এ অর্থটি বলা যায় নতুন। অর্থাৎ অপর কোনো মুফাসসীর তা উল্লেখ করেননি। তবু বলা যায়- মূল আরবী অভিধান, সব সাহাবী, তাবেয়ী এবং প্রামাণ্য সব কয়খানি তাফসীরই ‘অসীলা’ শব্দের অর্থ এই হতে পারে, অন্য কিছু নয়। অন্য কিছু অর্থ করা হলে তা হবে পরবর্তীকালের লোকদের মনগড়া। মূল কোরআন হাদীস ও আরবী ভাষার সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। এ আয়াতের ভিত্তিতে জানা গেল যে, এ আয়াতে আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য ‘অসীলা’ সন্ধানের যে নির্দেশ আল্লাহ তা‘আলা দিয়েছেন, তার মানে হলো আল্লাহরই আনুগত্য করা, কেবল তাঁরই ইবাদত বন্দেগী করা এবং তাঁর নাফরমানী না করা। কিংবা নিজেদের প্রয়োজন কেবল আল্লাহর নৈকট্যের থেকে পূরণ করতে চাওয়া অন্য কারো নিকট থেকে নয়। অপর কাউকে অসীলা বা মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারেনা, করা হলে তা হবে শিরক আর বিদয়াত। এই শিরক এর পথ চিরতরে বন্ধ করার জন্যই আল্লাহর এই আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই আয়াতকেই পেশ করা হচ্ছে অসীলার শিরককে সুষ্ঠু-জায়েয-ওয়াজিব-ফরয প্রমাণ করার কুমতলবে। আর এই পর্যায়ে ‘হেসনে হাসীন’ ‘আল-মুহান্নাদ’ আর ‘শেফাউস-সেকাম’ ধরনের কিতাবাদিতে লিখিত কথা পেশ করে তওহীদের এই চিরন্তন শাশ্বত আকীদাকে বিকৃত ও বিনষ্ট করতে চেষ্টা করা হচ্ছে।

কুরআনের যে দুটো আয়াতে এ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, সমস্ত মুফাসসির এ সম্পর্কে একমত যে, উভয় জায়গায়ই এ শব্দের এ অর্থই লক্ষ্যভূত হয়েছে, অন্য কোনো অর্থ নয়। আর বিস্তারিত আলোচনার দৃষ্টিতে গোটা আয়াতের অর্থ হলোঃ ‘হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, ভয় করো আল্লাহর নৈকট্য বা নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধান করো এবং এ জন্যই আল্লাহর পথে জিহাদ করো।’ (ইমাম কুরতবী, ইমাম ইবনে কাসীর, ইমাম শাওকানী প্রমূখ তাঁদের তাফসীরসমূহে এই একই কথা বলেছেন যার বাংলা তরজমা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে)।

আর হাদীসে ব্যবহৃত ‘অসীলা’ শব্দের অর্থ আল্লাহর এক বিশেষ মঞ্জিল। শরীয়তে এ অর্থকেই গ্রহণ করা হয়েছে। এখন দেখতে হবে, আল্লাহর নিকট অসীলা বানানোর শরীয়তসম্মত পন্থা ও পদ্ধতি কি? এ পর্যায়ে কয়েকটি জিনিস পেশ করা হচ্ছে।

প্রথমতঃ আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য অসীলা গ্রহণ সম্পূর্ণরূপে কুরআন হাদীসসম্মত। আল্লাহ নিজেই ইরশাদ করেছেনঃ

وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَىٰ فَادْعُوهُ بِهَا ۖ

-আল্লাহর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। অতএব তোমরা সে নাম ধরে ধরে তাঁকে ডাকো।(আল আরাফ 180)।

হাদীসে বর্ণিত রয়েছে, আবদুল্লাহ তাঁর পিতা বরিদা(রা) হতে বর্ণনা করেছেনঃ নবী করীম(স) এক ব্যক্তিকে নিম্নোক্ত ভাষায় দোআ করতে শুনতে পেলেন।

-হে আল্লাহ আমি তোমার নিকট প্রার্থনা করছি এ দিক দিয়ে যে, তুমিই আল্লাহ, তুমি ছাড়া কেউ মাবুদ নেই, তুমি পরমুখাপেক্ষীহীন, যিনি নিজে পয়দা হননি, জন্মও দেননি এবং কেউ তাঁর সমান সমকক্ষ নেই।

তখন নবী করীম(স) বললেন-এ লোকটি আল্লাহর নিকট তাঁর এমন বিরাট মহান নাম নিয়ে দো‘আ করল যে, এভাবে কিছু প্রার্থনা করলে নিশ্চয়ই কিছু দেয়া হবে, আর দোআ করা হলে তা অবশ্যই কবুল করা হবে।

হযরত আনাস ইবনে মালিক(রা) ও হযরত আয়েশা(রা) হতে বর্ণিত হাদীসেও এর সমর্থন পাওয়া যায়।

দ্বিতীয়ঃ নেক আমলের অসীলা। এ পর্যায়েও কুরআন হাদীসের দলীল বর্তমান। কুরআনের দলীল হচ্ছে সে দুটো আয়াত যাতে অসীলা শব্দের উল্লেখ রয়েছে। কেননা দুটো আয়াতেই ‘অসীলা’ শব্দের মানে ‘নৈকট্য’ হওয়া সম্পর্কে সমস্ত মুফাসসিরের ইজমা রয়েছে। এ পর্যায়ের তৃতীয় দলীল হচ্ছে সূরা ফাতিহার আয়াত  إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُকেবল তোমারই বন্দেগী করি, কেবল তোমারই নিকট সাহায্য চাই হে আল্লাহ! এতে সাহায্য প্রার্থনা এর পূর্বে ইবাদত এর উল্লেখ করাই হয়েছে প্রথমটিকে দ্বিতীয়টির অসীলা বানানোর জন্য।

হাদীসে এর দলীল হলো বুখারী শরীফে উল্লিখিত সেই কাহিনী, যাতে বলা হয়েছে –তিনজন লোক বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য পর্বত গুহায় আশ্রয় নেয়। অমনি এক বিরাট শিলাখন্ড এসে পর্বতগুহীর মুখ বন্ধ করে দেয়। মুক্তির কোনো পথ নেই মনে করে তারা প্রত্যেকেই নিজের নিজের নেক আমলের উল্লেখ করে আল্লাহর নিকট মুক্তির প্রার্থনা করতে লাগলো। পরে তাদের দোআ আল্লাহর দরবারে কবুল হয় এবং তারা মুক্তি লাভ করে। নবী করীম (স) এই ঘটনার উল্লেখ করেছেন প্রশংসাচ্ছলে এবং গুণ বর্ণনা প্রসঙ্গে।

এ হাদীস সম্পর্কে বলা যায়ঃ জুম’আর দিন যখন সূর্য্ যথেষ্ট পশ্চিমে ঢলে পড়বে, তখন দু’রাকাআত নামায পড়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করো। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা গেল যে, জুম‘আর নামায পড়লেও আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয়।

হাদীসে আরো বলা হয়েছেঃ এ কাহিনী থেকে প্রমাণিত হয় যে, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের আমলকে অসীলা বানাতে পারে; কিন্তু অপরের-নবী ও অলী-আল্লাহদের আমলের অসীলা গ্রহণের কোনো প্রমাণ এতে নেই।

বিশেষত বান্দার নিজের নেক আমলকে অসীলা বানিয়ে আল্লাহর নিকট দোআ করলে তাতে বান্দা আল্লাহর আরো নিকটতর হয়। আর এ কাজ কুরআন ও ইজমা উভয় দলীল মতেই শরীয়তসম্মত। এতে ব্যক্তির নফস পবিত্র হয় এবং আল্লাহর সন্তোষ লাভের যোগ্য হয়ে গড়ে ওঠে।

তৃতীয়ঃ নবী করীম(স)কে তাঁর নব্যুয়ত ও রিসালাতের ব্যাপারে সত্য বলে স্বীকার করে নিয়ে তাঁকে ‘অসীলা’ বানান। তিনি যে দ্বীন নিয়ে এসেছেন, তার প্রতি ঈমান এনে তাকে অসীলা ধরা। নবীর আদেশ নিষেধ মান্য করা এবং তাঁর সাহায্য করাকে অসীলা বানানো। তাঁর সুন্নাতকে পুনরুজ্জীবিত করা, তাঁর দাওয়াতকে জারী রাখা, সে বিষয়ে চিন্তা গবেষণা করা প্রভৃতিও অসীলা হতে পারে। এসব জিনিসকে অসীলা বানানো মূল দ্বীনের মুতাবিক কাজ। কেননা এ অসীলা বানানো ঠিক নেক আমলকে অসীলা বানানোর অন্তর্ভূক্ত।

চতূর্থঃ নবীর জীবদ্দশায় তাঁর দো’আকে অসীলা বানানো, দো’আর কাজে তাঁকে শরীক করা, তাঁকে দিয়ে আল্লাহর নিকট দো’আ করানো এবং তাঁর ইন্তেকালের পরে সময়ের যে কোনো নেক লোকের দ্বারা দো’আ করানো বা দো’আয় তাঁকে শরীক করা এবং তাঁর দো’আকে অসীলা মনে করা।

হাদীসে এর দলীল এই যে, হযরত উমর(রা) একবার দূর্ভিক্ষের সময় হযরত আব্বাস(রা)কে অসীলাস্বরূপ শামিল করে দো’আ করেছিলেন এই বলেঃ

হে আল্লাহ, আমার পূর্বে আামাদের নবীকে তোমার নিকট অসীলা বানাতাম। তখন তুমি আমাদের পানি দিয়ে সিক্ত করেছিলে। এখন আমরা তোমার নিকট দো’আ কবুল হবার জন্য তাঁর চাচাকে অসীলা বানাচ্ছি। অতএব তুমি আমাদের পানি দিয়ে সিক্ত করে দাও।

এখানে সুস্পষ্ট যে, এতদুপলক্ষে যে সামষ্টিক দো’আ অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে হযরত আব্বাসই দো’আকারীদের মধ্যে শরীক ও শামিল ছিলেন। তাঁকে দো’আয় অসীলা বানিয়েছিলেন, কেননা সাহাবীগণের মধ্যে তিনিই ছিলেন বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি। তাঁর মর্যাদা ছিল সকলের ওপর। হযরত মুআবিয়া(রা) ও তাঁর সঙ্গীরা ইয়াযীদ ইবনুল আসওয়াদ আল জকরীকে অসীলা বানিয়েছিলেন তাঁর নেক আমল ও তাকওয়া পরহেযগারীর জন্য। তাঁদের সকলের পক্ষে রওযায়ে পাকে যাওয়া ও রাসূল(সা) কে অসীলা বানানো কঠিন ছিলনা কিন্তু বানাননি। কাজেই এরূপ দো’আর কোনো দোষ হতে পারেনা তওহীদী সুন্নাতের দৃষ্টিতে, তা হতে পারেনা কোনো বিদয়াত। আরো কথা এই যে, নবী করীম(স) এর ইন্তিকালের পরে সাহাবায়ে কিরাম স্বয়ং রাসূল(স) কে দো’আর ক্ষেত্রে অসীলা বানাননি। কেননা মৃত লোককে সে নবীই হোননা কেন অসীলা বানানোকে তাঁরা বিদয়াত ও শিরক মনে করতেন। হযরত উমরের দো’আয় রাসূলে করীম(স) কে অসীলা না বানিয়ে অসীলা বানানো হয়েছিল তাঁর চাচা আব্বাসকে-যিনি জীবিত থেকে দো’আয় উপস্থিত ছিলেন। আর তাঁকে অসীলা বানানো থেকেই এ কথাটি স্পষ্ট হয়ে উঠে। এ দো’আয় বড় বড় সাহাবীগণও উপস্থিত ছিলেন কিন্তু তাঁরা কেউই এর প্রতিবাদ করেননি। তখনো যদি রাসূলকে অসীলা বানানো জায়েয হতো, তাহলে অন্যান্য সাহাবীরা তাঁকে তা-ই করতে বলতেন। কিন্তু তা কেউই বলেননি; বরং এ দো’আয় তাঁরা সকলেই শরীক হয়েছেন। আর রাসূলকেই যদি মৃত্যুর পর অসীলা বানানো বিদয়াত হয়ে থাকে, তাহলে অলী আল্লাহ কথিত মরে যাওয়া লোকদের কাউকে অসীলা বানানো তো একশ বার বিদয়াত হবে। কেননা মরে যাওয়ার পরও কাউকে বিশেষ ক্ষেত্রে দো’আয় অসীলা বানানোর মানে এই যে, তার সম্পর্কে ধারণা করা হচ্ছে যে, সে মরে গিয়েও এতদূর ক্ষমতা রাখে যে, সে বিপদগ্রস্ত লোকদের উদ্ধার করতে পারে বা উদ্ধার কাজে আল্লাহর সাথে শরীক হতে পারে। আর এরূপ আকীদাই তওহীদী শরীয়তের দৃষ্টিতে সুস্পষ্ট শিরক।

হাদীসে বর্ণিত আছে, এক বেদুঈন কঠিন দূর্ভিক্ষের সময় রাসূলে করীম(স) কে লক্ষ্য করে বলেছিলঃ আরবী (******)

-হে আল্লাহর রাসূল, ধন-মাল ধ্বংস হয়ে গেছে; পরিবার-পরিজন অভুক্ত হয়ে আছে। অতএব আপনি আমাদের জন্য দো’আ করুন।

আল্লাহর কুরআন মজীদেও এর দলীল রয়েছে। আল্লাহ নিজেই ইরশাদ করেছেনঃ

وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذ ظَّلَمُوا أَنفُسَهُمْ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَّحِيمًا [٤:٦٤]

-তারা যখন নিজেদের উপর জুলুম করেছিল তখন যদি তারা হে নবী! তোমার নিকট আসত এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতো আর রাসূলও তাদের জন্যে ক্ষমা চাইতো, তাহলে নিশ্চয়ই তারা আ্লাহকে তওবা কবুলকারী ও দয়াবান হিসেবে পেত।(আন নিসাঃ৬৪)

এ আয়াতে লোকদের জন্য রাসূলের ক্ষমা চাওয়ার পূর্বে তাদের নিজেদের ক্ষমা চাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তার অর্থ, তারা নিজেরা ক্ষমা না চাইলে তাদের জন্য রাসূলের ক্ষমা চাওয়ার কোনো মূল্য আল্লাহর নিকট নেই।

এ ধরনের অসীলা গ্রহণের ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই, থাকতে পারেনা। কিন্তু নবী করীম(স) এর মৃত্যুর পর তাঁর ব্যক্তিত্বকে আল্লাহর নৈকট্যের জন্য অসীলা বানানো স্পষ্ট বিদয়াত।

পঞ্চমঃ আল্লাহর নিকট তাঁর নেক বান্দাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দেখিয়ে দো’আ করা। যেমন হাদীসে হযরত আয়েশা(রা) হতে বর্ণিত হয়েছেঃ আরবী(******)

-হে আমাদের আল্লাহ, যিনি জীবরাঈল, মিকাঈল ও ইসরাফীলের রব্ব।

এরূপ দো’আ করা জায়েয মনে করা হলেও অনেকেই এটাকে নাজায়েয বলেছেন।

ষষ্ঠঃ নবী করীম(স)এর প্রতি দুরূদ পাঠানোকে অসীলা বানানো। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবু আওফা(রা) হতে বর্ণিত হয়েছে-নবী করীম(স) বলেছেনঃ আরবী(*******)

-আল্লাহর নিকট যার কোনো প্রয়োজন দেখা দিবে কিংবা কোনো মানুষের নিকট, সে যেন খুব ভালো করে অযূ করে এবং দু’রাকাআত নামায পড়ে, আল্লাহর ভালো প্রশংসা করে এবং নবীর প্রতি দুরূদ পাঠ করে, তারপর বলে আল্লাহ ধৈর্য্শীল ও অনুগ্রহ সম্পন্ন, তিনি ছাড়া কেউই মা‘বুদ নেই।

মোট কথা আল্লাহর নিকট দো’আ করার এসবই হলো ইসলাম ও সুন্নাত মোতাবিক নিয়ম। এছাড়া অন্য কোনো নিয়মে ও পন্থায় দো’আ করা ঈমানদার লোকদের পক্ষে জায়েয নয়।

সপ্তমঃ এরূপ দো’আ করাঃ

হে আল্লাহ, আমি তোমার নিকট তোমার অমুক নেক বান্দার দোহাই দিচ্ছি বা তার সম্মানের দোহাই দিয়ে তোমার নিকট দো’আ করছি।

কিন্তু এ ধরনের দো’আ শরীয়তে আদৌ সমর্থনযোগ্য নয়। ইজ্জ ইবনে আবদুস সালাম ও তাঁর অনুসারীদের মতে কেবল নবীর নামেই এরূপ দোহাই দেয়া জায়েয হতে পারে, অন্য কারো নামে জায়েয নয়। হাম্বলী মাযহাবে এরূপ দো’আ করা মাকরূহ তাহরীম। ‘কুদূরী’ প্রমুখ হানাফী মাযহাবের ফকীহগণ ইমাম আবু ইউসুফ হতে বর্ণনা করেছেনঃ

ইমাম আবু হানীফা(রা)বলেছেনঃ আল্লাহর নিকট, আল্লাহর নামে ছাড়া অন্য কারো দোহাই দিয়ে দো’আ করা কারো পক্ষেই উচিত হতে পারেনা।

‘হে আল্লাহ, তোমার আরশের মর্যাদা বন্ধনের দোহাই দিয়ে তোমার নিকট প্রার্থনা করি; অমুকের দোহাইতে দো’আ করি; তোমার নবী ও রাসূলগণের দোহাই দিয়ে দো’আ করি বা তোমার মহান ঘরের দোহাই দিয়ে দো’আ করি’, এরূপ বলে দো’আ করাকেও আমি মাকরূহ মনে করি।

ইমাম আবু হানীফা(রহ) হতে তাতারখানিয়া এবং তাঁর থেকে কিতাবে আল আলায়ী উদ্ধৃত করে বলেছেনঃ আল্লাহু সুবহানাহুর নিকট তাঁর নিজের দোহাই ছাড়া অপর কারো দোহাই দিয়ে(অসীলা বানিয়ে)দো’আ করা কিছুতেই উচিত নয়।

ইমাম বদলজী বলেছেনঃ আল্লাহর নিকট আল্লাহ ছাড়া অপর কারো অসীলায় দো’আ করা মাকরূহ। আর ‘হে আল্লাহ তোমার নিকট তোমার ফেরেশতা ও নবীগণের অসীলায় প্রার্থনা করি’ বলবেনা কখনো।

হানাফী মাযহাবের সব কিতাবেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবী-রাসূল ও অলী-পীর বা আল্লাহর ঘর ইত্যাদিকে অসীলা করে দো’আ করা মাকরূহে তাহরীম। আর জাহান্নামের আযাবের দিক দিয়ে মাকরূহে তাহরীম হারামের সমান্।

আল্লাহর নিকট অপর কারো দোহাই দিয়ে দো’আ করা বা অপর কাউকে অসীলা বানানো হারাম কেন? হারাম এজন্য যে- মাখলুকের মধ্যে কারোই কোনো হক্ নেই সৃষ্টিকর্তার ওপর। তাই এই দোহাই চলতে পারেনা। দোহাই দিলে বা কাউকে অসীলা বানালে তা হবে অর্থহীন।কাজেই মুসলিম সমাজে এরূপ করা সুস্পষ্টরূপে বিদয়াত।

মক্কার কাফির মুশরিকগণ যে সব মূর্তি দেব-দেবী উপাসনা করতো আল্লাহ আছেন-তিনি এক ও একক-একথা জানা থাকা এবং তার স্বীকৃত দেয়া সত্ত্বেও। তাদেরও তো মূল লক্ষ্য সেগুলোর পূজা-উপাসনা ইবাদত ছিলনা, মূল লক্ষ্য ছিল একমাত্র আল্লাহর নৈকট্য লাভ, আল্লাহর নিকট ঘনিষ্ট হওয়া, উচ্চতর মর্যাদা পাওয়া। মূর্তি ও দেব-দেবীর পূজা-উপাসনাকে তারা সেই লক্ষ্যে পৌছার মাধ্যমে বা অসীলা রূপেইতো গ্রহণ করেছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের এ কাজকে আল্লাহ শিরক বলেছেন, তাদেরকে হেদায়াতবঞ্চিত ও মিথ্যাবাদী কাফির বলে আখ্যায়িত করেছেন। নিম্নোদ্ধৃত আয়াতটিতে সে কথাই বলা হয়েছেঃ

أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ ۚ وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَىٰ إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ فِي مَا هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَاذِبٌ كَفَّارٌ [٣٩:٣]

(আঝ ঝুমারঃ৩)

-জেনে রাখো, আল্লাহর জন্য তো খালিস অবিমিশ্র আনুগত্য হতে হবে। আর যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যান্যদের বন্ধু পৃষ্ঠপোষকরূপে গ্রহণ করে এই বিশ্বাস পোষণের দাবি নিয়ে যে, আমরা তো আসলে ওদের ইবাদত করিনা- ওদের প্রতি যা কিছু করি, তা তো এই উদ্দেশ্যে যে, ওরাই আমাদেরকে আল্লাহর অতি ঘনিষ্ট নৈকট্যে পৌছে দেবে(তাদের এই কথা অসত্য, অযথার্থ) আল্লাহই তাদের পারস্পরিক মত-পার্থক্যের ব্যাপারাদির চূড়ান্ত মীমাংসা করে দিবেন। মনে রেখো আল্লাহ কখনোই মিথ্যাবাদী চরম মাত্রার কাফিরকে হেদায়াত দেননা।

এ আয়াতের আলোকে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে যে, সেকালের  আরব জনগণ আল্লাহকে পাওয়ার, তাঁর নৈকট্য অর্জনের লক্ষৌ মূর্তি ও দেব-দেবীর প্রতি যে আচরণ করতো, আজকের দিনের সে প্রকৃতির লোক আল্লাহর নৈকট্য লাভের লক্ষ্যে পীর-দরবেশদের প্রতি ঠিক সেই আচরণই গ্রহণ করেছে। এ দু’টির মধ্যে মৌলিক কোনেই পার্থক্য নেই। তাহলে আরবদের সেই কাজ যদি শিরক গণ্য হয়ে থাকে এবং তাদের মৌলিক দাবিকে আল্লাহ অসত্য ধরে নিয়ে তাদের স্পষ্ট ভাষায় মিথ্যাবাদী বলে থাকেন। তাহলে আজকের দিনের এই অসীলা গ্রহণকারী লোকেরা আল্লাহর নিকট মিথাবাদী আখ্যায়িত হবেনা কেন? আর তাদেরকে যদি কেবল এজন্যই কাফির বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে, তাহলে আজকের দিনের এইসব বড় বড় অসীলা গ্রহণকারী লোকেরা ‘কাফির’ বলে অভিহিত হবেনা কেন?

আল্লাহর নিকটি কি সেকাল ও একাল এবং আরব ও এদেশের লোকদের মধ্যে কোনোরূপ পার্থক্য বা তারতম্য আছে?

অত্যন্ত খারাপ কথা, যা তারা বলছে বা মনে করছে।

 

পীর-মুরীদীর বিদয়াত

ইসলামের সুন্নাতের আদর্শে আর একটি মারাত্মক ধরনের বিদয়াত দেখা দিয়েছে- তা হলো পীর-মুরীদী। পীর-মুরীদীর যে ‘সিলসিলা’ বর্তমানকালে দেখা যাচ্ছে, এ জিনিস সম্পূর্ণ নতুন ও মনগড়াভাবে উদ্ভাবিত। এ জিনিস রাসূলে করীম(স) এর যুগে ছিলনা, তিনি পীর-মুরীদী করেননি কখনো। তিনি নিজে বর্তমান অর্থে না ছিলেন পীর আর না ছিলেন সাহাবায়ে কিরাম তাঁর মুরীদ। সাহাবায়ে কিরামও এ পীর-মুরীদী করেননি কখনো। তাঁদের কেউই কারো পীর ছিলেননা এবং কেউ ছিলেননা তাঁদের মুরীদ। তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীন এর যুগেও এ পীর-মুরীদীর নাম চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়না।

শুধু তা-ই নয়। কুরআন হাদীস তন্ন তন্ন করে খুঁজেও এ পীর-মুরীদীর কোনো দলীলের সন্ধান পাওয়া যাবেনা। অথচ বর্তমানে এক শ্রেণীর পীর নামের কথিত জাহেল লোক ও তাদের ততোধিক জাহেল মুরীদ এ পীর-মুরীদীকে দ্বীন ইসলামের অন্যতম ভিত্তিগত জিনিস বলে প্রচারণা চালাচ্ছে। আর এর মাধ্যমে অজ্ঞা মূর্খ লোকদের মুরীদ বানিয়ে এক একটি বড় আকারের ব্যবসা ফেঁদে বসেছে। যদিও তাতে কোনো মূলধন বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়নি এবং বিপুল লাভজনক ব্যবসায়ে সঞ্চিত মূলধনে কোনো আয়করও দিতে হয়না। আর সঞ্চিত নগদ বিপুল অর্থের যাকাতও দেয়া হয়না কখনো।

শরীয়ত মারিফাত

এ পর্যায়ে সবচেয়ে মৌলিক বিদয়াত হলো শরীয়ত ও তরীকতকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন এবং পরস্পর সম্পর্কহীন দুই স্বতন্ত্র জিনিস মনে করা। এতোদূর পতন ঘটেছে যে, শরীয়তকে ‘ইলমে জাহের’ এবং ‘তরিকত’ বা ‘মারেফত’ কে ইলমে বাতেন বলে অভিহিত করে দ্বীন-ইসলামকেই দ্বিধাবিভক্ত করে দেয়া হয়েছে। এক শ্রেণীর জাহিল তরীকতপন্থী লোক বলতে শুরু করেছে যে, ইসলামের আসলই হলো তরীকত বা মারিফত, আর এ-ই হাকীকত। এ হাকীকত কেউ যদি লাভ করতে পারলো, তাহলে তাকে শরীয়ত পালন করতে হয়না, সে তো আল্লাহকে পেয়েই গেছে। তাদের মতে শরীয়তের আলিম এক আর মারিফত বা তরীকতের আলিম অন্য। এই তরীকতের আলিমরাই উপমহাদেশে পীর নামে অভিহিত হয়ে থাকেন। ধারণা প্রচার করা হয় যে, কেউ যদি শরীয়তের আলিম হয় আর সে তরীয়তের ইলম না জানে-কোনো পীরের নিকট মুরীদ না হয়-তবে সে ফাসিক।

তাসাউফকে বলা হয় সাধারণত মারিফাত। প্রখ্যাত অলী-আল্লাহ হযরত জুনাইদ বাগদাদী এ মারিফাত এর মূল্যহীনতা আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেনঃ

মারিফাতের তুলনায় ইলম অনেক উন্নত, সম্পূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ। আল্লাহ নিজে ইলম এর নামে অভিহিত হয়েছেন, মারিফাতের নামে নয়। আর তিনি বলেছেন-যারা ইলম লাভ করেছেন, তাদেরই উচ্চ মর্যাদা। এছাড়া তিনি যখন নবী করীম(স) কে সম্বোধন করলেন, সম্বোধন করলেন সর্বোত্তম, অধিকতর ব্যাপক কল্যাণময় ও পূর্ণাঙ্গ এক গুণ উল্লেখ করে।

আর বলেছেনঃ فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ

-‘তুমি জেনে রাখো, আল্লাহ ছাড়া কোনোই মা’বুদ নেই’।

কিংবাঃ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهْوَاءَهُمْ ۚ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ

-অতঃপর জানবে যে, এ লোকেরা নিজেদের কামনা বাসনাকে অনুসরণ করে চলেছে। আর যারাই নিজেদের কামনা বাসনাকে অনুসরণ করে চলে, তাদের চাইতে অধিক গোমরাহ আর কে হতে পারে।

পীর-মুরীদী সম্পর্কে এ আয়াত খুবই প্রযোজ্য। কিন্তু ‘মারিফাত হাসিল করো’ একথা কোথাও বলেননি। কেননা মানুষ একটা জিনিসকে চিনতে পারে; কিন্তু তার সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করা সম্ভবপর হয়না । আর যখন সে জিনিস সম্পর্কে ইলম হলো, সম্যকভাবে সে সম্পর্কে জানতে পারলো, তখন তাকে চিনতেও পারলো।

হযরত জুনাইদের একথার সারমর্ম হলো এই যে, মারিফাতের চাইতে ‘ইলম’ বড়। অতএব আল্লাহর মারিফাত নয়, আল্লাহ সম্পর্কে ইলম হাসিল করতে হবে। ‘ইলম’ হাসিল হলেই ‘মারিফাত’ লাভ হতে পারে। আর যার ইলম নেই, সে মারিফাতও পেতে পারেনা। এ ইলম-এর একমাত্র উৎস হলো আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের হাদীস। কুরআন-হাদীসের মাধ্যমেই রাসূলকে জানতে হবে এবং আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার ফলেই মানুষ পারে আল্লাহকে জানতে ও চিনতে-অন্য কোনো উপায়ে নয়।

কিন্তু তাসাউফবাদীরা এ মারিফাতকে কেন্দ্র করে গোলকধাঁধার এক প্রাসাদ রচনা করেছে। তাদের মতে মারিফাত বা ইলমে বাতেন এক সুসংবদ্ধ ও সুশৃংখলিত কর্মপন্থা, ইসলামী শরীয়ত থেকে তা সম্পূর্ণ এক ভিন্ন জিনিস। তাদের মতে  রাসূলে করীম(স) তাঁর এই মারিফাত কোনো কোনো সাহাবীকে শিক্ষা দিয়েছিলেন, আর অনেককে দেননি। তারা আরো মনে করেন, ইলমে বাতেন হযরত আলী(রা) হতে হাসান বসরী পর্য্ন্ত পৌছেছে। আর তাঁরই থেকে সীনায় সীনায় এ জিনিস চলে এসেছে এ কালের পীরদের পর্য্ন্ত।

এ সমস্ত কথাই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কেননা রাসূলে করীম(স) এ জিনিস কাউকেই শিখিয়ে যাননি, যা এখনকার পীর তার মুরীদদের শিখিয়ে থাকে। তিনি এরূপ করতে কাউকে বলেও যাননি। কোনো দরকারী ইলম তিনি কোনো কোনো সাহাবীকে শিখিয়ে যাবেন আর অন্য সাহাবীদেরকে বঞ্চিত করবেন-এরূপ তরা নবী করীমের নীতি ও আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তাছাড়া হাসান বসরী(র) হযরত আলী(রা) এর সাক্ষাৎ পাননি, তাঁর নিকট থেকে মারিফাত এর শিক্ষা লাভ করা ও খিলাফত এর ‘খিরকা’ লাভ করাতো দূরের কথা।

আল্লামা মুল্লা আলী আল কারী আল্লামা ইবনে হাযার আল আসকালানীর উদ্বৃতি দিয়ে লিখেছেনঃ

-সূফী ও মারিফাতপন্থীরা যেসব তরীকা ও নিয়ম-নীতি প্রমাণ করতে চায়, প্রমাণ হওয়ার মতো কোন জিনিসই নয়। সহীহ, হাসান বা যয়ীফ কোনো প্রকার হাদীসেই এ কথা বলা হয়নি যে, নবী করীম(স) তাঁর কোনো সাহাবীকে তাসাউফপন্থীদের প্রচলিত ধরনের খিলাফতের ‘খিরকা’(বিশেষ ধরনের জামা বা পোষাক)পড়িয়ে দিয়েছেন। সেসব করতে তিনি কাউকে হুকুমও করেননি। এ নিয়ে যা কিছু বর্ণনা করা হয় তা সবই সুস্পষ্টরূপে বাতিল। তাছাড়া হযরত আলী(রা) হাসান বসরীকে ‘খিরকা’ পরিয়েছেন(মারিফাতের খিলাফত দিয়েছেন) বলে যে দাবি করা হয়, তা সম্পূর্ণরূপে মনগড়া মিথ্যা কথা। কেননা হাদীসের ইমামগণ প্রমাণ করতে পারেননি যে, হাসান বসরী হযরত আলীর নিকট হতে কিছু শুনেছেন-তাঁকে হযরত আলীর ‘খিরকা’ পরিয়ে দেয়াতো দূরের কথা।

মুল্লা আলী কারী আরও লিখেছেনঃ

-এমনিভাবে তাসাউফপন্থীদের মধ্যে মুরীদকে তালকীন করা-রূহানী ফায়েজ দেয়ার যে ব্যাপারটি চালু করেছে, তাকে হাসান বসরীর সূত্রে হযরত আলীর সাথে সম্পর্ক পাতিয়ে নেয়ারও শরীয়তে কোনোই ভিত্তি নেই।

বস্তুত তাসাউফপন্থী লোকদের এ একটি অমূলক ধারণামাত্র। শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী এ সম্পর্কে লিখেছেনঃ

-সূফী বা তাসাউফপন্থীদের কথা যে, এসব তরীকতের সিলসিলা হযরত আলী (রা) পর্য্ন্ত পৌছে গেছে-এর জবাব এই যে, এটি পীর মুরীদের মুখে ধ্বনিত ও প্রসিদ্ধ একটি কথা। কিন্তু অনুসন্ধান করে জানা গেছে যে, এ কথার মূলে কোনোই ভিত্তি ও সত্য নেই।

এ পর্যায়ে তিনি আরো লিখেছেন যে, প্রসিদ্ধ দু রকমের হয়ে থাকে। এক রকমের প্রসিদ্ধ কথা যা সকল জ্ঞানী মনীষীদের নিকটই প্রসিদ্ধ। আর এক প্রকারের প্রসিদ্ধ কথা হলো, যা কেবল মাত্র একদল লোকের নিকট প্রসিদ্ধ। হযরত আলীর নিকট হতে মারিফাতের ইলম শুরু এ কথাটা কেবল এই সূফী পীরদের নিকটই প্রসিদ্ধ; অন্য কারোরই এ কথা জানা নেই। আসলে এ কথাটাই বাতিল। কিংবা বলা যায়, একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। শেষের জমানার লোকেরা এটাকে রচনা করেছে ও কবুল করেছে। আর এ ধরনের কথা আদৌ গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা। মারিফাতের যেসব তরীকা, মুরাকাবা-মুশাহিদা ও যিকির এখনকার পীরেরা তাদের মুরীদদের শিখিয়ে থাকে তা যে রাসূলে করীম(স) বা সাহাবায়ে কিরামের জামানায় ছিলনা, শাহ দেহলভী সে কথাও ঘোষণা করেছেন।

তিনি বলেছেনঃ

-জ্ঞাতব্য বিষয় হচ্ছে, সূফী পীরদের তাসাউফের রীতিনীতি সাহাবা ও তাবেয়ীদের যুগে ছিলনা। উপায় উপার্জন ত্যাগ করা, তালিযুক্ত পোশাক পরা, বিয়ে ঘর সংসার না করা ও খানকার মধ্যে বসে থাকা সেকালে প্রচলিত ছিলনা।

মারিফাত পন্থীদের বিশ্বাস, মারিফাতের এ কর্মপন্থা পুরোপুরি অনুসরণ করে চললেই পথিক-সালেক-নিগূঢ় তত্ত্ব (হাকীকত) কে জানতে পারে। আর শেষ পর্য্ন্ত এ মারিফাত এই তত্ত্ব লাভ করে যে, বাহ্য দৃশ্যমান এ জিনিসগুলো নির্ধারণ হিসেবে যদিও আল্লাহ হতে ভিন্ন জিনিস; কিন্তু মূল ব্যাপারের দৃষ্টিতে তা-ই হলো মূল আল্লাহ। আল্লাহ ও বাহ্যিক জিনিসগুলো মধ্যে যে পার্থক্য মনে হচ্ছে, তা হলো আমাদের ভ্রম। অর্থাৎ বাইরে দৃশ্যমান বর্তমান জিনিসের বৈচিত্র ও বিপুলতা সৃষ্টির ধোঁকা বা মায়া। অন্য কথায় বলা চলে, এ কর্মপন্থা অনুসরণ করলে মানুষ শেষ পর্য্ন্ত দৃষ্টি বিভ্রম হতে মুক্তি পেতে পারে। আর তখন মনে হয়, এক আল্লাহকে-ই এই বিপুলতার রূপে দেখতে পাচ্ছি। এ লোকদের মতে এ-ই হচ্ছে তওহীদের মারিফাত।

কিন্তু একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে যে, এসব তত্ত্বকথাই হচ্ছে বেদ-উপনিষদের দর্শন-বেদান্তবাদ। আর এ দর্শনের সঠিক পরিচয় হলো অদ্বৈতবাদ। মানে, আল্লাহ ও জগত কিংবা স্রষ্টা ও সৃষ্টি আসলে এক ও অভিন্ন। যা স্রষ্টি তাই স্রষ্টা এবং যিনি স্রষ্টা তিনিই সৃষ্টি। অদ্বৈতবাদী আদর্শের এই হলো গোড়ার কথা। আর তা-ই হচ্ছে হিন্দু ধর্মের তত্ত্ব, যা বর্তমান পীর-মুরীদী ধারায় ইসলামের মারিফাত নাম ধারণ করে মুসলিম সমাজে প্রচলিত হয়েছে এবং এ যে সুস্পষ্ট শিরক তাতে এক বিন্দু সন্দেহের অবকাশ নেই।

বস্তুত ইসলাম এক সর্বাত্বক দ্বীন। এতে এক ব্যক্তির মন হৃদয় অন্তর একান্তভাবে আল্লাহর জন্য খালিস করে দেয়ার ব্যবস্থা থেকে শুরু করে বাস্তব জীবনের সর্বদিক ও বিভাগ, সব কাজ ও বিষয় সম্পর্কেই বিস্তারিত বিধান দেয়া হয়েছে। তাতে শরীয়ত ও তরীকত কোনো বিচ্ছিন্ন,স্বতন্ত্র ও পরস্পর বিপরীত জিনিস নয়। যেমন দুই বিপরীত জিনিস নয় ব্যক্তির দেহ ও মন। দেহ ও মনের সমন্বয়েই যেমন মানুষ, তেমনি শরীয়ত-তরীকত বা মারিফত সবই একই জিনিসের এদিক ওদিক- বাহির ও ভিতর এবং একই কুরআন হাদীস হতে উৎসারিত।

কুরআন থেকেই পাওয়া যায় আল্লাহর সঠিক ও সার্বিক পরিচয়, তাঁর জাত ও সিফাত সম্পর্কিত নাম এবং তাঁর কুদরতের বিচিত্র বর্ণনা বিশ্লেষণের মাধ্যমে। কুরআন থেকেই জানা যায় আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার, তাঁর বন্দেগী কবুল করার এবং ঐকান্তিক নিষ্ঠার সাথে তাঁর আদেশ নিষেধ পালন করার শরীয়তী বিধান। এগুলোর নিগুঢ় তত্ত্ব, মাহাত্ম্য ও অন্তর্নিহিত তাৎপর্য্ যখন মানুষের মর্মমূলে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখনি তা হয় তরীকত বা মারিফাত। মানুষ যখন শরীয়ত মোতাবিক আমল করে, তখন হয় শরীয়তের আমল। আর এই আমল যদি ইখলাস, আল্লাহর ভয় ও আল্লাহ ভালোবাসায় সিক্ত ও সঞ্জীবিত হয়ে ওঠে, আল্লাহকে সব সময় হাজির নাজির অনুভব করতে পারে, তখনি তা হয় মারিফাত বা তরীকত। ইলম ও আমলের মাঝে যদ্দিন দ্বন্ধ থাকবে মনে, ততোদিন তা হবে শরীয়ত পর্যায়ের ব্যাপার। আর যখন এ দ্বন্ধে মন অন্তর মুতমায়িন হবে, পুরোপুরিভাবে আত্মসমর্পণ করবে আমলের নিকট, আমলময় হয়ে উঠবে জীবন, তখন তরীকত বা মারিফাত অর্জিত হলো বলা যাবে। শায়খ আবদুল মুহাদ্দিসে দেহলভী লিখেছেনঃ “হাকীকতকে শরীয়ত থেকে কোনো বিচ্ছিন্ন জিনিস মনে করে নিওনা।” আসলে হাকীকত শরীয়তেরই আসল জাওহার ও মূল প্রাণবস্তু। আর শরীয়ত হচ্ছে হাকীকতেরই বাহ্য রূপ ও অবয়ব।

শরীয়ত হচ্ছে এই যে, আল্লাহ ও রাসূলে করীম(স) যা কিছু বলেছেন তা বিশ্বাস করতে হবে এবং তদনুযায়ী আমল করতে হবে। আর ‘হাকীকত’ হচ্ছে এই যে যেসব বিষয়ে ইয়াকীন রয়েছে, তার প্রতি বিশ্বাসটা যেন সর্বাধিক দৃঢ় ও প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে।

শায়খ মহি উদ্দিন আবদুল কাদির জিলানি কুদ্দেশা সিররুহুশ বলেছেনঃ ‘যে হাকীকত শরীয়ত প্রত্যাখ্যান করবে, তাই ‘জান্দাকা’-“দ্বীন বিরোধিতা”- এ বাক্যের অর্থ হলো, কেউ যদি এমন কাশফ লাভ করে, যা দ্বীন ও শরীয়ত মোতাবিক নয়, আর সে যদি তাকেই নিজের আকীদা বানিয়ে নেয়, তাহলে সে কাফির ও জিন্দীক হয়ে যাবে।

আবু সালমান দুররানী বলেনঃ “অনেক সময় সলুক-পথের ‘অজুদ’ ও শোকর এর কোনো তত্ত্ব পূর্ণ সৌন্দর্য্ মন্ডিত হয়ে আমার সামনে এসে উপস্থিত হয়; কিন্তু আমি তা কবুল করিনা। আমি বলি দুজন বিশ্বস্ত নির্ভরযোগ্য স্বাক্ষী তোমার সত্যতা ও যথার্থতা সম্পর্কে যতক্ষণ না সাক্ষ্য দেবে, ততক্ষণ আমি তোমাকে কিছুতেই গ্রহণ করতে পারিনে। আর এ দুজন বিশ্বস্ত সাক্ষী কে?...তাহলো আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাত।”(শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী, মকতুব নং ১৩)

বস্তুত এ দুয়ের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই, নেই কোনো বিরোধ বা দ্বন্ধ, নেই কোনোরূপ দ্বৈততা। বরং সত্য কথা এই যে, এখানে তরীকত বা মারিফাতের যে পরিচয় দেয়া হলো, তা-ই হলো প্রকৃতপক্ষে দ্বীন ইসলাম। এই অখন্ড ইসলামই আল্লাহ তা‘আলা নাযিল করেছেন, কুরআন এই দ্বীন ইসলামই পেশ করেছে, নবী করীম(স) তাঁর জীবন, চরিত্র, আমল ও যাবতীয় কাজের মাধ্যমে এই অবিচ্ছিন্ন দ্বীনকেই দুনিয়ার সামনে উজ্জ্বল করে তুলে ধরেছেন এবং সম্পূর্ণ জিনিসেরই  নাম হলো কুরআনের ভাষায় শরীয়ত। কাজেই না এ শরীয়তকে অস্বীকার করতে পারে কোনো মুসলমান না এ তরীকত বা মারিফাতকে। তাসাউফের বিশেষজ্ঞ মনীষীদের মতে তাসাউফ হলোঃ উত্তম চরিত্রই তাসাউফ। কিন্তু উত্তরকালে শরীয়ত ও তরীকত দুটি বিচ্ছিন্ন জিনিস হয়ে গিয়ে দুই বিপরীত ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। শরীয়ততো কুরআন ও সুন্নাতের ভিত্তিতে অবিকৃত অপরিবর্তিত রয়েছে-থাকবে চিরদিন, কিন্তু তরীকত আর মারিফাতের নামে যে অলিখিত ও ‘সীনা-বা- সীনা’ চলে আসা স্বতন্ত্র জিনিসটি মাথাচাড়া দিয়ে উঠল, তাতে উত্তম নির্মল চরিত্রের কোনো গুরুত্বই থাকলোনা; তাতে পুঞ্জীভূত হয়ে উঠল নানাবিধ শিরকের আবর্জনা। আর এ ক্ষেত্রে এ-ই হলো বিদয়াত।

মারিফাত বা তরীকত শরীয়ত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে যখন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ধারায় বইতে লাগলো, তখন তাতে এসে জমলো এমন সব জিনিস যা শরীয়ত তথা কুরআন ও সুন্নাত থেকে গৃহীত নয়। তাতে শামিল হলো গ্রীক দর্শন, প্রাচীন মিশরীয় দর্শন এবং ভারতীয় বেদান্ত দর্শন। এ সবের সমন্বয়ে মারিফাত বা তরীকতের এই স্বতন্ত্র ইলম গড়ে উঠল; যার নাম রাখা হলো ‘ইলমে তাসাউফ’ বা শুধু তাসাউফ। অথচ পূর্বে কোনো যুগেই এই নামে কোনো ইলম ইসলামে ছিলনা, তাই মুসলমানরা জানতো না যে, ইসলামে শরীয়ত ও মারিফাতের দ্বৈততার ধারণা অতি বড় বিদয়াত। যেমন অতি বড় বিদয়াত হচ্ছে ইসলামে ধর্ম ও রাজনীতিকে দুই বিচ্ছিন্ন জিনিস মনে করা। ধর্ম ও রাজনীতিকে বিচ্ছিন্ন ও পারস্পরিক সম্পর্কহীন করে রাজনীতির ক্ষেত্রে ফাসিক-কাফির-জালিম লোকদের কর্তৃত্ব কায়েম করা হয়েছে। আর দ্বীনকে সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে শুধু নামায-রোযা-হজ্জ-যাকাতের মধ্যে। অনুরূপভাবে শরীয়ত ও তরীকতকে বিচ্ছিন্ন করে সৃষ্টি হয়েছে এক শ্রেণীর জাহিল পীর। মুসলিম সমাজে চলছে পীরবাদ নামে এক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র মুশরিকী প্রতিষ্ঠান। এ পীরবাদ চিরদিনই ফাসিক-ফাজির-জালিম শাসকদের- রাজা বাদশাহদের – আশ্রয়ে লালিত পালিত ও শাখায় পাতায় সুশোভিত হয়েছে। সাধারণত পীরেরা চিরদিনই এ ধরনের শাসকদের সমর্থন দিয়েছে। তারা কোনো দিনই জালিম ফাসিক শাসকদের বিরুদ্ধে টু শব্দটি করেনি। বরং সব সময়ই “আল্লাহ আপ কা হায়াত দারাজ করে” বলে দুহাত তুলে তাদের জন্য দো’আ করেছে।

তাসাউফের গতি ইসলামের বিপরীত দিকে

ইসলামী আধ্যাত্মবাদের মূল উৎস যদিও শুরুতে কুরআন ও সুন্নাতই ছিল; কিন্তু উত্তরকালে বিস্তারিত ও খুঁটিনাটি ব্যাপারে গিয়ে তা তাসাউফের নাম ধারণ করে এবং তার আদর্শ ও লক্ষ্য কুরআন সুন্নাতের আদর্শ ও লক্ষ্য থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে যায়। দু’টোর তুলনামূলক অধ্যয়নে একথা স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, তাসাউফের আদর্শের ক্ষেত্রে এসে ইসলামের কোনো কোনো মৌল আদর্শ ও লক্ষ্য ম্লান এবং উপেক্ষিত হয়ে পড়েছে, আর কোনো কোনো খুঁটিনাটি বিষয় মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব লাভ করেছে। কোনো কোনো ভাবধারা তাসাউফে এসে অধিক তীব্র ও প্রকট এবং কোনো কোনোটি অপেক্ষাকৃত দূর্বল ও কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে। কোনো কোনো ইসলামী ধারণা তাসাউফের ক্ষেত্রে  এসে সম্পূর্ণ নতুন অর্থ ধারণ করেছে। আর কোনো কোনোটির অর্থ ও তাৎপর্যে আংশিক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। আবার ইসলামের অনেকগুলো জরুরী দিককে তাসাউফ সম্পূর্ণ উপেক্ষাই করেছে এবং কোনো কোনো দিক দিয়ে বাইরের অনেক জিনিসই শামিল হয়ে পড়েছে তাসাউফের মধ্যে।

এখানে এসব বিষয় বিস্তারিত আলোচনা করার অবকাশ না থাকলেও সংক্ষেপে বিষয়টি ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করছি-যেন কেউ ধারণা না করে বসেন যে, তাসাউফের প্রতি শত্রুতা পোষণের কারণেই এসব কথা বলা হচ্ছে। কেননা তা আদৌ সত্য নয়। এখানে কয়েকটি দৃষ্টান্ত পেশ করা হচ্ছে।

ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে ‘আমল’ ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু তাসাউফে এসে তার ক্ষেত্র হয়ে যায় একেবারে সংকীর্ণ, সীমাবদ্ধ। মানুষের সামাজিক জীবন, সামাজিক ব্যবস্থা, প্রয়োজন জটিলতার সুষ্ঠ ও কার্য্কর সমাধান বের করা ইসলামের লক্ষ্য; কিন্তু এসব জিনিসের প্রতি তাসাউফপন্থীদের কোনো আগ্রহ ও কৌতুহলই নেই। এসব জিনিস তাদের তৎপরতার সম্পূর্ণ বাইরে অবস্থিত। ইসলামের প্রাথমিককালে ‘ফিকির’, ‘জযবা’ ও ‘আমল’- এ তিনটির মাঝে পরস্পর গভীর সম্পর্ক ও পূর্ণ ভারসাম্য রক্ষিত ছিল; কিন্তু তাসাউফপন্থীরা আবেগ ও কলবী-কাইফীয়াতের উপর এত বেশি গুরুত্ব আরোপ করে যে, তদ্দরুণ আমল- ‍বিশেষ করে চিন্তা বা ফিকির এর গুরুত্ব কম হয়ে গেছে বা আদৌ থাকেণি। আল্লাহর ভালোবাসা দ্বীন ইসলামের মৌল ভাবধারা। ইসলামের প্রাথমিক যুগে এ ভালবাসা ‘আমল’ থেকে বিচ্ছিন্ন ও আলাদা কোনো জিনিস ছিলনা, তেমন কিছু হওয়ারও স্বীকৃতি পায়নি কোনো দিন বরং আল্লাহর ভালোবাসা ছিল এমন এক প্রাণ উদ্দীপক ভাবধারা, যা সেসব আমলের মধ্যেই প্রবাহিত ও সঞ্চারিত হয়েছিল, যা জমিনের বুকে আল্লাহর খলীফা হওয়ার কারণে বাস্তবায়িত করা মানুষের পক্ষে অপরিহার্য্ ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে তাসাউফপন্থীদের আদর্শ ও লক্ষ্য আমল-এর ক্ষেত্রে কেবল সংকীর্ণই হয়ে যায়নি, ‘আমলে’র সাথে ‘মুহাব্বাত’ জোরদার করনের জন্য তাসাউফপন্থীরা নানা উপায় অবলম্বন করেছে। যেমনঃ গানের আসর এবং সঙ্গীত চর্চা ইত্যাদির দ্বারা ঈমান মজবুত হয় বলে মনে করা হয়েছে। কিন্তু প্রাথমিক যুকে ‘আল্লাহর মুহাব্বত’ মানুষের দ্বারা এই কাজ করিয়েছিল-তাসাউফপন্থীরা এর প্রমাণ দিতে পারবে কি?

