ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

মুখবন্ধ

সমাজতন্ত্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের কেন্দ্রীয় পরিকল্পিত অর্থনীতির পতনের পর সকলের কাছে মানবসভ্যতার মতাদর্শিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটা জটিল প্রশ্নের উদ্ভব হয়। এটা কি ইতিহাসের যবনিকাপাত ঘটিয়ে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার চূড়ান্ত বিপর্যয় এবং পশ্চিমা পুঁজিবাদের সমর্থক অতি উৎসাহী লোকদের দাবি অনুযায়ী পাশ্চাত্যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উদারবাদের দ্ব্যর্থহীন বিজয়, না তা ইতিহাসের গতিধারায় ক্রমঃপতনশীল অবস্থার একটি পর্যায় মাত্র? যদি সমাজতন্ত্র তার নিজস্ব অসংগতি ও অসমতার ভারে ন্যুব্জ হয়ে থাকে তাহলে এটা কী প্রমাণ করে যে, পুঁজিবাদ তার ঐতিহাসিক অসংগতি, অবিচার ও ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে? যদি পুঁজিবাদের কতিপয় নির্দিষ্ট ব্যর্থতার জন্য আংশিকভাবে হলেও সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতার পরে দ্রুত বিকল্প খুঁজে বেড়ানো হচ্ছে। সমাজতন্ত্রের বিশাল সৌধ ভেঙে চুরমার হওয়ার প্রেক্ষাপটে মানুষের মন ও বিবেকের দুয়ারে জটিল প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। 'ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ' বইটি এসব প্রশ্নের উপর আলোকপাত করার জন্য একটি সময়োচিত প্রচেষ্টা। এতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে যে, যথার্থ উত্তর খুঁজে বের করার জন্য পাশ্চাত্যের অভিজ্ঞতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার প্রয়োজন নেই, বরং অন্যান্য ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও এর সীমা বিস্তৃত হতে পারে। মানব জাতির সামনে একটি বৈপ্লবিক সুযোগ উন্মোচিত হতে পারে যদি কারো অনুসন্ধিৎসু মন আন্তরিকতা ও বস্তুনিষ্ঠতার সাথে মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের বক্তব্যকে পরীক্ষা করে দেখেন, যাতে তারা ইসলামী আদর্শের আলোকে এ যুগের অর্থনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের জবাব সন্তোষজনকভাবে দিয়েছেন। মানবজাতি পাশ্চাত্যের নেতৃত্বে বিগত তিনশ বছরে চারটি প্রধান অর্থনৈতিক মতাদর্শের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে, সেগুলো পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদী-ফ্যাসিবাদ ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র। এসব মতবাদই মৌলিকভাবে বৈশিষ্ট্যগতভাবে একই ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত যে, মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ধর্ম ও নৈতিকতা প্রাসঙ্গিক নয়; বরং অর্থনৈতিক বিষয়াদি অর্থনৈতিক আচরণের সূত্র দ্বারাই সমাধান করা যায় এবং নৈতিক সামাজিক বিধিবিধান এক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। পুঁজিবাদ তার সৌধ নির্মাণ করেছিল বল্গাহীন ব্যক্তি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, মুনাফার অভিপ্রায় ও বাজারব্যবস্থার নীতির উপর। সমাজতন্ত্র মানবজাতির জন্য সুখ-সমৃদ্ধি খুঁজেছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানা, সামাজিক প্রণোদনা ও কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতিতে। এ দু'য়ের সমন্বয়ে ফ্যাসিবাদ রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের ছত্রছায়ায় রাজনৈতিক প্রতিপত্তি ও সামরিক উচ্চাভিলাসের জন্ম দেয়। কল্যাণমূলক পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের কিছু বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে মিশ্র অর্থনীতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্রে এসব মতবাদের কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য পরিলক্ষিত হলেও তা মানবজাতির প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে। সর্বশেষ পতিত দেবতা হচ্ছে সমাজতন্ত্র। এখন এটা ধারণা করা নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক হবে যে, সমাজতন্ত্রের পতন পুঁজিবাদ ও কল্যাণ রাষ্ট্রের যথার্থতা প্রমাণ করে। আমাদের সময়কালের অর্থনৈতিক সংকট এখনও আদের মতোই তীব্র ও বিপন্ন রয়ে গেছে। সকল মানবগোষ্ঠীর জন্য একই সঙ্গে একটি দক্ষ ও ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা খুঁজে বের করার লক্ষ্যে জরুরি ভিত্তিতে সার্বিক অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। ড. মুহাম্মদ উমর চাপরারর 'Islam and Economic Challange' গ্রন্থটি এ ক্ষেত্রে একটি অগ্রণী প্রয়াস। ড. চাপরা পেশাজীবী অর্থনীতিবিদ। তিনি করাচী ও মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন। তিনি ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকস ও সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ, পাকিস্তান এর মতো বিভিন্ন স্বনামধন্য শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন, প্লাটভাইল ও কেনটাকি, লেক্সিনটন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। বিগত ২৬ বছর ধরে তিনি সৌদি অ্যারাবিয়ান মনিটারি এজেন্সির সিনিয়র অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। এ কারণে তিনি অর্থনীতির তত্ত্বগত জ্ঞান রয়েছে। বিগত ১৫ বছর ধরে তিনি অর্থনীতির ইসলামিক তত্ত্ব উন্নয়নের জন্য গভীর মনোনিবেশ সহকারে কাজ করছেন। এর আগে তিনি 'টুওয়ার্ডস ও জাস্ট মনিটারি সিস্টেম' শীর্ষক একটি গ্রন্থ (ইসলামিক ফাউন্ডশন, লেস্টার, ১৯৮৫) রচনা করে মুসলিম বিশ্বের শিক্ষাবিদ মহলে প্রচুর সুনাম অর্জন করেন এবং এর মাধ্যমে ইসলামী অর্থনীতির ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখার জন্য তিনি ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক পুরস্কার লাভ করেন। এভাবে ড. চাপরা বর্তমান সময়কালের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অধিকতর মৌলিক ইস্যুগুলো সম্পর্কে সমাধান তুলে ধরার ক্ষেত্রে যথেষ্ট যোগ্যতার পরিচয় দেন। 'Islam and Economic Challange' শীর্ষক বইটি এক দশকের গবেষণা ও চিন্তার ফসল। তার এই শ্রেষ্ঠ গবেষণা কর্মে তিনি অত্যন্ত সূক্ষভাবে ও পাণ্ডিত্যের সাথে পাশ্চাত্যের প্রধান তিনটি অর্থব্যবস্থার বিশ্লেষণ করেছেন এবং সেগুলোর সাফল্য ও ব্যর্থতার একটি বাস্তবসম্মত ব্যালান্স শিট তৈরি করেছেন। তিনি অর্থনীতির ইসলামী তত্ত্ব ও তার সমস্যাসমূহ তুলে ধরে মুসলিম দেশগুলোর অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য সুনির্দিষ্ট পরামর্শ এবং কৌশলগত উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়েনের লক্ষ্যে নতুন দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। ব্যাপক অর্থে তিনি মুসলিম বিশ্বে উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্যে যে উপাদান পেশ করেন তার মধ্যে রয়েছে বাজারব্যবস্থার জন্যে ব্যাপকভিত্তিক প্রনোদনা এবং একটি সহায়ক অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য মৌলিক কাঠামোগত সংস্কার। ড. চাপরা একজন সুদক্ষ সমাজ বিজ্ঞানী ও বস্ত্তনিষ্ঠ ইসলামী শিক্ষাবিদ হিসেবে বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। সমসাময়িক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও তার সমস্যাবলী সম্পর্কে তার ব্যাপক ও সূক্ষ্ম ধারণা রয়েছে; ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে তার উপস্থাপনা যথার্থ ও বিশ্বাসযোগ্য। পাশ্চাত্যের বিভিন্ন ব্যবস্থা ও সমসাময়িক মুসলিম সমাজের ভারসাম্যপূর্ণ সমালোচনা তিনি এমন সহজভাবে উপস্থাপন করেছেন যাকে এক কথায় পাণ্ডিত্যপূর্ণ, সুস্পষ্ট ও নির্দেশনাত্মক বলা যেতে পারে। 'Islam and Economic Challenge'গ্রন্থটি নিছক কোনো তত্ত্বীয় গ্রন্থ নয় বরং নীতি নির্ধারকদের জন্যেও অনেক প্রাসঙ্গিকতা এতে রয়েছে এবং তা শুধু মুসলিম বিশ্বের জন্যই নয়, সার্বিকভাবে সমগ্র বিশ্বের জন্য প্রযোজ্য। আমি মনে করি 'Islam and Economic Challange' গ্রন্থটি সমসাময়িক অর্থনেতিক ব্যবস্থার উপর একটি উন্নতমানের গ্রন্থ এবং তা সমসাময়িক মুসলিম বিশ্বে অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানে ইসলামী তত্ত্ব উন্নয়নের ক্ষেত্রে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করছে। ড. চাপরার এই অনুপম অবদানের পেছনে রয়েছে তার চিন্তা ও ধ্যান ধারণার বাস্তব প্রয়োগ। তিনি সমস্যাগুলোকে সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছেন; বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার সাফল্যকে নিঃসঙ্কোচে স্বীকার করেছেন এবং একই সঙ্গে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন বা কৃত্রিমতা পরিহার করে সম্পূর্ণ নিখুঁভাবে ইসলামিক বিকল্প ব্যাখ্যা করেছেন। ড. চাচরা দ্ব্যর্থহীভাবে প্রমাণ করেন যে, শুধু বস্তুগত সম্পদের পিছনে ছুটলে মানুষের কল্যাণ অর্জিত হয় না, দক্ষতা ও সমতার বিষয়টি কেবল তখনই প্রয়োগিক ধারণা হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে যদি বিষয়টিকে নৈতিক মূল্যবোধ ও আর্থসামজিক কাঠামোর প্রেক্ষিতে পুনঃ সংজ্ঞায়িত করা হয়। তিনি মানুষকে অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনা ও প্রয়াসের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পুনঃ আবিষ্কারের কৈফিয়ত দিয়েছেন। তিনি পাশ্চাত্যের একজন দক্ষ অর্থনীতিবিদের মতোই অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের জন্য বিভিন্ন উপকরণ যথাসম্ভব কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছেন। তবে তার সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে অর্থনীতির ক্ষেত্রে উন্নত চিন্তাধারা সমৃদ্ধ একটি নতুন সৌধ নির্মাণ করা যা নৈতিক ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন নয় এবং যেখানে এমন একটি আর্থসামাজিক কাঠামোর আওতায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় এবং একই সঙ্গে দক্ষ ও ন্যায়ভিত্তিক বণ্টন ব্যবস্থা সমাজের বিশেষ কোনো শ্রেণীর জন্য নয় বরং সমগ্র মানবতার জন্য নিশ্চিত করা হয়। নৈতিক চেতনা সঞ্জাত এবং কয়েক শতাব্দীর প্রায়োগিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি অর্থনীতিকে বিবর্তনের মাধ্যমে পরবর্তী এমন একটা পর্যায়ে উন্নীত করার চেষ্টা করেছেন যা মানুষের সাধারণ প্রত্যাশা পূরণে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে, পারে। যদি তা নিছক সুবিধাভোগীদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ হয়ে থাকে, তাহলে মানুষের কল্যাণের জন্যই সে অর্থনীতির হারানো গতিপথ পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন। আগামী দিনের সেই লক্ষ্যেই 'Islam and Economic Challange' গ্রন্থটি একটি পদক্ষেপ। খুরশীদ আহমদ লেস্টার ৩ জানুয়ারি ১৯৯২ ২৭ জামাদা আল-সানী ১৪১২

প্রারম্ভিক কথা

প্রায় সকল মুসলিম দেশেই চলমান ইসলামী পুনর্জাগরণের প্রেক্ষিতে একটি সমন্বিত কর্মসূচি রূপায়ণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। মানব জাতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, যে সংকট মোকাবিলা করেছে তা উত্তরণে ইসলামকে একটি কল্যাণমুখী ব্যবস্থা উপতার দিতে হবে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশই এখন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বহির্দেশীয় ভারসাম্যহীনতা মোকাবিলা করছে। এজন্য এমন একটা বিশেষ কৌশল গ্রহণ করতে হবে যাতে এ দু'য়ের ব্যবধানকে নিয়ন্ত্রণসাধ্য সীমার মধ্যে সামনে আনা যায় এবং এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য দূরীকরণ, মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং আয় ও সম্পদ বণ্টনে বৈষম্য হ্রাস করা যায়। মুসলিম দেশগুলো কি পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র এবং কল্যাণ রাষ্ট্রের বিশ্ববিপণনের আওতায় কোনো কৌশল প্রণয়ন করতে পারে? ইসলাম কি তাদের লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করতে পারে? এ গ্রন্থে এসব বিষয়সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রশ্নের জবাব দেয়ার প্রয়াস চালানো হয়েছে। পাণ্ডুলিপি প্রথম খসড়াটি ইসলামী ও প্রচলিত অর্থনীতির প্রায় ডজনখানেক পণ্ডিতের কাছে প্রেরণ করা হয়। এদের মধ্যে রয়েছেনঃ সৌদি আরবের ড. ফাহীম খান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রফেসর কেনেথ বোল্ডিং, প্রফেসর ইভার্ট হেগেন, প্রফেসর ফ্রাংক ভোগেল এবং যুবায়ের ইকবাল, যুক্তরাজ্যের প্রফেসর রুডনী নীনহাস এবং পাকিস্তানের প্রফেসর খুরশীদ আহমদ। সকলেই তাদের মূল্যবান সময় ব্যয় করে যত্নসহকারে আমার পাণ্ডুলিপিটি পাঠ করেছেন এবং মূল্যবান মন্তব্য ও পরামর্শ দিয়ে উপকৃত করেছেন, এজন্য আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। তাদের পরামর্শের আলোকে আমি পাণ্ডলিপিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছি। ফলশ্রুতিতে মূল অভিসন্দর্ভ অপরিবর্তিত থাকলেও তাদের মতামতের আলোকে সম্পাদনার ফলে এটি আরো সমৃদ্ধ হয়েছে। আমি বিশেষ করে ড. জারকা, ড. মুনাওয়ার ইকবাল এবং প্রফেসর কেনেথ বোল্ডিং এর তীক্ষ্ম সমালোচনা থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছি এবং তা কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করছি। প্রথমোক্ত তিনজন সৌদি আরবে বসবাস করার সুবাদে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য আমাকে মূল্যবান সময় দিয়েছেন। এরূপ আলোচনার ফলে বিষয়গুলো সম্পর্কে আমার জ্ঞানের পরিধি যেমন সম্প্রসারিত হয়েছে, তেমনি ইসলামী নীতি কৌশলের যুক্তিকে জোরদার করতেও সহায়ক হয়েছে। সুতরাং পাঠকগণ যদি বইটিকে মূল্যবান বলে বিবেচনা করে তাহলে এর কৃতিত্বের উল্লেখযোগ্য অংশ উপরে উল্লিখিত পণ্ডিতজনদের প্রাপ্য হবে। অবশ্য তাদের কেউই চূড়ান্ত খসড়াটি দেখেননি। ফলে যদি কোনো ত্রুটি থেকে থাকে সেজন্য আমাকেই দায়ী করতে হবে। বইটির কলেবর যাতে বৃদ্ধি না পায় এবং কৌশলগত পরিভাষায় ভারাক্রান্ত না হয় সেজন্য তাদের পরামর্শ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে বিব্রত ছিলাম। এ বইতে প্রকাশিত মতামত আমার নিজস্ব, আমি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করছি আমার মতামতের সাথে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ক্ল্যাসিকাল ও ইসলামী অর্থনীতির চলতি গ্রন্থাবলীর কাছে আমি এতটাই ঋণী যে, পাদটীকায় বিপুলসংখ্যক তথ্যসূত্রের উল্লেখ করা সত্ত্বেও দায়িত্ব শেষ হয় না। অধিকন্তু অর্থনীতির উপর বর্তমানে প্রকাশনার সংখ্যা এত বেশি যে, ব্যাপকভাবে তথ্যসূত্রের নির্দেশ সম্ভব নয়, বিশেষত এ ধরনের একটি বইতে, যেখানে তিনটি বিদ্যমান সমাজব্যবস্থা ও ইসলাম সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এমতাস্থায় আমাকে বেছে বেছে তথ্যসূত্র নির্বাচন করতে হয়েছে। অবশ্য এমন কিছু তথ্যসূত্র বাদ পড়ে যেতে পারে যা অন্যদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বইটির কলেবর বৃদ্ধির বিষয়টি পরিহার করার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রেই কেবল অন্য ভাষার বর্ণান্ত ব্যবহার করা হয়েছে। আমি ইসলামের বাণীকে বিশেষভাবে বুঝানোর জন্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে আরবি শব্দ ব্যবহার করেছি; ইংরেজি অনুবাদ করা হলে ইসলামী পরিভাষায় মূল ভাবার্থটি প্রস্ফুটিত হতো না। এই বইটি রচনা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে আরো অনেকে আমাকে সহযোগিতা করেছেন, আমি তাদের কাছেও ঋণী। এদের মধ্যে আমার স্ত্রী ও আমার সন্তানদের আমার প্রতি নৈতিক সমর্থন প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করেছে। আমার ভ্রাতৃদ্বয় আবদুর রহমান ও মুহাম্মদ আমাকে অব্যাহত উৎসাহ দেন। আমি আবদুল্লাহ ইউসুফ আলী, টি.বি. ইরভিং ও মুহাম্মদ আসাদের পবিত্র কোরআনের অনুবাদ থেকে বিশেষভাবে উপকৃত হয়েছি, যদিও তাদের অনুবাদ উদ্ধৃত করা হয়নি। ফিকাহ্, হাদিস ও অন্যান্য আরবি গ্রন্থের অনুবাদ আমার নিজস্ব। আমার মেয়ে সুমাইয়া অনুবাদের কতকগুলো জটিল সমস্যার সমাধানে সহায়তা করেছে। পাণ্ডলিপি পরীক্ষা ও প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে মুদ্রণ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে আমি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ড. এম.এম. আহসান ও অন্যান্য ভাইদের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই। বইটি রচনাকালে গবেষণা ও দাপ্তরিক সহায়তা প্রদানে দক্ষতার সাথে সাহায্য করার জন্য আমি জনাব মবিন আহমদের কাছে ঋণী রইলাম। আল্লাহতায়াল এদের সবাইকে তাদের অবদানের জন্য পুরস্কৃত করুন! এম.উমর চাপরা রিয়াদ, সৌদি আরব ১১ জুমাদা আল-আখিরা ১৪১১, ২৮ ডিসেম্বর, ১৯৯০ পুনশ্চঃ এ বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরির কাজ চূড়ান্ত হয়ে যাবার পর সোভিয়েত অর্থব্যবস্থার পতন ঘটে এবং ৫০ বছর ক্ষমতায় থাকার পর সুইডিশ সোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টি পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠত হারায়। এ ঘটনার ফলে এ পুস্তকের মূল প্রতিপাদ্যের যথার্থতা পুনরায় প্রমাণিত হলো, বিশেষ করে এখানে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধ্যায়ে,যেখানে সমাজতন্ত্র ও কল্যাণ রাষ্ট্র সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪১২,১৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৯১

ভূমিকা

শরীয়াহর গূঢ় উদ্দেশ্য হচ্ছে জনগনের কল্যাণ সাধনের মাধ্যমে তাদের আকিদা- বিশ্বাস, বুদ্ধিবৃত্তি, সন্তান-সন্ত্ততি ও সম্পদের সংরক্ষন করা। যা কিছু এই পাঁচটি বিষয় সংরক্ষণের নিশ্চয়তা বিধান করে তাই জনস্বার্থ বলে গণ্য এবং সেটাই কাম্য। -আল গাজালী। শরীয়াহর ভিত্তি হচ্ছে মানুষের জ্ঞান এবং পার্থিব জগত ও পরকালে জনগণের কল্যাণ সাধন। আর কল্যাণ নিহিত রয়েছে সার্বিক ন্যায়বিচার, দয়া, সুখ-সমৃদ্ধি ও জ্ঞানের মধ্যে। যেখানে ন্যায়বিচারের পরিবর্তে নির্যাতন, দয়ার স্থলে কঠোরতা, কল্যাণের পরিবর্তে কার্পণ্য এবং জ্ঞানের বদলে মূর্খতা স্থান পায়, সেখানে শরীয়াহর কিছু করণীয় নেই। -ইবন আল-কাইয়্যেম চ্যালেঞ্জ সকল সমাজেরই স্বীকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে মানবকল্যাণ। অবশ্য কল্যাণের মৌলিক উপাদান কি এবং কিভাবে অর্জিত হয়, সে সম্পর্কে মতপার্থক্য রয়েছে। যদিও একমাত্র বস্তুগত অবস্থাই কল্যাণের উপাদান নয়, তথাপি আধুনিক সেকুলারতার ধারণায় প্রাথমিকভাবে ঐ সকল বিষয়ের উপর জোর দিয়ে বলা হয় যে, কতিপয় বস্তুগত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না করা পর্যন্ত কল্যাণ বা সুখ-সমৃদ্ধি নিশ্চিত হয় না। এসব লক্ষের মধ্যে রয়েছেঃ দারিদ্র্য দূরীকরণ, সকল ব্যক্তির বস্তুগত মৌলিক চাহিদা পূরণ, সৎ উপায়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রত্যেকের সুযোগের লভ্যতা এবং আয় ও সম্পদের সুষম বণ্টন। অবশ্য বিশ্বের ধণী-গরীব নির্বিশেষে এমন কোনো দেশ নেই, যে দেশ এসব বস্তুগত লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে। যে কেন্দ্রীয় পরিকল্পিত অর্থনীতিতে এ সকল বস্তুগত লক্ষ্য নিশ্চিত অর্জনের সক্ষমতা দাবি করা হয়, সেখানেও তা শুধু ব্যর্থই হয়নি, বরং মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকটেরও সম্মুখীন হয়েছে, যাকে নিঃসন্দেহে ব্যবস্থাটির(system) ব্যর্থতা বলতে হবে। বাজার অর্থনীতির দেশগুলো গর্বের সাথে আত্মতৃপ্তি প্রকাশ করে যাচ্ছে যে, বাজারব্যবস্থা অতীতের যে কোনো সময়ের চাইতে উৎকৃষ্ট। তবে সামষ্টিক অর্থনীতির (Macroeconomic) ভারসাম্যহীনতা অর্থনীতির ঘনঘন ওঠানামা, উচ্চহারের মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্ব, অতিরিক্ত বাজেট ও বাণিজ্যিক লেনদেন ঘাটতি, এবং বৈদেশিক মুদ্রা, পণ্য ও শেয়ার বাজারের পরিবর্তনশীলতার মাধ্যমে তাদের ব্যর্থতা আরো সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। তদুপরি উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের জটিল বৈদেশিক ঋণ সমস্যায় মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধির ন্যায় আক্রান্ত, যা শুধু তাদের ভবিষ্যতের উন্নয়নকেই নয় বরং আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থার কাঠামো ও অস্তিত্বকেও হুমকির সম্মুখীন করছে। অধিকন্তু এসব সমস্যার সাথে সাথে বিশ্বের সকল দেশই বাস্তবে দেখতে পাচ্ছে যে, তাদের নবায়ন অযোগ্য (non-renewable) প্রাকৃতিক সম্পদ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে এবং পরিবেশ দূষণ জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে। মানুষের জীবনে ক্রমবর্ধমান চাপ, উত্তেজনা ও দ্বন্দ্ব–সংঘাত এবং তার সাথে অস্থিরতার ক্রমবর্ধিষ্ণু লক্ষণসমূহ, যেমন হতাশা, অপরাধ প্রবণতা, নেশা, মাদকাসক্তি, বিবাহ-বিচ্ছেদ, শিশু নির্যাতন, মানসিক অসুস্থতা ও আত্মহত্যা এসব কিছুই মানুষের ব্যক্তি জীবনে আত্মতৃপ্তির অভাবের পরিচায়ক। এ গ্রন্থে প্রধানত যে মুসলিম দেশগুলোর উপর আলোকপাত করা হবে, সেগুলোও এর ব্যতিক্রম নয়।এ দেশগুলোতেও বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মৌলিক চাহিদা অপূরণীয় রয়েছে; অপরদিকে ধনী ও উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণী বেশ স্বচ্ছলতার সাথে বাস করছে। বিত্তের পাশাপাশি দারিদ্র্যের অস্তিত্ব ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ও সামাজিক সংহতিকে ক্রমশ ক্ষয় করে দিচ্ছে এবং তা অপরাধ প্রবণতা, হিংসাত্মক কার্যকলাপ, সামাজিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। এসব দেশের অধিকাংশই চরম সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতার(macroeconomic imbalance) সংকটে নিপতিত। মুসলিম দেশগুলোর ক্ষেত্রে এসব দুর্বলতা আরো মারাত্মক। কারণ মানব মর্যাদা, ভ্রাতৃত্ব ও আর্থ-সামাজিক সুবিচারকে ইসলাম আপসহীন গুরুত্ব দিয়ে থাকে। যতক্ষণ পর্যন্ত মানবকল্যাণের সকল অপরিহার্য উপাদানগুলো নিশ্চিত করা না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এসকল কথা অন্তঃসারশূন্য শ্লোগানে পর্যবসিত হবে। দক্ষতা ও ন্যায়পরতা এমন কেন হলো যে, বিশ্বের কোনো দেশই মানুষের সুখ-সমৃদ্ধির বস্তুগত উপাদানগুলো পর্যন্ত বাস্তবে উপলদ্ধি করতে সক্ষম হয়নি? এ ব্যর্থতার জন্য কি সম্পদের অপ্রতুলতাকে দায়ী করা যায়? অধিকাংশ অর্থনীতিবিদই নেতিবাচক জবাব দিতে চাইবেন, কারণ প্রকৃত বিচারে তারা সম্পদকে নিরঙ্কুশভাবে দুষ্প্রাপ্য বলে বিবেচনা করেন না। কেবল সম্পদের উপর দাবির প্রেক্ষিতেই আপেক্ষিক দুষ্প্রাপ্যতা রয়েছে। অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ স্বীকার করেন যে, সম্পদের আপেক্ষিক দুষ্প্রাপ্যতা সত্ত্বেও যদি লভ্য সম্পদ ‍‌‌‍‌‌‌'দক্ষতা' ও 'ন্যায়পরতা'র সাথে ব্যবহার করা যায় তাহলে বস্তুগত লক্ষ্য অর্জন এবং অস্থিতিশীলতা ও ভারসাম্যহীনতা দূর করা সম্ভব। এটা হচ্ছে মানবতার প্রতি সম্ভাব্য সেই চ্যালেঞ্জ যাতে লভ্য সম্পদ 'দক্ষতা' ও 'ন্যায়পরতা'র সাথে ব্যবহার করার ফলশ্রুতিতে বিশ্বজনীনভাবে স্বীকৃত বস্তুগত সুখ-সমৃদ্ধির লক্ষ্য বাস্তবায়ন করবে এবং অস্থিতিশীলতা ও ভারসাম্যহীনতা দূর করবে। 'দক্ষতা' ও 'ন্যায়পরতা' এবং তার বাস্তবায়ন সম্পর্কিত বহু জটিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে এসে যায়। 'দক্ষতা' ও 'ন্যায়পরতা' কে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়ে থাকে। এ আলোচনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযুক্ত সংজ্ঞা হবে সেটি, যা বিশ্বজনীন স্বীকৃত বস্তুগত লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বলা যেতে পারে যে, একটি অর্থনীতি কাম্য দক্ষতা অর্জন করতে পারে, যদি লভ্য মোট কার্যক্রম জনশক্তি ও বস্তুগত সম্পদকে কর্মসংস্থানে এমনভাবে নিয়োজিত করা যায়, যাতে যুক্তিসংগত পর্যায়ের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সংরক্ষিত (reserved) হারে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধিসহ সর্বাধিক সম্ভাব্য পরিমাণ চাহিদা পূরণকারী পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হয়। সামষ্টিক অর্থনীতিতে দীর্ঘায়িত অথবা পৃথিবীতে মানুষের জীবন বিপন্ন করে এরূপ পরিবেশ নষ্ট না করে সমাজের নিকট অধিকতর গ্রহণযোগ্য সুফল অর্জনে ব্যর্থ হলে সে ক্ষেত্রে দক্ষতার প্রশ্ন এসে যায়। একটি অর্থনীতি সমতা(equality) অর্জন করতে পারে, যদি তার উৎপাদিত পণ্য ও সেবা এমনভাবে বণ্টন করা হয়, যাতে সকল মানুষের চাহিদা পর্যাপ্তভাবে পূরণ করা যায় এবং কাজের প্রেরণা, সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও উদ্যোগকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে আয় ও সম্পদের সুষম বণ্টন করা যায়। যেহেতু দক্ষতা ও সমতার বিষয়টি বাস্তবে রূপদান করার কাজটি মূলত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কাজ, সেহেতু সবচেয়ে যুক্তিসংগত পন্থা হবে এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করা যা ঐ দুটো জিনিসকেই কার্যকর করতে সাহায্য করবে। তিনটি প্রশ্ন দক্ষতার সাথে সম্পদের বরাদ্দ এবং ন্যায়পরতার সাথে তার বণ্টন করতে হলে প্রতিটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে অবশ্যই তিনটি সুপরিচিত মৌলিক অর্থনৈতিক প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। যেমন কি, কিভাবে ও কার জন্য উৎপাদন করা হবে? অর্থাৎ কি পরিমাণ কোনো বিকল্প পণ্য ও সেবা উৎপাদন করা হবে? কি কি সম্পদের সমন্বয়ে ও কি প্রযুক্তির সাহায্যে সেগুলো উৎপাদন করবে? এবং উৎপাদিত সেবা কে কতটুকু ভোগ করবে? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধুমাত্র একটি অর্থনীতিতে সম্পদের বরাদ্দই নয় বরং ব্যক্তি মানুষের মধ্যে তার বণ্টন এবং বর্তমান (ভোগ) ও ভবিষ্যতের (সঞ্চয় ও বিনিয়োগ) মধ্যকার বণ্টনকেও নির্ধারণ করে দেয়। বরাদ্দ ও বিতরণ অর্থনীতির প্রধান অংশ দখল করে আছে এবং এগুলোই অবশেষে নির্ধারণ করে দেয় সকল ব্যক্তির চাহিদা পূরণ হয়েছে কিনা, অন্যান্য সকল কাঙ্ক্ষিত আর্থ-সামাজিক লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়েছে কিনা এবং জনগণকে তাদের পূর্ণাঙ্গ কর্মশক্তিকে কর্মে নিয়োজিত করার জন্য যথেষ্ট অনুপ্রাণিত করা হয়েছে কিনা? একটি অর্থনীতির চূড়ান্ত পরীক্ষা তার ঘোষিত লক্ষ্যে নয়, বরং তার বাস্তবায়ন কতটুকু হলো তার উপর নির্ভরশীল। বিশ্ববীক্ষণ (World View) ও কৌশলের ভুমিকা আপাত দৃষ্টিতে যদিও তিনটি প্রশ্নই সোজাসাপটা, কিন্ত তা গভীর মূল্যবোধসঞ্জাত, শূন্যের উপর তার উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। এর একটি বিশ্ববীক্ষণ (world view) অথবা ভিত্তিমূল দর্শন এবং কৌশল থাকা প্রয়োজন। প্রতিটি সমাজব্যবস্থা তার নিজস্ব বিশ্ববীক্ষণ দিয়ে প্রভাবিত এবং বিশ্বজাহানের উৎপত্তি এবং মানব জীবনের প্রকৃতি সম্পর্কে এক প্রকার অন্তর্নিহিত ও প্রকাশমান ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত। আর্থার লোভেজয়ের (Arthur Lovejoy) মতে এই বিশ্ববীক্ষণ 'প্রায় যে কোনো বিষয়ের উপর মানব প্রকৃতির প্রতিফলনকে নিয়ন্ত্রণ করে'। মানব প্রকৃতি সম্পর্কে মতপার্থেক্যের ফলশ্রুতিতে মানব জীবনের তাৎপর্য ও উদ্দেশ্য, মানুষের আওতাধীন সীমাবদ্ধ সম্পদের চূড়ান্ত মালিকানা ও উদ্দেশ্য, অধিকার ও দায়িত্বের ক্ষেত্রে মানুষের পারস্পারিক সম্পর্ক, পরিবেশ এবং দক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতার মানদণ্ড সম্পর্কে চূড়ান্ত ধারণারও পার্থক্য ঘটে। একটি ভবনের ভিত্তির মতোই এরূপ একটি বিশ্ববীক্ষণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়ও একই রকম ভূমিকা রাখে, এমনকি সহায়ক ভিত্তিমূল সর্বদা একইভাবে অদৃশ্য ও অনুল্লেখ্য হওয়া সত্ত্বেও তা নিরবচ্ছিন্নভাবে সিদ্ধান্তকারী ভূমিকা পালন করে থাকে। পদ্ধতিগত কৌশল এই বিশ্ববীক্ষণের একটি যৌক্তিক ফলশ্রুতি। বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে পদ্ধতিকে পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর করার জন্য কৌশল হিসেবে থাকতে হবে কতগুলো অপরিহার্য উপাদান। এতে থাকতে হবে একটি পরিশোধন পদ্ধতি (filter mechanism), যার ভেতর দিয়ে সকল দাবি অদৃশ্য বা দৃশ্যমান হাত দিয়ে অতিক্রান্ত হবে, যাতে সম্পদ ও তার উপর দাবির মধ্যে একটা ভারসাম্য বিধান এবং কাম্য দক্ষতা ও সমতা বাস্তবায়িত করা যায়। এতে এমন একটা ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে ব্যক্তি তাদের নিজেদের এবং সমাজের স্বার্থে সাধ্যানুযায়ী কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হবে। এতে আরো থাকতে হবে আর্থ-সামাজিক পুনর্গঠনের জন্য একটি কার্যকর পন্থা, যাতে করে যতক্ষণ সর্বাধিক দক্ষতা ও সুষম বরাদ্দ ও বণ্টন অর্জিত না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত এক হাত থেকে অন্য হাতে সম্পদের হস্তান্তর দ্রুততর হয়। যদি একটি ব্যবস্থার (system) বিশ্ববীক্ষণ ও কৌশল তার লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে লক্ষ্যও বাস্তবায়ন করা যায় না। একটি আমগাছ জন্মাবার জন্য একটি আমের বীজ দরকার, এজন্য একটি লেবুর বীজ তা যত ভালোই হোক না কেন কোনো কাজে দেবে না। যে ব্যবস্থায় তার লক্ষ্য এবং বিশ্ববীক্ষণ ও কৌশলের মধ্যে অন্তর্নিহিত অসামঞ্জস্যতা বিদ্যমান তা তার অর্থনীতির কাঠামো ও সংগঠন এবং জীবনধারার মধ্যে মৌলিক বিন্যাস ঘটাতে সক্ষম নয়। সুতরাং সেগুলো হয় সংকটপ্রবণ। এরূপ ব্যবস্থায় বসবাসকারী জনগণ মিথ্যা প্রতিশ্রুতির শিকার হয় যা পূরন করা যায় না এবং এতে কিছু ছোট ধরনের সমন্বয় করা হলে তা কোনো ব্যাপারই নয়। এরূপ ছোটখাট সমন্বয় সমস্যার গভীরে প্রবেশ করতে পারে না। এগুলো নিছক সামঞ্জস্যহীনতার লক্ষণগুলোকে প্রতিরোধ করে। কিন্তু বিশ্ববীক্ষণ ও কৌশল এবং লক্ষ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। ফলে সমস্যাগুলো প্রতিবারে ভিন্ন অবয়বে অধিকতর মারাত্মক এবং আরো অবনতিশীলভাবে পুনরায় আবির্ভূত হয়। প্রচলিত ব্যবস্থাসমূহ সৃষ্টিজগত ও প্রকৃতি সম্পর্ক ব্যাখ্যা এবং মানব জীবনের তাৎপর্য সম্বন্ধে বিভিন্ন ধারণা রয়েছে। এ সকল ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ফলশ্রুতি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের জীবন ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন প্রকার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যা তার নিজস্ব বিশ্ববীক্ষণ ও অন্তর্নিহিত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত এবং প্রতিটি ব্যবস্থাই অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্য আলাদা কৌশল গ্রহণ করে থাকে। বর্তমান বিশ্বে তিনটি প্রধান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা রয়েছে-পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র ও তাদের যুক্তফল সেকুলারিজম। এ সকল ব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেত্রেই সময়ের বিবর্তনে বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলা করার কারণে তার মূল বক্তব্যেও উল্লেখযোগ্য সংশোধন এসেছে এবং সমস্যা সমাধানের জন্যই পরিবর্তন আনতে হয়েছে। এসবের বর্তমান অবস্থা তার মূল থেকে দূরে সরে এসেছে। বিভিন্ন ব্যবস্থার সংশোধনী সত্ত্বেও এসব ব্যবস্থার ফলে ঐ সকল দেশে যে বিপুল সম্পদ সৃষ্টি হয়েছে এবং আপেক্ষিকভাবে তাদের যে সম্পদ সৃষ্টি হয়েছে এবং আপেক্ষিকভাবে তাদের যে সম্পদের প্রাচুর্য রয়েছে তারপর এদেশগুলো তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে বিভিন্নভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এদের মধ্যে আবার অনেকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা মোকাবিলা করেছে। তাদের সমস্যা অব্যাহতভাবে বেড়েই চলেছে। সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধ বাড়ছে এবং সাধারণ লোক এসব সংকটজনক পরিস্থিতির মোকাবেলা করছে। এ গ্রন্থে যে সমস্যাগুলোর উপর আলোকপাত করা হবে, সেগুলো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপরিকাঠামোর সম্ভাব্য অথচ অকস্মাৎ ঘটনা(contingent event) নয়। বরং সেগুলো ঐ ব্যবস্থাসমূহের নিজস্ব অন্তর্নিহিত কাঠামোগত দুর্বলতার সহজাত ও মোটামুটি অপরিহার্য পরিণতি। এসব দুর্বলতা হচ্ছে তাদের লক্ষ্যের মধ্যকার দ্বন্দ্বের ফলশ্রুতি, যার উৎস নিহিত রয়েছে তাদের বিশ্ববীক্ষণ ও কৌশলে। এগুলো সেকুলারিজমের ফল এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যের সাথে বৈসাদৃশ্যের প্রতিফলন। অতএব ব্রুটের ভাষায় বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলোর নিজেদের যেখানে 'মানুষের শুদ্ধ দর্শন সম্পর্কে পুনঃচিন্তা' প্রয়োজন, সেখানে তাদের পক্ষে এমন কোনো আদর্শ (model) দেয়া সম্ভব নয় যা মুসলিম দেশগুলো অনুকরণ করতে পারে এবং অপেক্ষাকৃত অনুসরণকারী দেশগুলোকে যেখানে পৌঁছেছে তার কাছাকাছি পৌঁছতেও মুসলিম দেশগুলোর কয়েক দশক লেগে যাবে। বিকল্প ইসলামী ব্যবস্থা ইসলাম এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ধারণা পোষণ করে যা বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলো থেকে মৌলিকভাবে আলাদা। এর উৎস হচ্ছে শরীয়াহ এবং এর থেকে তার বিশ্ববীক্ষণ, লক্ষ্য ও কৌশলের উদ্ভব হয়েছে। বর্তমান প্রভাবশালী সেকুলার ব্যবস্থার মতো ইসলামের লক্ষ্য (মাকাসিদ আল-শরীয়াহ) মৌলিকভাবে জড় ও বস্তুগত বিষয় নয়। বরং এর ভিত্তি হচ্ছে মানবকল্যাণ (ফালাহ) ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন (হায়াতে তাইয়্যেবা) যাতে ভ্রাতৃত্ব ও আর্থ-সামাজিক সুবিচারের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয় এবং প্রয়োজন হয় সকল মানুষের জন্য একটি বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক চাহিদা পূরণের ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থার। এর কারণ হলো, সেই ঈমান, যাতে বলা হয়েছে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি এবং তার উপর নির্ভরশীল হিসেবে সকল মানুষই সমান এবং আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত চাহিদা পূরণের মাধ্যমে সকলের প্রকৃত কল্যাণ সাধন না করা পর্যন্ত তারা মনের প্রকৃত সুখ ও প্রশান্তি লাভ করে না। মাকাসিদ আল-শরীয়াহ 'মাকাসিদ আল-শরীয়াহ' (এ পুস্তকে সংক্ষেপে 'মাকাসিদ' ব্যবহার করা হবে) হচ্ছে শরীয়াহর সীমার মধ্যে থেকে 'ফালাহ' ও হায়াতে তাইয়্যেবা বাস্তবায়নের জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন তার সব কিছুই। শুরুতে গাজালীর যে উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে তাতে দেখা যায়, মাকাসিদ হচ্ছে ঈমান, জীবন, বু্দ্ধিবৃত্তি, বংশধর ও সম্পদের সংরক্ষণ ও উন্নতি সাধনের জন্য যা কিছু প্রয়োজন তার সবই। গাজালী বিজ্ঞতার সাথেই মাকাসিদের তালিকায় ঈমানকে শীর্ষে রেখেছেন। কারণ ইসলামী বিষয়বস্তুতে ঈমান হচ্ছে মানবকল্যাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ঈমান মানুষের সম্পর্ককে একটি যথার্থ ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করে এবং মানুষের সকল কল্যাণ নিশ্চিত করতে সহায়তা করার জন্য পরস্পরের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ ও সযত্ন মিথস্ক্রিয়ায় সক্ষম করে তোলে। এতে আরো রয়েছে একটি নৈতিক পরিশোধন পদ্ধতি (moral filter) যাতে ভ্রাতৃত্ব ও আর্থ-সামাজিক সুবিচারের মানদণ্ড অনুসারে সম্পদের বরাদ্দ ও বিতরণ করা হয়। এছাড়া একটি উদ্বুদ্ধকরণ ব্যবস্থায় (motivating system) চাহিদা পূরণ এবং আয় ও সম্পদের সুষম বণ্টনের লক্ষ্যের সাথে তাকে সম্পৃক্ত করে। মানবীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তথা গৃহস্থালী, সংস্থার বোর্ড মিটিং, বাজার অথবা কেন্দ্রিয় রাজনৈতিক পরিষদ ইত্যাদি নির্বিশেষে সকল ক্ষেত্রে ঈমানকে অনুপ্রবিষ্ট করা না গেলে সম্পদের বরাদ্দ ও বণ্টনের ক্ষেত্রে দক্ষতা ও ন্যায়পরতা প্রতিষ্ঠা করা যাবে না এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা অথবা অপরাধ, বিবাদ-বিসংবাদ, উত্তেজনা ও অস্থিরতার বিভিন্ন লক্ষণসমূহ দূর করা যাবে না। নৈতিক পরিশোধনের পথ অবলম্বন ব্যতীত দক্ষতা ও ন্যায়পরতার সংজ্ঞা নির্ণয় সম্ভব নয়। ফ্রাঙ্ক নাইট যথার্থ বলেছেন, ভৌত বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো 'বস্তু না সৃষ্টি করা যায়, না ধ্বংস করা যায়'। ভৌত মাপকাঠিতে মোট আউটপুট (output) সর্বদাই ও ইনপুটের (inupt) সমান হবে। অতএব দক্ষতার সঠিক সংজ্ঞা আউটপুট ও ইনপুটের অনুপাতের মধ্যে নির্ণীত হবে না, বরং তা হবে কার্যকর আউটপুট (useful output) এবং মোট আউটপুট অথবা ইনপুটের অনুপাতের ভিত্তিতে। এর অর্থ হচ্ছে দক্ষতা পরিমাপের জন্য দরকার এর প্রয়োজনীয়তার (usefulness) পরিমাপ। পরবর্তীতে এ গ্রন্থে যুক্তি উপস্থাপিত হবে যে, যদি সকলের কল্যাণ সাধন উদ্দেশ্য হয়, তা হলে ব্যক্তিগত অগ্রাধিকার ও মূল্য কোনো পরিমাপক হতে পারে না। পরিপূরক হিসেবে সমাজসম্মত নৈতিক পরিশোধন পদ্ধতি প্রয়োজন। যদি নৈতিক মানদণ্ড ছাড়া দক্ষতা সংজ্ঞায়িত করা কঠিন হয়, তাহলে এসব ব্যতীত ন্যায়পরতার (equity) সংজ্ঞা নির্ণয় করা আরো কঠিন হবে। গাজালী সম্পদকে তালিকার সর্বনিম্নে স্থান দিয়েছেন, কারণ তা নিজেই চূড়ান্ত বিষয় নয়; বরং সেটি হচ্ছে একটি মাধ্যম মাত্র যা মানবকল্যাণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সম্পদ নিজে কোনো সাহায্য করতে পারে না, যদি না তার বরাদ্দ দক্ষতার সাথে এবং বণ্টন ন্যায়পরায়ণতার সাথে করা হয়। অভীষ্ট সম্পদ অর্জন এবং কেন্দ্রিয় রাজনৈতিক সংস্থা পরিচালনার জন্য কতিপয় নৈতিক মানদণ্ড প্রয়োজন, যার ইঙ্গিত আগেই দেয়া হয়েছে। যদি সম্পদ নিজেই একটি চূড়ান্ত বিষয় হয়, তাহলে তার পরিণাম হবে অবিচার, ভারসাম্যহীনতা ও পরিবেশগত অনাচার, যা অবশেষে বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের অধিকাংশের কল্যাণকে সংকুচিত করবে। মধ্যবর্তী তিনটি লক্ষ্য-জীবন, বুদ্ধিবৃত্তি ও বংশধর-মানুষের নিজের সাথে সংশ্লিষ্ট, আর এসবের কল্যাণ সাধনই শরীয়াহর উদ্দেশ্য। এ তিনটি বিষয়ের উন্নতির লক্ষ্যে যে নৈতিক প্রতিশ্রুতির সুস্টষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয়েছে তা সম্পদের বরাদ্দ ও বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে। কিন্তু তা সেকুলের পরিবেশে কেবলমাত্র মূল্য ও বাজারের ক্ষেত্রে প্রয়োগ সম্ভব নয়। কেবল মাত্র ধনী ও উচ্চবিত্তদের নয়, বরং সকল মানুষের জীবন, বুদ্ধিবৃত্তি ও বংশধরদের সংরক্ষণ ও উন্নতি বিধান করতে হবে। সকলের ক্ষেত্রে এ তিনটি জিনিসের উন্নতির জন্য যা কিছু করা দরকার, তা একটি 'প্রয়োজন' (need) হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তা পূরণ করার জন্য সম্ভাব্য সব কিছু করতে হবে। যেমন-পর্যাপ্ত পুষ্টি, বস্ত্র, আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতির জন্য যথাযথ পরিচর্যা ও শিক্ষা, বাসস্থান, একটি সুষ্ঠু ও ভৌত পরিবেশ (ক্রমহাসমান উত্তেজনা, অপরাধ ও দূষণ), চিকিৎসা সুবিধা, আরামদায়ক পরিবহন, সকল আবশ্যকীয় পারিবারিক ও সামাজিক বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য যথেষ্ট অবকাশ এবং সৎ পন্থায় উপার্জনের সুযোগ থাকতে হবে। সম্পদের বরাদ্দ ও বণ্টনের অবশ্যই একটা নির্দেশনা থাকতে হবে, যা এতসব বিষয়ে ও অন্যান্য আবশ্যকীয় প্রয়োজন পূরণে সাহায্য করবে। এ সকল প্রয়োজন পূরণের ফলে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উভয়ই শান্তিপূর্ণ, স্বস্তিকর, সুস্থ ও দক্ষ হিসেবে গড়ে উঠবে এবং 'ফালাহ' ও 'হায়াতে তাইয়্যেবা' বাস্তবায়ন ও তাকে টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে ব্যাপক অবদান রাখতে সক্ষম হয়ে উঠবে। যে বরাদ্দ ও বণ্টন 'ফালাহ' ও 'হায়াতে তাইয়্যেবা' বাস্তবায়নে সাহায্য করে না, যা উপরে উল্লিখিত ইবন আল কাইয়্যেমের উদ্ধৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং যা বিজ্ঞতার পরিচায়ক নয়, তাকে দক্ষ ও ন্যায়পরায়ণ বলে বিবেচনা করা যায় না। বিস্তীর্ণ ব্যবধান দুর্ভাগ্যবশতঃ কতকগুলো ঐতিহাসিক কারণে শরীয়াহ ও মুসলিম দেশগুলোর বাস্তব অবস্থার মধ্যে বিস্তীর্ণ ব্যবধান রয়েছে। এর মধ্যে দুটো কারণ হচ্ছেঃ মুসলমানদের অধঃপতন এবং পরবর্তীতে পুঁজিবাদী ও সমাজবাদী উভয় সাম্রাজ্যবাদ কর্তৃক শাসন-শোষণ। বর্তমান মুসলিম সমাজ ইসলামের আধ্যাত্মিক শুদ্ধতার প্রতিফলন ঘটায় না। সত্যি বলতে কি, সমাজের বিশাল অংশের মধ্যে ইসলামী সমাজের জন্য যে আবশ্যকীয় বৈশিষ্ট্য প্রয়োজন, সে সম্পর্কেও তাদের সচেতনতা নেই। মুসলিম দেশগুলোতে প্রধান আদর্শ ইসলাম নয়, বরং সামন্তবাদ, পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের সমন্বয়ে গঠিত সেকুলারিজম। ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মুসলিম বিশ্বের কোনো অংশেই প্রচলিত নেই। মুসলিম দেশগুলো বিদ্যমান ব্যবস্থাসমূহের সেকুলার মতাদর্শের পরিপ্রক্ষিতে রচিত নীতির মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছে তাদের সমস্যার আরো অবনতি ঘটেছে এবং মাকাসিদের উপলদ্ধি থেকে তারা বহুদূরে সরে যাচ্ছে। দেশের মোট উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও দারিদ্র্য কমেনি, বরং বৃদ্ধি পেয়েছে। আয় ও সম্পদে বৈষম্যের আরো অবনতি ঘটেছে এবং তাদের জনগণের মৌলিক চহিদা এখনো অপূরণীয় রয়ে গেছে। সরকারি খাতে বাজেট ঘাটতি এবং একইভাবে লেনদেনের ভারসাম্যে (balance of payment) ঘাটতি এবং বৈদেশিক ঋনের বোঝা বৃদ্ধি পেয়েছে। মুদ্রাস্ফীতির হুমকি তো রয়েছেই। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মাদ বলেছেন, তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্র্য দূরীকরণের ধারণা দৌড়ে পালিয়েছে। উন্নত অর্থনীতির সাথে আলোচনার মধ্যে সমাধান খোঁজ করার বিষয়টি বাস্তবে মুখ থুবড়ে পড়েছে। তৃতীয় বিশ্বের কর্মকর্তারা এখন স্ফীত ঋণগ্রস্ততার মধ্য থেকে দরিদ্র দেশগুলোকে টেনে তোলার জন্য নতুন ধারণা উদ্ভাবনের মতো নিরুৎসাহমূলক কাজে নিয়োজিত। কেন এরকম হলো? ইসলামীকরণ (ইসলামী শিক্ষার আলোকে মুসলিম দেশগুলোর অর্থনীতির পুনর্গঠন) কি এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে না? এ গ্রন্থ প্রসঙ্গে এ প্রশ্নের জবাব দেয়ার একটি প্রয়াস এ গ্রন্থ। এর দুটি ভাগ রয়েছে। প্রথম অংশে ব্যর্থ মতবাদসমূহের আলোচনা করা হয়েছে। মুসলিম দেশসমূহ আর্থ-সামাজিক লক্ষ্যসমূহ অর্জন করতে চাইলে তদেরকে ঐসব মতবাদ পরিত্যাগ করতে হবে। এ অংশের প্রথম তিনটি অধ্যায়ে বিদ্যমান ব্যবস্থাসমূহের বিশ্ববীক্ষণ ও কৌশণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে; কিন্তু তা নিছক সমালোচনার জন্য নয়, বরং ঐ সকল ব্যবস্থার লক্ষ্য, তার বিশ্ববীক্ষণ ও কৌশলের মধ্যে যে অসংগতি রয়েছে তার কারণ, ধরন ও ফলাফল সনাক্ত করাই আসল উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে পাঠকরা উপলদ্ধি করতে পারেন যে, সে সকল ব্যবস্থার অনুসারী দেশগুলোতে দুষ্প্রাপ্য সম্পদের দক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে বরাদ্দের বিষয়টি কিভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও একই পরিণতি হবে। চতুর্থ অধ্যায়ের আলোচনায় দেখা যাবে যে বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলোর প্রেক্ষিতে যে নীতিমালা প্রণয়ন হয়েছে, তা কিভাবে অর্থনৈতিক নীতি কৌশলের সাথে অসংগতিপূর্ণ হয়ে পড়েছে এবং তার প্রভাব উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও পড়েছে। এর ফলে সামষ্টিক অর্থনীতি ও বহির্দেশীয় ভারসাম্যহীনতা পরিস্থিতির শুধু অবনতিই ঘটাচ্ছে না, বরং ন্যায়পরতা আনয়নের লক্ষ্যকেও বানচাল করে দিয়েছে। দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে সাতটি অধ্যায় যাতে ইসলামের জবাব তুলে ধরা হয়েছে। এ অধ্যায়গুলোর প্রথমটিতে অর্থাৎ পঞ্চম অধ্যায়ে বিশ্ববীক্ষণ ও ইসলামের কৌশল এবং মাকাসিদের সাথে অন্তর্নিহিত সংগতির বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ষষ্ঠ অধায়ে মুসলিম বিশ্বের অস্থিরতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করে পাঁচটি নীতির বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ভারসাম্যহীনতা দীর্ঘায়িত না করে মাকাসিদ বাস্তবায়নের জন্য ইসলামী আদর্শের আলোকে মুসলিম দেশগুলোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। এ সকল নীতি কৌশলের উপর প্রতিটি আলাদা অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। এগুলো একটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ব্যবস্থার জন্য এতটা তাৎপর্যপূর্ণ যে, সকল আর্থ-সামাজিক সংস্কার এবং দক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এগুলো কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে স্থান করে আছে। অষ্টম অধ্যায়ে সম্পদের পুঞ্জিভূতকরণ হ্রাস করার বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে যা আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য দরকারি এবং ইসলাম এ মূল্যবোধ ব্যবস্থার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছে। নবম ও দশম অধ্যায়ে ইসলামের আর্থ-সামাজিক লক্ষ্য হাসিলের জন্য অর্থনৈতিক ও আর্থিক পুনর্গঠনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। একাদশ অধ্যায়ে ইসলামী আদর্শের নীতিগত বিষয়াদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কৌশলগত নীতি পরিকল্পনা সম্পর্কে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। উপসংহারে সমগ্র বইয়ের ১১টি অধ্যায়ের আলোচনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে। এর ফলে পাঠকরা সার্বিক বিষয়গুলোর সারমর্ম দেখতে পারবেন। যেহেতু এ গ্রন্থে মৌলিকভাবে অর্থনৈতিক সমস্যার আলোচনা করা হয়েছে, সেহেতু এতে ফালাহ ও হায়াতে তাইয়্যেবার অর্থনৈতিক সমস্যা সংক্রান্ত সংশ্লিষ্টতা ব্যতীত আধ্যাত্মিক দিকগুলোর উপর আলোকপাত করা হয়নি। একটি মাত্র পুস্তকে সকল মুসলিম দেশের সমস্যার আলোচনা অযৌক্তিক। অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে উচ্চ আয়, মধ্যম আয় ও নিম্ন আয়ের দেশগুলো বিভিন্ন ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করছে। অবশ্য এটা সত্য যে, তাদের সমস্যাগুলোর বৈশিষ্ট্য একই ধরনের, পার্থক্য শুধু তাদের মাত্রায়। তারা সবাই সম্পদের আপেক্ষিক দুষ্প্রাপ্যতায় ভুগছে। এসব সত্ত্বেও বিদ্যমান ভারসাম্যহীনতা আর দীর্ঘায়িত না করে 'মাকাসিদ' হাসিলের লক্ষ্যে কাজ করা মুসলিম দেশগুলোর অলঙ্ঘনীয় নৈতিক দায়িত্ব। সুতরাং তারা সবাই বিভিন্ন মাত্রায় এ আলোচনা থেকে উপকৃত হতে পারেন। এ গ্রন্থে অবশ্য প্রধানত দরিদ্রতর ও মধ্য আয়ের অধিকতর সমস্যা সংকুল দেশগুলো সম্পর্কেই আলোচনা করা হয়েছে।

নোট ও তথ্যসূত্র(ভূমিকা) ১. আল গাজালী, al-Mustafa(১৯৩৭), পৃষ্ঠা ১৩৯-৪০। ২. ইবন কাইয়্যেম আল-জাওজিয়াহ, I'lm al-Muwaqqi'in (১৯৫৫), খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৪। ৩. মানুষের বস্তুগত চাহিদা নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমাদের প্রথমেই নির্ধারণ করতে হবে যে, মানুষের অস্তিত্ব, স্বাচ্ছন্দ্য ও মানবীয় উন্নয়নে কী কী বিষয় সত্যিকারভাবে অবদান রাখে। এ কাজ কঠিন হলেও অসম্ভব নয়।এ বিষয়ে কেইনস এর মতামত সহায়ক হতে পারে। তিনি বলেন, যদিও "মানুষের চাহিদা দৃশ্যতঃ অপূরণীয়....; সেগুলো দু'টি শ্রেণীতে বিভক্ত। আমাদের চারপাশে মানব সমাজের অবস্থা যাই হোক না কেন, এক প্রকার চহিদা সুনিশ্চিতভাবে আমরা অনুভব করি, আর অপর এক প্রকার চহিদা পূরণ আমাদের চারপাশের মানুষের তুলনায় সৌভাগ্যের অধিকারী করে বা শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি দান করে। দ্বিতীয় শ্রেণীর যে সকল চাহিদা শ্রেষ্ঠত্বের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে, সেগুলো হয়ত সত্যিই অপূরণীয়। কারণ অবস্থান যত উপরেই হোক, আরো উপরে ওঠার সুযোগ থেকেই যায়। কিন্তু সুনিশ্চিতভাবে অনুভূত হয় এমন চহিদার ক্ষেত্রে একথা সঠিক নয়। (J. M. Keynes, The Collected Writtings of John Maynard Keynes, vol. IX, Essays in Persuasion, the essay on "Economic Possibilities for our Grandchildren", ১৯৭২ পৃষ্ঠা ৩২৬)। এই শ্রেণীবিভক্তির কারণ থেকে বোঝা যায় যে,সুনিশ্চিত চাহিদাগুলো মানুষের নিজের মধ্যেই সৃষ্টি হয় এবং মানবীয় অবস্থার কারনেই আবশ্যক হয়। মানুষের অস্তিত্ব, স্বাচ্ছন্দ্য ও মানবীয় উন্নতির জন্য এগুলোর প্রয়োজন। পক্ষান্তরে যে সকল চাহিদা আপেক্ষিক সে সকল চাহিদা, Galbraith এর ভাষায়, তার নিজের কারণেই উদ্ভাবিত(Galbraith, The Affluent Society: পৃষ্ঠা ১৫২)। তারা মর্যাদা বৃদ্ধিকারী সামগ্রী ও অন্য এমন সকল দ্রব্য ও সেবাকে চাহিদার অন্তর্ভূক্ত করে ফেলে, যেগুলো তাদের কল্যাণ বাড়ায় না। প্রথমটিকে বলা যায় চাহিদা এবং অপরটিকে অভাব। এই অভাব পূরণ করার আকাঙ্ক্ষা প্রচারণা ও অন্যের সমতুল্য হওয়ার সামাজিক চাপ থেকে কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি হয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তির নিজের সম্পদ দ্বারা নিজের ও তার উপর নির্ভরশীল লোকদের বস্তুগত চাহিদা পূরণ করার অবমতাকে দারিদ্র্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তবে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও চাহিদা পূরণ করা এক বিষয় নয়। এক ব্যক্তির চাহিদা অপর কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের সহায়তায় পূরণ যায় যেতে পারে। তবে ব্যক্তিকে নিজের প্রচেষ্টায় স্বীয় আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে সক্ষম করে তোলাই হচ্ছে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য। তবে ব্যক্তির শারীরিক বা মানসিক অবমতা অথবা উপযুক্ত কর্মসংস্থান যোগাড়ে অসুবিধার কারণে এ লক্ষ্য সর্বদা সফল নাও হতে পারে। ৪. মুহাম্মদ বাকির আল সদর এ বিষয়ে ইসলামের অবস্থান যথার্থই বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন যে, অ-সুষম বণ্টন এবং ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে মানবীয় সম্পের্কের নৈতিক কাঠামোর অনুপস্থিতির ফলেই দারিদ্র্য ও বঞ্চনার জন্ম হয়েছে( মুহাম্মদ বাকির আল সদর, Iqtisaduna(১৯৮১), পৃষ্ঠা ৩৪৩। ৫. এ বিষয়ে প্রচলিত অর্থনীতিবিদগণের উপস্থাপনা সুস্পষ্টভাবে জানার জন্য দেখুন Milton Rose Friedman, Free to Choose (১৯৮০), পৃষ্ঠা ৯-৩৭ এবং P.A. Samuelson, Economics (১৯৮০), পৃষ্ঠা ১৫-১৮। ৬. Arthur Lovejoy, The Great Chain of Being(১৯৬০), পৃষ্ঠা ৭। ৭. এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন Edward S. Greenberg, serving the Few: Corporate Capitalism and the Bias of Government Policy(১৯৭৪) এবং সেকুলার কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে দেখুন Claus Offe, Contradictions of the Welfare State, ed., John keane(১৯৮৪) সম্পাদিত। ৮. আম ও লেবু বীজের দৃষ্টান্ত সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী'র Islami Riyasat গ্রন্থের (১৯৮২), পৃষ্ঠা ৬৯৫ থেকে নেয়া হয়েছে। ৯. Edwin A. Burtt, The Metaphysical Foundations of modern Science(১৯৫৫), পৃষ্ঠা ২৭। ১০. 'ফালাহ' (কল্যাণ) শব্দটি আল কোরআনে অন্তত চল্লিশবার বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রতিদিন পাঁচবার মসজিদের মিনার থেকে কল্যাণের দিকে ডাকা হয়। এ ভাষা আজানে দু'বার উচ্চারণ করা হয়, "কল্যাণের দিকে আস"। ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মিক উন্নতি হলো মানুষের কল্যাণের অপরিহার্য উপাদান। আত্মিক উন্নয়ন ব্যতীত কল্যাণের যে কোনো প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।'হায়াতে তাইয়্যেবা' ভাষ্যটি কোরআনের এ আয়াত থেকে এসেছে: "যে সকল পুরুষ ও নারী সৎকর্ম করে ও ঈমান আনয়ন করে, তাদেরকে নিশ্চয়ই 'হায়াতে তাইয়্যেবা' দান করব এবং তাদেরকে তাদের কর্মের (পরকালে) শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব।" (১৬:৯৭) ১১. দেখুন, M. Anas Zarqa, "Capital Allocation, Efficiency and Growth in an Interest-free Islamic Economy, নভেম্বর ১৯৮২, পৃষ্ঠা ৪৯ এবং Islamics: An Approach to Human Welfare, K. Ahmed, Studies in Islamic Economics(১৯৮০), পৃষ্ঠা ৩-১৮। আরো দেখুন Benjamin Ward, What is Wrong with Economics? (১৯৭২), পৃষ্ঠা ২১১। ১২. দেখুন W. Breit এর Readings in Microeconomis (১৯৮৬) গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ৪) উল্লিখিত Frank H.Knight, The Economic Organisation এর পুন:মুদ্রিত Social Economic Organisation পৃষ্ঠা ৩-৩০. আমি (লেখক) ড. আনাস জাকরার নিকট কৃতজ্ঞ। তিনি এ প্রযুক্তির প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ১৩. Arab News, ২ মার্চ ১৯৮৮। ১৪. এখানে Gottfried Haberler- কে উদ্ধৃত করা প্রাসঙ্গিক হবে। তিনি বলেন, "কতিপয় উন্নয়ন অর্থনীতিবিদগণ যাকে 'monoeconomics' বলেন অর্থাৎ যে সকল নীতি উন্নত ও অনুন্নত দেশে একইভাবে প্রযোজ্য- আমি তাতে বিশ্বাস করি। কিন্তু monoeconomics অনুসরণ করলেও সকল দেশের নীতি নির্ধারণের পরিপ্রেক্ষিত এক হবে এমন কথা নেই।" (M. Meier সম্পাদিত. Pioneers in Development, দ্বিতীয় সিরিজ(১৯৮৭), পৃষ্ঠা ৫৩ এ উল্লিখিত Gottfried Haberler, Liberal and Illiberal Development Policy).

প্রথম ভাগ: ব্যর্থ মতবাদসমূহ

فَأَعْرِ‌ضْ عَن مَّن تَوَلَّىٰ عَن ذِكْرِ‌نَا وَلَمْ يُرِ‌دْ إِلَّا الْحَيَاةَ الدُّنْيَا ﴿النجم: ٢٩﴾ "অতএব যে আমার স্মরণে বিমুখ হয় এবং পার্থিব জীবনই কামনা করে তার থেকে আপনি মুখ ফিরিয়ে নিন।" আল কুরআন ৫৩:২৯ إِنَّ هَـٰؤُلَاءِ يُحِبُّونَ الْعَاجِلَةَ وَيَذَرُ‌ونَ وَرَ‌اءَهُمْ يَوْمًا ثَقِيلًا ﴿الانسان: ٢٧﴾ " নিশ্চয়ই এরা পার্থিব জীবনকে ভালোবাসে এবং এক কঠিন দিবসকে পশ্চাতে ফেলে রাখে।" আর কুরআন ৭৬:২৭

প্রথম অধ্যায়ঃ পুঁজিবাদ সীমাবদ্ধতা

প্রথম অধ্যায় পুঁজিবাদ সীমাবদ্ধতা এক দিকে প্রাণহীন বিশাল প্রাচুর্য, অন্যদিকে দারিদ্র্য প্রকৃতপক্ষে গভীর বিশৃঙ্খলারই প্রকাশ ও চিহ্ন। -টিবর সিটোকভস্কি ক্লাসিক্যাল 'লেইজে- ফেয়ার' ধারণা সম্বলিত পুঁজিবাদের অস্তিত্ব বর্তমান পৃথিবীর কোথাও নেই। শতাব্দীকাল ধরে এর পরিমার্জন ও পরিবর্তন ঘটেছে। পুঁজিবাদের ত্রুটিগুলো, বিশেষত অর্থনীতির উপর এর বিরূপ প্রভাব দূর করার জন্য বিভিন্ন সরকার সংশোধনমূলক বহু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ফলে অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে পুঁজিবাদ তার আকর্ষণীয় আবেদন অব্যাহত রেখেছে। সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতা, অর্থনীতিতে সরকারের বিশাল ভূমিকার নেতিবাচক ফলাফল এবং কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া প্রভৃতির কারণে পুঁজিবাদের আকর্ষণ আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। উদারনীতিবাদ বা স্বল্পতম সরকারি হস্তক্ষেপ সম্বলিত ক্লসিক্যাল মডেলে প্রত্যাবর্তনের প্রতি সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী মহলের আহবান বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু পাশ্চাত্যের শিল্পোন্নত জগতেই নয়, বরং তৃতীয় বিশ্বের বৃহদাংশে ও প্রাক্তন কমিউনিস্ট দেশসমূহে এ ধরনের চিন্তাধারা অর্থনৈতিক নীতিকে প্রভাবান্বিত করেছে। এমতাবস্থায় পুঁজিবাদী ব্যবস্থার যৌক্তিকতা কতটুকু, কোন উপাদানগুলো এর বিকাশে সহায়তা করেছে, এ ব্যবস্থা দ্বারা এর সাফল্য হিসেবে দাবিদার ও বহুল প্রচারিত উৎপাদন দক্ষতা এবং একই সাথে সম্পত্তি অর্জন করা সম্ভব কিনা তা খতিয়ে দেখা বাঞ্ছনীয়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সংশোধনমূলক পদক্ষেপের কতিপয় অংশ বর্তমান অধ্যায়ে এবং 'কল্যাণ রাষ্ট্র' শীর্ষক তৃতীয় অধ্যায়ে বাকি অংশ আলোচিত হয়েছে। পুঁজিবাদের পাঁচটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছেঃ (ক) পুঁজিবাদ ব্যক্তিগত মানুষের পছন্দের ভিত্তিতে সম্পদ বৃদ্ধি ও পণ্য উৎপাদন এবং চাহিদা পূরণকে মানব কল্যাণের জন্য সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করে, (খ) পুঁজিবাদ ব্যক্তিগত উদ্যোগকে উৎসাহিত করার জন্য ব্যক্তিমালিকানা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম গ্রহণে অবারিত স্বাধিনতাকে পুঁজিবাদ অপরিহার্য মনে করে, (গ) পুঁজিবাদ অর্থনৈতিক সম্পদ বণ্টনে সর্বোচ্চ দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রতিযোগিতামূলক বাজারে উৎপাদক শ্রেণী কর্তৃক বিকেন্দ্রীকরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে অত্যাবশ্যক মনে করে, (ঘ) উৎপাদন দক্ষতা বা ন্যায়সঙ্গত বণ্টন কোনো ক্ষেত্রেই সরকারের বৃহৎ ভূমিকার প্রয়োজন রয়েছে বলে পুঁজিবাদ মনে করে না, এবং (ঙ) পুঁজিবাদ দাবি করে, মানুষের ব্যক্তিস্বার্থ পূরণের মাধ্যমে সমাজের সামগ্রিক স্বার্থও পূরণ হবে।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থার যুক্তি: সামঞ্জস্যতার দাবি বাজারব্যবস্থার সামগ্রিক যুক্তির প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটা একই সাথে ব্যক্তিস্বার্থ ও সমাজস্বার্থকে সুষমভাবে সমন্বিত করে। মনে করা হয়, সার্বভৌম ভোক্তা হিসেবে মানুষ যৌক্তিকভাবে আচরণ করে এবং তাদের পছন্দ মোতাবেক সর্বনিম্ন মূল্যে পণ্যদ্রব্য ও সেবা ক্রয় করতে চেষ্টা করে। মানুষের এ পছন্দ এবং পছন্দনীয় সামগ্রীর জন্য বাজার মূল্য প্রদানে আগ্রহ বাজার অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। উৎপাদক শ্রেণী আবার ভোক্তা শ্রেণীর এ চাহিদা মোতাবেক সম্ভাব্য সর্বনিম্ন মূল্যে উৎপাদন এবং সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করে। ভোক্তা শ্রেণীর উপযোগিতামূলক বাজারে পণ্য ও সেবার মূল্য নির্ধারিত হয়। উৎপাদন উপকরণ, পণ্যসামগ্রী ও সেবার মূল্য নির্ধারণের এই পদ্ধতির মাধ্যমে অর্থনীতিতে ভোক্তা শ্রেণীর পছন্দের সাথে সর্বোচ্চভাবে সামঞ্জস্যশীল পণ্যসামগ্রীর উৎপাদন নিশ্চিত হয়। বাজার অর্থনীতিতে এভাবে নির্ধারিত দ্রব্যমূল্য কারো সচেতন প্রচেষ্টা বা সরকারি হস্তক্ষেপ ব্যতিরেকেই উৎপাদনের এক খাত হতে অন্য খাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পদ সঞ্চালন করে থাকে। বাজার অর্থনীতিতে যে পণ্যসামগ্রী উৎপাদিত হয় তা ভোক্তা সমাজের পছন্দের ফল, তাই একে সবচেয়ে দ্ক্ষ ব্যবস্থা বলা যায়। যেহেতু এ ব্যবস্থা পণ্যসামগ্রীর ইনসাফতিত্তিক উৎপাদনে বিভিন্ন উৎপাদন উপকরণের (শ্রম, ভূমি, পুঁজি ও উদ্যোক্তা শ্রেণী) অবদানের ভিত্তিতে তাদের আয় নির্ধারন করে দেয়, তাই এ আয় বণ্টন ব্যবস্থাকেও বলা যায়। ফলে ভোক্তা শ্রেণীর সর্বাধিক সন্তুষ্টি, উৎপাদক শ্রেণীর সর্বনিম্ন উৎপাদন খরচ, মজুরি ও লভ্যাংশসহ সকল উৎপাদন উপকরণের সর্বোচ্চ উপার্জন নিশ্চিত হয়। উপসংহারে তাই বলা যায়, বাজার অর্থনীতি শুধুমাত্র সম্পদ ব্যবহারে দক্ষতাই নিশ্চিত করে না, বরং আয় বণ্টনের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ ন্যায়পরতা নিশ্চিত করে। ব্যক্তি ও সামাজিক স্বার্থের মাঝেও বাজার ব্যবস্থা অর্থনৈতিক সুসামঞ্জস্যতা বিধান করে। এ ব্যবস্থা মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করে কিনা অথবা এর বন্টন ব্যবস্থা সুষম কিনা- এ প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক বলে বিবেচিত নয়। কেননা বাজার অর্থনীতির মূল্যব্যবস্থা পূর্ব নির্ধারিত, সামষ্টিক মূল্যবোধ নির্দেশিকা ছাড়া এ প্রসঙ্গের নিরপেক্ষ সমাধান সম্ভব নয়। সম্পদের বৈষম্য প্রশ্নটিও তাই যথাযথ নয়, কেননা ব্যক্তির সম্পদ পণ্য উৎপাদনে তার অবদানের উপর নির্ভরশীল। তাই সরকারি হস্তক্ষেপের প্রয়োজন ততটুকুই, যতটুকু সামগ্রীর প্রতিযোগিতা, সুস্থ বাজার, দ্রব্য সামগ্রীর সরবরাহের ত্রুটি দূরীকরেণের জন্য প্রয়োজন। প্রত্যেক প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্যকে একটি 'প্যারেটো অপটিমাম' (Pareto Optimum)বলে ধরা হয়। কারো অবস্থার কিছু অবনতি না ঘটিয়ে অন্য একজনের অবস্থার উত্তরণ ঘটানো সম্ভব নয় এবং এ অবস্থাকে 'দক্ষ' ও 'সুষম' বলে মেনে নেয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। 'দক্ষতা' ও 'ন্যায়পরতা'র এ সংজ্ঞার কাঠামোর সাথে তাই দারিদ্র্য দূরীকরণ, অভাবমোচন ও প্রয়োজন পূরণ, আয় ও সম্পদের বৈষম্য দূরীকরণের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। বরং ধরে নেয়া হয় যে, প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা দ্বারা যে 'দক্ষতা' ও 'ন্যায়পরতা' অর্জিত হবে, তার পরোক্ষ ফল হিসেবে এসব উদ্দেশ্যগুলো সাধিত হবে। প্যারেটো অপটিমালিটির কাঠামোর মধ্যে থেকে স্থিতাবস্থা পরিবর্তনের একমাত্র গ্রহণযোগ্য পন্থা হচ্ছে, কারোর অবস্থার অবনতি না ঘটিয়ে অন্যের অবস্থার উন্নতি ঘটানো। কিন্তু ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা যায় যে, ব্যক্তিস্বার্থ ও সমাজস্বার্থের মাঝে সমন্বয়ের এ দাবিটিতে শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে। এ ব্যবস্থা ন্যায়পরতা প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছে। মূলত 'ব্যক্তিস্বার্থের' দ্বারা পরিচালিত বাজারব্যবস্থার 'অদৃশ্য হাত' ডালটনের ভাষায় জন্ম দিয়েছে, "ভোগবাদের ফসল অমানবিক, অবহেলিত ও অন্যান্য এক সমাজ; সামাজিক বৈষম্য মালিক, শ্রমিক, ভূস্বামি ও প্রজা এবং শাসক ও শাসিতের মধ্যকার দ্বন্দ"। কারণ হচ্ছে তা পুঁজিবাদের যৌক্তিকতাভিত্তিক এমন কতগুলো পূর্বশর্তের ধারণা, উপর নির্ভরশীল যা বাস্তবসম্মত নয় এবং সাধারণ অবস্থার মাধ্যমে যা কার্যকর হয়নি বা কার্যকর করা যায় না। ব্রিটটান তাই যথার্থ বলেছেন, "বাজার অর্থনীতির মাধ্যমে সামাজিক সুফল পাওয়ার জন্য যেসব পূর্ব ধারণা, শর্ত ও সীমারেখা প্রয়োজন তা কখনো পূর্ব থেকে নির্ধারণ করে দেয়া হয়নি; বরং পুঁজিবাদের অধিকাংশ রীতিনীতি বিশেষ সমস্যা উদ্ভব হবার পূর্বে রচিত হয় না। যেহেতু ব্যক্তি ও সমাজস্বার্থের মধ্যে সমন্বয়ে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে পুঁজিবাদের সেকুলার ধারণাই সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে, তাই এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও উপাদানগুলো অবলোকন করা দরকার। সেকুলার মতবাদের উপর গুরুত্বারোপ জ্ঞানালোকের বিশ্বদুষ্টি(The Enlightenment Worldview) সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ থেকে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম পর্যন্ত প্রায় দুই শতাব্দীব্যাপী রেঁনেসা আন্দোলন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ধারণাকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে। 'রেঁনেসা' যা প্রায়শ 'যুক্তির যুগ' এর সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তার চূড়ান্তরূপে দেখা যায় যে, তারা খৃস্টিয় বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিরোধিতা করেছে। এ ধর্মবিরোধী ভূমিকার কারণসমূহ অনুসন্ধান করার অবকাশ এ পুস্তকে নেই। তবে অবশ্যই অন্যতম কারণ হিসেবে চার্চের দুর্নীতি ও কুপমণ্ডুকতাকে চিহ্নিত করা যায়। 'যাজকশ্রেণীর মাঝে ধর্মীয় অবস্থার অবনতি এত বিশাল যে, তা প্রমাণের জন্য হাজারো উদাহরণ উপস্থাপন করf যেতে পারে'। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এ যাজক- বিরোধী মনোভাব প্রত্যাদিষ্ট ধর্মের প্রতিও আস্থার ভিত নাড়িয়ে দেয়। ফলে চার্চের সাথে সম্পৃক্ত সকল প্রকার বিশ্বাসকেই "অগ্রহণযোগ্য" বলে ধরে নেয়া হয়। রেঁনেসার সামগ্রিক সময়ে ভলতেয়ারের "কুখ্যাত জিনিসটি ধ্বংস কর" এ বাণী প্রতিধ্বনি করে বেরিয়েছে। ডুরান্ট যথার্থই মন্তব্য করেছেন, যদি যাজক শ্রেণী সুরুচিশীল ও ভক্তিবাদী জীবনযাপন করত, তবে হয়ত খৃস্টিয় প্রত্যাদিষ্ট কিতাব ও ঐতিহ্যের মর্যাদাকে চার্চ রক্ষা করতে পারতো'। রেঁনেসা আন্দোলনের অগ্রগামী চিন্তানায়কগণ ধর্মীয় বিশ্বাসের বদলে মানব জীবনের ক্ষেত্রে যুক্তিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তাদের মতে, কেবলমাত্র প্রত্যক্ষ ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা হতে জ্ঞান অর্জন সম্ভব। আধ্যাত্মিক সত্যকে অনুভব বা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও কেবলমাত্র যুক্তিকেই সর্বাধিক প্রাধান্য প্রদান করা হয়। একের পর এক ক্ল্যাসিক চিন্তাবিদ লক, বার্কলি, হিউম, কান্ট বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সম্মানজনক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেন এবং তারা ঈশ্বরের অস্তিত্ব, আত্মার অমরত্ব, নৈতিক মূল্যবোধ, পারলৌকিক জীবন এবং অন্যান্য ধর্মীয় মতাদর্শের প্রতি সংশয় সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। হিউম ধর্মীয় বিশ্বাসকে আধিভৌতিক ও কল্পনাপ্রবণ বিভ্রম বলে অভিহিত করেন। এ ধরনের মন্তব্য নিউটনের জগত সম্পর্কে ধারণাকে গ্রহণযোগ্য করার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়তা করল। নিউটনের মতে, ঈশ্বর একজন ঘড়ি নির্মাতার মতো, যিনি এ জগৎ সৃষ্টি করে একে স্বয়ংক্রিয় ঘড়ির মতো চালিত করে দিয়েছেন, কিন্তু এরপর আর এর কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করেননি। ভলতেয়ার এ কথাটাই তার বহুল প্রচলিত প্রবচনে এভাবে ব্যক্ত করেছেন, "যদি ঈশ্বরের অস্তিত্ব নাও থাকত, তবে তাকে আবিষ্কার করে নেয়া প্রয়োজন হয়ে পড়ত"। বিশ্বের এ যান্ত্রিক ব্যাখ্যার ফলে মানব আত্মারও যান্ত্রিক ব্যাখ্যা করা শুরু হলো। মানুষকে অন্ধ, উদ্দেশ্যহীন প্রকৃতির স্বয়ংক্রিয় বিবর্তন প্রক্রিয়ার এক দুর্ঘটনাজাত উপজাত হিসেবে দেখা হলো। মানুষ এক অন্ধ নিষ্ঠুর শক্তির করুণার শিকার, যাকে ঐ শক্তি অজ্ঞাতসারে জন্ম দিয়েছে। যেসব প্রতিপাদ্যের উপর ধারণা অবয়ব লাভ করল তা কতটুকু বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত তা বিবেচ্য বলে গণ্য হলো না। বরং বিজ্ঞানের নামে এসব ধারণা স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে পরিগণিত হলো। ধর্মের বাধন, যা নৈতিকতা ও মানব ভ্রাতৃত্ববোধের মাধ্যমে জীবনের ভিত গঠন করে, তা এভাবে ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ল। যদি ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রশ্নের সম্মুখীন হয় অথবা মানব জীবনের জন্য কোনো তাৎপর্য বহন না করে, তবে মৃত্যুর পর পারলৌকিক জীবনে স্রষ্টার সামনে জবাবদিহিতার কোনো প্রশ্ন আসে না। যদি জীবনের কোনো চরম ও গূঢ় উদ্দেশ্য থাকেও, তবে দেকার্তের ভাষায় তা আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। মানব জীবনের উদ্দেশ্য এমন একটি ধারণা যা 'বৈজ্ঞানিকভাবে অর্থহীন' এবং ক্রমান্বয়ে সামাজিক চিন্তাধারা থেকে তা অপসৃত হচ্ছে। তদানুসারে বার্ট্রান্ড রাসেল মন্তব্য করেছেন, 'সকল যুগের সকল পরিশ্রম, সকল অনুপ্রেরণা, মানব প্রতিভার সকল ঔজ্জল্য এ সৌরজগতের মৃত্যুর সাথে অমোঘ নিয়তির মতো নিভে যাবে। মানবকীর্তির সকল সৌধ এ বিশ্বজগতের ধ্বংস্তূপের নিচে কবরস্থ হয়ে যাবে'। 'জীবনের যদি কোনো চূড়ান্ত উদ্দেশ্য না থাকে, তবে কোনো প্রকার উচ্চতর অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস ও আদর্শকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকারও কোনো অর্থ হয় না'। তাই জাঁপল সাত্রের ভাষায় 'মূল্যবোধের একমাত্র ভিত্তি হতে পারে মানবীয় স্বাধীনতা। কোন মূল্যবোধের ভিত্তিতে জীবন পরিচালিত হবে তার জন্য বাহ্যিক বা অতিলৌকিক কোনো নির্দেশনার প্রয়োজন নেই'। সামাজিক ডারউইনবাদ এ ধারণাকে আরো জোরদার করল। 'অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম' এবং 'যোগ্যতমের বেঁচে থাকার অধিকার' এ ধারণাদ্বয় শেকড় গেড়ে বসল।

বস্তুবাদ ও নির্ণয়বাদ(Materialism & Determinism) রেঁনেসা কর্তৃক ধর্মীয় ধারণা ও বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যানের ফলে সমাজ বিজ্ঞানে ব্যক্তি ও সামাজিক আচরণকে নিউটনের পদার্থ বিজ্ঞানের যান্ত্রিকগুণে ব্যাখ্যার প্রচেষ্টা শুরু হলো। লা মেটরি বললেন, মানুষের আচরণ পদার্থ বা রাসায়নিক কার্যকারণ ও প্রক্রিয়া ছাড়া আর কিছু নয়। 'পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ দ্বারা বস্তুর বুদ্ধিমত্তা আছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না'- এ ধারণা 'পজিটিভিজম(Positivism) আন্দোলন নামে দানা বেঁধে উঠল। এর ফলে যুক্তি ও বিজ্ঞান প্রাধান্য লাভ করল। মানুষের কর্মকান্ডকে যান্ত্রিকভাবে ব্যাখ্যার এ প্রচেষ্টার ফলে সমাজ বিজ্ঞান বস্তুবাদী ও নির্ণয়বাদী রূপ পরিগ্রহ করল। স্রষ্টায় অবিশ্বাসের পরিণতিতে সৃষ্টি হয়েছে বস্তুবাদ। বস্তুবাদী দর্শন অনুযায়ী বস্তুই হচ্ছে এ মহাবিশ্বের প্রথম বা মৌলিক সৃষ্টির ভিত্তি। কোনো উচ্চতর উদ্দেশ্য, চরম লক্ষ্য বা বুদ্ধিমত্তা দ্বারা এ মহাবিশ্ব পরিচালিত নয়। সব কিছুকে বস্তুর ভিত্তিতে ও প্রক্রিয়ায় ব্যাখ্যা করতে হবে। মানুষের আবেগ এবং মূল্যবোধ হচ্ছে এক ধরনের মানসিক প্রক্রিয়া বা বিভ্রম যার প্রকৃত কোনো ভিত্তি নেই। এর ফল দাঁড়ায় সম্পদ, দৈহিক সুখ ও ইন্দ্রিয় সম্ভোগ হচ্ছে সর্বোচ্চ বিষয় যা মানুষ অর্জন করতে পারে। বস্তুবাদ এভাবে বাণিজ্যিক সংস্কৃতির জন্ম দিল। বছরের পর বছর এরূপ ভোগ সংস্কৃতির লিপ্সা এত বৃদ্ধি পেলো যে, তার চাহিদা সীমিত সম্পদের সীমাকে ছাড়িয়ে গেল। নির্ণয়বাদকে মানবাত্মার সচেতন রূপকে অস্বীকার করার ফল বলা যায়। নির্ণয়বাদের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য দাঁড়ায়, এ মহাজাগতিক বিশ্বের সকল কিছু, ইতিহাসের সকল ঘটনাবলী তাদের ভৌতিক, সামাজিক বা মনস্তাত্ত্বিক কার্যকারণের উপর নির্ভরশীল এবং নিয়ন্ত্রিত। লক মানব মনকে 'টেবুলা রাসা' (tabula rasa) নামে অভিহিত করেছেন, যার কোনো নিজস্ব চরিত্র নেই। তার মতে, মানব মন হচ্ছে কাঁচামালের মতো যা বাহ্যিক আর্থ-সামাজিক শক্তিসমূহ দ্বারা রূপ ও আকৃতি লাভ করে। মার্কস ফ্রয়েড, ওয়াটসন এবং স্ক্রিনারের মতে 'মানুষের মন পরিবেশের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং এ পরিবেশ মানুষের মনের নিয়ন্ত্রনের বাইরের শক্তি। মানুষের আচরণকে তাই অন্যান্য প্রাণীর ন্যায় বাহ্যিক ক্রিয়ার প্রভাবে সৃষ্ট স্বয়ংক্রিয় ও যান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া বলা যায়'(ওয়াটসন ও স্ক্রিনার)। ফ্রয়েডের মতে, 'এ আচরণ হচ্ছে অবচেতন মনের প্রতিক্রিয়া'। আর মার্কসের মতে 'মানুষের আচরণ আর্থ-সামাজিক অবস্থার বিক্রিয়ার প্রতিফলন'। মানবসত্তার জটিলতা ও স্বাতন্ত্র্যকে অগ্রাহ্য করা ছাড়াও নির্ণয়বাদ ব্যক্তিমানুষের কার্যকলাপের জন্য স্বীয় নৈতিক দায়দায়িত্বকেও অস্বীকার করেছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, নির্ণয়বাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি ধর্মীয় চিন্তার সম্পূর্ণ বিপরীত। ধর্মীয় মতে 'সকল কাজের জন্য স্রষ্টার নিকট জবাবদিহিতা রয়েছে'।

অসফল প্রতিবাদ মানুষ ও বিশ্ব সম্পর্কে এই যে যান্ত্রিক ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে, তার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবাদ হয়নি এমন নয়। রুশো, কান্ট ও বার্গসনের মতো রোমান্টিক ও আদর্শবাদী দার্শনিক এবং অসংখ্য ধর্মবেত্তাগণ তীক্ষ্ম প্রতিবাদ উচ্চারণ করেন। তারা জ্ঞানের ক্ষেত্রে যুক্তির সীমাবদ্ধতাসমূহের উপর আলোকপাত এবং অনুভূতি ও সংজ্ঞার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। এভাবে তারা মহাজাগতিক বিশ্ব পরিকল্পনায় মানুষের অনন্য অবস্থানকে চিহ্নিতও করতে চান। তারা রেঁনেসা চিন্তাধারার অন্তঃসারশূন্যতাকে তুলে ধরেন। ওয়ার্ডসওয়ার্থ ভলতেয়ারের 'কেনডাইড'-কে (Candide) "ভাঁড়ের কলম হতে বেরিয়ে আসা অখাদ্য" হিসেবে বর্ণনা করেন। রোমান্টিক দার্শনিকদের দৃষ্টিতে রেঁনেসাবাদী দার্শনিকগণের দর্শন অনুভূতিহীনতা, নিরেট যান্ত্রিকতা, অবাস্তবতা ও অমানবিকতার দোষে দুষ্ট। কিন্তু পাশ্চাত্যে সেকুলারতার যে জোয়ার উত্তাল হয়ে উঠেছিল, রোমান্টিক দার্শনিকগণের প্রচেষ্টা তা রোধ করতে ব্যর্থ হয়। দেকার্তে, স্পিনোজা লিবনিজ এবং লকের মতো রেঁনেসার প্রাথমিক চিন্তাবিদগণ তাদের যুক্তিবাদ বা প্রত্যাদিষ্ট ধর্মের প্রতি বিরোধিতাকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যাননি। কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ভলতেয়ার, হিউম এবং হলব্যাচের মতো চিন্তাবিদগণ ছিলেন ভিন্নতর। তারা শুধু অধিকতর বস্তুবাদীই ছিলেন না, বরং তারা ছিলেন ধর্মের প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন। ফলে রেঁনেসা আন্দোলন যা কতিপয় বুদ্ধিজীবীর মাধ্যমে সূচিত হয়েছিল, তা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে প্রভাবিত করে একসময় বুদ্ধিজীবী সমাজের বৃহদাংশসহ জনসাধারণের উল্লেখযোগ্য অংশকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আকৃষ্ট করে ফেলে। ই. এফ. শুমেকারের ভাষায়, 'উনবিংশ শতাব্দীর এই মতাদর্শ শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে আজকের পশ্চিমারা বিশেষত আমেরিকানরা এখনো রেঁনেসা যুগের আত্মিক সন্তান'। রেঁনেসা চিন্তাধারার জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও স্রষ্টায় বিশ্বাস, আস্থা ও আশা মানব হৃদয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহে দৃঢ়মূল ছিল এবং তারা যুক্তিবাদী ধ্যানধারণার কাছে আত্মসমর্পণ করেনি। সার্বিক নিরশ্বরবাদের অস্তিত্ব যেমন আজকে নেই তেমনি রেঁনেসা যুগেও ছিল না। প্রকৃতপক্ষে তখন যা ঘটেছিল তা হলো, রেঁনেসা চিন্তাধারার মোকাবিলায় সমাজে সম্মিলিত শক্তি হিসেবে ধর্মের ভূমিকা হ্রাসপায় এবং সেকুলারমতবাদ ধর্মের স্থান দখল করে নেয়। ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। নৈতিক মূল্যবোধ তার সামাজিক আইনগত ক্ষমতা হারায় এবং সামাজিক নৈতিক মূল্যবোধ অপরিচিত বিষয়ে পরিণত হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নৈতিক শিক্ষাসূচি কদাচিৎ বাধ্যতামূলক করা হয়, ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে তা আর ছাত্রদের আকর্ষণ করল না। কেননা শিক্ষার্থীরা বাস্তব জগতে যা তাদের জন্য লাভজনক হবে, সেসব বিষয়ের প্রতিই মনোযোগী হলো। নৈতিক ছাঁকনির অভাব ধর্মের আর্থ-সামাজিক গুরুত্ব তার মূল্যবোধের সামাজিক প্রয়োগশক্তির উপর নির্ভরশীল। তাহলেই কেবল আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ের উপর ধর্মের প্রভাব অক্ষুণ্ণ থাকে। এমতাবস্থায় ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি অনাস্থার ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিকে দুঃখজনক বিপর্যয় বলা হয়। কেননা এর ফলে সমাজ জীবনকে মন্দ হতে পরিশুদ্ধ রাখার আর কোনো ব্যবস্থা থাকে না। স্বার্থপরতা, জিনিসপত্রের মূল্য ও মুনাফা ধর্মীয় মূল্যবোধের স্থান দখল করে নেয় এবং তা সম্পদের বণ্টন, চাহিদা ও সরবরাহের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। ব্যক্তি মানুষের অভ্যন্তরীণ চেতনার মধ্যে কার্যকর বিবেকবোধ তখনো কিছুটা নিয়ামকের ভূমিকা পালন করলেও ব্যক্তিস্বার্থ ও সমাজস্বার্থের মধ্যে সমন্বয় বিধানের জন্য যে সামগ্রিক নিয়ামক ব্যবস্থ থাকা দরকার তা আর কার্যকর থাকে না। ধর্মীয় মূল্যবোধের নিয়ামক ব্যবস্থাকে অস্বীকারের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় অনুশাসন দুর্বল হয়ে পড়ায় একই স্রষ্টার সৃষ্টি সকল মানুষের ন্যায়পরতা ধারণাটি ধূলিস্যাৎ হয়ে পড়ে। উক্ত অনুশাসনের উদ্দেশ্য ছিল সীমিত সম্পদের সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে সকল মানুষের অভাব পূরণ এবং সম্পদ ও আয়ের সুষম বণ্টন। ইতিহাসের ব্যাপক অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে টয়েনবি ও ডুরান্ট এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, ধর্মীয় অনুশাসন ও মূল্যবোধ ব্যতিরেকে নৈতিক উচ্চমান ও সামাজিক সংহতি অর্জন সম্ভব নয়। টয়েনবি'র ভাষায়, 'ধর্ম মানুষের মাঝে সামাজিক দায়িত্বানুভূতিকে ধ্বংসের পরিবর্তে বৃদ্ধি করে। মানুষে মানুষ ভ্রাতৃত্ববোধের পূর্বশর্ত হচ্ছে সব মানুষের পিতা তথা স্রষ্টা হিসেবে ঈশ্বরের ধারনা। যদি মানব পরিবারের পিতা হিসেবে স্রষ্টাকে স্বীকার করে নেয়া না হয়, তবে মানব সমাজকে এক সূত্রে বন্ধনের আর কোনো বিকল্প থাকে না'। উইল এবং এরিয়েল ডুরান্টও জোরালোভাবে মন্তব্য করেছেন যে, ' ধর্মের সাহায্য ব্যতিরেকে কোনো সমাজ উচ্চ নৈতিক মান বজায় রেখেছে ইতিহাসে এর কোনো উদাহরণ নেই। উপযোগবাদ (Utilitarianism) ধর্মীয় অনুশাসন হতে যে সামাজিক শুভবুদ্ধি ও চেতনা জাগ্রত হয় তার অনুপস্থিতিতে কিভাবে ভালোমন্দ, কাঙ্ক্ষিত-অনাকাঙ্ক্ষিত অথবা ন্যায়-অন্যায় নির্ণয় করা যাবে? জেরেমি বেস্থাম, যিনি নিজে ছিলেন একজন নাস্তিক, এই প্রশ্নের উত্তর দেবার প্রয়াস পান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো সদুত্তর তিনি খুঁজে পাননি। নৈতিক মূল্যবোধের স্থান অধিকারী উপযোগবাদের ভোগবাদী মতবাদ হচ্ছে, যা কিছু কষ্টদায়ক তাই মন্দ। এভাবে আনন্দ ও কষ্টের ভিত্তিতে নির্ণীত হবে ভালোমন্দ, ন্যায়-অন্যায়ের মাপকাঠি। উপযোগবাদের এই নীতিকে অনেকটা গাণিতিক অংক শাস্ত্রের মতো মনে করা হলো। ১৭৭৯ সালে রেভারেন্ড জন ফরস্টারকে লিখিত এক পত্রে বেস্থাম বলেন, 'উপযোগবাদ এমন এক দৈব শক্তির ন্যায় যা ভালোমন্দ সম্পর্কিত সকল প্রশ্নের সমাধান দিতে পারে'। তাই যে ব্যক্তি তার উপযোগ বৃদ্ধির চেষ্টা করেন তিনি একজন ভালো লোক এবং একটি ভালো সমাজ হচ্ছে তাই, যা তার সামগ্রিক উপযোগ বৃদ্ধির চেষ্টায় নিয়োজিত। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধির চেষ্টায় যদি প্রত্যেক ব্যক্তি নিয়োজিত হয়, তাহলে সর্বাধিক মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত হবে। ব্যক্তিস্বার্থ ও সামাজিক স্বার্থের মাঝেও সমন্বয় সাধিত হবে। বেস্থামের মতে, প্রত্যেক ব্যক্তি তার স্বীয় স্বার্থ অনুযায়ী পরিচালিত হবার অধিকার রাখে। সুতরাং বেস্থামের যুক্তি অনুযায়ী মানবাধিকার ক্ষুণ্ণ হবার ধারণা একটি 'সারহীন বাহুল্য কথা মাত্র'। যেহেতু সুখ হচ্ছে একটি মানসিক অবস্থা, সেহেতু কী কী উপাদান ব্যক্তি ও সমাজের সুখ বৃদ্ধি করে তার বিস্তৃত বিবরণ ও ব্যাখ্যা নেই বলে উপযোগিতাবাদ নীতিকে অস্পষ্ট ও অকার্যকর বলা যেতে পারে। লক্ষ কোটি মানুষের সুখকে পরিমাপ ও যোগ করা সম্ভব নয় বিধায় বিকল্প উপযোগবাদ নীতির মাধ্যমে কতটুকু সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য অর্জন সম্ভব তাও নির্ণয় করা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে কোনো প্রকার সর্বসম্মত ঐকমত্যে পৌঁছা সম্ভব নয়। কেননা সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তি তার স্বীয় স্বার্থের অনুসরণ করে; স্বীয় স্বার্থান্বেষণ অন্যের কল্যাণ-অকল্যাণের উপর কি প্রভাব ফেলবে সে বিষয়ে কোনো ব্যক্তি সচেতন নয়। তাছাড়া ক্ষমতাশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ নিজেদের অনুকূলে শক্তি ও ক্ষমতা খাটিয়ে অনেক কিছু করতে পারে। এখানে রাউলস এর 'অজ্ঞতার পর্দা' (veil of ignorance) নামক নীতির উল্লেখ করা যেতে পারে। সমাজের প্রত্যেকটি লোক তার নিজের স্বার্থ, সামাজিক অবস্থান, তার শ্রম ও প্রতিভা সম্পর্কে বাজার মূল্যের আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত উপাদান সম্পর্কে না জেনেই যদি নিজ নিজ পছন্দ বা অগ্রাধিকার ব্যক্ত করতে থাকে, তবে তা হবে একটি কল্পনাবিলাসী ব্যাপার। একটি সামাজিক সংগঠনের ন্যায়ভিত্তিক নীতিমালা হিসেবে এটি কার্যকরভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাই এই উপসংহারে উপনীত হওয়া যায় যে, উপযোগবাদ সাধারণ স্বাচ্ছন্দ্য বা ন্যায়নীতির কোনো দিকনির্দেশনা দিতে পারে না। বরং কোনো সুনির্দিষ্ট জবাব দিতে অক্ষম এমন হাজার প্রশ্নের জন্ম দেয়। অধিকন্তু, ধর্ম যেভাবে মানুষকে সামাজিক বাধ্যবাধকতা মেনে চলায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে, উপযোগবাদ তা করতে পারে না। তাই পশ্চিমা বিশ্বেও উপযোগবাদের বিরোধিতা দেখা যায়। এ সবের ফলশ্রুতিতে নৈতিক নীতিমালার বিষয়ে উপযোগবাদের দৃষ্টিভংগির প্রতি সামগ্রিক বিকর্ষণ পরিলক্ষিত হয়। এতদসত্ত্বেও গত দু'শতাব্দী ধরে পশ্চিমা দর্শনের উপর উপযোগবাদ ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। পশ্চিমা জীবনাচরণ ও চিন্তাধারা বাকি বিশ্বকেও উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করেছে। উপযোগবাদ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য হিসেবে পরিচিত প্রয়োগবাদ উভয়ই নৈতিক মূল্যবোধের ধারণাকে পাল্টে দিয়েছে। প্রয়োগবাদ ধর্মীয় আবরণ হতে মুক্ত করে সেকুলার ব্যক্তি মানুষের কোনো কিছুর 'প্রয়োজনীয়তা' এবং 'আর্থিক মূল্যে'র ভিত্তিতে নৈতিক মূল্যবোধের নতুন সংজ্ঞা নির্মাণ করেছে। ফলে বিশেষ কোনো নীতিমালার প্রতি আস্থা এবং সামাজিক ঐকমত্যের জন্য মানুষের সর্বসম্মত কোনো নৈতিক আচরণের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়। কেননা কোনো বিশেষ নৈতিক নীতিমালা দ্বারা আর্থিকভাবে কে কতটুকু লাভবান হবে, সে সম্পর্কে মানুষ ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করে। বার্ট্রান্ড রাসেলের ভাষায়, "সমাজের অধিকাংশ মানুষ অন্য মানুষের কল্যাণের চেয়ে নিজের সুখ সুবিধার প্রতি অধিক আগ্রহশীল"। উপযোগবাদ মানুষের সম্পদ ও দৈহিক ভোগলালসাকে যৌক্তিক ভিত্তি প্রদান করে। এই মতবাদ ভোগকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তথা মানুষের সকল শ্রম-সাধনার চূড়ান্ত লক্ষ্য বলে নির্ধারণ করে। উপযোগবাদের মতে, উপার্জন বৃদ্ধি ও ভোগ চরিতার্থকরণ একটি উৎকর্ষ মূল্যবোধ। এ লক্ষ্যে যা কিছু করা হবে তা হবে ন্যায়সংগত। এভাবে ব্যক্তিস্বার্থ পূরণের মাধ্যমে সামাজিক স্বার্থও পূরণ হবে। প্রকৃত প্রস্তাবে এই দর্শন নৈতিক মুল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের সৃষ্টি করে। ১৯৭৮ সালে আলেকজান্ডার সোলঝেনিৎসীন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বক্তৃতায় বলেন, 'দু'শত বছর এমনকি পঞ্চাশ বছর পূর্বেও আমেরিকায় একথা কল্পনা করা যেত না যে, একজন মানুষকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছাড়া ব্যক্তিগত খেয়ালখুশি চরিতার্থ করার জন্য অসীম স্বাধীনতা প্রদান করা হবে। পরবর্তীতে পশ্চিমা জগতের সর্বত্র সবধরনের বাধা নিষেধ উঠে গেল। শতাব্দীব্যাপী যে খৃস্টিয় মূল্যবোধের ঐতিহ্য বজায় ছিল তার বন্ধন হতে সমগ্র পাশ্চাত্য জগত মুক্ত হয়ে গেল'। কৌশলসমূহের ব্যর্থতা কতিপয় অসমর্থনযোগ্য ধারনা অর্থনীতিতে জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে কতিপয় ধারণার প্রবর্তন পুঁজিবাদের ভিত্তি ও কৌশল নির্মাণে সহায়তা করেছিল। অর্থনীতির সূত্র এই সব বিশ্বাসের অন্যতম হচ্ছে, বিশ্বজগত সম্পর্কে যান্ত্রিকতার ধারণাকে সমাজ বিজ্ঞানের উপর অর্পণ করে বলা দেয়া হয়েছে যে, পদার্থ জগত যেভাবে আচরণ করে বা যেভাবে একে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, অনুরূপভাবে মানুষের আচরণকেও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এডাম স্মিথ নিউটনের পদার্থবিদ্যার অনুসরণে সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন সম্পর্কে অভিমত ব্যক্ত করেন যে, জড় জগতের সামঞ্জস্যতা ও ছন্দময়তার মতোই আর্থ-সামাজিক জীবনেও যান্ত্রিক নিপুণতায় ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ঘটে। এভাবে স্মিথ থেকে অর্থনৈতিক সূত্রাবলীকে নিউটনের সূত্রসমূহের মতো গাণিতিক বলে গণ্য করা হতে লাগল। মানুষের যৌক্তিক অর্থনৈতিক আচরণ দ্বিতীয় ধারণা হলো, "মানুষের অর্থনৈতিক আচরণ সব সময় যুক্তিবুদ্ধির ভিত্তিতে হবে"- এই ধারণাটি আধুনিক অর্থনীতির মূল কথা। মানুষ কেবলমাত্র ব্যক্তিস্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হয়। জেভনস এর ভাষায় 'মানুষের সমগ্র আচরণ স্বীয় স্বার্থ ও উপযোগিতা দ্বারা সুনিপুণভাবে তথা যান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হয়'। ফ্রিডম্যান বলেন,'মানুষের একমাত্র সামাজিক দায়িত্ব হচ্ছে মুনাফা বৃদ্ধির জন্য কাজ করা'। অর্থনীতির এই সব সূত্র ব্যক্তিস্বার্থকে যুক্তিশীলতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ দেখে। এজওয়ার্থ তাই সুউচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা করেন, অর্থনীতির প্রথম সূত্র হচ্ছে, 'প্রত্যেকটি অর্থনৈতিক এজেন্ট তার স্বীয় স্বার্থবোধ দ্বারা উজ্জীবিত'। প্রায় সকল আধুনিক অর্থনৈতিক মডেলই এই নীতিমালার ভিত্তিতে রচিত। কিন্তু বাধাবন্ধনহীনভাবে এভাবে ব্যক্তিস্বার্থকে অনুসরণের মনোভাব ও মতবাদকে সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে কলুষমুক্ত মনে করতে পশ্চিমের খৃষ্টিয় সমাজে সামাজিক আশীর্বাদ বা গ্রহণযোগ্যতা লাভের জন্য নতুন ধারণা প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সে ধারণাটি হচ্ছে, প্রকৃতির মধ্যে মধ্যাকর্ষণ শক্তি যেভাবে সামঞ্জস্যতা বিধানের কাজ করে, তদ্রুপ ব্যক্তি মানুষের স্ব-স্ব স্বার্থের অনুসরণও সমাজ জীবনে শৃঙ্খলা ও সামঞ্জস্যতা বিধানের কাজ করে। এডাম স্মিথ যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, যদি প্রত্যেকে স্ব-স্ব স্বার্থ অনুযায়ী চলে তবে প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজার অর্থনীতির 'অদৃশ্য হাত' সমগ্র সমাজের সামগ্রিক স্বার্থকে রক্ষা ও নিশ্চিত করবে এবং এভাবে ব্যক্তি ও সমাজে স্বার্থের মাঝে সমন্বয় সাধিত হবে। তাই দেখা যাচ্ছে, নিয়ন্ত্রণহীন ব্যক্তিস্বার্থ প্রকৃতপক্ষে সামাজিক স্বার্থকেই সংরক্ষণ করছে। ব্যক্তিস্বার্থকে এভাবে এক ধরনের পবিত্রতা দানই অর্থনীতিতে এডাম স্মিথের অন্যতম প্রধান অবদান। অর্থনীতির অধিকাংশ পণ্ডিতই একমত যে, মানুষের অর্থনৈতিক আচরণ যুক্তির ভিত্তিতে পরিচালিত। তবে এই যৌক্তিতার স্বরূপ কি তা নিয়ে কিছুটা বিতর্ক রয়েছে। কেবলমাত্র আর্থিক স্বার্থ ও পারস্পারিক সমাঞ্জস্যতাকে অর্থনৈতিক যুক্তির উপাদান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এই আর্থিক স্বার্থের আওতায় পড়ে সীমাহীন সম্পদ আহরণের প্রয়াস ও যথেচ্ছ ভোগবিলাস। যৌক্তিক আচরণের বিষয়ে মানুষের ব্যক্তিগত মূল্যবোধ, জীবনের উদ্দেশ্য, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং অন্যান্য মানবিক দিককে বিবেচনার মধ্যে ধরা হয়নি। যেহেতু উল্লিখিত এই সব উপাদান ও বিষয়কে পরিমাপ করা যায় না, তাই ক্লাসিক্যাল অর্থনীতি ও পুঁজিবাদের সূত্রের মাঝে এসব উপাদানগুলো কোনো তাত্ত্বিক দখল করে নিতে পারেনি। নেয়ায়িক প্রত্যক্ষবাদ(Positivism) তৃতীয় ধারণাটি হচ্ছে 'পজিটিভ' অর্থনীতির ধারণা। এর সংজ্ঞা অনুযায়ী কোনো রকম নৈতিক রূপরেখা বা মূল্যবোধের সাথে অর্থনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। অর্থনীতিতে মূল্যবোধের বিশ্লেষণ অপ্রাসঙ্গিক । অর্থনীতির এভাবে সম্পূর্ণভাবে মূল্যবোধের সাথে সম্পর্ক রহিত হয়ে যায়। প্রায় সব অর্থনীতিবিদই ক্রমান্বয়ে এ ধরনের মতের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন। 'প্যারেটো অপটিমাম' কে 'অর্থনৈতিক দক্ষতা'র সাথে সমার্থক ধরা হয় এবং এ তত্ত্বটি কল্যাণ অর্থনীতির প্রিয়পুত্র হিসেবে পরিচিত লাভ করে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থার ফলশ্রুতিতে যদি লক্ষ লক্ষ লোক মনে করে যে তারা ভালো অবস্থায় আছে, কিন্তু এক ব্যক্তি যদি মনে করে যে সে ভালো অবস্থায় নেই, তাহলে অর্থনীতিবিদ তার প্রস্তাবিত নীতির প্রত্যাশা সম্পর্কে মূল্যায়ন করা স্থগিত রাখতে বাধ্য হন। হার্ভে লিভেনস্টেইন বলেন, 'যেখানে সার্বজনীন সম্মতি নেই, এবং যেখানে কিছু লোক বলে ভালো আছি, অন্যান্যরা মনে করে খারাপ আছি, সেখানে কল্যাণ অর্থনীতিবিদরা ঘোষণা করতে পারেন না যে কল্যাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যভাবে বলা যায় যে, যারা পরিবর্তন চায় 'প্যারেটো অপটিমাম' তাদের ভেটো ক্ষমতা প্রদান করে। এর ফলে নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়া হয়ে পড়েছে পক্ষাঘাতগ্রস্ত, নিস্ক্রিয়, বৈচিত্র্যহীন, লাগামহীন, বিশেষ করে বস্তুবাদী সমাজে, যেখানে সকল গোষ্ঠী প্রত্যেকেই নিজ নিজ স্বার্থ আদায়ে সচেষ্ট থাকে। অর্থনীতিবিদ 'সে' (Say) এর সূত্র চতুর্থ ধারণাটি হচ্ছে অর্থনীতিবিদ 'সে' এর সূত্র। 'সে' নিউটনের পদার্থবিদ্যার সূত্রকে অর্থনীতিতে প্রয়োগ করেছেন। এই মহাবিশ্ব যেভাবে স্বয়ংক্রিয় ও সূচারুরূপে চলেছে, সেভাবে অর্থনীতিকে হস্তক্ষেপহীন অবস্থায় ছেড়ে দিলে তা সেরকম সুচারুরূপে চালিত হবে। উৎপাদন তার নিজস্ব চাহিদার জন্ম দেবে। অতিরিক্তি উৎপাদন বা বেকারত্ব সৃষ্টি হবে না। অতি উৎপাদন বা বেকারত্বের কোনো প্রবণতা দেখা দিলে তা আপনাআপনি সংশোধিত হয়ে যাবে। অর্থনৈতিক নিয়মকানুন ও সূত্রাবলী সার্বিকভাবে শক্তিশালী এবং এর জন্য বাইরের কোনো হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই। সূচারু অর্থনীতি পরিচালনায় সরকারের কোনো ভূমিকাই যেহেতু নেই, তাই অনর্থক হস্তক্ষেপ থেকে সরকারের দূরে থাকাই শ্রেয়। বাজার শক্তিসমূহ ক্রিয়া-বিক্রিয়ার মাধ্যমে শৃঙ্খলা, সামঞ্জস্যতা, দক্ষতা ও ন্যায়পরতা নিশ্চিত করবে। যে বাজারব্যবস্থা আপনাআপনি ভিতর থেকে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে, সেখানে সরকারের অনাহুত হস্তক্ষেপ বরং বিকৃতি ও অদক্ষতারই জন্ম দেবে। মানুষ ও বিশ্ব সম্পর্কে যান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হবার এই মতবাদ তাই বাজার শক্তির কার্যকারিতার বিষয়ে এক অন্ধ বিশ্বাসের জন্ম দেয়। সামাজিক ডারউইনবাদ ব্যক্তিস্বার্থের অন্ধ অনুসরণ ও পজিটিভ অর্থনীতিকে দুষণমুক্ত বলে যে পবিত্রতার আচ্ছাদন প্রদান করা হলো, তার ফলাফল সুদূরপ্রসারী বলে দেখা দিলো। যুগ যুগ লালিত আর্থ-সামাজিক ন্যায়নীতি এসং সম্পদ ও আয়ের সুষম বণ্টনের ধারণা ও বিশ্বাস বিরাট ধাক্কার সম্মুখীন হলো। নতুন ধারণা অর্থনীতিবিদের সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি দান করল। তাদের প্রচারিত আর্থিক মতবাদ অপর্যাপ্ত ও অন্যায়- এই মন্তব্য হতেও পজিটিভ অর্থনীতির মূল্যবোধ- নিরপেক্ষ ধারণা তাদের অব্যাহতি প্রদান করল। ফলে অর্থনীতিবিদের কাজ দাঁড়ালো উপাত্ত-তথ্যের বিবরণ বিশ্লেষণ করা, নৈতিক মূল্যমান বিচার করা নয়। উপর্যুক্ত মতবাদের নিরিখে একজন দরিদ্র ব্যক্তি এক ডলার খরচ করে যে উপযোগ সন্তুষ্টি লাভ করবে, তা একজন লাখপতির এক ডলার খরচের সন্তুষ্টির চেয়ে অনেক বেশি- এ ধরনের তুলনামূলক বিশ্লেষণের কোনো অবকাশ নেই এবং তা করা হলে তাকে অবৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা বলে আখ্যায়িত করা হবে। আর্থ-সামাজিক ন্যায়নীতির প্রতি প্রদর্শিত এই উপেক্ষার প্রেক্ষাপটে ইংরেজ অর্থনীতিবিদ থমাস ম্যালথাস (১৭৬৬-১৮৩৪) খৃস্টিয় সমাজে উচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা করেন, 'জনসংখ্যার চাপে পিষ্ট এ পৃথিবীতে কোনো নতুন শিশু যদি জন্মগ্রহণ করে, যাকে তার পিতামাতা ভাণপোষণ করতে পারে না, প্রাপ্তবয়স্ক হবার পর বাজারে যার শ্রমের কোনো চাহিদা নেই, তার খাদ্য দাবি করার প্রকৃতপক্ষে কোনো অধিকার নেই; বস্তুত এ পৃথিবীতে জন্মলাভ করারই তার অধিকার ছিল না। প্রকৃতির হিংস্র মুষ্টির নিচে তার কোনো আশ্রয় নেই। প্রকৃতি তার অস্তিত্বকে স্বীকার করে না এবং তার ধ্বংসের আদেশকে প্রকৃতি ত্বরিৎ গতিতে কার্যকর করে'। সামাজিক ডারউইনবাদ অর্থনীতিতে অনুপ্রবেশ করে নৈতিকতা ও ন্যায়নীতির সংজ্ঞা পাল্টে দিলো। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব নিয়ে আর কেউ মাথা ঘামানোর প্রয়োজন অনুভব করলো না। অর্থনীতির এই নবতত্ত্বের ছত্রছায়ায় ধনীরা বিবেকের দংশনবোধকে ঢেকে রাখল। দরিদ্র ও বেকারদের অলস, অস্থিরমতি, অসৎ বা উদ্যমহীন বলে মনে করা হলো। তাদের ভর্তুকি প্রদানের যে কোনো উদ্যোগ বাজার অর্থনীতিকে ভণ্ডুল করে যোগ্যতা অনুসারে পুরস্কার দেবার সুন্দর ব্যবস্থাকে সাবোটাজ করার অপচেষ্টা বলে অভিহিত করা হলো। সমাজের এই সব দরিদ্র বেকারদের ভাতা প্রদানের উদ্যোগ হবে উদ্যমী, পরিশ্রমী, উৎপাদনশীল ব্যক্তিবর্গকে দণ্ডদান করা, যার ফলে উৎপাদনশীলতা হ্রাস পেয়ে সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমন প্রচেষ্টাও নেয়া হলো যে, অর্থনীতির উপযুক্ত বিবৃতিতে যদি কাজ না হয় তবে পাদ্রীদের মুখ থেকে উচ্চারণ করা হবে যে, দারিদ্র্য পাপের শাস্তি এবং ধন সম্পদ হচ্ছে পূণ্যের পুরস্কার। এভাবে সমাজের প্রভাবশালী মতটি দাঁড়াল, ধনিক বণিক উৎপাদক শ্রেণীর বিপক্ষে দরিদ্র শ্রেণীকে যদি বেঁচে থাকতে হয়, তবে সামাজিক ভর্তুকির সাহায্যে নয়, বরং ব্যক্তিমানুষের দান দাক্ষিণ্যের উপর তাদের টিকে থাকতে হবে। এসব মতামত বিভিন্নভাবে ও বিভিন্ন ভাষায় প্রখ্যাত লেখকবৃন্দ যথা ডেনিয়েল ডেফো (১৭০৪), বার্নার্ড মেনডিভিলি (১৭১৪), আর্থার ইয়ং (১৭৭১) থেকে শুরু করে হার্বার্ট স্পেন্সার (১৮৫০), ডইসি (১৯০৫) এবং কেলভন কুলিজ এর লেখায় প্রকাশ পেয়েছে। পুঁজিবাদ নামক পদ্ধতি এভাবে প্রত্যেক ব্যক্তিকে সম্পদ উপার্জনে অপরিসীম ও বাধাহীন স্বাধীনতা প্রদান করে। বাজার অর্থনীতির নিয়মকানুন ও সূত্র যেহেতু পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রের মতো নিখুঁত ও প্রয়োগসিদ্ধ, তাই জীবন যুদ্ধে পরাজিত পেছনের সারির মানুষের দুঃখ-দুর্দশাকে পুঁজিবাদের ফল বলে অভিহিত করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। সামাজিক ডারউইনবাদ এই শিক্ষা দেয় যে, মুক্তবাজারের খোলা প্রতিযোগিতা প্রকৃতপক্ষে সাধারণ কল্যাণের ঢাল স্বরূপ। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ব্যক্তি প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে উৎপাদন খরচ সর্বনিম্ন হবে, দক্ষতা সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছার মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক অবস্থার শ্রীবৃদ্ধি ঘটাবে। তাই নৈতিকভাবে উচিত বা অনুচিত এরূপ বিচার-বিশ্লেষণ বা সরকারি হস্তক্ষেপের কোনো প্রয়োজন নেই। রাষ্ট্র কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ না করলে, ব্যক্তিমালিকানায় উদ্যোগ অপ্রতিহত গতিতে চলতে থাকলে সর্বোচ্চ কল্যাণ লাভের মধ্য দিয়ে জাতীয়স্বার্থ সর্বাধিকভাবে রক্ষিত হবে। প্রত্যেক মানুষ তার স্বীয় স্বার্থের শ্রেষ্ঠ বিচারক। তাতে বাঁধাহীনভাবে স্ব-স্ব স্বার্থের অনুসরণের দ্বারা শুধু নিজের কল্যাণ হবে না, শেষ পর্যন্ত তা অন্যের কল্যাণও ডেকে আনবে। তিক্ত ফলাফল বাজারব্যবস্থা পশ্চিমা মুক্তবাজার অর্থনীতিতে দীর্ঘকালীন সমৃদ্ধি বয়ে এনেছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সম্পদের বিপুল সম্প্রসারণ ঘটেছে। বাজারব্যবস্থার বিজয় দেখিয়ে রাজনৈতিক ব্যবস্থা সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করা হতে বিরত থাকে। পোলেনি'র ভাষায় সমাজই যেন বাজারের সম্প্রসারিত এক রূপ পরিগ্রহ করলো না। অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও বেকারত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে দরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে তুলল। এতে দেখা যায় দ্রুত উন্নয়ন ও বিপুল সমৃদ্ধি সত্ত্বেও দ্ক্ষতা ও ন্যায়পরতা স্বপ্ন সোনার হরিণই হয়ে রইল। পুঁজিবাদের ত্ক্তি বাস্তব পরিণতি মানুষের বিবেকের ন্যয়নীতিবোধকে নাড়া না দিয়ে পারেনি। তাই দেখা যায়, অতীত বা বর্তমানে পুঁজিবাদের মৌলিক নীতিমালাসমূহ বিরোধিতা ও সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। ইংল্যান্ডের টমাস কার্লাইল (Pastand Present, 1843), রাস্কিন (Unto this Last, 1862) ও চার্লস ডিকেন্স (Hard Times, 1854-55) এবং আমেরিকার হেনরী জর্জ (Progress and Poverty, 1870) এর ন্যায় বিখ্যাত মনীষীবৃন্দ 'লেইজে ফেয়ার' নীতির স্বার্থপরতাকেন্দ্রিক মতবাদকে আক্রমণ করে লেখনী চালনা করেন। থমাস কার্লাইল এই প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিকে 'ডিসমাল সাইন্স' (Dismal Science) বলে অভিহত করেন। তিনি নিয়ন্ত্রণহীন ব্যক্তিস্বার্থ সমাজস্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়ে অনুকূল হতে তরান্বিত করবে- এ চিন্তাধারাকে প্রত্যাখ্যান করেন। হেনরী জর্জ বিত্ত ও দারিদ্র্যের বৈপরীত্যকে তীব্রভাবে নিন্দা করেন এব মন্তব্য করেন, 'যতদিন পর্যন্ত স্ফীত সম্পদরাজি শুধু ধনিক শ্রেণীর বিত্ত বেসাতি বিলাসের ঘরে জমা হবে, যতদিন ধনিক শ্রেণী ও দরিদ্র শ্রেণীর দূরত্ব তীব্রতর হবে, ততদিন সত্যিকার ও স্থায়ী সমৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে বলা যাবে না'। যাই হোক, এসব খ্যাতিমান লেখকদের সকল সমালোচনা সত্ত্বেও পুঁজিবাদী অর্থনীতির চিন্তাধারার জোয়ার তীব্রভাবে প্রবাহিত হতে লাগল। খ্যাতিমান সমালোচক ও মনীষীদের সকল বিরূপ মন্তব্য শুধু ইতিহাসের প্রভাবহীন মন্তব্য রূপেই বিরাজ করল। আধুনিক যুগের কিছু কৃতি লেখকও পুঁজিবাদের তিক্ত ফলাফলে উপরোক্ত মন্তব্য করেছেন। হীমেন মিনিস্কি'র মতে, 'পুঁজিবাদী সমাজ বৈষম্যপূর্ণ ও অদক্ষ'। সমাজের চাহিদা পূরণে পুঁজিবাদের ব্যর্থতার কারণ হচ্ছে, পুঁজিবাদের উদ্দেশ্য ও কৌশলের সাথে সমাজের লক্ষ্য ও চাহিদার সংঘাত। ব্যক্তিস্বার্থ ও সমাজস্বার্থের মাঝে বিরোধিতার বদলে সেতুবন্ধন রচিত হবে বলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা দাবি করেছে। কিন্তু যেসব ধারণা, পূর্বশর্ত ও প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে এই দাবি করা হয়েছে, তা অবাস্তব ও অসত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। সমাজের চাহিদা ও লক্ষ্যপূরণের জন্য প্রয়োজন ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। অথচ পুঁজিবাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, তা সামাজিক ডারউইনবাদ বাস্তবায়নেরই এক প্রকার অমানবিক প্রচেষ্টার নামান্তর। পুঁজিবাদের ভিত্তিভূমি হিসেবে যেসব শর্ত ও ধারণার কথা বলা হয়েছে তার সুস্পষ্ট ভাসা ভাসা ধারণার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক 'দক্ষতা' ও 'ন্যায়পরতা' অর্জিত হবে তা সুনিশ্চিতভাবে বলা যায় না। সম্পদের অদক্ষ বণ্টন ব্যবস্থা কী উৎপাদন করতে হবে বাজারব্যবস্থা দ্রব্যসামগ্রী উৎপাদনের ক্ষেত্রে সীমিত সম্পদের সুদক্ষ বণ্টন নিশ্চিত করে বলে যে দাবি করা হয় তাকে কেবলমাত্র সামাজিক ডারউইনবাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই সত্য হিসেবে অভিহিত করা যায়। আসলে দেখা যায়, এই ধরনের মূল্যবোধ ও নৈতিকতাহীন পুঁজিবাদী সমাজে অর্থবিত্তের মালিক ভোক্তাশ্রেণীর পছন্দ ও চাহিদা অনুযায়ী দ্রব্য সামগ্রীর উৎপাদন হয়ে থাকে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা পক্ষপাতহীনভাবে পরিপূর্ণ প্রতিযোগিতা, দক্ষতা, ন্যায়পরতা প্রভৃতি পূর্বশর্তের কথা বলে এবং তার ভিত্তিতে উৎপাদন ব্যবস্থা দ্বারা সমাজের চাহিদা পূরণ হবার দাবি করে। কিন্তু বাস্তবে এই পূর্বশর্তসূহের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। অবাস্তব অনুমান প্রথম অনুমান করে নেয়া হয়েছে যে, প্রাথমিক শর্ত হিসেবে সামাজিক ঐকমত্য গড়ে তোলার প্রয়োজন নেই। বরং বিভিন্ন শ্রেণীর ভোক্তাগণ স্বতঃপ্রণোদিতভাবেই তাদের চাহিদার ন্যূনতম প্রয়োজন পূরণের মধ্যে সীমিত রাখবে। ফলে ভোক্তার কোনো স্বেচ্ছাচারী চাহিদার সংঘাত দেখা দেবে না। কিন্তু এই ধারণা তিনটি কারণে ভুল প্রমাণিত হয়েছে: (১) যখন কোনো নৈতিক বাধ্যবাধকতা নেই, তখন বিত্তশালীরা নিজেদের খেয়ালখুশি মতো ভোগ্য ও বিলাস সামগ্রী ক্রয় ও ভোগে কেন বিরত থাকবে? এটাই স্বাভাবিক যে সীমিত সম্পদের অপচয় দরিদ্র শ্রেণীর ভোগান্তি হবে- এ ধরনের বিবেক দংশনে ভোগার কারণ নেই। ধনিক শ্রেণী দরিদ্র শ্রেণীর দুঃখ-দুর্দশার জন্য নিজেদের বিলাস ও অপচয়কে দায়ী না করে বরং গরীব মানুষের অদক্ষতা ও তথাকথিত অকর্মণ্যতাকে দায়ী করে। (২) ভোগলিপ্সা ও প্রয়োজন পূরণ অথবা অত্যাবশ্যক ও অপ্রয়োজনীয়- এভাবে চাহিদাকে আলাদা করে দেখার কোনো উপায় পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নেই। বরং এ ধরনের বিভাজন প্রক্রিয়ার কোনো অবকাশ পুঁজিবাদী দর্শনে নেই। যেহেতু এ ধরনের সামাজিক কোনো মূল্যবোধের তাড়না পুঁজিবাদী সমাজে নেই অথবা সমাজের সার্বিক চাহিদার বিচারে কোন দ্রব্যসামগ্রী প্রয়োজনীয় আর কোনগুলো তুলনামূলকভাবে কম প্রয়োজনীয়, তা নির্ধারণ করে দেবার বিষয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের কোনো ভূমিকা নেই। তাই ধনিক শ্রেণী জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে নিজেদের যথেচ্ছা ভোগলালসা ও চাহিদা দ্বারা দরিদ্র মানুষকে তাদের ন্যূনতম প্রয়োজন থেকেও বঞ্চিত করে থাকে। (৩) বণিক শ্রেণী তাদের মুনাফার পাহাড় গড়ে তোলার জন্য পত্রপত্রিকা, রেডিও টেলিভিশন ও অন্যান্য মাধ্যমে বিজ্ঞাপনী চমক চাঙ্গা করে তোলে। বিভিন্ন ধরনের উদ্ভাবনী বিজ্ঞাপনী প্রচারণা ভোক্তশ্রেণীর মাঝে এমন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে সক্ষম যে, তার সামাজিক মর্যাদা তার কেনাকাটার ধার ও ভারের দ্বারা বাড়বে বা কমবে। ফলে সে তার মানসিক বিচারবুদ্ধি হরিয়ে ফেলে, চটকদার বিজ্ঞাপনী আকর্ষণের জোয়ারে ভেসে যায়। 'স্টাটাস সিম্বল' (Status Symbols)বা সামাজিক মর্যাদা লাভের অন্তহীন প্রতিযোগিতায় সমাজে সৃষ্টি হয় অফুরন্ত চাহিদার নানা প্রকরণ। গলব্রেথের ভাষায়, " ভোক্তাশ্রেণীর সকল প্রকার বিজ্ঞাপনী ভাষার মর্মবাণী দ্রব্যসামগ্রী ভোগের মাঝেই রয়েছে আনন্দের সর্বোচ্চ উৎস এবং এটাই হচ্ছে মানুষের অর্জনের সর্বোচ্চ শিখর"। ফলে অপ্রয়োজনীয় ও অত্যাবশ্যক নয় এমন সব সামগ্রীর উৎপাদনে বাজার ভরে যায়। বিজ্ঞাপনের প্রভাবমুক্তভাবে ভোক্তাশ্রেণীর যখন দ্রব্য সামগ্রী নির্বাচন ও কেনার স্বাধীনতা থাকে না, তখন ভোক্তাশ্রেণীর সার্বভৌমত্ব ও চূড়ান্ত স্বাধীনতার পুঁজিবাদ হাস্যকর বিষয় মাত্র। এ ধরনের পুঁজিবাদী উৎপাদন প্রক্রিয়া মুনাফার স্তূপকে স্ফীত করে তোলে ঠিকই, তবে তা দরিদ্র শ্রেণীকে তাদের প্রয়োজন পূরণের হক থেকে বঞ্চিত করার বিনিময়ে। ধনীক শ্রেণীর লোক দেখানো এই ভোগবিলাসপূর্ণ কেনাকাটায় ইন্ধন যোগায় বাণিজ্যিক ব্যাংক কর্তৃক এ খাতে ঋণ প্রদান। এ বিষয়ে ড্যানিয়েল বেল এর মন্তব্য 'আগে ক্রয়ের পূর্বে মানুষকে সঞ্চয় করতে হতো, আর এখন ক্রেডিট কার্ডের বদৌলতে মানুষের সঞ্চয় না থাকলেও তারা কেনার হিড়িকে নেমে যেতে পারে। ফলে আগে যা কল্পনা করেনি তেমন চাহিদা ও ক্রয়ের নতুন সড়ক খুলে যাচ্ছে'। ফলে একদিকে সকল কেনার ইচ্ছা হয়ত মিটছে না, কিন্তু অপরদিকে অবাঞ্ছিতভাবে বেড়ে চলেছে ঘাটতি, মুদ্রা সরবরাহের বৃদ্ধি, মুদ্রানীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি এবং দুঃসহ বৈদেশিক ঋণ। এ ব্যবস্থা সমাজে অহংকার, হিংসা ও পরশ্রীকাতরতার জন্ম দিচ্ছে বলে অনেক পণ্ডিত ও গুণিজন সমালোচনা মুখর হয়েছেন। এ ধরনের তীক্ষ্ণ সমাজ সচেতন সমালোচনা যতই প্রশংসার দাবিদার হোক না কেন এতে কোনো কাজ হচ্ছে না। যতক্ষণ না সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের স্ফূরণ ঘটছে, অন্য মানুষের হকের প্রতি দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতা সৃষ্টি না হচ্ছে, মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধ সৃষ্টির আদর্শবাদের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা না হচ্ছে এবং সার্বিকভাবে আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা সে আলোকে পুনর্গঠিত না হচ্ছে, ততদিন এ ক্ষয়ি‌ অবস্থার পরিবর্তন আশা করা যায় না। ন্যায়ভিত্তিক বণ্টনব্যবস্থা দ্বিতীয়ত, পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদগণ প্রথমেই এমন এক আদর্শবাদী সমাজ কল্পনা করে নিয়েছেন, যেখানে সম্পদ ও আয়ের ইনসাফপূর্ণ বণ্টনের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত আছে। যদি আয় ও সম্পদের এমন ইনসাফপূর্ণ ন্যায়ভিত্তিক বণ্টন সমাজে বজায় থাকত, তবেই বাজারে কী ধরনের পণ্যসামগ্রী উৎপাদিত হবে তার উপর প্রত্যেক মানুষের পছন্দ অপছন্দের প্রভাব কাজ করত। কিন্তু উত্তরাধিকার সূত্রে কোনো কোনো শ্রেণীর বিশাল বিত্ত-বৈভব প্রাপ্তি; ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তিতে বিশেষ শ্রেণীর বিশেষ সুবিধা; বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন ধরনের শিক্ষার সুযোগ; পারিবারিক ঐতিহ্য, শারীরিক শক্তির বিভিন্নতা ও উচ্চাশা সব মিলে সমাজে মানুষের আয়ের বণ্টন শুধু যে বৈষম্যমূলক তা নয়, প্রকৃতপক্ষে সেখানে আয়ের ন্যায়সঙ্গত বণ্টনের কোনো অবকাশই নেই। ফলে বিত্তবেসাতিদর মালিক সমাজে উপর শ্রেণী, যারা জাতীয় আয় ও ব্যাংক ঋণের সিংহভাগ দখল করে আছে, তারাই তাদের পছন্দ মাফিক ভোগ্য সামগ্রীর উৎপাদনকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রন করে। ঐ সব দ্রব্যসামগ্রী সমাজের জন্য কতটুকু প্রয়োজনীয় তা বিবেচ্য বিষয় থাকে না। যেহেতু এসব মানুষের অর্থকড়ি ও সম্পদের কোনো সীমা পরিসীমা নেই, তাই মর্যাদাপূর্ণ বিলাস সমাগ্রীর দাত যতই উচ্চ হোক না কেন অর্থাৎ পুঁজিবাদী চাহিদা তত্ত্বের ভিত্তিতে দাম যতই বেড়ে যাক না কেন, তাতে কিছু আসে যায় না। এসব অনুৎপাদনশীল বিলাস দ্রব্য ক্রয়ের ঘোড়দৌড়ে এ শ্রেণীর কোনো বিষয় নেই। এভাবে দেখা যায়, বাজার অর্থনীতি চাহিদা পূরণের যে সুন্দর স্বপ্ন উপস্থাপন করে, তা অর্থবিত্তহীন বিশাল দরিদ্রশ্রেণীর ক্রয় ক্ষমতার অভাবে বিত্তশালী শ্রেণীর ইচ্ছেমতো অর্থব্যয়ের ক্ষমতার সামনে মুখ থুবড়ে পড়ে। তাই পুঁজিবাদী অর্থনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র বাজারব্যবস্থার মাধ্যমে সঠিক দ্রব্যমূল্য নির্ধারণের তত্ত্বটির প্রসাদের ভিত কত যে নড়বড় তার বাস্তব অবস্থা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। পুঁজিবাদী অর্থনীতির ফলাফল সম্পর্কে তাই অর্থনীতিবিদ টাওনি Towney সঠিকভাবে মন্তব্য করেছেন, 'প্রতি বছর বাজারে যেসব পণ্য সামগ্রীর উৎপাদন দেখা যায় তার বৃহদাংশকে সঠিক অর্থে নিছক অপচয় বলা যায়, কেননা এসব সামগ্রী উৎপাদনের কোনো প্রয়োজনই ছিল না অথবা অন্য সব অত্যাবশ্যক সামগ্রী যথেষ্ট পরিমাণে উৎপাদনের পরই এসব উৎপাদনের অবকাশ দেখা দিত'। এ ধরনের অপচয়ধর্মী উৎপাদনের ফলে উৎপাদিত দ্রব্য সামগ্রীর টাকার হিসেবে সামগ্রিক মূল্যমান যাকে জাতীয় আয় (Gross National Product) নামে অভিহিত করা হয় তা আপাতঃদৃষ্টিতে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মানুষের প্রকৃত অবস্থার কোনো উন্নতি হয় না। তাই জাতীয় আয়ের (জিএনপি) হ্রাস বৃদ্ধি দ্বারা মানুষের কল্যাণ বা অবস্থার উন্নতি অবনতি বোঝা যায় না । দ্রব্যমূল্য চাহিদার প্রতিফলন তৃতীয়ত, এটা ধরে নেয়া হয় যে, কোনো জিনিসের জন্য যত বেশি টাকা খরচের জন্য মানুষ আগ্রহ প্রদর্শন করে, সে জিনিস তত বেশি প্রয়োজনীয়। কিন্তু এ তত্ত্বটি তর্কসাপেক্ষ। একজন দরিদ্র বা ধনী পিতার সন্তানের জন্যে দুগ্ধ সমানভাবে আবশ্যক হলেও দরিদ্র পিতা দুগ্ধের জন্য যত টাকা দিতে প্রস্তুত বা সক্ষম, তার চেয়ে ঠুনকো বিলাসী খেয়ালি জিনিসের জন্য ধনী পিতাকে অনেক বেশি মূল্য দিতে প্রস্তুত দেখা যায়। তাই দেখা যায় দ্রব্যের উচ্চমূল্য তার প্রয়োজনীয়তাকে প্রতিফলিত করে না। তাই সমাজের দুগ্ধের প্রয়োজন অনেক বেশি হলেও দরিদ্র শিশুদের সে চাহিদা পূরণ না হয়ে দেখা যায় ধনিক শ্রেণীর বিলাস সামগ্রী অনেক বেশি উৎপাদন হচ্ছে। এর দ্বারা কিন্তু অনুৎপাদনশীল ও বিলাস সামগ্রীর প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত হয় না। আর্থার ওকুন (Arthur Okun) তাই পুঁজিবাদী বাজারব্যবস্থা সম্পর্কে সঠিকভাবে মন্তব্য করেছেন, 'পুঁজিবাদী ব্যবস্থা দরিদ্র ঘরের সন্তানের মুখে এক মুঠো ভাতের সংস্থানের বদলে ধনী ঘরের পোষা কুকুরের মাংসের ব্যবস্থা করাকেই অগ্রাধিকার প্রদান করে'। শেষতক যে দুঃখজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়-তা হলো বিলাস সামগ্রীর প্রতি বিত্তশালীদের আগ্রহের কারণে এসব জিনিস প্রচুর উৎপাদিত হয় এবং সরবরাহ বৃদ্ধির সাধারণ নিয়মে ক্রমান্বয়ে এসবের দাম পড়ে আসে। অন্য দিকে অগনিত দরিদ্র শিশু থাকলেও তাদের দরিদ্র পিতার ত্রয় ক্ষমতা না থাকায় দুগ্ধ প্রয়োজন মোতাবেক উৎপাদিত হয় না বরং ফলে এক সময়ে দুগ্ধের দাম বৃদ্ধি পায়।

পূর্ণ প্রতিযোগিতা চতুর্থত, এটাও স্বাভাবিক হিসেবে ধরে করে নেয়া হয়েছে যে, পূর্ণ প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে বাজার অর্থনীতি চালিত হবে। পূর্ণ প্রতিযোগিতা বলতে বোঝায় অসংখ্য ক্রেতার সাথে অসংখ্য বিক্রেতাও থাকবে, উৎপাদন করার জন্য কোনো আগ্রহী উৎপাদকের বাজারে প্রবেশে কোনো প্রকার বাধা থাকবে না। বর্তমানে ও ভবিষ্যতের বাজার তথ্যের উপর পরিপূর্ণ ধারণাও সবার জানা থাকবে। কিন্তু এসব শর্তের উপস্থিতি কোথাও দেখা যায় না। পরিপূর্ণভাবে প্রতিযোগিতামূলক বাজার একটি অবাস্তব স্বপ্ন। বড় বড় ব্যবসা ও উৎপাদক প্রতষ্ঠান এবং সম্পদ ও ক্ষমতার কেন্দ্রীভূতকরণকে যেখানে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা উৎসাহিত ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে, সে অবস্থায় পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা ভবিষ্যতে প্রবর্তনের আশা করাও দুরাশা মাত্র। অসংখ্য ত্রুটি-বিচ্যুতি ও বাধাবিঘ্ন বাজার শক্তিসমূহের সুচারুরূপে পরিচালনার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফলে দ্রব্য সামগ্রী উৎপাদনে সামাজিক সম্পদসমূহ ব্যবহারের মাধ্যমে যে প্রকৃত খরচ পড়ে তা দ্রব্য সামগ্রীর বাজার দরের মধ্যে প্রতিফলিত হয় না। কোথাও দেখা যায় দ্রব্যমূল্য উক্ত দ্রব্য তেরির সামাজিক ব্যয়ের চেয়ে বেশি, আবার কোথাও দেখা যায় দ্রব্যমূল্য উক্ত দ্রব্য তৈরির সামাজিক ব্যয়ের চেয়ে কম। এরকম অবস্থায় সমাজের সীমিত সম্পদের যে সুদক্ষ ও সুচারুরূপে ব্যবহৃত দ্রব্যসামগ্রীর উৎপাদনে চারটি উপকরণ ভূমি, পুঁজি, শ্রম ও সংগঠনের যে আনুপাতিক অবদান রয়েছে তার যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। উৎপাদন উপকরণগুলো উৎপাদনে তাদের অবদানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিনিময় মূল্য পায় না অর্থাৎ কেউ পায় বেশি আর কেউ পায় কম। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় মানুষের কর্মপ্রচেষ্টা ও অনুপ্রেরণার একমাত্র উৎস যেখানে ব্যক্তিগত আর্থিক স্বার্থ এবং যতবেশি তাড়াতাড়ি সম্ভব সেই মুনাফা অর্জনে যখন সবাই ব্যস্ত, তখন তাদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সামাজিক লাভ-ক্ষতি কী দাঁড়াবে তা কেউ হিসেবের মধ্যেই আনে না। অথচ সমাজকল্যাণ ও সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে উৎপাদন প্রচেষ্টা থেকে উদ্ভূত এই সামাজিক লাভ-ক্ষতির বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। বাজার অর্থনীতিতে দ্রব্যসামগ্রীর মূল্যনির্ধারণী ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে দীর্ঘ সময়ের কোনো সীমারেখা এসে ব্যক্তিস্বার্থ ও সমাজস্বার্থের ফারাক ঘুচিয়ে উভয়ের সমন্বয় ঘটাবে- এই আশাবাদ এতই সুদূর পরাহত যে, একে এক প্রকার অর্থহীন আশাবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করা ছাড়া আর গত্যন্তর নেই। বিকৃত অগ্রাধিকার যখন প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণের অভাবে বাজার অর্থনীতিতে সন্তোষজনক অবস্থা বিরাজ করতে দেখা যায় না, তখন বাজারে উৎপাদনের বেলায় অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিকৃতি ঘটবে এটাই স্বাভাবিক। আয় ও সম্পদের বিশাল বৈষম্য ও সামাজিক ঐকমত্যহীনতার কারণে যখন সামাজিক অগ্রাধিকার বাজার অর্থনীতিতে কোনো স্থান পায় না, তখন উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সম্পদের যে অদক্ষ ও অন্যায্য ব্যবহার ঘটবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ধনিক শ্রেণীর বিশাল ক্রয় ক্ষমতার বদৌলতে তাদের খামখেয়ালিপূর্ণ বিলাসিতা পূরণের জন্য সীমিত সম্পদের অপচয়ের কারণে গরীব মানুষ অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন পূরণ হতে বঞ্চিত থাকে। প্রফেসর স্যামুয়েলসন তাই উল্লেখ করেছেন, 'লেইজে ফেয়ারের তথাকথিত প্রতিযোগিতামূলক বাজার অর্থনীতি ক্ষুধার্ত, বিকলাঙ্গ ও অপুষ্ট শিশুর জন্ম দেয়, যারা বড় হয়ে তাদের মতো পুষ্টিহীনতায় আক্রান্ত শিশুর জন্ম দেবে এতে আশ্চর্যের কিছু নেই'। তাঁর ভাষায়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম এমনকি সমগ্রভবিষ্যৎ জুড়ে এই লেইজে ফেয়ার পুঁজিবাদ আয় ও সম্পদ বৈষম্যের নিদর্শক জ্যামিতিক রেখাকে (Lorenz curves) অপ্রতিহতভাবে চালিয়ে নেবে'। তিনি আরো বলেন, "অর্থনীতিবিদ এডাম স্মিথের কোনো অধিকার নেই একথা বলার যে, মুক্তবাজার অর্থনীতির 'অদৃশ্য হাত' অন্ধ ব্যক্তিস্বার্থ দ্বারা চালিত মানুষের অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে শেষ পর্যন্ত সামাজিক স্বার্থ বিকাশ সাধনের দিকে নিয়ে যাবে। অর্থনীতিবিদ এডাম স্মিথ এ ধরনের প্রতিপাদ্যের অনুকূলে কোনো প্রমাণ দাখিল করতে পারেননি। শুধু তাই নয় ১৭৭৬ সাল হতে এ পর্যন্ত এ ধরনের ধারণার সপক্ষে কেউ কোনো প্রমাণ্য দলিল পেশ করতে পারেনি"। The Affluent Society নামক গ্রন্থে গলব্রেথ অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে অর্থনৈতিক সম্পদের বিভিন্ন উৎপাদন খাতে বণ্টন ব্যবস্থা অত্যন্ত পক্ষপাতদুষ্ট; সেখানে ধনিক শ্রেণীর মাঝে বিভিন্নভাবে সৃষ্ট কৃত্রিম প্রয়োজন ও চাকচিক্যময় অপ্রয়োজনীয় ভোগবিলাসের খাতে বিপুল সম্পদের অপচয় এমনভাবে ঘটছে যাতে সম্পদভান্ডারে টান পড়ে গেছে। ফলে মৌলিক ও অত্যাবশ্যক প্রয়োজনসমূহ পূরণের জন্য সম্পদের সংকুলান করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষা, গৃহায়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সেবাখাতসমূহ যার সাথে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের বর্তমান ও ভবিষ্যতের কল্যাণ ও অগ্রগতি জড়িত তা চরমভাবে অবহেলিত হচ্ছে। সামাজিক অগ্রাধিকারসমূহকে বাজার অর্থনীতিতে প্রতিফলিত করার উপায় উদ্ভাবনের কোনো পন্থা রয়েছে কি? এ প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, উপযোগবাদী দর্শনভিত্তিক প্রচলিত অর্থনৈতিক মতবাদ যার ভিত্তি সামাজিক ডারউইনবাদ বা কল্যাণ অর্থনীতি- যেটাই হোক না কেন, উপর্যুক্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে অক্ষম। এ মতবাদে মানুষের জন্য কোনো নির্দেশনা নেই এবং বিশ্বব্যবস্থার সেকুলার ব্যাখ্যার প্রেক্ষাপটে বাজার শক্তিসমূহই অর্থনৈতিক সম্পদের বিলিবণ্টনে একমাত্র নিয়ামক শক্তি হবে, যৌক্তিকভাবে একথা মেনে নেয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। কেননা ধর্মীয় নির্দেশনার অনুপস্থিতিতে যদি কোনো কিছুর উপর নির্ভর করতে হয়, তবে একমাত্র বিকল্প হিসেবে মেনে নিতে হয় বাজার শক্তিসমূহের ক্রিয়া-বিক্রিয়ার উপর নির্ভরতা। কারণ যদি কোনো ব্যক্তি, দল বা শ্রেণীকে সামাজিক অগ্রাধিকার নির্ণয়ের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, তবে তাদের ইচ্ছা অনিচ্ছা, পছন্দ-অপছন্দ তারা সমগ্র সমাজের উপর চাপিয়ে দেবে। এমতাবস্থায় বাজার শক্তিসমূহের উপর নির্ভরতাই তুলনামূলকভাবে শ্রেয়তর বিবেচিত হওয়া স্বাভাবিক। সামাজিক অগ্রাধিকার নির্ণয়ের ঐকমত্য সৃষ্টির কোনো পন্থা উদ্ভাবনের নীতিতে পুঁজিবাদী অর্থনীতির বাজারব্যবস্থা স্বীকার করে না। যেহেতু উচিত বা অনুচিত সম্পর্কে বাজার অর্থনীতিতে কোনো নির্দেশনা নেই, তাই স্বাভাবিকভাবে মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বীয় স্বার্থকে সর্বতোভাবে পরিপূরণের দিকে ধাবিত করে। সমাজের সকল মানুষের কল্যাণ ও স্বার্থ নিশ্চিত হচ্ছে কিনা-এ ধরনের মূল্যবোধভিত্তিক বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক দর্শনে স্বীকৃত নয় বিধায় সমগ্র উৎপাদন ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সমাজের বিভিন্ন মানুষের স্ব-স্ব অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে থাকে। অর্থনীতিবিদ শুমেকার (Schumacher) এর ভাষায়, বাজার অর্থনীতি প্রকৃত প্রস্তাবে সামাজিক অঙ্গীকারমুক্তভাবেই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করে। ক্রেতা বা বিক্রেতা কেউই মুক্তবাজার অর্থনীতিতে নিজেদের স্বার্থ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর প্রতি দায়বদ্ধ নয়। অধিকন্তু পুঁজিবাদ ব্যক্তিগত অগ্রাধিকারকে সামাজিক রূপ দান করে এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই সম্পদের সামাজিক পুনবণ্টনের বিরোধী। ফলে দেখা যায়, বাজার অর্থনীতির চাহিদা ও সরবরাহভিত্তিক ত্রুটিপূর্ণ দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা সরকারের কিঞ্চিত হস্তেক্ষেপের সাথে যুক্ত হয়ে মানুষের আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডকে অগ্রাধিকারের খাতে প্রবাহিত করার ফল হিসেবে সমাজের সকলের জন্য অভাব পূরণ ভিত্তিক কাঠামোগত পরিবর্তন অর্থনীতিতে আনা সম্ভব হয় না। উৎপাদন ব্যবস্থা উৎপাদনের মানদন্ড কোনো দ্রব্য বা সেবা উৎপাদনের জন্য শ্রম, পুঁজি, প্রযুক্তি ও সংগঠনের যৌথ প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয়। মানুষের শ্রম ও সীমিত সম্পদের সমন্বয়ে মানব সমাজে উৎপাদন সংঘটিত হয়। তাই উৎপাদন ব্যবস্থাকে দক্ষ ও সুষম করার জন্য উৎপাদন প্রক্রিয়া কতিপয় সুনির্দিষ্ট বৈশেষ্ট্যের দাবি রাখে। তাই শ্রমিক ও মালিক উভয়পক্ষকেই সর্বতোভাবে তাদের সার্বিক দৈহিক ও মানসিক শক্তি এবং ক্ষমতা প্রয়োগে উদ্বুদ্ধকরণের উপযোগী উৎপাদন ব্যবস্থাপনা চালু করা অত্যাবশ্যক। ন্যূনতম খরচ বলতে শুধু ব্যক্তিগত ব্যয় বোঝায় না। কোন প্রকার উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কতটুকু সামাজিক ব্যয় সংশ্লিষ্ট সে প্রশ্নও অতীব গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন খরচের অন্য একটি দিক হচ্ছে বর্তমান সীমিত সম্পদের ব্যবহারের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সম্পদ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, না কী নতুন সম্পদ সৃষ্টির ভিত্তি তৈরি হচ্ছে, সে দিকটির বিচার বিশ্লেষণ করা। তাছাড়া বিবেচনায় আনতে হবে কোনো উৎপাদন প্রক্রিয়ার পার্শ্ব–প্রতিক্রিয়া হিসেবে সৃষ্ট নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, অভাব অপূরণজনিত অসন্তোষ ইত্যাদি উপাদানসমূহকে। দ্বিতীয়ত, উৎপাদন ব্যবস্থা এমন হবে যা মানুষের মর্যাদাকে সমুন্নত করে তোলে এবং সংঘবদ্ধ মানুষের মাঝে ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করে। এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব যদি নিম্নবর্ণিত শর্তসমূহ পূরণ করা সম্ভব হয়: ক. মালিক ও শ্রমিকপক্ষ উভয়ই যদি উৎপাদনে তাদের অবদানের বিনিময়ে আনুপাতিক হারে পারিশ্রমিক লাভ করে; খ. উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘাতের পরিবর্তে যদি সমন্বয় গড়ে তোলা হয়; গ. কাজের একঘেঁয়েমী এ অনাবশ্যক বিরক্তি যদি হ্রাস করা হয়; ঘ. কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারিত করা হয়; এবং ঙ. ক্ষমতা ও সম্পদের কেন্দ্রীভূতকরণ প্রবণতা রোধ করা হয়। প্রকৃতপক্ষে, সকল বাস্তব পরিস্থিতি হতে একথা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, যে উৎপাদন ব্যবস্থায় মালিক ও শ্রমিক পক্ষ উভয়কে তাদের কর্মক্ষমতা ও দক্ষতার সবটুকু উজাড় করে দিতে উদ্ধুদ্ধকরণে ব্যর্থ হয়েছে অথবা বেকারত্ব, প্রকৃত পারিশ্রমিকের বদলে কম মজুরি প্রদান এবং সম্পদ এ আয়ের কেন্দ্রীভূতকরণ ঘটিয়েছে সে উৎপাদন ব্যবস্থা শুধু অবাঞ্ছনীয় নয়; বরং অকার্যকরও বটে। পুর্বশর্তসমূহ উৎপাদন দক্ষতার দিক থেকে পুঁজিবাদ সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা বলে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। এ ব্যবস্থাধীনে উদ্যোগ গ্রহনকারী পুঁজিপতি শ্রেণী হচ্ছে সমাজের প্রতিনিধি যারা কী ধরনের দ্রব্যসামগ্রী ও সেবা উৎপাদিত হবে তা নির্ধারণ করে। ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তি ও মুনাফার আকর্ষণ পুঁজিপতি শ্রেণীকে কার্যকর ভূমিকা পালনে উদ্ধুদ্ধ করে। বাজার দ্রব্যসামগ্রীর মূল্য পুঁজিপতি শ্রেণীর জন্য সংকেত হিসেবে কাজ করে। একদিকে মুনাফার আর্কষণ তাকে সর্বোচ্চ শ্রম ও মেধা নিয়োগে উদ্ধুদ্ধ করে, অন্যদিকে অন্যান্য পুঁজিপতিদের সাথে প্রতিযোগিতা মূল্য বাড়িয়ে সমাজকে শোষণ করার প্রবণতা হতে প্রতিহত করে। প্রতিযোগিতা তাকে ব্যয় সংকোচন, অপব্যয় হ্রাস, উৎপাদন উপকরণের খরচ কমাতে বাধ্য করে। ফলে পণ্য উৎপাদনের সর্বনিম্ন খরচই পণ্যের বাজার দামে পরিণত হয়। উপর্যুক্ত বর্ণনার পরিপ্রেক্ষিতে এ যুক্তি উপস্থাপন করা যায় যে, উৎপাদক শ্রেণী মুনাফা দ্বারা তাড়িত হলেও প্রতিযোগিতা তাদের অতিরিক্ত দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ থেকে নিয়ন্ত্রণ রাখে এবং এভাবে ভোক্তা তথা সমাজের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে, পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা হচ্ছে এক ধরনের বাইরের হস্তক্ষেপবিহীন একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা যাতে অপচয়, শোষণ বা অতিরিক্ত মুনাফার কোনো অবকাশ নেই। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও মুনাফার আর্কষণ উদ্যোক্তা শ্রেণীকে অধিকতর দক্ষতা ও দ্রব্যসামগ্রীর মান উন্নয়নে উজ্জীবিত করে। রাশিয়া, পূর্ব ইউরোপের দেশসমূহ এবং চীনের ন্যায় সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতেও এ উপলদ্ধি অধিকতর স্বীকৃতি লাভ করছে। সরকারি খাতের শিল্পসমূহের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ও বিশৃঙ্খলার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহও অধিকতর দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে ব্যক্তি মালিকানাধীন শিল্পবিকাশের দিকে বেশ ঝুঁকে পড়েছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন শিল্প ও মুনাফার ভিত্তিতে দেশের শিল্পকারখানার বিকাশ সমাজের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে- এ প্রতিপাদ্যটির সফলতার জন্য কতকগুলো পূর্বশর্ত রয়েছে। তা হচ্ছে, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ, সামাজিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্ণীত মূল্যবোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং সরকারের কার্যকর তত্ত্বাবধায়ক ভূমিকা। সুস্থ প্রতিযোগিতা শুধুমাত্র অধিকতর কর্মপ্রচেষ্টা ও কর্মদক্ষতা, জন্য অত্যাবশ্যক নয়, বরং মুনাফা অর্জনের আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যও অতীব প্রয়োজনীয়। প্রতিযোগিতা তখনই সুস্থ বলে বিবেচিত হবে, যখন তা অন্য উদ্যোক্তাকে বাজার থেকে উৎখাতের সংকীর্ণ স্বার্থবুদ্ধি হতে উদ্ভূত না হয়ে পণ্যের মান, সেবা বা দক্ষতার ক্ষেত্রে অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবার মানসিকতা দ্বারা উজ্জীবিত হবে। সুস্থ প্রতিযোগিতা শুধুমাত্র অধিকতর কর্মপ্রচেষ্টা ও কর্মদক্ষতার জন্য আবশ্যক। যদি অসাধু ও দুর্নীতিপরায়ণ বুদ্ধি ও পদ্ধতি দ্বারা প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন এবং তাদের মনমানসিকতা এ ধরনের নেতিবাচক হীনবুদ্ধি দ্বারা চালিত হয়, তবে সে প্রতিযোগিতাকে সুস্থ প্রতিযোগিতা বলা যায় না। এ ধরনের প্রতিযোগিতা প্রতিযোগী উৎপাদকের মধ্যে সহযোগিতার মনোভাবের বদলে জিঘাংসার সৃষ্টি করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সামাজিক ডারউইনবাদের সর্বগ্রাসী প্রতিক্রিয়ায় প্রত্যেক উদ্যোক্তা প্রতিযোগী অন্য প্রতিযোগীকে বাজার হতে উৎখাতের প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়। তা সম্ভব না হলে সকল উদ্যোক্তা-উৎপাদকশ্রেণী ভোক্তাশ্রেণীকে শোষণের উদ্দেশ্যে অসাধু গাঁটছড়ায় মিলিত হয়। উদ্যোক্তাশ্রেণীর মাঝে অসুস্থ প্রতিযোগিতা প্রকৃতপক্ষে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে এবং সব মানুষের বিশেষ করে ভোক্তাশ্রেণীর জন্য অকল্যাণ ডেকে আনে। অসাধু প্রতিযোগীদের মধ্যে স্বার্থের কারণে ঐক্যবদ্ধতা একচেটিয়া বাজারের জন্ম দেয় যা শোষণের দুয়ারকে উন্মোচিত করে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বাজার হতে উৎখাতের মাধ্যমে বড় বড় উৎপাদক ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে যোগসাজস করে ক্রমশ বাজার অর্থনীতিতে শোষণের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করে। উল্লেখ্য, প্রতিযোগিতা কার্যকর হতে পারে যদি একই পণ্যের বিপুল পরিমাণ উৎপাদক প্রতিষ্ঠান থাকে এবং কারো পক্ষে এককভাবে দ্রব্যমূল্যের উপর প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব না হয়। তাছাড়া উৎপাদক শ্রেণীকে সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রত শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। যদি সমাজে কোনো প্রকার নৈতিক মুল্যবোধ ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত ও কার্যকর না থাকে, যদি স্রষ্টার সামনে জবাবদিহিতার ভয় না থাকে, তবে অধিক মুনাফা অর্জনের লোভ বাজারে নানাবিধ কার্যকলাপের জন্ম দেবে। অসুস্থ প্রতিযোগিতার অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে বাজার দখলের জন্য নানারকম চটকদার বিজ্ঞাপনী প্রচারণা। তাছাড়া রয়েছে একই পণ্যের ক্ষেত্রে সম্মিলিত গবেষণার পরিবর্তে প্রত্যেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আলাদা গবেষণা কার্যক্রমের ফলে খরচ বৃদ্ধির দিক। প্রতিযোগিতামূলক পুঁজিবাদী বাজার ব্যবস্থার এই সব নেতিবাচক দিকের ফলে যে কোনো পণ্যের সামাজিক ব্যয় বৃদ্ধিই স্বাভাবিক ঘটনা। সরকারি আইনকানুন ও বিধিনিষেধ নৈতিক অনুভূতি ও দায়িত্ববোধের স্থান দখল করতে পারে না। নৈতিক দায়িত্বানুভূতির বিকল্প না হলেও সরকারি বিধিনিষেধের অবশ্যই কিছু কার্যকারিতা রয়েছে যা উৎপাদকশ্রেণীর যথেচ্ছ আচরণকে লাগাম টেনে ধরে-একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু নৈতিক মূল্যবোধের প্রতি বিশ্বাস ও আনুগত্য সমাজে যদি সর্বোচ্চ স্তরে বিরাজ না করে, তবে নানারূপ অসাধুর ব্যবসায়িক কলাকৌশল প্রতিরোধের জন্য আইনের পর আইন রচনা করতে হবে, এমনকি আইনের ফাঁকফোর রোধের জন্য আবার নতুন করে আইন রচনা করতে হবে, যার জন্য সমাজের খরচের দিকটি কোনভাবে কম হবার কথা নয়। এতদসত্ত্বেও আইন ফাঁকি দেবার প্রবণতা ও উৎকোচ প্রদানের মাধ্যমে আইনের বাধা ডিঙিয়ে যাবার প্রচেষ্টা কম হবে মনে করারও কারণ নেই। অর্থাৎ একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা সুচারু ও ন্যায়ভিত্তিক পরিচালিত হবার জন্য সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিক আচরণের কোনো বিকল্প নেই। অপূর্ণ পূর্বশর্তসমূহ পশ্চিমা পুঁজিবাদী অর্থনীতি ব্যক্তি মালিকানাধীন ও মুনাফাভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু এ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের জন্য কল্যাণমুখী করার জন্য পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কাঠামোতে যে কতগুলো পূর্বশর্তের আবশ্যকীয় প্রয়োজন তা পূরণ হয়নি। উৎপাদন ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ক্রমাগতই হ্রাস পেয়েছে। সাধারণভাবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও স্বীকৃত কোনো মূল্যবোধ সমাজে ঠাঁই করে নিতে পারেনি। নৈতিক মূল্যবোধের শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য এক সময়ে সরকারি নিয়মনীতির উপর খুব জোর দেয়া হত। কিন্তু সরকারি নিয়মনীতির কড়াকড়িও বর্তমানে ক্রমাগতভাবে শিথিল হবার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। 'ঊনিশ শতকের বৃটেনে বাজার সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ছিল প্রধানতম বিষয়। বর্তমানে বৃটেনে নয়, বরং সারা পৃথিবীতে প্রতিযোগিতা ক্রমাগতভাবে হ্রাস পেয়ে চলেছে'। গত এক শতাব্দী যাবৎ পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রধান বেশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে কতিপয় বৃহৎ উৎপাদন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ক্রমাগত প্রাধান্য। বর্তমানে পুঁজিবাদী বিশ্বে এডাম স্মিথ কল্পিত একটি দ্রব্যের উৎপাদনকারী অসংখ্য ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই। কোনো দ্রব্যের উৎপাদনে এরূপ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংখ্য শিল্প প্রতিষ্ঠানের জায়গায় স্থান করে নিয়েছে কতিপয় বিশাল আকৃতির শিল্প প্রতিষ্ঠান এই মুষ্টিমেয় শিল্প প্রতিষ্ঠান উৎপাদিত পণ্যটির দাম, উৎপাদনের পরিমাণ এবং ভবিষ্যতে কী পরিমাণে বিনিয়োগ করা হবে- এসব কিছু নিয়ন্ত্রণ করে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান ও পশ্চিম ইউরোপের দেশসমূহের কতিপয় বিশালাকৃতির শিল্প প্রতিষ্ঠান বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। এই সব প্রভূত ক্ষমতাশালী কোম্পানীগুলো শিল্প উৎপাদন, খনিজ সম্পদ উত্তোলন, পরিবহন ও যোগাযোগ, ব্যাংক ও ইনস্যুরেন্স ব্যবস্থাসহ বাজার অর্থনীতির বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। কৃষি ক্ষেত্রেও কৃষি খামারগুলো একত্রীকরণের মাধ্যমে বিশাল বিশাল কৃষি ফার্ম গড়ে উঠেছে। এ সম্পর্কে নর্ম হোয়াইট বলেন, ''বৃহৎ কৃষি খামারের প্রতি সরকারি নীতির পক্ষপাতিত্বের ফলে বিশালাকৃতির করপোরেশনসমূহ জন্ম লাভ করেছে। এরা খাদ্য সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছে। অবশ্যম্ভাবীভাবে কৃষিখাতের এ ধরনের বিশাল ফার্মের উত্থানে সুদূরপ্রসারী ফলাফল রয়েছে। প্রথমত, অপরিমেয় অর্থ ও ধন-সম্পদের বদৌলতে এসব বিশাল বিশাল কর্পোরেশনসমূহ এসব দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভূত ক্ষমতা ও প্রভাব বলয়ের সৃষ্টি করে। সরকার ও জনগণ উভয়ের উপরই এসব কর্পোরেশনের কার্যকলাপের প্রভাব রয়েছে। ব্যবসায়ী ফার্মগুলোর মাত্র ১০% হওয়া সত্ত্বেও বৃহদাকৃতির এই মুষ্টিমেয় কর্পোরেশনসমূহ যুক্তরাষ্ট্রের সমগ্র অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের ৮০% নিয়ন্ত্রণ করে। এমনকি বাকি ৯০% ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কার্যকলাপও বিভিন্নভাবে বৃহৎ কর্পোরেশনগুলোর দ্বারা প্রভাবিত হয়। পুঁজি, উৎপাদন, বিনিয়োগ, নতুন পণ্য, ভোক্তার প্রতিক্রিয়া অথবা কর্মসংস্থান সর্বক্ষেত্রেই এ সকল বৃহৎ কর্পোরেশন মার্কিন অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ করে। অনধিক ২০০ টি এ ধরনের কর্পোরেশন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির বিশাল অংশ দখল করে রেখেছে। কর্পোরেশনগুলো তাদের নজিরবিহীন ও সীমাহীন অর্থনৈতিক শক্তির সাহয্যে যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ জীবনের প্রায় প্রতিটি অঙ্গনে অপ্রতিহত প্রভাবের ছাপ রেখে চলছে। অনেক সময় নিজেদের স্বার্থের তাগিদে জনসাধারণের স্বার্থবিরোধী নীতি গ্রহণে কর্পোরেশনসমূহ সরকারকে বাধ্য করে। অধিকন্তু দানব আকৃতির এইসব কর্পোরেশনগুলো কোনো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নয়। মুষ্টিমেয় পরিবার এইসব কর্পোরেশনের সিংহভাগ স্টকের মালিক এবং ঐ কতিপয় পরিবারের হাতেই কর্পোরেশনগুলোর নীতি নির্ধারনের চূড়ান্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়ে আছে। ১৯৬০ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, করদাতাদের মধ্যে মাত্র ১% লোক শেয়ার স্টকের ৪৮% দখল করে আছে। তাই 'শেয়ার হোল্ডারদের গনতন্ত্র' নামক শব্দটি একটি ফাঁকা বুলি মাত্র, বিশেষত যখন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডাররা বোর্ড মিটিংয়েই অংশ গ্রহণ করে না। 'ফরচুন' পত্রিকার তালিকাভুক্ত ৫০০ টি শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দেখা গেছে ১৫০টির প্রকৃত নিয়ন্ত্রণকারী ক্ষমতা এক ব্যক্তি বা একটি পরিবারের সদস্যদের হাতে কেন্দ্রীভূত। তাই সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, অর্থনীতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য খাতসমূহ কতিপয় ধনাঢ্য অভিজাত শ্রেনীর হাতে সার্বিকভাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। বিশাল ক্ষমতা তাদের পণ্য সামগ্রী, মূল্য, বিনিয়োগ প্রভৃতি মৌলিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার একচেটিয়া আনুকূল্য প্রদান করেছে যা শুধু সমগ্র জাতিকে নয় বরং সারা বিশ্বকেই প্রভাবিত করছে। দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শ্রেণী, কৃষক, ক্ষুদ্র ও ব্যষ্টিক শিল্পজীবীরা ক্রমবর্ধমানভাবে তাদের স্বাধীনতা ও দরকষাকষির ক্ষমতা হারিয়ে বসেছে। গত দুই শতাব্দীকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মজুরি ও বেতনভোগী শ্রেণীর সংখ্যা তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৭৮০ সালে এর সংখ্যা ছিল ২০%, যা ১৯৭০ সালে ৮৪% এ এসে দাঁড়িয়েছে। ফলে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী অথবা ম্যানেজার বা অফিসার শ্রেণীর লোকের সংখ্যা এই দুই শতাব্দীকালে ৮০% হতে ২০% এ নেমে এসেছে। স্বল্পমেয়াদী তারতম্য বাদ দিলে দেখা যায় দীর্ঘমেয়াদী প্রবণতা হচ্ছে বৃহৎ শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুকূলে। দানবাকৃতির কর্পোরেশনসমূহের প্রদান কার্যনির্বাহী এবং পরিচালকগণ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত করছে। এর ফলে সমাজে সম্পদ ও ক্ষমতা আরো বেশি কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। কার্ল মার্কসের ভাষায় বলা যায়,'মজুরি-দাসত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে'। তৃতীয়ত, বাজার অর্থনীতিতে যে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থার কথা বলা হয় বৃহৎ কর্পোরেশনগুলো তা সুকৌশলে এড়িয়ে যেতে সক্ষম। তারা একসাথে গাঁটছড়া বেঁধে প্রতিযোগিতামূলক পণ্য মূল্যের পরিবর্তে যোগসাজসে একই ধরনের পণ্য মূল্য বাজারে বেঁধে দেয়। চতুর্থত, বৃহৎ শিল্প বা ব্যবসা প্রতিয়ানগুলোর বিশাল আকৃতির মুখে নতুন কোনো ফার্ম বাজারে প্রবেশের উৎসাহ পায় না। বাজারে প্রবেশের জন্য প্রচুর সম্পদের প্রয়োজন এবং নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান এ ধরনের ঝুঁকি নিতে সাহস পায় না। কেবলমাত্র প্রচুর বিত্তশালী কোনো ব্যক্তি যার জন্য ব্যাংক ঋণও খোলা রয়েছে, এ ধরনের বাজারে নতুনভাবে প্রবেশের জন্য উদ্যোগী হতে পারে। পঞ্চমত, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি ভাগাভাগি হয়ে গেছে। অধিকাংশ বৃহৎ কর্পোরেশনে স্টকহোল্ডারদের পরিবর্তে পেশাজীবী ব্যবস্থাপকগণ সার্বিক দেখাশোনার কাজটি করেন। যদিও তাত্ত্বিকভাবে এসব পেশাজীবী ব্যবস্থাপকগণ শেয়ারহোল্ডারদের বেতনভুক্ত কর্মচারী মাত্র। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এরাই প্রকৃত ক্ষমতা বিস্তার করে। শেয়ারহোল্ডারদের শুধু বছর শেষে বার্ষিক সভায় রিপোর্ট শোনার মধ্যে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। এসব পেশাজীবী ম্যানেজারদের অধিকাংশই উঠে এসেছেন সমাজের উঁচু স্তর হতে। এন্ড্র হেকার এ বিষয়ে মন্তব্য করেন যে, 'ইউরোপের বৃহৎ কর্পোরেশনসমূহে গণতান্ত্রিক সামাজিক পরিবেশ বিরাজ করে না। বরং এটাই লক্ষণীয় যে, সমাজের অভিজাত উঁচু শ্রেণী হতে কর্পোরেশনের ব্যব্স্থাপক শ্রেণীকে বাছাই করে নেয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্পদ ও সমাজের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের সাথে সম্পর্কিত বৃহৎ কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপকের পদ অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এসব হচ্ছে ক্ষমতার করিডোরে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রবেশপত্র স্বরূপ। যুক্তরাষ্ট্রে একই অবস্থার উল্লেখ করে 'মিল' বলেন, কর্পোরেশনগুলো হচ্ছে সম্পদের উৎস এবং ক্ষমতা ও সম্পদ অব্যাহত রাখার জন্য একই সাথে ভিত্তি। যেসব ব্যক্তি ও পরিবারবর্গের প্রভূত সম্পদ রয়েছে, দেখা যায় তারাই এসব কর্পোরেশনের হর্তাকর্তা বিধাতা। কর্পোরেশনসমূহের আয়তন বৃদ্ধি বিশাল কনগ্লোমারেটে পরিণত হবার পশ্চাতে দৃশ্যত দ্ক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্য কাজ করেছে। কিন্তু অধিকাংশ পর্যবেক্ষকের মতে দ্ক্ষ প্রতিষ্ঠান হবার জন্য এর আয়তন আরো সীমিত হওয়া প্রয়োজন। অধিকাংশ বৃহৎ কর্পোরেশনের কাঠামো হচ্ছে এরূপ, যেন কতগুলো আধা-স্বায়ত্বশাসিত কোম্পানীগুলোর যদি আলাদা স্বাধীন অস্তিত্ব থাকত তবে তারা অধিকতর দক্ষতার সাথে কাজ করতে পারত। বিশাল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ বা বন্ধন পদ্ধতি ক্ষমতা কেন্দ্রীভূতকরণকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যাংকসমূহের ট্রাস্ট কার্যক্রম ট্রেড এসোসিয়েশন, প্রাইস-লিডারশিপের পদ্ধতি এবং সর্বোপরি উৎপাদক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে অশুভ যোগসাজশ অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনকে আরো প্রসারিত করেছে। মুনাফা যদি দ্ক্ষতার পরিমাপক হয় তবে গবেষণা হতে দেখা গেছে যে, অনেক উৎপাদক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যাদের লাভের হার যে শিল্পে মুষ্ঠিমেয় উৎপাদক প্রতিষ্ঠান কর্তৃত্ব করছে তাদের চেয়ে কম নয়। সুতরাং, দেখা যায় শিল্প প্রতিষ্ঠানের বৃহদায়তনই দক্ষতা নিশ্চিত করে না। কর্পোরেশন ও কোম্পানীসমূহের বৃহদাকৃহতি লাভের পশ্চাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিরাট ভূমিকা রয়েছে। প্রতিযোগী ফার্মসমূহ ক্রয় এবং ফার্মসমূহের উল্লম্ব ও আনুভুমিক একত্রীকরণে বৃহৎ কর্পোরেশনের উৎসাহকে উদ্দীপিত করে ব্যাংকিং ব্যবস্থা সস্তা দরে ঋণ দান করে। ব্যাংক হতে এ অর্থের যোগান না হলে এ ধরনের একচেটিয়া অবস্থা সৃষ্টি করা দুঃসাধ্য ছিল। বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের বদলে কতিপয় বৃহৎ কোম্পানীকে ঋণদান করাকে পছন্দ করে। ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে কৃষিখাতেও বৃহৎ খামারগুলো প্রাধান্য পাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক পরিসংখ্যান হতে দেখা যায় যে, কৃষিখামারের সংখ্যা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কমে গেছে। এ অবস্থার জন্য পক্ষপাতমূলক ব্যাংক ঋণ ব্যবস্থাই দায়ী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ১৯% বৃহৎ কৃষিখামার কৃষিখাতে প্রদত্ত ঋণের ৬০% দখল করে আছে, যার পরিমাণ ব্রাজিল ও মেক্সিকোর যৌথ বৈদেশিক ঋণের সমান। কর্পোরেশনসমূহের সম্প্রসারণের পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে কর্পোরেশনগুলো তাদের লভ্যাংশের মাত্র অর্ধেক স্টকহোল্ডারদের প্রদান করে, বাকি অংশ নতুন যন্ত্রপাতি ক্রয় ও সম্প্রসারণে ব্যয় করে। লভ্যাংশকে নতুন সম্প্রসারণে বিনিয়োগ স্বীকৃত পন্থা বলা হলেও এটা যেভাবে করা হয় তা যথাযথ নয়। শেয়ারহোল্ডারগণ কীভাবে এবং কোন খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ চায় সে বিষয়ে কোনো মতামত গ্রহণ না করেই বিনিয়োগ খাতের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। যদি বোর্ড মিটিং এর বাইরে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের মতামত নেয়া হতো, তবে এ ব্যবস্থাকে অনেক বেশি গণতান্ত্রিক বলা হতো এবং এতে মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী সীমিত অর্থনৈতিক সম্পদের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত হতো। কর্পোরেশনের সম্প্রসারণ বেকারত্ব সমস্যাকেও তীব্রতর করেছে। এর কারণ হচ্ছে কর্পোরেশনসমূহ শ্রমনিবিড় উৎপাদন প্রক্রিয়ার বদলে পুঁজিনিবিড় ব্যবস্থঅর প্রতি অধিক পক্ষপাতী। ব্যাংক ঋণের অবারিত ছাড় সে উৎসাহে আরো ইন্ধন যোগায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যাংকের সুদের হার কম রাখার প্রয়োজনীয়তা, পরবর্তী দুই বছর পাবলিক সেক্টরে ঋণের সুদ পরিশোধের ভার লাঘব করা এবং যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন ও প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করা প্রভৃতি প্রেক্ষাপটে শুধুমাত্র কর্পোরেট সম্প্রসারণকেই উৎসাহিত করা হয়নি, বরং পুঁজি নির্ভর উৎপাদন প্রক্রিয়াকেও অধিকতর পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা হয়। প্রাথমিকভাবে এসব পদক্ষেপের ফলে প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পেলেও বেকারত্ব সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে। উৎপাদন উপকরণসমূহের ব্যক্তি মালিকানা ও উৎপাদক প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা সীমিত অর্থনৈতিক সম্পদ ব্যবহারে দক্ষতা নিশ্চিত করে- এ বিষয়টি তাত্ত্বিকভাবে সঠিক বলে মনে হয়। কিস্তু বাস্তবে দেখা যায় যে, পুঁজিবাদী বাজারব্যবস্থা শুধুমাত্র জন্ম দিয়েছে অপ্রয়োজনীয় দানবাকৃতির কনগ্লোমারেট কোম্পানীসমূহ, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ও অপরিসীম বেকারত্ব। এর ফলাফল সম্পর্কে বার্লি চমৎকারভাবে বলেন, 'পুঁজি রয়েছে, তাই রয়েছে পুঁজিবাদ। মধ্যখানে মার খাচ্ছে ঝুঁকি গ্রহণকারী উদ্যোক্ত শ্রেণী'। তাই দেখা যায়, পুঁজিবাদের দু'টি শক্তিশালী স্তম্ভ তথা ভোক্তাশ্রেণীর সার্বভৌম চূড়ান্ত ক্ষমতা ও উদ্যোক্তা শ্রেণীর সৃজনশীল উদ্ভাবনী ক্ষমতা উভয়ের ভিত নড়ে গেছে। ব্যক্তি ভোক্তা ও ব্যক্তি উদ্যোক্তা উভয়ই উৎপাদন সংগঠনের বিশাল শক্তিশালী চাকার কাছে হার মেনে আনুগত্য করছে। কিন্তু এ ধরনের অবস্থার উদ্ভব বাহির থেকে হয়নি, বরং পুঁজিবাদী কাঠামোর ভিতর থেকে জন্ম নিয়েছে। নৈতিক মূল্যবোধহীন পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতি, সুদভিত্তিক ব্যাংক ব্যবস্থাও এ অপব্যবস্থা সৃষ্টিতে সহায়তা করেছে। নিয়ন্ত্রণকারী সরকারি সংস্থাসমূহের নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থাসমূহও তেমন কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়নি। বরং শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহকে নিয়ন্ত্রণের বদলে এসব সংস্থা শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিধিবদ্ধ আইনকানুনসমূহ প্রণীত হয় কর্পোরেশনসমূহের স্বার্থরক্ষার জন্য। প্রকৃতপক্ষে, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী মহল কর্তৃকই এসব আইনকানুনের খসড়া প্রণীত হয়। গলব্রেথ তাই বলতে বাধ্য হয়েছেন, 'আধুনিক অর্থনীতিতে বড় বড় অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের হাতে ক্ষমতা জিম্মি হয়ে আছে। তথাকথিত সার্বভৌম ভোক্তাশ্রেণী ও সাধারণ জনগণের অর্থনীতির উপর নিয়ন্ত্রণ ক্রমাগতভাবে হ্রাস পেয়েছে। কর্পোরেশনসমূহের অর্থনীতির উপর সুদৃঢ় কায়েমী-স্বার্থ হ্রাস করার অন্যতম উপায় হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠানের গণতন্ত্রায়ন। কর্পোরেশন গণতন্ত্রায়নের উপায়সমূহ হতে পারে-এদের আকৃতি কমিয়ে 'অপটিমাম' পর্যায়ে নিয়ে আসা, একই পণ্যের উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো, কর্পোরেশনের পুঁজির পরিমাণের মধ্যে ইকুইটির অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়া এবং জনগণের মাঝে শেয়ারের মালিকানা ছড়িয়ে দেয়া। কিন্তু অর্থব্যবস্থার আমূল সংস্কার ব্যতীত এ ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন আশা করা যায় না। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাতারাতি প্রতিযোগী ফার্ম কিনে ফেলা, বাজারে প্রচুর বন্ড ইস্যু করা, সর্বোপরি বিশাল উৎপাদন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রতি ব্যাংকসমূহের পক্ষপাত ইতিবাচক পরিবর্তনের বদলে বিপরীতমুখী স্রোতকেই জোরদার করে তুলেছে। অন্যায্য বণ্টনব্যবস্থা সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের শেষ কথা হচ্ছে আর্থিক লভ্যাংশের বণ্টন। উৎপাদনের উপকরণসমূহ তথা শ্রমিক, পুঁজি সরবরাহকারী, ভূমি মালিক ও উদ্যোক্তা শ্রেণী উৎপাদনে অংশগ্রহণ করে স্ব-স্ব ন্যায়সংগত লভ্যাংশ প্রাপ্তির জন্য কৃষক যেমন তার শ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ করে একটি ভালো ফসল লাভের আশায়- এটি তারই অনুরূপ। তাই একটি সমাজ কাঠামো কতটুকু ভালো তা নির্ভর করেছে শুধুমাত্র উৎপাদন প্রক্রিয়ার দ্ক্ষতার উপর নয়, বরং একই সাথে বণ্টন প্রক্রিয়া সুষম ও ন্যায়সংগত কিনা তারও উপর। ইতোমধ্যেই সুস্পষ্টভাবে দেখা গেছে, সমাজের জন্য কী কী পণ্য সামগ্রী উৎপাদন করা প্রয়োজন এবং কীভাবে তা উৎপাদন করতে হবে- এ প্রশ্নের জবাবে পুঁজিবাদ সীমিত অর্থনৈতিক সম্পদের বিভিন্ন খাতে বণ্টনের ক্ষেত্রে দ্ক্ষ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারেনি। এখন দেখা যায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পদের বণ্টনের ক্ষেত্রেও পুঁজিবাদ কোনো প্রকার ন্যায়নীতি প্রদর্শন করতে পারেনি। স্থিতাবস্থার পক্ষে চুক্তি প্রচলিত পশ্চিমা অর্থনীতিতে লভ্যাংশ বণ্টনের বিষয়টি বিভিন্ন উৎপাদন খাতে বিভিন্ন উৎপাদন উপকরণের বণ্টনের ন্যায় গুরুত্ব লাভ করেনি। কারণ এটা স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে ধরে নেয়া হয়েছে যে, উৎপাদন উপকরণসমূহের যদি বিভিন্ন উৎপাদন খাতে দক্ষতার সাথে বিলিবণ্টন নিশ্চিত করা যায়, তবে বিভিন্ন উৎপাদন উপকরণসমূহ মোট উৎপাদনে প্রত্যেকে নিজস্ব অবদান অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের প্রাপ্য আয় পেয়ে যাবে। যদি কোনো উৎপাদন উপকরণের আয় উপযুক্ত নীতি অনুযায়ী প্রাপ্ততার চেয়ে কম দেখা যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে ঠিক মাত্রায় পৌঁছে যাবে। যেহেতু সম্পদ হচ্ছে মানুষের দীর্ঘকালীন সঞ্চয়ের ফসল, তাই অর্থনৈতিক যুক্তি অনুযায়ী সমাজে বিরাজিত বর্তমান সম্পদ বণ্টনের অবস্থানকে ন্যায়সংগত বলা ছাড়া উপায় নেই। অধিকাংশ পশ্চিমা অর্থনীতিবিদ সমাজে সম্পদ বণ্টনের বর্তমান স্থিতাবস্থার পক্ষে অর্থনীতির শাণিত যুক্তি প্রদর্শন করেছেন। স্যামুয়েলসন স্বীকার করেছেন, "সম্পদ ও আয় বণ্টনের নীতি ও তত্ত্ব এখনো স্থিতিশীলতা লাভ করেনি"। অর্থনীতির এরূপ একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের অবস্থা কেন বিরাজ করছে সে বিষয়ে সংগতভাবেই প্রশ্ন তোলা যায়। উৎপাদনশীল অবস্থার প্রান্তিক তত্ত্ব মোট উৎপাদনে প্রত্যেক উৎপাদন উপকরণের অবদান বা হিস্যা কতটুকু তা প্রদর্শনের চেষ্ট করেছে। অপরদিকে 'প্যারিটো অপটিমালিটি' তত্ত্ব আয় বণ্টনের বর্তমান স্থিতাবস্থার কোনোরূপ পরিবর্তনের চেষ্টাকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে বর্ণনা করেছে। এ তত্ত্ব অনুযায়ী আয় ও সম্পদের পুনর্বণ্টন 'প্যারিটো অপটিমালিটি' অনুযায়ী সমাজের সব মানুষের সর্বমোট যে সুখবোধ থাকে তা বিনষ্ট হবে। বিভিন্ন মানুষের মাঝে উপযোগ-উপভোগের পারস্পরিক তুলনা সম্ভব নয়- এ ধারণায় বিশ্বাসী অর্থনীতিবিদগণ বলেন যে, আয়ের অধিকতর সুষম বণ্টন আয়ের বৈষম্যমূলক বণ্টনের চেয়ে শ্রেয়তর বা অধিকতর কল্যাণকর হতে পারে মর্মে কোনো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমানিত উপসংহার টানা যায় না। পুঁজিবাদী সমাজে বলবৎ বর্তমান আয় বণ্টনব্যবস্থা প্রকৃতির কঠিন নিয়মের ফল এবং সংগত বলে তারা রায় প্রদান করেন। তাই সামাজিক ন্যায়পরতা কোনো অলীক আদর্শের ভিত্তিতে আয়ের পুনর্বণ্টনের যে কোনো উদ্যোগ শুধু যে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে তা নয়, এ প্রচেষ্টা অনাকাঙ্ক্ষিতও বটে। বর্তমান অর্থনৈতিক মতবাদসমূহ সমাজে বলবৎ আয়বণ্টন ব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে। আয়ের বিশাল বৈষম্যকে এসব অর্থনীতিবিদগণ প্রকৃতির নিয়ম ও অনিবার্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তাদের মতে, অর্থনৈতিক বা সামাজিক ন্যায়পরতা একটি অবাস্তব স্বপ্নমাত্র। এ ধরনর ন্যায়পরতা প্রচেষ্টা বরং সামাজিক দুঃখ-কষ্টকে বৃদ্ধি করবে। এ ধরনের চিন্তাধারার ফলে প্রতীয়মান হয় যে, পুঁজিবাদী হচ্ছে সম্পূর্ণ নৈতিকতাহীনভাবে অন্যায় ও অসংগত। অন্যদিকে পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন, ব্যক্তি মানুষের অন্ধস্বার্থপরতা যা বৈষম্যমূলক আয়বণ্টন ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে, তা একটি প্রয়োজনীয় ও কল্যাণকর সামাজিক শক্তি। প্রখ্যাত মার্কিন সমাজতত্ত্ববিদ ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উইলিয়াম সামনার বলেন, "কোটিপতি ব্যক্তিগণ প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফল, সমাজের বিশেষ বিশেষ কর্মসম্পাদনের জন্য প্রকৃতি তাদের নির্বাচন করেছে। তারা উচ্চ মুনাফা অর্জন করে এবং বিলাস ব্যসনে জীবনযাপন করে। কিন্তু সমাজের কল্যাণের জন্যই সমাজকে এ মূল্য দিতে হবে"। তাদের উচ্চ আয় সঞ্চয় সৃষ্টি করে, উদ্যোগ গ্রহণকে উৎসাহিত করে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে। রবার্ট ওয়েন বলেছেন, 'দরিদ্র ও বেকারগণ তাদের দারিদ্র্য ও নিরাপত্তাহীনতার জন্য দায়ী নন, বরং তারা যান্ত্রিক বাজারব্যবস্থার শিকার'। কিন্তু পুঁজিবাদের প্রবক্তা অর্থনীতিবিদদের ভাষ্যে রবার্ট ওয়েনের এই বক্তব্যের কোনো প্রতিধ্বনি মেলে না। প্রবৃদ্ধির উপর গুরুত্ব আরোপ দরিদ্র জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য সম্পদ ও আয়ের পুনর্বণ্টনের ধারণাকে পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদগণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। বিকল্প হিসেবে তারা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনকে গুরুত্ব দিয়েছেন। অর্থনীতিবিদ প্যারিটো বলেন, 'যদি জনসংখ্যার বৃদ্ধির হারের চেয়ে মোট আয়ের বৃদ্ধির হার বেশি না হয় তবে আয়ের বৈষম্য কমানো সম্ভব নয়'। পাশ্চাত্যের উদারনৈতিক ও রক্ষণশীল উভয় শিবিরের অর্থনীতিবিদগণ আয়ের সুষম বণ্টনের পরিবর্তে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপর জোর দিয়েছেন। থুরো এই ধরনের চিন্তাধারাকে সংক্ষেপে এভাবে বর্ণনা করেছেন, 'যদি কোনো দেশের অর্থনেতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পায় তবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং সবার জন্য অধিকতর আয়ের পথ সুগম হবে। জনগণ তাদের অধিকতর আয় অর্জনের কারণে বিত্তশালী অবস্থার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করেই সুখি থাকবে। সমাজ তখন আর ধন বৈষম্য নিয়ে মাথা ঘামাবে না। শেষ পর্যন্ত অব্যাহত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে আয় বৈষম্যের দূরত্ব ক্রমশ কমে আসবে'। এভাবে দেখা যায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রশ্নটি মাত্রাহীন গুরুত্ব লাভ করেছে এবং একে আয় বৈষম্য হ্রাসের অস্ত্র হিসেবে ধরে নেয়া হয়েছে। লক্ষণীয় যে, প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি দরিদ্র জনগণের ভোগের মাত্রা বাড়াতে সক্ষম হলেও তাদের সব অভাব পূরণ করতে পারেনি। অধিক প্রবৃদ্ধি ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। তদানুযায়ী বেড়েছে তাদের ভোগের মাত্রার ব্যবধানও। কোলকো এর মতে, 'যত দিন আয় বৈষম্য বিরাজ করবে ততদিন ধনী ও দরিদ্র শ্রেনীর মাঝে ভোগের বিরাট ব্যবধানও থেকে যাবে'। অধিক প্রবৃদ্ধি প্রকৃতপক্ষে ধনিক শ্রেণীর বিত্ত ও আয়কে আরো ফাঁপিয়ে তোলে, কেননা বৈষম্য সৃষ্টিকারী সকল প্রকার পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এ অবস্থায় অব্যাহত গতিতে চলতে থাকে। অধিকন্তু প্রবৃদ্ধি কখনো একটানা চলতে থাকে না। প্রবৃদ্ধিতে মাঝে মাঝে দেখা দেয় মন্দা ও বেকারত্ব। এই অর্থনৈতিক মন্দা সবার জন্য ক্ষতিকর হলেও দরিদ্র শ্রেণীর উপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক। প্রবৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা যদিও অনস্বীকার্য, তবুও এর উপর অত্যধিক গুরুত্বারোপ অনেক সমস্যার জন্ম দিয়েছে। বাজেট ও বাণিজ্য ঘাটতি, মুদ্রাস্ফীতি ও স্টাগফ্লেশন (Stagflatioh) [যে বিশেষ সময়সীমার মধ্যে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়, কিন্তু উৎপাদন বৃদ্ধি পায় না], বৈদেশিক সুদ পরিশোধের দায়ভার প্রভৃতি এ সমস্যাসমূহের অন্যতম। প্রবৃদ্ধির জন্য সতর্ক বিবেচনাহীন দৌড় প্রতিযোগিতা সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদকে নিঃশেষ করে তুলেছে, প্রকৃতির দুষণ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে। ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতা মানুষ, পশুপাখি ও উদ্ভিদ জীবনকে সংকটাপন্ন করে তুলেছে। আয় বৈষম্য নিরসনের জন্য প্রবৃদ্ধি অর্জন ছাড়াও আরো কতিপয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে একথা অস্বীকার করার জো নেই। এ পদক্ষেপগুলো প্রগতিশীল করব্যবস্থা, ভর্তুকি প্রদান ইত্যাদি। কিন্তু একথা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, প্রগতিশীল করব্যবস্থা কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করতে পারেনি। যেহেতু জনগণের সিংহভাগ মজুরও বেতনভোগী, তাই তাদের আয় পরোক্ষ করের আওতায় পড়ে যায়। অপর দিকে ধনাঢ্য শ্রেণী তাদের আয় ও মুনাফার উপর ধার্যযোগ্য আয়কর নানা পন্থায় ফাঁকি দেবার ফাঁকফোকর ও সুযোগ খুঁজে নেয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভর্তূকিব্যবস্থা এমনভাবে বিন্যস্ত থাকে যা দরিদ্র শ্রেণী থেকে ধনিক শ্রেনীকেই বেশি সহায়তা করে। সন্দেহবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বাজার অর্থনীতি ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত কার্যকারিতা ও সক্ষমতার বিষয়ে পুঁজিবাদী দেশসমূহও অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করে আসছে। নির্দিষ্ট ও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য সম্পদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাজার অর্থনীতির অবমতা, বাজার অর্থনীতির তাত্ত্বিকরূপ বাস্তবে খুঁজে না পাওয়া ইত্যাদি বিষয় ক্রমাগত স্বীকৃতি লাভ করছে। সমকালীন অনেক পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদ স্বীকার করে নিয়েছেন যে, অর্থনীতির কোনো খাতেই পূর্ণাঙ্গ প্রতিযোগিতামূলক অবস্থা বিরাজ করে না। বরং একচেটিয়া মালিকানা, বৈষম্যমূলক সুযোগ-সুবিধা, বিশেষ বিশেষ শ্রেণীর জন্য ব্যাংক ঋণের অবাধ সুযোগ, কোনো বিশেষ খাত বা অঞ্চলে নতুনদের বিনিয়োগের জন্য প্রবেশের ক্ষেত্রে নানা কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি হচ্ছে বাজার অর্থনীতির সাধারণ বৈশিষ্ট্য। এ অবস্থাই বিদ্যমান সম্পদ ও আয় বৈষম্যের জন্য প্রধানত দায়ী। এটা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতাহীন পুঁজিবাদী সমাজ ও অর্থনৈতিক কাঠামোর সাথে আয়-বৈষম্য অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এ কথাও প্রতিভাত হয়েছে যে, মানুষের কেবলমাত্র কার্যক্ষমতার পার্থক্যের জন্যই আয়- বৈষম্যের সৃষ্টি হয়নি। আয়-বৈষম্যের জন্য প্রকৃতপক্ষে দায়ী মানবসৃষ্ট পক্ষপাতমূলক নানা অবস্থা। আয়-বৈষম্যের অন্যতম প্রধান বাস্তব কারণ হচ্ছে উৎপাদন উপকরণ ও ব্যবসা- বাণিজ্যের মালিকানা সমাজের মানুষের মাঝে সুষমভাবে বিস্তৃত ও বণ্টিত নয়। ব্যাংকব্যবস্থাও এ অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থা সৃষ্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্যই ব্যাংক ঋণের দুয়ার খোলা থাকে। গেলব্রেথের (Galbraigth) ভাষায়, 'পরিকল্পিত অর্থনীতিতে বৃহৎ কর্পোরেশনসমূহ বাণিজ্যিক ব্যাংক, ইনস্যুরেন্স কোম্পানী ও বিনিয়োগ ব্যাংসমূহের নিকট আকর্ষণীয় খদ্দের'। তিনি আরো মন্তব্য করেন, 'পরিকল্পিত অর্থনীতিতে দেখা যায় যাদের ঋণ নেবার প্রয়োজন নেই, এসব বৃহৎ সংস্থাসমূহই ব্যাংকের সবচেয়ে বেশি অনুগ্রহভাজন। বিপরীত চিত্র দেখা যায় তারা ব্যাংকের নিকট আকর্ষণীয় খরিদ্দআর নয়'। বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিকট ব্যাংক ঋণের সহজলভ্যতার ফলে সমাজে ন্যায়পরতার সৃষ্টির পরিবর্তে ঐ সব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কলেবর বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সমাজে কাঙ্ক্ষিত ন্যায়পরতার দুয়ার ক্রমাগত অবরুদ্ধ হয়ে কতিপয় ধনিক-বণিক শ্রেণীর স্বার্থই ক্রমাগতভাবে চরিতার্থ হয়েছে। অপর দিকে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ যারা সীমাবদ্ধ বেতন ও মজুরি পাচ্ছে, তাদের দুর্গতি বেড়ে চলেছে। কার্ল মার্কস এ সমস্যা এবং এ অবাঞ্ছিত অবস্থা অনুভব করেছিলেন। কিন্তু তিনি ব্যক্তি মালিকানা অবসানের যে অবাস্তব সমাধান বাতলে দিয়েছিলেন তা সমাধানের বদলে অধিকতর সমস্যার জন্ম দিয়েছে। বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহ ও তাদের অভিভাবক ব্যাংকসমূহের ক্ষমতা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, পুঁজিবাদ মুখরক্ষাকারী যেসব প্রসাধনীমূলক পরিবর্তন আনয়ন করে, তা দ্বারা সমাজের ইনসাফ বৃদ্ধি করবে এ আশা দুরাশা মাত্র। বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অর্থলগ্নী প্রতিষ্ঠানসমূহের কায়েমী স্বার্থ ফ্রাংকেনস্টাইনের রুপ ধারণ করেছে। ফলে তাদের অপসারণ করে সমাজে শুভ ফলাফল আনয়নের প্রচেষ্টায় সফল হওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডেভিড রকফেলার একবার সবাইকে স্তম্ভিত করে জানিয়েছিলেন যে, এক ভোটের ফলাফলে দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজন ছাত্রের মধ্যে তিনজন ছাত্রই মনে করে যে, বৃহৎ পুঁজিপতি পরিবারগুলো সরাকারের লাগাম প্রশাসন ও কংগ্রেসের হাত হতে ছিনিয়ে নিয়েছে। উক্ত ভোটের ফলাফল মিশিগান ইউনিভার্সিটি কর্তৃক পরিচালিত এক গবেষণা জরিপ দ্বারা সমর্থিত হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, ৫৯% আমেরিকান নাগরিকই মনে করেন যে, কায়েমী স্বার্থবাদী কতিপয় পুঁজিবাদী পরিবারই সরকারকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে। এমতাব্স্থায় আয় ও সম্পদের বৈষম্য নিরসনে অর্থনীতির কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানসমূহের আমূল পরিবর্তন অত্যাবশ্যক বলে তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। বৈষম্য হ্রাস করতে পারে এমন ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আদর্শিক দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যতীত এ ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন প্রত্যাশা করা যায় না। একই সাথে প্রয়োজন সামাজিকভাবে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার প্রতি রাষ্ট্রের শক্তিশালী ইতিবাচক ভূমিকা পালনের সদিচ্ছা। কিন্তু লেইজে ফেয়ার অর্থনীতির স্থলে যে কল্যাণধর্মী রাষ্ট্রব্যবস্থা পাশ্চাত্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা বাঞ্ছিত ফলাফল আনয়নে ব্যর্থ হয়েছে।