‘যিকির’ কেও এখানে সংকীর্ণ অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। মাথা নিচু করে বসে মুখে ‘আল্লাহ’ ‘আল্লাহ’ কিংবা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ কলেমা নিম্নস্বরে বা উচ্চস্বরে উচ্চারণ করাকেই যিকির বলে ধরে নেয়া হচ্ছে এবং তা করলেই আল্লাহর যিকির করার কর্তব্য আদায় হয়ে গেল বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু এ যে কতো সংকীর্ণ ধারণা এবং ইসলামী আদর্শের একটি মৌল বিষয়কে বিকৃত করা, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। কুরআন মজীদে আল্লাহর যিকির করার স্পষ্ট নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সূরা আল বাকারায় বলা হয়েছেঃ

فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ [٢:١٥٢]

- তোমরা আমায় স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করবো, তোমরা আমার শোকর করো, আমার অকৃতজ্ঞতা করো না।

আল্লামা রাগেব ইফসানী ‘যিকির’ শব্দের অর্থ লিখেছেনঃ

*******

যিকির হচ্ছে মনের এমন একটা অবস্থা যা দ্বারা মানুষ যে জ্ঞান সংরক্ষণ করতে চায় তা করা তার পক্ষে সম্ভব হয়। ইয়াদ রাখা বা স্মরণে রাখা বা সংরক্ষণ যেমন, এ-ও তেমনি।

অপর অর্থে বলা হয়েছে ‘যিকির’ অর্থ মনে কোনো জিনিসের উপস্থিতি। তিনি আরও লিখেছেন-‘যিকির’ দু’ভাবে সম্ভব-একটি অন্তরের যিকির, অপরটি মুখের যিকির। তার ভুলে যাওয়া কথা স্মরণ করা ও ভুলে না গিয়ে স্মরণে রাখা, সবসময় স্মৃতিপটে জাগ্রত রাখা, সংরক্ষণ করা, এই উভয় অবস্থায়ই যিকির শব্দটি প্রযোজ্য।

আল্লামা কুরতবী লিখেছেনঃ কোনো জিনিস সম্পর্কে দিলের সদা সচেতন ও অবহিত হওয়া, সে বিষয়ে মনের জাগৃতি।

আর আয়াতটির তরজমা করেছেনঃ

তোমরা আমার আনুগত্য করে আমাকে স্মরণে রাখো। তাহলে আমি তোমাদের স্মরণ রাখবো সওয়াব দিয়ে, গুনাহ মাফ করে।

অন্য কথায় যিকির হচ্ছে আল্লাহকে স্মরণ রেখে তাঁর ইবাদত করা, আনুগত্য ও হুকুম পালন করা মনের আগ্রহ সহকারে।

অপর একটি আয়াতে বলা হয়েছেঃ

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ[٨:٢]

–প্রকৃত মুমিন তারাই, আল্লাহর উল্লেখ বা স্মরণ হলেই যাদের দিল কেঁপে উঠে।

এ আয়াতের তাফসীরে ইমাম ইবনে কাসীর লিখেছেনঃ অতএব হে মুমিনেরা-আল্লাহর নির্ধারিত ফরযসমূহ যথাযথভাবে পালন করো।

পরে এ তাফসীরকার লিখেছেনঃ মুমিনের-আল্লাহর যিকির হলেই যার দিল কেঁপে উঠে-কর্তব্য হচ্ছে সে আল্লাহকে ভয় করবে এবং তার আদেশসমূহ পালন করবে ও নিষেধসমূহ তরক করে চলবে।

এ আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, আল্লাহর যিকির করতে বলার অর্থ আল্লাহর ইবাদত করা, সর্বক্ষণ তাঁকে মেনে চলা, তাঁকেই নিজের একমাত্র মা’বুদ মনে করা এবং নিজেকে মনে করা একমাত্র তাঁরই দাস এবং এ বিষয়ে কখনোই গাফিল হয়ে না যাওয়া, সব সময়ই আল্লাহকে স্মরণ রাখা, কোনো সময়ই তাঁকে ভুলে না যাওয়া।

তাছাড়া কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী ‘যিকির’ ই একমাত্র করণীয় কাজ নয়। সেই সঙ্গে ‘ফিকির’ ও অপরিহার্য্। এই যিকির ও ফিকির-উভয়ের গুরুত্ব ও সার্বক্ষণিকতা বোঝাতে গিয়ে আল্লাহ বলেছেনঃ

الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَىٰ جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ[٣:١٩١]

-যারাই আল্লাহর যিকির করে দাঁড়ানো, বসা ও পার্শ্ব নির্ভর শয়ন অবস্থায় এবং নভোমন্ডল ও পৃথিবী সৃষ্টির বিষয়ে চিন্তা ভাবনা গবেষণা করে (বস্তুত তারাই বুদ্ধিমান লোক।)

(আল ইমরানঃ১৯১)

আয়াতটিতে আল্লাহর যিকির করতে বলা হয়েছে বসা, দাঁড়ানো ও শয়ন অবস্থায় অর্থাৎ সর্বাবস্থায়। কেননা এই তিনটি অবস্থার মধ্যে যে কোনো একটি অবস্থায়ই মানুষ থাকে। কোনো সময়ই এই তিনটির একটি ভিন্ন অন্য কোনো অবস্থায়ই তার হয়না, হয় সে বসে আছে, নয় দাঁড়িয়ে আছে কিংবা শুয়ে আছে। অতএব সর্বাবস্থায়ই আল্লাহর যিকির করতে হবে। অর্থাৎ স্মরণে রাখতে হবে, কোনো অবস্থায়ই আল্লাহকে ভুলে যাওয়া চলবেনা।

দ্বিতীয়ত, আয়াতটিতে শুধু যিকির এ কথাই বলা হয়নি, সেই সঙ্গে ফিকির এর কথাও বলা হয়েছে। আর ইমাম রাগেব এর ভাষায় ফিকির বলতে বোঝায়ঃ কোনো বিষয়ে জানবার জন্য নিয়োজিত শক্তি। বলা হয়েছে এ শব্দটির আসল অর্থ-বিষয়াদি ঘর্ষণ করা তার নিগুঢ় তত্ত্ব ও গভীর সত্য জানবার উদ্দেশ্য।

এক কথায় নিছকই যিকির আল্লাহর কাম্য নয়, বুদ্ধিমান লোকেরও কর্ম নয়। সেই সঙ্গে ফিকিরও আবশ্যক। ফিকিরবিহীন যিকির নির্বোধ লোকদের কাজ। আর ‘যিকির’ বিহীন ‘ফিকির’ হচ্ছে নাস্তিক ও আল্লাহদ্রোহী লোকদের কাজ।

কিন্তু আজকালকার ‘তাসাউফে’ শুধু যিকির আছে, ‘ফিকির’ নেই। যিকির এর সঙ্গে ফিকির করলে প্রচলিত ভাষায় তা আর তাসাউফ হলোনা। কোনো পীরের মুরীদ তা করতে চাইলে তার মুরীদগিরীই চলে যাবে, শুধু তাই নয়, এ যিকিরকেও তথায় খুবই ভালো অর্থে গ্রহণ করা হয়েছে ও নির্দিষ্ট সময়ে চোখ বন্ধ করে মুখে ‘আল্লাহ’ ‘আল্লাহ’ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে, চলে সেই নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে অন্যান্য সময়েও। এবং সেই বিশাল প্রক্রিয়ার বাইরে জীবনের বিশাল ক্ষেত্রে কোথাও তাদের জীবনে আল্লাহর যিকির এর কোনো লক্ষণ দেখা যায়না। ‘যিকির’ এর এই প্রক্রিয়া ও সময় নির্ধারণ ইসলামের এক মারাত্মক বিদয়াত। এই ‘বিদয়াত’ ইসলামকে সর্বাত্মক বিপ্লবী আদর্শ হতে না দিয়ে একটা যোগ সাধনার বৈরাগ্য ধর্মে পরিণত করে রেখেছে।

মৌখিক যিকিরও যিকির বটে যদি তার সাথে অন্তরের যিকির যুক্ত হয়। তাই ইমাম কুরতবী লিখেছেনঃ মৌখিক যিকিরকেও যিকির বলা হয়েছে, কেননা তা অন্তরের যিকির এর নিদর্শন।

অর্থাৎ অন্তরের যিকিরের যিকিরই মৌলিক যিকির এর রূপ লাভ করে। কিন্তু তাসাউফে তো সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের যিকির প্রবর্তিত। সেখানে অন্তরের যিকির এর কোনো স্থান নেই। অন্তরের যিকির এর যে লক্ষ্য, তা এখানে সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। এখানে মৌখিক যিকিরই প্রধানত মুখ্য। তার আঘাতে কলব সাফ করা ও ছয় লতীফা জারি করাই যে যিকির এর মূল উদ্দেশ্য। তাই বলা হয় সে যিকির কুরআনের বলা যিকির হতে সম্পূর্ণ ভিন্নতর জিনিস। যার কোনো দলীল কুরআন হাদীসে নেই। লতীফাও একটি বিদয়াতী ধারণা মাত্র। কুরআন হাদীসে তা স্বীকৃত নয়, তা থেকে পাওয়া যায়নি।

অপর একটি আয়াতে বলা হয়েছেঃ আরবী(*******)

-হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা আল্লাহকে খুব বেশি বেশি স্মরণ করো।

আল্লামা কুরতবী এর তাফসীরে লিখেছেনঃ আয়াতটিতে যে যিকির করার নির্দেশ, তার অর্থ দিল দিয়ে এমনভাবে যিকির করা, যা সর্বাবস্থায় ও স্থায়ীভাবে রক্ষা করা সম্ভব হবে। কোনো সময়ই তা হারিয়ে ফেলবেনা বা ভুলে যাবেনা।

এই পর্যায়ে নিম্নোক্ত আয়াতটিও প্রণিদানযোগ্যঃ

إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ ۚ

 -আল্লাহর দিকে উথ্থিত হয় সব পাক পবিত্র কথাবার্তা। আর নেক আমলই তাকে উথ্থিত করে। (আল ফাতিরঃ১০)

অর্থাৎ ভালো ভালো ও পবিত্র কথা-তওহীদ বিশ্বাস, আল্লাহর যিকির, কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি সবই আল্লাহর নিকট পৌঁছায়, তবে তা পোঁছিয়ে দেয় নেক আমল। নেক আমলবিহীন শুধু কথা, শুধু যিকির বা তওহীদ বিশ্বাস অর্থহীন। তা আল্লাহর নিকট কবুল হবেনা।

এই কারণে, হাদীসে যিকির এর বহু ফযীলত বর্ণিত হয়েছে বটে; কিন্তু সেই সঙ্গে তার বাস্তব রূপ কি হলে তা আল্লাহর যিকির হয় বা আল্লাহর যিকির এর বাস্তব পন্থা কি, তা স্পষ্ট ভাষায় বলে দেয়া হয়েছে।

নবী করীম(স) বলেছেনঃ আরবী(*******)

-যে লোক আল্লাহর আনুগত্য করলো, সেই আল্লাহর যিকির করলো, যদিও তার(নফল) নামায রোযা ও কল্যাণময় কাজ খুব কমই হলো।

অর্থাৎ আল্লাহর যিকির এর সঠিক বাস্তবরূপ হচ্ছে আল্লাহর আনুগত্য করা, তাঁর হুকুম আহকাম পালন করা। কেননা আল্লাহর হুকুম পালন করলে আল্লাহর যিকির স্বতঃই হয়ে যায়। কেননা আল্লাহ স্মরণে না থাকলে আল্লাহর হুকুম পালন সম্ভব হতে পারেনা। অতএব আল্লাহর ‘যিকির’ বিশেষ একটা ধরনে ও নির্দিষ্ট সময় ও সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখাই হচ্ছে বিদয়াত। তাসাউফে তথা পীর মুরীদীতে এই বিদয়াতই মূল উপজীব্য। এরূপ যিকির এর অনুষ্ঠান করেই পীরেরা বোকা লোকদের ভেড়া বানিয়ে রাখে এবং হাদীয়া-তোহফা আকারে ঘোষণা করে। বস্তুত যিকির এর এই ধরন হিন্দু বৈরাগ্যবাদী ও বৈষ্ঞবদের মধ্যেই প্রচলিত। পীরদের এই পদ্ধতিটি হিন্দু বৈরাগ্যবাদী হতে গৃহীত হয়েছে বললে কিছুমাত্র অত্যুক্তি করা হবেনা।

বৈরাগ্যবাদের বিরুদ্ধে কুরআন মজীদ চিরকালই সোচ্চার। নবী করীম(স) সারা জীবনের সাধনা দিয়ে এর বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছেন, মানুষের বৈরাগ্যবাদী ঝোঁক ও প্রবণতাকে দূর করেছেন। কিন্তু তাসাউফ এ জিনিসটিকে শক্তিশালী করে তুলেছে, তাসাউফের প্রধান হোতাদের মধ্যে বৈষয়িক স্বাদ আস্বাদন ও সামাজিক সম্পর্ক সম্বন্ধের ক্ষেত্রে এক প্রবল নেতিবাচক ভাবধারা বর্তমানে দেখতে পাওয়া যায়। অথচ ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে এ জিনিস ছিলনা। রাসূলের জামানায় সাহাবীদের মাঝে এমন ভাবধারা কখনো দেখা দিলে নবী করীম(স) কঠোর ভাষায় তার প্রতিবাদ করেছেন। কুরআন হাদীসে ‘তাজকিয়া’র ব্যাপারে যিকির ই ইলাহী-আল্লাহর যিকির এর উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে তা-ই একমাত্র উপায় ছিলনা। যিকিরে ইলাহীর সঙ্গে সঙ্গে আরো অনেক উপায় ও উপকরণ ছিল, যা মুসলমানদের তাজকীয়ায়ে নফস হাসিলের উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করা হতো। এ পর্যায়ে ‘জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ’-র কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বস্তুত ‘তাজকীয়ায়ে নফস’ সবর, তাওয়াক্কুল, আল্লাহর নিকট আত্মসমর্প্ণ, আল্লাহর ব্যবস্থায় রাজি হওয়া প্রভৃতি অতি উঁচুদরের মহান ‍গুণাবলী অর্জনের জন্য জিহাদের গুরুত্ব সর্বাধিক। কুরআন ও হাদীসে তাকে এ মর্যাদাই দেয়া হয়েছে।(বিশেষভাবে কুরআন মজীদের সূরা আল-বাকার ১৫২, ১৫৩ ও ১৫৪ আয়াত এবং সূরা আহযাব এর ২২ ও ২৩ আয়াত দ্রষ্টব্য)। কিন্তু তাসাউফপন্থীগণ জিহাদ পরিহার করেছে, জিহাদের প্রাণান্তকর ময়দান ত্যাগ করেছে, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব শয়তান লোকদের হাতে ছেড়ে দিয়ে খানকার নিরাপদ আশ্রয়ে যিকিরে ইলাহী ও মুরাকাবা মুশাহাদায় মশগুল হয়ে রয়েছে। আর এ কাজকেই তাজকীয়ায়ে নফসের একমাত্র উপায় রূপে নিজেরাও গ্রহণ করেছে, অন্যান্য মানুষকেও তা করতে দাওয়াত দিয়েছে। এরই ফলে যিকির এর নতুন নতুন পন্থা ও পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়েছে।

মুরাকাবা-মুশাহাদার সম্পূর্ণ নতুন পরিভাষা ও অভিনব পন্থা ও পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে, যার কোনো নাম নিশানা রাসূলে করীম(স) ও সাহাবায়ে কিরামের আমলে ছিলনা।

তাসাউফপন্থীদের মুজাহিদা নফসের খায়েশের বিরুদ্ধে এক প্রবল ও নিরবিচ্ছিন্ন যুদ্ধবিশেষ। কিন্তু আল্লাহর দুশমনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সাথে এর দূরতম সম্পর্কও নেই। তাসাউফপন্ধীরা এ পর্যায়ে একটি হাদীসকে দলীল হিসেবে পেশ করে। তা হচ্ছেঃ আরবী(*********)

-আমরা ছোট জিহাদ থেকে বড় জিহাদে ফিরে এলাম। লোকেরা জিজ্ঞেস করলোঃ বড় জিহাদ কি? বললেনঃ দিল বা নফসের সাথে জিহাদ করা।

এ কথাটিকে রাসূলের কথা বা হাদীস হিসেবেই প্রচার করা হয়। আর এর ওপর নির্ভর করে তাসাউফপন্থীরা প্রথমে দ্বীনের শত্রুদের সাথে যুদ্ধ বা তাদের মোকাবিলা করার তুলনায় নিজের নফসের সাথে মুজাহিদা করাকে উত্তম ও বড় জিহাদরূপে গ্রহণ করে। পরে এটাকেই একমাত্র কাজরূপে নির্ধারণ করে নেয়। আর দ্বীনের শত্রুদের সাথে জিহাদ করাকে দুনিয়াদারী বা রাজনীতি ইত্যাদি বলে সম্পূর্ণ বর্জন করে। কিন্তু আসলে এ একটা মস্ত বড় ধোঁকা। উপরোক্ত কথাটি সম্পর্কে হাদীস বিশারদ ‍ও বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাকার ইমাম ইবনে হাযার আসকালানী বলেছেন-ওটা হাদীস নয়। বরং খুবই প্রসিদ্ধ একটি কথা, লোকদের মুখে মুখে উচ্চারিত। কিন্তু আসলে ওটি ইবরাহীম ইবনে আইলার কথা, রাসূলের হাদীস নয়।

উক্ত কথাটি বায়হাকী ও খতীব বাগদাদী কর্তৃক উদ্ধৃত হয়েছে বটে; কিন্তু তা অত্যন্ত দূর্বল সনদের। তাই এর ‍উপর ভিত্তি করে ইসলামের এত বড় একটা বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায়না। এ কারণে আল্লাহর দুশমনদের মোকাবিলায় যুদ্ধ ও সংগ্রামে দৃঢ়তা মজবুতী ও অচল অটল হয়ে থাকার যে সবর কুরআন মজীদে যার উচ্চ মর্যাদা ঘোষিত হয়েছে তাসাউফপন্থীদের নিকট এর কোনোই গুরুত্ব নেই। ‘তাওয়াক্কুল’ ও অন্যান্য দ্বীনী ফযীলতপূর্ণ কাজ-কর্মের অবস্থা তা-ই ঘটেছে।

জীবনের লক্ষ্য ও আদর্শের ক্ষেত্রে তাসাউফপন্থীরা যে পরিবর্তন সূচিত করেছেন তা কি করে জায়েয হতে পারে? এ একটি কঠিন প্রশ্ন তাঁদের তরফ থেকে এর জবাব দিতে চেষ্টা করা হয়েছে বটে; কিন্তু সে জবাব কুরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিতে অগ্রাহ্য এবং অর্থহীন। তাঁরা নিজেদের আমলে বৈধতা প্রমাণের উদ্দেশ্যে ‘ইস্তিখাব’ ও ‘ইখতিয়ার’-‘ছাঁটাই বাচাই ও গ্রহণের’ নীতি অবলম্বন করেছেন। যেমন নবী করীমের সহস্র লক্ষ্য সাহাবীদের মধ্য থেকে কেবলমাত্র সুফ্ফাবাসী সাহাবীদেরকে নিজেদের আদর্শরূপে গ্রহণ করেছেন। কেননা তাঁদের জীবনের সাথে তারা তাদের সামগ্রিক আদর্শের মিল দেখতে পেয়েছিল। আর অন্যান্য সাহাবীদের জীবনের সেসব খুঁটিনাটি দিকগুলোই উজ্জ্বল করে তুলে ধরেছেন যেগুলো থেকে তাদের মনে ভাবধারার সমর্থন পাওয়া যায়। হযরত জুনাইদকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ ‘তাসাউফ’ কি? তিনি বললেন ‘তাসাউফ’ এর ভিত্তি আটটি জিনিসের ওপর স্থাপিত। এ আটটি জিনিস স্বতন্ত্রভাবে আটজন নবী পয়গম্বরের জীবনে স্পষ্ট প্রতিভাত। তা হলোঃ হযরত ইবরাহীমের বদান্যতা, দানশীলতা, মেহমানদারী, হযরত ঈসমাইলের আল্লাহ সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা ও আত্মসমর্পণ, হযরত ইয়াকুবের সবর, হযরত যাকারিয়ার ইশারাত, হযরত ইয়াহিয়ার অপরিচিত, হযরত ঈসার দেশ সফর, হযরত মূসার খিরকা পরিধান এবং হযরত মুহাম্মদ(স) এর ফাকর-দারিদ্র্য।

সহজেই বুঝতে পারা যায়, এক-একজন নবীর বিরাট বিশাল ও সম্পূর্ণ জীবনের বিপুল গুণরাশির মধ্যে আলাদা করে একটি মাত্র গুণকেই ‘আদর্শ’ রূপে গ্রহণ করা হয়েছে, যদিও তা করার অনুমতি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল দেননি। আল্লাহ তা‘আলা তো সম্পূর্ণ ও সামগ্রিকভাবেই হযরত মুহাম্মদ(স) কে আদর্শরূপে গ্রহণ করার-তার একটি মাত্র গুণ নয়-সবগুলো গুণই ধারণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

বলেছেনঃ لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ

-তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের সত্তায় অতীব উত্তম অনুসরণযোগ্য আদর্শ রয়েছে।(আল আহযাবঃ21)

আর রাসূলে করীম(স) নিজেই ঘোষণা করেছেনঃ আরবী(*******)

-আমি যে দ্বীন নিয়ে এসেছি তোমাদের মন ও মানসিকতা যতক্ষণে তার সম্পূর্ণ অধীন না হবে, ততক্ষণে তোমাদের কেউ-ই ঈমানদার হতে পারবেনা।

তার অর্থ রাসূলের একটি কথা বা একটি নীতিই নয়, তাঁর নিকট হতে পাওয়া সম্পূর্ণ দ্বীন-পুরোপুরি আদর্শই গ্রহণ করতে হবে।

‘খুলাফায়ে রাশেদুন’ এর ক্ষেত্রেও তাঁদের এই নীতিই অনুসৃত হয়েছে। তারা তাদের জীবনের জুহদ, সাখাওয়াত ও রিয়াজত পর্যায়ে ভাবধারা সমূহকেই গুরুত্ব দিয়ে থাকে, তাদের জিহাদী কার্য্ক্রম ও কর্মতৎপরতাকে এরা সম্পূর্ণ ভুলে যেতে চেয়েছে। অথচ তাঁদের সমগ্র জীবনই অতিবাহিত হয়েছে বাতিল শক্তির সাথে লড়াই সংগ্রাম, ইসলামী সমাজ সংগঠন ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সাধনা, সমাজে শরীয়তের আইন জারি ও কার্য্কর করা, ইনসাফ কায়েম করা ও আল্লাহর দুশমনদের মস্তক চূর্ণ করার কাজের মধ্য দিয়ে। কিন্তু বর্তমান তাসাউফপন্থীদের নিকট তাঁদের এসব মহান গুণের কোনোই গুরুত্ব নেই। এরই ফলে মুসলিম সমাজ আজ বৈরাগ্যবাদের স্রোতে ভেসে গিয়ে জীবনের বৈশিষ্ট্য ও প্রাণ-মনের শক্তি প্রতিভা হারিয়ে ফেলেছে, হয়েছে সর্বহারা।

ইলমে শরীয়ত ও ইলমে মারিফাত দুটি আলাদা জিনিস হওয়ার দাবির সমর্থনে একটি হাদীসও পেশ করা হয়। হাদীসটি মিশকাত শরীফে এভাবে উদ্বৃত হয়েছেঃ আরবী(******)

-হাসান বসরী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেনঃ ইলম দু’প্রকার। একটি ইলম কলবের অভ্যন্তরে প্রতিফলিত। আর এ-ই হচ্ছে সত্যিকার কল্যাণকর ইলম। আর একটি ইলম শুধু মুখে মুখে বলা। আর তা-ই হচ্ছে মানুষের উপর আল্লাহর অকাট্য দলীল।

 কিন্তু এটা এ পর্যায়ের কোনো দলীলই হতে পারেনা। কেননা একেতা এটা রাসূলের কথা নয়, কথা নয় কোনো সাহাবীর। এটি হচ্ছে হাসান বসরীর কথা এবং তিনি তাবেয়ী মাত্র।

দ্বিতীয়ত, এখানে যে ইলমের কথা বলা হচ্ছে, তা আসলে দুটি স্বতন্ত্র ইলম নয়। একটি ইলমেরই দুটি দিক-বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ। এর একটি অপরটি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। যেটিকে মুখে ইলম বলা হয়েছে, তা-ই হলো কুরআন ও সুন্নাতের ইলম; তা মুখে পড়ে শিখতে হয়। আর এই পড়ার যে প্রতিফলন ঘটে অন্তরের ওপর, তা-ই হলো ‘ইলমুন ফিল কালব’-দিলের ইলম। কাজেই এই দুয়ের মাঝে কোনো দ্বৈততা নেই এবং তা ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে হাসিল করা যায়না; বরং একই কুরআন হাদীস থেকেই তা শিখতে হবে। প্রদীপ জ্বালালে তা একটি হয় আগুন ও অপরটি সেই আগুনেরই আলো ও তাপ। এই আলোর তাপকে কি আগুন থেকে আলাদা করা যায়? এ-ও তেমনি। আবু তালীব মক্কী উপরোক্ত কথাটির ব্যাখ্যায় বলেছেনঃ

-এ দুটিই মৌলিক ইলম। একটি অপরটি ছাড়া নয় যেমন ঈমান ও ইসলাম। আর এ দু’টো পরস্পর ওতপ্রোতভাবে জড়িত, ঠিক যেমন দেহ ও মন। একটি অপরটি হতে বিচ্ছিন্ন হতে পারেনা।

‘ইলমে বাতেন’ বা ‘বাতেনীইলম বলেও কোনো জিনিস ইসলামে স্বীকৃত নয়। যদিও এ ইলম এর অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য আর একটি হাদীস ‘মুসাললাল’ বর্ণনা করা হয়।

তা এরূপঃ হাসান বসরী(রা) হতে বর্ণিত, তিনি হযরত হুযায়ফা(রা) হতে বর্ণনা করেছেনঃ হযরত হুযায়ফা বলেনঃ আমি নবী করীম(স) কে জিজ্ঞেস করলাম-ইলমে বাতেন কি? রাসূল(স) বললেন-আমি এ বিষয়ে জীবরাঈলকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন; আল্লাহ বলেছেনঃ ইলমে বাতেন হলো আমার ও আমার বন্ধু প্রিয়জন, আমার অলী ও আমার খাঁটি দোস্তদার লোকদের মধ্যবর্তী এক বিশেষ জিনিস, আমি তা তাদের কলবের ভিতরে আমানত রেখে দিই, তা আমার কোনো নিকটবর্তী ফেরেশতাও জানতে পারেনা, জানতে পারেনা কোনো নবী-রাসূলও।

কিন্তু হায় আফসোস! এটা কোনো হাদীসই নয়। ফাতহুল বারীর গ্রন্থকার ইমাম ইবনুল হাযার আসকালানী এটাকে হাদীস বলে মানতে রাজি হননি।

তিনি বলেছেনঃ এ কথাটি মনগড়াভাবে রচিত, রাসূল(স) এর কথা নয়। হাসান বসরী হযরত হুযায়ফার সন্ধান লাভ করেননি। তাঁর নিকট হতে হাদীস বর্ণনা করার কোনো সুযোগই তাঁর হয়নি।

কাজেই এখানে হযরত হুযাইফা(রা) হতে হাদীসটি হাসান বসরী বর্ণনা করেছেন বলে যা বলা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, নবী করীম(স) ও পরবর্তী ইসলামের স্বর্ণযুগের অনেক পরে ‘ইলমে বাতেন’ নামে পীর মুরীদী ব্যবসা এসব মিথ্যা কথাবার্তা ব্যাপক রচনা ও হাদীস নামে প্রচার করা হয়েছে। আসলে এ হলো বাতেনীয়া ফিরকার আকীদা। তারাই শরীয়তকে বাতেনী ও জাহেরী এ দু’ভাগে ভাগ করেছে। আর বাতেনীয়া ফিরকা সুন্নাত আল জামায়াতের মধ্যে গণ্য নয়। এ এক বাতিল ফিরকা। তারা নব্যুয়ত ও শরীয়তকে মানতোনা। সব হারাম জিনিসকে তারা হালাল মনে করতো।

বস্তুত কুরআন সুন্নাত থেকে বিচ্ছিন্ন এ মারিফাত মানুষকে ইসলামের তওহীদী ঈমান থেকে সরিয়ে নিয়ে বেদান্তবাদী শিরক এর মহাপংকে ডুবিয়ে দেয়। আর তা-ই ঘটেছে বর্তমানকালের অনেক পীরবাদী ও তথাকথিত তাসাউফপন্থীদের জীবন। অতএব ইসলামে এ তাসাউফের কোনো স্থান থাকতে পারেনা।

 

পীর ধরা কি ফরয?

আরো অগ্রসর হয়ে এক ধরনের অর্ধ আলিম পীর ধরা ফরয বলে দাবি করতে শুরু করেন। এজন্যে তারা দলীল হিসেবে পেশ করেন কুরআন মজীদের সে অসীলার আয়াতকে। তাঁরা বলেন ‘অসীলা’ ধরার হুকুমতো আল্লাহই দিয়েছেন কুরআন মজীদে- আর সে অসীলাই হলো পীর। অতএব পীর ধরা ফরয প্রমাণিত হলো। অথচ ইতিপূর্বে আমরা এ অসীলার আয়াতের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছি। প্রায় দশ বারো খানা প্রাচীন ও প্রামাণিক তাফসীরের উদ্ধৃতি দিয়ে দেখিয়েছি যে, আল্লাহ তা‘আলা যে ‘অসীলা’ তালাশ করতে আদেশ করেছেন তার মানে কখনো ‘পীর’ নয়, পীর ধরলেই সেই অসীলার সন্ধানের আদেশ পাওয়া যায়না। তাছাড়া প্রখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য আরবী অভিধানের উদ্ধৃতি দিয়েও দেখিয়েছি যে, ‘অসীলা” শব্দের অর্থ ‘পীর’ কেউ করেননি। মাওলানা আশরাফ আলী থানভী(রহ) মরহুম এ যুগের সর্বজনমান্য বড় তাসাউফপন্থী আলিম।কিন্তু তিনিও অসীলা শব্দের অর্থ পীর করেননি করেছেন ‘নৈকট্য’। সেজন্য তাঁর লেখা কুরআনের তরজমা দেখা আবশ্যক। বরং তিনি বলেছেন যে, জাহিল লোকেরাই এ আয়াত থেকে পীর ধরা ফরয প্রমাণ করতে চাইছে, অন্য কেউ নয়।

তাঁদের আর একটি দলীল হলো কুরআনের এই আয়াতঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ [٩:١١٩]

– হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদী লোকদের সঙ্গী হও।(আত তাওবাঃ119)।

এ আয়াত পেশ করে পীরবাদীরা বলতে চান যে, সাদেকীন বলতে তাদেরই বোঝানো হয়েছে এবং তাদের নিকট মুরীদ হয়ে তাদের সোহবত ইখতিয়ার করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অথচ দুনিয়ার কোনো লোকই এবং প্রথমকাল হতে শুরু করে বর্তমানকালের তাফসীরকারকদের মধ্যে কেউই এ থেকে পীরের নিকট মুরীদ হওয়ার আদেশ বুঝেননি, বুঝতে পারেনওনা। যদি কেউ তা বুঝতে চায়, তবে তা হচ্ছে নিজের মর্জি মত কুরআনকে ব্যবহার করা, নিজের পক্ষ সমর্থনে খামখেয়ালীভাবে কুরআনকে ব্যবহার করা। আর এ হচ্ছে অতি বড় অপরাধ- এত বড় অপরাধ যে, সুস্পষ্ট কুফরও এর সমতুল্য হতে পারেনা।

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত ইবনে আব্বাস(রা) লিখেছেন-সাদেকীন বলতে বোঝায় সে সব লোককে, যারা ঈমান এবং আল্লাহ ও রাসূলের সাথে করা আনুগত্যের ওয়াদা পূরণে সত্যবাদী প্রমাণিত হয়েছে।

এছাড়া একে সাধারণ অর্থেও ব্যবহার করা যায়। তখন এর অর্থ হবেঃ এমন সব লোক, যারা দ্বীন পালনে নিয়্যত, মুখের কথা ও আমল-সব দিক দিয়েই সত্যবাদী প্রমাণিত হয়েছে।

আল্লামা ইবনে কাসীর এ আয়াতের তাফসীরে লিখেছেনঃ সত্যবাদী হও, সত্যকে অবলম্বন করো, তাহলে তোমরা সত্যের ধারক হতে পারবে এবং ধ্বংস হতে বাঁচতে পারবে। তা তোমাদের কাজকর্মে সহজতা এনে দেবে।

আল্লামা তালুসীর মতে এর অর্থ হতে পারে বিশেষভাবে তারাও- যারা মুসলিম বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদেরকে উচ্চ স্থানে আটকে রেখেছিল।

এতে করে গোটা আয়াতের অর্থ হবেঃ তারা তিনজন যেমন ভাবে সত্য কথা বলেছিলেন, সত্যবাদিতা ও খালিস নিয়্যতে, তোমরাও তেমনি হও।(ইমামুল মোফাসসেরীন আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে আহমদ আল-আনসারী আল কুরতুবী তাঁর সুবিখ্যাত তাফসীরে এ আয়াতের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন; কিন্তু তাতে পীর ধরা বোঝায় ও পীরের সঙ্গ গ্রহণের নির্দেশ হয়েছে বল উল্লেখ করেননি)।

কুরআন মজীদের অপর এক আয়াতে সাদেকীন শব্দের সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। আয়াতটি এইঃ

আরবী(**********)

-সেসব ফকীর গরীব মুজাহিরদের জন্যে, যারা তাদের ঘর-বাড়ি থেকে বহিষ্কৃত এবং ধন-মাল থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তারা আল্লাহর নিকট থেকে অনুগ্রহ ও সন্তোষ পেতে চায়। আর তারা আল্লাহ ও রাসূলের সাহায্য করে। প্রকৃতপক্ষে এরাই সাদেকীন, সত্যবাদী।

 এখানে ‘সাদেকীন’ বা সত্যবাদী লোকদের পরিচয় দিয়ে বলা হয়েছে যে, তারা দ্বীন ইসলামের কারণে ঘর-বাড়ি থেকে বহিষ্কৃত, ধন-মাল থেকে বঞ্চিত, তাঁরা সব সময় আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তোষ পেতে চায় এবং সেজন্য তারা সবসময় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাহায্য কামনা করে দ্বীন কায়েম করার ব্যাপারে। এতো কোনো পীরের পরিচয় নয়।

আমি মনে করি, এ পর্যায়ের লোকই বোঝা যেতে পারে সাদেকীন শব্দ থেকে। নাফে বলেছেন যে, যে তিনজন লোক তাবুক যুদ্ধে মুজাহিদীন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন তাদের কথাই বলা হয়েছে এখানে। এছাড়া নবী করীম(স) এবং তাঁর সাহাবীগণও এর অর্থ হতে পারেন, বলেছেন ইবনে উমর(রা)। সাঈদ ইবনে জুবায়ের বলেছেন যে, এ আয়াতে ‘সাদেকীন’ বলতে বোঝানো হয়েছে হযরত আবু বকর সিদ্দীক ও হযরত উমর ফারূক(রা)কে। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায় যে, সাদেকীন অর্থ পীর, আর এ আয়াতে পীর ধরার নির্দেশ দেয়া হয়েছে-এ কথা বলা হচ্ছে কোন দলীলের ভিত্তিতে।

পীর মুরীদী সম্পর্কে মুজাদ্দিদে আলফেসানীর বক্তব্য

এ সম্পর্কে আমরা বেশি শুনতে চাইব মুজাদ্দিদে আলফেসানী শায়খ আহমদ সরহিন্দীর নিকট থেকে, জানতে চাইব তাঁর মতামত। কেননা পাক-ভারতে একদিকে তিনি যেমন তাসাউফ বা ইলমে মারিফাতের গোড়া তেমনি আকবরী ‘দ্বীনি-ইলাহী’ ফিতনা ও ইসলামের দুশমনির সয়লাবের মুখে তিনি প্রকৃত দ্বীন ইসলামকে জাগিয়ে তুলেছেন। কাজেই তাসাউফ সম্পর্কে তাঁর মতামত ‘আপনি আমি বা সে’ এর তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মত পেশ করা এজন্যও বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে, এ দেশের পীরের সাধারণত তাঁকেই সব পীরের গোড়া বলে দাবি করে থাকেন।

শরীয়ত ও মারিফাত পর্যায়ে তিনি তাঁর ‘মকতুবাত’ এ লিখেছেন-

কাল কিয়ামতের দিন শরীয়ত সম্পর্কেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, তাসাউফ সম্পর্কে কিছূই জিজ্ঞাসা করা হবেনা। জান্নাতে যাওয়া ও জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাওয়া শরীয়তের বিধান পালনের উপর নির্ভরশীল। নবী-রাসূলগণ-যাঁরা গোটা সৃষ্টিলোকের মাঝে সর্বোত্তম-শরীয়ত কবুল করারই দাওয়াত দিয়েছেন, পরকালীন নাজাতের জন্য শরীয়তই একমাত্র উপায় বলে ঘোষণা করেছেন। এ মহান মানবদের দুনিয়ায় আগমনের উদ্দেশ্যই হলো শরীয়তের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা। সবচেয়ে বড় নেকীর কাজ হলো শরীয়তকে চালু করা। এবং শরীয়তের বিধানসমূহের মধ্যে একটি হুকুমকে হলেও জিন্দা করা বিশেষ করে এমন সময় যখন ইসলামের নিদর্শনসমূহ ধ্বংস হয়ে গেছে। কোটি কোটি টাকা আল্লাহর পথে খরচ করাও শরীয়তের কোনো একটি মাসালাকে রেয়াজ দেয়ার সওয়াবের সমান হতে পারেনা।

মুজাদ্দিদে আলফেসানী(রহ) এ পর্যায়ে আরো একটি প্রশ্নের বিশদ ও স্পষ্ট জবাব দিয়েছেন। সাধারণ্যে প্রচলিত মত জাহিল পীরেরা ও তাদের মুরীদেরা প্রচার করে বেড়ায় যে, শরীয়ত হচ্ছে দ্বীনের বাইরের দিকের চামড়া, আর আসল মগজ হচ্ছে তরীকত বা মারিফাত। একথা বলে যারা শরীয়তের আলিম, কিন্তু তরীকত, মারিফাত ইত্যাদির ধার ধারেননা, শরীয়তকেই যথেষ্ট মনে করেন-তাঁদের ফাসিক ও বিদয়াতী ইত্যাদি বলে অভিহিত করে, তাঁদের সমালোচনা করে এবং তাঁদের দোষ গেয়ে বেড়ায়। এর জবাবে মুজাদ্দেদি আলফেসানীর-যিনি এদেশের প্রকৃত মারিফাতেরও গোড়া-তাঁর দাঁতভাঙ্গা জবাব শুনুন।

তিনি বলেছেনঃ শরীয়তের তিনটি অংশ রয়েছে। ইলম(শরীয়তকে জানা), আমল(শরীয়ত অনুযায়ী কাজ) এবং ইখলাস(নিষ্ঠা)। তরীকত ও হাকীকত উভয়ই শরীয়তের এই তৃতীয় অংশ-ইসলামের পরিপূরক হিসেবে শরীয়তের খাদেম মাত্র। এটিই আসল কথা, কিন্তু সকলে এতদূর বুঝতে সক্ষম হয়না। অধিকাংশ আলেম লোক কল্পনার সুখ স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে। আর বেহুদা অর্থহীন ও অকাজের কথাবার্তা বলাই যথেষ্ট মনে করে। এ লোকেরা শরীয়তের প্রতিপালন সম্পর্কে কি জানে, কি বুঝবে! তরীকতের হাকীকতই বা এরা কি বুঝবে! এরা শরীয়তকে চামড়া বা বাইরের জিনিস মনে করে বসে আছে আর হাকীকতকে মনে করছে মূল, মগজ ও আসল। আসল ব্যাপার কি, তা এরা আদৌ বুঝতে পারছেনা। সুফী লোকদের-পীরদের বেহুদা অর্থহীন কথাবার্তা নিয়ে অহমিকায় নিমগ্ন রয়েছে এবং মারিফাতের ‘আহওয়াল’ ও ‘মাকামাত’ এর মধ্যে পাগল হয়ে ঘুরে মরছে তারা। আল্লাহ তা‘আলা এ লোকদেরকে সঠিক পথে হেদায়াত করুন এ দোয়া করি।

শরীয়ত ও মারিফাতকে যারা দুটো জিনিস মনে করে নিয়েছে এবং তরীকতের অর্থহীন অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তায় যারা নিমগ্ন হয়েছে, মোজাদ্দেদি আলফেসানী(রহ) তাদেরকে জাহিল ও বিভ্রান্ত লোক বলে অভিহিত করেছেন। মুজাদ্দিদে আলফেসানীর এ কথা যে সম্পূর্ণ সত্য ও একান্তই নির্ভূল, তাতে অন্তত শরীয়তের আলিমদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। বস্তুত শরীয়তের আলিম ও জাহিল পীর ও তাদের অন্ধ মুরীদদের মাঝে মতভেদ শুরু থেকেই চলে এসেছে। শরীয়ত এর আলিমগণ ইসলামী শরীয়ত আর তরীকতের বিভক্তিকে কোনোদিনই সমর্থন করেননি, চিরদিনই এর বিরোধিতা করেছেন-এ জিনিসকে দ্বীন ইসলামের বাইরে থেকে আমদানি করা এক মারাত্মক বিদয়াত বলে ঘোষণা করেছেন। কিন্তু আজ জাহিল পীরেরা নিজেদের বৈষয়িক স্বার্থের জন্য এবং শরীয়ত পালন ও কায়েমের দায়িত্বপূর্ণ কাজ থেকে দূরে খানকা শরীফের চার দেয়ালের মধ্যে সহজ ও সস্তা সুন্নাত পালনের অভিনয় করার জন্য শরীয়ত থেকে বিচ্ছিন্ন ‘তরীকত’ নামের এক নতুন বস্তু প্রচলন করেছে। এরূপ অবস্থায় কার কথা বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে গ্রহণ করা যাবে? আলিমদের, না সূফী ও পীরদের? এর জবাব দিয়েছেন মুজাদ্দেদি আলফেসানী(রহ)। তিনি বলেছেনঃ জেনে রাখা ভালো, যে বিষয়ে সূফী, পীর ও শরীয়তের আলিমদের মাঝে মতভেদ হয়, ভালোভাবে চিন্তা ও অধ্যয়ন করলে দেখা যাবে যে, সে বিষয়ে আলিমদের মত-ই হক। এর কারণ এই যে, আলিমগণ নবী রাসূলগণের অনুসরণ করার মাধ্যমে নব্যুয়তের গভীর মাহাত্ম এবং তদলব্ধ ইলম লাভ করতে পেরেছেন। আর সূফী পীরদের দৃষ্টি বেলায়েতের কালিমাত ও তত্ত্বকথার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে।

পীরদের মুরীদ বানানো ব্যবসার সবচেয়ে বড় মূলধন হচ্ছে কাশফ ও ইলহামের দোহাই। পীরেরা যখন বলে আমার কাশফ হয়েছে-ইলহামযোগে আমি একথা জানতে পেরেছি’-তখন জাহিল মুরীদান ভক্তিতে গদগদ হয়ে কদমবুসি করতে শুরু করে। কিন্তু এসব জিনিস যে পীর মুরীদীর ব্যবসা চালাবার জন্য হয়, তা বুঝবার ক্ষমতা এই মূর্খ পীরদের নেই। ‘ইলহাম’ হতে পারে, কাশফও হয়, হয় আল্লাহর মেহেরবানীতে। যদি কেউ তা লাভ করে তাহলে অন্য লোকদের তা না বলে আল্লাহর শোকর আদায় করা উচিত। কিন্তু জাহিল পীরেরা শরীয়তের ধার ধারেনা। তারা ইলহামের দোহাই দিয়ে জায়েয-নাজায়েয, হালাল-হারাম ও ফরয ওয়াজিব ঠিক করে ফেলে। আর অন্ধ মুরীদরা তাই মাথা পেতে নেয়, শরীয়তের হুকুমের প্রতি তাকাবার খেয়ালও জাগেনা। এ সম্পর্কে মুজাদ্দেদি আলফেসানীর কথাই আমাদেরকে নির্ভূল পথ-নির্দেশ করতে পারে। তিনি বলেছেনঃ

কিয়াস ও ইজতিহাদ শরীয়তের মূলনীতিসমূহের মধ্যে অন্যতম। তা মেনে চলার জন্য আমাদেরকে আদেশ করা হয়েছে।কিন্তু কাশফ ও ইলহাম মেনে নেয়ার কোনো নির্দেশ আমাদেরকে দেয়া হয়নি। উপরন্তু ইলহাম অপর লোকের বিরুদ্ধে দলীল নয়। ইজতিহাদ মুকাল্লীদ এর জন্য দলীল(মেনে চলতে বাধ্য)। অতএব মুজতাহিদ আলিমদের মেনে চলাই উচিত এবং তাঁদের মতের ভিত্তিতে দ্বীনের নীতি তালাশ করা কর্তব্য। আর সূফীরা মুজতাহিদ আলিমদের মতের বিপরীত যা কিছু বলে বা দাবি করে, তা মেনে চলা কিছুতেই উচিত নয়।

সবচেয়ে দুঃখের বিষয়, পীর ও জাহিল লোক নিজেরা যেমন সাধারণত জাহিল হয়ে থাকে, মুরীদদেরকেও তেমনি জাহিল করে রাখতে চায় এবং তাদের দ্বীন-ইসলাম ও ইসলামী শরীয়ত সম্পর্কে কুরআন হাদীস সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার জন্য কখনো হেদায়াত দেয়না। পীর কিবলা মুরীদকে মুরাকাবা করতে বলবে, আল্লাহর যিকির করতে বলবে এবং হাযার বার করে ‘বানানো দুরুদ শরীফের অজীফা’ পড়তে বলবে; কিন্তু আল্লাহর কালাম দ্বীন ইসলামের মূল উৎস কুরআন মজীদ তিলাওয়াত করতে, তার তরজমা ও তাফসীর বুঝতে এবং আল্লাহর কথার সাথে গভীরভাবে পরিচিত হতে কখনোই বলবেনা। বস্তুত এ এক আশ্চর্যের ব্যাপার। কিন্তু মুজাদ্দিদে আলফেসানী(রহ) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেনঃ

অধিক জরুরী নসীহত হলো এই যে, কুরআন শরীফের অধ্যয়নে ও পড়াশোনায় কোনোরূপ ত্রুটি করবেনা। আপনার সমস্ত সময় যদি এই অধ্যয়নে ব্যয় হয়ে যায় যায় তাহলে ভালো। যিকির ও মুরাকাবার কোনো লাভ করবেননা।

মোগলদের ইসলাম বিরোধী শাসন আমলে মুজাদ্দিদে আলফেসানী যখন দ্বীন ইসলাম প্রচার এবং বাতিলের প্রতিবাদ শুরু করেন, তখন বাতিল পীরেরা তাঁর এ কাজের পথে অন্যতম প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। তিনি তখন স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন যে, এ বাতিলপন্থী পীরদের উৎখাত এবং তাসাউফের সংশোধন না হলে দ্বীন-ইসলামকে সঠিকভাবে প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করা যাবেনা। এজন্য তিনি তাসাউফের অনেকখানি সংশোধনও করেছেন, মুক্ত করেছেন তাকে বাতিল চিন্তা ও তরীকা থেকে।

আসল কথা হলো, পীরবাদ মোটেই ইসলামী জিনিস নয়। ইসলামের আলোকোজ্জ্বল পরিবেশে তার প্রচলন হয়নি। তার উন্মেষই হয়েছে ইসলামের পতন যুগে। অবশ্য ইসলামের অনেক মনীষীও ইলমে তাসাউফের মাধ্যমে জনগণকে দ্বীন ইসলামের দিকে নিয়ে আসতে চেষ্টা করেছেন; কিন্তু পীরবাদে যে মূল দোষত্রুটি ছিল, তার বীজ রয়েই গেছে এবং তা সৃষ্টি করেছে একটি বিষবৃক্ষ। বর্তমানে তাই এক বিরাট বৃক্ষে পরিণত হয়ে জনগণকে চরমভাবে বিভ্রান্ত করেছে, বিষাক্ত করেছে জনগণের আকীদা ও আমলকে। দ্বীন ইসলামের মূল সুন্নাতকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য এ বাতিল পীরবারে মূলোৎপাটন আজও অপরিহার্য্ , যেমন অপরিহার্য্ ছিল মোজাদ্দিদে আলফেসানীর জীবনকালে।

পীরবাদ বা বায়আত গ্রহণ রীতি

বর্তমান পীর মুরীদী ক্ষেত্রে মুরীদকে বায়’আত করা, মুরীদের নিকট হতে বায়’আত গ্রহণ এবং মুরীদের পক্ষে পীরের নিকট বায়’আত করা এক মৌলিক ব্যাপার। বস্তুত বায়’আত করা সুন্নাত মোতাবিক কাজ বটে; কিন্তু পীর-মুরীদীর বায়’আত সম্পূর্ণ বিদয়াত, যেমন বিদয়াত স্বয়ং পীর-মুরীদী।

‘বায়’আত’ আরবী শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ হলো ক্রয় বা বিক্রয় করা। এ শব্দটি বললেই দুটি পক্ষের কথা মনে জাগে। একপক্ষ বায়’আত করে আর অপরপক্ষ বায়’আত কবুল করে। একজন বিক্রেতা, অপরজন ক্রেতা। এই ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যাপারটি বড়ই সঙ্গীন। ইসলামে এর স্থান কোথায়, কি এর প্রকৃত ব্যাপার এবং সে ক্ষেত্রে সু্ন্নাত তরীকাই বা কি তা আমাদের বিস্তারিত জানতে হবে।