'লেইজে ফেয়ার' ব্যবস্থার অবসান দু'টি ঘটনা 'লেইজে ফেয়ার' পুঁজিবাদের ভিত বিশেষ করে রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে হস্তক্ষেপ না করার নীতিকে ধ্বসিয়ে দিয়েছিল। ঘটনা দু'টি হচ্ছে, ১৯৩০ এর দিকে মহামন্দা এবং সমাজবাদের উত্থান। ঘটনাদ্বয় কিনেসিয়ান বিপ্লব ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের জন্ম দেয়। 'লেইজে ফেয়ার' পুঁজিবাদের কফিনে ঘটনা দু'টি শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। স্যুমপিটার ও টয়েনবির মতো মার্কসবাদী নয় এমন অনেক অর্থনীতিবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পুঁজিবাদের মৃত্যুঘণ্টা বাজার কথা ভবিষ্যতদ্বাণী করেছিলেন। অবশ্য মিল্টন ফ্রিডম্যান ও ফ্রেডরিথ হায়েক এর মতো কতিপয় অর্থনীতিবিদ 'লেইজে ফেয়ার' অর্থনীতিকে সমর্থন করে যেতে লাগলেন, যদিও তা অনেকটা পরিবর্তিত কাঠামোয়। আশির দশকে এ ধরনের অর্থনীতিবিদের বলয় বৃদ্ধি পেতে লাগলো। মহামন্দার পর অর্থনীতিতে সরকারি হস্তক্ষেপের প্রবণতা যেভাবে বৃদ্ধি পেয়ে চলছিল সে উৎসাহ ক্রমান্বয়ে সরকারি প্রশাসন যন্ত্রের অদক্ষতা, বাজেট ঘাটতি পূরণের অসমর্থতা ও এসব কারণে কল্যাণ রাষ্ট্রের উপর সৃষ্ট বিরূর ধারণা ইত্যাদি কারণে হ্রাস পেতে লাগল। ত্রিশ দশকের দীর্ঘস্থায়ী মহামন্দা অর্থনীতিবিদ 'সে' এর অর্থনীতির সূত্রের উপর দীর্ঘকালীন আস্থা বিনষ্ট করে দেয়। এত প্রতীয়মান হয় যে, অর্থনীতির নিজে নিজে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশোধিত হবার বা বিচ্যুতি ঠিক করে আদর্শ স্থানে ফিরে আসার ক্ষমতা নেই। অর্থনৈতিক সংকটকালীন সময়ে বৃটিশ ও অন্যান্য সরকারের লেইজে ফেয়ার দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রফেসর কিনস বিস্মিত হয়ে পড়েন। কিনসের ক্লাসিক্যাল পূর্বসূরিরা উনবিংশ শতাব্দীর পুঁজিবাদী অর্থনীতির কাঠামোকে যেখানে স্বাভাবিক, প্রকৃতিসম্মত, যুক্তিসংগত, চিরকালীন ও সরল অভিধায় অভিষিক্ত করেছিলেন সেখানে কীনস তার Economic Consequence of the Peace গ্রন্থে পক্ষান্তরে লেইজে ফেয়ার পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে 'অস্বাভাবিক, অস্থিতিশীল, জটিল, অনির্ভরযোগ্য ও ভঙ্গুর' বলে চিহ্নিত করেছেন। সংস্কারের কণ্টকাকীর্ণ পথঃ কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের সুচনা কিনস এর জেনারেল থিওরির মূল প্রতিপাদ্য তারল্যের অগ্রাধিকার (liquidity prefernece) বা ভোগ বা সঞ্চয় বিনিয়োগ রেখা নয়; বরং এর মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে এডাম স্মিথ হতে শুরু করে সব ক্লাসিক্যাল ধারণায় ' আপনাআপনি সব সময় পূর্ণ কর্মসংস্থান বিরাজ করবে' মর্মে যে তত্ত্ব ও ধারণা দেয়া হয়েছে তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা। কিনস যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, মুক্তবাজার অর্থনীতি সব সময় পূর্ণ কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারে না। এ ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দীর্ঘ সময়ের জন্য অর্থনৈতিক মন্দার খানাখন্দে পড়ে থাকতে পারে। মন্দার কবলে পতিত অর্থনীতি একসময়ে আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমৃদ্ধির যুগে ফিরে আসবে- এ ধরনের বিশ্বাস একটি চরম ভ্রান্তিবিলাস বলে কিনস যৌক্তিক পন্থায় দেখিয়ে দিয়েছেন। কিনস বলেন, কেউ ধৈর্যের সাথে দীর্ঘকাল সমৃদ্ধির আশায় বসে থাকবে না, কারণ দীর্ঘকালীন সময় আমরা সবাই লাশে পরিণত হব। এ প্রেক্ষাপটেই মন্দা থেকে উত্তরণের জন্য ঘাটতি ব্যয়ের মাধ্যমে সরকারের প্রত্যক্ষ ভূমিকায় অবতীর্ণ হবার জন্য কিনসীয় প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে আমরা দেখতে পাই ১৯৩০ দশকের প্রলয়ংকরী মহামন্দা বাস্তবে লেইজে ফেয়ার পুঁজিবাদকে সমূলে উৎপাটিত করেছে, আর তাত্ত্বিকভাবে কিনসের অর্থনৈতিক দর্শনকে ধ্বসিয়ে দিয়েছে। এর সাথে সমাজতন্ত্রের উত্থান যুক্ত হয়ে 'কল্যাণ রাষ্ট্র যুগের সূচনা হয়েছে। অগ্রাধিকার নির্ণয়ে ব্যর্থতা একথা বলা প্রয়োজন যে, কিনস কল্যাণ রাষ্ট্রের শুধুমাত্র একটি বিষয়ের উপরই আলোচনা করেছেন- তা হচ্ছে পূর্ণ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার বিষয়টি। এ উদ্দেশ্যে রাজনীতির মাধ্যমে কার্যকর চাহিদা বৃদ্ধিকে তিনি জোর দিয়েছেন। কিনসের এই ব্যবস্থাপত্র যেহেতু যুগপৎ মুদ্রাস্ফীতি ও মন্দার তীব্রতাকে হ্রাস করে ব্যবসায়িক চক্রের উর্ধ্বগামীতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে, সেহেতু তার দেয়া ব্যবস্থাপত্র সঠিকভাবেই হোক বা ভুলক্রমেই হোক এ আস্থার জন্ম দিয়েছে যে, ১৯৩০ দশকের গভীর ও প্রলম্বিত মন্দা অতীতের বিষয় এবং এর আর পুনরায় আবির্ভাব হবে না। কিনস কিন্তু সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোন খাতে কত বরাদ্দ করতে হবে তথা তুলনামূলক অগ্রাধিকারের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থাপত্র রেখে যাননি। তার ব্যবস্থাপত্রে মূল প্রতিষেধক হিসেবে পূর্ণ কর্মসংস্থান অবস্থায় মোট চাহিদার পরিমাণকে একই পরিমাণে অক্ষুন্ন রাখার কথা বলা হয়েছে। প্রতিরক্ষা, ভৌত অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা কল্যাণ ভাতা যে কোনো খাতে খরচ বৃদ্ধি বা হ্রাস করে মোট চাহিদার পরিমাণকে অব্যাহত রাখা যেতে পারে। কিনস অগ্রাধিকারের বিষয়ে সচেতন ছিলেন না। তাঁর দৃষ্টিতে পূর্ণ কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে পুঁজিবাদ ব্যর্থ বলে প্রতিভাত হয়েছিল। তবে তাঁর মতে পুঁজিবাদ বিভিন্ন উৎপাদন খাতে উৎপাদন উপকরণের বণ্টন ও মানুষের সাথে আয়ের বণ্টন সমস্যার সমাধান করতে পেরেছিল। তাই দেখা যায়, কিনস পুঁজিবাদের কাঠামোয় সামান্য পরিবর্তনেই সন্তুষ্ট ছিলেন ততটুকু মাত্র যা পূর্ণ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারে। পূর্ণ কর্মসংস্থানে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে না এমন সব পুঁজিবাদের বৈশিষ্ট্য ও কাঠামোয় কোনো প্রকার পরিবর্তন আনয়নে কিনস বিশ্বাসী ছিলেন না। অর্থনৈতিক সমস্যা অর্থনৈতিক মন্দাকে মোকাবিলা করার জন্য কিনস প্রস্তাবিত ঘাটতি ব্যয়ের অস্ত্র অধিকাংশ সরকার সমাজকল্যাণ বা প্রতিরক্ষা খাতে অর্থায়নে অথবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করেছে। অধিকাংশ দেশে সরকারি খাতে এই ব্যয় বৃদ্ধি বেসরকারি ভোগখাতে ব্যয় হ্রাস না করেই সংঘটিত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী ব্যাপ্তি লাভকারী ভোগবাদ, আর্কষণীয় বিজ্ঞাপন, ব্যাংকের ভোগখাতে ঋণের প্রসার বেসরকারি ভোগখাতকে বরং চাঙ্গা করে তুলেছে। এ ভোগব্যয় বৃদ্ধিটি এমন যে, একে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। কেননা বিরাজমান ভোগবাদী পরিবেশে জীবনের পরম লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে যত বেশি ভোগ করা যায় তা এবং দেখা গেছে সমাজের কেউই অন্যের জন্য ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত নয়। সমাজে যদি সবাই মান্য করে এমন ত্যাগ স্বীকারকারী মূল্যবোধের অস্তিত্ব ও তার প্রতি আনুগত্য না থাকে তবে এমন অবস্থা সৃষ্টি হওয়াই খুব স্বাভাবিক এবং প্রত্যাশিত। সরকারি ও বেসরকারি খাতে এরূপ ব্যয় বৃদ্ধি পঞ্চাশ ও ষাট এই দুই দশকে পাশ্চাত্যে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বজায় রেখেছিল। এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সীমিত অর্থনৈতিক সম্পদের পরিসীমায় অর্থনীতির উপর যে প্রচণ্ড চাপ ও ভার সৃষ্টি করেছে তাতে নব নব গুরুতর সমস্যার উদ্ভব হয়েছে। উদ্ভূত সমস্যাসমূহের অন্যতম হচ্ছে অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতির হার। অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরু থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত প্রায় দু'শতাব্দী দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল মাত্র ৩৩%। কিন্তু ১৯৪০ এর দশকে গড় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে ছয় গুণ। কোনো ব্যাখ্যা দ্বারা একে মেনে নেয়া যায় না। কেননা এটা এখন সর্বজনস্বীকৃত যে, এ ধরনের দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি দক্ষতা ও ন্যায়পরতা উভয়ের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। মুদ্রাস্ফীতির ফলে প্রাথমিকভাবে দেখা যায় যে, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায় উচ্চ অর্থনীতি স্টাগফ্লেশন (Stagflation) দ্বারা আক্রান্ত হয়ে ওঠে। অর্থাৎ দেখা যায় উচ্চ দ্রব্যমূল্য ও উচ্চ মজুরি হারের সাথে হাতে হাত রেখে পড়তি চাহিদা, নিম্ন উৎপাদন, অধিক বেকারত্ব ও উৎপাদন ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহারের অসমর্থতা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়। অধিকাংশ শিল্পোন্নত দেশে প্রবৃদ্ধির হার কমে আসে এবং বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পায়। এমতাবস্থায় কিনসীয় পদ্ধতিতে মোট চাহিদার পরিমাণ অক্ষুন্ন রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এটা আবার একদিকে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে না। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতিকে আরো অবনতিশীল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়। এখন একথা সর্বজনস্বীকৃত যে, প্রকৃত প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি ও বেকারত্ব হ্রাস করার জন্য দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা একটি অপরিহার্য পূর্বশর্ত। ১৯৮০ এর দশকে মূল্যস্ফীতির হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেলেও অর্থনীতিবিদগণ একে একটি সাময়িক স্থিতিশীলতা বলে মনে করেন এবং ধারণা পোষণ করেন যে, মূল্যস্ফীতি আবারও একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বাজেট ঘাটতি যদি অব্যাহত থাকে। এ অবস্থার আরো অবনতি হবে যদি রাশিয়া ও অন্যান্য পূর্ব ইউরোপীয় দেশসমূহ তাদের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে অর্থবাজার হতে ব্যাপকভাবে ঋণ গ্রহণ করে থাকে এবং অন্যান্য শিল্পোন্নত দেশগুলোও অধিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও বেকারত্বের হার হ্রাসের জন্য উচ্চমাত্রার সরকারি ব্যয় অব্যাহত রাখে। দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে, অর্থবাজারে অত্যধিক লেনদেনের তারল্য সৃষ্টির ফলে বৈদেশিক মুদ্রা স্টক ও পণ্য বাজারে সৃষ্ট উচ্চমাত্রার অস্থিতিশীলতা। ব্রাডি কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী পুঁজিবাজার ক্রমশই ঝুঁকপূর্ণ ও বিপজ্জনকভাবে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে এবং এ বিষয়ে প্রতিরোধমূলক কিছু করারও অবকাশ দেখা যাচ্ছে না। যখন বিশাল বাজেট ঘাটতি, নাটকীয়ভাবে স্থিতিহীন সুদের ও বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের হার বিরাজ করে এবং স্বল্পমেয়াদের পণ্য আন্তঃদেশে দমকা বাতাসের মতো অর্থের আগমন ও নির্গমন হয়, তখন অর্থবাজার বিপজ্জনকভাবে অস্থিতিশীল হয়ে দাঁড়ায়। পুঁজিবাদী অর্থনীতির অস্থিতিশীলতার অন্যান্য কারণগুলো হচ্ছে, সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঋণদানের অত্যধিক প্রসারণ বা সংকোচন, সম্পদ ও আয়ের বিরাট বৈষম্য, যাকে হেইলব্রোনার 'পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার পরিকল্পনাহীন ও নৈরাজ্যবাদী চরিত্র' হিসেবে অভিহিত করেছেন। সুষম অর্থ ও রাজস্বনীতি প্রবর্তন এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন ব্যতিরেকে অস্থিতিশীলতার এইসব উৎসের মূল্যেৎপাটন করা সম্ভব নয়। তৃতীয় সমস্যা হচ্ছে, ঘাটতি বাজেটের অর্থায়নের জন্য অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের ফলে ঋণের ক্রমবর্ধমান সুদের বোঝা। তুলনামূলকভাবে অধিক ঋণের হার ও বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারের অস্থিরতা অর্থনীতিতে আবার নতুন নেতিবাচক মাত্রা যোগ করে। ঘাটতি বাজেটের জন্য অর্থ সংগ্রহ সকল দেশের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ালেও উন্নয়নশীল দেশের জন্য এ প্রক্রিয়া সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব উন্নয়নশীল দেশের জন্য বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধের বিষয়টি সমগ্র আন্তর্জাতিক অর্থবাজারের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করে দিয়েছে। চরমভাবে ঋণগ্রস্ত দেশসমূহের দুঃসহ অভাব লাঘবের জন্য বেশ কিছু আন্তর্জাতিক প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কিন্তু উপযুক্ত পরিমাণ অর্থের সংকুলান করা যায়নি বলে এসব কর্মসূচি গতিশীলতা লাভ করতে পারেনি। ইতোমধ্যে কতিপয় দেশ তাদের রপ্তানি আয়ের সুনির্দিষ্ট অনুপাতে বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। বৃহৎ ঋণগ্রস্ত দেশসমূহ যদি একই পরিকল্পনা ঘোষণা করে তাহলে ব্যাংকসমূহের জন্য সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দিবে। চতুর্থ সমস্যা হচ্ছে, সরকারি ও বেসরকারি খাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সঞ্চয়ের হার হ্রাস পাওয়া। যেহেতু সঞ্চয় ও বিনিয়োগ সরাসরিভাবে সম্পৃক্ত, তাই বিনিয়োগ স্বাভাবিকভাবেই হ্রাস পেয়েছে। ১৩টি মুখ্য ওইসিডি দেশে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের হার ১৯৬০-৭১ দশকের ১৭.৫% ও ১৭.৬% হতে হ্রাস পেয়ে ১৯৮০-৮৭ সালে ১০.৭% ও ১০.৮% এ এসে দাঁড়িয়েছে। রাশিয়া, পূর্ব ইউরোপ ও একত্রীভূত জার্মানী কর্তৃক বিনিয়োগের জন্য সংকুচিত বিশ্ব-সঞ্চয়ের ভাণ্ডারের উপর যেহেতু অধিকতর চাহিদা ও চাপ সৃষ্টি হবে, তাই বিশ্ব অর্থনীতির দিগন্তে সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব-সঞ্চয় ভাণ্ডার বিশেষত উচ্চ সঞ্চয়কারী দেশ জাপানেও সঞ্চয়ের ফলে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং স্টক, দ্রব্য সামগ্রী ও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। পঞ্চম সমস্যা হচ্ছে, ভোগের ইচ্ছা চরিতার্থকরণ ও প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির উপর অত্যধিক ও অপ্রয়োজনীয় গুরুত্ব আরোপের ফলে অনবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদের মজুদের ক্রমবর্ধমান হ্রাস এবং প্রাণী ও পরিবেশের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বিনষ্ট হওয়ার এই গ্রহে জীবনের উপর হুমকির সৃষ্টি হয়েছে। এখন এটা সর্বমহলে উপলদ্ধি হচ্ছে যে, 'বিশ্বের পরিবেশগত সংকট মোকাবিলার জন্য বিশ্ব অর্থনীতি ও বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহের মৌলিক নীতিমালার বৈপ্লবিক পরিবর্তন ব্যতিরেকে গত্যন্তর নেই'। বিশ্বের বিভিন্ন মহল থেকে এ বিষয়ে কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় প্রস্তাব উত্থাপিত হওয়া সত্ত্বেও এক্ষেত্রে অনিবার্যভাবে প্রয়োজনীয় একটি বিশেষ দিকের প্রতি স্বল্পই সচেতনতা ও উপলদ্ধি সৃষ্টি হয়েছে। তা হচ্ছে 'সম্ভোগের জড়তা' থেকে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে নৈতিক মূল্যবোধ ও সহজ সরল জীবনযাত্রার দিকে প্রত্যাবর্তনের অনুরাগ ও অনুভূতি। উভয় সংকট পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার দুটি পন্থা রয়েছে- হয় উৎপাদন ব্যয় না হয় মোট চাহিদা কমাতে হবে। প্রথম ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী কোনো না কোনোভাবে দ্রব্যমূল্য হ্রাস করতে হবে। দ্বিতীয় ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী সুষম বাজেটের দিকে ফিরে যেতে হবে। অস্থায়ী ব্যবস্থাপনা দ্বারা প্রথমটি অর্জন করা যেতে পারে। অবশ্য এর দীর্ঘকালীন ব্যবহার সম্ভব নয়, বিশেষত মুদ্রাস্ফীতিজনক পরিস্থিতিতে। কারণ প্রকৃত মজুরি হ্রাসের এই ব্যবস্থা শ্রমজীবী মানুষের জন্য কষ্টদায়ক ও অন্যায্য। তাছাড়া এতে কালোবাজারী, দীর্ঘকালীন সরবরাহ স্বল্পতা এবং উৎপাদন উপাদানের বিভিন্ন খাতে বণ্টনে বিকৃতি দেখা হয়। দেখা যায়, নিয়ন্ত্রণের ঢাকনা যখন তুলে ফেলা হয়, তখন দ্রব্যমূল্য ও মজুরি বৃদ্ধি পাগলা ঘোড়ার বেগে ছুটে আসে। সুষম বাজেটের ব্যবস্থাপত্র মূল্যস্ফীতির দিগন্তে স্বস্তির বাতাস এনে দিলেও অন্য সীমান্তে বৃদ্ধি হ্রাস, অধিকতর বেকারত্ব, কল্যাণ খাতে ব্যাপক কাটছাঁটের দুর্যোগ ডেকে আনে, বিশেষত যখন সরকার তার জন্য সকল খাতে বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে, ব্যয় কমাতে রাজী না থাকে এবং সেকুলার ভোগবাদী সমাজ যখন তাদের অনাবশ্যক ও অপচয়মূলক খরচ কমাতে অসম্মত থাকে। এ অবস্থা পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে একটি সংকটে নিপতিত করেছে। সৃষ্টি হয়েছে সমাধানহীন এক সংঘাতের। এ সংঘাত হচ্ছে পুঁজিবাদের কথিত সফল ও বাঞ্ছিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং মুদ্রাস্ফীতিমুক্ত স্বাস্থ্যকর অর্থনীতির সংঘাত। তাই দেখা যাচ্ছে, কিনসীয় কৌশল উভয় সংকটের সৃষ্টি করেছে। একদিকে এ অর্থনৈতিক কৌশল দারিদ্র্য দূরীকরণ, ন্যূনতম প্রয়োজনের চাহিদা পূরণ, মূদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্ব সমস্যার সমাধান করত পারেনি। অন্যদিকে সম্পদ ও আয়ের বিশাল বৈষম্য হ্রাসেরও কোনো পন্থা এই কৌশল উদ্ভাবন করতে পারেনি। অবশ্য সমাজতন্ত্রের অপ্রতিরোধ্য অগ্রাধিকারের মুখে এ লক্ষ্যসমূহ কালক্রমে বুদ্ধিবৃত্তিক গ্রহনযোগ্যতা লাভ করেছে, যা কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণার জন্ম দিয়েছে এবং পশ্চিমা ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিতে কল্যাণ রাষ্ট্রের এ ধারণা সজীব শিকড়ের আকার ধারণ করেছে। কল্যাণ রাষ্ট্র কেবলমাত্র অর্থনীতিতে সরকারের ভারসাম্য সৃষ্টিকারী ভূমিকা পালনের কিনসীয় প্রস্তাবকেই গ্রহণ করেনি, অধিকন্তু কল্যাণ খাতে অধিকতর ব্যয় এবং যথাযথ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সরকারের কল্যাণমুখী ভূমিকাকেও আত্মস্থ করেছে। সরকারি ও বেসরকারি কোনো খাতে ভারসাম্য সৃষ্টিকারী ব্যয় হ্রাস না করেই কল্যাণ রাষ্ট্রের ভিত্তির উপর প্রত্যাঘাতের জন্ম দিয়েছে। সামাজিক ডারউইনবাদীদের দৃষ্টিতে এ সমস্যার সমাধান হচ্ছে কল্যাণ খাতে ব্যয় হ্রাস। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক সমাজ, মনুষ্যত্বের উদ্বোধন যার লক্ষ্য হিসেবে এখানে সজীব, সেখানে কল্যাণ খাতে ব্যয় হ্রাস বা পূর্ণ কর্মসংস্থান ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির হার অর্জনের লক্ষ্য কি বিসর্জন দেয়া সম্ভব? যেহেতু এটা সম্ভব নয়, তাই প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে কোথায় ভুল আর কোথায় বিভ্রান্তি? এ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ও পদ্ধতিতেই মৌলিক গলদ রয়েছে। সামাজিক অনিষ্টকারিতা পুঁজিবাদের সেকুলার দর্শনের ট্রাজেডি হচ্ছে কতিপয় পুঁজিপতিদের লাগামহীন স্বার্থসিদ্ধির সুযোগ দানের বিনিময়ে সমাজে সিংহভাগ মানুষ অধিকার ও কল্যাণ হতে বঞ্চিত হয়েছে; শুধু তাই নয় বরং পুঁজিবাদ আরে অনেক সামাজিক অনিষ্টকারিতার জন্ম দিয়েছে। ঐশি নির্দেশনা এবং তা হতে উদ্ভুত সামাজিক মূল্যবোধগুলোকে অবহেলা ও অস্বীকৃতির মাধ্যমে পুঁজিবাদ এমন একটি বাঁধনহীন, লাগামহীন সমাজের জন্ম দিয়েছে যার পরতে পরতে দুর্নীতি ও দুষ্কৃতি বিস্তার লাভ করেছে। অধিক হতে অধিকতর ভোগবিলাসের লালসা, ছলেবলে কৌশলে যেভাবেই হোক অধিকতর সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার মানসিকতার ইন্ধন জুগিয়েছে। পুঁজিবাদী দর্শনের ফসল নেতিবাচক ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ ও আত্মস্বার্থপরতার অবাধ প্রচার ও প্রসার হাজার বছরের ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি দুর্বল করে তোলে। অথচ একথা অনস্বীকার্য যে, সুস্থ ও সবল সামাজিক অগ্রগতিতে পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। পারিবারিক আস্থা, বিশ্বাস ও নির্ভরশীলতা ব্যতিরেকে স্বামী ও স্ত্রী পরস্পরকে ভালোবাসার বন্ধনের মাঝে জড়িয়ে রাখতে পারে না। ঐ সমাজে এটা সম্ভব নয় যেখানে অবাধ যৌন স্বাধীনতা বিরাজ করে, স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই প্রতারণামূলক যৌন অনাচারে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। এমন সমাজে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের কাঠামো ভেঙে পড়াই স্বাভাবিক। 'ঈশ্বর এখন মৃত'- এ দাম্ভিক ঘোষণার পরপরই এলো 'পরিবার কাঠামোকে ভেঙে ফেল'- এই বাণিজ্যিক কৃষ্টির শ্লোগান। 'শাসন-শোষণের নীড় ও শৃঙ্খল' অভিধায় পরিবারকে চিহ্নিত করে এর নিন্দাবাদ উচ্চারিত হলো। 'ঐতিহ্যের শিকল' এবং 'সমষ্টিগত সকল বন্ধন' হতে মানুষের মুক্তি দেবার জন্য পশ্চিমা রেনেসাঁ আন্দোলনের স্বাভাবিক ফলাফল ছিল এগুলো। বিবাহ বন্ধনের বাইরে যৌন সম্পর্কের অনুমোদন এবং অর্থ উপার্জনের অবাধ লিন্সার সাথে সন্তান লালনপালনের জন্য ত্যাগ স্বীকারের প্রয়োজন তা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উপযুক্ত যত্ন ও স্নেহমমতার মাধ্যমে সন্তানকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার জন্য মাতাপিতার পক্ষ থেকে যে উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার প্রয়োজন, এর মাধ্যমে পরিপূর্ণ নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার কথা, তা এখন আর লভ্য নয়। শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য যে সময়টা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সে সময়টি মাতৃক্রোড়ের বদলে ডে-কেয়ার সেন্টারে হতে পারে না। তাই কিশোর অপরাধ বেড়ে চলছে এবং এমন এক প্রজন্ম বেড়ে উঠছে যাদের মাতাপিতা, ভাইবোন, মানুষ এবং সামাজিক মূল্যবোধ কোনো কিছুর প্রতিই কোনো শ্রদ্ধাবোধ নেই। মানুষের মানবিক মূল্যবোধের এরূপ অবনতিশীল পরিস্থিতিতে কি মানব সভ্যতা টিকে থাকতে পারে? মুষ্টিমেয় বৃহৎ কতিপয় পুঁজিবাদী পরিবার কর্তৃক সমগ্র অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ এবং নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্ষেত-খামার আছে এমন ধরনের জনসংখ্যার ক্রমহ্রাসমান হার গ্রামাঞ্চল ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শহর হতে বিরাট জনগোষ্ঠীকে কাজের খোঁজে বৃহৎ নগরীর দিকে ধাবমান করে তুলেছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর নগরমুখী এই বৃহৎ অভিবাসন একান্নবর্তী পরিবারের ভাঙনের সাথে যুক্ত হয়ে পরমাণু আকৃতির ক্ষদ্র পরিবারের সমকালীন ধরণাকে বাস্তব রূপ দিচ্ছে। ফলে পরিবারের সদস্য হিসেবে পূর্বে একে অন্যের আপদে-বিপদে, সুখ-দুঃখে যে পারস্পরিক নির্ভরতা ও সহায়তা পেত, তা হতে বর্তমান একক পরমাণু পরিবারগুলো বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে দরিদ্র, আর্ত, রোগগ্রস্ত, বৃদ্ধ, বিকলাঙ্গ জনগণের দেখাশোনা করার সমগ্র বোঝা ও দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপর বর্তায়, যেটা আনজাম দেবার শক্তি, সম্পদ ও সরঞ্জাম কোনোটাই রাষ্ট্রের নেই। পরিবার নামক তৃণমূল প্রতিষ্ঠান ও যুথবদ্ধ সামাজিক জীবনের ভাঙন সামাজিক নিয়ন্ত্রণের একটি অতীব কার্যকর পথ ও পন্থার ভিত্তিভূমিকে প্রবলভাবে ক্ষয় ও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধিতে ইন্ধন যুগিয়েছে। দারিদ্র্য দ্বারা সৃষ্ট দস্যুতা, চুরি, ধর্ষণ ও অর্থের বিনিময়ে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ এবং ধনিক শ্রেণী কর্তৃক ঘুষ, ভোক্তাকে প্রতারণা, বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন, নিম্নমানের দ্রব্য সামগ্রীর বাজারজাতকরণ, অন্যায্য শ্রমনীতি এবং কর ফাঁকি দেবার প্রচেষ্টা প্রভৃতি হোয়াইট কালার অপরাধ ও দুর্নীতিকে একত্রীভূত করলে যে অপরাধ ইনডেক্স বেরিয়ে আসবে তা ক্রমাগত উর্ধ্বমুখী। সরকারিভাবে অপরাধের যে পরিসংখ্যান পাওয়া যায় তা ডুবন্ত বিশাল হিমবাহের পানির উপরকার শীর্ষ দেশের মতো। সমাজদেহে অস্বাভাবিকতার সকল লক্ষণের বৃদ্ধি সুস্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। এটি ব্যক্তি-মানুষের জীবনে অসুখি হবার অভিব্যক্তিরই প্রকাশ। দেহ এবং যৌন সম্ভোগ ও সম্পদ বৃদ্ধির বল্গাহীন প্রচষ্টার মাঝে যদি মানুষের সুখ ও প্রশান্তি নিহিত থাকত তবে সমাজদেহে যে অস্বাভাবিকতার লক্ষণ জাজ্বল্যমান হয়ে ফুটে উঠেছে তা এত তীব্র হয়ে দৃশ্যমান হতো না, যা বস্তুত সভ্য সমাজের অস্তিত্বকেই হুমকির সম্মুখীন করেছে। অধিকাংশ সরকারই একথা উপলদ্ধি করতে পারছে না যে, কেবলমাত্র পুলিশী শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে অপরাধ হ্রাস ও দমন করা সম্ভব নয়। অপরাধ হ্রাসের জন্য প্রয়োজন আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং একই সাথে মৌলিক চেতনা ও মূল্যবোধের মাধ্যমে সমাজ দেহের পুনর্গঠন ও পুনর্বিন্যাস। অপরিহার্য বিষয়ের বাস্তবায়ন ব্যতীত অপরাধ হ্রাসের কথা উচ্চারণ ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেয়ার যুক্তির মতো অন্তঃসারশূণ্য। ফলে ব্যর্থতা অবধারিত। আর্থ-সামাজিক ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য অনিবার্যভাবে প্রয়োজন আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনার আমূল সংস্কার, যা শুধু ঐশীবাণী প্রদর্শিত নৈতিক মূল্যবোধের জাগরণের মাধ্যমেই সম্ভব। কিন্তু দেখা যায়, পুঁজিবাদের বিশ্বদৃষ্টি ও কৌশল মানুষের নফসানিয়াতের তাড়না থেকে সৃষ্ট যা ঐশীবাণী নির্দেশিত মূল্যবোধকে অস্বীকার করে জৈবিক তাড়নার দিকে ধাবিত হয়েছে। ফলশ্রুতিতে দেখা যাচ্ছে, বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদরাজির মালিকও দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সত্ত্বেও অধিক অগ্রসর পুঁজিবাদী দেশসমূহ দারিদ্র্য ও বেকারত্ব নিরসন, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের চাহিদাপূরণ এবং আয় ও সমাজের বিশাল বৈষম্য হ্রাসে সমর্থ্য হয়নি। শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার ৩৩.৬% তথা ৩ কোটি ২৪ লাখ লোক দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করছে। এদের এক চতুর্থাংশ আবার 'দারিদ্র্য ও হতাশার দুষ্টচক্রে' আবর্তিত। এরা হচ্ছে 'বস্তি সংস্কৃতির বন্দী আদম সন্তান'। কিশোরী গর্ভবতী, পিতৃহীন পরিবার, অমোচনীয় বেকারত্ব, অপরাধ ও মাদকাসক্তির অবক্ষয়িত সমাজ ও সংস্কৃতির অন্ধগলিতে এদের জীবন তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। ষাট ও সত্তর দশকে যখন লেইজে ফেয়ার দর্শন প্রত্যাখ্যাত হয়ে দারিদ্র্য দূরীকরণ রাষ্ট্রীয় কর্তব্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং যার ফলে উন্নত কল্যাণ রাষ্ট্রসমূহের আবির্ভাব ঘটে, উপযুক্ত হতাশাব্যঞ্জক চিত্রসমূহ তখনকার ছবি। এমতাস্থায় দুর্দশা আরো কত গভীরতর হবে তা কল্পনাও করা যায় না, যখন রিগান ও থ্যাচার প্রশাসন পুনরায় লেইজে ফেয়ারের পথে ওকালতি করছেন এবং তারা দারিদ্র্যের জন্য দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে এবং তাদের ভর্তুকি দেবার সরকারি নীতিকেই দায়ী করছেন? এসবের সাথে যদি শ্লথ প্রবৃদ্ধির সমষ্টি অর্থনৈতিক বৈসাদৃশ্যকে যুক্ত করা হয় তবে নিশ্চিতভাবে এটা সবার দৃষ্টিগোচর ও হৃগয়ঙ্গম হবে যে, সম্পূর্ণ নতুন ধরনের অর্থনৈতিক মডেল ব্যতিরেকে এ অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়।