‘বায়’আত’, শব্দের ব্যাখ্যাদান প্রসঙ্গে ইমাম রাগেব ইসফাহানী লিখেছেনঃ

যখন কেউ কোনো সার্বভৌমত্বের আনুগত্য স্বীকার করে তাকে মেনে চলার স্বীকৃতি দেয়, তখন এ কাজকে বলা হয় ‘বায়’আত’ করা বা পারস্পরিক বায়’আত গ্রহণ। আর এ থেকেই বলা হয়ঃ সে সার্বভৌমের নিকট বায়’আত করেছে বা দুজন পারস্পরিক বায়’আত করেছে।

কুরআন মজীদে আল্লাহ তা’আলা রাসূল(সা) এর নিকট সাহাবাদের বায়’আত করার কথা উল্লেখ করেছেন নানা জায়গায়। প্রথমত যেসব লোক প্রথম ঈমান এনে ইসলাম কবুল করতো, তারা রাসূলের নিকট বায়’আত করতো, রাসূল তাদের নিকট বায়’আত কবুল করতেন। সূরা আল ফতহুর আয়াতে হুদায়বিয়ার গৃহীত ‘বায়’আতের’ উল্লেখ প্রসঙ্গে বলা হয়েছেঃ

إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ ۚ فَمَن نَّكَثَ فَإِنَّمَا يَنكُثُ عَلَىٰ نَفْسِهِ ۖ وَمَنْ أَوْفَىٰ بِمَا عَاهَدَ عَلَيْهُ اللَّهَ فَسَيُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا [٤٨:١٠]

-হে নবী, যারা তোমার নিকট বায়’আত করে তারা আসলে বায়’আত করে আল্লাহরই নিকটে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর সংস্থাপিত। অতঃপর যেই এই এ বায়’আত ভঙ্গ করে, এ বায়’আত ভঙ্গের ক্ষতি তার নিজের ওপরই চাপবে। আর যে তা পুরো করবে, যা সে আল্লাহর সাথে ওয়াদা করছে, তাকে অবশ্যই বিরাট প্রতিফল দেয়া হবে।

এ আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বায়’আত ইসলামী জীবনধারার এক মৌল ব্যাপার। কিন্তু সে বায়’আত রাসূলের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয় স্বয়ং আল্লাহর সাথে এবং সে বায়’আত হলো খালিস ও পূর্ণাঙ্গভাবে আল্লাহর দাসত্ব কবুল করার বায়’আত, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে চলার বায়’আত, আল্লাহর পথে তাঁর দ্বীন কায়েমের লক্ষ্যে আত্মদানের বায়’আত, জিহাদে শরীক হওয়ার বায়’আত।

এ হলো সাধারণ পর্যায়ে বায়’আত। এ পর্যায়ের আর এক বায়’আতের কথা উল্লেখ হয়েছে, যা রাসূলে করীম(স) গ্রহণ করতেন মুমিন মহিলাদের নিকট থেকে।

সূরা মুমতাহিনায় বলা হয়েছেঃ

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا جَاءَكَ الْمُؤْمِنَاتُ يُبَايِعْنَكَ عَلَىٰ أَن لَّا يُشْرِكْنَ بِاللَّهِ شَيْئًا وَلَا يَسْرِقْنَ وَلَا يَزْنِينَ وَلَا يَقْتُلْنَ أَوْلَادَهُنَّ وَلَا يَأْتِينَ بِبُهْتَانٍ يَفْتَرِينَهُ بَيْنَ أَيْدِيهِنَّ وَأَرْجُلِهِنَّ وَلَا يَعْصِينَكَ فِي مَعْرُوفٍ ۙ فَبَايِعْهُنَّ وَاسْتَغْفِرْ لَهُنَّ اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ [٦٠:١٢]

–হে নবী, মুমিন মহিলারা যদি তোমার নিকট এসে বায়’আত করে এসব কথার ওপর যে, তারা আল্লাহর সাথে একবিন্দু শিরক করবেনা, তারা চুরি করবেনা, তারা যিনা-ব্যভিচার করবেনা, তারা তাদের সন্তান হত্যা করবেনা, তারা প্রকাশ্যভাবে মিথ্যামিথ্যি কোনো অমূলক কাজের দোষ কারো ওপর আরোপ করবেনা, আর তারা ভালো পরিচিত কাজে তোমার নাফরমানী করবেনা, তাহলে তুমি তাদের নিকট থেকে এ বায়’আত গ্রহণ করো, আর আল্লাহর নিকট তাদের জন্যে মাগফিরাতের দো’আ করো, আল্লাহ নিশ্চিতই বড় ক্ষমাশীল এবং অতীব করুণাময়। (মুমতাহিনাঃ১২)

এ আয়াত স্পষ্ট বলে দিচ্ছে যে, নবী করীম(স) কি কি বিষয়ে মুসলিম মেয়েদের নিকট থেকে বায়’আত গ্রহণ করেছেন। বিষয়গুলো যে ইসলামী ঈমান ও আমলের একেবারে মৌলিক,- কবীরা গুনাহ না করার প্রতিশ্রুতিতেই যে বায়’আত গ্রহণ করা হয়েছে-তা স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে। কাজেই সু্ন্নাত অনুযায়ী ‘বায়’আত’ হলো শুধু তাই, যা এসব বিষয়ে এবং এ ধরনের মৌলিক বিষয়েই করা হবে বা গ্রহণ করা হবে। এক কথায়, ইসলামের হুকুম আহকাম পুরোপুরি পালন করার এবং শরীয়তের বরখেলাপ কোনো কাজ না করার ওয়াদা দিয়ে ও নিয়ে-ই যে বায়’আত করা বা গ্রহণ করা হয় তা-ই হলো সুন্নাত মোতাবিক বায়’আত। এরূপ বায়’আত গ্রহণই সুন্নাত হতে পারে অন্য কোনোরূপ বায়’আত নয়।

দ্বিতীয়, বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতি ও প্রয়োজন অনুসারে নবী করীম(স) মুসলমানদের নিকট হতে বায়’আত গ্রহণ করেছেন। এ পর্যায়েরই বায়’আত হলো বায়’আতে রেজওয়ান। এ সম্পর্কে কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ

لَّقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا [٤٨:١٨]

–যেসব মু’মিন লোক গাছের তলায় বসে হে নবী! তোমার নিকট বায়’আত করেছিল, আল্লাহ তাদের প্রতি রাজি ও খুশি হয়েছেন। তাদের মনের আবেগ ও দরদের ভাবধারা তিনি ভালোভাবেই জেনেছিলেন এবং তাদের প্রতি পরম গভীর শান্তি নাযিল করেছিলেন এবং নিকটতর বিজয় দানেও তাদের ভূষিত করেছিলেন।(আল ফাতহঃ১৮)

হাদীস থেকে প্রমাণিত যে, এরূপ বায়’আত করার জন্য নবী করীম(স) সমস্ত সাহাবীদের আহবান করেছিলেন। এই বায়’আত সম্পর্কে তখনকার লোকেরা বলতোঃ নবী করীম (স) তো লোকদের নিকট হতে মৃত্যু কবুল করার বায়’আত গ্রহণ করেছিলেন।

আর হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ বলেনঃ

নবী করীম(স) ঠিক মৃত্যু কবুলের জন্য বায়’আত গ্রহণ করেননি। বরং আমরা বায়’আত গ্রহণ করেছি এর ওপর যে, আমরা কেউ-ই যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যাবনা। ফলে লোকেরা বায়’আত করেছিল এবং উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে কেবল বনী সালমা গোত্র সরদার জা্দ্দ ইবনে কায়স ছাড়া কেউই পালিয়ে যায়নি।(তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৪র্থ খন্ড)।

‘বায়’আতে রেজওয়ান’ যে কঠিন মুহুর্তে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং কি গুরুতর ব্যাপার নিয়ে তা  গ্রহণ করা হয়েছিল, এ আলোচনা থেকে স্পষ্ট জানা গেল। অনুরূপভাবে জিহাদের ক্ষেত্রেও নবী করীম(স) বায়’আত গ্রহণ করতেন।

হযরত আনাস ইবনে মালিক(রা) বলেনঃ আনসার লোকেরা বলতো-আমরা খন্দকের দিন নবীর নিকট জিহাদের জন্য বায়’আত করেছি, যদ্দিন আমরা বেঁচে থাকব তদ্দিনের জন্য।

অন্য হাদীস থেকে এ প্রমাণও পাওয়া যায় যে, নবী করীম(স) সাধারণভাবে আনুগত্যের বায়’আতও গ্রহণ করতেন এবং লোকেরা তা করতো। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর(রা) বলেনঃ আরবী(********)

-আমরা রাসূলে করীম (স) এর নিকট শোনা ও মেনে চলার(আনুগত্য করার জন্য) বায়’আত করতাম। রাসূল(স) সে বায়’আত গ্রহণ করতেন। তবে এ বায়’আতে নবী করীম(স) আমাদেরকে ‘যতদূর আমাদের ক্ষমতা কুলায়’ বলে একটি শর্ত আরোপ করেছেন।

রাসূল (স) এর জামানায় এই ছিল তাৎপর্য্ ও ব্যবহার। পরবর্তীকালে সাহাবীদের যুগেও এই বায়’আত ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু তা হয়েছে শুধু রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে খলীফার আনুগত্য করার শপথ বা প্রতিশ্রুতি দেয়ার জন্য। যেমন নবী করীম(স) এর ইন্তিকালের পর খলীফা নির্বাচনী সভায় হযরত উমর ফারূক(রা) সর্বপ্রথম বায়’আত করলেন হযরত আবু বকর(রা) এর হাতে।

এ সম্পর্কে হাদীসে বলা হয়েছেঃ আরবী (*********)

-হযরত উমর আবু বকরকে লক্ষ্য করে বললেনঃ না, আমরা তো আপনার হাতে বায়’আত করবো, আপনিই আমাদের সরদার, আমাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি এবং নবী করীমের নিকট আমাদের অপেক্ষা সর্বাধিক প্রিয় লোক। অতঃপর উমর ফারূক (রা) তাঁর হাত ধরলেন এবং বায়’আত করলেন, আর সেই সঙ্গে উপস্থিত সব লোকই বায়’আত করলো।

এ ঘটনা থেকে একথা প্রমাণিত হচ্ছে যে, বায়’আত করা এবং বায়’আত গ্রহণ করা মুসলিম সমাজে একটি সুন্নাত হিসেবেই চালু রয়েছে। নবী করীম (স) এর পরেও কিন্তু সে বায়’আত ছিল হয় জিহাদে যোগদান করার জন্য, না হয় রাষ্ট্রীয় আনুগত্য প্রকাশের জন্য।

কিন্তু পীর মুরীদীর ক্ষেত্রে- চিশতীয়া, নকশবন্দীয়া মুজাদ্দিদীয়া ও মুহাম্মদীয়া তরীকায় ফকীর-হাকীরের হাতে বায়’আত নেয়ার বর্তমানে প্রচলিত এই সিলসিলা এল কোথ্থেকে, এ বায়’আতের সাথে নবী করীম(স) ও সাহাবাদের বায়’আতের সম্পর্ক কি?-মিল কোথায়? আসলে এ হচ্ছে একটি ভালো কাজকে খারাপ উদ্দেশ্যে ও খারাপ ক্ষেত্রে ব্যবহার করার মতো ব্যাপার। কাজটা ভালো, কিন্তু তা খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। আর এ কারণেই পীর মুরীদীর ক্ষেত্রে হাতে হাতে কিংবা পাগড়ী ধরে অথবা পাগড়ী ধরা লোকের গায়ে গা মিলিয়ে বায়’আত করা, বায়’আত করা নানা তরীকায় মুরাকাবা করার জন্য-সম্পূর্ণ বিদয়াত। আরো বড় বিদয়াত হলো কুরআন বাদ দিয়ে মুরীদ ও পীরের ‘দালায়েলুল খয়রাত’ নামে এক বানানো দুরুদ সম্বলিত কিতাবের তিলাওয়াতে মশগুল হওয়া। মনে হয় এর তিলাওয়াত যেন একেবারে ফরয। কিন্তু শরীয়তে কুরআন ছাড়া আর কিছু তিলাওয়াত করা বড় সওয়াবের কাজ মনে করা, কুরআন অপেক্ষা অন্য কোনো মানবীয় কিতাবকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করা সুস্পষ্টরূপে এক বড় বিদয়াত।

শুধু তা-ই নয়, বায়’আত শব্দের আভিধানিক অর্থ বিক্রয় করা। যে লোকই ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ পড়েছে ও বিশ্বাস করেছে, সে তো নিজেকে আল্লাহর নিকট বিক্রয় করেই দিয়েছে, সে নতুন করে নিজেকে কোনো পীরের নিকট বিক্রয় করতে পারে কোন অধিকারে?

আল্লাহ ঘোষণা করেছেনঃ

إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَىٰ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُم بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ

–নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদের নিকট হতে তাদের জান ও মালকে ক্রয় করে নিয়েছেন এ শর্তে যে, তিনি এর বিনিময়ে জান্নাত লাভ করবেন।(আত তাওবাঃ১১১)

(এ আয়াত অনুযায়ী ক্রেতা হচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ, বিক্রেতা হচ্ছে মুমিন ব্যক্তি। বিক্রয়ের জিনিসগুলো হলো মুমিন ব্যক্তির নিজ সত্তা এবং তার মূল্য হচ্ছে জান্নাত দানের ওয়াদা। এ ক্রয়-বিক্রয় যথারীতি সম্পন্ন হয়ে গেছে, যখনই একজন লোক সচেতন মনে পড়ছেঃ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।)

কাজেই আল্লাহর নিকট জান মাল বিক্রয় করার পর তা যদি কোনো পীরের হাতে পুনরায় বিক্রয় (বায়’আত) করে তবে তা হবে অনধিকার চর্চা, সুস্পষ্ট শিরক।

(উপরন্তু আল্লাহ ও রাসূলের নিকট বায়’আত করার উদ্দেশ্য যে দ্বীনের জন্য জিহাদ করা, তা আয়াতের পরবর্তী শব্দগুলোতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। অথচ পীরদের নিকট বায়’আত করার উদ্দেশ্য হলো চোখ বন্ধ করে মুরাকাবা মুশাহিদা করা, যিকির করা, কল্পনার জগতে উড়ে বেড়ানো। এ ধরনের বায়’আতের মধ্যে আসমান জমীনের পার্থক্য।)

কিন্তু তা সত্ত্বেও সায়্যিদ আহমদ শহীদ কোনো পীর-মুরীদী করেছিলেন তা বলিষ্ঠভাবে প্রমাণিত নয়। বরং তাঁর প্রামাণ্য জীবনী গ্রন্থে এই কথাগুলো বলিষ্ঠভাবে উদ্ধৃত পাওয়া যায়।

তিনি যখন দিল্লীতে অবস্থানকারী শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভীর সুযোগ্য পুত্র এবং কুরআন-হাদীস ও সমসাময়িক যুগের সকল সূক্ষ্ম জ্ঞান বিজ্ঞানে পারদর্শী শাহ আবদুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভীর নিকট মৌখিকভাবে কুরআন হাদীসের শিক্ষা লাভ করে বেরেলী ফিরে আসলেন, তখন তিনি নিজের বাসগৃহে বসবাস না করে মসজিদে অবস্থান গ্রহণ করলেন এবং কুরআন হাদীসের ভিত্তিতে জনগণকে ওয়াজনসীহত করতে শুরু করলেন। তখন বিপুল সংখ্যক জনতা তাঁর হাতে বায়’আত করে তাঁর মুরীদ হওযার প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করলো এবং তাঁকে সেজন্য বাধ্য করতে চেষ্টা করতে লাগলো। তিনি মুরীদ বানাতে স্পষ্ট ভাষায় অস্বীকার করলেন এবং বললেন-মুসলমানদের পক্ষে আল্লাহ ও তাঁর রাসূরের মুরীদ হওয়াই যথেষ্ট। মিথ্যা বলবেনা, ধোঁকা দিবেনা, নিজের স্বার্থের খাতিরে অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করবেনা-এটাই তোমাদের প্রতি নসীহত। তোমরা যদিও কারো মুরীদ হলে এবং তারপরেও এসব কাজ করতে থাকলে, তাহলে সে মুরীদী তোমাকে কোনো ফায়দা দিবেনা। আর যদি নেক নিয়্যতে এসব নেক আমল পাবন্দীর সাথে করলে তাহলে তোমাকে কারো নিকট মুরীদ হবার প্রয়োজন হবেনা। তখন তোমরা নিজেরাই নিজেদের পীর হবে এবং স্বীয় বিদ্রোহী নফসকে তোমাদের মুরীদ বানিয়ে দিবে। তোমরা তোমাদের নফসের নিকট হতে বায়’আত গ্রহণ করো, যেন তা কোনোদিনই শয়তানী ওয়াসওয়াসার অনুসরণকারী না হয়। পরকালের নাজাত পাওয়ার এটাই হচ্ছে যথেষ্ট পন্থা।

বস্তুত নবী করীম(স) এর বায়’আত গ্রহণের অন্তর্নিহিত মৌল ভাবধারার সাথে সায়্যিদ আহমদ শহীদের উপরোক্ত কথাগুলোর যে মিল রয়েছে তা সহজেই বুঝতে পারা যায় । তিনি স্বভাবতই পীর মুরীদী পছন্দ করতেননা। লোকেরা তাঁর সম্মুখে মাথা নত করে বসে থাকবে ও তাঁর তাজীম করবে, তাঁর প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা জাহির করবে তা তিনি খুবই অপছন্দ করতেন। তাই এসব কিছু প্রত্যাখ্যান করে তিনি সেনাবাহিনীতে চাকরী গ্রহণ করে বহু দূরে চলে যান। উত্তরকালে তিনি জিহাদের জন্য যে বায়’আত গ্রহণ করতেন তা অনস্বীকার্য্।

গদীনশীন হওয়ার বিদয়াত

এ পর্যায়ে আর একটি বড় প্রশ্ন হলো এই যে, পীর-মুরীদীর ক্ষেত্রে এই যে, ‘গদিনশীন পীর’ হওয়ার প্রখা চালু রয়েছে ইসলামী শরীয়তে এর কোনো ভিত্তি আছে কি? কোনো মতে একজন লোক যদি একবার পীর নামে খ্যাত হতে পারলো, অমনি তাঁর বড় পুত্র অবশ্যই তাঁর গদীনশীন হবে। কিন্তু পীরের গদী কোনটি, যার ওপর বড় সাহেব ‘নশীন’ হন? পীর কি জমিদার যে, তার মৃত্যুর পর তার বড় পুত্র বাবার স্থলে জমিদার হয়ে বসবে? পীর-মুরীদী কি কোনো রাজা প্রজার ব্যাপার-পীর সাহেব রাজা বাদশাহ এবং মুরীদরা তার প্রজা, আর সে রাজার অন্তর্ধানের পর অমনি তার বড় পুত্র সিংহাসনে আসীন হয়ে বসবে? না পীর কোনো বড় দোকানদার যে, তার মরে যাওয়ার পরে সে দোকানদারের গদীর মালিক হয়ে বসবে তার বড় ছেলে? …এর কোনটি? এর মধ্যে যা-ই হোক, এর কোনোটির সাথে যে ইসলামের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক্ নেই, তা তো স্পষ্ট কথা। ইসলামে নেই কোনো জমিদারী. বাদশাহী; নেই দ্বীন নিয়ে এখানে কোনো দোকানদারী ব্যবসা চালাবার অবকাশ।

শুধু তা্-ই নয়, কেউ পীর বলে খ্যাত হলে অমনি তার ছেলেরা ‘শাহ’ বলে অভিহিত হতে শুরু করে। ‘শাহ’ মানে বাদশাহ। পীরের ছেলেকে ‘শাহ’ বা ‘বাদশাহ’ বলার এই মানে হতে পারে যে, পীর সাহেব নিজে একজন বাদশাহ; আর তার ছেলেরা খুঁদে বাদশাহ-বাদশাহজাদা। বুড়ো বাদশাহর চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর ছেলেদের মধ্যে যে বড়, সে অমনি পীর-গদীনশীন হয়ে বসবে, আর অমনি তার পুত্রেরা পূর্বানুরূপ শাহ উপাধিতে ভূষিত হতে শুরু করবে। এই চিরন্তন নিয়ম আবহমান কাল হতে চলে আসছে, এর ব্যতিক্রম দেখা যায়নি কখনো, কোনো ক্ষেত্রেই।

এ থেকে স্পষ্ট বুঝতে পারা যায় যে, পীর মুরীদী প্রথাটাই একটা জাহিলিয়াতের প্রথা। অন্তত এ কথাটাতো পরিষ্কার যে, এটা প্রচলিত হয়েছে এমন এক যুগে, যখন সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রচন্ড বাদশাহী প্রথা প্রতিষ্ঠিত ছিল। সামাজিক রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এ সর্বাত্মক ব্যবস্থার প্রভাব নিতান্ত ধর্মীয় ক্ষেত্রেও এমন প্রচন্ড হয়ে পড়েছিল যে, ধর্মীয় নেতৃত্বকেও অনুরূপ এক বাদশাহী মনে করা হয়েছে। বাদশাহীর ন্যায় ‘বাদশাহের ছেলে বাদশাহ হবে’ এই নীতি অনুযায়ী ‘পীরের ছেলেও পীর হবে’ এ ধারণাও বদ্ধমূল করে নেয়া হয়েছে।

বাদশাহর ছেলেকে বলা হয়-শাহজাদা-এ ঠিক শাব্দিক অর্থেই সঠিক প্রয়োগ(ইংরেজীতে বলা হয় Prince), পীরের ছেলেকেও তাই শাহ বলা হতে লাগলো-কৃত্রিম অর্থে। কেননা পীরও আসলে বাদশাহ নয়। আর তার ছেলেও নয় বাদশাহজাদা। এখানে মজার ব্যাপার এই যে, পীরের ছেলেরাই সবকিছু, তারাই শাহ নামে অভিহিত হয়, তাদের মধ্যে যে বড় সেই হয় গদীনশীন। কিন্তু বেচারী মেয়েদের কোনো অধিকার স্বীকৃত নয়, না মেয়েদের সন্তানের কোনো অধিকার সেখানে স্বীকৃত। সব কিছুই চলে পীরের ছেলে পীর, তার ছেলে পীর এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত ধারায়। এই ধারা কখনো পীরের কন্যাদের দিকে প্রবাহিত হয়না। ঠিক বাদশাহী সিস্টেমও তাই। সেখানে গদী-তথা রাজতখতের ওপর একমাত্র অধিকার ছেলেদের, সব ছেলে নয়, কেবল মাত্র বড় ছেলের আর তার বংশধরদের। মুসলমানদের মাঝে যে বাদশাহী সিস্টেম রয়েছে, তাতে অনেক সময় দেখা যায় বড় ছেলে বাদশাহ হয়ে গেলে ছোট ভাই বা অন্য কেউ-‘অলী আহমদ’ হয়। তার মানে এ বাদশাহর পর তার ছেলে নয়, তার ভাই-ই হবে গদীনশীন। কিন্তু পীর মুরীদীর ক্ষেত্রে এ বাদশাহী সিস্টেম এতদূর বিকৃতরূপ লাভ করেছে যে. এখানে বড় ছেলেই সব। বড় ছেলে একবার গদীনশীন হয়ে বসতে পারলে সে-ই হর্তা কর্তা বিধাতা। সে পিতার কেবল গদী-ই দখল করেনা, পিতার মুরীদরা সব তার মুরীদে পরিণত হয়ে যায় আপনা আপনিভাবে। যেমন জমিদার বা রাজার প্রজারা আপনা আপনি তার ছেলেরও প্রজা হয়ে যায়। আর বিত্ত সম্পত্তি কিছু থাকলে তারও একমাত্র ভোগদখলকারী হয় এই বড় সাহেব, যিনি গদীনশীন হয়ে বসেন। ছোট ভাই কেউ থাকলে তারা হয় চরম অসহায়, উপেক্ষিত, বঞ্চিত এবং পিতার বিশাল মুরীদ মহল হতে বিতাড়িত।

কিন্তু প্রশ্ন এই যে, এসব কথা কি ধর্মীয়? হতে পারে ব্রাক্ষ্মণ্য ধর্মের এ-ই নীতি। সেখানে ব্রাক্ষ্মণের বড় পুত্র অবশ্যই ব্রাক্ষ্মণ হবে, আর সে আপনা আপনি পেয়ে যাবে পিতার জযমানদের। এতদিন তারা ছিল বুড়ো ব্রাক্ষ্মণের জযমান আর এখন হবে তারা এই ব্রাক্ষ্মণ-পুত্র- ব্রাক্ষ্মণের জযমান। তবে কি এই ব্রাক্ষ্মণপ্রথা হরফে হরফে মুসলিম সমাজেও চালু হয়ে গেছে।

এ সম্পর্কে কারোরই এক বিন্দু সন্দেহও থাকতে পারেনা যে, এ প্রথার সাথে ইসলামের কোনোই সম্পর্ক নেই। এ প্রথা কিছুমাত্র ইসলামী নয়। ইসলামে গদীনশীন হওয়ার কোনো অবকাশ নেই, নেই শাহ হওয়ার কোনো সুযোগ। ছোট ভাই এবং বোনদের অধিকার হরণ করে একাই সব কিছু গ্রাস করে নেয়ার এ ব্যবস্থা ইসলামে আদৌ সমর্থিত হতে পারেনা।

ইসলাম আমরা পেয়েছি হযরত মুহাম্মদ(স) এর নিকট থেকে। তিনি ইসলামকে শুধু মৌখিক নসীহতের মাধ্যমেই পেশ করেননি, তিনি তাঁর বাস্তব জীবন দিয়ে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ আদর্শকে বাস্তবায়িত ও সমাজে প্রতিফলিত করে গেছেন। তিনি তেইশ বছরের সাধনা ও সংগ্রামের ফলে কায়েম করে গেছেন এক বিরাট রাষ্ট্র। কিন্তু তাঁর ইন্তিকালের পর তাঁর বংশে চললোনা নব্যুয়তের ধারা, না হলো কেউ গদীনশীন নবী। তিনি যে রাষ্ট্র কায়েম করে গেলেন, তাতেও কায়েম করা হলোনা তাঁর বংশের লোকদের কর্তৃত্ব। বরং মুসলমানেরা স্বাধীনভাবে নিজেদের মধ্য থেকে ইসলামের বিধান অনুযায়ী সর্বাধিক মুত্তাকী ব্যক্তিকে খলীফা নির্বাচিত করে নিলেন। সে খলীফা না হলো তাঁর প্রিয়তমা কন্যা ফাতিমা, না তাঁর জামাতা, না তাঁর প্রাণাধিক প্রিয় নাতি দৌহিত্ররা। নব্যুয়তের ধারাও চললোনা তাঁর বংশে। এমনি তাঁর সম্মানিত জামাতাদেরও কেউ এ সূত্রে রাসূল পরবর্তী খলীফা হলেননা। উত্তরকালে তাঁদের কেউ খলীফা হলেও তা রাসূলের জামাতা হওয়ার কারণে নয়, তা হয়েছেন তদানীন্তন সমাজের তাঁদের নৈতিক অবস্থান ও যোগ্যতার বৈশিষ্ট্যের কারণে। এ-ই ইসলামী ব্যবস্থা। এখানে বংশানুক্রমিকতা সম্পূর্ণ অচল। এ পীর মুরীদী রাসূলে করীম(স) থেকেই যদি চলে এসে থাকে-যেমন দাবি করা হচ্ছে, তাহলে এখানে গদীনশীন, ‘শাহ’ হওয়ার প্রথা এল কোথ্থেকে? রাসূলের জীবনে ও তাঁর কায়েম করা সমাজে তো এর নাম নিশানাও দেখা যায়না। খুলাফায়ে রাশেদুন এর সময়েও ছিলনা খলীফার ছেলে খলীফা হয়ে বসার প্রথা। বরং তাঁরা প্রত্যেকেই এ বংশানুক্রমিকতার প্রতিবাদ করেছেন। কোনো খলীফার ছেলেই খলীফা হতে পারেনি-না হযরত আবু বকরের, না উমর ফারূকের, না উসমান জিন্নুরাইনের, না আলী হায়দার(রা) এর। তাহলে প্রমাণিত হলো যে, এ প্রথা রাসূল(স) এর নিকট হতে গ্রহণ করা হয়নি। অতএব তা সুন্নাত নয়, তা স্পষ্ট বিদয়াত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এ বিদয়াতী প্রথায় গদীপ্রাপ্ত লোকেরাই সমাজে নিজেদেরকে পেশ করেছে সুন্নাতের বড় পায়রবী করনেওয়ালা- সুন্নাতের বড় ধারক বাহকরূপে। তার দৃষ্টিতে তিনি ছাড়া আর কেউই নাকি হক পথে নেই। অথচ সম্পূর্ণ ‘বিদয়াতী’ সিস্টেমে ‘গদীনশীন’ হয়ে নিজেকে ‘আহলে সুন্নাত’ হিসাবে পেশ করা এবং সুন্নাতের বড় অনুসারী হওয়ার দাবি করা বিদয়াত, বিদয়াতের নির্লজ্জ দৃষ্টতা ছাড়া আর কিছু নয়।

এখানেই শেষ নয়, এ গদীনশিন যদি জনমতের ভিত্তিতে ও উপযুক্ততার কারণে হতো, তাহলেও তার কোনো না কোনো দৃষ্টান্ত সলফে সালেহীনে হয়ত বা পাওয়া যেত। কিন্তু এখানে কোনো জনমতের স্থান নেই, যোগ্যতা অযোগ্যতার বিচার নেই। ব্যস বড় ছেলে হওয়াই গদী পাওয়ার অধিকারী হওয়ার জন্য বড় দলীল। এর ফলে এ গদীনশিন হয়ে গেছে এক ন্যক্কারজনক ব্রাক্ষ্মণ্যবাদ। পীরের মৃত্যুর পর তাঁর মুরীদান খলীফার মাঝে সবচেয়ে মুত্তাকী কোন লোক সত্যি পরবর্তী পীর হওয়ার সর্বাধিক উপযুক্ত, সে বিচার করা হয়না এখানে এবং সুন্নাত তরীকা মতো সবচেয়ে বেশি মুত্তাকী ও যোগ্য ব্যক্তিকে গদীনশিন করার কোনো প্রবণতাই এখানে পরিলক্ষিত হয়না। সে রকম লোককে নিজেদের মধ্যেও তালাশ করে বের করা হয়না। এখানে স্থায়ীভাবে ধরে নেয়া হয়-স্বয়ং পীর সাহেব ও জানেন, জানে মুরীদরা, জানে সাধারণ মানুষ যে হুযুরের বড় ছেলেই হবে পরবর্তী পীর, গদীনশিন। সে ছেলে লেখাপড়া কিছু জানুক আর না-ই জানুক, নৈতিক চরিত্র তার যতই খারাপ হোক, জ্ঞান বুদ্ধিতে সে যতই বুদ্ধু হোক, সেই হবে পরবর্তী পীর। আর মরহুম পীরের মতোই যোগ্যতাসম্পন্ন লোক সে দরবারে অন্য কেউ থাকলেও তাকে সেখানে কোনো স্থান দেয়া হবেনা। শুধু তা-ই নয়, সে যোগ্য ও অধিক মুত্তাকী ব্যক্তিকেও বরং মুরীদ হতে হবে সে অযোগ্য অ-আলীম-মানে জাহিল, চরিত্রহীন ও বুদ্ধু গদীনশিন পীরের। নতুবা সে দরবারে তার কোনো স্থান হবেনা, সেখানে থেকে অনতিবিলম্বে বিতাড়িত হতে হবে।

এ যে তথাকথিত জমিদারতন্ত্র, রাজতন্ত্র, আর ব্রাক্ষ্মণ্যবাদ প্রভৃতি জাহিলিয়াতের সব পদ্ধতিকেও ছাড়িয়ে গেছে। এর সাথে ইসলামের সুন্নাতের দূরতম সম্পর্কও থাকতে পারে কি?

কোনোরূপ সম্পর্ক থাকতে পারেনা। শুধু তা-ই নয়, এই পীর ও তার মুরীদরা- এ পীরের সমর্থকরা-হাদীয়া তোহফা ও টাকা পয়সা যারা দেয়, তারা সকলেই রাসূল(স) এর ঘোষণা অনুযায়ী আল্লাহর নিকট অভিশপ্ত। হযরত আলী(রা) বর্ণিত হাদীসে রাসূলে করীম(স) এর চারটি কথার তৃতীয় কথা হচ্ছেঃ আরবী(*******)

-আল্লাহ তা‘আলা অভিশপ্ত করেছেন সেই ব্যক্তিকে যে বিদয়াতকারীকে বা বিদয়াতপন্থীকে আশ্রয় দিয়েছে, সম্মান করেছে ও সাহায্য সহযোগিতা দিয়েছে।

 

পীর মুরীদী সম্পর্কে আমার চূড়ান্ত কথা

পীর মুরীদী সম্পর্কে আমি উপরে যা কিছুই লিখেছি, পাঠক মহোদয় লক্ষ্য করলে স্বীকার করবেন যে, আমি নিজস্ব মনগড়া কোনো কথা লিখিনি। তা যেমন কুরআন, সুন্নাত ও সর্বজনমান্য মনীষীবৃন্দের কথার দলীলের ভিত্তিতে লিখেছি তেমনি এ পর্যায়ে আমার নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতাও রয়েছে।

কিন্তু সে অভিজ্ঞতা শুধু বিদয়াতী পীর সম্পর্কে বা পীর মুরীদী বিদয়াত হওয়া সম্পর্কেই নয়, এর বিপরীত এ অভিজ্ঞতাও আমার রয়েছে যে, সিলসিলার ও পীরের মৃত্যুর পর গদীনশিন হওয়ার পরও কেউ কেউ এমন আছেন, যিনি পীর মুরীদকে বিদয়াত ও নিছক ব্যবসায়ীর কুসংস্কারাচ্ছন্ন অন্ধকার থেকে টেনে বাইরে নিয়ে এসে তাকে ঠিক ওস্তাদ-শাগরীদ, শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্ক কার্য্ত স্থাপন করেছেন। মারিফাত চর্চাকে শরীয়তের ভিত্তিতে পুনর্গঠিত করেছেন। শরীয়তের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে মারিফাতের শিক্ষাদানের কাজ করেছেন এবং এই গোটা তৎপরতার সঙ্গে জিহাদের সম্পর্ক স্থাপন করে দ্বীনী বিপ্লবের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছেন। তা দেখে দিল খুশিতে ভরে গেছে এবং মনে আশা জেগেছে যে, আল্লাহর নাযিল করা ও সর্বশেষ নবী রাসূল হযরত মুহাম্মাদ(স) এর প্রচারিত ও কায়েম করা দ্বীন হয়ত এখানে কায়েম হবে। মূলত খিলাফাতে রাশেদার অবসানের পর প্রথম দিকে দ্বীন কায়েমের যেসব চেষ্টা প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল, তা দ্বীনভিত্তিক মারিফাত ও জিহাদের বিপ্লবী ভাবধারা সমন্বিত ছিল, যাঁর ধ্বংসাবশেষ রূপ বর্তমান ব্যবসামূলক বিদয়াতপন্থী পীর-মুরীদী। বর্তমান অবস্থার আমূল পরিবর্তন করে সেই আসল ও আদর্শবাদভিত্তিক উস্তাদ-শাগরিদমূলক জন-সংগঠনের মাধ্যমে দ্বীন কায়েমের জন্য দ্বীন ও শরীয়তের, মারিফাত ও জিহাদের সমন্বয় নতুন করে কায়েম করাই বর্তমান মরণাপন্ন মুসলিম সমাজকে রক্ষা করা ও দ্বীনের ভবিষ্যত উজ্জ্বল করার একমাত্র উপায়। ধর্মহীন রাজনীতি, রাজনীতিহীন ধর্ম- উপরন্তু দ্বীনের শুষ্ক তাত্ত্বিকতা দ্বীন কায়েমের পথে বড় বাঁধা। দ্বীন-ইসলামের নির্ভূল তত্ত্বকে হৃদয়ের ঈমানী আবেগে সঞ্জীবিত করে জিহাদী কার্য্ক্রমের মাধ্যমেই পীর-মুরীদীর পুনর্গঠন হওয়া আবশ্যক।

মানত মানায় শিরক এর বিদয়াত

কোনো কিছুর জন্য কোনো কাজ করার বা কোনো কিছু দেয়ার মানত মানার সুযোগ ইসলামে রয়েছে। এ মানতকে আরবী ভাষায় বলা হয় নজর। আর ‘নজর’ এর অর্থ ইমাম রাগেব লিখেছেনঃ

-মানত বলা হয় এরূপ কাজকে যে, কোনো কিছু ঘটবার জন্য তুমি নিজের ওপর এমন কোনো কাজ করার দায়িত্ব গ্রহণ করবে-ওয়াজিব করে নেবে- যা আসলে তোমার ওপর ওয়াজিব নয়। যেমন বলা হয়ঃ আমি আল্লাহর জন্যে একাজ করার মানত করেছি।

ইবনুল আরাবীন মানত এর সংজ্ঞাদান প্রসঙ্গে লিখেছেনঃ

-কোনো কাজ করার বাধ্যবাধকতা নিজের ওপর নিজের কথার সাহায্যে চাপিয়ে নেয়া, যে কাজ হবে একান্তভাবে আল্লাহর ফরমাবরদারীমূলক এবং যা দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ হতে পারে।

তাফসীরে আবুস সউদে লিখিত হয়েছেঃ

-মানত হচ্ছে মনকে কোনো কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করা এবং তাকে বাধ্যতামূলকভাবে সম্পন্ন করা।

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখেছেনঃ

-আমাদের মতের লোকেরা বলেছেনঃ ইবাদত বা দান খয়রাতের কিছু নিজের ওপর অতিরিক্তভাবে জায়েয করে নেয়াকেই মানত বলা হয়। কুরআন মজীদে এ মানত মানার কথা বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা আল বাকারার ২৭০ নং আয়াতে বলা হয়েছেঃ

وَمَا أَنفَقْتُم مِّن نَّفَقَةٍ أَوْ نَذَرْتُم مِّن نَّذْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُهُ ۗ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ                              [٢:٢٧٠]

-তোমরা যা কিছু খরচ করো বা মানত মানো, আল্লাহ তার সবকিছুই জানেন। আর জালিমদের জন্য সাহায্যকারী নেই। (আল বাকারাঃ২৭০)।

তাসীরে মাজহারীতে এ আয়াতে ব্যাখ্যা লিখা হয়েছে এভাবেঃ মানত হচ্ছে এই যে, তোমরা আল্লাহর জন্য করবে বলে কোনো কাজ নিজের জন্য বাধ্যতামূলক করে নিবে শর্তাধীন কিংবা বিনাশর্তে।

এ আয়াত ও তাফসীরের উদ্ধৃতি স্পষ্ট বলে দেয় যে, মানত হতে হবে কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য। যে মানত হবে কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যে, কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী কেবল তাই জায়েয; যে মানত খালিসভাবে আল্লাহর জন্য নয়, তা কুরআনের দৃষ্টিতে কিছুতেই সমর্থনযোগ্য নয়। কুরআনের যে ধরনের মানত সমর্থিত, তাঁর দৃষ্টান্ত হচ্ছে ইমরান-স্ত্রীর মানত।

সূরা আল ইমরানে ৩৫ নং আয়াতে বলা হয়েছেঃ

إِذْ قَالَتِ امْرَأَتُ عِمْرَانَ رَبِّ إِنِّي نَذَرْتُ لَكَ مَا فِي بَطْنِي مُحَرَّرًا فَتَقَبَّلْ مِنِّي ۖ

–ইমরান স্ত্রী বললেনঃ হে আল্লাহ! আমার গর্ভে যে সন্তান রয়েছে তা আমি তোমারই জন্য মানত করলাম, তাকে দুনিয়ার ঝামেলা থেকে মুক্ত করবে, অতএব তুমি আমার এ মানত কবুল করো। (আল ইমরানঃ৩৫)।

ইমরান স্ত্রীর মানত ছিল একান্তভাবেই আল্লাহরই জন্য। সে মানতে এ দুনিয়ার কোনো স্বার্থলাভ লক্ষ্য ছিলনা, তাতে আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরীক করা হয়নি। মানত যে কেবল আল্লাহর জন্যই মানতে হয়-এ আয়াতে তার স্পষ্ট পথ নির্দেশ রয়েছে। ইমরান-স্ত্রীর কথা ‘তোমারই জন্য মানত করেছি’ তা স্পষ্টভাবে বলে দিচ্ছে। আর একটি দৃষ্টান্ত হলো সূরা মরীয়মের ২৬নং আয়াত। আল্লাহ তা‘আলা নিজেই মরিয়মকে লক্ষ্য করে বলেছেনঃ

فَقُولِي إِنِّي نَذَرْتُ لِلرَّحْمَٰنِ صَوْمًا

–অতএব তুমি বলো আমি আল্লাহর জন্যই রোযা মানত করলাম। (মরিয়মঃ ২৬)

আল্লাহ নিজেই শিক্ষা দিলেন এ আয়াতের মাধ্যমে যে, মানত কেবল আল্লাহর জন্যই মানতে হবে, অন্য কারো জন্য অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নয়।

এ পর্যায়ে কুরআন থেকে আরো ‍দুটো আয়াতাংশ উদ্ধৃত করা যাচ্ছে। একটি হলোঃ তারা যেন তাদের মানতসমূহ পুরো করে।

আর রাসূলের সাহাবীদের প্রশংসা করে কুরআনে বলা হয়েছেঃ তারা মানত পুরা করে।

এ ছাড়া আরো বহু আয়াত রয়েছে কুরআনে, যাতে আল্লাহর সাথে করা ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি পূরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর মানত যেহেতু আল্লাহর সাথেই করা এক বিশেষ ধরনের ওয়াদা, সে জন্যে মানত অবশ্যই পূরণ করতে হবে।

কুরআন, হাদীস ও ফিকাহ এর দৃষ্টিতে মানত মানার ব্যাপারে বুনিয়াদী শর্ত হলো এই যে, তা মানতে হবে একান্তভাবে আল্লাহর জন্যে, আল্লাহর সন্তোষ বিধানের জন্য। যে মানত আল্লাহর সন্তোষ বিধানের জন্য করা হয়নি, তা মূলতই মানত নয়। তা পূরণ করাও ওয়াজিব নয়। উপরন্তু সে মানত হবে এমন কাজ করার, যে কাজ আল্লাহর আনুগত্যমূলক, যা আল্লাহর নাফরমানীর কোনো কাজ নয়।

হাদীসে এ কথা স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে। আবু দাউদের কিতাবে উদ্ধৃত হয়েছে-হযরত ইবনে আমর বর্ণনা করেছেনঃ আমি রাসূল(স)কে বলতে শুনেছিঃ আরবী (*********)

-যে মানত দ্বারা আল্লাহর সন্তোষ লাভ করতে চাওয়া হয়নি, তা মূলতই মানত নয়।

অথবা এর তরজমা হবে, ‘মানত শুধু তাই যা থেকে আল্লাহর সন্তোষ লাভ করতে চাওয়া হয়েছে।’

ইমাম আহমদ মুসনাদে এবং তিবরানী বর্ণনা করেছেনঃ

নবী করীম(স) এক কঠিন গরমের দিনে লোকদের সামনে ভাষণ দিচ্ছিলেন। এ সময় একটি লোককে (সম্ভবত কোনো মরুবাসীকে) রোদের খরতাপের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন- কি ব্যাপার; তোমাকে রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছি কেন? লোকটি বললো, ‘আমি মানত করেছি আপনার ভাষণ শেষ না হওয়া পর্য্ন্ত রোদে দাঁড়িয়ে থাকবো।’ তখন নবী করীম(স) বললেন-আরবী (******)

-তুমি বসো, এটাতো কোনো মানত হলোনা। মানত তো শুধু তাই, যা করে আল্লাহর সন্তোষ হাসিল করা উদ্দেশ্য হবে।

এ মর্মের বহু সংখ্যক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সে সবগুলো থেকে এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, মানত এর মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হবে কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তোষ লাভ; ব্যক্তির কোনো বৈষয়িক স্বার্থের লাভ নয়, নয় আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সন্তোষ লাভ, আর যে মানত সেরূপ হবেনা, তা মানতই নয়, তা আদায় করাও কর্তব্য নয়।

মানত কেবল আল্লাহর সন্তোষ লাভ করার উদ্দেশ্যেই হলে চলবেনা, তা হতে হবে এমন কাজের মানত, যে কাজ মূলতই আল্লাহর আনুগত্যমূলক। যে কাজ আল্লাহর আনুগত্যমূলক নয়, তা করার মানত করা হলেও তা মানত বলে গণ্য হবেনা, তা পূরণ করাও হবেনা ওয়াজিব। হাদীসে তার ভুঁড়ি ভুঁড়ি প্রমাণ রয়েছে। হযরত ইমরান ইবনে হুসায়েন(রা) বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে-নবী করীম(স) বলেছেনঃ

-মানত দু’প্রকারের হয়।  যে মানত আল্লাহর আনুগত্যের কোনো কাজের হবে, তা আল্লাহর জন্য বটে এবং তাই পূরণ করতে হবে। আর যে মানত আল্লাহর নাফরমানীমূলক কাজের মাধ্যমে হবে, তা হবে শয়তানের উদ্দেশ্যে। তা পূরণ করার কোনো দায়িত্ব নেই। কর্তব্যও নয়।

বুখারী শরীফে এমন কিছু হাদীসের উল্লেখ রয়েছে, যা থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, ইসলামে এই মানত মানার কাজের কিছুমাত্র উৎসাহ দেয়া হয়নি। কথায় কথায় মানত মানার যে রোগ দেখা যায় অশিক্ষিত লোকদের মধ্যে এবং যে মানত মানার ইসলামী পদ্ধতি জানা না থাকার কারণে লোকেরা এক্ষেত্রে নানা প্রকার শিরকে লিপ্ত হয়ে পড়ে, রাসূলে করীম(স) একে কিছুমাত্র উৎসাহিত করেননি, এবং তিনি একে সম্পূর্ণ অর্থহীন কাজ বলে ঘোষণা করেছেন। হযরত ইবনে উমর(রা) বলেনঃ

-তোমরা কি লোকদেরকে মানত মানা থেকে নিষেধ করোনা? অথচ নবী করীম(স) বলেছেনঃ মানত মানায় না কিছু আসে, না কিছু যায়(বা মানত কিছু এগিয়েও দেয়না, কিছু পিছিয়েও দেয়না)। এতে বরং শুধু এতটুকু কাজ হয় যে, এর ফলে কৃপণের কিছু ধন খরচ হয়ে যায় মাত্র।

হযরত আবু হুরায়রা(রা) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম(স) ইরশাদ করেছেনঃ মানত মানব সন্তানকে কোনো ফায়দাই দেয়না। দেয় শুধু তাই, যা তার তকদীরে লিখিত হয়েছে। বরং মানত মানুষকে তার তকদীরের দিকেই নিয়ে যায়। অতঃপর কৃপণ ব্যক্তির হাত থেকে আল্লাহ কিছু খরচ করান। তার ফলে সে আমাকে(আল্লাহকে)এমন কিছু দেয়, যা এর পূর্বে সে কখনো দেয়নি।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমরের যে হাদীসটি মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে, তাতে মানত মানা থেকে রাসূল করীম(স) স্পষ্ট বাণী উচ্চারণ করেছেন।

ইরশাদ হয়েছেঃ আরবী(******)

-একদিন নবী করীম (স) আমাদের মানত মানা থেকে নিষেধ করেছিলেন। বলছিলেন, মানত কোনো কিছু থেকেই ফিরাতে পারেনা, তাতে শুধু কৃপণের কিছু অর্থ ব্যয় হয় মাত্র।

অপর এক হাদীসে স্পষ্ট বলা হয়েছেঃ মানত মানা থেকে রাসূলে করীম(স) নিষেধ করেছেন। অপর বর্ণনায় বলা হয়েছেঃ তোমরা মানত মানবেনা। কেননা এ মানত এক বিন্দু তকদীর বদলাতে বা ফিরাতে পারেনা।

এই হাদীস কয়টি থেকে বোঝা যায়, ইসলামে মানত মানার রীতি পছন্দনীয় নয়, বরং তা রাসূলের সুন্নাতের সম্পূর্ণ বিপরীত এক বিশেষ ধরনের বিদয়াত। আরো স্পষ্ট বলা যায়, টাকা পয়সা বা ধন সম্পদের মানত করা সম্পূর্ণ হারাম, তা যে কোনো উদ্দেশ্যেই করা হোকনা কেন? ইমাম মুহাম্মদ ইসমাইল আল-কাহলানী আস সানয়ানী লিখেছেন তাই লিখেছেনঃ

-মানত মানাকে হারাম বলা, এ কথাতো হাদীস থেকেই প্রমাণিত। এ হারাম হওয়ার কথা আরো শক্ত হয় এজন্য যে, মানত মানা থেকে নিষেধ করতে গিয়ে তার কারণ দর্শানো হয়েছে এই যে, এতে কোনো কল্যাণই আসেনা। তাতে যে অর্থ ব্যয় হয়, তা তো অযথা বিনষ্ট করা হয়। আর অর্থ বিনষ্ট করা হারাম। অতএব ধন মাল দেয়ার মানত মানাও হারাম।

অধিকাংশ শাফেয়ী ও মালেকী মাযহাবের লোকের বিশ্বাস, মানত মানা মাকরূহ। হাম্বলী মাযহাবেও একে মাকরূহ তাহরীম মনে করা হয়েছে। এর কারণ বলা হয়েছে এই যে, মানত কখনো আল্লাহর জন্য খালেস হয়না। তাতে ‘কোনো না কোনো বিনিময়’ লাভ লক্ষ্যভূত থাকে। অনেক সময় মানত মানা হয়; কিন্তু তা পূরণ করা কঠিন হয় বলে তা অপূরণীয়ই থেকে যায়। আল্লামা কাযী ইয়াজ বলেছেনঃ “মানত তাকদীরের ওপর জয়ী হতে চায় আর জাহিল লোকেরা মনে করে যে, মানত করলে তাকদীর ফিরে যাবে।” ইমাম তিরমিযী এবং কোনো কোনো সাহাবীও মানত মানাকে মাকরূহ মনে করতেন বলে উল্লেখ করেছেন। আর আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক লিখেছেনঃ মানত –তা আল্লাহর হুকুমবরদারীরই হোক কি নাফরমানীর- উভয় ক্ষেত্রে অবশ্য মাকরূহ হবে।

আর মাকরূহ মানে এসব ক্ষেত্রে মাকরূহ তাহরীম। ইবনুল আরাবী লিখেছেন-‘মানত মানা দো’আর সাদৃশ্য, তাতে তাকদীর ফিরে যায়না।” এ-ই হচ্ছে তকদীর। অথচ দো’আ করাকে পছন্দ করা হয়েছে, কিন্তু মানত মানতে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা মানত উপস্থিত ইবাদত। তাতে সোজাসুজি বান্দার মন মগজ আল্লাহর দিকেই ঝুঁকে পড়ে। তা হয় বিনয়া্বনত, কাতর, উৎসর্গীত আল্লাহরই সমীপে। কিন্তু মানত মানায় উপস্থিত কোনো ইবাদত দেখা যায়না; বরং তাতে সরাসরি আল্লাহর পরিবর্তে সেই মানতের ওপরই নির্ভরতা দেখা দেয়। আর তা-ই শিরক পর্য্ন্ত পৌছায়।

এই প্রেক্ষিতে দেখা যায় যে, বর্তমানে সাধারণভাবে জনগণের মাঝে এবং এক শ্রেণীর জাহিল পীরের মুরীদরেদ মধ্যে কথায় কথায় মানত মানার যে হিড়িক পড়ে গেছে এবং ওয়ায-নসীহতে মানত মানার যে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে, তা আর যা-ই হোক ইসলামের আদর্শ নয়, নয় রাসূলের প্রতিষ্ঠিত সুন্নাত বরং তা স্পষ্টভাবে বিদয়াত। এ বিদয়াত-ই কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিরক এ পরিণত হয়ে যায়। শিরক হয় তখন, যখন মানত মানা হয় কোনো মরা পীরের কবরের নামে। কেননা এসব ক্ষেত্রে ‘আল্লাহর ওয়াস্তে’ যতই মানত মানা হোকনা কেন, আসলে তা ‘আল্লাহর ওয়াস্তে’ থাকেনা। তার সামনে পীর, মাদ্রাসা ইত্যাদি-ই থাকে প্রবল হয়ে এবং মনে করা হয়, এদরে এমন কিছু বিশেষত্ব আছে, আছে এমন কিছু অলৌকিক ক্ষমতা, যার কারণে সে এ মানতের দরুন উপস্থিত বিপদ থেকে উদ্ধার লাভ করতে পারবে; কিংবা তা বাঞ্চিত কোনো সুবিধা লাভ করিয়ে দিতে পারবে। আর ইসলামের দৃষ্টিতে এ-ই হচ্ছে সুস্পষ্ট শিরক। এ ধরনের মানত মানায় আল্লাহকে রাখা হয় পেছনে, আর যার নামে মানত করা হয়, সেই হয় মুখ্য। মনে ঐকান্তিক সম্পর্ক তারই সাথে স্থাপিত হয়, তাকে খুশি করাই হয় আসল লক্ষ্য। কাজেই এই জিনিস আল্লাহর নিষেধ এবং তা আল্লাহর বাণীঃ

فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَندَاد ا

–‘কাউকেই আল্লাহর সমতুল্য ও প্রতিদ্বন্ধী বানিওনা’(আল বাকারাঃ২২) এর বিপরীত হয়ে যায়।

এ ধরনের মানত মানা যে হারাম তাতে কোনো মুসলমানেরই কি এক বিন্দু সন্দেহ থাকতে পারে?

পূর্বোক্ত হাদীস হতে অবশ্য এ কথাও জানা যায় যে, মানত যদি খালেসভাবে কেবল মাত্র আল্লাহর জন্যেই হয়, তবে তা পূরণ করতে হবে এবং তা জায়েয। কিন্তু দুঃখের বিষয়, জায়েয নিয়মে খালেসভাবে মানত মানা খুব কম লোকের পক্ষেই সম্ভব হয়ে থাকে। তাই টাকা পয়সা খরচ করার বা কোনো মাল দেয়ার মানত মানা না মানাই তওহীদবাদী লোকদের জন্য নিরাপদ পথ। যদি মানত মানতেই হয়, তবে যেন নামায রোযা, আল্লাহর ঘরের হ্জ্জ ইত্যাদি ধরনের কোনো কাজের মানত মানা হয়। কেননা তাতে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ-ই বান্দার সামনে আসেনা- আসার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু ধন-মালের যে মানত মানা হয় তাতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছু বা অন্য কারো প্রতিই মন বেশি করে ঝুঁকে পড়ে, বিশেষ করে এক শ্রেণীর শোষক জাহিল অর্থলোভী গদীনশিন পীর যখন মানত মানার এক জাল বিস্তার করে দিয়েছে সমস্ত সমাজের ওপর, তখন মূর্খ লোকেরা ও অজ্ঞ লোকেরা এ জালে সহজেই ধরা পড়ে যেতে পারে, নিমজ্জিত হতে পারে কঠিন শিরক এর অন্ধ গহবরে। এই প্রসঙ্গে জেনে রাখা দরকার যে, যদি কোনো বিশেষ জায়গার বিশেষ লোকদের জন্যে টাকা পয়সা বা কোনো মাল খরচ করার মানত করা হয়, তবে সে টাকা ইত্যাদি সেখানেই খরচ করতে হবে ইসলামে এমন কোনো জরুরী শর্ত নেই।

হানাফী ফিকহের কিতাবে লিখিত হয়েছে-

কেউ যদি বলে, অমুক দিন আল্লাহর নামে কিছু দান করা আমার ওপর ওয়াজিব কিংবা বলে অমুক স্থানের মিসকীনদের জন্য কিছু সদকা দেয়া ওয়াজিব, তাহলে দিন ও স্থানের কয়েদ পালন করা জরুরী হবেনা।

অর্থাৎ, যে কোনো দিন ও যে কোনো স্থানের গরীবদের মধ্যে দান করলেই মানত পূরণ হয়ে যাবে।

কবর যিয়ারত বিদয়াত

ইসলামে কবর যিয়ারত করা জায়েয ও সুন্নাত সমর্থিত। কিন্তু বর্তমানে কবর বিশেষ করে পীর অলী বলে কথিত লোকদের কবরকে কেন্দ্র করে দীর্ঘকাল ধরে যা কিছু হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ বিদয়াত, ইসলাম বিরোধী এবং সুস্পষ্ট শিরক, তাতে কোনো সন্দেহই থাকতে পারেনা।

কবর যিয়ারত সম্পর্কিত হাদীসসমূহ থেকে জানা যায়, ইসলামের প্রাথমিক যুগে কবর যিয়ারত করার অনুমতি ছিলনা। পরে সে অনুমতি দেয়া হয়। এ পর্যায়ে নবী করীম(স) এর একটি কথাই বড় দলীল। তিনি বলেছেনঃ আরবী(******)

-আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, কিন্তু এখন বলছি তোমরা কবর যিয়ারত করো।

অপর এক বর্ণনায় বলা হয়েছেঃ আরবী(*******)

-তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কবর যিয়ারত করতে চায়, তবে সে তা করতে পারে। কেননা কবর যিয়ারত মানুষকে পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

ইমাম নবয়ী এ হাদীসের ব্যাখ্যায় লিখেছেনঃ সকলেই এ ব্যাপারে একমত যে, কবর যিয়ারত করা মুসলমানদের জন্য সুন্নাত সমর্থিত।

হযরত আনাস(রা) বর্ণিত হাদীসে এ ব্যাপারে আরো একটি বিস্তারিত কথা বলা হয়েছে। নবী করীম(স) বলেছেনঃ আরবী(********)

-আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত করতে প্রথমে নিষেধ করেছিলাম কিন্তু পরে আমার নিকট স্পষ্ট হয়ে গেল যে, এ কবর যিয়ারতে মন নরম হয়, চোখে পানি আসে এবং পরকালকে স্মরণ করিয়ে দেয়। অতএব তোমরা কবর যিয়ারত করো। কিন্তু তা করতে গিয়ে তোমরা অশ্লীল, গর্হিত ও বাজে কথাবার্তা বলোনা।

ইবনুল হাজার আল আসকালানী লিখেছেনঃ অশ্লীল কথা এবং অবাঞ্চনীয় অতিরিক্ত কথাবার্তা অর্থাৎ অশ্লীল, অপ্রয়োজনীয় ও অবাঞ্চনীয় কথাবার্তা কবরস্থানে বেশি করে বলা নিষিদ্ধ।

হযরত ইবনে আব্বাস(রা) বলেছেন-রাসূলে করীম(স) অভিশাপ বর্ষণ করেছেন কবর যিয়ারতকারী মেয়েলোকদের ওপর এবং তাদের ওপরও, যারা কবরের ওপর মসজিদ, গুম্বদ বা কোব্বা ইত্যাদি নির্মাণ করে।

হযরত আয়েশা(রা) তাঁর মৃত্যুশয্যায় শায়িত অবস্থায় বলেছিলেন-আল্লাহ তা‘আলা লানত করেছেন ইহুদী ও খৃস্টানদের ওপর এজন্য যে, তারা তাদের নবী-রাসূলের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে।

আর গুম্বদ বা কোব্বা নিষিদ্ধের কারণ হচ্ছে- তাতে করে ধন মালের অপচয় হয়, কারো কোনো উপকার সাধিত হয়না। আর কবরস্থানে মসজিদ বানান হলে কবরের প্রতি অধিক সম্মান প্রদর্শন করা হয়। তা থেকে বিরত রাখাই এ নিষেধের উদ্দেশ্য।

অপর এক হাদীসে বলা হয়েছেঃ আরবী(***********)

-কবর যিয়ারতকারী মেয়েলোক এবং তার ওপর যারা বাতি জ্বালায় তাদের ওপর আল্লাহ তা‘আলা অভিশাপ করেছেন।

আর একটি হাদীসে বলা হয়েছে এভাবে-আরবী(********)

-কবরকে পাকা-পোক্ত ও শক্ত করে বানাতে, তার ওপর কোনোরূপ নির্মাণ কাজ করতে, তার ওপর বসতে এবং তার ওপর কোনো কিছু লিখতে নবী করীম(স) সুস্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন।

নবী করীমের ফরমান অনুযায়ী বলা যায় যে, কবরকে কেন্দ্র করে এসব কাজ করা মহা অন্যায়, অবাঞ্জনীয়। আর যারা একাজ করে তারা নিকৃষ্টতম লোক। নবী করীম(স) নিজে নিজের সম্পর্কে দো‘আ করেছেন এই বলেঃ আরবী(*********)

-হে আল্লাহ! তুমি আমার কবরকে কোনো পূজ্যমূর্তি বানিয়ে দিওনা। বস্তুত যে জাতি তাদের নবী রাসূলের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছে, তাদের ওপর আল্লাহর গজব তীব্র হয়ে উঠছে।

 এ হাদীসের তাৎপর্য্ সুস্পষ্ট। কবরের দিকে মুখ ফিরিয়ে সিজদা করা, কবরকে কিবলার দিকে রেখে নামাজ পড়া শরীয়তে সুস্পষ্ট হারাম। হযরত জুনদুব ইবনে আবদুল্লাহ (রা) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম(স) মুসলমানদের লক্ষ্য করে ইরশাদ করেছেনঃ আরবী(*********)

-সাবধান হও, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা নবী-রাসূল ও নেক লোকদের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছিল। তোমরা কিন্তু সাবধান হবে, তোমরা কখনো কবরকে মসজিদ বানাবেনা। আমি এ থেকে তোমাদের স্পষ্ট নিষেধ করছি।

কবরকে কেন্দ্র করে যে ওরশ ও মেলা অনুষ্ঠিত হয় তা ইসলামে নিষিদ্ধ। হযরত আবু হুরায়রা(রা) বলেনঃ আরবী(*********)

-রাসূলে করীম (স) কে বলতে শুনেছিঃ তোমরা তোমাদের ঘরকে কবরস্থানে পরিণত করোনা(অন্তত নফল নামায নিজেদের ঘরেই পড়বে)। আমার কবর কেন্দ্রে মেলা বসাবেনা, তোমরা আমার প্রতি দুরুদ পাঠাবে। যেখানে থেকেই তোমরা দুরুদ পাঠাওনা কেন, তা অবশ্যই আমার নিকট পৌছবে।

এ কারণেই কবরকে কোনো স্পষ্ট ও উন্নত স্থানরূপে নির্মিত করতেও নিষেধ করা হয়েছে। নবী করীম(স) হযরত আলী(রা) কে এ দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছিলেন-আরবী(*********)

-সব মূর্তি চুরমার করে দিবে এবং সব উচ্চ ও উন্নত কবর ভেঙ্গে সমান ও মাটির সাথে একাকার করে দিবে। এ থেকে যেন কোনো প্রতিকৃতি ও কোনো কবর রক্ষা না পায়। (হাদীসটি সহীস মুসলিম শরীফে উদ্ধৃত। এর বর্ণনাকারী আবুল হাইয়্যাজ আল আমাদী। হযরত আলী(রা) তাঁকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন-রাসূল(স) আমাকে যে দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছিলেন, আমি ও কি তোমাকে সে দায়িত্ব দিয়ে পাঠাবোনা? খলীফাতুল মুসলিমীন হিসেবেই হযরত আলী(রা) তাঁকে এই দায়িত্বে নিযুক্ত করেছিলেন।)

এসব কয়টি হাদীস থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে কবর যিয়ারত করা সাধারণ মুসলমানদের জন্যই নিষিদ্ধ ছিলো। নিষেধের কারণ এখানে স্পষ্ট বলা হয়নি। তবে অন্যান্য কারণের মধ্যে এও একটি বড় কারণ অবশ্যই ছিল যে, কবর পূজা জাহিলিয়াতের জমানায় একটি মুশরিকী কাজ হিসেবে আরব সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। মুসলমান হওয়ার পরও কবর যিয়ারতের ব্যাপক সুযোগ থাকলে তওহীদবাদী এ মানুষের পক্ষে কবর পূজার শিরক এ নিমজ্জিত হয়ে পড়ার বড় বেশি আশংকা ছিল। কিন্তু পরে যখন ইসলামী আকীদার ব্যাপক প্রচার ও বিপুল সংখ্যক লোকের মন-মগজে তা দৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়, পূর্ণ বাস্তবায়িত হয় ইসলামী জীবনাদর্শ, তখন কবর যিয়ারতের অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু সে অনুমতি কেবল পুরুষদের জন্য, মেয়েদের তা থেকে বাদ দিয় রাখা হয়। শুধু তা-ই নয়, কবর যিয়ারত করতে মেয়েদের যাওয়ার ব্যাপারটিকে ইসলামের দৃষ্টিতে অভিশাপের কাজ বলে ঘোষণা করা হয়।

এ পর্যায়ে শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী লিখেছেনঃ আরবী(********)

-আমি বলছি, শুরুতে কবর যিয়ারত নিষিদ্ধ ছিল। কেননা তা কবর পূজার দ্বার খুলে দিত। কিন্তু পরে যখন ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হলো এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর ইবাদত হারাম হওয়ার ব্যাপারে তাদের মন-মগজ স্থির বিশ্বাসী হলো, তখন কবর যিয়ারত করার অনুমতি দেয়া হয়।

অবশ্য মেয়েলোকদের কবর যিয়ারত করতে যাওয়ার ব্যাপারে কোনো কোনো ফিকাহবিদ সামান্য ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তাঁরা এক দিকে নিষেধ ও অপর দিকে অনুমতি- এ দুয়ের মাঝে সামঞ্জস্য স্থাপনের উদ্দেশ্যে বলেছেন- নেককার লোকদের কবর যিয়ারত করে বরকত লাভ করা বৃদ্ধা মেয়েলোকদের জন্য জায়েয, তাতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু যুবতী মেয়েলোকদের পক্ষে মাকরূহ তাহরীম।

কবর যিয়ারত করতে অনুমতি দেয়ার কারণ হাদীসে বলা হয়েছে-তাতে মানুষের মন নরম হয়, চোখে পানি আসে এবং পরকালের কথা মনে আসে। মনে আসে, কবরস্থ সব লোকই একদিন তাদেরই মতো জীবিত ছিল। কিন্তু আজ দুনিয়ার বুকে তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। এমনিভাবে তাদেরও সব মানুষেরই এরূপ পরিণতি দেখা দিবে। এ থেকে কারোরই রেহাই নেই। এতে করে যিয়ারতকারীর মনে পরকালের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের এক প্রয়োজনীয় ভাবধারা জাগে। আর ইসলামে তা বিশেষভাবে কাম্য।

কিন্তু কবর নির্মাণ সম্পর্কে এ হাদীসসমূহে দু’টো কড়া নিষেধ উদ্ধৃত হয়েছে। একটি এই যে, কবরস্থানে মসজিদ নির্মাণ করা চলবেনা। কেননা তা করা হলে মানুষ মসজিদের মতো কবরের প্রতিও ভক্তিভাজন হয়ে পড়তে পারে, কবরের প্রতি দেখাতে পারে আন্তরিক সম্মান ও শ্রদ্ধা। আর এ জিনিসই হলো শিরক এর উৎস। কবরগাহে মসজিদ বানানোর প্রচলন মুসলিম সমাজে দীর্ঘদিন থেকে চালু হয়ে আছে। অলী-আল্লাহ বলে কথিত কোনো লোকের কবর এখন কোথাও পাওয়া যাবেনা, যার নিকট মসজিদ নির্মাণ করা হয়নি। আর এসব কবরস্থানই শিরক ও বিদয়াতের লীলাকেন্দ্র হয়ে রয়েছে। বহু শত রকমের বিদয়াত মুসলিম সমাজে এখান থেকেই বিস্তার লাভ করেছে। বস্তুত এসব হচ্ছে ইসলামের তওহীদী আকীদায় শিরক এর বিদয়াতের অনুপ্রবেশ।

হাদীস অনুযায়ী কবরের ওপর কোনো কিছু নির্মাণ করাই হারাম। ইমাম শাওকানী পূর্বোক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় লিখেছেনঃ

-এ হাদীসে এ কথার দলীল পাওয়া গেল যে, কবরের ওপর কোনো কিছু নির্মাণ করাই হারাম।

শুধু তা-ই নয়, কবরের ওপর কিছু লিখাও হারাম। তিরমিযী শরীফে বর্ণিত হাদীসে অন্যান্য কথার সাথে এ বাক্যাংশটুকুও রয়েছে। -কবরের ওপর কিছু লেখাও নিষেধ।

অর্থাৎ কবরে মৃত ব্যক্তির নাম, জন্ম ও মৃত্যুর সন-তারিখ কিংবা কোনো মর্সিয়া বা শোক গাঁথা লেখা নিষিদ্ধ। শরীয়তে নাম লেখা আর অন্য কিছুই লেখা হারাম হওয়ার ব্যাপারে পার্থক্য করা হয়নি।

মাওলানা ইদরীস কান্দেলভী এ সম্পর্কে ব্যাখ্যায় লিখেছেনঃ এ কথার দু’টো অর্থ হতে পারেঃ একটি হচ্ছে কবরের ওপর ইট পাথর দিয়ে কোনো নির্মাণ কাজ করা কিংবা এ পর্যায়ের অন্য কোনো কাজ আর দ্বিতীয় হচ্ছে, কবরের ওপর কোনো চাঁদর, তাবু ইত্যাদি টানিয়ে দেয়া। আর এ দু’ধরনের কাজই নিষিদ্ধ। প্রথমটি নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ আগেই বলা হয়েছে। আর দ্বিতীয়টি এজন্য যে, তাও প্রথমটির মতই নিষ্ফল, অর্থহীন কাজ। এতে অর্থের অপচয় হয় আর তা হচ্ছে জাহিলিয়াতের লোকদের কাজ।

জনসাধারণ শরীয়তের মূল বিধানের সাথে পরিচিত নয় বলে তারা সব অলী-আল্লাহ বলে পরিচিত লোকদের কবরের কোব্বা নির্মিত ও তার প্রত্যেকটির ওপর নাম ও অন্যান্য জিনিস লিখিত দেখে মনে করে যে, এ বুঝি শরীয়ত সম্মত কাজ, অন্তত এতে শরীয়তে কোনো দোষ নেই। অথচ তা সবই ইসলামে নিষিদ্ধ। হাদীসে এ পর্যায়ে বিপুল সংখ্যক কথা রাসূলে করীম(স) থেকে বর্ণিত এবং কিতাবসমূহে উদ্ধৃতি হয়েছে। এসব হাদীস সম্পর্কে ইমাম হাকিম লিখেছেনঃ

-কবরের ওপর কোনো কিছু লিখতে নিষেধ করা হয়েছে যে হাদীসে তার সবকটিই বিলকুল সহীহ। কিন্তু তদনুযায়ী আমল করা হচ্ছেনা। কেননা সর্বত্র মুসলিম ইমামদের কবরের ওপর কিছু না কিছু লিখিত দেখা যায়। পরবর্তী লোকেরা পূর্ববর্তী লোকদের কাছে এসব শিখছে (ও জায়েয বলে মনে করছে)।

আসলে এ আমল না নবী করীম(স) থেকে প্রমাণিত না সাহাবীদের থেকে। পরবর্তীকালের লোকেরাই উদ্যোক্তা। কিন্তু তারা ছিল এমন লোক যাদের কথা বা কাজ শরীয়তে দলীলরূপে গৃহীত নয়। এ পর্যায়ে ইমাম যাহবী লিখেছেন-ইমাম হাকিমের উপরোক্ত কথা কোনো কাজের কথা নয়। আসলে কোনো সাহাবীই উক্ত নিষিদ্ধ কাজটি করেননি। এ হচ্ছে উত্তরকালের উদ্ভাবিত একটি কাজ-বিদয়াত। কোনো কোনো তাবেয়ী এবং তাদের পরবর্তীকালের লোকেরাই উদ্ভাবন করেছেন। নবী করীম(স) এর এ নিষেধ তাঁদের নিকট পৌছায়নি।

আর পাক ভারতে প্রখ্যাত মনীষী কাযী সানাউল্ল্যাহ পানিপত্তি লিখেছেনঃ

-আউলিয়াগণের কবর প্রসঙ্গে তাদের কবরকে উন্নত করা, তার ওপর গম্বুজ নির্মাণ, ওরস অনুষ্ঠান করা, চেরাগ বাতি জ্বালানো সম্পূর্ণ বিদয়াত। এর মাঝে কতগুলো হারাম মাকরুহ(তাহরীম)। নবী করীম(স) যারা কবরে বাতি জ্বালায় ও মানত করে তাদের ওপর লা‘নত করেছেন। বলেছেন-না আমার কবরের ওপর উৎসব পালন করবে, না তাকে সেজদার স্থান বানাবে, না এরূপ কোনো মসজিদে নামায পড়বে। না কোনো নির্দিষ্ট তারিখে সেখানে একত্রিত হবে। নবী করীম(স) হযরত আলী(রা) কে পাঠিয়েছিলেন এ নির্দেশ দিয়ে যে, উঁচু কবর ভেঙ্গে সমান করে দেবে এবং প্রতিকৃতি যেখানেই পাবে মুছে দিবে।

সহীহ হাদীসে প্রমাণ রয়েছে, নেককার অলী লোকদের কবরস্থানে মসজিদ নির্মাণ করা সাধারণ ও মূর্খ লোকদের একটি চিরন্তন স্বভাব। হযরত আয়েশা(রা) বলেনঃ নবী করীম(স) যখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত, তখন তাঁর স্ত্রী মারিয়া আবিসিনিয়ায় তার দেখা গীর্জার কথা রাসূল(স) এর নিকট উল্লেখ করেন। সে সময় উম্মে সালমা ও উম্মে হাবীবা(রা)ও উল্লেখ করেন তাঁদের দেখা সে গীর্জাসমূহের সৌন্দর্য্ ও তাতে রক্ষিত সব ছবি ও প্রতিকৃতির কথা। এসব কথা শুনে নবী করীম(স) মাথা ওপরে তুললেন এবং বললেনঃ আরবী(********)

-এসব ছবি ও প্রতিকৃতির ইতিহাস হলো এই যে, তাদের মধ্য থেকে কোনো নেককার(আমাদের ভাষায় কোনো পীর বা অলী-আল্লাহ বলে কথিত) ব্যক্তি যখন মরে গেছেন, তখন তার কবরের ওপর তারা মসজিদ নির্মাণ করেছে। অতঃপর তার মধ্যে এসব ছবি ও প্রতিকৃতি সংস্থাপিত করেছে। আসলে এরা হলো আল্লাহর নিকট নিকৃষ্টতম লোক।

এ হাদীসও প্রমাণ করে যে, কারো কবরকে কেন্দ্র করে মসজিদ নির্মাণ করা ইসলামে নিষিদ্ধ। কেননা আশংকা রয়েছে, সাধারণ লোকেরা কবরের সাথে সেরূপ ব্যবহারই করবে, যা করছে এসব অভিশপ্ত যেমনে করবে।

বস্তুত বর্তমানকালেও কোনো নামকরা বা খ্যাতনামা ‘অলী’(?)আলিম বা খ্যাতনামা পীরের মাজার খুব কমই দেখা যাবে, যার ওপর কোনো গুম্বদ বা কোব্বা নির্মিত হয়নি। নাম ও জন্ম-মৃত্যুর তারিখ এবং তৎসহ মর্সিয়া গাঁথা লেখা হয়নি। এসব কাজ যেমন হাদীসের স্পষ্ট বরখেলাপ, তেমনি তওহীদী আকীদারও সম্পূর্ণ পরিপন্থী। রাসূলে করীম(স) ইসলামের মৌল ভাবধারা তওহীদী আকীদার সুষ্ঠ হেফাজতের জন্যই এ সব কাজ করতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু রাসূলের এ সুস্পষ্ট নিষেধ নির্ভয়ে অমান্য করে পীর অলী-আল্লাহ বলে কথিত লোকদের, রাজনৈতিক নেতাদের ও প্রখ্যাত ব্যক্তিদের কবরের ওপর বানান হয়েছে ও হচ্ছে কুম্বদ, কোব্বা, স্মৃতি, মিনার প্রভৃতি আর তার ওপর লেখা হচ্ছে তাদের নাম, জন্ম-মৃত্যুর তারিখ ও শ্রদ্ধাঞ্জলী বা মর্সিয়া গাঁথা। কিন্তু এগুলো যে বিদয়াত এবং ইসলামের সম্পূর্ণ খেলাফ কাজ তাতে কোনো ঈমানদার মানুষেরই একবিন্দু সন্দেহ থাকতে পারেনা।

 ওপরের দলীলভিত্তিক আলোচনা থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিতে হলো যে, কবর উঁচু করা, তার ওপর কোব্বা নির্মাণ করা, মসজিদ বা নামায পড়ার স্থান নির্ধারণ, তাকে সর্বসাধারণের যিয়ারতগাহে পরিণত করা-কবরের পাশ্বে লোকদের দাঁড়ানোর জন্য ব্যালকনি তৈরি করা-এই সবই অত্যন্ত ও সুস্পষ্ট নিষিদ্ধ কাজ। এই ব্যাপারে রাসূলে করীম(স) কখনও অভিশাপ বর্ষণ করেছেন সেই লোকদের ওপর যারা এসব করে।

আবার কখনও তিনি বলেছেন- আরবী(*****)

-সেই লোকদের ওপর আল্লাহর গজব অত্যন্ত তীব্র ও প্রচন্ড হয়ে এসেছে যারা তাদের নবী-রাসূলগণের কবরসমূহকে মসজিদ বানিয়েছে।

তাই কখনও তিনি নিজেই ঐ কাজ যারা করে তাদের ওপর আল্লাহর গজব তীব্র ও কঠিন হয়ে বর্ষিত হওয়ার জন্য দো’আ করেছেন। সহীহ হাদীসেই তার উল্লেখ রয়েছে।

আবার কখনও তিনি সেই ধরনের সব কবর কোব্বা ইত্যাদি ধ্বংস করার জন্য দায়িত্ব দিয়ে লোক পাঠিয়েছেন। কখনও তিনি এই কাজকে ইয়াহুদী ও খ্রীস্টানদের কাজ বলে অভিহিত করেছেন। কখনও বলেছেনঃ তোমরা আমার কবরকে মূর্তি বানিয়ে অনুরূপ আচরণ করোনা। আবার কখনও বলেছেন-আরবী(******)

-তোমরা আমার কবরকে ঈদের ন্যায় উৎসবের কেন্দ্র বানিওনা।

অর্থাৎ এমন একটি মৌসুম বা সময় নির্ধারণ করে সেই সময় আবার কবরস্থানে লোকজন একত্রিত করে উৎসব করোনা। যেমন করে কবর পূজারীরা করে থাকে। তথায় তারা নানা অনুষ্ঠান পালন করে। কবরে অবস্থান গ্রহণ করে। ওরা আসলেও কার্য্ত আল্লাহর ইবাদত সম্পূর্ণ পরিহার করে কবর বা কবরস্থ ব্যক্তির ইবাদতে মেতে যায়। নবী করীম(স) এইসবকে তীব্র ভাষায় ও অত্যন্ত কঠোরতা সহকারে প্রতিরোধ করেছেন। আর আজ তাঁরই উম্মাহ হওয়ার দাবিদার অলী-আল্লাহ, পীর শায়খ, ইত্যাদির ছদ্মাবরণ ধরে মানুষকে কবর পূজারী বানাচ্ছে। কোথাও কোথাও আল্লাহকে হটিয়ে নিজেরাই মানুষের মা‘বুদ হয়ে বসেছে। সেখানে-তাদের প্রতি মুরীদরা-ভক্তরা-সেই ভক্তি শ্রদ্ধা ও আচার আচরণ করে, যা একান্তভাবে আল্লাহরই প্রাপ্য।

এ শুধু বিদয়াত নয়, এ হচ্ছে প্রচন্ড শিরক। তওহীদী ইসলামের দোহাই দিয়ে শিরক এর পীঠস্থানে পরিণত হয়েছে এমন দরগাহ মুসলিম দুনিয়ার সর্বত্রই বিরাজ করছে।

কবর জিয়ারতের নিয়ম

ইমাম নববী লিখেছেনঃ‘যিয়ারতকারীর কর্তব্য কবরস্থানে উপস্থিত হয়ে প্রথমে সালাম করবে এবং কবরস্থ সকলের রূহের প্রতি মাগফিরাত রহমত নাযিল হওয়ার জন্য আল্লাহর নিকট দো’আ করবে।’ এই সালাম ও দো’আ তা-ই হওয়া উচিত, যা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। এছাড়া কুরআনের আয়াত-সূরা বা রাসূল(স) থেকে বর্ণিত দো’আও পাঠ করা যেতে পারে।

 ইমাম শাফেয়ী ও তাঁর সব সঙ্গী সাথী মনীষীবৃন্দ সর্বসম্মতভাবে এ নিয়মেরই উল্লেখ করেছেন। ইমাম আবুল হাসান মুহাম্মদ ইবনে মরযুক জাফরানী একজন মুহাক্কিক ফকীহ ছিলেন। তিনি বলেছেনঃ কবরকে হাত দ্বারা জড়িয়ে ধরবেনা, স্পর্শ করবেনা, কবরকে চুমু দেবেনা, কবর জিয়ারতের সুন্নাতী নিয়ম এই।

আবুল হাসান আরো বলেছেনঃ কবর ধরা, স্পর্শ করা ও তাকে চুমু দেয়া-যা বর্তমানকালের সাধারণ মানুষ করছে-নিঃসন্দেহে বিদয়াত, শরীয়তে নিষিদ্ধ, ঘৃণিত। তা পরিহার করা এবং যে তা করে তাকে এ থেকে বিরত রাখা একান্তই কর্তব্য।

আবু মুসা এবং খোরাসানের সুবিজ্ঞ ফিকহবিদরা বলেছেন যে, কবর স্পর্শ করা, চুমু দেয়া খ্রীস্টানদের অভ্যাস। মুসলমানদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেননা নির্ভূলভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, কবরের প্রতি কোনোরূপ তা’জীম দেখানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

হাফিজ ইবনে কায়্যিম লিখেছেন, নবী করীম(স)কবর যিয়ারত করতেন, করতেন কবরস্থ লোকদের জন্য দো’আ করার উদ্দেশ্যে, তাদের প্রতি দয়া দেখাবার জন্য ও তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ইস্তিগফার করার উদ্দেশ্যে।

অতঃপর লিখেছেনঃ এরূপ যিয়ারত করাকেই রাসূলে করীম(স) তাঁর উম্মতের জন্য সুন্নাত করে পেশ করেছেন এবং এ-ই তাদের জন্য শরীয়তী পন্থা ও নিয়ম করে দিয়েছেন।

কবরস্থানে উপস্থিত হয়ে মুসলমানরা কি বলবে এবং কি করবে, শরীয়তে তারও নির্দেশ রয়েছে। হাফেজ ইবনে কাইয়্যেম লিখেছেনঃ আরবী(*******)

-মুসলমান যখন কবর যিয়ারত করবে, তখন বলবেঃ আসসালামু আলাইকুম, হে কবরস্থানবাসী মুমিন মুসলমানগণ, আমরাও আল্লাহ চাইলে তোমাদের সাথে মিলিত হবো। এখন তোমাদের জন্য ও আমাদের নিজেদের জন্য আল্লাহর নিকট কল্যাণ ও শান্তি কামনা করছি।

অতঃপর তিনি লিখছেনঃ মুশরিকরা কিন্তু এরূপ করতে অস্বীকার করছে। তারা কবরস্থানে শিরক করে, আল্লাহর সামনে মৃত লোকদের নাম নিয়েই দোহাই দেয়, তাদের অসীলা বানায় ও তাদের নামে কসম করে। মৃত লোকদের নিকট নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য দো’আ করে, সাহায্য প্রার্থনা করে, তার দিকে তাওয়াজ্জুহ করে। আর এসব করে তারা রাসূলের হেদায়াতের বিরুদ্ধতা করে। কেননা রাসূলের হেদায়াত তো হলো তওহীদ এবং মৃত লোকদের প্রতি দয়া প্রদর্শন। আর মুশরিকদের পন্থা হলো শিরক এবং নিজেদের ও মৃত লোকদের প্রতি যাবতীয় অন্যায় চালিয়ে দেয়া।

আজমীর শরীফে খাজা মঈনউদ্দীন চিশতীর কবরে তাঁকে লক্ষ্য করে যে দো’আ করা হয়, তাতে খাজা বাবাকে ঠিক আল্লাহর আসনেই বসানো হয়(নাউজুবিল্লাহ)।

তাতে বলা হয়ঃ আল্লাহকে মাহবুব কি তুরবত কা তামাচ্ছুক শায়মা সোওদা কী আজমাত কা তামাচ্ছুক, আপনে দরওয়াজা সে নেয়ামত বখশে দিজিয়ে। -এই বিশ্বসংসারের পালনকর্তা আল্লাহর তুমি প্রিয় বান্দা। আল্লাহ তোমার কথা শোনেন। তাই আজ সন্ধ্যা বেলায় তোমার দুটি অবোধ সন্তান তোমার দরবারে হাযির হয়েছে। বাবা তুমি এদের বিদ্যা দাও, বুদ্ধি দাও, অর্থ-যশ-খ্যাতি প্রতিপত্তি দাও।

…… তোমার অপার করুণাধারার মতো এদের জীবনে যেন প্রেম নীতি অনন্তকালের জন্য অটুট থাকে। বাবা আমার। খাজা সাহেব আমার অন্ধের যষ্টির মতো তুমিই এদের একমাত্র ভরসা, তুমিই এদের অন্ধকারের আলো, সব বিপদের একমাত্র সহায়।

তুমি দুনিয়ার বাদশাহ, গরীবের একমাত্র পালনকর্তা, তোমার নামে ডুবে যাওয়া মানুষ ভেসে উঠে, অন্ধকার দুঃখের মহাসাগর হাসতে হাসতে পার হয়।

বলা হয়ঃ কোনো ভয় নেই, কোনো চিন্তা নেই, বাবা আপনাদের খুশী করাবেনই। বাবা বড় স্নেহপরায়ণ। যে ছেলেমেয়েরা এখানে ছুটে আসে বাবা তাদের দুঃখ দেখে সহ্য করতে পারেননা।

………..কাল আবার আসবেন। বাবা খুশী হবেন। (নাউজুবিল্লাহ)।

মৃত ব্যক্তির দাফন কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর মৃতের মাগফিরাত চেয়ে দো’আ করা রাসূলে করীমের আমল থেকে জায়েয বলে প্রমাণিত।

হাদীসে বর্ণিত হয়েছেঃ আরবী(********)

-নবী করীম(স) যখন মৃত ব্যক্তির দাফনের কাজ সম্পন্ন করতেন তখন সেখানে দাঁড়িয়ে যেতেন এবং লোকদের বলতেনঃ তোমরা তোমাদের এই ভাইয়ের জন্য মাগফিরাতের দো’আ করো। কবরে সে যেন দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত ও স্থির হয়ে থাকতে পারে, সে জন্যে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করো। কেননা এখন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

মনে রাখতে হবে, এ হলো দাফন কাজ সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার পর দো’আ করা। এ তো সম্পূর্ণ জায়েয। কিন্তু বর্তমানে সাধারণ প্রচলনে দেখা যায়, এ দিকে জানাযার নামায পড়া হলো, আর অমনি কিছু একটা পড়ে দো’আ করার জন্য হাত তোলা হলো। অথচ ইসলামী শরীয়তে এ কাজ মাকরূহ! তৃতীয় শতকের ফকীহ ইমাম আবু বকর ইবনে হামীদ(রহ)বলেনঃ জানাযা নামাযের পরই আলাদা করে দো’আ করা মাকরূহ(তাহরীম)।

শামসুল আয়েম্মা হাওয়ানী ও শায়খুল ইসলাম আল্লামা মগদী বলেনঃ জানাযা নামাযের পরে দো’আর জন্য কেউই দাঁড়াবেনা।

এমনিভাবে ফতোয়ার সিরাজিয়া(১ম খন্ড,১৪পৃ.), জামউর রমুজ(১ম খন্ড,১৭৪পৃ.),বহরুর রায়েক (২য় খন্ড, ১৮৩ পৃ.) প্রভৃতি গ্রন্থে এ কথা লিখিত রয়েছে।

মুল্লা আলী আল কারী বলেনঃ জানাযা নামায পড়া হয়ে যাওয়ার পরই মৃতের জন্য দো’আ করবেনা। কেননা এতে মূল জানাযা নামাযের ওপর অতিরিক্ত কিছু করার মতো হয়।

তাহলে প্রমাণিত হলো যে, যিয়ারতের জন্য গিয়ে কবরস্থ লোকদের কল্যাণের জন্য দো’আ করা ছাড়া মুমিন মুসলমান যিয়ারতকারীর আর কিছু করার নেই, নেই অন্য কোনো কাজ করার মতো, নেই কোনো কথা বলবার মতো। এ দৃষ্টিতে স্পষ্ট বোঝা যায়, কবরস্থানে গিয়ে মুসলমানরা বর্তমানে যা কিছু করছে, তা শুধু বিদয়াতই নয়, শিরকও। অনুরূপভাবে “আল্লাহ তা’আলা সর্বশক্তির উৎস” এই ইয়াকীন ও বিশ্বাস অন্তরে বজায় রেখে কোনো মাখলুকের নিকট বা জীবিত অবস্থায় বা মৃত্যুর পর- কোনো কিছুরই অলৌকিক ধরনের কাজের সাহায্য চাওয়াও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ শিরক এবং মুসলিম সমাজে তার প্রচলন তওহীদী আকীদার বিরুদ্ধে শিরকের বিদয়াত।

কুরআন তিলাওয়াত তো কুরআন হাদীস উভয়ের ভিত্তিতেই অত্যন্ত সওয়াবের কাজ বলে প্রমাণিত। কবরের নিকট বসে কুরআন তিলাওয়াতেও বাহ্যত কোনো দোষ দেখা যায়না। কিন্তু এ পর্যায়ে ফিকাহ এর কিতাবে বলা হয়েছেঃ কবরের নিকট কুরআন পাঠ করার ব্যাপারে ফিকহবিদদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। ইমাম শাফেয়ী ও মুহাম্মদ ইবনে হাসান বলেছেন, তা পড়া মুস্তাহাব। এতে মৃত ব্যক্তি কুরআনের সোহবতের বরকত পেতে পারে। কাযী ইয়াজ ও মালিকী মাযহাবের ক্বিরানী উভয়ই তাঁদের সাথে একমত। কিন্তু ইমাম মালিক ও ইমাম আবু হানীফা(রহ) এ কাজকে মাকরূহ মনে করছেন। কেননা এ কাজের সমর্থনে সুন্নাতের কোনো দলীল পাওয়া যায়নি।

 মৃত লোকদের নিকট সাহায্য চাওয়া বিদয়াত

যারা মরে গেছে-তাঁরা অলী-ই হোন, আর নবী-ই হউন তাদের নিকট জীবিত লোকদের কোনোরূপ সাহায্য প্রার্থনা করা- বিদয়াতীদের ভাষায় যাদের বলা হয় ইস্তেমদাদে রূহানী-সুস্পষ্ট বিদয়াত।

প্রকৃতপক্ষে সাহায্য বা ক্ষতি কোনো কিছু করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারোরই নেই। এজন্যই কুরআন মজীদে আল্লাহ তা‘আলা কেবল তাঁরই নিকট সাহায্য চাওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন নানাভাবে। সূরায়ে ফাতিহা যা মূলত একটি দোয়ারই সূরা, তাতে বন্দেগী যেমন একমাত্র আল্লাহরই করার কখা বলা হয়েছে, তেমনি সাহায্যও একমাত্র আল্লাহরই কাছে চাইতে শেখান হয়েছে। বলা হয়েছেঃ আরবী(*********)

-হে আল্লাহ! আমরা কেবল তোমারই বন্দেগী করি, কেবল তোমারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি।

এ আয়াত যেমন বন্দেগী, দাসত্ব ও আইন পালনকে কেবলমাত্র আল্লাহর সাথে খাস করে দেয়ার নির্দেশ দেয়, তেমনি যাবতীয় বিষয়ে ও ব্যাপারে সব রকমের সাহায্য প্রার্থনাও কেবল আল্লাহরই নিকট করা যেতে পারে কিংবা করা উচিত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। ইমাম রাযীর ভাষায়- হে আল্লাহ, আর কারো নিকটই আমি কোনো প্রকারের সাহায্য চাইনা। কেননা তুমি ছাড়া আর যার কাছেই সাহায্য চাইব, তার পক্ষে আমার কোনোরূপ সাহায্য করা আদৌ সম্ভব নয়-তোমার সাহায্য ছাড়া। তাহলে তোমার সাহায্য ছাড়া অপর কারো পক্ষেই আমার কোনোরূপ সাহায্য করা যখন আদৌ সম্ভব নয়, তখন আমি তোমাকে ছাড়া অপর কারো নিকট সাহায্যই চাইবোই বা কেন? মাঝখানের এই মধ্যস্থতা মেনে নেয়ার এবং তোমাকে বাদ দিয়ে তার নিকট ধর্ণা দেয়ার কিই বা দরকার থাকতে পারে?

তাছাড়া নবী করীম(স) এর বাণী এ পর্যায়ে আমাদের যে পথ নির্দেশ করে তাওতো এই যে, সাহায্য কেবল আল্লাহরই নিকট চাইতে হবে। অন্য কারো নিকট নয়। নবী করীম(স) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস(রা) কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন-

তুমি যদি কোনো প্রার্থনা করতে চাও তো, আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করো। আর যদি তুমি কোনো সাহায্যই চাও, তাহলে সাহায্য চাইবে আল্লাহর নিকট।

আর আসল ব্যাপারই যখন এই, তখন যাবতীয় ব্যাপারে কেবল আল্লাহরই নিকট সাহায্য চাওয়া কর্তব্য। অপর কারো নিকট সাহায্য চাওয়াতো চরম বোকামী; চূড়ান্ত নির্বুদ্ধিতা, নীচতা ও হীনতা।

বিশেষ করে মরে যাওয়া লোকদের নিকট সাহায্য চাওয়াতো আরো বেশি মারাত্মক। দুনিয়ায় জীবিত থাকা অবস্থায় বৈষয়িক বিষয়ে সাহায্য চাওয়ার তো একটা মূল্য আছে। আছে বৈষয়িক তাৎপর্য্, তা নিষিদ্ধও নয়; কিন্তু মরে যাওয়া লোকদের নিকট সাহায্য চাওয়ার কি অর্থ হতে পারে। কবরস্থ লোকেরা কি দুনিয়ার লোকদের ফরিয়াদ শুনতে পায়, শুনতে পেলেও তাদের কিছু করার ক্ষমতা আছে কি? তারা যে শুনতে পায়না, তাতো কুরআনের ঘোষণা থেকেই প্রমাণিত। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবীকে বলেছেনঃ আরবী(******)

-তুমি মরে যাওয়া লোকদের কোনো কথা শোনাতে পারবেনা।

অন্যত্র বলেছেনঃ আরবী(********)

-নিশ্চয়ই তুমি হে নবী! মরে যাওয়া লোকদের কোনো কথা শোনাতে পারবেনা।

মরে যাওয়া লোকদের সম্পর্কে যদি এই ধারণা হয় যে, তারা মরে যাওয়ার পর এতদূর ক্ষমতাশালী থাকে যে, সেখানেও তারা যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারে; আর এসব কিছুই করতে পারে অলৌকিকভাবে; তাহলে এতে তাকে আল্লাহর সমতুল্য-আল্লাহর সমান-ক্ষমতাশালী হওয়ার ধারণা করার শামিল। আর এ ধারণা যে শিরক তাতে আর কোনো সন্দেহ থাকতে পারেনা।

ইমাম বগভী লিখেছেনঃ সাহায্য প্রার্থনাতো এক প্রকারের ইবাদত। ইবাদত বলা হয় বিনয় ও হীনতা জ্ঞান সহকারে করাকে। আর বান্দাকে বান্দা বলাই হয় আল্লাহর মুকাবিলায় তার এই বিনয়, বাধ্যতা ও হীনতার কারণে।

-যে লোক নবী রাসূল ও নেককার লোকদের কবর যিয়ারত করতে গিয়ে তাদের কবরে গিয়ে নামায পড়বে এবং সেখানে বসে দো’আ করবে, কবরস্থ লোকদের কাছে নিজেদের প্রয়োজন পূরণের জন্য প্রার্থনা করবে-মুসলিম আলিমদের মধ্যে কারো মতেই এ কাজ আদৌ জায়েয নয়। কেননা ইবাদত, প্রয়োজন পূরণের জন্য প্রার্থনা এবং সাহায্য চাওয়া এসব এক আল্লাহরই হক (কেবল তাঁরই নিকট চাওয়া যেতে পারে, অন্য কারো নিকট নয়)।

নবী করীম(স)এর এ পর্যায়েরই এক দীর্ঘ হাদীসের  শেষাংশে বলা হয়েছেঃ আরবী(*******)

-জেনে রাখো, সমস্ত মানুষও যদি একত্রিত হয়ে তোমার কোনো উপকার করতে চায়, তবে তারা তা করতে পারবেনা ততটুকু ছাড়া, যা আল্লাহ নির্দিষ্ট করে তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। অনুরূপভাবে সমস্ত মানুষও যদি তোমার একবিন্দু ক্ষতি করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়, তবুও তারা কিছুই করতে পারবেনা কেবল ততটুকুই ছাড়া, যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। বস্তুত কলমতো তুলে নেয়া হয়েছে, কাগজের কালিও শুকিয়ে গেছে।

অর্থাৎ আল্লাহর বিধান মতো যা হওয়ার তা হবেই এবং শুধু তা-ই হবে, অন্য কিছু হবেনা, হতে পারেনা। কারো তেমন কিছু করার একবিন্দু ক্ষমতা নেই। কাজেই আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নিকট-সে মৃত নবী রাসূল আর অলী পীর গাওস কুতুব-ই হোকনা কেন- কোনো কিছু চাওয়ার কোনো অর্থই হতে পারেনা। বরং তা হবে সুস্পষ্ট শিরক-শিরক এর বিদয়াত।

মক্কা শরীফের মুফতী আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ মীর গনী আল হানাফীর নিকট নিম্নোক্ত বিষয়ে ফতোয়া চাওয়া হয়ঃ

মরে যাওয়া লোকদের নিকট মান সম্মান লাভ, রিযিকের প্রাচূর্য্ ও সন্তান লাভেল জন্য জীবিত লোকদের সাহায্য চাওয়া সম্পর্কে আলিম সমাজের কি বক্তব্য? কবরস্থানে গিয়ে এ কথা বলাঃ ‘হে কবরস্থ লোকেরা, তোমরা আমাদের জন্য আল্লাহর নিকট দো’আ করো; আমাদের গরিবী দূর করার, রিযিকের প্রাচূর্য্, বেশি সন্তান হওয়া, আমাদের রোগীদের নিরাময়তা এবং উভয় জগতে আমাদের কল্যাণ হওয়ার জন্য। কেননা তোমরা ‘সলফে সালেহীন’, তোমাদের দো’আ আল্লাহর নিকট কবুল হয়।” মৃত ব্যক্তিদের নিকট এরূপভাবে সাহায্য চাওয়া কি জায়েয? কুরআন, সুন্নাহ ও মুজতাহিদদের মতের ভিত্তিতে এর জবাব দিন।

জবাবে মুফতি সাহেব যে ফতোয়া দেন, তার সারকথা হলোঃ নবী অলীদের নিকট ফরিয়াদ করা যায়; কিন্তু প্রশ্নের উল্লেখিত বিষয় ও স্থানে তা করা শরীয়তে বিধিবদ্ধ নয়। এই ফতোয়ায় তদানীন্তন বহু সংখ্যক আলেম সম্মতিসূচক স্বাক্ষর দেন।

মাওলানা রশীদ আহমদ গংগুহী(রহ) অপর এক প্রশ্নের জওয়াবে লিখেছেনঃ শায়খ আবদুল কাদের জিলানী(রহ) গায়েব জানেন এবং স্বতন্ত্র ও স্বশক্তিতে দুনিয়ার ওপর তাশাররূফ(ক্ষমতা প্রয়োগ)করতে পারেন বলে বিশ্বাস করলে সুস্পষ্ট শিরক হবে। এ পর্যায়ে তিনি প্রথমত উল্লেখ করেছেন কুরআনের আয়াত। আরবী(******)

-গায়েব জগতের চাবিসমূহ আল্লাহরই হাতে নিবদ্ধ, তা তিনি ছাড়া আর কেউ জানেননা।

পরে বাজ্জাজীয়া প্রভৃতি ফতোয়ার কিতাবের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেনঃ

মাশায়িখ-তথা পীর বুযুর্গদের রূহ হাযির হয় এবং তারা সব কিছু জানে বলে যে বিশ্বাস করবে সে কাফির হয়ে যাবে।