দ্বিতীয় অধ্যায়ঃ সমাজতন্ত্রের পশ্চাৎপসরণ

দ্বিতীয় অধ্যায় সমাজতন্ত্রের পশ্চাৎপসরণ পুঁজিবাদী সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অনিবার্য দুঃখদুর্দশা ও ভোগান্তি। মানবচিত্তের স্বভাবজাত শুভবুদ্ধি এ অবস্থাকে মেনে নিতে পারেনা। স্বাভাবিকভাবেই এ অমানবিক ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন প্রকার মতবাদ ও জীবনাদর্শের উদ্ভব ঘটেছে যার মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ। অবশ্য সমাজতন্ত্র কোনো এক ব্যক্তির চিন্তাপ্রসূত মতবাদ নয়। এর বিভিন্ন ধরন রয়েছে; যেমন- ইউটোপিয়ান, ফ্যাবিয়ান, সিন্ডিক্যালিস্ট, গিল্ড, মার্কসিস্ট, মার্কেট, ডেমোক্রেটিক এবং অন্যান্য। সমাজতন্ত্রের এসব বহুবিধ প্রকারের পারস্পরিক তারতম্যের চুলচেরা বিশ্লেষণ বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যাবশ্যক নয়। তবে সমাজতান্ত্রিক এসব মতবাদের মধ্যে কতক বৈশিষ্ট্য সাধারণ। সমাজতন্ত্রের ধারণা সমূহের সবগুলোই (কতিপয় ব্যতিক্রম ব্যতীত, যেমন-পল টিললিক, আর এইচ টাউনি এবং কুর্ট সুমেকার) তৎকালীন প্রবল সেকুলার আবহে লালিত হয়েছিল এবং বিশ্ব সম্পর্কে ধারণার ক্ষেত্রে এদের সবার দৃষ্টিভংগি ছিলো পুঁজিবাদী মতবাদের মতোই সেকুলার। পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার সমানভাবে সমালোচনা করে এরা যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, মুক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত বাজারব্যবস্থা অনিবার্যভাবে সম্পদের অসম বন্টন ঘটিয়ে বিত্তশালীকে আরো বিত্তবান এবং দরিদ্র্যকে আরো দরিদ্র্যতর করে আয় ও সম্পদের অসম বন্টনের দুষ্ট চক্রকে চিরস্থায়ী রূপ দেয়। সমাজতান্ত্রি মতবাদসমূহ ব্যক্তি মালিকানা ও মজুরি ব্যবস্থাকে সকল অনিষ্টের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করে ধারণা পোষণ করে যে, সম্পদের বিভিন্ন মাত্রায় জাতীয়করণ ব্যতীত দরিদ্র্য জনসাধারণের প্রতি ন্যায় বিচার করার সম্ভব নয়। যতদিন পর্যন্ত সম্পদের অসম বন্টন ব্যবস্থা ও বিশেষ স্বার্তভোগী শ্রেণী বিদ্যমান থাকবে, ততোদিন এমনকি গণতন্ত্রের পক্ষেও কার্যকর রূপ নেয়া সম্ভব নয়। সমাজতান্ত্রিক মতবাদসমূহ এমন একটি ভবিষ্যতের ধারণা পোষণ করে যখন জনগণ গণতান্ত্রিকভাবে বা বলপূর্বক পুঁজিবাদীদের কবল হতে সরকারের নিয়ন্ত্রভার গ্রহণ করবে এবং উৎপাদন উপকরণের জাতীয়করণ ও পরিকল্পিত উৎপাদন ও বন্টন ব্যবস্থার ভিত্তিতে শ্রেণী সংঘাতমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক ও সুষম সমাজব্যবস্থার পত্তন ঘটাবে। অন্য কথায় তারা পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে আক্রমণ করে উৎপাদন ও বন্টন প্রক্রিয়ার এক ভিন্ন ব্যবস্থাপনার প্রস্তাব করে। সমাজতন্ত্রের এ নানাবিধ প্রকরণের মধ্যে মূল পার্থক্য বিশ্বব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তাদে দৃষ্টিভংগিতে নয়, বরং অভিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে তাদে কার্যপদ্ধতি বা কৌশলের মধ্যে নিহিত। সমাজতন্ত্রের বহুবিধ প্রকরণের মধ্যে এখানে শুধুমাত্র মার্কসবাদী (Marxist) বাজারব্যবস্থা (Market) ও গণতান্ত্রিক (Democratic) -এই তিনটি চিন্তাধারার উপর আলোকপাত করা হবে। সমাজতন্ত্রের অন্যান্য ধারণাসমূহ এই তিনটি মূলধারার পূর্বসূরি এবং যেহেতু এগুলোর মূলধারা তিনটির মতো রাজনৈতিক প্রাধান্য বিস্তার করতে পারেনি, তাই তাদের আলোচনা দ্বারা সমাজতন্ত্রের মূর বিষয়বস্তু অনুধাবনে কোনো সুযোগের অবকাশ নেই। মার্কসবাদ বিশ্বদৃষ্টি ও কৌশল জঙ্গি নাস্তিক্যবাদ (Militant Atheism) মার্কবাদ হচ্ছে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ও মধ্যভাবে উদ্ভুত বিভিন্ন আদর্শগত সংশ্লেষণ। এ আদর্শিক চিন্তাধারাগুলো হচ্ছে তৎকালীন সেকুলার মুক্তচিন্তা, হেগেলের দ্বান্দ্বিক মতবাদ, ফুয়েরবাকের বস্তুবাদ, মিচেলের শ্রেণী সংগ্রাম তত্ত্ব, রিকার্ডো ও স্মিথের অর্থনৈতিক দর্শন এবং ফরাসী বিপ্লবের জঙ্গি আহক্ষাণ। ইহুদী পিতামাতার সাত সন্তানের অন্যতম কার্ল মার্কস এসব চিন্তাধারা, বিশেষ করে সেকুলার ও নাস্তিক্যবাদী ধ্যানধারণার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠেন। তার পিতা ধর্মের ব্যাপারে তেমন রক্ষণশীল ছিলেন না। বিশ্বাসের তাগিদে নয় বরং পেশার প্রয়োজনে তিনি পরবর্তীতে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন। যুবক বয়স হতে মার্কস গোঁড়া নাস্তিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন যার দর্শনের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘ধর্মশাস্ত্রের সমালোচনাই সকল সমালোচনা শাস্ত্রের মূল ভিত্তি’। অন্যান্য সমাজ বিজ্ঞানীর মধ্যে মার্কও সমাজব্যবস্থার রোগ নির্ণয় এবং প্রতিকার বিধানের চেষ্ট করেছিলেন। এই প্রক্রিয়ায় তিনি শ্রেণী বিচ্যূতি, শোষণ, উদ্বৃত্ত-মূল্য, ব্যক্তিগত সম্পত্তি, শ্রেণী সংগ্রাম, মজুরি-দাসত্ব, অর্থনৈতিক নির্ণয়বাদ নামক কতিপয় ধারণার প্রবর্তন করেন। কিন্তু লেখক হিসেবে সুবিন্যস্ত ও সাবলীল লেখনীর অধিকারী না হওয়ায় তার এই সব ধারণাগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে অস্পষ্ট, অবোধগম্য ও ভাসাভাসা। মার্কসের বিশ্লেষণের প্রধান তাত্ত্বিক ধারণা হচ্ছে ‘এলিনেশন’ (alienation) বা সম্পদের হস্তান্তর প্রক্রিয়া। বুর্জোয়া শ্রেণী কর্তৃক প্রলেতারিয়েত শ্রেণীকে শোষণের ফলে পুঁজিবাদী সমাজে এর উদ্ভব ঘটে। প্রলেতারিয়েত শ্রেণী হচ্ছে শিল্প শ্রমিক। উৎপাদন উপকরণের মালিক বিধায় তারা তাদের শ্রম বিক্রয় করে মজুরি-দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হতে বাধ্য হয়। বুর্জোয়া শ্রেণী হচ্ছে পুঁজিবাদী, যারা উৎপাদনের উপকরণসমূহের মালিক ও নিয়ন্তা। প্রলেতারিয়েত শ্রেণী সকল উদ্বৃত্ত মূল্যের স্রষ্টা হওয়া সত্ত্বেও তাদেরকে দেয়া হয় সর্বনিম্ন মজুরি যা তাদের কোনো রকমে বেঁচে থাকা ও নতুন শ্রমদাস প্রজননের চক্রে বেঁধে রাখে। বুর্জোয়া শ্রেণী শ্রমিক শ্রেণী কর্তৃক সৃষ্ট উদ্বৃত্ত-মূল্য আত্মসাতের মাধ্যমে ক্রমাগতভাবে ফুলে ফেঁপে ওঠে এবং প্রলেতারীয় শ্রেণীকে চিরস্থায়ী মজুরি দাসত্বের নিগড়ে আবদ্ধ করে। এই প্রক্রিয়া মানুষকে তার সহজাত মর্যাদা হতে বঞ্চিত করে অমানবিক যন্ত্রে মানবসত্তার বিচূর্ণিত ভগ্নাংশে পরিণত করে। মানব সত্তার সম্ভাববনাসমূহের পরিপূর্ণ বিকাশের সুযোগ হতে তারা নির্মমভাবে বঞ্চিত হয়। এই শোষণ প্রক্রিয়া পরস্পর স্বার্থ বিরোধী বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করে অনিবার্যভাবে শ্রেণী সংগ্রামের সূচনা করে। মানব ইতিহাসের গতিপথের ক্রমবিবর্তনে এই শ্রেণী সংগ্রামই মূল নিয়ন্তাশক্তি। ব্যক্তি মানুষ কোনো স্বাধীন সত্তা নয়, বরং ইতিহাসের এই দাবার ছকের অসহায় গুটি মাত্র। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর বৈষয়িক স্বার্থের অনিবার্য সংঘাতই নিয়ন্ত্রণ করে মানব ভাগ্য (অর্থনৈতিক নির্ণয়বাদ)। উপর্যুক্ত যুক্তি অনুসারে মানুষের চিন্তাধারা নয় বরং মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থাই ইতিহাসের মূল চালিকা শক্তি। বুর্জোয়া সমাজের ধর্ম ও রাষ্ট্র এ শ্রেণী সংঘাতের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং সর্বহারা শ্রেণীকে শোষণের জন্যে ধর্ম ও রাষ্ট্র উভয়কেই বুর্জোয়া শ্রেণী ব্যবহার করে। মানব সমাজের একাংশের ক্রমাগত দরিদ্র হতে দরিদ্রতর হওয়ার প্রক্রিয়ায় এ উভয় প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ এলিনেশন প্রক্রিয়া অপসৃত হবে এবং ইতিহাসের ক্রমবিবর্তনের এক পর্যায়ে রাষ্ট্রযন্ত্রেরই আর কোনো আবশ্যকতা থাকবেনা। তাই অত্যাবশ্যক প্রয়োজন হচ্ছে এ সমস্ত অববস্থার অপসারণ যে পরিপ্রেক্ষিতে মানুষ হয় অপমানিত, নিগৃহীত, পরিত্যক্ত ও শৃংখলিত। কিন্তু লক্ষণীয় যে, মার্কসীয় দর্শনের মধ্যেই অন্তর্নিহিত রয়েছে পরস্পর বিরোধিতা তথা চরম দ্বৈততা। মার্কসীয় দর্শনে একদিকে ব্যক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক নির্ণয়বাদের চরম হতাশাব্যঞ্জক পরিণতির কথা, অর্থাৎ সেখানে শ্রেণী সংঘাত ও শোষণের অনিবার্য হাত হতে মুক্তির কোনো পথ নেই, অপর দিকে অর্থনৈতিক নির্ণয়বাদের কঠোর নিগূঢ় তত্ত্ব থেকে মানবতার মুক্তির স্বপ্নজাল বিস্তার করা হয়েছে। মার্কসের মতানুসারে ‘ব্যক্তিস্বাতন্ত্রমূলক মানব প্রকৃতি বলে কিছু নেই’। এ মতবাদ মূলত অপরিবর্তনীয় ও স্থির এক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যহীন সাধারণ মানব চরিত্রের নির্দেশ করে। যেহেতু ব্যক্তি মানুষের কোনো মৌলিক প্রকৃতি নেই, তাই মানুষের চেতনা রাজনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে ক্রমাগত বদলে যাচ্ছে এবং এই পরিবর্তন তার জীবনে ‘বৈষয়িক অবস্থা তথা যে উৎপাদন পদ্ধতির সমাজে তার অবস্থান তা দ্বারা নির্ণীত হয়’। নরম্যান গ্রঅরাস মানব চরিত্র সম্পর্কে মার্কসের এ বহুল প্রচারিত মতের বিরোধিতা করেন। যাই হোক, মানব চরিত্র সম্পর্কে মার্কসের উপস্থাপিত ধারণা প্রামাণ্য বা গ্রহণযোগ্য নয়। তার ধারণা গ্রহণ করা হলে প্রকৃত প্রস্তাবে মার্কস ইতিহাসের বস্তুবাদী ধারণার উপর যে তাত্ত্বিক প্রাসাদ নির্মাণ করেছেন সেটাই ধ্বসে পড়ে। যদি ব্যক্তি মানব চরিত্র অপরিবর্তনীয় হয়, তবে মানব জীবনের বৈষয়িক অবস্থা ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে বা ইতিহাসের দাবার ছকে মানুষকে নিছক গুটিতে পরিণত করতে পারেনা। এর দ্বারা মার্কসের নিজের মতবাদই খণ্ডিত হয়ে যায় অর্থাৎ মানব চরিত্রের এ অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্যই তখন ইতিহাসের ক্রমবিবর্তনের বিরুদ্ধে কাজ করে যাবে। কিন্তু মার্কস ইতিহাসের দ্বন্দ্ববাদী যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তাতে আমরা মানব চরিত্র সম্পর্কে তার পূর্বতন ধারণার প্রতিফলন দেখতে পাইনা। প্রকৃতপক্ষে, মার্কসের পরস্পর বিরোধী চিন্তাধারার বীজ মার্কস উপস্থাপিত বিভিন্ন তাত্ত্বিক ধারণার মধ্যে যে অন্তর্নিহিত অসামঞ্জস্যতা রয়েছে তার মধ্যেই বিদ্যমান। একদিকে মার্কসের ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা মানব চরিত্রে অন্তর্নিহিত নিজস্ব বৈশিষ্ট্যকে স্বীকার করেনা, অন্যদিকে তার ‘এলিনেশন’ সম্পর্কিত ধারণাটি এমন এক বৈশিষ্ট্যের অপরিহার্যতা দাবি করে। মার্কসের বস্তুবাদী ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ববাদ ও এলিনেশন সম্পর্কিত উপর্যুক্ত দুটি ধারণাই প্রকৃতপক্ষে পরস্পর বিরোধী ও সাংঘর্ষিক এবং এটাই মার্কসীয় দর্শন ও মতবাদ সম্পর্কে অস্পষ্টতা ও অসামঞ্জস্যতার যে সাধারণ অভিযোগ সমালোচক মহলে বিরাজিত তার মূল কারণ। রণ কৌশলের ভুল প্রয়োগ ‘এলিনেশন’ প্রক্রিয়ার অবসানের একমাত্র উপায় হচ্ছে এর উৎস ব্যক্তিগত মালিকানার উচ্ছেদ সাধান। এর ফলে বুর্জোয়া শ্রেণীর সামাজিক আধিপত্য এবং তাদের রাজনৈতিক ও শোষণ-নিপীড়নমূলক ক্ষমতার বিলোপ ঘটবে। এই লক্ষ্যে সবচেয়ে কার্যকরী পন্থা হচ্ছে প্রলেতারীয় শ্রেণী কর্তৃক সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পতন ঘটানো। মার্কস ‘ইউরোপীয় সমাজতন্ত্রীদের প্রস্তাবিত শান্তিপূর্ণ পন্থায় সমাজ পরিবর্তনের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেন। কেননা এ পন্থা শ্রেণী সংগ্রামের মৌলিক হাতিয়ারকে ভোঁতা করে দেবে। মার্কস পুঁজিবাদী সমাজ থেকে ধাপে ধাপে ক্রমবিবর্তনের ধারণাকেও বাতিল করেন দেন। কেননা সমাজে পুঁজিবাদী শাসক শ্রেণীর সর্বগ্রাসী ক্ষমতা ও শক্তির কারণে এ ধরণের পরিবতর্/ন সাধান করা সম্ভব হবেনা। গতানুগতিক সরকার কর্তৃক বন্টন ব্যবস্থার সংস্কার প্রচেষ্টাও সফল সমাজতন্ত্র বিনির্মাণ করতে পারেনা। ‘প্রত্যেকে তার যোগ্যতা অনুসারে কাজ করবে এবং ব্যকিব্ত মালিকানাধীন সকল উৎপাদন উপকরণের জাতীয়করণের মাধ্যমে একটি প্রগতিশীল ন্যায়পরায়নতাভিত্তিক সমাজ গঠিত হবে, যেখানে ক্রমান্বয়ে মজুরি, বিনিময়ের মাধ্যমে মুদ্রা, সামাজিক শ্রেণী বিভাজন এবং পরিশেষে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিলুপ্তি ঘটাবে; সৃজিত হবে ‘বিবেক চেতনা ও উদ্দেশ্যমূলক নিয়ন্ত্রণের আওতায় উৎপাদক শ্রেণীর এক মুক্ত সমবায়ী ব্যবস্থা’। ফলে বুর্জোয়া পতন ও সর্বহারা (প্রলেতারিয়েত) শ্রেণীর বিজয় হবে আবশ্যম্ভাবী। প্রলেতারীয় শ্রেণীকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায় অভিসিক্ত করে তাদের বিচ্ছিন্নতার অবসান, তাদের জীবন যাত্রা ও কর্মপরিবেশের উন্নয়ন এবং এভাবে শ্রেণী সংঘাত অবসানের মহতি উদ্দেশ্য যদিও প্রশংসার দাবিদার, তবু মার্কস প্রস্তাবিত উদ্দেশ্য সাধনের পন্থা ও কৌশল ভ্রান্তি ও ত্রুটিপূর্ণ। ইতিহাসের জড়বাদী মার্কসীয় মতবাদের দার্শনিক দিকটি বাদ দিলে তার লক্ষ্য অর্জনের রণকৌশল হিসেবে বাকি থাকে বুর্জোয়া শ্রেণীর উচ্ছেদ, উৎপাদন উপকরণসমূহের রাষ্ট্রীয়করণ এবং কেন্দ্রীয় পরিকল্পনাভিত্তিক অর্থনীতির প্রবর্তন। কিন্তু তিনি যৌক্তিক বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত্তিতে উপস্থাপন করতে পারেননি যে, কিভাবে এলিনেশন প্রক্রিয়ার অবসান নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে তার প্রস্তাবিত মতাদর্শ ও পদ্ধতিগত কৌশল শোষণ ও মজুরি দাসত্বের অবসানের মাধ্যেমে প্রলেতারীয় শ্রেণীর আএর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন এবং কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার উচ্চতর ধাপে একটি শ্রেণী বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে সকল শোষণের অবসান ঘটবে। পুঁজিবাদী ব্যস্থাপনার আওতাধীনে রাষ্ট্রযন্ত্র ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যদি শোষণের হাতিয়ার হয়ে থাকে তবে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দর্শনে যা সমাজের একশ্রেণী কর্তৃক অন্য একটি শ্রেনীকে সম্পূর্ণ নির্মূলের প্রবক্তা- সে ব্যস্থাপনা উৎপাদন উপকরণের রাষ্ট্রীয়করণ ও কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার মাধ্যমে যখন বিজয়ী শ্রেণীকে লাগামহীন ক্ষমতা প্রদান করা হবে, তখন জনগণের দুঃখ-দুর্দশা যে আরো বৃদ্ধি পাবে না তা আশংকা না করার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। দ্বান্দ্বিক দর্শন, শ্রেণীশত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে একশ্রেণীর মানুষকে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড ও বলপূর্বক সম্পদ দখলে বিশ্বাসী মতাদর্শের ভিত্তিতে প্রতিটি সমাজে আর যাই হোক মানুষের ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। মানব হিতৈষী ভ্রাতৃত্ববোধের দর্শন দাবি করে সমাজের শক্তিশালী অংশ কর্তৃ সমাজের দরিদ্রতর ও ভাগ্য বিড়ম্বিত অংশের জন্যে ত্যাগ স্বীকার ও শর্তহীন সেবা প্রদান। অপর দিকে মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী মতবাদ ডারউইনের ‘শক্তিমানের বেঁচে থাকার অধিকার’ ভিত্তিক চিন্তাদর্শনেরই প্রতিধ্বনি। হত্যাকাণ্ড ও বলপূর্বক সম্পদ দখলের মাধ্যমে বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্র উৎখাত করে প্রলেতারীয় শ্রণীর প্রতিনিধিত্বের ধ্বজাধারীরা যখন একচ্ছত্র ক্ষমতার মালিক ও একনায়কতান্ত্রিক বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্র হতে অধিকতর ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্তা হবে তখন কি নিশ্চয়তা রয়েছে যে, তরা নিজেরাই শোষক ও নিপীড়কে পরিণত হবে না? মনে রাখা প্রয়োজন যে, কমিউনিস্ট মতাদর্শিক সর্বগ্রাসী রষ্ট্রযন্ত্রে জনগণের সবার অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে নয় বরং কতিপয় ব্যক্তিবর্গ দ্বারাই চালিত হবে। কেননা রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের ব্যবস্থাপনায় সমাজের সকল সদস্যের অংশগ্রহণের ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। সুতরাং পার্টির কতিপয় ব্যক্তি যারা একচ্ছত্র শাসন ক্ষমতাধারী রাষ্ট্রযন্ত্রের শীর্ষে থাকবে তারা পূর্বতন বুর্জোয়া শ্রণী হতেও অধিক নিপীড়নকারী বলে প্রমাণি হতে পারে। ব্যক্তিগত মালিকানাধীন সমাজে বিকেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শ্রমিক শ্রণি অন্তত কিছুটা স্বাধীনতা ভোগ করে। তার বিপরীতে উৎপাদন উপকরণসমূহের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রযন্ত্রে কতিপয় ব্যক্তিবর্গের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত হলে শ্রমিক শ্রেণীর ততটুকু স্বাধীনতা ভোগেরও আর অবকাশ থাকবেনা। এর কি নিশ্চয়তা রয়েছে যে, ফরাসি বিপ্লবের উদ্দেশ্যে যেভাবে বিপ্লব সংঘটনকারীদেরই বিশ্বাসঘাতকতা দ্বারা পদদলিত হয়েছিল, একইভাবে মার্কসীয় বিপ্লবের পতাকাধারী সর্বহারা শ্রেণীর একনায়করা (Dictatorship of Proletariat) বিপ্লবের বাণীকেও প্রতারিত করবেনা? যদি এলিনেশন প্রক্রিয়ার জন্যে শুধুমাত্র সম্পদের মালিকানাই দায়ি হয়, তবে ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপের মাঝেই সমধান নিহিত –এ মার্কসীয় ধারণার সাথে একমত হতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পত্তি হলো মানব সমাজে বিভিন্ন ক্ষমতা রমাঝে একটি মাত্র উৎস। এছাড়াও ক্ষমতার অন্যান্য উৎস রয়েছে, যেমন- শারীরিক যোগ্যতা, মানসিক ক্ষমতা, শিক্ষা, সৃজনশীলতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, কঠোর পরিশ্রম, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে নেতৃত্বের অবস্থান। বিভিন্ন অমার্কসীয় পদ্ধতিতে ব্যক্তিগত সম্পত্তির পরিমাণ হ্রাস বা এর শোষণ ক্ষমতা ভোঁতা করে দেয়া সম্ভব হলেও সভ্যতার ভিত্তি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট না করে মার্কসীয় পদ্ধতিতে ক্ষমতার অন্যান্য উৎসবসমূহের অপসারণ সম্ভব নাও হতে পারে। এটা মনে রাখা প্রয়োজন যে, এই এলিনেশন প্রক্রিয়া কোনো বিশেষ একক শ্রেণী বা গোষ্ঠীর আরোপিত বিষয় নয়। ক্ষমতা সম্পত্তি বা সামাজিক অবস্থান যেখান থেকেই আসুক না কেন অথবা যিনি এই ক্ষমতা ব্যবহার করবেন তিনি বুর্জোয়া বা প্রলেতারিয়েত যাই হোন না কেন, এরূপ ক্ষমতার অধিকারী যে কেউ এ ক্ষমতর অপব্যহার করতে পারে। তবে মার্কসীয় মতাদর্শে ক্ষমতার উৎস ব্যক্তগত সম্পত্তি বিলোপের পর উৎপাদন ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার মাধ্যমে সকল ক্ষমতা পলিটব্যুরোর সদস্যদের হাতে ন্যস্ত হয়, যারা চাকরি প্রদান ও সম্পদ বন্টন, পুরস্কার বা শাস্তি প্রদান, শ্রম শিবিরে প্রেরণের মতো সকল ক্ষমতার অধিকারী। আশ্চর্যের কিছু নেই যে, মার্কসীয় মতাদর্শ যেসব দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেসব সমাজে এই মতাদর্শ এলিনেশন প্রক্রিয়ার অবস্থান পরিবর্তন ঘটাতে বা কমিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। একটি ভুল ব্যবস্থাপত্র প্রকৃতপক্ষে রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে তাকে আরো জটিল করে তোলে। মার্কসের মতাদর্শ প্রকৃত প্রস্তাবে মানুষের উর অনাস্থাই প্রকাশ করে। এ মতবাদ মনে করে মানুষের চরিত্র কখনোই সংশোধন করা সম্ভব নয়। যেহেতু ব্যক্তিগত সম্পত্তি ক্ষমতার উৎস এবং শোষণের সুযোগ সৃষ্টি করে, তাই ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করাই সমীচীন। কিন্তু মনে রাখা দরকার যে, একদলীয় শাসন ব্যবস্থায় রাষ্টের শাসক ব্যক্ত বিপুল ক্ষমতার অধিকারী, যে ক্ষমতা ব্যক্তিগত সম্পদের মালিকদের ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি। যদি একজন ব্যক্তিকে তার নিজস্ব ব্যবসা পরিচলনায় তিনি সামাজিক কল্যাণ সীমাকে লঙ্ঘন করবেন এ আশংকায় বিশ্বাস করা না যায়, তবে সামগ্রিক জাতীয় উৎপাদন ব্যবস্থা নিরঙ্কুশভাবে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একদলীয় রাষ্ট্রের শাসকবর্গকে কি করে বিশ্বাস করা যেতে পারে? পলিটব্যুরোর এ শাসক ব্যক্তিরা একই ধরনের মানুষের ভিতর থেকে এসেছে এ বিশ্বাস কি স্থাপন করা যায়না? পুঁজিপতিদের তুলনায় তারা কি দেবদূত? যদি তা না হয় তবে সকল উৎপাদন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তাদের হাতে যে বিপুল ক্ষমতা পুঞ্জিভূত হয় সে ক্ষমতা যে তারা তাদের স্বার্থে ব্যবহার করবেন না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? মার্কস সম্ভবত এ ধরণের সম্ভাবনা আঁচ করতে পেয়েছিলেন। রাষ্ট্রহীন সমাজের যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন তার মূল কারণ বোধহয় এটি। কিন্তু মার্কস এটা বুঝতে পারেননি, যে রাষ্ট্রহীন সমাজে বিভিন্ন কায়েমী স্বার্থাবাদী মহলের পরস্পরের সংঘর্ষের ফলে শোষণ ও অবিচারের অধিকতর সম্ভাবনা থেকে যায়। ত্রুটি বিচ্যুতি ও তার ফলশ্রুতি বিপ্লব-উত্তর সময়ে মার্কসীয় কৌশল তথা উৎপাদন ব্যবস্থার রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা পদ্ধতির মাধ্যমে যে সমস্ত সম্পদের সুষম ও দক্ষ বন্টন নিশ্চিতকরণ এবং স্বপ্নের বাস্তবায়ন হবে বলে আশা করা হয়েছিল। এর পেছনে যৌক্তিকতা ছিলো এই যে, ব্যক্তি মালিকানা যে সমস্ত অসম সুযোগ সুবিধা প্রদান করে তা একবার দূরীভূত করতে পারলে বাজারব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণহীন ক্রিয়ার ফলে সম্পদের যে অদক্ষ্য ও অসম বন্টন ঘটে রাষ্ট্রতন্ত্র তা সংশোধন করে নিতে পারবে। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে মার্কসীয় চিন্তা দর্শনের ত্রুটির কারণে এ আশাবাদ বিফল হয়েছে। ভ্রান্ত অনুমান গণতন্ত্রের মতো সমাজতন্ত্রও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কতোগুলো ভুল ধারণা করে নিয়েছে। সঠিক ধারণার অভাবে দক্ষতা ও ন্যায়পরায়নতা উভয় লক্ষ্যই অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষ এসব ধারণাগুলোর ভ্রান্তি উপলব্ধি করতে সক্ষম নয়। কেননা এসব অনুমানগুলো মার্কসীয় পুস্তকে তত্ত্বের আবরণে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষিতে মার্কসীয় দর্শনের এ ভুল অনুমানসমূহ বিস্তৃতভাবে আলোচনার অবকাশ নেই। যাই হোক, কতিপয় মার্কসীয় অনুমানের উপর আলোচনা বিষয়টি বুঝতে সহায়তা করবে। অনাস্থা ও আস্থা প্রথমত, মার্কসীয় বিশ্লেষণ সামাজিক কল্যাণকামীতার সীমারেখার মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যক্তি মানুষের অবমতাকে নির্দেশ করে। এ মার্কসীয় সিদ্ধান্তের আলোকে ধারণা করে নেয়া হয়েছে যে, সমাজতান্ত্রিক ব্যস্থা প্রবর্তনের পর একই ব্যক্তি ভোক্তা, শ্রমিক, সরকারি কর্মচরী বা ব্যবস্থাপক হিসেবে নিজের ব্যক্তিস্বার্থকে ভুলে যেয়ে একমাত্র সমাজের সার্বিক কল্যাণবোধ দ্বারাই উদ্বুদ্ধ হবে। এর অর্থ দাঁড়ায় (ক) শ্রমিক শ্রণী আনুপাতিক হারে বস্তুগত প্রাপ্তির আশা ব্যতিরেকেই স্বার্থহীনভাবে দক্ষতা ও সততার সাথে কাজ করবে; (খ) কলকারখানার ব্যবস্থাপকগণ নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ, বাজার প্রতিযোগিতা, বাজার শক্তি দ্বারা নির্দেশিতভাবে উৎপাদনের উপকরণ ও উৎপাদিত পণ্যের ক্রয় বিক্রয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ইত্যাদি প্রক্রিয়া দ্বারা চালিত না হয়ে দক্ষতার সাথে কর্ম সম্পাদনে সক্ষম হবে; (গ) সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ তাদের বিপুল কার্যনির্বাহী ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতার কোনো অন্যায় সুযোগ নেবেনা। তাছাড়া সকল শ্রেণীর মানুষ ভোক্তা হিসেবে তাদের চাহিদা প্রয়োজনের সীমারেখার মধ্যে রেখে সম্পদের উপর অহেতুক চাপ হ্রাস করবে। উপর্যুক্ত পূর্বসিদ্ধান্তসমূহ বস্তুতপক্ষে অবাস্তব ধারণাপ্রসূত। কারণ সেকুলার একটি ব্যবস্থাপনায় সর্বজ্ঞ এক স্রষ্টার সামনে জবাবদিহিতার কোনো ধারণা বা অনুশাসন কাজ করেনা এবং একজন ব্যক্তি মানুষের জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভংগি মৃত্যু পরবর্তী কোনো জীবন সম্পর্কিত ধারণা দ্বারা প্রভাবিত নয়। এমতাবস্থায় একজন মানুষ বিত্ত-বৈভবের হাতছানিকে অগ্রাহ্য করে সব সময় নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাবে- ধরণের ধারণা পোষণ করা অবান্তর আশাবাদ মাত্র। তাই সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একজন মানুষ ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে কাজ করে যাবে -এ ধারণর কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। বিশেষত যখন আধ্যাত্মিকতার ভিত্তিহীন এ ধরণের জীন ব্যবস্থায় বস্তুগত জীবনের ভোগ বাসনাকে চরিতার্থ করাই একমাত্র লক্ষ্য হয়ে থাকে। এ কথা বিবেচনায় রখা হয়নি যে, ব্যক্তিগত লাভালাভের সুযোগের অভাবে তাদের উৎপাদন ও কর্মপ্রেরণা বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উপরন্তু জোরজবরদস্তিমূলক উপায়ে তা করতে চেষ্টা করা হলে নির্ধারিত সামাজিক লক্ষ্য অর্জনই ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে। বিভিন্নমুখী স্বার্থের সমন্বয় সাধন দ্বিতীয়ত, এটা ধরে নেয়া হয়েছে যে, রাষ্ট্রযন্ত্র এমন এক শ্রেণীর ব্যক্তিবর্গ দ্বারা চালিত হ যাদের ব্যক্তিস্বার্থের সাথে সমাজের সামগ্রিতক স্বার্থের কেনো সংঘাত থাকবে না এটাও একটি ভুল ধারণা। কেননা একটি নিরঙ্কুশ একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থায়ও ক্ষমতা কাঠামো আপেক্ষিক স্থান, আন্তঃজাতি ও অবস্থানজনিত বিভিন্নমুখী সুযোগ ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত নয়। বস্তুত। নৈতিক চেতনার অনুপস্থিতিতে এমন কোনো পদ্ধতি বা ব্যবস্থার অস্তিত্ব নেই যা পরস্পর বিরোধী স্বার্থসমূহের সমন্বয় নিশ্চিত করতে পারে। একটি কেন্দ্রীয় পরিকল্পনাধীন অর্থনীতিতেও পূর্বনির্ধারিত সামাজিক লক্ষ্য অর্জনের জন্যে উৎপাদন উপকরণ বন্টনের ক্ষেত্রে বোক্তার চাহিদার সাথে সামষ্টিক মূল্যবোধের অস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। পরিকল্পনাবিদদের সামাজিক লক্ষ্য নির্ণয়ের জন্যে একটি ভিত খুঁজে নিতে হয় এবং সে লক্ষ্যে এমন এক মূল্যবোধ মেনে চলেতে হয় যা বিশেষ শ্রেণীর স্বার্থ সংরক্ষণ করে। কিন্তু এ সামাজিক লক্ষ্য অর্জন ও সে জন্যে প্রয়োজনীয় মূল্যবোধ নিরূপনের দায়িত্ব কার উপর অর্পিত হবে? যেহেতু সামাজিক ব্যবস্থা পুঁজিবাদের মতোই সেকুলার ভিত্তির উপর স্থাপিত এবং সমাজতান্ত্রিক দর্শন ও বিবেচনায় ঐশী নির্দেশনার কোনো স্থান নেই, এমতাবস্থায় সামাজিক লক্ষ্য নির্ধারণ ও তা অর্জনের সহায়ক মূল্যমান ও মূল্যবোধ কি প্রক্রিয়ায় নির্ণীত হবে? যদি ব্যক্তি মানুষে ব্যক্তিসম্পদের মালিক বানিয়ে বিশ্বাস করা না যায় এ আশংকায় যে, ব্যক্তি মালিকানার সুযোগ নিয়ে সে অপরকে শোষণ করবেনা, তাহলে কি করে সেই একই ব্যক্তিকে বিশ্বাস করা যায় যে, সে নিজের স্বার্থ দ্বারা প্রণোদিত না হয়েই সমাজের জন্যে সার্বিক কল্যাণমূলক পণ্য উৎপাদন, বিন্যাস ও বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করবে? তারা কি তাদের ব্যক্তিস্বার্থের দ্বারা একটুও চালিত হবেনা? সমাজ কি প্রক্রিয়ায় তাদেরকে পরিচালন ও নিয়ন্ত্রণ করবে যাতে তাদের কৃতকর্ম দ্বারা শুধুমাত্র সমাজের অভীষ্ট কল্যাণমূলক উৎপাদনে নিজেদেরকে লিপ্ত রাখবে? উপরন্তু কার্ল ম্যানহেমের সেই প্রশ্ন থেকে যায়, ‘পরিকল্পনাকারীদের পরিকল্পনা কে করবে?’ তাছাড়া সমগ্র সমাজের জন্যে কি পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হওয়া প্রয়োজন তা নির্ধারণের সার্বিক দায়িত্ব গুটি কয়েক ব্যক্তিবর্গের উপর ন্যস্ত করার স্বপক্ষে কেনো গ্রহণযোগ্য যৌক্তিকতা নেই। ঐশী নির্দেশনার মূল্যবোধকে ধারণ করে যে সমাজব্যবস্থা নির্মিত নয়, এমন সমাজে ব্যক্তিমানুষ হিসেবে পরিকল্পনাবিদগণ বস্তুবাদী চেতনার ফলশ্রুতিতে তাদের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিতে পারবে না এটাই স্বাভাবিক। বস্তুত ঐশী নির্দেশনর মূল্যবোধ দ্বারা চালিত সমাজব্যবস্থার ক্ষেত্রেও সমগ্র উৎপাদন উপকরণ নিয়ন্ত্রণের সার্বিক ভার কতিপয় ব্যক্তির উপর অর্পন করা অতিশয় বিপজ্জনক। এরূপ বিপুল ক্ষমতা একনায়তন্ত্র এবং আমলাতন্ত্রের জন্ম না দিয়ে পারেনা, যা জনগণের কল্যাণের পরিবর্তে ব্যক্তির গোষ্ঠীস্বার্থকে চরিতার্থ করবে। তথ্যের লভ্যতা তৃতীয়ত, এটা ধরে নেয়া হয়েছে যে, কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা পর্যদের নিকট সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হবার নিমিত্ত ভোক্তার পছন্দ, উৎপাদন ব্যয় ও দ্রব্যমূল্যের সব তথ্য মওজুদ থাকবে। কিন্তু মুক্তবাজার ব্যবস্থা এবং চাহিদা ও সরবরাহের পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া যেখানে অনুপস্থিত সেখানে উপর্যুক্ত তথ্যের ক্ষেত্রে সঠিক সূচকসমূহ নির্ধারণ করাই সম্ভব নয়। এ পরিপ্রেক্ষিতেই হায়েক (Hyake) যুক্তি প্রদর্শন করেছেন যে, কর্তৃপক্ষের নিকট প্রয়োজনীয় উপাত্তসমূহ না থাকার কারণেই উৎপাদন উপকরণসমূহ বন্টনের সমাজতান্ত্রিক সমাধান বাস্তবসম্মত নয়। উপর্যুক্ত উপাত্তসমূহ লভ্য হলেও অসংখ্য পণ্য ও সেবা উৎপাদনে কোনগুলো উৎপাদন উপকরণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে তা নির্ধারণ করার পরিকল্পনা পর্যদের কতিপয় ব্যক্তির পক্ষে দুরূহ হবে। এ বিষয়ে তারা চেষ্টা করলেও তা হবে অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ পদ্ধতি, যার ফলে পরিবর্তিত অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যতা বিধান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া হবে শ্লথ ও মন্থর। কিন্তু পণ্য সামগ্রী উৎপাদনে সম্পদ বন্টনের বিষয়টি জনকল্যাণের সাথে এতো বেশি সম্পৃক্ত যে, এ বিষয়ে সিদ্ধান্তগ্রহণের ভার কতিপয় ব্যক্তির উপর ন্যস্ত করা সমীচীন নয়। মুক্তবাজার ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থাই প্রকৃত প্রস্তাবে সর্বোত্তম ব্যবস্থা। যে ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে উৎপাদক ভোক্তা ও সরবরাহকারী ব্যক্তিবর্গের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ নেই তাকে জনকল্যাণ সুনিশ্চিতকারী দক্ষ ব্যবস্থাপনা বলা যায় না। আর যদি ভোক্তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগই দেয়া হয়, তবে কিছু নৈতিক বাধ্যবাধকতার সীমারেখার মধ্যে তাদের চাহিদার দ্বারা নির্ণীত বাজার মূল্যের মাধ্যমে তাদের চাহিদা প্রকাশের সুযোগ প্রদান করা কি সঠিক হবেনা? বাজারমূল্য পদ্ধতি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে বিকেন্দ্রীভূত করে এবং ভোক্তা ও উৎপাদক শ্রেণীকে পরস্পরের উপর ক্রিয়া-প্রক্রিয়াকে সুযোগ দান করে ব্যক্তির প্রয়োজন ও চাহিদার সাথে দ্রুততরবাবে নিজেকে সামঞ্জস্যশীর করে নেয়, যা কেন্দ্রীয় পরিকল্পনাধীন ব্যবস্থাপনার অন্তর্গত জটিলতার জন্যে সম্ভব নয়। বিকেন্দ্রীকৃত বাজার অর্থনীতি অনেক বেশি স্থিতিস্থাপক এবং এ ব্যবস্থায় ব্যক্তি বিশেষের ভুল সিদ্ধান্ত বাজার শক্তির সাহায্যে সংশোধনের অবকাশ থাকে এবং সে ভুল সমাজের জন্যে সর্বাত্মক ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়তে পারে না। এমনকি যদি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা উৎপাদন উপকরণ বন্টনের পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকেও গ্রহণ করে, তবুও ঐশী প্রত্যাদেশভিত্তিক সুষম ব্যবস্থাপনার অভাবে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পুঁজিবাদী অনিবার্য পরিণতির অর্থনৈতিক বৈষম্যের বীজ বহন করতে হবে। ভর্তুকির সুফল চতুর্থত, এটা ধরে নেয়া হয়েছে যে, সেভিয়েত পণ্য মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতিতে বিশাল ভর্তুকির ব্যবস্থা দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সাহায্য করবে -এ ধারণাটিও ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে। ভর্তুকি ব্যবস্থা দরিদ্র জনসাধারণের, যাদের ক্রয় ক্ষমতা সীমিত তাদের চেয়ে সাধারণত ধনী সুবিধাভোগী গোষ্ঠীকেই বেশি উপকৃত করে। সোভিয়েত ইউনিয়নে খাদ্য ভর্তুকির পরিমাণ ছিলো জাতীয় আয়ের১০ বাগ যা ইইসি’র তুলনায় ৫ গুণ বেশি। এ ব্যবস্থার ফলে কৃষি পণ্যের কম মূল্যের কারণে উৎপাদক কৃষক শ্রেণী বঞ্চিত হয়েছে। ফলে তাদের উৎপাদনের স্পৃহা হ্রাস পেয়েছে। অপরদিকে অনুৎপাদক ধনীক শ্রেণী এতে বেশি উপকৃত হয়েছে। সোভিয়েত পরিকল্পনা পদ্ধতিতে বিশাল আকারের ভুর্তকি হচ্ছে স্বাভাবিক ব্যবস্থা। সর্বক্ষমতাসম্পন্ন মূল্য নির্ধারণকারী রাষ্ট্রীয় কমিটিকে সামান্য আলপিন হতে ট্রাক্টর পর্যন্ত প্রায় বিশ মিলিয়ন দ্রব্যের মূল্য নির্ধারণ করতে হয়। এ কাজটি এতো দূরূহ যে, যতো লোকবল সমৃদ্ধ হোক না কেন, কোনো একক সরকারি সংস্তার পক্ষে তা নিষ্পন্ন করা সম্ভব নয়। এই একক সংস্থার পক্ষে ভোক্তার পছন্দ, চাহিদা এবং এ সংক্রান্ত প্রকৃত ব্যয় ইত্যাদি সম্পর্কিত সকল উপাত্ত সংগ্রহ না হওয়াই স্বাভাবিক। ফলে পরিকল্পনা কমিশন মূল্য পরিবর্তন না করার সহজ পন্থাই গ্রহণ করে। তাই বছরের পর বছর মূল্য অপরিবর্তিত থাকে, বিশেষ করে খুচরা মূল্য। যার পরিবর্তন রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর। এ ধরনের অপরিবর্তনীয় মূল্য কাঠামো, অদৃশ্য ভর্তুকি এবং উৎপাদন উপকরণ বন্টনে অন্যায্যতা ও অদক্ষতার জন্ম দেয়। বিশাল আকারের ভর্তুকির ব্যবস্থা সীমিত সম্পদের অপরাধযোগ্য অপচয় ঘটায়। এই অপচয়ের ব্যাপ্তি একটি সাংবাদিক সম্মেলনে প্রদত্ত মিখাইল গর্বাচেভের বিবৃতি হতে সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। তাতে বলা হয়েছিল, ‘শিশুরা একটি পাউরুটি দিয়ে বল খেলছে এটা সচরাচর দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। মূল্য নির্ধারণ কমিটির চেয়ারম্যান ভেলেন্টিন পাভলভ তাই সঠিকভাবে মন্তব্য করেন যে, দ্রব্যমূল্যের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সংযোগ সাধনে সামান্যই ভূমিকা পালন করে, ফলে সৃষ্টি হয় পাইকারী ও খুচরা পণ্যের বিপুল ঘাটতি। এই ঘাটতির তীব্র সংকটের অবসান কখনো সম্ভব হবেনা। কেননা একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত প্রচার মাধ্যম ও গণতান্ত্রিক সকল পদ্ধতির কন্ঠরোধের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনাকে চাপিয়ে দেয়া হয়। সোভিয়েত রাশিয়ার সিদ্ধান্তসমূহ উপর মহলে নির্ণীত হয় এবং সর্বস্তরে প্রতিপালিত হয়। রাশিয়ার একদলীয় ব্যবস্থা যা অতীতে শক্তিশালী সংস্থা কেজিবি কর্তৃক পরিচালিত এবং যেখানে গ্রেফতার, ‘বন্দি শিবির’ ও তথাকথিত ‘মানসিক হাসপাতাল’-এ প্রেরণের বিপুল ক্ষমতা বিদ্যমান এবং এ ক্ষমতার অপপ্রয়োগের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো প্রতিষেধক নেই। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার মধ্যে অপরিবর্তনশীলতা থাকাই আবশ্যম্ভাবী। এই ধরণের একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোক্তার চাহিদা অনুযায়ী স্বতঃস্ফুর্তভাবে পরিবর্তনের কেনো স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির অস্তিত্ব নেই, অথবা সঠিক সিদ্ধান্তে পুরুস্কৃতি এবং বুল সিদ্ধান্তে শাস্তি দেবার কোনো ব্যবস্থা নেই। কেউ প্রশ্ন করতে পারে যে, অপরিবর্তিত স্থির মূল্য কি ভোক্তা শ্রেণীর জন্যে সুবিধাজনক নয়? কিন্তু খেয়াল খুশি অনুযায়ী যখন দ্রব্যমূলকে স্থির রাখা হয় এবং চাহিদা ও সরবরাহ সূত্র অনুযায়ী তা নির্ধারিত হতে দেয়া হয়না, তখন এ ব্যবস্থা অন্যায্যতা ও বৈষম্যের উৎসে পরিণত হয় এবং সম্পদ ব্যবহার, কর্ম প্রেরণা এবং দীর্ঘ মেয়াদী সরবরাহ তথা অর্থনীতির উপর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে। ভোক্তাগণ একদিকে উৎপাদিত পণ্যের অপচয়ে লিপ্ত হয়, অন্যদিকে শ্রমিক ও উৎপাদক শ্রেণী তাদের পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য হতে বঞ্চিত হয়। পণ্য দ্রব্যের মান কমে যায় এবং তা ভোক্তা শ্রেণীর উপযোগিতাভিত্তিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়। যেখানে শুধুমাত্র ধনীক ও আমলা শ্রেণী তাদের চাহিা অনুযায়ী পণ্য ক্রয় করতে সক্ষাম হয়, কিন্তু দরিদ্র জনগোষ্ঠী অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় সামগ্রী হতে বঞ্চিত হয় অথবা লাইনে দাঁড়িয়ে তদের মূল্যবান সময়ের অপচয় করে। যেহেতু উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মোতাবেক উৎপাদন করা হয়, তই স্বাভাবিকভাবে দেখা দেয় কতিপয় পণ্যের ঘাটতি, আবার পাশাপাশি আরেক শ্রেণীর পণ্যের বিপুল উদ্বৃত্তি। এ অপ্রয়োজনীয় উদ্বৃত্ত পণ্য অবিক্রিত থেকে যায়। কিন্তু এর দায়বার কাউকে বহন করতে হয়না এবং একই ভুল ধারায় উৎপাদন অব্যাহত থাকে। বৃহদায়তন খামার ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা পঞ্চমত এটাও ধরে নেয়া হয়েছে যে, বৃহদায়তনের অর্থনৈতিক অসুবিধা, প্রতিযোগিতা ও বাজার শক্তির অনুপস্থিতি সত্ত্বেও বৃহৎ একচেটিয়া খামার এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহ দক্ষতার সাথে কাজ করবে। এই ধারণাও ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে যে, বৃহদায়তন খামারগুলোতে সাধারণত অনেক প্রকারের ফসল, নানা জাতের গবাদি পশু উৎপাদন করা হয় এবং তাতে নিয়োজিত বিশাল আকারের কৃষি শ্রমিকগণ অনেকগুলো গ্রামে ছড়িয়ে বসবাস করে। ফলে এর তদারকি এক দুরূহ কর্মে পরিণত হয়। এজন্যে কৃষক, মালিক বা ভাগচাষী অনেক বেশি দক্ষতার সাথে একাজ সম্পন্ন করে, কেননা নানা ধরণের কজের অনেকগুলো সুচারুবাবে নিষ্পন্ন নাও হতে পারে এবং তা তদারকির অগোচরে থেকে যেতে পারে। ১৮৯৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে কৃষি জমির মাত্র ০.৫ শতাংশ ব্যক্তিগত মলিকানাধীন ছিলো, তাতে উৎপাদন ছিলো সমগ্র কৃষি পণ্য উৎপাদনের ২৭ শতাংশ। এটা রাষ্ট্রীয় খামার ব্যবস্থার চেয়ে ব্যক্তি মালিকানাধীন কৃষি খামারের দক্ষতা প্রমাণ করে। কৃষি উৎপাদন হ্রাস ছাড়াও সরঞ্জামের অদক্ষ রক্ষণাবেক্ষণ এবং উৎপাদনের চুরিজনিত ক্ষতিও কম ছিলনা। এ ধরণের ক্ষতির সম্ভাব্যতা ব্যক্তি মালিকানাধীন খামারে তত প্রকট নয়। প্রতিযোগিতার চিরস্থায়ী অনুপস্থিতির ফলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন উপকরণের সর্বোত্তম ব্যবহার বা উদ্ভাবনী প্রচেষ্টার স্পৃহা হারিয়ে ফেলে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যবস্থার এটাই যৌক্তিক পরিণতি। ব্যবস্থাপকগণের যখন লাভ- লোকসানে কোনো হিস্যা নেই। তখন তখন তারা কেন স্বতঃপ্রবৃত হয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করবে? যেহেতু বাজার অর্থনীতির চালিত মূল্যব্যবস্থা অনুপস্থিত এবং ব্যক্তিগতভাবে লাভ বা ক্ষতির কোনো প্রশ্ন নেই তাই ব্যবস্থাপক শ্রেণীকে ভালো উদ্যোগ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার আর কোনো হাতিয়ার নেই। ভোক্তাশ্রেণীর চাহিদা এবং সে মোতাবেক উৎপাদক শ্রেণীর প্রতিক্রিয়া তথা উৎপাদন ও সরবরাহের মধ্যে সংযোগ সাধান করে বাজারব্যবস্থা। এ মৌলিক উৎপাদনটিরই সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অস্তিত্ব নেই। ব্যবস্থাপনা তাই হয়ে দাঁড়ায় একদল রাজকর্মচারীর আদেশ জারীর এক প্রহসনে। তিনি বলেন : ‘ওয়েবার’ এর রাষ্ট্রীয় মালিকানা সম্পর্কে মন্তব্য এখানে প্রনিধানযোগ্য। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানা অর্থনৈতিক জীবনকে আমলাতন্ত্রের চক্রে আবদ্ধ করে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত সকল শ্রেণীর মানুষকে প্রাণহীন আনুষ্ঠানিকতা দ্বরা জড়পিণ্ডে পরিণত করে। ফলে খণ্ডিত হয় দক্ষতা। উদাহরণস্বরূপ, সোভিয়েত ইউনিয়নে ওইসিডি দেশ সমূহের তুলনায় প্রতি উৎপাদন এককের জন্যে ২.৫ গুণ বেশি শ্রমশক্তি ব্যয়িত হয়। উপরন্তু সোভিয়েত খামার বা শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপকগণের উৎপাদন উপকরণের মূল্য, উৎস বা উৎপাদিত পন্যের দামের উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এসব পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার অধীনে মস্কোর কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা পর্ষদ দ্বারা নির্ণীত হয়। উৎপাদন উপকরণের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও তার ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের একে অপরকে অর্থনৈতিক শর্তানুযায়ী বাছাই করার কোনো সুযোগ বা অবকাশ নেই। খামার বা শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপকগণকে সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সরবরাহ কমিটির নিকট অনুরোধপত্র প্রেরণ করতে হয়। কিন্তু এ কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষে দেশের প্রত্যন্ত প্রান্তরের সকল খামার বা শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিশেষ স্বতন্ত্র স্থানীয় অবস্থা ও সমস্যা সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা সম্ভব নয়। প্রতিটি কেসের স্বতন্ত্র বিশেষ অবস্থা বিশ্লেষণ করে ত্বরিত সমাধানে উপনীত হবার পর্যাপ্ত সময় বা স্পৃহাও তাদের থাকার কথা নয়। বাজারের অবস্থা অনুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠাানের নিজস্ব মূল্যায়নের ভিত্তিতে উৎপাদিত পণ্যের প্রকৃতি বা পরিমাণ পরিবর্তন করারও সুযোগ নেই। উপরন্তু দক্ষতা বৃদ্ধি বা উন্নতমানের পণ্য সামগ্রী উৎপাদনের মাধ্যমে ব্যবস্থাপক বা শ্রমিকরা সরাসরি লাভবান হবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। একজন উদ্যমী ব্যবস্থাপক সমগ্র সোভিয়েত ব্যবস্থায় ক্ষুদ্ধ হতে পারেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার পক্ষে উন্নততর ব্যবস্থাপনা চালু করার কোনো পথ খোলা নেই। ফলশ্রুতিতে সোভিয়েত ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক সম্পদসমূহ অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী অদক্ষ ব্যবহার ক্ষেত্র হতে দক্ষ ব্যবহার ক্ষেত্রে দ্রুত স্থানান্তির হয়না। তছাড়া কী পরিমাণ বিনিয়োগ করতে হবে, বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রয়োজনের মধ্যে কীভাবে সমন্বয় সাধন করতে হবে এবং জনগণকে ভবিষ্যতের প্রয়োজনে কিভাবে স্বতস্ফুর্তভাবে ত্যাগ স্বীকারে উদ্বুদ্ধ করা যাবে তা নিশ্চিত করার কোনো পদ্ধতি সোভিয়ে ব্যবস্থায় উপস্থিত নেই। একটি কেন্দ্রীয় পরিকল্পনাধীন অর্থনীতিতে বিনিয়োগ সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ স্পষ্টতই পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্ব। বাজার বাজার সূচকের উঙ্গিত এবং সামাজিকভাবে সম্মত মূল্যবোধ ব্যতিরেকে দক্ষতার সীমায় পূঁজি বন্টনের জন্যে কোনো কার্যকরী উপযুক্ত ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তসমূহ গৃহীত হয় নিছক রাজনৈতিক বিবেচনায় বা পরিকল্পনাবিদগণের ব্যক্তিগত রুচি বা প্রবণতা মোতাবেক। কেউ যুক্তি প্রদর্শন করতে পারেন যে, পুঁজিবাদী অর্থনীতিতেও অবস্থা ভিন্নতর নয়। প্রত্যেক উৎপাদন খাতে কতিপয় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে পুঁজিবাদী সমাজব্যস্থায় কতিপয় বিশাল একচেটিয়া কর্পোরেশন শুধু অর্থনীতিতেই প্রভুত্ব নয় বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিপুল প্রভাব বিস্তার করে থাকে। কার্যত পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে ভোক্তার সার্বভৌমত্বের ধারণাটির অর্থবহ কার্যকারিতার অভাব সর্বজনবিদিত। কোন পণ্য দ্রব্য উৎপাদন করতে হবে এবং তা কিভাবে করা হবে, কনজুমার ও শেয়ারহোল্ডারগণ সে সিদ্ধান্তের বিষয়ে কোনো মূখ্য ভুমিকা পালন করেনা। সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও করপোরেশন পরিচালনার বিষয়ে ব্যবস্থাপনা পর্ষদই মূখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। যেহেতু ব্যবস্থাপনা পর্ষদ সমাজের উপরের স্তরের ধনিক শ্রেণী হতে আগত কতিপয় পরিচালক ও বেতনভোগী পেশাজীবী দ্বারা গঠিত তাই সে পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করলে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়না। কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় অদক্ষতা ও বেইনসাফ বিদ্যমান সত্ত্বেও উপর্যুক্ত যুক্তিসমূহের কোনো শক্ত ভিত্তি নেই। প্রকৃতপক্ষে, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাধীন কোনো প্রতিষ্ঠানের ন্যায় পুজিবাদী বৃহৎ কর্পোরেশনগুলোর পণ্যের মান, পরিমাণ ও মূল্য নির্ধারিত হয়না। বাজার অর্থনীতির নিজস্ব নিয়ম এখানে কাজ করে। এমনকি যদি পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে একটি শিল্পে মাত্র গুটিকয়েক প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান বিরাজ করে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে চাহিদা ও মূল্যের বিষয়ে বিশেষ সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত থাকে, তবুও তাদের নিজেদের মধ্যে কিছু না কিছু প্রতিযোগিতা বিদ্যমান থাকবে, যদিও বা সে প্রতিযোগিতা পুঁজিবাদের প্রবক্তাগণ যে পরিমাণ সুষম প্রতিযোগিতার দাবী করে থাকেন তার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম হবে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রত্যেকটি শিল্প প্রতিষ্ঠান বাজারের পরিস্থিতি সম্পর্কে নিজস্ব মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং সিদ্ধান্ত ভুল হলে সেজন্যে লোকসানের ভার বহন করে। আবার কোনো কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা পর্ষদের দ্বারস্থ বা অনুমতির অপেক্ষা না করেই তাদের এ ভুল সংশোধনের সুযোগ থাকে। এদিকে তারা যেমন তাদের সৃষ্টিশীলতা ও দক্ষতা দ্বারা লাভবান হতে পারে, অপরদিকে তাদের বিকল্প দ্রব্যের প্রতিযোগিতা, আমদানি এবং দক্ষতার সাথে পরিচালিত না হলে বাজার হতে উৎখাত হতে হবে এ আশংকারও মুখোমুখি হতে হয়। এসব বৈশিষ্ট্য সমূহ রাষ্ট্রীয় সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অনুপস্থিত। তিক্ত ফলাফল অদক্ষ বন্টন ব্যবস্থা কার্যত বাস্তবে যদি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে সফল হতো, তাহলে উপরে এ ব্যবস্থার যে বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করা হয়েছে তাকে একদেশদর্শী সমালোচনা ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা বলে চালিয়ে দেয়া যেত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মাথাভারী অনাবশ্যক জটিল কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের নীতির ফলে এ ব্যবস্থা শ্রমিক ও ব্যবস্থাপক শ্রেণীকে প্রয়োজনীয় উদ্বুদ্ধকরণে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মে অদক্ষ ক্ষেত্র হতে সম্পদের প্রবাহ সৃষ্টি হয়নি। পরিমাণে সমগ্র অর্থনীতিতে সৃষ্টি হয়েছে এক স্থবিরতা, যা পরিবর্তিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনের সাথে সংগতি রাখতে হয়েছে ব্যর্থ। ফলশ্রুতিতে সোভিয়ে অর্থনীতির সবখাতে বিশেষ করে কৃষি খাতে উৎপাদন গুণগত ও পরিমাণে ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। সোভিয়েত যৌথখামার ব্যবস্থা চিত্র সত্যিই করুণ। কর্মক্ষম জনশক্তির একতৃতীয়াংশ কৃষিখাতে নিয়োজিত, তবুও খাদ্যশস্যের ঘাটতি পূরণের জন্যে আমদানি জরুরি হয়ে পড়ে। বিশ্বের সর্ববৃহতৎ খাদ্যশস্য রপ্তানিকারক দেশ সোভিয়েত রাশিয়া এভাবে পরিণত হয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহত খাদ্য আমদানিকারক দেশে। কঠোর বলপ্রয়োগ সত্ত্বেও সে দেশের বিপুল কৃষি সম্ভাবনাকে কার্যে পরিণত করা যায়নি। যোসেফ স্টালিন ব্যক্তিগতভাবে উইন্সটন চার্চিলকে বলেছিলেন, ‘যৌথ খামার ব্যবস্থার বিরোধিতার কারণে লক্ষ লক্ষ লোককে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে হয়েছে বা শ্রম শিবিরে নির্বাসিত হতে হয়েছে’। এর ফলে এ বাস্তব সত্যই প্রমাণিত হয় যে, শক্তি প্রয়োগ কখনো মানুষের ব্যক্তিস্বার্থ বা উচ্চতর মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত হবার প্রবণতার বিকল্প হতে পারেনা। সোভিয়েত ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা কমিশন এবং পলিটব্যুরোর সদস্যবৃন্দের সামনে অর্থনীতির নিয়ামক বাজারশক্তি দ্বারা নির্ণীত চাহিদা ও সরবরাহের কোনো ইংগিত রেখার অস্তিত্ব নেই বিধায় স্বাভাবিকভাবেই নিজস্ব স্বার্থ, ঝোঁক ও কমিউনিস্ট মতাদর্শ বুলির বাঁধা পথেই তারা অর্থনীতিকে চালিত করেন। ফলে অর্থনৈতিক ব্যবহারের নিমিত্তে সীমিত সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে ঘটে অর্থনীতির নিয়ম বিহর্ভূত বিকৃতি। সোভিয়েত ইউনিয়নে তাই দেখা যায় অত্যাবশ্যক ভোগ্যপণ্যের বদলে ভারী ও সামরিক শিল্প বিকাশের অনাবশ্যক আড়ম্বরতা| সোভিয়েত ইউনিয়ন বিপুল অবকাঠামোগত মানবসম্পদের অধিকারী এবং জনগণের জন্যে প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী উৎপাদনে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও দেশটি দীর্ঘ সময় ধরে ভোগ্যপণ্যের সংকটে ভুগছে। জনগণের হাতে অর্থ থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বাজারে লভ্য নয়। ঘাটতি সংকট এতো তীব্র আকার ধারণ করেছেন যে, সোভিয়েত নেতৃত্বও শঙ্কিত। সোভিয়েত ব্যবস্থার অদক্ষতার ফলে সৃষ্টি হয়েছে নিম্নগামী প্রবৃদ্ধির হার। সোভিয়েত শাসনের প্রথম দিকে ১৯২৮-১৯৪০ সালে প্রবৃদ্ধির হার ছিলো বেশি উচ্চ, বাৎসরিক ৫.৮%। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালে ১৯৪০-৫০ সালে তা ২.২%-এ নেমে আসে। যুদ্ধোত্তরকালে প্রবৃদ্দির হার পুনরায় বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৫০-৬০ সালে ৫.৭%-এ উপনীত হয়। ফলে সোভিয়েত ব্যবস্থার কার্যকারিতা সম্পর্কে পুনরায় উচ্ছাস ব্যক্ত হতে থাকে এবং এ ব্যবস্থাকে নবযুগের দ্বারোদঘাটক ও উন্নয়নশীল দেশের জন্যে মডেল হিসেবে অভিষিক্ত করার হতে থাকে। কিন্তু এর পরবর্তী সময় হতে আবার সোভিয়েত প্রবৃদ্ধির হার ক্রমাগত হ্রাস পেয়ে ১৯৬০-৭০ সালে ৫.২%, ১৯৭০-৭৫ সালে ৩.৭%, ১৯৭৫-১৯৮০ সালে ২.৬% এবং ১৯৮০-৮৫ সালে ২.০% এ এসে দাঁড়ায়। পেরেস্ত্রয়কার অন্যতম তাত্ত্বিক চিন্তাবিদ ‘আগানবেগিয়ান’ উপস্থাপিত সংশোধিত হিসাব অনুযায়ী দেখা যায় প্রকৃত প্রস্তাবে ১৯৮০ দশকের প্রথমার্ধে প্রবৃদ্দিই ঘটেনি। এর ফলে সোভিয়েত ব্যবস্থার আবেদন বহুলাংশে হ্রাস পায়; বিশেষত যখন জাপান, পশ্চিম জার্মানী দক্ষিণ কোরিয়া তুলনামূলকভাবে কম সম্পদশালী হওয়া সত্ত্বেও উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নয়নের স্বাক্ষর রাখে। উন্নত বিশ্বের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের ব্যবধান ১০ বছরের মধ্যে পূরণের জন্যে স্টালিনের ১৯৩১ সালে বিখ্যাত আহ্বান শূণ্য আস্ফালনে পরিণত হয়। এমনকি ষাট দশকের মধ্যে সে ব্যবধান ঘুচিয়ে দেবার লক্ষ্যে ক্রুশ্চেভের আশাবাদও অবাস্তবায়িত থেকে যায়। প্রবৃদ্ধি হারের ক্রমাগত হ্রাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত অর্থনীতির মধ্যে ব্যবধান বাড়িয়েই তোলে। সাম্প্রতিক সময়ে তা আরো বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। অসম বন্ট ব্যবস্থা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের মূল লক্ষ্য ছিলো জনগণের মধ্যে অর্থনৈতিক ন্যায়পরতা প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সমাজতন্ত্র বাস্তবক্ষেত্রে বৈষম্য সামান্যই দূর করতে পেরেছে। সম্পত্তিহীন শ্রমিকশ্রেণী সম্পত্তি থেকেই বঞ্চিত রয়ে গেল। একজন পুঁজিপতির মালিকানাধীন কারখানার শ্রমিক হওয়ার বদলে সে আরো বেশি ক্ষমতাশালী একচেটিয়া রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কারখানার শ্রমিকে পরিণত হলো। এ নতুন মালিকের পুরস্কার বা শাস্তি দেবার ক্ষমতা আবার অসীম। এখানে শ্রমিক শ্রেণী পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় তাদের যে অবস্থান ছিলো তা সত্ত্বেও অধিকতরভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হতে দূরে রয়ে গেলো। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে শ্রমিক শ্রেণী ইউনিয়ন, মুক্ত প্রচার মাধ্যম এবং নির্বাচনের মাধ্যমে অন্তত কিছুটা প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হতো। উৎপাদন যন্ত্র এবং উৎপাদিত দ্রব্যের উপর শ্রমিক শ্রেণীর নিয়ন্ত্রণের স্বপ্ন এ নতুন ব্যবস্থাতেও বাস্তবের মুখ দেখল না। বস্তুত তাদের প্রকৃত অবস্থার আরো অবণতি ঘটলো। কার্লমার্কস যে মজুরি দাসত্বের অবসান চেয়েছিলেন তা বরং আরো তীব্রতর হলো। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় একজন শ্রমিকের অন্তত তার কর্মক্ষেত্র বাছাইয়ের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সোভিয়েত ব্যবস্থায় রাষ্ট্র নামক একমাত্র মালিক থাকায় সে সুযোগেরও কোনো অবকাশ নেই। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় এক কারখানা ছেড়ে অন্য কারখানায় চলে যাবার যে স্বাধীনতা একজন শ্রমিক ভোগ করত, তা হারিয়ে সে এখন সারাজীবন একটি কারখানার শিকলে বাঁধা পড়ে গেলো। এখন সব কিছু নির্ভর করে তার উপরস্থ কর্মকর্তার উপর। কর্মকর্তা বদান্য হলে কারো অবস্থার উন্নতি ঘটতে পারে। কিন্তু সাধারণভাবে একজন শ্রমিক দক্ষতার সাথে অধিক পরিশ্রম করলেও সে জন্যে তার কোনো অতিরিক্ত পারিশ্রমিক পাবার কোনো সুযোগ এ ব্যবস্থায় নেই। অপরদিকে উর্ধতন কর্মকর্তা প্রতিহিংসাপরায়ণ চরিত্রের হলে কর্মচারীকে নীরবে নির্যাতন সয়ে যেতে হবে। অভিযোগ করারজন্যে তার সামনে কোনো দুয়ার খোলা নেই। যদি সে তার অধিকারের জন্যে লড়াই করতে চায়, তবে তা স্থান হবে বাধ্যতামূলক শ্রমশিবিরে। রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র তাই পুঁজিবাদী সমাজ থেকেও অধিকতর নিপীড়নমূলক হয়ে দাঁড়াল। শুধু এই কারণটিই কি মজুরি শ্রমিকের ভগ্ন বিচুর্ণ মানব সত্তায় পরিণত হওয়ার (এলিনেশন প্রক্রিয়া) জন্যে যথেষ্ট নয়? সোস্যাল ডেমোক্রেট ‘ক্রসল্যাণ্ড’ যথার্থই মন্তব্য করেছেন, ‘উৎপাদন উপকরণ হতে শ্রমিক শ্রেণীর বিছিন্নকরণের (এলিনেশন) অন্তর্নিহিত কারণ সমাজতান্ত্রিক সমাজেও বিদ্যমান। কারণ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র শ্রমিক শ্রেণী হতে বহু দূরে। শোষণের সম্ভাবনা এবং পুঁজিবাদের সমস্ত লক্ষণ ও বৈশিষ্ট্যসমূহ এখানেও পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান। সামাজিক বৈষম্য ও শ্রেণী পার্থক্যের ধারা এখানেও অপ্রতিহতভাবে চলতে থাকে। ‘মুরে ইয়ানোভিচ’ মন্তব্য করেছেন, ‘সোভিয়েত সমাজের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর শ্রেণী ব্যবস্থা। সমাজের উপর স্তরের লোকেরাই ধনতান্ত্রিক সমাজের মতো উচ্চ আয়ের পদমর্যাদাসম্পন্ন চাকরিসমূহ পেয়ে থাকে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সমাজতান্ত্রিক গবেষণায় দেখা গেছে শ্রমিকদের সন্তানদের জীবনের উচ্চাকাংখা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সৌভাগ্যের মুখ দেখার সুযোগ পায়নি। ‘শ্রমিক রাজত্বের’ বাগাড়ম্বর দ্বারা এ তিক্ত সত্যকে ঢেকে রাখার প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে। এককালের বিখ্যাত প্রবচন যে “রাষ্ট্রীয় মালিকানা শ্রেণীহীন সমাজ” প্রতিষ্ঠা করবে ভ্রান্তিতে পর্যবসিত হয়েছে। রাষ্ট্র শিল্পসমূহ অধিগ্রহণ করলে আর কোনো শ্রেণীবিশেষই রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করবে না -এরূপ ধারণা করার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। এককেন্দ্রীক ব্যবস্থা যা মানব ভ্রাতৃত্বের মতবাদ বা স্রষ্টার সম্মুখে জবাবদিহিতার ধারণার উপর নয়, বরং দ্বান্দ্বিক মতবাদ এবং একশ্রেণী কর্তৃক অন্যশ্রেণীকে উৎখাত বা অধীনস্থ করার দর্শনের উপর ভিত্তিশীল তা হতে শ্রেণীব্যবস্থা আরো বেশি তীব্রতর হতে বাধ্য। সোভিয়েত ইউনিয়নে ভোগ্যপূণ্য উৎপাদনকে অগ্রাধিকার প্রদান না কার ফলে জনগণের বিচ্ছিন্নকরণ (এলিনেশন) প্রক্রিয়া আরো জোরদার হয়েছে। খাদ্য, বাসস্থান ও জীবনের অন্যান্য অত্যাবশ্যকক সামগ্রীর সরবরাহ রয়ে গেছ। অপ্রতুল। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের জন্যে শ্রমিকদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বিপরীত পক্ষে প্রভাবশালী ও শক্তিধর ব্যক্তিবর্গের নিকট সব কিছুই সহজলভ্য। তারা শুধু বিনামূল্যে প্রসাদোপম বাড়ি ও গাড়িই নয়, গোপনভাবে প্রদত্ত অতিরিক্ত বেতন, হ্রাসকৃত মূল্যের দোকানো বিশেষ সুবিধাও ভোগ করে। এমনকি শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের বিনামূল্যে দ্রব্যসামগ্রী পাবার জন্যে রয়েছে বিশেষ দোকান। এ ব্যবস্থা সমাজে মানুষের শ্রেনী বিভক্তির সুস্পষ্ট দলিল। সেখানে অভিজাত শ্রেনীর জন্যে সকল প্রকার বিলাস সামগ্রীর সুযোগ রয়েছে, অতচ সাধারণ মানুষ নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী হতেও বঞ্চিত। শ্রমিকদের মনোবল ও শৃঙ্খলাবোধের উপর স্বাভাবিকভাবে এ অবস্থা প্রবল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। অবশ্য বিখ্যাত ‘নাভোসিবিরিস’ রিপোর্টে খ্যাতিমান অর্থনীতিকিদগণ অলস, দুর্নীতিপ্রবণ ও শৃঙ্খলাবোধহীন শ্রমিক সমাজ গড়ে ওঠার পিছনে অর্থনীতির অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণকে দায়ী করেন। তারা কারণ হিসেবে বিরাজমান শ্রেণী বৈষম্য, সামাজিক অন্যায়পরতা ও নৈতিক স্খলনজনিত পরিবেশের প্রতিক্রিয়া দেখতে বস্তুত ব্যর্থ হন। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও শ্রমিক শ্রেণীর সন্তানগণ উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভর্তির সুযোগের বেলায় সমাজের উপর স্তরের প্রভাব ও বিত্তশালী ব্যক্তিদের সন্তানদের তুলনায় কম সুযোগ লাভ করে। সর্বস্তরের শিক্ষাব্যবস্থা অবৈতনিক হওয়া সত্ত্বেও সোভিয়ে শিক্ষাব্যবস্থায় পুরুষানুক্রমে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য টিকিয়ে রাখার প্রবণতা সুস্পষ্ট। এক্ষেত্রে সুযোগ লাভের শর্ত হয়ে দাঁড়ায় সামাজি সিড়িতে শিক্ষার্থীর শ্রেণীগত অবস্থান। ‘ইয়ানোভিচ’ লক্ষ্য করেছেন, যে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ যত বেশি ভবিষ্যত লাভজনক পেশা সাথে সংযুক্ত তাতে শ্রমজীবী মানুষের সন্তানদের প্রবেশের সুযোগ তত কম এবং “সাদা কলারধারী পেশাজীবীদের সন্তানেরাই সেখানে সিংহভাব দখল করে আছে”। অন্যান্য দিক থেকেও সোভিয়েত ব্যবস্থা অন্যায়পরতাপূর্ণ। কৃষক শ্রেণী শুধুমাত্র তাদের কৃষি জমিই হারায়নি, তারা তাদের উৎপাদিত ফসলের জন্যও যথাযথ মুল্য পায়না যা সরকার কৃর্তৃক হ্রাসকৃত ও পূর্বনির্ধারিত। সমগ্র সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নেই আয় প্রয়োজনের তুলনায় নূন্যতম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের তুলনায় সোভিয়েত ইউনিয়নে আয়ের বৈষম্য কম হতে পারে, কিন্তু তা অবশ্যই যুক্তরাজ্য ও নরওয়ের তুলনায় কম নয়। সমাজতন্ত্রী চিন্তাবিদ ‘সুইজি’র দৃষ্টিতে সোভিয়েত সমাজ আয় ও সুযোগের ক্ষেত্রে তীব্রভাবে বৈষম্যমূলক। এ কারণেই শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেও কৃষক ও শ্রমিকদের তাদের পূর্ণশক্তিতে কাজ করার জন্যে উদ্বুদ্ধকরণে সফল হওয়া যায়নি। এভাবে এ ব্যবস্থা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সম্পত্তিই হরণ করেনি, এটা শ্রম ও প্রয়োজনের তুলনায় কম মজুরি প্রদান করে সর্বহারা উৎপাদক শ্রেণীর প্রতি বিরাট অবিচার সাধন করেছে। ‘সর্বহারার একনায়কত্ব’ এভাবে সর্বহারা শ্রেণীর দমনযন্ত্রে পরিণত হয়। তাই ‘সুইজি’ এ মর্মে মন্তব্য করতে বাধ্য হন যে, ‘মার্কসীয় মতাদর্শের দাবি পূরণে সোভিয়েত ইউনিয়ন পরিপূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। মিথ্যা স্বপ্ন শ্রেণীহীন, বৈষম্যহীন, ভ্রাতৃত্বমূরক যে সমাজের স্বপ্ন কালমার্ক দেখেছিলেন, তা এভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। শ্রমিক শ্রেণী মজুরি দাসত্বের নিগড়ে বাঁধা পড়ে যায়। সামাজিক শ্রেণীবিভেদও অব্যাহত গতিতে চলতে থাকে। ‘সর্বহারার একনায়কতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা লাভ করল না। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিলুপ্তির মার্কসীয় ধারণার কোনো লক্ষণও কোথাও দৃষ্টিগোচর হলোনা, বরং রাষ্ট্র তার নিপীড়নমূলক অস্ত্র নিয়ে আরো জেঁকে বসল। এ ব্যর্থতার কারণ সুস্পষ্ট। লক্ষ্যের সাথে দর্শন ও কৌশলের কোনো মিল ছিলনা। লক্ষ্য ছিলো ‘মানবতাবাদের প্রতিষ্ঠা’ একটি শ্রেণীহীন সমাজ, যেখানে কেউ কাউকে শোষণ করবে না, যেখানে সবাই সামষ্টিক কল্যাণের জন্যে কাজ করবে এবং সবার প্রয়োজন পূর্ণ হবে, যেখানে আয় ও সম্পদের কোনো বৈষম্য থাকবে না, ফলে এলিনেশন বা বিচ্ছিন্নকরণেরও কোনো প্রক্রিয়া থাকবেনা। কিন্তু এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে ব্যবহৃত দর্শন ও কৌশল এ উদ্দেশ্যের সাথে সংগতিপূর্ণ ছিলনা। এ দর্শন দ্বান্দ্বিক মতবাদের প্রবক্তা, যাতে ঘৃণা, ্র,্েরণী সংঘাত ও উৎখাতের কথা বলা হয়েছে, ব্যক্ত হয়েছে সমগ্র উৎপাদন উপকরণের নিয়ন্ত্রণ কতিপয় ব্যক্তির হাতে সমর্পনের মতবাদ। গুটিকয়েক ব্যক্তিবর্গের হাতে বিশাল নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা অর্পন, অথচ তাদের ব্যক্তিস্বার্থ ও শ্রেণীস্বার্থকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো নৈতিক বা আধ্যাত্মিক প্রেরণা বা ব্যবস্থার অস্তিত্ব নেই। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নির্ধারণকারী সামাজিকভাবে সম্মত কোনো নীতিমালা নেই -এমন ব্যবস্থা ক্ষমতা ও সুবিধাভোগী শ্রেণীর স্বার্থে তাদের অবস্থান অক্ষুন্ন রাখার লড়াইয়ে রূপান্তরিত হতে বাধ্য। এরূপ ব্যবস্থায় কোনোরূপ গণতন্ত্রায়নের প্রচেষ্টা সফল হতে পারেনা, কেননা শক্তিধর আমলাতন্ত্র তাদের সুবিধাভোগী অবস্থান অক্ষুন্ন রাখার স্বার্থে একে স্বভাবতই বাধা দেবে। ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারাদার, তাদের তল্পীবাহক ও চাটুকাররাই শুধুমাত্র এ ধরণের একনায়তান্ত্রিক ব্যবস্থায় সুযোগ সুবিধার প্রত্যাশা করতে পারে। তাই প্রথম থেকেই এ ব্যবস্থা সঠিক পন্থায় অগ্রসর হতে পারেনি। ত্রিশ দশকের মাঝামাঝি সময়ে লিও ট্রটস্কি সোভিয়েত ব্যবস্থাকে সমালোচনা করে বলেছিলেন, ‘প্রকৃত সমাজতন্ত্র শুধুমাত্র উৎপাদন উপকরণের মাধ্যমে আপনাআপনি অর্জন করা সম্ভব নয়; এর জন্যে প্রয়োজন অধিকতর গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার বিকাশ, চর্চা ও অধিকতর ন্যায়পরতা সৃষ্টির উদ্যোগ’। ট্রটস্কির গণতন্ত্র চর্চার এ আকাঙ্খা সোভিয়েত ব্যবস্থায় বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি; কেননা পলিটব্যুরোর মুষ্টিমেয় সদস্যই এখানে সকল মানুষের জীবিকার হর্তাকর্তা এবং শ্রমিক শ্রেণীকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হতে দূরে রাখার মাঝেই তাদের স্বার্থ নিহিত। সম্পদশালী বুর্জোয়া হতে ক্ষমতাশালী পলিটব্যুরোর সদস্যদের ভিন্নতর আচরণ করার কোনো কারণ নেই। নিজের স্বার্থসিদ্ধি লাভ করার স্বভাবজাত মানব প্রবণতাকে সীমারেখা মেনে চলতে বাধ্য করার কোনো কার্যকর পন্থা না থাকলে মার্কসের ‘প্রত্যেকে সাধ্যমতো কাজ করবে, প্রয়োজন অনুযায়ী ভোগ করবে’ -এই নীতির উপর ভিত্তিশীল সমাজের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। বিনিময় মূল্য প্রাপ্তির আশা ছাড়া মানুষ সর্বশক্তি নিয়োগ করে না। তারা সর্বোচ্চ কাজের বিনিময়ে সর্বোচচ্চ প্রাপ্তিই আশা করবে। তাই এমন কোনো পন্থা থাকা দরকার, যাতে তারা সর্বোচ্চ কাজ করতেও অনুপ্রাণিত হবে; আবার বিনিময়ে তাদের প্রাপ্ত দাবিও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যে থাকবে। কিন্তু বল প্রয়োগ ছাড়া মানুষের স্বার্থচিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার আর কোনো পন্থা মার্কস দেখাতে পারেননি। তাই পুঁজিবাদের শক্তিশালী সমালোচনা উপস্থাপন করা সত্ত্বে মার্কস কোনো গঠনমূলক ও কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা পেশ করতে পারেননি। তা মানুষের স্বার্থপরতাকে সীমারেখা লঙ্ঘন করতে না দিয়ে একটি আদর্শ সমাজব্যবস্থা গঠন করার জন্যে প্রয়োজন শ্রেণী সংঘাতের বদলে প্রত্যেক মানবসত্তাকে ভ্রাতৃভাবে দেখা ও একটি সর্বসম্মত মূল্যবোধের শক্ত কাঠামোর মধ্যে থেকে সবাই সামষ্টিক কল্যাণের জন্যে কাজ করবে এমন চিন্তাধারায় সৃষ্ট একটি মতাদর্শ। পরবর্তী আলোচনায় দেখা যাবে, একমাত্র ধর্মই এ ধরনের চিন্তাধারা ভিত্তিক দর্শন ও ব্যবস্থাপনা প্রদান করতে পারে। কিন্তু মার্কস সকল ধর্ম ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে প্রত্যাখ্যানো আহবান জানিয়েছিলেন। মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধশালি ঐতিহ্য ধ্বংসের পর যা মার্কস উপস্থাপন করেছিলেন তা হলো সমস্ত উৎপাদন উপকরণের উপর কর্তৃত্বশীর একটি একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে নীতিনির্ধারণের জন্যে কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই, ব্যক্তিস্বার্থের লেলিহান শিখাকে নিয়ন্ত্রণের কোনো উপায় নেই। শুধু রয়েছে এক নিষ্ঠুর, ক্ষমাহীন প্রচণ্ড শক্তি। এমনকি একটি একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র আবার ইতিহাসের এক পর্যায়ে এসে আপনাআপনি বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে মার্কস বিশ্বাস করতেন। কিন্তু কিভাবে এ বিলুপ্তি ঘটবে মার্কস তা ব্যাখ্যা করেননি। যদি বুর্জোয়াগণ স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ত্যাগে প্রস্তুত না হয়, তবে কিভাবে ধারণা করা যেতে পারে যে, প্রলেতারিয়েত পলিটব্যুরোর সদস্য হবার মাধ্যমে ক্ষমতা লাভের পর সে ক্ষমতা ত্যাগ করবে? বাস্তব সত্য হলো কমিউনিস্ট দেশসমূহে রাষ্ট্র বিলুপ্ত না হয়ে বরং উৎপীড়নের আরো শক্তিশালী যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। ‘প্রকৃতির সাথে সংগতিপূর্ণ সমাজব্যস্থা’ আর বাস্তবতা লাভ করেনি। প্রলেতারীয় শ্রেণী সেই মজুর দাসই রয়ে গেল। মার্কসীয় বিপ্লব দ্বারা তারা কি পেলো? তাদের আয়ের বৃদ্ধি কিন্তু তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, পশ্চিম জার্মানীর মতো দেশে সোভিয়েত রাশিয়া, পূর্ব ইউরোপ ও চীনের চেয়ে বেশি পাচ্ছে, যদিও তা বুর্জোয়া শ্রেণীর আয়ের মতো নয়। ফলত পুঁজিবাদের অবশ্যম্ভাবী পতন সম্পর্কিত মার্কসের ভবিষ্যদ্বানী ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে। সোভিয়েত নিরীক্ষা হতে লদ্ধ প্রায় সকল অভিজ্ঞতাই নেতিবাচক -যেমন, মজুরি প্রথাহীন রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব মুক্তসমাজ, মুদ্রা ও শ্রেণী বৈষম্যহীন ব্যবস্থা সবই মরীচিকায় পরিণত হয়েছে। সর্বস্তরে গণতন্ত্রের অস্তিত্বহীনতা, সমালোচনা, নিষ্ঠুর দমন -এসবের দিকে তাকালে হতাশা আরো তীব্রতর হয়। পুনর্গঠনের জটিলতা ‘নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতিতে এলোমেলোভাবে বাজার অর্থনীতির কিছু দিক সংযোজনের চেষ্টা টেলিফোনের খুঁটিতে আঙ্গুর গাছের কলম লাগানোর প্রচেষ্টার মতোই ব্যর্থ হয়েছে’। -জর্জ আর্বাতভ। অবাস্তব চিন্তাধারার কারণে মার্কসবাদ যা যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সমাজতন্ত্রীদের উপর ব্যাপক বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব বিস্তার করেছিল, ক্রমান্বয়ে তা ক্রমবর্ধমান হারে আক্রমণের সম্মুখীন হলো। সংশোধনবাদ জনপ্রিয় হয়ে উঠল এবং মার্কবাদকে প্রায় ধ্বসিয়ে দিলো। সোভিয়েত অর্থনীতিবিদদের মধ্যে ক্রমবর্ধমানভাবে এ উপলব্ধি সৃষ্টি হলো যে, সোভিয়েত অর্থনীতির ব্যাপক সংস্কার অত্যাবশ্যক। সোভিয়েত নেতৃত্ব রাজনৈতিক সংস্কারের অপরিহার্যতার উপর জোর দিতে লাগলেন, যা মিখাইল গর্বাচেভ প্রবর্তিত ‘গ্লাসনস্ত’ ও ‘পেরেস্ত্রয়কা’ ধারণার মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হলো। কিন্তু সমস্যা হলো, এখনো এটা কারো কাছে সুস্পষ্ট নয় যে, সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে তাদের বিঘোষিত অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাবার জন্যে কতটুকু সংস্কার ও পুনর্গঠনের প্রয়োজন। যুক্তি প্রদর্শন করা হয় যে, ব্যক্তিগত সম্পত্তির পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বিকেন্দ্রীকরণ ও পেরেস্ত্রয়কার প্রেক্ষিতে সুস্পষ্টিকরণ প্রয়োজন। তা হচ্ছে বিকেন্দ্রীকরণ, প্রতিযোগিতা, মূল্য সংস্কার, বিরাষ্ট্রীয়করণ এবং সম্পত্তি অধিকারের ক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি নিজস্ব পরিচিত সম্পূর্ণ না হারিয়ে কতটুকু ছাড় দিতে প্রস্তুত। খণ্ড খণ্ড পরিবর্তন ও সুচিন্তিত ভিতহীন সংস্কার প্রচেষ্টা যেমন অকার্যকর হবে, তেমনি পুঁজিবাদের দিকে ত্বরিৎ যাত্রা প্রয়োজনীয় অবস্থার অনুকূল পরিবেশের অভাবে বর্তমান আর্থ-সামাজিক বৈষম্যকে আরো অবনতিশীল করে তুলবে মাত্র এবং সমাজতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্যের কফিনে শেষ পেরেক পুতে দেবে। প্রশ্ন হলো, সমাজতন্ত্রেও গায়ে ইতোমধ্যে ব্যর্থ পুঁজিবাদের কিছু উপাদান লেপনের মাধ্যমে সেই কাংখিত বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা কী সম্ভব, যা বিদ্যমান অর্থনৈতিক সমস্যা ও সামাজিক অস্থিতিশীলতাকে অতিক্রম করে সমাজতন্ত্রের বিঘোষিত লক্ষ্যে পৌছাতে সাহায্য করবে? দুর্ভাগ্যক্রমে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির পুনর্গঠনের বিতর্কে পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক উভয় বিশ্বের বুদ্ধিজীবী মহল একটি মৌলিক বিষয়কে ভুলে যাচ্ছেন এবং তা হচ্ছে এ পুনর্গঠনের জন্যে মূলত সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব দৃষ্টিভংগির নিজস্ব আদলেরই পরিবর্তন প্রয়োজন। আর্থ-সামাজিক পুনর্গঠন ও এর পেছনে প্রয়োজনীয় প্রেরণার ক্ষেত্রে নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির যে ভূমিকা রয়েছে, উপযুক্ত বিতর্কে তাকে সামান্যতম স্থানও প্রদান করা হয়নি, যেন এটা কোনো গুরুত্বই বহন করেনা। এটা উপলব্ধি করা হয়নি যে, সমাজতান্ত্রিক দেশে ভোগ্য পণ্য ঘাটতির জন্যে কেন্দ্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও বাজার মূল্যের অস্তিত্বহীনতাই যদি শুধুমাত্র দায়ী হয়, তবে পুঁজিবাদী দেশসমূহে ভোগ্য পণ্যের লক্ষ্য পূরণে সফল হবার কথা ছিলো। কিন্তু এ প্রয়োজন পূরণ কখনোই সম্ভব নয়, যতক্ষণ না এ খাতে প্রয়োজনীয় বিপুল সম্পদ বরাদ্দ করা হয়। ভোগ্য পণ্য খাতে প্রয়োজনীয় বাড়তি সম্পদের স্থানান্তর মানেই অন্য খাতসমূহ যথা প্রতিরক্ষা, মহাকাশ কর্মসূচি, ভারী শিল্প, মর্যাদাবৃদ্ধির খাত, এলিট শ্রেণীর জন্যে বিলাস সামগ্রী উৎপান এবং অন্যান্য বহু অর্থনৈতিক খাতসহ যেসব ভৌগোলিক এলাকা সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে বেশি সুবিধা ভোগ করে আসছে তাতে কম বরাদ্দ, সম্পদের এরূপ পুনর্বিন্যাস সহজ কাজ নয়। এর জন্যে শুধু সামাজিকভাবে সম্মত মানদণ্ডই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সুবিধাভোগী শ্রেণী ও এলাকার পক্ষ হতে ত্যাগ স্বীকারের শক্তিশালী প্রেরণা ও ইচ্ছা। ‘জীবন মাত্র একটিই -এ বিশ্বাসে বিশ্বাসী উপযুক্ত ভোগবাদীরা কেন এটা করতে যাবে? যদি উল্লিখিত অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস করা না হয়, তবে বাড়তি সম্পদ কোথা থেকে আসবে? মুদ্রার সরবরাহ বৃদ্ধি? এটা সৃষ্টি করবে সীমিত সম্পদের উপর বাড়তি চাহিদা এবং সামাজিক অর্থনৈতিক ন্যায়পরতা, যার মুখোমোখি দাঁড়িয়ে আছে বর্তমানে পুঁজিবাদী ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র সমূহ। ক্ষতিকর রাজস্ব ঘাটতি হ্রাসের প্রয়োজনীয়তা মনে রাখলে এ সমস্যার ব্যাপ্তি হৃদয়ঙ্গম করা আরো সহজ হবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ ছিলো ১৯৮০-৮৫ সালে ৩% এর কম। তা বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৮৭ সালে হয়েছে প্রায় ৭% এবং ১৯৮৮ সালে ১৪%। ভোগ্যপণ্য উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধিকে ব্যাহত না করে এটা কী করে কমানো যাবে। এ জটিল প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব হয়নি। সরকারি ঋণের মাধ্যমে যদি এ সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হয়, তবে আগামি কয়েক বছরের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ঋণগ্রস্ত উন্নয়নশীল দেশসমূহের মতো ঋণের সুদ পরিশোধের তীব্র সমস্যায় নিপতিত হবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সামনে রয়েছে তাই অর্থনীতি পুনর্গঠনের পর্বত প্রমাণ কঠিন কাজ এবং তা তাকে করতে হবে ক্রমবর্ধমান ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বিকাশের যুগে অন্ধ ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থতার মুখে লাগাম পরানোর কোনো হাতিয়ারের যোগন ছাড়াই সবার চাহিদা পূরণের মাধ্যমে; বেকারত্ব না বাড়িয়ে বাজেট ঘাটতি হ্রাসের মাধ্যমে; মূল্যবৃদ্ধির প্লেগ আক্রান্ত অর্থনীতিতে বাস্তবসম্মত মূল্য কাঠামো বাস্তবায়নের মাধ্যমে। বাস্তবভিত্তিক পণ্য মূল্য ও বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার প্রবর্তন এবং জন বাজেট ঘাটতি হ্রাসের জন্যে ভর্তুকি কমানো মানেই পৃষ্ঠপোষকতার বর্তমান ব্যবস্থার অবসান, যেখানে উৎপাদন ও আমদানি ব্যয়ের সাথে খুচরা মূল্যের কোনো সম্পর্ক নেই, যেথায় অন্তত তাত্ত্বিকভাবে সস্তা খাদ্য, বস্ত্র, ও বাসস্থানের ব্যবস্থা আছে এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত বলে ধরে নেয়া হয়। বাস্তবভিত্তিক মূল্য প্রবর্তনের ফলে অবশ্যম্ভাবীরূপে দেখা দেবে মুদ্রাস্ফীতির প্রতিক্রিয়া। যদি মজুরি ও পেনশন যুগপৎ বৃদ্ধি করা না হয়, তাহলে সর্বসাধারণ বিশেষতদরিদ্র শ্রেণীর জীবনযাত্রার মান তীব্রভাবে হ্রাস পাবে। ফলে গ্লাসনস্ত বা খোলামেলা সমালোচনার পরিবেশের প্রেক্ষিতে সামাজিকও রাজনৈতিক অীস্থতিশীলতা দেখা দেবে। আবার মূল্যবৃদ্ধির সাথে মজুরি বৃদ্ধি পেরেস্ত্রয়কা বা সংস্কার প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য ব্যর্থ করে দেবে। পেরেস্ত্রয়কা দাবি করে যে, মজুরি বৃদ্ধি ঘটবেনা বা সে বৃদ্ধি আনুপাতিক হারে হবেনা। মজুরি নির্ধারণ করা হলোমূল্য ও মজুরি পরিবর্তন দ্বারা কিছু শ্রমিক অন্যদের চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে প্রকৃত আয়ের ব্যবধান বৃদ্ধি পেয়ে অধিকতর আয় ও সম্পদ বৈষম্যের সৃষ্টি হবে এবং গণচীনের মতো সামাজিক অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হতে পারে। বাজার অর্থনীতিতে এ ধরণের পরিবর্তন অল্প মাত্রায় প্রতি বছরই সংঘটিত হয়। কিন্তু তা দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে নজরে পড়েনা, যেরূপ জাজ্বল্যমানভাবে দৃষ্টিগোচর হবে সমাজতান্ত্রিক দেশে, যেখানে উপর্যুপরি দশরে ভ্রান্তি কয়েক বছরে অপনোদনের চেষ্টা নেয়া হবে। ফলে পৃথিবীর যে কোনো অর্থনীতির চেয়ে বিরাষ্ট্রীয়করণকৃত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে নৈতিক পুনর্জাগরণ ও আর্থ-সামাজিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। অধিকন্তু অধিক দক্ষতার আশা কখনো বাস্তবায়িত হবেনা, যদি প্রতিষ্ঠানসমূহের উৎপাদন উপকরণের মান, পরিমাণ ও উৎস নির্ধারণ এবং কর্মচারীদের কর্মসম্পাদনের ভিত্তিতে নিয়োগ ও বরখাস্তের স্বাধীনতা না থাকে। নিশ্চিত বাজারের যে সুবিধা বর্তমানে প্রতিষ্ঠানসমূহ ভোগ করছে, সে সুবিধা সম্ভবত প্রত্যাহার করতে হবে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানের মুখোমুখি হবে। দক্ষতা অর্জনের জন্যে তাদেরকে শ্রমিক ছাঁটাই করতে হবে, যার ফলে দেখা দেবে বেকারত্ব। যেহেতু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিশালাকারের, লোকসানকারী এমনসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার ফলে সৃষ্ট সমস্যা বিশেষত বেকারত্বের পরিমাণ হবে বিশালাকৃতির। বাজারব্যবস্থার দিকে দ্রুত নিয়ে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট সমস্যাবলী সামাল দেবার জন্যে সোভিয়েত ব্যবস্থা উপযুক্ত নয়। যে পর্যন্ত সোভিয়েত বাজারব্যবস্থার পৃষ্ঠপোষকতার ধারা ও আচরণ অব্যাবহত থাকবে, ততদিন বাজারব্যবস্থার আংশিক পুনরুজ্জীবন স্ববিরোধী বিষয়ে পরিণত হবে। পরিণত হবে। অধিকতর দক্ষতা অর্জনের জন্যে যদি যৌথ মালিকানা, কেন্দ্রীয় পরিকল্পনাসহ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও লক্ষ্যসমূহ পরিত্যাগ করা হয়, তবে সমাজতন্ত্রের আলাদা ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত হবার আর কী-ই বা অবশিষ্ট থাকে? বিরাষ্ট্রীয়করণের প্রশ্নটিও সমস্যাসংকুল। যেহেতু জাতীয়করণকৃত সকল সম্পদের মালিকানা সমগ্র জনগণের, তাই বিরাষ্ট্রীয়করণের মাধ্যমে কারো কাছে সম্পত্তির অধিকার হস্তান্তর প্রক্রিয়াও ইনসাফভিত্তিক হওয়া দরকার। এর জন্যে এ পর্যন্ত কোনো সুস্পষ্ট ও স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণীত হয়েছে বলে মনে হয়না। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন খামার ও শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহে শেয়ারভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে হস্তান্তরের একটি ধারণা গড়ে উঠেছে। কিন্তু এরূপ নিলাম সংঘটিত হবার পূর্বে সঠিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন, যা আবার বাজারব্যবস্থা কর্তৃক মূল্য ও লাভের পরিমাণ নির্ণীত হবার সুযোগ না থাকায় একটি সময়সাপেক্ষ ও কঠিন কর্ম। এরূপ মূল্যায়ন ব্যতিরেকে যাদের ভিতরের বিষয়ে জ্ঞান নেই তাদের বিশাল ঝুঁকি নিতে হবে। উপরন্তু এ নিলাম ব্যবস্থার নেতিবাচক দিক হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক যুগে যারা সম্পত্তি পুঞ্জীভূত করতে পেরেছিল, শুধু তারাই এসব শেয়ার কিনতে সক্ষম হবে। ফলে যারা মালিকানাস্বত্ব ব্যতিরেকেই এতোদিন সুবিধাভোগী ছিলো, তারা এখন মালিকানাস্বত্ব লাভের মাধ্যমে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে। তাহলে যাদের নামে সমাজতন্ত্র আনা হয়েছিল এবং যাদের নামে আবার তা ভাঙ্গা হচ্ছে, সেই প্রলেতারীয় শ্রেণী এখন কোথায় যাবে? যাই হোক, সম্পদের মালিকানা যদি জনগণের মধ্যে ন্যায়পরতার সাথে বন্টন করতে হয়, তাহলে জটিল প্রশ্নটি থেকে যায় যে, কীভাবে এটা সম্পাদন করা হবে, কে কিসের মালিকানা লাভ করবে এবং কতটুকু পরিমাণ? যদি শ্রমিকদের তারা যে খামার বা কারখানায় কাজ করছে তার অংশীদারিত্ব প্রদান করা হয়, তাহলে যারা কাজ করছেনা বা কম উৎপাদনশীল খামারে কাজ করছে অথবা এমন কারখানায় কাজ করছে যা দেউলিয়া ঘোষিত হয়েছে বা শিগগিরই ঘোষিত হবে, তাদের বেলায় কী হবে? যদি সবাইকে ক্রয়ের জন্যে কুপণ দেয়া হয়, তাহেল ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তর প্রক্রিয়া আরম্ভ করার জন্যে অপেক্ষা করতে হবে। এই পদ্ধতি সময়সাপেক্ষ যা বর্তমান প্রেক্ষিতে বাস্তবায়নযোগ্য নয়। অধিকন্তু যারা অতীতে সম্পদ কুক্ষিগত করতে পেরেছে, তারা ক্রয়ের জন্যে প্রাপ্ত কুপনের সুবাদে অধিকতর সুবিধাজনক অবস্থানে চলে আসবে। ডারউইনীয় বাছাই পদ্ধতিও সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। গত কয়েকদশকে সোভিয়েত নেতৃত্বের কাঠামো দর্পভরে টিকে থাকার তত্ত্বের ভিত্তিতেই তা নির্ধারিত হয়েছে এবং বর্তমান ব্যবস্থার স্বপক্ষে একটি কায়েমী স্বার্থ তৈরি হয়েই আছে। নৈতিক পুনর্জাগরণ ব্যতিরেকে শুধুমাত্র পেরস্ত্রয়কা নীতির দ্বারা এ অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সমূহের কর্মকর্তাগণ বাজারনীতির বাস্তবতা মেনে নিতে মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রস্তুত নাও থাকতে পারে। তাই কলকারখানা ও খামারের অদক্ষ ব্যবস্থাপকদের অপসারণের জন্যে প্রয়াজন হবে নেতৃত্বের কঠোর হস্তক্ষেপ। যেহেতু এতে অসন্তোষ ও অস্থিরতা সৃষ্টি হবে, তাই নেতৃত্বকে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যে একই সাথে কায়েমী স্বার্থকে শান্ত করার প্রচেষ্টায় নিয়োজিত হতে হবে। সমাজতন্ত্রের কুফলসমূহ তথা ক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ, বিশালায়তন প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক অসুবিধা ইত্যাদি দূরীকরণ তাই সহজ কাজ নয়। প্রকৃত প্রস্তাবে ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রত্যেক ব্যক্তির সংস্কারের স্বপক্ষে থাকার, আবার একই সাথে তাকে বিরোধিতা করার কোনো না কোনো কারণ রয়েছে। বাজার সমাজতন্ত্র সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন তার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বাজার অর্থনীতির কিছু উপাদান সংযোজন করছে তখন পূর্ব ইউরোপীয় দেশ সমূহ (বুলগেরিয়া, চেকোশ্লোভাকিা, পূর্ব জার্মানী, হাঙ্গেরী, পোল্যান্ড ও রোমানিয়া), যুগোশ্লাভিয়া এবং চীন ইতোমধ্যে এমন এক পথ ধরেছে যা ‘বাজার সমাজতন্ত্র’ নামে অভিহিত। এমনকি চীন মাও সে তুং কর্তৃক বলপূর্বক চাপিয়ে দেয়া অমানবিক ও অস্বাভাবিক কমিউন ব্যবস্থার উপর গুরুত্ব আরোপ পরিত্যাগ করেছে। এতদসত্ত্বেও অধিকাংশ উৎপাদন উপকরণের রাষ্ট্রীয় মালিকানাভিত্তিক সোভিয়েত মডেলই এখনো এসব অর্থনীতির মূল মেরুদণ্ড। সংস্কার ও পুনর্গঠনের মৌলনীতি হতে হবে উৎপাদন উপকরণ বন্টনের ক্ষেত্রে বাজার শক্তি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগকে ভূমিকা পালন করতে দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আংশিকভাবে বিকেন্দ্রীকরণ করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎপাদন উপকরণ সংগ্রহ, উৎপাদন দ্রব্যের মূল্য নির্ধারণ এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে অধিকতর স্বায়ত্বশাসন প্রদান। স্ব-শাসন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর থেকে উপরের অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণ তুলে নিতে হবে। বাজার শক্তি কর্তৃক নির্ধারিত মূল্য, মজুরি এবং বিনিময় হারের প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করতে হবে এবং বাজেট ঘাটতি হ্রাসের জন্যে ভর্তুকির পরিমাণ কমাতে হবে। ভারী শিল্পের উপর পূর্বে যে অনাবশ্যক গুরুত্ব প্রদান করা হতো তা হ্রাস করতে হবে। ব্যর্থতা ও পতন এসব সংস্কার সকল দেশে সুসমভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। এগুলো বুলগেরিয়া, চেকোশ্লোভাকিয়া, পূর্ব জার্মানী ও রোমানিয়ার তুলনায় যুগোশ্লাভিয়া, হাংগেরী, পোল্যান্ড ও চীনে অধিকতর ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এ দেশগুলোর কোনোটাই বাজার সমাজতন্ত্রের প্রবক্তারা তাত্ত্বিকভাবে যে পথ ও পদ্ধতি উপস্থাপন করেছেন সেভাবে বাজার শক্তির উপর আস্থা প্রদান ও অর্থনীতিকে বিকেন্দ্রীকরণের পথে অগ্রসর হয়নি। বাস্তবে সর্বত্রই অতিরিক্তভাবে এককেন্দ্রিক ও আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার মৌলিক উপরিকাঠামো অটুট রয়ে গেছে। ফলে উৎপাদনশীলতা, প্রবৃদ্ধি ও পণ্যমানের ক্রমাবনতি এবং ঘাটতি সমস্যা যা এদেশগুলো সমাধান করতে চেয়েছে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। সমস্যাগুলো অসহনীয় হয়ে উঠলে ১৯৮৯ সালে পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট সরকারগুলো তাসের ঘরের মতো ধুলিস্যাৎ হয়ে পড়ে। ১৯৮৯ সালে তিয়েনমেন স্কয়ারের গণতন্ত্রের আন্দোলন পাশবিক শক্তির সাহায্যে দমন না করলে চীনের কমিউনিস্ট সরকার এতদিন হয়ত উৎখাত হয়ে যেত। প্রশ্ন হলো, লক্ষ্য অর্জনের দিক থেকে সোভিয়েত মডেলের চেয়ে কেন বাজার সমাজতন্ত্র অধিকতর সফলতা দেখতে পারলনা? রাজনৈতিক গণতন্ত্র অর্তনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির সাথে রাজনৈতিক গণতন্ত্র চর্চা শুরু করা হয়নি। রাজনৈতিক একনায়কতন্ত্র ও নির্যাতনমূলক ব্যবস্থা অব্যাহত থাকে। রাজনৈতিক স্বধীনতার অস্ত্বিহীনতা অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচিকে বিকলাঙ্গ করে দেয় এবং অবয়বে বেড়ে ওঠার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। দমননীতি দ্বারা চালিত সরকারের কায়েমী স্বার্থ যেভাবে চরিতার্থ হবে সে পথেই সংস্কার কর্মসূচিকে চলতে দেয়া হয়। আংশিক ও অবিন্যস্ত সংস্কার কর্মসূচি অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন ঘটাতে ব্যর্থ হয় বলে লক্ষ্যে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়নি। এর সাথে দুর্নীতি ও অদক্ষতা সম্পদের অপচয় ঘটিয়ে ঘাটতি ও সংকটের সৃষ্টি করে। যদি অর্থনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি রাজনৈতিক গণতন্ত্রও চালু হতো তবু তা যথেষ্ট বলে বিবেচিত হতো না। বিকেন্দ্রীকরণের সাহায্যেআমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার অপসারণ এবং বাজার শক্তির পুনরাবির্ভাবের ফলে সম্পদের বন্টনে অবশ্য নিঃসন্দেহে দক্ষতার সৃষ্টি হতো। তবে তা বাজার অর্থনীতিতে জাতীয়করণকৃত শিল্প সংস্থায় যে দক্ষতা বিরাজমান তার চেয়ে অধিক হতোনা। উৎপাদন উপকরণের ব্যাক্তিগত মালিকানার অনুপস্থিতির ফলে বাজার অর্থনীতি থেকে যে স্বতঃস্ফুর্ত উদ্যোগ বেরিয়ে আসে উৎপাদন উপকরণের ব্যক্তিগত মালিকানার অভাবে তা বাজার সমাজতন্ত্রে পাওয়া কখনো সম্ভব নয়, ফলে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবেই। বাজার সমাজতন্ত্রকে যদি প্রকৃত অর্থে একটি কার্যকর ও প্রকৃত বিশ্বদৃষ্টির কাঠামোর মধ্যে বিন্যস্ত করা না যায়, তবে বাঞ্ছনীয় ন্যায়পরতা, যা বাজার অর্থনীতিও প্রদানের ব্যর্থ হয়েছে, তা কখনোই অর্জন করা সম্ভব হবেনা। শুধুমাত্র এ ধরণের বিশ্ব দর্শনভিত্তিক বাজার সমাজতন্ত্রই কাঙ্খিত লক্ষ্য পূরণে কর্মোদ্দীপনা সৃষ্টি, সুষম বন্টনব্যবস্থা ও আর্থ-সামাজিক পুনর্বিন্যাস ঘটাতে পারে। এরূপ দর্শনের অভাবে কার্যকর ব্যবস্থা ও কৌশল গড়ে উঠতে পারেনি। এসব বাজার সমাজতন্ত্র অভিমুখী দেশসমূহ তাই শুধুমাত্র তাদের নিজেদের সমস্যা সমাধানেই ব্যর্থ হয়নি উপরন্তু তারা বাজেট ঘাটতি মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, উচ্চ বৈদেশিক ঋণ প্রভৃতি অর্থনৈতিক সমস্যা, এতোদিন যা পুঁজিবাদী অর্থনীতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছিল, তার ঘূর্ণিপাকেও পতিত হয়েছে। অধিকন্তু আয়ের বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়ে সামাজিক অস্থিতিশীলতার জন্ম দিয়েছে। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও ঋণ উদারনীতি গ্রহণে অগ্রসর যুগোস্লাভিয়া, পোল্যান্ড, হাংগেরি এবং চিন এ বিষয়ে উত্তম উদাহরণ। মুল্যস্ফীতি ও শ্রমিক অসন্তোষের যাতাকলে আর্তনা করছে যুগোস্লাভিয়া ও পোল্যান্ড। উভয় দেশে প্রতি বছর মুদ্রাস্ফীতি বেড়েই চলছে। যুগোস্লাভিয়ার ১৯৭৯ সালে মুদ্রাস্ফীতির হার ছিলো ২১.২% যা বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৮৯ সালে হয়েছে ১২৪০%। পোল্যান্ডে মুদ্রাস্ফীতি ১৯৭৯ সালের ৭.১% থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৮৯ সালে দাঁড়িয়েছে ২৪৫%। এ দু’দেশের মূল্যস্ফীতি ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে যা ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে এসে দাঁড়িয়েছে ২৬৮৫% এবং ৬৪০% এ। হাঙ্গেরী ও চীনে মূল্যস্ফীতির হার তুলনামূলকভাবে কম হলেও তা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। চীনে তা ১৯৮৩ সালের ২.০% হতে ছয় গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৮৫ সালে ১১.৯% এ দাঁড়িয়েছে। চীনাদের যারা বিগত ৩০ বছর যাবত মূল্য স্থিতিশীলতা দেখে আসছে এ মূল্যবৃদ্ধি তাদের নিকট তীব্র আঘাত হিসেবে দেখা দেয়। ফলে প্রতিবাদ ও ছাত্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরিণতিতে অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির রূপকার ও কমিউনিস্ট পার্টি প্রধান হু ইয়াও ব্যাংকে অপমানজনকভাবে পদত্যাগ করতে হয়। সরকার মূল্য বৃদ্ধির উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপসহ সাময়িকভাবে অর্থনীতিকে উন্মুক্তকরণের নীতি শিথিল করে। ফলে ১৯৮৬ সালে মূল্যবৃদ্ধিতে বিরতি এসে মূল্যস্ফীতি ৭% এ নেমে আসে। কিন্তু মূল্যবৃদ্ধি রোধের এই ঢাকনি শক্তভাবে আটকে রাখা সম্ভ হলোনা। ১৯৮৬ সালে মূল্যবৃদ্ধিতে বিরতি এসে মূল্যস্ফীতি ৮.৮% এবং ১৯৮৮ সালে ২০.৭ এ এসে দাঁড়াল। অর্থনীতি উদারনীতিকরণ পুনরায় শুরু হলে চেপে রাখা মুদ্রাস্ফীতির বিস্ফোরণের সম্ভাবনা রয়েই গেল। বেকারত্ব বৃদ্ধি পেতে শুরু করলো। বেকারদের জন্যে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করেই সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির উৎপাদন ব্যবস্থায় ছড়িয়ে থাকা অদক্ষতা হ্রাসের উদ্যোগ নেয়া হলে এ অবস্থা সৃষ্টি হতে বাধ্য। প্রথমদিকে বেকারত্বের কোনো অস্তিত্ব আছে বলে স্বীকার করা হলোনা। যুগোস্লাভিয়ায় বেকারত্বের পরিমাণ দাঁড়াল ১৫% যা ওইসিডি দেশের তুলানায় দ্বিগুণ এবং তা আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। পূর্ব ইউরোপীয় দেশসমূহ ও যুগোস্লাভিয়ার বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বিশালাকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৮৫-৮৯ এ চার বছরে মার্কিন ডলার ৭১.৭ বিলিয়ন হতে মার্কিন ডলার ১০১.২ বিলিয়নে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত দেশ হাংগেরী, পোল্যান্ড ও যুগোস্লাভিয়ার মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯৮৯ সালে যথাক্রমে ২০.৬ বিলিয়ন, ৪৩.৩ বিলিয়ন এবং ১৯.৭ বিলিয়ন মর্কিন ডলার। চীনের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ আরো দ্রুততরভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৮০ সালের ৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হতে তা ১৯৮৯ সালে ৪৪.৯ মার্কিন ডলারে পরিণত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরো দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংস্কারের সমস্যা সংস্কারের কৌশল হিসেবে যেসব পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে তা পুঁজিবাদের সেকুলার কাঠামোার সাথে সামঞ্জস্যশীলতার কাঁচিতে কেটেই প্রদান করা হয়েছে এবং সে পরামর্শগুলো হচ্ছে: সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনুদ্ধারের জন্যে সরকারি ব্যয় কমাও ও ঋণ সংকোচনের নীতি গ্রহণ কর, বাজারের চাহিদা ও সরবরাহ দ্বারা মূল্য নির্ণীত হতে দাও, আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ সরিয়ে ফেল এবং ব্যক্তি মালিকানা চালু কর। এগুলোর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হলেও আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার মূল্য লক্ষ্য ন্যায়পরতা সমাধিকে ঢেকে দেবে। আবার এ পরিপূর্ণ পুনর্গঠন ও পুনর্বিন্যাস চিরায়ত মূল্যবোধ সমৃদ্ধ চিন্তাদর্শন ব্যতীত সেকুল্যার মূল্যবোধের কাঠামোয় অর্জন করা সম্ভব নয়। সামষ্টিক অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ভারসাম্যহীনতা দূরীকরণের জন্যে সরকারি ব্যয় হ্রাস করা প্রয়োজন। কিন্তু জনকল্যাণ যখন সরকারি ব্যয়ের উপর মূলত নির্ভরশীল তখন এটা করা কঠিন, কেননা সরকারি ব্যয় হ্রাস রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে- বিশেষত যখন ভর্তুকি তুলে নেয়া হবে; চাহিদা ও সরবরাহের স্বাভাবিক নিয়মে মূল্যকে নির্ণীত হতে দেয়া হবে; মজুরি বৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরা হবে এবং ফলে প্রকৃত আয়া হ্রাস পাবে। অধিকন্তু হ্রাসকৃত সরকারি ব্যয়ের সাথে মিলে বিরাষ্ট্রীয়করণকৃত সংস্থাসমূহের ব্যয় কমানোর চেষ্টা বেকারত্ব বাড়িয়ে তুলবে। বেকারদের জন্যে কোনো কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা না থাকলে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরো তীব্র হবে। বিজাতীয়করণ জনগণের আয় ও সম্পদের ন্যায়পরতা অমীমাংসিত প্রশ্নটি আবার জাগিয়ে তুলবে, সোভিয়েত ইউনিয়নে যা ইতোমধ্যে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, সুচারুভাবে পরিকল্পিত এবং যুগপৎ দক্ষতা ও ন্যায়পরতা লক্ষ্য পূরণে সক্ষম পরিবর্তন কৌশল নিরূপন ব্যতিরেকে সংস্কার কতো কঠিন। সেকুলার কাঠামোর আওতায় সমাজতন্ত্রী অর্থনীতিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যবস্থায় রূপান্তরের বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তার করবে। দরিদ্র ও বিত্তহীন জনগণ এভাবে ভোগান্তির সম্মুখীন হবে। অপরাধের মাত্রাও বৃদ্ধি পাবে। কেননা একনায়কবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে অপরাধ রোধের জন্যে নির্যাতনমূলক ব্যবস্থা ছাড়া আর কিছুই থাকেনা। সংস্কারবাদী সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিসমূহ ফলে দ্বৈত সমস্যার সম্মুখীন- কী করে অতীতের বৈষম্য ও অন্যায়পরতাসমূহ দূর করা যায় যা বর্তমান আর্থ-সামাজিক অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে এবং একই সাথে কিভাবে দুর্নীতি ও ভাসরসম্যহীনতা বৃদ্ধি না করে যুগপৎ দক্ষতা ও ন্যায়পরতা বিধান করা যায়। কল্যাণমূলক রাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের কৌশল যা সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহ বর্তমান মডেল হিসেবে গ্রহণ করেছে তা সহায়ক না-ও হতে পারে। কেননা এ ধরনের মডেলের দেশসমূহ পূর্ব ইউরোপীয় দেশের মতো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও ঘাটতির সমস্যায় ভুগছেনা। ভিন্নতর কোনো কৌশল অবলম্বন করা না হলে বর্তমানে সামাজিক গণতন্ত্রের দেশসমূহ যে সমস্যায় ভুগছে পূর্ব ইউরোপীয় দেশসমূহকে তার চেয়ে অধিকতর প্রকট সামষ্টিক ভারসাম্যহীনতা ও অন্যান্য সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। সংস্কার কর্মসূচিতে নৈতিক মাত্রা সংযোজন এবং আমূল আর্থ-সমাজিক পুনর্গঠনের পদক্ষেপ নেয়া না হলে পূর্ব ইউরোপীয় দেশসমূহকে উন্নয়ন তরান্বিত ও ঘাটতি পূরণের জন্যে সম্ভবত বিশালায়তনের ঋণের দিকে ঝুকে পড়তে হবে। এর ফলে জনগণকে আপাততঃ শান্ত রাখা সম্ভব হলেও দীর্ঘ মেয়াদে অন্যান্য জটিল সমস্যার সৃষ্টি হবে, যা বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশসমূহ হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছে। গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রে মার্কসীয় বাঁধন-কষণ নেই। এতে বলপ্রেয়োগের উপর বিশ্বাস বা পুঁজিবাদের অবশ্যম্ভাবী পতনের ধারণা নেই। বরং এ মতবাদ বিশ্বাস করে যে, সমাজতন্ত্র আদর্শ হিসেবে গণতন্ত্র হতে অবিচ্ছেদ্য এবং শান্তিপূর্ণভাবে বিপ্লব ছাড়াই গণতান্ত্রিকভাবে ধাপে ধাপে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব। সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্য অর্জনের জন্যে এর প্রথম দিকের প্রবক্তাগণ অবশ্য উৎপাদন যন্ত্রেও রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার আবশ্যকতার কথা বলেছেন। সুম্পিটার সমাজতন্ত্রের সংজ্ঞা হিসেবে একটি প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিকে চিহ্নিত করেছেন, যেখানে উৎপাদন উপকরণ ও উৎপাদিত পণ্যের নিয়ন্ত্রণ একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের উপর ন্যস্ত। তার সমসাময়িক পণ্ডিত অস্কার ল্যাঞ্জ সমাজতন্ত্রকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার সমার্থক হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে ‘উৎপাদনের প্রধান উপকরণের সামাজিক মালিকানার’ কথা বলেছেন। সোভিয়েত মডেল হতে বিচ্ছেদ জনগণের উপর দমননীতির বিরূপ ফলাফল ও সোভিয়েত উৎপাদন ব্যবস্থার অদক্ষতা লক্ষ্য করে এ উভয় পন্থার উপর হতে গুরুত্বারোপ কমিয়ে আনা হলো। বাজারব্যবস্থা সম্পদের সুষম বন্টন উৎপাদন সংক্রান্ত অন্যান্য সমাধানে সক্ষম বলে প্রতীতি জন্মাল। যেহেতু ধনতন্ত্রের মূল ব্যর্থতা হচ্ছে বন্টন ক্ষেত্রে বৈষম্য ও ভারসাম্যহীনতা, সেহেতু ধনতন্ত্রের মূল ব্যর্থতা হচ্ছে বন্টন ক্ষেত্রে বৈষম্য ও ভারসাম্যহীনতা, সেহেতু ধনতন্ত্রের এই চারিত্রিক ত্রুটি দূরীকরণই হবে সমাজতন্ত্রের প্রধান কাজ। মিশ্র অর্থনীতির মাধ্যমে এ আরাধ্য কাজ সম্পাদন করা সম্ভব বলে ধারণা করা হলো। কেননা এ ব্যবস্থায় পাবলিক সেক্টর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং এ ব্যবস্থা ধনতন্ত্রের চরিত্র উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন করে সমাজতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য কতিপয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এই পদক্ষেপ সমূহ কী হবে সে সম্পর্কে প্রচুর মতভেদ থাকলেও গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের সমার্থক হিসেবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের উপর ভিত্তিশীল কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণার সাথে তা জনগুরুত্বপূর্ণ শিল্পসমূহের জাতীয়করণ, শ্রমনীতি সংস্কার, সামাজিক নিরাপত্তা (বেকার ভাতা, অবৈতনিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবহণ সুবিধা) ইত্যাদি নিশ্চিত করে। বিপরীত পক্ষে বিপ্লব, কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা এবং সকল উৎপাদন উপকরণের রাষ্ট্রীয় মালিকানার সাথে কমিউনিজম সমার্থক পদবাচ্য হিসেবে পরিগণিত হয়। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে হল্যান্ডের ফ্যাবিয়ান সমাজতন্ত্রীগণ এবং জার্মানীর সংশোধনবাদীগণ যে মতবাদ প্রচার করে তার মূল সুর ছিলো ক্রমবিবর্তনবাদের অনিবার্য অনিবার্য বিজয়। বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী তাত্ত্বিকগণ এ ধরণের চিন্তাধারার প্রতি অনাস্থা ও অষন্তোষ প্রকাশ করেন। তাদের মতে ধনবাদী পরিবেশ কাঠামোর মধ্যে ক্রিয়াশীল সংসদীয় গণতন্ত্র ও শ্রমিক ইউনিয়নের সংশোধনবাদী অস্ত্র ব্যর্থ হতে বাধ্য। সংসদ ও শ্রমিক ইউনিয়নসমূহ সমাজের প্রভাবশালী অংশের স্বার্থকেই প্রতিফলিত করে এবং ধনবাদী সমাজে প্রভুত্ব করে বুর্জোয়া শ্রেণী। তাই সংশোধনবাদী অস্ত্রের দ্বারা ধনবাদের পতন ঘটানো সম্ভব নয়। এগুলো ধনবাদী সমাজের কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানসমূহকেই শক্তিশালী করবে। সুতরাং সংশোধনবাদী পন্থা শুধুমাত্র ধনতন্ত্রের অস্তিত্বকেই দীর্ঘায়িত করবে। বিপ্লবীরা কল্যাণ রাষ্ট্রকে তাদের লক্ষ্য হিসেবে স্থির করেনি। তারা প্রকৃত সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্খাকে ধরে রাখল, যেখানে কল্যাণ রাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে বিলুপ্তি ঘটবে শ্রণী বৈষম্যের এবং সকল উৎপাদন উপকরণের রাষ্ট্রীয়করণ ও মজুরি সম্পর্কের অবসানের মাধ্যমে সকল সম্পদের সম বন্টন নিশ্চিত হবে। কিন্তু পূর্বের আলোচনায় দেখা গেছে, এ বৈপ্লবিক দৃষ্টিভংগি মজুরি দাসত্বকে আরো সুদৃঢ় করেছে এবং দক্ষতাকে করেছে খর্ব। তাই এ ধরণের বৈপ্লবিক চিন্তাধারাকে বর্তমানে আর সমাজতান্ত্রিক দলসমূহ রাজনৈতিক মঞ্চ বা মেনিফেস্টো হিসেবে ব্যবহার করছে না, বরং তারা কল্যাণ রাষ্ট্রের চিন্তা দ্বারাই উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। অধিকন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক বৈপ্লবিক পন্থা পরিত্যাগের কারণে দৃশ্যমান ভবিষ্যতে এ মতবাদের নতুন অনুসারী তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তাই পশ্ন দাঁড়ায়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রাষ্ট্রের ভূমিকা বৃদ্ধি ও ধনতন্ত্রের বন্টন ব্যবস্থায় কিছু কসমেটিক পরিবর্তন এনে দারিদ্র্যের অবসান, প্রত্যেকের প্রয়োজন পূরণ, আয় ও সম্পদের সুষম বন্টন তথা আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব কিনা? অথচ ইতিবাচক হতো উদ্বৃত্ত মূল্য বা আয় বন্টনের ক্ষেত্রে অন্যায়পরতা থাকা সত্ত্বেও অন্তত যদি বাজারব্যবস্থা বিভি ন্ন উৎপাদন উপকরণ বরাদ্দের ক্ষেত্রে দক্ষতা দেখাতে পারত। কিন্তু যেহেতু দেখা গেছে যে, বিভিন্ন উৎপাদন উপকরণ বরাদ্দের ক্ষেত্রেও বাজার অর্থনীতি দক্ষতা প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়েছে, তাই এক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র সম্পর্কে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এ সত্যকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে সমাজতন্ত্রী দলসমূহ ক্ষমতা এসেছে। তাদের মুখ্য উদ্দেশ্যসমূহ ছিলো দারিদ্র্য দূরীকরণ, রাষ্ট্র কৃর্তক সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান, সম্পদের অধিকতর সমবন্টন, পূর্ণ কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। এ দলসমূহ যদিও অর্থনীতিতে কতিপয় প্রশংসনীয় সংস্কার প্রবর্তন ও শ্রমজীবীদের জীবনযাত্রার মান উন্ন করতে পেরেছে, তবুও তাদের মূল লক্ষ্যসমূহ অর্জনে তারা ব্যর্থ হয়েছে। এসব অর্থনীতির বিশাল সম্পদের ভিত থাকা সত্ত্বেও এখনো দারিদ্র ব্যাপক, মানুষের প্রয়োজন অপূর্ণ এবং আয় ও সম্পদের বৈষম্য বস্তুত বৃদ্ধি প্রাপ্ত। তাছাড়া ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, ভারসাম্যহীনতা ও অস্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দক্ষতা ও ন্যায়পরতা, উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে চলেছে। আপষকামী নীতি গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের মতাদর্শ সফলতার মুখ দেখতে পায়নি। বাজেট ঘাটতি ও করের গুরুভারের কারণে এর কৌশল ও পদ্ধতি আক্রমণের সম্মুখীন হয়েছে। পরবর্তী পরিচ্ছেদে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এ কারণে আবেদন হারিয়েছে। যেসব দেশে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র শক্তি অর্জন করেছে, সেখানে ‘নব্য ডানপন্থীদের’ পুনরুত্থান ঘটেছে; সমাজতন্ত্র বিরোধীরা ভোটারদের সহানুভূতি লাভ করতে সক্ষাম হয়েছে। ফলশ্রুতিতে ১৯৮৩ এবং ১৯৮৭ সালে বৃটিশ লেবার পার্টি ১৯২৯ সালে চেয়েও প্রকট অর্থনৈতিক মন্দার জন্যে দায়ী রক্ষণশীল দলকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচনে জয়ের জন্যে তিন মিলিয়ন বেকারের ইস্যুকে ব্যবহারে লেবার পার্টির ব্যর্থতার পরিপ্রেক্ষিতে ‘ইকনোমিস্ট’ ঘোষণা করে ক্রমবর্ধমান সরকারি ব্যয়ের সুবর্ণ যুগের বৈপ্লবিক ও উদার দানশীল মতবাদ সমাজতন্ত্রকে এখন পুরাতন ও সেকেলের বলে মনে হয়; সমাজতন্ত্র উত্তর ভবিষ্যতের ইউরোপের কাছে সমাজতন্ত্র আর কোনো আবেদন রাখে না। আবার কতিপয় প্রথম সারির সমাজচিন্তাবিদ সম্পদ ও মুনাফার ব্যক্তি মালিকানাসহ ধনতন্ত্রের মৌল স্তম্ভগুলোর উপর সমাজতন্ত্রীদের আক্রমণের সারবত্তাকে প্রশ্ন করেছেন। ‘ফিউচার অব সোসালিজম’ গ্রন্থে ক্রসল্যন্ড মন্তব্য করেছেন, ‘মালিকানার ভিত্তিতে ধনতন্ত্রের সংজ্ঞা এবং একশত বছর পূর্বে ধনতন্ত্র কল্যাণকর ছিলো কিনা এ প্রশ্ন বর্তমান সকল তাৎপর্য হারিয়েছে, কেননা শুধু মালিকানা দ্বারা এখন আর সামাজিক সম্পর্কের সমগ্র প্রেক্ষাপট নির্মিত হয়না। রাজনৈতিক ব্যবস্থা এ সমাজের আন্তঃসম্পর্ক ও ন্যায়পরতার নিরিখে সমাজকে বিচার করা এখন বরং অধিক প্রাসঙ্গিক। জাতীয়করণ এখন আর গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত নয়। ফলে বৃটিশ এবং বহু ইউরোপীয় সমাজতন্ত্রী দল এখন নামে মাত্র যৌথ প্রথার সমর্থক। সমাজের উন্নয়ন ও দক্ষতার উপর মুনাফর প্রভাব এখন অনেক বেশি গুরুত্ব বহন করে। তাই ক্রসল্যান্ড মন্তব্য করেন যে, ‘এটা চিন্তা করা ভুল যে মুনাফার সাথে পুঁজিবাদের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। পুঁজিবাদ বা সমাজতন্ত্রী যে, কোনো গতিশীল ব্যবস্থার ক্ষেত্রে মুনাফা ব্যবসায়িক কার্যক্রমের জন্যে অপরিহার্য ভিত্তি’। তাই ‘নোভাকের’ মন্তব্যের সাথ একমত হওয়া যায় যে ‘তত্ত্ব ও কার্য উভয় ক্ষেত্রে সমাজতন্ত্রীগণ পশ্চাৎপসরণ করেছে’। এমনকি সুইডেনের অর্থমন্ত্রী কিয়েল আরোফ ফেলট বলেন, আমাদের ধনতন্ত্র বিরোধী দল হিসেবে চিহ্নিত হবার প্রয়োজন নেই। ধনতন্ত্রের অনেক সমস্যা আছে, কিন্তু তার কোনো উপযুক্ত বিকল্প নেই। আর যদি সমাজতন্ত্র সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানা ও মুনাফাকে স্বীকার করে নেয়, তাহলে ধনতন্ত্র থেকে সমাজতন্ত্রের পার্থক্য নিরূপণের কি মানদণ্ড অবশিষ্ট থাকে, বিশেষত যখন গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রে আয়ের বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়ে থাকে ও সামাজিক শ্রেণী বিভক্তি প্রাধান্য বিস্তার করে? এমনকি ডানপন্থীরাও এখন রাষ্ট্র কর্তৃক অত্যাবশ্যকীয় সেবাসমূহের সরবরাহের সমর্থক। ট্রেড ইউনিয়নের প্রতি দৃঢ় সমর্থ তাই গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বেকারত্বের বর্তমান উচ্চহারের কারণে ্‌ট্েরড ইউনিয়ন আন্দোলনের শক্তি বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন এখন আর ‘ক্ষমতার সম্পর্ক বিন্যাসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সমর্থ নয়। তাই উইলিয়াম ফাফ মন্তব্য করেন, উদারননৈতিক বামপন্থী বা রক্ষণশীল বামপন্থী কারো নিকট এখন জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য বৃহৎ কোনো কর্মসূচি নেই। আরভিং হাউই আরো দৃঢ়তার সাথে বলেন, ‘সমাজতন্ত্র দ্বারা এখন ার দারিদ্র্য দূরীকরণ বা শিল্পসমূহের জাতীয়করণ বুঝায়না’। আইনসংগতভাবে ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টায় এক নির্বাচনী রাজনীতির প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ্য রেখে এতো বেশি আপোস করতে হয় যে, তার প্রাণশক্তি ও মৌলিক পরিবর্তন সাধনের নিজস্ব ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে- সেই পরিবর্তন যা চরিত্রকে পাল্টিয়ে দিতে পারে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠী চাইলেই গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রকে সমর্থনের ক্ষেত্রে দোদুল্যমানতা দেখিয়েছে। এ আন্দোলন সুদৃঢ় শেকড় গাড়তে বাধ্য হয়েছে। এখনো এটা জনগণের খেয়াল বা শখের কাছে করুণা প্রার্থী। রক্ষণশীল বা সমাজতন্ত্রী দলের নেতৃত্বের শক্তির উপর এ দলগুলোর বিজয় নির্ভরশীল। জনগণ এ মতবাদের জন্যে দৃঢ় কদমে দাঁড়িয়ে জীবন মরণ লড়াই করতে রাজি নয়, যেমনভাবে তারা করে থাকে ধর্মীয় মতাদর্শের ক্ষেত্রে। জনচিত্তের এ ধরণের দোদুল্যমান অবস্থা কি গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের বিজয়কে নিশ্চিত করতে পারে? অপরদিকে বিপ্লবও কোনো সমাধান নয়। রাশিয়া এবং চীনের বিপ্লব অযুত-লক্ষ লোকের হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, পেছনে রেখে গেছে এমন তিক্ত স্মৃতি যা গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সম্পর্কে সজাগ কোনো মানুষেরই সমর্থন লাভ করতে পারেনা। এমনকি যেসব উন্নয়নশীল দেশে বিপ্লব বা সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে মানবতার যা কিছু আদি অতিহ্য ছিল তার উপর ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। ভাবমূর্তিও বিনাশ কার্যসম্পাদনের নিক্তিতে বিচার করলে দেখা যাবে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র এর লক্ষ্য অর্জনে সাফল্য লাভ করেনি এবং ভস্যিতে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা আসলেও এর অধিকতর সাফল্য লাভের সম্ভাবনা ক্ষীণ। কারণ এর লক্ষ্য এবং দৃষ্টিভংগির মধ্যে সামঞ্জস্যের অভাবের কারণে এ মতবাদ কার্যকর কর্মকৌশল রচনায় ব্যর্থ হয়েছে। ধনতন্ত্রের মতো গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রও রেঁনেসা পরবর্তী সেকুলার দর্শনের ফসল। ধনতন্ত্রের বন্টন ব্যবস্থায় কিছু বাস্তবভিত্তিক পরিবর্তন সাধন করাই গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের একমাত্র সাফল্য। সার ও মাটির কিছু পরিবর্তন ঘটিয়ে লেবুর বীজ থেকে আম ফলানো কখনই সম্ভব নয়। বিশ্ব সম্পর্কে দৃষ্টিভংগির ব্যাপক পরিবর্তন, সর্বোপরি মানুষের চরিত্র ও স্বভাবের মৌলিক পরিবর্তন সাধন এবং কর্মকৌশলের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ব্যতিরেকে সমাজতন্ত্রের মানবতাবাদী লক্ষ্যসমূহ অর্জন কখনই সম্ভব নয়। একটি প্রকৃত সমাধানে উপনীত হবার জন্যে নতুন বৈপ্লবিক চিন্তাধারার পরিবর্তে বামপন্থী চিন্তাধারাকে ‘আমেরিকানবাদের’ ছাঁচে ফেলে দেয়া হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণবাদ বা শান্তিকামীতার মতো ইস্যুর সাথে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রকে সম্পৃক্ত করা একটি প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে। যদিও এগুলোর সম্পৃক্তি অবশ্যই প্রয়োজন, তা সত্ত্বেও শুধুমাত্র এসবের অন্তর্ভুক্তিই মানুষের চাহিদাপূরণ, বৃহত্তর সমতা বা শ্রেণী বৈষম্যের অবসানকে নিশ্চিত করতে পারেনা। বুর্জোয়া দলগুলোও উৎসাহের সাথে এ ব্যবস্থাপত্র নিয়ে জনগণের সম্মুখে আসতে পারে। রায় হেটারসলে তার Economic Priorities for the Labour Government নামক সাম্প্রতিক গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের ভিত্তি কত সংকুচিত রূপ ধারণ করেছে। লেবার পার্টির এক কনফারেন্সে ‘নেইল কিনোক’ পূর্ববর্তী এক পক্ষকালের মধ্যে রক্ষণশীল দুটো দলের উপস্থাপনার মতোই নিখুঁতভাবে ধনতন্ত্রী সামাজিক বাজারনীতির এক এজেন্ডা উপস্থাপন করেন। লেবার পার্টির নেতার মতে, উক্ত দলের লক্ষ্য হচ্ছে ‘রক্ষণশীলদের চেয়েও দক্ষতার সাথে বাজার অর্থনীতিকে পরিচালিত করা’। লেবার পার্টির প্রধান হিসেবে কিনোকের নির্বাচন কার্যত ধনতন্ত্রের আরো উত্তম ব্যবস্থাপনার প্রতি পার্টির অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। ফলে প্রতীয়মান হয় যে, গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র তার লক্ষ্য অর্জন ছাড়াই স্বকীয় ভাবমূর্তি হারিয়েছে।