উক্ত কিতাবে এ কথাও লিখিত হয়েছে-যে ব্যক্তি মনে করে মৃত ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া নিজেই যাবতীয় বিষয়ে ও ব্যাপারে কর্তৃত্ব চালায়, আর এরূপ আকীদা ও বিশ্বাস যার হবে, সে কাফির হয়ে যাবে। (বাহরুর রায়েখ গ্রন্থেও এমন উল্লেখ রয়েছে, মিয়াত মাসায়েল গ্রন্থ)।

মওলানা শাহ মুহাম্মদ ইসহাকের ছাত্র মওলানা নওয়াব কুতুবুদ্দীন খান কবরস্থ লোকদের নিকট সাহায্য চাওয়া জায়েয কিনা এমন এরূপ এক প্রশ্নের জবাবে লিখেছেনঃ

-কবরস্থ লোকদের নিকট সাহায্য চাওয়া, তা যে প্রকারেরই হোকনা কেন জায়েয নয়। শায়খ আবদুল হক মিশকাতের আরবী শরাহ এ লিখেছেনঃ নবী ও আম্বিায়া ছাড়া কবরস্থ অন্য লোকদের নিকট কোনোরূপ সাহায্য চাওয়া-ইস্তেমদাদে রূহানী করা-বহুসংখ্যক ফকীহ নাজায়েয বলেছেন। তাতা বলেছেনঃ মৃতদের জন্য দো’আ করা, তাদের জন্যে আল্লাহর নিকট মাগফেরাত চাওয়া, দো’আ ও কুরআন তিলাওয়াত করে তাদের কোনোরূপ ফায়দা পৌছানো ছাড়া কবর যিয়ারতে আর কোনো কিছুই করণীয় নেই।

এ পর্যায়ে একটি ধোঁকা হচ্ছে এই যে, আল্লাহর নামে আল্লাহর ওয়াস্তে কোনো অলীর রূহের নিকট কিছু প্রার্থনা করাকে জায়েয মনে করা হচ্ছে এবং এতে কোনো দোষ আছে বলে মনে করা হচ্ছেনা। মনে করা হচ্ছে যে, তাকে শুধু অসীলা হিসেবেই গ্রহণ করা হচ্ছে আর এরূপ অসীলা গ্রহণে কোনো দোষ নেই।

কিন্তু এ বাস্তবিকই একটি ধোঁকা যার ফলে অনেক নিষ্ঠাবান তওহীদবাদী মুসলমানও অজ্ঞাতসারে পরিষ্কার শিরক এর মধ্যে লিপ্ত হয়ে পড়ে। কোনো কিছু প্রার্থনা করার সময় আল্লাহ ছাড়া আর কারো নাম করা হলে হয় তার অর্থ এই হবে যে, আসলে চাওয়া হচ্ছে অন্য ব্যক্তির নিকট- আল্লাহর নিকট চাইলে আল্লাহ তা দিবেন কিনা কিংবা শুধু আল্লাহর তা দেয়ার ক্ষমতা আছে কিনা। আর এ দু’টো দিক দিয়েই ব্যাপারটি পুরো শিরক এর মধ্যে গণ্য হয়ে যায়।

শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী এ পর্যায়ে লিখেছেনঃ

-শিরক হওয়ার ধারণা হয় যে সব ক্ষেত্রে, তার মধ্যে এ ও একটি যে, লোকেরা আল্লাহ ছাড়া অপরের নিকট রোগীর রোগ সারা ও গরীবকে ধন দেয়া প্রভৃতি প্রয়োজন পূরণের জন্য দো’আ করে, তাদের জন্য মানত মানে, এসব মানত হতে নিজেদের কামনা পূরণ হওয়ার আশা পোষণ করে তাদের নামে তিলাওয়াত করে বরকত লাভের আশায়। এ জন্যে আল্লাহ লোকদের ওপর ওয়াযিব করে দিয়েছেন যে, তারা নামাযে বলবেঃ “হে আল্লাহ! আমরা কেবল তোমারই বন্দেগী করি, কেবল তোমারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি।” আল্লাহ আরো বলেছেনঃ আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেই ডাকবেনা। এ ডাকা নিষিদ্ধ হওয়ার অর্থ শুধু ইবাদত করা থেকে নিষিদ্ধ নয়-যা কোনো কোনো তাফসীরকারক মনে করেন। বরং এর অর্থ হচ্ছে অন্য কারো নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা নিষেধ।

কেননা আল্লাহ অপর আয়াতে বলেছেনঃ “কেবল আল্লাহকেই ডাকবে। ফলে তোমরা যা চাও, তিনি তা তোমাদের জন্য খুলে দিবেন।”

মিথ্যা প্রচারের বাতুলতা

কবর পূজা ও রূহানী ইস্তিমদাদে বিশ্বাসী লোকেরা তাদের মতের সমর্থনে একটি কথাকে দলীল হিসেবে পেশ করে। কথাটি এইঃ আরবী(******)

-তোমরা যখন দুনিয়ার কাজ কর্মে খুব কাতর ও দিশেহারা হয়ে পড়বে, তখন তোমরা কবরবাসীদের নিকট সাহায্য চাইবে।

এ কথাটিকে তারা হাদীস হিসেবে চালিয়ে দেয়। আসলে এটা হাদীস নয়, এটাকে হাদীস বলা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। বিশেষজ্ঞগণ এ কথাটি সম্পর্কে লিখেছেনঃ বিশেষজ্ঞগণ সম্পূর্ণ একমত হয়ে বলেছেন যে, এ কথাটি সম্পূর্ণ মনগড়া, মিথ্যা।

আর শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী এ কথাটি সম্পর্কে লিখেছেনঃ হাদীস বলে চালানো এ কথাটি মুজাবির(পেশকার খাদেমদের)নিজেদের মনগড়া কথা। তারা নযর-নিয়াজ লাভের উদ্দেশ্যে নিজেদের এ কথাটি মিথ্যামিথ্যি নবী করীমের নামে চালিয়ে দিয়েছে।

আসলে এ কথাটি কোনো হাদীসই নয়। মুহাদ্দিস এবং মূহাক্কিক সূফীগণও একে মনগড়া ও রচিত কথা বলে ঘোষণা করেছেন। বস্তুত আকীদার ব্যাপারে এ রকম বানানো কথাকে দলীল হিসেবে পেশ করার কারণ হলো চরম অজ্ঞতা ও মূর্খতা।

সূরা আল বাকারার আয়াতঃ فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَندَادًا وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ

এর তাফসীরে শাহ আবদুল আযীয(রহ) বিভিন্ন রকম ও প্রকারের ‘প্রতিদ্বন্ধীর’ উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে চতূর্থ রকম হলো কবর পূজারীদের বানানো প্রতিদ্বন্ধী। তাদের সম্পর্কে এখানে লিখেছেনঃ পীর পুজারী লোকেরা বলেঃ বুযুর্গ লোকেরা খুব বেশি বেশি রিয়াজত ও সাধনা মুজাহিদা করে বলে তাদের দো’আ ও সুপারিশ আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় বিধায় এ দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ার পর তাদের রূহে অসীম শক্তি ও বিশালতার সৃষ্টি হয়। তাদের শেকেল-সুরতকে যদি বরজাখ বানান্ হয় কিংবা তার বৈঠকখানায় ও কবরস্থানে আজিজী ইনকেসারীর সাথে সেজদা করা হয়, তাহলে তাদের রূহ জ্ঞানের বিশালতার কারণে তা জানতে পারে এবং দুনিয়া আখিরাতে সিজদাকারীর কল্যাণের জন্য তারা সুপারিশ করে। (নাউজুবিল্লাহ)।

এ থেকে বোঝা গেল, এ ধরনের ইস্তিমদাদ ও কবরপূজাকে শাহ আবদুল আজীজ(রহ) সুস্পষ্টরূপে আল্লাহর প্রতিদ্বন্ধী গ্রহণ করা মনে করেন। আর এ গ্রহণ করাই হলো শিরক-যা কুরআনে সুস্পষ্ট নিষিদ্ধ।

আল্লাহ ও বান্দার মাঝে এ ধরনের অসীলা ধরা ও সুপারিশ হাসিল করার কোনো প্রয়োজন আছে বলে যদি কেউ মনে করেন, তবে সে আল্লাহর সম্পর্কে বদনামী করেছে। আল্লামা ইবনে কাইয়্যেম লিখেছেনঃ যে মনে করবে যে, আল্লাহর সন্তান আছে কিংবা তাঁর কোনো শরীক আছে বা তাঁর অনুমতি ছাড়াই কেউ তাঁর নিকট শাফায়াত করতে পারে অথবা সৃষ্টি ও স্রষ্টার মধ্যে এমন কোনো মাধ্যম রয়েছে, যা সৃষ্টির প্রয়োজনের কথা আল্লাহর নিকট পেশ করে কিংবা আল্লাহ ছাড়া এমন কতক অলী-আল্লাহও রয়েছে, যারা আল্লাহ ও সেই লোকদের মাঝে অসীলা ও নৈকট্যের কাজ করবে এবং স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। এ জন্যে তাদের নিকট তারা দো’আ করে, তাদের ভয় করে চলে, আর তাদের কাছ থেকে অনেক কিছুর আশা করে- এই যার আকীদা হবে, সে তো আল্লাহ সম্পর্কে অত্যন্ত জঘন্য ও খারাপ ধারণা পোষণ করলো।

কাজী সানাউল্লাহ পানিপত্তী(র) হানাফী মাযহাবের বড় আলিম এবং তাসাউফপন্থী মনীষী ছিলেন। কুরআন-হাদীসে গভীর পান্ডিত্য থাকার কারণে তিনি সর্বমহলেই সম্মানার্হ ও শ্রদ্ধেয় ছিলেন। তিনি কুরআনের আয়াতঃ إِنَّ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ عِبَادٌ أَمْثَالُكُمْ ۖ

-তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে আর যাদের ডাকো, তারা তো তোমাদের মতোই দাসানুদাস মাত্র।

এ সম্পর্কে লিখেছেন-এ আয়াত বিশেষভাবে কেবলমাত্র মূর্তি পূজারীদের জন্য নয়, বরং

مِن   دُونِ اللَّهِ    আল্লাহ ছাড়া সাধারণভাবে আর যে কেউ-ই হোকনা কেন, সে-ই এর মধ্যে শামিল এবং তাকে ডাকলেই সুস্পষ্ট শিরক হবে। কেননা ওদের যে ডাকা হচ্ছে, মানুষের কোনো একটি প্রয়োজন পূরণ করার ওদের কি ক্ষমতা আছে? কেউ যদি বলে যে, এ আয়াত কাফিরদের জন্য প্রযোজ্য, কেননা তারাই মূর্তিগুলোকে স্মরণ করে থাকে, তা হলে বলবো

دُونِ اللَّهِ     শব্দটি সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত কোনো বিশেষ জিনিস যে বোঝায়না, তা-ই একথা স্বীকৃতব্য নয়।

বস্তুত কুরআন ও হাদীস থেকে মুশরিকী আকীদা ও আমলের অনুকূলে দলীল পেশ করা বড়ই আশ্চর্যের বিষয়। আরও আশ্চর্যের বিষয় যে সব মনীষী আজীবন শিরক বিদয়াতের বিরুদ্ধে কলম চালিয়েছেন, বাস্তবভাবে অভিযান চালিয়েছে, তাঁদেরই কোনো কোনো কথা পূর্বাপর সম্পর্ক ছিন্ন করে শিরক বিদয়াতের সমর্থনে চালিয়ে দিতে চেষ্টা করা হয়েছে। এ ব্যাপারে তাঁদের এই ধোঁকাবাজি অভিজ্ঞ মহলে ধরা পড়ে যেতে পারে- এতটুকু ভয়ও এই বিদয়াতপন্থী ও বিদয়াত প্রচারকদের মনে জাগেনা। মনে হয়, বিদয়াত ছাড়া তাদের মন মগজে আর কিছু নেই। বিদয়াতেই তাদের রুচি, বিদয়াতই তাদের পেশা যেমন এক শ্রেণীর পোকার রুচি কেবল ময়লা ও আবর্জনায়! আল্লাহ এদের হেদায়াত করুন।

কুরআনের আয়াত দিয়ে ধোঁকাবাজি

আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সাহায্য চাওয়া জায়েয নয়; বরং তা শিরক। পূর্বোক্ত আলোচনা থেকে তা কুরআন হাদীস ও  ফিকাহর অকাট্য দলীলের ভিত্তিতে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু এই আলোচনার শেষ ভাগে পীর পোরস্ত আলিমদের তিনটি দলীল সম্পর্কে সংক্ষেপে দুটি কথা না বললে ভুল অপনোদন এবং বাতিলের প্রতিবাদ সম্পূর্ণ হবেনা।

উক্ত আলিম সাহেবদের আল্লাহ ছাড়া অন্য শক্তির নিকট-জীবিত বা মৃত অলী-আল্লাহর নিকট ইস্তেমদাদ ও সাহায্য চাওয়া জায়েয। আর তা প্রমাণের জন্য তারা কুরআন মজীদ থেকে তিনটি আয়াত পেশ করে থাকেন। প্রথম আয়াত হলো সূরা ছফ এর।

مَنْ أَنصَارِي إِلَى اللَّهِ ۖ قَالَ الْحَوَارِيُّونَ نَحْنُ أَنصَارُ اللَّهِ ۖ

-হযরত ঈসা (আ) বললেনঃ আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে আমার সহায়ক কে হবে? শিষ্যগণ বললো-আমরাই আল্লাহর কাজে আপনার সহায়ক। (আছ ছফঃ১৪)

আর দ্বিতীয় আয়াতটি হলো সূরা আল কাহাফ এর।

قَالَ مَا مَكَّنِّي فِيهِ رَبِّي خَيْرٌ فَأَعِينُونِي بِقُوَّةٍ أَجْعَلْ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ رَدْمًا [١٨:٩٥]

-তোমাদের আর্থিক সাহায্য দেয়ার জরুরত নেই, কেননা আমার প্রভু আমাকে যে ধন সম্পদ দান করেছেন তা-ই যথেষ্ট; তবে তোমরা আমাকে দৈহিক সাহায্য করতে পার। তাহলে আমি তোমাদের ও তাদের মাঝে এক দৃঢ় প্রাচীর নির্মাণ করে দেবো।(আল কাহাফঃ৯৫)

আর তৃতীয় আয়াত হলো সূরা ইউসুফ এর। আয়াতটি এইঃ

اذْكُرْنِي عِندَ رَبِّكَ فَأَنسَاهُ الشَّيْطَانُ ذِكْرَ رَبِّهِ فَلَبِثَ فِي السِّجْنِ بِضْعَ سِنِينَ [١٢:٤٢]

–তোমার প্রভুর(আজিজ মিসর) নিকট আমার কথা উল্লেখ করবে। কিন্তু শয়তান তাকে তার প্রভুর নিকট তার কথার উল্লেখ করতে ভুলিয়ে দিলো। ফলে ইউসুফ(আ)আরও কয়েক বৎসর কারাগারেই রইলো।

এই তিনটি আয়াত পেশ করে পীর-পোরস্ত আলিম নামধারী লোকেরা বলতে চান যে, যেভাবে হযরত ঈসা(আ)হাওয়ারী লোকদের নিকট সাহায্য চেয়েছিলেন, যেভাবে জুলকারনাইন জনগণের কাছে বলেছিলেন বাঁধ বাধার ব্যাপারে তোমরা শক্তি দিয়ে আমাকে সাহায্য করো এবং যেভাবে হযরত ইউসুফ(আ) কারাগার থেকে মুক্তিলাভের জন্য মুক্তিপ্রাপ্ত সাথীকে বাদশাহর নিকট সুপারিশ করতে বলেছিলেন, অনুরূপভাবে কোনো বিপদ থেকে উদ্ধার পাবার জন্যে কিংবা বৈষয়িক মুক্তি লাভের আশায় যে কোনো জীবিত বা মৃত অলী আল্লাহর নিকট দো’আ প্রার্থনা করা যায় তা সম্পূর্ণ জায়েয। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে কথাটি প্রমাণ করার জন্য কুরআন মজীদের উক্ত তিনটি আয়াত পেশ করা হয়, তা এর কোনো একটি আয়াত থেকেও প্রমাণিত হয়না। প্রত্যেকটি আয়াতকে ভিত্তি করে বিচার বিবেচনা করলেই আমার এ কথার সত্যতা প্রমাণিত হবে। মনে রাখা আবশ্যক যে, আলোচনা হচ্ছে ‘ইস্তেমদাদে রূহানী’ ‘আধ্যাত্মিক উপায়ে সাহায্য পাওয়ার জন্য কারো নিকট দো’আ করা’ সম্পর্কে। আহলে সুন্নাত আল জামা’আতের আকীদা হলো এই যে, এ ধরনের সাহায্য প্রার্থনা একমাত্র আল্লাহরই নিকট করা যেতে পারে। কেননা এ ধরনের সাহায্য দানের ক্ষমতা আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই-থাকতে পারেনা। আর আল্লাহ তা’আলার সুস্পষ্ট নির্দেশ এই যে, এ ধরনের অবস্থায় কেবল আল্লাহর নিকট সাহায্য চাইতে হবে। তওহীদী আকীদাও তাই। অন্য কারো নিকট সাহায্য চাইলে তা আকীদার দিক দিয়ে হবে শিরক এবং তওহীদী আকীদায় তাই হবে বিদয়াত। এ প্রেক্ষিতে আয়াত তিনটি যাচাই করলে দেখা যাবে যে, এর কোনোটিতেই এ পর্যায়ের সাহায্য চাওয়ার কথা নেই। সূরা ছফ এর প্রথমোক্ত আয়াতে হযরত ঈসা(আ) এর যে সাহায্য চাওয়ার কথা বলা হয়েছে ‘আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে আমার সহায়ক কে হবে?’ এ কথা বলে, সে সাহায্য তো কোনো ব্যক্তির বিপদে পড়ে চাওয়া সাহায্য নয়। হযরত ঈসা(আ) কোনো বিপদে পড়ে হাওয়াকারীদের সাহায্য চাননি। সাহায্য চাননি নিজের কোনো কাজের ব্যাপারে। কোনো আধ্যাত্মিক উপায়ে সাহায্য করার জন্যে ফরিয়াদ করা হয়নি এখানে। কুরআনের আয়াত مَنْ أَنصَارِي إِلَى اللَّهِ‘আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে কে আমার সহায়ক হবে’ কথাটিই প্রমাণ করে সে সাহায্য চাওয়ার মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহর দ্বীন প্রচার ও কায়েম করার ব্যাপারে কাজ করার জন্য এগিয়ে আসতে তাদের আহবান জানানো হয়েছে মাত্র। কেননা দ্বীন কায়েমের জন্য চেষ্টা করা কেবলমাত্র ঈসা(আ) এরই দায়িত্ব ছিলনা, অন্য সব মুসলমানেরও দায়িত্ব ছিল। আয়াতটির সূচনাইতো হয়েছে আল্লাহর সাহায্যকারী হওয়ার নির্দেশ দিয়ে।

বলা হয়েছেঃ হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারী হও।

এখন বাস্তবভাবে আল্লাহর সাহায্য কাজে আহবান করাতো নবীরই দায়িত্ব। হযরত ঈসা(আ) তো সে দায়িত্বই পালন করেছেন এই সাহায্য চেয়ে। এ কারণেই আল্লামা আলূসী সহ সব মু’তাবার তাফসীরেই এই আয়াতের তাফসীর করা হয়েছে এভাবেঃ

অর্থাৎ আল্লাহর সাহায্যের উদ্দেশ্য নিয়ে কে আমার সৈন্য হতে রাজি আছে? এতো কোনো আধ্যাত্মিক উপায়ে সাহায্য করতে বলার কথা নয়। এ তো হচ্ছে নবীর নব্যুয়তী দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে সাহায্য করার আহবান। এ কাজ নবীর নিজের কোনো কাজ নয়। এ হচ্ছে সোজাসুজি ও সরাসরি আল্লাহর সাহায্যের কাজ। এর বড় প্রমাণ রয়েছে খোদ কুরআনের এ সূরাতেই উল্লিখিত  তাদের জবাবে।তারা অগ্রসর হয়ে এসেছে ঈসা(আ) এর সাহায্যে নয়, আল্লাহর সাহায্য করার কাজে। তাই তারা বলেছেন- نَحْنُ أَنصَارُ اللَّهِ–আমরাই আল্লাহর সাহায্যকারী।আল্লামা আলুসী এখানেই লিখেছেনঃ আমার সাহায্য বলার মানে দুই শরীকের কাজকে একজনের পক্ষে অপরজনের কাজ বলা। আর যখন, এরা দুপক্ষই সমানভাবে আল্লাহর সাহায্য  কাজে শরীক হয়েছে, তখন উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপিত হলো এবং এ কথা বলাকে সহীহ সাব্যস্ত করে দিলো।

অতএব স্পষ্ট হয়ে গেল যে, হযরত ঈসা(আ) কোনো অলৌকিক কাজ করার ব্যাপারে কোনো মৃত ব্যক্তির নিকট সাহায্য চাননি। তাঁর কথার সার হলোঃ বাঁধ বাঁধতে হবে, টাকা পয়সা আমার আছে। তোমরা বাস্তবভাবে সাহায্য করে আমার এ কাজে সাহায্য করো। এ হচ্ছে বৈষয়িক কাজে নিতান্ত বাস্তবভাবে কাজের সহযোগিতা করতে বলা। আর এ জগততো বাস্তব কার্য্কারণের জগত। এ জগতে এ ধরনের পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতা চাওয়া বা পাওয়া কিছুতেই কোনো আধ্যাত্মিক সাহায্যের ব্যাপার নয়।এ হলো মানুষের সামাজিক জীবনের জন্য অপরিহার্য্ ব্যাপার, যা সম্পূর্ণ জায়েয। তাই ইমাম ইবনে কাসীর এ আয়াতের তাফসীরে লিখেছেনঃ

-“অর্থাৎ আল্লাহ আমাকে রাজত্ব ও আধিপত্য যা দিয়েছেন, তা তোমাদের জন্য সব কিছুই থেকে উত্তম। কিন্তু তোমরা আমাকে শক্তি দিয়ে সাহায্য করো অর্থাৎ কাজ করে ও নির্মাণ কাজের জিনিসপত্র দিয়ে।”

আর তৃতীয় আয়াতটিও একটি বৈষয়িক তদবীর সংক্রান্ত ব্যাপার। হযরত ইউসুফ(আ) দীর্ঘদিন বিনাবিচারে আটক হয়ে পড়েছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন, বাদশাহ হয়তো তাঁর কথা ভুলেই গেছে। অতএব তিনি সহবন্দীর রেহাই পেয়ে জেল থেকে চলে যাওয়ার সময় বলে দিলেন যে, আমার কথা তোমার প্রভুর নিকট বলবে। এও যদি কোনো আধ্যাত্মিক সাহায্য চাওয়ার পর্যায়ের কাজ হয়ে থাকে তা হলে তো বলতে হবে যে, নবীও অ-নবীর নিকট অলৌকিক উপায়ে সাহায্য চাইতে পারেন। কিন্তু তা যে একজন নবীর পক্ষে কতখানি অপমানকর তা বলাই বাহুল্য।(এই পর্যায়ে ইমাম ইবনে কাসীর একটি হাদীস উদ্ধৃতি করেছিলেন। হাদীসটি এইঃ নবী করীম(স) বলেছেনঃ হযরত ইউসুফ(আ) এই যে কথাটি বলেছিলেন, অর্থাৎ তিনি যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নিকট মুক্তি কামনা করেছিলেন, তা না করলে তিনি যতদিন জেলে ছিলেন ততদিন থাকতেননা। পরে ইবনে কাসীর লিখেছেন- এ হাদীসটি সাংঘাতিকভাবে যয়ীফ, অগ্রহণযোগ্য।) সবচেয়ে বড় কথা, একজন নবী অলৌকিক বা আধ্যাত্মিক উপায়ে(?) সাহায্য চাইলেন, আর শয়তান তা ভুলিয়ে দিলো, তার মুক্তির প্রয়াসকে ব্যর্থ করে দিলো! এরূপ কথা পীর-পোরস্তারাই বিশ্বাস করতে পারে, কোনো তওহীদবাদী আহলে সুন্নাত ব্যক্তি এরূপ বিশ্বাসকে মনের দূরতম কোণেও স্থান দিতে প্রস্তুত হতে পারেনা।

মোটকথা, এ কয়টি আয়াত দিয়ে পীর-পোরস্তরা যা প্রমাণ করতে চাইছে তা আদৌ প্রমাণিত হয়না। হয় শুধু ধোঁকাবাজি করা।

এই পর্যায়ে কুরআনের নিম্নোদ্ধৃত আয়াতটি আমাদের অবশ্যই সবসময় স্মরণে রাখতে হবে।

আরবী(********)

-আল্লাহ ছাড়া আর যারা যারা আছে তারা তো তোমাদের কোনো উপকারও করতে পারেনা, ক্ষতিও না-তাই তাকে আদৌ ডাকবেনা। যদি ডাকো তাহলে তুমি জালিমদের মধ্যে গণ্য হয়ে যাবে।

মানুষ কাউকে ডাকে তাঁর কাছ হতে উপকার পাওয়ার আশায় অথবা কোনো ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য। আর উপকার ও ক্ষতি যে করতে পারেনা তাকে ডেকে কি লাভ হবে। তা করার নিরংকুশ ক্ষমতা তো একমাত্র আল্লাহর, অতএব ডাকতে হবে সর্বাবস্থায়, সব কিছুর জন্য একমাত্র তাঁকেই। পানাহ বা আশ্রয় চাওয়া কেবল তাঁরই নিকট সম্ভব। কেননা পানাহ বা আশ্রয় দেয়ার একবিন্দু ক্ষমতা আল্লাহ ছাড়া আর কারোরই নেই। তাই আল্লাহ নিজেই নির্দেশ দিয়েছেন-পানাহ বা আশ্রয় চাও কেবল সেই এক আল্লাহর নিকট।

কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে বিদেশ সফর

কবর যিয়ারত করা জায়েয কিন্তু তা করতে হবে শরীয়তসম্মতভাবে। কবরস্থানে গিয়ে যেমন শরীয়তবিরোধী কোনো কাজ করা যাবেনা, কোনো অবাঞ্চিত কথাও বলা যাবেনা; তেমনি কোনো নবী বা অলী বা কোনো নেককার লোকের কবর যিয়ারত করার উদ্দেশ্যে বিদেশ সফরও জায়েয নয়। এ পর্যায়ে সর্বপ্রথম দলীল হচ্ছে নবী করীম(স) এর তীব্র ও জোরদার নিষেধ বাণী।

তিনি ইরশাদ করেছেনঃ আরবী(******)

- আল্লাহর নৈকট্য লাভ মূলক সফর কেবল তিনটি মসজিদ যিয়ারতের জন্য করা যাবে, তা হলো মসজিদে হারাম(কাবা ঘর), মসজিদে নববী, এবং মসজিদে আকসা। এছাড়া আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে অপর কোনো স্থানের জন্য সফর করা যাবেনা।

ইমাম নববী এ হাদীসের ব্যাখ্যায় লিখেছেনঃ এ হাদীস উক্ত তিনটি মসজিদের এবং সে মসজিদ ত্রয়ের জন্য সফর করার ফযীলত প্রমাণ করেছে। কেননা সর্বশ্রেণীর আলিমের মতে এর মানে হচ্ছে এই যে, মসজিদত্রয় ছাড়া অন্য কোনো মসজিদের জন্য সফর করার কোনো ফযীলত নেই।

ইমাম নববী হাদীসের ব্যাখ্যায় অন্যত্র লিখেছেনঃ এ তিনটি হচ্ছে নবীগণের মসজিদ। এতে নামায পড়ার ফযীলত অনেক বেশি অন্যান্য মসজিদের তুলনায়।

অতএব তাতে নামায পড়া ও ইবাদত করার নিয়্যতেই সফর করা যাবে। তাতে আল্লাহ ছাড়া অপর কারো ইবাদতের জন্য সফর করা যাবেনা। কেননা মসজিদে হারামের দিকে সফর করা মানত করা হলে তার হ্জ্জ বা উমরা করার উদ্দেশ্যে তা পূরণ করা কর্তব্য। আর শেষোক্ত মসজিদদ্বয়ের সফর মানত করা হলে ইমাম শাফেয়ীর একটি কথা হচ্ছে এই যে, এ দুয়ের নিয়্যতে সফর করা মুস্তাহাব; ওয়াজিব নয়। আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, সে মানত পূরণ করা ওয়াজিব হবে। আর অনেক আলিমই এই মত পোষণ করেন। অতঃপর তিনি লিখেছেনঃ

-এ তিনটি মসজিদ ছাড়া অপর কোনো মসজিদের জন্য সফর মানত করা হলে তা পূরণ করা ওয়াজিব নয় এবং মানতই শুদ্ধ হবেনা। এ মত আমাদের এবং সমগ্র আলিমদের। অবশ্য মুহাম্মদ ইবনে মুসলিম মালিকী ভিন্নমত পোষণ করেন।

এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছেঃ হাদীসের শব্দ ‘শাদ্দুর রীহাল’ মানে বিদেশ সফর করা। অর্থাৎ আল্লাহর নৈকট্য লাভের নিয়্যত ও উদ্দেশ্যে এ তিনটি মসজিদ ছাড়া অপর কোনো স্থানের জন্যে সফর করবেনা। কেননা এ তিনটি মসজিদিই হচ্ছে সবচেয়ে বড় সম্মানার্হ্ এ কারণে যে, এ ছাড়া অপর সব মসজিদই মর্যাদায় সমান। অতএব যে কোনো মসজিদেই নামায পড়া হোকনা কেন, সবখানেই একই রকম সওয়াব পাওয়া যাবে। কিন্তু এ তিনটি মসজিদের সম্মান ভিন্ন রকম। এ হাদীসের অর্থ হলো, কোনো বিশেষ জায়গার নিয়্যত করে সেজন্যে সফর করবেনা। কিন্তু সেখানে যদি লেখাপড়া শেখা ইত্যাদির কোনো প্রয়োজন থাকে, তাহলে সে কথা স্বতন্ত্র। হাদীসের বাহ্যিক অর্থ তো এই যে, এই তিনটি স্থান ছাড়া অপর কোনো জায়গায় সফরই করতে নিষেধ করা হয়েছে। কেউ বলেছেন এ তিনটি মসজিদ ছাড়া অপর কোনো স্থানে সফরের মানত করা হলে তা পূরণ করা ওয়াজিব হবেনা। এ মানতই মানত বলে গণ্য হবেনা, তা পূরণ করাও ওয়াজিব হবেনা। এ মানতই মানত বলে গণ্য হবেনা, তা পূরণ করা জরুরী হবেনা। আর ‘অলী’ ও নেককার লোকদের বা পবিত্র স্থানসমূহ সফর করা সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা হারাম।

মনে রাখতে হবে, এখানে শুধু যিয়ারত করতে নিষেধ করা হয়নি, তা আলোচ্যও নয় এখানে। বরং এ নিষেধ হচ্ছে শুধু এ উদ্দেশ্যে বিদেশ সফর করা সম্পর্কে। রাসূলের এ হাদীসই হচ্ছে সুন্নাত এবং এই সুন্নাত অনুযায়ীই আমল করেছেন সাহাবায়ে কিরাম। এমন কি, কোনো কোনো বর্ণনামতে শুধু রাসূলের কবর যিয়ারতের জন্য সফর করার কাজও তাঁরা করেননি এবং তা তাঁরা করা পছন্দও করেননি। এ পর্যায়ে প্রমাণ হিসেবে নিম্নোক্ত কথা দুটি উল্লেখ করা যেতে পারেঃ

সব সাহাবী- যেমন মুয়ায, আবু ওবায়দা, উবাদা ইবনে সামিত এবং আবুদ দারদা প্রমুখ-এঁদের কেউ দুনিয়ার একটি কবরগাহেরও যিয়ারত করবার উদ্দেশ্যে সফর করেছেন বলে জানা যায়নি।

এমন কি, সাহাবায়ে কিরাম(রা)শুধু কোনো নবীর মাযার যিয়ারত করার উদ্দেশ্যে সফর করেছেন বলেও প্রমাণ পাওয়া যায়না। বলা হয়েছেঃ হযরত আবু বকর, উমর, উসমান, আলী(রা) এবং তাঁদের পরবর্তী লোকদের যুগ শেষ হওয়া পর্য্ন্ত কোনো সাহাবীই কোনো নবী বা নেক ব্যক্তির কবর যিয়ারতের জন্য সফর করে বিদেশ যাননি।

এই পর্যায়ে সর্বজনমান্য ভারতীয় মনীষী শাহওয়ারী মুহাদ্দিসে দিহলভী যা কিছু লিখেছেন, তা উল্লেখ করে আমাদের এ সম্পর্কিত বক্তব্য শেষ করছি। মুয়াত্তা ইমাম মালিক গ্রন্থে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে নিম্নোক্ত ভাষায়; হযরত আবু হুরায়রা(রা)বলেনঃ আমি বুসরা ইবনে আবূ গিফারীর সঙ্গে সাক্ষাত করলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ কোথ্থেকে এসেছ? বললামঃ ‘তুর’ থেকে। তিনি বললেন-তুরের দিকে যাওয়ার পূর্বে যদি তোমার সাথে আমার একবার সাক্ষাত হতো, তাহলে তোমার আর যাওয়া হতোনা। কেননা, নবী করীম(স) কে আমি বলতে শুনেছিঃ তোমরা মসজিদে হারাম, আমার মসজিদ এবং মসজিদে ইলীয়া বা বায়তুল মুকাদ্দাস- এই তিনটি মসজিদ ছাড়া আর কোনো মসজিদের জন্য সফরের আয়োজন করবেনা।

শাহ ওয়ালী উল্লাহ(রা) এ হাদীসের ব্যাখ্যায় লিখেছেনঃ এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, এ তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোনো জায়গার জন্য আল্লাহর নৈকট্য (বা সওয়াব) লাভের নিয়্যতে সফর করা এবং কোনো জায়গাকে এ জন্যে নির্দিষ্ট করে নেয়া নিষিদ্ধ।

এর কারণ বলতে গিয়ে তিনি লিখেছেনঃ সম্ভবত এ নিষেধের মূল লক্ষ্য হলো লোকদেরকে সে কাজ হতে বিরত রাখা, যা জাহিলিয়াতের জামানার লোকেরা করতো। যেমন-তারা নিজেদের ইচ্ছেমত এক একটি তাজীমের স্থান আবিষ্কার ও নির্দিষ্ট করে নিত।

তিনি এ হাদীসের ভিত্তিতে আরো লিখেছেনঃ আমি বলবো জাহিলিয়াতের যুগের লোকেরা বিভিন্ন কল্পনার ভিত্তিতে বিভিন্ন জায়গাকে তাজীমের জায়গা বলে মনে করতো, তার যিয়ারত করতো, তা থেকে বরকত হাসিল করতো। তাতে করে মূল দ্বীন-ই বিকৃত হয়ে যেত, আর হতো নানা বিপর্য্য়। এ কারণে আলোচ্য হাদীস দ্বারা নবী করীম(স) এ বিপর্য্য়ের পথ বন্ধ করে দিলেন, যেন ইসলামী সুন্নাতী আদর্শ ও নিদর্শনাদি গায়র ইসলামী আদর্শের সাথে মিলে মিশে একাকার না হয়ে যায় এবং তা গায়রুল্লাহর ইবাদতের পন্থা উদ্ভাবনের কারণ রূপে গৃহীত না হয়। আমার মতে হক কথা হলো এই যে কবর, কোনো অলী আল্লাহর ইবাদতের জায়গা ও ‘তুর’-এ সবাই সমানভাবে এই নিষেধের মধ্যে গণ্য।

এ হাদীসের ব্যাখ্যায় আল্লামা কস্তলানী লিখেছেনঃ

-এ তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য সব জায়গায় যাওয়ার জন্য সফর করা-যেমন নেককার লোকদের জীবিত থাকা বা মরে যাওয়ার পর তাদের জিয়ারতের জন্য যাওয়া, সেখানে ইবাদত করা বা সেখান থেকে বরকত লাভের উদ্দেশ্যে যাওয়া- এ সম্পর্কে আবু মুহাম্মদ জুয়েনী বলেন যে, বাহ্যত হাদীস অনুযায়ী আমল করা হলে এসব হারাম হবে। কাযী হুসাইন, কাযী ইয়াজ ও অন্যান্য মনীষীও এই মত-ই গ্রহণ করেছেন। তবে শাফেয়ী মাজহাবের ঈমামুল হারামইন প্রমুখের মতে এ কাজ জায়েয।(বলাবাহুল্য, একদিকে জায়েয অপরদিকে হারাম)। হারাম থেকে বাঁচার জন্য এ জায়েয মত গ্রহণ করা যেতে পারেনা।

মুল্লা আলী আল কারী এ হাদীসের ব্যাখ্যায় লিখেছেনঃ কোনো কোনো আলিম এ হাদীসের দলীল দিয়ে বলেছেন যে, বরকতের জায়গা এবং আলিম ও নেককার লোক (অলী-পীর-দরবেশ) এর কবর যিয়ারতের জন্য সফর করা নিষিদ্ধ।

উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে শাহ আবদুল আযীয মুহাদ্দিসে দিহলভী(রহ) লিখেছেনঃ হজ্জের সফরের সমান কিংবা তার চাইতেও ভাল ও উত্তম সফর মনে করে, হজ্জের ইহরাম বাঁধার মত জেনে শুনে বা না জেনে ইহরাম বাঁধে- এ কাজ কিছুতেই করা উচিত নয়।

সহীহ হাদীস, উহার ব্যাখ্যা এবং ইসলামের বিশেষজ্ঞ সলফে সালেহীনের পূর্বোদ্ধৃত মূল্যবান বাণীসমূহের ভিত্তিতে এ কথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, কবর বা নির্দিষ্ট কোনো স্থানকে নিজেদের ইচ্ছেমতো পবিত্র বরকতওয়ালা বা শরীফ ইত্যাদি মনে করা, তা যিয়ারত করার জন্য এবং কবরস্থ অলী পীর দরবেশ এর নিকট প্রার্থনা করা বা তাকে অসীলা করার জন্য বিদেশ সফর করা এবং সেখান থেকে বরকত হাসীল করতে চাওয়া- এ সবই জাহিলিয়াতের জমানার মুশরিক লোকদের কাজ, এ কাজ দ্বীন-ইসলামের সম্পূর্ণ খেলাফ। এতে যেমন আকীদার খারাবী দেয়া দেয়, তেমনি আমলেরও। এ কারণে নবী করীম(স) এ ধরনের কাজ করতে এ হাদীস মারফত চিরদিনের জন্য নিষেধ করে দিয়েছেন। অতএব বর্তমানে বিভিন্ন জায়গায় স্বকপোল কল্পিত মনগড়া পীর বা অলী দরবেশের কবরকে কেন্দ্র করে যা কিছু করা হচ্ছে, আজমীর শরীফে, বাগদাদ শরীফ, দাতাগঞ্জবখশ, শর্ষিণা শরীফ, মাইজভান্ডার আর সুরেশ্বর শরীফ প্রভৃতি স্থানে যে ওরস ও অন্যান্য অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় এবং দলে দলে মূর্খ মুরীদরা একত্রিত হয় মরা পীরের কবর হতে ফায়েজ নেয়ার উদ্দেশ্যে- তা সবই রাসূলের নির্দেশের সম্পূর্ণ খেলাফ, সুন্নাতের বিপরীত- এক স্পষ্ট বিদয়াত। আর পীর ভক্তির তীব্রতা ও আতিশয্যের কারণে অনেক ক্ষেত্রে তা-ই শিরক এ পরিণত হয়।

এমন কি, মক্কায় কাবা ঘরের হজ্জ করতে গিয়ে মদীনায় যাওয়া যারা বাধ্যতামূলক মনে করেন, তাদের উচিত মসজিদে নববীতে নামায পড়ার নিয়্যতে সফর করবে, শুধু রাসূলে করীমের কবরে সালাম করার উদ্দেশ্যে সফর করা উচিত নয়।

এ সব অকাট্য দলীলের মুকাবিলায় বিদয়াতীদের কথাবার্তা পেশ করে পীর-মুরীদী মহাশূণ্যে মিলিয়ে যেতে দেরী নেই মোটেও।

আল্লাহ এই বিদয়াতীদের হেদায়াত করুন।

ইস্তিমদাদে রূহানী

কবর যিয়ারত সম্পর্কে উপরোক্ত বিস্তারিত আলোচনা পাঠ করার পর কারো মনেই সন্দেহ থাকতে পারেনা যে, কবরস্থানে গিয়ে তাদের জন্য দো’আ করা ছাড়া আর কোনো কাজ করা। কবরস্থ লোকদের নিকট নিজেদের কোনো মনোবেদনা জানাতে চেষ্টা করা, কোনো প্রয়োজন পূরণের জন্য তাদের সাহায্য প্রার্থনা করা কিংবা তাদের কাছ হতে রূহানী ফায়েয হাসিল করতে চেষ্টা করা সম্পূর্ণ শিরক। মূলত এ সেই কাজ, যা মূলত মুশরিকরা করে তাদের মনগড়া দেব-দেবী ও মাবুদদের নিকট। এ পর্যায়ে তাফসীর জামেউত তাফসীর এর সূরা ফাতির এর তাফসীর থেকে একটা ঘটনা উল্লেখ করা একান্তই জরুরী। ঘটনাটি হযরত শাহ ইসহাক দেহলভী ইমাম আবু হানীফা(রহ) থেকে বর্ণনা করেছেন।

ঘটনাটি এরূপঃ ইমাম আবু হানীফা দেখলেন, এক ব্যক্তি নেক লোকদের কবরস্থানে উপস্থিত হয়ে সালাম করছে, তাদের সম্বোধন করে বলছেঃ হে কবরবাসীরা! তোমাদের কি কোনো খবর আছে? তোমাদের আছে কোনো ক্ষমতা? আমি তো তোমাদের কাছে কয়েক মাস ধরে আসছি, তোমাদের ডাকাডাকি করছি।  তোমাদের নিকট আমার জন্য কোনো প্রার্থনা ছিলনা, ছিল শুধু দো’আর প্রার্থনা। কিন্তু তোমরা কি কিছু টের পেয়েছ, না একেবারে গাফিল হয়ে পড়ছো?

এ কথা ইমাম আবু হানীফা(রহ) শুনতে পেলেন। তিনি লোকটিকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেনঃ কবরস্থ লোকেরা কি তোমার ডাকের কোনো জবাব দিল? লোকটি বললঃ না, কোনো জবাবই পাইনি। তখন ইমাম আবু হানীফা(রহ) বললেনঃ বড় দুঃখ, বড় লজ্জার বিষয়! তোমার দুটো হাতই ধ্বংস হয়ে যাক। তুমি এমন সব দেহকে লক্ষ্য করে কথা বলছো যারা কোনো জবাবই দিতে পারেনা, যাদের কোনো কিছুই করার ক্ষমতা নেই, (এমন কি) কোনো আওয়াজও তারা শুনতে পায়না। অতঃপর তিনি পড়লেন সূরা ফাতির এর 22 নং আয়াত।–তুমি শোনাতে পারবেনা তাদের, যারা কবরে রয়েছে।

ইমাম আবু হানীফার(রহ) এই উক্তি প্রমাণ করে যে, তিনি এই মত পোষণ করতেন যে, অলী ও নেক লোকদের কবরে গিয়ে তাদের সম্বোধন করে কথা বলা বা কিছুর জন্য প্রার্থনা করা সম্পূর্ণ নাজায়েয। দ্বিতীয়-মৃত ব্যক্তি শুনেওনা, জবাবও দিতে পারেনা। ভক্তদেরকে বিপদ থেকে উদ্ধার করা, নিঃসন্তানকে সন্তান দান করা বা চাকুরী-ব্যবসা ইত্যাদিতে উন্নতি দান করার কোনো সাধ্যই তাদের নেই- থাকতে পারেনা। ইমামা আবু হানীফা(রহ) এর এই মতে কুরআনের ঘোষণার যথার্থ প্রতিফলন ঘটেছে। ইয়াহুদি খ্রীস্টান মুশরিকার হযরত ঈসা, হযরত উজাইর ও ফেরেশতাদের ডাকতো। তাদের নিকট সাহায্য চাইতো বিপদ হতে উদ্ধার পাওয়ার জন্য। এই প্রেক্ষিতেই আল্লাহ তা’আলা ঘোষণা করলেনঃ আরবী(*********)

-না, ওরা তোমাদের বিপদ দূর করতে এবং তোমাদের জন্য আসা বিপদকে অন্য দিকে সরিয়ে দিতে কস্মিনকালেও পারবেনা।

এই পর্যায়ে কুরআন মজীদের একটি আয়াত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেনঃ

وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّن يَدْعُو مِن دُونِ اللَّهِ مَن لَّا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَىٰ يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَن دُعَائِهِمْ غَافِلُونَ [٤٦:٥]

- যে লোক আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকবে সে কিয়ামত পর্য্ন্তও তার ডাকের জবাব দিবেনা, তার চাইতে অধিক গুমরাহ আর কে হতে পারে? ওরা তো তাদের দো’আ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অনবহিত। (আহকাফঃ5)

এ পর্যায়ে সঠিক মাসআলা জানার জন্য সর্বপ্রথম দেখতে হবে কুরআন মজীদে স্বয়ং নবী করীম(স) এর কি মর্যাদা ঘোষিত হয়েছে। নবী করীমের যে মর্যাদা কুরআনে ঘোষিত হয়েছে- এ পর্যায়ে আকীদা ঠিক রাখার জন্য সুন্নাতের সঠিক জ্ঞান অর্জনের জন্য- তাই হবে ভিত্তি। কুরআনের পাঠক মাত্রই জানেন, কুরআন মজীদে স্বয়ং রাসূলের জবানীতে তাঁর নিজের মর্যাদা নানা স্থানে ঘোষিত হয়েছে। এ পর্যায়ের একটি আয়াত হচ্ছে এইঃ

قُل لَّا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ ۚ وَلَوْ كُنتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ ۚ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ [٧:١٨٨]

-বলো হে নবী! আমি আমার নিজের জন্য কোনো কল্যাণের ওপর কর্তৃত্বশালী নই, না কোনো ক্ষতির ওপর। তবে শুধু তা-ই এর বাইরে, যা আল্লাহ চাইবেন। আর আমি যদি গায়েব জানতাম, তাহলে আমি নিশ্চয়ই অনেক বেশি বেশি কল্যাণ লাভ করে নিতাম এবং আমাকে কোনো দুঃখ বা কষ্টই স্পর্শ করতে পারতোনা। আমি তো শুধু ভয় প্রদর্শনকারী, শুধু সংবাদদাতা ঈমানদার লোকদের জন্য।(আল আরাফঃ188)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা আলুসী লিখেছেনঃ এ আয়াত থেকে বোঝা গেল যে, নবী করীম(স) সে গায়েবের জ্ঞান জানেননা, যা ফায়দা লাভ ও ক্ষতির প্রতিরোধের জন্য অনুকূল। কেননা তার সাথে এবং দ্বীনী হুকুম আহকাম ও শরীয়তের বিধানের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। এ জন্যে এ ধরনের গায়েবী জ্ঞান নবী করীম(স) জানেননা। আর এ জ্ঞান না জানা তাঁর নব্যুয়তের মহান মর্যাদার পক্ষে কিছুমাত্র ক্ষতিকর বা দোষের নয়।

এ পর্যায়ে গায়েবী ইলম যে রাসূলের নেই, তা একটি বাস্তব ঘটনা থেকেও প্রমাণিত হয়। হযরত আয়েশা(রা) বলেনঃ লোকেরা খেজুর গাছের স্ত্রী ও পুরুষের মধ্যে মিলন ঘটাত। নবী করীম(স) বলেনঃ এ কাজ যদি তোমরা না কর তবে ভালোই হয়। কিন্তু পরবর্তী ফসল কালে তারা এ কাজ না করার দরুণ খেজুরের ফসল ভালো হলোনা। এ কথা শুনে নবী করীম(স) বললেনঃ ‘তোমাদের এসব বৈষয়িক ব্যাপার তোমরাই ভালো জানো।’ অপর বর্ণনায় কথাটি এভাবে বলা হয়েছেঃ ‘দেখ, ব্যাপার যদি তোমাদের বৈষয়িক সংক্রান্ত হয়, তবে তা তোমাদের ব্যাপার। আর যদি দ্বীন সংক্রান্ত হয়, তাহলে তা আমার আওতাভুক্ত।’

হানাফী মাযহাব সমর্থিত আকীদায় স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, নবী করীম(স) গায়েব জানতেন-এরূপ আকীদা যদি কেউ পোষণ করে, তবে সে হবে স্পষ্ট কাফির। কেননা এরূপ আকীদা কুরআনের(পূর্বোক্ত এবং) এ আয়াতের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আয়াতটি হলোঃ

قُل لَّا يَعْلَمُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ ۚ

–বলো, আসমান-জমিনের কেউ-ই গায়েব জানেনা এক আল্লাহ ছাড়া।

অর্থাৎ যা কিছু মানুষের অনুভূতি আর জ্ঞানের আওতার মধ্যের ব্যাপার নয় তা আসমান-জমিনের সমস্ত সৃষ্টিলোকের মধ্যে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ-ই জানেনা, জানতে পারেনা।

হযরত আয়েশা(রা) বলেনঃ আরবী(********)

-যে লোক ধারণা করবে যে, মুহাম্মদ(স) লোকদের সে সব বৈষয়িক বিষয়ে জানেন বা খবর দেন, যা কাল ঘটবে, তবে সে আল্লাহর প্রতি একটি অতি বড় মিথ্যা আরোপ করে দিলো।

গায়েব জানা সম্পর্কিত এ সব অকাট্য ও সুস্পষ্ট দলীলসমূহের ভিত্তিতে বলা যায়, নবী করীম(স)-ই যখন গায়েব জানতেননা, তখন কোনো পীর-অলী-দরবেশ এর পক্ষে গায়েব জানার কোনো প্রশ্নই উঠতে পারেনা। যদি কেউ তা মনে করে, তবে তা হবে আকীদার ক্ষেত্রে এক মহা শিরক, কুরআন ও হাদীসের স্পষ্ট ঘোষণাবলীর সম্পূর্ণ খেলাফ এবং সুন্নাতী আকীদার বিপরীত এক সুস্পষ্ট বিদয়াত।

 