তৃতীয় অধ্যায়ঃ কল্যাণ রাষ্ট্রের সংকট

তৃতীয় অধ্যায় কল্যাণ রাষ্ট্রের সংকট সামাজিক সুবিচারের বিষয়ে যারা অতিমাত্রায় সচেতন তারা প্রায়ই অনুভব করেন যে, তারা যেন বধিরের সাথে কথা বলছেন। -মাইকেল প্রাউজ পুঁজিবাদী বিশ্বে কল্যাণ রাষ্ট্রের আবির্ভাব একটি ইতিবাচক ও শুভ ঘটনা। মহামন্দা ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণায় গতিশীলতা সৃষ্টি হয়। যুদ্ধ ও মন্দা এবং সমাজতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এ ধারণা ব্যাপ্তি লাভ করে। কল্যাণ রাষ্ট্রের পুঁজিবাদের অতিরিক্ত কুফলগুলো প্রমাণিত করে সমাজতন্ত্রের আবেদন হ্রাস করা। সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষ, শ্রমিক, পুঁজিবাদী নিবিশেষে সবাই এ ধারণা দ্বারা আকৃষ্ট হয়। কল্যাণ রাষ্ট্রের অনেক সমালোচকের মতে কল্যাণ রাষ্ট্র হচ্ছে, ‘শাষক শ্রেনীর কাছ থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ গণমানুষের কাছে ক্ষমতার হাত বদল না ঘটিয়ে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে একটি সামাজিক ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি’। ‘লেইজে ফেয়ার’ পুঁজিবাদে রয়েছে সামাজিক ডারউইনবাদের মমার্থ তথা শক্তিশালীদের টিকে থাকার দর্শন। অপরদিকে কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণার পশ্চাতে এ ব্যবস্থা থেকে সরে আসার কথা বলা হয়েছে। এ বিশ্বাস এতে জয়লাভ করল যে, ব্যক্তিমানুষের কল্যাণ বিধান বাজারব্যবস্থার শক্তিসমূহের ক্রিয়া-বিক্রিয়ার খেয়ালের উপর ছেড়ে দেয়া যায় না। মানুষের দারিদ্র্য ও স্বীয় প্রয়োজন পূরণের অবমতা শুধুমাত্র ব্যক্তি মানুষের নিজস্ব ব্যর্থতা মাত্র নয়, বরং তা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ফল। এ ধারণা, বিশ্লেষণ ও বিশ্বাস অর্থনীতির মূল ধারায় স্বীকৃতি লাভ করল। নিজস্ব ত্রুটির কারণে মানুষ বেকার, অর্ধবেকার বা শ্রমের কম মূল্য পাচ্ছে না, বরং তার অন্য কারণ রয়েছে। তাই সীমিত সামর্থের মানুষদের আধুনিক সমাজে সুন্দর ও দক্ষভাবে বেঁচে থাকার জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গৃহায়ণ, যোগাযোগ প্রভৃতি সামাজিক সু্যোগ সুবিধা প্রদানের দ্বার উন্মোচন করা এবং শিল্প দুর্ঘটনা, অঙ্গহানি ও বেকারত্বের মতো সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার বিরুদ্ধে তাদের সামাজিক প্রতিরক্ষা প্রদান করা প্রয়োজন। কল্যাণ রাষ্টের দর্শন রাষ্ট্রীয় নীতিমালার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসাবে পূর্ণ কর্মসংস্থান এবং সম্পদ ও আয়ের সুষম বন্টনকে নির্ধারণ করেছে। এ দর্শন লেইজে-ফেয়ার পূঁজিবাদী বা কীনেসীয় অর্থনৈতিক মতবাদের বিপরীতে রাষ্ট্রের ব্যাপক ও সক্রিয় ভূমিকার তত্ত্ব প্রচার করল। কল্যাণ রাষ্ট্রের ধরণ এবং কার্যাবলি সম্পর্কে নানা মত রয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও বিশ্লেষকগণ এ সম্পর্কে কোনো ঐক্যমত্যে পৌছুতে পারেননি। দশকের পর দশক যাবত এ বিষয়ে এত বেশি আলোচনা করা হয়েছে যে, টিটমাস কল্যাণ রাষ্ট্রের সংজ্ঞাকে 'অবর্ণনীয় বিমূর্ততা' বলে আখ্যায়িত করেছেন। কল্যাণ রাষ্ট্রের নানা ধরনের বাস্তব উদাহরণ রয়েছে যা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সুইডেন পর্যন্ত বিস্তৃত। কল্যাণ রাষ্ট্র উদারনীতিবাদের দর্শন বা বাজার অর্থনীতির অলঙ্ঘনীয়তার পোশাক ছেড়ে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসতে পারেনি। সেখানে মূল্যবোধ নিরপেক্ষ উদারনীতিবাদের মতাদর্শ অব্যাহত রইল। বাজারব্যবস্থার যে ত্রুটি রয়েছে তা সরকারি হস্তক্ষেপ দ্বারা দূর করা হলে গণতান্ত্রিক সমাজবাদ বিভিন্ন বঞ্চিত উৎপদান খাতে সম্পদের দক্ষ বণ্টন নিশ্চিত করতে সমর্থ হবে বলে ধরে নেয়া হলো। জনগণকে উপযোগিতামূরক দ্রব্য ও সেবা সরবরাহ করা হবে তথা বণ্টন খাতে সরকারের ভূমিকা অগ্রগণ্য হবে। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকল নাগরিক হবে সরকারি সুবিধার অংশীদার। সামাজিক অধিকার হিসেবে প্রথ্যেক ব্যক্তি মানুষের সরকারি সুবিধা প্রাপ্তির নীতি হবে সামাজিক ইনস্যুরেন্স কর্মসূচির ভিত্তি। এ নীতিমালা অনুসরণের যুক্তি হচ্ছে সাধারণ নাগরিক সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ব্যক্তি বিশেষের যোগ্যতা ও প্রাপ্যতা যাচাই বাছাইয়ের জন্য ন্যায়সংগত ভিন্ন কোনো পথ খোলা নেই এবং এর ব্যত্যয় ঘটালে 'প্যারিটো অপটিমালিটি'র মানদণ্ডই লঙ্ঘিত হবে। কৌশল কল্যাণ রাষ্ট্র তাই বাজারব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের কথা বলে না। বরং মনে করা হয় যে, রাষ্ট্রের বৃহত্তম ভূমিকা 'লেইজে-ফেয়ার' পুঁজিবাদ ত্রুটি দূরীকরণ এবং বাজারব্যবস্থার উন্নতি সাধনে সক্ষম হবে। কল্যাণ রাষ্ট্রের বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবহার করে সে লক্ষ্য অর্জন করা যাবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছয়টি প্রধান অস্ত্র হচ্ছেঃ ক. নিয়ন্ত্রণমূলক বিধিবিধান, খ. প্রধান শিল্পসমূহের জাতীয়করণ, গ. শক্তিশালী শ্রমিক আন্দোলন, ঘ. রাজস্ব নীত, ঙ. উচ্চ হারের অর্থনেতিক প্রবৃদ্ধি ও চ. পূর্ণ কর্মসংস্থান। কল্যাণ রাষ্ট্রের লক্ষ্য অর্জনে এ অস্ত্রগুলোর কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন। (ক) নিয়ন্ত্রণমুলক বিধিবিধান দ্রব্যসামগ্রীর মান, শৃঙ্খলা ও প্রতিযোগিতা বজায় রাখা এবং অন্যের অধিকার সংরক্ষণ করার জন্য বেসরকারি খাতকে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা প্রবর্তনেরে জন্য কিছু মানদণ্ড বা ঐকমত্য প্রয়োজন যার ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যায়। যদি এ ধরনের সর্বজনস্বীকৃত মানদণ্ড বা ঐকমত্য না থাকে এবং এরূপ দ্বিধাবিভক্ত সমাজের প্রত্যেক শ্রেণী নিজস্ব স্বার্থে চালিত হতে থাকে, তবে রাষ্ট্রকে নানা স্বার্থের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে মধ্যস্থতাকারী নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা পালন করতে হয়। বিভিন্ন শ্রেনীর মাঝে রাজনৈতিক দরকষাকষির মধ্য দিয়ে সমঝোতামূলক যা কিছু সাব্যস্ত হয় তাই হয় রাষ্ট্রের কার্যাবলী। এ ক্ষেত্রে সর্বজনস্বীকৃত ঐকমত্য না থাকায় ভোটদানে প্রভাববিস্তার, সংবাদ মাধ্যমের উপর আধিপত্য, নির্বাচনী প্রচারণায় অর্থবল, লবিং ক্ষমতা প্রভৃতি যে দল বা শ্রেণীর মধ্যে বেশি, সরকারি নীতি ও নিয়ন্ত্রণ তাদের অনুকূলে চলে যায়। আর্থিক ও সাংগঠনিক ক্ষমতা ও সম্পদ বিভিন্ন স্বার্থের শ্রেণীর মাঝে যেহেতু সমভাবে বণ্টিত নয়, তাই তাদের মাঝে আন্তঃশ্রেণী শক্তির ভারসাম্য বিরাজ করার কথা নয়। অবশ্য স্ট্রেচি, গলব্রেথ ও অন্যান্যের ধারণা বিভিন্ন শ্রেণীর স্বার্থসমূহ একে অন্যকে প্রতিহত করে ন্যায়পরায়নতা আনয়ন করবে। কিন্তু বিভিন্ন শ্রেণীর মাঝে রাজনৈতিক দরকষাকষির মধ্য দিয়ে সমঝোতামৌলক যা কিছেু সাব্যস্ত হয় তাই হয় রাষ্ট্রের কার্যাবলী। এ ক্ষেত্রে সর্বজনস্বীকৃত ঐকমত্য না থাকায় ভোটদানে প্রভাববিস্তার, সংবাদ মাধ্যমের উপর আধিপত্য, নির্বাচনী প্রচারণায় অর্থবল, লবিং ক্ষমতা প্রভৃতি যে দল বা শ্রেণীর মধ্যে বেশি, সরকারি নীতি ও নিয়ন্ত্রণ তাদের অনূকূলে চলে যায়। আর্থিক ও সাংগঠনিক ক্ষমতা ও সম্পদ বিভিন্ন স্বার্থের শ্রেণীল মাঝে যেহেতু সমভাবে বণ্টিত নয়, তাই তাদের মাঝে আন্তঃশ্রেণী শক্তির ভারসাম্য বিরাজ করার কথা নয়। অবশ্য স্ট্রেচি, গলব্রেথ ও অন্যান্যের ধারণা বিভিন্ন শ্রেণীর স্বার্থসূহ এক অন্যকে প্রতিহত করে ন্যায়পরায়নতা আনয়ন করবে। কিন্তু বিভিন্ন শ্রেণীর মাঝে শক্তির দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে দেখা যায়, সরকারি নিয়ন্ত্রণ নীতি ধনী ও শক্তিশালীদের অনুকূলে চলে আসে। কেননা তাদের পক্ষে অর্থ-সম্পদ ও ক্ষমতার দ্বারা প্রচার মাধ্যমকে কাজে লাগানো, নির্বাচনী প্রচারণায় বিপুল অর্থব্যয় ও প্রভাবিত করার অন্যান্য পন্থা অবলম্বন করা সম্ভব হয়। অধিকন্তু সঠিক আইন কাঠামো প্রণয়ন করা হলেও বিধিবিধানের কার্যকারিতার জন্য কেবল রাষ্ট্রীয় শক্তিই যথেষ্ট নয়। এর সাথে প্রয়োজন শক্তিশালী সামাজিক উদ্দীপনা শক্তি যা শুধু নৈতিক চেতনাসম্পন্ন সমাজেই আশা করা যায়। যদি বিধিবিধান মেনে চলার জন্য ব্যক্তি মানুষের মাঝে অভ্যন্তরীণ তাগিদ না থাকে, যত বাঁধনকষণ দিয়ে আইন রচনা করা হোক না কেন, আইনকানুন ফাঁকি দেবার বা ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাবার জন্য মানুষ ছলেবলে চেষ্টা করে যাবে। সমাজের সামগ্রিক স্বার্থে ব্যক্তিস্বার্থকে ত্যাগ করার নৈতিক চেতনা ও মূল্যবোধ এবং লক্ষ্য সম্পর্কে ঐকমত্য ছাড়া আর্থ-সামাজিক ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শুধুমাত্র রাষ্ট্র ও প্রশাসন যন্ত্রের শক্তির সাহায্যে আইন ও বিধিবিধান প্রণয়ন ও তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যাবে বলে প্রত্যাশা করা আসলে একটি ভ্রান্তিবিলাস মাত্র। সেকুলার মতবাদ যা কল্যাণ রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি তাতে লক্ষ্য সম্পর্কে ঐকমত্য ও নৈতিক চেতনা- এ উভয় শক্তিকেই অস্বীকার করা হয়েছে। পুঁজিবাদী সমাজের বিত্তশালী ও ক্ষমতাশালী শ্রেনীও সমাজতন্ত্রের অগ্রযাত্রার মুখে বিকল্প হিসেবে কল্যাণ রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থাকে সমর্থন করে থাকে। কিন্তু পরবর্তীতে কল্যাণ রাষ্ট্র যখন রাজস্ব সংকটের মুখে পড়ল, তখন ব্যবসায়ী শ্রেণী রক্ষণশীল সরকারের সাথে হাত মিলিয়ে বিধিবিধান শিথিলকরণের পক্ষে আওয়াজ তুলল। তারা যুক্তি দেখাল যে, বিধিবিধানের নিগড়ে অর্থনীতির স্বাচ্ছন্দ্য ও গতিশীলতা হ্রাস পায়, সরকারি ও বেসরকারি ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এতে সুস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে যে, আর্থ-সামাজিক সুবিচারের প্রতি সুদৃঢ় সামাজিক অঙ্গীকার এবং ঐকমত্যসম্মত মূল্যবোধের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে ন্যায়সংগত হিস্যা অন্যকে দেবার স্পৃহা ও প্ররণা ছাড়াই ইনসাফ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে য়িন্ত্রণমূলক বিধিবিধানের বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। রাজনৈতিক হাওয়া বদলের চাপে আইনকানুন যাই প্রবর্তন করা হোক না কেন, সময় ও ভিন্ন পরিস্থিতিতে ক্রমশ তা তার কার্যকারিতা হারাবে। (খ)জাতীয়করণ বড় বড় শিল্পসমূহ জাতীয়কাণের দাবিও ক্রমশ তার আবেদন হারিয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পসমূহের অদক্ষতা এবং এসব প্রতিষ্ঠানের লোকসান কাটিয়ে ওঠার জন্যে বিপুল ভর্তুকি জাতীয়করণের প্রতি মোহমুক্তি ঘটিয়েছে। উপরস্তু রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে বাজারব্যবস্থা দ্বারা নির্ণীত ও সংকটের কারণে সরকারি কোষাগারের পক্ষে এরূপ ভর্তুকির জন্যে অর্থ যোগান দেয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক পছন্দের চেয়েও সংকট কবলিত সরকারি অর্থব্যবস্থার প্রয়োজনেই বিশ্বব্যাপী ডান-বাম উবয় শিবিরেই বিরাষ্ট্রীয়করণের ধারা সূচিত হয়েছে। কোনো না কোনো বিরাষ্ট্রীয়করণ কর্মসূচি পশ্চিম ইউরোপে চালু হয়েছিল এবং এ ধারা জাপান, ভারত, লাতিন আমেরিকা, কানাডা, আফ্রিকা, এমনকি চীন, পূর্ব ইউরোপ ও সোভিয়েত ইউনিয়নে ছড়িয়ে পড়েছে। স্পেনের প্রথম সমাজতান্ত্রিক সরকারের আমলেই বিরাষ্ট্রীয়করণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৯৭৯ সালে রক্ষণশীল সরকার বৃটেনে যে বিরাষ্ট্রীয়করণ কর্মসূচি শুরু করে, তাতে ১৯৮৮ সালের মধ্যে সরকারি কোষাগারে ১৭বিলিয়ন ডলারের অধিক জমা পড়ে। পরবর্তী ৩ বছরে এর পরিমাণ ৩৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে বলে ধারণা করা হয়। ১৯৭৯ সালে জাতীয় আয়ে রাষ্ট্রীয়করণ নীতি ভবিষ্যতে আরো বেগবান হবে। (গ) শ্রমিক আন্দোলন ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন, যাকে শ্রমিকের আয় বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধানের মহৌষধ মনে করা হতো, মুদ্রাস্ফীতি ও বেকার সমস্যার উর্ধগতির কারণে তা গতি হারিয়ে ফেলল। ক্রমাগত মজুরি বৃদ্ধিকে ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতির জন্য দায়ী করা হলো। মজুরি হারের ক্ষেত্রে অনমনীয়তাকে বেকার সমস্যার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হলো। ফলে অনেক শিল্পোন্নত দেশে ট্রেড ইউনিয়নের জনপ্রিয়তা বিপুলভাবে হ্রাস পেল। শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর সাথে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিকদের সম্পৃক্ততা হারিয়ে গেল। বৃটেনে যেখানে শ্রমিক আন্দোলন সবচেয়ে বেশি শক্তিশালীভাবে দানা বেধে উঠেছিল, সেখানে শ্রমিকদের বৃহদাংশ আর ট্রেড ইউনিয়নের সাথে সংযুক্ত রইল না। বৃটিশ শিল্প শ্রমিক ইউনিয়নে সদস্য পদ ২৪% কমে গেল, যখন চাকরির পরিমাণ কমলো ১৩%। বৃটিশ ট্রেড ইউনিয়নগুলোর কনফেডারেশনের বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৪০% এর কম; যারা সদস্য তারাও সক্রিয় নয়। তৃণমূল পর্যায়ে সম্পৃক্ততা শিথিল হয়ে গেছে। শ্রমিকরা ইউনিয়নের সাথে থাকার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে। দেখা যায়, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন তার শক্তিশালী দুর্গের মধ্যেও দুর্বল হয়ে পড়েছে। পশ্চিম জার্মানী, জাপান ও ফ্রান্স যেখানে মাত্র ১৯% শ্রমিক ইউনিয়নের সাথে সম্পৃক্ত সেখানকার অবস্থা আরো করুণ। বর্তমান বেকার সমস্যার মুখে নিকট ভবিষ্যতে শ্রমিক ইউনিয়নের পুনরুদ্ধার সম্ভাবনা খুবই কম। শুধুমাত্র সরকারকেই দায়ী করা যথার্থ নয়। কেননা শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর বাড়াবাড়িও অনেকটা দায়ী। কিছু সংখ্যক শ্রমিক নেতার ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার প্রবণতা, তাদের অতিরিক্ত দাবিদাওয়ার ফলে সৃষ্ট সামাজিক বিরূপ প্রতিক্রিয়া শিল্পপতিদের নিকট হতে সহযোগিতা ও জনসমর্থনের ভিতকে ধসিয়ে দিল। আর্থ-সামাজিক ন্যায়নীতির প্রতি বিশ্বাসের কারণে শিল্পপতিগণ ট্রেড ইউনিয়নসমূহকে মেনে নেয়নি। বরং শ্রমিক ইউনিয়নগুলো স্থিতিশীল শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক সৃষ্টিতে অবদান রেখে শিল্পপতিদের উপকারে আসবে- এ বিশ্বাস থেকে তারা শ্রমিক ইউনিয়নকে মেনে নিয়েছিল। শ্রমিক ইউনিয়ন ও মালিক পক্ষের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি উভয় পক্ষের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল, সমধর্মী শিল্পসমূহে একই ধরনের মজুরি কাঠামো নির্ধারণে এ চুক্তি সহায়ক ছিল এবং এ চুক্তির মেয়াদের মধ্যে কোনোরূপ ধর্মঘটের কোনো অবকাশ ছিল না। ট্রেড ইউনিয়ন এভাবে অর্থনৈতিক গতি-প্রকৃতি ও স্থিতিশীলতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখল বা প্রকারান্তরে পুঁজি গঠন ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হলো। কিন্তু ট্রেড ইউনিয়নের নেতৃত্বের দুর্নীতি এবং ধর্মঘটের সংখ্যাধিক্যে শিল্পপতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের মাঝে গড়ে ওঠা সমঝোতা ও সামাজিক চুক্তি ভেঙে পড়ল। ১৯৭৮-৭৯ সালের প্রবল অসন্তোষের সময় বৃটেনে এতবেশি ধর্মঘট সংঘটিত হলো যে, তাতে জনগণের দুর্দশা চরমে উঠল এবং ধর্মঘটের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠল। মিসেস থ্যাচারের রাজনৈতিক উত্থানের পশ্চাতে এটাও একটি কারণ। শ্রমিক ইউনিয়নগুলো প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধিতে কোনো অবদান রাখতে পেরেছিল কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে। ১৯৪৭-১৯৬৭ এ দুই দশকে এ হার আর বাড়েনি। ১৯৮৭ সালে প্রকৃত মজুরির হার ছিল ১৯৬৮ সালের মজুরির অনুরূপ। ১৯৮১ সাল থেকে ঘন্টা প্রতি ন্যূনতম মজুরি হার ৩.৩৫ ডলারে অপরিবর্তিত রয়েছে। রক্ষণশীল নীতির প্রবল জোয়ার এবং নিম্নতম মজুরি হার নির্ধারণের আইনের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন হ্রাসের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমিক ইউনিয়ন মজুরি হারে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি আনয়নে সমর্থ হয়নি। মুদ্রাস্ফীতির ফলে গত এক দশকে মজুরি ৪.২৫ ডলারে বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত তা পুষিয়ে দিতে পারেনি, কারণ ন্যূনতম ৪.২৫ ডলার মজুরি বৃদ্ধির প্রয়োজন ছিল। নিম্নতম মজুরির প্রকৃত মূল্য যদি এভাবে হ্রাস পেতে থাকে, তবে নিম্নতম মজুরির আইনের চেয়ে মুদ্রাস্ফীতির দাপটই অধিক প্রমাণিত হবে। (ঘ) রাজস্বনীতি সরকারি ব্যয় রাজস্বনীতি কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠল। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাজস্বনীতি অঙ্গ হিসেবে সরকারি ব্যয়, প্রগতিশীল করব্যবস্থা ও সরকারি ঋণকে ব্যবহার করা হলো। প্রতিরক্ষা, জনপ্রশাসন ও কতিপয় সেবা সরবরাহের মতো গতানুগতিক ক্ষেত্রে সরকারি ব্যয়কে লেইজে-ফেয়ার রাষ্ট্র ব্যবস্থাও স্বীকার করে নিয়েছে। কল্যাণ রাষ্ট্রে সরকারি ব্যয়ের পরিসীমাকে প্রসারিত করা হয়েছে, যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা ও অধিকতর আয়-ন্যায়পরায়নতা অর্জিত হতে পারে। এসব লক্ষ্য অর্জনে ক্রমবর্ধমান সরকারি দায়িত্বের পরিপ্রেক্ষিতে পঞ্চাশ বছরে সরকারি ব্যয় ও কর রাজস্বের মাত্রা বিপুলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বেকার ভাতার মতো সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা (Social Security Benefit), বয়স্ক ভাতা ও শিশু কল্যাণ ভাতার ন্যায় সামাজিক সাহায্য, অনুদান, খাদ্য ও জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে ভর্তূকি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গৃহায়ন, যানবাহন প্রভৃতি গণসেবা সরবরাহের কারণে সরকারি ব্যয়ের মাত্রা তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত উপযুক্ত সেবাসমূহ শুধুমাত্র গরীবদের প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সমাজের অন্যান্য শ্রেণীকেও বর্তমানে এগুলো সরবরাহ করতে হয়। ওইসিডি দেশসমূহে ১৯৬০ সাল হতে ১৯৮২ সালের মধ্যে জাতীয় আয়ের অংশ হিসেবে সরকারি ব্যয় গড়ে ১৫% বৃদ্ধি পেয়ে ৪১.৩% এ দাঁড়য়েছে। ১৯৮৮ সালে তা ৪০% এ নেমে আসে। ১৯৮২ সালে নেদারল্যান্ডস ও সুইডেনে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে যথাক্রমে জাতীয় আয়ের ৭২% এবং ৬৬% এ পৌছে। ১৯৮৮ সালে তা ৫৮% এবং ৫৯% এ হ্রাস পায়। সরকারি ব্যয় ছিল সর্বনিম্ন পর্যায়ে সুইজারল্যান্ডে (জাতীয় আয়ের ৩০%)। যুক্তরাষ্ট্র সুইডেনের মতো কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণার সাথে ততবেশি সম্পৃক্ত না হলেও সরকারি ব্যয় ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। ১৯৪০ সালে সরকারি ব্যয়ের মাত্রা ছিল জাতীয় আয়ের ১০%, তা ১৯৮৬ সালে ৩৭% এ পরিণত হয়। ১৯৮৮ সালে সরকারি ব্যয় সামান্য কমে ৩৬.৩% এসে দাঁড়ায়। শুধুমাত্র মন্দা ও বেকারত্বের সময় সরকারি ব্যয় বেড়েছে তা নয়, বরং পূর্ণ কর্মসংস্থানের সময়েও সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে হয়। তাছাগা ভোগ্য সামগ্রীর ক্ষেত্রে যে প্রত্যাশার বিস্ফোরণ ঘটেছে, অধিকতর অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছাড়া তা পূরণ করা সম্ভব নয়। ওইসিডি দেশসমূহের সরকারি ব্যয় কাঠামোতে দু'টি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। একটি হচ্ছে প্রতিরক্ষা খাত ও কল্যাণমূলক সামাজিক সেবা দানের ক্ষেত্রে ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি বিনিয়োগ ব্যয় হ্রাস। অপরটি হচ্ছে সামগ্রিক ব্যয় হ্রাসের ক্ষেত্রে অস্থিতিস্থাপকতা। যেহেতু অধিকাংশ দেশে প্রবৃদ্ধির হার বেকরত্বের হারের চেয়ে বেশি নয়, সরকারি ব্যয় হ্রাসের যে কোনো পদক্ষেপ সামাজিক বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতা জন্ন দেবে। এসব কারণে সরকারি ব্যয় সকল মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। অবশ্য সরকার ব্যয় হ্রাসের জন্য চাপের সম্মুখীন হচ্ছে। কিন্তু আর্থ-সামাজিক লক্ষ্যসমূহের আলোকে অগ্রাধিকার নির্ধারণ ছাড়াই সরকার যখন যেখানে সুবিধা সেখানে সরকারি ব্যয় কাটছাঁটের নীতি অনুসরণ করেছে। তবে তাও বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আসল জায়গায় কাটছাঁট না করে কম গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কাটঁছাটের প্রবণতাটাই লক্ষণীয়। সরকারি ব্যয় হ্রাসের খাত নির্ধারণ করতে গেলে সরকারি বিনিয়োগ ব্যয় এবং ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে কল্যাণ খাতে ব্যয় হ্রাস করার প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত হয়ে পড়ে। তবে দেশের প্রবৃদ্ধি সম্ভাবনা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক সমর্থন ব্যাহত না করে এরূপ সরকারি ব্যয় হ্রাসের কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহত রাখা সম্ভব নয়। তাই দেখা যায় বিপরীতটাই ঘটেছে। এসব কারণে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অনেক দেশের সরকারের পক্ষে বিশাল সরকারি ব্যয় হ্রাস করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। পূর্ব-পশ্চিমের উত্তেজনা হ্রাসের ফলে শান্তির ফসল হিসেবে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় হ্রাস পেয়েছে, সম্পদের অবমুক্তি ঘটেছে। অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে সেই অবমুক্ত সম্পদের সঞ্চালনের ফলে উৎপাদন দক্ষতা ও ন্যায়পরায়নতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সাধারণভাবে সবাই যা অনুভব করেছে নিউইয়র্ক টাইমসের সাম্প্রতিক এক সম্পাদকীয় ভাষায় তা হচ্ছে, 'পেন্টাগণ ব্যয় হ্রাস সমীচীন বলে মনে করলেও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তা করতে অনীহা প্রকাশ করবে যতক্ষণ না তারা নিশ্চিত হবেন যে, এতে পেন্টাগণের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হবে না'। এতে দেখা যায়, পেন্টাগণের বিশাল বাজেটের ব্যয় হ্রাস চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর স্বার্থেই করা হয় না। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গবেষণা, অবকাঠামো পরিবেশ প্রভৃতি খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দের মাধ্যমেও সামগ্রিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা সম্পাদন করা সম্ভব। কিন্তু কতিপয় বিশাল কর্পোরেশন যারা প্রভূত রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী তারা অধিকতর সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার পক্ষপাতী। কৃষি খাতে ভর্তুকি কৃষি পণ্যের দাম উর্ধমুখী রাখার মাধ্যমে বৃহৎ কৃষকদের সহায়তা করে এবং খাদ্যশস্যের উচ্চমূল্যের দ্বারা দরিদ্র জনগণকে ক্ষতিগ্রস্থ করে। কৃষিতে এ ভর্তুকির মাত্রা হ্রাস করা হলে সার্বিক অর্থনীতি লাভবান হবে। কিন্তু ওইসিডি দেশসমূহে ভর্তূকির পরিমাণ বেড়েই চলেছে। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৬ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে কৃষি ভর্তূকি ১৪.৭% থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৩৫.৪%, ইউরোপীয়ান কমিউনিটিতে ৪৪.৩% থেকে ৪৯.৩% এবং জাপানে ৬৪.৩% থেকে ৭৫%। ফলে করদাতাদের উপর যে বিপুল চাপ সৃষ্টি হয়েছে তার পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। জাপানে ভর্তূকির পরিমাণও প্রায় সমপরিমাণ। সম্প্রতি কৃষি সেক্টরে সংস্কার সত্ত্বেও ইইসিতে কৃষি ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। খাদ্যদ্রব্যের উচ্চ মূল্য এবং উৎপাদনে অদক্ষতা বিবেচনা করলে এ খাতে পরোক্ষ ব্যয় আরো বেশি দাঁড়াবে। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান হতে দেখা যায়, ওইসিডি দেশসমূহের করদাতা ও ভোক্তাদের কৃষি খাতে ভর্তুকি হিসেবে প্রতি বছর ২৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দিতে হচ্ছে। ফাইন্যানসিয়াল টাইমসের এক সম্পাদকীয়তে দুঃখ করে বলা হয়েছে যে, কতিপয় বিশালাকৃতির কৃষি খামারের জন্য অগণিত মানুষকে বিশাল ভর্তুকির ভার বহন করতে হচ্ছে। কিন্তু শিল্পোন্নত দেশেসমূহের রাজনীতিবিদগণ বৃহৎ কৃষি খামারসমূহের রাজনৈতিক আধিপত্যের কাছে এমনভাবে বন্দী যে, কৃষি ভর্তুকি সম্পর্কে উদ্বেগ ও আশংকার কোনো দৃষ্টিগ্রাহ্য ফলাফল আশা করা যায় না। উচ্চমাত্রার কর এবং ঘাটতি সরকার কর্তৃক কর আদায় বা ঋণ গ্রহণ বৃদ্ধির মাধ্যমেই সরকারি ব্যয় বাড়ানো যেতে পারে। ওইসিডি দেশসমূহে করের পরিমাণ ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ছে। এ দেশসমূহে ১৯৬০ সালে যে করের পরিমাণ ছিল জাতীয় আয়ের ২৭.৭%, তা ১৯৮৮ সালে ৩৮.৪% এ পরিণত হয়েছে। সর্বোচ্চ মাত্রা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ২৯.৮% ও তুরস্ক ২২.৯%। ফলে 'Welfare State Backlash' অভিধায় অভিষিক্ত কর-বিরোধী এক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। যেহেতু এ Backlash এর কারণে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির সাথে সাথে কর বৃদ্ধি করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই ঘাটতি পূরণের জন্য ঋণ গ্রহণের উপর সরকারকে অধিকতর নির্ভরশীল হতে হয়েছে। ১৯৬০ সালে ওইসিডি দেশসমূহের বাজেট উদ্বৃত্ত ছিল জিডিপির ১.৩%। ১৯৮৪ সালে বাজেট ঘাটতি দাঁড়ায় জিডিপি'র ২%। বড় বাজেট ঘাটতির নানা প্রতিক্রিয়া রয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি, উচ্চ সুদের হার এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ নিরুৎসাহ বাজেট ঘাটতির অন্যতম বিরূপ প্রতিক্রিয়া। বাজেট ঘাটতি সরকারি সুদ পরিশোধের পরিমাণও বাড়িয়ে দেয়। ১৯৭৫ সালে সরকারি সুদের পরিমাণ ছিল সরকারি ব্যয়ের ৫%, যা ১৯৮২ সালে ১০% এ বৃদ্ধি পেয়েছে। যেহেতু সরকারি ঋণ বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে, তাই সুদের হার যদি হ্রাস পেত তবে ঋণের ভার কিছুটা লঘব হতো। কিন্তু ১৯৮৮ সাল হতে সুদের হার বেড়েই চলেছে। ক্রমবর্ধমান সরকারি ব্যয় যোগান দেবার জন্য উচ্চহারের কর ও ঋণের দ্বারস্থ হওয়া তাই সকল কল্যাণ রাষ্ট্রে সরকারি ব্যয়-ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়নের একটি সমস্যাকীর্ণ ও অস্বাস্থ্যকর দিক হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এ ঘাটতি আরো বেসরকারি খাতের সঞ্চয়কেই শুধু শুষে নেয়া হয়নি, বরং বৈদেশিক ঋণেরও দ্বারস্থ হতে হয়েছে। এর ফলে শুধুমাত্র বেসরকারি খাতের বিনিয়োগই ব্যাহত হয়নি, প্রথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে ঋণগ্রস্থ দেশে পরিণত হয়েছে। যদি ঘাটতি অব্যাহত থাকে তবে বিদেশী পুঁজি আকর্ষণের জন্য সুদের উচ্চ হার বজায় রাখতে হবে যা শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও চলতি হিসেবকেই ক্ষতিগ্রস্থ করবে না, অন্যান্য দেশসমূহ, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশকেও ক্ষতিগ্রস্থ করবে। সুদের হার বৃদ্ধির ফলে এদর ঋণের সুদ পরিশোধের বোঝা বেড়ে যাবে এবং অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় হতে উন্নয়নের অর্থ যোগান দেয়া কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে। অসম ভর্তুকি সরকারি ব্যয়, করের বোঝা ও ঘাটরিত পরিমাণ লাফিয়ে বেড়ে চললেও কল্যাণ রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য-আয় ও সম্পদের বৈষম্য হ্রাস পেল না। বস্তুত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সকল প্রতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে অক্ষুন্ন রেখে, সরকারি ব্যয়ের মাধ্যমে বৈষম্য হ্রাস সম্ভব নয়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পরিচালিত সমগ্র উৎপাদন ব্যবস্থা সবার প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে সীমিত সম্পদের সঠিক ব্যবহারের নীতির বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়। মানুষের আচরণ, প্রয়োজন, লক্ষ্য ও মূল্যবোধ কী হওয়া উচিত সমাজে তা নির্ধারিত না থাকার ফলে কল্যাণ রাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদী সরকারি ব্যয়ের পরিকল্পনা রচনা সম্ভব হয় না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভর্তুকি প্রাপ্ত বিভিন্ন দ্রব্য ও সেবা খাতে সরকারি ব্যয় হতে যে সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি হয়, ধনী ও গরীবের তা হতে সমান ফায়দা আদায়ের সুযাগকে ইনসাফপূর্ণ নীতি বলঅ যায় না। ধনীর মোকাবিলায় গরীবকে সাহায্যের মাধ্যমে বৈষম্য হ্রাসের যে লক্ষ্য অর্জন সরকারি ব্যয়ের মাধ্যমে হওয়ার কথা, তা সাধিত হয়নি। অথচ সরকারি ব্যয়ের বোঝা সাধ্যের অতিরিক্ত হারে বেড়ে চলেছে। কল্যাণ সুবিধা পাওয়ার প্রকৃত যোগ্যতা এবং সরকারি খরচে ধনীদের কল্যাণ সুবিধা প্রদানের সামাজিক ব্যয় যদি সঠিকবাবে বিবেচনা ও নির্ধারণ করা হতো, তবে সম্ভবত একই বা কম সরকারি ব্যয় হতে গরীবদের জন্য অধিকতর সুবিধা সরবরাহ করা সম্ভব হতো। সুতরাং, দেখা যায় পুঁজিবাদী কাঠামোর মধ্যে বৈষম্য হ্রাসের লক্ষ্যে যেসব এডহক ভিত্তিক কল্যাণধর্মী কর্মসূচি নেয়া হয়েছে, সেসবের কিছু কিছু ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। জুলিয়ান লি গ্রান্ড সমাজের সামগ্রিক বৈষম্য কাঠামোর উপর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গৃহায়ন ও যানবাহন খাতে সরকারি ব্যয়ের ফলাফল পরীক্ষা করে দেখেছেন। তাতে সরকারি ব্যয়ের প্রতি চারটির মাঝে একটি দ্বারা গরীবের চেয়ে ধনীরাই অধিক উপকৃত হয়েছে বলে দেখা গেছে। ফলে সরকারি ব্যয়ে ধনী ও দরিদ্রের মাঝে তারতম্যমূলক সুবিধা গ্রহণের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বৈষম্য উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়নি। জুলিয়ান গ্র্যান্ড উপসংহারে উপনীত হন যে, কল্যাণ রাষ্ট্রের গৃহীত বৈষম্য হ্রাসের কর্মসূচিসমূহ ব্যাপকভাবে ব্যর্থ হয়েছে এবং জোড়াতালি দেয়া কোনো কর্মসূচির সাহায্যে অবস্থার আর উন্নয়ন সম্ভব নয়। সার্বজনীন সুবিধা প্রদানের প্রবক্তা রিচার্ড লিটমাস বিনামূল্যে প্রদত্ত বৃটেনের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা কর্মসূচির ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে মন্তব্য করেছেন যে, উচ্চ আয়ের লোকেরাই জানে এ সুবিধার সর্বোচ্চ সুযোগ কীভাবে নিতে হবে। ধনীরা বিশেষজ্ঞদের নিকট হতে পরামর্শ ও সেবা বেশি পেয়ে থাকে এবং উন্নত যন্ত্রপাতি ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সমৃদ্ধ হাসপাতালের অধিকাংশ সিট তারাই পায়। মোটকথা বিশেষজ্ঞ শল্যচিকিৎসা, মাতৃসেবা ,মনোবিজ্ঞান চিকিৎসা ক্ষেত্রের সকল বিষয়ে দরিদ্র শ্রেণী থেকে ধনিক শ্রেণীই অধিক সুবিধা আদায় করতে পারে। গরীব মানুষেরা নিম্নমানের চিকিৎসা সুবিধা পায় এবং লাইনের শেষ মাথায় এসে তাদের দাঁড়াতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রেও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে শ্রেণী বৈষম্য হ্রাস পায়নি। সমাজের নিম্নশ্রেণীর অবস্থার কোনো উন্নয়ন ঘটেনি, বরং সুবিধাভোগী উচ্চ শ্রেণীর অবস্থার আরো উন্নতি ঘটেছে। বেশ কিছু সমীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ হতে দেখা গেছে, সাধারণ ভর্তুকি গরীবদের চেয়ে ধনীদের ভাগেই বেশি সুবিধা বয়ে আনে। ১৯৭৪ সালে নির্বাচনে বিজয়ের পর বৃটেনে শ্রমিকদল রুটি, দুধ, মাখন,পনির ময়দা ও চায়ের উপর যে ভর্তুকি প্রদানের প্রথা চালু করে তা পর্যবেক্ষণ করে উইট এবং নিউবোল্ড দেখিয়েছেন যে, এ খাদ্য ভর্তুকি নিম্নবিত্তদের চেয়ে উচ্চ বিত্তশালীদেরই বেশি সুবিধা প্রদান করেছে। সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহে খাদ্য ভর্তুকি নিম্নবিত্তদের চেয়ে উচ্চ বিত্তশালীদেরই বেশি সুবিধা প্রদান করেছে। সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহে খাদ্য ভর্তুকি ব্যাপক। গিয়র্গী ঝাকোলঝাই সরবরাহে হাংগেরীয় ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে তিনি দেখিয়েছেন যে, খাদ্য ভর্তুকির পরিমাণ বিশাল হলেও তার সামগ্রিক প্রভাব তুলনামূলকভাবে গরীবের স্বার্থের প্রতিকূলে। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পসমূহের দ্রব্যসামগ্রীর মূল্য কম রাখায়ও একই অসম ফল পাওয়া গেছে। লি গ্রান্ড দেখিয়েছেন, যেহেতু ধনীরা গ্যাস, ইলেকট্রিসিটি, কয়লা, ডাক ও টেলিফোন অধিক ব্যবহার করে, বৃটেনে সত্তর দশকে মুদ্রাস্ফীতি রোধের জন্য এসবের উপর প্রদত্ত ভর্তুকির মাধ্যমে গরীবের চেয়ে ধনীরাই বেশি উপকৃত হয়েছে। তাই দেখা যাচ্ছে, কল্যাণ রাষ্ট্রে বিনামূল্যে বা ভর্তুকির মাধ্যমে কম মূল্যে দ্রব্য সামগ্রী সরবরাহ সম্প্রসারণ দরিদ্রের চেয়ে ধনীদেরই বেশি লাভবান করেছে। বৈষম্য তাই বরং বেড়েছে। প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা কল্যাণ রাষ্ট্রের রাজনীতির অপর অঙ্গ প্রগতিশীল করব্যবস্থাও অধিকতর কোনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারেনি। প্রথম দিকে বৈষম্য হ্রাসের ক্ষেত্রে প্রগতিশীল করের প্রতি বিশ্বাস এত প্রবল ছিল যে, হেনরি সীমনস দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, 'তাই আমি বলব.... বৈষম্য হ্রাসের জন্য প্রগতিশীল করব্যবস্থা শুধুমাত্র কার্যকর ও সক্ষম পদ্ধতিই নয়, বরং এটিই একমাত্র উপযুক্ত ব্যবস্থা যা এ যাবত প্রণয়ন করা হয়েছে। যে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা আমাদের কাম্য, অন্য সব ব্যবস্থা তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়'। প্রগতিশীল করব্যবস্থা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হলো, কেননা এটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাথে মৌলিক কোনো পার্থক্য সৃষ্টি করে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, তা প্রগতিশীল কর বৈষম্য হ্রাস করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি সমীক্ষা হতে দেখা যায় যে, কর কাঠামোয় প্রগতিশীলতার একটি আবরণ থাকলেও নানা ছাড়, রেয়াত, অব্যাহতি ও সুবিধা প্রদান এ ব্যবস্থার কার্যকারিতাকে ভোতা করে দিয়েছে। কর হতে বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রীর অব্যাহতি প্রদানের ব্যবস্থা রাজস্ব হ্রাস করে এবং সম্ভবত কর ব্যবস্থাকেও ন্যায়নীতির পরিপন্থী করে তোলে। স্ট্রেয়ার অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, সাধারণভাবে আয়করকে আয় পুনর্বণ্টনের হাতিয়ার হিসেবে যেরূপ কার্যকর মনে করা হয়, আয়কর বর্তমানে যেভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, তাতে তার সেই কার্যকারিতা থাকছে না। অন্যান্য অনেক সমীক্ষা অনুরূপ উপসংতারে উপনীত হয়েছে। পেচম্যান আরো অগ্রসর হয়ে বলেছেন যে, কর্পোরেট ট্যাক্সের উপর কম এবং বেতন ও মজুরির উপর অধিক আয়কর আরোপের নির্ভরশীলতার কারণে গত ২০ বছরে করব্যবস্থা অধিক নিপীড়নমূলক হয়ে পড়েছে। British Institute of Fiscal Studies এর এক সাম্প্রতিক সমীক্ষা হতে দেখা যায় যে, ১৯৭৯ সাল হতে বৃটেনের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য কর-ভার লাঘবের জন্য রেয়াত পাবার এক জটিল পদ্ধতি উদ্ভাবন করে নিয়েছে। করব্যবস্থার নানা ফাঁকফোকর ও অসামঞ্জস্যতাকে ব্যবহার করে ধনীরা ধনীই থেকে যায়। ফলে সাধারণভাবে এ ধারণাই বদ্ধমূল হয়েছে যে, প্রগতিশীল কর কোনো কোনো দেশে তা উল্টো দিকে চালিত হয়েছে। যথাযথভাবে প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা হলে করব্যবস্থার আয়ের পুনর্বণ্টন ন্যায়পরায়নতা আনয়নে বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও কল্যাণ রাষ্ট্রের ব্যয় বৃদ্ধির চাপে আয় ন্যায়পরায়নতামুখী সংস্কারের পরিবর্তে আয়কর ও কর্পোরেট কর হার হ্রাসের দাবি উঠল। পুনর্বণ্টন করব্যবস্থা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্থ করে মর্মে দাবি করা হলো। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৮৬ সালের কর সংস্কার আয়কর হারকে হ্রাস করে এমন পর্যায়ে নামিয়ে আনলো যা ১৯২০ সালের পর আর এরকম দেখা যায়নি। ফল দাঁড়াল এই যে, যখন পূর্বে অন্তত বাহ্যিক আবরণ হতে আয়-ন্যায়পরায়নতা অর্জন করব্যবস্থার লক্ষ্যস্বরূপে মনে হতো, কর হার হ্রাসের পর সে ধারণাও অবলুপ্ত হয়ে গেল। অব্যাহত বৈষম্য তিক্ত সত্য এই যে, সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি ও দৃশ্যত প্রগতিশীল করব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও সম্পদ বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে গরীব আরো গরীব এবং ধনী আরো ধনী হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেব মতে যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭৮ সালে দারিদ্র্য রেখার নিচে জনসংখ্যা ছিল ১১.৪%, যা ১৯৮৬ সালে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১৩.৬%। ধনী দরিদ্রের মাঝে আয়ের ব্যবধানও বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৮০ সালের আয় সিঁড়ির নিম্নধাপের এক পঞ্চমাংশ পরিবার জাতীয় আয়ের ৫.৩% লাভ করত। অপরদিকে উপরের সিঁড়ির এক পঞ্চমাংশ পরিবার পেত জাতীয় আয়ের ৩৮.২%। ১৯৮৬ সালে মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে নিচের এক পঞ্চমাংশ জনগণের হিস্যা ৪.৬% এ নেমে আসে। অপর দিকে উপরের এক পঞ্চমাংশ জনগণের হিস্যা ৪৩.৭% এ বৃদ্ধি পায়। মার্কিন কংগ্রেসের যৌথ অর্থনৈতিক কমিটির সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে ডেমোক্রেট দলের সদস্যগণ মন্তব্য করেছেন যে, গত দুই দশকে সম্পদের কেন্দ্রীভূতকরণ আরো বিপুলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৬২ সালে ০.৫% জনগণ সম্পদের ২৫.৬% নিয়ন্ত্রণ করত। ১৯৮৩ সালে তারা সম্পদের ৩৫.১% নিয়ন্ত্রণ করে। ৯০% মার্কিন জনগণের গৃহস্থালী সম্পদের হিস্যা গত ২১ বছরে ৩৪.৯% হতে ২৮% এ হ্রাস পেয়েছে। যৌথ অর্থনৈতিক কমিটির সভাপতি কংগ্রেস সদস্য ডেভিড আর ওবে রিপোর্টের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, পরিসংখ্যান সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, ধনী অধিকতর ধনী হয়েছে। তিনি আরো মন্তব্য করেন, যদি সম্পদ ক্ষমতা হয়ে থাকে, তাহলে বলতে হয় ১৯৬০ এর দশকের চেয়ে অধিকাংশ মার্কিন জনগণ বর্তমানে কম ক্ষমতার অধিকারী। অন্যান্য শিল্পোন্নত দেশের অবস্থার তেমন কোনো হেরফের নেই। সুইডেন যাকে দৃশ্যত আদর্শ কল্যাণ রাষ্ট্র বিবেচনা করা হয়, সেখানে উপরের ১০% পরিবারের জাতীয় আয়ে অংশ ছিল ১৯৭২ সালে ২১.৩%। ১৯৮১ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে ২৮.১% এ পরিণত হয়েছে। নিচের দিকের এক-পঞ্চমাংশ পরিবারের হিস্যা জাতীয় আয়েল ৬.৬% হতে ৭.৪% এ বৃদ্ধি পেলেও এ বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতিতে অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। (ঙ) উচ্চ প্রবৃদ্ধি কল্যাণ রাষ্ট্রের ইতঃপূর্বে আলোচিত ব্যবস্থাসমূহ আয় ও সম্পদের বৈষম্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য কোনো ভুমিকা রাখতে পারেনি। তেমনি উচ্চ প্রবৃদ্ধির কৌশলও অধিকতর কোনো অগ্রগতি সাধন করতে সমর্থ হয়নি। কল্যাণ রাষ্ট্রের কর্মকৌশলে উচ্চ প্রবৃদ্ধিই হচ্ছে একমাত্র অস্ত্র, যা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, ফলে তা সার্বজনীন সমর্থন লাভ করে। যেহেতু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে দীর্ঘকালীন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণাটি গতি লাভ করেছিল, তাই প্রবৃদ্ধিই শেষতক শ্রেণীহীন সমাজ রচনায় সক্ষম হবে মর্মে গভীর আস্থা প্রকাশ করা হয়েছিল। প্রকৃত প্রস্তাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এডহক অঙ্গ হিসেবে সামাজিক কর্মসূচিগুলো কাজ করছিল। কিছু কিছু লেখক প্রবৃদ্ধি ছাড়া পুনর্বণ্টনকে সামঞ্জস্যহী বলে অভিহিত করেছেন। এমনকি এস্থনি ক্রশল্যাল্ড এর মতো বিখ্যাত সমাজতন্ত্রীও অনুভব করেছেন যে, প্রবৃদ্ধি অর্জনই পুনর্বণ্টনের জন্য একমাত্র কার্যকর পন্থা। কেননা আয়ের যে কোনো উল্লেখযোগ্য হস্তান্তরের ফলে জনসংখ্যার অধিকতর স্বচ্ছল অংশের প্রকৃত আয় হ্রাস পাবে এবং এর ফলে তাদের মাঝে হতাশার সঞ্চার হবে। কিছু বিখ্যাত নীতি নির্ধারক উপদেষ্টা আরো দ্রুততর প্রবৃদ্ধিকেই উন্নয়নশীল ও উন্নত নির্বিশেষে সকল দেশের সকল সমস্যার সমাধান বলে মনে করেন। যাই হোক, দু'দশক যাবত উচ্চ প্রবৃদ্ধির হার এবং ক্রমবর্ধমান সম্পদ দারিদ্র্য দূরীকরণ, প্রয়োজন পূরণ ও বৈষম্য হ্রাসে ব্যর্থ হয়েছে। অধিকতর কল্যাণমুখী রাষ্ট্র বলে পরিচিত পশ্চিম জাম্রআনী, যুক্তরাজ্য ও জাপান নির্বিশেষে বিশ্বের সকল ধনী রাষ্ট্রে দরিদ্র জনগণের কিছু অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও গৃহায়ন চাহিদা পূরণ হয়নি। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্রব্যসামগ্রীর যে সয়লাব বয়ে এনেছে, তা মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধিতে কোনো অবদান রাখতে পারেনি। একটি সামগ্রিক বিশৃঙ্খলার লক্ষণসমূহ ক্রমবর্ধমান প্রকাশ লাভ করছে। মিশান এর ভাষায় সর্বত্র স্থিতি ও পরিমিতির বদলে অস্থিরতা ও অপরিমিতি বিরাজ করছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতি এরূপ ক্রমাগত ধেয়ে চলা পুনর্বণ্টন লক্ষ্য অর্জনে যেমন সহায়তা করেনি, তেমনি অপরদিকে প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি ও বেসরকারি খাতে ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সুদের হার ও মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে উচ্চহারের প্রবৃদ্ধির ধারণাটি সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। World Commission on Environment and Development(ব্রান্ড-ল্যান্ড কমিশন) ১৯৮৭ সাল থেকে 'টেকসই' উন্নয়নের ধারণাটি জনপ্রিয় করে তুলেছে। টেকসই উন্নয়নের ধারণা আন্তঃপ্রজন্ম ও অন্তঃপ্রজন্ম ন্যায়পরতাকে ক্ষুণ্ণ না করে উন্নয়নের উপর জোর প্রদান করে। তবে ন্যায়পরতা ক্ষুণ্ণকারী কিছু উপাদান, যেমন উচ্চমাত্রার মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার, ঋণ পরিশোধের পরিমাণ, দূষণ ও অনবায়নযোগ্য সম্পদের ক্ষয় যদি বিবেচনায় আনা হয়, তবে 'টেকসই' উন্নয়নের কোনো উজ্জ্বল ছবির পূর্বাভাস দেয়া সম্ভব নয়। অদূর ভবিষ্যতে শিল্পোন্নত দেশগুলোতে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে যে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ছিল তার পুনরাবৃত্তি ঘটানো সম্ভব নয়। আইএমএফ এর হিসেব অনুযায়ী ৯০ দশকের প্রথমার্ধে প্রকৃত প্রবৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ৩% হতে পারে। এ ধরনের অবস্থার প্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপর নির্ভর করে সামষ্টিক ও বৈদেশিক অন্যায়পরায়নতা ও পুনর্বণ্টন সমস্যার সমাধান আশা করা যায় না। তাই সময়ের দাবি হচ্ছে কার্যকর নতুন কোনো কৌশল উদ্ভাবন। (চ) পূর্ণ কর্মসংস্থান দরিদ্র মানুষের অবস্থা উন্নয়নের অন্যতম প্রধান উপায় কর্মসংস্থানের হার উচ্চমাত্রায় বৃদ্ধির লক্ষ্যও তিক্ততায় পর্যবসিত হয়েছে। পশ্চিমের শিল্পোন্নত দেশসমূহে বেকারত্ব পরিণত হয়েছে এক অমোচনীয় সমস্যায়। ১৯৭০ সালে ইউরোপের ওইসিডি দেশসমূহে বেকারত্বের পরিমাণ ছিল জনসংখ্যার ২.৭%। ১৯৯০ সালে বেকারত্বের পরিমাণ ৩ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৮.১% এ এসে দাঁড়ায়। মধ্যবর্তী পর্যায়ে ১৯৮৬ সালে বেকারত্বে ৯.৯% এর শিখরে পৌঁছায়। নিকট ভবিষ্যতে এ হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে বলে মনে হয় না। ১৯৬০ এর দশকের শেষের দিক থেকে সকল বড় শিল্পোন্নত দেশে Non-accelerating Inflation Rate of Unemployment (NAIRU) তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে যুব সমাজের অস্বাভাবিক বেকারত্বের হার। কেননা বেকারত্ব বেকার যুবকদের আত্মসম্মানবোধকে আহত করে, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিরাশা সৃষ্টি করে, সমাজ বিদ্বেষী করে তোলে এবং তাদের সম্ভাবনা ও ক্ষমতাকে তিলে তিলে ক্ষয় করে দেয়। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য কল্যাণ রাষ্ট্রের হাতে একমাত্র বড় যে হাতিয়ারটি রয়েছে তা হচ্ছে উচ্চমাত্রার প্রবৃদ্ধি অর্জন। ইউরোপে বেকারত্ব বৃদ্ধি রোধের জন্য ৩.৫% প্রকৃত প্রবৃদ্ধির হার অর্জন প্রয়োজন। কিন্তু ১৯৭৬ সাল হতে এক দশকের বেশি সময় ইউরোপের প্রবৃদ্ধির হার এ বেঞ্চমার্ক হারের কম। ১৯৭৮-৭৯ অর্থ বছরে অবস্থার কিছু উন্নতি হয়েছিল। কিন্তু মধ্যবর্তী মেয়াদের জন্য প্রত্যাশা আশাব্যঞ্জক নয়। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্ব বৃদ্ধি রোধের জন্য ২.৫%-৩% প্রবৃদ্ধি ও প্রয়োজন। কিন্তু ১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রেরর প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধির হার হচ্ছে ১.৭%। ১৯৯১ সালে এ হার আরো কম হবে বলে মনে হচ্ছে। আবার যুক্তরাষ্ট্র যদি তার বাজেট ঘাটতি হ্রাসে অধিকতর দৃঢ় সংকল্প হয়, তবে প্রবৃদ্ধির হার আরো কমে বেকার-সমস্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটবে। নিকট ভবিষ্যতে স্বল্প প্রবৃদ্ধি পূর্ণ কর্মসংস্থান অর্জনের সম্ভাবনা খুব উজ্জ্বল নয়। এরূপ হতাশাবাদ ব্যক্ত হয়েছে লুইস ইম্মেরিজের কন্ঠে-"স্বল্প প্রবৃদ্ধির হার এবং ক্রমবর্ধমান শ্রমিক সংখ্যা- এ সমীকরণের দু'দিককে মিলিয়ে দেখলে আমরা দেখতে পাই পূর্ণ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য পুরণ বলতে গেলে এ এক অসম্ভব আশা"। কৌশলের ব্যর্থতা পুঁজিবাদের সামাজিক-ডারউইনবাদী দর্শন হতে কল্যাণ রাষ্ট্র নিঃসন্দেহে একটি শুভ উত্তরণ। অন্যায় ও অসাম্যের বিরুদ্ধে মানবত্তা স্বাভাবিকভাবে পুঁজিবাদ সৃষ্ট বৈষম্যকে স্বীকার করে নিতে পারেনি। তিনশত বছরের সেকুলার মতবাদও বস্তুত মানবসত্তার মৌলিক মূল্যবো ও চেতনাকে ধ্বংস করতে পারেনি। যাই হোক, কল্যাণ রাষ্ট্রের লক্ষ্য মানবতাবাদ হলেও ও অর্জনে কার্যকর কৌশল উদ্ভাবনে এ মতাদর্শ ব্যর্থ হয়েছে। বস্তুত পুঁজিবাদী দর্শন বা বিশ্বদৃষ্টিতে কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণা মৌলিক কোনো পরিবর্তন আনয়ন করেনি। এ মতাদর্শের এমন কোনো কার্যকর কর্মসূচি বা প্রেরণা নেই, যা ইনসাফ অভিমুখী লক্ষ্যের পরিপন্থী সম্পদের অপচয়মূলক প্রেরণা নেই, যা ইনসাফ অভিমুখী লক্ষ্যের পরিপন্থী সম্পদের অপচয়মূলক ব্যবহার রোধ করতে পারে। কল্যাণ রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনায় একই পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থা, উৎপাদন পদ্ধতি এবং প্রতিষ্ঠানিক কাঠামো বজায় রাখা হয়েছে যা ধনী দরিদ্রের মধ্যে দুস্তর ব্যবধার সৃষ্টির জন্য দায়ী। অর্থনৈতিক মৌলিক পুনর্গঠন ও কোনো সামাজিক দর্শন ব্যতিরেকেই মূল্যবোধ নিরপেক্ষ বাজারব্যবস্থার সৃষ্ট বৈষম্যসমূহ সরকারের সক্রিয় ভূমিকা দ্বারা অপসারণ করা সম্ভব হবে- এ মর্মে যে ধারণা পোষণ করা হয়েছিল তা এক কল্পনাবিলাসের পর্যসবিত হয়েছে। শিল্পোন্নত দেশসমূহে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা দরিদ্র মানুষের দুঃখ- দুদর্শা কিছুটা প্রশমিত করলেও সামগ্রিক দরিদ্র মানুষের মৌলিক প্রয়োজনও পূরণ হলো না। বিত্তশালী ও বিত্তহীনের ব্যবধান শুধু প্রকৃত আয়ের দিকেই নয়, বরং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও গৃহায়ন সুবিধার প্রাপ্যতার দিকেও বাড়ছে। অবাক করার বিষয় হলো, জিডিপি'র উল্লেখযোগ্য অংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা সত্ত্বেও(সুইডেনে ৯% এর উপর) গরীব ও বৃদ্ধরা ত্বরিৎ ও উপযুক্ত চিকিৎসা সুবিধা পাচ্ছে না। হৃৎপিণ্ডের শল্যচিকিৎসা থেকে চোখের অপারেশনসহ অনেক গুরুতর ক্ষেত্রে তাদের দীর্ঘ সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। ঔষধপত্রের দুর্মূল্য সত্ত্বেও ঔষধপত্র তৈরির বৃহৎ কোম্পানীসমূহের চাপের মুখে সরকার ট্রেডমার্ক ঔষধের স্থলে সমমানের অথচ স্বল্প মূল্যের জেনেরিক ঔষধ বাজারে প্রচলন করতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে স্বাস্থ্যসেবা মূলত বেসরকারি খাত দ্বারা পরিচালিত, সেখানে জনসংখ্যার ১৩.৩% তথা ৩১.৩ মিলিয়ন আমেরিকান নাগরিকের কোনো স্বাস্থ্যবীমা নেই। এদের মধ্যে ৮.৬ মিলিয়ন হচ্ছে শিশু। দেশের প্রতি ছয়জন শিশুর একজন হচ্ছে এই শিশুরা। গৃহায়ন সুবিদা সবার জন্য বিশেষ করে দরিদ্র শ্রেণীর জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকৃত গরীবদের নাগালে বস্তুত কোনো বাসস্থান সুবিধা নেই। অধিকাংশ গরীব মানুষ বাস করে ভাড়া বাড়িতে। গত দশকগুলোতে আয়ের চেয়ে বাড়ি ভাড়া দ্রুত হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কলেজ শিক্ষার ব্যয় আরো বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা তথাকথিত সমান সুযোগের অর্থনীতিকে তামাশায় পরিণত করেছে। আরো নির্মম পরিহাস হচ্ছে যে, প্রচলিত আর্থ-সামাজিক অবস্থা শুধু দরিদ্রকে দরিদ্রই রাখছে না, বরং দারিদ্রকে চিরস্থায়ীত্ব প্রদান করেছে। খুব নগণ্য সংখ্যক লোকই এ সর্বগ্রাসী কৃষ্ণবৃত্ত অনেক দেশের লক্ষ-নিযুত মানবসন্তান পুঁতিগন্ধময় বস্তির অন্ধ গলিতে বন্দী হয়ে আছে। কল্যাণ রাষ্ট্রের কথিত ছত্রচ্ছায়া সত্ত্বেও তাদের অবস্থা করুণ থেকে করুণতর হচ্ছে। মাতৃপিতৃ পরিচয়হীন শিশু, অপরাধ, মাদক, গ্যাং এবং হতাশা মিলিয়ে এ হচ্ছে এক দুঃস্বপ্নের জগৎ। কল্যাণ রাষ্ট্রসমূহের সম্পদ থাকা সত্ত্বেও ন্যায়পরায়নতাপূর্ণ সমাজের স্বপ্ন স্বপনই রয়ে গেছে। বর্তমান বিরাজমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, কল্যাণ রাষ্ট্র সম্পদের দক্ষ ও সুষম বিলিবণ্টনে ব্যর্থ হয়েছে। তা সত্ত্বেও যুক্তি দেখানো হয় যে, যদি কল্যাণ রাষ্ট্রের আবির্ভাব না হতো তবে নিয়ন্ত্রণহীন বাজার ব্যবস্থা সামাজিক বৈষম্যকে আরো তীব্রতর করে তুলত। এ কথা স্বীকার করে নিলেও কল্যাণ রাষ্ট্রকে তার বহুল স্বীকৃত ব্যর্থতার দায়ভার হতে অব্যাহতি দেয়া যায় না। কল্যাণ রাষ্ট্রের কল্যাণকর সমাজের স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে গেলেও তার সকল কর্মসূচিই নিঃশেষিত হয়ে গেছে। নিয়ন্ত্রণমূলক বিধিবিধিান, রাষ্ট্রায়করণ, ট্রেড ইউনিয়ন, রাজস্বনীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং পূর্ণ কর্মসংস্থানসহ কল্যাণমুখী সেবা সরবরাহে কল্যাণ রাষ্ট্রের সক্ষমতার বিষয়ে ব্যাপক আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে। আলবার্ট হির্চম্যান বলিষ্ঠভাবে স্বীকার করেছেন যে, কল্যাণ রাষ্ট্র যে সংকটাপন্ন এ বিষয়ে আর কোনো বিতর্ক নেই। ১৯৫০ এবং ১৯৬০ এর দশকে ওইসিডি দেশসমূহের উচ্চহারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের ফলে সামাজিক কল্যাণমূলক খাতে অধিক হারে সরকারি ব্যয় সম্ভব হয়েছিল। ১৯৭০ এর দশকের প্রথম দিক হতে নিম্নহারের প্রবৃদ্ধি ও উচ্চহারের বাজেট ঘাটতি কল্যাণমূলক কর্মসূচিকে ব্যাহত করে। ফলে নতুন হাসপাতাল, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মানের অর্থায়নে ভাটা পড়ে। বর্তমান সুযোগ সুবিধার উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ায় তা অদক্ষ হয়ে ওঠে এবং বাড়তি চাহিদা মেটাতে অক্ষম হয়ে পড়ে। কল্যাণ রাষ্ট্রের তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতার প্রেক্ষিতে অধিক অর্থের যোগানই সমস্যার সুস্পষ্ট সমাধান হিসেবে দেখা দেয়। এমনকি বৃটিশ লেবার পার্টির মতেও অধিক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য অধিক সরকারি ঋণ ও ব্যয় অত্যাবশ্যক হিসেবে চিহ্নিত হয়। কিন্তু ট্যাক্স বা মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি না করে তা কী করে করা সম্ভব সেটা দেখাতে তারা ব্যর্থ হয়। বিশাল বাজেট ঘাটতি এবং তজ্জনিত মুদ্রাস্ফীতি প্রতিক্রিয়ার দরুণ পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে অধিক অর্থের যোগান দেয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বস্তুত সত্তর দশকের দুই অংকের মুদ্রাস্ফীতি পরিহারের লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন ছিল নিম্নমাত্রার সরকারি বাজেট ঘাটতি এবং ঋণ সংকোচন। কিন্তু ট্যাক্সের বিরুদ্ধে বিরূপ জনমতের প্রেক্ষিতে সরকারি ব্যয় হ্রাস ব্যতিরেকে ঘাটতি কমানো সম্ভব ছিল না। শক্তিশালী কায়েমী স্বার্থবাদী মহল জাতীয় স্বার্থের নামে প্রতিরক্ষা ও তাদের স্বার্থের অনুকূল অন্যান্য খাতে ব্যয় হ্রাসে বাধা প্রদান করে। ফলে বেকার ভাতা, ন্যূনতম মজুরি, চিকিৎসা ভাতা ও অন্যান্য কল্যাণ সুবিধার মতো বহু সংখ্যক সামাজিক নীতি পুনর্বিবেচনার সম্মুখীন হয়েছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতির এ দ্বন্দ্ব কল্যাণ রাষ্ট্রকে সংকটে নিক্ষেপ করেছে। 'আজকের হালনাগাদ চিন্তাধারাটি হচ্ছে কল্যাণ রাষ্ট্রের ক্রমপ্রসার ও প্রবৃদ্ধি সম্ভবত আর সম্ভব নয়, বা বলা যায় কাঙ্ক্ষিতও নয়'। বস্তুত ৬৪টি দেশের অবস্থা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রণীত হ্যারল্ড ইউলেনস্কির রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা যায় যে, ৭০ দশকে অনেক ধনী দেশে রাষ্টীয় সেবা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে। রক্ষণশীল চিন্তার এ জোয়ার প্রায় সবগুলো কল্যাণ রাষ্ট্রকে প্লাবিত করে। তবে অবশ্যই এ ধরনের প্রতিক্রিয়া অনাকাঙ্ক্ষিত। কেননা অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ব্যতিরেকে কোনো বড় মানবগোষ্ঠীর পক্ষেই তার মানবতাবাদী লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। এমনকি পশ্চিমের পরিকল্পিত বাজার অর্থনীতির যে সাফল্য, তাও গড়ে উঠছে সেই কল্যাণমূলক সমাজের স্বপ্নের ভিতরে উপর ,যা কল্যাণ রাষ্ট্র সরবরাহ করেছে। তাই কল্যাণ রাষ্ট্রের চাকাকে দীর্ঘদিনের জন্য পেছন দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। যদি জনপ্রতিনিধিদের সময়ান্তরে বারবার নির্বাচনের জন্য জনতার মুখোমুখি হতে হয়, তবে তারা জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ না করে পারবে না। আর রাষ্ট্রের সক্রিয় কল্যাণমূখী ভূমিকা ছাড়া এসব প্রতিশ্রুতি পালন সম্ভব নয়। কল্যাণ রাষ্ট্র তাই উভয় সংকটে। তাহলে কি বলতে হবে, কোথাও কোনো ভুল রয়ে গেছে?