অলৌকিক ক্রিয়া কান্ড ঘটানোর বিদয়াত

বিশ্বলোকের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ। এ সবের ওপর কর্তৃত্বও চলে একমাত্র আল্লাহরই। তিনি ছাড়া এ দুনিয়ায় অপর কারো কিছু করার ক্ষমতা নেই। মানুষ জীবিত থাকা অবস্থায় শুধু ততটুকুই করতে পারে, যা করার অবকাশ রেখেছেন আল্লাহ তা‘আলা। সে অবকাশও অসীম নয়, অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে আল্লাহ যাকে যা করার ক্ষমতা দান করেন, সে তা ততটুকুই করতে পারে যতটুকু করার অনুমতি আল্লাহ দান করেন। এ কারণে বলা যায়, আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের এ ধরনের কিছু কিছু কাজ করার অনুমতি দেন কখনো কখনো, যে ধরনের কাজকে আমরা ‘অলৌকিক কাজ’ বলে থাকি। এর কতগুলো কাজ এমন যেগুলো নবী রাসূলগণ কর্তৃক অনুষ্ঠিত হয়। এগুলোকেই ইসলামী পরিভাষায় বলে ‘মুজিযা’। নবী রাসূলগণের মুজিযা সত্য। নবীর নব্যুয়তী সত্যতা প্রমাণের জন্য তা হয় অকাট্য দলীল। কিন্তু এ ‘মুজিযা’ অনুষ্ঠিত হয় সৃষ্টির কল্যাণ সাধনের জন্য, কোনো কোনো বিশেষ ফায়দা পৌঁছাবার জন্য এবং তা হয় স্বয়ং আল্লাহর কুদরতে ও ইচ্ছায়, নবী-রাসূলের ইচ্ছায় নয়। তা করার ক্ষমতা নবী-রাসূলের নিজস্ব নয়, কেবল মাত্র আল্লাহরই দেয়া ক্ষমতা।

আল্লাহ তা‘আলা অন্যান্য নবী ও রাসূলগণকে যেমন মুজিযা ও অকাট্য প্রমাণাদি দিয়েছেন তাঁদের নব্যুয়তের অকাট্যতার প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে, তেমনি হযরত ঈসা(আ) কেও বহু অস্বাভাবিক কর্মকান্ড ঘটানোর শক্তি দান করেছিলেন। কিন্তু খ্রিস্টানরা সেসব নিদর্শন দেখে মনে করে নিয়েছে যে, এসব করার ক্ষমতা স্বয়ং হযরত ঈসা(আ) এর নিজস্ব এবং এই ক্ষমতা ও শক্তি ঠিক আল্লাহর ক্ষমতা ও শক্তি। এই কারণে সেই মূর্খরা মনে করে নিয়েছে যে-মহান আল্লাহই বুঝি হযরত ঈসার মধ্যে লীন হয়ে গেছেন। এক্ষণে আল্লাহ ও ঈসা অভিন্ন সত্তায় পরিণত, আল্লাহ ঈসা একাকার।(নাউজুবিল্লাহ)। আর এ-ই  হচ্ছে খ্রিস্টানদের শিরকী আকীদা গ্রহণের মূলতত্ত্ব।

মুসলমানদের মধ্যে অলী-আল্লাহ নামে পরিচিত ব্যক্তিদের সম্পর্কেও ভক্তির আতিশয্যে- চরম মূর্খতার কারণে- মনে করেছে যে, আল্লাহ বুঝি তাদের মুঠোর মধ্যে এসে গেছেন; কিংবা তারা আল্লাহ হয়ে গেছেন (নাউজুবিল্লাহ) বলেইতো তারা অসাধ্য সাধন করতে ও অস্বাভাবিক-অলৌকিক ঘটনাবলী ঘটাবার ক্ষমতার অধিকারী হয়ে বসেছেন। এও ঠিক শিরকে নিমজ্জিত খ্রিস্টানদের মতো চরম মূর্খতারই পরিণতি। খ্রিস্টানরা যেমন বুঝেনি যে, হযরত ঈসা(আ) এর যা কিছু ক্ষমতা, তা নবী হিসেবেই আল্লাহর দেয়া, তার নিজের কিছুই নয়, তেমনি মুসলমানদের মাঝে এই মূর্খ লোকেরাও বুঝেনা- বুঝতে প্রস্তুতই নয় যে, তারা যাদেরকে অলী-আল্লাহ বলে মনে করে প্রকৃতপক্ষে তারা আল্লাহর অলী নাও হতে পারে। আর হলেও অলৌকিক কিছু করার, আল্লাহর চলমান ও সদা কার্য্কর স্বাভাবিক নিয়ম বিধান দর-বদল করার কোনো ক্ষমতাই তাদের নেই। ওরাও ঠিক এই কারণেই খ্রিস্টানদের মতোই চরম শিরকের মধ্যে ডুবে আছে।

কিন্তু নবী-রাসূল ছাড়া অন্য মানুষের দ্বারা যদি অস্বাভাবিক কর্মকান্ড হয় তবে তা তিন প্রকারের হতে পারে।

এক. তা দ্বারা যদি কোনে দ্বীনী ফায়দা হয়, তবে তা নেক আমলসমূহের মধ্যে গণ্য।

দুই. যদি তা থেকে কোনো বৈধ ব্যাপার ঘটে, তবে তা আল্লাহর দেয়া এক বৈষয়িক নেয়ামত। সে জন্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উচিত আল্লাহর শোকর করা।

তিন. অস্বাভাবিক ঘটনা যদি এমন কিছু ঘটে বা হারামের পর্যায়ে পড়ে যায়, তবে তা হবে আল্লাহর আযাবের কারণ। তার ফলে আল্লাহর অসন্তুষ্টি ফেটে পড়ে।

মনে রাখতে হবে, অস্বাভাবিক ঘটনা যেমন দুনিয়ার নেক বান্দাদের কেন্দ্র করে সংঘটিত হয় তেমনি সংঘটিত হতে পারে অন্যান্য বান্দাদের কেন্দ্র করেও। অতএব তা যেমন দ্বীনের দৃষ্টিতে ভালোও নয়, তেমনি মন্দও নয়। কিন্তু এমনও হয়, যা না ভালো, না মন্দ।

নেক লোকদেরকে কেন্দ্র করলে তেমন কোনো ঘটনা ঘটলে তা যেমন তার নিজের গৌরবের কোনো বিষয় নয়, তেমনি তা-ই নয় তার বুজুর্গীর কোনো প্রমাণ। আর যাকে কেন্দ্র করেই এমন কিছু ঘটবে, তাকেই যে অলৌকিক ক্ষমতার মালিক মনে করতে হবে, মনে করতে হবে তাকে আল্লাহর প্রিয় বান্দা, তার কোনো দলীলই কুরআন হাদীসের খুঁজে পাওয়া যায়না। কুরআনের আয়াতের ভিত্তিতে কে আল্লাহর অলী, কে তাঁর প্রিয় ব্যক্তি, নিম্নোক্ত আয়াত থেকে জানতে পারা যায়। আল্লাহ ইরশাদ করেছেনঃ

أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ [١٠:٦٢]

الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ [١٠:٦٣]

–জেনে রেখো, আল্লাহর অলী লোকদের কোনো ভয় নেই, নেই তাদের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ। এরা সেই লোক, যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে। (ইউনূসঃ62-63)

হযরত আবু হুরায়রা(রা) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম(স) হাদীসে কুদসী বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহর এ কথাটি বলেছেনঃ আরবী(**********)

-যে লোক আমার অলীর সঙ্গে শত্রুতা করবে, সে আমার সাথে যুদ্ধের ঘোষণা দেয়। বান্দার ওপর আমি যেসব ফরয ধার্য্ করে দিয়েছি কেবল সেগুলো আদায় করেই আমার নৈকট্য লাভ করতে পারে- এ-ই আমার নিকট অধিক প্রিয়। নফল কাজ করেও বান্দা আমার নৈকট্য লাভ করে থাকে। শেষ পর্য্ন্ত আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি। আর আমি যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসতে শুরু করি, তখন আমি তার সেই কান হয়ে যাই যা দ্বারা সে শুনে, সেই চোখ হয়ে যায় যা দ্বারা দেখে, সেই হাত হয়ে যাই যা দ্বারা সে ধরে, সেই পা হয়ে যাই যা দ্বারা সে চলে। অতএব সে আমার দ্বারাই শুনে, আমার দ্বারাই দেখে, আমার দ্বারাই ধরে, আমার দ্বারাই চলে।

কুরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে প্রমাণিত হলো যে, অলী-আল্লাহ সেই হয় এবং তাঁকেই বলা যায়, যে মুমিন হবে এবং মুত্তাকী হবে। ঈমান ও তাকওয়া হওয়ার মানে পূর্ণ ঈমান এবং নির্ভূল নির্ভেজাল তাকওয়া। আর হাদীস থেকে জানা গেল যে, সে হবে আল্লাহর আরোপিত ফরযসমূহের যথাযথ পালনকারী। কিন্তু সেই সঙ্গে তার যে কারামত হতে হবে এমন কথা না কুরআনে আছে, না হাদীসে। কুরআনের উক্ত আয়াতের পরবর্তী কথায় এই কারামতের কথা নেই। যা আছে তা হলো এইঃ لَهُمُ الْبُشْرَىٰ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ ۚ

-তাদের জন্য সুসংবাদ দুনিয়ার জীবনে এবং পরকালের।

بُشْرىবা সুসংবাদ বলতে মূলত বোঝায় এমন খবর যা শুনলে মুখমন্ডলে আনন্দের চিহ্ন ফুটে ওঠে। এ থেকেই হচ্ছে বাশারাত মানে সুসংবাদ। আর যে সংবাদ দিলে এরূপ আনন্দ লাভ হয় তাকেও بُشْرى বলা হয়। আর এর সঠিক তাৎপর্য্ এইঃ তাদের জন্যে সুসংবাদ তারা দুনিয়ায় থাকতেও এবং পরকালে চলে গেলেও। অর্থাৎ নগদ ও বাকী উভয় ধরনই।

আল্লামা আলুসী লিখেছেনঃ বহু সংখ্যক হাদীসের বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, কুরআনের এ بُشْرى শব্দের অর্থ হচ্ছে দুনিয়ার জীবনে ভাল ও শুভ স্বপ্ন, যা নব্যুয়তের ছিচল্লিশ ভাগের এক ভাগ।

রাসূল(সা) এর নিজের কথা থেকেই এ তাফসীর জানা গেছে অকাট্যভাবে। আর পরকালের ব্যাপারে তা হচ্ছেঃ মুমিনকে মৃত্যুর মুহুর্তে সুসংবাদ দেয়া হবে যে, আল্লাহ তোমাকে এবং তোমাকে যারা তোমার কবর পর্য্ন্ত বহন করে নেবেন, তাদের মাফ করে দিয়েছেন।

আর হযরত আবু হুরায়রা(রা) এর বর্ণনা থেকেও জানা যায়, যার মানে হচ্ছে বেহেশত।

আর আতা থেকে বর্ণিত হয়েছেঃ দুনিয়ায় হচ্ছে এই যে,بُشْرى  ফেরেশতারা মৃত্যুর সময় তাদের নিকট রহমত নিয়ে আসবেন। আর পরকালীন হচ্ছে এই যে, بُشْرى তখন ফেরেশতাগণ এ সব মুসলমানের নিকট তাদের সাফল্য ও সম্মান মর্যাদার সুসংবাদ বহন করে নিয়ে আসবেন। তারা তাদের মুখমন্ডলকে উজ্জল দেখতে পাবেন এবং তাদের ডান হাতে তাদের আমলনামা দেয়া হবে, তারা তা পড়বে ইত্যাদি পর্যায়ের সুসংবাদ।

তাহলে অলী-আল্লাহদের যে কোনো কারামত লাভ হবে, যা নিয়ে এখনকার সত্য পীরেরা এবং মিথ্যা পীরেরা দাবি করছে এবং অন্ধ অজ্ঞ মুরীদদের এসব আজগুবী কথাবার্তা বলে  সাচ্চা পীর আর ভন্ড পীরের দিকে অধিকতর আকৃষ্ট করে তোলা হচ্ছে।

অলী-আল্লাহদের প্রতি এসব দান বাস্তবিকই আল্লাহর অতি বড় অনুগ্রহ। কিন্তু সে অনুগ্রহ ব্যক্তিগতভাবে তাদের জন্য। কেউ তা লাভ করে থাকলে তার উচিত আল্লাহর শোকর আদায় করা। কিন্তু তার প্রচারণার মারফতে পীর-মুরীদী ব্যবসা চালানোর লিল্লাহিয়াতের কোনো প্রমাণ মিলে কি? আকায়িদের কিতাবে যে কারামতের কথা বলা হয়েছে তা হলো এগুলো। কারামত মানে সম্মান মর্যাদা; আর এগুলোও আল্লাহর পক্ষ হতে দেয়া সম্মান মর্যাদা এবং কুরআন হাদীসের ঘোষণায় প্রমাণিত এসব কারামতকে কোনো মুসলমান অস্বীকার করতে পারেনা। কিন্তু এখানে যে কারামতের কথা বলা হচ্ছে তা এসব নয়। তা হলো কোনো পীর বা অলী আল্লাহ কোনো অঘটন ঘটিয়েছে, কোনো অস্বাভাবিক কাজ করে মুরীদদের তাক লাগিয়ে দিয়েছে, কে শূণ্যে উড়ে গেছে, কে পানির ওপর দিয়ে পায়ে হেঁটে সমুদ্র পার হয়েছে, কে জেলখানায় বন্দী থাকা অবস্থায়ও প্রতিদিন কাবায় গিয়ে নামায পড়েছে, এসব প্রচারণার মানে কি? এসব যে একেবারে ফাঁকা বুলি, কেবল অজ্ঞ মূর্খদের জন্যই তা বলা হয়, তাদের মধ্যেই তা প্রচার করা হয়, এটা যে কোনো সুস্থ বুদ্ধির মানুষই স্বীকার করবেন।

মোটকথা, অলী আল্লাহ হলেই যে তার কারামত বা অলৌকিক ঘটনা ঘটানোর ক্ষমতা থাকতে হবে, কারো ‘কারামত’ থাকলেই যে সে অলী আল্লাহ বলে গণ্য হবে আর কারামত না হলে অলী আল্লাহ মনে করা যাবেনা, সব কথাই ভিত্তিহীন। কুরআন হাদীসের এসব কথার কোনোই দলীল নেই।

মূর্খ পীরেরা ততোধিক মূর্খ মুরীদদের সামনে নিজেদের যে সব কারামত জাহির করে, প্রকাশ করে যেসব অলৌকিক(?) কান্ড কারখানা কিংবা মৃত্যুর পরও তারা অলৌকিকভাবে দুনিয়ার ব্যবস্থাপনার এবং সামাজিক কাজকর্মে কোনোরূপ ‘তাসাররূপ করে বা করতে পারে কিংবা শায়খদের রূহ হাযির হয়, দুনিয়ার অবস্থা জানে বা শুনে ইত্যাদি বলে যে দাবি করা হচ্ছে, সেগুলো সুস্পষ্টভাবে কুফরি বা শিরকী কথাবার্তা ছাড়া আর কি হতে পারে। এ ক্ষমতা স্বয়ং রাসূলকেও দেয়া হয়নি। এ পর্যায়ে কয়েকটি দলীলের উল্লেখ করা যাচ্ছে।

মুল্লা আলী আল কারী লিখেছেনঃ হানাফী ইমামগণ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেনঃ নবী করীম(স) গায়েব জানেন-এরূপ আকীদা যে রাখে, সে কাফির। কেননা এরূপ আকীদা আল্লাহর ঘোষণা ‘আল্লাহ ছাড়া আসমান জমিনের কেউ ই গায়েব জানেনা’ এর বিপরীত।( قُل لَّا يَعْلَمُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ ۚ আয়াতের অর্থ হলোঃ যে সব বিষয়ে মানুষের অনুভূতি শক্তি ও বিদ্যাবুদ্ধির বাইরে অবস্থিত গায়েব, তা আসমান-জমিনের গোটা সৃষ্টিলোকের মধ্যে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ ই জানেনা। ইমাম ইবনে কাসীর এ আয়াতের তাফসীরে লিখেছেনঃ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তিনি সমগ্র সৃষ্টিলোকের শিক্ষাদান প্রসঙ্গে যেন বলে দেন যে, আসমান-জমিনের অধিবাসীদের মধ্যে কেউ-ই গায়েব জানেননা-জানেন কেবলমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। অতঃপর লিখেছেনঃ আল্লাহর কথা-‘আল্লাহ ছাড়া’ পূর্ব কথা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে আলাদা করা হয়েছে। তার মানে হলো এই যে, গায়েব আল্লাহ ছাড়া কেউই জানেনা। কেননা এ ব্যাপারে তিনি এক ও একক, এ ব্যাপারে তাঁর কেউই শরীক নেই।)

এমনিভাবে যে লোক বিশ্বাস করবে যে, মৃত লোকেরা দুনিয়ার ব্যাপারে ‘তাসাররুফ’ করে (নিজেদের ইচ্ছেমতো কোনো ঘটনা ঘটানো ও কার্য্ সম্পাদন করে), আল্লাহ ছাড়া এরূপ আকীদা রাখা কুফরী।

বিবাহে যে লোক আল্লাহর রাসূল(স)-কে সাক্ষী বানায়ঃ তাকে হানাফী ফিকাহ এর কিতাবে কাফির বলা হয়েছে। কেননা সে এ কাজ রাসূলে করীমকে ‘আলিমুল গায়েব’ মনে করেই করেছে।

কবরস্থানে যে শিরক বিদয়াত অনুষ্ঠিত হয়, তার বিরুদ্ধে মুজাদ্দেদি আল ফেসানী জিহাদ করেছেন আজীবন। এ পর্যায়ে তিনি যা লিখেছেন, তা এখানে উদ্ধৃত করা হচ্ছেঃ রোগ শোক দূর করার ব্যাপারে মূর্তি দেব-দেবী ও বাতিল মা’বুদের নিকট সাহায্য চাওয়া, যা জাহিল মুসলমানদের মধ্যে রেওয়াজ পেয়ে গেছে-একেবারেই শিরক ও গোমরাহী। নির্মিত ও অনির্মিত পাথরের নিকট নিজেদের প্রয়োজন পূরণের জন্য দো’আ করা মহান আল্লাহকে স্পষ্ট ভাষায় অস্বীকার করার সমান এবং একেবারেই কুফরী। আল্লাহ তা‘আলা কোনো কোনো গোমরাহ লোকদের অবস্থান বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘তারা নিজের ব্যাপারসমূহকে তাগুতী শক্তির নিকট পেশ করতে ইচ্ছে করে, অথচ আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন যে, এসব তাগুতী শক্তিকে অস্বীকার করতে হবে। আর শয়তান তাদের বিভ্রান্ত করে গোমরাহীর মধ্যে নিক্ষেপ করতে চায়।

অনেক মেয়েলোক চরম অজ্ঞতাবশত এ ধরনের সাহায্য্ প্রার্থনায় লিপ্ত হয়। কতক অলীক নামের কাছে রোগ শোক ও বিপদাপদ থেকে মুক্তি চায়। তাতে মুশরিকদের রসম-রেওয়াজ জড়িত। খুব কম মেয়েলোকই এই সূক্ষ্ম শিরক হতে রক্ষা পেয়েছে, আর এতদসংক্রান্ত অনুষ্ঠানাদিতে শরিক হয়নি। অবশ্য আল্লাহ যাকে বাঁচিয়েছেন, সেই বেঁচেছে।

বর্তমানকালে অলী-আল্লাহ বলে কথিত লোকদের কবরে যা কিছু ঘটছে, ঘটছে বিশেষ পীরের বিশেষ মুরীদরা জীবিত পীরের দরবারে বা মৃত পীরের কবরে গিয়ে যা কিছু করছে, তার কাছ থেকে রূহানী ফায়েজ হাসিল করছে, বিপদে আপদে সাহায্য প্রার্থনা করছে, তা যে সম্পূর্ণরূপে শিরকী কাজ এবং মুসলিম সমাজে তা যে শিরকের বিদয়াত মুজাদ্দিদে আলফেসানীর কথার পূর্বোক্ত উদ্ধৃতি থেকে তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। অথচ বড়ই আফসোস, তাঁরই পরবর্তীকালে মুরীদ ও তস্য মুরীদরা আজ ঠিক সেই সব কাজই করেছে এবং তা সত্বেও নিজেদের ‘আহলে সুন্নাত আল জামায়াত’ হওয়ার দাবি করছে। মুজাদ্দিদে আলফেসানীর উপরোক্ত যুক্তিপূর্ণ কথার আলোকে এদেরকে ‘আহলে সুন্নাত না বলে বরং বলা যায় আহলে সুন্নাত আল বিদয়াত। মুজাদ্দিদে আলফেসানী(রহ) এ ধরনের কাজকে স্পষ্ট ভাষায় শিরকী কাজ এবং এই লোকদেরকে মুশরিক বলে অভিহিত করেছেন। কেননা একাজ কেবল মুশরিকদের দ্বারাই সম্ভব। মুশরিক লোকেরা এ ধরনের কাজ করে বলেইতো তারা মুশরিক। এ ধরনের কাজ না করলেতো তারা নিশ্চয়ই মুশরিক হতোনা। তাহলে এক শ্রেণীর মুসলিম বা পীর আলিম নামধারী লোকেরা যদি এরূপ কাজ করে, তবে তা কোনো শিরকী কাজ হবেনা এবং তারাই বা আল্লাহর দরবারে ‘মুশরিক’ রূপে নিন্দিত হবেনা কেন? দীর্ঘ আলোচনার শেষ পর্যায়ে এ কালের পীর-মুরীদ ও ‘অলী-আল্লাহ’ বলে কথিত লোকদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই হযরত মুজাদ্দিদে আলফেসানী(রহ) এর নসীহত, যা তিনি করেছিলেন তদানীন্তন বিদয়াতী পীরদের প্রতি-তা হলোঃ

-একালের তাসাউফপন্থীরা যদি ইনসাফ করে এবং ইসলামের দূর্বল অবস্থা ও মিথ্যার ব্যাপক রূপ লক্ষ্য করে তাহলে তাদের উচিত সুন্নাতের বাইরে তাদের পীরদের পায়রুবী না করা। আর মনগড়া বিষয়গুলোকে নিজেদের পীরদের আমল করতে দেখার দোহাই দিয়ে অনুসরণ না করা।

বস্তুত নবী করীম(স) এর অনুসরণ করে চলা নিঃসন্দেহে মুক্তির বাহন, ভালো ও মঙ্গলময় ফলের উৎস।  সুন্নাতের বাইরের বিষয়গুলোকে অন্ধভাবে মেনে চলার মধ্যে বিপদের ওপর বিপদ রয়েছে।

তাবিজ তুমার কবর বাঁধার বিদয়াত

আমাদের সমাজে সাধারণ অশিক্ষিত লোকদের মাঝে তাবিজ কবজ এবং এক শ্রেণীর বড় লোকদের মাঝে, বিশেষ করে বিদেশ সফরকালে ‘ইমামে জামেন’ বাঁধার একটি ব্যাপক রেওয়াজ রয়েছে দেখা যায়। এ সব লোক ইসলামের মৌলিক আদর্শের বড় একটা ধার ধারেনা, বুঝেও না তেমন। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিপদে পড়লে বা বিপদ দেখা দিলে অথবা বিপদের আশংকা করলে হাতে, গলায় তাবিজ কবজ ও ‘ইমামে জামেন’ না বেঁধে তারা পারেনা। এরা মনে করে, এতে করে বিপদ কেটে যাবে কিংবা বিপদ আসতেই পারবেনা। কিন্তু কুরআন হাদীসের দৃষ্টিতে এসব যে ইসলামের তওহীদী আকীদার সম্পূর্ণ বিপরীত এবং মুসলমানদের মাঝে এটা যে একটা সম্পূর্ণ বিদয়াত ও শিরকী কাজ, সে কথা তারা ভেবে দেখবারও অবকাশ পায়না। একটু গভীরভাবে তলিয়ে দেখলে বুঝতে পারা যায়, মূলত দোষ এ লোকদের নয়, এক শ্রেণীর আলিম বেশ ধারী মোল্লা মৌলবীরাই সাধারণ মানুষের মাঝে এ জিনিসের প্রচলন করেছে এবং এতে করে তারা দু পয়সা রোজগার করে খাচ্ছে। তারা অজ্ঞ মূর্খ লোকদের মনে তওহীদী আকীদার কোনো ধারণা সৃষ্টি করতেই চেষ্টা করেনি। বরং তার বিপরীতে এ ধারণা দিয়েছে যে, বিপদ কেটে যাবে। বিপদ থেকে উদ্ধার পাবে। অর্থাৎ তওহীদী আকীদার পরিবর্তে স্পষ্ট শিরকী আকীদাই তাদের মন মগজে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। এক আল্লাহর ওপর সর্বাবস্থায় নির্ভর করার, আল্লাহর নিকট বিপদ হতে উদ্ধার পাওয়ার জন্য দো’আ করার কথা না শিখিয়ে তাদের পরিচালিত করা হয়েছে সুস্পষ্ট শিরকের পথে। এতে করে মুসলিম সমাজে তাবিজ কবজ ও ইমামে জামেন বাঁধার রেওয়াজ দিয়ে এক সুস্পষ্ট বিদয়াতকেই চালু করা হয়েছে মুসলমানদের মধ্যে।

অথচ যে কোনো আলিম কুরআনের দিকে তাকালে দেখতে পেত, কুরআন মুসলমানদের পরিচয় দান প্রসঙ্গে ওজস্বিনী ভাষায় ঘোষণা করেছেঃ

وَيَرْجُونَ رَحْمَتَهُ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ ۚ

–মুমিন-মুসলমানেরা কেবল আল্লাহরই রহমত পাওয়ার আশা করে এবং কেবল তারই আজাববে ভয় করে। (বনী ঈসরাইলঃ৫৭)।

অন্য কথায় তারা আল্লাহ ছাড়া আর কারো নিকট, কোনো জিনিসের নিকট একবিন্দু সাহায্য, শান্তি ও নিরাপত্তা পেতে চায়না। তাদের মন কোনো অবস্থাতেই অন্য কারো দিকে, কিছুর দিকে আশান্বিত হয়না। অপর কারো ক্ষতির একবিন্দু ভয়ও তাদের মনে জাগেনা। তারা যেমন কোনো মৃত্যু ও অনুপস্থিত ব্যক্তি বা কোনো প্রাণহীন জিনিসের আশ্রয় নেয়না – না কোনো ফায়দা লাভের আশায়, না কোনো বিপদ বা ক্ষতি দূর করার উদ্দেশ্যে। বস্তুত এই তওহীদী আকীদা এবং এই হচ্ছে তওহীদবাদী মুমিনের পরিচয়।

  কিন্তু তাবিজ-তুমার-কবজ বাঁধা এর সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তা কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত আয়াতের স্পষ্ট বিরোধী। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেনঃ

قُلْ أَفَرَأَيْتُم مَّا تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ إِنْ أَرَادَنِيَ اللَّهُ بِضُرٍّ هَلْ هُنَّ كَاشِفَاتُ ضُرِّهِ أَوْ أَرَادَنِي بِرَحْمَةٍ هَلْ هُنَّ مُمْسِكَاتُ رَحْمَتِهِ ۚ

–বলো হে নবী! তোমরা কি লক্ষ্য করছো তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাকে তাকে ডাকো, আল্লাহ যদি আমাকে কোনো ক্ষতি করতে চান তাহলে কি তারা তা রোধ বা দূর করতে পারবে? কিংবা আল্লাহ যদি আমাকে কোনো রহমত দিতে চান তাহলে কি তারা আল্লাহর এ রহমতকে বাধা দিতে পারবে? (আঝ ঝুমার ৩৮)।

ক্ষতি বা রহমত দেয়ার একমাত্র নিরংকুশ মালিক এক আল্লাহই, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নয়। আল্লাহ চাইলে ক্ষতি করে দেবেন, সে ক্ষতি থেকে সে বাঁচতে পারবেনা। অনুরূপভাবে আল্লাহ যদি কাউকে রহমত দান করতে চান, তাহলে সে রহমত থেকে বঞ্চিত থাকবেনা, কেউ তাকে রহমত থেকে বঞ্চিত করতে পারবেনা। যার জন্য রহমত নির্দিষ্ট, সে রহমত অন্য কাউকেও দিতে পারবেনা কেউ। অবস্থা যখন এই, তখন বুদ্ধিমান লোকেরা কেন আল্লাহ ছাড়া অপর কোনো ব্যক্তি, শক্তি বা জিনিসের কাছে কিছু পেতে চাইবে, পেতে চাইবে তার দয়া সাহায্য, পেতে চাইবে বিপদ হতে তার কাছে নিষ্কৃতি? আমাদের দেশে তাবিজ কবজ, ইমামে জামেন কি এ ধরনের জিনিস নয়? হাদীসে তো এসব সম্পর্কে স্পষ্ট নিষেধ বাণী উচ্চারিত হয়েছে। যে কোনো আলিম এ হাদীস দেখতে পারেন। দেখলে বুঝতে পারবেন যে, হাদীসের দৃষ্টিতেই এসব শিরকী কাজ। এখানে আমরা কয়েকটি হাদীসের উল্লেখ করছি।

আরবী(***********)

-হযরত ইমরান ইবনে হুসায়ন (রা) হতে বর্ণিত, নবী করীম(স) এক ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন, সে পিত্তরসের রোগ থেকে বাঁচার জন্য একটি আংটি হাতে পড়ে রেখেছে। তিনি অসন্তোষের সুরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওটা কি পরেছ? বললো, রোগ হতে উদ্ধার পাওয়ার উদ্দেশ্যে এটা পড়েছি। রাসূল(স) বললেন, ওটা খুলে ফেল। কেননা ওটা তোমার হাতে পরা থাকলে তোমার বিপদ বাড়িয়ে দেবে- কমাবেনা একটুও। আর এটা রাখা অবস্থায় যদি তুমি মরে যাও, তাহলে তুমি কখনোই কল্যাণ লাভ করতে পারবেনা।

হযরত উকবা ইবনে আমের(রা) হতে বর্ণিত, নবী করীম(স) ইরশাদ করেছেনঃ আরবী(******)

-যে ব্যক্তি কোনো তাবিজ তুমার ঝুলাবে, আল্লাহ তাকে কোনো ফায়দা দেবেননা। আর যে কোনো কবজ ঝুলাবে, আল্লাহ তার বিপদ দূর করবেননা কখনো (কোনো শান্তি পাবেনা সে)।

অপর বর্ণনায় বলা হয়েছেঃ আরবী(********)

-যে লোক কোনো তাবিজ কবজ বাঁধবে, সে শিরক করলো।

পরপর উল্লেখ করা এ তিনটি হাদীস থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, কোনো ক্ষতি লোকসান বিপদ হতে উদ্ধার পাবার জন্য কিংবা কোনো স্বার্থ উদ্দেশ্য লাভের আশায় তাবিজ কবয বাঁধা সুস্পষ্ট শিরক। ঈমানের বুনিয়াদ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ কালেমা বান্দার নিকট যে ইখলাস দাবি করে, এ কাজ তার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কেননা যে লোক সত্যিকার ইখলাস সম্পন্ন মুমিন সে তো কারো নিকট হতে ফায়দা পাওয়ার বা কারো লোকসান থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো দিকে মনকে উন্মুখ করবেনা। অতএব এসব ত্যাগ না করলে পূর্ণ তওহীদের দাবি পূরণ হতে পারেনা। এটা ছোট শিরক বলে অনেকেই এর গুনাহ এর মারাত্মকতা লক্ষ্য করেনা, বরং উপেক্ষা করে। কিন্তু আসলে এ ছোট শিরক হলেও অত্যন্ত সাংঘাতিক। হাদীসের থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, নবী করীমের জীবদ্দশায় কোনো সাহাবীর নিকট এর মারাত্মক রূপ অস্পষ্ট বা অজানা ছিল। তা হলে বর্তমান কালের কম ইলমের ও দূর্বল ঈমানের লোকদের নিকট তা গোপন থাকায় আশ্চর্য্যের কি আছে- বিশেষত যখন চারিদিকে শিরক ও বিদয়াত ব্যাপকভাবে ছেয়ে গেছে।

হযরত হুযায়ফা(রা) এক ব্যক্তিকে দেখলেন সে জ্বরের তীব্রতার কারণে তাবিজ স্বরূপ একটি সুতা হাতে বেঁধে রেখেছে। তখন তিনি তা ছিঁড়ে ফেললেন এবং এ আয়াতটি পাঠ করলেনঃ ‘তারা অধিকাংশ লোকই আল্লাহর প্রতি ঈমান আনেনি, বরং তারা মুশরিক।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ(রা) শিরক ও বিদয়াতের বিরুদ্ধে বড় বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে গেছেন। যখন যেখানেই  যে বিদয়াত বা শিরক দেখেছেন, তারই বিরুদ্ধে তিনি দ্রুত প্রতিবাদের আওয়াজ তুলেছেন, ক্ষিপ্র কার্য্কর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। একদা তিনি ঘরের মধ্যে গিয়ে তার স্ত্রীর গলায় একটা তাগা ঝুলতে দেখলেন। তিনি জিজ্ঞেস করায় স্ত্রী জবাবে বললেনঃ এটা অমুক অসুখের টোটকা চিকিৎসার জন্য গলায় বেঁধেছি। তিনি সেটি ধরে এত শক্তভাবে টান দিলেন যে, সেটা ছিঁড়ে গেল। নতুবা তাঁর স্ত্রীই উপুড় হয়ে পড়ে গিয়ে ব্যথা পেতেন। চরিত্রের দৃঢ়তার জন্যই শুধু তিনি তা করেননি বরং শিরক বিদয়াতের বিরুদ্ধে দ্বীনি দায়িত্ব পালনের জন্যই করেছিলেন।

জাহিলিয়াত যুগে ‘যাতে আনওয়াত’ নামে একটি বৃক্ষ ছিল, সেখানে কুরাইশ ও সমস্ত আরব প্রতি বছর একবার একত্রিত হতো এবং তাদের তরবারী সেই বৃক্ষের সাথে ঝুলিয়ে দিত, তারই নিকট জন্তু জবাই করবো এবং একদিন তথায় সকলে অবস্থান করতো।

মক্কা বিজয়ের পর মক্কার নবদীক্ষিত মুসলমান ও মদীনা থেকে আগত সাহাবী সমভিব্যাহারে নবী করীম(স) হুনায়নের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। পথিমধ্যে সে বৃক্ষটি দেখতে পেয়েই মক্কার নবদীক্ষিত মুসলিমগণ পার্শ্ব থেকে বলে উঠলোঃ হে রাসূল(স)! আমাদের জন্যও একটি ‘যাতে আনওয়াত’ বানিয়ে দিন, যেমন ওদের জন্য ‘যাতে আনওয়াত’ রয়েছে। এই কথা শুনেই  নবী করীম(স) বললেনঃ আল্লাহু আকবার, তোমরাতো সে রকম কথাই বলছো যেমন মূসার সঙ্গীরা বলেছিল-ওদের যেমন পূজ্য দেবতা রয়েছে আমাদের জন্যও অনুরূপ দেবতা বানিয়ে দাও হে মূসা!

 অর্থাৎ তাদের ঐ কথা যেমন ইসলামের তওহীদী আকীদার পরিপন্থী ছিল, আজকের তোমাদের এই কথাও তেমনি তওহীদী ঈমানের বিপরীত। কেননা ওদের কথার মতো এদের কথাও মুশরিকদের সাথে সাদৃশ্য রয়েছে। ফলে তা একটি অতি বড় শিরকী কথা। ওদের মতো ‘যাতে আনওয়াত’ বানিয়ে তার সাথে তরবারী ঝুলানো, তার নিকট জন্তু যবাই করা এবং সেখানে একদিন অবস্থান করা এক আল্লাহর সাথে আর একজন ইলাহ বানানো সমতুল্য গণ্য হওয়ায় রাসূলে করীম(স) ওদের কথা প্রত্যাখ্যান করলেন। (তিরমিযী, মুসনাদের আহমদ, ইবনে জরীর ও ইবনে ইসহাকে ফীসীরাতে নবী)।

এ ঐতিহাসিক কথা যদি সত্যি হয়(কে বলবে তা সত্যি নয়) তাহলে একালের মুসলিমরা  যে বড় বড় নামকরা অলী-পীর-গাওসের(?) কবরের নিকট অবস্থান করছে, তার নিকট দো’আ করছে, তাকে ডাকছে এবং তার দো’আ চাচ্ছে, তা পরিষ্কার শিরক ও প্রত্যাখ্যানযোগ্য হবেনা কেন?

দু’টি কাজের মধ্যে শিরক হওয়ার দিক দিয়ে পূর্ণ মিল রয়েছে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতেই ইমাম মালিকের ছাত্র আবু বকর তাতুশী লোকজনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তোমরা যেখানেই এ ধরনের বৃক্ষ দেখতে পাবে, যাতে কেন্দ্র করে জনতা একত্রিত হয়, বৃক্ষটির প্রতি সম্মান শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে, রোগ ও বিপদে মুক্তি চায় তার নিকট এবং বৃক্ষটিকে কেন্দ্র করে ওরস করে-সেই বৃক্ষটিকে অবিলম্বে কেটে ফেলবে এবং শিরকের এই আড্ডাখানা ভেঙ্গে নির্মূল করে ফেলবে।

এ থেকে স্পষ্ট বোঝা গেল যে, হযরত হুযায়ফার দৃষ্টিতে জ্বর ইত্যাদি থেকে বাঁচার জন্য তাবিজ তুমার বাঁধা পরিষ্কার শিরক। এটা ছোট শিরক হলেও সাহাবায়ে কিরাম তার প্রতিবাদে এমন সব আয়াত দলীল পেশ করতেন, যা বড় শিরকের প্রতিবাদে নাযিল হয়েছে। কেননা ছোট হলেও সেটা যে শিরক তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এ জন্যে নবী করীম(স) বলেছেনঃ আরবী(*****)

-তোমাদের ব্যাপারে আমি সবচাইতে ভয় করি ছোট ছোট শিরককে।

অতএব শিরক যত ছোটই হোকনা কেন, আসলে তা আদৌ ছোট নয়। বরং সাহাবীদের দৃষ্টিতে ছোট শিরকও ছিল কবীরা গুনাহর চাইতেও বড় কঠিন।

কুরআনের আয়াত ও হাদীসসমূহের দৃষ্টিতে আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে প্রচলিত তাবিজ-তুমার-কবজ- ইমামে জামেন বাঁধার রেওয়াজটি সম্পর্কে চিন্তা করলে দুঃখে কলিজা ফেটে যায়। কেবল জাহিল লোকরাই যদি এসব করতো, তাহলে কোনো কথা ছিলনা। কিন্তু বড় বড় আলিম নামধারী লোকদেরও এই শিরকে নিমজ্জিত দেখতে পাচ্ছি। রাষ্ট্রপ্রধানের বিদেশ গমনকালে বিমানবন্দরে বিদায়কালে যখন একজন আলিম নামধারী ব্যক্তি ঘটা করে তাঁর হাতে ইমামে জামেন বেঁধে দেন, যখন বিদেশে বিবাহিতা মেয়ে রুখসত করার সময় মা কন্যার হাতে ইমামে জামেন বাঁধে এবং তার খবর খবরের কাগজে বড় বড় অক্ষরে প্রকাশ করা হয়, তখন তওহীদে বিশ্বাসী মানুষের মস্তক লজ্জায় ও দুঃখে নত না হয়ে পারেনা।

আমাদের গ্রা্ম্য মূর্খ সমাজে দেখা যায়, সদ্যজাত সন্তানের গলায় হাতে রাজ্যের বাজে জিনিস বেঁধে দেয়া হয়। বড়ইর আটি, তামার পয়সা, মোল্লার দেয়া তাবিজের ঢোল, নানা গাছ গাছড়ার পাতা বা শিকড়ের টুকরা ঝুলিযে দেয়া হয়। হাটা চলা করতে পারে-এমন ছেলে মেয়ের পায়ে মল, ঝুনঝুনি পরিয়ে দেয়া হয়- পুকুরের দিকে যেতে লাগলে টের পাওয়া যাবে, পানিতে পড়ে মরা থেকে তাকে বাঁচানো যাবে এই আশায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, যার মৃত্যু শিশুকালে নির্ধারিত থাকে তাকে এসব আবর্জনার বোঝা রক্ষা করতে পারেনা। মল বা ঝুনঝুনি পরা ছেলেমেয়েও পানিতে ডুবে মারা যায়। কেননা মৃত্যু এগুলোর ওপর নির্ভরশীল নয়। বস্তুত মানুষের ক্ষেত্রে এসবের শিরক হওয়া এবং সব রেওয়াজের বিদয়াত হওয়ার কোনোই সন্দেহ নেই। নবী করীম(স) যেমন এসব ব্যাপারে স্পষ্ট উক্তি করেছেন, নিষেধ বাণী উচ্চারণ করেছেন, তেমনি কার্য্তও তিনি জাহিলিয়াতের জামানায় প্রচলিত এসব রীতির প্রতিবাদ করেছেন। এমন কি তিনি জন্তু জানোয়ারের গলায়ও এসব বাঁধতে নিষেধ করেছেন, বাঁধা থাকলে তা ছিঁড়ে ফেলেছেন।

জাহিলিয়াতের জমানায় একটি রেওয়াজ ছিল, ভালো ভালো উটকে লোকদের নজরের দোষ থেকে বাঁচার জন্য উটের গলায় নানা তাবিজ-তুমার বাঁধা হতো। হযরত আবু বুশাইর-কুরাইশ ইবনে উবাইদ বলেন, একবার বিদেশ যাত্রাকালে তিনি রাসূল(স) এর সঙ্গী ছিলেন। নবী করীম(স) যাত্রার পূর্বেই একজন লোক পাঠিয়ে দিলেন এই বলেঃ আরবী(*****)

-কোনো উটের গলায় যেন এ ধরনের কোনো সূতা বাঁধা না থাকে, থাকলে তা যেন ছিঁড়ে ফেলা হয়।

ইমাম আহমদ ও আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন, নবী করীম(স) বলেছেনঃ আরবী(****)

-তাবিজ-তুমার ও নির্ভরতার জিনিসগুলো ব্যবহার স্পষ্ট শিরক।

এ আলোচনার শেষভাগে একটি সন্দেহের অপনোদন প্রয়োজন। পূর্বের আলোচনা পাঠে কারো মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, কুরআনের আয়াত দিয়ে তাবিজ বানালেও কি শিরক হবে? এর সংক্ষিপ্ত জবাব এই যে, সলফে সালেহীনদের মধ্যে কেউ কেউ কুরআনের আয়াত দিয়ে তাবিজ কবয বানানো জায়েয বলেছেন। কিন্তু কেউ কেউ এ কাজকেও হারাম বলে ঘোষণা করেছেন। হযরত ইবনে মাসঊদ(রা) এই শেষের লোকদের মধ্যে অন্যতম। ফিকহবিদদের মধ্যে কাতাদাহ, শাবী, সাঈদ ইবনে জোবাইর ও এক বড় দল বলেছেনঃ তাবিজ তুমার ব্যবহার মাকরূহ(তাহরীম)। মুমিন মাত্রই কর্তব্য এগুলো পরিহার করা, আল্লাহর প্রতি ঈমান দৃঢ় রেখে তাঁর ওপর নির্ভর ও ভরসা করা এবং এই জ্ঞান সহকারে যে, তার কোনো ফায়দা দেয়না, তা ত্যাগ করলে কোনো ক্ষতি হবেনা।

আমার মনে হয়, এসব কাজের পিছনে যে মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা থাকে, তা চিন্তা করলে সবাই স্বীকার করবেন, এসব কাজ হারাম ও তওহীদ বিরোধী না হয়ে পারেনা- তা কুরআনের আয়াত দ্বারা বানানো হলেও নয়। কেননা একজন যখন বিপদে পড়ার আশংকায় এসব কাজ করবে, তার মনের লক্ষ্য আল্লাহ হতে অ-আল্লাহ জিনিসের দিকে কেন্দ্রীভূত হবে। আল্লাহকে বাদ দিয়ে সে এই জিনিসের ওপর নির্ভরতা গ্রহণ করবে। আর তওহীদরে দৃষ্টিতে এটাই শিরক। দ্বিতীয়ত এ কাজে কুরআনের আয়াত ব্যবহৃত হলে, তা যে কুরআনের সঠিক ব্যবহার নয়, কুরআন যে তাবিজ হয়ে থাকার জন্য দুনিয়াতে আসেনি, কুরআনের উদ্দেশ্য থেকে সরিয়ে তাকে অন্য কাজে ব্যবহার করা হয়, তাতে কি কোনো সন্দেহ আছে? এত কুরআনের প্রকাশ্য অপমান, কুরআনের অপব্যবহার, কুরআনের এও এক প্রকার তাহরীফ-ব্যবহারিক তাহরীফ(বিকৃতি সাধন), কুরআনের অভিজ্ঞ তওহীদ বিশ্বাসী মানুষের নিকট তা কিছু মাত্র অস্পষ্ট নয়। তাই এ কাজ যত শীঘ্রই বন্ধ হবে মানুষ তা ত্যাগ করে খলীস তওহীদবাদী তওহীদপন্থী হয়ে উঠবে, ততই মঙ্গল। অন্তত সমাজের আলিমদের যে এজন্য বিশেষ তৎপর হওয়া উচিত এবং এসব জিনিসকে একটুও প্রশ্রয় দেয়া উচিত নয়, তা আমি জোর গলায় বলতে চাই।

অবশ্য এ থেকে একথা প্রমাণ হয়না যে, কোনো আকস্মিক বিপদে কুরআনের আয়াত পড়ে আল্লাহর রহমত চাওয়া যাবেনা কিংবা বিপদগ্রস্ত লোকের ওপর আল্লাহর শিফা লাভের জন্য ফুঁ দেয়া যাবেনা। তা যে করা যাবে, তা হাদীস থেকেই প্রমাণিত এবং বহু সংখ্যক ফিকহবিদও সে মত জাহির করেছেন।

মিলাদ অনুষ্ঠান বিদয়াত

মুসলমান সমাজে বহু দিন থেকেই মিলাদ পাঠ ও মিলাদের মজলিস অনুষ্ঠানের রেওয়াজ চলে আসছে।সাধারণভাবে মুসলমানরা একে বড় সওয়াবের কাজ বলে মনে করে এবং খুব আন্তরিকতা সহকারে তা পালন করে। কিন্তু কোনো এক সময় মুহুর্তের জন্যও বোধ হয় মুসলমানরা- মুসলিম সমাজের শিক্ষিত সচেতন জনতা-ভেবে দেখতেও রাজি হয়না যে, এ কাজ ইসলামী শরীয়ত মোতাবিক কিনা, সেই সুন্নাত মোতাবিক কিনা, যা মুসলমানেরা লাভ করেছে হযরত মুহাম্মদ(স) এর নিকট থেকে তাঁর প্রতি ঈমান আনার কারণে। এমন কি এ দেশের আলিম সমাজেও সমাজের এ আবহমান কাল হতে চলে আসা রেওয়াজের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। কখনো তাকিয়ে দেখেনা-আমরা সুন্নাত মোতাবিক কাজ করছি, না বিদয়াত করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে খানিকটা বিস্তারিত আলোচনা করা এ গ্রন্থে বিশেষ প্রয়োজন হয়ে দেখা দিয়েছে।

এ কথা সবাই জানেন ও স্বীকার করেন যে, প্রচলিত মিলাদের কোনো রেওয়াজ রাসূলে করীম(স) এর জীবনে ছিলনা, ছিল না সাহাবায়ে কিরাম, তাবেয়ীন ও পরবর্তীকালের মুজাহিদদের সময়ে। এ মিলাদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস হলো এই যে, নবী করীম(স) এর প্রায় দুইশ বছর পরে এমন এক বাদশা এর প্রচলন করে, যাকে ইতিহাসে একজন ফাসিক ব্যক্তি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জামে আজহারের শিক্ষক ডঃ আহমাদ শারবাকী লিখেছেন-চতূর্থ হিজরীতে ফাহিমীয় শাসকরা মিসরে এর প্রচলন করেন। একথাও বলা হয় যে, শায়খ উমর ইবনে মুহাম্মদ নামক এক ব্যক্তি ইরাকের মুসল শহরে এর প্রচলন করেছেন। পরে আল মুজাফফর আবু সাঈদ বাদশাহ ইরাকের এরকেল শহরে মীলাদ চালু করেন। ইবনে দাহইয়া এ বিষয়ে একখানা কিতাব লিখে তাকে দেন। বাদশাহ তাকে এক হাজার দীনার পুরস্কার দেন।

এ পরিপ্রেক্ষিতে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বর্তমানে মিলাদ সুন্নাতের ব্যবস্থা নয়, সুন্নাত মোতাবিক ব্যবস্থাও এটি নয়। বরং তা সুস্পষ্টরূপে বিদয়াত।

এর বিদয়াত হওয়ার সবচেয়ে সুস্পষ্ট ও অকাট্য দলীল হচ্ছে এই যে, এই কাজ রাসূলে করীম(স) এর জমানায় ছিলনা, রাসূলের পরে খুলাফায়ে রাশেদুন তথা সাহাবায়ে কিরামের যুগেও তা একটি সওয়াবের কাজরূপে চালু হয়নি। এমন কি তার পরবর্তী যুগেও তাবেয়ী মুজতাহিদদের সময়েও এর প্রচলন হতে দেখা যায়নি। আর এ ইসলামী যুগে যে কাজ একটি ইবাদত বা সওয়াবের কাজ হিসেবে প্রচলিত হয়নি, পরবর্তীকালের কোনো লোকের পক্ষে তেমন কোনো কাজকে সওয়াবের কাজরূপে চালু করা সম্ভব হতে পারেনা, সে অধিকারও কাউকে দেয়া হয়নি।

একে তো ইসলামের জায়েয নাজায়েয, সওয়াব-গুনাহ এবং আল্লাহ রাসূলের সন্তোষ অসন্তোষের বিধি ব্যবস্থা কেবলমাত্র কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতেই প্রমাণিত হবে। কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে প্রমাণিত নয় অথচ তাকে বড় সওয়াবের কাজ বলে মনে করা হবে, তার কোনো অবকাশই ইসলামে নেই। প্রকৃতপক্ষে এরূপ কাজই বিদয়াত। আর যে কাজ মূলতই বিদয়াত, সে কাজ কোনোরূপ সওয়াব হওয়ার আশা করাই বাতুলতা মাত্র। রাসূলে করী(স) কয়যুগের কল্যাণময়তার সাক্ষ্য দিয়েছেন নিজে এই বলেঃ আরবী(******)

-অতীব কল্যাণময় ইসলামী যুগ হলো আমার এই যুগ, তারপর পরবর্তীকালের লোকদের যুগ এবং তারপরে তৎপরবতীকালের লোকদের যুগ।

এ তিনটি যুগের কোনো এক যুগেই অর্থাৎ রাসূলের নিজের সাহাবীদের এবং তাবেয়ীদের যুগে মিলাদের এ অনুষ্ঠানের রেওয়াজ মুসলিম সমাজে চালু হয়নি, হয়েছে তারও বহু পরে। কাজেই এ কাজে কোনো প্রকৃত কল্যাণ আছে বলে মনে করাই একটি বড় বিদয়াত। বিশেষত কয়েকটি বিশেষ কারণে মিলাদের এ অনুষ্ঠান মুসলমানদের আকীদা ও দ্বীনের দিক দিয়ে খুবই মারাত্মক হয়ে উঠে। কারণ কয়টি সংক্ষেপে এইঃ

(এ অনুষ্ঠানে নবী করীম (স) এর জন্ম বৃত্তান্ত যেভাবে আলোচিত হয় বা আরবী উর্দূ বা বাংলা উচ্চারণে পঠিত হয়, তা মূলতই ঘৃণার্হ। অথচ ঠিক এই সময়েই নবী করীম(স) মজলিসে স্বশরীরে উপস্থিত হন বলে লোকদের আকীদা রয়েছে। কিন্তু সব বিশেষজ্ঞদের মতেই এ ধরনের আকীদা সুস্পষ্ট কুফরী। কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণায় এবং ফিকাহর দৃঢ় সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এরূপ আকীদার হারাম হওয়ার কথা প্রমাণিত হয়েছে।

নবী করীম(স) দুনিয়া থেকে চিরতরে বিদায় গ্রহণ করে চলে গেছেন। তাঁর পক্ষে দুনিয়ায় ফিরে আসার আকীদা পোষণ করা শিরক। এ কাজ কেবল আল্লাহর পক্ষেই সম্ভব। আল আল্লাহর কুদরতের কাজ কোনো বান্দার জন্য ধারণা করা পরিষ্কার শিরক। এ পর্যায়ে ফতোয়ায়ে বাজ্জাজিয়ার কথা আবার উল্লেখ করা যেতে পারে।

তাতে লেখা হয়েছেঃ আরবী (******)

-হানাফী মাযহাবে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, নবী করীম (স) গায়েবের ইলম জানেন- এরূপ আকীদা যে রাখবে, সে কাফির হয়ে যাবে। কেননা এরূপ আকীদা আল্লাহর ঘোষণার সম্পূর্ণ বিপরীত। আল্লাহ ইরশাদ করেছেনঃ

قُل لَّا يَعْلَمُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ ۚ

-বল, আসমান জমিনে যারাই রয়েছে, আল্লাহ ছাড়া আর কেউই গায়েব জানেনা।

যদি কেউ বিবাহের অনুষ্ঠানে বলে যে, আমার এ বিবাহের সাক্ষী হচ্ছে স্বয়ং আল্লাহ ও রাসূল, তবে সে কাফির হয়ে যাবে বলে ফিকহর কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা সেতো রাসূল(স) কে আলীমুল গায়েব বলে বিশ্বাস করলো।

() মিলাদ মাহফিল শিরনি মিঠাই বন্টনকে একান্ত জরুরী মনে করা হয়। আর মিলাদ মাহফিল এর অনুষ্ঠানকে ওয়াজিব এর পর্যায়ে গণ্য করা হয়। এভাবে কোনো নাজায়েয কাজকে ওয়াজিব বা জরুরী মনে করা হলে তা মাকরূহ হয়ে যাবে। ফিকহর কিতাবে বলা হয়েছেঃ যে মুবাহ কাজই ওয়াজিব গণ্য হবে, তা মাকরূহ হবে(আর মাকরূহ মানে মাকরূহ তাহরীম)।

() নির্দিষ্ট দিন ও তারিখে মিলাদ করাকে জরুরী মনে করা হয়। অথচ শরীয়তে যখন কোনো তারিখকে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি এ কাজের জন্য, তখন এরূপ করাতো শরীয়তের বিধানের ওপর নিজেদের থেকে বৃদ্ধি করার শামিল।

হাদীসে স্পষ্ট বলা হয়েছেঃ আরবী(******)

-রাত্রিসমূহের মধ্যে কেবল জুম‘আর রাত্রিকেই তাহাজ্জুদের নামাযের জন্য এবং দিনসমূহের মধ্যে কেবল শুক্রবারের দিনটিকেই নফল রোযার জন্য বিশেষভাবে নির্দিষ্ট করে নিওনা।

অতএব নফল রোযার জন্যই যখন কোনো রাত বা দিন নিজেদের থেকে নির্দিষ্ট করে নিতে রাসূলে করীম(স) সুস্পষ্ট ভাষায় নিষেধ করেছেন, তখন মিলাদের জন্যই বা নিজেদের থেকে এ নির্ধারণ কেমন করে জায়েয হতে পারে!