যুক্তি ভ্রান্তি সমস্যা দেখা দেয়ার কারন হলো অন্যান্য যে কোনো দেশের মতোই কল্যাণ রাষ্ট্রকেও একই ধরনের সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যদি কল্যাণমূলক খাতে অধিক সম্পদ ব্যয় করা হয়, তবে অন্যান্য উন্নয়নমূলক খাতে কল্যাণ রাষ্ট্র যে বন্ধনের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে তা হতে পরত্রাণ পাওয়া দুষ্কর। শুধুমাত্র বাজার মূল্যব্যবস্থার উপর নির্ভর করে সম্পদের অর্থনৈতিক উপকরণ বা সম্পদের উপর বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতের দাবিকে এমনভাবে হ্রাস করা সম্ভব নয়, যাতে সামাজিক লক্ষ্যসমূহ পূরণ অবিঘ্নিত থেকে যাবে। তার জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন অগ্রাধিকার নির্ধারণের অনুপ্রাণিত করা। উক্ত সামাজিক ঐকমত্য সৃষ্টি এবং তদানুযায়ী জনমত ও দাবিকে সেভাবে অনুপ্রাণিত করা। উক্ত সামাজিক ঐকমত্যর আলোকেই তখন বিভিন্ন খাতে কী হারে অর্থনৈতিক সম্পদ ব্যবহৃত হবে তা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। কিন্তু কল্যাণ রাষ্ট্র কাজ করে নৈতিক মূল্যবোধের বগ্লাহীন পুঁজিবাদী কাঠামোর আওতায়, যেখানে সামাজিক প্রয়োজন পূরণের অগ্রাধিকার নির্ণয়ের কোনো নৈতিক ঐকমত্য ভিত্তিক পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া নেই। অথবা সামাজিক ন্যায়নীতি, সামষ্টিক অর্থনীতি ও বৈদেশিক ভারসম্যের সাথে সংগতি রেখে ব্যক্তি ও দলসমূহকে তাদের দাবদাওয়াকে সংযত ও বিন্যস্ত করার জন্য অনুপ্রাণিত করার কোনো নৈতিক ব্যবস্থাপনা নেই। পক্ষান্তরে, উচিত-অনুচিত এর মানদণ্ড নির্ধারণ না করার সেকুলার মতাদর্শ ও 'পেরিটো অপটিমালিটি'র কাঠামোর মধ্যে নীতি নির্ধারণ করার ফলে সীমিত সম্পদের উপর সরকারি ও বেসরকারি খাতের চাহিদার বিপুল ও অপ্রতিহত চাপ সৃষ্টি হয়। দেদার বিজ্ঞাপন প্রচার এবং লোভনীয় কনজুমার ঋণের লভ্যতা সমাজের প্রতিপত্তি অর্জনের যে ইঁদুর দৌড় চলছে তাতে আরো ইন্ধন যুগিয়েছে। সর্বোচ্চ সুযোগ, বৈষয়িক সুবিধা ও ভোগ অর্জন জীবনের চরম লক্ষ্য হওয়ায় কল্যাণ রাষ্ট্রের সেকুলার সমাজে জনগণের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি খাতে কল্যাণমূলক কর্মসূচির জন্য ব্যাপক ব্যয়ের কারণে যে বিশাল রাজস্ব ঘাটতির সৃষ্টি হয়, তাতে সীমিত সম্পদের উপর চাপ আরো জটিল আকার ধারণ করে। সীমিত সম্পদের উপর সরকারি ও বেসরকারি খাতের চাহিদার বিপুল চাপে কল্যাণ রাষ্ট্র ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। যদিও এরূপ দ্বিমুখী চাহিদা প্রাথমিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করল, কিন্তু পরবর্তীতে তা সম্পদের ও চাহিদার মাঝে বিরাট ব্যবধান গড়ে তুলল। অনেক দেশে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যহীনতার মধ্য দিয়ে এ ব্যবধান প্রতিফলিত হয়ে ওঠে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ যেখানে বেইনসাফী অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিপুলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, সেখানে বাজেট ঘাটতি হ্রাস করা প্রয়োজন বলে অনুভূত হয়। রিগ্যান ও থ্যাচারের অর্থনৈতিক চিন্তাধার মোতাবেক বাজারব্যবস্থার উপর অধিক নির্ভরশীলতার মাধ্যমেই এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। জনপ্রিয়তার নিরিখে এটা মিসেস থ্যাচারের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এ নীতি গুরুত্বের সাথে অনুসরণ করে এবং জনগণের সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সরকারি আর্থিক ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নতি লাথ করেনি। সুইডেনের মতো দেশ যেখানে জনগণের কল্যাণমুখী সেবার জন্য অধিকতর সুনাম রয়েছে, সেখানে উচ্চমাত্রার ট্যাক্স ও সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির দরুণ সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। এটা এখন সর্বজনস্বীকৃত যে ,অতিরিক্ত মাত্রার ট্যাক্স জনগণের কর্মসংস্থান, সঞ্চয় ও ব্যক্তিগত উদ্যোগকে নিরুৎসাহিত করে। অন্যান্য শিল্পোন্নত দেশের তুলনায় সুইডেনে বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতির হার দ্বিগুণ। সুইডিস ক্রোনারের বিপুল অবমূল্যায়ন সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাজারে সুইডেনের প্রতিযোগিতার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ শেয়ার মার্কেট সংকুচিত হচ্ছে এবং চলতি হিসাব ঘাটতি বেড়ে চলছে। বিশাল কর বেসরকারি সঞ্চয়কে দারুণভাবে ব্যাহত করছে। সুইডেনে বেসরকারি সঞ্চয়ের হার ছিল জাতীয় আয়ের মাত্র ০.৮%। তার তুলনায় অন্যান্য শিল্পোন্নত দেশে এর হার ছিল ৯.৩%। ফলে সুদের হার বেড়ে যেতে বাধ্য, যা বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিকে আরো হ্রাস করে ভবিষ্যৎ সমস্যাকে তীব্রতর করে তুলবে। কিন্তু সরকারি ব্যয় হ্রাস ছাড়া ট্যাক্স কমানো সম্ভব নয়। অন্যথায় বাজেট ঘাটতি, মুদ্রাস্ফীতি ও বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যহীনতা আরো বৃদ্ধি পাবে। তাই সবার কাছে সহজতম পন্থাটি হচ্ছে কল্যাণমুখী কর্মসূচিতগুলোতে সরকারি ব্যয় হ্রাস করা। তাই দেখা যায় নৈতিকতা নিরপেক্ষ কার্যপরিধির মধ্যে থেকে কর হার হ্রাস করা মূলত রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক ভূমিকাসমূহ হ্রাসের নামান্তর মাত্র। পশ্চিম জার্মানী ও জাপানের মতো দেশ যাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতার মতো সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়নি, কিন্তু যারা কল্যাণ রাষ্ট্রের লক্ষ্য পূরণে বিভিন্ন মাত্রায় ব্যর্থ হয়েছে, তাদের সমস্যা ভিন্নতর। সমধর্মী আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের প্রয়োজনে তারা ঘাটতিবহুল দেশগুলোর চাপের সম্মুখীন হলো। এ চাপ উদ্বৃত্ত দেশসমূহকে দীর্ঘমেয়াদে তাদের সবল মুদ্রা ও রাজস্ব নীতি অনুসরণে বাধা সৃষ্টি করল। প্রবল চাপের মুখে পশ্চিম জার্মানী ও জাপান উভয় দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ডিসকাউন্ট হার ১৯৮৭ সালে সর্বনিম্ন ২.৫% এ নামিয়ে আনতে হলো, যা ছিল ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে যথাক্রমে ৪.৫% এবং ৫%। ফলে উভয় দেশই অনাকাঙ্ক্ষিত মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও ফটকাবাজারী দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হলো। উভয় দেশকে তাই স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ১৯৮৯ সালের অক্টোবরে (পশ্চিম জার্মানী) এবং ১৯৯০ সালের আগষ্টে (জাপান) ডিসকাউন্ট হার ৬.০% এ বৃদ্ধি করতে হলো। সুদের স্বল্প হারের এ সময়ে জাপানে স্টক ও রিয়েল এস্টেট বাজার শীর্ষে উঠে গেল যা দীর্ঘকাল ধরে রাখা সম্ভব হলো না। ঘাটতি দেশসমূহের অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং সবল মুদ্রা ও রাজস্বনীতি প্রয়োগ না করে শুধুমাত্র উদ্বৃত্ত দেশসমূহকে চাপের মুখে রাখার মাধ্যমে ঘাটতি দেশগুলোর তেমন কোনো উপকার তো হবেই না, বরং উদ্বৃত্ত দেশগুলোর সংকট বাড়বে। যেহেতু এ পদক্ষেপ নেয়া হয়নি, তাই সমৃদ্ধ অর্থনীতিসমূহও অস্থিতিশীলতার সম্মুখীন হলো। স্বল্পমেয়াদী ফটকাবাজারী লগ্নী পুঁজির স্থান্ন্তর তীব্রতা লাভ করল। ফলে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও মুদ্রাবাজার পরিবেশ বিপন্ন হয়ে উঠল। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, পণ্য ও স্টক মার্কেটে অসিথরতার সৃষ্টি হলো। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় চাহিদার নৈতিকতা-অনৈতিকতার বালাই না থাকায় একদিকে সার্বিক চাহিদার বিস্ফোরণ ঘটল, অন্যদিকে ঐ কাঠামোর মধ্যে থেকে কল্যাণ রাষ্ট্রে গরীবের অবস্থার যথার্থ উন্নয়ন করতে না পরার সমস্যা আরো জটিলতর হলো। পুঁজিবাদের অগ্রহণযোগ্য ত্রুটিগুলো সংশোধন করতে যেয়ে কল্যাণ রাষ্ট্রে সমভাবে অসমাধানযোগ্য নতুন সমস্যার জন্ম দিলো। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মাঝে সবচেয়ে কম স্বার্থ ত্যাগ করে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায়ের যে প্রতিযোগিতা তারই নাম হলো সেকুলার পুঁজিবাদের সামাজিক-ডারউইনীয় দর্শন বা ব্যবস্থা। জোড়াতালি দিয়ে এ ত্রুটি-বিচ্যুতি দূরীকরণের প্রচেষ্টার কারণে কল্যাণ রাষ্ট্রের কর্মসূচি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। একদিকে কল্যাণ রাষ্ট্র কতিপয় মানবতাবাদী লক্ষ্য স্বীকার করে নিয়েছে, অন্যদিকে এ রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভিত্তি হচ্ছে সামাজিক ডারউইনবাদ ও ভোগবাদ। আশার সঞ্চার করে পুনঃ নিরাশ করা কতিপয় আর্থ-সামাজিক সমস্যার জন্ম দেয়া ব্যতীত কল্যাণ রাষ্ট্রের উপযুক্ত দুটি দিক দীর্ঘদিন পারস্পরিকভাবে সহাবস্থান করতে পারে না। এ ধরনের সমন্বয় ব্যবস্থা কতিপয় সমস্যার সমাধান করে, আবার অন্য কতকগুলো সমস্যার জন্ম দেয়। তাই সমাজ ও অর্থনীতির এমন মৌলিক পুনর্গঠন প্রয়োজন যাতে সম্পদের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কল্যাণ রাষ্ট্রের মানবতাবাদী লক্ষ্যসমূহ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়। অনেক চিন্তাবিদ বর্তমানে এ বাস্তবতাকে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। মরিস ব্রুসের ভাষায়, কল্যাণ রষ্ট্রের ধারণা কোনো রাজনৈতিক সামাজিক চিন্তাভাবনা বা দর্শনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে জন্ম লাভ করেনি, কল্যাণ রাষ্ট্র কোনো সুপরিকল্পিত চিন্তার ফসল নয়। বস্ত্তত বিশেষ কতগুলো সমস্যার নিরসনে বছরের পর বছর ধরে যেসব প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তারই স্তূপীকৃত রূপ ব্যতীত কল্যাণ রাষ্ট্র আর কিছুই নয়। কল্যাণ রাষ্ট্রের দর্শন সম্পর্কে একই ধরনের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন পিয়ীট থিয়োনেস, 'কল্যাণ রাষ্ট্রের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, কারো পক্ষে সম্পূর্ণ ও যথার্থভবে এর প্রচার প্রচারণায় লিপ্ত হওয়া সম্ভব নয়। কেননা একজন সমাজতন্ত্রীর কছে কল্যাণ রাষ্ট্র অর্ধসমাজতন্ত্র ব্যতীত আর কিছু নয়। আবার লিবারেলদের নিকটও এটি অর্ধ-লিবারেলিজম মাত্র'। সিডনী হুকের মন্তব্য হচ্ছে, "কল্যাণ রাষ্ট্রের পশ্চাতে যে সামাজিক দর্শন তা অপরিণত ও অস্পষ্ট"। বেরিংটনের ভাষায়, কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রবক্তাগণ এমনকি মৌলিক প্রশ্নগুলোরও অস্মপূর্ণ ও নেতিবাচক জবাব ছাড়া অন্য কিছু দিতে সক্ষম নয়। যেমন, কল্যাণ রাষ্ট্রের লক্ষ্যসমূহ কী? কল্যাণ রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে কল্যাণের সংজ্ঞা কী? তিনি পর্যবেক্ষণ করে যে, 'একটি বিশ্বযুদ্ধ ও বিশ্বসংকটের পর কল্যাণ রাষ্ট্র জন্মলাভ করেছে এমন অভাব বা দুর্ভিক্ষের সময় যখন সবার কাছে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে ,যে অবস্থা বিরাজমান তা কারো কাম্য নয়; তা হচ্ছে সংকট, ক্ষুধা, তৃষ্ণা, শীত, বেকারত্ব, একনায়কত্ব, খাদ্য বা প্রতিভার অপচয়। তাই দেখা যায়, নেতিবাচক লক্ষ্যসমূহই কল্যাণ রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে'। মিরডাল তাই বলেন, 'কল্যাণ রাষ্ট্রের কর্মসূচিতে সরকারি হস্তক্ষেপের যে ব্যবস্থা দেখা যায় তা মতাদর্শ নয় বরং ঘটনাচক্রেরই ফলশ্রুতি'। সম্ভবত এ কারণেই কল্যাণ রাষ্ট্র আর্থ-সামাজিক সংস্কারে বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেনি। কল্যাণ রাষ্ট্রের সুসংবদ্ধ ও সামাজিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ সমন্বিত একক কোনো দর্শন নেই, যার ভিত্তিতে কার্যকর কর্মবূচি প্রণয়ন করা যেতে পারে, যে কর্মসূচির প্রতিটি উপাদান ক্রমঃসামঞ্জস্যময় যা মানবতাবাদী লক্ষ্যসমূহ অর্জনে সক্ষম। যে শক্তিসূহ দারিদ্র্য ও বৈষম্যের জন্ম দেয় ও তাকে অব্যাহত রাখে তা এতই শক্তিশালী যে, কল্যাণ রাষ্ট্রের সামাজিক কর্মসূচির জোড়াতালি দেয়া ব্যবস্থা দ্বারা তার অপনোদন সম্ভব নয়। কল্যাণ রাষ্ট্র দরিদ্রের পক্ষে আয়ের পুর্নবন্টনের জন্য পেছনের দরজা দিয়ে যে পরোক্ষ ব্যবস্থা রেখেছে, তা দারিদ্র্য বৈষম্য সৃষ্টিকারী আর্থ-সামাজিক শক্তিসমূহকে অতিক্রম করার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। দারিদ্র্যের জন্য দায়ী এসব শক্তিসমূহকে সরাসরি মোকাবিলা করা প্রয়োজন; লক্ষণসমূহের বদলে সমস্যঅর মূল্যে আঘাত করা প্রয়োজন। প্রয়োজন আর্থ-সামাজিক কাঠামোর আমূল সংস্কার এবং পুঁজিবাদ বা তার উন্নত সংস্করণ কল্যাণ রাষ্ট্রের ভিতে যে জীবনবোধ তার আমূল পরিবর্তন। এর ফলে বেকারত্ব, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধের মতো সামাজিক সমস্যাগুলো যা সমাজতন্ত্র ও কল্যাণ রাষ্ট্রের আবির্ভাব সত্ত্বেও ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে তার সমাধান করা সহায়ক হবে। সত্যিকারভাবে বলতে গেলে, চিন্তাবিদগণ চাইলেও কল্যাণ রাষ্ট্রের স্ববিরোধিতামুক্ত এক সুসংবদ্ধ দর্শন রচনা করতে পারতেন না। কেননা উপযোগবাদ বা ন্যায়নীতির সামাজিক চুক্তির মতবাদের উপর ভিত্তি করে একটি সামাজিক কল্যাণ দর্শন গড়ে তোলা কী সম্ভব? বিচার-বুদ্ধি, ব্যক্তিস্বার্থ ও সামাজিক চুক্তির ধারণা কী আমাদের পেরিটো অপটিমালিটির অতিরিক্ত কিছু এনে দিতে পারে? এসব দর্শন সামাজিক ঐকমত্যভিত্তিক মূল্যবোধের বিজয় পতাকা তুলে ধরার জন্য মানুষকে জীবনমরণ পণ করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে না। তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধের রক্তবীজ বপন করে কল্যাণ রাষ্ট্রের সংকট পারস্পরিক সহযোগিতা ও অন্যের কল্যাণে স্বার্থ ত্যাগে অনুপ্রাণিত করতে পারে না। এসব গুণাবলীর উন্মেষ দাবি করে মানুষের ব্যক্তিস্বার্থের উর্ধ্বে ওঠার তাগিদ এবং নিজের স্বার্থকে কেঁটেছেটে সীমিত সম্পদের উপর চাপ কমানোর মানসিক প্রবণতা। ব্যক্তিস্বার্থ ও উপযোগবাদের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে যে মূল্যবোধ ব্যবস্থা, তাতে দ্বন্দ্ব ও বিতর্কের অবকাশ অনস্বীকার্য। তাই মানব সমাজের মূল্যবোধের ভিত্তি হওয়া উচিত 'ভালো' বা 'মন্দ','অশুদ্ধ' বা 'ভুল' এরূপ সুস্পষ্ট সত্যের উপর ,যাতে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। এরূপ হলে ধনীদের স্বার্থহানি করে দরিদ্রের উপকার ঘটলেও কেউ কোনো প্রতিবাদ করবে না। একটি সেকুলার সমাজ সামাজিক ব্যবস্থাপনার কোনো প্রতিবাদ করবে না। একটি সেকুলার সমাজ সামাজিক ব্যবস্থাপনার কোনো সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ নয়। মাইকেল নোভাকের ভাষায়, 'বিভিন্ন শ্রেণীর স্বার্থময় একটি সমাজের মাথার উপর কোনো পবিত্র আচ্ছাদন নেই। এ ধরনের সমাজে এ ধরনের কোনো মনোগত ইচ্ছাই নেই। আধ্যাত্মিকভাবে এটা একটি শূন্য মন্দির। এ মন্দির এমনই অন্তঃসারশূন্য যে, কোনো শব্দ, প্রতিবিম্ব বা প্রতীকই আমাদের সবার কাঙ্ক্ষিত কোনো বিষয়কে মূর্ত করে তোলে না'। কেবলমাত্র ঐমী নির্দেশনাই যদি না থাকে, তবে বিলাস পরিহার ও সবার প্রয়োজন মিটাবার স্বার্থে ব্যবহারে ছাড় দেয়ার জন্য ধনীদের উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করার জন্য আর কিছু আছে কী? আশার আলো কালো মেঘের আড়ালেও থাকে আশার রজত রেখা। পশ্চিমা পুঁজিবাদ ও কল্যাণ রাষ্ট্রের সমালোচনামূলক ব্যবচ্ছেদে অর্থনৈতিক কালো মেঘের প্রান্তে আশারসে কিরণ দৃশ্যমান করে তুলছে। একমাত্র স্বার্থপরতাই মানবীয় কর্মকাণ্ডের পশ্চাতে ক্রিয়াশীল নয়- এ সত্য ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠছে। দৈনন্দিন প্রয়োজন পূরণের সাথে সাথে মানব সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের অনিবর্যতা ক্রমশ গুরুত্ব লাভ করছে। ক্লাসিক্যাল অর্থনীতির মূলধারার সীমা ছাড়িয়ে তাই নানা চিন্তাধারা বিকশিত হয়ে উঠছে। এ সকল মতাদর্শ অবশ্যই প্রায় সমধর্মী, পার্থক্য হচ্ছে গুরুত্ব প্রদানের বিষয়গুলোর বিভিন্নতায়। এ ধরনের তিনটি মতাদর্শ উল্লেখের দাবি রাখে। একটি মতাদর্শের নাম হচ্ছে Grants Economics। স্বার্থহীনভাবে কাজ করা ব্যক্তিমানুষের যৌক্তিক আচরণ হতে একটি বিচ্যুতি-এ মতাদর্শ তা মনে করে না। 'শুধুমাত্র ব্যক্তিস্বার্থে মানুষ কাজ করে'- এ ধরনের যুক্তি বাস্তব অবস্থার সামগ্রিক চিত্র নয় মর্মে কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করেন। অর্থনীতিবিদ হান এর মতে, যৌক্তিক আচরণের সংজ্ঞা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রচলিত অর্থনীতিশাস্ত্র সম্ভবত ভুল করেছে। একজন মানুষ শুধুমাত্র পাই পাই আর্থিক লাভক্ষতির চুলচেরা হিসাব করেই চলবে এটা সম্ভবত ঠিক নয়। সুতরাং এ কথাও বলা যায় না। প্রচলিত অর্থনীতিতে মানুষের আচরণের বিষয়ে ফ্রীডম্যান এর সাফাই সত্ত্বেও কিছু অর্থনীতিবিদ ভিন্ন ধারণা পোষণ করেন। এটা বলা সম্ভবত যথৃর্থ হবে যে ,যদি অর্থনৈতিক তত্ত্ব ও সূত্রের কাজ হয় মানুষের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে সঠিক ও অর্থপূর্ণ অনুমানে উপনীত হওয়া, তবে মানুষ স্বার্থপরতা নয়, পরার্থবাদের কাঠামোর মধ্যে থেকে অধিক যুক্তিযুক্ত আচরণ করবে-এ ধারণা করে নিলেই বরং অর্থনৈতিক আচরণ সম্পর্কে অধিক অর্থবহ পূর্বাভাস পাওয়া সম্ভব হবে। তাই মূল্যবোধ নিরপেক্ষ বিজ্ঞানের নামে অথনৈতিক বিশ্লেষণ পদ্ধতিতে যে মানবিক আচরণের উপাদানকে অস্বীকার করা হয়েছে, তাকে যথাযথ স্থান দেবার জন্য Pareto Optimum-এর বিকল্প হিসেবে Boulding Optimum তত্ত্ব উপস্থাপন করা হয়েছে। দ্বিতীয় চিন্তাধারাটি হচ্ছে, প্রয়োজন পূরণভিত্তিক মানবতাবাদী অর্থনীতি। এটি সকল মৌলিক মানবিক মূল্যবোধের স্বীকৃতি ও অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে মানবকল্যাণ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে। শুধুমাত্র সম্পদের উপর প্রচলিত অর্থনৈতিক তত্ত্বের মতো গুরুত্ব মতো গুরুত্ব আরোপের বদলে মানবতাবাদী অর্থনীতি প্রয়োজন পূরণে সন্তোষ ও মানবিক চেতনার উন্নয়নের উপর জোর প্রদান করে। যার লক্ষ্য হচ্ছে আব্রাহাম মাসলো এর ভাষায় 'আত্ম-উপলদ্ধি' বা 'আত্ম-সম্পূর্ণতা'। তৃতীয় মতাদর্শ সামাজিক অর্থনীতি মতাদর্শ হিসেবে অভিহিত। এ চিন্তাধারা নৈতিক বিবেচনার ছাঁচে অর্থনৈতিক তত্ত্বের পুনর্বিন্যাসে বিশ্বাসী। উদারনীতিবাদী দর্শন হতে অর্থনীতিবিদগণ নৈর্ব্যক্তিক বিজ্ঞানমনস্কতার প্রতি অঙ্গীকারের যে উত্তরাধিকার প্রাপ্ত হয়েছেন, তা প্রকৃত যুক্তির ধোপেও টেকে না এবং প্রত্যাশার প্রয়োজনীয়তার মানদণ্ডেও উতরে যায় না। এটা যুক্তিগ্রাহ্য নয়, কেননা অর্থনীতির ক্ষেত্রে এ তথাকথিত বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ভিত রচিত কতকগুলো প্রাক-পক্ষপাতিত্ত্বমূলক অনুমানের উপর। এটা অনাকাঙ্ক্ষিত, কেননা এ কথিত অনুসন্ধান সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয়তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করে না। মূল্যবোধ নিরপেক্ষ একটি শাস্ত্র কখনো জনগণের পছন্দ অপছন্দের ভিত্তিতে নীতিমালা ও সুপারিশ প্রণয়নে সফলতা লাভ করতে পারে না। অধ্যাপক সেন তাই যথাযথভাবেই মন্তব্য করেছেন, 'অর্থনীতিকে নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্নকরণের ফলে কল্যাণ অর্থনীতির সমৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে এবং একই সাথে তা বর্ণনামূলক ও পুর্বাভাসমূলক অর্থনীতির ভিতকে দুর্বল করে দিয়েছে। উপসংতারে তিনি বলেছেন যে, মানুষের আচার আচরণ ও বিচারবোধে যে নৈতিক বিবেচনা চালিত হয়, তার প্রতি যদি অধিকতর সক্রিয় মনোযোগ প্রদান করা হতো, তবে অর্থনীতিকে অধিকতর সমৃদ্ধশালী, দক্ষ ও কল্যাণকর শাস্ত্রে পরিণত করা যেত। সমস্যা হলো মূল্যবোধ হচ্ছে এমন চেতনাময় একটি প্রপঞ্চ যা বস্তুগত প্রকরণের মতো বিজ্ঞান দ্বারা প্রস্তুত বা নির্ণয় করা যায় না। আর্নল্ড ব্রেখটস এর ভাষায়, 'মূল্যবোধের ক্ষেত্রে যারা বৈজ্ঞানিক কর্তৃত্বের দাবি করেন, তারা যে ভ্রান্তির মধ্যে নিপতিত তা বিজ্ঞানসম্মতভাবেই দেখানো যায়'। যদি মূল্যবোধকে 'বৈজ্ঞানিক পন্থায়' নির্ণয় করা সম্ভব না হয়, যদি 'বিচারবোধ'কে প্রয়োগ করতে হয়, সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন দাঁড়ায় এ বিচারকের ভূমিকা কে পালন করবে? এ ক্ষেত্রে কী কোনরূপ ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব? এমন একটি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হলে তা সামাজিক স্বীকৃতি লাভের জন্য হবে যথেষ্ঠ শক্তিশালী এবং যে কেউ প্রতিষ্ঠিত সামাজিক বিধিবিধানের বিরুদ্ধে কাজ করলে নিন্দিত হবে। 'আত্মস্বার্থ' ও 'অর্থনৈতিক মানুষ' সংশ্লিষ্ট ধারণার বিলোপ সাধিত হচ্ছে এবং চাহিদা পূরণ ও মূল্যবোধ বিচার সংক্রান্ত ধারণার বিকাশ ঘটছে। এতে দেখানো হচ্ছে যে, মানুষ বৈষম্যের মধ্যে বসবাস করবে না। মানুষ তার যুক্তিবোধ উন্নত করতে, সমস্যার বিশ্লেষণ করতে এবং ভ্রান্তি আবিষ্কার করতে সক্ষম; যেটি সহজ নয়-সেটি হচ্ছে সমস্যার সমাধান। কোনো প্রকার জোড়াতালি বা কৃত্রিম পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাধান সম্ভব নয়। সমাধান নিহিত রয়েছে সার্বিকভাবে সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে এরূপ পুনর্গঠনের মধ্যে, যাতে একদিকে 'অর্থনেতিক মানুষ' পরিণত হবে 'নৈতিকভাবে সচেতন' মানুষে, যিনি ভ্রাতৃত্ববোধ এবং আর্থ-সামাজিক সুবিচারের মাধ্যমে জীবনযাপনে আগ্রহী; অপরদিকে তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে এমনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে যাতে সকলের চাহিদা পূরণ হবে, অথচ আয় ও সম্পদের ক্ষেত্রে ভারসাম্যহীনতা ও বৈষম্য বৃদ্ধি করবে না, বরং তা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকবে। যদিও মূল্যবোধের প্রতি গুরুত্বারোপের পুনর্জাগরণের বিষয়টি প্রশংসনীয়, কিন্তু পাশ্চাত্যের অর্থনীতিতে তার প্রয়োগ একটি দুরূহ কাজ। প্রধান কথা হচ্ছে, গলব্রেইথ এর মতে, 'প্রচলিত ধারণার প্রতি রয়েছে কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গীকার'- যাতে অর্থনীতিকে দেখা হয় একটি বিজ্ঞান হিসেবে এবং তারা বৈজ্ঞানিক ধারণায় বুদ্ধিবৃত্তিক বিশুদ্ধতার মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করেছেন। ধর্ম প্রদত্ত ঐকমত্য ব্যতীত মূলে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে গত দু'দশকে পাশ্চাত্যে নিরপেক্ষ মূল্যবোধ ব্যবস্থার প্রত অঙ্গীকারের ধাণা বহুদূর এগিয়ে গেছে। স্কাডউচ যথার্থই বলেছেন, সামাজিক নৈতিকতা ঐকমত্যের ভিত্তিতে সম্মত মানদণ্ডের উপর নির্ভরশীল, যা স্বতঃসিদ্ধ বলে বিবেচিত বিধায় খুব একটা বিতর্কের অবকাশ রাখে না। ব্যতিক্রমধর্মী কিছু লোক ছাড়া মানব জাতির সমগ্র ইতিহাসে নৈতিকতা কখনোই ধর্ম থেকে আলাদা করে দেখা হয়নি। উপযোগবাদ ও সামাজিক চুক্তি মতবাদ সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য কোনো মূল্যবোধ সম্পর্কে আলোকপাত করতে পারেনি। পাশ্চাত্য জগত সম্পর্কে মিনস্কি মজার কথা বলেছেন, 'আমাদের কী করা উচিত সে সম্পর্কে আমাদের ঐকমত্য নেই, কোনো প্রকার সম্মত মূল্যবোধ ছাড়া এরূপ ঐকমত্যে পৌঁছান কঠিন'।

 

চতুর্থ অধ্যায়ঃ উন্নয়ন অর্থনীতির অসংগতি

চতুর্থ অধ্যায় উন্নয়ন অর্থনীতির অসংগতি উন্নয়ন অর্থনীতির নিজস্ব কোনো স্বরূপ নেই। তিনটি মূলধঅরার অর্থনীতির (নিউক্লাসিক্যাল, কীনেসীয়ান ও স্যোসালিস্ট) যে কোনো বাড়তি অঙ্গ হিসেবে এটা বেড়ে উঠেছে। অর্থনীতির এ তিন ধারাই পশ্চিমা বিশ্বে জন্ম নিয়েছে। তাই উন্নয়ন অর্থনীতির প্রস্তাবিত কৌশলসমূহ এ পশ্চিমা বিশ্বদৃষ্টির আঙ্গিকে রচিত। যে সময়ে মূলধঅরার অর্থনীরিত জোয়ার বইছিল তারই আবহে বেড়ে উঠেছে তৎকালীন উন্নয়ন অর্থনীতির ধারা। উন্নয়ন অর্থনীতির ধাঁচ তাই কীনেসীয়ান, স্যোসালিস্ট ও নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতির উত্থানপতনের দোলাচলে বারবার বাঁক নিয়েছে। দোদুল্যমান আনুগত্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উন্নয়ন অর্থনীতির জন্ম। এ সময় তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশ স্বাধীনতা লাভ করে এবং ঐসব উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়নের সমস্যাসমূহ সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতে থাকে। Economic Development and Cultural Change নামে উন্নয়ন অর্থনীতির উপর প্রথম জার্নালের প্রথম সংখ্যা ১৯৫২ সালে প্রকাশিত হয়। এ সময়ে এ বিষয়ের উপর হাতে গোনা গবেষণামূলক কতিপয় লেখা ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে মহামন্দা এবং যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনের সমস্যার কারণে কীনেসীয় অর্থনীতি এবং সমাজবাদ পশ্চিমে গুরুত্বলাভ করেছিল। উন্নয়ন অর্থনীতিও নিওক্লাসিক্যাল ভিত্তি হতে সরে আসছিল এবং বাজার শক্তির উপর কম নির্ভরশীলতা ও অর্থনীতিতে সরকারের অধিকতর ভূমিকার উপর গুরুত্ব আরোপ করছিল। যাই হোক, ৭০ দশকের প্রথম ভাগে কীনেসীয়ান ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কৌশলের মুঠি শিথিল হয়ে আসলো এবং নিওক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতি আবার মঞ্চে ফিরে আসলো। উন্নয়ন অর্থনীতি প্রবেশ করলো এক সংকট সন্ধিক্ষণে। তাই উন্নয়ন অর্থনীতির উপর সমকালীন লেখাসমূহ আত্মসংশয় ও প্রশ্নবাণে বিদ্ধ। যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠ উন্নয়ন অর্থনীতিবিদগ এখনো উন্নয়ন অর্থনীতির উপযোগিতায় বিশ্বাসী, তবু কেউ কেউ এ একাডিমিক বিষয়টির বৈধতার প্রশ্নে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। বিতর্কটি মেরুকরণ লাভ করছে। মনে করা হচ্ছে, উন্নয়শীল দেশসমূহে বাজার শক্তিসমূহের সমস্যার সমাধানের পথ হচ্ছে বাজার শক্তিসমূহকে স্বাধীনভাবে চল দেয়া ও অর্থনীতিতে সরকারের ভূমিকা ও হস্তক্ষেপ হ্রাস করা। অন্য দলের চিন্তাবিদদের মত হচ্ছে, বাজারব্যবস্থা ও মূল্যের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরতার পথটি সঠিক নয়। তবে বর্তমানে প্রভাবশালী মত হচ্ছে, বাজারমুখী এবং নিয়ন্ত্রণ বিরোধী ব্যবস্থা পশ্চিমা বিশ্বে উদার মতবাদ ও নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতির পুনর্জাগরণের নির্দেশক। উন্নয়নশীল দেশসমূহ বর্তমানে সেব সমস্যায় ভুগছে তার অধিকাংশের জন্য নিয়ন্ত্রণমূলক নীতিকে দায়ী করা হচ্ছে যা তিন দশক যাবত অনুসরণ করা হয়ে আসছে। সীমিত সম্পদের অদক্ষ ব্যবহার, বৃহৎ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও বহির্বাণিজ্যে অন্যায়পরায়নতা, সম্পদ ও আয়ের ক্রমবর্ধমান বৈষম্য বা সামাজিক টানাপোড়েন-এসব কিছুর জন্যই নিয়ন্ত্রণমূলক অর্থনীতিকেই দায়ী হসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বাজার অর্থনীতি ও রাষ্ট্র অর্থনীতির মধ্যে উন্নয়ন অর্থনীতির দোদুল্যমানতা এক সুদৃঢ় লক্ষ্য পথ হতে বিচ্যুত করেছে। এতে সৃষ্টি হয়েছে পরস্পর বিরোধী বিশ্লেষণ ও পথনির্দেশ। অর্থনৈতিক কর্মসূচিতে উদ্ভব হয়েছে অসংগতি ও অনিশ্চয়তা। এসব দেশকে এখন যেসব কাজ করতে হবে তা দ্বিগুণ কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের অর্থনীতির উন্নয়ন এমনভাবে করতে হবে যাতে সীমিত সম্পদের ব্যবহারে অধিকতর দক্ষতা ও ক্ষমতা নিশ্চিত হয়। উপরন্তু ভুল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ইতোমধ্যে যে অসংগতি ও অন্যায়পরায়নতা সৃষ্টি হয়েছে তা অপসারণ করতে হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতির আলোকে যে নতুন নীতিমালার ব্যবস্থাপত্র প্রদান করা হচ্ছে তাতে আকাঙ্ক্ষিত দক্ষতা, ন্যায়পরায়নতা ও স্থিতিশীলতা আসবে কিনা? তাই বিশ্বদৃষ্টি উন্নয়ন অর্থনীতির উপর কী ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং কী সমস্যার জন্ম দিয়েছে তা লক্ষ্য করা প্রয়োজন। নিওক্লাসিক, কীনেসীয়ান এবং সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির শিকড় রয়েছে রেঁনেসা উদ্ভূত বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে। মানব সমস্যার বিশ্লেষণ এবং মানব কল্যাণের উদ্দেশ্য সাধনে উপযুক্ত অর্থনৈতিক চিন্তাধারাসমূহের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে সেকুলার। মানুষের সুখ ও স্থিতির উৎস হিসেবে এসব চিন্তাধারা বৈষয়িক লাভকে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছে। ব্যক্তি ও সমাজ পুনর্গঠনে নৈতিক মূল্যবোধেল ভূমিকা তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। বরং আর্থ-সামাজিক সুবিচারের ধারণার সাথে প্রকৃত প্রস্তাবে তাদের কোনো মানসিক সংগতি ছিল না। নৈতিক মূল্যবোধ কীভাবে সমাজ ব্যবস্থায় বৈষম্য ও অবিচারের বিরুদ্ধে সামাজিক ছাঁকনি প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করতে পারে, সে বিষয়ে তাদের ধারণা ছিল না। সম্পূর্ণভাবে এই বৈষয়িক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে স্বভাবতই সামাজিক-ডারউইনবাদ এবং বস্তুবাদের ফসল ব্যতিরেকে অন্য কিছুরই প্রত্যাশা করা যায় না। দৃষ্টিভঙ্গির এরূপ কাঠামোর কারণে নিজেকে সামাজিক প্রয়োজন পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কোনো উদ্দীপনা কাজ করতে পারে না। অপ্রত্যক্ষভাবে সামাজিক স্বার্থরক্ষা ব্যক্তিস্বার্থ পূরণের পরোক্ষ ফসল হিসেবে বেরিয়ে আসতে পারে। নিরাশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি উন্নয়ন অর্থনীতিবিদের সামাজিক-ডারউইনীয় এবং উচ্চতর বর্ণ ও জাতিসত্তার তত্ত্বের প্রতি যুক্তিহীন বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তারা মূলত অশ্বেতাঙ্গ ও অইউরোপীয় দরিদ্র দেশসমূহের দারিদ্র্য, অনুন্নয়ন ও রাজনৈতিক গোলামীর কার্যকারণকে ঐসব দেশ ও জনগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও জাতিসত্তার তথাকথিত নিম্নমানের ফসল হিসেবে চিহিন্ত করেছে। ফলে উন্নয়ন সম্পর্কে এক ধরনের নিরাশা জন্ম লাভ করেছে। যুক্তি দেখানো হয় যে, এ দেশসমূহ উন্নয়নের পূর্বশর্তগুলো পূরণ করেনি। এ দেশসমূহের সামাজিক, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধসমূহকে উন্নয়নের উপর্যৃক্ত পূর্বশর্তসমূহ বিনির্মাণের অনুপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এমনকি জাতিসংঘের একটি কমিটি কর্তৃক প্রস্তুতকৃত একটি রিপোর্টেও এ ধরনের যুক্তিহীন উচ্চতর বর্ণ ও জাতিসত্ত্বা কেন্দ্রিক মতবাদেরর প্রতি পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করা হয়েছে। ধারণা দেয়া হয়েছে যে, পাশ্চাত্যেও পুঁজিবাদী দেশসমূহের অনুসরণে দরিদ্র দেশসমূহের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং আইনগত কাঠামোর সংস্কার সাধন করা না হলে উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞদের মাঝেও একই ধরনের অভিমত প্রচলিত যে, কেবলমাত্র উন্নত দেশসমূহের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক দর্শন ও কাঠামো অনুসরণর মাধ্যমেই দরিদ্র দেশের পক্ষে পুঁজি গঠন, উৎপাদন ও ভোগের লক্ষ্যমাত্র অর্জন সম্ভব। 'পঞ্চাশ দশকের প্রথম দিকে রচিত বিশ্ব ব্যাংকের ১৩টি রিপোর্ট পড়ে কিন্ডেলবার্জার এবং স্পেঞ্জলার এ ধঅরণাই লাভ করেছেন। এদর মধ্যে সবচেয়ে চাঁচাছোলা বক্তব্য দিয়েছেন ইউজিনি স্টেলের; তিনি বলেছেন যে, কেবলমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া অনুসরণের মাধ্যমেই দরিদ্র দেশসমূহের উন্নয়ন সম্ভব। এসব দেশকে পশ্চিমের মূল্যবোধ ও সমাজ কাঠামো গ্রহণ করতে হবে। এমনকি পশ্চিমা অর্থনীতিবিদদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম বর্ণবাদী অর্থনীতিবিদ মিরডারও মনে করেন উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য শর্তাবলী, যা 'আধুনিক ধ্যানধারণা' নামে অভিহিত, তা দরিদ্র দেশসমূহের নিকট 'বিজাতীয় ও ভিনদেশী'। তাই দেখা যায় প্রাধান্য বিস্তারকারী ধারণার অনুসৃতি ব্যতিরেকে উন্নয়ন সম্ভব নয়। আর এ আধুনিকতা মানে শুধুমাত্র আধুনিক প্রযুক্তি, আধুনিক বাজারজাতকরণ ও ব্যবস্থাপনার কৌশল গ্রহণই নয়, বরং পশ্চিমা জীবন পদ্ধতি ও বস্তুবাদী মূল্যবোধের আত্মীকরণও। প্রবৃদ্ধির পূর্বশর্তসমূহের 'অনুপস্থিতি তত্ত্বের' উপর অগ্রহণযোগ্যভাবে অত্যধিক জোর প্রদান উন্নয়ন সাহিত্যে 'দারিদ্যের দুষ্টচক্র' ধারণাকে গ্রহণযোগ্যতা দান করেছে। নার্কস একে এভাবে প্রকাশ করেছেন, 'বৃত্তাকার শক্তিসমূহ একে অপরের উপর এমনভাবে ক্রিয়া-বিক্রিয়া করে যাতে একটি দরিদ্র দেশ দরিদ্রই থেকে যায়-একটি দেশ দরিদ্র থাকার কারণ এটি দরিদ্র''। 'দারিদ্যের দুষ্টচক্র' ধারণাটি এমন সংক্রামক রূপ লাভ করে যে, প্রত্যেক উন্নয়ন অর্থনীতিবিদই এ ধারণার জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হয়ে পড়েছে। অত্যধিক জনসংখ্যা, স্বল্প আয়, স্বল্প সঞ্চয়, স্বল্প বিনিয়োগ, স্বল্প রপ্তানি ও স্বল্প প্রবৃদ্ধির দুষ্টচক্র অতিক্রম করা দরিদ্র দেশগুলোর জন্য সম্ভব হবে না, যেহেতু এদুলো সৃষ্টি হয়েছে 'আধুনিক ধ্যানধারণা'র অভাবে-এ ধারণাটিই প্রসার লাভ করেছে। তাই এ দেশগুলো নার্কস কথিত 'অনতিক্রমনীয় নিম্নমাত্রার ইক্যুইলিব্রিয়ামের' ঘূর্ণবর্তে ঘুরতে থাকবে। এমনকি ভোগকে সংকুচিত করে তারা যেটুকু সঞ্চয় করে, তাকেও তারা পুঁজিতে পরিণত করতে পারে না। কারণ পুঁজিতে পরিণত করার মাধ্যম রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বৃদ্ধিতে তারা অবম। এ দেশগুলো দু'টি ঘাটতি পৌরণে অবম- সঞ্চয়-বিনিয়োগ এবং আমদানি-রপ্তানি ঘাটতি। ফলে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র হতে পরিত্রাণের আশা এদেশগুলোতে সুদূর পরাহত। 'প্রবৃদ্ধির ধাপ (Stage of growth) তত্ত্বও অন্তর্নিহিতভাবে 'দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র' তত্ত্বকে স্বীকার করে নেয়। এ তত্ত্বগুলোতে উন্নয়নের জন্য যে মৌলিক উপাদানগুলোকে ধরা হয়, তা উন্নয়নের এক ধাপ থেকে অন্য ধাপে যেতে বাধা দেয়। বাধা ও অনগগ্রসরতার চক্রটি ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর হতে থাকে। উন্নয়ন অর্থনীতি সম্পর্কিত অধিকাংশ লেখাতেই আমরা দেখতে পাই উন্নয়নশীল দেশসমূহের প্রবৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বিরাজ করছে এক ধরনের গভীর হতাশা। যেহেতু পাশ্চাত্য জীবনবোধ ও ধরন ব্যতীত অন্য যে কোনো জীবনব্যবস্থা ও পদ্ধতিকে দরে নেয়া হয়েছে উন্নয়নের পরিপন্থি হিসেবে, তাই দরিদ্র দেশসমূহের সীতিম সম্পদ পরিসীমা ও জীবনবোধের সাথে সামঞ্জস্যতা রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের কোনো প্রকার চিন্তভাবনা করা হয়নি। পঞ্চাশ দশকের প্রথম দিকে উইলিয়ামসন এক লেখায় স্বীকার করেছেন যে, 'স্থির মডেল এবং পশ্চিমা সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ধারণা দ্বারা অর্থনীতিবিদগণ এতই আচ্ছন্ন যে তাদের পক্ষে পেশাগতভাবে উন্নয়ন অর্থনীতির বিষয়ে সঠিক ভাবনা ও অবদান রাখার প্রত্যাশা দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েচে। অভিজ্ঞতা হতে সুস্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, উন্নয়ন সম্পর্কে এরূপ হতাশা ভ্রান্তির ফসল। কেননা ভিন্ন ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে, অবস্থা ও সম্পদভিত্তিক হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন দেশে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক উন্নতি সাধিত হয়েছে। সমস্যা হচ্ছে প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও দারিদ্র্য রয়ে গেছে এবং প্রবৃদ্ধির ফসল মুষ্টিমেয় কিছু হাতে জমা হয়েছে। উপরন্তু উন্নয়নশীল দেশসমূহে দেখা দিয়েছে বিপুল বহির্বাণিজ্য ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা। কেন এমনটি হয়েছে তা পরবর্তী আলোচনা হতে সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে। সমাজতান্ত্রিক কৌশল 'উন্নয়ন অর্থনীতি' নামক বিষয়টির জন্মের প্রথম দিকে উন্নয়ন সম্পর্কে যে হতাশার সৃষ্টি হয় তাতেই জন্ম নেয় Critical Minimum Effort নামক ধারণাটির। এ ধারণাটির অর্থ হচ্ছে, যদি এসব দেশসমূহকে 'দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র' ভাঙতে হয়, তবে উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যাবার প্রভাবক শক্তিসমূহ ঐ মাত্রায় অর্জন করতে হবে যাতে বাধার অচলায়তনটি ভাঙা যায়। এ ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, কোনো দেশের জনগোষ্ঠী যখন সাংস্কৃতিকভাবে পশ্চাৎপদ এবং সঞ্চয় প্রবণতা ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ যখন সীমি তখন মীভাবে প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় এ Critical Minimum Effort অর্জন করা সম্ভব হবে। এ সম্পর্কে দুটি মত প্রচলিত আছে। একটি মত হলো 'সমাজতান্ত্রিক নির্মাণ কৌশল' যেখানে অর্থনীতিতে সরকারি ভূমিকা অগ্রগামী এবং এত রাষ্ট্রযন্ত্র সামগ্রিক পরিকল্পনা, নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি খাত ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচনা করবে। এ ব্যবস্থাপনা বেসরকারি খাত ও বাজার অর্থনীতির উপর নির্ভরশীল নিওক্লাসিক্যাল চিন্তাধারার বিপরীত মেরুতে অবস্থিত। অন্য চিন্তধারাটি হচ্ছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়নের স্বার্থে আর্থ-সামাজিক সুবিচারের লক্ষ্যটিকে আপাতত কম গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নয়ন সম্পর্কিত লেখাজোখায় সমাজতান্ত্রিক কর্মকৌশলের প্রতি আস্থাশীলতার জোয়ার সৃষ্টি হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও গণচীনে কমিউনিস্ট আমলে এবং পশ্চিমে কীনেসীয় অর্থনীতির প্রাথমিক সাফল্যে। যুক্তি দেখানো হতে থাকে যে, নিওক্লাসিক্যাল অর্থনৈতিক মডেল যা দ্রব্যমূল্যের সামান্য পরিবর্তরে প্রতক্রিয়ায় বাজারব্যবস্থা ব্যাপকভাবে সাড়া দেয় তা উন্নয়নশীল দেশের জন্য বাস্তবসম্মত মডেল হতে পারে না। কেননা শেষোক্ত দেশসমূহ নানাবিধ প্রতিষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক জড়তা ও অস্থিতিস্থাপকতা দ্বারা স্থবির হয়ে আছে। উন্নয়নশীল দেশসমূহের সরকারগুলোকে উন্নয়নের জন্য অগ্রবর্তী ভূমিকা নিয়ে জোর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কেবলমাত্র এক ধরনের big push দ্বারাই এর self generating, self sustained growth এবং great leap forward অর্জন করতে পারে। 'বিগ পুশ' ধারণাটি আসলে স্টালিনের 'সমাজতান্ত্রিক শিল্পায়নের রাস্তা'র অপর নাম। স্টালিনের সময় ভারী শিল্পকে অগ্রাধিকার দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন উচ্চগতির প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল। ভারী শিল্পায়ন কৃষি ও সোভিয়েত অর্থনীতির অন্য সব খাতের উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। এভাবে পুঁজিবাদী বিশ্ব হতে আমদানি নির্ভরতা কমানো সম্ভব হয়। সোভিয়েত মডেলের লনুসরণে একইভাবে উন্নয়নশীল দেশসমূহে ভারী শিল্পের বিকাশ ও নগর উন্নয়নের উপর অধিক জোর দিয়ে 'বিগ পুশ' অর্জন করতে হবে। কতিপয় শিল্পে উপর্যুপরি বিনিয়োগ কেন্দ্রীভূত করতে হবে। রোজেনস্টেইন-রোডান এর মতে এটা সাফল্যের জন্য যথেষ্ট না হলেও প্রয়োজনীয় শর্ত। 'বিগ পুশ' তত্ত্বে পুঁজির বৃহৎ প্রকল্পের প্রতি পক্ষপাতিত্ব রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশসমূহকে শিল্পায়নের পথে নিয়ে যাবার জন্য ভারী শিল্পের উপর অগ্রাধিকার প্রদান অপরিহার্য এ চিন্তাধারাকে জোরদার করে তোলা হয়। এ ধরনের ভারী শিল্পের ক্ষুদ্রতম ইউনিটও এত বিশাল যে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পক্ষে তাতে নাক গলানোর চিন্ত করাও দুঃসাধ্য, তাই এগুলোর বেড়ে ওঠা সম্ভব হবে সরকারি খাতে। 'বিগ পুশ' তত্ত্বের ফলাফল দাঁড়ালো অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে সরকারি খাতের ভূমিকার উপর মাত্রতিরিক্ত গুরুত্বারোপ। নিওক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতির বদলে আসলো নতুন এক অর্থনৈতিক তত্ত্ব যা পরিকল্পনা, সরকারি হস্তক্ষেপ, শিল্পায়ন, আমদানি-প্রতিস্থাপন, নগরায়ন ও অন্যান্য নীতিমালার মাধ্যমে অর্থনীতিতে সরকারের ক্রমবর্ধমান ভূমিকাকে অপরিহার্য বলে ঘোষণা করল। উন্নয়ন অর্থনীতি সাধারণভাবে অর্জন করল পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতি বিরোধী এক জঙ্গি মনোভঙ্গি। সার্বিক পরিকল্পনার ধারণা দেশের পর দেশ জয় করে নিল। এ পরিকল্পনা সকল পুঁজি বিনিয়োগ উদ্যোগের ভার ভারী শিল্পায়নের কাঁধে অর্পণ করল। পরিকল্পনা তাই দক্ষতা ও ন্যায়পরতা অর্জনের জন্য শুধুমাত্র দিকনির্দেশনায় সীমাবদ্ধ রইল না, বরং বিনিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণের পুরো দায়ভার সরকারের উপর চাপিয়ে দিলো। ন্যায়পরতা নীতির প্রতি অবহেলা একটি বিশ্বাস বিস্তৃতি লাভ করল যে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আর্থ-সামাজিক সুবিচার-উভয় লক্ষ্য একসাথে অর্জন সম্ভবত সংগতিপূর্ণ নয়। যদি প্রবৃদ্ধিকে লক্ষ্য স্থির করা হয়, তবে ন্যায়ভিত্তিক বণ্টনের লক্ষ্যকে পরিত্যাগ করতে হবে। উন্নয়ন পরিকল্পনায় অবশ্য একথা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার বিবেচনায় সোচ্চারভাবে উচ্চারণ করার অবকাশ নেই। তাই পরিকল্পনাসমূহের লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে আর্থ-সামাজিক সুবিচারের কথাটি কাগুজে প্রতিশ্রুতি হিসেবে আওড়ানো হতে থাকে। উন্নয়নশীল দেশসমূহের মধ্যে ১৯৫২ সালে প্রণীত ভারতের প্রথম পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্র হিসেবে পূর্ণাঙ্গ কর্মসংস্থান ও সর্বোচ্চ উৎপাদনের পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক ন্যায্যতা অর্জনের কথা ব্যক্ত করা হয়। পাকিস্তানের ১৯৫৬ সনের শাসনতন্ত্রে রাষ্ট্রীয় নীতিমালার মৌলিক দিকনির্দেশনা হিসেবে গণমানুষের স্বার্থের পরিপন্থি কতিপয় ব্যক্তির হাতে সম্পদের কেন্দ্রীভূতকরণকে প্রতিহত করার ঘোষণা ব্যক্ত করা হয়। জাতীয় পরিকল্পনা বোর্ডের কার্যপরিধি ও প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার লক্ষ্যসমূহ ব্যক্ত হয় ন্যায়ভিত্তিক ধ্যানধারণার পরিভাষায়। পাকিস্তানের দ্বিতীয় পরিকল্পনায়ও প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মতো ন্যায়ভিত্তিক আদর্শকে পুনর্ব্যক্ত করা হয়। তবে প্রকৃতপক্ষে আর্থ-সামাজিক সুবিচারের লক্ষ্যকে বাস্তবে রূপায়িত করার জন্য ভারত, পাকিস্তান ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ১৯৫৫ সালে উন্নয়ন সাহিত্যে ন্যায়পরতা বিরোধী তত্ত্বপ্রবাত নিয়ে আসলেন স্যার আর্থার লুইস। পরবর্তী দেড় দশক যাবত তাত্ত্বিক মতবাদ চালু ছিল। তিনি বললেন, প্রথমেই মনে রাখা দরকার আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে প্রবৃদ্ধি অর্জন, বণ্টন-ন্যায়পরতা নিশ্চিত করা নয়। বেয়ার এবং ইয়ামী ১৯৫৭ সালে বলেন, 'দরিদ্র জনগণের মাঝে আয়ের সমবণ্টনের নীতিমালার মাধ্যমে মাথাপিছু আয়ভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। এমনকি জাতিসংঘও বণ্টন ন্যায়পরতাকে তার নীতিমালার লক্ষ্য হিসেবে স্থির করেনি, বরং জাতিসংঘের দলিলে বলা হয়, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাধারণ লক্ষ্য হচ্ছে জাতীয় আয় বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারকে বৃদ্ধি করা। অধ্যাপক হ্যারি জনসন ১৯৬৪ সালে জোর দিয়ে বলেন, 'দ্রুত উন্নয়নে আগ্রহী একটি দেশের জন্য আয়ের সমবণ্টনের নীতির উপর জোর দেয়া বিজ্ঞতারর পরিচায়ক হবে না'। ১৯৬৪ সনে প্রকাশিত জেরাল্ড মেয়ার এর বহুল পঠিত Leading Issues in Economic Development এর প্রথম সংস্করণে দারিদ্র্য, অন্যায়পরতা এবং আয়ের বণ্টনের বিষয়গুলো সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল। এমনকি মধ্য ষাটের দশকে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কিত কোনো কনফারেন্সের লক্ষ্য হিসেবে দারিদ্র্য ও অন্যায়পরতা নিরসনের কোনো উল্লেখ দেখা যায় না। ১৯৬৬ সনের সেমিনার, সিম্পোজিয়ামের কার্যবিবরণী পড়লে তা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। দ্রুত উন্নয়নের কিছু প্রবক্তা এতদূর অগ্রসর হন যে, তারা বলতে থাকেন, আয়ের বৈষম্য বেড়ে ও্ঠা আরো বেশি জরুরি, কেননা এতে ধনীরা অধিক সঞ্চয়ের সুযোগ পাবে। পুঁজি গঠন তরান্বিত হবে। এ ধারণার অনুকূলে প্রধান বিষয়ে হিসেবে কুজনেটস এর Inverted U-curve কে উপস্থাপন করা হতে থাকে। যদিও কুজনেটসের উক্ত রেখা, লেখা বা পরিসংখ্যান হতে এ রূপ ধারণার কোনো সমর্থন পাওয় যায় না। কুজনেট কার্ভে বরং দেখানো হয়েছে উন্নয়নের প্রথম পর্যায়ে আয়ের বৈষম্য দেখা দেয়, যা পরবর্তীতে ক্রমশ হ্রাস পায়। আয় বৈষম্যের পক্ষাবলম্বনকারী প্রবক্তারা এ কথা ভুলে যান যে, কুজনেটস কার্ভেল প্রদর্শিত প্রবণতা প্রকৃতির অলংঘনীয় কোনো নিয়মের প্রকাশ নয়। এমনটিও তো হতে পারে যে, কুজনেটসের কার্ভের চিত্রটি প্রকৃতির কোনো দৃঢ় আইন নয়, বরং অনুসৃত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও পদ্ধতির ফসল মাত্র। উপর্যুক্ত মতবাদের পক্ষে বলা হয় যে, শিল্পবিপ্লবের সময় তীব্র আয় বৈষম্যের কারণে উচ্চতর সঞ্চয় হার অর্জন সম্ভব হয়েছিল। এডাম স্মিথ হতে শুরু করে অনেক অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ বৈষম্য ও প্রবৃদ্ধির মাঝে যোগসূত্র টানার চেষ্টার করেছেন। তৃতীয় বিশ্বের শ্রম-আধিক্যপূর্ণ দেশসমূহের জন্য এ সূত্রকে মডেল হিসেবে ধরে নেয়া হয়েছে। অবশ্য সাক্ষ্য প্রামণ উপযুক্ত তত্ত্বের অনুকূলে কিছু পরিবেশন করতে পারেনি। আয় বৈষম্যের কারণে বৃটেনে বা আমেরিকায় সঞ্চয়ের উদ্ভব ঘটেনি। সমকালীন সময়ে বিভিন্ন দেশে সঞ্চয়ের পিছনেও এরূপ বৈষম্যের কোনো অবদান দেখা যায় না। পরিকল্পিতভাবে মুদ্রাস্ফীতিকে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের তত্ত্বও উপস্থাপন করা হয়েছে। কেননা মুদ্রাস্ফীতি সরকারের ঋণ পরিশোধের ভার লাঘব করে এবং জনগণকে সঞ্চয়ে বাধ্য করে। যুক্তি প্রদর্শন করা হয় যে, মুদ্রাস্ফিতর ফলে আয় এমন শ্রেণীর অনুকূলে পুনর্বণ্টিত হয় যারা অধিক সঞ্চয়প্রবণ। প্রফেসর হেইস যুক্তি দেখান যে, মুদ্রাস্ফীতিজনিত মূল্যবৃদ্ধিতে শিল্প ও বণিক শ্রেণীর লাভের হার বৃদ্ধি পেয়ে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাড়ে। এ যুক্তি এক ভুল ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে, যেন শ্রমিকের বেতন মজুরির প্রতিটি টাকা ভোগের কাজে ব্যয় হয়। আর যে টাকাটি শ্রমিককে দেয়া হয় না তা সঞ্চয় ও বিনিয়োগের কাজে ব্যবহৃত হয়। এই চিন্তাধারা উন্নয়নশীল দেশসমূহের নেতা ও নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করে। এমনকি জওহরলাল নেহেরুর মতো সামাজিক সুবিচারে আস্থাশীল ব্যক্তিও ভঅরতে আয় বৈষম্য প্রবণতাকে এ বলে মেনে নেন যে, 'বর্ধিষ্ণু একটি অর্থনীতিতে কিছু মাত্রায় আয় বৈষম্য অবশ্যম্ভাবী'। কিছু মুসলিম অর্থনীতিবিদ এ কোরাসে যোগ দেন। কিন্তু আর্থ-সামাজিক সুবিচারের প্রশ্নে ইসলামের অবস্থান সুস্পষ্ট। এসব মুসলিম অথনীতিবিদ সেকুলার সামাজিক-ডারউইনবাদকে তুলে ধরে বলেন আর্থ-সামাজিক সুবিচারের ধারণাটি একটি বিলাস যা কেবলমাত্র ধনী দেশগুলোই বহন করতে পারে। মাহবুবুল হক, যিনি পরবর্তীতে পাকিস্তানের অর্থ ও পরিরকল্পনা মন্ত্রী হয়েছিলেন, তিনি লিখেছেন, 'অনুন্নত দেশসমূহকে অত্যন্ত সচেতনভাবে প্রবৃদ্ধির দর্শনকে গ্রহণ করতে হবে এবং ন্যায়সঙ্গতবণ্টন ও কল্যাণ রাষ্ট্রের ধ্যান ধারণাগুলোকে ভবিষ্যতের সূতিকাগারে জমা রাখতে হবে। এটা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, এ ধারণগুলো হচ্ছে ধনিক দেশগুলোর উপযোগী বিলাসিতা'। সম্ভবত এ কথাটি বিবেচনায় আনা হয়নি যে, ইসলামী মূল্যবোধে অবিচার করা, তাকে সমর্থন করা বা ক্ষমার চোখে দেখা একটি বড় অপরাধ। উন্নয়নশীল অর্থনীতির সমাজতান্ত্রিক প্রবণতা তাই সামাজিক সুবিচার নিশ্চিতকরণের বিষয়ে কোনো উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেনি। অথচ আমরা জানি পাশ্চাত্য ও সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ায় সমাজতন্ত্রের দুনিয়ায় সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা ছিল অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশে সমাজতন্ত্রের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, সামাজিক সুবিচার নয়, বরং পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রযন্ত্রের শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি তরান্বিত করার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা। উন্নয়নশীল দেশে সমাজতন্ত্র তাই রূপ নিয়েছে এক ভিন্ন প্রকৃতির যা কমিউনিস্ট বিশ্ব ও পশ্চিমা বিশ্ব হতে ভিন্ন এক তৃতীয় ধারা। তৃতীয় বিশ্বে সমাজতন্ত্র তার অন্য সকল লক্ষ্য ও দর্শন হারিয়ে হয়ে দাঁড়িয়েছে শুধুমাত্র অর্থনীতির বৃহৎ অংশের রাষ্ট্র কর্তৃক মালিকানা ও পরিচালনা। সমাজতন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে যান্ত্রিক পরিকল্পনার অপর নাম। যদিও এ সময়ে কিছু অর্থনীতিবিদ সমাজতন্ত্রের ন্যায়বিচারের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন, তারা ছিলেন সংখ্যালঘিষ্ঠ। মূলধারার মতবাদটি ছিল 'trickle-down' বা 'চুঁইয়ে পড়া' মতবাদ, যাতে বলা হয়েছে, প্রবৃদ্ধি তরান্বিত হলে তা পরে ছড়িয়ে পড়ে দারিদ্র্য ও আয় বণ্টনের সমস্যা সমাধান করবে। কিন্তু বাস্তবে 'চুঁইয়ে পড়া' পদ্ধতি গুরুতরভাবে অকার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। এটাই হবার কথা। কেননা দারিদ্র্য এবং আয় বৈষম্য এত বেশি বিস্তৃত, অতলস্পর্শী ও অমোচনীয় যে, অর্থনীতিতে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার, অর্থব্যবস্থার পরিবর্তন, উপযুক্ত মূল্যবোধ ও প্রেরণা সৃষ্টি ব্যতিরেকে এর অপনোদন প্রত্যাশা করা অবাস্তব স্বপ্নমাত্র। অন্তঃসারশূন্য বিতর্ক সামাজিক ঐকমত্য দ্বারা নির্ণীত মূল্যবোধ ও আর্থ-সামাজিক ন্যায়পরায়ণতার ছাঁকিনি (filter) ব্যবস্থার দ্বারা উন্নয়ন ও তার ফসল সমগ্র জনগণের মধ্যে বণ্টনের প্রয়োজনীয়তার প্রতি উন্নয়ন অর্থনীতির দর্শনের যে অঙ্গীকারের প্রয়োজন ছিল, তা ছিল দুঃখজনকভাবে অনুপস্থিত। ফলে উন্নয়ন সম্পর্কিত এ যাবত সমগ্র আলোচনা পরিণত হয়েছে শূন্যগর্ভ চুলচেরা বিশ্লেষণ ও অর্থহীন বিতর্কে। উন্নয়নের জন্য উন্নয়ন এবং সমাজে বৈষম্য সৃষ্টির মধ্য দিয়ে উন্নয়ন-এ দুই উন্নয়ন অর্থনীতির দর্শন দেশজ অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য ও প্রত্যাশিত সেই ছাঁকনি প্রক্রিয়ার আনজাম দিতে পারেনি যা বিভিন্ন খেয়ালখুশি ও ঝোঁক তাদের সমগ্র আলোচনা ও অভিসন্দর্ভকে অন্তহীন ও দিশাহীন এক পথে ঠেলে দিয়েছে। উন্নয়নের সকল বিবেচ্য ক্ষেত্রেই একথা সত্য। কৃষি বনাম শিল্প, গ্রামীণ বনাম নগর উন্নয়ন, ভারসাম্যপূর্ণ বনাম ভারসাম্যহীন উন্নয়ন, আমদানি প্রতিস্থাপন বনাম রপ্তানি উন্নয়ন, বাজার অর্থনীতি বনাম পরিকল্পনা-সকল বিষয়ের আলোচনার ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য। অর্থনীতিতে দক্ষতা ও ন্যায়পরতা এ দু'টিই যদি আকাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য হয়, তবে দেখা যাবে, এ যাবত উন্নয়ন সম্পর্কিত সমগ্র আলোচনা এ দু'টি বিষয় নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে সমগ্র আলোচনাই পরিণত হয়েছে এক অর্থহীন বাকসর্বস্ব আপাত চাকচিক্যময় কথামলায়। উন্নয়ন অর্থনীতির আলোচনাতেই উন্নয়নের লক্ষ্য হিসেবে আর্থ-সামাজিক ন্যায়নীতিকে ধরা হয়নি। উন্নয়নশীল দেশসমূহ উন্নয়নের কোন ধাপে অবস্থান করছে, তাদের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য কী, কোন উদ্দীপনাসমূহ মানুষকে সমাজস্বার্থ ও ব্যক্তিস্বার্থের সাথে সংগতি রেখে কর্মপ্রেরণা দান করে-এসব সম্পর্কে উন্নয়ন অর্থনীতির আলোচনায় পরিষ্কার ধারণার অভাব সুস্পষ্ট। এর ফলে উন্নয়নশীল অর্থনীতির যে সামগ্রিক ক্ষতি হয়েছে তা হচ্ছে, স্বাচ্ছন্দ গতিশীলতার বদলে প্রতিবন্ধকতা, শ্লথ প্রবৃদ্ধি রেখা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, প্রাণশক্তি শুষে নেয়া ঋণ এবং সামাজিক অস্থিরতা। সত্যিকার কর্মচেতনা ও ন্যায়ানুগ বণ্টন নীতিমালার বোধ ও স্পৃতা সম্বলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ধারণা ও কাঠামো গড়ে তোলা যেত, যদি সমগ্র নীতিমালার লক্ষ্য থাকত আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। তাহলে উন্নয়ন পরিকল্পনার এত বেশি বাধাবিঘ্ন, শ্লথ গতি ও ধসে পড়ার মুখোমুখি হতে হতো না। কৃষি বনাম শিল্প উন্নয়নশীল দেশের অধিকাংশ জনগণ গ্রামাঞ্চলে বাস করে। তাই পল্লী ও কৃষি উন্নয়ন ছাড়া তাদের ভাগ্যোন্নয়ন সম্ভব নয়। পল্লী উন্নয়ন তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের অনেক পথের মাঝে একটি পথ মাত্র নয় বরং পল্লী উন্নয়ন অত্যাবশ্যক ও অপরিহার্য। তবে শিল্পোন্নয়নের সমর্থন ছাড়া পল্লী উন্নয়ন সম্ভব নয়, এ কথাও সত্য। কৃষকদের আয় বাড়ানো প্রয়োজন যাতে তারা উন্নত বীজ, প্রযুক্তি ও সার ব্যবহার করতে পারে। কৃষক পরিবারের বেকার ও অর্ধবেকার সদস্যদের কর্মসংস্থান ব্যতিরেকে আয় বাড়ানো সম্ভব নয়। যুগপৎ গ্রামীণ এলাকায় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বিকাশ ছাড়া কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব হবে না। উন্নয়নশীর দেশের অধিকাংশের জন্য তাই পল্লী উন্নয়নের পাশাপাশি শিল্পোন্নয়ন অত্যাবশ্যক। এ দ্বৈত উন্নয়ন প্রক্রিয়া হবে মৌলিক চাহিদা পূরণ ও বৈষম্য হ্রাসের জন্য প্রয়োজন তাই দেশের অর্থনীতির ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন নীতি অনুসরণ। গ্রামীণ উন্নয়ন বা শিল্পোন্নয়ন কোনোটাই এককভাবে উন্নয়নশীল দেশের বঞ্ছিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাতে পারে না। এ জন্য প্রয়োজন অর্থনীতির সকল খাতের আধুনিকীকরণ ও বহুমুখীকরণ। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য তাই কৃষি উন্নয়ন বা শিল্পোন্নয়ন কোনো বিকল্প পন্থা নয় যে তাদেরও মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নিলেই হলো। এ উভয় খাত পরস্পর নির্ভরশীল এবং এক অন্যের পরিপূরক। প্রকৃত প্রস্তাবে কৃষি খাত বা শিল্প খাতের উন্নয়ন লক্ষ্য হচ্ছে, কিভাবে এ খাতদ্বয়ের উন্নয়নের মাধ্যমে জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো যায়। যদি নীতি নির্ধারকদের লক্ষ্য হতো আপামর সাধারণ মানুষের কল্যাণ সাধান করা, তবে তারা অবশ্যই কৃষি ও শিল্প উভয় খাতের যুগপৎ উন্নয়নে মনোযোগী হতেন। এসব আলোচনা হতে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, কোনো অর্থনৈতিক কর্মসূচি যা অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন হারের বৈষম্যমূলক প্রবৃদ্ধি বা unbalanced growth এর তত্ত্ব উপস্থাপন করে, তথা কৃষি বা শিল্প কোনো খাতকে অধিক গুরুত্ব প্রদান করে, তা জনগণের জন্য দুর্দশা, কল্যাণ ও সংকট ব্যতিরেকে অন্য কিছু বয়ে আনে না। এ ধরনের একদেশদর্শী নীতি একবার চালু হলে তার কুফল পরিবর্তনের জন্য পরবর্তীতে প্রয়োজন হয় সংশোধনমূলক নীতিমালার প্রবর্তন। এ সংশোধনমূলক ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ ও প্রয়োগ কখনো সহজ ও সমস্যা মুক্ত হয় না। আমদানি প্রতিস্থাপন এবং রপ্তানি উন্নয়ন যদি কৃষি ও শিল্পকে সমভাবে গড়ে তুলতে হয়, তবে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে আমদানি প্রতিস্থাপন ও রপ্তানি উন্নয়নের গুরুত্বকে সুস্পষ্টভাবে উপলদ্ধি করতে হবে। একটিকে খাটো করে অন্যটিকে গুরুত্ব প্রদানের কোনো প্রয়োজন নেই। উভয় খাতই অত্যাবশ্যক, যদিও অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিভিন্ন ধাপে তাদের তুলনামূলক গুরুত্ব হ্রাস-বৃদ্ধি পেতে পারে। অবশ্যই এ কথার অর্থ এই দাঁড়ায় না যে, যে কোনো মূল্যেই আমদানি প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। যেহেতু চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে, সীমিত প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। যেহেতু চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে, সীমিত সম্পদের দক্ষ ও সুসম ব্যবহারের মধ্য দিয়ে জনগণের সর্বোচ্চ কল্যাণ সাধন করা, তাই আমদানির ক্ষেত্রে ট্যারিফ ও নন- ট্যারিফ দেয়ালগুলো তুলে দেয়া বা না দেয়ার বিষয়টি উক্ত পদক্ষেপ দ্বারা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনগণের আর্থ-সামাজিক কল্যাণ কতটুকু নিশ্চিত হবে সে নিরিখে দেখতে হবে। উৎপাদন উপকরণের বিভিন্ন খাতে বণ্টনের যুক্তিযুক্ত নীতিমালাকে উপেক্ষা করা সংগত হবে না। কেননা সম্পদের অদক্ষ ব্যবহারের মূল্য দিতে হবে জনগণকে, যা কোনোক্রেমই মেনে নেয়া যায় না। এতদসত্ত্বেও দেখা যায়, আমদানি প্রতিস্থাপন কর্মসূচি দ্বারা ধনিক-বণিক শ্রেণীর কায়েমী স্বার্থ সংরক্ষিত হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে পরনির্ভরশীলতা হ্রাসের শ্লোগানটি ব্যবহার করা হয় জনগণের দেশপ্রেমিক অনুভূতিকে ব্যবহারের জন্য। অর্থনৈতিক নীতিমালা হিসেবে আমদানি-প্রতিস্থাপন কর্মসূচিতে কোনো ত্রুটি নেই। ত্রুটি হচ্ছে যে অবস্থা ও পদ্ধতিতে তার অপপ্রয়োগ হচ্ছে তাতে। যদি উন্নয়নের লক্ষ্য হয়ে থাকে সমাজে ন্যায়পরতা সৃষ্টি করা, তাহলে সর্বপ্রথম প্রয়োজন ছিল কৃষি, ক্ষুদ্র ও ব্যষ্টিক শিল্পের (Small Micro Entreprise-SME) সমর্থনে আমদানি প্রতিস্থাপন কর্মসূচিকে ব্যবহার করা। এর ফলে গ্রামীণ এলাকা এবং ক্ষুদ্র শহর ও নগরীতে কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রসারিত হতো। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে তাদের ভিটেমাটি হতে উচ্ছেদ হয়ে নগরমুখী হতে হতো না। কিন্তু গ্রামীণ এলাকায় প্রত্যাশিত কৃষিনির্ভর ক্ষুদ্র ও ব্যষ্টিক শিল্পের উন্নয়নের পদক্ষেপ পরিবর্তে গ্রহণ করা হলো শহরাঞ্চলে বৃহৎ শিল্প কারখানা স্থাপনের কর্মসূচি। বৃহৎ শিল্প স্থাপনে সহায়তার লক্ষ্যে সরকার কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রিত বৈদেশিক মুদ্রাহার ও উচ্চ ট্যারিফহার নির্ধারণ করল। নিম্নমূল্যে উৎপাদন উপকরণ সরবরাহের মাধ্যমে প্রদান করল বিপুল ভর্তুকি। পুঁজিবাদী আন্তর্জাতিক সহায়তা এগিয়ে আসলো। এসব চোখ ঝলসানো বৃহদায়তন প্রকল্পের প্রতি আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাসমূহের সুদৃষ্টি উল্লেখের অপেক্ষা রাখে না। কৃষি এবং ক্ষুদ্র ও ব্যষ্টিক শিল্প খাত সরকারের পক্ষ হতে ভর্তুকি বা অন্য কোনো প্রকার সহায়তা পায়নি, তদুপরি উচ্চ মূল্যমানের বৈদেশিক মুদ্রাহারের কারণে এ খাতগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব খাতে ব্যবহৃত প্রযুক্তি ছিল প্রাচীনকালের। ক্রমউৎপাদনশীলতার কারণে আয় সঞ্চয় ও বিনিয়োগের মাত্রা ছিল অনুল্লেখ্য। ফলে বেকারত্ব ও অর্ধবেকারত্ব বৃদ্ধি পায়। ভারী যন্ত্রপাতির দাম কৃত্রিমবাবে কম রাখায় এবং ট্যারিফহার ও অতিরিক্তভাবে মূল্যায়িত বৈদেশিক মুদ্রার সযোগের কারণে আমদানি প্রতিস্থাপক বৃহৎ শিল্প কারখানা প্রসার লাভ করল। উপরন্তু সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী উৎপাদন ও তাদের সার্বিক স্বার্থ দেখা যেহেতু সরকারি নীতিমালার প্রধান লক্ষ্য ছিলনা, তাই আমাদানি প্রতিস্থাপক যে সকল বৃহৎ শিল্প কারখানা স্থাপনের জন্যে নির্ধারণ করা হলো তা গণমানুষের স্বার্থ ও কল্যাণের অনুকূলে গেল না। যদি তা করা হতো, তাহলে অন্তত সাধারণ মানুষ সুলভ মূল্যে তাদের প্রয়োজনীয় ভোগ্য সামগ্রী লাভ করতে পারত। যদিও এ ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের প্রশ্নটি সুরাহা সম্ভব হয়ত হতো না। কিন্তু দেখা গেল ঐসব বৃহদায়তান শিল্প কারখানা গড়ে তোলা হলো যা সাধারণ মানুষের অত্যাবশ্যক দৈনন্দিন পণ্যসামগ্রী উৎপাদনের প্রয়োজন পূরণের জন্যে নয়, বরং মুনাফামুখী বিলাস দ্রব্য ও ভারী যন্ত্রপাতি উৎপাদনে নিয়োজিত রইল। দেশীয় বাজার ক্ষুদ্র হবার কারণে এসব শিল্প দ্রব্যের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ছিল সীমিত এবং অদক্ষ হবার কারণে তারা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেনি। অপরদিকে এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি নির্ভর বিধায় প্রতিস্থাপক শিল্প কারখানা দ্বারা দেশর শিল্পদ্রব্য সামগ্রির ঘাটতি পূরণ ও আমদানি নির্ভরতা কমানো সম্ভব হলো না। প্রকৃত প্রস্তাবে শুধু এক শ্রেণীর আমদানির বদলে অন্য শ্রেনীর আমাদানি প্রতিস্থাপিত হলো মাত্র। বিদেশ হতে আমদানি করা কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি দিয়ে বড় শিল্প কারখানা গড়ে তোলার মাদ্যমে প্রত্যাশিত মাত্রার কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধি হলো না, যা দিয়ে কৃষি, ক্ষুদ্র ও ব্যষ্টিক শ্পিরৈ দ্রব্যসামগ্রীর চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। কোনো খাতের প্রবৃদ্ধির ফলে স্বাভাবিকভাবে অর্থনীতিতে যে ‘লিংকেজ’ প্রতিক্রিয়া তথা অন্যখাতগুলোর জন্যে যে সুযোগ সুবিধার সৃষ্টি হবার কথা, তা হলো না। বৃহদায়তন শিল্পসমূহের জন্যে যে আমদানি করতে হয় বাড়তি মুনাফা সে পথে আবার ফিরে গেল। ধনী দেশগুলোতে পুঁজির আধিক্য ও শ্রমের স্বল্পতার কারণে সেখানকার প্রযুক্তিসমূহ স্বাভাবিক কারণেই পুঁজি-নিবিড়। উন্নয়নশীল দেশসমূহের শিল্পকারখানায় উন্নত বিশ্ব হতে আমদানিকৃত এসব পুঁজি নির্ভর প্রযুক্তি ব্যবহৃত হতে লাগল। ফলে শিল্প কারখানা গড়ে ওঠলেও সে অনুযায়ী কর্মসংস্থানো সযোগ প্রসারিত হলোনা। অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় সম্পদের বৃহৎ ভাগ কৃষি, ক্ষুদ্র ও ব্যষ্টিক শিল্প খাতে সৃষ্টি হলেও এসব খাত ন্যায্য হিস্যা হিসেবে পুঁজি রূপে এ সঞ্চয়ের ভাগ পেল না। বরং ঐ সঞ্চয় প্রবাহ সরকারের পক্ষপাতমূলক নীতি কারণে বৃহত শিল্পখাতে প্রবাহিত হলো। ফলশ্রুতিতে গ্রামীন হস্তশিল্প বিলেতি তাঁতশিল্প দ্বারা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর অংশের জন্যে বেকার থাকা ছাড়া অন্য কোনো পথ থাকলনা অথবা তারা শহরাঞ্চলে পাড়ি জমাতে বাধ্য হলো। এর অর্থ অবশ্য এ নয় যে, অর্থনীতির উন্নয়নে বৃহদায়তান পুঁজি নির্ভর শিল্পখাতকে খাটো করে দেখা। কথা হচ্ছে যে, যেহেতু আত্মকর্মসংস্থান ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি যেখানে প্রাধান্য পাওয়া সামাজিকভাবে প্রয়োজন, সেখানে পুঁজি-নিবিড় বৃহৎ শিল্প তখনই গড়ে উঠতে দেয়া উচিত, যখন শ্রমনিবিড় শিল্প সমূহ ঐসব দ্রব্যসামগ্রী উৎপাদনে সমর্থ নয় বলে দেখা যায়। ‘উন্নত চিন্তা কিন্তু সরল জীবনযাপন’ –প্রাচ্যের এ দর্শনের নিজস্বতার সাথে সংগতি রেখে দেশীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন দর্শন ও কর্মপদ্ধতি গড়ে তোলার পরিবর্তে পাশ্চাত্য জীবনবোধ ও পদ্ধতির প্রতি যে আসক্তি ও প্রচারণা চালানো হয়েছে, তাতে বর্তমানে যে ধারার দ্রব্যসামগ্রীর শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে সেই প্রবণতাটাই স্বাভাবিক ছিল। এটা আরো প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে পাশ্চাত্যের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল উৎপাদনকারী বেনিয়া ও শিল্পপতি গোষ্ঠীর কায়েমী স্বার্থে। তারা তাদের পণ্য ও প্রযুক্তি তৃতীয় বিশ্বে বাজারজাতকরণের লোভনীয় পন্থা অনুসরণ করেছে। ব্যাংক ও ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান মারফত ‘ক্রেডিট সেল’ এর মাধ্যমে তার তৃতীয় বিশ্বে তাদের পণ্য সামগ্রীর বাজার সৃষ্টি করে নেয়। ফলে উন্নয়নশীল বিশ্বের রপ্তানির চেয়ে আমদানি বৃদ্ধি পায়। সৃষ্টি হয় আমাদানি ও রপ্তানির মাঝে ভারসাম্যহীনতা ও বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের সংকট। যদি শিল্পায়ন ও আমদানি প্রতিস্থাপনের নীতিমালা সমাজে ন্যায়পরতা সৃষ্টির লক্ষ্যে রচিত হতো তাহলে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন দৃষ্টিভংগি ও পদ্ধতি গ্রহণ করা হতো। তাহলে লক্ষ্য হতো মানুষের মৌলিক দ্রব্য সামগ্রীর প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে উৎপাদন, সকল মানুষের জন্যে কর্মসংস্থান এবং সমাজের বৈষম্যহ্রাস। দেশীয় ধনীক শ্রেণী ও বিদেশী বেনিয়াদের স্বার্থ পূরণের হাতিয়ার হিসেবে দেশীয় শিল্পনীতি ব্যবহৃত হতোনা। সব কিছু করা হতো দেশীয় বাজারের জন্যে, ভোগ্য পণ্য ও যন্ত্রপাতি নির্মাণ ও রপ্তানি পণ্য উৎপাদনে গ্রামীণ ও শহরের উদ্যোক্তাদের সহায়তা প্রদানের জন্যে। গ্রামীণ এলাকায় গড়ে তোলা হতো সহজ সরল অথচ দক্ষ ভৌত ও আর্থিক অবকাঠামো। ক্ষুদ্র ও ব্যষ্টিক শিল্পের জন্যে দেশীয় লাগসই প্রযুক্তি নির্মাণ করা হতো অথবা আমদানি করা হতো ঐ সব প্রযুক্তি যা উন্নয়নশীল দেশের অবস্থার সাথে সংগতিপূর্ণ। দেশীয় শিল্পকে পরিচর্যার জন্যে দেয়া হতো ট্যারিফ প্রতিরক্ষা। এসব যদি করা হতো, তবে শুধুমাত্র দেশজ উৎপাদনই বৃদ্ধি পেতনা, বিদেশী পণ্যের সাথে এগুলো এক পর্যায়ে এসে মানের দিক থেকে প্রতিযোগিতায় নামতে পারতো। গ্রামীণ এলাকায় প্রচুর কর্মসংস্থান হতো, গ্রামীণ আয় বৃদ্ধি পেত, শহরের উপর জনসংখ্যার চাপ কমে যেত। গ্রামীন মানুষের অধিক আয়ের ফলে তারা উন্নমানের কৃষি উৎপাদন উপকরণ ব্যবহার করতে পারতো। ফলে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পেত। এভাবে যদি আমাদানি প্রতিস্থাপনের শিল্পনীতি গ্রহণ করা হতো, তবে ক্ষুদ্র ও ব্যাষ্টিক শিল্পের উন্নতির মাধ্যমে দেশে পণ্যসামগ্রীর চাহিদার সংকুলান করা সম্ভব হতো। এবং পরিশেষে উদ্ধৃত্ত পণ্য রপ্তানি বাজারে প্রবেশ করতে পারত। প্রথমে অবশ্য দেশীয় বাজারের চাহিদা অনুপাতে পণ্যসামগ্রী উৎপাদিত হতো। শিল্প কারখানার ক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সাথে যখন যখন বাড়তি অর্থনৈতিক সুবিধা (external economic) সৃষ্টি হতো, কখন রপ্তানি বাজার সৃষ্টির সুফল ঘরে তোলা যেত। এ ধরণের শিল্পনীতি হতো উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ের জন্যে। যখন অত্যাবশ্যকীয় পণ্য সামগ্রীর প্রয়োজন মিটে যেত, বেকার সমস্যার সমাধান হয়ে যেত, তখন ভারী যন্ত্রপাতি ও ‘ভোক্তা টেকসই’ উৎপাদন উন্নয়নের দ্বিতীয় পর্যায়ের নীতিমালা হিসেবে গৃহীত হতে পারতো। আমদানি প্রতিস্থাপন বা বিদেশ হতে আমাদানি হ্রাসের জন্যে দেশীয় শিল্পকারখানা গড়ে তোলার যে নীতি, তা উন্নয়নশীল দেশসমূহে সঠিক পন্থায় পরিচালিত না হওয়ায় রপ্তানি উন্নয়নের লক্ষ্য তাও অর্জন হয়নি। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সরকারি সহায়তা ও ভর্তুকি সত্ত্বেও গড়ে তোলা পুঁজি-নিবিড় অনেক বৃহদায়তান ভারী শিল্পেরই প্রাথমিক পর্যায়ে তুলনামূলক খরচ সুবিধা ছিলনা। রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতার সামনে তারা দাঁড়াতে পারলনা। পক্ষান্তরে কৃষি ও শ্রম নির্ভর ক্ষুদ্র শিল্পসমূহ স্থাপন করে যাদের তুলনামূলকভাবে অধিক দক্ষ ও উৎপাদনশীল করে গড়ে তোলা সম্ভব ছিল, তারা সরকারি সাহায্য সহযোগিতা হতে বঞ্চিত হলো। বৈদেশিক মুদ্রার হার কৃত্রিমভাবে উচ্চমাত্রায় বেঁধে দেয়ায় কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্প খাত রপ্তানি বাজারে প্রবেশের কার্যকারিতা হারাল। ফলে রপ্তানি যতদূর বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব ছিল তা হলোনা। আধুনা রপ্তানি উন্নয়নের উপর যে পরিমাণ অথ্যধিক জোর দেয়া হচ্ছে, সতর্কতার সাথে তার মূল্যায়ন করতে হবে। যদি যে কোনো মূল্যে আমদানি প্রতিস্থাপনের নীতি ক্ষতিকর হয়, তবে যে কোনো মূল্যে রপ্তানি উন্নয়নের নীতিও আকাঙ্ক্ষিত হতে পারেনা। যে খাতে ইতোমধ্যে অনেকগুলো অদক্ষ পুঁজি-নির্ভর বৃহৎ শিল্প স্থাপিত হয়ে গেছে, সেখানে যে কোনো নতুন নীতির দু’টি স্তম্ভ হচ্ছে শ্রমের কম মূল্য নির্ধারণ ও স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন। এ নীতি দ্বারা দেশীয় ধনীক শ্রেণী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত অদক্ষ্য শিল্পগুলোর পক্ষে রপ্তানি সম্ভব হতে পারে, তবে তা প্রকৃত মজুরি হ্রাসের দ্বারা দরিদ্র শ্রেণীকে আরো দরিদ্রতর করবে। তাই রপ্তানি উন্নয়নের এ নীতিমালা হবে আর্থ-সামাজিক ন্যায়নীতি বিরোধী। তাই রপ্তানি উন্নয়নের হুজুগে ট্রেনে চটজলদি উঠে পড়ার আগে নিশ্চিত করতে হবে যেন রপ্তানি প্রবৃদ্ধি প্রক্রিয়ার ফসল মেহনতী দরিদ্র শ্রেণীর হাতে আসে। যেসব প্রবক্তারা আমদানি প্রতিস্থাপনের পরিবর্তে উন্নয়নের কৌশল হিসেবে শুধুমাত্র রপ্তানি উন্নয়নের উপর জোর দিয়ে থাকেন, তাদের মনে রাখা প্রয়োজন তৃতীয় বিশ্বের রপ্তানি সামগ্রী উন্নত বিশ্বে সব সময় সকল প্রকার ট্যারিফ ও ট্যারিফ দেয়ালের সম্মুখীন হবে। অপরদিকে ‘ডাম্পিং নীতি’ (Dumping Policy) এবং প্রিডেটরি’ (Predatory) মূল্য নির্ধারণীর মাধ্যমে উন্নত বিশ্ব তাদের মালামাল তৃতীয় বিশ্বে বাজারজাতকরণ অব্যাহত রাখবে। ‘দি ইকোনমিস্ট’ পত্রিকার ভাষায়, ইউরোপের ‘কমন এগ্রিকালচারাল পলিসি’ এবং ধনী দেশসমূহের ‘মাল্টি-ফাইবার এগ্রিমেন্ট’ এর মতো জটিল বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতাসমূহের প্রধান ভোক্তভোগী হচ্ছে দরিদ্র দেশগুলো। গত তিন দশকে শিল্পোন্নত বিশ্বে কৃষি ও শিল্পে সরকারি অনুদান উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একই হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বাহির হতে আমদানির বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধকতা। বুনক্যাম্প এর মতে, উন্নত দেশের সরকারসমূহ কর্তৃক আরোপিত এসব বাধানিষেধ উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিঘ্নিত করে তুলেছে। উন্নত দেশের এসব রক্ষণশীল পদক্ষেপ ও সরকারি নীতির ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো হতে কৃষি পণ্য রপ্তানি দারুণভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। উদাহারণ স্বরূপ, জাপানে চাল আমদানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিশ্ববাজারে দরের ৯গুণ দামে জাপানে দেশি চাল বিক্রি হয়। উন্নত বিশ্বে ট্যারিফ হার কমানো হলেও ঐসব দেশে নন-ট্যারিফ বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা সমূহ দ্বারা বাহির হতে আমাদানি প্রতিহত করে দেশীয় পণ্য সামগ্রীর সংরক্ষণ অব্যাহত থাকে। অধিকন্তু কোনো উন্নয়নশীল দেশের রপ্তানি অগ্রগতি ব্যাহত হয়। আন্কটাড এর হিসাব মতে, উন্নত বিশ্বের সংরক্ষণশীল নীতির ফলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো বছরে ৭০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় হতে বঞ্চিত হয় যা তাদের বার্ষিক বৈদেশিক ঋণের ৫০ ভাগের বেশি। অপ্রত্যাশিত সমস্যাবলী উন্নয়ন অর্থনীতির পণ্ডিতগণ উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যে সরকারের বৃহৎ ভূমিকার উপর জোর দিলেও এসব দেশের সম্পদ যেভাবে অপচয় হয়ে যাচ্ছে তা রোধের জন্যে কার্যকর কৌশল উদ্ভাবনের দিকে তেমন কোনো নজর দেয়নি। পশ্চিমা ভোগবাদী সংস্কৃতির একচেটিয়া প্রচারণা চলছে। এমনকি অর্থনীতিবিদ রসটো অর্থনৈতিক উন্নয়নের পঞ্চম ধাপে যে বিলাসী জীবন যাপনের উল্লেখ করেছেন, তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়ন প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপেই সে জীবনযাত্রার দিকে তাদের ঠেলে দেয়া হচ্ছে। ফলে বিলাস দ্রব্যের আমাদানী বৃদ্ধি পেয়ে বাণিজ্য ঘাটতিকে প্রকট করে তুলেছে। বিলাস দ্রব্যের প্রতি আকর্ষণ সঞ্চয় প্রবণতাকে হ্রাস করেছে। অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজনীয়তার তুলনায় অপ্রতুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের মাঝে দূরত্ব বেড়ে চলছে। অপ্রয়োজনীয় ও বিলাস দ্রব্যের খাতে সম্পদের অপচয়কে রুখতে হলে প্রয়োজন ছিল মূল্যবোধ ও সামাজিক সচেতনতার ধারা গড়ে তোলা। পশ্চিমা অর্থনৈতিক উন্নয়ন পদ্ধতিতে এ ধরণের কোনো সামাজিক মূল্যবোধের দর্শন নেই। তাদের উন্নয়নের জন্যে কর মুদ্রাস্ফীতি হচ্ছে ভোগ হ্রাসের জন্যে ব্যবহৃত একমাত্র অস্ত্র। করের ভিত্তি সংকীর্ণ হওয়ায় এবং অদক্ষ ও দুর্নীতিপরায়ন কর প্রশাসনের কারণে উন্নয়নশীল দেশে বিপুল হারে কর-রাজস্ব বৃদ্ধির সুযোগ নেই। বাটে ঘাটতি তাই তীব্রভাবে বৃদ্ধি পায়। এ ঘাটতি পুরণের জন্যে কীনসীয় অর্থনীতিতে মুদ্রা সরবরাহ ও বৈদেশিক সাহায্য বৃদ্ধির কথা বলো হয়েছে। মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধির প্রবক্তারা একথা ভুলে যান যে, উন্নয়নশীল দেশসমূহ কাঠামোগত দুর্বলতা ও সরবরাহ জটিলতার কারণে উন্নত দেশের তুলনায় এসব দেশে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতি ও আমদানি-রপ্তানি ঘাটতি অধিকহারে বৃদ্ধি পায়। বৈদেশিক সাহায্যের প্রসঙ্গে বলা যায় যে, এর ক্ষুদ্রাংশ আসে অনুদান হিসেবে, বৃহদাংশ আসে ঋণ হিসেবে যা সুদে আসলে চক্রবৃদ্ধি হারে পরিশোধ করতে হয়। টাকা ছাপানো এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ- দুই ক্রাচের উপর ভর করে তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহকে চলতে হয়। একবার এ দুটির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে আর ফেরার পথ থাকেনা। কেননা উচ্চহারে কর বৃদ্ধি বা উল্লেখযোগ্য সরকারি ব্যয় হ্রাস কোনোটাই রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় নয়। মুদ্রাস্ফীতি সম্প্রতি মুদ্রাস্ফীতি তীব্র আকার ধারণ করলেও উন্নয়নের প্রথম পর্যায়ে একে যুক্তিসংগত ও প্রয়োজনীয় বলে ধরে নেয়া হয়েছে। ‘ফিলিপস কার্ভ’ এর মাধ্যমে নীতি নির্ধারকগণ যুক্তি খুঁজে পান যে, মুদ্রাস্ফীতির মাধ্যমে তারা প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে পারবেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে অধিকাংশ কীনসীয় অর্থনীতিবিদ মুদ্রাস্ফীতির বিষয়ে কোনো শংকা অনুভব করেননি; বরং তারা মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধির নীতিকে সমর্থন দিয়ে যান। ১৯৬১ সালে বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত বক্তৃতামালায় প্রফেসর হেনী ব্রুটন বলেন, ‘মুদ্রাস্ফীতি দমনকে অর্থনৈতিক নীতিমালার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য না করে বরং উন্নয়নের অস্ত্র হিসেবে একে অর্থনীতিবিদদের মুদ্রাস্ফীতির প্রতি পক্ষপাতিত্বের রাশ টেনে ধরার জন্য যথেষ্ট নয়। মুদ্রাস্ফীতি নীতির আরো ক্ষতিকর প্রক্রিয়া রয়েছে যা উন্নয়নকে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং ভবিষ্যতে আরো করতে থাকবে। মুদ্রাস্ফীতির দরুণ মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হয় এবং খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় ভোগ্যপণ্যের উপর ভর্তুকি প্রদান করতে হয়। মূল্য এসব দ্রব্যসামগ্রীর দীর্ঘমেয়াদী সরবরাহকে ব্যাহত করে। অপরদিকে ভর্তুকি প্রদান সরকারি বাজেটের উপর ক্রমাগত দুঃসহ বোঝা চাপিয়ে দেয়। মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধির দরুণ যে মূল্যস্ফীতি ঘটে, তা কমিয়ে আনার জন্য সরকারকে বৈদেশিক বিনিময় হার কৃত্রিমভাবে উঁচু রাখতে হয়। এর ফলে আবার আমদানি উৎসাহিত হয়। বিপরীতি দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষি এবং ক্ষুদ্র ও ব্যষ্টিক শিল্পখাত যা বৃহৎ ভারী শিল্পের মতো সরকারি সহায়তা লাভ করে না। আমদানির উপর নির্ভরতা ক্রমাগত বাড়তে থাকে এবং বৈদশিক মুদ্রার ভাণ্ডার সংকুচিত হতে থাকে। ফলে সরকারি ঋণের পরিমাণ বাড়াতে হয়। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ভার জটিলতর হতে থাকে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের চাপের মুখে সরকার মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও ভর্তুকি প্রদান নীতি তুলে দিতে এবং বাস্তবসম্মত বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার নির্ধারণ করতে চাইলেও তা পারে না। কেননা সংশোধনমূলক এ ব্যবস্থা জীবনযাত্রা ব্যয়ের উপর চাপ সৃষ্টি করে বিধায় রাজনৈতিকভাবে এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা সরকারের পক্ষে সম্ভব হয় না। স্যার আর্থার লুইস তাই আক্ষেপ করে বলেছেন, 'উন্নত ও অনুন্নত দেশ নির্বিশেষে আমরা এ মৌলিক শিক্ষাই পেয়েছি যে, মুদ্রাস্ফীতি হচ্ছে এক দুঃসহ ক্লেশকর পন্থা'। ঋণের বোঝা ক্রমাগত বড় আকারের ঋণ গ্রহণ করার ফলে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের বোঝা তীব্র আকার ধারণ করেছে। প্রথমে এ বিষয়টি তেমন আশংকাজনক মনে করা হয়নি, কিন্তু উন্নয়নশীল দেশের ঋণের বোঝা ক্রমশ দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং অভ্যন্তরীণ আন্তর্জাতিক অর্থবাজার ব্যবস্থার সুস্বাস্থ্যের ব্যাপারে যারা সংশ্লিষ্ট তাদের এ বিষয়টি ভাবিয়ে তুলছে। ফাঁপা ও দুর্বল অভ্যন্তরীণ অর্থবাজার হতে সরকারের বিপুল ঋণ গ্রহণের ফলে বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় ঋণ সুবিধা হতে বঞ্চিত হলো। অর্থবাজার কম সুদ সম্পন্ন সরকারি ঋণের চাপে দুর্বলতর হলো। বহুজাতিক ব্যাংক ও অর্থসংস্থা হতে উন্নয়নশীল দেশসমূহ কর্তৃক বিপুল হারে ঋণ গ্রহণ প্রাথমিক পর্যায়ে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ধারণার নিরিখে মন্দ বিবেচনা করা হয়নি। কিন্তু ঋণের বোঝা এমন অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, উন্নয়নশীল দেশসমূহ কর্তৃক ঋণ পরিশোধে অপরাগতা এসব ঋণদানকারী সংস্থাসমূহের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুরো উন্নয়ন পরিকল্পনা ও প্রক্রিয়া বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রকৃত প্রবৃদ্ধির হার হ্রাস পেয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি ও বৈদেশিক ঋণের ভাব লাঘবের প্রচেষ্টা এ হারকে আরো শ্লথ করে দিতে পারে। পরিকল্পনা বিষয়ক জটিলতা উন্নয়নশীল দেশে সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা রচনার ক্ষেত্রে যেসব জটিলতা দেখা দিতে পারে, তা যথাযথ গুরুত্বের সাথে অনুধাবন করা হয়নি। অপরদিকে উন্নয়ন পরিকল্পনা হতে অতিরিক্ত ফলাফল আশা করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় উপাত্তের অভাব এবং উপাত্তসমূহের অসম্পূর্ণতা ও নির্ভরযোগ্যহীনতা সফল উন্নয়ন পরিকল্পনা রচনার সুযোগকে সীমিত করে দিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন উপাদান যথা মোট সঞ্চয়, পুঁজি, বেকারত্বের পরিমাণ, বিনিয়োগ প্রকল্পের মূল্যমান প্রভৃতি পরিমাপের জন্য প্রয়োজনীয় উপাত্তের অপর্যাপ্ততার কারণে পরিকল্পনায় সৃষ্ট ভুলের মাত্রা বিরাট হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপরন্তু একটি পরিকল্পনা মডেল হতে অতিরিক্ত আশা করার প্রবণতা দেখা দিলো। এটা অনুধাবন করা হলো না যে, বিভিন্ন বিকল্পের মাঝে সঠিক পন্থাটি বাছাই করে নেয়ার যে কঠিন সিদ্ধান্ত নীতি নির্ধারকদের নিতে হয়, নিছক কোনো উন্নয়ন মডেল সে সমস্যাটিকে অপসারণ বা সহজতর করে দিতে পারে না। অগ্রাধিকার নির্ধারণ ছাড়া উন্নয়ন পরিকল্পনার বহুবিধ উদ্দেশ্যের মাঝে যে পারস্পরিক সংঘাত আছে তা নিরসন করা সম্ভব নয়। উন্নয়ন দর্শন যা মূল্যবোধ ও বস্তুগত লক্ষ্যের দিকনির্দেশনা দেয়, তার স্থান কখনো একটি যান্ত্রিক 'ইকোনমেট্রিক মডেল', দখল করতে পারে না। 'প্যারেটো অপটিমালিটি'র ধারণা ও লক্ষ্যও এভাবে অর্জন করা যায় না। সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থে দ্বিধাহীন চিত্তে নীতি নির্ধারকদের উন্নয়ন দর্শন গ্রহণ করতে হবে এবং জনগণকে উৎসাহের সাথে তাতে অংশগ্রহণ করতে হবে। এ ধরণের দর্শন ও অনুপ্রেরণার অভাব ও অনুপস্থিতিই ব্যাখ্যা করে কেন সকল উন্নয়ন পরিকল্পনাই তার উদ্দেশ্যসমূহের মধ্যে ন্যায়পরতা বিধান করছে, অথচ কোনো পরিকল্পনা মডেলই উদ্দেশ্যসমূহ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কোনো কার্যকর পন্থা ও পদ্ধতি বাতলে দিতে পারেনি। একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে যেসব সমস্যার উদ্ভব হতে পারে, তা নিরসনের দিকে পূর্ব হতে যথাযথ মনোযোগ দেয়া হয় না। অনেক উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সুসংগত ও পরিপক্কতার বিচারে কাগজে কলমে সঠিক বলে দেখা যায়, কিন্তু বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক যোগাযোগের অভাবে ঐসব পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ লাভ করে না। পরিকল্পনাগুলো আধুনিক 'ইকোনমেট্রিক মডেলে'র সহায়তায় প্রণয়ন করা হয় বিধায় তার বাস্তবায়ন অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বস্তুত পরিকল্পনাগুলো এতো বেশি মার্জিত ও পরিশীলিত যে, তা কাগজে কলমেই সুশোভন, কিন্তু বাস্তবায়নযোগ্য নয়। পাশ্চাত্যের উচ্চ তাত্ত্বিক মডেলগুলো অনুসরণ না করে অর্থনীতির প্রাথমিক ও সরল মূলনীতিগুলোর সুষ্ঠু প্রয়োগের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলো অধিক উপকৃত হতে পারত। ম্যাক্রো-ইকোনমিক মডেলগুলোর পরিমাপযোগ্য উন্নয়ন উপাদানসমূহের প্রতি পক্ষপাতিত্বের প্রবণতা রয়েছে। যদিও অপরিমাপযোগ্য উন্নয়ন উপাদানগুলোরও পরিকল্পনার লক্ষ্য বিশেষত আর্থ-সামাজিক ন্যায়নীতি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একটি 'ইকোনমেট্রিক মডেল' অঙ্ক শাস্ত্রের নিরিখে যত বেশি সুশৃঙ্খলাবদ্ধ, তার তত বেশি অর্থনীতির বাইরের সামাজিক উপাদানগুলো গ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিকরণের সম্ভাবনা কম থাকে। প্রফেসর গলব্রেথের ভাষায়, 'উন্নয়ন সমস্যাটির দিকে সাধারণভাবে দৃকপাত করলেই দেখা যায়, কার্যকর সরকার, শিক্ষা এবং সামাজিক সুবিচারের বিষয়গুলো অতীব গুরুত্বপূর্ণ। অনেক দেশেই উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে এগুলোকে চিহিন্ত করতে না পারাই প্রধান সমস্যা। এ বাধাগুলো যতদিন অপসারণ না করা যাবে, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও পুঁজি বিনিয়োগ হতে তত দিন বেশি কিছু আশা করা যায় না। একটি পরিকল্পনা কাগজে কলমে যত বেশি বড় হবে, তা তত বেশি ক্ষুদ্র ফল প্রসব করবে। নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতির পুনারাবির্ভাব উন্নয়নশীল দেশগুলো এখন যেসব সমস্যায় ভুগছে, তার ফলেই পুরুত্থান ঘটেছে নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতির। তিন দশক যাবত সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতির বৃহৎ সরকার এবং সার্বিক পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে এসব সমস্যার জন্য দায়ী করা হচ্ছে। সরকারি খাতের বিনিয়োগের উপর প্রবল গুরুত্ব প্রদান এবং প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার জন্য নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা আরোপ করার ফলে শুধুমাত্র উৎপাদন উপাদান বণ্টনের মধ্যে বিকৃতি সৃষ্টি হয়নি, অধিকন্তু বৈদেশিক বাণিজ্য ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হচ্ছে। অর্থনৈতিক সম্পদের অসম বণ্টনের ফলে বেসরকারি খাতের উদ্যম ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা ব্যাহত হয়েছে। বিপুল পুঁজিনির্ভর বৃহদায়তন ভারী শিল্পের প্রতি অনুৎসাহ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন; বিনিময়ে যে শিল্পায়ন ঘটেছে তা হয়েছে অদক্ষ ও অফলপ্রসূ। আইএমএফ-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর মাইকেল ক্যামডিসাস সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, 'যেসব দেশের অর্থনীতি প্রবল মুদ্রাস্ফীতি, বিশাল বাজেট ঘাটতি, প্রচুর বাণিজ্য প্রতিবন্ধতা, ভারসাম্যহীন বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, বৈদেশিক ঋণের বোঝা এবং ক্রমাগত পুঁজি পাচার দ্বারা উপদ্রুত, তারা দীর্ঘকালীনভাবে উন্নয়নের পথে ধাবিত হতে পারে না। শ্লথ প্রবৃদ্ধি ও ভারসাম্যহীনতার চেয়েও বিষাদময় চিত্র হচ্ছে, এসব গরীব দেশগুলোর বৈষম্য, বেকারত্ব ও অর্ধ-বেকারত্ব ও সর্বগ্রাসী দারিদ্র্যের পরিসীমাকে হ্রাস করতে না পারার ব্যর্থতা। দরিদ্র দেশগুলোর সমস্যা হ্রাস পাবার বদলে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাধীনতা এবং জাতীয় সরকার গঠনের ফলে যে প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছিল তা পূরণ হয়নি। সমাজতান্ত্রিক উন্নয়ন কৌশলের ব্যর্থতার পথ ধরে নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতির যে পুনর্জাগরণ, তা উন্নয়শীল দেশসমূহকে তারা যে সোপান থেকে শুরু করেছিল সেখানে ফিরিয়ে আনল। তা হলো সীমিত সম্পদের ব্যবহারে দক্ষতা ও ন্যায়পরতা আনয়ন। উন্নয়ন অর্থনীতি এবার দৃশ্যত নতুন চেহারা ধারণ করল। শুধুমাত্র প্রবৃদ্ধি নয়, আর্থ-সামাজিক ন্যায়পরতাও এবার লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে ধার্য হলো। সত্তর দশকের শুরু হতে এ ধারা সূচিত হলো। অর্থনৈতিক উন্নয়ন এখন শুধুমাত্র মাথাপিছু আয়ের বৃদ্ধি নয়, দারিদ্র্যের মাত্রা হ্রাসও। সবাই উপলদ্ধি করতে শুরু করল যে, ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দরিদ্র ও জনসংখ্যাপীড়িত দেশগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে সমৃদ্ধির আশার আলো দেখাতে পারে শুধুমাত্র মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সাথে দীর্ঘকালীন ন্যায়পরতাভিত্তিক বণ্টন। আগে উন্নয়ন এবং পরে ন্যায়পরতাভিত্তিক বিতরণ-এ ব্যবস্থা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। উন্নয়ন অর্থনীতি তাই আর শুধুমাত্র জাতীয় আয় বৃদ্ধির বেদীমূলে পূজার নৈবেদ্য হয়ে থাকল না, বরং তা বণ্টন ন্যায়পরতার প্রবক্তা হয়ে উঠল। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ, সামগ্রিক দারিদ্র্যের মাত্রা হ্রাস, ন্যায়পরতার সাথে উন্নয়ন প্রভৃতি আহবান উচ্চারিত হলো। নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতি অর্থনৈতিক কার্যকারণের যৌক্তিকতার অভিভাবক হিসেবে না থেকে 'গরীবের অভিভাবক' হিসেবে আবির্ভূত হলো। ১৯৭৩ সালে নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ব্যাংকের বার্ষিক সভায় ব্যাংকের তৎকালীন সভাপতি ম্যকনামারা বিশেষভাবে মনোযোগ আকর্ষণ করেন তাদের প্রতি, যারা নিশ্ছিদ্র দারিদ্র্যে মধ্যে বসবাস করছে; যারা ক্ষধা, পুষ্টিহীনতা, ব্যাধি ও অশিক্ষার যাতাকলে চরমভাবে পিষ্ট। ১৯৭৯ সালে নোবেল প্রাইজ গ্রহণকালে থিওডর শুলজ বলেন, 'পৃথিবীর অধিকাংশ লোক গরীব। তাই গরীব হওয়ার কারণ সম্পর্কিত অর্থনীতিটি যদি আমরা জানতে পারি, তবে অর্থনীতির সত্যিকার জ্ঞান উদয় হবে'। জেরাল্ড মেয়ারের ১৯৮৪ সনে প্রকাশিত 'Leading Issues in Economic Developmemt' এর প্রথম সংস্করণে দারিদ্র্য, বৈষম্য, আয় বণ্টন প্রভৃতি বিষয় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত চতুর্থ সংস্করণে তিনি উন্নয়নশীল দেশে আয় বণ্টনের ন্যায়পরতার উপর উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব আরোপ করেন। একই সালে প্রকাশিত অন্য একটি বইয়ে তিনি দারিদ্র্য থেকে মুক্তিকেই অর্থনীতির একমাত্র প্রতিপাদ্য বিষয় হিসেবে অভিহিত করেন। আয় বণ্টন ন্যায়পরতার প্রতি উদ্বেগ সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে ডাডলি সিয়ার্স এর ভাষায়, 'একটি দেশের উন্নয়ন হচ্ছে কিনা তা জানতে হলে প্রশ্ন করতে হবে, সে দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতির কি অবস্থা? বেকারত্ব পরিস্থিতির কি রূপ? আয় বৈষম্যের অবস্থা কি? যদি এ তিনটি অবস্থারই উন্নতি হয়ে থাকে তবে নিঃসন্দেহে সে দেশের উন্নয়ন ঘটছে বলা যায়। যদি কেন্দ্রীয় সমস্যাত্রয়ের একটি বা দুটির বিশেষভাবে যদি তিনটিরই অবনতি ঘটে তবে মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ হলেও সে দেশের উন্নয়ন ঘটছে বলা অসম্ভব হবে'। মৌলিক প্রশ্ন আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা যাকে দ্রুত পুঁজিগঠন ও প্রবৃদ্ধির যুপকাষ্ঠে এতদিন বলি দেয়া হয়েছে, তা আবার পুনরায় স্বীকৃতি লাভ করল। এ শুভ পরিবর্তনকে অবশ্যই সুস্বাগতম। দক্ষতা ও ন্যায়পরায়নতা অর্জনের প্রশ্নে উন্নয়ন অর্থনীতি রূপ পরিবর্তন করে নিওক্লাসিক্যাল, কীনেসীয় এবং সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির মতো অবয়ব ধারণ করল। কিন্তু প্রশ্ন থেকে গেল, বিশেষ দর্শন ও মূল্যবোধ নিরপেক্ষ নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতির পক্ষে এ লক্ষ্যদ্বয় অর্জন করা সম্ভব হবে কিনা? বর্তমানে প্রতিটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে এবং প্রতিটি লেখায় নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতিবিদগণ যে উন্নয়ন কৌশলের কথা তুলে ধরছেন, তা হলো 'এডজাস্টমেন্ট' বা সমন্বয় সাধন। সমন্বয় সাধনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। উন্নয়নশীল দেশসমূহই যে প্রকট ভারসাম্যহীনতায় ভুগছে, তাতে সমন্বয় সাধনের প্রয়োজনীয়তা কেবলমাত্র একটি বিকল্প পন্থা নয়, বরং অত্যাব্শ্যকীয় প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রামের উপাদানগুলো সম্পর্কে। সন্দেহ দেখা দিয়েছে, নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতি যে উপাদানগুলো উপস্থাপন করছে, তা একই সাথে দক্ষতা ও ন্যায়পরতার লক্ষ্যদ্বয় অর্জনে সক্ষম হবে কিনা। সঠিক সমন্বয় প্রক্রিয়া হচ্ছে তাই যা অর্থনীতির উন্নয়ন পদ্ধতির চাহিদা ও সরবরাহ উভয় দিককে এমনভাবে মোকাবিলা করে যা প্রবৃদ্ধিকে সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত করবে। চাহিদার দিকে অভ্যন্তরীণ সামগ্রিক ব্যয়ের পরিমাণ কমাতে হবে; এ ব্যয় হচ্ছে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ ব্যয়ের সামগ্রিক মাত্রা। তবে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি অবুণ্ণ রাখার জন্য বিনিয়োগ ব্যয় ও ভোগব্যয়ের পরিমাণ অধিকমাত্রায় কমাতে হবে। আর্থ-সামাজিক সুবিচার অবুণ্ণ রাখার জন্য আবার ভোগব্যয় এমনভাবে কমাতে হবে, যাতে কৃচ্ছ্যতাসাধনের ভারটি সমাজের সক্ষম ব্যক্তিদের উপর পড়ে। দরিদ্র মানুষের ভোগের অবস্থার যেখানে উন্নয়ন কাম্য ও প্রত্যাশিত, সেখানে অন্তত যাতে তাদের ভোগের মাত্রা আরো কৃশকায় হয়ে না দাঁড়ায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। সরবরাহের দিকেও আবার আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার দাবি করে যে, উৎপাদন এমনভাবে বাড়াতে হবে যাতে সমাজের প্রয়োজন পূরণ হয়, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পায় এবং বৈষম্য হ্রাস পায়। পক্ষান্তরে দেখা যায় বিপরীত চিত্রটাই ঘটেছে। বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফ-এর আশীর্বাদধন্য নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতির সমন্বয় কর্মসূচির ফলে অস্থায়ী বেকারত্ব দেখা দিচ্ছে, জীনযাত্রার মান অন্তত স্বল্পকালীন সময়ের জন্য কমে যাচ্ছে। প্রকৃত প্রস্তাবে সমাজের দরিদ্র অংশই সবচেয়ে বেশি কষাঘাত লাভ করছে, এ কথা অকপটে স্বীকার করছেন বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট বারবার কোনোবল। কিন্তু আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ একটি অর্থনৈতিক পদ্ধতি সমন্বয় প্রক্রিয়ার মূল্য হিসেবে দরিদ্র মানুষের এ ভোগান্তিকে মেনে নিতে পারে না। এ ভোগান্তি সাময়িক ও স্বল্পমেয়াদী বলে যে প্রলেপ দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা এ ভোগান্তি প্রক্রিয়ায় স্থায়ী, দীর্ঘমেয়াদী ও পৌনঃপুনিক মাত্রা গ্রহণ করার সম্ভাবনাই বেশি। সমন্বয়ের ফলাফলের বিষয়ে কোনোবলের মূল্যায়ন ও প্রতিক্রিয়া নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতির প্রস্তাবনার নিরিখেই করা হয়েছে। এখন দেখা প্রয়োজন, মূল্যবোধ নিরপেক্ষ উন্নয়ন অর্থনীতির প্রসারণ পর্যায়ে যে দরিদ্র শ্রেণীকে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হয়েছে, তাদের কেন আবার নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতির সমন্বয় প্রক্রিয়ার পর্যায়ে নতুনভাবে সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে? লিবারেলিজমের উপাদানসমূহ নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতির সমন্বয় প্রোগ্রামের বুনন হয়েছে লিবারেলিজমের সুতোয়। লিবারেলিজম বস্তুত 'এনলাইটেনমেন্ট' তত্ত্বের ভিতে গড়া। অর্থনীতিবিদদের 'গরীবের অভিভাবক' হবার অনেক বাকবিতণ্ডা সত্ত্বেও তারা এমন কোনো প্রণোদনা ও অনুপ্রেরণা সঞ্চারক ব্যবস্থাপনার প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে পারেননি, যাতে শক্তিশালী ও বিত্তশালীদের সমন্বয় প্রক্রিয়ার বিরূপ প্রতিক্রিয়া গরীবের উপর না ফেলে নিজেদের হজম করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা যায়। কিন্তু দেখা যায়, গরীব মানুষের জীবনযাত্রার উপর তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া শুধু পরোক্ষভাবে সামান্য লাঘবের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং তা অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ভারসাম্য আনয়নের মাধ্যমে যে অধিকতর প্রবৃদ্ধির আবহ সৃষ্টি হবে তারই উচ্ছিষ্ট হিসেবে আসবে। আইএমএফ-এর সমন্বয় প্রোগ্রামে নিওক্লাসিক্যাল লিবারেলিজমের যেসব উপাদান প্রস্তাব করা হয়েছে তা হচ্ছেঃ (ক) অর্থনীতিতে সরকারি ভূমিকা হ্রাস; (খ) বাজার অর্থনীতিকে নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়া; (গ) বৈদেশিক বাণিজ্যকে বিমুক্তকরণ। এ মূল লক্ষ্য পূরণের জন্য স্থিতি ও দক্ষতা অর্জন করতে হবে। বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারসাম্য আনয়ন করতে হবে। সার্বিক অভ্যন্তরীণ চাহিদা নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক দক্ষতা পরিমার্জনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণ করতে হবে। অবশ্য বণ্টন ন্যায়পরতার বিষয়টি মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যা বলে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক এডজাস্টমেন্ট বা সমন্বয় সাধনের প্রক্রিয়ায় যে বিরূপ বণ্টন বিষয়ক সমস্যার সৃষ্টি হয়, তার নিরসন বৈদেশিক বা আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তাপুষ্ট প্রোগামের মূল লক্ষ্য থাকে না, যদিও পরোক্ষভাবে কিছু ইতিবাচক ফল লাভ করা যায়। ফলশ্রুতিতে দেখা যায় সদস্য দেশগুলোর উপর আইএমএফ-এর বার্ষিক কনসাল্টেশন রিপোর্টের কোনোটিতেই দেশগুলোর দারিদ্র্য বিমোচন, বৈষম্য দূরীকরণ বা প্রাত্যহিক প্রয়োজন পূরণের উপর কোনো আলোচনা নেই। যদি একটি দেশ অভ্যন্তরীন আয় বৈষম্যকে আরো তীব্রতর করে হলেও বৈদেশিক ভারসাম্যহীনতাকে কমাতে পারে, তবে সেটাই আইএমএফ-এর নিকট অভিনন্দনযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। যুক্তি প্রদর্শন করা হয় যে, অর্থনীতিতে সরকারি ভূমিকা ও হস্তক্ষেপ হ্রাস করা হলে কর নিয়ন্ত্রণ ও বাজেট খাতটি কমানোর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ ব্যয়ভার হ্রাস করা সম্ভব হবে। বেসরকারি খাত স্ব-স্বার্থ দ্বারা উদ্বুদ্ধ বিধায় তা অধিকতর কার্যকর ও বৃহত্তর ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে। ঋণ প্রসারের লাগাম টেনে ধরা হলে অভ্যন্তরীণ সম্পদের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার হ্রাস পাবে। বাজার শক্তিকে নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়ার ফলে সুদের হার, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারসহ সকল উৎপাদন উপকরণ, পণ্য ও সেবার মূল্য সঠিক হারে সঠিক খাতে প্রবাহিত হবে। বাজার শক্তিসমূহ সঠিক সংকেত পাওয়ার কারণে উৎপাদন উপকরণসমূহ সঠিক খাতে প্রবাহিত হতে থাকবে। অর্থনৈতিক সম্পদের অপচয় হ্রাস পাবে। এ নীতির ফলে অধিকাংশ দ্রব্য ও সেবার মূল্য বৃদ্ধি পেলেও, নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতি প্রকৃত মজুরি হ্রাসের এ ধারাকে সমর্থন করে, যদিও সংগঠিত শ্রমিক শ্রেণীর উপর এতে দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। চূড়ান্ত পর্যায়ে উচ্চতর কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির মারফত তা পুষিয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সুবিধা গ্রহণ করে সমন্বয় সাধনকারী উন্নয়নশীল দেশ প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদের সংরক্ষণ নীতিজনিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সংকোচন প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারবে। সকল আমদানি বাণিজ্যের বাধা তুলে দিতে হবে। আমদানি ও রপ্তানি উভয়কে উৎসাহিত করতে হবে। বাস্তবসম্মত বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার আমদানি ও রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। চলতি বাজেট ঘাটতি এতে হ্রাস পাবে। যদি ট্যারিফ ধার্য করতেই হয়, তা হওয়া উচিত নিম্নমাত্রার ও সুষম। কোনো কিছুর প্রতি পক্ষপাতিত্বের দ্বারা বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ সমীচীন হবে না। কেননা এর ফলে বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতে সম্পদ সঞ্চালনে অস্বাভাবিক ও বিকৃত প্রবাহ সৃষ্টি হবে এবং উৎপাদন দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমদানি প্রতিস্থাপনের জন্য শিল্পায়ন নীতির রয়েছে সীমিত সম্ভাবনা। কেননা এর লক্ষ্য হচ্ছে কেবলমাত্র সীমাবদ্ধ দেশীয় বাজার। অপরদিকে রপ্তানির ক্ষেত্রে এ ধরনের পরিমাণগত সীমাবদ্ধতা নেই। উদারনৈতিক অর্থনৈতিক মতবাদ সরকারি ব্যয় হ্রাসের আহবান জানালেও বাজেটের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মাঝে অর্থনৈতিক ন্যায়পরতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারি ব্যয়ের বিভিন্ন খাতের মধ্যে বাঞ্ছিত পরিবর্তন আনয়নের সমস্যাটির দিকে আলোকপাত করে না। দরিদ্র জনগণকে মানব সম্পদে পরিণত করার লক্ষ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গৃহায়ন, যোগাযোগ ও পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধার মানোন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ সঞ্চয়ের পন্থা নিরূপণের কোনো দিকনির্দেশক আলোচনা এ উদার নৈতিক মতবাদে দেখা যায় না। এমনকি বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট কর্মসূচির সরবরাহের দিক সংক্রান্ত আলোচনাও প্রধানত সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও রপ্তানির বাস্তবসম্মত মূল্য, সুদের হার, বিনিময় হার এবং করের মাধ্যমে উৎসাহ প্রদানের মাঝে সীমাবদ্ধ। অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যসামগ্রীর সরবরাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে অর্থনীতির যে পুনর্গঠনের প্রয়োজন, সে বিষয়ে কোনো আলোকপাত নেই। উন্নয়নশীল দেশের সম্পদ বণ্টনের বিশাল সমস্যাটির নিওক্লাসিক্যাল সমাধান দাঁড়ায় এসব দেশের জন্য বস্তুত একটি ক্ষীণ ও অনির্ভরযোগ্য সূত্রের উপর। তা হলো দ্রব্য ও সেবার সঠিক মূল্যের দিয়ে বাজার শক্তিসমূহকে সঠিক সংকেত প্রদান করা। ভুল উদাহরণ: শুধুমাত্র উদারনৈতিক মতবাদ নয় নিওক্লাসিক্যাল ব্যবস্থাপত্রের সমর্থনে সিঙ্গাপুর, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও জাপানের মতো দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোর উদাহরণ টানা হয়। এদেশগুলো অর্থনৈতিক দক্ষতা ও প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য রপ্তানিমুখী উদারনৈতিক অর্থনীতির পথ বেছে নেয়। বলা হয়, উদারনীতিবাদ এসব দেশের বেসরকারি খাতকে অধিকতর উদ্যোগ গ্রহণ ও নৈপূণ্য অর্জনে উদ্বুদ্ধ এবং এভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে সহায়তা করেছে। বহির্মুখীতা এসব দেশের রপ্তানিযোগ্য উদ্ধৃত্ত বৃদ্ধি করেছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারিত করেছে এবং বিদেশী সাহায্যের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার গড়ে তুলতে সক্ষম করেছে। উদারনৈতিক মতবাদ ও রপ্তানিমুখীতা সব দেশের অর্থনৈতিক অগ্রসরতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও অর্থনৈতিক সাফল্যের সকল কৃতিত্ব এ নীতির একক ফসল বলা ভুল হবে। সাফল্যের আরো অনেক উল্লেখযোগ্য কারণ রয়েছে। তার কিছু হচ্ছেঃ প্রত্যক্ষ ও বিপুলভাবে সরকারের হস্তক্ষেপ, ব্যাপক ভূমি সংস্কার ও সামাজিক মূল্যবোধের দ্বারা আনীত সামাজিক সংহতি, স্থিতিশীলতা ও আর্থ-সামাজিক সুবিচার; উচ্চমাত্রার সঞ্চয় ও বিনিয়োগ প্রবণতা এবং রপ্তানি উন্নয়ন ও আমদানি প্রতিস্থাপনভিত্তিক শিল্পায়নের প্রতি সরকারের সক্রিয় সমর্থন। উল্লিখিত সবগুলোই নিওক্লাসিক্যাল মডেলের নিজস্ব উপাদান নয়, বরং এর অনেকগুলোই এ মডেলের সাথে সংঘাতপূর্ণ। সরকারি ভূমিকা দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এসব দেশের সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিক পালণ করেছে। একমাত্র হংকং কিছুটা ব্যতিক্রম যেখানে লেইজে ফেয়ার বা মুক্তবাজার অর্থনীতির চর্চা হয়েছে। অন্যান্য দেশগুলোতে ব্যাপকভাবে সরকার অর্থনীতিকে প্রভাবিত করার জন্য হস্তক্ষেপ করেছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্পকারখানা, ভর্তুকি, বিধিবিধান ও অন্যান্য বিভিন্ন পন্থায় সরকারি পুঁজিবাজার, অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়, বাণিজ্য তথা অর্থনীতির সকল অঙ্গনকে প্রভাবিত করেছে। এসব দেশের সরকারি শিল্প লাইসেন্স, বিদেশী ঋণ ও প্রযুক্তি চুক্তি ইত্যাদির উপর নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যান্য বাধানিষেধ ও উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে নির্দিষ্ট ধারায় প্রবাহিত করেছে। তাই নিওক্লাসিক্যাল অর্থে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান এবং সিঙ্গাপুরকে লিবারেল অর্থনীতি বলা যায় না। জাপান সম্পর্কে ইয়াসুও মাসাই বলেন, 'অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরকারের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ সীমিত হলেও অর্থনীতির উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ও বিস্তৃত। এ নিয়ন্ত্রণ অব্শ্য প্রশাসনিক বা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সংগঠিত হয় না, তা হয় এক সূক্ষ্ম, সুনিপুণ পদ্ধতিতে। শিল্প ও বণিক সমিতির সাথে সরকার সার্বক্ষণিক সংলাপের এক সংযোগ বজায় রাখে না, যা একজন বহিরাগতের নিকট বিচিত্র মনে হতে পারে। সরকার পরোক্ষভাবে অথচ নিবিড়ভাবে জড়িত থাকে ব্যাংকের ঋণ দানের সাথে। তাছাড়া অর্থনীতির বিভিন্ন দিক তথা রপ্তানি, আমদানি, বিনিয়োগ, মূল্য এবং অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি প্রভৃতি বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট সরকারের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট ও এজেন্সি রয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরকারের বিপুল অংশ গ্রহণের আর কোনো প্রয়োজন দেখা যায় না। অন্যান্য মুক্তবাজার অর্থনীতির মতো তাই জাপানী সরকারও অর্থনীতির প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালনে অনীহা প্রদর্শনের একটি আবহ বজায় রাখতে পারে। সরকারের সক্রিয় ও শক্তিশালী ভূমিকা ব্যতিরেকে এ দেশগুলো উন্নয়নের বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে কিনা সে বিষয়ে তাই সন্দেহের অবকাশ আছে। এ কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, এসব দেশের সরকারের ভূমিকা কখনো বেসরকারি খাতে উদ্যোগ ও উদ্যমকে ব্যাহত করেনি; বরং এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা হচ্ছে ইতিবাচক। সরকার বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বেসরকারি খাতকে উৎসাহ ও সহায়তা যুগিয়েছে। এ সব দেশের প্রজ্ঞাবান, একনিষ্ঠ ও অগ্রগতিমুখী বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেশের সার্বিক স্বার্থে অর্থনীতির ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে কার্যকর সহায়তা প্রদান করেছে। সরকারের স্থিতিশীলতার কারণে অর্থনৈতিক নীতিমালা সম্পর্কে অনিশ্চয়তা দূরীভূত হয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা উজ্জীবিত হয়েছে। ভূমিসংস্কার এবং সম্পদবণ্টন দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর দখলদার শক্তি যুদ্ধ প্রচেষ্টায় নিয়োজিত সামন্ত শক্তিকে বস্তুগত ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে ধ্বংস করে দেবার লক্ষ্যে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান ব্যাপক ভূমি সংস্কার করে। এ সুদূর প্রসারী সংস্কার কর্মসূচির ফলে এসব দেশে গ্রামীণ আয় বণ্টনের মাঝে ন্যায়পরতা এবং গ্রাম ও নগর জীবনযাত্রার মানের মধ্যে ব্যবধান কমে আসে। এ তিন দেশেই ভূমি সংস্কার এত ব্যাপক ছিল যে, সংস্কার-পূর্ব সমাজের নিয়ামক সামন্ত শক্তির ভিত ধসে পড়ে এবং সামন্ত শক্তির অধিপতি-প্রজা সম্পর্কের সম্পূর্ণ বিলোপ ঘটে। ভূমি সংস্কারের ফলে জাপানে পরিবার প্রতি আবাদী জমির মালিকানা দাঁড়ায় ২.২৫ একর। গত ৩০ বছর যাবত আবাদী জমির পরিবার পিছু মালিকানা একই রকম রয়েছে। ১৯৮৫ সালের পরিসংখ্যান হতে দেখা যায় যে, জাপানে কৃষি খামারের গড় আয়তন ২.৯ একর। মাত্র ৪% কৃষি খামারের ৭.৪১ একরের বেশি জমি রয়েছে। স্যাচস এর মতে 'আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ধরনের ভূমি সংস্কার হয়েছে এসব দেশে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দখলে এবং তাইওয়ান জাতীয়তাবাদী শক্তির অধীনে থাকায় বিশেষ ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতিরি কারণে এ সংস্কার সম্ভব হয়েছে। সামন্ত প্রভুগণ বর্ণিত পরিস্থিতির কারণে রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। ভ্যমি সংস্কার মূলত সমান্ত শ্রেণীকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেয়। কেননা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়নি অথবা যেখানে প্রদান করা হয়েছে তা ছিল যৎসামান্য। তিনটি দেশেই যুদ্ধের ফলে সম্পদের বিন্যাস এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে বন্ড ও নগদ টাকার বিপুল মূল্যহ্রাস ভূমি সংস্কারজনিত জমির পুনর্বণ্টন ফলাফলকে আরো তীব্রতর করে তোলে। ১৯৪৭ সালে জাপানে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ৩৩৪%। ১৯৫০ সালে মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল দক্ষিণ কোরিয়ায় ৫০০% এবং তাইওয়ানে ৩৪০০%। এসব সম্মিলিত কারণে আয় ও সম্পদের বৈষম্য বিপুলভাবে হ্রাস পায় এবং বাজার অর্থনীতি ও সরকারি উদ্যোগের সমন্বয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পটভূমি তৈরি হয়। এ অবস্থার বিকাশ না ঘটলে উদারনৈতিক অর্থনৈতিক মতবাদ সম্ভবত আয় বৈষম্য আরো বাড়িয়ে তুলত। একটি ক্ষুদ্র বিত্তশালী জনপ্রিয়তাহীন সামন্তগোষ্ঠীর স্থলে একটি বড় আকারের কৃষক শ্রেণী গড়ে ওঠার ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য কৃষক শ্রেণীর পক্ষে চলে আসে। কৃষক শ্রেণীর নবলদ্ধ ও রাজনৈতিক শক্তির কারণে সমর্থনের প্রয়োজনে সরকারের নীতিও তাদের অনুকূলে চালিত হয়। তাছাড়া গ্রামীণ অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য কৃষিকে সমর্থন দেয়া সরকারের নীতি হয়ে দাঁড়ায়। ভূমি মালিকানা প্রাপ্তি ও গড়ে ওঠা অবকাঠামোর সুযোগ সুবিধা কৃষকদের কৃষিতে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করে। কৃষি খামারের আয়তন ছোট বিধায় কৃষকরা উন্নত বীজ, অধিক পরিমাণ সার, উন্নত পদ্ধতির চাষাবাদ প্রভৃতি শ্রমনির্ভর পদ্ধতির মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন ও আয় বাড়াতে সক্ষম হলো। অধিক কৃষিপণ্য উৎপাদন ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মিটাল, সঞ্চয় বাড়াল এবং শিল্পদ্রব্যের বাজার সৃষ্টি করল। লিবারেলিজম নব্য ধনীদের তাদের সঞ্চয় পাশ্চাত্য পুঁজি ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতির চালিকা শক্তিতে পরিণত হতে সহায়তা করলো। এর ফলে অসংখ্য শিল্প কারখানা গড়ে উঠল। কৃষি ও শিল্প ভারসাম্যমূলকভাবে বিকশিত হলো। যদি লিবারেলিজম না থাকত, তবে অনেক উন্নয়নশীল দেশের মতো এসব দেশের নব্য ধনীরা সঞ্চয় ও বিনিয়োগের পরিবর্তে ভোগের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিত এবং বিদেশে পুঁজি পাচারে লিপ্ত হতো। সামাজিক সাম্য ভূমি সংস্কার অর্থনীতিতে যে প্রবৃদ্ধি বয়ে আনল, তার ফসল সমাজে সুসমভাবে ছড়িয়ে পড়ায় সামাজিক সাম্যের এক নতুন যুগ শুরু হলো। মিরডালের ভাষায়, 'সামাজিক বৈষম্য সকল প্রকারেই উৎপাদনশীলতার শত্রু'। সামাজিক সাম্য অপ্রয়োজনীয় ভোগ বিলাসের মাত্রা হ্রাস করল। গরীব মানুষের হাতে সম্পদের সঞ্চালন এবং তাদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মান উন্নত করল। একটি স্বাস্থ্যবান ও শিক্ষিত জনশক্তি গতিশীল ও নির্ভরযোগ্য প্রবৃদ্ধির ভিত রচনা করল। গরীব মানুষের দুঃখ-দুর্দশা হ্রাস তাদের ক্ষোভ ও হতাশা দূর করে কর্ম ও দক্ষতার উদ্দীপনা সৃষ্টি করল। ধর্মঘট ও সংঘাতজনিত অপচয় লোপ পেল। স্যাচস এর মতে, ল্যাটিন আমেরিকায় পৃথিবীর অন্যান্য স্থানের তুলনায় অধিক আয় বৈষম্য এবং তজ্জনিত সামাজিক সংঘাতের কারণে তথাকার অর্থনৈতিক সাফল্য বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ব্রাজিলে ৫ম ধনীব্যক্তি ৫ম গরীবের চেয়ে ৩৩ গুণ বেশি ধনী। অথচ তাইওয়ানে একই শ্রেণীর একজন ধনী ব্যক্তি অনুরূপ শ্রেণীর একজন দরিদ্র্য ব্যক্তি হতে মাত্র ৪গুণ ধনী। লাতিন আমেরিকায় গড়ে ২০% ধনাঢ্য ব্যক্তি ২১ গুণ বেশি ধনী যেখানে পূর্ব এশিয়ায় একজনের ধনাঢ্যতার মাত্রা মাত্র ৯ গুণ। শ্রমনিবিড় পদ্ধতি শ্রমনিবিড় প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে এসব দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়। ফলে বৈষম্য আরো হ্রাস পেয়ে ন্যায়পরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যে পথ অনুসরণ করেছে, তাইওয়ান তার চেয়ে একটু ভিন্ন পাথ অনুসরণ করেছে। কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের ভূমিকাকে তাইওয়ান সবিশেষ গুরুত্ব দেয়। ব্যবসা বাণিজ্যে বৃহৎ কোম্পানীগুলোকে একচেটিয়া কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা লাভ করতে দেয়নি। এ নীতির ফলে শ্রমনিবিড় উৎপাদন পদ্ধতি আরো বেশি প্রসার লাভ করে। বেকারত্ব ও অর্ধ-বেকারত্বের পরিধি আরে হ্রাস পায়। ক্ষুদ্র কৃষকগণ তাদের গ্রামীণ পটভূমিকায় আয় বৃদ্ধির সুযোগ লাভ করে। শিল্পোন্নত দেশের সার্বক্ষণিক মাথাব্যথা বেকার সমস্যার এদেশগুলোতে এভাবে সমাধান ঘটে। গামীণ কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি গ্রামীণ আয়ের বিপুল স্ফীতি ঘটায়। ১৯৮০ সালের পরিসংখ্যান হতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সর্বমোট আয়ের তিন চতুর্থাংশ অকৃষিজাত গ্রামীণ উৎস বলে দেখা যায়। এভাবে ১৯৫০ এর দশকের শ্রম-আধিক্যপূর্ণ তাইওয়ান ৭০ এর দশকে শ্রমিক সংকটের দেশে পরিণত হয় অর্থাৎ দেশটিতে পূর্ণ কর্মসংস্থান অর্জিত হয়। শহর ও গ্রামে পূর্ণ কর্মসংস্থানের ফলে সকল মানুষের আয় বৃদ্ধি পায়। ফলে ভূমি সংস্কারের দ্বারা ইতঃপূর্বে যে আয়-ন্যায়পরতা অর্জিত হয়েছিল, সে পরিস্থিতি আরো উন্নতি লাভ করে। পঞ্চাশের দশকে তাইওয়ানে যে 'গিনি-কোইফিসিয়েন্ট' (Gini coefficient) এর মাত্রা ছিল ০.৫৬, তা ৮০ এর দশকের প্রথম দিকে ০.৩১ এ নেমে আসে। যে কোনো উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় তাইওয়ান অধিক আয়-ন্যায়পরতা অর্জন করে। দেশের ২০% ধনাঢ্য ব্যক্তি ও দরিদ্রতম ২০% জনগোষ্ঠীর আয়ের হারের পার্থক্য ১৯৫৩ সালের ২০.৫ থেকে ১৯৮০ সালে ৪.২ এ নেমে আসে। এ হার সম্ভবত উন্নয়নশীল দেশসমূহের মধ্যে সর্বনিম্ন। সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ এসব দেশের জনগণের সমরূপতা এবং মূল্যবোধ সামাজিক শান্তি ও স্থিতিশীলতাপূর্ণ ঘনিষ্ঠ সমাজ গঠনে সহায়তা প্রদান করে। ব্যক্তির দায়িত্ববোধের উপর এ মূল্যবোধ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে মাতা-পিতার প্রতি দায়িত্ব, মালিক-শ্রমিকের মধ্যকার পারস্পরিক দায়্ত্ব, বন্ধু ও প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ব। কেউ যদি এ দায়িত্বকে অবহেলা বা অস্বীকার করে, সমাজ তাকে ঘৃণার চোখে দেখে। যে সমাজে দায়িত্বের অবস্থান এত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে সামষ্টিক শৃঙ্খলা অতি শক্তিশালী হয়, মালিক শ্রমিকের প্রতি মানবিক আচরণ করে ও তার কল্যাণের প্রতি খেয়াল রাখে। শ্রমিক সজাগভাবে পরিশ্রম করে এবং শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক হয় অতি ঘনিষ্ট। এ ধরনের যে সামাজিক মূল্যবোধ সামাজিক স্বার্থকে ব্যক্তিস্বার্থের উপর স্তান দেয়, তা নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতির লিবারেলিজমে খুঁজে পাওয়া যাবে না। যুদ্ধের পূর্বে এ সাংস্কৃতিক মূল্যবোধগুলো কেন সুপ্ত ছিল তা একটি বিষ্ময়কর প্রশ্ন বটে। উত্তর হচ্ছে, এ ধরনের মূল্যবোধ আচরিত হবার জন্য অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন। এসব দেশে পরবর্তীতে এ ধরনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির অন্যতম কারণ হচ্ছে, যুদ্ধ পরবর্তী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ফল হিসেবে আর্থ-সামাজিক ন্যায়পরতার আবির্ভাব। চরম সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যে ভরা দেশে ব্যক্তি ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনের কোনো বালাই বা দায়ভার নেই। কিন্তু ন্যায়ভিত্তিক সমাজে এ দায়ভার কেউ অস্বীকার করতে পারে না। পরস্পরের প্রতি দায়িত্ববোধের এ সংস্কৃতির উন্মেষের আরো একটি কারণ হচ্ছে, সবাই জানত যে যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতীয় অর্থনীতির দাবি কী? এ উপলদ্ধির জাগরণ বিলাসিতা পরিহার এবং সহজ সরল জীবনযাপনের এক সামাজিক সংস্কৃতি গড়ে তোলে। ফলে এসব দেশে পরিমিত ভোগ-ব্যয় এবং উচ্চহারে সঞ্চয়ের সৃষ্টি হয়। ১৯৮৭ সালে জাপান, হংকং, সিঙ্গাপুর, দিক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের জাতীয় সঞ্চয়ের হার ছিল যথাক্রমে আয়ের ৩৩.৪%, ৩০.৭%, ৩৯.৯%, ৩৭.০%। পক্ষান্তরে এ সময়ে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়া অঞ্চলে জাতীয় সঞ্চয়ের হার ছিল আয়ের ১৯.৮%, আফ্রিকার সাহার অঞ্চলে ১৩.০%, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় ১৭.০% এবং দক্ষিণ এশিয়ার ১৯.৩%। সঞ্চয়ের এ উচ্চহার পুঁজি গঠন এবং পণ্যসামগ্রীর উৎপাদন ও রপ্তানির জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদের জোগান দিলো। এসব দেশের অর্থনৈতিক সাফল্যে সঞ্চয়ের এ উচ্চহারের অবদান কোনোভাবে খাটো করে দেখা যায় না। উচ্চহারের কারণে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি বা বিদেশী ঋণ গ্রহণ ছাড়াই সরকারি ও বেসরকারি খাত তাদের বিনিয়োগ কার্যক্রমে অর্থ যোগান দিতে পেরেছে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ছিল বিধায় বাজারে এ দেশগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকে। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বিদেশী ঋণের সুদের ভারে এ দেশগুলো জর্জরিত হলো না এবং দেশীয় চাহিদা পূরণ রপ্তানিমুখী অগ্রগামী এক অর্থনীতির শক্ত ভিত গড়ে উঠল। আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও রপ্তানি উন্নয়ন সামাজিক মূল্যবোধগুলো এসব দেশে জাতীয় সঞ্চয় বৃদ্ধির সাথে সাথে অপ্রয়োজনীয় আমদানি হ্রাসে সহায়তা করল। পক্ষান্তরে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে জাতীয় উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় এ সঞ্চয় যোগাড় করা হলো উচ্চ আমদানি শুল্ক ও কঠোর বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। যার ফলে সৃষ্টি হলো চোরাচালান, আন্ডার ইনভয়েসিং এবং দুর্নীতি। এসব দেশের মানুষের প্রাত্যতিক প্রয়োজন পূরণে ভোগ ব্যয়ে সংযম ও কৃচ্ছ্রতাসাধন কোনোটাই জোর করে করা হয়নি; বরং সামাজিক মূল্যবোধ দ্বারা তা উজ্জীবিত ছিল। আমদানি নিয়ন্ত্রণের উপর কঠোর কোনো বিধিবিধান না থাকা সত্ত্বেও এসব দেশ আমদানিমুখী না হয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণের স্পৃহার দিকে উদ্বুদ্ধ ও তাড়িত হয়েছিল। জাপানের বিষয়ে লেস্টার থুরোর পর্যবেক্ষণ এখানে প্রণিধানযোগ্য, 'জাপানে শিল্পফার্মগুলো তাদের নিকটতম সরবরাহকারীরে সাথে শিল্প যন্ত্রাংশের যখন যা প্রয়োজন, তখন তা সঠিক ও সুনির্দিষ্টবাবে সরবরাহের বিষয়ে এমন দীর্ঘকালীন নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখে যে, নতুন কোনো বিদেশী ফার্মের জাপানী বাজারে প্রবেশের কোনো সুযোগই ছিল না'। তবে এসব দেশের বহির্মুখী দৃষ্টিভঙ্গি ও ভূমিকাকে অত্যধিক ফলাও করে তুলে ধরা হয়েছে। বস্তুত রপ্তানি প্রবৃদ্ধি জাপানে একটি নতুন বিষয়। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে জাপান ছিল একটি বাণিজ্য ঘাটতির দেশ। দেশীয় বাজারের চাহিদা পূরণের মধ্য দিয়েই জাপানী কোম্পানীগুলো প্রথমত সফলতা অর্জন করে। অপরদিকে কোম্পানীর আয়তন বৃদ্ধির ফলে তুলনামূলক যে উৎপাদন খরচ কমে আসে, সে সুযোগ গ্রহণ করে জাপান রপ্তানি বাজারে প্রবেশে করে। অভ্যন্তরীণ বাজার চাহিদাই শেষতক রপ্তানিমুখীতা সৃষ্টিতে সফলতা এনে দিয়েছে। উল্টোভাবে নয় অর্থাৎ প্রথমেই রপ্তানির দ্বারা জাপান সাফল্যের মুখ দেখেনি। কোরিয়া, তাইওয়ান ও আরো অনেক দেশ যারা রপ্তানি ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করেছে, তারা সবাই প্রথম পর্যায়ে আমদানি প্রতস্থাপনের পথ অনুসরণ করেছে। এসব দেশে প্রাথমিক পর্যায়ে দেশীয় শিল্প সংরক্ষণ নীতি গ্রহণ করে এবং পরবর্তী পর্যায়ে তারা আমদানি প্রতিস্থাপন থেকে রপ্তানি উন্নয়নের দিকে মোড় নেয়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রথম দিকে উপার্জিত সীমিত বৈদেশিক মুদ্রার সবটুকু বিদেশী প্রযুক্তি ও যন্তপাতি ক্রয়ে। ব্যয় হতো। অপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর আমদানি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা হয়। শিল্পায়নের জন্য সংরক্ষণবাদী নীতির প্রয়োজন নেই মর্মে সম্প্রতি যে মতামত ব্যক্ত করা হচ্ছে তা তথ্য নির্ভর নয়। জার্মান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে জাপান পর্যন্ত সকল ঐতিহাসিক উদাহরণ হতে দেখা যায় যে, এসব দেশে সংরক্ষণবাদী শিল্পনীতির মাধ্যমেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি লাভ করেছে। এমনকি এখনো এসব দেশসমূহ শিল্প ও কৃষি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সংরক্ষণবাদী নীতি প্রয়োগ করছে, যা উন্নত দেশগুলো করেনি এবং এখনো করছে না, তা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে করতে বলা অবাস্তব পরামর্শ মাত্র। নিম্নমাত্রার প্রতিরক্ষা ব্যয় জাপানী পাবলিক ফিন্যান্সের তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্বল্পমাত্রার প্রতিরক্ষা ব্যয়। জাতীয় আয়ের ১% এরও কম প্রতিরক্ষা ব্যয় হচ্ছে জাতীয় আয়ের ৪% এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জাতীয় আয়ের ৩%। সামরিক খাতে স্বল্প ব্যয়ের কারণে জাপানে পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থনৈতিক সম্পদ অবমুক্তি লাভ করে। ফলে সরকারি ব্যয় নিম্ন পর্যায়ে রাখা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়। তাছাড়া অন্যান্য দেশের তুলনায় করহার নিচু পর্যায়ে রাখা সম্ভব হয়। ১৯৭৫ সালে জাপানে সর্বমোট করের পরিমাণ ছিল জাতীয় আয়ের ২১% এবং ১৯৮৮ সালে ৩১.৩%। পক্ষান্তরে এ সময়কালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে করের মাত্রা ছিল জাতীয় আয়ের ৩.৩% এবং ৪০.৮%। জাপানের তুলনায় দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাইওয়ানে প্রতিরক্ষা খাতে তুলনামূলকভাবে অধিক অর্থ বরাদ্দ হলেও বাজেটের এ বাড়তি বোঝা বৈদেশিক সাহায্য, প্রধানত যুক্তরাষ্ট্র হতে প্রাপ্ত, দ্বারা লাঘব হয়। ভবিষ্যতের ছবি সুস্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, এসব দেশের দ্রুত অর্থনেতিক উন্নয়ন বিশেষত প্রবৃদ্ধি ও ন্যায়পরতার লক্ষ্যের মধ্যে সমন্বয় সাধনের পশ্চাতে অনেকগুলো কারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিক পালন করেছে। তবে এ সমস্ত কারণগুলোর সূতিকাগার হিসেবে একমাত্র উদারনীতিবাদকে কৃতিত্ব দেয়া সঠিক হবে না। এখানে একটি প্রশ্ন উত্থাপন করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, বিশেষ পরিস্থিতির কারণে এ সমস্ত দেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে যে ন্যায়পরতা অর্জন করতে পেয়েছে, তা ভবিষ্যতেও ধরে রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে কিনা। কতিপয় কারণে এসব দেশে আয়-ন্যায্যতা ভারসাম্য সম্প্রতি যেভাবে হ্রাস পেয়েছে তাতে নেতিবাচক উত্তরই পাওয়া যায়। দক্ষিণ কোরিয়া শিল্প খাতে বৃহদায়তন পরিবার পরিচালিত বিশালাকৃতির কোম্পানী বা কনগ্লোমাটে্স এর পথ ধরেছে। সরকারি সহায়তা ও ব্যাংক ব্যবস্থা হতে ঋণের মাধ্যমে কোরিয়ান কনগ্লোমারেটসমূহ উত্তরোত্তর বৃহদাকৃতি ধারণ করেছে। ১৯৮৪ সালের তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, জাতীয় আয়ের ৬৪% এবং রপ্তানির ৭০% নিয়ন্ত্রণ করছে বৃহৎ ১০টি কনগ্লোমারেট। কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী শ্রমঘন উৎপাদন পদ্ধতি গ্রামীণ এলাকায় নয়, শুধু শহরাঞ্চলেই লভ্য। ফলে গ্রামাঞ্চল হতে শহরাঞ্চলে বিপুল মানুষের অভিবাসন ঘটেছে। তাইওয়ানের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেনি। দক্ষিণ কোরিয়ায় দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ সিউল, পুসান, টায়ীগু এবং ইনচোন নামক চারটি বৃহৎ শহরে ঠাসাঠাসি করে বাস করছে। ফলে শহর কেন্দ্রগুলোর গৃহায়ন ও অন্যান্য নাগরিক সুযোগ সুবিধার উপর সৃষ্টি হয়েছে প্রচণ্ড চাপ। গ্রাম থেকে ছুটে আসা মানুষের জীবনযাত্রা হয়ে উঠেছে দুর্বিসহ। দক্ষিণ কোরিয়ায় বৃহৎ শিল্প পরিবারের উত্থান আয় বৈষম্যকে তীব্রতর করে তুলছে। ১৯৬৫ সালে নিচের দিকের ৪০% মানুষের আয়ের পরিমাণ ছিল জাতীয় আয়ের ১৯.৩%, যা ১৯৮৭ সালে হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৬.৯% এ। একই সময় ব্যবধানে উপর দিকের ২০% মানুষের আয় ৪১.৮% হতে বৃদ্ধি পেয়ে ৪৫.৩% এ দাঁড়িয়েছে। অন্যান্য উন্নয়নশীর দেশের তুলনায় দক্ষিণ কোরিয়ায় আয়-বণ্টন অনেক বেশি ন্যায়পরতাপূর্ণ হলেও শিল্প ও বাণিজ্য সংগঠন হিসেবে কনগ্লোমারেট পদ্ধতিকে বেছে নেয়ার কারণে আয় বৈষম্য, বিলাস ব্যয় এবং শ্রমিক সংঘাতের বীজ রোপিত হয়েছে। ১৯৮১-৮৫ সময়কালে প্রতি বছর ধর্মঘট হয়েছে গড়ে ১০০টি। ১৯৮৬ সালে ধর্মঘটের সংখ্যা ২৭৬টি। ১৯৮৭ সালে ধর্মঘট সীমা ছাড়িয়ে দাঁড়িয়েছে ৩০০৮টিতে। এত প্রমাণিত হয়, ভূমি সংস্কার ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ দ্বারা অর্জিত আর্থ-সামাজিক ন্যায্যতার মাধ্যমে যে সুষম শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল, তা শহরাঞ্চলে আগত শ্রমিকদের দুর্দশা ও ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের দ্বারা ভগ্নদশা লাভ করেছে। "সামাজিক সম্পর্কের উপর প্রতিক্রিয়া যাই হোক না কেন, তার দিকে লক্ষ্য না করে কোরিয়া তিন দশক যাবত কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথেই ধাবিত হয়েছে। দৃষ্টিভঙ্গির এখন পরিবর্তন ঘটেছে''। পারভেজ হাসান যথার্থই মন্তব্য করেছেন, 'পশ্চাৎপদ গ্রামীণ অর্থনীতি ও শহরাঞ্চলের দিকে মানুষের অত্যধিক অভিবাসনের তিক্ত অভিজ্ঞতা গ্রামীণ ও নগর উন্নয়নের জন্য একটি সমন্বিত পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। জাপানের ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টিপাত করলেও ক্রমবর্ধমান আয় বৈষম্যের একটি ধারা দেখতে পাওয়া যায়। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জাইবাৎসু নামধারী বৃহৎ শিল্প পরিবারগুলোর বিলুপ্ত ও ভুমি সংস্কার সমাজে অর্থনৈতিক শক্তিকে যেভাবে সুষমভাবে বণ্টন করে দিয়েছিল, তাতে মুষ্টিমেয় পরিবারের পক্ষে আর দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করা সম্ভব হয়নি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকৃতির অসংখ্য শিল্প ইউনিট গড়ে উঠল এবং তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বাজারের সৃষ্টি হলো। উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি পাওয়ায় জাপানের পক্ষে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে ওঠা সম্ভব হলো। কিন্তু চল্লিশ দশকের শেষের দিকে Elimination of Excessive Concentration of Economic Power Law- এর কার্যকারিতা প্রায় লোপ পায় এবং পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি সময়ে এ আইন বাতিল করা হয়। ফলশ্রুতিতে মিতসুবিসি, মিতসুই, সুমিতোমা নামে প্রাক্তন জাইবাৎসু পরিবারগুলোর পূর্বতন অর্থনৈতিক শক্তি নিয়ে পুরাবির্ভাব ঘটে। যদিও এ কোম্পানীগুলোর গঠন প্রণালী জাইবাৎসু সময়কাল হতে ভিন্ন; তবু তারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভূত প্রভাব বিস্তার করছে। ক্রমবর্ধমান শক্তি সঞ্চয়কারী জাইবাৎসু ব্যাংকসমূহ এ কোম্পানীগুলোর ধাত্রী হিসেবে কাজ করল। অর্থনীতির উপর এদের ব্যাপক প্রভাব ভবিষ্যতে দীর্ঘকাল ধরে অব্যাহত থাকবে। জাপানে ক্ষদ্র ব্যবসা বাণিজ্যের বিপুল প্রসার ঘটলেও মোট বিক্রয়ে তাদের হিস্যা কমে এসেছে। এসব ব্যবসা-ফার্মের অধিকাংশের নিজস্ব মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা নেই। ব্যাংকিং ব্যবসা ছাড়া বড় বড় ব্যবসায়ী ফার্মের আনুকূল্যের বর্তমান বর্তমান ব্যবস্থাপনা কিছু হাতে সম্পদের কেন্দ্রীভূতকরণ ঘটাচ্ছে। সম্পদের কুক্ষিগতকরণ জাইবাৎসু সময়ের সমমাত্রার না হলেও এর প্রবণতা সেদিকেই যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বড় বড় বিত্তশালীদের অবলুপ্তির মাত্র চার দশকের মধ্যে বর্তমানে বিশ্বের প্রথম দশজন ধনী ব্যক্তির মধ্যে ছয় জন জাপানের। এ রকম বিশাল ধনশালী ব্যক্তিদের পক্ষে দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতির উপর ক্রমবর্ধমান প্রভাব ফেলাই স্বাভাবিক। জাপানে 'এগ্রিকালচারাল ল্যান্ড এ্যাক্ট' সামন্ততন্ত্রের পুনরুজ্জীবনকে এবং 'লার্জ স্কেল রিটেইল স্টোর ল' খুচরা ব্যবসা সেক্টরে বৃহৎ বাণিজ্য সংস্থার অনুপ্রবেশকে রুদ্ধ করেছিল। জাপানের চলমান উদারনীতিকরণ নীতির ফলে, বিশেষত যদি উপযুক্ত এ্যাক্ট দু'টি বাতিল বা তাদের কার্যকারিতা হ্রাস করা হয় তবে, সম্পদের কেন্দ্রীভূতকরণ আরো বৃদ্ধি পাবে। এসব দেশের সঞ্চয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ এখন শেয়ার বাজার ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হচ্ছে। শেয়ার ও জমির মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে আয় সম্পদের কেন্দ্রীভূতকরণ বাড়ছে। ১৯৫০ সালে 'নিক্কেই ইনডেক্স' ছিল ১০২, যা বেড়ে ১৯৬০ সালে। ১,১১৭; ১৯৭০ সালে ২,১৯৩; ১৯৮০ সালে ৬,৮৭০ এবং ১৯৮৭ সালের অক্টোবরে ধ্বসের পূর্বে ২৬,৬৪৬। অন্যান্য বড় ষ্টক মার্কেটের তুলনায় জাপানে অবশ্যই দ্রুত বাজার দর ফিরে আসে এবং ডিসেম্বর, ১৯৮৯ সালে ইনডেক্স ৩৮,৯১৬ তে এসে দাঁড়ায়। জাপানে প্রতি চার বছর অন্তর শেয়ার দর দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ হার ১৯৭০ সালে ছিল ১০.৭, যা বেড়ে ১৯৮০ সালে হয়েছে ১৯.১ এবং ১৯৮৮ সালে ৬১.৪। জুলাই ১৯৮৯ সালে এ হার মূলত সুদের হার বৃদ্ধির জন্য ৫০.৪ এ নেমে আসে। জুলাই, ১৯৮৯-এ কতিপয় বৃহৎ দেশের স্টকের তুলনামূলক মূল্য ও আয়ের হার ছিল যুক্তরাষ্ট্রে ১৩.৩; যুক্তরাজ্যে ১১.৭; পশ্চিম জার্মানীতে ১৫.৭ এবং ফ্রান্সে ১২.৪। জাপানী স্টকের মূল্য ও আয়ের অতি উচ্চহারের মধ্যে সংকটের বীজ লুকায়িত আছে, যা যে কোনো সময়, শুধু জাপানী অর্থনীতিতে নয় বরং বিশ্ব মুদ্রাবাজার ব্যবস্থায় অশনি সংকেত ডেকে আনতে পারে। জাপানে জমির মূল্য তীব্রভাবে বেড়েছে। ছয়টি বড় শহরে বাণিজ্য, বসতি বা শিল্প স্থাপনে ব্যবহারের জন্য জমির গড় দাম প্রতি চার বছরে দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্প, বাণিজ্য বা বসতবাড়ি সম্পত্তি জাপানে এত বেশি ব্যয়সাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, তা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নাগালের বাইরে চলে গেছে। একদিন তাদের বসতবাড়ি বা ব্যবসা বাণিজ্য হবে, সে স্বপ্ন ভেঙে গেছে। অফিস ও জায়গাজমির উর্ধমূল্যের দরুণ দ্রব্যসামগ্রীর দামও বেড়ে গেছে। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় হ্র্রাস পেয়েছে। জাপান বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল দেশ। প্রকৃত প্রস্তাবে ইয়েনের অভ্যন্তরীণ ক্রয় ক্ষমতা তার বৈদেশিক বিনিময় হারের চেয়ে কম। শেয়ার ও সম্পত্তির ফটকাবাজার তাতে থেমে নেই। যাদের অতিরিক্ত জামানত দেবার সামর্থ্য আছে, তারা ব্যাংক হতে ফটকাবাজারে বিনিয়োগের জন্য প্রচুর ঋণ পাচ্ছে। এ ফটকাবাজার বিস্ফোরণ সম্পদের বৈষম্য বাড়িয়ে আর্থ-সামাজিক ভারসাম্য বিনষ্ট করছে। এখানকার নব্য ধনীদের জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও ভিন্ন ধরনের। তারা ভোগবিলাসে অজস্র খরচ করে সামাজিক বৈষম্যকে আরো দৃশ্যমান ও তীক্ষ্ম করার মাধ্যমে সামাজিক সেই সংযোগ সূত্রকে শিথিল করে দেয়, যা সামাজিক সংহতিকে জোরদার করে রেখেছিল। একই ফটকাবাজার বিস্ফোরণ দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানেও আর্থ-সামাজিক ন্যায়পরতার উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলেছে। তাই দেখা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এসব দেশ ন্যায়পরতার সাথে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে অগ্রসর হলেও পুঁজিবাদী অর্থ কাঠামোর মধ্যে থেকে আর্থ-সামাজিক ইনসাফকে ধরে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ালো। বিশেষ পরিস্থিতির কারণে প্রাথমিক পর্যায়ে বৈষম্য হ্রাস করা সম্ভব হলেও সমগ্র অর্থনীতিকে ন্যায়পরতার লক্ষ্যে পুনর্গঠন না করা হলে আয় ও সম্পদ বৈষম্য আবার সমাজে জেগে উঠবেই। অর্থনীতির বিশেষ করে অর্থব্যবস্থার এরূপ পুনর্গঠন কিভাবে করা যায় তা পরবর্তী ৮-১০ অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে। হারানো সূত্র দূরপ্রাচ্যের দেশগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ন্যায়পরতা পাশাপাশি অর্জন করতে সমর্থ হলেও এর পশ্চাতে উদারনীতিবাদের ভূমিকাকে অত্যধিক গুরুত্ব প্রদান করা ভুল হবে। এমনকি নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতিবিদগণও স্বীকার করেন যে, বাজার অর্থনীতির উপর জোর প্রদানের অর্থ এ নয় যে, বাজার ব্যবস্থার যে কোনো ফলাফলকে সরকার মেনে নেবে; বরং এটাই কাম্য যে, সরকার বাজার মূল্য ব্যবস্থার উন্নতি সাধনের জন্য চেষ্টা চালাবে। দুঃখজনক হলেও এ কথা সত্য যে, নিওক্লাসিক্যাল উদারনীতিবাদের প্রয়োগের পাশাপাশি বাজার ও মূল্য ব্যবস্থার উন্নতির জন্য সরকারি প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ন্যায়পরতার লক্ষ্যকে ধরে রাখা যায়নি। দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিরাজিত অধিকতর ন্যায়পরতার কারণ উদার নীতিবাদ নয়। বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী বিশেষ অবস্থা, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও সরকারি নীতি এর কারণ। স্বাভাবিক শান্তিকালীন সময়ে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে ন্যায়পরতা সৃষ্টিকারী অবস্থাসমূহের পুনরাবৃত্তি ঘটানো সম্ভব নয়। ন্যায়পরতা সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় কৌশল উদ্ভাবন ব্যতিরেকে শুধুমাত্র নিওক্লাসিক্যাল উদারনীতিবাদের প্রয়োগে আয় বৈষম্যের অবনতি সৃষ্টি করবে। এমনকি যদি অন্যান্য দেশে অনুরূপ সঞ্চয়ধর্মী সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ বিরাজও করে, তবু বর্তমান পাশ্চাত্য ভোগবাদী সভ্যতার আগ্রাসন, ক্রমবর্ধমান নৈতিক অবক্ষয় ও বিপুল আর্থ- সামাজিক বৈষম্য তার কার্যকারিতাকে ভোঁতা করে দিয়েছে। এসব দেশের আজকের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে কিভাবে সামাজিক আয়ের ক্ষেত্রে ন্যায়পরতা অর্জন ও বজায় রাখা যায়। আয়ের ক্ষেত্রে ন্যায়পরতাকে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা সত্ত্বেও এসব দেশ তা অর্জনের কার্যকর কৌশল উদ্ভাবনে ব্যর্থ হয়েছে। পঁচিশ বছরে উন্নয়ন পরিক্রমাকে অধ্যয়ন করে মোরওয়েটজ মন্তব্য করেছেন, 'কিভাবে প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যায় এবং এ জন্য কি নীতি অনুসরণ করতে হবে এ বিষয়ে প্রচুর ও অনায়াসলদ্ধ অর্থনৈতিক আলোচনা সমৃদ্ধ লেখা রয়েছে। কিন্তু উন্নয়নের ফসলকে কিভাবে জনগণের মাঝে সুষমভাবে বণ্টন করতে হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনামূলক কোনো আলোচনা দেখা যায় না'। যদিও এক দশকেরও আগে এ মন্তব্য করা হয়েছে, তবু আজকের জন্যও একথা সত্য। বণ্টন ব্যবস্থার উন্নতির জন্য মূলত প্রবৃদ্ধির উপরই নির্ভর করা হচ্ছে। ফিল্ডস যথার্থভাবে বলেছেন, 'দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাধারণভাবে দারিদ্র্য হ্রাস করলেও দারিদ্র্য নিরসনের জন্য প্রবৃদ্ধি অর্জন যথেষ্ট নয়... অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে বৈষম্য হ্রাস পাবে কী বৃদ্ধি পাবে, তা মাথাপিছু গড় আয়ের বৃদ্ধির উপর নির্ভর করে না, বরং তা নির্ভর করে কী ধরনের উন্নয়ন কৌশল অনুসরণ করা হয়েছে তার উপর। বৈষম্য হ্রাসের জন্য কার্যকর কর্মসূচি প্রদানের ব্যর্থতার প্রেক্ষিতে সাম্যের জন্য উদ্বেগ প্রকাশ আসলে ফ্যাশন নির্ভর সমাজের আরেকটি ফ্যাশন মাত্র। এ অনুভূতিটি আরো তীব্রতার হয়, যখন দেখা যায় নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতিবিদদের একটি বিরাট অংশ ন্যায়পরতা অর্জনকে নীতিমালার মূল লক্ষ্য হিসেবে ধার্য না করে তাকে অনুসৃত নীতির পরোক্ষ লক্ষ্য হিসেবে স্থির করে। ন্যায়পরতা অর্জনের উপর পর্যাপ্ত আলোচনার অভাব বস্তুত উন্নয়ন অর্থনীতিবিদদের এ বিষয়ের আলোচনার প্রতি অনীহার ফসল মাত্র। ন্যায়পরতা অর্জনের জন্য কার্যকর কৌশল দাবি করে সামাজিক উদ্দীপনার জাগরণ, সামাজিক মূল্যবোধ নিরপেক্ষ নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতির কাঠামোর মধ্যে থেকে তা সম্ভব নয়। প্রশ্ন হচ্ছে ন্যায়পরতা অর্জনের উপযুক্ত পন্থা যদি কেউ বাতলেও দেয় তবুও অন্যরা গ্রহণ করবে কেন? মিয়ারের ভাষায় উন্নয়ন অর্থনীতির সবচেয়ে অসমৃদ্ধ অংশ হচ্ছে, কিভাবে যথাযথ নীতিমালার গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি করতে হবে তার দিকনির্দেশ করতে না পারা। পন্থা বাতলানো সহজ হলেও তার গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি ও বাস্তবায়ন সত্যি কঠিন। এর কারণ বলতে যেয়ে মিয়ার বলেছেন, 'এমন একটি নীতিমালা বা কর্মসূচি পাওয়া দুষ্কর যাতে সবাই লাভবান হয়। যে কোনো কর্মসূচি হতে কেউ লাভবান হবে আর কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এটাই স্বাভাবিক'। তাই এমন একটি কর্মপদ্ধতি নিরূপণ করা প্রয়োজন, যা কোনো কর্মসূচির দ্বারা ক্ষতিগ্রস্তদেরও সত্য গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করবে। নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতি এখানে ব্যর্থ হয়েছে। এ মতবাদ প্রদত্ত কর্মসূচি কার্যকর হয়েছে যতক্ষণ পর্যন্ত তা ব্যক্তিস্বার্থ পূরণের অনুকূলে থেকেছে। ব্যক্তিস্বার্থ পূরণের জন্য ধাবিত হবে এ ধরনের ব্যবস্থার মাধ্যমে সুষম বণ্টন আনয়ন করা যায় না। এ ধরনের অর্থনৈতিক আচরণ বস্তুত বৈষম্যকে আরো বাড়িয়ে দেয়। সুষম বণ্টন দাবি করে সামাজিক স্বার্থে নিছক ব্যক্তিস্বার্থের কিছু ছাড় দেবার স্পৃহা। নিওক্লাসিক্যাল মডেলে সামাজিক স্বার্থসিদ্ধি ততদূর পর্যন্ত হবে, তা ব্যক্তিস্বার্থের সাথে সংঘাতপূর্ণ না হয়। মূল্যবোধ নিরপেক্ষ উদারনীতিবাদ আত্মত্যাগ স্বীকার করে, সামাজিক স্বার্থরক্ষার কোনো তাগিদ সৃষ্টি করে না। বিশ্ব ব্যাংকের রির্পোর্ট অনুযায়ী বিশ্বের মানুষের আয় যদি সুষমভাবে বণ্টন করা হতো, তবে বর্তমান খাদ্যশস্যের পরিমাণ দ্বারাই প্রত্যেক নারী, পুরুষ ও শিশুকে প্রতিদিন ৩০০০ ক্যালরি এবং ৬৫ গ্রাম দেখা গেছে ১৯৬৫ সালে মাথাপিছু যে ক্যালরি ছিল তার তুলনায় ১৯৮৫ সালে মাথাপিছু ক্যালরি অনেক কম। মানুষের অভাব রয়েছে এর কারণ এ নয় যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের উৎপাদন যথেষ্ট পরিমাণে হয়নি; বরং এটাই যে, তার সুষম বণ্টন সৃষ্টি করতে পারেনি। যদি এ মডেলের তা করার সামর্থ্য থাকত,তবে যেসব অধিক সম্পদ ও সমৃদ্ধিশালী উন্নত দেশসমূহে এ মডেলের প্রয়োগ হয়েছে, সেসব দেশে সম্পদের সুষম বণ্টন অর্জিত হতো। তাহলে এসব দেশের উন্নয়ন কমিটিসমূহকে এ কথা স্বীকার করতে হতো না যে, ‘দারিদ্র্য দূরীকরণে সমস্যাটির নিরসন প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে’। নিওক্লাসিক্যাল মডেলের ন্যায়পরতা অর্জনের ব্যর্থতাই সমাজতন্ত্রের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু সমাজতন্ত্রও অধিকাংশ দেশেই ন্যায়পরতা আনতে ব্যর্থ হয়েছে। সমাজতন্ত্রের অধিকতর ব্যর্থতা হচ্ছে, অধিকাংশ দেশে সমাজতন্ত্র উৎপাদন দক্ষতাও অর্জন করতে পারেনি। আয় ন্যায়পরতার লক্ষ্য অর্জন যেহেতু উন্নয়নশীল দেশের জরুরি আর্থ-সামাজিক ম্যান্ডেট, তাই যে নিওক্লাসিক্যাল মডেল অতীতে এ লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে তার পুনরুজ্জীবন দ্বারা নতুন কিছু আশা করা যায় না। নিওক্লাসিক্যাল মডেলের দিকে পুনরায় ফিরে গেলে উন্নয়নশীল দেশেসমূহে যে আয়-বৈষম্য বিরাজমান, সে অবস্থার কোনো উন্নতি সাধিত হবে না। বরং সংকট ও অসন্তোষ আরো বৃদ্ধি পাবার সম্ভাবনা রয়েছে যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তীব্রতা লাভ করেছে। রাজনৈতিক অসন্তোষ ও সংকট এমন আকার নিতে পারে যাতে উদারনীতিবাদের বিরুদ্ধে এক ক্রুদ্ধ স্রোতধারা সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, উদারনীতিবাদ বিরোধী এ স্রোতধারা উন্নয়নশীল দেশসমূহে ন্যায়পরতার লক্ষ্য অর্জনে কী সফল হবে, যখন ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, উন্নয়নশীল ও সমাজতান্ত্রিক উভয় শিবিরেই উদারনীতি বিরোধী মতবাদ ন্যায়পরতার লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। তাই দুটি মতবাদের মাঝে ফুটবলের মতো ছোটাছুটি করার পরিবর্তে উন্নয়নশীল দেশসমূহকে নিজের আর্থ-সামাজিক প্রয়োজনের আলোকে নিজস্ব উন্নয়ন কৌশল উদ্ভাবন করতে হবে।