() মিলাদ মজলিসের সাজ সজ্জার জন্য খুব আলো বাতির ব্যবস্থা করা হয়, মোমবাতি আর আগরবাতির ধুম পড়ে যায়। এসব নিতান্তই বেহুদা কাজ। আর একাজে যে পয়সা খরচ করা হয়, তাও বেহুদা খরচ। এ কাজ নিষিদ্ধ, এর ওপরই আরোপিত হয় আল্লাহর ঘোষণাঃ

-বেহুদা অর্থ খরচ করোনা। কেননা বেহুদা খরচকারী শয়তানের ভাই।

এসব করা হয় যে অনুষ্ঠানে, যাতে করে আল্লাহর কালামের স্পষ্ট বিরোধিতা করা হয়, তা করে সওয়াব হতে পারে বলে মনে কার কি নিতান্ত আহাম্মকী নয়?

মওলানা রশীদ আহমদ গংগুহী মিলাদ সংক্রান্ত এক সওয়ালে জবাবে লিখেছেনঃ প্রচলিত ধরনের মিলাদ অনুষ্ঠান বিদয়াত ও মাকরূহ।

এ জবাবকে সমকালীন বহু গণ্যমান্য আলিম ‘সহীহ’ বলে সমর্থন করেছেন এবং ফতোয়ার দস্তখতও দিয়েছেন। মওলানা গংগুহী অন্যত্র লিখেছেনঃ শরীয়তে যা বিনা শর্তে রয়েছে, তাকে শর্তাধীন করা এবং যা শর্তাধীন রয়েছে তাকে শর্তমুক্ত করাই হলো বিদয়াত। যেমন মিলাদের মজলিস অনুষ্ঠান করা। আসলে আল্লাহর যিকির কিংবা রাসূলের জীবন চরিত বর্ণনা ও আলোচনা করা শরীয়তে মুস্তাহাব ও জায়েয। কিন্তু ঠিক সেই উদ্দেশ্যেই কোনো মজলিস অনুষ্ঠান করা বিদয়াত ও হারাম। আল্লাহ ও রাসূলের কথা বলা তো মুস্তাহাব; কিন্তু বিশেষভাবে মিলাদের আলোচনার শর্ত করা বিদয়াত।

ইমাম আল্লামা ইবনুল হাজ্জ লিখেছেনঃ

তারা যে সব বিদয়াত রচনা করে নিয়েছে, তন্মধ্যে একটি তাদের এই আকীদা যে, তারা এ পর্যায়ে যা কিছু করছে তাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় ইবাদত এবং আল্লাহর নির্দেশাবলীর বহিঃপ্রকাশ। আর তা হচ্ছে এই যে, রবিউল আউয়াল মাসে তারা মিলাদের অনুষ্ঠান করে, যাতে কয়েক প্রকারের বিদয়াতের অনুষ্ঠান করে, হারাম কাজ করে। এমন কি, এতদূর বলেছেন যে, এসব মিলাদেরই কারণে সৃষ্ট বিপর্য্য়। তাতে কোনোরূপ সুর গান হোক আর মিলাদের নিয়্যত করা হয়, লোকদের সেজন্য দাওয়াত দেয়া হয়, উপরোল্লিখিত কোনো দোষের কাজ যদি তাতে নাও থাকে তবু শুধু এ কাজের নিয়্যত করার কারণেও তা বিদয়াতই হবে। কেননা মূলতই এ জিনিস দ্বীন ইসলামে অতিরিক্ত বৃদ্ধি। অতীতকালের নেক ও দ্বীনদার লোকদের আমল এরূপ ছিলনা অথচ তাদের অনুসরণ করাই উত্তম। তারা কেউ মিলাদের নিয়্যত করেছেন বলে কোনোই উল্লেখ নেই? আমরাতো তাঁদেরই অনুসরণ করি। কাজেই তাঁদের কাজের যতদূর সুযোগ-সুবিধ ও ক্ষেত্র বিশালতা ছিল, আমাদেরও তো ঠিক ততোদূরই থাকবে।

মওলানা আবদূর রহমান আল মাগরিবী আল হানাফী(রহ) তাঁর ফতোয়ায় লিখেছেনঃ মিলাদ অনুষ্ঠান করা বিদয়াত। নবী করীম(স) খুলাফায়ে রাশেদীন এবং ইমামগণ তা করেনওনি, করতে বলেনওনি। ‘শরীয়াতুল ইলাহিয়া গ্রণ্থেও এমনিই লেখা হয়েছে।

মাওলানা নাসিরুদ্দীন আল আওদী শাফেয়ী এক প্রশ্নের জবাবে এ সম্পর্কে লিখেছেনঃ

মিলাদ পাঠের অনুষ্ঠান করা যাবেনা। কেনা সলফে সালেহীন কেউই এ কাজ করেছেন বলে বর্ণিত হয়নি। বরং তিন যুগ(তাবেয়ী পরবর্তী যুগ)পরে এক খারাপ জমানার লোকেরা এ কাজ নতুন করে উদ্ভাবন করেছে। যে কাজ সলফে সালেহীন করেননি, তাই আমরা পরবর্তী লোকদের অনুসরণ করতে পারিনা। কেননা সলফে সালেহীন এর অনুসরণই আমাদের জন্য যথেষ্ট। এ বিদয়াতী কাজ করার প্রয়োজন কোথায়?

হাম্বলী মাযহাবের শায়খ শরফুদ্দীন(রহ) বলেছেনঃ দেশের এই শাসকমন্ডলী প্রতি বছর নবী করীম(স) এর মিলাদের যে উৎসব অনুষ্ঠান করে, তাকে খুব খারাপ ধরনের বাড়াবাড়ি ছাড়াও তা মূলতই একটা বিদয়াতী কাজ। নফসের খায়েশের অনুসরণ করে তারাই এ কাজ নতুন করে উদ্ভাবন করেছে। তারা জানেনা নবী করীম(স) কি করতে আদেশ করেছেন, আর কি করতে নিষেধ করেছেন। অথচ তিনিই শরীয়তের বাহক ও প্রবর্তক।

কাযী শিহাবুদ্দীন(রহ) এক প্রশ্নের জবাবে লিখেছেনঃ

না, তা করা যাবেনা। কেননা তা বিদয়াত। আর সব বিদয়াতই সুস্পষ্ট গোমরাহী। সব গোমরাহীরই পরিণাম জাহান্নাম। জাহিল লোকেরা রবিউল আউয়াল মাসে প্রত্যেক বছরের শুরুতে যা কিছু করে, তা শরীয়তের কোনো জিনিসই নয়। আর নবী করীমের জন্মের কথা উল্লেখ করার সময় তারা যে দাঁড়ায়, মনে করে নবী করীমের রূহ তাশরীফ এনেছে এবং উপস্থিত আছে, এ এক বাতিল ধারণা মাত্র। এ আকীদা পরিষ্কার শিরক। ইমামগণ এ ধরনের কাজ করতে নিষেধ করছেন।

শামী চরিত গ্রন্থ প্রণেতা লিখেছেনঃ রাসূল(স) এর প্রেমিকদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে যে, তারা যখন নবী করীম(স) এর জন্ম বৃত্তান্ত শুনতে পায় তখন তারা তাঁর তাজীমের জন্য দাঁড়িয়ে যায়। অথচ এই দাঁড়ানো বিদয়াত, এর কোনো ভিত্তি নেই।

মওলানা ফজলুল্লাহ জৌনপুরী বলেনঃ নবী করীমের ভূমিষ্ট হওয়ার কাহিনী শুনবার সময় সাধারণ মানুষ যে কিয়াম করে, তার কোনো দলীল নেই; বরং তা মাকরূহ।

কাযী নসিরউদ্দীন গুজরাটি লিখেছেনঃ কোনো কোনো জাহিল পীর এমন বহু বিদয়াত চালু করেছেন, যার সমর্থনে কোনো হাদীস বা কোনো নীতি কুরআন-সুন্নাতে পাওয়া যায়না। তার মধ্যে একটি হচ্ছে রাসূলে করীমের জন্ম বৃত্তান্ত বলার সময় দাঁড়ানো।

মুজাদ্দিদে আলফেসানী শায়খ আহমদ শরহিন্দী লিখেছেনঃ ইনসাফের দৃষ্টিতে বিচার করে দেখুন। মনে করুন নবী করীম(স) যদি এ সময়ে বর্তমান থাকতেন, দুনিয়ায় জীবিত থাকতেন আর এ ধরনের মজলিস অনুষ্ঠান হতে দেখতেন, তবে কি তিনি এতে রাজি হতেন, এ অনুষ্ঠান পছন্দ করতেন? এটাই নিশ্চিত যে, তিনি কিছুতেই এ কাজকে পছন্দ করতেননা। বরং এ কাজের প্রতিবাদই করতেন।

এসব মজলিস সম্পর্কে কুরআন মজীদের এ আয়াতটি বিশেষভাবে

وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّىٰ يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ ۚ إِنَّكُمْ إِذًا مِّثْلُهُمْ ۗ

প্রযোজ্যঃ –আল্লাহ তোমাদের প্রতি এই নির্দেশ জারি করেছেন, তোমরা যখন আল্লাহর আয়াতকে অমান্য করা হচ্ছে শুনতে পাও এবং তার ঠাট্টা বিদ্রুপ হতে দেখতে পাও, তখন তোমরা তাদের সাথে বসবেন-যতক্ষণ না তারা অন্য কাজে মনোযোগী হয়ে পড়ে। অন্যথায় সে সময় তোমরাও তাদেরই মতো গুনাহগার হবে। (আন নিসাঃ140)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতবী ও মুহীউস সুন্নাহ ইমাম বগভী লিখেছেনঃ যহহাক হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বলেছেন যে, এ আয়াতের আওতায় পড়ে গেছে দ্বীন ইসলামের নতুন উদ্ভাবিত সব কাজ এবং কিয়ামত পর্য্ন্ত যা কিছু বিদয়াত রচনা করা হবে তা সবই।

আয়াতের শেষাংশঃ

إِنَّ اللَّهَ جَامِعُ الْمُنَافِقِينَ وَالْكَافِرِينَ فِي جَهَنَّمَ جَمِيعًا [٤:١٤٠]

–নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা মুনাফিক ও কাফির সকলকেই জাহান্নামে একত্রিত করবেন, বিদয়াতী ও কাফির উভয়ের জন্য অত্যন্ত কঠোর সতর্কবাণী।

এ পর্যায়ে আমার শেষ কথা হলো, নবী করীম(স) দুনিয়ার মুসলমানদের আদর্শ, সর্বাধিক প্রিয়, আল্লাহর হেদায়াত ও রহমত লাভের একমাত্র মাধ্যম। এ জন্যে রাসূলে করীমের জীবনী, তাঁর চরিত্র ও কর্মাদর্শই এ অন্ধকার দুনিয়ায় একমাত্র মুক্তির আলোকস্তম্ভ। তাই সব মানুষের জন্য বারে বারে তা আলোচনা করতে হবে, পড়তে হবে, জানতে হবে, অন্যদের সামনে বিস্তারিতভাবে তা তুলেও ধরতে হবে, বাস্তব জীবনের কদমে কদমে তাঁকেই অনুসরণ করে চলতে হবে, তাঁকেই মানতে হবে, ভালোবাসতে হবে, তারই কাছ থেকে চলার পথের সন্ধান ও নির্দেশ লাভ করতে হবে। এছাড়া মুসলমানের কোনোই উপায় নেই, থাকতে পারেনা। কুরআন হাদীসে রাসূল(স) সম্পর্কে যেসব বুনিয়াদী হেদায়াত দেয়া হয়েছে, তার সারকথা এ-ই। কিন্তু রাসূলে করীম(স) কে পূজা করা চলবেনা। তাঁর সম্পর্কে এমন ধারণা রাখা যাবেনা, যা শরীয়তের দৃষ্টিতে কেবল আল্লাহর সম্পর্কেই রাখা যেতে পারে।

রাসূলে করীমের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা ঈমানদার ব্যক্তির ইসলামের পথে চলার সবচেয়ে বড় পাথেয়। সে ভালোবাসা নিশ্চয়ই এত মাত্রাতিরিক্ত হবেনা, যা কেবল আল্লাহর জন্যই হওয়া উচিত। রাসূল(স) কে সে মর্যাদা, সে গুরুত্ব এবং সে ভালোবাসাই দিতে হবে, যা দিতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন এবং রাসূল(স) যা করার জন্য উপদেশ দিয়েছেন।

এ পর্যায়ে আল্লাহর সবচেয়ে বড় হেদায়াত হচ্ছে রাসূলে করীম(স) কে অনুসরণ করা।

আয়াত হলোঃ

قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ [٣:٣١]

-বলে দাও হে নবী! তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস, তাহলে তোমরা হে মুসলমানরা! আমার অনুসরণ করে চলো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন, তিনি তোমাদের গুনাহ মাফ করে দেবেন। আর আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও দয়াবান।(আল ইমরানঃ ৩১)

এ আয়াতের মূল কথা হলো আল্লাহকে ভালোবাসলে নবীর অনুসরণ করতে হবে। নবীর অনুসরণ করলে আল্লাহর ভালোবাসা ও ক্ষমা লাভই হচ্ছে বান্দার সবচেয়ে বেশি-সবচেয়ে বড় কাম্য। আর তা পাওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে রাসূলে করীম(স) এর সার্বিক অনুসরণ।

রাসূল(স) এর প্রতি উম্মতের দ্বিতীয় কর্তব্য হচ্ছে দুরূদ পাঠ। কুরআন মজীদের আয়াতে বলা হয়েছেঃ আরবী(*******)

-নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দুরূদ পাঠান। হে মুমিন লোকেরা! তোমরাও নবীর প্রতি দুরূদ ও সালাম পাঠাও।

নবীর প্রতি দুরূদ পাঠানো একটি মহৎ কাজ, একটি অতি সওয়াবের কাজ। আল্লাহ নিজে যে নবীর প্রতি দুরূদ পাঠান, পাঠান ফেরেশতাগণ, সে নবীর প্রতি দুরূদ পাঠানো যে কত বড় মুবারক কাজ, কত বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে এ থেকে; তার ব্যাখ্যা করে শেষ করা সম্ভব নয়।

এছাড়া নবীর প্রতি উম্মতের আর কি করণীয় থাকতে পারে? নবীর জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনা এবং নবীর জননীর প্রসব বেদনাকালীন ঘটনাবলীর উল্লেখ যে সওয়াব হবে এ কথা কে বললো? কেমন করে তা জানা গেল? আর এই যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দল বেঁধে ‘ইয়া নবী সালাম আলাইকা’ ‘ইয়া হাবীব সালাম আলাইকা’ বলতে হবে আর এতে বড় সওয়াব হবে বলে মনে করা হচ্ছে, এ কথা তো কুরআন হাদীস থেকে প্রমাণিত নয়। অনেকের মতে এসব কাজ হিন্দুদের এক ধরনের পূজা অনুষ্ঠানের মতোই ব্যাপার। আর ইবাদত পর্যায়ের কোনো কাজেই অন্য ধর্মাবলম্বীর সাথে সাদৃশ্য হওয়া মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বর্জনীয়। কেননা নবী করীম(স) বলেছেনঃ আরবী(******)

-যে লোক অন্য জাতির সাথে সাদৃশ্য রক্ষা করে চলবে, কিয়ামতের দিন সে তাদের মধ্যেই গণ্য হবে।

মিলাদ মাহফীলে নবী করীমের ‘রূহ’ হাযির হয়, এ কথা যদি তর্কের খাতিরেও মেনে নেয়া হয়, তবু প্রশ্ন এই যে, তখন সে কথা মনে করে মজলিসে সবাইকে দাঁড়াতে হবে কেন? রাসূলের জীবদ্দশায়ও কি সাহাবীগণ রাসূলের আগমনে তাজীমের জন্য দাঁড়াতেন এবং এ দাঁড়ানোয় রাসূলে করীম(স) খুশি হতেন কিংবা তিনি দাঁড়িয়ে কি তাঁর তাজীম করতে বলেছেন কোনোদিন? এ পর্যায়ে আমরা সহীহ হাদীসের সম্পূর্ণ বিপরীত জিনিস দেখতে পাই। মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে যে, আনাস(রা) সাহাবীদের সম্পর্কে বলেনঃ আরবী(********)

-সাহাবীদের নিকট রাসূলে করীম(স) সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা যখন রাসূলকে উপস্থিত দেখতে পেতেন, তাঁরা তাঁর জন্যে দাঁড়াতেননা। কেননা তাঁরা জানতেন যে, তাঁর তাজীমের উদ্দেশ্যে দাঁড়ানোকে তিনি অপছন্দ করেন।

আবু মাজলাজ বলেনঃ হযরত মুআবিয়া(রা) এমন একটি ঘরে প্রবেশ করলেন, যেখানে হযরত ইবনে আমের ও ইবনে যুবায়র উপস্থিত ছিলেন। মুআবিয়ার আগমনে ইবনে আমের দাঁড়ালেন কিন্তু ইবনে যুবায়র বসে থাকলেন। তখন মুআবিয়া(রা) তাঁকে বললেনঃ আরবী(******)

-তুমি বসো। কেননা আমি রাসূলে করীমের(স) নিকট শুনেছি তিনি বলেছেনঃ যে ব্যক্তি তার সম্মানার্থে লোকেরা দাঁড়াক-এটা চায় এবং এতে খুশী হয়, সে যেন জাহান্নামে নিজের ঘর বানিয়ে নেয়।

নবী করীম(স) নিজে মোটেই পছন্দ করতেননা, চাইতেননা যে তাঁর তাজীমের জন্য লোকেরা উঠে দাঁড়াবে। তার প্রমাণ হযরত আবু ইমামের বর্ণনা। তিনি বলেনঃ আরবী(******)

-নবী করীম(স) লাঠির ওপর ভর দিয়ে আমাদের সামনে আসলেন। তখন আমরা তার তাজীমের জন্য দাঁড়িয়ে গেলাম। নবী করীম(স) বললেনঃ অমুসলিম লোকেরা যেমন পরস্পরের তাজীমের জন্য দাঁড়ায়, তোমরা তেমনি করে দাঁড়াবেনা।

রাসূলে করীমের(স) এ কথাটিকে কেউ কেউ তাঁর স্বভাবজনিত বিনয় বলে অভিহিত করতে পারেন। বলতে পারেন, রাসূলে করীম(স) বিনয়বশত তাঁর তাজীমার্থে কাউকে দাঁড়াতে বলেননি বা দাঁড়ালেও নিষেধ করেছেন। তাই বলে আমরা কি দাঁড়িয়ে তাঁর প্রতি সম্মান দেখাব না?

এরূপ কথার প্রকৃত তাৎপর্য্ যে কতো ভয়াবহতা এ লোকেরা বুঝতে পারেনা। তাঁর মানে এই হয়ে যে, তিনি নিষেধ করেছেন কৃত্রিমভাবে, আসলে দাঁড়ানটাকেই তিনি পছন্দ করতেন, দাঁড়ালে তিনি খুশি হতেন, তাতে সওয়াবও হয়। অথচ প্রশ্ন এই যে, যে যে কাজ করলে মুসলমানরা সওয়াবও পেতে পারে কিংবা তাদের তাজীমার্থে দাঁড়ালে যদি সওয়াবই হতো বা তা যদি নবীর প্রতি মুসলমানদের কর্তব্যই ছিল, তবে এভাবে নিষেধ করার কোনো কারণ থাকতে পারেনা। তিনি অকপটে তা বলতে পারতেন, যেমন বলেছেন তাঁর জন্য দুরূদ পড়তে, তাঁকে অনুসরণ করতে, এ ব্যাপারে কৃত্রিমতার কোনোই প্রয়োজন ছিলনা। আর নবীর পক্ষে কৃত্রিমতা করা সম্ভব বা কৃত্রিমতা করেছেন বলে মনে করা- দ্বীনের মূলের ওপরই কুঠারাঘাত। কোনো ঈমানদার লোকের পক্ষেই এরূপ ধারণা করা সম্ভবপর নয়।

মনে রাখা আবশ্যক- রাসূলে করীমের রূহ মিলাদে হাযির হয় মনে করে তাঁর তাজীমার্থে দাঁড়ানোর ব্যাপারটিই এখানে আমাদের আলোচ্য। নতুবা সমাজের সম্মানিত ব্যক্তিদের আগমনে সাময়িকভাবে দাঁড়িয়ে তাঁকে প্রসন্নচিত্তে সংবর্ধনা জানানো এবং তাঁকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করার জন্য দাঁড়ানো এ থেকে ভিন্ন কথা। সহীহ হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে, হযরত সায়াদ ইবনে মুয়ায (রা) যখন তাঁর জন্তুযানে চড়ে আসছিলেন, তখন খোদ নবী করীম(স) আনসারদের নির্দেশ দিয়েছিলেনঃ তোমরা তোমাদের নেতার প্রতি সম্মানা প্রদর্শনার্থে দাঁড়াও। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, কোনো মর্যাদাবান ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে সম্মান দেখানো নাজায়েয নয়। বরং জমহুর আলিমগণ তা মুস্তাহাব বলেছেন। এ পর্যায়ে কোনো নিষেধ পাওয়া যায়নি।

খোদ নবী করীম(স) স্নেহের আতিশয্যে তদীয় দুহিতা হযরত ফাতিমা(রা) এর জন্যও দাঁড়িয়েছেন। এই দাঁড়ান নিষিদ্ধ নয়। বরং নিষিদ্ধ হচ্ছে সেই দাঁড়ানো, যে সম্পর্কে রাসূলে করীম(স) বলেছেনঃ আরবী(********)

-যে লোক পছন্দ করবে যে লোকেরা তার প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য দাঁড়াক, সে যেন তার আসন জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।

কোনো প্রকৃত ঈমানদারই তা পছন্দ করতে এবং দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান দেখালে নিশ্চয়ই খুশি হতে পারেনা। অতএব কোনো নেতা বা ব্যক্তি খুশি হবে-এ জন্য দাঁড়ানো সম্পূর্ণ হারাম।

এ বিস্তারিত আলোচনার দৃষ্টিতে বর্তমানে প্রচলিত আনুষ্ঠানিক মিলাদ মাহফিল এবং প্রতি বছর অতীব ধুম-ধামের সহিত ১২ই রবিউল আওয়ালের ‘ফাতিহা-ই-দোয়াজদহম’ নামের অনুষ্ঠান জাতীয় উৎসবরূপে পালন করা যে সুস্পষ্ট বিদয়াত, তাতে কোনোই সন্দেহ থাকতে পারেনা। সাহাবী, তাবেয়ীন ও তাবে তাবেয়ীন এর যুগে এর কোনো একটিরও কোনো দৃষ্টান্ত দেখানো যেতে পারেনা। কুরআন হাদীস থেকেও এর অনুকূলে কোনো দলীল পেশ করা সম্ভব নয়। কাজেই এসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আল্লাহর কোনো সওয়াব পাওয়ার আশা করাও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এগুলোকে জাতীয় অনুষ্ঠানরূপে গ্রহণ করে জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পালন করার, পালন করে রাসূলের প্রতি একটা বড় দায়িত্ব পালন করা হলো বলে আত্মশ্লাঘা লাভ করা কিংবা এসবের মাধ্যমে নিজেদেরকে রাসূলের বড় অনুসারীরূপে জাহির করে জনগণকে ধোঁকা দেয়া শুধু বিদয়াতই নয়, বিদয়াত অপেক্ষাও অধিক বড় ধৃষ্টতা, সন্দেহ নেই।

কদমবুসির বিদয়াত

বর্তমানকালের পীর ও আলিমদের দরবারে কদমবুসির বড় ছড়াছড়ি দেখা যায়। মুরীদ হলেই পীরের কদমবুসি করতে হয়, মাদ্রাসার ছাত্র হলেই ওস্তাদ হুযুরের কদমবুসি করতে বাধ্য। তা না করলে না মুরীদ ফায়েজ পেতে পারে পীরের, না ছাত্র ওস্তাদের কাছ হতে লাভ করতে পারে ইলম। বরং উভয় দরবারেই সে বেয়াদব বলে দোষী সাব্যস্ত হয় এবং সঙ্গে সঙ্গেই ‘বড় কুরআনের (?) দলীল পেশ করে বলা হয়ঃ আরবী(*******)

-বেয়াদব লোক আল্লাহর অনুগ্রহ হতে বঞ্চিত হয়ে যায়।

কদমবুসি করলে আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হয় কিনা- তা আল্লাহই জানেন। কিন্তু এ ধরনের মুরীদ আর ছাত্র যে পীর ও ওস্তাদের স্নেহ দৃষ্টি থেকে মাহরুম হয়ে যায় তা বাস্তব সত্য। কিন্তু প্রশ্ন এই যে, এই কদমবুসি করা কি সত্যই শরীয়ত মোতাবিক কাজ? এ জিনিস মুসলিম সমাজে কোথ্থেকে এসে প্রবেশ করলো? এর ফলাফলই বা কি?

সাহাবায়ে কিরামের সামনে নবী করীম(স) এর যে সম্মান ও মর্যাদা এবং নবী করীম(স) কে সাহাবায়ে কিরাম যতদূর ভক্তি শ্রদ্ধা করতেন, তার তুলনা অন্য কোথাও হতে পারেনা এবং সেই রকম সম্মান শ্রদ্ধা অন্য কাউকেই কেউ দিতে পারেনা। কিন্তু সেই সাহাবীগণ বাহ্যত নবী করীমের প্রতি কিরূপ সম্মান দেখাতেন? এ পর্যায়ে হাদীসে শুধু এতটুকুরই উল্লেখ পাওয়া যায় যে, সাহাবীদের কেউ কেউ নবী করীমের হাতে ও কপালে হালকা ভাবে চুমু দিয়েছেন। এই চুমু’য় ভক্তির চাইতে ভালোবাসাই প্রকাশ পেতো সমধিক। তাঁদের কেউ কোনোদিন রাসূলে করীমের পা হাত দিয়ে স্পর্শ করে সে হাত দ্বারা মুখমন্ডল মুছে দেয়ার যে কদমবুসি, তা করেছেন বলে কোনো উল্লেখযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যাবেনা হাদীসের বা জীবন চরিতের কিতাবে।

এ পর্যায়ে হাদীসে শুধু এতটুকুই উল্লেখ পাওয়া যায় যে, কোনো কোনো সাহাবী ভালোবাসার আতিশয্যে কখনো কখনো নবী করীম(স) এর হাত পা চুম্বন করেছেন। কিন্তু নির্বিশেষে সব সাহাবীর মধ্যে এ জিনিসের কোনো প্রচলন ছিলনা। তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীন এর যুগেও মুসলিম সমাজে এর কোনো রেওয়াজ দেখা যায়নি। এ কদমবুসির কোনো নাম নিশানাই পাওয়া যায়না ইসলামের এ সোনালী যুগের ইতিহাসে। তাহলে এ কাজটি যে ইজমা ও মুতাওয়াতির ঐতিহ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত তা অনস্বীকার্য্।

তা ছাড়া ইসলামী শরীয়তের একটি মূলনীতি হলো, কোনো মুবাহ বা সুন্নাত মোতাবিক কাজও যদি আকীদা বা আমলের ক্ষেত্রে খারাবী পয়দার কারণ হয়ে পড়ে, তাহলে তা করার পরিবর্তে বরং না করাই ওয়াজিব। এ কারণেই হযরত ওমর ফারূক(রা) সে গাছটি কেটে ফেলেছিলেন, যার পাদদেশে বসে নবী করীম(স) ঐতিহাসিক ‘বায়’আতে রেজওয়ান’ গ্রহণ করেছিলেন। কেননা তাঁর সময়কার লোকেরা এ গাছের নিকট সমবেত হওয়াকে সুন্নাতী কাজ বলে মনে করতো এবং তার নিকট রীতিমত হাজিরা দেওয়াকে একান্ত জরুরী ও সওয়াবের কাজ বলে মনে করতে শুরু করেছিল। অথচ এ জামানা ছিল ইসলামের উজ্জ্বলতম যুগ। এ জন্যে ইলমে ফিকহর মূলনীতি দাঁড়িয়েছেঃ যে মুবাহ কাজ ওয়াজিবের পর্যায়ে পৌছে যায়, তা করা মাকরূহ।

তা ছাড়া কদমবুসি করার সময় মানুষ ঠিক সে অবস্থায় পৌছে যায় , যে অবস্থায় পৌছে নামাযের রুকু ও সেজদার সময়ে, আর ইচ্ছে করে কারো জন্য এরূপ করা সম্পূর্ণ নাজায়েয।

কাযী ইয়াজ লিখেছেনঃ (আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে)সেজদা করা যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি রুকূর ধরনে কারো সামনে মাথা নত করাও নিষিদ্ধ।

আল মুজাদ্দিদে আল ফেসানী(রহ) লিখেছেনঃ কারো সামনে মাথা নত করা কূফরীর কাছাকাছি।

আর ফিকাহবিদদের মত হলোঃ রাজা বাদশাহ বা অন্য কারো জন্য মাথা নোয়ানো মাকরূহ। আর মাকরূহ মানে মাকরূহ তাহরীম।

এ সব কথা থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো যে, পীর, ওস্তাদ বা অন্য কোনো মুরুব্বী- তিনি যেই হোননা কেন, তার যে কদমবুসি করতে হবে ইসলামী শরীয়তে তার কোনো নিয়ম নেই। আর এ কাজ রাসূলে করীমের সুন্নাতের সম্পূর্ণ পরিপন্থী-অতি বড় বিদয়াত।

কদমবুসি সম্পর্কে আর একটি কথা হলো, এর রেওয়াজ কেবল পাক ভারতের আলিম ও পীরের দরবারেই দেখা যায়। অন্যান্য মুসলিম সমাজে এর নাম নিশানাও নেই। এ কারণে এ কথা সহজেই মনে করা যেতে পারে যে, কদমবুসির এ কাজটি এতদ্দেশীয় হিন্দু সমাজ থেকে মুসলিম সমাজে এসে তা মুসলমানী রূপ পরিগ্রহ করেছে। মুসলিম সমাজের বর্তমান কদমবুসি ছিল আসলে ‘ব্রাক্ষ্মণের পদপ্রান্তে প্রণিপাত’। এখনো তা দেখা যায় এখানে সেখানে। যজমান ব্রাক্ষ্মণের সামনে আসলেই ব্রাক্ষ্মণ তার বাঁ পায়ের বুড়ো অঙ্গুলী উঁচু করে ধরবে, আর যজমান তার কপাল সে অঙ্গুলির অগ্রভাগে স্থাপন করবে। অতঃপর যখন ইচ্ছা ব্রাক্ষ্মণ তার পা টেনে নেবে। ব্রাক্ষ্মণ্য ধর্মে এ রীতি আদিম। কেননা ব্রাক্ষ্মণ্য ধর্ম দর্শনে ব্রাক্ষ্মণরাই মানুষ আর অন্যান্যরা ব্রাক্ষ্মণের দাসানুদাস। অতএব ব্রাক্ষ্মণের পদপ্রান্তে প্রণিপাত করাই তাদের কর্তব্য।

পরবর্তীকালে এ দেশের হিন্দুরা মুসলমান হয়ে এ হিন্দুয়ানী ব্রাক্ষ্মণ্য প্রথাকেই- এ ‘পদপ্রান্তে প্রণিপাতকে’ই ‘মুসলমান’ বানিয়ে কদমবুসিতে পরিণত করে দিয়েছে। এক কথায় সম্পূর্ণ হিন্দুয়ানী ব্রাক্ষ্মণ্য প্রথাকে মুসলিম সমাজে-বিশেষ করে পীর সাহেবান ও আলিম ওস্তাদ সাহেবানের দরবারে বড় সওয়াবের কাজ হিসেবে চালু করে দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু এর কুফল, যা মুসলিম সমাজে প্রতিফলিত হয়েছে, তওহীদের দৃষ্টিতে তা খুবই ভয়াবহ। পীর মুরীদী আর ওস্তাদ শাগরিদীর পরিবেশে এ কদমবুসি রীতিমত শিরকী ভাবধারা বিস্তার করে দিয়েছে। মুরীদ আর ছাত্র মনে করে এ কাজ অপরিহার্য্। অন্যথায় হুজুরের নেক নজর পাওয়া যাবেনা, হুজুর খুশি হবেননা। দ্বিতীয়ত, হুজুর তো এমন উঁচু মর্যাদার যে, তিনি যা-ই বলবেন, অথবা যাতে তাঁর দিল খুশি হবে, তাই করা তাঁর কর্তব্য। তার উপর টু শব্দ করাও চরম বেয়াদবী। আর তাতে আল্লাহ বেজার হবেন। অথচ ইসলামের তওহিদী আকীদায় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে আল্লাহর এবং বাস্তব আমলের ক্ষেত্রে রাসূল(স) ছাড়া এ মর্যাদা আর কারোই হতে পারেনা।

অপরদিকে ‘হযরত পীর কেবলা’ ও ওস্তাদ হুযুরের মনে এ বাসনা স্পষ্টত মনে থাকে- তারা তো ফেরেশতা নয়, মানুষই-যে, মুরীদ বা ছাত্র আমার কদমবুসি করবেই। অনেক হুজুরকে এমনভাবে প্রস্তুত হয়েই আসন গ্রহণ করতে দেখা যায় যে, মুরীদ বা ছাত্রের পক্ষে পায়ে হাত দিতে যেন কোনো অসুবিধা না হয়। বরং অনায়াসেই যেন একাজ সম্পাদিত হতে পারে। তাই বলে তাঁরা মুখে কাউকে কদমবুসি করতে বলেন, এমন নয়; বরং তাঁরা নিষেধই করে থাকেন। আর সে নিষেধ বাণীটা উচ্চারিত হয় কদমবুসির কাজটা যথারীতি সম্পন্ন হয়ে যাবার পর, তার আগে নয়। আর সে নিষেধও ঠিক আদেশেরই অনুরূপ।

সবচেয়ে বড় কথা, কদমবুসির যে রূপটি তা সেজদার মতোই। আল্লামা শামী তাঁর সময়কার অবস্থা অনুযায়ী এ ধরনের কাজকে ‘সেজদা’ বলেই অভিহিত করেছেন।

তিনি লিখেছেনঃ এমনিভাবে লোকেরা যে আলিম ও বড় লোকদের জমিনবুসি করে, এ কাজ সম্পূর্ণ হারাম। আর যে একাজ করে এবং যে তাতে রাজি থাকে- খুশি হয়, উভয়ই গোনাহগার হয়। কেননা একাজ ঠিক মূর্তি পূজা সদৃশ্য।

দেওবন্দের মুফতী মাওলানা রশীদ আহমাদ লুধিয়ানভী-ও এরূপই ফতোয়া দিয়েছেন। (আহসানুল ফতোয়া দ্রষ্টব্য)।

বস্তুত কুরআন হাদীসে কদমবুসির কোনো উল্লেখ নেই, ইসলামী তাহযীব ও তমদ্দুনের ক্ষেত্রে এর কোনো স্থান নেই। এর পরিবর্তে কুরআন-হাদীসে সালাম দেয়ার ও মুসাফাহা করার উল্লেখ এবং সুস্পষ্ট নির্দেশ পাওয়া যায়।

কুরআন মজীদে সালাম সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ

وَإِذَا حُيِّيتُم بِتَحِيَّةٍ فَحَيُّوا بِأَحْسَنَ مِنْهَا أَوْ رُدُّوهَا ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ حَسِيبًا [٤:٨٦]

- তোমাদেরকে যখন কোনো প্রকার সম্ভাষণে সম্ভাষিত করা হবে, তখন তোমরা তার অপেক্ষা উত্তম সম্ভাষণে সম্ভাষিত করো অথবা ততোটুকুই ফিরিয়ে দাও। মনে রেখো, আল্লাহ সর্ব বিষয়ে নিশ্চিত হিসাব গ্রহণকারী। (আন নিসাঃ৪৬)

এ থেকে সুস্পষ্ট বোঝা গেল, মুসলমানদের পরস্পরের যখন দেখা সাক্ষাত হবে, তখন পরস্পরের সম্ভাষণের আদান প্রদান করবে। এ সম্ভাষণ মৌখিক হতে হবে এবং এ সম্ভাষণের ব্যাপারে পরস্পরে ঐকান্তিক নিষ্ঠা পোষণ করতে হবে এবং কোনোরূপ কৃপণতা পোষণ করা চলবেনা। বরং প্রত্যেককে অপরের তুলনায় উত্তম সম্ভাষণ দানে প্রস্তুত থাকতে হবে অকুন্ঠিতভাবে। আয়াতের শেষ অংশ এ সম্ভাষণের গুরুত্ব এবং তা যথারীতি আদান প্রদানের জন্য সতর্কতা অবলম্বন করার নির্দেশ দিচ্ছে।

হাদীসে নবী করীম(স) বারবার নানাভাবে পারস্পরিক সালাম আদান প্রদানের জন্য তাগিদ দিয়েছেন। হযরত আবু হুরায়রা(রা) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম(স) ইরশাদ করেছেনঃ

আরবী(********)

-আমার প্রাণ যে আল্লাহর মুষ্টিবদ্ধ তাঁর কসম করে বলছিঃ তোমরা জান্নাতে যেতে পারবেনা, যতক্ষণ না  তোমরা ঈমান আনবে, আর তোমরা ঈমান আনতে পারবেনা যতক্ষণ না তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসবে। অতঃপর বললেনঃ আমি কি তোমাদের এমন একটা কাজের পথ দেখাব, যা করলে তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসতে পারবে? তা হলো এই যে, তোমরা তোমাদের পরস্পরের মাঝে সালাম দেয়ার প্রচলনকে চালু করবে।

নবী করীম(স) হিজরত করে মদীনায় উপস্থিত হলে মদীনার মুসলমানগণে তাঁকে সাদর সম্বর্ধনা জানিয়েছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম এ সম্বর্ধনার বিবরণ দান প্রসঙ্গে বলেছেনঃ আরবী(************)

-নবী করীম(স) যখন মদীনায় উপস্থিত হলেন, তখন জনগণ তাকে সম্বর্ধনা করার উদ্দেশ্যে দ্রুততা সহকারে এগিয়ে এল। যারা এই সময় সামনে এগিয়ে গিয়েছিল, আমিও তাদের মধ্যে একজন। …এই সময় আমি যে কথা তাঁকে যে কথা সর্বপ্রথম বলতে শুনেছিলাম তা হলোঃ তোমরা পরস্পরের প্রতি সালাম আদান প্রদান করো।

কুরআনের আয়াত থেকে পারস্পরিক সম্ভাষণের যে হেদায়াত পাওয়া যায়, সে সম্ভাষণ যে কি এবং কিভাবে, কি কথা দিয়ে তা করতে হবে, তার সঠিক সুস্পষ্ট নির্দেশ পাওয়া যায় এ হাদীস থেকে। অতএব নতুন সাক্ষাতকালে একজন মুসলমানের অপর মুসলমানের প্রতি প্রথম জরুরী কর্তব্য হচ্ছে সালাম দেয়া, বলা আসসালামু আলাইকুম। আর অপর পক্ষ জবাবে বলবেঃ ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। বুখারী শরীফের একটি হাদীস থেকে জানা যায়, হযরত আদম(আ) সৃষ্ট হওয়ার পরই আল্লাহর নির্দেশক্রমে ফেরেশতাদের সাথে এই সালামের আদান প্রদান করেছিলেন।

শেষোক্ত হাদীস থেকে একজন নবাগত মহাসম্মানিত মেহমানকে সম্বর্ধনা জানাবার সঠিক নিয়ম সম্পর্কে সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ জানতে পারা যায়। এই পর্যায়ে অপর হাদীস থেকে জানা যায়, এ সালাম করার সময় কি ধরনের আচরণ অবলম্বন করা উচিত এবং কি ধরনের অনুচিত।

এই পর্যায়ে যত হাদীসই বর্ণিত হয়েছে, তা সব সামনে রেখে চিন্তা করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ‘সালাম’ মুখে উচ্চারণ করার-কথার মাধ্যমে বলে দেবার ব্যাপার। এজন্যে কোনোরূপ অঙ্গভঙ্গি করা জরুরী নয়, তা হাদীস থেকেও প্রমাণিত নয়।

দ্বিতীয় যে কাজ নবাগত মুসলিমের সাথে করার কথা হাদীস থেকে সুন্নাত বলে প্রমাণিত, তা হলো মুসাফাহা করা। বুখারীর একটি হাদীস থেকে জানা যায়, হযরত কাব ইবনে মালিক(রা) বলেনঃ আরবী(******)

-আমি মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলাম। হঠাৎ দেখতে পেলাম সেখানে নবী করীম(স) রয়েছেন। আমাকে দেখেই তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ দাঁড়িয়ে আমার দিকে দ্রুত এগিয়ে আসলেন। আমার সাথে মুসাফাহা করলেন এবং আমাকে সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে গেলেন।

বুখারীর অপর হাদীস থেকে জানা যায়, তাবেয়ী কাতাদাহ হযরত আনাস(রা) কে জিজ্ঞেস করলেনঃ আরবী(********)

-নবী করীমের(স) সাহাবীদের পরস্পর মুসাফাহা করার রীতি বহুল প্রচলিত ছিল কি? হযরত আনাস(রা) জবাবে বললেন, হ্যা, তা চালু ছিল।

আবদুল্লাহ হিশাম বলেন, আমরা নবী করীমের সঙ্গে ছিলাম। আর তিনি হযরত উমরের হাত ধরে ছিলেন।

এ পর্যায়ের হাদীস থেকে নবাগতের সাথে সালামের পর মুসাফাহার সুস্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় এবং তা রাসূলে করীম(স) এর সাহাবীদের সমাজে পুরা মাত্রায় চালু ছিল বলে অকাট্যভাবে জানা যায়।

এই সম্পর্কে তিরমিযী শরীফে বর্ণিত একটি হাদীস সর্বাধিক স্পষ্টভাষী। হযরত আনাস ইবনে মালিক(রা) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলে করীম(স) কে জিজ্ঞেস করলেনঃ আরবী(*******)

-ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমাদের একজন তার ভাই বা বন্ধুর সাথে যখন সাক্ষাত করে, তখন কি সে তার জন্য মাথা নুইয়ে দিবে? রাসূল(স) বললেনঃ না। জিজ্ঞেস করলো, তবে কি তাকে জড়িয়ে ধরবে ও তার মুখমন্ডলে চুমু খাবে? রাসূল(স) বললেনঃ না। জিজ্ঞেস করলোঃ তবে কি তার হাত ধরে মুসাফাহা করবে? রাসূল(স) বললেনঃ হ্যা।

এ হাদীস সম্পর্কে ইমাম তিরমিযী বলেছেন-‘মুসাফাহা’ হাতে হাত ধরা ও পরস্পরের জন্য দো‘আ করা ‘আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের মাফ করে দিন’-বলবে।

এর ফযীলত বর্ণনা সম্পর্কে রাসূলে করীম(স) ইরশাদ করেছেনঃ আরবী(********)

-দু’জন মুসলমান পরস্পরের সাক্ষাতকালে যদি মুসাফাহা করে, তাহলে দু’খানি হাত বিচ্ছিন্ন করার আগেই সে দুজনকে ক্ষমা করে দেয়া হয়।

হাদীসে তৃতীয় যে জিনিসের উল্লেখ পাওয়া যায়, তা হচ্ছে ‘মুয়ানাকা’-কোলাকুলি। তিরমিযী শরীফে এ সম্পর্কে যে একমাত্র হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে তাহলো হযরত আয়েশা(রা) বলেনঃ

আরবী(********)

-যায়দ ইবনে হারিসা [রাসূল(স) এর পালিত পুত্র] মদীনায় উপস্থিত হলো। তখন নবী করীম(স) আমার ঘরে এলেন। যায়দ তাঁর সাথে দেখা করার জন্য এলো এবং দরজায় ধাক্কা দিলো। নবী করীম(স) তার কাছে উঠে গেলেন এবং তিনি তার সাথে গলাগলি করলেন, একজন আরেকজন এর গলা জড়িয়ে ধরলেন এবং তাকে স্নেহের চুম্বন দিলেন।

এ পর্যায়ে আরো কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করে আল্লামা আহমাদুল বান্না লিখেছেনঃ এসব হাদীস প্রমাণ করে যে, মুয়ানাকা(গলাগলি বা কোলাকুলি)শরীয়তে জায়েয। বিশেষ করে যে আসবে তার সাথে।

নবী করীম(স) এর সাহাবীদের তরীকা ছিলো এই যে, যখন তাঁরা পরস্পরের সাথে দেখা করতেন, পরস্পরের মুসাফাহা করতেন। আর যখন বিদেশ সফর করে ফিরে আসতেন, তখন তাঁরা পরস্পরে গলাগলি করতেন।

এ আলোচনা থেকে জানা গেল, ইসলামের সুন্নাত হচ্ছে এই যে, দু’জন মুসলমান যখন পরস্পর সাক্ষাত করবে তখন সালাম করবে, মুসাফাহা করবে এবং গলাগলিও করবে-বিশেষ করে বিদেশাগত ব্যক্তির সাথে। এসব কয়টি কথাই সুস্পষ্ট হাদীস থেকে প্রমাণিত। রাসূলে করীম(স) তাই করেছেন, সাহাবাদের সমাজে এই ছিল স্থায়ী রীতি, বস্তুত এই হচ্ছে সুন্নাত। কিন্তু এই কদমবুসি এল কোথ্থেকে? কে কদমবুসি করতে বলেছে? কে তা রেওয়াজ করেছে ইসলামী সমাজে? কুরআন নয়, হাদীস নয়, রাসূল নয়, রাসূলের গড়া সমাজ নয়। অতএব এটি বিদয়াত ও মুশরিকী রীতি হওয়ার কোনোই সন্দেহ নেই। অথচ আমাদের সমাজের তথাকথিত পীরবাদি আহলে সুন্নাত(?) দের সমাজে কদমবুসি একটি অপরিহার্য্ রীতি। আর তা হবেই না বা কেন? এখানে ইসলাম ও সুন্নাত কুরআন, হাদীস, রাসূল ও সাহাবাদের আমল থেকে গ্রহণ করা হয়না, গ্রহণ করা হয় মরহুম বা বর্তমান পীর সাহেবানদের কাছ থেকে। আর এ ধরনের পীর মুরীদী যেহেতু বেদান্তবাদী ব্রাক্ষ্মণ্যবাদী থেকে গৃহীত, তাই কদমবুসির ব্রাক্ষ্মণ্য রীতিও এখানে চালু হতে বাধ্য। কেউ যদি বলেন যে, ওস্তাদ, পীর ও মুরুব্বীদের তাজীম করার জন্যই এ রীতি চালু করা হয়েছে, তাহলে বলবো-ওস্তাদ, পীর ও মুরুব্বীদের তাজীমের তরীকা সুন্নাত থেকে যা প্রমাণিত তাই দিয়ে তাজীম করতে হবে। নিজেদের মনগড়া একটা রীতিকে চালু করার বিশেষ করে তাতে যদি শরীয়তের দৃষ্টিতে ভয়ানক খারাবী থাকে-কারো অধিকার থাকতে পারেনা। করলে তাই তো হবে বিদয়াত। যারা চলতি প্রথার দোহাই দিয়ে শরীয়তের বাইরের জিনিসকে শরীয়তসম্মত বলে চালু করতে চাইবে, তারাইতো বিদয়াতী। আল্লাহ এই বিদয়াতীদের প্রভাব থেকে বাঁচান ঈমানদার ও তওহীদবাদী মুসলিম সমাজকে।

কদমবুসি পর্যায়ে আলোচনার শেষভাগে একটি কথার উল্লেখ করে তার জবাব না দিলে এ দীর্ঘ আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কোনো কোনো পীরের অনুমোদনক্রমে প্রকাশিত তাসাউফ সংক্রান্ত কদমবুসি- বিশেষ করে পীর ওস্তাদের কদমবুসি-করা জায়েয বলে ফতোয়া দেয়া হয়েছে। এ ফতোয়ার দলীল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে দুটো হাদীস। একটি হাদীস তিরমিযী থেকে, অপরটি আবু দাঊদ থেকে। প্রথম হাদীসটিতে দু’জন ইয়াহুদীর কথা বলা হয়েছেঃ তারা রাসূলে করীমের নিকট দ্বীন ইসলামের ব্যাখ্যা শ্রবণ করে। অতঃপর তারা রাসূলে করীমের দু’হাত ও দু’পা চুম্বন করলো এবং বললোঃ আমরা স্বাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি নবী।

এ সম্পর্কে আমাদের প্রথম কথা হলো, ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে উত্তম বিশুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করেছেন বটে, কিন্তু ইমাম নাসায়ী হাদীস সম্পর্কে বলেছেন-অগ্রাহ্য হাদীস। আর মুনযেরী বলেছেন, হাদীসটি আবদুল্লাহ ইবনে সালেমার কারণেই যয়ীফ। কেননা হাদীস বর্ণনাকারী হিসেবে তাঁর দোষ বের করা হয়েছে। তাছাড়া হাদীসের সুস্পষ্ট কথা হলো-হাত ও পা চু্ম্বনের কাজটি দু’জন ইয়াহুদী করেছে। ইয়াহুদীদের কাজ মুসলমানদের জন্য অনুসরণীয় হতে পারেনা। আবু দাউদ বর্ণিত অপর হাদীসে ঊমামাত ইবনে শরীক(রা) এর কথা উদ্ধৃত হয়েছেঃ আরবী(******)

-আবু দাউদে উদ্ধৃত হাদীসে রাসূলে করীম(স) এর হাত বা পা নয়, কটিদেশ চুম্বনের কথা বলা হয়েছে। (হযরত উসাইদ ইবনে উজাইর(রা) হতে হাদীসটি বর্ণিত। একজন আনসারের কথায় রাসূলে করীম(স) তাঁর পরিহিত জামা পিছনের দিক দিয়ে তুলে ধরলে তিনি তাঁকে আলিঙ্গন করলেন এবং তার কটিদেশে চুম্বন করতে লাগলেন।)

দ্বিতীয় কথা, এ পর্যায়ের সব কটি হাদীসকে একত্রিত করে বিচার করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, এসবের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় সব হাদীসে একই রকম নয়। কোনোটিতে শুধু দু’হাত চুম্বনের কথা বলা হয়েছে, কোনোটিতে এক হাত, এক পা চুম্বনের কথা বলা হয়েছে। এমন কি হযরত ইবনে উমর(রা) হতে বর্ণিত হাদীসে শুধু হাত চুম্বনের কথা উল্লিখিত হয়েছে। বলা হয়েছেঃ আরবী(*******)

-অতঃপর আমরা তাঁর হাত চুম্বন করলাম। তিনি বললেনঃ এবং আবু লুকাবা ও কাব ইবনে মালিক এবং তাঁর দু’জন সঙ্গীও নবী করীম(স) এর হাত চুম্বন করলেন, যখন আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করলেন। এ কথা আবরাহীও উল্লেখ করেছেন।

ইবনে উমার বর্ণিত এ হাদীসটি ইমাম বুখারী ‘আদাবুল মুফরাদ’ নামক কিতাবে উল্লেখ করেছেন। হযরত বুরাইদা ইবনে বর্ণিত একটি হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে, জনৈক বুদ্ধু লোক রাসূলের মস্তক ও দু’পা চুম্বনের অনুমতি প্রার্থনা করলে রাসূলে করীম(স) তাকে অনুমতি দেন। আবদুর রহমান ইবনে রুজাইন বলেছেন, সালেমা ইবনুল আকওয়া তাঁর উটের হাতের মতো হাত বের করলেন, আমরা তা চুম্বন করলাম। সাবিত হতে বর্ণিত, তিনি হযরত আনাসের হাত চুম্বন করলেন। আর হযরত ‘আলী নাকি’ হযরত আব্বাসের হাত ও পা চুম্বন করেছিলেন।

এভাবে বর্ণিত হাদীসসমূহ হতে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়না। মূলত হাত পা দু’টোই চুম্বন করার কথা ঠিক, না শুধু হাত চুম্বনের কথাই ঠিক। কাজেই এসব হাদীসের ভিত্তিতে কদমবুসি করা জায়েয কিছুতেই বলা যায়না। আবু মালিক আল আশযায়ী বলেনঃ আমি আবু আওফ(রা) কে বললাম, আপনি যে হাত দিয়ে রাসূলের বায়’আত করেছেন, তা বের করুন। তিনি সে হাত বের করেন। অতঃপর আমরা তা চুম্বন করি।

এ ধরনের হাদীস হতে কোনো আবিদ জাহিদ ব্যক্তির হাত ভক্তিভরে চুম্বন করা জায়েয প্রমাণিত হয় বটে; কিন্তু কদমবুসি প্রমাণিত হয়না। ইমাম নববীও এ মত প্রকাশ করেছেন।

আরো কথা হলো, কোনো নওমুসলিম যদি ভক্তি শ্রদ্ধায় ভারাক্রান্ত হয়ে রাসূলে করীমের হাত ও পা উভয়ই চুম্বন করে থাকেন, তবে তার ভিত্তিতে আজকের পীর ওস্তাদেরা ভক্ত মুরীদ ও ছাত্রদের দ্বারা নিজেদের হাত পা চুম্বন করাতে পারেননা। তাঁরা কি নিজেদের রাসূলের মর্যাদাভিষিক্ত মনে করে নিয়েছেন?

বস্তুত কদমবুসির বর্তমান রেওয়াজ রাসূলের সুন্নাতের বিপরীত; মানবতার পক্ষে চরম অবমাননাকর। অনতিবিলম্বে এ প্রথা বন্ধ হওয়া বাঞ্চনীয়।

 

সমাজে নারীদের প্রাধান্যও বিদয়াত

ইসলামী সমাজে নারীর মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত, কুরআন দ্বারা ঘোষিত এবং রাসূলে করীম(স) দ্বারা বাস্তবায়িত। তাতে নারীদের নারী হিসেবে মর্যাদা ও অধিকার পুরোপুরি স্বীকৃত। কিন্তু নারীদের মর্যাদা পুরুষের ওপরে নয়, নীচে-প্রথম নয়, দ্বিতীয়- নিরংকুশ নয়, শর্তাধীন।

এ পর্যায়ে কুরআনের ঘোষণাঃ

الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ ۚ

–পুরুষগণ নারীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ কতক মানুষকে অপর কতক মানুষের ওপর অধিক মর্যাদা দিয়েছেন এই নিয়মের ভিত্তিতে এবং এজন্যও যে, পুরুষরাই তাদের ধন সম্পদ নারীদের জন্য ব্যয় করে।(আন নিসাঃ৩৪)।

নারীদের তুলনায় পুরুষদের মর্যাদা অধিক হওয়ার একটি কারণ স্বাভাবিক গুণ-বৈশিষ্ট্য-বিশেষত্ত্ব। আর দ্বিতীয়, পরিবার পরিচালনা ও আর্থিক প্রয়োজন পূরণের জন্য নারীদের তুলনায় পুরুষরাই দায়ী-তারাই তা করে থাকে। এটাই পারিবারিক জীবনে ক্ষুদ্র সংকীর্ণ পরিসরে এবং বৃহত্তর সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সুষ্ঠুতা ও শৃঙ্খলা বিধানের জন্য কার্য্কর নিয়ম। এর ব্যতিক্রম হলে সামাজিক শৃঙ্খলা চূর্ণ-বিচূর্ণ হতে বাধ্য। তাই রাসূলে করীম(স) বলেছেনঃ আরবী(********)

-আমার পরে আমার উম্মতের জন্য সর্বাধিক ক্ষতিকর ফিতনা পুরুষদের ওপর আসতে পারে নারীদের প্রাধান্যের কারণে।

নারী প্রাধান্যের কারণেই বহু সমাজ ও রাষ্ট্র বিপর্য্স্ত হয়েছে; ইতিহাসই তার অকাট্য প্রমাণ।

হযরত আবু বকর(রা) নবী করীম(স) এর এ কথাটি বর্ণনা করেছেনঃ যে জনসমষ্টি তাদের সামষ্টিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ও কর্তৃত্ব কোনো নারীকে অর্পণ করবে, তারা কখনোই কোনো কল্যাণ লাভ করতে পারবেনা।

আরও বর্ণিত হয়েছেঃ আরবী(***********)

-পুরুষই যখন নারীদের আনুগত্য করতে থাকে, মনে করো তখনই পুরুষরা ধ্বংসের মধ্যে পড়ে গেছে।

এ কথার সত্যতা যেমন বর্তমান পাশ্চাত্য সমাজের অবস্থা প্রমাণ করে, তেমনি আমাদের এতদ্দেশীয় সমাজ ও পরিবারে অবস্থা থেকেও তার সত্যতা প্রমাণিত হয়। নারীকে যদি নৌকার হাল ধরতে দেয়া হয়, ড্রাইভারকে বসিয়ে যে ড্রাইভিং জানেনা বা যোগ্যতা নেই তাকে মোটর চালনা করতে দিয়ে যে অবস্থা দেখা দেয়, স্বাভাবিক নারী প্রাধান্যের পরিণতিও তা-ই হবে। এটা সুন্নাতে রাসূলের পরিপন্থী। (এটাই সাধারণ সত্য। ব্যতিক্রম থাকা অসম্ভব নয়)।

 

পোশাক পরিচ্ছদ এর বিদয়াত

আমাদের দেশে বর্তমানে ‘সুন্নাতী লেবাস’ বলে এক ধরনের বিশেষ কাটিং ও বিশেষ পরিমাণের লম্বা কোর্তা পরিধান করা হচ্ছে। প্রচার করা হচ্ছে যে, এই হচ্ছে সুন্নাতী পোষাক। আর এ সুন্নাতী পোষাক যে না পরবে সে ফাসিক বলে বিবেচিত হবে এবং এমন লোক যদি আলিম হয়, তাহলে তার পিছনে নামায পড়া জায়েয হবেনা। এ কারণে সমাজের এক বিশেষ শ্রেণীর লোক-আলিম ও পীরগণ এ ধরনের কোর্তা পরাকেই সুন্নাত মনে করেন, ‘সুন্নাতী পোশাক’ বলেই তারা এর প্রচারও করেন। শুধু নিজেরাই তা পরিধান করেননা, তাঁদের ছাত্র ও মুরীদানকেও অনুরূপ কাটিং ও লম্বা মাপের কল্লিদার কোর্তা পরিধান করতে বাধ্য করে থাকেন।

কিন্তু প্রশ্ন এই যে, সুন্নাতী পোশাক বলতে কি বোঝায়, কোনো বিশেষ কাটিং বা বিশেষ লম্বা মাপের জামা পরা কি সত্যিই সুন্নাত? সে সুন্নাত কোন দলীলের ভিত্তিতে প্রমাণিত হলো? কুরআন থেকে? হাদীস থেকে? কুরআন ও হাদীসের আলোকে আমরা বিষয়টিকে বুঝতে চেষ্টা করবো।

পোশাক কি রকম হতে হবে সে সম্পর্কে কুরআন মজীদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আয়াত হলো এই।

يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا ۖ وَلِبَاسُ التَّقْوَىٰ ذَٰلِكَ خَيْرٌ ۚ ذَٰلِكَ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ لَعَلَّهُمْ يَذَّكَّرُونَ [٧:٢٦]

-হে আদম সন্তান! নিশ্চয়ই আমরা তোমাদের জন্য এমন পোশাক(পরিধানের বিধান)নাযিল করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থানকে ঢেকে রাখবে এবং যা হবে ভূষণ। আর তাকওয়ার পোশাক, তা-ই কল্যাণময়। এ হচ্ছে আল্লাহর আয়াতসমূহের অন্যতম; এবং বলা হচ্ছে এই আশায় যে, তারা নসীহত কবুল করবে।(আল আরাফঃ২৬)

এ আয়াত থেকে কয়েকটি মৌলিক কথা জানতে পারা যায়। প্রথম এই যে, পোশাক মানুষের জন্য আল্লাহ তা‘আলার এক বিশেষ দান। অতএব পোশাক সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সে পোশাক কি রকমের হতে হবে; সে বিষয়ে এ আয়াত থেকে দু’টো কথা জানতে পারা যায়।

একটি হলো, পোশাক এমন হতে হবে যা অবশ্যই মানুষের লজ্জাস্থানকে আবৃত করে রাখবে। যে পোশাক মানুষের লজ্জাস্থানকে আবৃত করেনা, তা মানুষের পোশাক হতে পারেনা। আর দ্বিতীয় কথা হলো, সে পোশাককে ‘ভূষণ’ হতে হবে।(رِيش শব্দের মানে হলো উজ্জ্বল্য, চাকচিক্য, শোভাবর্ধক। আভিধানিকদের মতে رِيش শব্দের আসল অর্থ হলো পাখির পালক যা চাকচিক্যময় ও শোভাবর্ধক হয়ে থাকে। আর মানুষের পোশাকও যেহেতু পাখির পক্ষ ও পালকের মতোই, এ কারণে মানুষের পোশাক বাহ্যত কেমন হবে তা বোঝাতে رِيش  শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।) পোশাক পরলে যেন দেখতে মানুষকে ভালো দেখায়, বদসুরত যেন না হয়, সেদিকে খেয়াল করতে হবে। বস্তুত পোশাকই মানুষের সৌন্দর্য্ বৃদ্ধি করে, পোশাকের মাধ্যমে মানুষের সৌন্দর্য্ বোধ, ভদ্রতা, শালীনতা ও রুচি-সুস্থতা প্রমাণিত হয়। আর পোশাক যদি সে রকম না হয়, তা হলে আল্লাহর দেয়া এক সুন্দর ব্যবস্থাকে অবজ্ঞা করা হবে, হবে আল্লাহর নাশোকরী।(নতুন পোশাক পরে যে দো‘আটি পড়তে রাসূলে করীম(স) বলেছেন তা হলোঃ ‘প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি আমাকে এমন পোশাক পরিয়েছেন, যা দ্বারা আমি লজ্জাস্থান আবৃত করি এবং আমার জীবনে শোভা ও সৌন্দর্য্ লাভ করি।’ এ দো‘আতে ও সেই ছতার ঢাকা এবং প্রশংসা লাভের লক্ষ্যের কথাই বলা হয়েছে, পোশাক পড়ার মূলে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নাই। এ ঠিক কুরআনের আয়াতেরই ব্যাখ্যা যেন।)

এর সঙ্গে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, ভূষণ ও শোভার ব্যাপারে মানুষের রুচি পরিবর্তনশীল এবং স্থান, কাল ও মানসিক অবস্থার দৃষ্টিতে রুচির ক্ষেত্রে অনেক পার্থক্য ও পরিবর্তন সূচিত হতে পারে। অতএব কুরআনের মতে পোশাকের ধরণ ও কাটিং পরিবর্তনশীল। কোনো ধরাবাঁধা কাটিং এর পোশাক ইসলামী পোশাক বলে অভিহিত হতে পারেনা।

এ আয়াতের তৃতীয় কথা হলোঃ তাকওয়ার লেবাস। তাকওয়ার লেবাস কাকে বলে এ বিষয়ে বিভিন্ন মত দেখা যায়। কাতাদাহ বলেছেন, ‘লেবাসুত-তাকওয়া’ বলে এখানে ঈমান বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ পূর্বোক্ত দুটি পরিচয়সহ পোশাক পরতে হবে, কিন্তু এ ব্যাপারে সর্বাধিক কল্যাণময় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ঈমানকে তাজা রাখা, সঠিকরূপে বহাল রাখা। হাসান বসরী এর মানে বলেছেনঃ লজ্জা, লজ্জাশীলতা, শালীনতা। কেননা, এই লজ্জাশীলতা ও শালীনতাই মানুষকে তাকওয়া অবলম্বন করতে উদ্বুদ্ধ করে। ইবনে আব্বাস(রা) বলেছেন- তা হলো, নেক আমল। ওসমান ইবনে আফফান(রা) বলেছেন, তা হলো নৈতিক পবিত্রতা।

আর আয়াতের মানে হলোঃ তাকওয়ার পোশাক ভালো-কল্যাণময়, যদি তা গ্রহণ করা হয় আল্লাহর সৃষ্ট পোশাক ও সৌন্দর্য্ ব্যবস্থা থেকে।

মোটকথা, পোশাককে প্রথমে লজ্জাস্থান আবরণকারী হতে হবে। এজন্যে নারী ও পুরুষের পোশাকে মৌলিকভাবে পার্থক্য হতে বাধ্য এ কারণে যে, পুরুষের লজ্জাস্থান এবং নারীদেহের লজ্জাস্থানের পরিধির দিক দিয়ে পার্থক্য রয়েছে। আর দ্বিতীয় হচ্ছে, তা অবশ্যই ভূষণ বা শোভাবর্ধক ও সৌন্দর্য্ প্রকাশক হতে হবে। যে পোশাক মানুষের আকার-আকৃতিকে কিম্ভূতকিমাকার বা বীভৎস করে দেয়, চেহারা বিকৃত করে দেয়, সে পোশাক কুরআন সমর্থিত পোশাক নয়, কোনো মুসলমানের পক্ষেই তা ব্যবহারযোগ্য হতে পারেনা।

এই পর্যায়ে কুরআন মজীদ থেকে দ্বিতীয় যে আয়াতটি উদ্ধৃত করা যায় তা হলো এইঃ

قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ

-বলো হে নবী! আল্লাহর সৌন্দর্য্- যা তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য বের করেছেন- তা কে হারাম করে দিলো? (আল আরাফঃ৩২)

‘আল্লাহর সৌন্দর্য্’ মানে মানুষের জন্য আল্লাহর সৃষ্টি করে দেয়া সৌন্দর্যের সামগ্রী, আর তা হলো্ পোশাক ও অন্যান্য সৌন্দর্যের উপাদান, সৌন্দর্য্ বৃদ্ধিকারী জিনিসপত্র। অর্থাৎ পোশাক ও সৌন্দর্য্ বৃদ্ধিকারী দ্রব্যাদি তো আল্লাহরই সৃষ্টি এবং তিনি তা সৃষ্টি করেছেন তাঁর বান্দাদের জন্য। তিনি তা ভোগ ব্যবহার করার জন্যই বানিয়েছেন, মূলগতভাবেই তা সকলের জন্য জায়েয। এ জায়েয জিনিসকে কে হারাম করে দিতে পারে? আল্লাহর সৃষ্টি জিনিসকে হারাম করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। আর তিনিই একে হালাল করে দিয়েছেন-শুধু একে হালাল-ই করে দেননি, তা গ্রহণ ও ব্যবহার করার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি এই বলেঃ

আরবী(*******)

-তোমাদের সৌন্দর্য্ বৃদ্ধিকারী জিনিস- পোশাক- তোমরা তা গ্রহণ করো প্রতি নামাযের সময়।

এ আয়াতেও সেই পোশাক গ্রহণের কথাই বলা হয়েছে যা হবে জিনাত, শোভামন্ডিত, সৌন্দর্য্ বৃদ্ধিকারী। অতএব পোশাক গ্রহণের ব্যাপারে কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী মূলগতভাবে তিনটি জিনিসের দিকেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে হবেঃ প্রথমত লজ্জাস্থান আবরণকারী, দ্বিতীয় ভূষণ, শোভাবর্ধনকারী এবং তৃতীয় সে পোশাক শালীনতাপূর্ণ হতে হবে, লজ্জাশীলতার অনুভূতির প্রতীক হতে হবে, নির্লজ্জতাব্যঞ্জক হবে না তা।

কুরআন মজীদে পোশাক সম্পর্কে যে হেদায়াত পাওয়া যায়, তা এই। এছাড়া কুরআন থেকে পোশাক পর্যায়ে আর কিছু জানা যায়না। কুরআন থেকে যা জানা গেল, তাতে কিন্তু পোশাকের কাটিং, ধরন, আকার ও পরিমাণ দৈর্ঘ্য প্রস্থ সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি।

অতঃপর দেখতে হবে, এ বিষয়ে হাদীস থেকে কি জানা যায়। সর্বপ্রথম বুখারী শরীফের ‘কিতাবুল লিবাস’ এ উদ্ধৃত হাদীস লক্ষ্যণীয়। নবী করীম(স) বলেছেনঃ আরবী(********)

-তোমরা খাও, পান করো, পোশাক পরো এবং দান-খয়রাত করো। (আর এসব কাজ করবে দুটো শর্তে) না বেহুদা খরচ করবে, না অহংকারের দরুণ করবে।

খাওয়া, পান করা, পোশাক পর এবং দান খয়রাত করা সম্পর্কে রাসূলে করীমের এ নির্দেশ। এ কাজ অবাধ ও উন্মুক্ত-কেবলমাত্র দুটো শর্তের অধীন। একটি হলো, এর কোনোটিই বেহুদা বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘনকারী হবেনা। আর দ্বিতীয় হচ্ছে অহংকারের বশবর্তী হয়ে একাজগুলো করবেনা। বাঞ্চনীয় নয় এমন এমন পরিমাণ অতিরিক্ত ব্যয় করাই হলো ‘ইসরাফ’। আর অহংকার করা, খুব বেশী দামী পোশাক এবং বাহদুরী ও বড়মানুষী প্রকাশ হয় যে পোশাকে তা নিষিদ্ধ। আর পোশাক পর্যায়ে আমাদের জন্য হেদায়াত এই যে, প্রথম বেহুদা খরচ হয় যে পোশাকে, যে ধরনের যে পরিমাপের পোশাক, তা পরিধান করা সুন্নাতের খেলাফ। পোশাককে অবশ্যই এ থেকে মুক্ত হতে হবে। আর দ্বিতীয়ত গৌরব অহংকারবশত কোনো পোশাক পরা এবং যে ধরনের, যে আকারের ও যে পরিমাপের পোশাক পরলে গৌরব-অহংকার, বড় মানুষী ও বাহাদুরী প্রকাশ পায়, যা মানুষকে সাধারণ মানুষ থেকে স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট করে দেয়, তা পরা যাবেনা। তা পরলে হবে সুন্নাতের বিপরীত কাজ। অতএব ব্যয় বাহুল্য ও অহংকার বিবর্জিত যে কোনো আকারের, প্রকারের ধরনের, কাটিং এর এবং পরিমাপের পোশাকই সুন্নাত অনুমোদিত পোশাক। সুন্নাতী লেবাস তাই, যা হবে এরূপ। হযরত ইবনে আব্বাস(রা) বলেছেনঃ আরবী(*****)

-তুমি খাও, যা-ই চাও, তুমি পরো যাই তোমার ইচ্ছা, যতক্ষণ পর্য্ন্ত দুটো জিনিস থেকে তুমি ভুলে থাকবেঃ ব্যয় বাহুল্য বেহুদা খরচ ও গর্ব অহংকার প্রকাশক বস্ত্র।

অর্থাৎ এ দুটো বিকার থেকে মুক্ত যে কোনো পোশাকই হাদীস মোতাবিক পোশাক এবং তা পরা সম্পূর্ণ জায়েয। আকার, ধরন, কাটিং ও লম্বা খাটোর ব্যাপারে হাদীস কোনো বিশেষ নির্দেশ দেয়নি, আরোপ করেনি কোনো বাধ্যবাধকতা।

বুখারী শরীফেই এরপর যে হাদীসটি উদ্ধৃত হয়েছে, তা হলো এইঃ

আরবী(*********)

-নবী করীম(স) বলেছেনঃ আল্লাহ এমন কোনো ব্যক্তির দিকে রহমতের দৃষ্টি দিবেননা, সে আল্লাহর রহমত থেকে হবে বঞ্চিত।

 মনে রাখতে হবে, এ হাদীস থেকে জামা কাপড়ের আকার, কাটিং বা দৈর্ঘ্য সম্পর্কে কোনো হেদায়াত পাওয়া যাচ্ছেনা। শুধু মানসিক ব্যাপারেই নির্দেশ করা হয়েছে। কাপড় পরার বাহ্যিক ধরণ কি হবে, কি না হবে তা-ই বলা হয়েছে। আর অহংকারের ভাব নিয়ে যাই করা হবে, যেভাবেই অহংকার প্রকাশ পাবে, তা-ই নিষিদ্ধ হবে।

অতঃপর বুখারী শরীফের সব কয়টি হাদীসই আপনি পড়ে যান, কোনো একটি হাদীসেও পোশাক সম্পর্কে বিশেষ কোনো কাটিং বা পরিমাপ গ্রহণের নির্দেশ পাবেননা। তবে হাদীস থেকে এ কথা জানা যায় যে, নবী করীমের কোর্তার আস্তিন বা হাত ছিল খুবই সংকীর্ণ। তা থেকে এখানকার চুরিদার আস্তিনের জামা পরা জায়েয প্রমাণিত হয়। নবী করীম(স) যে কামীস পরতেন তা কতখানি লম্বা ছিল? একটি হাদীস থেকে স্পষ্ট জানা যায় যে, তা খুব লম্বা ছিলনা। হাদীসটির ভাষা এইঃ আরবী(*********)

-নবী করীমের কামীস সাধারণত সূতীর কাপড় দিয়ে তৈরী হতো এবং তার ঝুল খুব কম হতো ও আস্তিন চুরিদার হতো।

এ থেকে অকাট্যভাবে জানা গেল যে, যারা বলে বেড়ায় যে, নবী করীম(স) অর্ধেক নলা পর্য্ন্ত ঝুল কোর্তা পরেছেন, তারা বানানো মিথ্যা কথা বলেছেন। সত্য কথা হলো তিনি লুংগী পরলে খাটো কোর্তা পরিধান করতেন।

তিরমিযী শরীফে পোশাক পর্যায়ে যে হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে, তার মধ্যে ও প্রথম হাদীস হলো এইঃ

আরবী(*******)

-নবী করীম(স)বলেছেনঃ আমার উম্মতের পুরুষ লোকদের জন্য রেশমের পোশাক ও স্বর্ণ হারাম করা হয়েছে, আর মেয়েদের জন্য হালাল করা হয়েছে।

অর্থাৎ পুরুষদের জন্য রেশমী পোশাক হারাম।

এছাড়া মুসনাদে আহমদ এর একটি হাদীস থেকে পরিধেয় বস্ত্রের ঝুল কতখানি হওয়া উচিত সে বিষয়ে একটা সুস্পষ্ট ধারণা মেলে। হযরত আবু হুরায়রা(রা) বর্ণনা করেনঃ আরবী(*********)

-ঈমানদার লোকদের ইজার পায়ের দুই নলার মাঝ বরাবর ঝুলতে পারে। এর নীচে যেতে পারে পায়ের গিরা ওপর পর্য্ন্ত। এর নীচে গেলে তা হবে জাহান্নামে যাওয়ার কাজ।

হাদীসে ইজার শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এর মানে পরিধেয় বস্ত্র, যা কোমরের নীচের দিক ঢাকার জন্য ব্যবহৃত হয়। তা লুঙ্গি হতে পারে, পাজামা হতে পারে, হতে পারে আজকালকার পোশাক প্যান্ট বা অন্য কিছু। এগুলো ঝুল হাঁটু হতে গিরা পর্য্ন্তকার মাঝ বরাবর ‘নিসফে সাক’ পর্য্ন্ত হতে পারে। ‘নিসফে সাক’ এর নীচে পায়ের গীরা পর্য্ন্ত ও ঝুলতে পারে; কিন্তু এর নীচে গেলে তা জায়েয হতে পারেনা।

নবী করীম(স) এর এ পর্যায়ের হাদীসসমূহকে ভিত্তি করে হযরত ইবনে উমর(রা) বলেনঃ আরবী(*******)

-রাসূলে করীম(স) ইজারকে পায়ের গীরার নীচে ঝুলবার ব্যাপারে যে আযাবের কথা বলেছেন, তা-ই তিনি বলেছেন কামীস এর ব্যাপারেও।

‘কামীস’ হলো গাত্রাবরণ, শরীরের ঊর্ধ্বভাগ ঢাকার জন্য যাই পরিধান করা হয়, তাই কামীস তার কাটিং বা ধরন যাই হোকনা কেন। তা এখনকার পাঞ্জাবী, শার্ট, কোর্ট বা কল্লিদার জামা-যে কোনোটাই হতে পারে। তার কাটিং কি হবে, সে বিষয়ে হাদীস কিছুই বলছেনা। বলছে শুধু এ কথা যে, তা যেনো এতদূর লম্বা না হয় যে, তদ্দারা পায়ের গিরাও ঢেকে যায়। হযরত ইবনে উমরের কথা থেকে স্পষ্ট জানা গেল যে, পায়ের গিরার নিচে ইজার বা কামীস যাই ঝুলবে, তাই হারাম হবে। মনে রাখতে হবে যে, তদানীন্তন আরব সমাজে সাধারণত একখানা কাপড় দিয়ে শরীরের ওপরভাগ হতে হাটুর নীচের ভাগ পর্য্ন্ত ঢেকে ফেলত। এমনকি বর্তমানেও আরবদের পোশাক এরকমই। নীচে ছোটো-খাটো একটা পরে, আর তার ওপর দিয়ে পায়ের গিরা পর্য্ন্ত লম্বা একটা জামা পরে-এই হলো এখনকার আরবদের সাধারণ পোশাক। এর কোনোটিকেই যে নীচের দিকে ঝুলিয়ে দিয়ে পায়ের গিরা ঢেকে ফেলা যাবেনা তাই বলা হচ্ছে এইসব হাদীসে। বস্তুত ‘নিসফে সাক’ বলতে কোনো কিছুর উল্লেখ  বা থাকলে তা হলো এই।

 কিন্তু একটা লুঙ্গি বা পাজামা পরা সত্ত্বেও ‘নিসফে সাক’-নলার মাঝ বরাবর পর্য্ন্ত একটি কোর্তাও ওপর থেকে ঝুলে পড়তে হবে এবং এরূপ কোর্তা পরা সুন্নাত হবে-একথা কোথ্থেকে জানা গেল? কুরআন থেকে নয়, হাদীস থেকেও নয়। আর কুরআনও হাদীস থেকে যা প্রমাণিত নয়, তা ফিকাহর কিতাব থেকেও প্রমাণিত হতে পারেনা। বর্তমান আরবদের রেওয়াজ থেকেও তা প্রমাণিত নয়। অতএব বর্তমানে এক শ্রেণীর আলিম ও পীর সাহেবানদের ‘সুন্নাতি লেবাস’ বলে চালিয়ে দেয়া ‘নলার অর্ধেক পর্য্ন্ত’ লম্বা কল্লিদার কোর্তা শরীয়তের মূল দলীল থেকে প্রমাণিত জিনিস নয়। এ হলো সম্পূর্ণ মনগড়া এক জিনিস। আর শরীয়তের সুন্নাত রূপে প্রমাণিত নয়- এমন একটি পোশাককে ‘সুন্নাতি লেবাস’ বলে চালিয়ে দেয়া এক অতি বড় বিদয়াত(এ দেশের এক শ্রেণীর আলিম ও পীর সাহেবান যে পাজামা বা লুঙ্গির ওপর কল্লিদার নিসফে সাফ কোর্তা পরেন, তাকে ‘সুন্নাতী লেবাস’ বলা একটা মনগড়া কথা। এ পোশাককে বড়জোর এতদ্দেশীয় পরহেযগার আলিম ও পীর সাহেবানদের পছন্দনীয় পোশাক-লিবালুস ওলামা-বলা যেতে পারে মাত্র)। তা বিদয়াত এজন্যেও যে, তাতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচ হয়। আর বেহুদা খরচ থেকে দূরে থাকা পোশাকের ব্যাপারে প্রথম শর্ত। বর্তমানে এই বিদয়াত চালু হয়ে রয়েছে সমাজের একশ্রেণীর জনগণের মাঝে। তারা মনে করছে ‘সুন্নাতী পোশাক পরছি আমরা; রাসূলের পায়বরী করছি আমরা, সে কথা এই লোকদের খেয়ালেই আসেনা। বস্তুত এ চরম অন্ধত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়।

আমার এ দলীলভিত্তিক আলোচনায় এ পোশাকের প্রতি কোনো বিদ্বেষ প্রচার করা হয়নি, তা পরতে নিষেধও করা হয়নি। আমার বক্তব্য শুধু এতটুকু যে, শুধুমাত্র এ ধরনের পোশাককেই ‘সুন্নাতী পোশাক’ বলাটাই বিদয়াত। এ পোশাক শুধু পরাকে আমি বিদয়াত বলিনি- বিদয়াত বলতেও চাইনা।

স্বপ্নের ফয়সালা মেনে নেয়ার বিদয়াত

পীর সাহেবদের দরবারের সবচাইতে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, এখানে সব সময় স্বপ্নের রাজত্ব কায়েম হয়ে থাকে। কে কত বেশি এবং ভালো স্বপ্ন দেখতে পারে, মুরীদ-মুসাহিবদের মাঝে তা নিয়ে প্রবল প্রতিযোগিতা চলে। ফলে তাদের কেউ কেউ যে বানানো স্বপ্নও না বলে, এমন কথা জোর করে বলা যায়না। কেননা যে যত ভালো স্বপ্ন দেখবে এবং স্বপ্নযোগে হুজুর কিবলার বেলায়েত ও উচ্চ মর্যাদা প্রমাণ করতে পারবে, হুজুরের দোয়া ফায়েজ এবং স্নেহাশীষ সেই পাবে সবচাইতে বেশি। কাজেই এ দরবারে স্বপ্ন দেখতেই হবে;-স্বপ্ন না দেখে কোনো উপায় আছে? এ দরবারের লোকেরা চোখ বুঝলেই স্বপ্ন দেখতে পায়, স্বপ্ন যেন এদের জন্য এমন পাগল হয়ে বসে থাকে যে, যে কোনো সময়ই তা এদের চোখের সামনে ভেসে ওঠার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। তারা জেগে জেগেও স্বপ্ন দেখে অনেক সময় এবং তা হুজুর কিবলাকে খুশি করার জন্য সুন্দরভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে দরবারে পেশ করে। শুধু তা-ই নয়, শরীয়তের দৃষ্টিতে ভালো-মন্দ জায়েয নাজায়েয সম্পর্কেও এখানে স্বপ্ন দ্বারাই ফয়সালা গ্রহণ করা হয়। একজন হয়তো বললোঃ আমি অমুক হুজুরকে স্বপ্নে দেখেছি, তিনি এই কাজটি করতে নিষেধ করেছেন; অমনি সে কাজটি পরিত্যাগ করা হলো। কিংবা তিনি অমুক কাজ করতে বলেছেন। অতএব সঙ্গে সঙ্গে সে কাজ করতে শুরু করা হলো।

কেউ বললোঃ আমি নবী করীম(স)কে স্বপ্নে দেখেছি, তিনি আমাকে এ কাজটি করতে আদেশ করেছেন, আর অমনি সে কাজ করতে শুরু করে দেয়া হলো। কিংবা কোনো কাজ করতে নিষেধ করেছেন বলে তা বন্ধ করা হলো। এ ব্যাপারে শরীয়তের ফয়সালা যে কি, সে দিকে আদৌ তাকিয়েও দেখা হয়না; শরীয়ত কি বলে সে কথা জিজ্ঞেস করার কোনো প্রয়োজন তারা বোধ করেনা।

এভাবে স্বপ্নের ওপর নির্ভরতা, স্বপ্ন দ্বারা পরিচালিত হওয়া, স্বপ্নের ভিত্তিতে কোনো কাজ করা বা না করা পীর-পূজকদের নীতি, কোনো শরীয়তপন্থীর এ নীতি নয়। কেননা সাধারণ মানুষের স্বপ্ন-সত্যিকারভাবে যদি কেউ দেখেই –কোনো শরীয়তের বিধান হতে পারেনা। স্বপ্ন সত্য হতে পারে। কোনো স্বপ্ন যদি কেউ সত্যিই দেখে থাকে তবে তা থেকে সে নিজে কোনো আগাম সুখবর লাভ করবে, না হয় কোনো বিষয়ে সতর্কাবলম্বনের ইঙ্গিত পাবে। সে জন্যে তার উচিত আল্লাহর শোকর করা। কিন্তু এ স্বপ্ন দ্বারা ফরয-ওয়াজিব, হালাল হারাম ও জায়েয নাজায়েয কিংবা করণীয় কি, না করণীয় কি, তা প্রমাণিত হতে পারেনা। স্বপ্ন থেকে শরীয়তের অনুকূল কোনো কথা জানতে পারলে সে তো ভালোই; কিন্তু শরীয়তের বিপরীতে যদি কিছু জানা যায় তবে তা কিছুতেই অনুসরণ করা যাবেনা। করা যাবেনা এজন্য যে, শরীয়তের বিপরীত কারো কোনো হুকুম দেয়ার অধিকার নেই, স্বপ্নের কি দাম থাকতে পারে শরীয়তের মুকাবিলায়?

অবশ্য স্বপ্ন ইসলামের দৃষ্টিতে একেবারে ফেলবার বিষয় নয়- এ কথা ঠিক। স্বপ্নযোগে নবী করীম(স) এর দর্শন লাভ করা যায়, তাও হাদীস থেকে প্রমাণিত। কিন্তু প্রথম কথা হলো, স্বপ্নযোগে শয়তান যদি নবী করীমের নিজের বেশ নয়- যে কোনো একটি বেশ ধারণ করে তাকেই ‘নবী করীম’ বলে জাহির করে, তবে স্বপ্ন দ্রষ্টা কি করে বুঝতে পারবে যে এ প্রকৃত রাসূল নয়?

এ পর্যায়ে রাসূলে(স) এর হাদীসের ভাষা ও তাতে ব্যবহৃত শব্দগুলো লক্ষণীয়। হযরত আবদুল্লাহ(রা) নবী করীম(স) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেনঃ আরবী(*******)

-যে লোক স্বপ্নযোগে আমাকে দেখলো, সে ঠিক আমাকেই দেখলো। কেননা শয়তান আমার রূপ ও প্রতিকৃতি ধারণ করতে পারেনা। (তিরমিযী)।

শয়তান রাসূলের রূপ ও প্রতিকৃতি ধারণ করতে পারবেনা-বলে যদি কেউ স্বপ্নযোগে রাসূলে করীম(স)কে দেখল, তবে বিশ্বাস করতে হবে যে, সে ঠিক রাসূলকেই দেখেছে, অন্য কাউকে নয়-হাদীসের শব্দ ও ভাষা থেকে একথাই স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। কিন্তু এ শব্দ ও ভাষার ভিত্তিতেই ‍দু’টো দিক এমন থেকে যায়-যার স্পষ্ট মীমাংসা হওয়ার প্রয়োজন। একটি হলো রাসূলে করীম(স) বলেছেনঃ যে লোক আমাকে দেখল, সে আমাকেই দেখল, কিন্তু যদি কেউ অন্য কাউকে দেখে এবং তার মনে ভ্রম হয় শয়তান ভ্রম জাগিয়ে দেয় যে, ইনি রাসূল(স) তাহলে কি হবে? এরূপ হওয়ার অবকাশ কি এ হাদীসের ভাষা থেকে বের হয়না?

দ্বিতীয় রাসূলে করীম(স) বলেছেনঃ শয়তান আমার রূপ ও প্রতিকৃতি ধারণ করতে পারেনা, কিন্তু শয়তান যদি অন্য কারো রূপ প্রতিকৃতি ধারণ করে স্বপ্ন দ্রষ্টার মনে এই ভ্রম জাগিয়ে দেয় যে, ইনি রাসূলে করীম তাহলে কি হবে?

এরূপ হওয়া সম্ভব কিনা এ হাদীসের স্পষ্ট ভাষার পরিপ্রেক্ষিতে? আমার মনে হয়, হাদীসে এই দুটো সম্ভাবনার পথ বন্ধ করে দেয়নি। এখানে এ সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই কথা বলা হচ্ছে। আল মাজেরী ও কাযী ইয়াজ প্রমুখ হাদীস বিশারদ এ হাদীসের যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তাতেও এর সমর্থন পাওয়া যায়। (তিরমিযীর শরাহ‘তুহফাতুল আল ওয়াযী, ৬ষ্ঠ খন্ড, ৫৫৫ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)।

কাজেই স্বপ্ন দেখলেই তদনুযায়ী কাজ করতে হবে, ইসলামে এমন কথা অচল। আর দ্বিতীয় কথা হলো, নবী করীম(স) এর যা কিছু বলবার ছিল তা তো তাঁর জীবিত থাকাকালে সম্পূর্ণই বলে দিয়ে গেছেন, তাঁর জীবদ্দশয়াইতো দ্বীন পূর্ণতা লাভ করেছে। এখন নতুন করে তাঁর কিছুই বলবার থাকতে পারেনা। হালাল-হারাম, জায়েয-নাজায়েয বলে দেয়া নবীর দায়িত্ব। আর নবীর এ দায়িত্ব নবীর জীবন পর্য্ন্তই সীমাবদ্ধ। নবীর জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার পর এ পর্যায়ের কোনো দায়িত্বই থাকতে পারেনা তাঁর ওপর। আর শেষ নবীতো তাঁর জীবদ্দশাতেই ‘খাতামুন্নাবীয়ীন’ ছিলেন। নবীর জীবন শেষ হয়ে গেছে, তার পূর্বেই নব্যুয়তের দায়িত্ব পূর্ণরূপে পালিত হয়ে গেছে। অতঃপর স্বপ্নযোগে শরীয়তের কোনো নতুন বিধান দেয়ার প্রয়োজনই নেই। তাই স্বপ্নযোগে নবী করীম(স) কে দেখলেও এবং তার নিকট হতে কোনো নির্দেশ পেলেও তা পালন করার কোনো দায়িত্ব স্বপ্নদ্রষ্টারও নেই, নেই উম্মতের কোনো লোকেরও। দ্বীন ইসলাম পরিপূর্ণ। এখন বিশ্ব মানবের জন্য তা-ই একমাত্র চূড়ান্ত বিধান। সবকিছু তা থেকেই জানতে হবে, তা থেকেই গ্রহণ করতে হবে, চলতে হবে তাকে অনুসরণ করেই।

শরীয়তে স্বপ্নের যে মর্যাদা দেয়া হয়েছে, তা নিম্নোক্ত হাদীস থেকেই প্রমাণিত। এ পর্যায়ে দুটো হাদীস উল্লেখ করা যেতে পারে। একটি হযরত আবু হুরায়রা(রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আরবী(********)

-নবী করীম(স) বলেছেন, নব্যুয়তের কোনো কিছুই বাকী নেই- সবই শেষ হয়ে গেছে। এখন আছে শুধু-‘সুসংবাদ দাতাসমূহ’। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন-সুসংবাদ দাতাসমূহ বলতে কি বোঝায়? নবী করীম (স) বললেনঃ তা হলো ভালো স্বপ্ন।

দ্বিতীয় হাদীস হলো হযরত আনাস(রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আরবী(********)

-ভালো স্বপ্ন নব্যুয়তের ছিচল্লিশ ভাগের একভাগ মাত্র।

প্রথম হাদীস থেকে এতটুকু জানা যায় যে, ভালো স্বপ্ন বান্দার জন্য সুসংবাদ লাভের একটি মাধ্যম মাত্র। আর দ্বিতীয় হাদীস থেকে জানা যায় যে, নব্যুয়তের ছিচল্লিশ ভাগের এক ভাগ মর্যাদার অধিকারী হলো এই ‘শুভ স্বপ্ন’। তা হলে বাকি পঁয়তাল্লিশ ভাগ কি? তা হলো নব্যুয়তের মাধ্যমে লব্ধ কুরআন ও সুন্নাত।[এ হাদীসে শুভ স্বপ্নকে নব্যুয়তের ছিচল্লিশ ভাগের এক ভাগ বলা হয়েছে। মুসলিম শরীফে হযরত আবু হুরায়রা(রা) বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছেঃ ‘শুভ স্বপ্ন’ নব্যুয়তের পঁয়তাল্লিশ ভাগের এক ভাগ, ইবনে আমর বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে সত্তর ভাগের এক ভাগ। কাজেই এসব কথা কোনো নির্দিষ্ট জিনিস নয়। দ্বিতীয়, শুভ স্বপ্নকে নব্যুয়তের অংশ বলার মানে এ নয় যে, শুভ স্বপ্নও বুঝি ঠিক নব্যুয়তের মতোই নির্ভূল বিধানকারী জিনিস। এখানে নব্যুয়তের সঙ্গে শুভ স্বপ্নের শুধু সাদৃশ্য দেখানোর জন্যই এ কথা বলা হয়েছে। অন্যথায় শুভ স্বপ্ন কখনো নব্যুয়তের সমান হতে পারেনা।(জুরকানী লিখিত মুয়াত্তার শরাহ, চতূর্থ খন্ড. ৩৫১ পৃ.)]

অতএব এই কুরআন ও সুন্নাহই হলো দ্বীনের আসল ও মূল ভিত্তি। তা-ই বাস্তব জিনিস, তার মুকাবিলায় স্বপ্নকে পেশ করা কল্পনা বিলাসী লোকদেরই কাজ। যারা বাস্তব জীবনের ব্যাপারগুলোকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ইচ্ছুক, তাদের কর্তব্য হলো স্বপ্নের পেছনে না ছুটে কুরআন ও সুন্নাহকে ভিত্তি ধরে অগ্রসর হওয়া। যারা কুরআন-হাদীসের বাস্তব বিধানকে ভিত্তি করে কাজ করেনা, তা থেকে গ্রহণ করেনা জীবন পথের নির্দেশ ও ফয়সালা; বরং যারা স্বপ্নের ভিত্তিতেই সব বিষয়ে ফয়সালা গ্রহণ করে, তারা আসলেই ঈমানদার নয়, ঈমানদার নয় আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের সুন্নাতের প্রতি। অতএব তারা বিদয়াতপন্থী, বিদয়াতী লোক।

বিদয়াত প্রতিরোধ সুন্নাতের প্রতিষ্ঠা

সুন্নাত ও বিদয়াতের এ দীর্ঘ আলোচনা থেকে একথা প্রমাণিত হয় যে, ইসলামের পূর্ণাঙ্গ আদর্শই হচ্ছে এবং এরই বিপরীতকে বলা হয় বিদয়াত। সুন্নাত হচ্ছে ‘উসওয়ায়ে হাসান’-নিখুঁত, উৎকৃষ্টতম ও উন্নততর আদর্শ; যা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমানদার প্রত্যেকটি মানুষের জন্যিই একান্তভাবে অনুসরণীয়। বস্তুত ইসলামী আদর্শবাদী যে, সে এই আদর্শকে মনে মগজে ও কাজে কর্মে পুরোপুরিভাবে গ্রহণ ও অনুসরণ করে চলে। আর সেই হচ্ছে প্রকৃত মুসলিম।

পক্ষান্তরে ইসলামের বিপরীত চিন্তা-বিশ্বাস ও বাস্তব রীতিনীতি যাই গ্রহণ করা হবে, তাই বিদয়াত। তাই সে জাহিলিয়াত, যা খতম করার জন্য দুনিয়ায় এসেছিলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ(স)। তিনি নিজে তাঁর নব্যুয়তের জীবন-ব্যাপি অবিশ্রান্ত সাধনার ফলে একদিকে যেমন জাহিলিয়াতের বুনিয়াদ চূর্ণ করেছিলেন এবং বিদয়াতের পথ রুদ্ধ করেছেন চিরতরে অপরদিকে তেমনি করেছেন সুন্নাতের পরিপূর্ণ প্রতিষ্ঠা। সাহাবীদের সমাজকেও তিনি এ আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে তুলেছিলেন পুরো মাত্রায়। তিনি নিজে এ পর্যায়ে এত অসংখ্য ও মহামূল্য হেদায়েত দিয়ে গেছেন, যার বর্ণনা করে শেষ করা সম্ভব নয়। তিনি একান্তভাবে কামনা করেছিলেন তাঁর তৈরী সমাজ যেন কোনো অবস্থায় বিদয়াতের প্রশ্রয় না দেয়, বিচ্যূত না হয় সুন্নাতের আলোকো্জ্জ্বল আদর্শ রাজপথ থেকে। শুধু তাই নয়, তাঁর তৈরি সমাজ যেন প্রতিনিয়ত বিদয়াতের প্রতিরোধে এবং সুন্নাতের পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজে ব্যতিব্যস্ত ও আত্মনিয়োজিত থাকে- এই ছিল তাঁর ঐকান্তিক কামনা। তাঁর এ পর্যায়ের বাণীসমূহের মধ্য থেকে কিছু কথা আমরা এখানে উল্লেখ করছি।

নবী করীম(স) হযরত বিলাল ইবনে হারীস(রা) কে লক্ষ্য করে ইরশাদ করেছিলেনঃ  আরবী(*****)

-জেনে রেখো, যে লোক আমার পরে আমার কোনো সুন্নাতকে যা মরে গেছে তা পুনরুজ্জীবিত করবে, তার জন্য নির্দিষ্ট রয়েছে সেই পরিম