পঞ্চম অধ্যায়ঃ ইসলামী বিশ্বদর্শন ও কর্মকৌশল

পঞ্চম অধ্যায় ইসলামী বিশ্বদর্শন ও কর্মকৌশল সেকুলার বুদ্ধিবৃত্তিক ও বিশ্বদর্শনভিত্তিক কর্মকৌশল অবলম্বন করে উন্নয়নশীল এবং ধনাঢ্য পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো কী কারণে দক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতার লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়নি প্রথম চারটি অধ্যায়ে তা আলোচিত হয়েছে। সে কারণে মুসলিম দেশগুলো যদি 'মাকাসিদ আল-শরীয়াহ' হাসিল করতে চায়, তাহলে তাদের এসব কর্মকৌশলকে মডেল হিসেবে গ্রহণ করার কোনো কারণ নেই; কেননা 'মাকাসিদ আল-শরীয়াহ'-তে স্বাভাবিক মানবকল্যাণের উপাদানসমূহ এতই ব্যাপক যে, অন্য কোনো সেকুলার ব্যবস্থায় তা কল্পনাও করা যায় না। এমনকি কী করতে হবে সে ব্যাপারে কালক্ষেপণের সময়ও মুসলিম দেশগুলোর নেই। ইতোমধ্যেই যথেষ্ট ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। তারা যদি মাকাসিদ অর্জনের উপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার না দেয়, তাহলে আর্থ-সামাজিক অসন্তোষ আরো ঘনীভূত হবে। ফলে তাদের সমাজ খণ্ডবিখণ্ড হয়ে পড়বে। অতএব মুসলিম দেশগুলোর প্রয়োজন এক ভিন্ন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার, যে ব্যবস্থা ভ্রাতৃত্ব ও মানবকল্যাণের সকল প্রয়োজনীয় উপাদান নিশ্চিত করতে সক্ষম। এ ব্যবস্থা ভারসাম্যহীনতা দূরীকরণেই সক্ষম হবে না, বরং তা সম্পদের এমনভাবে পুনর্বণ্টন করবে, যাতে একই সঙ্গে দক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতা উভয়ই অর্জিত হয়। এ ব্যবস্থায় অংশগ্রহণকরীগণ এর নীতিমালাসমূহ মেনে চলবে এবং তাদের সর্বোত্তম গুনাবলীর বিকাশ ঘটাবে। এতে তারা শুধু নিজের স্বার্থই নয়, বরং সমাজের স্বার্থও রক্ষা করবে। এ ব্যবস্থা ততক্ষণ পর্যন্ত সফল হবে না, যতক্ষণ না তা ব্যাপক আর্থ-সামাজিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। পুনর্গঠনের মাধ্যমে সমাজের দুরূহ হতে পারে, যদি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের মাধ্যমে সমাজের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোকে এমনভাবে উপযোগী করে তোলা না হয়, যেখানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এ ব্যবস্থার মূলনীতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে অবৈধ সুবিধা নিতে পারে। দুর্লভ সম্পদ ও তার বণ্টনের মধ্যে এমনভাবে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে, যাতে দক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতা উভয়ই অর্জিত হয়। এ জন্য যা দরকার, তা হলো রাষ্ট্র বা বাজারের উপর গুরুত্ব না দিয়ে মানবগোষ্ঠীর উপর নজর দেয়া। মানুষ একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জীবন্ত ও অপরিহার্য উপাদান। লক্ষ্য ও লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ার সবই মানুষ। অতএব, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের সামাজিক কল্যাণের লক্ষ্যে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আত্মস্বার্থ অর্জনের লক্ষ্যে তাদেরকে সংশোধিত ও উদ্বুদ্ধ করা না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বাজার অর্থনীতির 'অদৃশ্য হাত' অথবা কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার 'দৃশ্যমান হাত' দ্বারা আর্থ-সামাজিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কিছুতেই সফল হতে পারবে না। এককভাবে মানুষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও তার প্রতিষ্ঠানসমূহ থেকে অনুপ্রেরণা পায়। সুতরাং, সংস্কার হতে হবে এমন যা অর্থব্যবস্থাকে পরিশুদ্ধ করে, জীবনাচার ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত শক্তিকে এমনভাবে পুনর্গঠিত করে, যাতে সম্পদের উপর অপ্রয়োজনীয় চাপ কমিয়ে আনা যায় এবং অন্যায়, শোষণ ও অস্থিতিশীলতা সম্পূর্ণ নির্মূল করা না গেলেও ব্যাপকভাবে হ্রাস করা যায়। এগুলো যদি না করা যায়, তাহলে কোনো একক মানুষের সংস্কার কার্যকর হতে পারে না। অতএব মানুষ এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে একটি পারস্পরিক সম্পর্ক বিদ্যমান। এ উভয় বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো ব্যবস্থার কর্মকৌশলে যখন কেবলমাত্র বাজার শক্তি বা রাষ্ট্রের উপর প্রধানত জোর দেয়া হয়, তখন শেষ পর্যন্ত তা মানুষের অধঃপতন ডেকে আনে ও দুর্দশা বৃদ্ধি করে, হতে পারে, তা মানুষের সমস্যার সমাধানের মহৎ উদ্দেশ্য নিয়েই করা হয়। অর্থনৈতিক ব্যবস্থা একটি বিশ্বদর্শনের উপর ভিত্তি করে গড়ে না উঠলে মানুষ ঐ ব্যবস্থার লক্ষ্য এবং তা অর্জনের উপায় হতে পারে না। কারণ এ দর্শন সমস্ত বিবেচনার কেন্দ্রবিন্দুতে গুরুত্বের ঈর্ষণীয় অবস্থানে মানুষকে পুনঃস্থাপিত করে এবং তাকে কেন্দ্র করেই সমস্ত কিছু আবর্তিত হয়। পুঁজিবাদী ও সমাজবাদী কোনো বিশ্বদর্শনেই মানুষকে এ ধরনের গুরুত্ব দেয়া হয়নি এবং ডারউইনবাদ বা দ্বান্দ্বিকতাবাদে মানব ভ্রাতৃত্ববোধ, আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সম্পদের আমানতের প্রকৃতির বিষয়ে যে অন্তর্নিহিত বিশ্বাস থাকা প্রয়োজন তাও স্থান পায়নি। এতে 'যোগ্যতমরাই সেরা' অথবা 'শ্রেণী সংগ্রাম' এবং 'চাহিদার সর্বোচ্চ তৃপ্তি' বা 'জীবনের বস্তুবাদী অবস্থা' ইত্যাদি বিষয়ের উপর অত্যধিক ও অতিরঞ্জিত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এসব দর্শনে সমাজের স্বার্থে কাজ করার জন্য মানুষকে নিয়োজিত করার কোনো উদ্বুদ্ধকরণমূলক ব্যবস্থা নেই। সমাজের স্বার্থ কেবল আত্মস্বার্থ সিদ্ধি ও প্রচেষ্টার মাঝেই নিহিত নয়, বরং সে জন্য অন্যের উপকারার্থে ব্যক্তিগত লাভ ও আয়েশ বিসর্জন দেয়ারও প্রয়োজন। এসব বিশ্বদর্শন সংঘাত ও অধিকারের দাবিকেই জোরালো করে এবং শুধু সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে অদক্ষতা ও অবিচারেরই জন্ম দেয় না, তা স্বপ্নভঙ্গ, অপরাধ, পারিবারিক ও সামাজিক ধস এবং পরিশেষে মানুষের অধঃপতনও ডেকে আনে। অর্থ ও ব্যাংকব্যবস্থা আধুনিক কালের অর্থনীতির উপর এত ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে যে, এদের ইতিবাচক সমর্থন ছাড়া কোনো অর্থব্যবস্থা তার শক্তি ও সামর্থ্যকে ধরে রাখতে বা আর্থ-সামাজিক লক্ষ্য অর্জনে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে না। সুতরাং, সকলের জন্য ক্ষতিকর অতিরিক্ত ভোগ, বেকারত্বও মুদ্রাস্ফীতি যাতে ঘটতে না পারে, তেমনি ভারসাম্যহীনতা ও বাড়াবাড়িকে পরিহারকল্পে অর্থ ও ব্যাংকব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। সাধারণভাবে এ ব্যবস্থা এমন হতে হবে যাতে প্রয়োজন পূরণ করা যায়, উচ্চহারে উপার্জনের সুযোগ সৃষ্টি এবং উৎপাদন ব্যবস্থার ব্যাপকভিত্তিক মালিকানা নিশ্চত হয়। এ ধরনের একটি সুস্থ ও ন্যায়বিচারমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রণয়ন করা কি সম্ভব? এ অধ্যায়ের মূল লক্ষ্য এ কথারই ই্ঙ্গিত দেয় যে, হ্যাঁ, তা করা সম্ভব। এ ব্যবস্থার শিকড় নিহিত থাকবে ইসলামী বিশ্বদর্শনে। একে কিভাবে সুনির্দিষ্ট নীতিমালায় রূপান্তরিত করা যায়, সে সম্পর্কে ষষ্ঠ থেকে একাদশ অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে। ইসলামের বিশ্বদর্শন ও কর্মকৌশল মাকাসিদের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এ দর্শন কৌশল মুসলিম দেশগুলো যেসব সমস্যার সম্মুখীন, তার একটি ন্যায়ভিত্তিক ও কার্যকর সমাধানের নীলনকশা প্রদানে সক্ষম। তবে এজন্য ইসলামের শিক্ষাসমূহ অনুসরণ ও সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকা জরুরি। যেহেতু বহু মুসলিম দেশের অর্থনীতি এখনো উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, সেহেতু তাদের অর্থব্যবস্থা ও অর্থনীতির জন্য একটি নতুন নকশা ও দিকনির্দেশনা অনুসরণ করতে খুব একটা অসুবিধা হবে না। অবশ্য কাল পরিক্রমার সাথে সাথে তা করা উত্তরোত্তর কঠিন হয়ে পড়বে। বিশ্ববীক্ষণ ইসলাম একটি সাধারণ সহজবোধ্য ও যুক্তিগ্রাহ্য সার্বজনীন বিশ্বাসের নাম। এর ভিত্তি তিনটি মৌলিক নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত: তাওহীদ (একত্ববাদ), খিলাফত (প্রতিনিধিত্ব) ও আদল (ন্যায়বিচার)। এ নীতিমালা ইসলামী বিশ্বদর্শনের শুধু কাঠামোই তৈরি করে না, তা মাকাসিদ ও কর্মকৌশলের উৎস হিসেবেও কাজ করে। অতএব, এতে বহুত্ববাদী দল বা সামাজিক শ্রেণীসমূহের পরস্পর বিরোধী দাবির মুখে কোনোরকম জোড়াতালি বা পশ্চাৎ চিন্তার সুযোগ নেই। ইসলামী বিশ্বদর্শন, মাকাসিদ এবং কর্মকৌশলের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে এতে সংগতিপূর্ণ নীতি প্রণীত হয় এবং এদের পরস্পরের মধ্যে পরিপূর্ণ সমন্বয় বিরাজ করে। যারা এসব ধারণার সাথে পরিচিত নয়, তাদের জন্য এবং লক্ষ্য অর্জনে ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করার জন্য কিভাবে ইসলামী বিশ্বদর্শন, মাকাসিদ ও কর্মকৌশলকে একটি সংগতিপূর্ণ নীতিতে সমন্বিত করা যায়, সে উদ্দেশ্যে এ তিনটি মৌলিক নীতির অর্থ ও গুরত্ব সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা আবশ্যক। তাওহীদ তাওহীদ (আল্লাহর একত্ব ও একতা) ইসলামী বিশ্বাসের ভিত্তিপ্রস্তর। এ ধারণার উপরই গড়ে উঠেছে সামগ্রিক বিশ্বদর্শন ও কর্মকৌশল। অন্য সব কিছুই যৌক্তিকভাবে এর থেকে সৃষ্ট। এর অর্থ হচ্ছে, একটি সর্বশক্তিমান সত্তা, যিনি এক এবং অদ্বিতীয়, এ বিশ্বকে সচেতনভাবে পরিকল্পনা ও সৃষ্টি করেছেন এবং তা হঠাৎ করে বা দুর্ঘটনাবশত সৃষ্টি হয়নি (কোরআন-৩:১৯১, ৩৮:২৭ ও ২৩:১৫)। তিনি যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার পিছনে একটি উদ্দেশ্য রয়েছে। এ উদ্দেশ্যেই এ বিশ্বের অস্তিত্বের অর্থ ও গুরুত্ব বহন করে। মানুষ তারই একটি অংশ। বিশ্ব সৃষ্টির সর্বোচ্চ সত্তা অবসর গ্রহণ করেননি। বিশ্বব্যবস্থার প্রতিটি কার্যক্রম তিনি সক্রিয়ভাবে দেখাশুনা করছেন (কোরআন-১০:৩ এবং ৩২:৫) এবং এর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ঘটনা সম্পর্কে তিনি সচেতন ও সচেতন ও খোঁজ রাখেন (কোরআন-৩১:১৫ ও ৬৭:১৪)।' খিলাফত মানবসত্তা পৃথিবীতে তার খলিফা বা প্রতিনিধি (কোরআন-২:৩০, ৬:১৬৫, ৩৫:৩৯, ৩৮:২৮ ও ৫৭:৭০) এবং তার উপর অর্জিত দায়িত্ব যাতে কার্যকরভাবে পালন করতে পারে, সেজন্য তাকে সব ধরনের আধ্যাত্মিক, মানসিক ও বস্তুগত সম্পদে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করা হয়েছে। খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালনে ইচ্ছা করলে সে স্বাধীনভাবে চিন্তভাবনা করে ভুল বা সঠিক এবং ন্যায় বা অন্যায় সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যা মানুষের জীবনের অবস্থা, তার সমাজ বা ইতিহাসের গতিধারা পাল্টে দিতে পারে। প্রকৃতিগতভাবে সে ভালো হওয়ার সে সুখি ও পরিতৃপ্তবোধ করে, যতক্ষণ সে অনড় থাকে অথবা তার অন্তর্গত প্রকৃতির আরো সান্নিধ্যে পৌঁছায়; আর অসুখি ও দুর্দশাগ্রস্ত অনুভব করে, যখন সে এ থেকে বিচ্যুত হয়। আল্লাহতায়ালা এ বিশ্বকে যে সম্পদে সমৃদ্ধ করেছেন তা সীমাহীন। দক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে ব্যবহার করলে সকলের কল্যাণের প্রয়োজন মিটানোর জন্য তা যথেষ্ট। এসব সম্পদ কিভাবে ব্যবহৃত হবে একজন মানুষ তা নিজেই নির্ধারণ করতে পারে। তবে যেহেতু সেই একমাত্র খলিফা নয় এবং কোটি কোটি মানব সন্তান যারা তারই মতো খলিফা এবং তার ভাইও তার সমান, সেহেতু তার সত্যিকারের পরীক্ষা সকল মানুষের কল্যাণে (ফালাহ) আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদের দক্ষ ও সমতাভিত্তিক ব্যবহারের মধ্যেই নিহিত। এটা করা সম্ভব তখনই, যখন তা করা হয় দায়িত্ববোধ ও মাকাসিদ এবং আল্লাহ প্রদত্ত নির্দেশনা ও নিষেধাজ্ঞার আলোকে। তাওহীদ ও খিলাফতের ধারণা সহজাতভাবে অন্যসব ধারণা যেমন: 'জন্মগত ভাবে পাপী' বা 'ইতিহাসে দাবার ঘুঁটি', 'জন্মকালে অলিখিত ফলক' অথবা 'মুক্ত থাকার জন্যই জন্ম'-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। করুণাময় মহান আল্লাহ কেন 'জন্মগতভাবে পাপী'কে সৃষ্টি করবেন এবং নিজের কোনো দোষ না থাকলেও কেন তাকে চিরদিনের জন্য অভিশপ্ত করবেন? কান্ট যথার্থই উল্লেখ করেছেন, 'মানব ইতিহাসে নৈতিক দুর্বৃত্তি ও তার অবিরাম বিস্তার লাভ সম্পর্কে এটি সবচেয়ে বাজে ধারণা যে, তা উত্তরাধিকার সূত্রে আমাদের আদি পিতা-মাতার নিকট থেকে এসেছে'। মূল 'পাপের ধারণা' থেকে অর্থ দাঁড়ায় এটা যে, পাপ-পুণ্য প্রজনন প্রক্রিয়ায় হস্তান্তরযোগ্য এবং প্রত্যেক মানুষ অন্যের ব্যর্থতা এবং পাপের প্রভাবেই দুনিয়াতে আগমন করে। উপরন্তু, যে 'মূল পাপ' সে নিজে নিজে করেনি, সে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য কোনো 'ত্রাণকর্তা'র যদি আসতেই হয় তবে পৃথিবীতে প্রথম মানব সন্তানের আগমনের সাথে সাথে না এসে কেন সে এত দেরিতে আসবে? মানুষ যদি জন্মগতভাবে পাপী হয় তাহলে কিভাবে তার কৃতকর্মের জন্য তাকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে? 'মূল পাপ' এর ধারণাটি এভাবেই পবিত্র কোরআনে দ্ব্যার্থহীনভাবে প্রত্যেকের নিজ নিজ কর্মফলের উপর যে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, তার সঙ্গে প্রবলভাবে সাংঘর্ষিক (উদাহরণ-৬:১৬৪, ১৭:১৫, ৩৫:১৮; ৩৯:৭ ও ৫৩:৩৮)। লুইস যথার্থভাবেই উল্লেখ করেছেন, এ ধরনের ধারণা 'দায়িত্ববোধকে অস্বীকার করে বিরাট ক্ষতি করতে পারে'। 'মূল পাপ' এর ধারণাটি একজন মুলমান প্রায়শ যে মহান দয়ালু ও করুণাময় (আর-রাহমান ও আর-রহীম) আল্লাহর নাম জপ করে, তার গুণাবলীর সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। এটা মানুষের বুদ্ধির অগম্য যে, এমন একজন দয়ালূ প্রভু কেন তাদের প্রথম পিতামাতার পাপ সমগ্র মানবজাতির ঘাড়ে চাপিয়ে দেবেন। তিনি করুণাময় ও ক্ষমাশীল এবং যা কিছু ভালো গুণের কল্পনা করা যায় তার সবই তার মধ্যে আছে। সুতরাং, এ ধরনের কাজ করা তার জন্যে অসম্ভব (কোরআন-৭:১৮০)। আশ্চর্য হওয়ার কোনো কারণ নেই যে, প্রায় সকল আধুনিক দার্শনিকদের মতো উনবিংশ শতাব্দীর যুক্তিবাদী ও রোমান্টিক ব্যক্তিবর্গ মানব প্রকৃতির সহজাত দুর্বলতার মূলপাপের ধারণাটি পরিত্যাগ করেছিলেন। অনুরূপভাবে পারিপার্শ্বিক শক্তিকে প্রভাবিত করে নিজ ভাগ্য নির্ধারণে সক্ষম একটি স্বকীয় অমর আত্মার অস্তিত্বকে অস্বীকারকারী পশ্চিমা তত্ত্বসমূহের 'বন্ধকী' ও 'জন্মলগ্নে অলিখিত ফলক' ধারণাসমূহ মানবসত্তাকে তুচ্ছতায় পরিগণিত করেছে। এসব তত্ত্বের মর্মকথা হলো, মানুষের মন একটি চিহ্নহীন স্লেটের মতো, যার উপর বহিস্থঃ কার্যকরণগুলো পছন্দ মাফিক ছাপ রেখে যায়। এ মত অনুযায়ী মানবসত্তা অসহায় ও অসাড়; বেঁচে থাকার জন্য তাদের জীবনের কোনো লক্ষ্য নেই। তাদের জীবন ইতিহাস জড় শক্তি দ্বারা নির্ধারিত অথবা মনস্তাত্ত্বিক (ফ্রয়েড), প্রবৃত্তিজাত (লরেঞ্জ), এবং পরিবেশগত (প্যারলভ, ওয়াটসন, স্কিননার ও অন্যান্য) প্রভাব দ্বারা নিয়োজিত। স্কিননারের সুরে সুর মিলিয়ে এ দৃষ্টিভঙ্গি এ সাক্ষ্যই দেয় যে, 'একক স্বাধীনতা সাধন হতে পারে না। নিয়তিবাদ মানুষের মর্যাদাকে শুধু অবনমিতই করে না, তা বিরাজমান পরিস্থিতি এবং সম্পদের অন্যায্য ও অদক্ষ বিতরণের জন্য মানুষের দায়িত্বশীলতাকেও অস্বীকার করে। নিয়তিবাদ বলে, আত্মিক শক্তিসমূহ, সামাজিক কাঠামো এবং জীবনের বস্তুগত অবস্থানের পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত মানুষের অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে না। কিন্তু মানবসত্তা যদি অসাড় হয় এবং তাদের জীবন যদি নিয়ন্ত্রিত ও পূর্ব-নির্ধারিত হয়, তবে কে এ পরিবর্তন আনবে? তাছাড়া, জীবন যদি পূর্ব-নির্ধারিত হয়, তাহলে 'বিচ্ছিনতাবোধ'ও এর একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এবং বুর্জোয়া বা প্রোলেতারিয়েত কাউকেই এর জন্যে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। তাহলে শ্রমিক শ্রেণীর 'বিচ্ছিন্নতাবোধে'র জন্য বুর্জোয়া শ্রেণীকে দোষ দেয়া হবে অথবা শ্রমিক জাগরণের আহবান জানানো হবে? মানব অস্তিত্বের পূর্ব-নির্ধারিত প্রকৃতি সংজ্ঞায়িত করলে মানব প্রচেষ্টা দ্বারা তা অপরিবর্তনীয়। বুর্জোয়া শ্রেণী ও ব্যক্তিগত সম্পত্তি উৎখাত করে তার স্থলে রাষ্ট্রীয় একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার মার্কসীয় সুপারিশ পলিটব্যুরো কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া মানব জীবনে আর এক ধরনের নিয়তিবাদের প্রচলন ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়। নিয়িতবাদীদের বিপরীত প্রান্তে সার্ত্রের ভোগবাদের অবস্থান। সেখানে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব নেই এবং মানুষের স্বাধীনতা সীমাহীন; কেবল সে অবিরাম স্বাধীনতাকে অস্বীকার করতে পারে না। মানুষের মানসিক জীবনের প্রতিটি দিক ইচ্ছাকৃত, নির্বাচিত এবং নিয়ত দায়িত্বাবদ্ধ। নিঃসন্দেহে এ ধারণা নিয়তিবাদের চেয়ে ভালো। তবে সার্ত্রের মতে, এ স্বাধীনতার নিরঙ্কুশ সব কিছুই অনুমোদিত। মানব জীবনের সহজাত কোনো উদ্দেশ্য বা চুড়ান্ত লক্ষ্য নেই। মানবসত্তার জন্য কোনো অতিপ্রাকৃতিক বা বিষয়সম্মত মূল্যবোধ নেই, তা সে স্রষ্টার আইন বলি কিংবা স্বর্গীয় প্রেম বা অন্য বিছু বলি না কেন। মানবসত্তা এ পৃথিবীতে বিকৃত এবং পরিত্যক্ত, যেখানে তারা সম্পূর্ণভাবে নিজেরাই নিজেদের দেখাশোনা করবে। মূল্যবোধের একমাত্র ভিত্তি মানুষের স্বাধীনতা অনুরণের জন্য কেউ মূল্যবোধ বাছাই করে নেবে এর কোনো বাস্তব যুক্তি থাকতে পারে না। নিরঙ্কুশ স্বাধীনতার এ ধরনের ধারণা কেবল পুঁজিবাদী ধরনের লেইজে ফেয়ার ও মূল্যবোধ নিরপেক্ষতার সৃষ্টি করবে। সেখানে সম্মত মূল্যবোধের কোনো প্রশ্নের উদয় হবে না, অথবা ব্যক্তি ও সামাজিক স্বার্থের মধ্যে ঐকতান সৃষ্টির জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হবে না, অথবা সম্পদের দক্ষ সুষম বণ্টনের প্রশ্ন দেখা দেবে না, যার কোনো কিছুই বাজার দ্বারা আপনাআপনি ঘটানো সম্ভব নয়। এ ধারণাসমূহের সম্পূর্ণ বিপরীত খিলাফতের ধারণা বিশ্বে মানবসত্তাকে একটি সম্মানজনক ও মহিমান্বিত মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে (কোরআন-১৭:৭০) এবং মানব-মানবীর জীবনকে একটি অর্থ ও লক্ষ্য প্রদান করেছে। এ অর্থ একটি দৃঢ় বিশ্বাসের মাধ্যমে দেয়া হয়েছে যে, তাদেরকে বৃথা নয় বরং একটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে (কোরআন-৩:১৯২, ৩:১৯২, ২৩:১১৫)। তাদের জীবনের ব্রত হচ্ছে, স্বাধীন হওয়া সত্ত্বেও ঐশী পদ্ধতি অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা। ইসলামী মতে 'ইবাদত' বা উপাসনা বলতে এটিই বুঝানো হয়েছে (কোরআন- ৫১:৫৬) যার অলঙ্ঘনীয় অনুজ্ঞা হচ্ছে অন্যান্য মানুষের প্রতি কোনো মানুষের দায়িত্ব পালন (হাক্কুল ইবাদ), তাদের আশ্চর্যের কিছু নেই যে, কতিপয় মহান ধর্মের মতো ইসলামে অধিকারের চেয়ে দায়িত্বের উপর অধিকতর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এর পিছনে মৌলিক যুক্তি হলো, যদি প্রত্যেকে দায়িত্ব পালন করে, তবে প্রত্যেকের নিজ স্বার্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে অর্জিত হবে এবং সকলের অধিকার নিঃসন্দেহে সুরক্ষিত থাকবে। এ ব্রতের সাফল্যের জন্য প্রয়োজন ন্যায়বিচারক, দয়ালু ও করুণাময় সৃষ্টিকর্তা এবং তার নির্দেশনার প্রতি পরিপূর্ণ সমর্পণের মাধ্যমে আত্মিক উন্নতি। মানবসত্তা অবশ্যই তাকে ছাড়া আর কারো কাছে নত হবে না, আর কারো মূল্যবোধ মানবে না এবং আর কারো উদ্দেশ্য পূরণের জন্য বেঁচে থাকবে না। এ পৃথিবীতে তাদের সকল কর্মের জন্য তারা তার কাছে দায়ী থাকবে। অবশ্যই তারা শুধু নিজের কাজের জন্যই দায়ী থাকবে (কোরআন-৬:১৬৪, ১৭:১৫ ও ৩৫:১৮) এবং তাদের নিজেদের কারণে যতটুকু সুসংঘটিত হয়েছে, ততটুকু ছাড়া অন্যদের অতীত বা বর্তমান, বাকি কোনো কাজের জন্যই দোষী সাব্যস্ত হবে না, যেখানে এ পৃথিবীতে যেভাবে তারা দায়িত্ব পালন করেছে, তার উপর ভিত্তি করে তাদেরকে পুরস্কার বা শাস্তি প্রদান করা হবে। এভাবেই তাদের জীবন 'সৌর ব্যবস্থার বিশাল নক্ষত্রের মতো কালক্রমে নিভে যাবার মতো নয়', এবং বার্ট্রান্ড রাসেলের হতাশব্যঞ্জক অনুভব 'মানুষের অর্জনের সমস্ত মন্দিরটি এ বিশ্বে ধ্বংস স্তূপের নিচে তলিয়ে যাবে"। এও সত্যিকার বাস্তবতা নয়। খিলাফতের যে ধারণা তার বেশ কিছু সংশ্লেষ বা অনুসিদ্ধান্ত রয়েছে। এগুলো হচ্ছে; ১.বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব খিলাফতের অর্থ মানবজাতির মৌলিক ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব। প্রত্যেকেই খলিফা এবং কোনো দেশ, দল বা বিশেষ কোনো জাতির সদস্য বা কোনো বিশেষ সুবিধাভোগী ব্যক্তি নয়। এটি সাদাকালো, উঁচুনিচু সকল মানবসত্তার সামাজিক সাম্য ও মহত্ত্বকে ইসলামী বিশ্বাসের মৌলিক উপাদানে পরিগণিত করেছে। মানুষের মর্যাদা নির্ধারণের মানদণ্ড তার জাতি, পরিবার বা সম্পদ নয়; বরং তা হচ্ছে তার চরিত্র ও মানবতার প্রতি সেবা (যা তার বিশ্বাস ও অনুশীলনের প্রতিফলন)। রাসূলুল্লাহ (স) সুস্পষ্ট করে বলেছেন, 'সমস্ত মানবসত্তাই আল্লাহর ভৃত্য এবং আল্লাহর নিকট তারাই সবচেয়ে বেশি প্রিয়, যারা তার ভৃত্যদের মধ্যে সর্বোত্তম'। ভ্রাতৃত্বের এ ধারণাগত কাঠামোর আওতায় অন্যান্য মানবসত্তার প্রতি সঠিক মনোভাব 'জোর যার মুল্লুক তার', 'কেবল আত্মস্বার্থ রক্ষার্থে সংগ্রাম' অথবা 'যোগ্যতমরা সেরা' নয়, বরং তা হচ্ছে সকলের মৌলিক চাহিদা পূরণ, সমগ্র মানবিক সম্ভাবনাকে উন্নত করা এবং মানব জীবনকে সমৃদ্ধ করার জন্য পারস্পরিক কোরবানী ও সহযোগিতার মনোভাব। প্রতিযোগিতাকে ততক্ষণ পর্যন্ত উৎসাহিত করা যায় যতক্ষণ তা সুস্থ থাকে, দক্ষতা বৃদ্ধি করে এবং ইসলামের সার্বিক উদ্দেশ্য মানবকল্যাণে সহায়তা করে। যখনই তা সীমালঙ্ঘন করে, প্রতিহিংসা ও দাম্ভিকতার জন্ম দেয় এবং নৃশংসতা ও পারস্পরিক ধ্বংসের কারণ হয়, তখনই তা সংশোধন করতে হবে। ২. সম্পদ একটি আমানত মানুষের কাছে প্রাপ্ত সকল সম্পদই যেহেতু আল্লাহ প্রদত্ত, সেহেতু খলিফা হিসেবে মানুষ এর মূল মালিক নয়, সে শুধু আমানতদার (আমীন)। এ আমানতদারিত্ব (আমানা) যখন ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে অস্বীকৃতি’ বুঝায় না, তখন তাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংশ্লেষ থাকে। এ সংশ্লেষগুলো অন্যান্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও ইসলামে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানা সম্পর্কিত ধারণার মধ্যে এক বৈপ্লবিক পার্থ্যক্যের সৃষ্টি করে। প্রথমত, সম্পদ মুষ্টিমেয় কিছু লোকের জন্য নয়, সকলের উপকারের জন্য (কোরআন-২:২৯)। তা অবশ্যই সকলের কল্যাণে ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে কাজে লাগাতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রত্যেককে অবশ্যই বৈধভাবে সম্পদ অর্জন করতে হবে, যেমনভাবে কোরআন ও সুন্নাহতে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। এর অন্যথা হলে তা খিলাফতের দায়িত্বের লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হবে। তৃতীয়ত, সম্পদ বৈধভাবে অর্জিত হলেও তা আমানতের শর্তের বাইরে ব্যয় করা যাবে না। আর এ আমানতদারিত্ব হচ্ছে শুধু নিজের এবং নিজের পরিবারের কল্যাণ নয়, অন্যের কল্যাণও বটে। একজন আমানতদার হিসেবে মানুষের জন্য এটি শোভন নয় যে, সে স্বার্থপর, সম্পদ লোভী ও বিবেকবর্জিত হবে এবং শুধু নিজের কল্যাণেই কাজ করবে। চতুর্থত, কেউই আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ ধ্বংস বা অপচয় করার অধিকারী নয়। এ ধরনের কাজকে কোরআন ফাসাদ সৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করেছে (দুরাচার, দুর্বৃত্তি ও অসততা)। আল্লাহ ফাসাদকে ঘৃণা করেন (কোরআন-২:২০৫)। যখন প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা) ইয়াযিদ-বিন-আবু সুফিয়ানকে কোনো এক যু্দ্ধের দায়িত্ব দিয়ে পাঠালেন, তখন তিনি তাকে বাছবিচার না করে হত্যা করতে এবং এমনকি শত্রু দেশের শস্যক্ষেত বা জীবজন্তু ধ্বংস করতে নিষেধ করেছিলেন। যুদ্ধকালে শত্রু ভূখণ্ডেই যদি এ ধরনের কাজ অনুমোদিত না হয়, তা হলে শান্তিপূর্ণ সময়ে নিজের দেশে তা অনুমোদিত হওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। অতএব মূল্য বৃদ্ধি বা উচ্চমূল্য বজায় রাখার স্বার্থে জ্বালিয়ে দিয়ে বা সাগরে নিক্ষেপ করে উৎপাদিত পণ্য ধ্বংস করার বিন্দুমাত্র কোনো সুযোগ নেই। ৩. সাদাসিধে জীবন পদ্ধতি আল্লাহর খলিফার জন্য গ্রহণযোগ্য একমাত্র জীবন পদ্ধতি হবে বিনীত। এতে কোনো ঔদ্ধত্য, জাঁকজমক ও আড়ম্বর অথবা নৈতিক শৈথিল্য প্রতিফলিত হবে না। এ ধরনের জীবন ধারণ পদ্ধতি অপব্যয় ও অপচয়ের কারণ হয় এবং সম্পদের উপর অপ্রয়োজনীয় চাপ বাড়ে। ফলে সবার চাহিদা পূরণে সামাজিক সক্ষমতা হ্রাস পায়। এসবের ফলে অন্যায় পথে উপার্জনের রাস্তা তৈরি হয় এবং স্বাভাবিক বিতরণ ব্যবস্থার বাইরে আয়ের বৈষম্য সৃষ্টি হয়। অথচ দক্ষতা, উদ্যোগ, প্রচেষ্টা ও ঝুঁকির পার্থক্যের কারণে বিতরণে ইনসাফ বিধান নিশ্চিত করা দরকার। এসবের ফলে ন্যায়পরতার অনুভূতিতেও ধস নামে এবং মুসলিম সমাজের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ও দুর্বল হয়ে পড়ে। ৪. মানব স্বাধীনতা মানবসত্তা আল্লাহর খলিফা হওয়ায় তারা আল্লাহর ছাড়া আর কারো দাসত্ব করবে না। সুতরাং, সামাজিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক যাই হোক না কেন, সকল প্রকার দাসত্ব ইসলামে নিষিদ্ধ। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে যে, নবী মুহাম্মদ (স) এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্যই মানবজাতিকে বোঝা ও শৃঙ্খলামুক্ত করা- যা তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়ে থাকে (কোরআন-৭:১৫৭)। সে অনুসারে কারোর, এমনকি রাষ্ট্রেরও, কোনো অধিকার নেই এ স্বাধীনতা বাতিল করা এবং মানব জীবনকে কোনো প্রকার দাসত্ব বা শৃঙ্খলে বেধে ফেলা। এ শিক্ষই দ্বিতীয় খলিফা উমর (রা)-কে একথা জিজ্ঞেস করতে উৎসাহিত করে, ‘মাতৃগর্ভ থেকে প্রত্যেক মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করলেও কখন থেকে তোমরা তাদের দাস বানিয়েছো’? এর অর্থ এ নয় যে, মানুষ যা চাইবে তাই স্বাধীনভাবে করতে পারবে। তারা শরীয়াহর নিয়মে বাঁধা। শরীয়াহর লক্ষ্য হচ্ছে, প্রত্যেককে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে সকলের কল্যাণ নিশ্চিত করা। অতএব, তারা ততটুকুই স্বাধীন যতটুকু শরীয়াহর সামাজিক দায়িত্বশীলতা নির্ধারণ করেছে। কোনো ব্যবস্থায় মানবসত্তাকে যদি সীমারেখার বাইরে অতিরিক্ত স্বাধীনতা দেয়া হয়, তবে তা খিলাফতের ধারণায় যে মহত্ত্ব ও জবাবদিহিতা বিমূর্ত হয়েছে তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না এবং তা মানবসত্তার কল্যাণে কোনো অবদান রাখতে পারবে না। আদল (ন্যায়বিচার) তাওহীদ ও খিলাফতের ধারণার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ভ্রাতৃত্বের সঙ্গে আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার না থাকলে তা একটি অন্তঃসারশূন্য ফাঁপা ধারণায় পর্যবসিত হবে। ন্যায়বিচারকে ইসলামী আইনশাস্ত্রবিদগণ মাকাসিদ আল-শরীয়াহরও প্রশ্নাতীতভাবে অপরিহার্য উপাদান বলে মনে করেছেন। এ ব্যাপারে তারা এতই গুরুত্ব দিয়েছেন যে, ন্যায়বিচারহীন কোনো সমাজকে একটি আদর্শ মুসলিম সমাজ হিসেবে কল্পনা করাই অসম্ভব। মানব সমাজ থেকে জুলুমের সকল দিক নির্মূল করার উদ্দেশ্যের ব্যাপারে ইসলাম দ্ব্যর্থহীন। ইসলামের পরিভাষায় জুলুমকে সকল প্রকার অন্যায়, অবিচার, শোষণ, নির্যাতন ও অপকর্মের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এর সাহায্যেই একজন ব্যক্তি অন্য সকলকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে অথবা তাদের প্রতি তার দায়িত্ব পালন করে না। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও সকল প্রকার অবিচার নির্মূল করাকে কোরআনে আল্লাহর রাসূলগণের প্রধান লক্ষ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে (কোরআন-৫৭:২৫)। কম করে হলেও কোরআনে প্রায় শতাধিক স্থানে ন্যায়বিচারের দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণনা করা হয়েছে; কোথাও প্রত্যক্ষভাবে আদল, কিশত, মিজানের মতো শব্দ দ্বারা অথবা বিভিন্ন প্রকার পরোক্ষ বর্ণনা ও বর্ণনাভঙ্গির সাহায্যে। এছাড়া, জুলুম, ইজম, দালাল বা অন্যান্য শব্দের মতো শব্দসমষ্টি ব্যবহারের মাধ্যমে অবিচারের বিরুদ্ধে কোরআনে দুই শতাধিক স্থানে তিরস্কার করা হয়েছে। মূলত ইসলামী বিশ্বাসের গুরুত্ব অনুসারে কোরআনে ন্যায়বিচারকে আল্লাহ ভীতির পরেই স্থান দেয়া হয়েছে (কোরআন-৫:৮)। আল্লাহ ভীতিই স্বভাবত সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এর কারণে মানুষ ন্যায়বিচারসহ সকল ভালো কাজে প্রবৃত্ত হয়। রাসূলুল্লাহ (স) ন্যায়বিচারের উপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন। তিনি ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতিকে নিশ্ছিদ্র অন্ধকারাচ্ছন্নতার সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, ‘অবিচার থেকে সতর্ক হও, কারণ শেষ বিচারের দিনে তা গহীন অন্ধকারে নিয়ে যাবে’। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ইবনে তাইমিয়া এতদূর পর্যন্ত বলেছেন যে, ‘অবিশ্বাসী হলেও আল্লাহ ন্যায়বিচারকারী রাষ্ট্রকে রক্ষা করবেন এবং বিশ্বাসী হলেও অন্যায় আচরণকারী রাষ্ট্রকে রক্ষা করবেন না এবং বিশ্ব অবিশ্বাস ও ন্যায়বিচার নিয়ে টিকে থাকতে পারে, কিন্তু ইসলাম অবিচার নিয়ে টিকে থাকতে পারে না’। ইসলাম ও অবিচার পরস্পর বিরোধী এবং যে কোনো একটির দুর্বল বা নির্মূল হওয়া ছাড়া একসঙ্গে চলতে পারে না। ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়বিচারের প্রতি ইসলামের দৃঢ় অঙ্গীকারের দাবি হচ্ছে, মানবসত্তার নিকট গচ্ছিত আল্লাহর পবিত্র আমানত সকল সম্পদকে মাকাসিদ আল শরীয়াহর লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য ব্যবহার করতে হবে। শরীয়াহ সম্পর্কে আলোচনার কাঠামোর মধ্যে চারটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হচ্ছে: (১) চাহিদা, (২) আয়ের সম্মানজনক উৎস, (৩) সম্পদ ও আয়ের ন্যায়ভিত্তিক বণ্টন এবং (৪) প্রবৃদ্ধি ও স্থিতি। ১. চাহিদা পূরণ ভ্রাতৃত্বের মৌলিক সংশ্লেষ এবং সম্পদের আমানত প্রকৃতির বিষয়টি হচ্ছে, সম্পদ প্রত্যেকের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য ব্যবহার করতে হবে এবং প্রত্যেককে সম্মানজনক ও মানবিক মানের জীবন ধারনের নিশ্চয়তা দিতে হবে, আর তা হতে হবে স্রষ্টার খলিফা হওয়ার কারণে মানুষের সহজাত মর্যাদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। নবী করিম (স) বলেছেন: ‘সে লোক ঈমানদার নয়, যে পেট ভরে আহার করে অথচ তার প্রতিবেশী অভুক্ত থাকে’। যেহেতু সম্পদ তুলনামূলকভাবে সীমিত, তাই এ লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত মানবতা ও সাধারণ কল্যাণের সীমানার মধ্যে সম্পদের উপর দাবি করা না হয়। চাহিদা পূরণ অবশ্যই এমনভাবে হতে হবে, যাতে জীবনধারণ খুব সাধাসিধে প্রকৃতির হয় এবং তাতে আরামআয়েশ থাকলে তা যেন অপচয় ও দাম্ভিকতার পর্যায়ে যেতে না পারে। ইসলামে এ ধরনের অপচয় নিষিদ্ধ হলেও মুসলিম দেশগুলোতে এর জোয়ার বইছে। ইসলামের চাহিদা পূরণের প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব প্রদানকে এভাবে দেখা ঠিক হবে না যে, সাম্প্রতিককালে এ বিষয়ে পশ্চিমা সমাজে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতেই ইসলামে একে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এটা প্রমাণিত যে, সমগ্র মুসলিম ইতহাসে ফিকাহ ও ইসলামী সাহিত্যের উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আইনশাস্ত্রবিদগণ সর্বসম্মতভাবে এ মত পোষণ করেন যে, গরীবদের মৌলিক চাহিদা পূরণের দায়িত্ব গ্রহণ মুসলিম সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব (ফরজে কিফায়া)। মূলত শাতিবীর মতে, সমাজের নিম্নস্তরের মানুষের অস্তিত্ব সমাজের নিজের অস্তিত্বের জন্যই প্রয়োজন (raison d’etre)। মওলানা মওদূদী, ইমাম হাসান আল-বান্না, সাইয়্যেদ কুতুব, মুস্তফা-আল-সিবা’ই, আবু জাহরাহ, বাকির আল-সদার, মুহাম্মদ-আল-মুবারক এবং ইউসুফ আল-কারযাভী সহ সকল আধুনিক পণ্ডিতগণ এ ব্যাপারে একমত। ২. সম্মানজনক উপার্জনের উৎস খলিফার পদবীর সঙ্গে যে মর্যাদা সংযুক্ত করা হয় তার অর্থ হচ্ছে, চাহিদা পূরণ অবশ্যই প্রত্যেকের নিজের চেষ্টায় হতে হবে। সে অনুযায়ী আইনশাস্ত্রবিদগণ নিজের ও নিজের পরিবারের ভরণপোষণের জন্য উপার্জন করাকে প্রত্যেক মুসলমানের ব্যক্তিগত দায়িত্ব পালন ব্যতিরেকে কোনো মুসলমান এমনকি ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের জন্যও তার দৈহিক ও মানসিক পর্যাপ্ত সুস্থতা ও দক্ষতা রক্ষা করে চলতে পারে না। যেহেতু কোনো মুসলমান কর্মসংস্থান বা আত্ম-কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকলে সততার সঙ্গে উপার্জনের দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম নাও হতে পারে, সেহেতু এ সিদ্ধান্তে আসা যেতে পারে যে, যোগ্যতা ও উদ্যোগের সঙ্গে সংগতি রেখে প্রত্যেকের জন্য সৎ উপার্জনের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা মুসলিম সমাজের সামষ্টিক দায়িত্ব। তা সত্ত্বেও কিছু লোক অবশ্যই থাকবে, যারা কোনো শারীরিক অবমতার কারণে নিজস্ব উদ্যোগে আয় করতে সক্ষম হবে না। এ ধরনের লোক যাতে কোনোরকম উপহাস বা পাল্টা অভিযোগের শিকার না হয়ে নিজেদের চাহিদা পুরণ করতে পারে, সে জন্যে তাদেরকে সাহায্য করা মুসলিম উম্মহার সামষ্টিক দায়িত্ব (ফরজে কিফায়া)। একটি গভীর বন্ধন ও ভ্রাতৃত্ববোধে আবদ্ধ মুসলিম উম্মাহর এ যৌথ দায়িত্ব পালনের ভার প্রথমে পড়বে পরিবার, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী ও আওকাফ বা মানবহিতৈষী সংগঠনগুলোর উপর। এ সমস্ত লোক বা সংস্থা যখন তা করতে সক্ষম হবে না, কেবলমাত্র তখনই রাষ্ট্র সে দায়িত্ব গ্রহণ করবে। এসব কর্মসূচির চূড়ান্ত লক্ষ্য হবে, এভাবে সাহায্যপ্রাপ্ত লোকেরা যাতে বেশি আয়ের মাধ্যমে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে তাতে সাহায্যে করা। তবে যতক্ষণ বাস্তবে রূপ না নিচ্ছে, ততক্ষণ এ ধরনের সম্পূরক আয়ের সাহায্য অবশ্যই থাকতে হবে। ইসলামে এ উদ্দেশ্যে বাধ্যতামূলক যাকাত (উশরসহ) এবং সাদাকা ও আওকাফের আকারে স্বেচ্ছাভিত্তিক দানের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান প্রাপ্তির একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে। সরকারের এখাতে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ রাখা উচিত। ৩. আয় ও সম্পদের সমতাভিত্তিক বণ্টন চাহিদা পূরণ সত্ত্বেও আয় ও সম্পদের চরম বৈষম্য সৃষ্টি হতে পারে। একটি মুসলিম সমাজে তখন বৈষম্য মেনে নেয়া যায়, যখন তা প্রথমত কমবেশি দক্ষতা, উদ্দ্যোগ, প্রচেষ্টা ও ঝুঁকির অনুপাতে হয়ে থাকে। যেখানে ইসলামী শিক্ষাসমূহ আন্তরিকভাবে অনুসৃত হয়, সেই সমাজে এগুলো সাধারণভাবে বণ্টিত হতে বাধ্য। চরম বা খুব বড় ধরণের বৈষম্য ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ ইসলামী শিক্ষায় গুরুত্ব দেয়া হয় যে, সম্পদ কেবল সমগ্র মানবসত্তার জন্য আল্লাহর দানই নয় (কোরআন-২:২৯), তা একটি আমানতও বটে (কোরআন-৫৭:৭)। সুতরাং গুটিকতক লোকের হাতে সম্পদ কুক্ষিগত থাকার কোনো কারণ নেই। বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে কার্যকর কর্মসূচি না থাকলে ইসলামের কাঙ্ক্ষিত ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি তরান্বিত করার পরিবর্তে ধ্বংসই এনে দেবে। অতএব, ইসলাম মূলত সম্মানজনক উপার্জনের উৎসের মাধ্যমে প্রত্যেকের চাহিদাই পূরণ করতে চায় না, বরং উপার্জন ও সম্পদের ন্যায়ভিত্তিক বণ্টনের উপর গুরুত্ব প্রদান করে। কোরআনের ভাষায়, ‘সম্পদ যেন কেবল তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়’ (কোরআন-৫৯:৭)। ন্যায়ভিত্তিক বিতরণ বিষয়টিকে ইসলামে এত বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে যে, বেশ কিছু মুসলিম চিন্তাবিদ এরূপ ধারণা পোষণ করেন যে, মুসলিম সমাজে সম্পদের সমতা অপরিহার্য। নবী করিম (স) এর একজন সাহাবী হযরত আবু জর (রা) এ ধারণা পোষণ করতেন যে, কোনো মুসলমানের তার পরিবারের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদের মালিক হওয়া ঠিক নয়। তবে নবী করিম (স) এর অধিকাংশ সাহাবী তার এ চরম মতের সঙ্গে একমত হননি। অবশ্য আবু জর উপার্জনের সমতার কোনো প্রবক্তা নন। তিনি সম্পদের (সম্পদ পুঞ্জীভূতকরণ) সমতায় বিশ্বাস করতেন। তিনি বলেন, এটা অর্জন করা সম্ভব, যদি ধনী লোকেরা নিজেদের প্রকৃত ব্যয় মিটানোর পর সমস্ত উদ্বৃত্ত সম্পদ তাদের কম সৌভাগ্যশালী ভাইদের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য ব্যয় করে। মুসলিম পণ্ডিতগণের সাধারণ ধারণা হচ্ছে, সামাজিক আচরণ পদ্ধতি ও অর্থনীতি ইসলামের শিক্ষানুযায়ী পুনর্বিন্যস্ত করা হলে মুসলিম সমাজে সম্পদ ও আয়ের চরম অসমতা থাকতে পারে না। ৪. প্রবৃদ্ধি ও স্থিতি মুসলিম উম্মাহর পক্ষে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ দক্ষতার সাথে লভ্য সম্পদ ব্যবহার না করে চাহিদা পূরণ ও উচ্চ পর্যায়ের আত্মকর্মসংস্থান ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্য অর্জন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যুক্তিসংগত উচ্চহার অর্জন করা সম্ভব নয়। এমনকি সম্পদ ও উপার্জনের ন্যায়ভিত্তিক বণ্টনের লক্ষ্য বিত্তবান লোকদের পক্ষে আরো দ্রুত ও কম মূল্যে অর্জন করা সম্ভব, যদি উচ্চতর হারে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয় এবং গরীব লোকেরা আনুপাতিক হারে সেই প্রবৃদ্ধির বৃহদাংশের সুবিধা ভোগ করতে সক্ষম হয়। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে অধিকতর সাফল্য মন্দা, মুদ্রাস্ফীতি এবং মূল্য ও বিনিময় হারের অস্থিরতার কারণে সৃষ্ট দুঃখ-দুর্দশা ও বৈষম্য হ্রাস করে। অতএব একটি মুসলিম সমাজ যা নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্যারেটো অপটিমালিটির ধারণার উপর নির্ভরশীল নয় এবং শুধু নিজের প্রয়োজনেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপর গুরুত্ব দেয় না, সেখানে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা সর্বনিম্নে রাখার জন্য ‘খিলাফত’ ও ‘আদল’-এর দাবি পূরণ করা প্রয়োজন। কর্মকৌশল এটা সুস্পষ্ট যে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের বিপরীতে ইসলামের লক্ষ্য হচ্ছে পরিপূর্ণ এবং তার অন্তর্নিহিত দর্শনের যৌক্তিক রূপায়ণ। ইসলাম শ্রেণীসমূহ ও বহুত্ববাদী দলগুলোর মধ্যে প্রভাব ও টিকে থাকার সংগ্রামের ফলে উদ্ভুত বিচ্ছিন্ন উপাদানের মতো কোনো জগাখিচুরি জিনিস তৈরি করে না। এ বিষয়গুলো ইসলামী ব্যবস্থার সঙ্গে এতই অবিচ্ছেদ্য যে, মুসলিম সমাজের ইসলামীকরণ কোন পর্যায়ে উন্নীত, তার পরিমাপের মানদ্ণ্ড এগুলোর দ্বারা নির্ধারিত হয়। অবশ্য এতে বিশ্বদর্শনের সঙ্গে লক্ষ্যসমূহের সমন্বয় যথেষ্ট নয়। এমন একটি কর্মকৌশল থাকা আবশ্যক যা অন্তনির্হিত দর্শনের যৌক্তিক ফল এবং ঐকান্তিকতার সঙ্গে কাজে লাগলে তা মুসলিম সমাজকে তার লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম করতে পারে। ইসলামে এ ধরনের একটি কর্মকৌশল আছে। এ কর্মকৌশলের মধ্যে রয়েছে চারটি অপরিহার্য ও পারস্পরিক শক্তিসঞ্চারী উপাদান, যার সাহায্যে সমগ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করা যায়। ক. একটি সমাজসম্মত বিশোধন কর্মকৌশল; খ. সমাজ ও নিজের স্বার্থে প্রত্যেকের সর্বশক্তি নিয়োগের জন্য জোরলো উদ্বুদ্ধকরণ ব্যবস্থা; গ. সম্পদের স্বল্পতা সত্ত্বেও ‘মাকাসিদ’ অর্জনের লক্ষ্যে সমগ্র অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস এবং ঘ. সরকারের একটি ইতিবাচক ও দৃঢ় লক্ষ্যাভিমুখী ভূমিকা। এখন দেখা জরুরি যে, উল্লিখিত কর্মকৌশলের সুনির্দিষ্ট উপাদান ইসলামী বিশ্ববীক্ষণ ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কিভাবে লক্ষ্য অর্জনের পথে সম্পদ বরাদ্দ ও বণ্টনকে প্রভাবিত করতে সাহায্য করে। (ক) পরিশোধন পদ্ধতি সম্পদের উপর সীমাহীন চাহিদার তুলনায় সম্পদের আপেক্ষিক স্বল্পতার পরিপ্রেক্ষিতে একটি বিশোধন কৌশলের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সম্পদের উপর যত দাবি আছে, তা একটি বিশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যেতে হবে। এতে দ্বৈত লক্ষ্য অর্জিত হবে, লভ্য সম্পদ ও চাহিদাকে সমপর্যায়ে আনা যাবে এবং ঈপ্সিত আর্থ-সামাজিক লক্ষ্য অর্জিত হবে। পুঁজিবাদ ভোক্তাদেরকে তাদের নিজ নিজ অগ্রাধিকার অনুসারে সর্বোচ্চ পরিতৃপ্তির লক্ষ্যে যা চায় তাই ভোগ করার অনুমতি দেয়। এ মতবাদ ভোক্তাদের অগ্রাধিকার বিবেচনায় উৎপাদনের যে যে জিনিস ব্যবহার করে তা বাজার নির্ধারিত মূল্যে বিশোধন কৌশল হিসেবে কাজ করে। এ ধরনের মূল্য নির্ধারণ সর্বোচ্চ উপযোগিতা প্রয়াসী ভোক্তা কতটুকু ভোগ করবে এবং সর্বোচ্চ মুনাফা প্রত্যাশী উৎপাদক কী উৎপাদন করবে তা নির্ধারণ করে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে একটি সমতা আনয়ন করে। পটভূমিকার শর্তাবলী পূরণ না হওয়ার বিশোধন প্রক্রিয়া হিসেবে কেবলমাত্র মূল্য ব্যবস্থার ব্যবহার আর্থ-সামাজিক লক্ষ্য অর্জনকে ব্যর্থ করে দেয়। বাধাহীন ব্যক্তিকেন্দ্রিক অগ্রাধিকার এবং মূল্যবোধহীন প্রচারণা ও ঋণপ্রাপ্তির সহজ সুযোগ সীমাহীন চাহিদার জন্ম দেয়, অথচ একই সময়ে বড় আকারের তীর্যক উপার্জন বণ্টনের ফলে প্রয়োজন মিটানোর জন্য দুর্লভ সম্পদ স্থানান্তর করতে সক্ষম হয়। এর ফলে প্রয়োজন মিটানোর জন্য লভ্য সম্পদেরই কেবল হ্রাস ঘটে না, সঞ্চয় এবং আমদানি-রপ্তানির মধ্যেও দুরত্ব বৃদ্ধি হয় এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতার আরো অবনতি ঘটে। বিশোধন কৌশল হিসেবে মূল্য কৌশলের উপর নির্ভরশীলতা চাহিদা ও সরবরাহের একটি সমতা আনয়নে সহায়তা করে, তবে তা গরীবদের কষ্টের বিনিময়ে তাদের সীমিত উপকরণ দিয়ে উচ্চমূল্যে চাহিদা পূরণ করতে পারে না। এভাবে তাদের কল্যাণ বিঘ্নিত হয়। বাজারব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকৃত বিশোধন কৌশলের পরিবর্তে পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপিত হলে অবস্থা আরো খারাপ হবে। এতে ব্যবস্থাটি একনায়কত্বমূলক হবে, অথচ লক্ষ্য অর্জনে কোনো উন্নতি হবে না। আমলাতন্ত্রের হাতে সম্পদ বরাদ্দের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত করলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া দুর্বল, ধীর ও অদক্ষ হয়ে পড়বে। কারণ ভোক্তাদের অগ্রাধিকার ও উৎপাদকের উৎপাদন ব্যয় সম্পর্কে তাড়াতাড়ি তথ্য প্রাপ্তির কোনো কার্যকর পথ আমলাতন্ত্রের কাছে নেই। এমনকি আমলাতন্ত্রের কাছে সকলের কল্যাণ নিশ্চিত করতে উদ্বুদ্ধকরণ ব্যবস্থা বা সমাজসম্মত মূল্যবোধও নেই। সম্পদ বরাদ্দের ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্রের কাছে একমাত্র মানদণ্ড হলো তার নিজস্ব বিবেচনাবোধ, যা সমাজসম্মত মূল্যবোধ বা বাজার পরিস্থিতির সাহায্য ছাড়া সম্পদের আপেক্ষিক দুষ্প্রাপ্যতা বা চাহিদা পূরণের আপেক্ষিক গুরুত্ব বিবেচনায় এনে সম্পদ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে পারে না। উপরন্তু, ক্ষমতার অবস্থানগুলো এদের উপস্থিতির কারণে তাদের নিজস্ব স্বার্থ উদ্ধারে তারা বিশেষ সুবিধা ভোগ করে থাকে। এর ফলে সম্পদের যে বরাদ্দ ও বিতরণ হয়ে থাকে, তা না হয় দক্ষ না হয় ন্যায়ভিত্তিক। অতএব, সম্পদ বরাদ্দের ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণতা প্রয়োগ করার জন্য সর্বোত্তম কর্মকৌশল হচ্ছে, বাজারব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অপসারণ না করা। বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে গণতন্ত্রায়ন ঘটে; এ প্রক্রিয়ায় ভোক্তা ও উৎপাদক উভয়ই অংশগ্রহণ করতে পারে। এ ব্যবস্থায় পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে অধিকতর দক্ষতার প্রচলন ঘটে। বরং আরো ভালো হবে অন্য কোনো উপায়ে মূল্য কৌশলের পরিপূরণ করা, যাতে সম্পদের উপর অপ্রয়োজনীয় দাবি নির্ভুল না হলেও অন্তত নিম্নতম পর্যায়ে থাকবে, এসব দাবি সে ধরনের যা ভারসাম্যহীনতা ঘটায় এবং চাহিদা পূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ইসলাম নৈতিক বিশোধন প্রচলনের মাধ্যমে এ কাজ করে থাকে। বিশোধনের দ্বৈত স্তরের মাধ্যমে সম্পদের বরাদ্দ কাজ সম্পন্ন করতে হয়। প্রথম স্তরের বিশোধন খিলাফত ও আদলের সঙ্গে সংগতি রেখে ব্যক্তিগত অগ্রাধিকারের মাত্রা পরিবর্তনের মাধ্যমে উৎস মুখেই ব্যক্তিমানুষের অন্তর সচেতনতা থেকে উদ্ভূত সীমাহীন চাহিদা ও সমস্যার মোকাবিলা করে। ইসলাম প্রত্যেক মুসলিমকে সম্পদের উপর তাদের সম্ভাব্য দাবি ইসলামী মূল্যবোধের বিশোধন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া অপরিহার্য করেছে, যাতে বাজারে প্রবেশ করার আগেই তার অনেকগুলো বাদ পড়ে যায়। এভাবে সম্পদের উপর যে দাবি ইতবাচক প্রভাব ফেলে না বা মানবকল্যাণ অর্জন থেকে অন্য খাতে প্রবাহিত করে, সেসব দাবি বাজার মূল্যে দ্বিতীয় বিশোধন স্তরে প্রকাশ পাবার আগেই উৎসমুখেই বিলুপ্ত হয়। নৈতিক বিশোধন সম্পদের উপর দাবিকে মানবকল্যাণের একটি কাজে পরিণত করে এবং অন্য কোনো উদ্দেশ্যে সম্পদের ব্যবহার অনুমোদন করে না। উদাহরণস্বরূপ, এ বিশোধন নৈতিকভাবে নিষিদ্ধ সেসব তৎপরতায় সম্পদের ব্যবস্থার অনুমোদন করে না, যেসব তৎপরতায় মানুষ, পশু বা গাছপালা বর্তমান বা ভবিষ্যতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং তাদের কল্যাণ হ্রাস পেতে পারে। এ প্রক্রিয়া একটি সাধারণ জীবনাচার কামনা করে এবং অমিতব্যয়িতা বা অযৌক্তিক প্রতিযোগিতা বা জাঁকজমকের জন্য সম্পদের ব্যবহার অনুমোদন করে না। কারণ এ ধরণের ব্যবহার কল্যাণের ক্ষেত্রে প্রকৃত পার্থক্য সৃষ্টি করে। এ প্রক্রিয়া সম্পদের ধ্বংস বা অপব্যয়ও বরদাশত করে না (যেমন: মূল্যবৃদ্ধির লক্ষ্যে খাদ্যদ্রব্য পুডিয়ে ফেলা)। যদি ব্যাংকিং ব্যবস্থাকেও এমনভাবে পুনর্গঠন করা যায় যে, তা বিশোধন প্রক্রিয়ার পরিপূরক ভূমিকা পালন করতে পারে, তাহলে সম্পদের উপর দাবিকে যথার্থ সীমার মধ্যে রাখা যাবে। সম্পদ, দক্ষতা ও আর্থিক মধ্যস্থতা সম্পদ বরাদ্দ ও বিতরণের ক্ষেত্রে যে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, এ নৈতিক প্রক্রিয়াটি সত্যকে এভাবে নমনীয় ও মানবতাসম্পন্ন করে। ব্যারিংটন মূর যথার্থই উল্লেখ করেছেন, কোনো মানবসমাজই সব ধরনের মানবিক আচরণ অনুমোদন করতে পারে না, যদি তা করত তবে শিগগিরই সমাজ হিসেবে তা অবলুপ্ত হতো’। যাইহোক, প্রত্যেকটি সমাজের অন্যতম মৌলিক প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের একটি নৈতিক বিশোধন কে দিতে পারবে? একটি নৈতিক পদ্ধতি কি অবশ্যই । ঐশ্বরিক সূত্র ভিত্তিক হবে এবং এর পিছনে কি অবশ্যই স্রষ্টার নিকট জবাবদিহিতার বিশ্বাস কাজ করবে? অন্যান্য কয়েকটি ধর্মের মতো ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, ঐশ্বরিক মঞ্জুরি এবং পরকালে বিশ্বাস উভয়ই জরুরি। প্রথমত, ঐশ্বরিক বিধিনিষেধের কারণে আচরণবিধি নিরঙ্কুশ ও বিতর্কের উর্ধ্বে থাকবে। স্রষ্টার বিধিনিষেধ ছাড়া প্রণীত আচরণ ব্যক্তিগত বিচারে মতভেদের বিষয় হয়ে পড়ে। যেমনটি ঘটেছে পশ্চিমা সমাজে সেকুলার মতবাদ গ্রহণের পর। পরে তাদের মূল্যবোধটিই সম্পূর্ণভাবে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। বিভিন্ন সভ্যতা ব্যাপক ও গভীরভাবে পর্যালোচনার পর ডুরান্ট ইতিহাস থেকে এ সিদ্ধান্ত পৌঁছেছেন যে, আমাদের সামনে ইতিহাসের এমন কোনো সমাজের উদাহরণ নেই, যেখানে ধর্মীয় অনুভূতি ব্যতিরেকে সাফল্যজনকভাবে কোনো নৈতিক জীবন পালন করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, মানব সমাজে এমন কে আছে, যে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং সকলের কল্যাণে পরিপূর্ণভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে পারে? যদি মানবসত্তার নিজেদেরকেই এসব নিয়ম তৈরি করতে হতো, তাহলে তা প্রণয়ন করতে তাদের মাঝে এ ধরনের প্রবণতাই কাজ করত, যাতে তা প্রতিপত্তিশালী ও বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থের অনুকূলে যায় এবং যা সকলের কল্যাণ করতে অপারগ। এমনকি নিরপেক্ষতার ব্যাপারে সামান্যতম সন্দেহই সর্বসম্মতির সুযোগ নস্যাৎ করে দেয়। তৃতীয়ত, অন্যদের উপর তাদের কাজের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে সে সম্পর্কে মূল্যায়ন করার জ্ঞান মানুষের নেই, বিশেষ করে অনেক দূর থেকে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতএব, তাদের আচরণবিধি প্রণয়নের জন্য এমন জ্ঞানী ও বিবেকবান সত্তার প্রয়োজন, যা এ ধরনের প্রতিফল সম্পর্কে কল্পনা করতে পারে, যাতে তাদের কোনো কার্যক্রমের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে অন্যেরা রক্ষা পায়। চতুর্থত, সেই পরম সত্তা যিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন, এককভাবে মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন, শক্তি, দুর্বলতা সম্পর্কে বুঝতে সক্ষম এবং তাদের একমাত্র নিয়ন্ত্রক ও সকল মূল্যবোধের উৎস হিসেবে দায়িত্ব পালন করার ক্ষমতা রাখেন। তার সীমাহীন দয়াময়তায় তিনি মানুষকে অন্ধকারের মধ্যে পথহীন ছেড়ে দেননি; স্বয়ং আদম (আ) থেকে শুরু করে নবীদের এক নিরবচ্ছিন্ন দলের মাধ্যমে তিনি তাদেরকে প্রয়োজনীয় পথনির্দেশ দিয়েছেন যে পথনির্দেশ সকলের কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে। এ যৌক্তিক কাঠামোর মধ্যে মূল্যবোধ নিরপেক্ষতা অকল্পনীয়। মূল্যবোধ কাঠামোর নিরপেক্ষতা কেবলমাত্র সেই ব্যবস্থার সঙ্গেই সংগতিপূর্ণ যা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য এবং আত্মস্বার্থ বা আত্মকেন্দ্রিক যুক্তিবাদিতাকে মহিমান্বিত করে। নিঃসন্দেহে এটি ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ইসলামে প্রধানত সামাজিক দায়িত্ব ও সকলের কল্যাণের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। মূল্যবোধ সকল খলিফার দায়িত্ব নির্ধারণ করে দেয়। তাদের সকলকে ‘মাকাসিদ’ বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য এ মূল্যবোধের সঙ্গে সংগতি রেখে কাজ করতে হয়। সামষ্টিক মূল্যবোধ বিবেচনা অপরিহার্য এবং এ মূল্যবোধ বিচার থেকে বিরত থাকার যে কোনো প্রচেষ্টা বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে এবং সকলের কল্যাণ অর্জন ব্যর্থ করে দিতে বাধ্য। সমাজসম্মত মূল্যবোধের বিশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পদের উপর দাবি বিবেচিত হবার পর এভাবে অপ্রয়োজনীয় দাবি পরিত্যাগ করে সর্বনিম্ন পর্যায়ে আনতে হলে বাজার মূল্যের এ বিশোধন কৌশল দক্ষ ও ন্যায়ভিত্তিক সম্পদ বরাদ্দ ব্যবস্থা প্রচলনে আরো বেশি কার্যকর হবে। (খ) সঠিক প্রণোদনা দক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতা কেবলমাত্র একটি যথার্থ বিশোধন কৌশলের মাধ্যমে অর্জন করা যায় না। প্রত্যেক মানুষকে সেভাবে কাজ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করাও প্রয়োজন। পুঁজিবাদের ধারণা হলোঃ আত্মস্বার্থ একজন মানুষকে তার দক্ষতাকে সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করবে এবং সাথে সাথে প্রতিযোগিতা আত্মস্বার্থ উদ্ধারের পথে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করবে এবং সামাজিক স্বার্থ রক্ষায় সাহায্য করবে। এ্যাডাম স্মিথ তাই মনে করেন, বাজারব্যবস্থা আত্মস্বার্থ ও সামাজিক স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে সক্ষম হবে। সমাজতন্ত্র ব্যক্তি মানুষকে বিশ্বাস করেনি এবং এ ধারণা পোষণ করেছে যে, তার স্বীয়স্বার্থ উদ্ধারের প্রেচেষ্টা অবশ্যই সামাজিক স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। অতএব, সামাজিক স্বার্থ রক্ষাকল্পে সম্পদ বরাদ্দ ও বিতরণের উপর এতে ব্যক্তিগত সম্পত্তি রহিত এবং কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তি মানুষ কর্তৃক স্বীয়স্বার্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টা অনিবার্যভাবেই খারাপ নয়। মানব উন্নয়নের জন্য অবশ্যই এটি প্রয়োজন এবং অনুমোদিত না হলে কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই দক্ষতা অর্জনে সফল হবে না। আত্মস্বার্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টা কেবলমাত্র তখনই ধ্বংসাত্মক হতে পারে, যখন তা কতিপয় সীমারেখা অতিক্রম করে এবং ব্যক্তি মানুষ তেমন একটি সমাজ সৃষ্টিতে আগ্রহী হয় না, যে সমাজের মূল্য ভ্রাতৃত্ব ও আর্থ সামাজিক ন্যায়বিচার। যাইহোক, বিবেকবান মানুষ কোনো সমাজে তার কাজের যথার্থ প্রতিদান পেতে সক্ষম হলে সাধারণত তার নিজের স্বার্থের জন্য তার সাধ্যমতো কাজ করতে আগ্রহী হয়। তখন প্রশ্ন ওঠে, সমাজের স্বার্থে কাজ করতে কী জিনিস তাকে উদ্বুদ্ধ করে? একজন ভোক্তা কেন সম্পদের উপর তার দাবি ‘মানবতার সীমারেখার মধ্যে’ সীমাবদ্ধ রাখবে এবং অন্যের জন্য ত্যাগ স্বীকার করবে এবং কেন একজন ব্যবসায়ী প্রতিযোগিতাকে শ্বাসরুদ্ধ করে মারবে না এবং প্রশ্নসাপেক্ষ পথে নিজে ধনী হবে না? এখানেই প্রভুর সম্মুখে জবাবদিহিতা এবং পরকালের বিশ্বাস অপরিহার্য হয়ে দেখা দেয়। আত্মস্বার্থ অর্জনের লক্ষ্য যখন ইহকালের চিন্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন তা লোভ, বিবেকহীনতা এবং অন্যের স্বার্থের প্রতি অবজ্ঞা সৃষ্টি করতে বাধ্য। দি ইকনমিষ্ট এর ভাষায় ‘যখনই তারা কোনো সুযোগ পায় বিবেকহীন অর্থনৈতিক শক্তিগুলো অন্য সবার ক্ষতির বিনিময়ে নিজেরা সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করে। সুতরাং বিভিন্ন প্রকারের বাড়তির কারণে যে শক্তি সাধারণত বাজারকে কার্যকর রাখে, তাই বাজার সমাধানকে ব্যর্থ করে দেয়’। সেকুলার তথা ইহলৌকিক সমাজে সচেতনভাবে সামাজিক দায়িত্ব পালনে আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক ব্যক্তি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে না, যেখানে তা তাদের ইহলৌকিক কোনো সুবিধা বয়ে আনে না। পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক নির্বিশেষে এ ধরনের সমাজে প্যারেটার সর্বাধিক অনুকূল অবস্থার ধারণাটি একমাত্র যৌক্তিক আচরণ পদ্ধতি। অন্যান্য সেকুলার পন্থীদের মতো ইহলৌকিক কাঠামোর মধ্যে প্যারেটোর চিন্তাচেতনা ভুল ছিল না। কোনো ব্যক্তিকে সমাজের স্বার্থে কাজ করানোর জন্য উদ্বুদ্ধকরণের কোনো কার্যকর কৌশল পুঁজিবাদের নেই, যদি সেই স্বার্থ আত্মস্বার্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্জিত না হয়। এ দুই স্বার্থ যখন এক নয় ও পটভূমিকার শর্তাবলীও পূরণ করে না, তখন একমাত্র মূল্যব্যবস্থার উপর নির্ভরতার ফলে ধনীরা তাদের গৌণ চাহিদা পূরণের জন্য দুষ্প্রাপ্য সম্পদ অন্যত্র সরিয়ে নিতে পারে; ফলে গরীবরা প্রয়োজন মেটানোর জন্য বঞ্চিত হয়। পুঁজিবাদ এভাবে অসাম্যে পরিণত হয়। সমাজতন্ত্র এর চেয়েও খারাপ। কারণ ব্যক্তি মানুষকে তার নিজের স্বার্থ উদ্ধার থেকে নিবৃত্ত করতে যেয়ে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে কোনো ব্যক্তিকে উদ্বুদ্ধকরণের কর্মকৌশল এ মতবাদে নেই। এছাড়া এর ইহলৌকিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সমাজের স্বার্থে কাজ করার জন্য উদ্বুদ্ধকরণও এই মতবাদে কোনো ব্যক্তির জন্য নেই। এভাবে সমাজতন্ত্র দক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতা অর্জনে ব্যর্থ হয়। যাইহোক, যদি সর্বশক্তিমান সত্তা, যার নিকটি থেকে কোনো কিছু লুকানো সম্ভব নয় (কোরআন-৫:৩), তাঁর সামনে জবাবদিহিতা এবং মৃত্যুর পরে জীবনের ধারণা প্রচলিত হয়, তবে উচ্চস্তরের যুক্তিবাদিতা সৃষ্টি হয়। এসব বিশ্বাস সমাজমুখী কার্যক্রম গ্রহণে উদ্বুদ্ধকরণ শক্তি হিসেবে কাজ করে এবং তখন আত্মস্বার্থ এক সীমাহীন দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যে পরিণত হয়। এসবের অর্থ হচ্ছে, কোনো ব্যক্তির নিজ স্বার্থ শুধু ইহলৌকিক অবস্থার উন্নতিতেই নিহিত নয়, তার জন্য পরলৌকিক অবস্থার উন্নতিও দরকার। অতএব সে যদি বিবেকসম্পন্ন হয় এবং নিজের জন্য যা সর্বোত্তম তাই চায়, তাহলে সে শুধু নিজের স্বল্পমেয়াদী দুনিয়ার কল্যাণের লক্ষ্যেইকাজ করবে না, দেদার ব্যয় করার আর্থিক সংগতি সত্ত্বেও অপ্রয়োজনীয় ও অপচয়মূলক উপভোগ হ্রাসের মাধ্যমে অন্যের কল্যাণে কাজ করে নিজের দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণও নিশ্চিত করবে। এভাবে সাশ্রয়কৃত সম্পদ বর্ধিত উৎপাদন ও চাহিদা পূরণকারী মালামাল সরবরাহে ব্যবহৃত হতে পারে এবং এভাবে গরীবের স্বার্থ রক্ষিত হতে পারে। অনুরূপভাবে, পরকালের জীবনের তুলনায় ইহলোকের জীবন খুবই নগণ্য-এ বিশ্বাস কোনো ব্যবসায়ীকে প্রশ্নসাপেক্ষ উপায়ে ধনী হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে এবং এভাবে অন্যদেরকে তাদের সুযোগ সংকুচিত না করে এবং স্বাধীন জীবিকা থেকে বঞ্চিত না করে সাহয্য করতে পারে। কী, কেমন করে এবং কার জন্য উৎপাদন করতে হবে সেসব প্রশ্নের উত্তরে কোনো ব্যক্তিকে উদ্বুদ্ধকরণে একটি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত কৌশল হিসেবে কাজ করতে এসব বিশ্বাস শক্তি রাখে এবং এভাবে তা সাধারণের কল্যাণের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বিতরণ ও বরাদ্দ নিশ্চিত করে। ইসলাম মানুষের কাজের একটি দীর্ঘমেয়াদী জীবনদর্শন প্রদান করে, সে সঙ্গে মানুষ এ দুনিয়াতে তার আত্মস্বার্থ অস্বীকার করুক তাও চায় না। এটা বাস্তবসম্মত হতো না। যে মূল্যবোধ এরূপ ব্যবস্থা করে তা ক্রিয়াশীল হয় না। মূলত ইসলাম চায়, কোনো ব্যক্তি তার সকল অপরিহার্য প্রয়োজন শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য পূরণ করুক এবং তার নিজের ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনে দক্ষ হোক এবং তা করতে যেয়ে তার সামগ্রিক কর্মক্ষমতাকে উন্নত করুক। আল্লাহ যেসব ভালো জিনিস দান করেছেন তা পরিহার করার কোনো যুক্তি নেই (কোরআন-৭:৩২)। তবে, যেহেতু সম্পদ সীমিত, সেহেতু আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে অন্যান্য সবার কল্যাণ অগ্রাহ্য করে কেবলমাত্র অর্থনৈতিক মানুষ হবার মতো চরম পর্যায়ে যাওয়া তাকে মানায় না। এলেক নোভ যথার্থই মন্তব্য করেছেন: ‘যেসব সমাজ কেবল লাভ নিয়েই ব্যস্ত, সেগুলো খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাবে। আক্ষরিক ও আলংকারিক অর্থে দুর্নীতি বৃদ্ধি পাবে, যেখানে সাফল্যের প্রধান মানদণ্ড টাকা বানানোই মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। অনুরূপভাবে, জোসেফ স্কামপিটার মন্তব্য করেছেন যে, ‘কোনো সমাজব্যবস্থাই কাজ করতে পারে না, যেখানে প্রত্যেকেই নিজের একক স্বল্পমেয়াদী স্বার্থ ছাড়া অন্য কোনো কিছু দ্বারা পরিচালিত হয় না’। একটি নিক্তি (কোরআনের মিজান পরিভাষায় ৫:৭-৯) একান্তই প্রয়োজন, যা সামাজিক কল্যাণ ও মানুষের কর্মক্ষমতার অব্যাহত উন্নয়ন নিশ্চিত করবে। ইসলাম এ ধরনের ভারসাম্য সৃষ্টির জন্য যা করেছে, তাতে আত্মস্বার্থকে আধ্যাত্মিক এবং দীর্ঘমেয়াদী মাত্রা দিতে হবে। প্রত্যেক ব্যক্তি অবশ্যই দুনিয়ায় তার অতি ক্ষুদ্র স্বার্থের প্রতি নজন দেবে, সেই সঙ্গে চিরস্থায়ী জীবন পরকালের স্বার্থের প্রতিও লক্ষ্য রাখবে। এ দুনিয়ার স্বার্থ উদ্ধারের জন্য কিছুটা স্বার্থপর হয়ত হতে হয়। অবশ্য হতেই হবে এমন নয়। কেননা পরকালের স্বার্থ অন্যদের প্রতি দায়িত্ব পালন ব্যতিরেকে অর্জিত হতে পারে না। এজন্য যে সম্পূর্ণ আত্মস্বীকৃতির পথ বেছে নিতে হবে তাও নয়। অতএব, একজন সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞ সত্তার সামনে জবাবদিহিতায় বিশ্বাস এভাবে আত্মস্বার্থ নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক কল্যাণমুখী আচরণ করতে উদ্বুদ্ধকরণে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে। রাষ্ট্রীয়ভাবে জোরজবরদস্তি করে এ কাজ করানো সম্ভব নয়। কারণ রাষ্ট্র কর্তৃক ধৃত হওয়ার সম্ভাবনা নিশ্ছিদ্র নয় এবং ঘুষ দিয়ে বা রাজনৈতিক ও আর্থিক ক্ষমতা ব্যবহার করে অফিসিয়াল শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। এভাবে মার্কসীয় তত্ত্বে যা অস্বীকার করা হয়েছে ইসলাম তাকে স্বীকৃতি দেয়। ইসলাম লাভ ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির মাধ্যমে ব্যক্তির উদ্যোগ, প্রচেষ্টা, দক্ষতা ও কর্ম অভিযানে ব্যক্তির আত্নস্বার্থের অবদানকে স্বীকার করে। অবশ্য ইসলাম লোভ, বিবেকহীনতা ও অন্যদের অধিকার ও প্রয়োজন অবজ্ঞা করার ক্ষতিরকর দিক মোকাবিলা করে, যা পুঁজিবাদী, সমাজতন্ত্রী, সেকুলার স্বল্পমেয়াদী পার্থিব চিন্তাধারার অনিবার্যভাবেই প্রসার ঘটায়। ইসলাম এভাবে ব্যক্তির নিজের গহীন চেতনায় অভ্যন্তরীণ ও স্বনিয়ন্ত্রিত কর্মকৌশল প্রবিষ্ট করার মাধ্যমে এবং সেই সাতে আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার, মানব ভ্রাতৃত্ব এবং স্রষ্টার সামনে জবাবদিহিতার বিকাশের উপর নিরস্তর গুরুত্ব আরোপ করে। বিশ্বাসের এ কাঠামো সামাজিক স্বার্থ উদ্ধারের পথ বন্ধ করতে দৃঢ় উদ্বুদ্ধকারী শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। প্রতিযোগিতা ও বাজার শক্তি বরাদ্দকারী প্রক্রিয়ার দক্ষতা অর্জনে অবদান রাখার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে অপরিহার্য। কিন্তু সামাজিক লক্ষ্য অর্জন যদি নিশ্চিত করতে হয় তবে এগুলোকে অবশ্যই নৈতিক মূল্যবোধের বিশোধক কর্মকৌশলের সীমাবদ্ধতার মধ্যেই কাজ করতে হবে। কেবলমাত্র এ সীমাবদ্ধতার মধ্যেই প্রতিযোগতিা ‘সুস্থ’ এবং বাজার শক্তি ‘মানবিক’ হতে পারে। দুর্লভ সম্পদের ন্যায়ভিত্তিক ব্যবহারের জন্য মানবসত্তার মাঝে শক্তিশালী উদ্বুদ্ধকারী প্রণোদনা সৃষ্টিতে আল্লাহর সামনে জবাবদিহিতায় বিশ্বাসের যে ক্ষমতা রয়েছে, প্রতিযোগিতা বা বাজার শক্তি অথবা কেন্দ্রীভূত পরিকল্পনা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার তা নেই। পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র উভয় ব্যসস্থায় নীতি নির্ধারণে এবং নিজেদের স্বার্থপর সুবিধায় সম্পদ কাজে লাগানো, প্রভাব বিস্তারে শক্তিশালী সুবিধাবাদী শ্রেণীকে বাধাদান অথবা সমাজকল্যাণের চাহিদা অনুযায়ী ব্যয় করায় উৎসাহ প্রদানের কোনো অন্তঃকৌশল নেই। অথচ অন্য কোনো কার্যকর ধর্মীয় ব্যবস্থার মতো ইসলামী ব্যবস্থায় তাদেরকে শক্তিশালীভাবে উদ্বুদ্ধ করা হবে। যদি তারা উদ্বুদ্ধ না হয়, তাহলে তারা দীর্ঘমেয়াদী আত্মস্বার্থের বিরুদ্ধেই কাজ করবে। (গ) আর্থ-সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন বিশোধন কৌশল এবং উদ্বুদ্ধকরণ ব্যবস্থা দু’টোই ভোতা হয়ে যেতে পারে, যদি লক্ষ্য অর্জনের জন্য অনুকূল আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশের পরিপূরক না থাকে। সামাজিক পরিবেশ বিশ্বস্ততার বিধি পালনের অনুকূল হওয়া উচিত, যাতে বস্তুগত সম্পদ অর্জন ও দৃষ্টি আকর্ষণ ভোগ সম্মানের উৎস হিসেবে বিবেচিত হতে না পারে। অর্থনৈতিক ও আর্থিক পরিবেশ এমন হওয়া বাঞ্ছনীয়, যাতে শুধু অর্থনৈতিক বিবেচনামুখী মানুষ জন্মগ্রহণ না করে এবং জন্মগ্রহণ করলেও যেন বেঁচে না থাকে। যদি সমাজের মূল্যবোধব্যবস্থা অর্থনীতিমুখী মানুষের মর্যাদাকে আহত করে এবং যদি অর্থনৈতিক ও আর্থিক ব্যবস্থা পুনর্গঠন করে, তা এমনভাবে আরো শক্তিশালী করা হয় যে, অর্থনীতির বরাদ্দ ও বিতরণকারী শক্তিসমূহ দুর্লভ সম্পদ সেসব উদ্দেশ্য ব্যবহার সমর্থন না করে লক্ষ্য অর্জনকে ব্যর্থ করে দেয়, তবে ব্যক্তি মানুষের ভোগ, আয় ও বিনিয়োগ আচরণে উন্নততর গুণ ও অর্থ সূচিত হতে পারে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনকে ব্যক্তি, সমাজ ও রাজনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে এমনভাবে জোরদার করা যায় যে, সমাজের অবৈধ শক্তির কেন্দ্রগুলো আরো দুর্বল হয়ে পড়ে, যাতে কেউ তার সামাজিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক প্রতিপত্তি খাটিয়ে অবৈধ সুযোগ গ্রহণ করতে না পারে। এ ধরনের পুনর্গঠনের অভাবে সম্পদ ব্যবহারে অদক্ষতা ও বৈষম্যই শুধু চিরস্থায়ী হবে না, তা দীর্ঘমেয়াদী ভারসাম্যহীনতার আরো অবনতি ঘটাবে। এ ধরনের পুনর্গঠন এলোপাতাড়ি অস্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে করা যাবে না। তা হতে হবে অবশ্যই সুশৃঙ্খল ও সুসংবদ্ধ এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে অনুসরণের মাধ্যমে একটি সুচিন্তিত, লক্ষ্যাশ্রয়ী ও দীর্ঘমেয়াদী সংস্কার কর্মসূচি। পুনর্গঠন কর্মসূচিতে যা বিবেচনায় আনতে হবে তা হলো: ক. ব্যক্তি-মানুষকে তার দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ ও সহায়তার মাধ্যমে মানব উপাদানকে জোরদার করার লক্ষ্যে দক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতা অর্জনে সহায়ত। খ. সম্পদ ও অপ্রয়োজনীয় ভোগ নিম্নতম পর্যায়ে নিয়ে আসায় সহায়তা করা এবং চাহিদা পূরণ, রপ্তানি এবং বর্ধিত কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে ইসলামী শিক্ষার আলোকে সকল সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং সেই সঙ্গে সরকারি রাজস্ব ও আর্থিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের সংস্কার করা। অন্য কথায় যা প্রয়োজন তা হলো, মানবসত্তার সংস্কার এবং ভোগের ধরণ বিনিয়োগ, উৎপাদনের উপাদানসমূহের সার্বিক পুনর্গঠন। সম্পদের স্বল্পতা বা ভারসাম্যতা যত বড় হবে এবং মাকাসিদ ও বাস্তবতার মাঝে দূরত্ব যত বেশি হবে, পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তাও তত ব্যাপক হবে। পুনর্গঠনের কয়েকটি মৌলিক উপাদান একজন মুসলিমের বিশ্বাসের একটি অখণ্ড রূপ। যেহেতু পরকালে তার ভাগ্য ঐ সব বিশ্বাসের বিশ্বস্ত অনুসরণের উপর নির্ভরশীল, তা করতে তার প্রণোদনা হবে খুব জোরালো। অতএব ইসলামী পরিবেশে পুনর্গঠন সেকুলার পরিবেশের চেয়ে আরো বেশি সফল হওয়া স্বাভাবিক। একবার এ ধরনের পুনর্গঠন কার্যকরভাবে করা গেলে এর থেকে লব্দ ব্যবস্থা পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র অথবা কল্যাণ রাষ্ট্রের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা হবে। যাইহোক, এ বইয়ে আর্থ-সামজিক পুনর্গঠনের সাথে সংশ্লিষ্ট ইসলামের সকল মূল্যবোধ, প্রতিষ্ঠানসমূহের পর্যালোচনা সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। এজন্যে কোরআন, সুন্নাহ ও ফিকাহ গ্রন্থাদি রয়েছে। তথাপি চারটি প্রধান পুনর্গঠন উপাদান ইসলামে রয়েছে যার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, কিন্তু তাকে অবজ্ঞা করা হয়েছে বা ভুল বোঝা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে: ক. আমানতকৃত সম্পদের বিবেক মোতাবেক ব্যবহার; খ. যাকাত ও অন্যান্য দান-সাদাকার মাধ্যমে সামাজিক সাহায্য; গ. উত্তরাধিকার এবং ঘ. আর্থিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন। মাকাসিদ অর্জনে একটি নীতিমালা প্রণয়নে এসবের গুরুত্ব পরবর্তী অধ্যায়ে সুস্পষ্ট হবে। (ঘ) রাষ্ট্রের ভূমিকা অর্থনীতিতে রাষ্ট্র সক্রিয় ভূমিকা পালন না করলে এত ব্যাপক একটি পুনর্গঠণ সম্ভব নাও হতে পারে। রাষ্ট্রকে অবশ্যই ইসলামের মূল্যবোধ ও লক্ষ্যসমূহের বাস্তব রূপদানের চেষ্টা করতে হবে। এর কারণ হচ্ছে, এমনকি একটি নৈতিকতা সমৃদ্ধ পরিবেশেও কোনো লোক এ ধরনের হওয়া সম্ভব, যে অন্যদের অতি জরুরি প্রয়োজন সম্পর্কে একেবারেই অসচেতন অথবা দুস্প্রাপ্য সমস্যা এবং সম্পদ ব্যবহারের সামাজিক অগ্রাধিকার সম্পর্কে উদাসীন। তছাড়া, এমন অনেক কাজ আছে যা সাধারণ কল্যাণের স্বার্থে সম্পাদিত হওয়া প্রয়োজন, অথচ কোনো ব্যক্তি তা করতে আগ্রহী নাও হতে পারে অথবা বাজারের ব্যর্থতা বা পর্যাপ্ত সম্পদ সংগ্রতে অপরাগতার কারণে এককবাবে বা সমষ্টিগতভাবে তা করতে সক্ষম নাও হতে পারে। এমতাবস্থায়, নৈতিক উন্নতি বা মূল্যব্যবস্থা, তা যত অপরিহার্যই হোক না কেন, সম্পদ বিতরণ ও বরাদ্দে ন্যায়পরায়ণতা ও দক্ষতার জন্য যে ধরনের পুনর্গঠন প্রয়োজন তা অর্জনে পর্যাপ্ত হতে পারে না। অতএব প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত মুসলিম রাজনৈতিক চিন্তাধারায় অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের ভূমিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। কয়েকটি বিষয়ের আওতায় এটি আলোচিত হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম আল-আহকাম-আল সুলতানিয়া (সরকারি বিধিবিধান), মাকাসিদ আল-শরীয়াহ, আল-সিয়াসাহ আল-শরীয়াহ (শরীয়াহর রাজনৈতিক নীতি) এবং আল-হিসবাহ (সরকারি হিসাব)। যাইহোক, ইসলামী অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের ভূমিকা ‘হস্তক্ষেপ’ প্রকৃতির নয়, যেখানে লেইজে ফেয়ার পুঁজিবাদের গন্ধ থাকে। এতে ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও উদ্যম নিঃশেষকারী ও স্বাধীনতা হরণকারী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা রাষ্ট্রীয় বিতরণ ব্যবস্থার প্রকৃতি নেই। এটি ধর্মনিরপেক্ষ কল্যাণ রাষ্ট্রের মতোও নয়, যা মূল্যবোধ বিচারের প্রতি অনীহার কারণে সম্পদের উপর জোর দাবি জানায় এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করে। বরং এর ভূমিকা ইতিবাচক ব্যক্তিগত ও সামাজিক স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করে সকলের কল্যাণ অর্জনে সহায়তা করা, অর্থনৈতিক যন্ত্রযানকে সঠিক পথে পরিচালিত করা। শক্তিশালী সুবিধাবাদী গোষ্ঠীকে বিচ্যুতি থেকে বাধা দেয়া রাষ্ট্রের একটি নৈতিক দায়িত্ব। ইসলামী মূল্যবোধ বাস্তবায়নে জনগণের প্রণোগনা যত বেশি হবে এবং মাকাসিদ অর্জন এবং সম্পদ ও দাবির মধ্যে ন্যায়ভিত্তিক সমতা সৃষ্টিতে আর্থ-সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো যত বেশি কার্যকর হবে, অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের তত কম ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে রাষ্ট্রের ভূমিকা যাই হোক না কেন, তা স্বেচ্ছাচারী হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়; শরীয়াহর বিধিনিষেধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ‘আলাপ আলোচনা’র (শুরা) মাধ্যমে কার্যকরী হওয়া উচিত। এভাবে ইসলাম ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং দক্ষতা বৃদ্ধিতে মূল্য কৌশলের ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেয়, তবে বাজার শক্তিকে অলঙ্ঘনীয় মনে করে না। বাজার শক্তির অন্ধ প্রয়োগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামাজিকভাবে সৃজনশীল, উৎপাদনশীল উদ্যোগকে প্রতিদান দেয় না, শোষণ নিয়ন্ত্রণ করে না অথবা দুর্বল ও অভাবীদেরকে সাহায্য করে না। অতএব, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে মাকাসিদ অর্জন নিশ্চিত করতে হবে। ইসলামী রাষ্ট্রকে তার লক্ষ্য অর্জনের জন্য শক্তি ব্যবহার করার কোনো প্রয়োজন নেই বা অর্থনীতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়ন্ত্রণ করা বা তার মালিকানার উপর নির্ভর করারও প্রয়োজন নেই। শরীয়াহ বাস্তবায়নে জ্ঞান, দৃঢ় প্রত্যয় ও কৌশলের অনুসরণ প্রয়োজন (কোরআন-২:২৫৬; ও ১৬:১২৫)। রাষ্ট্র বরং সামাজিক কল্যাণের সীমারেখার মধ্যে কার্যকর ভূমিকা পালনের জন্য বেসরকারি খাতকে সাহায্য ও উদ্বুদ্ধকরণের চেষ্টা কর